** কবিতার অফুরন্ত
স্ফূর্তি যখন এক ফর্মা কাব্যগ্রন্থের
ভিতরে **
তমালশেখর
দে
এক ফর্মা কবিতার বই মানেই একটা ঝলক। নিমিষে ফোটে ওঠার স্ফূর্তি। এবং
স্পর্ধা। সদ্য শেষ হয়ে গেল ‘৩৮ তম
আগরতলা বইমেলা’ । বইমেলা মানেই বইয়ের উৎসব । নতুন বই। নতুন আবেগ । উচ্ছ্বাস । আর
বইমেলা পরবর্তীতে চলবে লেখক, পাঠকের
পাঠ-প্রতিক্রিয়ার আদান-প্রদান । এবং সেটা চলতেই থাকবে গোটা বছর ধরেই । এবছর
নীহারিকা প্রকাশনী থেকে এক গুচ্ছ এক ফর্মার কবিতার বই বেরিয়েছে। এর মধ্যে
বাংলাদেশের জনপ্রিয় পাঁচজন কবির কবিতা প্রকাশিত হয়েছে । বাংলাদেশ মানেই একটা
উন্মাদনা । প্রবীণ কবিদের পাশাপাশি একঝাঁক তরুণ কবিদের স্ফুরণ । এমন পাঁচজন কবির
একফর্মার কবিতা বই প্রকাশ করেছে নীহারিকা প্রকাশনী । কবি মুজিব ইরম-এর কবিতার
বইয়ের নাম ‘মু.ই’ । এই সময়ের বাংলাদেশের তরুণ তুর্কি
কবিদের তিনি অন্যতম। তার কবিতার নিজস্বতা, স্টাইল পাঠককে নতুন এক দিগন্ত দিয়েছে। যেমন
– “ মনোবাসে আছি আমি মনোবাসে আছি, অজানা স্রোতের টানে নাই হয়ে/ বাঁচি।। দেশছাড়া খেশছাড়া ভিনবাসী মন,
হারানো মানুষ আমি করহ / যতন।।” (মনোবাস) কিংবা “
কিতা তুমি কও খালি, কিতা তুমি কও ! আমার লাগে না ভালা! আমার / বুকর মাঝে লুকানো যে
দুখ, আমার দিলর মাঝে লুকানো যে অচিন / অসুখ” ( জিওল কবিতা) কবি কবিতা নিয়ে অনবরত পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বিশ্বাসী।
আরেক কবি হেনরি স্বপন এর “আলপথ দূরে”
কাব্যে দিয়েছেন হৃদয়ের দুরন্ত ছোঁয়া। কবিতার ভিতর দিয়ে সামাজিক নানান অসঙ্গতিকে তুলে
ধরতে আগ্রহী তিনি। যেমন-“ আগুনে দুরন্ত হও, দহনেও আমনের ধানচাষ.../ জোনাকিরা উঁকি
দেয় সাঁজের সঙ্গমে রাতের নিঃশ্বাস।”(অভিমানে ঝরে কষ) কিংবা “অবিরত ঝরে রতি, শরীর
উর্বর শস্যে ভরা উরু / লাঙল চাষের সব কলা বুঝি ? উড়ে বাতাসের বুকে / মুখ গুঁজে
শিখে নেবে, শ্রমজীবী রমণীর গন্ধ শুঁকে –” (শিশ্নের প্রস্রাব) । কবি হেনরি স্বপনের
মেজাজ বোঝাতে আর একটি কবিতার দুই লাইন উল্লেখ করছি – “হাঙরের ক্ষুধা যেন,
আরব্য-ব্রা বোঁটায় মুক্তা বসানো / ফাটলে কাঠের চাকা ঢুকে, ঘর্ঘর শব্দ কিসের জানো
?” (ঘর্ঘর শব্দ কিসের জানো)
কবি অসীম সাহা বাংলাদেশের ‘একুশে
পদক’ প্রাপ্ত আরেক জনপ্রিয় কবি। তার উপমা, ব্যঞ্জনা তৈরি করার ক্ষমতা সম্পর্কে
পাঠক সমাজ ওয়াকিবহাল। তার কবিতার ভিতরে জীবনের বোধ বারবার জাগরিত হতে দেখা যায় । “
