ফ্ল্যাপের লেখা
‘জাফর সাদেক - নিহত রাত্রির দরজা পাঠ পুনঃপাঠ’ – এই বইটি শুধু বই নয়, ত্রিপুরার কবিতাচর্চার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল । কথিতই আছে, জাফর সাদেক ত্রিপুরার বাংলা কবিতাচর্চায় এক দীঘলবাঁক । এই বাঁককে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই ত্রিপুরার কবিতাচর্চায় । বহু দশকের প্রতীক্ষার পর ‘নিহত রাত্রির দরজা’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের সাথে সাথে তার প্রতিটি কবিতার গভীরতাকে পরখ করে দেখার চেষ্টা করেছেন ত্রিপুরার আরেক বিশিষ্ট কবি-আলোচক তমালশেখর দে । তিনি তাঁর দক্ষ লেখনীর মাধ্যমে প্রতিটি কবিতাকে বিশ্লেষণ করে দেখাবার চেষ্টা করেছেন, জাফর সাদেকের কবিতার কেন কোনো পূর্বসূরি নেই, উত্তরসূরিও নেই । এমনই স্বতন্ত্র তাঁর কাব্যভাষা । আশা করি আমাদের প্রকাশনীর ‘জাফর সাদেক - নিহত রাত্রির দরজা পাঠ পুনঃপাঠ’ এই বইটি আপনাদের মুগ্ধ করবে । ঋদ্ধ করবে ।
যে কথাগুলো না-বললেই নয়
আমার সৌভাগ্য যে, ধর্মনগর সরকারি গ্রন্থাগারে বই নিয়ে ঘাটাঘাটি করতে গিয়ে হঠাৎ করেই একদিন জাফর সাদেকের ‘নিহত রাত্রির দরজা’ কাব্যগ্রন্থটি খুঁজে পেয়ে যাই । এর আগে অবশ্য কবির নাম শুনেছিলাম । মূলত তখন থেকেই প্রয়াত তরুণ এই কবির কবিতা পড়ার জন্য আমি মুখিয়ে ছিলাম । আর সেই মোক্ষম সময়েই কাব্যটি সৌভাগ্যক্রমে পেয়ে যাই গ্রন্থাগারে । যথারীতি কাব্যটি আমাকেও মাতাল করে তোলে । তখন জানলাম জাফর সাদেককে নিয়ে ত্রিপুরার কোথাও এককভাবে বিস্তারিত আলোচনা হয়নি । ‘নিহত রাত্রির দরজা’ কাব্যগ্রন্থটির রিভিউ দু-এক জায়গায় আলোচিত হয়েছে, কিন্তু এর বেশি কিছু কোথাও কিছু হয়নি । মূলত তখনই আমার জাফর সাদেককে নিয়ে বিস্তারিত কাজ করার ইচ্ছে জাগে । কবি সন্তোষ রায়কে আমার মনের কথা বলতেই, তিনি আমাকে খুব উৎসাহ দিলেন এবং ‘জলজ’ লিটল ম্যাগজিনে ধারাবাহিকভাবে লেখার সুযোগ করে দিলেন । সালটা ২০০৭ । ধারাবাহিক লিখতে লাগলাম । এবং বেশ সাড়াও পেলাম । ২০০৯ সালে “স্রোত প্রকাশনা” থেকে ‘শক্তিপদ জাফর, সেলিম ও অন্যান্য’ প্রবন্ধের বইয়ে সেটা গ্রন্থ আকারে প্রকাশিতও হয় । কিন্তু আজ ১৫ বছর পর আবারও কবি জাফর সাদেককে নিয়ে কাজ করতে ইচ্ছে হল । মনে হল জাফর সাদেককে নিয়ে আরও বিশাল পরিসরে একটা কাজ করা খুবই প্রয়োজন । সময়ের দাবিও বটে। সেই তাগিদ থেকেই এই বইয়ের অবতারণা । তাছাড়া ‘নিহত রাত্রির দরজা’ বইটি প্রকাশের পরপরই প্রায় নিঃশেষ হয়ে যায় সেই ১৯৯১ সালেই । এরপর থেকে বইটি আর প্রাকশিত হয়নি নানাবিধ কারণে । আমি ‘নিহত রাত্রির দরজা’ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশের সাথে সাথে কাব্যগ্রন্থটির বিস্তারিত আলোচনাও একসূত্রে বেঁধে দিয়েছি । এতে পাঠকদের দুটো সুবিধাই এক সাথে হয়ে যাচ্ছে । গ্রন্থটি পড়া এবং তার সম্পর্কে আলোচনাও এক পরিসরে পাওয়া হয়ে যাচ্ছে । সেই অর্থে বইটি নিয়ে আমি খুবই উৎসাহী । জাফর সাদেককে নিয়ে কাজ করতে পেরে আমি যারপর নাই আনন্দিত । তবে এই কাজটি করা সহজ হত না যদি-না কবির বড় ভাই কবি আকবর আহমেদের আন্তরিক সহযোগিতা পেতাম । তিনি আমাকে ‘নিহত রাত্রির দরজা’ কাব্যগ্রন্থটি পুনরায় প্রকাশের অনুমতি দিয়ে কৃতার্থ করেছেন । তার কাছে আমি কৃতজ্ঞ । এই কাজটি করতে গিয়ে বিশালগড় কবির বাড়ি যেতে হয়েছে । কবির যাপনকে অনুভব করতে এতে আমার খুব সুবিধা হয়েছে । কবির বন্ধুদের সাথেও কথা হয়েছে । পরিবারের অন্যান্যদের সাথেও কথা হয়েছে । ভাই-বোনদের সাথে তো অবশ্যই । কবির বাড়ির পরিবেশ, তার চারপাশ আমাকে মুগ্ধ করেছে । সত্যিই ব্যক্তি জাফর সাদেক কবিতাকে অবলম্বন করেই বেঁচে ছিলেন । কবিতাই ছিল তাঁর প্রাণভ্রমরা ।
জাফর সাদেককে নিয়ে আমার এই সামগ্রিক প্রচেষ্টা যদি আপনাদের ভালো লাগলে, সেটাই হবে আমার প্রাপ্তি ।
বিনীত
তমালশেখর দে
নিহত রাত্রির দরজা
জাফর সাদেক
স্পন্দন
হরিগঙ্গা বসাক রোড, আগরতলা ৭৯৯০০১
৯ কালীবাড়ি রোড, কলকাতা ৭০০০৩২
নতুন সংস্করণ ঃ আগরতলা বইমেলা, মার্চ ১৯৯৫
প্রথম প্রকাশ ঃ ফেব্রুয়ারি , ১৯৯১
স্বত্ব ঃ আবদুল খালেক
প্রচ্ছদ ঃ কৃষ্ণধন আচার্য
নির্মাণ সম্পাদনা ঃ প্রবুদ্ধসুন্দর কর
প্রকাশক ঃ ননীবালা বন্দ্যোপাধ্যায় ।। স্পন্দন ।।
৯, কালীবাড়ি রোড, কলকাতা ৭০০০৩২
মুদ্রক ঃ তরুণ প্রিন্টার্স, ২৯ কলেজ ষ্ট্রীট
কলকাতা ৭৩
মূল্য ঃ কুড়ি টাকা
যদি এই সংঘবদ্ধ কণ্ঠস্বরকে প্রমাণ বলি ।
সময়মুগ্ধ প্রকাশকে আর দূরে টানবো কেন ?
যেহেতু মেলে দেওয়া আছে ঘরে বাইরে অথবা সোজাসুজি মানুষের কাছে
ব্যস নিবেদ রাখলাম শ্রেষ্ঠ মুহূর্তের ।
বিষবৃক্ষের নীচে যে একাকিত্বের আলিঙ্গন আমি সহ্য করতে পারলাম না
তার মাত্রা, স্পর্শ রূপ রস গন্ধ মোহ প্রেম বিরহ যোগ আত্মিক প্রতীক
একে একে সবার কাছে গেলাম
কবিতার কাছে যেতে পেরেছি তো ?
জীবনের গেয় মানচিত্র তুলতে গিয়ে
হয়তো কখনো গুণে ফেলেছি আকাশের নক্ষত্র ।
জন্মদাকে ভুলতে গিয়ে দাঁড়িয়ে গেছি
কবরের পাশে ।
না, আমি দরজার সামনে এসেই দাঁড়ালাম ।
পাঠক- পাঠিকাগণ আমাকে ভেতরে প্রবেশ করতে দিন ।
এ আমার প্রাণের প্রথম ঝাঁপি তোলা ।
হে উদ্ধারকারীগণ অশেষ ঋণ জমা রইলো ।
# জাফর সাদেক
আমার স্মৃতির মোক্ষণ
বিধাতার কঠোর নিয়মের শিকার আমার ছোট ভাই এর স্মৃতিতে আপনাদের সামনে আমার প্রথম জবানবন্দী । হ্যাঁআমিই – আপনারা যাকে কবি জাফর সাদেক বলেন, তার হতভাগা লক্ষ্মীছাড়া বড় ভাই । এ এক অভিশপ্ত পরিবারের আত্মকথা ।
ত্রিপুরার বিশালগড় থেকে আড়াই কিলোমিটার পূর্বদিকে ২নং চন্দ্রনগর নামে অজ গাঁয়ে এক কৃষক পরিবারে জন্ম আমাদের দাদুর অর্থাৎ কবি জাফর সাদেকের দাদু ছৈয়দ আলী (শিক্ষক) । পিতা স্বর্গীয় নেজামত খাঁ । নেজামত খাঁর একমাত্র পুত্রসন্তান ছৈয়দ আলীর লেখাপড়ার হাতেখড়ি পিতার কাছেই । এরপর বিশালগড়ের তৎকালীন শ্রেষ্ঠ কবিরাজ ও শিক্ষক স্বর্গীয় বিধুভূষণ ভট্টাচার্যের কাছে। এরপর ছৈয়দ আলীকে ভর্তি করা হয় তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ কুমিল্লার ইউসুফ স্কুলে । সেখান থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে কলা বিভাগে ভর্তি হন । ১৯৩৩ সালে ঐ কলেজ থেকে ডিস্টিংশন সহ স্নাতক হন । তিনিই ছিলেন বিশালগড় এলাকার প্রথম স্নাতক । এই কথাগুলো ছোটবেলা ঠাকুরমার কাছ থেকে শোনা । আর শুনতাম স্বর্গীয় বিধুভূষণ ভট্টাচার্যের কৃতি সন্তান বিশ্বভূষণ ভট্টাচার্যের মুখে । বিশ্বভূষণ প্রায় দিনই স্কুল থেকে ফেরার পথে আমাদের বাড়ি হয়ে যেতেন এবং আমাদের বলতেন – তোদের দাদু আমার বাবার ছাত্র, আমি তোর দাদুর ছাত্র এবং তোর বাবা আমার ছাত্র । ছোটবেলায় এই কথাগুলো শুনে আমি আর জাফর খুব আনন্দ পেতাম । আমি আর জাফর তাঁর ছোট ভাই মৌলীভূষণ ভট্টাচার্যের কাছে পড়েছি ।
