কবি শুভদীপ দেব এবং তার কাব্য-‘উড়ন তস্তরিয়ে’
‘পাগল কেবল উপযুক্ত কবিরাই হতে পারেন।’ / তমালশেখর দে
কবিতায় চিত্রকল্পের
ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়, এনিয়ে
নতুন করে বলার কিছু নেই। তবে এই
চিত্রকল্পকে কোন কবি কীভাবে নিচ্ছেন, কীভাবে গড়ছেন বা ভাবছেন, এখানেই কবির সাথে
সাথে প্রজন্মের চিন্তাভাবনার গুরুত্ব। এগিয়ে যাওয়া। নতুন দৃষ্টি এবং বক্তব্যের
চাপে পুরনো কবিতার ছাপ ভাঙার একটা
ঐকান্তিক প্রচেষ্টা দেখতে পাওয়া যায় কবি
শুভদীপ দেব-এর ‘উড়ন তস্তরিয়ে’-র প্রথম কাব্যগ্রন্থেই।‘আমার প্রিয়তমার ঠোঁট
কামড়ে দিয়েছে/ কোন ক্রিয়েটিভ কুকুর’(ফ্রি) বই খুলে প্রথমেই এই লাইনে আঁতকে যাই।শুরুতেই
কবি বুঝিয়ে দিয়েছেন ক্রিয়েটিভিটি নিয়ে কবি নতুন করে কিছু ভাবতে চলেছেন। যা প্রথাগত
ধারণাকে ভাঙতে চলেছে, আঘাত করতে চলেছে। ‘আমি?/সেই কবে মরে গেছি, মনে নেই।/তবে সাহারা
মরুভূমির মাঝামাঝি অঞ্চলে;/আমার মৃতদেহটাকে একলা পেয়ে/ খা খা করছে/ একঝাঁক শকুন আর
শকুনি’ (গুমর)—সাথে সাথে মনে পড়ে গেল সেই কবেকার শোনা কথা – ‘ভাষা যতটা প্রকাশ করে তার থেকে আবৃত করে
বেশি।’ কবি শুভদীপ দেব এরপরই অনেকটা
নিজেকেই যেন ব্যঙ্গ করে পরের পঙক্তিতে বলছেন –‘দূর থেকে দেখছি আর ভাবছি;/ “ওরা আর
কি পাবে?”। কবির এই ব্যঞ্জনা-তৈরির খেলা পাঠক হিসেবে আমাকে মুগ্ধ করে।‘উড়ন তস্তরিয়ে’-র কবি অনেকটা বিচ্ছিন্নতাবোধ, নিঃসঙ্গতাজনিত
বিষাদ, চৈতন্যগত অবক্ষয় ও হতাশা, এককথায় অস্তিত্বজনিত আতঙ্ক নিয়ে অবলীলায় নানাভাবে
পরীক্ষাননিরীক্ষা করেছেন তার গোটা কাব্য জোড়ে। এখানেই শুভদীপের কৃতিত্ব এবং
দুঃসাহস। দুঃসাহসই এই কবির প্রেরণাস্থল। নিছক কবিতায় তার তীব্র অনীহা থাকবে, এটাই
স্বাভাবিক। কবি তাই অনায়াসে বলতে পারেন – ‘তোমরা কারা আমার জেনে লাভ নেই/
অন্দরের ঈশা আর শয়তানের সম্পর্ক/ নিপাতে ঢেলে দিয়েছি কবেই’(গল্প) অনেকদিন পর এমন
স্পর্ধামাখা উচ্চারণ মনকে মুহূর্তে পুলকিত করে। কবি এরপরই বলছেন –‘আমি তো নেই
পৃথিবীর কোথাও/ তবু একটা সৃষ্টি থেকে আরেকটা সৃষ্টির ফাঁকগুলো থাকে/ দিনে দিনে
আত্মহত্যার ইচ্ছেগুলোও মরে যায়...’ এখানে কবি ‘ও’-কেন ব্যবহার করলেন? তবে কি ‘আত্ম’-কে
‘হত্যা’ করার মাঝেও কবি একটা বক্তব্য রাখতে চাইছিলেন? তাহলে রাখলেন না কেন? কবি
শুভদীপকে এভাবে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে পাঠ না-করলে, পাঠভ্রম থেকে সহজেই পাঠকের মনে
