Tuesday, February 20, 2024

অসাধারণ এক স্মৃতির নকশীকাঁথা “আমার ব্রাহ্মণবাড়িয়া” / তমালশেখর দে

 

 





অসাধারণ এক স্মৃতির নকশীকাঁথা  “আমার ব্রাহ্মণবাড়িয়া”   

              তমালশেখর দে    

 

নদী-মাতৃক বাংলাদেশের মধ্য-পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম বিভাগের ঐতিহ্যবাহী তিতাস-বিধৌত জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়া শিক্ষা ও সংস্কৃতির পীটস্থান হিসেবে পরিচিত। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলাকে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক  রাজধানীও বলা হয়। সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ, ব্যারিস্টার এ রসুল,সৈয়দ শামসুল হুদা, প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক অদ্বৈত মল্ল বর্মণ , শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত,কবি আব্দুল কাদিরসহ বহু গুণীজনের জন্মধন্য জেলা এই ব্রাহ্মণবাড়িয়া ।ত্রিপুরার সীমান্ত সংলগ্ন এই অংশ এক সময় ত্রিপুরার অন্তর্ভুক্ত ছিল। সেই ব্রাহ্মণবাড়িয়া নিয়ে “আমার ব্রাহ্মণবাড়িয়া” গ্রন্থ রচনা করেছেন রাজ্যের বিশিষ্ট সঙ্গীতব্যক্তিত্ব মায়া রায়। নজরুল ইসলামের উপর তাঁর গবেষণাধর্মী কাজ সুধীজনদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে অনেক আগেই। এবার তাঁর মেয়েবেলা, বড় হওয়া , সঙ্গীতশিক্ষা , এই সব প্রায় বাইশটি ছোটো ছোটো নিবন্ধ লিখেছেন  মায়া রায়। এত সাবলীল গদ্যভাষা তরতর করে পড়ে যেতে যেতে, কখন যেন পাঠক হিসেবে নিজেই মিশে গেলাম লেখিকার সাথে। শুধু কি তাঁর সাথে মিশলাম? না, আসলে, এক অপূর্ব বাংলাদেশকে পেয়ে যাই মনের অন্তরালেতৎকালীন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বা বাওনবাইড়ার সংস্কৃতি, সামাজিক হিন্দু- মুসলিমের মেলবন্ধনের ভিতর কোথাও যেন হারিয়ে যাওয়া যায় বইটির পাতা উল্টাতে উল্টাতে যাদের পূর্ববঙ্গের সাথে ক্ষীণমাত্র সম্পর্ক আছে, তারা মুহূর্তেই এই বই পড়তে পড়তে সেই স্মৃতিময়তায় হারিয়ে যেতে বাধ্য হবেন। আর যাদের সেই অভিজ্ঞতা নেই, তারও লেখিকার লেখনীর জাদুতে হাতিয়ে যাবেন নিজেদের শৈশবে। কখনও বা যৌবনে। ‘শ্রীমাস্টার’ ‘নিদানদা’ ‘আমার গৃহশিক্ষক’ ‘ধনীপিসি’ ‘ফুলবাসীর মা’ ‘হেনাদি’ এইসব চরিত্রের কথা শুনতে শুনতে প্রেমে পড়ে যেতে বাধ্য হবেন পাঠকরা কোথাও মনে হবে, এইসব চরিত্রের সাথে কোথাও-না-কোথাও আমিও জড়িয়ে ছিলাম। একটা আশ্চর্য মেলবন্ধন খুঁজে পাওয়া যায়। মনে হয়, এদের আমিও যেন কোথাও দেখেছি। কথা বলেছি প্রতিটি চরিত্রের সাথে এই যে সংযোগ গড়ে তোলা, এখানেই  আমার মতে লেখিকার সার্থকতা। আবার যেমন তার – ‘ব্রত পার্বণ’ ‘পয়লা বৈশাখ’ ‘রবীন্দ্র জয়ন্তী’ ‘দুর্গাপূজা’ ‘ঈদ উৎসব’ এই নিবন্ধগুলি পড়তে পড়তে  সেই সময়ের পরিবেশ, পরিস্থিতি, সেই মায়াময় এক সময়ের কথাচিত্র ফোটে ওঠে লেখিকার স্মৃতিচারণের মধ্যে দিয়ে।  আবার ‘নৌকা বাইচ’ ‘খেলাধূলা’ ‘মামার বাড়ি কৃষ্ণপুর’ মন্ত্রমুগ্ধের মতো তন্ময় করে দেয়। সেই তিতাস নদীর উপর দিয়ে কলের গান শুনতে শুনতে পরিবারের সাথে মামার বাড়ি যাওয়ার বর্ণনা, এককথায় অসাধারণ এক অনুভূতি। যা মুহূর্তেই মনকে আলোড়িত করে তোলে। অবশেষে শেষ  নিবন্ধ ‘স্মৃতিগুলো রয়ে যায়’ মনকে উদাস করে দেয়, লেখিকা এত বছরও যখন বলেন- “ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে চলে আসার পরও তিতাস পারের সঙ্গে আমার সম্পর্কের বাঁধন ছিন্ন হয়নি। বরং উত্তরোত্তর সেই বাঁধন আরও দৃঢ় হয়েছে। জন্মভূমির মাটির টান কে ভুলতে পারে?” তখন মনটা কেমন এক নস্টালজিয়ায় ভুগতে থাকে। এই কঠিন সময়ে লেখিকা শিকড়ে মোচড় দেন ফেলে আসা বাংলাদেশের জন্য এখনও তিনি কাঁদেন। লালন করেন তার ভালোবাসা।  

 “আমার ব্রাহ্মণবাড়িয়া” বইটি পড়তে পড়তে শেষে গিয়ে মনে হয়, যেন একটি উপন্যাসই পড়ে ফেললাম। কত চরিত্রের মসৃণ সমাবেশ লেখিকা টেনে আনলেন গল্পের ছলে তার লেখায়। আসলে আত্মজীবনীমূলক আলোচনাকে  বা স্মৃতিচারণাকে একটা সময়ের নিরিখে পর্যায়ক্রমে উপন্যাসের ছকে ফেলে দেয়াই লেখিকা মায়া রায়ের অন্যতম কৃতিত্ব বলে মনে হয়েছে আমার। বইটি পড়তে পড়তে  সময়, সমাজ, এবং তৎকালীন সময়ের বাংলাদেশের সামাজিক রাজনৈতিক স্থিতিকেও অনুমান করা যায়। বইটি পাঠককে সমৃদ্ধ করবে বলেই আমার বিশ্বাস।

 

‘আমার ব্রাহ্মণবাড়িয়া’

লেখিকাঃ মায়া রায়

নীহারিকা প্রকাশনী, আগরতলা

মূল্য ঃ ২৫০ টাকা        

 

কবি নকুল রায়-এর ‘কবিতা সমগ্র’ ত্রিপুরার কবিতা চর্চার একটি প্রয়োজনীয় দলিল / তমালশেখর দে

 

 






কবি নকুল রায়-এর ‘কবিতা সমগ্র’ ত্রিপুরার কবিতা চর্চার একটি প্রয়োজনীয় দলিল   

 

