Sunday, February 11, 2024

‘আই কাণ্ট ব্রিদ’ ঃ এই কবিকে আমরা এড়াতে পারবো না । / আলোচনা ঃ সেলিম মুস্তাফা


 "‘আই কাণ্ট ব্রিদ’ ঃ এই কবিকে আমরা এড়াতে পারবো না "

              সেলিম মুস্তাফা 



কবি তমালশেখর দে । বাংলা দীর্ঘকবিতার ভুবনে এবং একই সঙ্গে অনু-কবিতারও ভুবনে এক অচেনা বাতাস বইয়ে দেবার ক্ষমতাধর কবি । ‘আই কাণ্ট ব্রিদ’ তার ৫ম কাব্যগ্রন্থ । ৮০ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থে ১২টি দীর্ঘ কবিতা, সময় ও অস্তিত্বের অন্ধকার পৃষ্ঠাগুলি খুলে খুলে ধরেছে । পড়তে পড়তে পাঠকের মনে এমন এক গ্লানির অনুভব হয় যে, মাঝপথে বই বন্ধ করে দিতে হয় । পাঠকের মনে অপরাধবোধ কাজ করতে শুরু করে । আর এটাই কবিরও তীব্র বাসনা যেন । পাঠক যতক্ষণ পর্যন্ত না অন্যায়, অমানবিকতার তথা সময় ও সমাজের ঘোর অন্ধকার গিলে ফেলতে বাধ্য হচ্ছেন ততক্ষণ কবি বলেই যাচ্ছেন । হয়ত একই কথা, কিন্তু বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ আর ভিন্ন ভিন্ন ভাষা ও ভাষ্যে । নিস্তার নেই পাঠকের যতক্ষণ না তিনি বুঝতে পারেন যে তিনিই এই অপ-জগতের সৃষ্টিকর্তা, তিনি মোটেই অমৃতের পুত্র নন, বরং একজন হত্যাকারী, যিনি প্রতিদিন নিজের তথাকথিত সহনশীলতা, ভব্যতা, আর শিক্ষা দিয়ে হত্যা করে চলেছেন তার নিজেরই অমূল্য অস্তিত্বকে । তিনি দেখেও দেখেন না, শুনেও শোনেন না, আর বলার ক্ষমতা তো কবেই লুপ্ত । আর এ থেকেই প্রতিমুহূর্তে অবক্ষয়িত হচ্ছে গোটা সমাজ, সময়, সভ্যতা ।  

কবি এসব মোটেই বলেন না । তিনি শুধু দেখিয়ে দেন পাঠককে তার চেহারা, আর প্রশ্ন তোলেন কখনো নৈর্ব্যক্তিক, কখনো নিজেরই বিরুদ্ধে । কবি নিজেকেই সময় সমাজ তথা একজন সামাজিকের শিকার হিসেবে তুলে ধরেন—

‘আই কাণ্ট ব্রিদ ।/আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছি না ।/এখন আর আমি ইচ্ছে করলেই কাউকে/ কুত্তার বাচ্চা গালি দিতে পারি না ।’ (আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছি না ।) 


পত্রিকায় প্রকাশিত বিভিন্ন অমানবিক ঘটনার সংবাদ সাজিয়ে একটা নতুন ধরনের কবিতার জন্ম দিয়েছেন কবি—‘খবর-৫—উত্তর প্রদেশের উন্নাওয়ে ১৭ বছরের দলিত মেয়েকে চাকরি দেওয়ার নাম করে বাড়িতে ডেকে ধর্ষণ করা হয়েছিল । মেয়েটার অসহায় বাবা থানায় অভিযোগ জানাতে গেলে তাকেই মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার করে প্রহার করে পুলিশ… …। কবি লিখলেন—আমরা কি তবে এভাবেই নির্দিষ্ট মাপে শ্বাস নিতে নিতে/মরণের দিকে হেঁটে যাবো ?/ ঠাকুরদার মতো ! বাবার মতো ! পাড়ার পাগলটার মতো/… … প্রতিটা নির্বাচন এলে আমার মনে প্রশ্ন জাগে—/জনগণ আসলে কাকে বলে ?’(গড্ডলিকার মতো হাঁটতে হাঁটতে) । 

জীবনের প্রতিটি ঘটনার, প্রতিটি ক্রিয়ার, দেখার, শোনার, বলার, এমনকী ভালোবাসারও একটা দায় আছে । এই দায়টুকু আমরা পালন করি না, কিংবা জানিই না যে দায় আছে । কিন্তু আমাদের আত্মা জানে দায় আছে, সেই দায় আমরা অনেক সময় নানা বাহানায় এমনকী ঈশ্বরভক্তির আড়ালেও এড়িয়ে যাই । কবি বলেন—‘সমস্ত দৃশ্য থেকেই আমি এ যাবত /কেবল পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করেছি / প্রেমিকার ঠোঁট থেকে আমিই প্রথম ঠোঁট/ টান মেরে সরিয়ে নিয়েছিলাম… …/ আমার বাবার কষ্টের কথা আমি কাউকে বলিনি/পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করেছি/… … বাংলাদেশ থেকে পালাবার সময় আমার পিসি ধর্ষিতা হয়েছিলেন—/আমি কাউকে বলিনি ।’(কেবল পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করেছি) । 