ক্লান্তি আসা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এভাবে কবির অনেক কবিতার অনেক লাইন ভাবায়। যেমন-‘ ‘একটা
উড়তে জানা পাখি / সারাক্ষণ ডানা ঝাপ্টায় না/ তাও দেখি/ শিখি/অসংখ্য শব্দ প্রদক্ষিণ
করতে করতে/ চিৎকার ক্ষীণ হয়ে আসে।’(ধোঁয়া)।‘প্রত্যেকটা মশারির ভেতর ঠিক যেভাবে
তৈরী হয়ে যায় আরেকটা ঘর/সেভাবেই পেঁয়াজের খোসার মত ভাঁজে ভাঁজে আমরা বেঁচে যাই
জীবনান্তরে/এই শরীর থেকে শিখেছি, এই শরীর শুধুই বাঙ্কার।’(ভণ্ডুল)- এই
ভাবব্যঞ্জনা, চিত্রকল্প, কবির উপলব্দি, প্রথার বাইরে গিয়ে আপনাকে কিছু বলতে চায়।
বিগত দশকের উন্মাদ সাহিত্য আন্দোলনের ঢেউয়ের কথা আবার মনে করিয়ে দেয়, নতুন
চিত্রকল্পে, নতুন উন্মাদনায়।অন্য একটা মাত্রা যোগ করে ‘উড়ন তস্তরিয়ে’ কবিতাটা। আবার
এই কবির কলম থেকে অনায়াসে বেরিয়ে আসে- ‘দু’টো সাপ যেভাবে দু’টো সাপের বুকে / হাত
রেখে/ সারাটা শীতের জন্য ঘুমিয়ে যায়,/সেভাবেই ভালোবাসার অনন্ত গভীরতায়/ চল ঢুকে
যাই’(শীতঘুম)আবার একটু ভিন্ন ‘আমার যৌনতার গভীরতায়,/রক্তের অনন্ত শীৎকার’(ধবধবা
পাইপ)-কবির এইসব লাইনের গভীরতা, আমাদের আরও আরও প্রত্যাশা বাড়িয়ে তুলে কবির কাছে।
আপনি
‘সিগারেট জ্বলতে থাকলেই আরও একটা সম্ভাব্য সিগারেট প্যাকেটের কাঁধে কাৎ হয়’
এই লাইনটাই ধরুন, শুনতে বা পরিকল্পনা করতে
যতটা সহজ মনে হচ্ছে, ভিতরে ততটাই কঠিন ছিল এই নির্বাচন। অথচ কবি কি খুব ভেবে-চিন্তে, পরিকল্পনা করে
লাইনটা আবিষ্কার করেছেন ? নিঃসন্দেহে না। আমরা ধারণা কোন এক অজানা মুহূর্তে হঠাৎ স্পার্ক করেছে
কবির মননের ডগায়। কিন্তু কবি এই লাইনের ভিতর দিয়ে ধরতে চেয়েছেন আমাদের মনোজগতের জটিল এক মনস্তাত্ত্বিক জায়গা।
যে-জায়গাটা পুঁজিপতি বাণিজ্য সংস্থাগুলি খুব চুপিসারে ধরার চেষ্টা করে থাকে।যে
জায়গাটা নিয়ে প্রথমবিশ্ব আমাদের সাথে বাণিজ্য খেলে, অর্থনৈতিক রাজনীতি করে। এটা
আমাদের মধ্যবিত্ত মানসিকতার সবচেয়ে স্পর্শকাতর গোপন জায়গা। আরও একটু চাই! আর একটু
হলেই ......! এই ‘একটু’র কোন শেষ নেই। কোনদিন হয়ও না, হবারও নয়। প্রাপ্তির একটা
চূড়ান্ত জায়গায় না-যাওয়া পর্যন্ত এই চাওয়ার বা মানসিকতার কোন শেষ নেই, মুক্তি নেই
আমাদের। এই চাওয়াই তো আমাদের কাল। এখানেই তো মূলগত আমাদের সমস্যা। আর এই সমস্যার কথা কর্পোরেট সেক্টর খুব ভালো
করেই জানে।আমরাও জেনে-শোনে বা অবচেতনে তার চাহিদার কাছে আত্মসমর্পণ করি। এটাই আমাদের স্বাভাবিক