ত্রিপুরার  কবিতার ইতিহাসে নকুল রায় একটি অবিস্মরণীয় নাম। সত্তর দশকের উন্মাদনা পর্যায়ের এই উজ্জ্বল নক্ষত্র তিনি। ত্রিপুরার সাহিত্য তৎপরতায় ‘গ্রুপ সেঞ্চুরি’ বলিষ্ঠ ভূমিকাকে কে অস্বীকার করার সাহস দেখাবে?  সেই গ্রুপ সেঞ্চুরি-র যাবতীয় উদ্দীপনার তিনি ছিলেন প্রাণপুরুষ।  ত্রিপুরার অলিগলি চষে বেড়িয়েছেন কবিতাকে ভালোবেসে। গোটা বাংলা সাহিত্যের সর্বত্র তাঁর বিস্তার এবং ব্যক্তিত্ব ছিল ঈর্ষণীয়। তাঁর উন্মাদনা একরাশ তরুণ উদ্দীপিত হয়েছিল কবিতা নিয়ে। সেই নকুল রায়ের যেকোনো রচনাই পাঠকদের মনে আলাদা একটা মূল্য রাখে। ত্রিপুরার লিটিল ম্যাগাজিন আন্দোলনের তিনি অগ্রগামি পথিক। সেই নকুল রায়ের সমগ্র কবিতা নিয়ে নীহারিকা প্রকাশনী এবার প্রকাশ করছে তাঁর ‘কবিতা সমগ্র’। একই মলাটের ভিতর থাকছে তাঁর প্রায় বাইশটি কাব্যগ্রন্থের বিশটি কাব্যগ্রন্থ এবং অগ্রন্থিত প্রায় তিনশো কবিতাদুটো কাব্যগ্রন্থ খুঁজে পাওয়া যায়নি।  কবিতা নিয়ে কবি বিশ্বাস করেন –“ বাস্তবতার বাইরে কোনো কল্পনা নেই এবং কোনো কবিতাই বাস্তবশূন্য নয়।” এখানে এই ছোট্ট পরিসরে বিশটি কাব্যগ্রন্থের নির্যাস তুলে ধরা সম্ভব নয়।  তবে তাঁর কবিতার মর্মকাহিনির বিষয় হয়ে আছে, তাঁর জীবনের ক্ষুধা, কাম, বিরক্তি, হতাশা, প্রতিবাদময়। সত্তর দশক বা তার পরবর্তী সময়ের সমাজ-রাজনীতি-অর্থনীতির জটিল আবহ উঁকি দেয় তাঁর কবিতায়। তিনি সময়কে, সময়ের সংকটকে অনুভব করেন তার প্রতিটি কবিতার চরণে। নিজেকে নিংড়ে নিয়ে, তারই রূপ দেন যেন কবিতার লাইনে। নকুল রায়ের কাব্যগ্রন্থের নামই আপনাকে অনেককিছু বলে দেয়। যেমন – ‘হৃদপিণ্ডের হাট’ ‘ আমি নীরোর হাতের বাঘটাকে’ ‘শব্দশৈল্য এবং শানিতদীপমল্লিকা’ ‘পাঁজরের এন্টেনা’ কিংবা ‘অন্নদাসের পায়ের ধুলো’  এমন করে কত নাম বলা যায়।  দ্রোহ তাঁর এবং তাঁর কবিতার মর্মস্থলে অবস্থান করে।

“ ভালোবাসা লীন হয়ে আছে/ পাপের শরীর/ কীরকম চিনির মতো গলে যায় ধোপার শরীর!”(দেয়ালে দেয়ালে) কিংবা “ কখনো এই শরীর ছুঁয়েই পালক হয়ে যাই/ কখনো কাঁটার মতো বিঁধে যায় ঈশ্বর/ শিরায় শিরায় স্নান সেরে/ পেছন দুয়ার খুলে হারিয়ে যাই” (হৃদপিণ্ডের হাট)  কিংবা “ ওই তো কাছেই নির্জনতা মগ্ন থাকি পরবাসী বলে/ সবাই একপ্রকার ভালো থাকি শংকর হোটেলের মানুষ/ অন্ধকার ফুরালে ঠিক চোখের কোণে/ পরাভূত মানুষের ভয় ও বিতৃষ্ণা জটিল।” (সাঁকো) অথবা একদম শেষ পর্যায়ের কবিতা  “আমি শেষ রাতের প্রহরী লাইটম্যান, আমি/ সবুজ আলো উঁচু করে তুলে বলছি-‘ কেন/ ভাষা শহিদ রেল ইস্টিশনের নামকরণ হলো না!” (মাতৃভাষা সুরক্ষা দিবস)

 

কবি নকুল রায়ের কাব্যভাষা টানটান। দেশভাগ, উদ্বাস্তু জীবনের শিকড় যন্ত্রণা, স্থানিক চিত্রকল্পের বুনন তাঁর কবিতাকে করে তুলে হৃদয়গ্রাহী। ত্রিপুরার কবিতা সম্পর্কে নিবিড় একটা ধারণা তৈরি করতে হলে, কবি  নকুল রায়কে স্পষ্টভাবেই  ছুঁয়ে যেতে হবে। নাহলে, গোটা বিষয়টাই অধরা থেকে যাবে। তাই তাঁর গুরুত্ব অনস্বীকার্য। কবি নকুল রায়ের এই ‘কবিতা সমগ্র’  বাংলা কবিতার পাঠক এবং গবেষকদের জন্য এক অসামান্য দলিল হয়ে থাকবে, এই প্রত্যাশা করা খুবই স্বাভাবিক। অসাধারণ প্রচ্ছদ করেছেন চারু পিন্টু। তার প্রতিটি প্রচ্ছদই পাঠককে নতুন এক উপলব্ধি দিয়ে যায়।       

 

কবিতা সমগ্র 

নকুল রায়

নীহারিকা প্রকাশনী, আগরতলা

মূল্য ঃ ১২০০ টাকা       

জীবনের নানা অনুভূতির আত্মদর্শন দেখা যায় – তমা বর্মণ

 

             


         জীবনের নানা অনুভূতির আত্মদর্শন দেখা যায়

                     আলোচনা – তমা বর্মণ


 

