“ত্রিপুরার
কাব্যজগতকে জেরী চন্দ নিঃসন্দেহে একটা
উচ্চতায় নিয়ে যাবে”
তমালশেখর দে
“অজানা
পাহাড়ি
পথে
এগিয়ে আস্তে
আস্তে
দেখলাম টেলিফোন
বুথ,
কুয়াশায় ঢাকা
অরণ্য
এ রাজ্য
থেকে
আর
কোনো
সংবাদ পাঠানোর
নেই
–
খারাং-এ পাহাড়ি
রমণীর
পিঠে চড়া
বিশ্বাস,
কাঁচা সাদা
বাঁশকড়ুলের
গরম নিঃশ্বাস
ছাড়া
” ( অরণ্য-১)
পড়ছিলাম জেরী চন্দ-এর কবিতা। কবিতার শুরু করেছে কি সুন্দর নিজের বয়ান বলার ঢঙে । বলতে বলতে হঠাৎ করেই বলে ফেললো – “এ রাজ্য থেকে আর কোনো / সংবাদ পাঠানোর নেই”।
অথচ
এই
লাইনের
জন্য
কিন্তু
পাঠক
তখনও
প্রস্তুত
ছিল
না
। কেননা,
এর
আগে
আমরা
খুব
স্বাভাবিক
দৃশ্যের
বর্ণনাই
পাচ্ছিলাম
– “অজানা পাহাড়ি
পথে/ এগিয়ে আস্তে
আস্তে
/ দেখলাম টেলিফোন
বুথ”। খুবই
সাধারণ
একটি
লাইন
। বেশ
রোমান্টিক
একটি
কবিতা
পড়তে
চলেছি,
এমন
ভাবই
অনুভব
করছিলাম
এবং
পাঠক
হিসেবে
নিজেকে
প্রস্তুতও
করছিলাম
। আমার
এই
ভাবনাকে
পরের
দুই
লাইনও
প্রশ্রয়
দিল
যেখানে
কবি
লিখছেন
– “কুয়াশায় ঢাকা
/ অরণ্য
”। এই পর্যন্ত
একটা
চিত্রকল্পের
ক্যানভাস
কল্পনা
করলে
কিন্তু
খুব
সুন্দর
মানায়
। বিশেষ
করে
পাহাড়ি
পথে কুয়াশায় ঢাকা
টেলিফোন
বুথের
ইমেজ
কল্পনা
করে,
কার-না
মন
উতলা
হয়! মোবাইলের যুগে
পাহাড়ি
অরণ্যে
টেলিফোন
বুথের
দৃশ্য
মনকে
কিছুটা
নস্টালজিক
করে
তুলে
বই-কি
! এইটুকু
পড়ে
আমি
মোটামুটি
নস্টালজিক
হয়ে
পড়েছি
। কিন্তু
পরের
লাইন
পড়ে
থমকে
গেলাম
– “এ রাজ্য
থেকে
আর
কোনো
/ সংবাদ
পাঠানোর
নেই”। কবি
হঠাৎ
করে
পাঠক
হিসেবে
আমাকে প্রায় অপ্রস্তুত
করে চমকে দিলেন
। কোথায়
রোমান্টিক
হয়ে
মনকে
তৈরি
করছিলাম,
তখন
এই
লাইন
! আর
এখান
থেকেই
তৈরি হয়
কবির
প্রতি
প্রথম
ভালোবাসা
। এই যে
হঠাৎ
নাড়িয়ে
দেয়া,
এটা
কিন্তু
সব
কবি
করে
উঠতে
পারেন
না
। পিঠ
সটান
করে
পরের
লাইনে
গেলাম
– “খারাং-এ পাহাড়ি
রমণীর
/ পিঠে
চড়া
বিশ্বাস
” । ওমা
! আবারও
অবাক
। এর কারণ
হচ্ছে,
পাঠক
হিসেবে
এখনও
তো
আমি
এটাই
বুঝে
উঠতে
পারলাম
না,
কবি
হঠাৎ
করে
কেন
বললেন
-– “এ রাজ্য
থেকে
আর
কোনো
/ সংবাদ
পাঠানোর
নেই”। কেন
? কী
হয়েছে
এখানে
? এই এক
লাইনে
কবি
ভাবনার
প্রচুর
সম্ভাবনাকে
গুঁজে
দিয়েছেন
। এই লাইনকে
ব্যাখ্যা
না-করে
পাঠকের
এগিয়ে
যাওয়া
নিঃসন্দেহে
বোকামি
হবে
! কিংবা
বলতে
পারি,
রসিকের
কাজ
হবে
না
