** চারজন কবির বিচিত্র স্বাদের চারটি কাব্যগ্রন্থ **
তমালশেখর দে
তাবৎ বিশ্বে সব কিছুই কবিতার বিষয়বস্তু হতে
পারে । কবিতা এক আগ্রাসী শিল্পের প্রতিমা । তার কাঠ-খড় মাটি রঙ চোখের পল্লব তৃতীয়
নয়ন থেকে মুকুট পর্যন্ত সবই কবির চিন্তাকল্পনা । ভাবানুষঙ্গ ও চিত্রকল্প ও
কাব্যভাষার আধার থেকে উঠে আসে । তার মনোজগতের ভিতরে অনেক আলো-আঁধারি, অস্পষ্টতা,
জটিল ভাবনাচিন্তার মিলিত ও বিপরীত স্রোত খেলা করে । নব্বই দশকের কবিদের মধ্যে
উল্লেখযোগ্য কবি বিশ্বজিৎ দেব। স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল তার কবিতা। শুরু থেকেই তিনি
তার কবিতায় নিজস্বতা বজায় রেখে চলেছেন ।৩৮তম আগরতলা বইমেলায় বেরিয়েছে তার পঞ্চম
কাব্যগ্রন্থ “বিকেলের হার্টক্রেন”। নামের মধ্যেই কবি তার ভাবনার অভিনবত্বের ছাপ
রেখেছেন । এই নামের সাথে মিলিয়ে কবির যে কবিতাটি আমাকে খুব আকর্ষণ করেছে , তার নাম
– ‘একটি বিনম্র ফ্লাইওভার ও তার মরচের
আকরিকগুলি’। কবি লিখছেন – “ ইস্পাতের নীরবতাগুলি তাকে বেঁধে রাখে শূন্য
মাঝারে। বুকের দুদিকে দোটানা । পাঁজরের মরচের গায়ে জমে থাকে ভার বহনের স্মৃতি।
শূন্যের উভয় প্রান্তে গেঁথে রেখেছে সে অহংকার, ভেঙে না পড়ার অদম্য কংক্রিট ”। কবি
বলছেন একটি ফ্লাইওভারের কথা । অথচ পড়তে পড়তে মনে হচ্ছে যেন কবি এখানে মানুষের কথাই
বলছেন। দুই
প্রান্তকে আশ্চর্যজনকভাবে মিলিয়ে দিচ্ছেন জীবনের সাথে । তাই তো তিনি এরপরই বলছেন –
“ রাতের গভীরে যখন সব চলাচল থেমে যায় রোজ, সারাদিন কষ্ট বোঝাই পণ্যের লরিগুলি ফিরে
যায় কোজাগরী টার্মিনালের দিকে তখন তারও ঘুম পায়, মাসি পিসি পায় । নিরুত্তর আকাশের
নিচে গাঁটের ইস্পাতগুলি খুলে রাখে নস্টালজিক ব্যথা”। কবি বিশ্বজিৎ কীভাবে রাতের
বিষণ্ণতার সাথে মাসি-পিসি মিলিয়ে নিছক একটি
ব্রীজের প্রতীক থেকে ‘নস্টালজিক ব্যথা’ অবধি পৌঁছলেন, তার এককথায় অনবদ্য । কবির
নিজস্ব একটা ভাষাজগৎ রয়েছে । রয়েছে নিজের একটা মুনশিয়ানার স্টাইল । কবির মনোজগৎ
বোঝার জন্য, একটি কবিতার কিছু অংশই যথেষ্ট বলে, মনে হয়েছে আমার। কবি বিশ্বজিৎ দেবকে আরও প্রগাঢ়ভাবে বুঝতে হলে, তাকে নিবিড় পাঠ করা জরুরি।
এই কবির রূপ ও প্রকৃতি, অন্তঃসার ও লক্ষণ মৌলিকতায় ভরপুর। কবিতা পাঠের ঋদ্ধ পাঠ
না-থাকলে, চট করে তাকে বোঝে ওঠা মুশকিল।
নীহারিকা প্রকাশনী থেকে এবছর উল্লেখযোগ্য
আরেকটি কবিতা বই কবি সুবিনয় দাশের ‘১০০ স্বনির্বাচিত কবিতা’। আশির দশকের রই কবির কবিতায় অর্থনৈতিক টানাপড়েন, নৈতিক মূল্যবোধের অভাব, ভোগবাদের
