Wednesday, June 19, 2024

চিত্রশিল্পী সমর মজুমদার

 

 


 বাংলাদেশের অগ্রগণ্য চিত্রশিল্পীদের মধ্যে সমর মজুমদার অন্যতম একজন। তিনি তাঁর  চিত্রকর্মে লোকশিল্পকে দিয়েছেন লোভনীয় এক মায়াবীমাত্রা ।  তাঁর সাথে একান্ত আলোচনায় তমালশেখর দে ।   

ক্যানভাসে গ্রামবাংলা বেছে নেওয়ার কারণ সম্পর্কে সমর মজুমদার বহু আগেই বলেছিলেন, “আমার স্নেহ, অনুরাগ, প্রতিবাদ বা দুঃখের অনুভূতি-সবই বাংলাদেশের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। আমার অন্তঃসম্পর্ক অনেক সাধারণ ও জীবন্ত, যেটা আমি আমার ক্যানভাসে ধারণ করি এবং বিশ্বাস করি এটি দর্শকদের জন্য বোধগম্য হবে। আমি প্রথম দিনই চিত্রী সমর মজুমদারের ছবি দেখে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যাই । এত চেনা। এত কাছের, এত আপন মনে হল ছবিগুলোকে।  এরপর বাংলাদেশের আরেক প্রখ্যাত শিল্পী চারুপিন্টু- দার সহায়তায় শিল্পীর সাথে যোগাযোগ তৈরি করিএবং এক পর্যায়ে সাক্ষাৎকার নেয়ার বাসনাটা ব্যক্ত করি । শিল্পীও তাঁর অমায়িক ব্যবহারে আমাকে কাছে টেনে নেন সহজেই। এতে আমার খুব সুবিধা হয় । আমার ইচ্ছেটাও পূর্ণ হয় । সাক্ষাৎকার দেবার জন্য ধন্যবাদ স্যার।

 

 

 “সরলতা ছাড়া  বৃহত্তর বাংলা জনগোষ্ঠির জীবনধারাকে ফুটিয়ে তোলা অসম্ভব 

 

প্রশ্ন ঃ আপনার ছবিতে বাংলার বিচিত্র জীবন চিত্রিত হয়ে থাকে তার নানা অবর্ণনীয় রূপ-সজ্জার অপার সৌন্দর্য নিয়ে আপনি নিজেও বলেন, ‘আমি বাংলাদেশের শিল্পী বাংলার ছবি আঁকি’। আপনার এই দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠার প্রেক্ষাপট নিয়ে প্রথমেই কিছু জানতে চাই।

উত্তর ঃ  আমি বাংলার লোকসংস্কৃতির এক মায়াবী আবহে বেড়ে উঠেছি । আমার শৈশবের একটা বড় সময় কেটেছে নানা পূজা-পার্বণে আয়োজিত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের স্বাদ-আস্বাদনে। গান-নাটক- ছবি আঁকা এ-সবের মধ্যে দিয়েই বড় হয়েছিস্কুলের সময়টুকু বাদ দিয়ে সারাদিন কাটতো প্রতিমা তৈরির শিল্পীদের সাথে । সারা বছর ধরে মায়ের জন্য ষষ্টি মা  তার জন্য কালো বেড়াল, ধলা বেড়াল বানাতাম । টেপা পুতুলের অবিকল নকল করতাম । ফরমায়েশ আসতো দিদিদের চুলা বানিয়ে দেবার জন্য । এভাবে কখন যে সুন্দর আমার মনে বাসা বেঁধেছে জানি না । আমার অভিবাবকদের প্রশ্রয় ছিল । মনে পড়ে ঘরের দেয়ালে কাচ বাঁধাই কিছু ক্রস স্ট্রিচের হাতের কাজ ছিল, যেমন- গোলাপ ফুল, গৌরনিতাই এসব গোলাপের পাশে লেখা ছিল ‘সুখে থাকো’ । একসময় জানলাম এইসব  আমার মায়ের বিয়ের আগের হাতের কাজ ।  মা যখন গর্বভরে তাঁর কাজগুলো অতিথিদের দেখাতেন, তখন গর্বে আমারও মনটা ভরে উঠতো ।

রুমালের কোণায়, বালিশে ছবি এঁকে  দেবার জন্য নানা অনুরোধ আসতো মায়ের কাছে । ক্রমে কখন যে মায়ের জায়গাটা আমার হয়ে গেল আজ আর মনে নেই । আমি তোরঙ্গে আঁকা লতা, অর্ণামেন্টের প্রজাপতি, রিক্সা বা ট্রাকে আঁকা ফুল চোখে বয়ে নিয়ে বাড়ি আসতাম কপি করার জন্য । পরিবারে অভাব ছিল রঙ, কাগজের তখন অনেক দাম। তাই কাঠ-কয়লা দিয়ে দেয়ালে আঁকতাম দেবী দুর্গা ও তার চালচিত্র আপন মনে আমার মতো করে আঁকতাম।

একদিন হঠাৎ করে মনে হল, এতদিন আমি দৃশ্যমান  যা কিছু দেখতাম সব স্বপ্নে দেখতাম। এখন কেমন ত্রিমাত্রায় দেখছি । আমি গাছকে ছুঁয়ে দেখতাম । ঘরটাকে ছুঁয়ে দেখতাম । আমি এটাকে এক নতুন খেলা হিসেবে পেয়ে গেলাম । রূপকথার গল্প আমাকে খুব ভাবাতো আমার কল্পনাকে উস্কে দিত। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় অশ্বপিঠে রাজিয়া সুলতানার ছবি এঁকে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলাম । সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় পৌরসভার প্রার্থীর পোস্টার ও ব্যানার আঁকার দায়িত্ব পাই ।এভাবেই ছবি আঁকতে আঁকতে আমার বেড়ে ওঠা । তখন আমার চোখে রাক্ষসের মতো ক্ষুধা ছিল । প্রাকৃতিক দৃশ্য, বইয়ের ইলাস্ট্রেশন পাগলের মতো আমাকে টানত ।

 





প্রশ্ন ঃ ‘মৃত্তিকামায়া’ ‘মা’ ‘ঘুম নেই’ ‘পিতা’ ‘ছায়া এবং সখি’ ‘কানাই’ ‘নকশিকাঁথা’ – আপনার ছবির টাইটেলগুলোও বড় মায়াবী, মরমিয়াআপনার ছবির  এইসব প্রেক্ষাপট অঙ্কনের দৃষ্টিকোণ নিয়ে আমাদের কিছু বলুন