। এই ‘সংবাদ’
শব্দটাকেই
তো
বিভিন্ন
দৃষ্টিকোণ
থেকে
দেখতে
হবে
। এখানে
কবি
কোন
সংবাদের
কথা
বলছেন
? খবরের
কাগজের
কথা
কী
কবি
বলছেন
? তাই
ধরতে
হবে
। যদি
তাই
ধরি,
তাহলে
খবরের
কাগজে
কোনটা
সংবাদ
হয়
? সব
খবর
কি
সংবাদের
মর্যাদা
পায়
? নিশ্চয়ই
না
। তাহলে কি কবি
এখানে
বলতে
চাইছেন
– সুসংবাদ পাঠানোর
নেই
? নাকি
দুঃসংবাদ
? দুটোই
তো
খবরের
প্রধান
বিষয়
। এই খটকা
নিয়ে
পরের
লাইনে
যেতেই
কিছুটা
পরিষ্কার
হল,
সংবাদটা
সুসংবাদ,
না
দুঃসংবাদ
। তাও
কবি
কবিতার
মেজাজ
এবং
রহস্য
রেখেই
বললেন
- “খারাং-এ
পাহাড়ি
রমণীর
/ পিঠে
চড়া
বিশ্বাস
” । কী অসাধারণ
স্থানীয়ও
চিত্রকল্পের
প্রয়োগের
ভিতর
দিয়ে
কবি
বললেন
– “পিঠে চড়া
বিশ্বাস
”। এবং
এই
বিশ্বাস
শব্দ
থেকেই
বুঝে
নিতে
হবে,
আসলে
কবি
পূর্বের
লাইনে
‘দুঃসংবাদ’
–এর কথাই বোঝাতে চেয়েছেন
। ‘দুঃসংবাদ’
না-
হলে
‘ বিশ্বাস’
–এর প্রশ্ন
আসে
না
। দুঃসময়েই
বিশ্বাসের
উপর
জোর
রাখতে
হয়
। সাধারণত
দুঃসময়
এলেই
আমরা
বলি
– মনের বিশ্বাসকে
ভেঙে
যেতে
দিও
না
। জোর
রাখো
! একদিন
সব
ঠিক
হয়ে
যাবে
। কিংবা
দুঃসময়-টাকে
কোনো
মতে
কাটতে
দাও
! ‘খারাং’ শব্দের
ব্যবহারও
লক্ষণীয়
। কবি
তার
কবিতায়
কোথাও
‘দুঃসময়’
শব্দটা
ব্যবহার
করেননি
। কিন্তু
কবিতার
ভিতরে
রেখে
দিয়েছেন
। এইভাবে
কবিতার
ভিতরে
হিডেন-ওয়ার্ড-কে
গুঁজে
রাখা
কিন্তু
বড়
কবির
বৈশিষ্ট্য।
সব
কবির
কবিতায়
এটা
দেখা
যায়
না
। কবি
জেরী
এখানেই
থেমে
থাকলেন
না,
আরেকটু
এগিয়ে
গিয়ে
বললেন
– “ কাঁচা সাদা
বাঁশকড়ুলের
/ গরম
নিঃশ্বাস
ছাড়া
!” এবার
কবি
তার
কবিত্ব
লুকিয়ে
রেখেদিলেন
– “ গরম নিঃশ্বাস”
চিত্রকল্পের
ভিতরে
। এবং
“ছাড়া”-টি
যোগ
করে,
শেষ
লাইন
থেকে
কবিতাকে
আবার
রিভার্স
করে
- “এ
রাজ্য
থেকে
আর
কোনো
/ সংবাদ
পাঠানোর
নেই”
এই
লাইনের
দিকে
টেনে
নিয়ে
গেলেন
। তার
মানে গরম নিঃশ্বাসের
খবর
বা
সংবাদ-টা
পাঠানো
যায়
। এই ‘গরম
নিঃশ্বাস’-এর খবরটা
পাঠানো
যেতে
পারে
। কাঁচা
সাদা
বাঁশকড়ুল-এর
সাথে
কী
অদ্ভুত
দক্ষতায়
‘গরম
নিঃশ্বাস’
চিত্রকল্পটা
জুড়ে
দিলেন
! এখানেই
তার
ক্ষমতা। এখানেই
পরিলক্ষিত
হয়
তার
কল্পনা,
কবিত্বশক্তির
বৈশিষ্ট্য
। এই ধরণের
কল্পনা,
কবিতার
সেটিং,
শব্দ,
চিত্রকল্পের
ব্যবহার
খুব
চট
করে
বসেই
লেখা
সম্ভব
নয়
। অনেকেই
তার
চারপাশ
নিয়ে
বা
নিত্যদিনের