১৯৩৩ সালে স্নাতক হওয়ার পর ১৯৪৩ পর্যন্ত এই দীর্ঘ সময় আমাদের দাদু বিশালগড়ের প্রথম স্কুল (বাজারের পাশে) বর্তমানে যেখানে Girls High School সেই স্কুলে প্রধান শিক্ষকের পদে শিক্ষকতা করেছেন । ঐ সময় দাদু কবিতা লিখতেন । উনার কিছু কিছু কবিতা তৎকালীন কলিকাতা থেকে প্রকাশিত প্রবাসী এবং মোহাম্মদীয়া পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল । দু’একটি কবিতা আজও আমাদের সংগ্রহে আছে । তারপর ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে ১৯৪৩ সালেই একদিন স্কুলে দাদুর মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটে এবং ১৯৮৮ সালে জুন মাসের এক গভীর রাতে চিরদিনের মতো নিরুদ্দেশ হয়ে যান । অনেকেই বলে থাকেন বর্তমানে বাংলাদেশের লেইশারায় দাশগুপ্ত নামে এক দরবেশ এসেছিলেন অনর্গল ইংরেজি বলতেন এবং শুধু লিখে যেতেন । ঐ দরবেশের সংস্পর্শে এসে তাঁর কাগজপত্র পড়ে নাকি দাদুর মস্তিষ্কবিকৃতি ঘটেছিল । নিরুদ্দেশ হওয়াকালীন তিনি এক পুত্র ও দুই কন্যা রেখে যান । তারা তখন ৩-৪-৫ বৎসরের শিশু । ঐ পুত্র হলেন আমার হতভাগ্য পিতা আবদুল খালেক । পাগল হয়ে যাওয়ার ভয়ে দশম শ্রেণির পর আমার বাবার লেখাপড়া বন্ধ করে দেওয়া হয় । কিন্তু লেখাপড়া করে যাচ্ছেন সারাজীবন ধরে । নিজের ঘরকে তৈরি করেছেন মিনি লাইব্রেরীতে । বাবাও কবিতা লিখতেন । হয়তো কবি হওয়ার জন্যে নয় । নেশা হিসেবে । সেই সূত্রে আমরা অনেক কবির বই হাতে পেয়েছি ছোটবেলায় । সেজন্যই বোধহয় সাহিত্যের প্রতি কবিতার প্রতি এতটা ঝোঁক ছিল জাফরের ।বাবাও দীর্ঘকাল ধরে রোগে ভুগছেন । ছোটবেলা থেকেই বাতের রোগ । এরই মাঝে ১৪ বার ম্যালিনা হয়ে গেছে । কোন রকমে বেঁচে আছেন, শুনলে ডাক্তাররাও আঁৎকে উঠেন ।
এবার শুনুন ছোটবেলায় মধু আর কলা চুপি চুপি খাওয়ার সাথী, রাতে মায়ের পাশে শোওয়া নিয়ে ঝগড়া করার সাথী, মাছ ধরার সাথী, জ্যৈষ্ঠের দুপুরে আম কুড়োবার সাথী, কঞ্চি দিয়ে পাখী ধরার সাথী, ঘুড়ি উড়ানোর সাথী, শীতের সকালে খেজুর রস খাওয়ার সাথী, ডাংগুটি খেলার সাথী, বল খেলার সাথী, ছোটবেলার খাসী ছাগল চরানোর সাথী, স্কুলে যাওয়ার সাথী, সাইকেল চালানোর সাথী জাফর সাদেকের কথা ।
এখন প্রতিক্ষণে মনে শুধু উথলে ওঠে বিগত সেই ১৮-১৯ বছরের ঘটনা । আর বাকী জীবনটাও হয়তো এভাবে স্মৃতিচারণ করতে করতেই কেটে যাবে । ৬ বৎসরের জাফর ডিপথেরিয়ার মত মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হয়েছিল । V. M. Hospital-এ ডাঃ শীল এর হাতে অপারেশান হয় গলায় । প্রথম দফায় বেঁচে যায়, অসুখ ভাল হয়ে বাড়ী ফিরতে বড় ভাইয়ের জন্য শার্ট, নিজের জন্য স্কুলে বই নেওয়ার বাক্স আর ছোট বোনের জন্য খেলনার বাক্স নিয়ে আসে । রোগ সেরে গেলে সব ভুলে যায় জাফর, কোন কিছুই যেন তাকে দমাতে পারবে না । ৮-৯ বৎসর বয়সে Rheumatic fever- এর চিকিৎসা করেন বিশালগড় Hospital –এর ডাঃ বিধান দাস । এরপর ১৪-১৫ বৎসর বয়সে ধরা পড়ে Rheumatic heart fever অর্থাৎ বাত জ্বর থেকে Heart- এ attack এর চিকিৎসা করেন - Dr. S. K. Datta । তিনি বলেন ১৪-২৫ বৎসর বয়স পর্যন্ত Benzyl Penicillin (Penedure/Pencom) inj. এক মাস অন্তর অন্তর সাথে cardioxin Tab. ব্যবহারে সেরে যাবে । সেই থেকে নিয়মিত ঔষধ চলছে । এরপর নাক দিয়ে রক্ত পড়া শুরু হয় । দু-দুবার G. B. Hospital-এ ভর্তি করা হয় । চিকিৎসা করেছেন Dr. P.Roy এবংDr. A. K. Mahapatra. জাফর তখন নবম শ্রেণীর ছাত্র । বিশালগড় দ্বাদশ শ্রেণী বিদ্যালয়ের এরপর দশম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ ।
১৯৮৭ সালে আমি ২৫শে আগস্ট মঙ্গলবার বাড়ীর কাউকে না-বলে নানীর সাথে চলে যাই বাংলাদেশ জীবনে প্রথমবার । জাফর হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে । জাফরের সেবা করেছেন সুস্থ ‘মা’ । ২৬ তারিখ বুধবার বিকেলে হঠাৎ অসুস্থ অবস্থায় মাকে নিয়ে ভর্তি করা হয় V. M. Hospital-এ জাফর তখন শয্যাশায়ী, ঐ দিনই সন্ধ্যা ৭-১৫ মিনিটে V. M. Hospital-এর Bed-এ জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন আমাদের স্নেহময়ী জননী ।
ঠিক সেই মুহূর্তেই আমি ঘুরে বেড়াচ্ছি ব্রাহ্মণবাড়ীয়া শহরে । ২৭ তারিখ সকালে আচমকা খবর পেয়ে এসে দেখতে হল মায়ের মৃত মুখ । জাফর রোগের যন্ত্রণায় বিছানা থেকে উঠে মা-কে ভাল করে দেখতেও পারেনি । সেই দুঃখ বুকে নিয়েই আমরা ছয়টি ভাই বোন দিন কাটাচ্ছিলাম । তখন জাফরকে নিয়ে দেখানো হল Heart Specialist Dr. Bimal Bhowmik- কে । তিনিও ঠিক একই ঔষধপত্র দিয়ে চিকিৎসা করতে লাগলেন । সুস্থ হল জাফর । তখন থেকেই জীবনের একমাত্র সঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছে কবিতাকে । আগে শুধু আবৃত্তি করা আর কবিতা পড়ার ভীষণ শখ ছিল। এরপর শুরু করল লিখতেও, এবং একটা কবিতায় লিখল – “জন্মদাকে ভুলতে গিয়ে দাঁড়িয়ে গেছি কবরের পাশে ।” ঠিকই মায়ের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে অনেক চোখের জল ফেলেছি আমরা । বাবাও জীবনে একটা বড় আঘাত পেলেন । পাশের বাড়ীতেই নানী হয়ে গেলেন পাগলের মত । জাফর দৃঢ় সংকল্প নিয়ে সকল মানুষের সব দুঃখকে বেদনাকে কবিতার মধ্যে প্রকাশ করতে লাগল । এরপর ১৯৮৮ সালের ৬ই জুন দীর্ঘ ১১ বছর Paralysis- এ ভোগার পর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন আমাদের দাদী । মায়ের মত স্নেহ করতেন আমাদের আর বলতেন আমার দীর্ঘদিনের প্রার্থনার ফল তোমরা তিনটি ভাই কারণ আমাদের বংশে দাদু, বাবা সবাই একা একা ।
এরপর থেকে এই দীর্ঘ সময়টা সুখে দুঃখে একরকম কাটছিল । ছোটবেলা থেকে দুঃখ পেতে পেতে দুঃখটাকেই জীবনের ব্রত করে নিয়েছিলাম আর নীটশের সেই বিখ্যাত উক্তিটাকে স্মরণ করে মনে মনে একটু সাহস যোগাতাম – “Live dangerously” আর মনকে প্রবোধ দিতাম অনেক দার্শনিক উক্তি মনে করে – “ Human life is a tragedy as well as comedy tears and smile sighs and shouts of joy go side by side.” পবিত্র কোরানের বিখ্যাত উক্তি –“আল্লাহর রহমত হতে নিরাশ হয়ো না ।” “যাহা চলিয়া গিয়াছে তার জন্য ভেবো না ।” নিশ্চয়আল্লাহ ধৈর্য্যশীলদের সাথে থাকেন । হ্যাঁ অতীতকে ভুলে বর্তমানকে নিয়ে বাঁচার জন্য জীবনের গতিকে অনেক আঁকাবাঁকা পথেই প্রবাহিত করেছি । কিন্তু মাঝখানে যে এমন একটা আঘাত পেতে হবে তা কোনোদিন ভাবিনি। পরম দয়াময় জীবনের শেষ চেষ্টা করার সুযোগ দিল না । ইচ্ছে ছিল ভেলোর নিয়ে শেষ চিকিৎসাটা করানোর । কিন্তু এর আগেই মহাকাল এসে গ্রাস করল আমাদের ।
আমার ভাইয়ের মানবাত্মা এই নশ্বর পৃথিবী থেকে মহাসত্য মহাবিশ্বারের দেশে চলে গেল । আমাদেরকে এই ধুলো-মলিন Platform-এ ফেলে । একজন দার্শনিক বলেছিলেন- ‘বই পড়ার আনন্দ দ্বিগুন হয় যদি এমন একজন মানুষ পাওয়া যায় যে একই বইগুলো ভালবাসে ।” সেই বই পড়ার আনন্দ জীবনে আর পাব না । রাত্রে বসে বসে শুয়ে শুয়ে গল্প বলার সাথী জাফর আর কোনদিন ভাই বলে ডাকবে না । ছোট ভাই-বোনেরা পাবে না খেলা করার আনন্দ করার সাথী । আজও যারা না বুঝে জাফু মামা জাফু মামা বলে ডাকে তাদের ডাকও একদিন স্তব্ধ হয়ে যাবে । ছোটভাইকে কেউ আদু-খাদু-দাদু বলবে না ।
জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত জাফর Dr. B. Bhowmik-এর চিকিৎসাধীন ছিল । অনেক চেষ্টা করেও ভুলতে পারিনি জীবনের শেষ মুহূর্তেকী বলতে চেয়ে Heart fail করল জাফর । সারাজীবন খুঁজেও বোধ হয় এর উত্তর পাব না । মৃত্যুর আগের দিনও পড়ন্ত রোদের দিকে তাকিয়ে কি বলতে চেয়েছিল সুকান্ত ? এর উত্তর আজও জানা হয়নি আমাদের । পৃথিবীর প্রতিটি মৃত কবি সম্পর্কে ঠিক একই ধরণের উদ্বেল কৌতূহল আমাদের । মৃত্যুর ঠিক পূর্ব মুহূর্তে তাকিয়ে কি ভেবে গেছেন কবিরা ?
আমরা জানি মৃত্যুর আগমুহূর্তে আচমকা নিউমোনিয়াম আক্রান্ত ‘আপলিনের’ ডাক্তারের দুই হাত জড়িয়ে চিৎকার করে বলেছিলেন– ‘যেমন করেই পারো আমাকে বাঁচিয়ে দাও ডাক্তার, আমার অনেক কাজ বাকী পড়ে আছে । মৃত্যুর আগের দিনগুলোতে বিষাদে ফালা ফালা হয়েছিল কীটস্ । আপনারা কবিদের কাছ থেকে কি জানতে পারব কী বলতে চেয়েছিল জাফর !