উত্তর ঃ  সেই অর্থে, এখানে আমার  দৃষ্টিকোণ খুব সহজ-সরল। তাই নামগুলোও এমনই নির্বাচন করে থাকি। সাধারণ মানুষের ছবি সাধারণ আর্টের ভাষায় প্রকাশিত হবে, এটাই আমি   চাই । আমরা তো জানি, যা আঁকা থাকে ছবিতে, বা যা লেখা থাকে কবিতায়, আর্ট কিন্তু সেখানে থাকে না । আর্ট থাকে তার অন্তরালে   আর্ট এটাকে শুধু ভর করে থাকেসরলতাই এখানে সবচেয়ে বড় সম্পদ । আমার মনে হয়, সরলতা  ছাড়া  বৃহত্তর জনগোষ্ঠির জীবনধারাকে ফুটিয়ে তোলা অসম্ভব । দুর্বোধ্যতা এড়িয়ে যে-কেউ এখানে প্রবেশ করতে পারবেগ্রহণ করতে পারবে ছবির স্বাদ, বিষয় । তার মায়াময় প্রক্ষাপট। এরজন্য তাকে জহুরি হতে হবে না । জানতে হবে না, ছবির জটিল সব পরিভাষা ।   

 প্রশ্ন ঃ  আপনার ছবিতে পল্লীজীবনের একাকীত্ব, হতাশা, মাড়ুলভাঙা পুরুষ বা নারীর ছবিতে খুব একটা দেখা যায় না। গ্রামীণ জীবনের ক্লান্তি-দুর্দশাকে আপনি কীভাবে পর্যবেক্ষণ করে থাকেন? তাদের কান্না-বেদনা...

উত্তর ঃ স্মৃতি থেকে আঁকা আমার শৈশবের মানুষগুলি সততই সুখি মানুষ ছিল । দুঃখ তো নিশ্চয়ই ছিল । কিন্তু তা আমি ভাবতে চাই না । পাকিস্তান আমলে বাঙালির লোকশিল্প চর্চাকে খুব একটা গুরুত্ব দেয়া হত না । আমার মধ্যে যা-কিছু বিকশিত হয়েছে তা অনেকটাই আনমনে । লোকশিল্প ও ভারতীয় অভিজাত শিল্পকে আমি যেটুকু চিনেছি এবং মনে প্রাণে গ্রহণ করেছি তা আরও অনেক পরে ।  

আমরা লোক সংস্কৃতির অনেক কিছু হারিয়ে ফেলেছি । এখন বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে যাত্রাপালা হয় না। পুতুলনাচ হয় না । সরাচিত্র, রসেরহাঁড়ি, শীতলপাটি, নকশি কাঁথা, কত কিছুই তো আর হয় না । আমাদের যেভাবে চারুকলার শিক্ষা হয়েছে, তা মূলত পাশ্চাত্য শিক্ষা । কাজেই আমরা খুব স্বাভাবিকভাবেই অঙ্কন পদ্ধতি ও উপকরণে পাশ্চাত্য ধারাই গ্রহণ করেছি এবং সেভাবেই আমরা ছবি আঁকি ।আগেও বলেছি, বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমি ব্যক্তিগতভাবে বেছে নিয়েছি বাংলা ও বাঙালিকে । বিখ্যাত চিত্র সমালোচক ও বিশিষ্ট বন্ধু মঈন উদ্দিন খালেদ বলেন – ‘ আমার ছবিতে ত্রিধারা বহমান।’ হেবেল  সাহেব নাকি ভারতীয় শিল্পীদের পশ্চিমমুখী না-হয়ে নিজের মাটিতে দাঁড়াতে বলতেন । যার ফলশ্রুতিতে আমরা পেয়েছি অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নন্দলাল, রামকিঙ্কর, যামিনী রায়। পরবর্তীতে কামরুল হাসান, এস এম সুলতান প্রমুখ শিল্পীদের ।  আমি একটা সরকারি চাকরি পেলাম সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫-টা পর্যন্ত। লোকশিল্প সংগ্রহ এবং গবেষক  শিল্পী কামরুল হাসানের পরিচালনায় এবং তার অধীনে চাকরি  আমাকে খুব প্রভাবিত করে সারাদেশ ঘুরে ঘুরে লোকশিল্প দেখা, সংগ্রহ করা এবং এসব নিয়ে পরে গবেষণা করার সুযোগ পেতাম ।  শিল্পী কামরুল হাসান ছিলেন এর  প্রতিষ্ঠাতা এবং পরিচালকআমাদের এত প্রচেষ্টার পরও কিন্তু  আমাদের দেশে পশ্চিমী ছবির প্রভাব এড়ানো যায় নি । পাকিস্তান আমলে নাকি জোর করে শিল্পধারাকে পশ্চিমীকরণের একটা  সরকারি প্রচেষ্টা থাকতো । বাংলার আলো বাতাস, পরিবেশ, মানুষের পারস্পারিক সম্পর্ক ইত্যাদি গভীর মমতায় আমাকে টেনে ধরে। আমি নিশ্চল হয়ে বসে পড়ি  এইসব ধারায়  







প্রশ্ন ঃ আপনার  গ্রামীণ ছবিতে আপনার কল্পনায় আঁকা একটা নিজস্ব গ্রাম দেখতে পাই । সেই গ্রামীণ জীবনকেই আপনি সাজান আপনার মতো করে । এ-ব্যাপারে আমাদের কিছু বলুন