প্রবৃত্তি। অবচেতনের এক জটিল সমীকরণের দিকেই আসলে কবির এই ‘কাঁথ’ হওয়ার ইঙ্গিত।
শুভদীপ কেবল বলেছে, আজকের পরিভাষায়। আজকের ব্যঞ্জনায়, একটু হালকা চালে। এবং এই
বলার মাঝে কবির দীর্ঘ প্রস্তুতির পরিভ্রমণ টের পাওয়া যায়। ভাবনার জটিল জগতে
দীর্ঘপরিভ্রমণ ছাড়া এইরকম একটা লাইন সহজে
আসতে পারে না মননের ডগায়।অবচেতনেও না। এখানেই কবির প্রস্তুতি।নিজের সাথে, নিজের মতো
করে কবির চলা। চাইলেই কি পাগল হওয়া যায়? পাগল কেবল উপযুক্ত কবিরাই হতে পারেন।
এবার আসি,শুভদীপের বেসিক কবি ভাবনার জগতে। অস্তিত্বের অনিশ্চয়াতাজনিত এক
সীমাহীন নৈরাশ্য, মননশীল অনুভূতি সম্পন্ন
শিল্পীকে আজ দাঁড় করিয়েছে এক অর্থহীন, অন্ধকার, অসম্ভব ভবিতব্যের দিকে। সেই
দাঁড়িয়ে থাকা শিল্পীদের মধ্যে তরুণতুর্কি শুভদীপ দেব একজন। আজকের সমাজ রাষ্ট্রগত কাঠামোয়,
মানসিক বিচ্ছেদ বা অনন্বয় যেখানে অবিসংবাদী সত্য; মানবিক ভাষা যেখানে
অর্থহীন,অসঙ্গত প্রলাপ বৈ আর কিছু নয়। সেখানে আর যাই হোক, অন্তত জীবন থাকতে পারে
না। এই জন্যই কবি শুরু থেকেই নিজেকে মৃত ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন। তাহলে লিখছেন কেন কবি
? প্রকাশই বা করছেন কেন? আসলে এখানেই কবি নিজের মৃত আত্মার প্রতি কিছু বলতে
চাইছেন। কিংবা দার্শনিক লাঁকার সেই বিখ্যাত মন্তব্যে, যেখানে দার্শনিক ডেকার্ডের ‘
I
think there for- I am’ পরিবর্তে বলতে চাইছেন –‘I think where I
am not, there I am where I don’t thank’।
এই কবিকে চট করে কাছে পাওয়া মুস্কিল। মুস্কিল এইসব লাইনের
অর্থ খোঁজা –‘ আমার যৌনতার গভীরতায়,/ রক্তের অনন্ত শীৎকার/ এখন যখন যুদ্ধবিমানের
দাম/ পাখির মাংসের দামের চাইতেও বেশি/ তখনই বীর্যের ভারিক্কি সহকারে যন্ত্রণা করি
পৃথিবীকে’(ধবধবা পাইপ) কবি ‘যুদ্ধবিমানের
দাম’ সাথে ‘পাখির মাংসের দামের’ তুলনায় গেলেন কেন? আর কোন উদাহরণ কি খুঁজে পেলেন না কবি ! কিংবা ‘ ভ্রণ হত্যার প্রতিক্রিয়ায় ব্যস্ত থাকা/ মায়েদের
মত/ ব্যথা ও ব্যর্থতাজর্জর ক্যানবেলরা,/ স্পষ্ট করে জানে না/এইসব চিৎকারের
কথা!’(এবোর্শন)। আহা! কি যে মুন্সিয়ানায় ব্যথা, মা, এবং ব্যর্থতাজর্জর ক্যানবেলরা শব্দের ব্যবহার
করলেন, তা ধন্যবাদ যোগ্য।বিশেষ করে ‘মা’ শব্দ। মা কেন ভ্রণ হত্যায় ব্যস্ত হবেন? এটা তো
মায়েদের স্বভাব নয়। তবে --? আমি কেবল
প্রশ্ন করলাম। উত্তর খুঁজবেন পাঠকরা তার মতো করে। এখানেই তো তৈরি হবে পাঠকের
সাথে কবির সংযোগ বা বিচ্ছেদ। এবং
ধারাবাহিক পরবর্তী যা কিছু ...