সেই উত্তরের অপেক্ষায় থাকব আমি চিরদিন । এখন আমার মাথায় শুধু ঘুরপাক খায় সারা দুনিয়া সম্বন্ধে বোদলেয়রের সেই সিদ্ধান্ত–“an oasis of horror surrounded by desert of boredom.” পৃথিবীর আসল সত্য বোধ হয় এটাই ।
# আকবর আহমেদ
সূচী
১। ব্রাহ্মলিপি ২। ইতিহাস ৩। খুলছি অ্যালবাম ৪। আজীবন ৬। হৃদয়ের পাথর ভাঙতে ভাঙতে ৭। ঘর থেকে ঘরে মেঘ ডুবে থাকে ৮। শীত বসন্তের কবিতা ৯। আয় কথা বলি অনন্ত আকাশ ১০। নির্মাণ সাতরঙ ১১। ৮ই অক্টোবর ১৯৯০ ১২। চতুর্দশপদী রাত্রি ১৩। কথা অসীম ১৪ । রাত দিনে আসে না ১৫। অবিনাশী ১৬। ভালোবাসার ঝনন-রণন শব্দে ১৭। জীবন বাজছে দ্রুত ১৮। তট ১৯। আমি আর দেবদূত ২০। সময় ধমনীময় ২১ । কবিতার হারানো শ্লোক ২২। অন্ধকারের সামনে ২৩। আমাদের কবিতাসমগ্রের শ্রেষ্ঠ কবিতা ২৪। যেমন মনে পড়ে ২৫। সমাহিত ২৬। অনির্বাণ লেখা ২৭। তোমাকে দেবো জাতীয় সংগীত ২৮।পরিকল্পিত হাত ২৯। নষ্ট করতালি অনির্বাণ ভারতবর্ষ ৩০। সভাকক্ষের চেয়ার ৩১। কবির জবাবদিহি ৩২ । অবৈধ উল্লাস ৩৩। ইতি শিরে সংক্রান্তি নমঃ ৩৪ । ঘুম ও অঘুম ৩৫। সময়ের একাঘ্নী ঘাতক ৩৬। কাফন কীর্তন ৩৭। দ্বিখণ্ডিত আত্মধ্বনি ৩৮। খেলে মহাকাল ৩৯। অলগ্ন ছায়ার মুখোমুখি অনন্ত অসুখী আঁধার ৪০। নষ্ট বাড়ী ৪১। শ্মশান রাত্রির উৎসব ৪২। জন্ম মহাকাল ৪৩। দাঁড়াও সমাধিনিদ্রা ৪৪। যাকনা সেও ৪৫ । দৈব ৪৬। মানুষ ও তার জীবনের গান ৪৭। স্থবির দুঃখ ইতিহাস ৪৮ । স্বগত নির্মাণে ৪৯। যখন খুশী যাইবেন ডাকবেন ৫০ । নিহত রাত্রির দরজা ৫১। নির্বাসিত গ্রামীণ সংবাদ ।
**ব্রাহ্মলিপি
এ কললে আছে নাকি জনিতৃকোষ
ছুঁয়ে দেখ উচ্ছ্বলতা ।
উন্নাসিক ছুঁড়ে ফেলে হাতের চাবিকাঠি
বুকের ব্রাহ্মলিপি কি সব ক্ষতবিভূতি
পাখীগুলো উড়ে যায় বাসায় বাসায়
বুকের ব্রাহ্মলিপি বোঝে না কেউ ।
২৩-০৫-১৯৮৯
*সংস্কৃত অর্থ - কলল, বাংলা অর্থ – কল, মানে অঙ্কুর, বীজ । = জরায়ুভ্রূণ। জনিতৃকোষ - মাতৃকোষ,
** ইতিহাস **
বলপেনে সারাদিন ধরে রাখি কিছু আত্মপরিচিতি
আমার নিস্বন নিবিড় থেকে
একটা বাইসনমুণ্ডু
ক্ষমাহীন ইস্পাত হাত
কিছু প্রিয় ফুল
উদ্বেল করতালি
নিখোঁজ হয়ে যায়
শুদ্ধ হোম, আনত জলপটি, উঠোনে সাদাহাঁস
এভাবে প্রতিদিন কবিতার হৃদয়ে
বাঁচে কিছু অনুভব
এছাড়া বাঁচা ও মরার আর কোন ইতিহাস নেই ।
১৪- ০৭-১৯৯০
** খুলছি অ্যালবাম
ছুটে যেতে পারি দুরন্ত ট্রেনের গতিতে
এমন আশ্চর্য কিছু নেই।
মেঘের খোঁপা খুলে বৃষ্টির জল
ধ্যানমগ্ন মাটিতে মিশাই
এমন আশ্চর্যও কিছু নেই।
শুধুই দিতে পারি ছন্দাঘাত—মুমূর্ষু বেলার
ঘনান্ধকার নিকুঞ্জ-ক্ষত রাত
দেখতেই পাচ্ছেন অপক্ষপাতিত্বে যোজন যোজন এগিয়ে
যাচ্ছে বায়বীয় করাত।
দুরন্ত বাতাস অগ্নিবাণ
এখন চৈত্রমাস
নেতার মত ধুঁকছে ক্ষয়ে মাঠের ঘাস
এমন কোন সম্পদ সঙ্গে করে আসিনি
যেখানে নির্ভয়ে পিতামহের নামটি
পর্যন্ত লেখা যায়।
সমস্ত ব্যাকরণের অন্তর্দাহে
সকাল থেকেই পাগলাঘণ্টি
মগডালেসময়তাড়ায়।
সন্ধ্যায় হৃদয়ের সর্বোচ্চ চূড়াটিতে
সম্প্রীতি ভাঙতে ইচ্ছে হয়।
উদ্ধত শূন্যতার কানে কানে
ছুটে যেতে পারি দুরন্ত ট্রেনের গতিতে
এমন আশ্চর্য কিছু নেই।
এমন কোন সম্পদ সঙ্গে করে আসিনি
যেখানে নির্ভয়ে পিতামহের নামটি
পর্যন্ত লেখা যায়।
০২.০৪.১৯৮৯
** আজীবন
হাজার বছর মুখোমুখি
হাতে তোলা তরবারি সুস্থির
যুদ্ধের সাজসজ্জা
পোকায় কেটেছে তোমারে
এ নবান্ন ফিরিয়ে নাও
সাগরে প্রলয় নামুক
হেমন্ত যেখানে রাদ্দিন ব্যবধান গড়ে
আকাশে নক্ষত্রে পাশাপাশি শয্যায়
১৭.১১.১৯৮৮
** হৃদয়ের পাথর ভাঙতে ভাঙতে
হৃদয়ের পাথর ভাঙতে ভাঙতে অমানুষ হয়ে যাই
ব্যূহে নামবার আগে পাগলা বেশেই
জান্নামে যেতে দরকার ছিল অন্তত একবার
আমার মাথার উপরের আকাশটা ক্রমাগত
যতটানীল।
হৃদয়ের পাথর ভাঙতে ভাঙতে মানবতা ফিরে পাই
তোমাদের কাছে যেতেও দরকার ছিল
সবটুকু রহস্যের ঝুলন্ত আশা নিয়ে
আমার বুকের উপরের আকাশটা ক্রমাগত
যতটা নীল।
হৃদয়ের পাথর ভাঙতে ভাঙতে সকাল থেকে সন্ধ্যায় পৌঁছাই
রাত্তির আঁধারে যে শব্দগুলি জেগে থাকে
তাদের অধিকার দিতে দরকার ছিল
আমার কানের উপরের আকাশটা ক্রমাগত
যতটা নীল।
হৃদয়ের পাথর ভাঙতে ভাঙতে মোহনার মুখের পাত্তা পাই
ঊর্মিমালার বার্ত্তা শুনতে চেয়েছিলুম
তবে সমাধির দরকার ছিল
আমার চোখের উপরের আকাশটা ক্রমাগত
যতটানীল।
হৃদয়ের পাথর ভাঙতে ভাঙতে মৃত্তিকার ভেতর চলে যাই
সেখানেও কে জানি চিৎকার করে
দরকারের তাগিদে প্রতিকূল তেজারতে
আমার বিলকুল আকাশটা ক্রমাগত
যতটানীল।
০৪.১২.১৯৮৮
*জান্নাম= জাহান্নম=নরক।তেজারত=বিনিয়োগব্যবসা।
ঊর্মিমালা – সমুদ্র ।
** ঘর থেকে ঘরে মেঘ ডুবে থাকে
ঘর থেকে ঘরে মেঘ ডুবে থাকে
স্বপ্নের কাছাকাছি আসে নিরুদ্দেশ পৃথিবী
মুছে যায় শেষতম নাম
খোলা পৃথিবীকে কোথায় রেখে যাবো
ঘর থেকে ঘরে মেঘ ডুবে থাকে
দুয়ার পেরিয়ে গেলে ধ্বংস হবো ।
১৫-০৫- ১৯৮৯
** শীত বসন্তের কবিতা
তুমি কি ব্যর্থ শীত,ইষ্টিশানে রাত কাটানো
পাগলের রোমাঞ্চ ?
জানি কোথাও পেছনের দেয়াল ভেঙে পড়ছে
চোখের কবর থেকে মুহুর্মুহু ভেসে
আসছে জীবনের তীব্র ছবি
যেন কালরাত্রি গৈরিক বসন খুলে
উলঙ্গ নৃত্য করছে শিয়রে
আর তুমি পুনরুত্থিত হয়ে আমাকে
করছো গঠন
--সব আবছা ধীরে ধীরে নৃমুণ্ডু পতন ।
আড়ষ্ট পংক্তির পাঁজর খোলার অন্ধকারে
কেঁপে কেঁপে উঠেছে সৌরলোক
আর কবিত্ব পাপোষে পা মোছা সময়কে
আমি ছুঁড়ে দিচ্ছি নগ্ন পায়ের ধুলো
সময়ের অনুজ্ঞায় ধর্ষিত গাছ চিৎকার
করে তন্বী যুবতীর মতো শেকড়ে তার জীবনের স্তব
সেই মতো আমি বাড়ীতে সাজিয়ে
রেখেছি দু’খানা পুষ্প টব
ভগ্ন চুল্লীর ভেতর কাঠের অনন্ত বিপ্লব ।
৭. ৮ .৯০.
** আয় কথা বলি অনন্ত আকাশ
বিকল্প নামব্রতে যজ্ঞ করছিল এক মহাকাব্যের নায়ক
যেমন নশ্বর চিন্তারা চুপচাপ হাঁটে আপনি মস্তিষ্কের ভেতর
ভ্রমান্ধ দার্শনিক বারবার টিপে দেখে দর্শনের হাত পা
দেখতে দেখতে নিয়মের ঠোঁট কেটে বেরিয়ে আসে নির্মাণ
তিমির ছুঁই ছুঁই অন্ধকারে নেচে ওঠে গাছ
আয় কথা বলি অনন্ত আকাশ
২৩ – ৪-৯০
** নির্মাণের সাতরঙ
কিছু ইন্দ্রিয় মরে গেলে স্ট্যাচুর নির্মাতা তুমি সমগ্র প্রহর
জুড়ে বানাও আমাদের বিগ্রহ
প্রকাশ কাব্যময়ী থাকে যেন গভীর সমস্ত দিন নির্মিত মিনারে
মানুষের সন্ধিলগ্ন ভার বেশি কিছু দেয়না পরিচয়
জাগো, ওঠো প্রসারিত হও এই যে ঋদ্ধ পরিচয়
কামনা সহিস কণ্ঠ
আচারের সুশ্রাব্য ভণিতা
কেউ যেন ছুঁয়ে গেছে শোণিত শাবক প্রারম্ভ বেলায়
প্রতিটি ধ্রুপদী আশার আকাশ দহনে যেমন নক্ষত্রেরা
গলে গলে যায়
সাঁকো হয়ে থাকে অনন্ত সময়
বেঁচে থাকে সহোদরা হয়ে মৃদু কল্পনার সূর্যঘ্রাণ
আঘাত-বর্ধিত চেতনার ভেতর তবুও মুখের আদলগুলো
ক্ষণে ক্ষণে গড়েছে আমার অস্তিত্বের মুক্ত বিকাশ
চিত্রিত চেতনার ভেতর বহুদূর চলে গেছে আড়াল কাঙ্ক্ষিত
ঘ্রাণ
বৃদ্ধের ধরণে নুয়ে পড়া দিনের শেষের ছায়ায়
যেমন একাগ্র চারণ মাঠপ্রান্তে ঘুরে একা একা
যেন দিবান্ধ পেঁচার মতো ধারণার জগতে ডুবে আছে বেলা
না-- বললেই উড়ে যাবে কোন গোপন টিয়াপাখি
বিষণ্ন গোধূলির মতো নির্মাণের সাতরঙ
২৩-৫-৯০
** ৮ই অক্টোবর ১৯৯০
বৃষ্টির গাঢ় কণ্ঠস্বর শুনতে শুনতে
ঝনাৎ শব্দে চৈতন্য ফিরে চুপ হয়ে যাচ্ছি ।
ঝাপসা আকাশে মেঘপরীরা দুরন্ত খেলছে
দিগন্তে প্রসারিত মায়াবী ঝালর
থিরথির কাঁপছে আশ্বিনের ধানক্ষেত
সদিচ্ছার কুঁড়িগুলো সারাদিন
ভিজছে একা একা
৮-১০-৯০
** চতুর্দশপদী রাত্রি
রাতভোর ভার্যার আয়ু কেটে যায় স্বৈরনাদিনী প্রেম
তীরে তার সতৃষ্ণ নারায়ণ জাগে প্রণম্য জিজ্ঞাসায়
রচয়িতা জানে তার নির্মাণের হাত দুটি কত অসহায়
যায় যায় নামাবলী হেমলুণ্ঠিত উলঙ্গ ধুলোয়
হায়রে নক্ষত্র আমার অনিন্দ্যের নামে তুই ডুবালি সপ্তনীল
উদ্যত দেয়াল ভেঙে মৃত্যুগামী হয় প্রচক্র রাত্রিচর
শুণ্ঠিমরা ভোর আসে পিছু পিছু তার প্রণম্য নদী
পাষাণপ্রতিমা রাত পরাঙ্মুখ দিনগুলি হারায় সতীচ্ছদ
সম্প্রতি পোড়া পোড়া গান নাচে জোড়া করতলে
পায়ে পায়ে ল্যাংবোট ডুবে নিহত দিনগুলির শ্যাওলার তলে
যেন স্খলিত স্বভাব সুর ভেঙে খায়, আগুনের সান্দ্র বুক
ললিত লজ্জা ফিরেফিরে চায়, ঠোঁটের শালুক করে লেনদেন
লেপাপোঁছা উঠোনে লক্ষ্মীর পা যেন লয়হীন মহাকাল