আগ্রাসনের চরিত্র তার কবিতার রন্ধ্রে রন্ধ্রে বসবাস করে । শ্লেষ তার কবিতার অন্যতম
প্রধান অস্ত্র। সিরিয়াস
পাঠকের কাছে তিনি খুবই উল্লেখযোগ্য একটি নাম । তার প্রখ্যাত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে
উল্লেখযোগ্য হল – ‘জ্বলে অম্লান’ ‘ রাত্রির সেতার’ ‘ হৃদয় যেখানে উপদ্রুত’ ‘ নিজের
কপাল নিজে খাবো’ ‘ সারাদিন সারারাত’ এমন করে প্রায় ১২টি কাব্যগ্রন্থের জন্মদাতা
তিনি। সেই সব কাব্য থেকে বাছাই করে এবছর ‘১০০ স্বনির্বাচিত কবিতা’ বেরিয়েছে। কবির নিজের সবচেয়ে পছন্দের একশটি কবিতার সংকলন। সেই অর্থে
বইটি খুবই মূল্যবান । কবির কবিতার টুকরো টুকরো কিছু নমুনা তুলে ধরছি । যেমন –
“অসংখ্য শব্দ জড়ো করে আগুন জ্বালাই/ কি ভাবছো ? দুঃখে বোঝা কিছুটা কমাতে পারলাম ?/
মানিব্যাগ ফাঁকা তবু লিখছি ” (মানিব্যাগ), “ বিষণ্ণ মুখ, খিল খিল হাসি / হা করা
পয়েট্রি সকল / কফি হাউস, বইপাড়া ঘুরছি” (বিষণ্ণ মুখ), “বিহঙ্গকে বলেছি খাঁচা ভেঙে
পালাও / ইনি বামপন্থী ইনি ডানপন্থী/ সুযোগ পেলেই চাঁদা মেরে ধাঁধাঁ করেন” (ছবি), “
পাগল যাচ্ছে, তাকে তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে / সুস্থ লোকের দল, চকলেট খাচ্ছে মা
ভবতারিণী” (ডিকশনারি)। এই রকম অসংখ্য উল্লেখযোগ্য কবিতা আছে কবির ‘‘১০০
স্বনির্বাচিত কবিতা”-র বইটিতে । একটু ভিন্নধর্মী কবিকে জানতে হলে, বইটি পড়তেই হবে। খবুই
মননশীল প্রচ্ছদ করেছেন বাংলাদেশের শিল্পী চারু পিন্টু।
ত্রিপুরার আরেক উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় উল্লেখযোগ্য
কবির নাম পায়েল দেব। ৩৮তম আগরতলা বইমেলায়
প্রকাশিত হয়েছে তার চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ “নিমফুল”। কবি অশোক দেব কবির কবিতার
বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন – “পায়েল দেবের কবিতায় মেদবাহুল্য নেই,
নির্মাণের ছেনি হাতুড়ির শব্দ নেই। অন্যদিকে ভাবালুতার ভারও ক্লান্ত করে না পাঠককে
। নিজস্ব এক বাকবিভুতি সৃষ্টি করেছেন পায়েল ।” আসলেই পায়েলের কবিতা এমনই! যেমন – “
আমাকে শূন্যতার দিকে নিয়ে গেছে এক নিপুণ জাদুকর/ সব জাদু বাদামের খোসার মত ছাড়িয়ে
/ নিজেকে আলগা করে দেখেছি – অচেনা”(শিল্প) অথবা “ অনেক চিঠির পর ফিরে আসে বসন্ত /
উলের জামার গোলাপি ও কাশ্মীরী গাঢ় নীলে / ভাঁজ করে রাখতে হয় শীতের ওম ”(খেলাঘর
বাঁধতে লেখেছি) কিংবা “ টুকরো টুকরো সময়ের গায়ে /