উত্তর ঃ  আমি আমার ফেলে আসা  সেইসব গ্রামকে ছবিতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করি  বারবারইএখনকার গ্রামে কোনো বাঁশের সাঁকো নাই । মাটির ঘর, লাঙল-জোয়াল, ঢেঁকি কিছুই নাই । বাধানো নদীগুলোকে আমার কেমন যেন বড় আকারের নর্দমার মতোই মনে হয় । সেখানে কোনো পাল তোলা নৌকা চলে না । সব যান্ত্রিক ইঞ্জিন । আমি আমার ফেলে আসা ছোটোবেলার গ্রামকে ভালবাসি, যেখানে দারিদ্র হয়ত ছিল । কিন্তু তার পাশাপাশি মমতাও ছিল । আমার ধারণা এখনকার গ্রামগুলি  আধুনিক হয়েছে হয়ত,  কিন্তু সেই সাথে তাদের জীবনে জটিলতাও বেড়েছে সমান তালেএখন গ্রামে কোনো নাটক, যাত্রা, থিয়েটার, কবিগান, গ্রামীণ মেলা কিছুই হয় না । কামার কুমোর তাঁতি এদের জীবন আজ বিপন্ন । শিল্প বিপ্লবের পরে সারা পৃথিবীতে যখন লোক সংস্কৃতির উপর বিপর্যয় নেমে এলো । তখন এক শ্রেণির সমাজবিজ্ঞানী চিন্তিত হয়ে পড়লেন তারা প্রস্তাব তুলেছিলেন গ্রামের লোকসংস্কৃতির পুনঃজাগরণের । কারণ লোকসংস্কৃতি গ্রামের প্রাণ এ-সংস্কৃতির অনুপস্থিত মানে তাদের মনের আকাশকে অবরুদ্ধ করে রাখা । এর পরিণতি ভয়াবহ ।

 






প্রশ্ন ঃ এবস্ট্রাক্ট বা  বিমূর্ত ফর্মের কাজ আপনার ক্ষেত্রে দেখা যায় না । এই ফর্ম নিয়ে আপনার ব্যক্তিগত ভাবনা জানতে চাই। বিচ্ছিন্নতা, ভঙ্গুর সময়কে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করতে চাইবেন, আপনার ছবিতে ।

উত্তর ঃ বিমূর্ত ছবি বলতে কিছু নাই । যাকে আমরা বিমূর্ত বলি, আমার কাছে তা ভাষার উপস্থাপনার  ভিন্নতা মাত্র । কে তার বক্তব্যকে কোন ভাষায় তুলে আনবে, সেটি শিল্পী নিজে নির্ণয় করবেন । অনেকে ঐতিহ্যকে আধুনিক ফর্মে তুলে আনার চেষ্টা করছেন । আমার কর্মধারা সব সময় যে এর বাইরে ছিল তাও নয় । আমি দেখেছি, ঐতিহ্যকে তথা বৃহত্তর জনগোষ্ঠির জীবনধারণ, জীবনাচার, তাদের সরলতা, মায়া, মমতা, প্রাণকে বিমূর্ততায় বা আধুনিকতায় ধরতে গেলে, কোথায় যেন সেটি তার  মূল জায়গা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় । এতোটা বিচ্ছিন্নতা আমি ইচ্ছে করেই চাই না ।  

 প্রশ্ন ঃ প্রচ্ছদ নিয়ে আপনার দীর্ঘযাত্রা রয়েছে । ইদানিং প্রচ্ছদ কম করছেন লক্ষ্য করছি । আপনি কি প্রচ্ছদ থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন ?

উত্তর ঃ শুধু ছবি আঁকা দিয়ে বেঁচে থাকার কথা আজ থেকে চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর আগে যুদ্ধ বিদ্ধস্ত দেশে কেউ ভাবতেই পারতো না ।  সকাল ১০ থেকে বিকেল ৫ টা পর্যন্ত কাজের পর যেটুকু সময় পেতাম, এখন প্রচুর লে-আউট করতাম । বুক-কাভারের অনুরোধ এলে তা থেকে কাজে লাগাতাম । দীর্ঘদিন ব্লক প্রিন্ট পদ্ধতি চলার পর হঠাৎ করে ঝড়ের গতিতে পাল্টে গেল সবতখন সারারাত জেগে কম্পিউটার ঘাটাঘাটি করে ডিজাইন  বদল করি, আর  নিজে নিজেই  অবাক  হইএভাবেই একসময় ভীষণ জনপ্রিয় গেলাম







প্রশ্ন ঃ অনেকে মনে করেন, প্রচ্ছদচিত্রের মাধ্যমেও শিল্পসত্ত্বা প্রকাশ করা যায় । আপনি তার সাথে একমত পোষণ করেন ?

উত্তর ঃ না, এক্ষেত্রে বিনয়ের সাথে বলবো,আমি এক মত নই । প্রচ্ছদ এক ধরণের চাহিদা ভিত্তিক কাজ। তাই এ-ধরণের কাজে এক ধরণের পরাধীনতা থেকেই যায় । যেমন – আকৃতির সীমাবদ্ধতা, রঙের সীমাবদ্ধতা, সামর্থের সীমাবদ্ধতা ইত্যাদি । মুদ্রণ যন্ত্রের পারিপাট্যতা তদুপুরি, যেহেতু এটি একটি ডিজাইন, এর গ্রহণযোগ্যতা থাকতে হয়  উদ্যোক্তার  উৎকর্ষতার বাণী, গ্রাহকের কাছে   সচতুরভাবে পৌঁছে দেয়াই এর প্রধান কাজ । দীর্ঘদিন প্রচ্ছদ-অলঙ্করণ শিল্পে কাজ করার পর, এক সময় সিদ্ধান্ত নিলাম, এখন ছবি আঁকাতেই মন দেবো । যা একান্তভাবে আমাকে প্রতিনিধিত্ব করবে । সেই ভাবনা থেকেই ছবিতে পুরোপুরি মন দিলাম ।    

প্রশ্ন ঃ একই বঙ্গ ইতিহাসের নির্মমতায় আমরা বিচ্ছিন্ন। ত্রিপুরার শিল্পীদের কাজ দেখা হয় ? কেমন লাগে আপনার ?