আঠারোটি গল্প নিয়ে 'গল্পের মতো' এই গল্পগ্রন্থে লেখক তমালশেখর দে আসলে গল্প  নয়, গল্পের আকারে মানুষের জীবনের নানা অনুভূতির আত্মদর্শন ঘটাতে চেয়েছেন পাঠকের কাছে। আমার অন্তত তাই মনে হয়েছে। কয়েকটি গল্পের কথা বলব, যেমন 'এক ঝাঁক জোনাকি' গল্পে লেখক তমাল শেখরকে সম্পর্কের গভীর হতে উঠে আসতে দেখি। লেখক ভালোবাসাকে বহমানতায় ধরে রাখতে চান। সবাই তাই চাই। কিন্তু আত্মস্বার্থে মনের দীনতা থেকে সম্পর্কের টানাহ্যাঁচড়া করতে করতে ভুলে যাই ভালোবাসা গণ্ডিবদ্ধতায় থাকে নাঅথচ জেনেও আমরা চেষ্টা করি তা-ই। এখানে শ্রাবণী নিবিড় এবং বর্ণা, তিন মানুষের অনুভব চিত্র আঁকতে গিয়ে লেখক আচমকাই শেষ পর্যায়ে লিখে ফেলেন--- 'নিবিড় কোনও উত্তর করে না। সে জানে, এইসব কথার গন্তব্য কোথায়!'  'গন্তব্য' কথাটির নিজস্ব বিশাল এক তাৎপর্য রয়েছে। জানা অজানা দুটো দিকই বোঝায়। আবার অসীমের দিকে যাওয়াও বোঝায়। হয়তো নিবিড় আদৌ জানে না বা জেনে বসে আছে তার এবং বর্ণার সম্পর্কের পরিণতি কোথায়। অথবা শূন্যতা ছাড়া এখানে কিছুই নেই। হেরে যাওয়া নিবিড়ের কাছে শ্রাবণী সমস্ত শূন্যতা ভরিয়ে তাই বহমান অনুভব হয়ে ওঠে সহজেই। শ্রাবণীর কাছেই অপমানিত প্রেমিক সত্বাটিকে ফিরে পেতে চায় নিবিড়। মানুষের নিজেকে খুঁজে ফেরার গল্প। গল্পটিতে লেখক জীবনের স্পষ্ট এবং স্বাভাবিক কথাটিই পুনরায় যেন বলতে চেয়েছেন। প্রেম ভালোবাসা যন্ত্রণা অথবা সম্মান ইগো  সবেতে মানুষ আসলে নিজের অস্তিত্বটুকুই তো খুঁজে ফিরে, সম্পূর্ণ হতে অপরের মধ্যেই পেতে চায় নিজেকে। কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য চায়। গল্পে ট্রেনের উপস্থাপনা জীবন নামক একটা জার্নির ইঙ্গিত বহন করে এবং গল্পের শেষে দারুণ ভালো লাগা তৈরি হয়ে যায়, কারণ সম্পর্কের এমন জটিল রসায়নে বসেও লেখক তিন চরিত্রকেই শেষপর্যন্ত রেখে গেছেন খোলা বাতাসের মতো! 'কাঞ্চনপুরের গেস্টহাউস এবং আমি' গল্পটি সম্পর্কে বলব, গল্পের চরিত্র যখন লেখকের সঙ্গে মিলেমিশে যায় কিংবা লেখক হয়তো ইচ্ছাকৃতভাবেই মিশিয়ে দিতে চান তখন গল্প কী শুধুমাত্র গল্প থাকে?  হয়তো না। জীবনের কথা হয়ে দাঁড়ায়। এখানেও সম্পর্কের মনস্তাত্ত্বিক দিক এসেছে। পিতা-মাতার রহস্যময় টানাপোড়েন-সম্পর্কের মাঝখানে সন্তান হিসেবে অমিতের সত্য-মিথ্যার সন্ধান এবং তার মানসিক দ্বন্দ্ব এই গল্পের বিষয়বস্তু। যে কারণেই হোক গল্পটি পড়ে যেতে হয়।  লেখক তমাল শেখরের 'গল্পের মতো' এই সংকলনে 'ঘর করা' 'গল্পের মতো' 'চোট' 'নির্জনতা' 'পাখা গল্প' প্রত্যেকটা গল্পই মানুষের অন্তর্গূঢ় অনুভূতির কথামালা। মনে হতেই পারে নিজেকে কোথাও না কোথাও চিনতে পারা যাচ্ছে। গল্প নয় গল্পের মতো করে বলা এ যেন চারপাশের জটিল আবর্ত থেকে উঠে আসা বিভিন্ন চরিত্র ধরে লেখকেরই এক একটি স্বগতোক্তি অথবা অনুভূতির ভিন্নতা। আরেকটি গল্পের কথা বলব, গল্পের নাম 'কবি'সাক্ষ্যাৎকার নেবার কৌশলে কবির নিজস্ব মনোজগতের একাকিত্ব বা যন্ত্রণার ছবি এঁকেছেন লেখক। গল্পের স্বল্প পরিসরে চমৎকার কিছু চিত্রকল্পের ঘোর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে অনেক দূর হেঁটে যাবার বিস্তৃতি রয়েছে এখানে। পাঠশেষে বহুমাত্রিক বোধ জেগে ওঠে মননের গভীরে। কবিরা মৃত্যুর মতো একা, এই সত্যটি ঘটনা প্রবাহের মধ্য দিয়ে সরল স্বীকারোক্তি হয়ে বেরিয়ে আসে সহজেই। এই গল্পের বিষাদগ্রস্ততা প্রায় অধিকাংশ গল্পেই তার ছোঁয়া আছে। তবে কী সবই অসুখের গল্প? না। অসুখ এবং সুখের মধ্যে যে সূক্ষ্ম এক দেয়াল মাত্র রয়েছে তারই যেন নিশ্চিতি করতে চেয়েছেন লেখক বারবার। কোনও চরিত্র তাই পক্ষপাত দুষ্টে কোনঠাসা হয়ে পড়ে না। লেখকের প্রতিটি গল্পের আদল মানুষের নানারূপ সংবেদনশীলতা বা অনুভূতি কেন্দ্রিক। চরিত্র বদলেছে। বিষয়ের আঙ্গিক বদলেছে। কিন্তু লেখকের ফোকাস মূলত মানুষের মন এবং মনের আনাচকানাচে জড়িয়ে থাকা গোপন রহস্যের খেলা নিয়েই।  'মায়া' গল্পে সূক্ষ্ম অথচ নিষ্ঠুর এক বাস্তব সত্যতা দেখি---  প্রিয়জনের মৃত্যু নিয়ে এবং তার প্রতি কৃতজ্ঞতায় উদগ্রীব থাকা কিছু মানুষ তার মৃত্যুর পরমুহূর্তেই সচেতন হয়ে ওঠে নিজেদেরকেই নিয়ে অদ্ভুতভাবে! একসময় যাকে কেন্দ্র করে নির্ভরতা খুঁজে পেয়েছিল, তেমন আপনজনকে হারিয়েও ভাবনা আসে সহজেই----এই শীতে কি করে যাই শ্মশানে? তাহলে কী জাগতিক সংসারে প্রেম ভালোবাসা স্নেহ যা-কিছু সবই একধরণের প্রয়োজন? মৃত্যুতে ফুরিয়ে যায়! মৃত্যু অমোঘ অবচেতনে জানা থাকে বলেই হয়তো মানুষ শোকেও সচেতন থাকতে পারে জীবন নিয়ে! 'নেই' তার চেয়ে যে 'আছে' তার জন্যেই মানুষের তাই হয়তো সমস্ত মায়া। জীবনের মায়া! এভাবে অন্যান্য গল্পগুলোতেও একে একে মানুষ এবং সম্পর্ক আর তার মনস্তত্ত্বকে চেনাজানা চরিত্রে গেঁথে লেখক তমাল শেখর দে টুকরো টুকরো গল্প নয়, টুকরো টুকরো সম্পর্কের একটি বিশ্লেষণমূলক আখ্যান তৈরি করেছেন গল্পের মতো করে। লেখক হয়তো  নিজেকেই ভেঙে ভেঙে অনুভূতির আলো-আঁধারির ভিতর অনেক অবরুদ্ধ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চেয়েছেন। পাঠকের আগ্রহ এই বইটি খুঁজে নেবে আশা এবং শুভকামনায় রইলাম।