বৃক্ষের মাধুরীর চেয়ে আরো বেশী হারানো মাশুল ।
**কথা অসীম
জলোচ্ছ্বাসে আকাশ ছুঁতে গেলো এক নারী
আমার কাছে গোপন রেখে সমস্ত কথা
ভাবোচ্ছ্বাসে পাতাল ছুঁতে গেলো এক পুরুষ
তার কাছে গোপন রেখে সমস্ত কথা
দু’জনাই দু’জনকে চিনতো একক সূত্রে
উড়াল নদীর জলে গা ভাসালেই ওদের দেখা হতো
ওরা দু’জনেই কথা রেখেছিলো
ফেরার সঙ্গে প্রতিজ্ঞা ওদের ফিরিয়ে দিতে হবে।
৪-২-৮৯
** রাত দিনে আসে না
রাত রাতের ভেতরেই ঘুমোয়
দিন দিনের তলস্পর্শে
বুক ঘুমোয় বুকেই
স্মৃতির তসবী আঁকড়ে থাকে
ভাবনার দিগন্তপ্রসারী ঝালর
যদি বাইরে যায় কখনো
তখনই জানবে তস্কররা ভড়কে গেছে
কি চাই এখানে
টাটকা ভালোবাসা
অনিম রাতের বিছানায়
জ্যোৎস্নার রস
ভালোবাসাকে মন্থন করেছে সারারাত
চোখের জল শুকোয় না – শিশির ।
তাকিয়া ভিজুক মানচিত্রে
চাই এখানে কেউ না জাগুক
ভোলাতে ঘুমের নীলে
তাকে তাকে আমিত্বে ফুটে
থাকুক আশার কুঁড়ি ।
১৯- ১০- ৮৮
** অবিনাশী
বিনিদ্র রমণী যেন দুটো পাখী মেরে রেখে ঝাঁপির ভেতর
আরো দুটো যায় সঙ্গমে, চাকতির নাভি ছুঁয়ে পথের মতো
প্রলম্বিত আশা রমা বুকের কাছে হাত দুটো রাখে
রাখে উদ্যত তৃতীয় ভুবন রাত্রির যাদুঘরে
কি দুর্বিষহ তার স্নায়ু জ্বলে ছতরীর শিল্পময়
জলপ্রিয় পাখী যেন সতৃষ্ণ ঠোঁট দেয় উষ্ণ প্রস্রবণে
সাত্ত্বিক রোমন্থনে ক্রমাগত সন্ন্যাসী প্রেম তার
সরিকানা যাচে প্রেমের স্বরূপ প্রেমে
স্বাদের ভেতর সুতীব্র বাঁশী, প্রাণ সবিশেষ
বিজিত কল্পনার শব্দদ্রোহ জাগে তোলপাড়
চিন্তা তালাক হয়ে যেন দ্বীপান্তরের তুমুল বৃষ্টি
মিথ্যে সঞ্চয় তার চরিত স্তবক আন্দোলন
অভিযোগ আছে, সংহতি আছে চেতনাবিকাশ
যে পথে আসে নামের বর্তিকা, প্রণয় অবিনাশী ।
*তারিখ নেই
** ভালোবাসারঝনন-রণনশব্দে
ভালোবাসার ঝনন-রণন শব্দে রক্তে
সন্ন্যাস জাগে।
ঝাউফুল তুমি। ঝাঁকামুটের ভাতের
স্বপ্নে জাগো
দুঃসাহসিক দুপুরবেলার জলসত্র হয়ে
জল-ঝাপ্টায় ভেজা চুলের শুচি গন্ধ।
ভালোবাসার ঝনন-রণন শব্দে রক্তে
নদীজাগে।
স্রোত তুমি। দুই তীরে তরমুজ খেত
ঝলসানো শ্মশানের পোড়াকাঠ
বিস্তীর্ণ নির্জনতায়। তরুতলে দুগ্ধবতী
গাভী ওলানে দুধের মমতা।
ভালোবাসারঝনন-রণনশব্দেরক্তে
আগুন জাগে।
ছাই তুমি। চুপচাপ ক্ষত কর বুক
দপ করে জ্বলো নিবো
চিরদিন জাগরুক প্রেমেন্দ্র বিলাপ
০৭.০৮.১৯৯০
** জীবন বাজছে দ্রুত
দুটো জীবনের মুখোমুখি জ্বলন্ত টিকা
ভাঙচুর স্বপ্নের মতো খণ্ড বিকাশ
আমি দেখি বাষ্পজমা বৃত্ত
বনপোড়া সাপের মতো বর্ষানদী
দাঁড়ানো বিশঙ্ক কাল, দূরের বাতিদান
নদীর ওপারে বসন্ত, শূন্য গোঠের মেলা
দেখি মানুষের বুক থেকে ধ্বসে পড়া পাথর
শান্ত জীবনের কাছে ক্ষমার দুরন্ত রুদ্রদৌড়
আদর্শের একাগ্র বায়ু, মদ্ভেদী বীজ
বৃক্ষ-বিভূতি, মায়া’র অষ্টপাশ সংকল্পের
রাঙা ব্যুমেরাং আকাশ।*
১০.০৭.১৯৯০
*বিশঙ্ক = ১.শঙ্কাশূন্য, ২. বিশেষশঙ্কাযুক্ত
** তট
গমনের ভেতর গীত কোলাহল কিংবা
ভালোবাসার শানপাথরে যাবতীয়
কলাকৌশল, স্থির অস্থির চিত্রকল্প
এই তো থাকে আশা করার ।
বহতা জলের মতো আমাদের চোখ দুটো
সময়ের যাদুবাক্সের দিকে ধাবিত
যদি আজ গান গাই সূর্যসুখে
দশদিক বিভ্রম আহ্লাদ করে
দিকে দিকে ত্রাণ দিয়ে সবুজদাহ
এপারে ওপারে তুমি মাঝে
সংলাপ সেতু
ভুল হরফে আলিঙ্গন করে তট ।
(তারিখ লেখা নেই।)
** **
পাহাড়চুড়োর দিনযৌবন সীমান্তের ভুবন
পেরিয়ে গেছে
দুপুর কোথাও না কোথাও থেকে যায়
থেকে যায় প্রেমিকার জবুথবু পা
কিংশুক শয্যার পাশে ।
আর অন্ধধারণা যার বুকের তায়ুশ চুরি
করে নিল
নরম স্তনে বসিয়ে গেল দাঁত
সারারাত ভাসাল ডালিম
সাতরঙে নন্দিত ভোরের জঙ্ঘায়
রৌদ্রযোনি গড়িয়ে নামে শৈলবালারূপে*
*তারিখ নেই ।
তায়ুশ – ময়ূর
( এই কবিতার কোনো নামাকরণ কবি করে যাননি )
** আমি আর দেবদূত
আমি আর বৃষ্টি নই
বা বৃষ্টিভেজা ভ্রূণ
দরবেশও নই
কি করে হবো স্বয়ংসিদ্ধ জীব।
দশ আঙুল এগিয়ে গেছে
চাঁদের আলোর দ্যোতনা।
আমার প্রিয় গজল গান
আমার প্রিয় আজান গান
পথে পথে বাজতে দাও
আমি আর দেবদূত
বৃষ্টি ভিজে বাড়ী যাই
বাড়ি ফাঁকা অসংখ্য লতায়
ঢাকা থাকে দুয়ার
টিলার গন্ধে নিম্ব জমি
বাহিরে থাকে ছুঁবার।
জুম খেত সাপ চরাচর
পিঠে স্মৃতির লাঙল
দঙ্গল বেঁধে শুয়োর নামে
মগ্ন করে জঙ্গল
আমি আর দেবদূত
বৃষ্টি ভিজে বাড়ী যাই।
০২.০৪.১৯৮৯
** সময় ধমনীময়
একাকী কবিত্ব অন্ধকার; আত্মার মস্তকে তুমুল বৃষ্টি
স্মৃতি থেকে খুলে যাওয়া বাল্ব
উপকূলে নেত্রমায়া, স্বাধীন উচ্চারণ
যেখানে শুরু হয় ঝরা অথবা পত্রমোচন
যেখানে মোহনবাঁশী পাশে নিধুবন
যেখানে বৃত্তস্রোতে কাঁদে মহাজীবন
আজ দুঃখ কাল সুখ আগামী উদ্ভাসন
ক্রমশ মৃত্তিকার ভেতর নদী ও নর্তকী
ক্রমশ আলভন করে সাগর নটপাখী
ক্রমশ চলে যাই দূরে ক্রমশ কাছাকাছি
ক্রমশ প্রীতিসুখ দেয় দগ্ধ মরুবাসী
পাথর, সমিধ, বায়ু জীবন ও যুদ্ধজয়
নিস্বনে বেজে ওঠে সময় ধমনীময়
১৪-০৬-৯০
** নিস্বন – শব্দ, ধ্বনি
** কবিতারহারানোশ্লোক
১.
খেলতে এসে হারিয়ে গ্যাছো
নোলক নাকচাবি
তখন তুমি কেঁদেছিলে, কেঁদেছিলো কবি।
২.
গাঁয়ের পথে হাঁটতে হাঁটতে
পানাপুকুর ধারে
লুকিয়ে গিয়ে তুমি যখন
নষ্টগণিকা
তমালতলে মোহনবাঁশী
ডাকতো ছুটিবারে,
এখন শুধু ঘণ্টা বাজে তুমি লজ্জাহীনা।
৩.
নিগূঢ় দেশের বনবহ্নি ফুটলো
শঙ্খফুলে
তুমি এখন শিশুর মা
শিশুকে নাও কোলে
মৃৎপাত্রে ভোজপাত্রে মৃন্ময়ী
এই মাটি
তোমার শিশু বড় হচ্ছে
প্রেমবীজের গোলবাটি।
২১ – ১১ – ১৯৯০
** অন্ধকারের সামনে
টুপটুপ শিশির রাত, গূঢ় হাওয়ার
ফিসফিসানি
নিশাচর পাখীর ডানা ঝাপটানো মুহূর্তগুলো
বিপুল আয়োজনে অন্ধকারকে
হাততালি দিচ্ছে ।
তারপর ঘাসের ভেতর মৃত জোনাকির
জীবনের মতো নির্জনতা ।
তারপর মাঠের সামনের হিজল গাছের
সমস্ত আকাশটাকে
ইথার তরঙ্গের মতো কাঁপিয়ে দিয়ে
চৈতন্য ডালপালা দাঁড়িয়ে থাকে
অন্ধকারের সামনে ।
২৪- ০৯- ১৯৯০
** আমাদের কবিতা সমগ্রের শ্রেষ্ঠ কবিতা **
মাতাল শাসকের ষড়যন্ত্রের মতন আমাদের জন্মনিধুবনে শ্মশান ঢুকিয়া যাইবে।
ওলানের দুধের ধারা উধাওবশতঃ তোমরাও অলগ্ন ছায়ায় দাঁড়াইয়া উঠিবে —
তাহাই স্বাভাবিক । কারণ মাটির দিকে আমাদের বিরুদ্ধটান বশংবদ হইয়া
দাঁড়াইয়া থাকিবে তাহা ঠিক নহে এবং তাহারাও চোখে আঙুল দিয়া দেখাইয়া
দিবেঃ জীবনের প্রথম শর্ত ছিল আমরা পাল্টাইয়া যাইব ।
শিল্পীর ইজেলে লগ্ন হরিণ সাঁকোর পাড়ে জল খাইতে আসিবে। আমাদের
করতলের আমলকী শুকাইবার আগেই আলিঙ্গন হইতে খুলিয়া পড়িবে
ব্রাহ্মলিপি । টায়-টায় বাঁচিয়া থাকিবে সংসার আর জরতী আকাশে জীবনের
নিবন্ধ উল্টাইয়া লেখা আমাদের প্রথম অক্ষর । শীত আসিবে । ঘাসবনে
শুইয়া থাকিবে জ্যোৎস্না। ডিম-ভাঙা দুপুরে ভেজা চুলের জুবিলী উৎসবে
আমাদের পূর্ণ হইবে একশো বছর ।
অতঃপর তোমাদের টালবাহানায়, হারানো টিকলির খোঁজে— আমাদের কবিতা
সমগ্রের শ্রেষ্ঠ কবিতা তাহারা পড়িবে।
২৩-১০-৯০
*জরতী = বৃদ্ধা, জীর্ণা।
** যেমন মনে পড়ে
যেমন তুমি পারো রতিবাণে নির্মাণ
ভেঙে দিয়ে
মানসাঙ্ক থেকে খুলে নিতে
বাসনার করাত—
যেমন মনখোলা আকাশের নীচে দাঁড়ালে
আজো মনে পড়ে যায় মায়া মায়া দিনগুলো,
মনে পড়ে শৈশবের বাঙ্ময়
পাঠশালার প্রথম জীবন পাঠ
মনে পড়ে যুবতী চাঁদ ঝিঁঝিঁর তান
জোনাকির ছায়ায় ছায়ায় নক্ষত্ররাত
অন্তরালে ধানক্ষেত, আম্রকানন
জ্যৈষ্ঠের বিভূতি আকাশ ।
০৩- ০৫-১৯৯০
** সমাহিত **
স্তব ঘোষণা করে দাও
শুধু কথামালায় নিজেকে সাজিয়ে
রতি ও রমণে
কোন গৌরব নেই।
বরং সাত্ত্বিক দানে মহতী হয় মানবতা।
যে জন্মান্তর আমাদের মাঝে প্রতিদিন দ্বন্দ্ব করে
অধিকারের শরবতে বিষ ঢেলে দেয়
ওকে ডেকে এনে ভোজ করাও
রসনা তৃপ্ত করো
উচ্চকিত প্রশংসার মুখোশ খুলে
রমিত হবার আগে
নিজস্ব সংলাপে ওকে সমাহিত করো।
*তারিখ নেই
** অনিবার্য শেখা **
মানুষের করতল ছুঁয়ে অনিবার্য
হিংসা শিখে নাও ।
শেখার কোন বিকল্প নেই ।
বরং তুমি তার আগে নিজেকে
একবার দ্যাখে নাও ।
২৫- ০৯- ১৯৯০
** তোমাকে দেব জাতীয় সংগীত
একটু জায়গা করে নিতে দাও
এই জনপদে প্রতিনিয়ত ভাঙছে পুরুষের ঊরুসন্ধি
দ্যোতিত ঘরে শুয়ে থাকে পাগলী ভাদুরী
তোমার চোখের পর্দা তুলে স্মৃতির জাবরকাটা
তবে তুমি জন্তু নও আর দশটা মানুষের মতোই জাদুকরী
কোন জাদু ছুঁয়ে দেবে আমাকে ?