উত্তর ঃ দুঃখজনক হলেও ত্রিপুরার শিল্পীদের কাজ খুব একটা দেখার সুযোগ এখনও হয়ে ওঠেনি। ত্রিপুরার চারু-কলা বিভাগের অনেক নামডাক শুনেছি । বাংলাদেশের প্রথিতযশা শিল্পিরা বেশ কয়েকবার সেখানে আর্ট ক্যাম্পে অংশগ্রহণ ও প্রদর্শনী করেছেন । এই ধরণের শৈল্পিক আদান-প্রদান খুবই প্রয়োজন । ফেইসবুকের কল্যাণে কিছু কাজ দেখি ভাল লাগে ।

 

 







রবীন্দ্রনাথের শেষ বয়সের প্রিয়া এবং ছবির নান্দনিকতা**

 


** রবীন্দ্রনাথের শেষ বয়সের প্রিয়া এবং ছবির নান্দনিকতা**

                       তমালশেখর দে 





চিত্রকর রবীন্দ্রনাথ জীবনের শেষ সতেরোটি বছর এঁকে গেছেন প্রায় দুই-আড়াই হাজারের অধিক ছবি। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই উন্মাদনাকে তুলনা করেছেন আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতের সঙ্গে এবং নিজেকে তুলে ধরেছেন প্রতিটি ধারায় সক্রিয় মৌলিকতায়। তাঁর ছবির বিকাশ যেভাবে হল, তা যেমন অভূতপূর্ব তেমনি তাতে যে সকল বৈচিত্র্য দেখা গেল তা সাধারণ কল্পনার বাইরে। তাঁর সেই পান্ডুলিপির সংশোধন গুলি যেন ছিল অজস্র জলদারা এক ঘেরা দ্বীপের সারি, দ্বীপগুলি কখনও বিচ্ছিন্ন, কখনও সাঁকো দিয়ে, বা সরু জমির ফালি দিয়ে জোড়া। ওই জলধারার মধ্যে যেন কল্পিত নৌকো তারার মতো ঝলমলায়। তাঁর সেই সাদৃশ্যযুক্ত আঁকাগুলি কখনও এক- একটা অতিকায় কল্পসম্ভব  বীভৎস জন্তুর মতো ঝলসে ওঠে, কখনও বা তাতে ঘনবনের আভাস আসে। মনে হয় যে এই সকল জীবজন্তু কত দীর্ঘদিন ধরে এই ধরণীতে রক্তমাংসের  কায়ায় জন্ম নেবার জন্যে কোনও কবির কল্পনার প্রতীক্ষায় ছিল। 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা "নারীমুখ" আমাকে খুব টানে। সেই নারীমুখ আপনার চোখে কীভাবে ধরা দেয়, জানতে চেয়েছিলাম রাজ্যের কবি-চিত্রকর মিলনকান্তি দত্তের কাছে। তিনি বলেন -- " আমার ধারণা, প্রথাসিদ্ধ রংরেখার চিত্রকে কবি ভাঙছেন সুন্দরপানা মুখকেও বিকৃত করে দিচ্ছেন, এ ভাবনার অন্য ব্যাখ্যা আছে। তবু বলব, কবির আঁকা কিছু নারী মুখ, নারী শরীর রহস্যরেখার মায়ায় অবগুন্ঠনবতী। আবার এক বেপরোয়া ভঙ্গির উদ্ধত চিত্রণেও যেন তারা প্রথা ভাঙতে চায়। পুরুষ প্রাধান্যের সামাজিক অবস্থানে নারী আজও নির্যাতিতা। এর সামাজিক- রাজনৈতিক জটিল কিছু কারণ আছে, সবটাই জৈবিক নয় হয়তো। কিন্তু সমাজে তো প্রতিবাদের কণ্ঠস্বরও আজ তুমুল, বিশেষ করে নারী সমাজে এ নারীরা যেন রবীন্দ্রচরিত্রে নারীদের মতোই, কী বলব, বেপরোয়া, সাহসিনী!" রবি ঠাকুরের ছবির স্টাইল ভারতীয় সব পদ্ধতির ছবির থেকে আলাদা। এটা তো জানাই আমাদের সকলের যে,আমাদের দেশে তার প্রথমে গ্রহণ করেননি এখানকার রশিকরা। ওকাম্পোর আয়োজনে প্রথম প্যারিসে রবি ঠাকুরের ছবির প্রদর্শনী হয়। এবং ভারতীয় এক্সপ্রেশনিস্ট শিল্পী হিসাবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পান। তাঁর অনেক দ্বিমাত্রিক ছবি তাঁর আকার গুণে ত্রিমাত্রিক রূপ পেয়েছে। রবীন্দ্রনাথের ছবি তাই দেখতে হয় গভীরভাবে। 

আমাদের রাজ্যের কবি-উপন্যাসিক- চিত্রকর অশোক দেবের কাছে জানতে চেয়েছিলাম -- " চিত্রকর রবীন্দ্রনাথকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ণ করে থাকেন? " উত্তরে একটু সময় নিয়ে তার স্বভাবসিদ্ধভঙ্গিতে বললেন --" মন। ইন্দ্রিয়কে বাজার করতে পাঠায় সে,  তারপর রান্না করে নিজেকেই খেতে দেয়। প্রকৃতি। নানা নিসর্গের বাজার খুলে বসে আছেন। দৃশ্যনিসর্গ, শ্রব্যনিসর্গ, ভাবনিসর্গ এমনকি অধ্যাত্মনিসর্গ। কবির মনের সংসার কাউকে বাদ রাখতে চায় না। উপকরণ সীমিত, শব্দ। সব ধরা যায় না। কলম রেখে, কোন কবি তুলি কিংবা ছেনি তুলে নেননি? রবিঠাকুরের ছবিতে, এমনকি শব্দের সাক্ষাৎও মেলে। ছবি আঁকতে শুরু করলে  নিকটবাসী শিল্পীরা তাঁকে কিছুটা ড্রয়িং শিখিয়ে দিতে চেষ্টা করেছিলেন। তিনি, স্বাভাবিক, সে গ্রহণ করেননি। কারণ, তিনি জানতেন, তিনি মনের পাকঘরে বসেছেন গৃহিণীপনা করতে, মিস্ত্রিগিরি করতে নয়।  সে কারণে, তাঁর ছবিতে মনের স্বাভাবিক উদ্ভাস দেখা যায়। সম্ভবত সামান্য বর্ণান্ধ ছিলেন,  রঙের ব্যবহারে তাঁর সুখ্যাত রুচিবোধ টাল খেয়েছে কোথাও। অথচ, কাগজের সাদা ছেড়ে দিয়ে কী অবলীলায় প্রায় মহাজাগতিক উদ্ভাস এনেছেন। নারীদেহ, চোখ চোখের দৃষ্টি সবেতেই একপ্রকার দূরগামিতা দেখা যায়। কবি মাত্রেই যে সুদূরের পিয়াসী। পাণ্ডুলিপির সঙ্গে যে বিচিত্র আঁকিবুঁকি করতেন, সেসবের মুক্তি রবিঠাকুরের রঙে এবং কিছু কিছু রেখায়। সুরে, গীতিতে, নৃত্যে এবং রচনায় যাদের পাননি, পাওয়া সম্ভব ছিল না, সে তিনি রংরেখায় পেতে চেয়েছেন, আমরা পেয়েছি এক যাদুজগতের সন্ধান।" 

