Sunday, February 11, 2024

অসহায় একটা সময়ের সামনে দাঁড়িয়ে সবল চিৎকারের কাব্যগাথার নাম যেন “বারবার পাল্টে যাই” কাব্য


 অসহায় একটা সময়ের সামনে দাঁড়িয়ে সবল চিৎকারের কাব্যগাথার নাম যেন “বারবার পাল্টে যাই” কাব্য

“সারাদিন ছুটোছুটি সারাদিন কাজ / সারাদিন ঘাম লালা ভালোবাসা মান অভিমান - / তারও পর সারারাত জেগে বসে থাকা / একা একা / স্বপ্ন আর দুঃস্বপ্নের সমান সমান / অভিযান” ( সংকট -১) সেলিম মুস্তাফা ত্রিপুরার কাব্য জগতে সেই সত্তর দশক থেকেই একটি ভিন্ন সুরের নাম । তাঁর প্রতিটি কাব্যই মূলত নিজেকে একেকভাবে পরিক্রমা করে দেখার পরিক্রমা । তিনি নিজেকে নির্মমভাবে বিদ্ধ করতে জানেন । প্রশ্নে প্রশ্নে জর্জরিত করা তাঁর কাব্যস্বভাব । নিজেকে পাল্টে পাল্টে দেখাই তাঁর কাব্যচলন । নবম কাব্যগ্রন্থে এসেও এর ব্যতিক্রম হল না । বোধ হয় তাই এবারের কাব্যগ্রন্থের নাম রেখেছেন “বারবার পাল্টে যাই”। আগেই বলেছি, বারবার পাল্টে যাওয়াই তাঁর কবিতার মর্মস্বভাব। সেই ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত তার “বাহান্ন তাসের পর” কাব্যের ছয় বছর পর ১৯৮৪ সালে প্রকাশিত “ছোরার বদলে একদিন” হয় । এর দশ বছর পর ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত হয় – “ ইতি জঙ্গল কাহিনি” এর নয় বছর পর ২০০৩ সালে প্রকাশিত হয় “দেবতার অনুরোধে” । এভাবে প্রতিটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের আগে কবি নিজেকে প্রচুর সময় দেন । নিজেকে নিয়ে নিজেই খেলেন পর্যাপ্তভাবে এবং সেই খেলার ছাপ আমরা দেখতে পাই তাঁর কবিতায় । সম্প্রতি ২০২৩ সালের আগরতলা বইমেলায় ‘সৈকত প্রকাশন’ থেকে প্রকাশিত “বারবার পাল্টে যাই” কাব্যগ্রন্থেও তার ছাপ দেখতে পাই ।
“সঞ্জয়, আমাকে বল / কী হচ্ছে ওখানে -/ কেন এত কলরব ?/ বলে দাও -/ নকল যুদ্ধের কোনো প্রয়োজন নেই -/ আমিই কৌরব আর / আমিই পাণ্ডব।” ( নকল যুদ্ধ) – কবিতাটি পড়লেই বোঝা যায় কবি কোন সময়কে ধরার চেষ্টা করছেন ! কিন্তু সরাসরি বিষয়টাতে না-গিয়ে মহাভারতের আড়ালে আজকের পরিস্থিতিকেই ধরলেন । কিন্তু কবি পালটালেন কোথায় ? পালটালেন – “আমিই কৌরব আর / আমিই পাণ্ডব।” এই দেখার মধ্য দিয়ে । আজকের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এর চেয়ে সত্য দেখা বা উপলব্ধি কী হতে পারে ? এখানে কবি কোথাও কাব্য করেননি । জাস্ট সরাসরি কিছু কথা ছেড়ে দিয়েছেন সাদা কাগজের উপর যেন ।
“তোমার টালমাটাল উঁচু হিল / ফুটপাতের কোনো অবিন্যস্ত দেহ সহসা ছুঁয়ে গেলে সন্ধ্যার / অন্ধকারে জনরব ওঠে - / ছবি ওঠে ভোরের কাগজে; খুলে যায় / অবৈধ নগরীর সমস্ত কপাটিকা” (অবৈধ নাগরী)