জীবনযন্ত্রনা
নিয়ে
লেখেন,
কিন্তু
কবিতার
ভিতরে
একাধারে
এতটি
সম্ভাবনাকে
খুব
স্বতঃস্ফূর্তভাবে
গুঁজে
দিতে
পারেন
না।
বিশেষ
করে
তরুণ
কবিরা
। এই কবিতার
কোথাও
কৃত্রিমতার
ছাপ
নেই
। বরং
প্রথম
পড়ায়
বোঝাই
যায়
না,
এই
কবিতার
ভিতরে
এত সম্ভাবনা লুকিয়ে রয়েছে
। অরণ্যঘেরা ত্রিপুরার কথা
বলতে
গিয়ে
স্থানিকতার
পাশাপাশি
রাজনীতি,
সময়ের
বহমানতাকেও
কবি
কি
চমৎকারভাবে
চিত্রায়িত
করলেন
এই ছোট্ট কবিতায়,
ভাবলে
মুগ্ধ
হতে
হয়
বই-কি
!
প্রথম কবিতা
পড়ে,
পরের
কবিতা
পড়ার
লোভ
সামলাতে
পারলাম
না
-
“আমার
প্রিয়
শিশুরা
রেললাইনের পাথর
দিয়ে
কাগজের গুলি
ফাটাচ্ছে
–
মহাশূন্যের শব্দতরঙ্গে
বিলীন
হচ্ছে
শুধুই
ঠাস্ ... ঠাস্
... ” (অরণ্য-২)
ওমা! ছোট্ট
এই
কবিতার
ভিতরেও
খেলা
আছে
দেখলাম
। রেললাইনে
না-হলেও পাথরে
আমরাও
ছোটবেলায়
বিশেষ
করে
পূজার
সময়
‘কাগজের
গুলি’
ফাটাতাম
। এই অবধি
সাধারণ
চিত্রকল্পের
পরই
কবি
তার
নিজ
দক্ষতায়
যোগ
করলেন
– “মহাশূন্যের শব্দতরঙ্গে
বিলীন
হচ্ছে
/ শুধুই
/ ঠাস্
... ঠাস্
... ” চমক লাগলো
‘ঠাস্
ঠাস্’
শব্দ
ব্যবহারে
। আর
এই
ঠাস্
চমক
হত
না,
যদি
কবি
–‘ মহাশূন্যের শব্দতরঙ্গে
বিলীন
হচ্ছে’
– এই চিত্রকল্প
না-
আঁকতেন
। এবং তারপরও
কাব্যিক
তীক্ষ্নতা
আসতো
না,
যদি
কবি
‘শুধুই’
শব্দটাকে
আলাদা
লাইনের
গুরুত্ব
না-দিতেন
। এবার কবিতাটা
পুনরায়
আবার
পড়লাম
এবং
এবার
‘ঠাস্
ঠাস্’
শব্দটা
কোথায়
যেন
সত্যিই
ঠাস্...
ঠাস্...
করে
বাজলো
। শৈশবের
ঠাস্
শব্দ
শোনে
চমকের
চেয়ে
এই
চমত
একটু
আলাদা
। দুই
ঠাস্
কিছুতেই
আর
এক
জায়গায়
নেই
। মহাশূন্যের
শব্দতরঙ্গে
সবই
বিলীন
হচ্ছে,
কিন্তু
কর
বিচিত্রভাবে
। একই
অনুভূতি
জীবনের
দুই
পর্বে
দুইভাবে
যেন
ধরা
দিল
। একেক
জনের
কাছে
এই
ঠাস্
শব্দের
উপলব্ধি
আজ
একেক
রকমের
। খুব
চমকেও
ঠাস্
লাগে
বুকে,
আবার
খুব
ভয়েও
ঠাস্
লাগে
। কবি
তাহলে
কোন্
ঠাসে্র
কথা
বলতে
চাইলেন
? এটা
ভাবতে
গিয়ে
আবার
কবিতায়
যেতে
হবে
এবং
হারিয়ে
যেতে
হবে।
কেননা
কবি
খুব
গোপনে
এই শব্দের ভিতরে
‘সময়’-কে
গুঁজে
দিয়েছেন
। এবার
এই
সময়-কে
ব্যাখ্যা
করেই
বলতে
হবে,
কবি
কোন্
ঠাস্-এর
কথা
এখানে
বলতে
বা
বোঝাতে
চেষ্টা
করেছেন
।
“দৃশ্য
ভেঙেছে
বারবার
;
কাদামাখা পা নিয়ে
বৃষ্টিতে
ভিজে
ছাউনি দেওয়া
চায়ের
দোকান
।
বাজতে থাকা
‘ছুপানা
ভি
নেহি
আতা...’
