‘তারা দেখার পাপ’ সুমন পাঠারী
‘কবির ভাবনা জগতের পরিভ্রমণ’
প্রত্যেক যুগ তার নিজের ভাষায় কথা বলে। সম্ভবত এইজন্যই প্রজন্মে প্রজন্মে
কাব্য তার ভাষা পালটে ফেলার চেষ্টা করে। সব যুগই তার মতো করে তার চারপাশকে দেখতে
চায়।বোঝতে চায়। কখনো খুব সচেতনভাবেই চায়। কখনো অবচেতনেই চায়। কবির কবিতা তো
চেতন-অবচেতনের লীলাক্ষেত্র। ‘অবশেষে ফিরে এলাম,/ জামা পেন্ট খুলে সামনে দাঁড়ালাম
-/... রক্ত এসে ভিজিয়ে দেয় নখের ডগা,/ নিথর হয়ে পড়ে মেরুদন্ড,/ যোনিময় ফুটতে থাকে
সাদা ভাত’( আয়না) ‘এখন ভাত খুঁজতে খুঁজতে বাবার সাথে বসার সুযোগ কম হয়,/... আমি
যদি দেশ হই তবে তিনি আমৃত্যু কৃষক’ (বাবা) প্রথম দশকের কবি সুমন পাঠারী-র দ্বিতীয়
কাব্যগ্রন্থ ‘তারা দেখার পাপ’-এর শুরুতেই আমরা একটা ভিন্ন সুরের ছুঁয়া পাই, যা
মনকে মুগ্ধ করে। ভরিয়ে দেয়। তরুণ কবির এই ভিন্নসুরের আশায় অনেকদিন থেকেই জন্য
অপেক্ষায় ছিলাম। ‘যোনিময় ফুটতে থাকে সাদা ভাত’– এই লাইন চমকায় বৈকি! পিঠও সটান করে
বসতে বাধ্য করে। এখানেই কবির প্রথম কৃতিত্ব।কবির টার্গেট এবং সটান গুলি-ছুঁড়ার
নিষ্ঠুরতা মুগ্ধ করে। ‘মধ্যরাতে জেগে উঠে কিছু মুখস্থ ব্যথা,/ জেগে উঠে বাসি
ফুল,/...প্রতি মধ্যরাতে আমি ভণ্ড হয়ে জাই,/প্রতি
মধ্যরাতে ইচ্ছা করেই বাস্তব বিমুখ হয়ে যাই।’(মধ্যরাত) কবির ভাবনা জগতের
পরিভ্রমণ, পাঠককেও একসময় জড়িয়ে ফেলে। কবি বাস্তব এবং স্বপ্নের দু’টানায় নিজেকেই
বৃত্তের মতো পরিক্রমা করেন বারবার।বিদ্ধও
করেন। ‘বেঁচে আছি, সুস্থ আছি, তাই বেশ ভালো আছি/ এতটুকুতেই যেন মন ভরে যায়
তোমার।/... প্ল্যাস্টিকের মোড়ক খুলে সত্য দেখানোর মতো/ এটা জেনে যেও ভালো আছি
আমি’(ভালো আছি) কবির শব্দ ব্যবহার, উপমার প্রয়োগ এবং বাক্যের আড়ালে নিজের চারপাশ
মাড়িয়ে বাস্তবের কাছাকাছি পা রাখা তার ক্ষমতাই প্রদর্শন করে। খুব অনাবিল অথচ
অন্যরকম একটা চিত্রকল্প দেখতে পাই ‘যাপন’ নামের এই কবিতায় – ‘সন্ধ্যায় বাবা ফিরে
আসে/ মা ধার করে আনে জ্যোৎস্না, গ্রাম-বাতাস,/তারপর তারা বসে গল্প করে,/ পাথর
ভাঙার গল্প,/ গলির আঁধারে জোনাকির গল্প’। এখানে আমরা পাই আনন্দপ্রকাশের ছবি ও
বিষয়মুক্ত রঙের গতিময় চলনের ছবি এবং বেদনা। কবির আরও কিছু
চিত্রকল্প ভাবিয়েছে, যেমন –‘আমার ঈশ্বর
জানেন আমি কবি হতে নয়/ ভালোবাসতে এসেছিলাম।’(আলুথালু) ‘বন্ধুত্বের মাঝে একটি ভাতের
পাহাড়,/ পার করে আসতে আসতে সন্ধ্যা ঘনায়।’(বন্ধু) এই সন্ধ্যা পাঠককেও মর্মাহত করে।
কবির অসংখ্য ভালো কবিতা মনকে যেমন টেনেছে, তেমনি খারাপ লেগেছে কবির অনেক কবিতা
মৌলিকতার দাবি রাখতে রাখতে কবির হাত থেকে অবচেতনেই ফসকে গেছে। সম্ভবত এখানেই কবি ও
কবিতার লুকোচুরি খেলা।তবে কবি সুমন
পাঠারী-র কবি-জীবনের শুরুতেই অনেক উচ্চতাকে ছুঁয়ে ফেলেছেন। এখন নিজেকে ধরে রাখতে
পারলে, তার কাছ থেকে আমাদের অনেক কিছু পাওয়ার আছে।কবিতার মূল কনসেপ্ট অনুযায়ী খুব
সুন্দর প্রচ্ছদ এঁকেছেন শিল্পী চারু পিন্টু।
‘তারা দেখার পাপ’
সুমন পাঠারী
প্রকাশকঃ নীহারিকা/ শ্যামলী বিপণী বিতান,
শ্যামলী বাজার, কুঞ্জবন/
আগরতলা, ত্রিপুরা(পঃ) পিন ৭৯৯০০৬
No comments:
Post a Comment