Tuesday, January 30, 2024

পদ্মশ্রী থাঙ্গা ডারলং ত্রিপুরা

 

 











বাবা হাগডংঙ্গা ও শ্বশুর দারঠোয়ামা-র  হাত ধরে বর্তমানে পৃথিবীর বিরলতম ‘রসেম’ বাদ্যযন্ত্রটি বাজাতে এবং বানাতে শিখেছিলেন আন্তর্জাতিকখ্যাত সম্পন্ন শিল্পী থাংঙ্গা ডারলং রসেম নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন জাপান,বাংলাদেশ, থাইল্যান্ডসহ গোটা ভারতবর্ষ । এই বিশেষ অবদানের জন্য  ভারত সরকার ২০১৫ সালে  তাঁকে সঙ্গীত নাটক অ্যাকাদেমী  সম্মানে সম্মানিত করে। কৈলাসহরের থেকে প্রায় পনেরো কিলোমিটার পাহাড়ি রাস্তা পেরিয়ে  ‘মুরাই বাড়ি ভিলেজ’-এ  আজ পঁচানব্বই বয়সেও তরুণ শিল্পী থাংঙ্গা ডারলং-এর সাথে একান্ত কথোপকথনে     মেতে উঠেছিলাম।

 

প্রশ্ন ঃ রসেম’-এর মত ব্যতিক্রমী বাদ্যযন্ত্রটি বাজানো প্রেরণা পেলেন কার কাছ থেকে ?

 

উত্তর ঃ আমার বাবা হাগডংঙ্গা ডারলং খুব ভালো রসেম বাজাতে পারতেন ।  এই যন্ত্রটি বারো বছর বয়সেই বাবা আমার হাতে তুলে দেন ।সেই থেকে শেখা শুরু আমার শ্বশুরও খুব ভালো রসেম বাজাতে ও বানাতে পারতেন । তাঁর  কাছেই আমার পরবর্তী যাবতীয় শিক্ষা ।তাঁর বাজানো সুর এখনও আমার কানে এগে রয়েছে যেন ...        

 

প্রশ্ন ঃ রসেম বাদ্যযন্ত্রটি সম্পর্কে আমাদের কিছু বলুন ?

 

উত্তর ঃ রসেম বাদ্যযন্ত্রটি আমাদের ডারলং উপজাতি একটি প্রাচীন লোকজ  বাদ্যযন্ত্র দেখতে অনেকটা পাশ্চাত্য ব্যাগপাইপার যন্ত্রের মত।  চেরো, বাঠুইন্দ, রিকিমাচুই, খোয়াল্লাম, দারথেম ,ডাররেমু  প্রভৃতি নাচের মধ্যে প্রধান সুরের যন্ত্রই হল এই রসেম আমি সব মিলিয়ে চব্বিশটি সুর বাজাতে পারি । এর মধ্যে বেশ কয়েকটি আমার সুর করা ।রসেম বাদ্যযন্ত্রটির আলাদা একটা রিদম আছে, মাত্রা আছে। যা আজ হারিয়ে যেতে বসেছে।

 

প্রশ্ন ঃ   রসেম  তৈরীর কৌশল প্রক্রিয়া  সম্পর্কে আমাদের যদি কিছু বলেন ?

 

উত্তর ঃ   ঔমনামক  এক ধরণের বনজ ফল যা অন্য কোন কাজে লাগে না। তার সাথে আরও সাতটি বাঁশের বাঁশি যোগ করে এটি তৈরি করা হয়। মধ্যে একটা ছোট একটা ধাতব পদার্থ ব্যবহার করা হয়।এই সময়ে ঔম ফলটিও দুর্লভ।    তাছাড়া শুধু ফল পেলই হয় না, ফলটিকে সাতটা বাঁশি সংযুক্ত করার মত  একটি বিশেষ আকৃতি সম্পন্ন  হতে হয় না-হলে আবার কোন কাজে আসবে না । কারণ এর প্রক্রিয়াহত জটিলতা অনেকওরা চেষ্টা করেছে। কিন্তু পারেনি । আমি যে ক’টা বানিয়ে দিয়ে গেছি, সেগুলো দিয়েই আগামিতে যদি কেউ বাজায়, তবে বাজাতে হবে।   

 

প্রশ্ন ঃ রসেম বাদ্যযন্ত্রটি কি বাজানো শেখাতে পেরেছেন ?