 

গ্রন্থ ঃ ‘গল্পের মতো’

লেখকঃ তমালশেখর দে

আলোচক – তমা বর্মণ

নীহারিকা প্রকাশনী , আগরতলা

মূল্যঃ  ২৫০ টাকা

কবিতার ভিতর দিয়েই জগতকে পরিক্রমা করতে আগ্রহী কবি অমিতাভ কর / তমালশেখর দে

 




কবিতার ভিতর দিয়েই  জগতকে পরিক্রমা করতে আগ্রহী কবি অমিতাভ কর /  তমালশেখর দে

 

অমিতাভ কর ত্রিপুরা রাজ্যের পরিচিত একজন কবি। তথাগত অর্থে আশির দশকের কবি। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ “এই রৌদ্রময় প্রান্তর”বের হয়  ১৯৮২ সালে। প্রথম কাব্যগ্রন্থের ৩৩ বছর পর বের হয় তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ “ভাঙা কাচের রাত”। এই দীর্ঘদিন না-লেখার পেছনে অবশ্যই তাঁর পেশাগত জীবন দায়ী ছিল। কবি কর্মজীবনের ছিলেন ভারতীয় আরক্ষা দফতরের মহানির্দেশক। কবি নিজের আরোপিত নির্বাসন নিয়ে পরে কবি নিজেই বলেছেন –‘কবিতা লেখা নিয়ে সমস্যা এই যে মাথায় একটা পংক্তি এলে যতক্ষণ অবধি না পরের বা আগের পংক্তিগুলো ধরা দিচ্ছে ততক্ষণ শান্তি নেই। এইজন্য আরা দফতরে থাকাকালীন সময়ে কবিতাকে জোর করে সরিয়ে রেখেছিলাম।’ যাই হোক, তারপরও কবি কবিতা থেকে  সরে যাননি, এটাই আমাদের প্রাপ্তি। “ নির্বাচিত অমিতাভ কর” গ্রন্থে কবির মোট পাঁচটি কাব্যগ্রন্থ এবং অগ্রন্থিত কিছু কবিতা থেকে নির্বাচিত কবিতার সংকলন হচ্ছে এই গ্রন্থ। সেই অর্থে এখানে আমরা কবি অমিতাভ করকে সম্পূর্ণ রূপে পেয়ে যাই।

১৯৭১ সালে লেখা কবির কবিতা পড়েই প্রথমে মুগ্ধ হতে হয়। যেখানে কবি লিখছেন – “খুলে বলা যায় না কাউকে,/ তোমাকেও নয়, গহিন বনের ইউক্যালিপ্টাস/ পৃথিবীর পরে অভিমানহীন আমি/ তবু জেগে থাকি” (শাণিত দুঃখের হাতে) কিংবা “ যেখানেই যাই, প্রিয়তমা,/ চেয়ে থাক অনন্ত কৌতুকে,/ এ হৃদয় ভেসেছিল চিতার সোনালি স্রোতে,/ জারোয়াদের নাচের তালে পরিপূর্ণ/ এ কেমন দিন? এ কেমন ভ্রান্ত রাত?” (যেখানেই যাই)    

কবির কবিতায় দৃশ্যের পর দৃশ্য আছে। চিত্রকল্পের বহমান কারুকার্য আছে। কবির দেখা আমাদের মুগ্ধ করে। “ সময় ধীরে ধীরে সবাইকে নক্ষত্রধূলি বানিয়ে দেয়। হেমন্তের/ ঝরা পাতা মৃত্যু দ্যোতক নয়, রুপান্তরমাত্র। এরমধ্যে/ আমরা ভুলে যাই আমাদের লক্ষ্য, শরীর ভালোবাসি বলে/ শিশুর মতন বিস্ময়ে, ভয়ে মেটামরফোসিসের দিকে/ স্মৃতিহীন বিভ্রমে চেয়ে থাকি;” (সময়)

কবি অমিতাভ কর-কে  খুব চট করে পড়তে গেলে মুস্কিল। তাঁর কবিতা পড়তে হবে কিছুটা সময় নিয়ে। তিনি জীবনকে দেখেন খুব গভীর থেকে। শব্দ ব্যবহারেও তিনি  থাকেন বেশ সতর্ক। কবিতা প্রিয় পাঠকদের খুবই প্রিয় হয়ে উঠবে “ নির্বাচিত অমিতাভ কর” গ্রন্থটি আশা করতেই পারি। কবির নিজস্ব একটা ঢং আছে, ভাষা আছে। কবিতার ভিতর দিয়ে জীবন ও সমাজ বাস্তাবতাকে দেখতে চান নিজের আলোকে। এখানেই তিনি স্বতন্ত্র। কবিতার ভিতর দিয়েই তিনি জগতকে পরিক্রমা করতে আগ্রহী।  

বইঃ ‘নির্বাচিত অমিতাভ কর’

লেখকঃ অমিতাভ কর

নীহারিকা প্রকাশনী, আগরতলা

মূল্য ঃ ৩০০ টাকা

কবিতার অফুরন্ত স্ফূর্তি যখন এক ফর্মা কাব্যগ্রন্থের ভিতরে / তমালশেখর দে


 

    ** কবিতার অফুরন্ত স্ফূর্তি  যখন এক ফর্মা কাব্যগ্রন্থের ভিতরে **

                          তমালশেখর দে   

 

এক ফর্মা কবিতার বই মানেই একটা ঝলক। নিমিষে ফোটে ওঠার স্ফূর্তি। এবং স্পর্ধা।  সদ্য শেষ হয়ে গেল ‘৩৮ তম আগরতলা বইমেলা’ । বইমেলা মানেই বইয়ের উৎসব । নতুন বই। নতুন আবেগ । উচ্ছ্বাস । আর বইমেলা পরবর্তীতে চলবে  লেখক, পাঠকের পাঠ-প্রতিক্রিয়ার আদান-প্রদান । এবং সেটা চলতেই থাকবে গোটা বছর ধরেই । এবছর নীহারিকা প্রকাশনী থেকে এক গুচ্ছ এক ফর্মার কবিতার বই বেরিয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের জনপ্রিয় পাঁচজন কবির কবিতা প্রকাশিত হয়েছে । বাংলাদেশ মানেই একটা উন্মাদনা । প্রবীণ কবিদের পাশাপাশি একঝাঁক তরুণ কবিদের স্ফুরণ । এমন পাঁচজন কবির একফর্মার কবিতা বই প্রকাশ করেছে নীহারিকা প্রকাশনী । কবি মুজিব ইরম-এর কবিতার বইয়ের নাম ‘মু.ই’ । এই সময়ের বাংলাদেশের তরুণ তুর্কি কবিদের তিনি অন্যতম। তার কবিতার নিজস্বতা, স্টাইল পাঠককে নতুন এক দিগন্ত দিয়েছে। যেমন – “ মনোবাসে আছি আমি মনোবাসে আছি, অজানা স্রোতের টানে নাই হয়ে/ বাঁচি।। দেশছাড়া খেশছাড়া ভিনবাসী মন, হারানো মানুষ আমি করহ / যতন।।” (মনোবাস) কিংবা “ কিতা তুমি কও খালি, কিতা তুমি কও ! আমার লাগে না ভালা! আমার / বুকর মাঝে লুকানো যে দুখ, আমার দিলর মাঝে লুকানো যে অচিন / অসুখ” ( জিওল কবিতা) কবি  কবিতা নিয়ে অনবরত পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বিশ্বাসী।

