'অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি'
সত্তর দশকের উন্মাদনায় এক ভিন্ন উচ্চারণ-ভঙ্গিমা নিয়ে কবিতার জগতে পা রেখেছিলেন কবি অসীম দত্তরায়।
১। "কবি বসে আছে। একটি শব্দের জন্য/যে শব্দ ভেসে বেড়াচ্ছে মহাশূন্যে।/কবি অনুভব করছে তার অস্তিত্ব" একজন কবির আসলে মূল যন্ত্রণাটা ঠিক কোথায়?
উত্তর : হৃদয়ের র কোন্ যন্ত্রীতে কীসের অভিঘাত থেকে কবিতার সৃষ্টি হয় তা বোধহয় কবিও সঠিক ভাে বলতে পারে না। শুধু অনুভব করতে পারে কোথাও একটা প্রবল আবেগ তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। এই আবেগ কখনও কখনও এক তীব্র যন্ত্রণায় পরিণত হয়, যতক্ষণ- না সেই আবেগ অক্ষরে, ছন্দে, উপমায়, শব্দবন্ধনে রুপ পায়। অনেক সময় মনে হয় কবিতা বোধহয় একটা আকস্মিক ব্যাপার। হঠাৎ করেই সে অনর্গল ধারায় বেরিয়ে আসে। তা বোধহয় নয়। 'জল পড়ে পাতা নড়ে এই নিয়ে পদ্য'- কোনও এক বর্ষণ ক্লান্ত সন্ধ্যায় এই শব্দবন্ধ সৃষ্টির বহু আগে থেকেই তার প্রস্তুতি চলতে থাকে কবির মননে , মেধায়। কবি হয়তো অনুভবও করতে পারে না। কিন্তু একটা তীব্র যন্ত্রণা তাকে কুড়ে কুড়ে খায়। হয়তো সেই যন্ত্রণা থেকেই যার মধ্যে কেউ কোনওদিন কবিতা লেখার সম্ভাবনাও লক্ষ করেনি, সেই আপাত কাব্য সম্ভাবনাহীন ব্যক্তিও লিখে ফেলে দু-দশ লাইনের কবিতা যা পড়ে আশেপাশের সবাই চমৎকৃত হয়ে যায়। কিন্তু তারপর থেকে প্রতিনিয়ত সেই আবেগ বা যন্ত্রণা কবিকে তাড়া করে যায়। দ্বিতীয় কেউ বুঝতে পারে না সেই আবেগ কীভারে নিশির ডাকের মতো তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। কবি প্রতিনিয়ত যন্ত্রণায় বিদ্ধ হচ্ছেন। রাতদিন রক্তক্ষরণ চলছে তার মস্তিষ্কে হৃদয়ে। শুধু একটি নতুন সৃষ্টির জন্য এই যন্ত্রণা। বীজ ফেটে অঙ্কুরোদগমের আগে যে আলোড়ন চলতে থাকে নীরবে, কাব্য রচনার প্রক্রিয়াও তেমনই নীরব। যন্ত্রণাবিহীন কোনও সৃষ্টি কি সম্ভব? কোনও মৌলিক সৃষ্টি বোধহয় সম্ভব নয়। একজন চিত্রকর কোনও এক দৃশ্যকল্পের জন্য যে আর্তি নিয়ে তুলি হাতে বাসে থাকে, একজন সঙ্গীত শিল্পী এক নতুন সুরবন্ধের জন্য যেভাবে যন্ত্রে বা কণ্ঠে ঝঙ্কার তোলে, একজন কবি শুধু একটি মাত্র নিবিড় শব্দের জন্য যেভাবে প্রহরের পর গ্রহর জাগে, সেটাই তার যন্ত্রণা। এই যন্ত্রণাই সকল সৃষ্টির প্রেরণা। যেদিন সেই যন্ত্রণার অনুভুতি শেষ হয়ে যাবে সেই সৃষ্টির প্রক্রিয়াও শেষ হয়ে যাবে। এই নিরবিচ্ছিন্ন 'হৃদয় কুড়ে খাওয়াই' - একজন কবির কবিতা লেখার প্রেরণা।
২। প্রশ্ন : -আমি, রাতুল, দিব্যেন্দু, পাঞ্চালী, স্বপন/সেই যে কবে গিয়েছিলাম / জুমের ক্ষেতের পাশে কার্পাসের পুঞ্জ বরফ মায়া'--- ত্রিপুরার যৌথ সংস্কৃতির মিলবন্ধনে যে অপূর্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য গড়ে ওঠার কথা ছিল, তা থেকে আমরা বারবারই পিছিয়ে যাচ্ছি কেন?
