ত্রিপুরার
চিত্রজগতকে বর্ণময় করে তুলেছেন যে ক’জন খ্যাতনামা শিল্পী, তাদের মধ্যে পার্থপ্রতীম গাঙ্গুলি
অন্যতম। তাঁর সাথে একান্ত আলোচনায়
তমালশেখর দে।
প্রশ্ন
ঃ আপনার ছবিতে দুটো জিনিস বিশেষভাবে চোখে পড়ে, প্রথমত, বিষয়কে উপর থেকে থেকে দেখার প্রবণতা এবং দ্বিতীয়তঃ কালো
রঙয়ের ব্যবহারের প্রাধান্য । এই নিয়ে আপনার দৃষ্টিকোণ জানতে
চাইছি?
উত্তর ঃ আসলে কী জানো, সবাই চায় ছবি আঁকতে আঁকতে তার
একটা নিজস্বতা গড়ে উঠুক। আমিও সেই খোঁজেই এসেছিলাম। বহুবার আকাশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা
আমি আমার ছবিতে ধরার চেষ্টা করেছি ২০০৭ সাল থেকে। আকাশ থেকে শহরগুলো দেখতে দেখতে মনে
হয়েছে, ওরা বড় নিঃস্ব, ওরা বড় দুখী। পাখি গাছ কেউই তাকে ভালবাসে না। তাই আমি আমার আঁকা শহরে আমাদের বাংলার, উত্তরপূর্বের নানা ফোক-মোটিফ দিয়ে তাকে সাজিয়ে তোলার চেষ্টা
করেছি। শহরের বাহিরে দিয়ে বয়ে গেছে নদী, চরাচর জুড়ে কিছু বর্ণের ছোটাছুটি। এই
কাজগুলো মিশ্র মাধ্যমে ক্যানভাসের উপর করা। এভাবেই আমি আমার অনুভূতি ঐসব কাজে প্রকাশ করার
চেষ্টা করেছি।
প্রশ্ন ঃ সাদা-কালোর কাজ নিয়ে বললেন না কিছু ? বিশেষ করে
কালো রঙ ...
উত্তর ঃ হ্যাঁ, তার পরবর্তীকালে সাদা-কালোর কাজ আমাকে খুব টানে। কালোতে কাজ করার প্রবণতা আমাআর অনেক দিনের। তার প্রতি
একটা আলাদা ভালবাসা রয়েছে আমার। ৯০’এর
দশকে করেছিলাম বৈনারী সিরিজ। তারপরও প্রচুর কাজ করেছি কালোতে।
প্রশ্ন
ঃ ত্রিপুরাতে ছবির বাজার নেই। এই দিকটাকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করতে চাইবেন?
উত্তর ঃ বাজার না-থাকার কারণে, আমরা শিল্পীরা অদ্ভুতরকম
একটা স্বাধীনতা ভোগ করি। আমাদের বিক্রির
কোন চিন্তা করতে হয় না। সুতরাং আমাদের মনে যা আসে, আমরা আপন মনে তাই এঁকে চলি।
আঁকার স্বাধীনতা আমরা চুটিয়ে উপভোগ করি। তুলনামূলক বড় বড় শহরের শিল্পীরা সেই
স্বাধীনতা উপভোগ করতে পারে না। তাদের অনেক সময়ই ছবি আঁকতে হয় গ্যালারীর চাহিদা
অনুযায়ী। স্বাভাবিকভাবেই গ্যালারী বাজারের
চাহিদা অনুযায়ী চলে। সেখানে শিল্পীদের যা ইচ্ছে আঁকার স্বাধীনতা নেই। আবার এঁকেও যে খুব লাভবান হবেন, তারও কোন
নিশ্চয়তা নেই। কেননা, তারা আপনাকে ছবি বিক্রির সঠিক বলবে না। এবং দেবেও না।
রয়্যালিটিরও কোন ব্যবস্থা নেই। ফলত, সেখানেও শিল্পীরা ভাল অবস্থানে নেই। উল্টো
দিনে দিনে শিল্পীর শিল্প এবং মন দুটোই
দিনে দিনে সংকোচিত হয়ে পড়ে। সেই নিরিখে আমাদের স্বাধীনতা এবং সম্ভাবনা অনেক
বেশি। এবং উপভোগ্য।
প্রশ্ন
ঃ আপনি যখন ছবি নিয়ে কাজ করতে এলেন, তখন আপনার প্রেরণা, ইন্সপিরেশন কি ছিল? কাদের
দেখে আপনার খুব উৎসাহ বোধ করতেন ? সেই প্রেক্ষাপট নিয়ে কিছু বলুন আমাদের ?