মানুষের নিঃসঙ্গতা, চরম একাকিত্ব, মানুষের সাথে
সংযোগ স্থাপনের ব্যর্থতা কবিকে গোটা কাব্যেই আঘাত করে গেছে, নির্মমের মত। নাট্যকার
আথার আদামভ-এর একটা লেখা খুব মনে পড়ছিল, শুভদীপের কবিতা পড়তে পড়তে, যে উক্তিটা
দিয়ে আমি ‘উড়ন তস্তরিয়ে’-র আলোচনা শেষ করবো, –‘সব
কিছুই এমনভাবে ঘটে যাতে মনে হয় আমি যেন এক বিশাল দুর্বোধ্য কেন্দ্রীয় সত্ত্বার
একটি বিশেষ অস্তিত্ব মাত্র। কখনও কখনও জীবনের এই বিরাট সমগ্রতা এমন নাটকীয় সুন্দর
মনে হয় যে আমি অভূতপূর্ব আনন্দে শিহরিত হই। কিন্তু বেশির ভাগ সময়ই আমার কাছে
জীবনকে মনে হয় একটি ভয়ংকর পশুর মত, যেটা আমাকে এ’ফোঁড় ও’ফোঁড় করে দেয়, আমাকে
অতিক্রম করে যায়, মুহূর্ত থেকে মুহূর্তে আতঙ্ক আমাকে আঁকড়ে ধরে।’
বইঃ ‘উড়ন তস্তরিয়ে’
কবি শুভদীপ দেব
প্রকাশকঃ নীহারিকা
ঠমক ও ঠাঁট প্রতিক্রিয়া ১
উড়ন্ তস্তরিয়ে/শুভদীপ দেব
নীহারিকা প্রকাশন
‘উড়ন্ তস্তরিয়ে‘-প্রায় প্রায় বাংলা ভাষা ও
বানানবিধিতে লেখা এক
কবিতার বই যাতে
হরেক কিসিমের কবিতা নেই।অন্তর্লীন সুর একটাই,এবং তা
নিষাদের। অন্তত,বোধি(হৃদয় উপচানো পকেট)বলছে,কায়িক উত্তেজনাপ্রসূত
এই ব্রহ্মাণ্ড।আর এই
উত্তেজনটুকুই মহাকাব্যিক।অবশ্য,তা
হেঁজে নতুন হয়েছে বেহতৃণ পাপোষ।তারপর আবার
আমরা জন্মেছি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তায়,প্রথম দাঁত
কেলিয়েছি কোনো অফ্হ্যান্ড অসহায়তাকে চাক্ষুষ করে,প্রথম আশ্বস্ত হয়েছি জনকের(মায়ের অপ্রেমিক)পিঠে রোমের মানচিত্র দেখে,প্রথম ভালোবেসেছি নিজের অপেক্ষমাণ উল্টোরথ-কেই তবু
কখনোই প্রথমবারে বুঝে
উঠতে পারিনি আরবার,অন্যআরবার বলে
কিছু হয়না,আঃ
মাইমেসিস!প্রণালী।এমনকি দাস্তান-এ-যৌনতা করে(করেকরেকরেকরেকরে) কাঠছন্দ ছাড়া
এক পাউচ বিস্ময়ও সঞ্চয়ে রাখতে পারিনি।অতএব আমাদের একটা
ডাবল খাটিয়া রাখা
আছে বেডরুমে।কিংবা টয়লেটে শ্রীখোল।আমরা মিছিলে যাব
না আর।শুধু ফোন
অন থাকলেই শোনা
যাবে ডাক-দিল্লী চলো।
বলে রাখা ভালো(দাঁড়াও পথিকবর লাইনে),শুভদীপ-এর
কমোড‘কে সহসাই রাষ্ট্রের ঘাড় মনে
হচ্ছে।সময়কে মনে হয়েছে চিৎ-কারের অনুজ।অনাবিষ্কৃত ডেসিবেল-এ সকালসন্ধ্যা চিৎকার করলে
কিংবা রোজ ঘরে
ফেরার যন্ত্রণার উষ্ণতায় নীল
হতে থাকা শরীর
থেকে ফসফরাসের নিম
সুবাস পাড়াদেশময় বিলিয়ে যায়
বলে কবিকে ঢিলিয়ে,চাবকিয়ে,দাঁত
উপড়ে মেরে ফেলার বিধান আছে।হ্যাঁ,এই
বইয়ের কবি মৃত।তিনি সাতজাগায়জোড়া খুনের বদলা নিতে এসচেন শুধু।
যা বলার—
১ আর যারা
সিল্পোসাহিট্টোভার্জিনমোহিত্তো ফাৎনায় করে
একের পর এক
উঠিয়ে আনে
প্রগলভমেয়েমানুষ,হিলিং সূত্র,রিয়াল এ্যাস্টেট ম্যাজিক,ছন্দচিকিৎসা,ছন্দদুঃখহতাশাকাতরতাপ্রকৃতিমাধুকরিছদ্মবাউলবার্নাউল,তাহাদের কলমকুমারে আরো
নিব(?নিপ) দিও
গিরিশ,ও শুনচ!তাহারা য্যানো সকলে
ব্রয়লারপালক চুবিয়ে একে
অন্যের ঘামের দাগ
পর্যন্ত টুকে নেন।
তাদের জন্য এই
বইটির ছায়া।ছায়ানট।
২ সিগারেট জ্বলতে থাকলেই আরও
একটা সম্ভাব্য সিগারেট প্যাকেটের কাঁধে কাৎ হয়।
সুনির্দিষ্ট গলা খাঁকারি দিয়ে
আর যা—
১ বস্তুত,কোনো
লেখাই আর বস্তনিরপেক্ষ হতে
পারে না।
২ বস্তুত এই
কবিতা লিখতে হলে
আত্মস্থ(internalize) করতে হয়
একরকম হিংসাকে এবং
একটা ফ্লাইটের মধ্য
দিয়ে তাও পেরিয়ে যেতে
হয় মেহগনি ভূখন্ডে
৩ বস্তুত,এই
সেই লেখক যিনি
ইচ্ছে করলেই পানু(পাদোদক অনুসৃত কবিতা) লিখতে পারেন বলে নীরবে কেঁদে ফেলেছিলেন
৪ বস্তুত,এই
সেই লেখক,যার
চোখের দিকে সরাসরি না
হয়ে, দুবেলা নিয়ম
করে ঠকানো যায়
৫ বস্তুত,এই
সেই বই,যার
ভেতরে নীলডাউন করিয়ে রাখা হয়েছে ছন্দমাত্রাকাব্যব্যাকরণের নদের
নিমাই আর্কিটাইপ-কে।
৬ বস্তুত,এ
বইটি সংগ্রহ করলে
কবির মাংসের স্বাদও পাওয়া যাবে
৭ বস্তুত এই
একটা বই যা
কোনোভাবেই মাইনর মেজো-সেজো manufactured কবি-লেখকদের সঙ্গে এক টেবলে থাকতে পারে না!