আরেক কবি হেনরি স্বপন এর “আলপথ দূরে” কাব্যে দিয়েছেন হৃদয়ের দুরন্ত ছোঁয়া। কবিতার ভিতর দিয়ে সামাজিক নানান অসঙ্গতিকে তুলে ধরতে আগ্রহী তিনি। যেমন-“ আগুনে দুরন্ত হও, দহনেও আমনের ধানচাষ.../ জোনাকিরা উঁকি দেয় সাঁজের সঙ্গমে রাতের নিঃশ্বাস।”(অভিমানে ঝরে কষ) কিংবা “অবিরত ঝরে রতি, শরীর উর্বর শস্যে ভরা উরু / লাঙল চাষের সব কলা বুঝি ? উড়ে বাতাসের বুকে / মুখ গুঁজে শিখে নেবে, শ্রমজীবী রমণীর গন্ধ শুঁকে –” (শিশ্নের প্রস্রাব) । কবি হেনরি স্বপনের মেজাজ বোঝাতে আর একটি কবিতার দুই লাইন উল্লেখ করছি – “হাঙরের ক্ষুধা যেন, আরব্য-ব্রা বোঁটায় মুক্তা বসানো / ফাটলে কাঠের চাকা ঢুকে, ঘর্ঘর শব্দ কিসের জানো ?” (ঘর্ঘর শব্দ কিসের জানো)

কবি অসীম সাহা বাংলাদেশের ‘একুশে পদক’ প্রাপ্ত আরেক জনপ্রিয় কবি। তার উপমা, ব্যঞ্জনা তৈরি করার ক্ষমতা সম্পর্কে পাঠক সমাজ ওয়াকিবহাল। তার কবিতার ভিতরে জীবনের বোধ বারবার জাগরিত হতে দেখা যায় । “ কথা থাকলেই রাখা যায় না ! কথার পৃষ্ঠেও কথারা লুকিয়ে থাকে ।/ ভাষা জানা থাকলেই জানা হয় না, ভাষাজ্ঞানও থাকা প্রয়োজন ।” (শেষ-পরোয়ানা)  বাংলাদেশের আরেক জনপ্রিয় তরুণ কবি  হলেন পিয়াস মজিদ । নীহারিকা থেকে প্রকাশিত হয়েছে তার “বেঁচে থাকার বসন্তবাগান”। এই কাব্যগ্রন্থে কবি ছোটো ছোটো বাক্যের ভিতর দিয়ে জীবনের জটিলতাকে ধরার চেষ্টা করেছেন । যেমন – “ কথার/ কাকলি-ভিড়ে/ কথাতেই খুঁজি/ নৈঃশব্দের ঘর।/ মানুষ মূলত / তার/ ছায়ার সহোদর।” (সেই দুপুরের ছায়ায় মায়ায়) কিংবা “ প্রতিটি /অভ্যর্থনায়/ আছে/ বিদায়ের/ গন্ধ।” (অতঃপর) বিষয়, আঙ্গিক  সব কিছুই নিয়ে তিনি ভাবেন। পাঠককে ভাবান । এটাই তার প্রধান বৈশিষ্ট্য । বাংলাদেশের নব্বই দশকের উল্লেখযোগ্য কবিদের মধ্যে ওবায়েদ আকাশ অন্যতম একজন । তার কবিতায় একটা নিজস্ব ঢঙ আছে। উপস্থাপনায় আছে অভিনব কৌশল এবং আছে স্বতন্ত্র ভাষারীতি ।ভাবনার আধুনিকতাই তার  কবিতার প্রধান অস্ত্র । যেমন – “ গতকাল থেকে কেউ আর আমাকে দেখছে না / এই প্রথম আমি সম্পূর্ণ প্রকাশ্য থেকেও একপ্রকার আত্মগোপন প্রচেষ্টায় / সফল হতে পেরেছি।” ( আত্মসম্মোহনমূলক) অথবা

“রাত্রিরা রক্ত গুনছে, রক্তস্নান, রক্ত পোহাচ্ছে- / বাইরে তখন একা একাত্তর / তার সমস্ত বিশ্বাসে শোণিত জখম” (একাত্তর)।

এবার আসি, ত্রিপুরার কবিদের এক ফর্মার বইয়ের প্রসঙ্গে । কবি মৌলিক মজুমদারের এক ফর্মার কবিতার বইয়ের নাম দিয়েছেন “আমি অনাগতবিধাতা”। মৌলিক ইতিমধ্যেই নিজের চিন্তায় নিজস্বতা আনতে সক্ষম হয়েছেন। কবিতা ভাবনার ভিতর জীবনবোধকে মিশিয়ে কবিতাকে করে তুলে অনন্য এবং ঝরঝরে।তার কবিতার মেজাজ বোঝার জন্য, তার কাব্যের প্রথম কবিতাটি তুলে ধরাই যথেষ্ট মনে করছি । যেখানে কবি লিখছেন – “ আমরা দুজনেই বৃক্ষ খুঁজেছিলাম পরস্পরের মধ্যে / নিশ্চিদ্র নিদ্রা চেয়েছিলাম গাছের কোটরে ।/ ঘুমের ভিতর বৃদ্ধ হয়েছি .../ আজও পাখিওড়া দিন/ গাছ নেই পাখি আছে/ তারা নিরুপদ্রব ঘর করে আমার শাখায়...” (ঘুমের ভিতর)। কবি মৌলিকের বৈশিষ্ট্য এই একটি কবিতার মধ্যেই ধরা পড়ে । একটি ঘুমের ভিতর দিয়ে কবি ব্যক্তি থেকে প্রকৃতি, প্রকৃতি থেকে জীবনের সংশয়কে স্পষ্ট করে তুলেছেন । এরপরই বলতে হয় কবি পার্থ ঘোষের কবিতার বই “বেদনার মতো নীল”-র কথা । কবির কবিতার প্রথম লাইনটাই আমাকে মুগ্ধ  এবং গভীর আবেগে আচ্ছন্ন করে ফেলল। যেখানে কবি লিখছেন –“কীভাবে কাকে বলা যায় – মরে আছি বহুকাল”( কীভাবে কাকে বলা যায়) এই একটিমাত্র লাইনের ভিতরেই রয়ে গেছে অজস্র কথা । কবিতাটির ভিতর খুব চুপচাপ একটা নিঃসঙ্গতার বেদনা টের পাওয়া যায়। একই মেজাজ টের পাই তার ‘নিজস্ব’ কবিতাটির ভিতর, যেখানে তিনি লিখছেন  –“...এই ব্যথাঘর তোমাকে দিলাম / জেনে নাও তারার বৈচিত্র্য ও আকাশ ।/ মগজের ভিতর এই ব্যথাঘর / আজব এক একলা শ্মশান”। কিংবা “প্রেম নামক আধুলিকে নেড়েচেড়ে দেখি -/ আসলেই মুদ্রার এ-পিট ও-পিট ।” (অতঃপর) । ‘মাতালের কাব্য দর্শন’ কবিতায় নানাদিক দেখিয়ে শেষমেস পাঠককেই প্রশ্ন করে বসলেন –“ জগতের সমস্ত ব্যর্থ প্রচেষ্টার নাম কি তবে / - কবিতা ?” কবির কাছে স্বাভাবিকভাবেই আশা রইল। কবিতা তো জীবনেরই উন্মোচন।  