 

উত্তর ঃ আমার নাতি ক্লাঙ মিঙ্গা ছাড়া আরও তিনজনকে বাজানো শেখাতে পেরেছি।  তাও চব্বিশটা সুরের মধ্যে তারা কেবল চারটি শিখতে পেরেছে তাঁরাবাকিটা  এখনও শিখছে ।সবাই পারছেও না। আসলে সরগমের সাতটা সুর সাতটা বাঁশে যুক্ত করা খুব মুস্কিল । এরজন্য নাছোড়বান্দা  চেষ্টার পাশাপাশি  নিরলস সাধনা চাই একটু এদিক ওদিক হলেই সুর বেসুর হয়ে যায় ।

 

 

 

প্রশ্ন  রসেম নিয়ে মঞ্চ মাতিয়েছেন এ-পর্যন্ত কোথায় কোথায় ?

 

উত্তর ঃ এই বুড়ো বয়সে এসে সবগুলো তো আর মনে নেই তবে  রাজ্যের ‘তথ্য সংস্কৃতি দপ্তর,  ইষ্টার্ণ জোনাল ক্যালচারাল সেন্টার , সঙ্গীত নাট্য একাডেমি (দিল্লি), নর্থ ইষ্টার্ণ  জোনাল ক্যালচারাল সেন্টার, এরকম প্রতিষ্ঠানের বহু আমন্ত্রণে  বহু জায়গায় গিয়ে  অনুষ্ঠান করেছি । কলকাতা, পাটনা , দিল্লি, ২০০০ সালে জাপান সরকারের আমন্ত্রণে দুই মাস সেখানে থেকে একের পের এক অনুষ্ঠান করেছি । ২০০১ সালে বাংলাদেশ, ২০০২ সালে থাইল্যান্ডবর্তমান ত্রিপুরার রাজ্যপাল মহামহিম তথাগত রায়-কেও শুনিয়ে এসেছি ।

 

 

প্রশ্ন ঃ আপনার জাপানে অনুষ্ঠান করার অভিজ্ঞতা নিয়ে আমাদের কিছু বলুন ?

 

উত্তর ঃ (জা-পা-ন  বলে এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন) সে এক বিচিত্র অভিজ্ঞতাপ্রতিদিন  বিরামহীন দ্বীপ থেকে  দ্বীপান্তরে কখনো গাড়ি, কখনো  জাহাজে আট ঘণ্টা সমুদ্র পথ পাড়ি দিয়ে একের পর এক ভিন্ন জায়গায়  অনুষ্ঠান করতে হত । ওরা খুব সুশৃঙ্খল এক মিনিট সময়ও ওরা নষ্ট করতো না ।

 

প্রশ্ন ঃ আপনার জীবনের সবচেয়ে  আনন্দঘন মুহূর্ত –

 

উত্তরঃ ২০১৪ সালে মহামহিম রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যয়-এর কাছ থেকেসঙ্গীত নাটক অ্যাকাদেমী সম্মান গ্রহণ করা সেখানে  এত এত গুণিজনের সামনে নিজেকে  দেখে খুব ভালো লাগছিল। জীবনে এই সম্মান কোনদিন পাবো ভাবতে পারিনি । 

 

প্রশ্ন ঃ  কোন দুঃখ যা আপনাকে প্রায়ই তাড়িত করে ?