তোমার গালের খাসজমিতে ফসলের চিত্র এঁকে
দেখছি মেঘবহ্নি
এই ছুঁড়ে দিলাম তোমার মুচলেকা
বিচারে তোমাকে এজলাসে দেবো
দেবো তোমারই আয়ুছেঁড়া জারজ শিশুর জাতীয় সংগীত ।
২৭- ০৫- ১৯৮৯
** পরিকল্পিত হাত **
প্রাণিক উপমা দিয়ে কাব্য না লিখলে
সত্যকে লিখা হয় না।
খুব যখন নুয়ে পড়ি নিজের ভেতর
জন্মদিনের পাশাপাশি মৃত্যুদিন দেহরক্ষীর
মতো চোখ ঠেরে চায়, পাহারা দেয়
একটা সিগারেট জ্বালায়
এক একটা জন্ম মানেই এক একটা মৃত্যুর দাসখত
দ্রুত ব্যঞ্জনায় রাত ফুরনোর বাঁশী,
উৎসবের বাতি নিবিয়ে আলিঙ্গন থেকে
বেরিয়ে পড়া।
হে প্রেম নদীপারে গাছতলায় তুমি কি করেছো ?
অন্তর্ভুক্ত নারীর শরীরে
কনষ্টেবলের লাঠিতে
উজান ময়দানে তুমি কি করেছো ?
অধিকারের ভুবন থেকে যুগলবন্দী
পোষাক রেখে স্বাধীনতা হারিয়ে গেলে
তবে হে প্রেম আমি কাকে ডেকে বলবো
কয়েক ডজন সত্যকে একদা আমি
এইখানে দেখেছিলাম ?
কাকে ডেকে বলবো মানুষের বস্তাপচা কান্না
স্বর্গে পৌঁছায় না বরং তাকে আরো
কব্জা করতে এগিয়ে আসে পরিকল্পিত হাত।
১১ – ০৭- ১৯৯০
** নষ্ট করতালি অনির্বাণ ভারতবর্ষ
আকাশ তুমি কার শেকড়ে আটকে আছো
আমি যে আজ স্বপ্ন দেখি বড়ই খারাপ
পোড়ামাটির নীতিও দেখি, দেখি আবার ফ্ল্যাগমার্চ
আকাশ তুমি কি বল আজকে
আমার দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছো
চেয়ারটা কি বল হয়ে যায়
লুফতে লুফতে দৌড়ে সবাই ?
আর নষ্ট করতালির ঘেরাটোপে ডুবে যায়
অনির্বাণ ভারতবর্ষ ।
০৬- ১১- ১৯৯০
** সভাকক্ষের চেয়ার **
সভাকক্ষের টেবিলের সামনে মায়াবী চেয়ার
আমি ঐ চেয়ারের দিকে ঘুরপাক
খেতে খেতে প্রচণ্ড হিংসুটে হয়ে উঠি
মোটরস্ট্যাণ্ডের অচল গাড়ী স্বাভাবিক
গাড়ীর মতো তুখোড় পাল্লায় ছোটে
দোতালা ছাদের সমস্ত ইটবালি মুহূর্তেই
খসে পড়তে থাকে
দমকলের প্রতিটি কলকব্জা ছিটকে যায়
প্রতিটি হরিণের চোখ রক্তাক্ত হয় ।
আমি সভাকক্ষ থেকে বেরিয়ে এলেই
নষ্ট ইচ্ছার খোল, কর্তাল, মৃদঙ্গ পাখোয়াজ
দাঁড়িয়ে ওঠে ।
আমার ছায়াও দাপট মেরে
আমাকে ছুঁড়ে ফেলতে চায়
আশ্চর্য এক গিলোটিন মাথা
থেকে ধড়ের বিচ্ছিন্নতার স্বপ্ন দেখায় ।
প্রতিটি চোখের দারুণ ভ্রূকুটিতে,
নানারকম ধিক্কার, ধূর্তোমি তীক্ষ্ণ হয় ।
ইদানীং আমি সুদীর্ঘ একটা নদীর
সামনে দাঁড়িয়ে
চেয়ারটার সঙ্গে জবরদস্তি করি
হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার কথা ভাবি
তারপর
যেই চেয়ারটাকে শ্মশানাগ্নিতে নিক্ষেপ করি
অন্য একজন লুফে নিয়ে দৌড়ে পালায় ।
১৩- ১০- ১৯৯০
** কবির জবাবদিহি **
১.
গালগল্প চিন্তাতালাক বৃষ্টি ঘনঘোর
বেড়া ভাইঙ্গ্যা ঘরের ভিতর ঢুইক্যা গেল চোর।
২.
কবাটবন্ধ তালাসিন্দুক চক্রমধু লালা
আমিও চোর তুমিও চোর চোর হগ্গল হালা।
৩.
উল্টাইয়া দে পাল্টাইয়া দে চিৎপটাং দে লাথি
বাইরে ঝরে ভিতরে ঝরে, খোঁজ এখন বাতি ।
৪.
জ্যোৎস্না শাড়ি, রক্ততালু, লালুভুলোর খেলা
বেল্লারী বাতের ছিদ্র আমি, মন্ত্রীবাবুর চেলা ।
৫.
উল্টাইয়া দে পাল্টাইয়া দে আয়রে লালুভুলো
মালগাড়ীর ডাব্বারা যায় কুকুর কুকুর কু।
*তারিখ নেই ।
** অবৈধ উল্লাস
১.
স্বপ্ন ছুঁয়ে যৌন উল্লাস । শুরুতে মার্ডার ।
হ্যালো পাখিঃ সঙ্গমের দিকে ঝুলছে ঈশ্বর
না বাদুরের ছবি ?
ঠোঁটের মুখে ঠোঁট । হাতের তালুতে ভব্যতা ।
শূন্য কি ঈশ্বরীর ব্লাডার ?
২.
হৃদয়ে প্রহরী এল্যুশন । প্রণয়ে লহরী মৌমাছি ।
পর্দা কাঁপে । রাত্রি কাঁপে ।
উড্ডীন আরো ঊর্ধ্বে উড্ডীন আরব্য রজনী ।
সমস্ত স্তবক খুলে ঘুরে মারছে ভৈরবী ঢিল ।
৩.
খাবি ? খা রত্নভাণ্ডার খা । সমস্ত পৃথিবী
খাঁ – খাঁ । -- তুই সুধাগন্ধময়ী কস্তূরী
পবিত্রতা ।
৪.
রঙিন বেলুন ওড়ে । ক্ষুরতাড়া নাপিত ।
চুষা, লেহা, পেয় সব বিভ্রম ।
অনুভব নেই । মন্ত্র নেই ।
সর্বাঙ্গীন ব্যাকরণ নিখোঁজ
৫.
অবৈধপ্রিয় ঈশ্বরগামী সাধো আবার
প্রেমের সা ।
দিগ্বিদিগ স্বপ্নদোষ ঈশ্বরীকে কামড়ে খা।
০২-১২-১৯৯০
** ইতি শিরে সংক্রান্তি নমঃ **
১।
নিজের পায়ের ধুলো নিয়ে শত্রু আমি।
সাধ সাধ্যি নেই।
আলোর ভ্রমর স্বপ্নদোষী। উড়াল দিলো বামা।
ত্রুটির চামর লুফে ধরলো ফাঁক ।
গল্প কল্প । নগর কোটাল । খিলখিল পামর ।
যবন কাফের । মিঞা গোঁসাই ।
তোবা তোবা, রাম রাম
২.
বোবা থিয়েটার । শূন্যে পা । হরিওঁ ।
কবে আমি শিখেছিলাম আলিফ, বে;
আল্লাহ।
তপ্ত কল্কি । চুমুক ঠোঁট । উপজীব্য স্বপ্ন।
রামমন্দির, বাবরি মসজিদ ছোঁ
কুত্তা ছোঁ ছোঁ !
৩.
অশিব রাত্রি। গাজন ধোঁয়া । চিচিং
ফাঁক।
স্বপ্ন ভেঙে কাঁঠাল খা শালা ।
অন্ধকারকে ঠুকরিয়ে তুই সন্ন্যাসী হ ।
ইতি শিরে সংক্রান্তি নমঃ
০৫-১২-১৯৯০
** ঘুম ও অঘুম **
অঘুম যারা রাত কাটায়
তাদের কাঙাল বলবে কে ?
তারা তো রাত্রির চোখ ফোটায়
ঘুম কি জানে অঘুমের চোখ
কখন ফোটে ।
বরং ঘুম সান্ত্বনা নয়
মৃত্যুর বুক চেটে খাওয়া
বিষাক্ত শিশু ।
০৫-০৬- ১৯৮৯
** সময়ের একঘ্নী ঘাতক **
মতের দেউটি নিবে গেলে আমার চিন্তা জুড়ে
যখন বিপ্লাবন নামে
হাঁসের পালকের মতো ঝরে যায় পংক্তিমালা
জেটিতে স্পর্শ করে যেন বহুদূর চলে গেছে
বাণিজ্য জাহাজ ।
শতপদী দংশনের মতো হেসে ওঠে অন্ধপতন
জলজ রেখা ছুঁয়ে জন্ম জড়ুল মাটি
অদূরগামী কোন ভুল স্থাপত্যে মিশে যায় ত্বকে
সময়ের কুত-কুত হাঁটা দিন থেকে দিনান্তরে
একা একা ।
লাশঘরের মতো চারিদিকে উৎরায় আদিম
অন্ধকার ।
অমোঘ কণ্ঠ থেকে কে যেন বহুকাল ধ্বনিত
হয়ে একদা মিশে গেল লুপ্ত পরকালে
একে একে কাঙ্ক্ষিত প্রহর শেষে
কবোষ্ণ ভোর তারই অবয়বে খেলাচ্ছে
রাহিত্য আত্মাময় ।
ভুলের কাকপদে কোন সার্থক বর্ণমালা
লোপাট হয়ে গেলে
নির্বিকার দেহে জন্মায় ঘাস ও ভূমিজ লতা
তারপর একাগ্র প্রপাতে চলে যায় বহুকাল
ইতিবৃত্ত ঘুরে আশেপাশে ।
রোজ রোজ প্রত্যাগত বিহিতকালের সংযত করাতে
প্রণালী ঘুরে আসে ছন্দ পতনে
সময়ের একঘ্নী আঘাত থেকে বেঁচে যাই আমি ।
০৮- ০৬ – ১৯৯০
** কাফন কীর্তন **
কবররাত্রির লাশের ভেতর
আমার জন্ম ঈশ্বর খোলস খুলে গল্প করে ।
কাফন কীর্তনে বীতকাম চারিধার
উৎসবের কালো কাফেলা হাতে শোক সভায়
ফুটপাতের রাজা
মাংসল স্বাদের গন্ধে ফুটে আছে শারীরিক ফুল।
১৪.১১.১৯৯০
** দ্বিখণ্ডিত আত্মধ্বনি
অশেষ উৎসাহে দুঃখের ভেতর থেকে জমক উৎপ্রেক্ষায়
আমার সুখের বিজ্ঞানগুলো লিখা হয়েছিল ।
উৎসবরাত্রি তুমি তো জানো আমার জীবন কতো
বেতালসিদ্ধ ।
স্বপ্নের কবর থেকে উদ্বেল চেতনা কতকাল
খুঁজেছে নিস্বন ?