রবীন্দ্রনাথ কবিতা রচনা সময় এক ধরনের অনুশাসন ও সংযমের মধ্যে নিজেকে বেঁধে রাখতেন,ছবি আঁকার সময় তিনি ততটাই মুক্ত করে স্বাচ্ছন্দ্যের শেষ সীমা পর্যন্ত অনায়াসে বিচরণ করে আসতেন। সত্যি অর্থেই তার এই কাজে না ছিল কোনো কায়দা, না কোনো নিয়ম। কেবল ছিল ছন্দ জগতে রেখার সঙ্গে লয়ের নিত্য। 

ত্রিপুরার সরকারি চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এবং প্রখ্যাত চিত্রকর অভিজিৎ ভট্টাচার্য-- "আমার চোখে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা ছবি" প্রসঙ্গে বলেন -- "'যেখানেই আলো-আঁধারি, আবছায়া সেখানেই রহস্য! আকুল জিজ্ঞাসা! কল্পনার পাখিরা সেখানেই ডানা মেলে!রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবির আলো-আঁধারি যেন রহস্যময়তার এক গহীন অরণ্য। আধো অন্ধকার পরিসরে কখনও স্থবির, কখনও চলমান ছায়া ছায়া মানুষ, গাছ, পশু, পাখিসহ বিচিত্র সব অবয়ব যেন রহস্যময়তাকে আরো গভীর থেকে গভীরতর করে তোলে।যে মানুষটি জীবনের সিংহ ভাগ সময় লেখায় রূপ নির্মাণ করলেন তাঁর নিশ্চয়ই জীবনের একটি পর্যায়ে এসে মনে হয়েছে, যে অরূপ রূপের নির্মাণ তিনি করতে চাইছেন সেই কাঙ্খিত রূপ শুধু শব্দের বুননে সার্থক ভাবে তৈরী হচ্ছে না। আর তখনই রং রেখার আলো-আঁধারি ও রহস্যময়তার বিস্তারে তাঁর হাত থেকে বেরিয়ে এসেছে একের পর এক অরূপ রূপের অপরূপ সৃষ্টি! তাঁর ছবি। রঙে, রেখায়, আকৃতিতে,সংরচনে অনন্য, অনবদ্য প্রতিটি নির্মাণ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবিতে রঙ-রেখার এই রহস্যময় রূপ আমাকে বারে বারে সম্মোহিত করে, আচ্ছন্ন করে, তীব্র ভাবে আকর্ষিত করে....। তাঁর একই ছবি যত বার দেখি, প্রতিবারই সে-যেন নতুন রূপে আমার কাছে ধরা দেয়। এ যেন অপরূপকে খোঁজার এক অনন্ত আধার..."। রবীন্দ্রনাথের ছবির রেখার প্রসঙ্গে রাজ্যের আরেক বিখ্যাত চিত্রশিল্পী পার্থপ্রতীম গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর লিখিত প্রতিক্রিয়ায় মুম্বাই থেকে জানান --" পড়েছি আজ রেখার মায়ায়। রেখার মায়ায় পড়েই রবি ঠাকুর ছবিতে পৌঁছে ছিলেন।  শোনা যায়, একাকিত্ব থেকে মুক্তি পেতেই নাকি তিনি হাতে তুলি তুলে নিয়েছিলেন। ইউরোপের ছবির সঙ্গে ততদিনে তার পরিচয় হয়ে গেছে। অবনীন্দ্রনাথ, গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাজ দেখে চলে ছিলেন। কিন্তু অবাক করা কথা, নিজে যখন ছবি আঁকলেন,  তখন তাদের  কোনো প্রভাব তাঁর ছবিতে পড়েনি। এ-এক অন্য ছবি।ছবি যেন কিছু বলতে চাইছে। কিন্তু কোথাও একটা অদ্ভুত আদিমতা ছবিকে ঘিরে ছিল।রহস্যের প্রাচীর ভেদ করে যারা তার ছবি বুঝতে পারে, মননে মেধায় পারে, তারা তার প্রকৃত স্বাদ পায় ধন্য হয়। " 

প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী যামিনী রায়ের একটা লেখায় পড়েছিলাম, তিনি লিখেছেন --  "রবীন্দ্রনাথের আঁকা কোনো ব্যক্তির ছবি দেখলে মনে হয় না যে তারা নিজেদের মধ্যে গুটিয়ে যাচ্ছে বা বাতাসের ধাক্কায় ধাক্কা খাচ্ছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি, পরিবর্তে, তাদের ভর এবং একটি মেরুদণ্ড রয়েছে। এই হাড়ের কাঠামো এবং তাদের নির্মাণের ছন্দের কারণে রবীন্দ্রনাথের চিত্রগুলি শক্তি অর্জন করে। আমার মতে, গত দুইশত বছর ধরে, রাজপুতদের সময় থেকে, আমাদের ছবি নির্মাণের ঐতিহ্যে একটা অভাব ক্রমাগতভাবে বাড়তে থাকে এবং রবীন্দ্রনাথ এর বিরোধিতা করেন; তিনি তার চিত্রগুলির জন্য একটি শক্তিশালী মেরুদণ্ডের সন্ধান করেছিলেন।"

