জীবনের নানা অনুভূতির আত্মদর্শন দেখা যায়
আলোচনা – তমা বর্মণ
আঠারোটি গল্প নিয়ে 'গল্পের মতো' এই গল্পগ্রন্থে লেখক তমালশেখর দে আসলে গল্প নয়, গল্পের আকারে
মানুষের জীবনের নানা অনুভূতির আত্মদর্শন ঘটাতে চেয়েছেন পাঠকের কাছে। আমার অন্তত
তাই মনে হয়েছে। কয়েকটি গল্পের কথা বলব, যেমন 'এক ঝাঁক জোনাকি' গল্পে লেখক তমাল শেখরকে সম্পর্কের গভীর হতে উঠে
আসতে দেখি। লেখক ভালোবাসাকে বহমানতায় ধরে রাখতে চান। সবাই তাই চাই। কিন্তু
আত্মস্বার্থে মনের দীনতা থেকে সম্পর্কের
টানাহ্যাঁচড়া করতে করতে ভুলে যাই ভালোবাসা গণ্ডিবদ্ধতায় থাকে না। অথচ জেনেও আমরা চেষ্টা করি তা-ই। এখানে শ্রাবণী নিবিড়
এবং বর্ণা, তিন মানুষের অনুভব চিত্র আঁকতে গিয়ে লেখক আচমকাই
শেষ পর্যায়ে লিখে ফেলেন--- 'নিবিড় কোনও উত্তর করে না।
সে জানে, এইসব কথার গন্তব্য কোথায়!' 'গন্তব্য' কথাটির নিজস্ব বিশাল এক তাৎপর্য রয়েছে। জানা অজানা দুটো দিকই বোঝায়। আবার
অসীমের দিকে যাওয়াও বোঝায়। হয়তো নিবিড় আদৌ জানে না বা জেনে বসে আছে তার এবং
বর্ণার সম্পর্কের পরিণতি কোথায়। অথবা শূন্যতা ছাড়া এখানে কিছুই নেই। হেরে যাওয়া
নিবিড়ের কাছে শ্রাবণী সমস্ত শূন্যতা ভরিয়ে তাই বহমান অনুভব হয়ে ওঠে সহজেই। শ্রাবণীর
কাছেই অপমানিত প্রেমিক সত্বাটিকে ফিরে পেতে চায় নিবিড়। মানুষের নিজেকে খুঁজে ফেরার
গল্প। গল্পটিতে লেখক জীবনের স্পষ্ট এবং স্বাভাবিক কথাটিই পুনরায় যেন বলতে চেয়েছেন।
প্রেম ভালোবাসা যন্ত্রণা অথবা সম্মান ইগো
সবেতে মানুষ আসলে নিজের অস্তিত্বটুকুই তো খুঁজে ফিরে, সম্পূর্ণ হতে অপরের মধ্যেই পেতে চায় নিজেকে। কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য চায়। গল্পে
ট্রেনের উপস্থাপনা জীবন নামক একটা জার্নির ইঙ্গিত বহন করে এবং গল্পের শেষে দারুণ
ভালো লাগা তৈরি হয়ে যায়, কারণ সম্পর্কের এমন জটিল
রসায়নে বসেও লেখক তিন চরিত্রকেই শেষপর্যন্ত রেখে গেছেন খোলা বাতাসের মতো! 'কাঞ্চনপুরের গেস্টহাউস এবং আমি' গল্পটি সম্পর্কে বলব,
গল্পের চরিত্র যখন লেখকের সঙ্গে মিলেমিশে যায় কিংবা লেখক
হয়তো ইচ্ছাকৃতভাবেই মিশিয়ে দিতে চান তখন গল্প কী শুধুমাত্র গল্প থাকে? হয়তো না। জীবনের কথা হয়ে
দাঁড়ায়। এখানেও সম্পর্কের মনস্তাত্ত্বিক দিক এসেছে। পিতা-মাতার রহস্যময়
টানাপোড়েন-সম্পর্কের মাঝখানে সন্তান হিসেবে অমিতের সত্য-মিথ্যার সন্ধান এবং তার
মানসিক দ্বন্দ্ব এই গল্পের বিষয়বস্তু। যে কারণেই হোক গল্পটি পড়ে যেতে হয়। লেখক তমাল শেখরের 'গল্পের মতো' এই সংকলনে 'ঘর করা' 'গল্পের মতো' 'চোট' 'নির্জনতা' 'পাখা গল্প' প্রত্যেকটা গল্পই মানুষের অন্তর্গূঢ় অনুভূতির