 

উত্তর ঃ  রসেম আমার জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত । রসেম সম্পর্কে যা জানি , তাঁর তেমন কিছুই দিয়ে যেতে পারছি না। পঁচানব্বুই বছর হয়েছে আর কতদিন বাঁচবো কে জানে ? এক্ষেত্রে সম্ভবত আমার সাথেই রসেম-এর গৌরবময় ইতিহাসের সমাপ্তি হতে চলেছে । এই বোধ  যখনই চিন্তায় কাজ করে তখনই মনটা ভারী হয়ে উঠে । অথচ নীরবে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না

প্রশ্ন ঃ কোন অব্যক্ত কথা যা বলা হয়নি –

উত্তর ঃ আমি ‘রসেম’ বাদ্যযন্ত্রটি শেখাবার জন্য একটি কোচিং সেন্টার খুলতে চাই। যেখানে জাতিবর্ণ নির্বিশেষে সব ইচ্ছুক ছাত্রছাত্রীরা বিনামূল্যে রসেম বাদ্যযন্ত্রটি শেখাতে পারবেকোথায় জাপান থেকে এসে আমার কাছ থেকে শিখে গেছে! সেখানে আমার দেশের লোক শিখবে না ? ভারত সরকারের ‘সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়’ আমাকে সে সুযোগ করে দিলে আমি খুব খুশি হবো।ভারত সরকার আমার কৃতিত্বের জন্য ২০১ সালে ‘সঙ্গীত নাটক অ্যাকাদেমী’  সম্মানে  সম্মানিত করেছে, তাঁর ভিত্তিতেই আমার এই প্রার্থনা না-হলে একটা দায় অসম্পূর্ণ রেখেই  আমাকে এই পৃথিবী থেকে চলে যেতে হবে।   

 

 

@@  আরও একবার পদ্মশ্রী থাংঙ্গা ডারলং-এর বাড়ির প্রাঙ্গণে @@

 

পদ্মশ্রী থাংঙ্গা ডারলং-এর সাথে আমার সম্পর্ক বেশ নিবিড় বলতে পারি। ঊণকোটি যাওয়ার পথে পড়বে  চিরাকুটি। চিরাকুটি থেকে ডান দিকে একটি পিচ রাস্তা চলে গেছে।  প্রথমে পড়ে  ভগবান নগর, তারপর দেবস্তল, দেওরা, এরপর আসে মুরাই বাড়ি।  জনবসতি খুবই কম। জনবিরল। প্রকৃতির হাতছানি চারদিকে। একটা নীরবতা মনকে গ্রাস করে। মনের ভিতর গুনগুণ করতে থাকে প্রেম। শহরের শব্দ-দূষণ, বায়ু-দূষণ, দৃশ্য-দূষণ, বিবেক-দূষণ থেকে একটু দূরে, নিজেকে পেয়ে নিজেই  আনন্দে মেতে উঠলাম। সাথে ছিল জগৎজ্যোতি। প্রায় সাত কিলোমিটার পর গিয়ে পৌঁছলাম ত্রিপুরার গর্ব, ডারলং সম্প্রদায়ের গর্ব, ঊণকোটির অহংকার, ভারতের সম্পদ থাংঙ্গা ডারলং-এর  বাড়ি। আজ থেকে চার বছর আগে যখন গিয়েছিলাম নাট্যশিল্পী  বিল্টনের সাথে তখন রাস্তাটা পাকা ছিল না। রাস্তার কাছ চলছিল। খুবই কষ্ট হয়েছিল যেতে। এবার আর তেমন কোন কষ্ট হল না। শিল্পীকে উঠোনেই পেলাম। তিনি আমাকে দেখে খুবই আপ্লুত হলেন। তাঁকে মিষ্টিমুখ করালাম। তাঁর অনুভূতি জানতে চাইলাম! তাঁকে তার ভাতিজা প্রথম সংবাদটা জানায়। তিনি খুশি। যদিও পুরো বিষয়টা তিনি বুঝতে পারছেন না।  তার চিন্তা তিনি দিল্লি কীভাবে যাবেন আবার?  আকাশে উড়ে যাবেন  বোঝতে পারছেন কিন্তু এত টাকা কোথায় পাবেন! আলাপ করে জানলামসঙ্গীত নাটক অ্যাকাদেমী সম্মান গ্রহণের সময়ও তাঁকে  বিমান ভাড়া সংগ্রহ করতে হয়েছিল পরে  যদিও  সব টাকা সরকার থেকে পেয়ে যান। তবু, প্রাথমিক এই টাকা কোথা থেকে পাবেন, এই নিয়ে দুঃশ্চিন্তা করছেন। তবে, তিনি খুবই খুশি রাষ্ট্রপতির সাথে উনার দেখা হবে। তিনি এই অসুস্থ শরীরেও ভারতের রাষ্ট্রপতির জন্য তিনি নিজ হাতে একটিরসেমবাঁশিতৈরি করেছেন তাঁর খুব শখ তিনি নিজ হাতে মহামহিম রাষ্ট্রপতির  হাতে এই বাঁশিটি উপহার দেবেন।

