Friday, February 9, 2024

** বৈশাখ – কিছু স্মৃতি কিছু ব্যথা ** তমালশেখর দে

 

                              ** বৈশাখ – কিছু স্মৃতি কিছু ব্যথা **   তমালশেখর দে

 

দিনের পর দিন, রাতের পর রাত, মাসের পর মাস গড়িয়ে আসে পয়লা বৈশাখ। কল্যাণ ও নবযাত্রার প্রতীক আমাদের এই বাংলা নববর্ষ। অতীতের সকল গ্লানি ভুলে গিয়ে আমরা সুখ ও আনন্দময় জীবনের প্রত্যাশায় উদযাপন করি বাংলা নববর্ষ। পয়লা বৈশাখ বাংলা সনের প্রথম দিন। এ দিনটিকে  আনন্দঘন পরিবেশে বরণ করে নেওয়া হয় বাংলা নববর্ষের সাথে আবহমানকাল ধরে বৃষ্টিনির্ভর বঙ্গভূমির  নিবিড় সম্পর্।।সাধারণত, বাংলা নববর্ষের সূচনা হতো হালখাতা উন্মোচনের মাধ্যমে। গ্রামে-গঞ্জে-নগরে ব্যবসায়ী সম্প্রদায় নববর্ষের শুরুতে পুরনো হিসাবনিকাশের সমাপ্তি টেনে নতুন হিসাব-নিকাশের খাতা খুলতেন নববর্ষের উৎসব বাংলার গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, ফলে কৃষিপ্রধান  দেশের সাধারণ মানুষদের কাছে এই দিনটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। 

বঙ্গাব্দ বা বাংলা সনের উদ্ভবের বিষয়ে কিছু বিতর্ক থাকলেও বাঙালির ইতিহাস ও তাদের জীবনযাত্রায় এ সনের প্রভাব ছিল ব্যাপক ও গভীর। কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ  উৎপাদনমুখী সব কর্মকাণ্ডে বাংলা সনের ছিল আধিপত্য। বাংলা ও ভারতের নদীতীরবর্তী অঞ্চলে বিকশিত কৃষি সভ্যতার সঙ্গে ঋতুভিত্তিক কৃষি উৎপাদনব্যবস্থাও সম্পর্ক নিবিড় ফসল বোনা, ফসলের সময়ভিত্তিক যত বা পরিচর্যা, ফসল কাটাসহ যাবতীয় কৃষিকাজ বাংলা সন, তারিখ পঞ্জিকা অনুযায়ী নিষ্পন্ন করা হতো। সেই সঙ্গে ভালো ফসল ঘরে উঠলে বাঙালির বারো মাসের তেরো পার্বণও উদযাপিত হতো গ্রাম-বাংলার এই সংস্কৃতি ছিল সংকর সংস্কৃতি বা মিশ্র সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতিতে হিন্দু, বৌদ্ধ, আদিবাসী এবং মুসলিম সংস্কৃতির সমন্বয় ঘটেছিল। এখন কৃষক পরিবারের সন্তানরা লেখাপড়া শিখছে। গ্রামীণ অর্থনীতির মধ্যে নানা উপাদান যুক্ত হয়ে নতুন গতিবেগ সঞ্চার হয়েছে এবং

এতে অনেকের অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে, হাতে নগদ টাকা আসার উৎস সৃষ্টি হয়েছে। ফলে জীবনধারার পরিবর্তন ঘটেছে, বদলেছে  ধরন, আসবাবপত্র এবং সামাজিক রীতিনীতি ও অভ্যাসের। এই পরিবর্তনের ফলে বাঙালির ঐতিহ্যগত

সংস্কৃতির উপাদান এবং জীবনযাত্রার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত বাংলা সনও আর এখন একাধিপত্য করতে পারছে না। 