 ত্রিপুরার সরকারি চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা এবং প্রখ্যাত চিত্রকর মিতালী গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে রবীন্দ্রনাথের  ছবিতে নারী চরিত্রের উপস্থিতি এবং তার রহস্য নিয়ে তাঁর প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে জানান-- "রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবির নারীরা অদ্ভুত রহস্যময়ী। আধো অন্ধকারের আড়ালে থেকেও সম্মোহিত করে তীব্র ভাবে। রবীন্দ্রনাথ এক প্রখর ব্যক্তিত্ব। স্বাভাবিক ভাবেই তাকে প্রভাবিত করতে পারেন অন্য কোন প্রখরতা। সেজন্যই বোধহয় আমরা দেখি যে-সব নারীচরিত্র তার কাছাকাছি আসতে পেরেছেন তারা সবাই স্বতন্ত্র অস্তিত্বের অধিকারিনী। সেই সব নারীদের বা তার কল্পনার নারীদের যে ছবি তিনি এঁকেছেন স্বাভাবিক ভাবেই তাদের উপস্থিতি গভীর এবং প্রখর। অন্ধকারের মধ্যে থেকে ফুটে ওঠা কোনো মুখ, যা কখনও দেখা যায় বা কখনও সম্পূর্ণ দেখাও যায় না, কখনও কোনো অবয়ব যেন আপন খেয়ালে নৃত্যরতা সবই যেন কেমন সম্মোহিত করে।তিনি এঁকেছেন বিমূর্ত করে কিন্তু তারা সবাই চেয়ে থাকে, কচ্চিৎ স্মিত হাসে, কিছু বলে উঠতে চায়। কখনও কয়েকজন একসাথে বসে যেন পরস্পর ছুঁয়ে থাকে একই সত্তার বিভিন্ন রূপের মত। কিন্তু আশ্চর্যভাবে তারা সবাই খুব বিমর্ষ। এত প্রখর উপস্থিতি সত্ত্বেও।"

 "

     রাজ্যের আরেক বিখ্যাত চিত্রশিল্পী জয়ন্ত ভট্টাচার্যের কাছে জানতে চেয়েছিলাম --  "রবীন্দ্রনাথের ছবির কোন বৈশিষ্ট্যটা এখনও আপনাকে ভাবায়?  ভাবতে বাধ্য করে?" উত্তরে বললেন --"তুমি কি কেবলি ছবি /শুধু পটে লিখা? ঐ যে সুদুর নীহারিকায় যারা আকাশের নীড় করে আছে ভীড়"-- রবীন্দ্রনাথের ছবি  কোনো পটে বাঁধা ছিল না। রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানে বোধহয় অনেক বেশি মানুষের অনুভূতিকে ধরতে  পেরেছেন।   সেই যে পট ছেড়ে সুদূর নীহারিকা য় তাঁর  ভাবনা সঞ্চালন করল, এখানেই তো চলে আসে রবীন্দ্রনাথের সেই  বিশাল এবং সেই ব্যাপককে অন্তরে উপলব্ধি করার তাড়না। , চোখের আলোকে চোখের বাইরেই দেখতে হবে ,এগুলো রবীন্দ্রনাথ কাব্যে বলেছেন।  সঙ্গীতেও বলেছেন।  বলেছেন ছবির ক্ষেত্রেও।  আমরা দেখতে পাই বর্ণের সাবলীল এবং বলিষ্ঠ উপস্থাপনা। তাঁর  আঁকা প্রায় সমস্ত ছবিতে আসে এক পড়ন্ত বেলার আলো। রবীন্দ্রনাথের ছবির সরলীকরণ এবং স্পেসের যে একটা খেলা তা আমাকে অনুপ্রাণিত করে এখনও।আরেকটা কথা  না- বললেই নয়,  রবীন্দ্রনাথ যখন একেবারে উত্তর আধুনিক বা আধুনিক যাই বলি এই প্যাটার্নের ছবি আঁকা শুরু করলেন তখন কিন্তু ইউরোপীয় দেশগুলোতে কারা ছবি আঁকছিল  একটু ভেবে দেখলে , এটা পরিষ্কারভাবে বলা যায় ভারতবর্ষের ওই সময়ের যে দীর্ঘদিন যাবত চলে আসা চিত্রকলার একঘেঁয়ে অধ্যায় চলছিল তা ভেঙে বেরিয়ে আসার প্রথম প্রচেষ্টা রবীন্দ্রনাথ নিজেই দেখিয়েছিলেন। হয়ত তাই রবীন্দ্রনাথ  রামকিঙ্কর বেজ- এর প্রথা ভাঙাকে সম্পূর্ণ সমর্থন করে কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন।" 

রবীন্দ্রনাথের ছবিকে নিয়ে তরুণ প্রজন্ম কী ভাবছে, এটা জানার ইচ্ছে থেকে রাজ্যের উজ্জ্বল চিত্রশিল্পী পুষ্পল দেবের কাছে রবীন্দ্রনাথের ছবির আকর্ষণের প্রধান বিষয় জানতে চাইলে, তিনি জানান -- " ছবিতে কবির গাঢ় রঙের ব্যবহার আমাকে অবাক করে। বিশেষ করে কালো রঙের বলিষ্ঠ ব্যবহার। " একই কথার আভাস পাই তরুণ চিত্রশিল্পী জয়ন্ত দেব-এর  মতামত থেকে।  তিনি বলেন -- "আলো আঁধারের মেশানো একটা মনোক্রমটিক ব্যবহার, গাঢ় কালো রঙের পাশাপাশি উজ্জ্বল লাল,কমলা রঙের কনট্রাস্ট, আবার কোথাও কোথাও কনট্রাস্টটা মনেই হচ্ছে না, মনে হচ্ছে কালো সাথে মিশে একটা হারমোনি সৃষ্টি করেছে, যেটা ঐ-সময়ের অন্যান্য শিল্পীর কাছের সাথে তুলনা করলে, অবাকই হতে হয়। তিনি তাঁর আঁকায় একটা নিজস্ব ঘোরানা তৈরি করতে পেরেছিলেন। "  আবার তরুণ চিত্র শিল্পী উমা মজুমদার বলেন-- " তাঁর ছবিতে  সরাসরি রঙ চাপিয়ে কাজ করার বিষয়টা আমাকে খুব ভাবায়। তাছাড়া তাঁর লাইনিং এবং চিত্রপটে স্পেসের ব্যবহার আমাকে বরাবরই মুগ্ধ করেছে। । "

উপরোক্ত আলোচনা থেকে আমাদের একথা মনে করা ঠিক হবে না যে রবীন্দ্রনাথের জীবনের শেষ ১০ ১৫ বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি তাঁর চিত্রশিল্প। আমরা দেখতে পাই সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথের বেশ কয়েকটি শ্রেষ্ঠ রচনা এই পর্যায়েই সৃষ্টি হয়, যেমন -- পূরবী, মহুয়া, আরোগ্য, শেষলেখা প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থের মধ্যে তার গভীর জীবনবোধ লক্ষ্য করা যায়। "সভ্যতার সংকট প্রবন্ধটিও  তিনি এই সময়ে লেখেন। রবীন্দ্রনাথকে সমর্থ ভাবে বুঝতে হলে, তার রচনাশৈলীর পাশাপাশি,  চিত্রের আনন্দ লাভ করতে হলে, যা সর্বাগ্রে প্রয়োজন তা হলো --তাকে পরিপূর্ণভাবে জানা, তার সমগ্রতাকে যতদূর সম্ভব বুঝার চেষ্টা করা। একমাত্র তাহলেই তার সাহিত্যদর্শন, জীবনদর্শনের পাশাপাশি তাঁর  চিত্রশিল্পের দর্শনকেও আমরা ভালোভাবে বুঝতে পারবো।  