৮ বস্তুত,আগেই
যা বলা হয়ে
গ্যাছে,যে শুভদীপ মৃত।সে তামাম খুনের বদলা নিতে
ফিরে এসেছে শুধু!
২। কবির ভাবনা জগতের পরিভ্রমণ
প্রত্যেক যুগ তার নিজের ভাষায় কথা বলে। সম্ভবত এইজন্যই প্রজন্মে প্রজন্মে
কাব্য তার ভাষা পালটে ফেলার চেষ্টা করে। সব যুগই তার মতো করে তার
চারপাশকে দেখতে চায়।বোঝতে চায়। কখনো খুব সচেতনভাবেই চায়। কখনো অবচেতনেই চায়। কবির
কবিতা তো চেতন-অবচেতনের লীলাক্ষেত্র। ‘অবশেষে ফিরে এলাম,/ জামা পেন্ট খুলে সামনে
দাঁড়ালাম -/... রক্ত এসে ভিজিয়ে দেয় নখের ডগা,/ নিথর হয়ে পড়ে মেরুদন্ড,/ যোনিময়
ফুটতে থাকে সাদা ভাত’( আয়না) ‘এখন ভাত খুঁজতে খুঁজতে বাবার সাথে সুযোগ কম হয়,/... আমি যদি দেশ হই তবে তিনি
আমৃত্যু কৃষক’ (বাবা) প্রথম দশকের কবি সুমন পাঠারী-র দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘তারা
দেখার পাপ’-এর শুরুতেই আমরা একটা ভিন্ন সুরের ছুঁয়া পাই, যা মনকে মুগ্ধ করে। ভরিয়ে
দেয়। তরুণ কবির এই ভিন্নসুরের আশায় অনেকদিন থেকেই জন্য অপেক্ষায় ছিলাম। ‘যোনিময়
ফুটতে থাকে সাদা ভাত’– এই লাইন চমকায় বৈকি! পিঠও সটান করে বসতে বাধ্য করে। এখানেই কবির
প্রথম কৃতিত্ব।কবির টার্গেট এবং সটান গুলি-ছুঁড়া মুগ্ধ করে। ‘মধ্যরাতে জেগে উঠে
কিছু মুখস্থ ব্যথা,/ জেগে উঠে বাসি ফুল,/...প্রতি মধ্যরাতে আমি ভণ্ড হয়ে
জাই,/প্রতি মধ্যরাতে ইচ্ছা করেই বাস্তব
বিমুখ হয়ে যাই।’(মধ্যরাত) কবির ভাবনা জগতের পরিভ্রমণ, পাঠককেও একসময় জড়িয়ে ফেলে।
কবি বাস্তব এবং স্বপ্নের দু’টানায় নিজেকেই বৃত্তের মতো পরিক্রমা করেন বারবার। ‘
বেঁচে আছি, সুস্থ আছি, তাই বেশ ভালো আছি/ এতটুকুতেই যেন মন ভরে যায় তোমার।/...