ভাঙছে দৃশ্য,
বদলাচ্ছে
প্রবণতা
একতরফা মিঠে
যন্ত্রণা
নয়।”
(দৃশ্য)
খুব সাধারণ চিত্রকল্প। কিন্তু কবি কী অসাধারনভাবে এর ভিতরে খুব মুন্সিয়ানায় দৃশ্যের পর দৃশ্য বুনন করে গেলেন। যেমন – ‘কাদামাখা পা নিয়ে বৃষ্টিতে ভিজে/ছাউনি দেওয়া চায়ের দোকান।’ ।
অতি সাধারণ একটি দৃশ্য । তারপরও কেন জানি ছাউনি দেওয়া চায়ের দোকানটার জন্য মন কেমন করে ওঠে । এবং এই সাধারণ দৃশ্যকে অসাধারণ করে নিলেন এক লহমায় এই কথা বলে –‘ছুপানা ভি নেহি আতা...’ ।
কবি এখানে কী লুকাতে চাইছেন
? এটাকে কি প্রেমের কবিতা বলতে পারবো ? প্রেমের কবিতা মনে করতেই মনে হল, কবি তাহলে এই কথা কেন বললেন – ‘ভাঙছে
দৃশ্য /বদলাচ্ছে প্রবণতা / একতরফা মিঠে যন্ত্রণা নয়।’ এই ‘প্রবণতা’ শব্দের ভিতরে কবি কীসের ইঙ্গিত লুকিয়ে রাখতে চাইলেন ? সাথে ‘যন্ত্রণা’ শব্দটাও গুঁজে দিলেন আলতো করে! এই যন্ত্রণার কথা বুঝতে হলে, কবিতার আরেকটু সামনে যেতে হবে । পাঠককে এইভাবে টেনে নেয়া কিন্তু ভালো কবির একটা বড় গুণ । পাঠক হিসেবে আপনি থেমেও যেতে পারতেন ।
কিন্তু হঠাৎ আপনার মনে হল- এখানে যন্ত্রণার কথা কেন এলো ? এরপর হয়ত আপনার মনে পড়ে গেল -‘ছুপানা ভি নেহি আতা...’ এই কথাটা কবি তাহলে হয়ত এমনই এমনই বলেননি! এই বলার মধ্যেও কবির এক ধরণের বিশ্বাস কাজ করে ।
প্রচলিত নির্মাণপ্রক্রিয়াকে কিছু আক্রমণ করেই এই প্রয়োগ কৌশল নিয়েছেন কবি। এভাবেই কবি তার কবিতাকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন নির্দিষ্ট লক্ষ্যে। তরুণ কবি যখন তার কবিতায় ঝুঁকি নিতে ভয় পান না,
তখনই বুঝতে হয় এই কবি জীবনকে নিয়ে তথা কবিতাকে নিয়ে খেলবেন একদিন।
এই কবিতার
পরবর্তী অংশে কবি লিখছেন –
“দৃশ্য হচ্ছে
কাচের বয়ামে ভরা বিস্কুট –
চুলার আগুনে
কালো হওয়া বাঁশের বেড়া,
ছোটো টিভিতে
চলতে থাকা,
রেস্টলিং দেখতে
থাকা বৃদ্ধ শ্রমিকের পায়ের নখ,
চা-দোকানের
মহিলার কালো পেট ।” (দৃশ্য)
সদ্য তরুণ কবি
চিত্রকল্প আনলেন সত্তর দশকের – ‘কাচের বয়ামে ভরা বিস্কুট’। এবং অসাধারণভাবে সার্থক
একটি চলমান দৃশ্যের দিকে নিয়ে গেলেন পাঠককে । যে পাঠক বহুদিন হয়ত এই ধরণের
চিত্রকল্পের পাশ ঘেঁষায়নি। এতে পাঠের রুচিও কিছুটা চমকিত হয় এবং নতুনের একটা স্বাদ
পায় । আর এখানে কবি সার্থকতা হল, কবি এই দৃশ্যমানতার বহমানতাকে বজায় রেখে পরবর্তী
লাইনে চিত্রকল্প আনলেন – “চুলার আগুনে কালো হওয়া বাঁশের বেড়া” । এই দেখা যে একটা
