দুঃখই কবিকে জারিত করে কবিতার দিকে নিয়ে যায়
সত্যজিৎ দত্ত আশির দশকের একজন শক্তিশালী কবি এবং গল্পকার । সব্যসাচীর মতো দুটো বিভাগেই তার সফল চলাচল । দীর্ঘ কয়েক দশক লেখার পর ২০২১ সালের আগরতলা বইমেলায় প্রকাশিত হয় তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ “ নীল পদ্মপুরাণ ও অন্যান্য কবিতা” । এরপরই বের হয় তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ “অন্তরমহল” । “ এখন সুখের জন্য প্রেম চেয়ে / অসুখের আঘ্রাণ নাও,/ মন খারাপের বালিশে থাকো / পাশ ফিরে” ( দাম্পত্য- তিন) “ তুমি তো আলোকলতা ! জ্যোৎস্নায় রেখে মন / মাপতে চাইছো পূর্ণিমায় গ্রহণের বিস্তার / গান নেই, কথা নেই, সুর নেই আজ / উত্তরের পৃষ্ঠা খুঁজতে বসে, ছিঁড়ে গেল বেহালার তার” (আলোকলতা) “ পৃথিবীর যাবতীয় কবিতা / আসলেই সংকেত মাত্র।” ( সংকেত) এভাবে তিনটে কবিতা পড়ার পরই বুঝলাম কবি খুবই ধীর পায়ে কবিতায় শব্দের বুননে বিশ্বাসী । নিজস্ব অনুভবকে খুব যত্নে কুড়িয়ে কুড়িয়ে তুলে আনেন কবিতায় । তাই তিনি লিখতে পারেন- “ শীত এলে পাতারাই ঝরে নির্বিরোধে / অহংকারের পায়ের নিচে গুঁড়ো হয়ে যেতে থাকে / বিগত যৌবনের ক্লোরোফিল” (হাইবারনেশন) কিংবা “ যেকোন নামেই ডাকতে পারো আমাকে / প্রমথরঞ্জন অথবা দিগন্ত রায় / এপিটাফে বহুদিন আগে লিখে রেখেছি,/ জীবন সত্য, নামে কী-বা এসে যায়!” (এপিটাফ-দুই)
এভাবেই কবি ছোটো ছোটো উপলব্ধিকে পুঁজি করে এগিয়ে চলেন বড়
বড় আত্মপোলব্ধির দিকে । সত্যজিৎ দত্তের কবিতায় মায়াবী একটা সুর আছে । প্লট
নির্বাচন আছে । সে তুলনায় চিৎকার- উচ্চ-শব্দাবলীর চাপ নেই । যা অনুভব করেন, বলেন চুপিসারে । সটান । “ জমাট বাঁধা কথাদের টুকরো টুকরো বরফ / খানখান করে ভেঙে দিচ্ছিল নৈশব্দ / সেইসব স্মৃতি আজ কেন
ভেসে এলো / নভেম্বর রাতে / বৃষ্টিতে আটকেই কি তবে কেটে যায় / এক একটা জীবন / এক একটা দহন” ( ১০ই
জুলাই,
১৯৯৪) ।
কবি যদিও তার
কাব্যের ভূমিকায় বলেই দিয়েছেন –
“ মহামারি, লক-ডাউন, অসুখের কব্লে হোম আইসোলেশনে কাটানো অনিশ্চিত
দিনরাত্রি; আমাকে খুঁড়ে দেখতে শিখিয়েছে বুকের ভেতর যন্ত্রণার ছটফট । আত্মগত এই কালখণ্ডে, লিখতে প্ররোচিত করেছে।” কাব্যটি পড়তে পড়তে এই কবিকেই পেয়েছি ঘুরেফিরে । প্রেম-ব্যথা-বেদনায় কবি যেন তার নিজেই নিংড়ে দেখেছেন “অন্তরমহল”
কাব্যে । সম্প্রতি প্রয়াত মাকে নিয়ে লিখেছেন অসাধারণ কবিতা – “ আগুন টেনে নিল তোমাকে! / আমি এগিয়ে দিলাম / চন্দন কাঠ, ধূপের গুঁড়ো / এবং যাবতীয় দাহ্য / জলমগ্ন জঠর !/ আমাকে কাঁদাও পুনর্বার” (মা)।
কবির প্রতি রইল শুভ কামনা । দুঃখই কবিকে জারিত
করে কবিতার দিকে নিয়ে যায় । নীরবে কলম তুলে দেয় তার হাতে ।
কাব্যগ্রন্থ - “অন্তরমহল”
কবি –
সত্যজিৎ দত্ত
প্রকাশক – নীহারিকা পাবলিশার্স / আগরতলা
গল্পের বাঁকে বাঁকে জীবনের অদ্ভুত চিত্রকথা
গল্প কি শুধু ঘটনার মাঝেই লুকিয়ে থাকে ? মনে
হয় না । গল্প বলার ঢং-ও জানতে হয় গল্পকারকে । সেটা যে যত ভাল জানে, সে তত গল্পকার
নিঃসন্দেহে । ‘আকাল’ গল্পে লেখিকা গ্রামের একটি পরিস্থিতি তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন
। কিন্তু গ্রামের বর্ণনার আড়ালে গল্পকে নিয়ে যান টানটান এক পরিস্থিতির দিকে । ‘এক