উত্তর : সে একটা সময় ছিল উদ্দাম মাদলের তালে বাঁধা এক উত্তাল জীবন। পাগল মোষের পিঠে চেপে যেন আদিগন্ত জ্যোৎস্নার ভেতর ছুটে চলা। সত্তরের দশকের কথা লিখছি। সারা রাজ্যে না হোক, অন্তত আগরতলা শহরে কবি-লেখকদের একটা দাদাগিরি ছিল। গভীর রাতে কবি বাতুল দেববর্মণের বাড়িতে শুয়োরের মাংসের ভর্তা খেয়ে আমরা বেরিয়েছি , আমরা মানে পার্থ গাঙ্গুলি, নিলিপ পোদ্দার, রণজিৎ রায়, উৎপল চক্রবর্তী আরও কিছু উন্মাদী যুবাও। কনকাতার শিল্পী অসিত পাল আর 'চলমান শিল্প'-এর প্রসারে ডিএম হাসপাতালের বর্তমানে অরিভিএমে যন্ত্রা ওয়ার্ডে দেওয়ালে ছবি আঁকবেন। আমরা তার শরিক, শিরিষ কাজে যবে শ্যাওলা তুলছি। তারপর হবি আঁকা শেষে মগরায়ত উত্তীর্ণ সময়ে পার্থ, রাতুল ওর উদ্যত গঠে গান ধয়েছে- 'আজি জোৎস্না হাতে সবাই গেছে বনে আমায় শহর পরিক্রমা করছি। কিন্তু কেউ গ্রন্থ করেনি 'তোমরা কারা শয়রে তখনও পুলিশ নায়েগা ছিল। ছুটির দিনে শাঁতের সুখুজে বেরয়ে পড়েছি শহর মেড়ে দুরে পাহাড়ি পথে, উপয়াতি পল্লীতে, হা-বাগানের ছায়াছ হৃদের ক্ষেতের পাশে বস্তিতে বড়িতে। আরের ব্যাগে দেখার খাতা, ঝরো হয়তে যেচ-বুক। তখন মান্দাই বাজারে বা গাগনির গ্রামে এখটা শহরে পরিহাস ছিল না। আমার গেছি উপজাতি জীবনের ছাগ নিয়ে, চা-বাগানের শ্রমিক জীবনের ছবি তুলে আনতে। তারপর সেইসব ছবি ও সাহিত্যকর্ম নিয়ে আগরতলায় গোস্ট অফিস চৌমুহনীর গোল চক্করে পরাজিত ট্যায় ও আমাদের চারপাশে কিংবা চিলড্রেন্স পার্কে সাজানো। হয়েছে চিত্ত প্রদর্শনী। আয়োজন করা হয়েছে সাহিত্য-চারুকনা মেনার। যেই মেলায় কোনও বিভেদের প্রাচীর ছিল না। সবাই মিলে এগিয়ে
মনে রাখতে হবে সেই সময়ে সরকারি আয়োজনে কোনও বইমেলা বা সংস্কৃতি মেলা অনুষ্ঠিত হতো না। পরে ধীরে ধীরে সরকারি প্রয়ান বৃষ্ণ হতে থাকে। এর ফলে আমরা করেছিলাম আমোলের যুথবদ্ধ প্রয়াস আরও বেগবান হবে। বলিষ্ঠ পদক্ষেপে বহু বাবার প্রাচীর অতিক্রম করে আমরা এক মুখদীপ্ত দিনের দিকে এগিয়ে যাব। ঠিক তমনই আমাদের যুথবদ্ধ জীবনে জেগে উঠ এক অনভিপ্রেত আর্তনাদ। যে আর্তনাদের প্রবক্ত আমাদের একে অপরকে ফেলল দূরে। এই আঘাত কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই এ রাজ্যের অরণ্যভূমি ভারী হয়ে উঠল বারুদের গন্ধে। উগ্রপন্থার কার্তুজের শব্দে। আক্রান্ত মানুষের আর্থবাডিতে ভারী হয়ে উঠল উপজাতি পল্লীর আর অনোপজাতি পল্লীর উপবাই। এরই মিগড়ে বাঁধা দুটি নৌকা যেন দু'টি প্রোতে ভেসে যেতে উদ্যত। সেই বিখযায় আমরা কাটিয়ে উঠলাম। কিন্তু কোথায় যেন একটা অভাব বোধ রয়ে গেল। আমরা যতটা এগিয়ে যেতে চেয়েছিলাম এক সঙ্গে ততটা যেন পারলাম না। আমরা সেন ব্যস্ত হয়ে পড়লাম একা একা নাড়ছিয়ে। যুথবদ্ধ প্রয়াস যেন অনেকটাই উপেক্ষিত রয়ে গেল একশে। তবু এর মধ্যে যে আশার আলো নেই তা তো নয়। ঈশিষ গেলার দুষপ্রাপ্ত আলোক রেখার মতো এখনও সম্ভাব্য ডিমিক দিয়ে ওঠে, এই কণিক ছটা যে একদিন সূর্যালোকে পরিণত হবে না কে বলতে পারে।
'আজকাল নড় দেশি স্কুল হয়ে যায়। পাশাপাশি চলাতে চলতে। তোমাকে ভুল নামে ডেকে উঠি। মিছিলে হাঁটতে হাঁটতে স্কুলে খাই। জরুরী শ্লোগান'- সমাজ-রাজনীতি-সংসার জীবন কবি
অহীম দত্তরায়কে এত প্রকট ভাবে আচ্ছয় বা বিষজ্ঞ করে তোলে কেন?