গল্পকার সত্যজিৎ দত্তের কাছে জানতে চেয়েছিলাম,“পয়লা বৈশাখ নিয়ে বাংলাদেশে যে উন্মাদনা দেখা যায়। আমরা সেটা তৈরি করতে পারিনি। এই ব্যর্থতা নিয়ে কি বলবেন আপনি?” উত্তরে বললেন- “এই ব্যর্থতা অল্প কথায় বলা সম্ভব নয়।এর পেছনে রয়েছে বড় করুণ ইতিহাস। দেশভাগের যন্ত্রণা বুকে চেপে যে প্রজন্ম এদেশে এসে নিজেদের অস্তিত্ব খুঁজতে চেয়েছিলেন, একটা দীর্ঘ সময় তাদের কেটে গেছে পায়ের নিচে মাটি খুঁজে পেতে। সেই অন্যায় অধ্যায়ে কৃষ্টি-সংস্কৃতি সাহিত্য সর্বত্রই বাংলা নববর্ষ ঘিরে তেমন কোন উন্মাদনা দেখা যায় নি। পাশাপাশি ভারতের বৈচিত্র্যময় পরিমন্ডলে বাংলা কেলেন্ডারেরও তেমন কোন গুরুত্ব নেই। যা কিনা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বিপরীত। সেখানে বাংলা ভাষা সরকারি ভাষা। বাংলা পাঠকের সংখ্যাও বহুগুণ বেশি। আর যে বিষয়টি সবচে' বেশি অনুঘটকের কাজ করেছে, সেটি হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ। ফলত নববর্ষ ঘিরে স্বতঃস্ফূর্ত যে অাবেগ বাংলাদেশে পরিলক্ষিত হয়, আমরা তা নিজেরাও সেরকম অাবেগ তাড়িত হই না। হই না বলে নতুন প্রজন্মের কাছেও সঞ্চারিত করতে পারিনা। এই অভিমত অবশ্য সম্পূর্ণভাবেই ব্যক্তিগত।

 কবি সেলিম মুস্তাফা কিছুটা আবেগহীনভাবে সরাসরিই বলেন - “বাঙালির পয়লা বৈশাখ, নববর্ষ । সামান্যই অনুভূতি আনে মনে । কারণ এই সময়হীন সময়ে কোনো  ঐতিহ্যের সঙ্গেই আমরা আর তেমনভাবে জড়িত নই । বাংলাদেশে ওরা পালন করেন কমবেশি । পশ্চিমবঙ্গেও তেমন কিছু হয় বলে মনে হয় না । গেল দুই ভুবন । তৃতীয় ভুবন যদি কাছাড় হয়ে থাকে, সেখানেও শুধু বাঙালি দ্বারা কিছু হয় বলে শুনি না । আমাদের ইতিহাস আর ঐতিহ্য সবই জর্জরিত আর কণ্টকিত । কিছু করা মানে জবরদস্তির লোকদেখানো ফ্যাশন । চাকমাদের বিজু মেলার কল্যাণে পয়লা বৈশাখের কথা মনে পড়ে । আগে তো সরকারি ছুটিও ছিল না । সবই হয়েছে বিজুর কল্যাণে । ২৫শে বৈশাখের আগে কোনো বৈশাখের কথা আমার মনেই পড়ে না । তরুণ প্রজন্মের কবি অভিজিৎ চক্রবর্তী  পয়লা বৈশাখ নিয়ে  তার অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন –“পয়লা বৈশাখ আমাকে মনে করায়, আমি আমার ভাষার সন্তান। এটাই আমার পরিচয়। আমার রক্তে হাজার বছরের পূর্ব পুরুষের ঘ্রাণ। আমি ভুঁইফোঁড় নই। আমার ইতিহাস আছে।

আছে বহু পুরাতন সমৃদ্ধ রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক ঐতিহ্য। হয়তো এখন স্মৃতিচারণই শুধু। তবু বাড়ি-ঘরে এখনো আমাদের মা মাসিরা যে নিষ্ঠায় বিভিন্ন অনুষ্ঠান পালন করেন, তাদের মাঙ্গলিক কাজের মধ্য দিয়ে সেই প্রাচীন কালের কোনো ফুলের গন্ধ যেন পাই। যেন ছুঁতে পারি অতীতের সেই বৈভব।