কবি রিয়া দেবী আমার কাছে খুবই সম্ভাবনাময় একটি নাম। তার কাব্যগ্রন্থ “উদ্বাস্তু জীবন” বইটি নিয়ে পড়তে পড়তে এসে থামকে যাই, যখন চোখে পড়ে – “প্রত্যেকটা মানুষের মধ্যেই একটা নদী থাকে / পারাপারের সাঁকোটাই শুধু ভিন্নরকম” (পূর্ণতা) কিংবা “ মুঠোফোনের একপ্রান্তে ছিলে তুমি আরেক / প্রান্তে আমি,/ কথা হল তবুও মাঝখানে শূন্যতায় সবটাই ছিল/ বেমালুম ফাঁকি।” (মুঠোফোন) কিংবা “ যদি একটা দিন এমন হত / আমার না বলা কথা সব/ তোমার হৃদয় ছুঁয়ে যেত” ( আকাশকুসুম) কিংবা “ আমাদের বুকে কোন সাদা বক নেই/ তবুও আমরা পাখি/ ...  ভিতর ঘরে অপ্রকাশিত ময়লার বাক্স /কত আবর্জনা জমা থাকে ঠিক/ ঢেকে রাখি যন্ত্রণার পেরেক ঠুকে ঠুকেই” ( ধারণ) । কবি আমাদের জীবনের খুব কাছাকাছি ছড়িয়ে থাকা উপকরণ থেকেই বিষয়কে নির্বাচন করেন। কিন্তু বোধকে পোঁছে দিতে চান অজানা এক বেদনার দিকে। তার কবিতার ভিতরে নিজেকে খোঁজার একটা তৎপরতা আছে ।  কবির এই ধারা এবং সন্ধান একদিন তাকে পূর্ণতার দিকে নিয়ে যাবে আশা করতেই পারি। তরুণ কবি সন্দীপ-এর কবিতার বই ‘ইচ্ছেসিঁড়ি’। কবিতাকে বুকে যাপন করাটাই বড় কথা। ‘অনুভূতি’ কবিতায় সে লিখছে – “ সময়ের বুকে জমেছে তোমার স্মৃতি/ কথার মাঝে কথারা লোকায় অভিমান/ মনের সাথে মন পুশেছে সংঘাত/ আঙুলের ফাঁকে যৌবন মাপে স্লোগান”। কবির কাছে আগামিতে নিশ্চয়ই আরও অনেক ভালো ভালো কবিতা উপহার পাবো ।   

প্রত্যেক কবিই জীবন নিয়ে , জীবনের নানা দিক নানাভাবে দেখার চেষ্টা করেছেন । সেই অর্থে তারা জীবনের রুপকার । কবিদের প্রত্যেকেরই জীবনজিজ্ঞাসা বা অর্থসন্ধানের রূপ ভিন্ন ভিন্ন রকমের । বিন্দুর মধ্যে সিন্ধুর মতো তাদের একঝলক মনকে আনন্দ দিয়ে গেল । আশাকরি আপনাদেরও ভালো লাগবে ।        

 

          

চারজন কবির বিচিত্র স্বাদের চারটি কাব্যগ্রন্থ / তমালশেখর দে

 

** চারজন কবির বিচিত্র স্বাদের চারটি কাব্যগ্রন্থ **   তমালশেখর দে     

 

তাবৎ বিশ্বে সব কিছুই কবিতার বিষয়বস্তু হতে পারে । কবিতা এক আগ্রাসী শিল্পের প্রতিমা । তার কাঠ-খড় মাটি রঙ চোখের পল্লব তৃতীয় নয়ন থেকে মুকুট পর্যন্ত সবই কবির চিন্তাকল্পনা । ভাবানুষঙ্গ ও চিত্রকল্প ও কাব্যভাষার আধার থেকে উঠে আসে । তার মনোজগতের ভিতরে অনেক আলো-আঁধারি, অস্পষ্টতা, জটিল ভাবনাচিন্তার মিলিত ও বিপরীত স্রোত খেলা করে । নব্বই দশকের কবিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কবি বিশ্বজিৎ দেব। স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল তার কবিতা। শুরু থেকেই তিনি তার কবিতায় নিজস্বতা বজায় রেখে চলেছেন ।৩৮তম আগরতলা বইমেলায় বেরিয়েছে তার পঞ্চম কাব্যগ্রন্থ “বিকেলের হার্টক্রেন”। নামের মধ্যেই কবি তার ভাবনার অভিনবত্বের ছাপ রেখেছেন । এই নামের সাথে মিলিয়ে কবির যে কবিতাটি আমাকে খুব আকর্ষণ করেছে , তার নাম – ‘একটি বিনম্র ফ্লাইওভার ও তার মরচের  আকরিকগুলি’। কবি লিখছেন – “ ইস্পাতের নীরবতাগুলি তাকে বেঁধে রাখে শূন্য মাঝারে। বুকের দুদিকে দোটানা । পাঁজরের মরচের গায়ে জমে থাকে ভার বহনের স্মৃতি। শূন্যের উভয় প্রান্তে গেঁথে রেখেছে সে অহংকার, ভেঙে না পড়ার অদম্য কংক্রিট ”। কবি বলছেন একটি ফ্লাইওভারের কথা । অথচ পড়তে পড়তে মনে হচ্ছে যেন কবি এখানে মানুষের কথাই বলছেন  দুই প্রান্তকে আশ্চর্যজনকভাবে মিলিয়ে দিচ্ছেন জীবনের সাথে । তাই তো তিনি এরপরই বলছেন – “ রাতের গভীরে যখন সব চলাচল থেমে যায় রোজ, সারাদিন কষ্ট বোঝাই পণ্যের লরিগুলি ফিরে যায় কোজাগরী টার্মিনালের দিকে তখন তারও ঘুম পায়, মাসি পিসি পায় । নিরুত্তর আকাশের নিচে গাঁটের ইস্পাতগুলি খুলে রাখে নস্টালজিক ব্যথা”। কবি বিশ্বজিৎ কীভাবে রাতের বিষণ্ণতার সাথে মাসি-পিসি মিলিয়ে নিছক একটি  ব্রীজের প্রতীক থেকে ‘নস্টালজিক ব্যথা’ অবধি পৌঁছলেন, তার এককথায় অনবদ্য । কবির নিজস্ব একটা ভাষাজগৎ রয়েছে । রয়েছে নিজের একটা মুনশিয়ানার স্টাইল । কবির মনোজগৎ বোঝার জন্য, একটি কবিতার কিছু অংশই যথেষ্ট বলে, মনে হয়েছে আমার কবি বিশ্বজিৎ দেবকে আরও প্রগাঢ়ভাবে বুঝতে হলে, তাকে নিবিড় পাঠ করা জরুরি। এই কবির রূপ ও প্রকৃতি, অন্তঃসার ও লক্ষণ মৌলিকতায় ভরপুর। কবিতা পাঠের ঋদ্ধ পাঠ না-থাকলে, চট করে তাকে বোঝে ওঠা  মুশকিল 