চিত্রকর পার্থপ্রতীম গাঙ্গুলি

 




ত্রিপুরার চিত্রজগতকে বর্ণময় করে তুলেছেন যে ক’জন খ্যাতনামা শিল্পী, তাদের মধ্যে  পার্থপ্রতীম গাঙ্গুলি অন্যতম।  তাঁর সাথে একান্ত আলোচনায় তমালশেখর দে।  

 

প্রশ্ন ঃ আপনার ছবিতে দুটো জিনিস বিশেষভাবে চোখে পড়ে, প্রথমত, বিষয়কে  উপর থেকে থেকে দেখার প্রবণতা এবং দ্বিতীয়তঃ কালো রঙয়ের ব্যবহারের প্রাধান্য   এই নিয়ে আপনার দৃষ্টিকোণ জানতে চাইছি?

 

উত্তর ঃ  আসলে কী জানো, সবাই চায় ছবি আঁকতে আঁকতে তার একটা নিজস্বতা গড়ে উঠুক। আমিও সেই খোঁজেই এসেছিলাম। বহুবার আকাশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আমি আমার ছবিতে ধরার চেষ্টা করেছি ২০০৭ সাল থেকে। আকাশ থেকে শহরগুলো দেখতে দেখতে মনে হয়েছে, ওরা বড় নিঃস্ব, ওরা বড় দুখীপাখি গাছ কেউই তাকে ভালবাসে না। তাই আমি আমার আঁকা শহরে আমাদের বাংলার, উত্তরপূর্বের  নানা ফোক-মোটিফ দিয়ে তাকে সাজিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি। শহরের বাহিরে দিয়ে বয়ে গেছে নদী, চরাচর জুড়ে কিছু বর্ণের ছোটাছুটি। এই কাজগুলো মিশ্র মাধ্যমে ক্যানভাসের উপর করা। এভাবেই আমি আমার অনুভূতি ঐসব কাজে প্রকাশ করার চেষ্টা করেছি।

 



প্রশ্ন ঃ
  সাদা-কালোর কাজ নিয়ে বললেন না কিছু ? বিশেষ করে কালো রঙ ...

উত্তর ঃ হ্যাঁ, তার পরবর্তীকালে সাদা-কালোর কাজ আমাকে খুব টানে। কালোতে  কাজ করার প্রবণতা আমাআর অনেক দিনের। তার প্রতি একটা আলাদা ভালবাসা রয়েছে আমার।  ৯০’এর দশকে করেছিলাম বৈনারী সিরিজ। তারপরও প্রচুর কাজ করেছি কালোতে।   

 

 প্রশ্ন ঃ ত্রিপুরাতে ছবির বাজার নেই। এই দিকটাকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করতে চাইবেন? 

 উত্তর ঃ  বাজার না-থাকার কারণে, আমরা শিল্পীরা অদ্ভুতরকম একটা  স্বাধীনতা ভোগ করি। আমাদের বিক্রির কোন চিন্তা করতে হয় না। সুতরাং আমাদের মনে যা আসে, আমরা আপন মনে তাই এঁকে চলি। আঁকার স্বাধীনতা আমরা চুটিয়ে উপভোগ করি। তুলনামূলক বড় বড় শহরের শিল্পীরা সেই স্বাধীনতা উপভোগ করতে পারে না। তাদের অনেক সময়ই ছবি আঁকতে হয় গ্যালারীর চাহিদা অনুযায়ী। স্বাভাবিকভাবেই  গ্যালারী বাজারের চাহিদা অনুযায়ী চলে। সেখানে শিল্পীদের যা ইচ্ছে আঁকার স্বাধীনতা নেই আবার এঁকেও যে খুব লাভবান হবেন, তারও কোন নিশ্চয়তা নেই। কেননা, তারা আপনাকে ছবি বিক্রির সঠিক বলবে না। এবং দেবেও না। রয়্যালিটিরও কোন ব্যবস্থা নেই। ফলত, সেখানেও শিল্পীরা ভাল অবস্থানে নেই। উল্টো দিনে দিনে  শিল্পীর শিল্প এবং মন দুটোই দিনে দিনে সংকোচিত হয়ে পড়ে সেই নিরিখে আমাদের স্বাধীনতা এবং সম্ভাবনা অনেক বেশি। এবং উপভোগ্য।   

 




প্রশ্ন ঃ আপনি যখন ছবি নিয়ে কাজ করতে এলেন, তখন আপনার প্রেরণা, ইন্সপিরেশন কি ছিল? কাদের দেখে আপনার খুব উৎসাহ বোধ করতেন ? সেই প্রেক্ষাপট নিয়ে কিছু বলুন আমাদের ?