কবি সন্তোষ রায়ের কাছে জানতে চেয়েছিলাম- “আপনার ছোটবেলায় হয়ত ১লা বৈশাখ নিয়ে অনেক উন্মাদনা দেখেছেন বাড়িঘরে। আজ জীবনের  অপরাহ্ণ বেলায় এই উন্মাদনাকে কি হারিয়ে যেতে দেখছেন?  উত্তরে কবি বললেন – ‘ বাড়ির প্রশস্ত  উঠোনটি নেই, পুকুর নেই, উঠোনের চারপাশে ঘর নেই। গোয়ালঘর, ঠাকুরঘর, রান্নাঘর। আজ একই ঘরে খাই, শুই,এ্যাটাস্ট লেট্রিনে মলত্যাগও  হয়। গোটা ভূগোলটিই বদলে গেছে। বদলেছে যাপনক্রিয়া, মানসিকতা। আধুনিকতার টানে আমরা ঐতিহ্যচ্যুত। শহুরে সভ্যতায় ঢেকেছে সব। আধা প্রাচ্য, আধা পাশ্চাত্য। পয়লা বৈশাখ মানেই মাছ-মাংস। জাতিসত্তা এড়িয়ে চলছি—যা তামিল, তেলেগু, অসমীয়া, পাঞ্জাবি, ভারতের অন্যপ্রদেশ ভলেনি। ভোলেনি, ভোলেনি বাংলাদেশের বাঙালি। ” কবি, গল্পকার কিশোররঞ্জন দে  পয়লা বৈশাখের প্রথাগত আবেগ থেকে একটু সরে গিয়ে  প্রতিক্রিয়ায় বললেন  – “ একজন মানুষ, তার একটা মন। কতদিকে আর ছড়িয়ে দিতে পারে? একটা সীমা তো আছে। উৎসব আমাদের এতো বেশি, বহুমুখী মনটাকে বহু উৎসবে ছড়িয়ে দিয়েছি। ফলে কোথাও পূর্ণতা পায় না। আজকাল দুর্গাপূজাও বাঙালি মনে কতটা আর আবেগ এনে দেয়! কি প্রবীণ, কি নবীন কোনও উৎসবেই আমরা আবেগে ভাসি না।”       

মণিপুরি ছোট গল্পকার, অনুবাদক এল বীরমঙ্গল তার স্মৃতিচারণে বলেন, “ মণিপুরিরা বছরের শেষ দিনটিকে ‘চেইরাউবা’ এবং  নববর্ষকে ‘শজিবু’ উৎসব নামে পালন করে থাকেন।  ‘শজিবু’ অর্থাৎ নববর্ষের একমাসব্যাপী মণিপুরিরা কাজকর্ম সব ভুলে, আনন্দ-ফুর্তিতে  মেতে থাকত। বিকেলে বাড়ির উঠোনে  যুবক-যুবতিরা গোল হয়ে বসে কড়ি খেলত। বাজি ধরা হত।  এনিয়ে ভারি মজার পরিবেশ তৈরি হত।  তবে আজকাল তীব্র প্রতিযোগিতার দৌঁড়ে সেইসব

অনাবিল আনন্দ থেকে আজকের জেনারেশন বঞ্চিত তবু, গ্রামে এখনও নববর্ষের দিনে দূর কোন বাড়ি থেকে যুবক-যুবতিদের কড়ি খেলার হাসি-ঠাট্টা শোনা যায়। তখন মনে হয়, এখনও সোনালি দিনগুলি হারিয়ে যায়নি।”

 চাকমা সম্প্রদায়ের উৎসব নিয়ে আলোচক, গবেষক গৌতম চাকমা বলেন -  “ ‘বিঝু’ চাকমাদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জাতীয় উৎসব। চৈত্রের শেষ দু’দিন এবং নববর্ষের প্রথম দিন অর্থাৎ পয়লা বৈশাখ – এই তিনদিন ব্যাপী এই উৎসব পালিত হয়। ঘর-দোর পরিষ্কার, সাজানো থেকে শুরু করে, পিঠা, পায়েস, দলবেঁধে বিঝুপরিভ্রমণ, লোক ক্রীড়ার আয়োজন করা হয়। বুদ্ধরা পুণ্যলাভের আশায় বুদ্ধ মন্দিরে গিয়ে অষ্ট শীল পালন করে। যদিও যুগের হাওয়ায় কিছুটা ম্রিয়মাণ হয়ে এসেছে। তবে, বিঝু উৎসব নিয়ে আমরা আজও আপ্লুত।”