নীহারিকা প্রকাশনী থেকে এবছর উল্লেখযোগ্য আরেকটি কবিতা বই কবি সুবিনয় দাশের ‘১০০ স্বনির্বাচিত কবিতাআশির দশকের রই কবির কবিতায় অর্থনৈতিক টানাপড়েন, নৈতিক মূল্যবোধের অভাব, ভোগবাদের আগ্রাসনের চরিত্র তার কবিতার রন্ধ্রে রন্ধ্রে বসবাস করে । শ্লেষ তার কবিতার অন্যতম প্রধান অস্ত্র সিরিয়াস পাঠকের কাছে তিনি খুবই উল্লেখযোগ্য একটি নাম । তার প্রখ্যাত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – ‘জ্বলে অম্লান’ ‘ রাত্রির সেতার’ ‘ হৃদয় যেখানে উপদ্রুত’ ‘ নিজের কপাল নিজে খাবো’ ‘ সারাদিন সারারাত’ এমন করে প্রায় ১২টি কাব্যগ্রন্থের জন্মদাতা তিনি। সেই সব কাব্য থেকে বাছাই করে এবছর ‘১০০ স্বনির্বাচিত কবিতা’ বেরিয়েছেকবির নিজের সবচেয়ে পছন্দের একশটি কবিতার সংকলন সেই অর্থে বইটি খুবই মূল্যবান । কবির কবিতার টুকরো টুকরো কিছু নমুনা তুলে ধরছি । যেমন – “অসংখ্য শব্দ জড়ো করে আগুন জ্বালাই/ কি ভাবছো ? দুঃখে বোঝা কিছুটা কমাতে পারলাম ?/ মানিব্যাগ ফাঁকা তবু লিখছি ” (মানিব্যাগ), “ বিষণ্ণ মুখ, খিল খিল হাসি / হা করা পয়েট্রি সকল / কফি হাউস, বইপাড়া ঘুরছি” (বিষণ্ণ মুখ), “বিহঙ্গকে বলেছি খাঁচা ভেঙে পালাও / ইনি বামপন্থী ইনি ডানপন্থী/ সুযোগ পেলেই চাঁদা মেরে ধাঁধাঁ করেন” (ছবি), “ পাগল যাচ্ছে, তাকে তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে / সুস্থ লোকের দল, চকলেট খাচ্ছে মা ভবতারিণী” (ডিকশনারি)। এই রকম অসংখ্য উল্লেখযোগ্য কবিতা আছে কবির ‘‘১০০ স্বনির্বাচিত কবিতা”-র বইটিতে একটু ভিন্নধর্মী কবিকে জানতে হলে, বইটি পড়তেই হবে। খবুই মননশীল প্রচ্ছদ করেছেন বাংলাদেশের শিল্পী চারু পিন্টু

 ত্রিপুরার আরেক উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় উল্লেখযোগ্য কবির নাম পায়েল দেব।  ৩৮তম আগরতলা বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে তার চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ “নিমফুল”। কবি অশোক দেব কবির কবিতার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন – “পায়েল দেবের কবিতায় মেদবাহুল্য নেই, নির্মাণের ছেনি হাতুড়ির শব্দ নেই। অন্যদিকে ভাবালুতার ভারও ক্লান্ত করে না পাঠককে । নিজস্ব এক বাকবিভুতি সৃষ্টি করেছেন পায়েল ।” আসলেই পায়েলের কবিতা এমনই! যেমন – “ আমাকে শূন্যতার দিকে নিয়ে গেছে এক নিপুণ জাদুকর/ সব জাদু বাদামের খোসার মত ছাড়িয়ে / নিজেকে আলগা করে দেখেছি – অচেনা”(শিল্প) অথবা “ অনেক চিঠির পর ফিরে আসে বসন্ত / উলের জামার গোলাপি ও কাশ্মীরী গাঢ় নীলে / ভাঁজ করে রাখতে হয় শীতের ওম ”(খেলাঘর বাঁধতে লেখেছি) কিংবা “ টুকরো টুকরো সময়ের গায়ে /  সে এক বেশ্যা, এক রক্ষিতা, মা অথবা বউ / এখন একা থাকে / মাঝে মাঝে কাছে যাই / প্রতিবার আয়না ভাঙার শব্দ বয়ামে ভরে চলে আসি” (সোহাগি) অথবা “ তাদের মৃত্যুর পর সন্ধ্যা নামে / যে করে পাখিদের ঠোঁট বধির হলে আসে দুঃসময়” (উপসুর) । “ তার মৃতদেহে হোঁচট খেতেই মনে হল / কোনও অশ্বমেধের আগুন / ঠোঁটে তিল আঁকা”(ক্ষুধা) । শব্দকে নিঙড়ে অনুভূতির গায়ে রঙ ধরানো কবিতার অন্যতম শর্ত ও জরুরি বিষয় । সেই শর্ত এবং এবং তার বার্তা খুব ভালো করেই রপ্ত করেছেন কবি পায়েল । প্রায় প্রতিটি কবিতার ভিতরেই কবি রেখেছেন জীবনবোধ, বোধের বিন্যস্ত বিন্যাস। উগ্রনারিবাদি মানসিকতা কোথাও তেমন চোখে পড়েনি। বরং এর পরিবর্তে কিছু  অসামঞ্জস্য ব্যবস্থার দিকে তিনি আঙুল  তুলেছেন ।  “আত্মীয়স্বজনরা উলুধ্বনি দেয় / ঠাকুরে পেয়েছে, ভর করেছে দেহ ।” পায়েল দেব জানেন, কবিতার মূল কথা কোথায় ! আগামিতে ত্রিপুরার কবিতাকে তিনি আরও মুগ্ধস্তরে নিয়ে যাবেন এটা আশা করতেই পারি।

 তরুণ কবি সুব্রত দেববর্মা ত্রিপুরার কবিতায় এক নতুন সম্ভাবনার নাম । তার “অ্যান্টিবায়োটিক কবিতা” পড়তে পড়তে তাই মনে হয়েছে আমার । তার কাব্যের প্রথম কবিতাই তা জানিয়ে দেয় – “ যখন সন্ধ্যা নেমে আসে মহাকাশ থেকে/ নিজেকে কেমন শ্মশানের পাশে / ডোমেদের ঘরের মতন মনে হয় ।”( পাঁচ দিনের প্রেম) কিংবা “ আমি ভাতের লড়াইটা দেখিনি / দেখেছি জাতের লড়াই”( ভাত ফেলে জাতের লড়াই) অথবা “মেঘলা রাতগুলো শুষে নিচ্ছে সস্তা নিকোটিন / কেটে যাচ্ছে ক্ষোভে ভরা আরেকটা বৃষ্টিরদিন।/ মৃত্যুদণ্ডের আসামির মতো বেঁচে আছি প্রায়”( বৃষ্টি নয় নিকোটিনের জল)কবি  সুব্রত দেববর্মার ভিতর নিঃসন্দেহে কবিতার মনোবীজ রয়েছে । যা আগামিতে আরও তাৎপর্যময় হয়ে পাঠকের হৃদয়ে ধরা দেবে।  প্রচ্ছদ শিল্পী চারু পিন্টু প্রত্যেকটি কবিতার বইয়েই ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের প্রচ্ছদ উপহার দিয়েছেনআশা করি, নীহারিকা প্রকাশনীর দ্বারা এই সময়ের উল্লেখযোগ্য  চারজনের কবিতা আপনাদের ভালো লাগবে                  