উত্তর ঃ আমরা যে-সময় ছবি আঁকা শুরু করেছি, মানে সত্তর দশক আমাদের খুব ইন্সপায়ার করেছে। শুধু
আমাদের আগরতলার শিল্পীদের কাজ তা না, সত্তর দশকের নকশাল আন্দোলন এটা আমাদের
ভীষণভাবে ভিতর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। নাড়িয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশ যুদ্ধ। ক্রমাগত
বিপন্ন, নিঃস্ব রিফিউজি মানুষের ঢল, তাদের হতাশ জর্জরিত সর্বহারা চেহারা। এই সমস্ত
বিষয়গুলো আমাকে বা আমাদেরকে ঝাঁজিয়ে
তুলেছিল। সে সময়টা গোটা বিশ্বকেই নাড়িয়ে দিয়েছিল, সাথে আমাকেও। সেই সময় আমরা সাহিত্য চারুকলা মেলা করেছি। লিটিল
ম্যাগাজিন করেছি। নিজের মতো ছবি এঁকেছি।
তখনও আমি আর্ট কলেজে ভর্তি হইনি। আমাকে ইন্সপায়ার করেছেন পার্থদা, চিন্ময়দা। তারা তখন তুলসীবতী স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। এবং সেই সময়ে আমি
‘রূপম নাট্যগোষ্ঠী’র সাথে আমি জড়িয়ে হয়ে
পড়েছিলাম আমি, নিলিপ, অসীম, রাতুল এরা সবাই। এই নাটক করতে গিয়ে অদ্ভুত এক
শৃঙ্খলতার ভিতর দিয়ে যেতে যেতে আমাদের জীবনের ভিতরেও একসময় তা রূপান্তরিত হয়ে যায়।
যা আমাকে খুব সচেতন করে তুলেছিল। আমাদের ট্যোটাল ভাবনাচিন্তাকে একটা স্ট্রিমলাইন
ধরিয়ে দিয়েছিল। তারপর চিত্রকর সলিলকৃষ্ণ দেববর্মণের কাছে আমার শিল্পের হাতেখড়ি। ছবি আঁকা শুরু
করি। আবার সরস্বতী পুজোয় নিলিপ মানে নিলিপ
পোদ্দার খুব সুন্দর ডেকোরেশন করতো। এটাও
আমাকে খুব ইন্সপায়ার করে। আবার সেই সময়ে
কলকাতার আর্টিস্ট অসিত পাল নামের একজনের সাথে আমার পরিচয় হয়। তাঁর সাথে কাজও করেছি
এবং ব্যক্তিগতভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছি। এইভাবেই বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে আর্টের দিকে আকৃষ্ট হই এবং তা নিয়ে পড়াশোনা
করলাম। আমার বড়ভাই মানস গাঙ্গুলি আমাকে কলকাতা নিয়ে গিয়ে উৎসাহের সাথে আর্ট কলেজে
ভর্তি করান। সেটাও আমাকে খুব এগিয়ে নিয়ে যায়।


প্রশ্ন
ঃ তার মানে একটা শখ থেকেই আর্টের জগতে আসা –
উত্তর ঃ আমি শুধু শখ বলতে চাইব না। বরং বলবো একটা
প্যাশন থেকেই আমার আর্টের জগতে আসা।
প্রশ্ন
ঃ সেই সময়ের অভিজ্ঞতা, কিছু স্মৃতি নিয়ে আমাদের বলুন ?