সাঁকোর ওপারে একা একা হেঁটে গেছে
কতো পরলোক ।
একটি ধ্বনিও পাইনি আমি
শুধু একটি উদ্বাহুকে দেখেছি ধীরে ধীরে কবরের
ভেতর মমি হয়ে যায়
একটি ফুলকে দেখেছি আকাশের দিকে
মুখ তুলে অকারণে আঙ্গিনায় ঝরে বারংবার
একটি নারীকে যিনি নিজস্ব বর্শায় বিদ্ধ
করেছেন আদিম চুল্লী
একটি পাখীকে দেখেছি আমার দ্বিখণ্ডিত
আত্মার ভেতর বীজধান কাটে
একটি সন্ধ্যাকে দেখেছি সতৃষ্ণ সোনার তরী
তার শূন্য পাটে ।
তারপর কতোকাল চলে গেছে আমি জানি না
নিয়ত নির্মিত হয়েছে কতো জগৎ
কতো প্রস্তুতিপর্ব অসমাপ্ত রেখে স্বস্তিহীন
উঠে গেছি গম্বুজের মতো
আমি জেগে দেখি সুসময় চলে গেছে
শূন্যমাঠ ভাঙা মুরলী, বাসনা কলকল হারা
একটি ছোপও নেই কোনখানে ।
আম জেগে দেখি ভালোবাসার এক ভাঙা দাঁত
জগদ্দল শায়িত-অন্ধকার জখম করছে
আলোর গতিপথ ।
আমি জেগে দেখি যুগসন্ধির ধ্বনি নিবে গেছে
ইস্পাত-হাত যেভাবে পেরেক বসিয়েছিল
যীশুর বুকে
তারও আগে নূহের জাহাজ যুদী
পর্বতে যেভাবে ঠেকেছিল মহাবেগে
আমার মর্মমূলে টানা নিস্বন তার
নিঝুম বাজে সময় সংকোচনে ।
১৭- ০৬- ১৯৯০
** খেলে মহাকাল ***
কখনো দুই ঠ্যাং ফাঁক করে দাঁড়ায় আয়ুধ করাত
আলু থালু বিছানায় পাশ ফিরে শোয় কামনা
ভোরের বাতাসে দীর্ঘ কেঁদে যায় জন্ম-হরিয়াল
দিকে দিকে উৎস কান্না বিস্তীর্ণ শ্মশান
বাঁশের সাঁকোর মতো কাঁপে মায়াবী হরিণ
শূন্য পিরিচে নোংরা দুটো হাতে খেলে মহাকাল
৯-১০- ১৯৯০
** অলগ্ন ছায়ার মুখোমুখি অনন্ত অসুখী আঁধার
এই তো সময়চিতা । যেখানে কণ্ঠ মধুরে তিক্ততায় ।
বিশাল সমুদ্রের তলদেশ জুড়ে অপেক্ষমান
সার্বজনীন মৌনতা ।
তারপর বৃক্ষ নদী, পাহাড়-পর্বত পেরিয়ে আমিই
তাকে মৃত্যুর দিকে ছুটিয়ে নিই
আমার জন্ম-ধুলো কেবলি ভূমধ্য শিকড় বাড়িয়ে
দিচ্ছে চতুর্দিকে
ঔষধপত্রের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সখ্যতায় ডাকবাক্সের
একাকী চিঠির মতো নিঃসঙ্গ আলিঙ্গনে
বেড়ে উঠছে শব্দরূপ—গাছ
যে গাছের দীর্ঘ সহবাসে আমার অন্তজ ঋতুর ভেতর
মুহুর্মুহু মৃত্যুর সুতো টানা অনেক জন্মে বুদ্ধিস্বপ্ন ।
তবে নিরভ্র জীবন পেতে আমি কি কৌতূহলী ?
না নিরবচ্ছিন্ন রাত্রির তরল অন্ধকারে
একত্র সভ্যতায় যে আমার সব নিয়ে গেছে বিমূর্ত করে
উথালে-পাথালে
একাগ্রমনে আমি কি খুঁজি তার মুখ ?
শুধু জানি, যে আমার বিরুদ্ধ কল্পনা
শূন্য-কুম্ভ—হাসে
তার কাছে যেতে হবে বারংবার
অলগ্ন ছায়ার মুখোমুখি অনন্ত অসুখী আঁধার ।
০১- ০৮-১৯৯০
** নষ্টবাড়ি **
সাঁকোর উপর পড়লে ছায়া
বিপ্রতীপে
আমার দিকে টিকলি ছুঁড়ো
কোন সুখে
আমাকে ডাকে শ্মশান ঘুম
মৃত্যু এবং মায়াবিনী
আমাকে ডাকে পথের ডানা
সম্মোহিত নষ্টবাড়ী
৪-১১-১৯৯০
**শ্মশান রাত্রির উৎসব **
এখন আমরা কঙ্কালবাড়ীর দিকে যাইতেছি । নির্জনেদাঁড়ানো এক কিশোরীর প্রার্থনার মতন বুদ্ধির স্বপ্ন চতুর্দিকে উৎরাইয়া পড়িতেছে । কিছুটা যুদ্ধ করিয়া
তাহার পরে শান্তির কথা বলিব । এখন বঙ্কিম স্তবক ভাঙিয়া বাহুলীনা স্বপ্নমুগ্ধা হইয়া উঠিতেছে । মধুহীন ওষ্ঠের উপর নিঃশব্দ চুম্বনে পর্ণঝরা ঋতুর মুখে আজ
যাহার সহিত দেখা হইতে পারে— সে নমনীয় থাকিবে না । তীব্র বিষ বিস্ফোরণে অথবা আশ্চর্য বোমা ফাটাইয়া সে পথে দাঁড়াইতে পারে । এই বিদ্রোহ যদি
আজ জনপ্রিয়তা অর্জন করে তবে বুঝিতে হইবে আমি সঠিক সময়ে আসিতে পারি নাই ।
#
পাঠকের কাছে ক্ষমা চাহিয়া এখন আমি তাহার শরীর স্পর্শ করিতে যাইতেছি । নিশীথ শীৎকারে পবিত্র পুষ্পাঞ্জলি তাহার ওষ্ঠে বাজিয়া উঠিতে পারে । সুতরাং
এই প্রজন্মের আরোগ্যস্নানের কথা চিন্তা করিয়া দৃশ্যান্তর ঘটানো হইল ।
#
ইহার পরে এখন আমরা শ্মশান-উৎসবে মিলিত হইব । মানুষ ও প্রকৃতির স্তব্ধতার ভিতর রাত্রির নূপুর বাজাইতে বাজাইতে শবশকট নদীতীরে আনয়ন করিব । মৃতকে
স্পর্শ করিলে মানুষ বীতকাম হয়; চারিধারের জন্মান্তর ঘটিয়া যায় ।
#
সুতরাং অতঃপর কিছুটা জিজ্ঞাসা হাসিয়া কাঁদিয়া উঠিতে
পারে । বলাবাহুল্য চরিত্রহীন আহ্লাদে চক্ষু খুলিয়া
দেখিলাম চৌভিতে আগাছার জঙ্গল বিলীয়মান তীর্থরাত;
এতদিন আমি যাহাকে ফলবতী করিয়া রাখিয়াছি সে
কিছুই ভাবিতেছে না ।
১৬ - ০৮-১৯৯০
** জন্ম মহাকাল **
তৃণমূলে নষ্ট কবিতা— গাছশিশু
ধরে আছে হাত ।
গভীরে রতিমুখ জন্ম মহাকাল
অনির্বাণ করতালি অহোরাত্র
উৎসবের দিকে যায় ।
১২- ১১ -১৯৯০
** দাঁড়াও সমাধিনিদ্রা **
যে স্তব্ধীভূত শব্দেরা এতোদিন সমবেত ছিল আমার
দুঃখের শিয়রে
আজ তারা দূর সন্ধ্যার সমুদ্র কোলে
সাহসী নক্ষত্রের মতো স্বাধীন ।
অন্ধিকা, আমার বিবর্দ্ধিত জগতের ভেতর
তুমি এতো সুস্পষ্ট হয়ে উঠলে কেন ?
এতোদিন সময়কে যে দেখেছিলাম করুণ বর্শা হাতে
দেখেছিলাম পুরনো উইঢিবি,
বৃষ্টস্নাত ভোরের স্নিগ্ধ গোলাপ
পাশে তার ব্যথাতুর কম্পন ।
আজ তারা হারিয়ে যাচ্ছে আমার বিবর্ণ পাণ্ডুলিপিগুলোরমধ্যে,
স্থির চার্বাক যেনো ভগবানকে অস্বীকার করে
হাত বাড়িয়ে বলছে—
আয় দুঃখ কাছে আয় তোকে হিম করে দিই
আমার বহুজন্মের বাসনার আকাশে
তোকে দার্শনিকের সফলতায় ফুটিয়ে তুলি ।
না, আমি কোন সুখের জন্যে এ কড়চা
লিখছি না,
বুকের সন্নিহিতে যে মুহূর্তগুলো ফেটে আছে
শূন্যময়
ওদের সমাদরে ডেকে এনে শুধু একবার
বলতে চাই, বসো । আমার আহতশয্যার
পাশে বসো । নির্ভয়ে বসো ।
হয়তো ওরা বসবে না কোনদিন
এমনিতেই দাঁড়িয়ে থাকবে কাল, কাল—
নদীর ওপার, রহস্যলোক আকাশের মতো ।
০৩-০৭-১৯৯০
** যাকনা সেও **
শ্মশানরাজা আজ যদি যায় ফুলচুরিতে
বাগান অমনি উধাও হবে ।
ভাঙা সাঁকো হেঁটে যাবে বাড়ীর ভেতর
একদা সেও ভালোবাসতো ঘুড়ি উড়াতে ।
নীড়ের পাখী উড়ে গ্যাছে,
নষ্ট নীড় ধুলোয় এখন,
টেবিল উল্টে রাজার সামনে
বেরিয়ে গ্যাছে কে যে কখন ।
আপদ গ্যাছে, সবাই ভাবে
আসবে আসুক
আমি বলি, যাকনা সেও
বৃত্ত খুলে বালুচরে ঘুমিয়ে পড়ুক।
১৯- ১১- ১৯৯০
** দৈব **
স্বাভাবিক চলাফেরা খাওয়া দাওয়া
গল্প করা
নিজের কবরের জন্য একফালি জমি রাখা
ব্যস—
এখন দরকার বিশ্রাম, নিস্তব্ধতা,
বাসর ভাঙা রাত্রির অভিসার
ইচ্ছার নিবন্ধমূলে জল বায়ু মাটির
যুক্তিবাদ ।
যৌন বিছানায় ইঁদুর-সঙ্গমে মশারি
উঁচিয়ে চিন্তারা দেখে কাল কতটুকু গেলে
মরণের গলিপথে হাত রেখে কেউ নষ্ট
করে নির্মাণ
যাত্রীকে মূর্খ বলে দেয় তুমুল ধিক্কার
নর্দমায় পুঁতে দেয় পদ্মবীজের মালা
শেষতম নাম ।
মৃত আত্মার দঙ্গলে কবিতা নিয়ে পাঠক্রম
গড়তে গড়তে
যেন বুড়ো-হাবড়া গলায় আবার বেজে
উঠলো পুরনো সংগীতের সুর ।
যেন সাতরঙে নন্দিত লোকটা জানে
অপেক্ষমান জীবনের নির্বাসন ও
তার পরবর্তী শিল্পায়ন ।
সেকেলে গল্পটা বলে লাভ নেই ।
বিবর থেকে বেরিয়ে আসা উজ্জ্বল আলোকে
যে চিবোচ্ছে ভালোবাসা
বৃক্ষের উষ্ণতায় সেই পলাতক প্রণয়ী ।
কবর-শর্বরীর গাঢ় কণ্ঠস্বর শুনতে
শুনতে একসময় ঈশ্বরের পায়ে
সমাহিত হয়ে যায় ।
(তারিখ নেই)
** মানুষ ও তার জীবনের গান **
ঈর্ষাছিন্ন রাত্রির আলিঙ্গনে মৃত্যুর অম্লগন্ধে
মহিমময় জীবন
যেখানে আলোক ও অন্ধকার মুখোমুখি হয়
এই খোলা আকাশ অশনি মিলন
আলেখা পৃষ্ঠার উপর কলমের অভ্যাস ঘোষণায়
অনার্য হাসি ঢেলে দেয় উগ্রবিষ
ইহজন্মের নরলোকে !