 

 

 

১।  বই – বিকেলের হার্টক্রেন

কবি – বিশ্বজিৎ দেব

নীহারিকা প্রকাশনী

মূল্য – ১৪০ টাকা

 

২।  বই – ১০০ স্বনির্বাচিত কবিতা

কবি – সুবিনয় দাশ 

নীহারিকা প্রকাশনী

মূল্য – ১৭০ টাকা

 ৩। বই – নিমফুল

কবি – পায়েল দেব  

নীহারিকা প্রকাশনী

মূল্য – ১৪০ টাকা

৩। বই – অ্যান্টিবায়োটিক কবিতা

কবি – সুব্রত দেববর্মা  

নীহারিকা প্রকাশনী

মূল্য – ১৭০ টাকা 

 

কবিতা -উপন্যাসের মেলবন্ধনে যেখানে একাকার বিকাশ সরকার / তমালশেখর দে

 

 কবিতা -উপন্যাসের মেলবন্ধনে যেখানে একাকার বিকাশ সরকার                               তমালশেখর দে 

উত্তর পূর্বাঞ্চলের শক্তিশালী কবি বিকাশ সরকার গল্প উপন্যাসেও তিনি সমান জনপ্রিয়   বিকাশ সরকারের কবিতা গতানুগতিক প্রথা থেকে একটু অন্যরকম বর্তমান কবিতা বইটির নামহ্যালুসিনেশন সিরিজ ’ । এই ধরণের নামাকরণের মধ্যেই কবির কবি ভাবনার উৎস খুঁজে পাওয়া যায় ।     

হ্যালুসিনেশন শব্দটির সাথে  আমরা অনেকেই পরিচিত । অনেকে আবার ইলিউশন বা দৃষ্টিভ্রমকে হ্যালুসিনেশনের সাথে গুলিয়ে ফেলেন । ইলিউশন এবং হ্যালুসিনেশন দুটোই এক ধরণের ভ্রম । তবে একটু পার্থক্য আছে । যেমন – সামনের ঝুলে থাকা দড়ি যদি কারও কাছে সাপ মনে হয় তাহলে এটি ইলিউশন । আর যদি কোনও দড়ির অস্তিত্ব ছাড়াই সাপ দেখতে পাই, তবে সেটা হবে হ্যালুসিনেশন ।  হ্যালুসিনেশন হল এমনই একটি মানসিক  অবস্থা যেখানে ব্যক্তি কোন প্রকার উদ্দীপনা ছাড়াই বিশেষ ইন্দ্রিয়ানুভূতি  লাভ করে । কবি হ্যালুসিনেশন সিরিজ’-এর কবিতার প্রাক্ কথনেই আমাদের জানান –‘...প্রতিদিন একটু একটু করে স্বপ্নভঙ্গের কারণে, ব্যক্তিগত মনোবিকলনের কারণে আমি তীব্র বিষন্নতার শিকার হয়েছিলুম । বিষাদ ও ইনসমনিয়া । তখন আত্মহত্যার প্রবণতাও দেখা দিয়েছিল ।  আসলে কবির সেই সময়ের প্রেক্ষাপট থেকেই এই কবিগুলি উঠে এসেছিল ।

“ তুমি যন্ত্রণায় নীল হয়ে যাও, আমি তোমাকে বলি / আকাশ / তুমি যন্ত্রণায় গলে গলে পড়ো, আমি তোমাকে বলি / বিষ / তুমি যন্ত্রণায় লীন হয়ে থাকো, আমি তোমাকে বলি / স্বপ্ন /এবং / তুমি যন্ত্রণায় বুকে রাখো মাথা, আমি ফিসফিস করে বলি / ‘থাকো ’ ”

হ্যালুসিনেশন সিরিজ’ কাব্যের উনচল্লিশ নম্বর কবিতাটি পড়লেই কবির নিজস্বতা বুঝতে আমাদের অসুবিধা হয় না । কবির কবিতার ভিতর এক ধরণের মূর্ছনা আছে। জীবনকে প্রচলিত ধারার থেকে সরে গিয়ে দেখার একটা প্রবণতা আছে । যা পাঠককে  বিচিত্র অনুভূতির দিকে নিয়ে যায় ।  

যেমন –“ মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে যায় ? নাকি ঘুমের ভিতর হেঁটে-হেঁটে আমি এসেছি / এই একা এক অভিশপ্ত মাঠে! / প্রতিটি ঘাসের ডগায় আগস্টশেষের হিম” (আট)

                                   কিংবা

“এমনই হয় / একা-একা চা বাগানের পাশে হিমে ভেজা ঘাসে থাকি শুয়ে / এমনই হতে থাকে / অবসন্ন বেতপাতাগুলো নেশারু সাপের মতো পড়ে নুয়ে / কেউ আসে না ” (সতেরো)

 

কবি বিকাশ সরকারের মেধা ও মনন এই দুই-তিনটে উদাহরণ থেকেই লক্ষিত হয় । আবার বিকাশ সরকার গদ্য সাহিত্যেও সিদ্ধহস্ত । প্রথম উপন্যাস ‘ আগুনের সেঁক’  লিখেছিলেন ১৬ বছর বয়সেই। এরপর পরবর্তী উপন্যাস লেখেন ‘লেন্দু রায়ের জিজীবিষা ’। এই উপন্যাস মূলত দুটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড । তবে তারা কেউ কেউকেটা   রাজনৈতিক নেতা নন । ছোট শহরের দুই নিষ্ঠাবান কর্মী, যারা আজও রাজনীতিকে মনে করেন সমাজ বদলানোর, অন্যায়-অবিচার- অসাম্য দূর করার হাতিয়ার ।  এই দুটি উপন্যাসকে একত্রে নিয়ে  এসেছে স্রোত প্রকাশনা । খুনি লেন্দু রায় এবং সাংবাদিক বিশেষ মজুমদার, এই দুই নায়ক-খলনায়ক চরিত্রকে ভিত্তি করে উপন্যাসিক বিকাশ রায়ের জীবন, রাজনীতির ভিতরে ঢুকে আরেক অভিনব এবং জটিল সমাজের রূপরেখা তুলে ধরেছেন আমাদের সামনে । আশাকরি পাঠকদের ভালো লাগবে । বইয়ের প্রচ্ছদ – পরিকাঠামো সবই মনোমুগ্ধকর ।

 

১) কবিতার বই ঃ  ‘হ্যালুসিনেশন সিরিজ’

কবি – বিকাশ সরকার

স্রোত প্রকাশনা / কুমারঘাট

মূল্য – ১০০ টাকা

 

২) উপন্যাস ঃ  ‘লেন্দু রায়ের জিজীবিষা

উপন্যাসিক  – বিকাশ সরকার

মূল্য – ২৫০ টাকা

স্রোত প্রকাশনা / কুমারঘাট

 

 

 

 

 

অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎

  'অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎ ‎সত্তর দশকের উন্মাদনায় এক ভিন্ন উচ্চারণ-ভঙ্গ...