কবিতার লাইন হতে পারে, এই ভাবনার মধ্যেই কবি জেরীর নিজস্বতা । অতিসাধারণ দৃশ্য
থেকে টুক করে কবিতার জন্য একটি অসাধারণ
লাইন তুলে নিলেন ! এই দেখাই তো একজন সম্ভাবনাময় কবির লক্ষণ । একই ধারা লক্ষ করা যায় – ‘চা-দোকানের মহিলার
কালো পেট।’ আমাকে প্রভাবিত করেছে কবির এই ধরণের নীরব পর্যবেক্ষণ । খুব সাধারণ,
অতিসাধারণ দৃশ্যকে কবি তার কবিতায় স্থান দিয়েছেন তীক্ষ্নতায় । এখানে ‘কালো’ শব্দের
ব্যঞ্জনাকে আলাদা একটা মাত্রায় নিয়েছে গেছেন কবি । কোথাও যেন নিজেই অজান্তেই একটা
প্রতীক হয়ে উঠছে এই ‘কালো’-টি । এই মহিলাটি । তার তলপেটও । তার যন্ত্রণা-সংগ্রামও । এটাই দেখার আধুনিকতা । এটাই তো বিনির্মাণ । এটাই
নিজস্বতা । আর এখানেই আমি কবির মননে মুগ্ধ হয়ে গেছি । আসলে,
মুগ্ধ না-হয়ে পারা যায় না । কিছু পরিচিত দেখা, পরিচিত সংকট নিয়ে, অভাব নিয়ে, দুঃখ
নিয়ে অনেকেই লিখতে পারেন । দুঃখের কথা বলা সহজ । তাকে উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া কঠিন
। সাধারবন দৃশ্যকে অসাধারণ জায়গায় নিয়ে
যেতে হলে দীর্ঘ পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি দীর্ঘমনন প্রয়োজন। যাপন প্রয়োজন । ভালোবাসা প্রয়োজন ।
লক্ষণীয়, কবি
কিন্তু নিজে তেমন কিছু বলছেন না। চাপিয়েও দিচ্ছেন পাঠকের উপর । তিনি কেবল একের পর দৃশ্য কোলাজের মতো এঁকে চলেছেন, আর
তাতেই মুগ্ধ হচ্ছি আমি । নিজে জড়িত হচ্ছেন
কম । বরং পাঠককে ঢুকিয়ে দিচ্ছেন চিত্রকল্পের
ভিতরে । তার নিজের ভিতরে । পাঠককে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তার ফেলে আসা অভিজ্ঞতায় ।
তার ফেলে আসা স্মৃতির দেশে । তার ছোটোবেলায় । ফলে আরেক ধরণের আমেজ তৈরি হছে । এটা
আমাকে দারুণভাবে মুগ্ধ করেছে । কবি তার মূল বক্তব্যে কেবল বলছেন – ‘দৃশ্য ভাঙছে’ ।
কিন্তু ‘ভাঙছে’-টা কী সেটা বলছেন না ! তার
জন্য তিনি পাঠককে প্রস্তুত করছেন । বড় কবিদের তো এটাই প্রবণতা থাকে । যা শুরুতেই
ধরা দিয়েছে জেরীর কলমে-
“দৃশ্য ভাঙছে –
নেশা ধরাচ্ছে
পচা ভাতের মদ,
বৃষ্টিতে
দাঁড়িয়ে ক্ষণিকের চুম্বন,
নারিকেলের তেল
মাখা ঠাম্মার চেহারা !
প্রাইভেট
টিউটরের হাত ভাঙছে, সব দৃশ্য –
একমাথা উকুন
নিয়ে বান্ধবীর হাসিমুখ, ক্লাসের চকের গুঁড়ো
কোনো প্যাক্ট
হবে না স্বাক্ষর, দৃশ্য ভাঙবে।
হেল্পারের লাল
ফোনে বাজবে ‘ওয়াদা রাহা...’