উত্তর ঃ আমি জানি
না, ডাক্তারি-ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গেলে কতটুকু পরিশ্রম করতে লাগে।কিন্তু আর্ট কলেজে
পড়ার যে পরিশ্রম, তা অনেকেই কল্পনা করতে পারবে না। কোন ছুটির দিন নেই। নিজের তাগিদেই পরিশ্রম করতে
হয়। কলকাতার স্টেশনে দেখবে ছেলে-মেয়েরা
স্কেচ করছে। আমি হাওড়া স্টেশনে সারারাত কাজ করে, ভোরের বেলা কখন যে ঘুমে ঢলে
পড়েছি, বলতেই পারি না। ভোরবেলা লোকের ধাক্কাধাক্কিতে ঘুম ভাঙে। এরপর কলেজে যেতাম। এমন যে কতদিন হয়েছে, তার ইয়ত্তা নাই! এভাবেই
নিরন্তর কাজ করে যেতে হয়। কাজের পর্যা লোচনা করা। আবার কাজে লেগে পড়া।
প্রশ্ন ঃ আপনার ছবি
দেখতে দেখতে কেউ বলেন ‘তার ছবি ব
কিউবিক, কেউ বলেন তার ছবি কিছুটা মনড্রিয়ান, কিছুটা ক্যানডিনেস্কির জ্যামিতির
ন্যাস’। আমি জানতে চাইছি, আপনি আপনার ছবিকে কীভাবে
দেখতে আগ্রহী ?
উত্তর ঃ আসলে মূল কথা হচ্ছে, দর্শক কীভাবে ছবিটা দেখছে!
একটু পেছন ফিরে যাই। ইতালির ভেনিসে প্রতি দুই বছরে চিত্র শিল্পের অলিম্পিক হয়।
যেটা ভেনিস বিনালে হিসেবেখ্যাত। ২০১১ সাআলে ভারত প্রথমবারের মতো অংশগ্রহণ করে। সেই
সুবাদে মিনিস্ট্রি অফ কালচার থেকে যে দল পাঠানো হয়, সে-দলে আমিও ছিলাম। অসাধারণ
অভিজ্ঞতা। ৮০টি রাষ্ট্রের প্রদর্শনী হচ্ছে সারা শহর জুড়ে। লোকজন নৌকা করে শহর
ঘুরছে আর প্রদর্শনী দেখছে। কত রঙের
বাহারি কাজ। সবটুকু দেখেশুনে এটাই বুঝলাম – “তোমার ইচ্ছা মতো তুমি যা কিছু আঁকতে পারো।” শিল্পের কোন গ্রামার নেই। ছবিতে রস থাকলেই
হল! অবশ্যই রসিক দর্শকের জন্যই শিল্পীর ছবি আঁকা।
প্রশ্ন
ঃ ত্রিপুরার তরুণ প্রজন্মের কাজ কি দেখছেন
? কেমন লাগছে তাদের কাজ? আপনি কতটা প্রত্যাশী -
উত্তর ঃ আমি আশাবাদি। আলাদা করে নাম না-নিয়েই বলছি অনেকেই
খুব ভাল কাজ করছে। ছবি তখনই ভাল হবে, যখন চিত্রী হবেন মননশীল। তাকে তার সমাজ
সম্পর্কে জানতে হবে। মানুষের সাথে মিশতে
হবে। একটা মানুষের সাথে কথা বলা মানে তো একটা বই পড়া। এর কোনও বিকল্প নেই। ছবি আঁকতে গেলে একজন আর্টিস্টকে তার
চারপাশের জনজীবন, রাজনীতি, প্রকৃতিকে জানতে হবে নিবিড়ভাবে। এই জানাটা আমি কীভাবে
জানবো ? আমার অভিজ্ঞতা দিয়ে জানতে হবে। পড়াশোনা করে জানতে হবে। ছবির শ্রমিক থেকে
তাকে শিল্পী হয়ে উঠতে হবে। এখানেই বিকাশ নিহিত।
No comments:
Post a Comment