অভাগী গ্রাম থেকে এখন প্রায়ই কিশোরী- যুবতী মেয়েরা উধাও হয়ে যায়।’ গল্পের শেষে এক
ভয়াবহ বাস্তবতার সামনে গল্পকার দাঁড় করিয়েও সরাসরি কিছু বলেননি । কেবল সরল শিশুর
প্রশ্নের উত্তরে এক মায়ের মুখ দিয়ে উচ্চারণ করালেন ‘ ও কিছু না । কারও মুরগির ঘরের
ভাঙ্গা দরজা দিয়ে শেয়াল ঢুকেছে বোধহয় ।’ এখানেই গল্পের ইতি টানেন । কিন্তু গল্প
শেষ হয় না । পাঠককে নিয়ে যায় আরও দীর্ঘপথ । আসলে এখানে গল্পকার দেবাশ্রিতা
চৌধুরী-র দক্ষতা । ‘ হাঁড়ি’ দেবী’ ‘ যাযাবর’ ‘ কুসুম’ ‘অচেনা গল্প’ ‘উজাগর’ প্রায়
প্রতিটি গল্পের ভিতরেই লেখিকা তার প্রতিভার সাক্ষর রেখে গেছেন দারুণ মুনশিয়ানায় । প্রতিটি
গল্পই একশ্বাসে না-পড়া পর্যন্ত শান্তি পাওয়া যায় না । অর্পিতা আচার্য কবি-গল্পকার
। মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপিকা । ফলে তার গল্প- কবিতায় অনায়াসে বিচরণ করে মনের বিচিত্র
জগতের রহস্য । এখানেও তার ব্যতিক্রম হয়নি । ‘অন্ধকার’ গল্পেও আমরা মৌনীর অন্ধকারময়
মনোজগতের দেখা পাই । শাহিনের জন্য তার গুমরে ওঠা কান্না দেখতে পাই । গল্পকার শেষ
লাইনে লিখলেন - ‘সে এখন অন্ধকার খাবে,
অন্ধকার মাখবে, অন্ধকারে গান গাইবে ...
একা’ কোনও দাঁড়ি, কমা ছাড়া শেষ হয়েও শেষ হয় না গল্পটা । মননের ভিতরে গুঞ্জরিত হতে
থাকে মৌনীর অন্ধকার । অনুগল্পের ঢঙে লেখা প্রায় প্রতিটি লেখা, দারুণ মুগ্ধ করে ।
‘সাপ’ গল্পটাও বড় ব্যঞ্জনাধর্মী । ‘সারাদিইনি তো বই পড়ে অনিন্দ্য । বইয়ের মধ্যে
খায়, বইয়ের মধ্যে ঘুমায় । শুধু মধ্যরাতে...’ তবে কি এখানেই গল্পকারের দুঃখ ? না,
একটু এগোলে আমরা আরও ভিন্ন কিছু দেখতে পাই । গল্পকার শেষ লাইনে এসে লিখছেন – ‘
সবুজ সাপের মতো শাড়িটা গায়ে জড়িয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমি হেসে উঠি খিলখিল করে।’
এই হাসি ক্রমেই আলোর মতো বিচ্ছুরিত হয় । কিন্তু এই বিচ্ছুরণ কীসের ? চর্ম আনন্দের
না বেদনার ? মনোজগতের এই অন্ধকার জীবনে উঁকি দিয়ে চরিত্রটিকে বোঝার চেষ্টা করতে
থাকেন গল্পকার । অর্পিতা আচার্যকে পাঠের অন্যরকম একটা মেজাজ আছে । তার গল্পের
প্রতিটি চরিত্রই বিচরণ করে জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা, দুঃখ-বেদনা- সংঘর্ষের ভিতর
দিয়ে । ফলে তার গল্প পাঠে অন্য একটা মাত্রা পাওয়া যায় । ‘ট্রিকোটিলোম্যানিয়া’
গল্পও এক ভিন্ন স্বাদে আনে মনোজগতে । এটাও একটা মনোবিজ্ঞানের টার্ম । ‘লোমশ শরীরটা
গায়ে লাগলে রিয়ার শরীর শিরশির করে ওঠে । মনে পড়ে যায়... ‘ । না, গল্পকার এখানে আর বেশি কিছু ইঙ্গিতেও লেখেননি এব্যাপারে । রিয়ার জীবনের গোপন যন্ত্রণার কথা
এভাবেই গল্পে তুলে ধরেন তিনি । ‘ পাহাড়ি সন্ধ্যা’, ‘কেস নম্বর তেরো’, ‘ভয়’ প্রতিটি
গল্পই অনবদ্য পারদর্শিতায় সাজিয়েছেন লেখিকা ।
‘পিতলের পিলসুজ’ গ্রন্থটি লেখিকা দুই বোনের
এক মনোরম সৃষ্টি । বইটি তারা উৎসর্গ করেছেন তাদের তৃতীয় বোন দেবাদৃতাকে । প্রচ্ছদ
করেছেন তীর্খঙ্কর দাস । ত্রিপুরার গল্পে
এই বইটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে আশাকরি ।
“ পিতলের পিলসুজ”
লেখক – দেবাশ্রিতা চৌধুরী, অর্পিতা আচার্য
প্রকাশক – নীহারিকা
No comments:
Post a Comment