এইসব নিয়েই আজ নানা কথা হল। চারছেলে, চার মেয়ে সন্তান তাঁর।  বর্তমানে চোদ্দ জনের  পরিবার তাঁর।   আগে যে বাড়িটা জীর্ণ দেখেছিলাম, সেটা ভেঙে, এখন অর্ধেক হয়ে গেছে। তিনি বৃদ্ধ ভাতা পান।  এছাড়া আর কোন ধরণের ভাতা পান না। পরিবারে কোন সরকারী কর্মচারী নেই। ফলে, ঘর ঠিক করা হয়ে ওঠেনি। ছেলে-মেয়ে, নাতি কারো কোন ধরণের সরকারী চাকরি নেই। সবাই শ্রমজীবী। বর্তমানে এক নাতি বাঁশি বাজাতে পারে চারটি সুর।  তিনি ২৮ টি সুরে বাঁশি বাজাতে পারেন। কিন্তু বাজনাটি শেখা বেশ কষ্টসাধ্য। তাই তাঁর মতো করে, তারা শিখতে পারছে না। তিনি এখনও সবাইকে শেখাতে ইচ্ছুক। কিন্তু তাঁর জন্য পরিকাঠামো  চান তিনি।

(যাই হোক, আজকে পদ্মশ্রী থাংঙ্গা ডারলং-এর সাথে  কাটানোর কিছু মুহূর্ত, কিছু কথা তুলে ধরলাম।  আপনাদের ভাল লাগবে আশাকরি। তাঁকে তিনি আরও আলোচনা, মন্থন হবে আশাকরি। তাঁর জন্য আমরা সবাই আরও একটু মরমী হয়ে চিন্তা-ভাবনা করবো  আশাকরি। সরকার তার মতো শুভকিছু চিন্তা করবে আশা রাখছি। বিগত কেউ কিছু করেনি বলে,আগামিতেও কেউ কিছু করবে না, এতটা হতাশ নাই বা হলাম। আমাদের সম্পদকে আমাদের সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। তাঁকে প্রনাম জানিয়ে এইবারের মতো বিদায় নেই। কথা দিয়েছি, দিল্লি  থেকে এলে আবার আসবো  )

 

এই পর্যন্ত সব ঠিকই ছিল। বাড়ি এলাম বিকেলে। আসতে আসতে অনেক কথাই ভাবছিলাম।থাংঙ্গা ডারলং-এর সাথে  আলোচনার সময় নাতি বারবার তাঁর দাদুকে তার চাকরির কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল। সরকারের কাছে আপনি কি চান ? এই কথা      

 

 





No comments:

Post a Comment

অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎

  'অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎ ‎সত্তর দশকের উন্মাদনায় এক ভিন্ন উচ্চারণ-ভঙ্গ...