কেউ নিজস্ব নাম
নিয়ে দাঁড়াবে না দৃশ্যের প্রথমে ।” ( দৃশ্য)
কবিতাটার ক্রম
যদি আপনি প্রথম থেকে আরও একবার লক্ষ করেন, তবে দেখবেন কবি খুব সংযমের সাথে আপনাকে
কোথা থেকে কোথায় নিয়ে এসেছেন তার নিজস্ব দক্ষতায় । “একমাথা উকুন নিয়ে বান্ধবীর
হাসিমুখ, ক্লাসের চকের গুঁড়ো ” - একমাথা উকুন নিয়ে বান্ধবীর হাসিমুখ, এই
‘হাসিমুখ’-এর পর্যবেক্ষণেই তো পাঠক হিসেবে আমি মুগ্ধ । আর আবার বলতে হয়, এই
‘উকুন’ শব্দ এবং চিত্রকল্পের ব্যবহার কী
চমৎকার হয়েছে ! কিন্তু আশ্চর্য হয়েছি এরপরই কবি গোটা কবিতায় যা বললেন নি, অথবা বলা
যায়, গোটা কবিতার পরিকল্পনা যেখানে গিয়ে সার্থক হয়, সেই লাইনগুলো হল – “কোনো
প্যাক্ট হবে না স্বাক্ষর” । এতক্ষণ তো এসব কোনো প্রসঙ্গই আসলো না। ‘স্বাক্ষর’-ই বা
হবে না কেন ? কবি তখনই বলে উঠলেন – ‘দৃশ্য ভাঙবে’। এখন হঠাৎ করেই মনে হচ্ছে,
এতক্ষণ যা ভাবছিলাম, আসলে তো কবিতা অন্য জায়গায় । দৃশ্য ভাঙছে অন্য কোথাও ! অন্য
কোনো পরিকল্পনা মাথায় রেখে । এজন্যই ‘স্বাক্ষর’ হচ্ছে না । অনেক কিছু এভাবেই কথা
থাকলেও কথা রাখা হয় না । স্বাক্ষরের কথা থাকলেও কোনো এক অজানা কারণে তা স্বাক্ষর
হয় না । দৃশ্যের পট পাল্টে যায় । এবং এরপরই কবি অসাধারণ একটি লাইন আনলেন –
“হেল্পারের লাল ফোনে বাজবে ‘ওয়াদা রাহা...’” । এই যে – “‘ওয়াদা রাহা ...” – কী
অদ্ভুত প্রয়োগ । এই ‘ওয়াদা রাহা’ – এটাকে
কি এখন আর গান মনে হচ্ছে ? এভাবে কত
ওয়াদা-র পর ওয়াদা থেকে যায় নীরবে । এবার পেছেন ফিরে একবার দেখুন তো সেইসব ছোটো
ছোটো দৃশ্যকল্পগুলো – ‘কাদামাখা পা নিয়ে
বৃষ্টিতে
ভিজে/ছাউনি
দেওয়া
চায়ের
দোকান
।’ ‘‘ছুপানা
ভি
নেহি
আতা...’