ক্রমেই চিত্রপট, ভাষা পালটাচ্ছেন কবি । এবং এই ধারাবাহিকতা কবি গোটা কাব্যেই বজায় রেখেছেন । ‘সেফটিপিন খুলে দাও’ ‘চল্ বোবা হয়ে যাই’ ‘বাঙ্কার ও গোলাপ’ ‘নীতু মালতী সেলিম ও হাততালি’ কবিতাগুলোতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন । কবিতার ভিতরে ঢুকে কবিতার ভিতরকে অনেকটাই তছনছ করে দেখার চেষ্টা করেছেন । কতটা সফল হয়েছেন, তার থেকেও আমার কাছে বড় মনে হয়েছে, তাঁর নিজেকে নিয়ে এই ঝুঁকি নেয়ার প্রবণতা । এই ঝুঁকিটাই আমরা পাঠক হিসেবে অনেকের ভিতরে খোঁজে ফিরি । বেশির ভাগ সময়ই হতাশ হই । কবিতায় কবির একটা ভাষা-ফর্ম প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবার পর সাধারণত সেটা থেকে প্রতিষ্ঠিত কবিরা বেরিয়ে আসার সাহস দেখান না । এই ক্ষেত্রে সেলিম মুস্তাফাকে কিছুটা ব্যতিক্রম মনে হয়েছে আমার । তিনি তাঁর প্রচলিত ফর্ম বা তাঁর পরিচিত কাব্যভাষাকে বারবার আক্রমণ করেছেন । প্রতিবারই পাল্টাতে চেয়েছেন নিজেকে । নিজের কাব্যভাষাকে ।
কোরোনাকালীন বিপর্যয় নিয়ে কবির একে একে বেশ কয়েকটি কবিতা পাই এই কাব্যগ্রন্থে । কোনো পক্ষ নয়, বিপক্ষ নয়, দ্রষ্টার দৃষ্টিকোণ থেকে গোটা পরিস্থিতি, বিপর্যয়ের পর্যালোচনা করেছেন তিনি । একে একে লিখেছেন – ‘শোনো কাগজের দুনিয়া, এ বিশ্ব / এখনো মাটির / পা কোথায় যাবে, কোথায় দেবে লাথি -/ লেখা আছে পায়ের তলায়’ (কোরোনার দিন –১) । ‘দলমত নির্বিশেষে / ভালোবাসা নির্বিশেষে অচ্ছুত রয়েছি - / মনে নেই কবে থেকে” (কোরোনার দিন ২) “তুমি তো বাতাস নও / নও তুমি ঈশ্বরের দূত / তবু ছুঁয়ে ফেলেছ সকল / ঘনিষ্ঠ শরীর’ (কোরোনার দিন –৩) ‘ না / কিছু নেই / খাবার নেই ঘর নেই / কাজ নেই / জাতি নেই ধর্ম নেই দেশ নেই / শুধু যান আছে’ (কোরোনার দিন –৪) ‘ চোখগুলি বন্ধ আমার / কান অবরুদ্ধ / ঘরের খুঁটিতে বাঁধা স্তম্ভিত পা / নিঃশ্বাস নেবার জন্য শুধু মুখটি খোলা / কথা বলা যাবে না, মহাযুদ্ধের / জীবাণু বসে আছে গলা দাবিয়ে’ (কোরোনার দিন –৫)। কবি এই সময়কালকে নানাভাবে বিদ্ধ করেছেন । ব্যক্তি থেকে সমাজ, সমাজ থেকে রাষ্ট্রের ভুমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন । তাই তিনি লিখেছেন – “ এ কী আদর্শ ভারতবর্ষ শ্রমিক মারছো পিষে / রক্তের রুটি পাথর ও মাটি ছড়াছড়ি লাশে লাশে ? / ভাষণের নেতা মূর্খ বিধাতা লজ্জা নেই রে তোর / মজদুর মরে পথে প্রান্তরে দেশটাই মৃত্যুর!” ( কোরোনার দিন –৮) । কবির সব কিছুর ভিতরে দেখতে পাচ্ছেন একটা যুদ্ধের আবহ । তাই তো লিখছেন – “ একটা যুদ্ধের তলে তলে আরেকটা যুদ্ধ / লালিত হতে দেখি আমারই অন্নে - / আমারই প্রশ্রয়ে ঝরে / দানবের লালসার লোল’ (‘কোরোনার দিন –৭) ।