প্ল্যাস্টিকের মোড়ক খুলে সত্য দেখানোর মতো/ এটা জেনে যেও ভালো আছি আমি’(ভালো আছি)
কবির শব্দ ব্যবহার, উপমার প্রয়োগ এবং বাক্যের আড়ালে নিজের চারপাশ মাড়িয়ে বাস্তবের
কাছাকাছি পা রাখা তার ক্ষমতাই প্রদর্শন করে। খুব অনাবিল অথচ অন্যরকম একটা
চিত্রকল্প দেখতে পাই ‘যাপন’ নামের এই কবিতায় – ‘সন্ধ্যায় বাবা ফিরে আসে/ মা ধার করে
আনে জ্যোৎস্না, গ্রাম-বাতাস,/তারপর তারা বসে গল্প করে,/ পাথর ভাঙার গল্প,/ গলির
আঁধারে জোনাকির গল্প’। এখানে আমরা পাই আনন্দপ্রকাশের ছবি ও বিষয়মুক্ত রঙের গতিময়
চলনের ছবি। কবির আরও কিছু চিত্রকল্প আমাকে ভাবিয়েছে, যেমন –‘ আমার ঈশ্বর জানেন আমি
কবি হতে নয়/ ভালোবাসতে এসেছিলাম।’(আলুথালু) ‘বন্ধুত্বের মাঝে একটি ভাতের পাহাড়,/
পার করে আসতে আসতে সন্ধ্যা ঘনায়।’(বন্ধু)
কবির অসংখ্য ভালো কবিতা মনকে যেমন টেনেছে, তেমনি খারাপ লেগেছে কবির অনেক কবিতা
মৌলিকতার দাবি রাখতে রাখতে কবির হাত ফসকে গেছে, কবিরই অজান্তে। তখন পাঠক হিসেবে মর্মাহত
হয়েছি বৈকি। সম্ভবত এখানেই কবি ও কবিতার
লুকোচুরি খেলা।তবে কবি সুমন পাঠারী-র কবি-জীবনের শুরুতেই অনেক উচ্চতাকে
ছুঁয়ে ফেলেছেন। এখন নিজেকে ধরে রাখতে পারলে, তার কাছ থেকে আমাদের অনেক কিছু পাওয়ার
আছে।কবিতার মূল কনসেপ্ট অনুযায়ী খুব সুন্দর প্রচ্ছদ এঁকেছেন শিল্পী চারু
পিন্টু।
‘তারা দেখার পাপ’
সুমন পাঠারী
প্রকাশকঃ নীহারিকা/ শ্যামলী বিপণী বিতান,
শ্যামলী বাজার, কুঞ্জবন/
আগরতলা, ত্রিপুরা(পঃ) পিন ৭৯৯০০৬
১/ ‘কবির উজ্জ্বল উপস্থিতিকে
স্বাগতম’ / তমালশেখর দে
আসলে আমি কবিতার
সমালোচক নই। মাঝে মাঝে আলোকপাত অবশ্যই করে থাকি। কিন্তু দুটো ভিন্ন জিনিস আমার
কাছে। ভালোবাসা এবং নির্মমতার সমন্বয়েই একজন সমালোচক। সে সাধ্য আমার নেই। তবু, আমি
আমার চোখে কবি মৌলিক মজুমদার-এর কবিতার পাঠ প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছি, বন্ধু তীর্থঙ্করের অনুরোধে।
‘লুনাটিক ডায়ারিজ’ কাব্যগ্রন্থ পড়ার পর আমার
মনে হয়েছে, সময়ের উপর ভর দিয়ে সময়ের কবিতা চলে
আসছে পাঠকের সামনে। রহস্যে ভরা কবিতা
নিঃশব্দে তার কাজ করে চলেছে।প্রতিদিন ভয়ংকরভাবে পালটে যাওয়া পৃথিবীতে সে যেন সময়ের
ঘূর্ণি। পলকে পলকে তুলে ধরছে প্রজন্মের ক্ষতমুখ, ভালোবাসা, গোপনতম নিশ্বাস।
ইতিমধ্যেই একবিংশ দশকের কবিরা তাঁদের নতুন ভাষা নিয়ে ত্রিপুরার তথা বাংলা কবিতা
জগতে সাহসী পা রাখছেন। তাদের মধ্যে
উজ্জ্বল প্রতিভার একজন মৌলিক মজুমদার। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘লুনাটিক ডায়ারিজ’
প্রথম পাঠেই মুগ্ধ করে। নানা মেজাজের কবিতার মধ্যে ধরা পড়েছে কখনো বিষণ্ণ, কখনো
ক্রোধ, কখনো নির্জনতার এমন চাপ যে, চুপ করে বসে থাকতে হয়, নিজের কাছে নিজেই। ‘ট্রাকের
পায়ে চলছে গুটি গুটি/ কতকগুলো বৃষ্টিদানা, ছোটো,/ শ্রাবণধারা নামলো
আঁখিপাতে’(বৃষ্টিকাব্য-১) ‘শতাব্দী প্রাচীন কোনো বৃষ্টিস্নাত রাতে/ এক উস্কোখুস্কো