গবেষক, কবি, উপন্যাসিক নন্দকুমার দেববর্মা তার মূল্যায়নে বলেন, “ আগের মতো আর কিছুই নেই। আমরা ক্রমশ যেন সব হারিয়ে ফেলছি। যেমন বাঙালির তরফ থেকে তেমনই আদিবাসিদের তরফ থেকেও। প্রথাগত ঐতিহ্য থেকে আমরা দূরে সরে এসেছি।  এখন তো একজন ধুতিপরা বাঙালি দেখি না। অথচ আমাদের স্কুল জীবনের একজন শিক্ষককেও ধুতি-ছাড়া দেখিনি। নববর্ষের দিনে বড়দের প্রণাম করার প্রথা আজ অস্তমিত। বছরের এই প্রথম দিন হালখাতার উদ্বোধন হত। সেদিন মিষ্টি খাওয়ানো হত। সেসব নেই আর।  আমাদের

 

আদিবাসিদের মধ্যেও অনেক কিছুই নেই।” আমি আলতো করে জানতে চাইলাম –  “বাংলাদেশ কিন্তু ঐতিহ্যটা ধরে রাখতে পেরেছে। আমরা পারবো না?’ উত্তরে তিনি বললেন, “ দেখো, বাংলাদেশ ভাষা থেকে উঠে আসা একটি দেশ। তারা শেকড়ের যে জায়গাটা ধরে রাখতে পেরেছে, বা পারছে, আমাদের মতো মিশ্র সংস্কৃতিতে তা গড়ে তোলা নানাবিদ কারনেই মুস্কিল।নানা বিপর্যস্ত ইতিহাসও এর জন্য দায়ী। ”   

অবশ্যই এটা ঠিক যে, বাংলা নববর্ষ আজ বাংলাদেশের সমগ্র জনগোষ্ঠীর কাছে বাঙালির আত্মপরিচয় ও আত্ম-আবিষ্কারের প্রধান উৎসবে পরিণত হয়েছে।. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউট আয়োজিত বকুলতলায় বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রানববর্ষ-বরণকে করে তোলে মনোহর ও হৃদয়স্পর্শী। 

এছাড়াও শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ, টি,এস,সি, এবং চারুকলাসহ সমগ্র বিশ্ববিদ্যালয়, তথা সমগ্র ঢাকা শহর বিশাল জনসমুদ্রের উৎসবে পরিণত হয়।  আমার বন্ধুব্যক্তি বাংলাদেশের বিশিষ্ট আবৃত্তিকার এবং সাংস্কৃতিককর্মী রুবেল কুদ্দুস বলেন, বাংলাদেশে পয়লা বৈশাখ উৎসবকে কেন্দ্র করে যে উন্মাদনা গড়ে উঠেছে, বা তোলা সম্ভব হয়েছে, ভারতের মতো বিশাল এবং বহুজাতিক পরম্পরায় তা  বাস্তবায়ন করাটা সহজ নয় ভাষা চেতনা থেকেই আমাদের এই প্রাপ্তি।”    

আমাদের জীবনের সার্বিক পটভূমিতে নববর্ষের  গুরুত্ব ও তাৎপর্য আজও লুকিয়ে আছে।   বাঙালি-উপজাতি মিশ্রিত এই ত্রিপুরার কৃষিনির্ভর জীবনযাত্রায় আজও পয়লা বৈশাখ আনন্দঘন অনুভূতির আত্মপ্রকাশ, আজও আমাদের ঘরে ঘরে কিছুটা নীরবে হলেও টের পাওয়া যায়   

 

No comments:

Post a Comment

অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎

  'অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎ ‎সত্তর দশকের উন্মাদনায় এক ভিন্ন উচ্চারণ-ভঙ্গ...