কথা থাকলেই রাখা যায় না ! কথার পৃষ্ঠেও কথারা লুকিয়ে থাকে ।/ ভাষা জানা থাকলেই
জানা হয় না, ভাষাজ্ঞানও থাকা প্রয়োজন ।” (শেষ-পরোয়ানা) বাংলাদেশের আরেক জনপ্রিয় তরুণ কবি হলেন পিয়াস মজিদ । নীহারিকা থেকে প্রকাশিত হয়েছে
তার “বেঁচে থাকার বসন্তবাগান”। এই কাব্যগ্রন্থে কবি ছোটো ছোটো বাক্যের ভিতর দিয়ে
জীবনের জটিলতাকে ধরার চেষ্টা করেছেন । যেমন – “ কথার/ কাকলি-ভিড়ে/ কথাতেই খুঁজি/
নৈঃশব্দের ঘর।/ মানুষ মূলত / তার/ ছায়ার সহোদর।” (সেই দুপুরের ছায়ায় মায়ায়) কিংবা
“ প্রতিটি /অভ্যর্থনায়/ আছে/ বিদায়ের/ গন্ধ।” (অতঃপর) বিষয়, আঙ্গিক সব কিছুই নিয়ে তিনি ভাবেন। পাঠককে ভাবান । এটাই
তার প্রধান বৈশিষ্ট্য । বাংলাদেশের নব্বই দশকের উল্লেখযোগ্য কবিদের মধ্যে ওবায়েদ
আকাশ অন্যতম একজন । তার কবিতায় একটা নিজস্ব ঢঙ আছে। উপস্থাপনায় আছে অভিনব কৌশল এবং
আছে স্বতন্ত্র ভাষারীতি ।ভাবনার আধুনিকতাই তার
কবিতার প্রধান অস্ত্র । যেমন – “ গতকাল থেকে কেউ আর আমাকে দেখছে না / এই
প্রথম আমি সম্পূর্ণ প্রকাশ্য থেকেও একপ্রকার আত্মগোপন প্রচেষ্টায় / সফল হতে
পেরেছি।” ( আত্মসম্মোহনমূলক) অথবা
“রাত্রিরা রক্ত গুনছে, রক্তস্নান,
রক্ত পোহাচ্ছে- / বাইরে তখন একা একাত্তর / তার সমস্ত বিশ্বাসে শোণিত জখম” (একাত্তর)।
এবার আসি, ত্রিপুরার কবিদের এক
ফর্মার বইয়ের প্রসঙ্গে । কবি মৌলিক মজুমদারের এক ফর্মার কবিতার বইয়ের নাম দিয়েছেন
“আমি অনাগতবিধাতা”। মৌলিক ইতিমধ্যেই নিজের চিন্তায় নিজস্বতা আনতে সক্ষম হয়েছেন।
কবিতা ভাবনার ভিতর জীবনবোধকে মিশিয়ে কবিতাকে করে তুলে অনন্য এবং ঝরঝরে।তার কবিতার
মেজাজ বোঝার জন্য, তার কাব্যের প্রথম কবিতাটি তুলে ধরাই যথেষ্ট মনে করছি । যেখানে
কবি লিখছেন – “ আমরা দুজনেই বৃক্ষ খুঁজেছিলাম পরস্পরের মধ্যে / নিশ্চিদ্র নিদ্রা
চেয়েছিলাম গাছের কোটরে ।/ ঘুমের ভিতর বৃদ্ধ হয়েছি .../ আজও পাখিওড়া দিন/ গাছ নেই
পাখি আছে/ তারা নিরুপদ্রব ঘর করে আমার শাখায়...” (ঘুমের ভিতর)। কবি মৌলিকের
বৈশিষ্ট্য এই একটি কবিতার মধ্যেই ধরা পড়ে । একটি ঘুমের ভিতর দিয়ে কবি ব্যক্তি থেকে
প্রকৃতি, প্রকৃতি থেকে জীবনের সংশয়কে স্পষ্ট করে তুলেছেন । এরপরই বলতে হয় কবি
পার্থ ঘোষের কবিতার বই “বেদনার মতো নীল”-র কথা । কবির কবিতার প্রথম লাইনটাই আমাকে
মুগ্ধ এবং গভীর আবেগে আচ্ছন্ন করে ফেলল। যেখানে
কবি লিখছেন –“কীভাবে কাকে বলা যায় – মরে আছি বহুকাল”( কীভাবে কাকে বলা যায়) এই