যুবক/ তোমাকে মেঘ ভেবে চুম্বন করেছিল -/ এই রাস্তায়, একা একা’(দু’টি বৃষ্টি) তরুণ
এই কবির বিষণ্ণতা, মুহূর্তে নিষ্ঠুরের মতো আক্রমণ করে বসে তারই কবিতার পাঠককে।
মূলত এই ‘একা’ শব্দটি গোটা কাব্যগ্রন্থ জুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছে অনন্ত বিরহের গন্ধ। ‘
ভেজা ঠোঁটে আবাহন কামিনী ফুলের সুবাস/ হারিয়ে গেছে কতকাল!/ কতটা ছিন্নমূল
বিভেদকামী এ পরবাস/ তা কি জেনেছিলে এতকাল?’ (প্রেমপর্ব) কবিতাকে যদি ধরে নিই,
হৃদয়ের মর্মবেদনার অন্তর্নিহিত বহিঃপ্রকাশ, তবে সেই প্রকাশের প্রথমেই খুব স্বাভাবিকভাবেই
প্রেম চলে আসে।কিন্তু তার প্রকাশ মৌলিক মজুমদার করেছেন মৌলিকভাবেই। এখানেই তার
গুরুত্ব। ‘বৃষ্টিতে জমেনি কি ঠিক ?/পাঁজরেতে ফিসফাস,/ সাপগুলো হিসহিস,/সব বিষ ঢেলে গেছে,/ ঢক
ঢক ঢু’(লুনাটিক ডায়ারিজ -১) ‘সিগারেটে ধোঁয়া ঘর/ ভাবঘরে তস্কর,/ লুটে নিয়ে গেছে
তোকে/ চানঘর’ (লুনাটিক ডায়ারিজ-২) আহা!
‘চানঘর’ কি অপূর্ব ব্যবহার। ছন্দের তালে তালে জীবনকে নিয়ে গেলেন এমন এক জায়গায়,
যেখানে ছন্দ হয়ে গেল বিচ্ছিন্ন।মর্মাহত।‘ তোমাকে উৎসাহী দেখালো খুব-/ বক্ষলগ্না
হয়ে জেনে নিলে/ বিসনেসের যত/ কূটকৌশল।/( চিন সিস্টেম) ‘বক্ষলগ্না’ শব্দের সাথে
‘কূটকৌশল’ ব্যবহার করে চরম এক সংকটকে।কবির ‘মধ্যরাতের পিং-বার’ কবিতার প্রথম স্তবক ‘তোমার যে
অস্থি থেকে ডানা উদগম হয়/ আমি তাতে রক্তচন্দন মেখে দিয়েছি,/ এর চেয়ে নিবিড় আর কী কথা আমার আছে
বল!’ পড়ার পর অবাক এবং আতঙ্কিত হয়ে যাই পরের স্তবক পড়ে, যেখানে কবি বলছেন – ‘তোমার
যে পিঠ কাঁপে দুরু দুরু/ দুর্নিবার উড্ডয়ন সম্ভাবনায়,/ এর চেয়ে চরম যৌনচিন্তা আমার
আর কী আছে বল!’ এত সুন্দর মিলনের ভিতর কবির একি দুঃসহ যন্ত্রণাকাতরতা! কবির
মনোজগতের নানা জটিলভাবনার সরল প্রকাশ সহজেই পাঠক হিসেবে আমাকে
মুহূর্তে আবার চুম্বকের মতো টেনে নেয়।আমি আবার চলে যাই, একদম প্রথম কবিতায়। কিন্তু
কেন ? আমি নিজেকে প্রশ্ন করেছিলাম। উত্তর এলো, এই কবির সহজ কথা যতটা সহজে মেনে
নিতে ইচ্ছে করে, ততটা সরলভাবে তাকে দেখলে পাঠ–ভ্রষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। তখনই
পেছন ফিরে ‘এক শহর’ কবিতার ফেইসবুকের কমেন্ট পর্যায়ে কথোপকথনের দিকে চোখ গেল। এবং
সম্মানিত পাঠক দীপান্বিতা সেন-এর মন্তব্যগুলো বোঝার চেষ্টা করলাম। এবং সব অর্থেই
তাঁকে আমার সঠিক মনে হল। সত্যিই তো, একজন পা থাকতে ‘হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকবে কেন?’ এবং শেষ পর্যন্ত সঠিক উত্তর
বা মন মতো উত্তর পাননি। প্রশ্ন উঠতেই পারে, কেন পেলেন না? আমিও উত্তর পাচ্ছি না।
তবে একটা জায়গায় কবির প্রতি আমার কোন ক্ষোভ নেই, কারণ কবি কোন অর্থে ‘হামাগুড়ি’
ব্যবহার করেছেন, তা আমার জানার কোন দরকার নেই। কবির উত্তর আমার সঠিক মনে নাও হতে