ফ্যাসীবাদ পুঁজিবাদী কী করে আমাদের অজান্তেই আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে শিকলে জড়ায়। আমরা টের পাই না । কেবল অন্ধের মতো কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের ভক্ত হয়ে উঠি, এবং একসময় টের পাই কিছুতেই কিছু  হয় না, হবার নয় । কিন্তু তা বলি না কাউকে, চেপে রাখি নিজেকে লজ্জার হাত থকে বাঁচাতে । কিন্তু একজন কবির সঙ্গে অন্য মানুষের যে পার্থক্য, সেটা শুধু কবিত্ব করার দক্ষতা নিয়ে নয়, বরং সেটা আত্মস্থ থাকার অনুশীলন, নিজের মনুষ্যত্বকে জাগ্রত রাখার অনুশীলন, যা তাকে তাঁর নিজের ব্যবহারিক জীবন থেকেও নিভৃতে আরেক মানুষ করে রাখে । আর সেই মানুষটাই লেখে, সেই মানুষটাই কবি । কবি বলেন— ‘আমি আজকাল আর কোনো প্রতিবাদ মিছিলে যাই না ।/ যত দিন যাচ্ছে তত ভীতু হয়ে পড়ছি ।/ যতদিন যাচ্ছে তত আমি ঘরমুখী হয়ে পড়ছি ।/… … আমার কণ্ঠস্বর, আমার প্রতিবাদ /আমার কানেই ফিরে ফিরে আসছে বারবার /… … আমি একটা অদৃশ্য কাচের দেওয়ালে বন্দি ।/… … এত ভয় নিয়ে কি চলা যায় ?/ আমি কবে একটা মিছিল হয়ে উঠবো বাবা ।’ (আর কবে একা একটি মিছিল হয়ে উঠবো!)

 

এ তো গেল মিথ্যা ও অর্ধসত্যের মায়াজালের গড্ডলিকায় ভ্রমান্ধ এক সামাজিক জীবনের কথা । ব্যক্তিগত জীবন, আমাদের সামজের একটা ইউনিট একজন ব্যক্তি, তার জীবন কেমন ? সমাজের অন্ধকার কোথায় কোথায় আঘাত করে, কবি তা-ও দেখালেন নিজের ওপর সব বিষ উজাড় করে নিয়ে—‘…শ্রাবণীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম--/ জীবনে শেষতম চুম্বন তুমি কাকে দিতে চাইবে ?/না, সে কোনো উত্তর দেয়নি ।/যাবতীয় আঘাতে শীতল হয়ে যাচ্ছে মন /ঝিমিয়ে পড়ছে উত্তপ্ত দেহ /জীবনের লাইট হাউস্টা আলেয়ার মতো ক্রমশ দূরে/ গহীন অরণ্যের দিকে সরে যাচ্ছে ।’ (দুঃখের কাছে ঘুরেফিরে অসহায় হয়ে পড়ি) ।

এই সব কবিতাই এমন উলঙ্গ যে মনে হয় কবিতা নয়, অন্যকিছু । আর এখানেই পাঠকের আসল বিপদ । বারবার বড়ো ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছেন কবি । কবিতা নয়, গল্প নয়, উপন্যাস নয় । কিন্তু কিছু তো বটেই, নইলে এমন অস্বস্তিতে ফেলবে কেন ? কবিতার রূপ চেনা বড় দায় । প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে কাব্যচেতনা রূপ ও তাৎপর্য অর্থাৎ তার ভাষ্য পালটে পালটে এগিয়ে যাচ্ছে । আর আমরা অস্বীকার করব কেন ? অস্বীকার কি আমরা করতে জানি ? যদি জানতাম তাহলে এই কবিতাগুলি লেখাই হতো না। সাহিত্যচেতনার এটাও এক প্যারাডক্স । কবির শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, আমরাও অক্সিজেনের জন্য প্রতিদিন ছুটে যাচ্ছি হাসপাতালের দিকে, যেখানে আসলেই কোনো অক্সিজেন নেই । আমাদের বোধোদয় হোক বা না হোক, এই কবিকে আমরা এড়াতে পারবো না ।

গ্রন্থটির প্রছদ করেছেন অনিমেষ মাহাতো ।


আই কাণ্ট ব্রিদ : তমাশেখর দে

প্রকাশক : নীহারিকা, আগরতলা 


No comments:

Post a Comment

অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎

  'অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎ ‎সত্তর দশকের উন্মাদনায় এক ভিন্ন উচ্চারণ-ভঙ্গ...