কথামালা। মনে হতেই পারে নিজেকে কোথাও না কোথাও চিনতে পারা যাচ্ছে। গল্প নয় গল্পের
মতো করে বলা এ যেন চারপাশের জটিল আবর্ত থেকে উঠে আসা বিভিন্ন চরিত্র ধরে লেখকেরই
এক একটি স্বগতোক্তি অথবা অনুভূতির ভিন্নতা। আরেকটি গল্পের কথা বলব, গল্পের নাম 'কবি'। সাক্ষ্যাৎকার নেবার কৌশলে
কবির নিজস্ব মনোজগতের একাকিত্ব বা যন্ত্রণার ছবি এঁকেছেন লেখক। গল্পের স্বল্প
পরিসরে চমৎকার কিছু চিত্রকল্পের ঘোর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে অনেক দূর হেঁটে যাবার
বিস্তৃতি রয়েছে এখানে। পাঠশেষে বহুমাত্রিক বোধ জেগে ওঠে মননের গভীরে। কবিরা মৃত্যুর মতো একা, এই সত্যটি ঘটনা প্রবাহের মধ্য দিয়ে সরল স্বীকারোক্তি হয়ে বেরিয়ে আসে সহজেই। এই
গল্পের বিষাদগ্রস্ততা প্রায় অধিকাংশ গল্পেই তার ছোঁয়া আছে। তবে কী সবই অসুখের গল্প?
না। অসুখ এবং সুখের মধ্যে যে সূক্ষ্ম এক দেয়াল মাত্র রয়েছে
তারই যেন নিশ্চিতি করতে চেয়েছেন লেখক বারবার। কোনও চরিত্র তাই পক্ষপাত দুষ্টে
কোনঠাসা হয়ে পড়ে না। লেখকের প্রতিটি গল্পের আদল মানুষের নানারূপ সংবেদনশীলতা বা
অনুভূতি কেন্দ্রিক। চরিত্র বদলেছে। বিষয়ের আঙ্গিক বদলেছে। কিন্তু লেখকের ফোকাস
মূলত মানুষের মন এবং মনের আনাচকানাচে জড়িয়ে থাকা গোপন রহস্যের খেলা নিয়েই। 'মায়া' গল্পে সূক্ষ্ম অথচ নিষ্ঠুর এক বাস্তব সত্যতা দেখি--- প্রিয়জনের মৃত্যু নিয়ে এবং তার প্রতি কৃতজ্ঞতায়
উদগ্রীব থাকা কিছু মানুষ তার মৃত্যুর পরমুহূর্তেই সচেতন হয়ে ওঠে নিজেদেরকেই নিয়ে
অদ্ভুতভাবে! একসময় যাকে কেন্দ্র করে নির্ভরতা খুঁজে পেয়েছিল, তেমন আপনজনকে হারিয়েও ভাবনা আসে সহজেই----এই শীতে কি করে যাই শ্মশানে? তাহলে কী জাগতিক সংসারে প্রেম ভালোবাসা স্নেহ যা-কিছু সবই একধরণের প্রয়োজন?
মৃত্যুতে ফুরিয়ে যায়! মৃত্যু অমোঘ অবচেতনে জানা থাকে বলেই
হয়তো মানুষ শোকেও সচেতন থাকতে পারে জীবন নিয়ে! 'নেই' তার চেয়ে যে 'আছে' তার জন্যেই মানুষের তাই হয়তো সমস্ত মায়া। জীবনের
মায়া! এভাবে অন্যান্য গল্পগুলোতেও একে একে মানুষ এবং সম্পর্ক আর তার মনস্তত্ত্বকে
চেনাজানা চরিত্রে গেঁথে লেখক তমাল শেখর দে টুকরো টুকরো গল্প নয়, টুকরো টুকরো সম্পর্কের একটি বিশ্লেষণমূলক আখ্যান তৈরি করেছেন গল্পের মতো করে।
লেখক হয়তো নিজেকেই ভেঙে ভেঙে অনুভূতির
আলো-আঁধারির ভিতর অনেক অবরুদ্ধ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চেয়েছেন। পাঠকের আগ্রহ এই
বইটি খুঁজে নেবে আশা এবং শুভকামনায় রইলাম।
গ্রন্থ ঃ ‘গল্পের মতো’
লেখকঃ তমালশেখর দে
আলোচক – তমা বর্মণ
নীহারিকা প্রকাশনী , আগরতলা
মূল্যঃ
২৫০ টাকা
No comments:
Post a Comment