এবাজন কবি তো দাসার বিমুখ, সমাজ বিচ্ছিন্ন বা রাজনীতি বিযুক্ত কোনও ব্যাক্তিত্ব নয়। সে তো সব কিছুকে ছুঁয়ে আছে। আনার এন্ড সত্যি কখনও কখনও যে সব কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সব কিছু ছেড়ে এক অর্থেবিক গ্রেীপ্রভেজা প্রান্তের দিকে ছুটে বেড়ায়া কোনও নতুন শব্ণয়ের জানা, নবতার ছত্যের সন্ধানে, কল্পদৃশ্যের গোঁজে। তখন সে সংসার বিমুখ, সমাজ পরিত্যক্ত। কবির এ এ আশ্চর্য ভ্রমণ। 'মোহ ও মোদের মধ্যে যে চার এম স্পেস'- তার মধ্যে সে নিষাদিন হা-ডু-ডু খেলে বেড়ায়। একজন কবি হয়তো মধ্যরাতে পাশে শোয়া শির সন্ধানের কাল্লা শুনে জেগে ওঠে। ভায় মনে হয় তার সন্তান কি কোনও লেখন ইজোয়ারের খবর পেয়েছে। তখন যে সপ্তম্মানের জন্য শঙ্কা বোধ করে। এভাবে কবি অফিস করে, ঘর পড়ায়, বাজারে ছোটে হিসেবের খাতা রেখে, পাড়ার বোকানে মাঁড়িয়ে সিগারেট ফোঁকে। আবার এঠাৎ বিভিন্ন হয়ে যায়। বাজার থেকে মৌরলা মাছ
কিনে আনতে হঠাৎ চলে যায় উন্ময়ের ব্যাক্তিগত
বাগানে ঘুড়ি ওড়াতে। বিনিমস্তা বিনিযুতায় উৎর্যের মুড়িকে ফোগাট্টা করে দেয় বারবার। অফিসে জানমার পাশে বাদে থাকতে থাকতে ভার চোখে ভেসে ওঠে না দেখা রৌভব্লান্ত সফদরাচ্য রোড। যেখানে একটি নিরন্ন পকেটমার ছেলে একা উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়াচ্ছে। তার ঠোটের কয়ে লেগে আছে যানি রক্তের ফোটে। কলি তার পাশে হাঁটে। সযত্নে তার শার্টের হলো গোড় দেয়। ঠোঁটের রক্ত মুছিয়ে নেয়। আমরা শ্লোগান দিই দিন বদলের শ্লোগান। কবি তো প্রতি মুহূর্তে আগান দেয়। প্রতিদিন নতুন নতুন শ্লোগান রানা করে। এক মুহূর্তেও রাজনীতি দিমুখ থাকতে পারে না। যে প্রতিটি প্রমক্রান্ত মানুষের জন্য বাবাসনন তৈরি করে। তাদের ভায়া ঘরের ফুটেন ছাউনিতে শন গুঁজে দিতে চায়। কবি বিষন্ন হয়ে পড়ে যখন সে দেখে সকালবেলা কাজের সন্ধানে বেরিয়ে পড়া মানুষটি সন্ধ্যায় শূন্য হাতে শুম মুখে ঘরে ফিরে যাতে। আর তার বালক সন্তান গরম ভাতের জন্য উন্মুখ হয়ে আছে।
'ব্যক্তিগত ডিজনিল্যান্ড' এরপর 'স্বাধীনতার স্কুল
বর্ণমালা দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থের পর আর আপনাকে পাওয়া গেল না। দীর্ঘ এই নীরবতার কারণ, যন্ত্রণা নিয়ে আমাদের কিছু বলুন।