সে এক বেশ্যা, এক রক্ষিতা, মা অথবা বউ / এখন একা থাকে / মাঝে মাঝে কাছে যাই
/ প্রতিবার আয়না ভাঙার শব্দ বয়ামে ভরে চলে আসি” (সোহাগি) অথবা “ তাদের মৃত্যুর পর
সন্ধ্যা নামে / যে করে পাখিদের ঠোঁট বধির হলে আসে দুঃসময়” (উপসুর) । “ তার মৃতদেহে
হোঁচট খেতেই মনে হল / কোনও অশ্বমেধের আগুন / ঠোঁটে তিল আঁকা”(ক্ষুধা) । শব্দকে
নিঙড়ে অনুভূতির গায়ে রঙ ধরানো কবিতার অন্যতম শর্ত ও জরুরি বিষয় । সেই শর্ত এবং এবং
তার বার্তা খুব ভালো করেই রপ্ত করেছেন কবি পায়েল । প্রায় প্রতিটি কবিতার ভিতরেই
কবি রেখেছেন জীবনবোধ, বোধের বিন্যস্ত বিন্যাস। উগ্রনারিবাদি মানসিকতা কোথাও তেমন
চোখে পড়েনি। বরং এর পরিবর্তে কিছু
অসামঞ্জস্য ব্যবস্থার দিকে তিনি আঙুল
তুলেছেন । “আত্মীয়স্বজনরা উলুধ্বনি
দেয় / ঠাকুরে পেয়েছে, ভর করেছে দেহ ।” পায়েল দেব জানেন, কবিতার মূল কথা কোথায় ! আগামিতে
ত্রিপুরার কবিতাকে তিনি আরও মুগ্ধস্তরে নিয়ে যাবেন এটা আশা করতেই পারি।
তরুণ কবি সুব্রত দেববর্মা ত্রিপুরার কবিতায় এক
নতুন সম্ভাবনার নাম । তার “অ্যান্টিবায়োটিক কবিতা” পড়তে পড়তে তাই মনে হয়েছে আমার ।
তার কাব্যের প্রথম কবিতাই তা জানিয়ে দেয় – “ যখন সন্ধ্যা নেমে আসে মহাকাশ থেকে/
নিজেকে কেমন শ্মশানের পাশে / ডোমেদের ঘরের মতন মনে হয় ।”( পাঁচ দিনের প্রেম) কিংবা
“ আমি ভাতের লড়াইটা দেখিনি / দেখেছি জাতের লড়াই”( ভাত ফেলে জাতের লড়াই) অথবা
“মেঘলা রাতগুলো শুষে নিচ্ছে সস্তা নিকোটিন / কেটে যাচ্ছে ক্ষোভে ভরা আরেকটা
বৃষ্টিরদিন।/ মৃত্যুদণ্ডের আসামির মতো বেঁচে আছি প্রায়”( বৃষ্টি নয় নিকোটিনের জল)। কবি সুব্রত দেববর্মার ভিতর নিঃসন্দেহে
কবিতার মনোবীজ রয়েছে । যা আগামিতে আরও
তাৎপর্যময় হয়ে পাঠকের হৃদয়ে ধরা দেবে। প্রচ্ছদ শিল্পী চারু পিন্টু প্রত্যেকটি কবিতার
বইয়েই ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের প্রচ্ছদ উপহার দিয়েছেন। আশা করি,
নীহারিকা প্রকাশনীর দ্বারা এই সময়ের উল্লেখযোগ্য চারজনের কবিতা আপনাদের ভালো লাগবে।
১। বই
– বিকেলের হার্টক্রেন
কবি – বিশ্বজিৎ দেব
নীহারিকা প্রকাশনী
মূল্য – ১৪০ টাকা
২। বই
– ১০০ স্বনির্বাচিত কবিতা
কবি – সুবিনয় দাশ
নীহারিকা প্রকাশনী
মূল্য – ১৭০ টাকা
৩।
বই – নিমফুল
কবি – পায়েল দেব
নীহারিকা প্রকাশনী
মূল্য – ১৪০ টাকা
৩। বই – অ্যান্টিবায়োটিক কবিতা
কবি – সুব্রত দেববর্মা
নীহারিকা প্রকাশনী
মূল্য – ১৭০ টাকা
No comments:
Post a Comment