বহুলীন সভ্যতার ফুলদানী ভেঙে
আজ পঞ্চায়েত দৌড়ে যাচ্ছে আরক্ষা দপ্তরে
অরণ্য ভেঙে পড়ছে নগরে
তবুও আমার অশান্তি তুখোড় অনন্ত জিজ্ঞাসার
যেমন স্মৃতির উড়ুক্কু মাছ জলে ডোবে
তার উদ্ধার নেই
যেমন উদ্বীক্ষণে জ্বলন্ত চোখে দ্বিতীয়
বরে আগুনের উজ্জ্বলতার কোন মানে হয় না ।
আমাদের সতৃষ্ণ-দহনে যে চারাবীজ
জন্ম হয় প্রতিদিন,
ওদের বিমুক্ত মুখ আমরা দেখতে পাই না,
ফোঁটা ফোঁটা নির্মন্দু রস
দু’হাতে রক্তের পাট্টা, স্পন্দিত চারিধার
পদ্মদল যেভাবে কেঁপে ওঠে জলের স্তম্ভনে
বৃক্ষ যেভাবে কেঁপে ওঠে পাখির স্তম্ভনে
পৃথিবী যেভাবে কেঁপে ওঠে সত্য প্রতিষ্ঠার আগে
যেমন স্মৃতির উড়ুক্কু মাছ জলে ডোবে
তার উদ্ধার নেই
যেমন উদ্বীক্ষণে জ্বলন্ত চোখে
দ্বিতীয় বরে আগুনের উজ্জ্বলতার
কোন মানে হয় না ।
শুধু সত্যের স্কুপ খোলার তীক্ষ্ণতায় আমাদের
জীবনের মূল্যদান
যে গানের পর্ণ খসে গেলে
পৃথিবীতে আর কোন গান থাকে না ।
১৩-০৮-১৯৯০
** স্থবির দুঃখ ইতিহাস **
[ যে জন্মদা মায়ের দৈব মৃত্যুতে আমি কবি হলুম ।
এক প্রেতস্বরে শয্যাশায়ী আমি, মাকে উঠে দেখার
শক্তি ছিল কিনা আজও বলতে পারবো না । সেই
চিরদুঃখ জননীকে নিবেদিত । ]
বিলীন জ্যোৎস্না রাত । স্তিমিত শূন্য-কানন,
শূন্য-কোরান; অন্ধকারে ডালপালা, ভেতর নির্জন ।
কোথায় প্রস্ফুটিত মৃত বলয় ?
কোথায় ঘুমের অবসান ?
দুটো কথার জন্যে আকাশ খুব
কাছাকাছি বৃত্তঘোষণা
দুটো জন্মচাকার মুখোমুখি মৃত্যুর
কঠিন ঘরানা ।
ইচ্ছা সেতুর নীচে স্বপ্ন বিলাস নদী
মানুষের পবিত্র সংযম স্নান করে জলে ।
কোথায় শানু বনমর্মরে বঙ্কিম নূপুর বাজে,
বিষম হরিণ কান্না পোড়ে বনতল ?
কোথায় ? শুনি না কিছুই আজ
শুধু প্রতিধ্বনি মা নাম সবুজে
রক্তিমে একাকার স্থবির দুঃখ ইতিহাস ।
১৩-০৯-১৯৯০
** স্বগত নির্মাণে **
অনাসুখের আশায় আশায় আমি এখন
অসুখের ভেতর এক সুকণ্ঠ পাখী।
প্রগত রাত্রির অন্ধকারে ভাসাই ভুলভ্রান্তির
ভাঙা নৌকাগুলো
কথামালা সাজাই আত্মজ প্রলাপে,
আমি নিজেও ভাবতে পারিনে নিহত দিনগুলো
কি গেল ?
ভবিষ্যতে আমার কে আসবে ??
আমি কি পৃথিবীকে সূক্ষ্মকোণে দেখেছিলাম
নাকি স্বগত নির্মাণে অসুখের
ঘাড় মটকে লাফিয়ে পড়েছিলাম
কবিতার জঙ্গলে
অথচ যেদিন আমার মায়ের মৃত্যুতে
জীবনকে সেলামী দিয়েছি
মুমূর্ষু বিছানায়
নির্লজ্জের মতো চিৎকার করে উঠেছি
জয়স্তু বলে
সেদিন কি বুকের ভেতর লুকিয়েছিল
এই চুনকামের বালতি
যা দিয়ে এখনো আমি দেয়ালের
অসহায় স্মৃতির
দাগ মুছতে ছুটে যাই
আর মুখোমুখি হই অক্টপাশের কপটদ্বারের।
#
হে নিয়মনিষ্ঠ সেদিন থেকে এক
রুক্ষ উন্মাদের পা
কবরের দিকে ছুটে যায়
ছুটে যায় পরিচর্য্যাহীন একমুঠো
ধুলো শূন্যের দিকে
আজ কে পারে সাত্ত্বিক হয়ে
জীবনে জীবন রেখে ছুঁয়ে যেতে মন
কে পারো কামনাকে দাহ করে
আমাকে শ্রেষ্ঠ সূর্যোদয় দেখাতে ?
** তারিখ নেই )
** যখন খুশী যাইবেন ডাকবেন **
যখন খুশী যাইবেন ডাকবেন
ধাক্কা দিয়া দরজা খুলবেন ।
ঘরে কেউ থাকেন না,
আগে থাকতেন অন্য কেউ
এখন আমি থাকি
ঘরের ভেতর ঘর থাকে।
প্রেম সংক্রান্ত ব্যাপার নিয়া
আমার কাছে যাইবেন
জমি সংক্রান্ত ইজারা ব্যাপার ?
যাইবেন থাকবেন ।
মাইয়ার বিয়া যাইবেন না কিরে
নিমন্ত্রণডা করবেন।
হেদিন আইল ফজল ভাইয়া তুলসীবতী
যখন খুশী যাইবেন ডাকবেন, ধাক্কা দিয়া দরজা খুলবেন
থিতিয়ে রাখা কলিংবেল, আগে থাকতেন অন্য কেউ
এখন আমি থাকি
ঘরের ভেতর ঘর থাকে
চিল্লান হুনবেন ডাইনাত বাওয়াত
ব্যাপ্ত করা চরাচরে, পইর্যাক থাকি যমের ঘরে ।
ব্যক্তিগত সময়সূরী দশদিকেই এজেন্ট চায়
প্রদাহের তুলকালামে একটা দিক
ভেল্কি লাগায়
সময়ের শরীর থেকে খোলস খুইল্যা
রাখছি আমি, দৌড়ার সময় ল্যাংডা অইয়া
বুলে অইল তিনডা স্বামী, রক্ষক আছে মোক্ষক নাই
দুর্দিনের রক্ত চাই, বাত বিমার বড় বিমার
বাতিক অইলো নিস্তার নাই, মূল তুইল্যা দেখি মূলরোমে
জলৌকার ফরমূলা
গাছটা ছিল জীবনদোলা
প্রবর আছে তাবড় তাবড় আশেপাশে
বিদ্যমান
নীকা হলেও যাইবেন থাকবেন
আমার ঘরে
কুব্জ অইয়্যা আইট্টা গিয়া সিঁড়ির
নীচে পিড়া দিয়া দুয়ারটাতে বইবেন ।
নিঝুম জুমে রমণঘুমে পইড়্যা আছে
ভাই তাতেও যে শিল্প আছে, এ হেন গড় খাই ।
কাউল্ক্যা পরশু এমনি কইর্যাআ যাইবেন
যাইবেন কন ।
আমার কিন্তু জাইগ্যা আছে
মানুষ খেকো মন ।
১৬- ০৪ – ১৯৮৯
** নিহত রাত্রির দরজা **
অপস্রিয়মান আলো আর দ্রুতগামী সময়
ভেঙে পড়ছে সমুদ্রের তরঙ্গমালায়
লঘুহস্ত শিকারী ধনুকের ছিলায়
টানতে টানতে ঝুঁকে পড়ছে কুৎকুতে নীল
আকাশের দিকে ।
পাগলের প্রলাপ বকতে বকতে যে
প্রেমরাঙা নারী আজ মকরগঙ্গায়
শুকনো বকুলমালা ভাসাতে যাবে
ফিরে এসে সবকটি পুরনো চিঠিপত্তর ছিঁড়ে ফেলবে
ঠিকানায় কালি ফেলে দিয়ে
মৃদু আপত্তির অন্ধবিন্দুতে নিজস্ব
সংলাপে বাজাবে রিমিঝিমি
পৌরুষ যে দাঁতে কামড়ে ধরে প্রণয়শরীর
ক্ষাত্রপ্রেম জেগে ওঠে ধীরে
ক্রমাগত ছন্দিত ঘর্ষণে
পুষ্প চয়নকালে সুস্থ আবহাওয়া
সহসা কোত্থেকে হাততালি দিতে দিতে
সংবাদপত্রের পাতার দিকে ফেরায় লিপ্ত চোখ ।
পরদিন ভোরবেলা ঝাউগাছে
ডোমিনী কাক ডাকে
স্বপ্নে জড়িমা কেটে স্নানঘরে সূর্য ওঠে
কবিতার সহোক্তি সহস্রধারায় স্তনিত
প্রহর ভেঙে সাই সাই ছোটে
যেখানে বজ্রদগ্ধ আমি
প্রেমের চাঁছি খেয়ে তারপর মৃত্যুর শ্লোক
যতদূরে যায়
পায়ে পায়ে নিরুদ্দেশ পর্যটক
বটের চুমুরি থেকে টুপটাপ জল
চুমরে দেয় চাঁদোয়ার গাল ।
যেখানে ঝংকার ওঠে অরুণা ধরণীতে
বিষণ্ন ছন্দের খাতে নিজস্ব দিনগুলি
অথচ কিছু হাত উলঙ্গ রোমাঞ্চিত উলঙ্গ আকৃতি লাভে ।
আয়ুর চাদরে করাঘাত করে করে
যে যোগিনী ব্রত নিয়ে রাত জেগে থাকে
অনিন্দ্য সহায়ক ব্যক্ত রূপে
হে রাত্তির মাঝি স্তম্ভিত কর লগি
গর্ভবতী শব্দের পোষাক ঠেলে
গ্রামের পরবর্তী গ্রাম
আমার লিপির তলপেটে শ্রমিক মিছিল
অথচ জীবনের পিছুটান পাশ ফিরে যায়
সন্ধ্যার আসন্ন বিপ্লবে
যে বিপ্লব ঘরমুখো লুপ্ত পাঁচালী
প্লাবন পাত্রের নম্র অহংকারে
ত্বদীয় বিড়াল যদি যত্নে লালিত হয়
তীর্থের দাগ নিহত রাত্রির দরোজা
জানালা খুলে অনিরুদ্ধ শূন্যতায়
দেহত্যাগ করে ।
পুত্তলির খিমাত্তলে তবুও জন্মান্ধ
গায়ক মালিকার ঘ্রাণ পায়
প্রেমের চাঁছি খেয়ে তারপর
মৃত্যুর শ্লোক যতদূরে যায় ।
( তারিখ নেই)
** নির্বাসিত গ্রামীণ সংবাদ **
অপরাহ্ন বেলার হংসবালক কীর্তির খোলা
দরজা পেয়ে সোজা উঠে গেল পশ্চিমের দিকে
তখনো যবনিকা নাম্নী সোনালী মেয়েটি
লাই পুঁই-এর মস্তক তুলছে আমাদের
অম্লান ভবিষ্যতের দিকে ।
এখন আরাধনার বানভাসি জল ঢুকে গেছে
গ্রামে গ্রামে
এই মত জীবনবৃক্ষের ছিল ঊর্ধ্বমূলবাহু
একটা দৃঢ় ভবিষ্যৎ স্বপ্নও ছিল
ছিল মুক্ত পরিবেশ
দিগন্তের সোনায় আজ নেই সেই
অযাচিত সন্ন্যাস
মগ্নকালো বাতাবরণ ভেঙ্গে
আমি গ্রাম থেকে বলছি
এই আমার নির্বাসিত গ্রামীণ সংবাদ ।
( তারিখ নেই)
অগ্রন্থিত কবিতা
** আমিও যেতে চেয়েছিলাম
আমিও তো যেতে চেয়েছিলাম অনন্তকালের মধ্যরেখার উরুতে আগুন জ্বেলে
তারপর,
অসময়ে ঘুমভাঙা শিশুর মতো
টালমাটাল পৃথিবীর দ্বারে ।
জীবন বড়ো জাঁহাপনা
জোর করে ধর্ষণ করে দেবদূতের জ্যোতি ।
আমিও যেতে চেয়েছিলাম
নামহীন মাতৃনদীর কাছে,
ঢিল ছোঁড়ার আগেই শীৎকারের
শব্দে পাড়ে আছড়ে পড়ে নদী ।
কেমন কোরে জানাই তাঁকে
কলঙ্ক হয় যদি,
এই জলেই ভেসেছিলো গায়ের রাখাল ।
** এবারএকমুঠোভাতখা**
যা যা তুই ভাষার ভূগোল
ঘর থেকে আজ বেরিয়ে যা
গরম ভাত, না রৌদ্রটিলা