একটিমাত্র লাইনের ভিতরেই রয়ে গেছে অজস্র কথা । কবিতাটির ভিতর খুব চুপচাপ একটা নিঃসঙ্গতার
বেদনা টের পাওয়া যায়। একই মেজাজ টের পাই তার ‘নিজস্ব’ কবিতাটির ভিতর, যেখানে তিনি
লিখছেন –“...এই ব্যথাঘর তোমাকে দিলাম /
জেনে নাও তারার বৈচিত্র্য ও আকাশ ।/ মগজের ভিতর এই ব্যথাঘর / আজব এক একলা শ্মশান”।
কিংবা “প্রেম নামক আধুলিকে নেড়েচেড়ে দেখি -/ আসলেই মুদ্রার এ-পিট ও-পিট ।” (অতঃপর)
। ‘মাতালের কাব্য দর্শন’ কবিতায় নানাদিক দেখিয়ে শেষমেস পাঠককেই প্রশ্ন করে বসলেন –“
জগতের সমস্ত ব্যর্থ প্রচেষ্টার নাম কি তবে / - কবিতা ?” কবির কাছে স্বাভাবিকভাবেই
আশা রইল। কবিতা তো জীবনেরই উন্মোচন।
কবি রিয়া দেবী আমার কাছে খুবই
সম্ভাবনাময় একটি নাম। তার কাব্যগ্রন্থ “উদ্বাস্তু জীবন” বইটি নিয়ে পড়তে পড়তে এসে
থামকে যাই, যখন চোখে পড়ে – “প্রত্যেকটা মানুষের মধ্যেই একটা নদী থাকে / পারাপারের
সাঁকোটাই শুধু ভিন্নরকম” (পূর্ণতা) কিংবা “ মুঠোফোনের একপ্রান্তে ছিলে তুমি আরেক /
প্রান্তে আমি,/ কথা হল তবুও মাঝখানে শূন্যতায় সবটাই ছিল/ বেমালুম ফাঁকি।”
(মুঠোফোন) কিংবা “ যদি একটা দিন এমন হত / আমার না বলা কথা সব/ তোমার হৃদয় ছুঁয়ে
যেত” ( আকাশকুসুম) কিংবা “ আমাদের বুকে কোন সাদা বক নেই/ তবুও আমরা পাখি/ ... ভিতর ঘরে অপ্রকাশিত ময়লার বাক্স /কত আবর্জনা
জমা থাকে ঠিক/ ঢেকে রাখি যন্ত্রণার পেরেক ঠুকে ঠুকেই” ( ধারণ) । কবি আমাদের জীবনের
খুব কাছাকাছি ছড়িয়ে থাকা উপকরণ থেকেই বিষয়কে নির্বাচন করেন। কিন্তু বোধকে পোঁছে
দিতে চান অজানা এক বেদনার দিকে। তার কবিতার ভিতরে নিজেকে খোঁজার একটা তৎপরতা আছে ।
কবির এই ধারা এবং সন্ধান একদিন তাকে
পূর্ণতার দিকে নিয়ে যাবে আশা করতেই পারি। তরুণ কবি সন্দীপ-এর কবিতার বই
‘ইচ্ছেসিঁড়ি’। কবিতাকে বুকে যাপন করাটাই বড় কথা। ‘অনুভূতি’ কবিতায় সে লিখছে – “
সময়ের বুকে জমেছে তোমার স্মৃতি/ কথার মাঝে কথারা লোকায় অভিমান/ মনের সাথে মন
পুশেছে সংঘাত/ আঙুলের ফাঁকে যৌবন মাপে স্লোগান”। কবির কাছে আগামিতে নিশ্চয়ই আরও
অনেক ভালো ভালো কবিতা উপহার পাবো ।
প্রত্যেক কবিই জীবন নিয়ে , জীবনের
নানা দিক নানাভাবে দেখার চেষ্টা করেছেন । সেই অর্থে তারা জীবনের রুপকার । কবিদের
প্রত্যেকেরই জীবনজিজ্ঞাসা বা অর্থসন্ধানের রূপ ভিন্ন ভিন্ন রকমের । বিন্দুর মধ্যে
সিন্ধুর মতো তাদের একঝলক মনকে আনন্দ দিয়ে গেল । আশাকরি আপনাদেরও ভালো লাগবে ।

No comments:
Post a Comment