 উত্তর ঃ  আমরা যে-সময় ছবি আঁকা শুরু করেছি, মানে  সত্তর দশক আমাদের খুব ইন্সপায়ার করেছে। শুধু আমাদের আগরতলার শিল্পীদের কাজ তা না, সত্তর দশকের নকশাল আন্দোলন এটা আমাদের ভীষণভাবে ভিতর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। নাড়িয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশ যুদ্ধ। ক্রমাগত বিপন্ন, নিঃস্ব রিফিউজি মানুষের ঢল, তাদের হতাশ জর্জরিত সর্বহারা চেহারা। এই সমস্ত বিষয়গুলো  আমাকে বা আমাদেরকে ঝাঁজিয়ে তুলেছিল। সে সময়টা গোটা বিশ্বকেই নাড়িয়ে দিয়েছিল, সাথে আমাকেও। সেই সময়  আমরা সাহিত্য চারুকলা মেলা করেছি। লিটিল ম্যাগাজিন  করেছি। নিজের মতো ছবি এঁকেছি। তখনও আমি আর্ট কলেজে ভর্তি হইনি। আমাকে ইন্সপায়ার করেছেন পার্থদা, চিন্ময়দাতারা তখন তুলসীবতী স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। এবং সেই সময়ে আমি ‘রূপম নাট্যগোষ্ঠী’র  সাথে আমি জড়িয়ে হয়ে পড়েছিলাম আমি, নিলিপ, অসীম, রাতুল এরা সবাই। এই নাটক করতে গিয়ে অদ্ভুত এক শৃঙ্খলতার ভিতর দিয়ে যেতে যেতে আমাদের জীবনের ভিতরেও একসময় তা রূপান্তরিত হয়ে যায়। যা আমাকে খুব সচেতন করে তুলেছিল। আমাদের ট্যোটাল ভাবনাচিন্তাকে একটা স্ট্রিমলাইন ধরিয়ে দিয়েছিল। তারপর চিত্রকর সলিলকৃষ্ণ দেববর্মণের কাছে আমার শিল্পের হাতেখড়ি। ছবি আঁকা শুরু করি। আবার সরস্বতী পুজোয় নিলিপ মানে  নিলিপ পোদ্দার  খুব সুন্দর ডেকোরেশন করতো। এটাও আমাকে খুব ইন্সপায়ার করেআবার সেই সময়ে কলকাতার আর্টিস্ট অসিত পাল নামের একজনের সাথে আমার পরিচয় হয়। তাঁর সাথে কাজও করেছি এবং ব্যক্তিগতভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছি। এইভাবেই বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে আর্টের দিকে আকৃষ্ট হই এবং তা নিয়ে পড়াশোনা করলাম। আমার বড়ভাই মানস গাঙ্গুলি আমাকে কলকাতা নিয়ে গিয়ে উৎসাহের সাথে আর্ট কলেজে ভর্তি করান। সেটাও আমাকে খুব এগিয়ে নিয়ে যায়।

 





প্রশ্ন ঃ তার মানে একটা শখ থেকেই আর্টের জগতে আসা –

উত্তর ঃ  আমি শুধু শখ বলতে চাইব না। বরং বলবো একটা প্যাশন থেকেই আমার আর্টের জগতে আসা।

 প্রশ্ন ঃ সেই সময়ের অভিজ্ঞতা, কিছু স্মৃতি নিয়ে আমাদের বলুন ?

উত্তর ঃ আমি জানি না, ডাক্তারি-ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গেলে কতটুকু পরিশ্রম করতে লাগে।কিন্তু আর্ট কলেজে পড়ার যে পরিশ্রম, তা অনেকেই কল্পনা করতে পারবে না।  কোন ছুটির দিন নেই। নিজের তাগিদেই পরিশ্রম করতে হয়।  কলকাতার স্টেশনে দেখবে ছেলে-মেয়েরা স্কেচ করছে। আমি হাওড়া স্টেশনে সারারাত কাজ করে, ভোরের বেলা কখন যে ঘুমে ঢলে পড়েছি, বলতেই পারি না। ভোরবেলা লোকের ধাক্কাধাক্কিতে ঘুম ভাঙেএরপর কলেজে যেতাম। এমন যে কতদিন হয়েছে, তার ইয়ত্তা নাই! এভাবেই নিরন্তর কাজ করে যেতে হয়। কাজের পর্যা লোচনা করা। আবার কাজে লেগে পড়া।    

 






প্রশ্ন ঃ   আপনার ছবি   দেখতে দেখতে কেউ বলেন  ‘তার ছবি ব কিউবিক, কেউ বলেন তার ছবি কিছুটা মনড্রিয়ান, কিছুটা ক্যানডিনেস্কির জ্যামিতির ন্যাস’আমি জানতে চাইছি, আপনি আপনার ছবিকে কীভাবে দেখতে আগ্রহী ?  

উত্তর ঃ  আসলে মূল কথা হচ্ছে, দর্শক কীভাবে ছবিটা দেখছে! একটু পেছন ফিরে যাই। ইতালির ভেনিসে প্রতি দুই বছরে চিত্র শিল্পের অলিম্পিক হয়। যেটা ভেনিস বিনালে হিসেবেখ্যাত। ২০১১ সাআলে ভারত প্রথমবারের মতো অংশগ্রহণ করে। সেই সুবাদে মিনিস্ট্রি অফ কালচার থেকে যে দল পাঠানো হয়, সে-দলে আমিও ছিলাম। অসাধারণ অভিজ্ঞতা। ৮০টি রাষ্ট্রের প্রদর্শনী হচ্ছে সারা শহর জুড়ে।  লোকজন নৌকা করে  শহর  ঘুরছে আর প্রদর্শনী দেখছে। কত রঙের  বাহারি কাজ। সবটুকু দেখেশুনে এটাই বুঝলাম “তোমার ইচ্ছা মতো তুমি যা কিছু আঁকতে পারো” শিল্পের কোন গ্রামার নেই। ছবিতে রস থাকলেই হল! অবশ্যই রসিক দর্শকের জন্যই শিল্পীর ছবি আঁকা।

 




 

প্রশ্ন ঃ  ত্রিপুরার তরুণ প্রজন্মের কাজ কি দেখছেন ? কেমন লাগছে তাদের কাজ? আপনি কতটা প্রত্যাশী -

 উত্তর ঃ  আমি আশাবাদি। আলাদা করে নাম না-নিয়েই বলছি অনেকেই খুব ভাল কাজ করছে। ছবি তখনই ভাল হবে, যখন চিত্রী হবেন মননশীল। তাকে তার সমাজ সম্পর্কে জানতে  হবে। মানুষের সাথে মিশতে হবে। একটা মানুষের সাথে কথা বলা মানে তো একটা বই পড়া। এর কোনও  বিকল্প নেই। ছবি আঁকতে গেলে একজন আর্টিস্টকে তার চারপাশের জনজীবন, রাজনীতি, প্রকৃতিকে জানতে হবে নিবিড়ভাবে। এই জানাটা আমি কীভাবে জানবো ? আমার অভিজ্ঞতা দিয়ে জানতে হবে। পড়াশোনা করে জানতে হবে। ছবির শ্রমিক থেকে তাকে শিল্পী হয়ে উঠতে হবে। এখানেই বিকাশ নিহিত।

 



অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎

  'অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎ ‎সত্তর দশকের উন্মাদনায় এক ভিন্ন উচ্চারণ-ভঙ্গ...