‘কাচের বয়ামে ভরা বিস্কুট’ ‘চুলার আগুনে কালো
হওয়া বাঁশের বেড়া’ ‘বৃদ্ধ শ্রমিকের পায়ের নখ’ ‘চা-দোকানের মহিলার কালো পেট’ ‘নেশা
ধরাচ্ছে পচা ভাতের মদ’ ‘বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে ক্ষণিকের চুম্বন’ ‘নারিকেলের তেল মাখা
ঠাম্মার চেহারা!’ ‘একমাথা উকুন নিয়ে বান্ধবীর হাসিমুখ, ক্লাসের চকের গুঁড়ো’ – এই
সব দৃশ্যকল্প তৈরি করার পর কবি বললেন – “কোনো প্যাক্ট হবে না স্বাক্ষর” । কেবল দৃশ্যের পর দৃশ্যই ভাঙবে । এভাবেই ভেঙে
আসছে প্রবহমান কাল থেকে । এজন্যই তো কবি বলেছিলেন – “ভাঙছে দৃশ্য, বদলাচ্ছে
প্রবণতা ” । আসলেই তো সাধারণ জনগণের
সাথে রাজনৈতিক নেতাদের কেবল দৃশ্য বদলানোর
প্রতিশ্রুতি । নির্বাচন এলেই কেবল সাধারণ
মানুষের জীবনের দৃশ্য পাল্টে দেবার স্বপ্ন দেখানো হয় । সেই দব স্বপ্ন মূলগত অর্থে
কাকে দেখানো হয়, সেই সব সাধারণ, অতিসাধারণ মানুষদেরই দেখানো হয় । সেই তারাই দেখে
একের পর এক দৃশ্যই পাল্টে কেবল, শুধু তাদের কিছু বদলায় না । হয়ত তাই কবিতার শুরুই হয়েছে তাই এই কথা বলে – “
দৃশ্য ভেঙেছে বাববার” ।
কবি জেরী কি
সাধারণ দৃশ্যের বুনন দিয়ে দিয়ে এগিয়ে গেলেন বড় একটা চিত্রপটের দিকে । অথচ কোথাও
একটা ভারি শব্দ নেই । ভারি দৃশ্য নেই । ভারি বক্তব্য নেই । ভারি মান-অভিমান নেই ।
দর্শকের মতো দেখেই চলেছেন । সাধারণ সাধারণ দৃশ্যের ভিতর থেকে জীবনের এক গভীর
উপলব্ধির দিয়ে এগিয়ে গেলেন অনায়াসে ।
এই ধরণের কবিতা
লিখতে গেলে প্রস্তুতির প্রয়োজন হয় । জেরীর মধ্যে সেই প্রস্তুতি দেখা যায় । সেই অর্থে খুবই সত্য কথন এটা – “জেরী নিজেকে
পুড়িয়ে কবিতা লেখে।” সাধনার এই রেশ ধরে
রাখলে জেরী অনেকদূর যাবে । কেননা, তার
দেখা বিচিত্র । জীবনের প্রথম কাব্যেই ধরা পড়ে তার নিজস্বতা । জীবনকে দেখার মধ্যে
তার নিজস্ব একটা দৃষ্টিভঙ্গি আছে । এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাকে আলাদা করে । এই
দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই তার আগামিতে এগিয়ে যাবার সম্ভাবনা প্রবল । ত্রিপুরার কাব্যজগতকে
নিঃসন্দেহে সে একটি উচ্চতায় নিয়ে যাবে, এই বিশ্বাস আমি অন্তত রাখি। বাকিটা জীবনদেবতা জানেন, তিনি কাকে কোথায় নিয়ে
যাবেন ! হয়ত এখানেই শেষ । হয়ত বা এখান থেকেই উত্থানের শুরু ... । আমি শুধু তার দুটি কবিতা নিয়ে আমার উপলব্ধি বা
আমার প্রতিক্রিয়া জানিয়েছি । গোটা কাব্যই আমাকে মুগ্ধ করেছি । প্রায় প্রতিটি
কবিতাই উপলব্ধিতে ভরপুর । নিজের যাপিতজীবনের ধারাবিবরণী । সাধারণ দৃশ্যের ভিতরে
আলতো করে অসাধারণ অনুভবকে গুঁজে দেয়া । তেমনই
সাহসী উচ্চারণ । কৌশলের পাকামি নেই । সহজসরল অনুভবকে সেই সরলতাতেই তিনি বহন করে
নিয়ে গেছেন তার অভীষ্ট লক্ষ্যে । নিয়ে গেছেনও অনায়াসে । কোথাও কাব্যভাবনার সাথে
জোরাজুরি নেই । ছলনা নেই । জটিলতা নেই । সরল সাপের মতোই তীক্ষ্ন উচ্চারণ । নীরবেই নিজেকে
পুড়িয়ে লিখে গেছে জেরী । তার জীবনের সফলতা কামনা করি । নিজেকে ঘুরেফিরে দেখাই তো
জীবন । অথবা কবিতা । অথবা নিজের সৃষ্টিউল্লাস । অথবা বেঁচে থাকা নির্মম আনন্দ । নিজেকে ভালোবাসার
স্ফূর্তি । নিজেকে নিজে আঘাত করার চরম অপারআনন্দ।
বই – “পরবর্তী
দৃশ্যের জন্য”
কবি – জেরী চন্দ
প্রচ্ছদ –
সুতীর্থ বিশ্বাস
প্রকাশক –
হারাকরি
আগরতলা , ত্রিপুরা

No comments:
Post a Comment