এ প্রশ্নটি নতুন নায়। গায় কয়েক বছরে বন্ধু বাতান, কথা- কেন লিখছ না বা কেন লিখছেন না।' এ যেন এক উদ্ধত প্রশ্ন। যার উত্তর আনার কাছে নেই। একদিন এক বর্ষণ মুখর সন্ধ্যায় করিমগঞ্জ কলেজ মাদ্রাবাদে বসে হঠাৎ করে কবিতা লেখার শুরু। কলেজের দেওয়াল পত্রিকায় প্রকাশ। সহপাঠী এবং অধ্যাপকদের কাছ থেকে ইতস্তত প্রশংসা- সেই শুরু। তারপর থেকে ক্রমশ একটা যেখার তাগিদ অনুভব করেছি। এরপর ১৯৭২ স্যাল আবার আগরতলায় এসে নিলিপ পোদ্দার রাতুল দেববর্মণ, পার্থ গাঙ্গুলি প্রমুখ পৌর্ণমী লিটন মাগানিজের পরিচালকদের সাহচর্যে সেই ইচ্ছা আরও বেগান হল। আসলে আমি লেখালেখি করণ ছেলেবেলায় কেউ আবতেই পারোনি। যারা দেখাদেখি করেন তাদের সাধারণত অল্প বয়দ থেকেই প্রতিভার স্ফুরণ দেখা যায়। বরং আমার দিদি শক্তি দত্তরায় ছেলেবেলা থেকেই লেখালেখি করতেন। এখনও অসুস্থ শরীরেও নিয়মিত লেখেন। ছেলেবেলায় আমার বাবা শৈলেন্দ্র কৃষ্ণ দস্ত ছিলেন উৎসাহলতা। লেখালেখি আমার জীবনে অনেকটা অস্বাভাবিক ঘটনা। এর চেয়ে ব্যাং ক্রিকেটার হলেই সেটা হতো অনেক বেশি স্বাভাবিক।
প্রসঙ্গর আমার পেশাগত জীবনও শুরু হয় ক্রীড়া সাংবাদিক হিসেবে। এ কথাও স্বীকার করতে হাৎ, তথ্য, সংস্কৃতি দপ্তরে চাকরি করার সূত্রে পরিবেশও অনুঘটকের কাজ করেছিল। কর্মক্ষেত্রে বন্ধ লেখক, যাহিতাকর্মী, শিল্পীর উপস্থিতি নিঃসন্দেহে আমাকে প্রাণিত করেছিল। এরই মাঝে 'ব্যক্তিগত ডিজনিল্যান্ড' ও 'মাধীনতার ভুল ভাবিনি যে বই ছাপিয়ে নিজের লেখালেখি পাঠকের হাতে তুলে দেন। তবু মিলিপের একান্ত আগ্রহে গৌপদী প্রকাশন থেকে এই দুটি প্রকাশিত হয়েছে। যার জন্য আমাকে কোনও অর্থ বা প্রম বায় করতে হয়নি। এভাবে চলতে চলতে হঠা যেমন-একদিন সেখালেখি শুরু হয়েছিল, তেমনি হঠাৎই একদিন তা বন্ধও হয়ে গেল। কেন বন্ধ হায় এর উত্ত্যা যেন নিজের কাছেই ধরা দেয় না। লিখতে লিখতে একদিন যেন মনে হল যে উদ্দেশ্য লিখতে চাই যেখানে যেন পৌঁছতে পারছিনা। প্রথম যখন লেখালেখি শুরু বারি তখন তো কোনও উদ্দেশ্য ছিল না। যেখার আসবেই লেখা। কিন্তু একটা সময় মনে হল লিখতে হলে মানুষের জন্য লিখতে হ্যাগ। একদিন মনে হল তা হচ্ছে না।
যেখালেখি করে যে জায়গায় পৌঁছবে চেয়েছিলাম সে জায়গায় দোষহয় আর গৌছতে পারব না। তাহলে আর লিখে কী লাভ? এ হয়তো শুধুই আবেগ। একটা ব্যাপার মনে হয়-লেখালেখি করতে হলে অধ্যয়নের মাধমে নিজেকে নিস্তো পরিশীলিত করে তুলতে হয়, সমৃদ্ধ করে তুলতে হয়। কিন্তু একটা সময় এক্ষেত্রে আমার ব্যাপাক ৯টি ঘটে গেছে। যার জন্য আর এগিয়ে যেতে পারছি না। এখনও যে মায়ে মধ্যে দুটার ছত্র লেখা হয় না। তা নয়। কিন্তু একটি
লাইন দেখার পরই মনে হয় লাইনটি নিজেরাই পছন্দ মতো হল না। লেখা আর এগোয় না ধা সম্পূর্ণ করায় প্যা মনে হল এ যো আমি লিখতে মাইনি। স্নায়নে লিখে কী লাভ?