কিন্তু এসবের ভিতরে কবি নিজেকে কোথায় দেখছেন ? পাঠক হিসেবে এই প্রশ্নই বারবার নিজের ভিতর উঁকি দিচ্ছিল । আর তখন চোখে পড়ে আরেকটি কবিতা – “ কোনো গল্পের ভেতর ঢুকতে পারি না / গেট খুলে ঢুকতে পারি না বাগানে / বোকার মতো ধমক খাই / বোকার মতো গিলে ফেলি থুতু ” ( নিজের কথা )। কবির এই স্বীকারোক্তির ভিতর এক ক্ষত-বিক্ষত হৃদয়কে দেখতে পাই । “ শুধু শরীর আছে – ক্রিয়াপদ নেই, / কামান্ধ না-হলে আর আলিঙ্গন হবে না,/ ভালোবাসার তালিকা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি / নদীহীন শহরের আবর্জনার পাশে” ( আর না) ।
“বারবার পাল্টে যাই” – কাব্যগ্রন্থে আমি এক অসহায় সময়ের সামনে প্রায় স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কবিকে আবিষ্কার করেছি । এবং পড়তে পড়তে পাঠক হিসেবে নিজেকেও সেখানে আবিষ্কার করেছি । তখন কবির মতো আমিও নিজেকে প্রশ্ন করেছি – “ শব্দ কি সব কথা বলে দিতে পারে ? নিঃশব্দ ?” ( নদী)। তারপরও আমরা বলতে চাই । বলতে বাধ্য হই । কবি শুধু আমাদের তার মানবিক পরিস্থিতির এদিক-ওদিক দেখিয়েছেন । তাই তো কবি আবার বলছেন – “উত্তেজনায় কান্না পায় আমার - / গলা বন্ধ হয়ে যায়” ( নদী) গোটা কাব্যগ্রন্থেই কবি সেলিম মুস্তাফা নিজেকে নতুন এক মোড়কে নিজেকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন মূলত নিজের কাছেই । আর এখানেই আমি এই কাব্যের সফলতা লক্ষ করেছি । আপনারও সেলিম মুস্তাফার এই দগ্ধ হৃদয়ের স্পর্শ নিয়ে পারেন । হাতে তুলে দেখতে পারে কবির এই ‘বারবার পাল্টে যাই’-এর রূপকথা । তাঁর মর্মবেদনার স্বাদ নিতে পারেন । হয়ত অন্ধকারে নিজেকে অসহায় অবস্থায় আবিষ্কার করবেন । হয়ত বেদনাহত হবেন । “হাসি রেখে চলে যায় মুখ / কত অগ্নিবাদ্য, যুদ্ধের নাকাড়া -/ কত দেশপ্রেমপত্র – জয়পত্র ঘোড়ার কপালে ! / আয়ু ফুরিয়ে আসে, যুদ্ধ থামে না -/ দুরন্ত ঘোড়ার কোনো ক্লান্তি নেই” ( বাঙ্কার ও গোলাপ) । এই যুদ্ধ, এই নাকাড়া, এই এই জয়পত্র, এই দুরন্ত ঘোড়ার ক্লান্তি কোনো দিন নেই । হয়ত এটাই চিরসত্য । কাব্যের মর্ম সংকটকে মাথায় রেখে অসাধারণ শৈল্পিক ব্যঞ্জনা এনেছেন প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী পার্থপ্রতিম গঙ্গোপাধ্যায় । তাকেও ধন্যবাদ জানাই ।
কাব্যগ্রন্থ -- “বারবার পাল্টে যাই”
কবি – সেলিম মুস্তাফা
সৈকত প্রকাশন / আগরতলা
মূল্য – ১৩০ টাকা ।
All reactions:
Manas Pal Saikat Prakashan, Basab Maitra and 20 others

No comments:

Post a Comment

অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎

  'অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎ ‎সত্তর দশকের উন্মাদনায় এক ভিন্ন উচ্চারণ-ভঙ্গ...