পারে! তাহলে আমি কীভাবে এই ‘হামাগুড়ি’ শব্দের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিলাম? এই জায়গায়
কিছু কথা আছে। যা একান্ত ব্যক্তিগত আমার। আমি খুব বিশ্বাস করি, পাঠককে তাঁর ঘটে
যাওয়া ঘটনার দিকে নিয়ে যাওয়া, বা মনে করিয়ে দেওয়াও কবির একটা কাজ।এই হামাগুড়ি
প্রেমিকার প্রতি অনুনয়। এই হামাগুড়ি ভালোবাসার হামাগুড়ি। রেগে থাকা প্রেমিকার
প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনকে বক্রোক্তির মুন্সিয়ানায় কবি এখানে উপস্থিত করতে চেয়েছেন। আমি আমার প্রেমের দিনে
চলে গেলাম।সেদিন শ্রাবণীর সাথে সেদিন খুব হেঁটেছিলাম। এই ‘হামাগুড়ি’ মননের
হামাগুড়ি। কবি পরের লাইনে ‘এঁটো করে দিই সমস্ত বাতাস’ - এই ‘এঁটো’ শব্দটা এখানে
আনলেন কেন?’ শুধু এই ‘এঁটো’ শব্দ থেকে আমি আমার
এক কবিতার লাইনে লাইনে চলে গেলাম, যেখানে লিখেছিলাম – ‘প্রিয়, এঁটো
ঠোঁটে আমি চুম্বন খাই না।’ এখানে এঁটো হল
বাতাস। তার মানে কবি ঐদিন ‘বটতলা থেকে আশ্রম চৌমুনী’ কতবার হেঁটেছেন, ভুক্তভোগী
প্রেমিক ছাড়া কেউ কল্পনা করতে পারবেন না! অসধারণ ব্যঞ্জনায় কবি লিখছেন- ‘ শহরের খোপে খোপে
বসন্ত লেগে থাকে/ মড়কের মতো-’ এত প্রেম চারিদিকে, কবি কেবল হতাশ, তার প্রেমিকা
এখনও তার অভিমানের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসতে রাজি হচ্ছে না। শিক্ষকের সামনে তার
সামনেও তো ‘হামাগুড়ি’ দিয়ে ক্ষমা চাওয়া গেল! আসলে এক দুর্দান্ত তারুণ্যের প্রেমের চিরপট। যে
চিত্রপটের নির্দিষ্ট কোন মানে নেই, নিছক
পাগলামি ছাড়া। আসলে পাঠক কবিতার মেজাজ না-বুঝে খুব বেশি সিরিয়াস হলে অহেতুক একটা ভুল বোঝাবুঝি
তৈরি হয়ে যায়। আবার এক অর্থে এখানেই মজা। এক্সপেরিমেন্ট। যদিও কবি মৌলক মজুমদারের
সব পরীক্ষানিরীক্ষার সাথে আমি একমত হতে পারিনি। না-হওয়াই স্বাভাবিক। কখনো কখনো নিজের
উপর খুব বেশি কনফিডেন্সও কবিতাকে মাটি করে দিয়ে যায়। তবে যৌবন তো সাহসেরই আরেক
নাম। ঝুঁকি নেওয়ার এই তো সময়।
কবি মৌলক মজুমদারের কাব্যগ্রন্থ ‘লুনাটিক ডায়ারিজ’ বা তার ডায়েরির পাতায় মনের
বিভিন্ন অনুভূতি, যত খুলেছি ততই মুগ্ধ হয়েছি। দগ্ধ হয়েছি। প্রেমের পাশাপাশি
অপ্রেমের সাথেও সহবাস করেছি। যা কবি খুব সঙ্গোপনে নিজের সাথে যাপন করেন। কবি
কিন্তু তার নিজের সব কথা বলেও বলেননি। আবার গোপন করেও গোপন করেননি।পাঠকের সাথে
কবির এই খেলা আমার খুব ভালো লেগেছে।আমার কাছে কবি নেহাতই এক ব্যক্তি, আর তা কবিতা
তার বাঁচার আবরণ। কবির উজ্জ্বল উপস্থিতিকে স্বাগতম।
ত্রিপুরার তরুণ প্রকাশক সংস্থা নীহারিকাকেও ধন্যবাদ এই সাহস ও এক্সপেরিমেন্টকে
সমর্থন করার জন্য। অপূর্ব ব্যঞ্জনায় প্রচ্ছদ এঁকেছেন চারু পিন্টু।
‘লুনাটিক ডায়ারিজ’ মৌলক মজুমদার
প্রকাশকঃ নীহারিকা/ শ্যামলী বিপণী বিতান,
শ্যামলী বাজার, কুঞ্জবন/
আগরতলা, ত্রিপুরা(পঃ) পিন ৭৯৯০০৬
No comments:
Post a Comment