'এক অন্তহীন অরণ্যের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাই...এক অন্তহীন শস্য ক্ষেতে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠি আমাকে বন্দী করো'। আপনি একধারে কোথাও নিজেকে মুক্ত মনে করেন আবার কোথাও বন্দী। আপনার মনোবেদনাটা আসলে ঠিক কোথায়?
আমার শৈশব, কৈশোর ও যৌলনের প্রথম ভাগ
কেটেছে চা-বাগানে। কখনও আসামের মা-বাগানে, কখনও ত্রিপুরার চা-বাগানে। যাদের চা-বাগানের অভিজ্ঞতা আছে তারা জানেন চা-বাগানের পরিবেশ ও প্রকৃতির এক মোহময় আবেশ আছে। যতদূর চোখ যায় হা-ক্ষেত আর সবুজের বিশাল বিস্তার। কোথাও দিনিয়ার্ড বোর্ডের মতো মধুণ। কোথাও ঢেউ খেলানো সমুদ্র। জীবনে শেষ যে মা-বাগানে ছিলাম সেটা আসামের রেমপুরের খুব কাছে গোমতিলা থেকে বাট কিমি দূরে। শীরকালে ভোরবেলা বোমডিলার দিকে তাকালে হিমালয়ের ছোট ছোট শুজ দেশা যেতো। অভালবেলার রোদে রূপের মতো চকচক করছে। সেখানে দেকে চোখ ফেরালেই দেখা যেত পিচ রাস্তায় ওপাশে মাইলের পর মাইল সবুজ বা সোনালি ধন ক্ষেতের বিস্তার। আবার কোথাও দু'ধারে বাঁশবন মাঝখান দিয়ে অপ্রশস্ত্র গায়েচনলা পথ। চারপাশে এক নিখর নিনতা। শুধু বাঁশবনের ভেতর দিয়ে হাওয়ায় শন শন শব্দ। বৃষ্টির দিনে দু'হাতে বান চেপে ওলাতে গেলে চারদিকে কেমন এক ওয়া ওয়া শব্দ। অনেক দিন খ্যা ককবরক শিখতে গিয়ে মনে হয়েছিল, কেন বৃষ্টিকে ককবরকে 'ভাতুই' বলা হয়। কেউ যদি গৌহাটি থেকে তেজপুর বাসে বা ট্রেনে ভ্রমণ করে থাকেন তাহলে নিশ্যয়ই দেখেছেন স্থানে স্থানে দিগন্ত বিস্তৃত গান ক্ষেত, দূরে গ্রামের সবুজ রেখা। মারার লোন। শীতের মরসুমে চোখ জুড়ানো মর্মে বৈচিত্র। মাকে মাথে থাকা মরিচের নাল ক্ষেত। এক অদ্ভুত রতের বাহার। আর বিষ পারবো দিনে, ভোগালী বিষয় আনে নূর গ্রাম থেকে ভেসে আসা আবেশে ডুবিয়ে দেয়। বানিয়ায় মধ্য দিয়ে হেঁটে গেছি উদ্দেশ্যহীন। নিথর ভরতা মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে কখনও বৃক্ষের ভেতর এক অজানা হাহাকার জেগে উঠেছে। মনে হয়েছে
কাছের দুয়োর স্বজন-সুহৃদদের চিৎকার করে ডাকি, বলি- 'আমাকে বন্দী করা।' আবার কখনও বিজর মাদলো শব্দের মধ্যে গম ক্ষেতের আলাপথ ধরে পৌষের দৌঁড়ে গ্রাম থেকে প্রামান্তরে ঠোঁটে যেছি। বিশাল উন্মুক্ততার মধ্যে দাঁড়িয়ে মনে হয়েছে-'হলে জলে অন্তরীক্ষে একমাত্র আমিই সরটি। নষ্টালজিয়া আমাকে এখনও তাড়িয়ে বেড়ায়। সেই অরগোর নির্জনতা, ধান ক্ষেতের রঙিন শোভা মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি। এর সঙ্গে বিচ্ছেদই আমার যন্ত্রণা।


No comments:
Post a Comment