যা খুশি তুই একটা চা'।
যা যা যা পথের কুকুর
গেরস্থবাড়িতে ঢুকে যা
রান্না ঘরের শেকল টেনে
একটা কিছু লুটে খা।
যা যা যা নৃত্য করে
শিবের সঙ্গে জীবন যা
ও খোকা তুই ঘুড়িটা রাখ
এবার একমুঠো ভাত খা।
১৯/ ১১/ ৯০
** বৈকুণ্ঠযাত্রা **
(যার সঙ্গে কথা হয়নি। অথচ সে বন্ধু ছিল সবার । ক্লাসরুমের সেই হারানো মেয়েটিকে মনে রেখে )
বনভোজনের রাত্রি ছিল, বনপদ্যে নারী --
চোখের ভেতর মেঘনা ছিল, নষ্ট করতালি
বাঁশের সাঁকো কাঁপছিল নদীতে ছিল জল
হাওয়ায় ওড়ে হলুদ শাড়ি মেয়েটি ডুবে গেছে ।
( প্রাপ্তিসূত্র -- পত্রিকা -- উত্তরপূর্ব
৩য়বর্ষ, ১মসংখ্যা, জুন'৯১
সম্পাদক -- কল্যাণব্রতচক্রবর্তী, সন্তোষরায়, নকুলরায়, লক্ষ্মণবণিক)
** কবিতার সিঁড়ি **
রাত দুটোর শ্মশান ঘাটের বুকে ভেসে উঠে
কবিতার সিঁড়ি
মৃতদেহে উপুড় বসে জীবন খুঁজে ঘুমের শব্দ
ভয়ঙ্কর ভালোবাসা ছিটাতে ছিটাতে মনে
জেগে উঠে কবিতার সিঁড়ি
হারিয়ে যাওয়া অযুত লক্ষ স্নেহ
দু'ধারে রাত মেঘের মতো
নদী শান্ত মাটিকান্না মুর্ছিত আকাশ
কবোষ্ণ হাত কবিতার সিঁড়ি ছুটে বাতাসে
রাত দু'টোর শ্মশানে জেঁকে বসে হারানো
কবিতা পোড়াকাঠ শিয়াল
মৃত দেহ ভোগ করে নির্জনতা
অযুত বর্গমাইল জুড়ে প্রত্যেকের ঘরে ঘরে
খুলে থাকে গাঁথা কবিতার সিঁড়ি
প্রাপ্তিসূত্র – “পাভেল” মাসিক সংবাদ সাহিত্য সাময়িকী
তৃতীয় বর্ষ, সপ্তম সংখ্যা । সম্পাদকের নাম খুঁজে পাইনি ।
( কভাবের শেষ পৃষ্ঠা – এমন ছিল )
জাফর সাদেক
জন্মঃ ৩রা জানুয়ারী ১৯৭১
মৃত্যুঃ ২৯শে ডিসেম্বর ১৯৯০
পিতা – আবদুল খালেক
মাতা – অফিলা বেগম
কোন সত্যের বিচিত্র শিকার যতো বেগে ছুটে নিজস্ব ভঙ্গিমায় তার চেয়েও দ্রুতগামী যখন আমি সমাজ আমির দিকে দুরন্ত মানবতা দংশনের উত্তাপ পাই আমার চক্রবৃত্তের বাইরে অলৌকিক সৌরবলয় আর্তনাদ করে শুনি বিভূতি চিৎকার ক্রুদ্ধ সত্তার প্রতোদ ঘর্ষণে স্তম্ভিত মুরলী মরমে নিবেদ্য সংলয় দিনগুলি মৃত্যুর আড়াল সম্পাতে বুদ্ধির ভূগোল ক্ষয় অনন্ত সূর্যঘ্রাণ চৌদিক হলকাময় সদন রাত্রিচরী নিমিত্ত ও কারণের শৃঙ্খলে ভেসে ওঠে কবিত্ব কল্যাণী তালুতে কি সুন্দর স্বভাবজ সে আমি তার দশদিকে অমর্ত্য সন্ধানী নির্মাণের স্বাগত উচ্চারণে মানুষের হস্ত চুম্বন করি গণতায় কষ্ট পাই সময় নমস্য প্রিয়তম অভিমানে অখণ্ডতায় হেসে ওঠে উর্দ্ধলোক অপরূপ মৃত্তিকায় দাঁড়িয়ে থাকি ঈপ্সিত প্রহর ।
.....................
ত্রিপুরার কবিতা-সাহিত্যে জাফর সাদেক এক বিস্ময়ের নাম
তমালশেখর দে
ত্রিপুরার কবিতা-সাহিত্যে জাফর সাদেক এক বিস্ময়ের নাম
ত্রিপুরায় বাংলা কবিতার ক্রমযাত্রার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে । খুব স্বাভাবিকভাবেই দীর্ঘ এই পথে বহু বহু গুণী কবি এসেছেন । এর মধ্যেও কবি জাফর সাদেক এক বিশেষ জায়গা করে আছে । আজও তাঁর কোনো বিকল্প নেই । তাই তো বলা যায়, ত্রিপুরার কবিতা-সাহিত্যে জাফর সাদেক এক বিস্ময়ের নাম । ত্রিপুরার কবিতার ধারাবাহিকতায় তিনি আজও অনস্বীকার্য এক নাম।
কবির জন্ম ৩রা জানুয়ারি ১৯৭১সালে । মৃত্যুবরণকরেন ২৯শে ডিসেম্বর ১৯৯০ সালে । সেই অর্থে কবি বেঁচে ছিলেন ১৯ বছর ৮ মাস ২৮ দিন । এই অতি অল্প সময়ের মধ্যে ত্রিপুরার বাংলা কবিতায় জাফর সাদেক এক স্বতন্ত্র জায়গা করে নিয়েছেন । তাঁর সম্পর্কে সার্বিক মূল্যায়নে এইটুকু বলাই যথেষ্ট যে– ত্রিপুরার সাহিত্যের জগতে জাফর সাদেকের কোনো পূর্বসূরী নেই, উত্তরসূরীও এযাবৎ নেই । এমনই স্বতন্ত্র ছিল তাঁর চিন্তা-ভাবনা, কাব্যভাষা । জীবনকে দেখেছেন একান্ত নিজের মতো করে । চারপাশকে ব্যাখ্যা করেছেন নিজের আপন খেয়ালে । কবির একমাত্র প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘নিহত রাত্রির দরজা’। যার প্রকাশিত রূপ কবি দেখে যেতে পারেননি । সময়, সমাজ, রাজনীতি, জীবনবোধ, মৃত্যুবোধের এক আশ্চর্য জগৎ ধরা পড়ে কবির এই কাব্যগ্রন্থে । কবি যদি আরও বেঁচে থাকতেন, তবে কী হত, তা আজ অনুমান করে বলা মুস্কিল! হয়ত তাঁর কবিতা আরও বেশি স্পষ্ট একটা ভাষা পেত । হয়ত আরও তীব্র হয়ে উঠত তাঁর আক্রমণ । হয়ত আরও মৌলিক অনেক লেখা আমরা তাঁর কাছ থেকে পেতাম। সেই সম্ভাবনা জাফর সাদেকের মধ্যে ছিল । তবে যা আর হবার নয়, তা নিয়ে আর ভাবতে চাইছি না । যা পেয়েছি, তা নিয়েই আমরা আলোচনা করবো । শুরুটা নিশ্চয়ই কবির বড় ভাইকে দিয়েই করতে চাই ।
জাফরের বড়ভাই আকবর আহমেদ নিজেও একজন কবি । পেশায় শিক্ষক । রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বসহ আলোচক । তিনি ‘নিহত রাত্রির দরজা’ কাব্যগ্রন্থের শুরুতেই “আমার স্মৃতি মোক্ষম”-য় কিছু কথা পাঠকদের উদ্দেশ্যে লিখেছেন । সেখান থেকেই আমি শুরু করতে চাইছি । তিনিলিখেছেন- ‘ত্রিপুরার বিশালগড় থেকে আড়াই কি.মি. পূর্বদিকে২নংচন্দ্রনগর নামে গাঁয়ে এক কৃষক পরিবারে জন্ম আমাদের দাদুর অর্থাৎকবি জাফর সাদেকের দাদু ছৈয়দ আলি (শিক্ষক)।পিতা স্বর্গীয় নেজামত খাঁ।নেজামত খাঁ-র একমাত্র পুত্রসন্তান ছৈয়দ আলীর লেখাপড়ার হাতেখড়ি পিতার কাছেই। এরপর বিশালগড়ের তৎকালীন শ্রেষ্ঠ কবিরাজ ও শিক্ষক স্বর্গীয় বিধুভূষণ ভট্টাচার্যের কাছে। এরপর ছৈয়দ আলী-কে ভর্তি করা হয় তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ কুমিল্লার ইউসুফ স্কুলে। সেখান থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজে কলা-বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৩৩ সালে ঐ কলেজ থেকে ডিষ্টিংশনসহ স্নাতক হন। তিনি ছিলেন বিশালগড় এলাকার প্রথম স্নাতক। এই কথাগুলো ছোটবেলা ঠাকুমার কাছ থেকে শোনা। আর শুনতাম স্বর্গীয় বিধুভূষণ ভট্টাচার্যের কৃতিসন্তান বিশ্বভূষণ ভট্টাচার্যের মুখে।বিশ্বভূষণ প্রায় দিনই স্কুল থেকে ফেরার পথে আমাদের বাড়ি হয়ে যেতেন এবং আমাদের বলতেন- ‘তোদের দাদু আমার বাবার ছাত্র, আমি তোর দাদুর ছাত্র এবং তোর বাবা আমার ছাত্র। ছোটবেলায় এই কথাগুলো শুনে আমি আর জাফর খুব আনন্দ পেতাম।আমি আর জাফর ওনার ছোটভাই মৌলিভূষণ ভট্টাচার্যের কাছে পড়েছি। ১৯৩৩ সালে স্নাতক হওয়ার পর ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত, এই দীর্ঘ সময় আমাদের দাদু বিশালগড়ের প্রথম স্কুল (বাজারের পাশে) বর্তমানে যেখানে Girl High School, সেই স্কুলে প্রধান শিক্ষকের পদে শিক্ষকতা করেছেন। ঐ সময় দাদু কবিতা লিখতেন। ওনার কিছু কিছু কবিতা তৎকালীন কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘প্রবাসী’ এবং ‘মোহাম্মদীয়া পত্রিকা’য় ছাপা হয়েছিল। দু’একটি কবিতা আজও আমাদের সংগ্রহে আছে। তারপর ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে ১৯৪৩ সালেই একদিন স্কুলে দাদুর মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটে এবং ১৯৪৪ সালে জুন মাসের এক গভীর রাতে চিরদিনের মতো নিরুদ্দেশ হয়ে যান। অনেকেই বলে থাকেন বর্তমানে বাংলাদেশের লেইশারায় দাসগুপ্ত নামে এক দরবেশ এসেছিলেন, অনর্গল ইংরেজি বলতেন এবং শুধু লিখে যেতেন। ঐ দরবেশের সংস্পর্শে এসে ওনার কাগজপত্র পড়ে নাকি দাদু’র মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটেছিল।’
দাদু ছৈয়দ আলী সম্পর্কে এইটুকুই জানা যায় আকবর আহমেদের কাছ থেকে। কিন্তু দাদুর ‘মস্তিষ্ক বিকৃতি’ শব্দটাকে আমরা ভাবান্তর ঘটেছিল বলতেই পারি। দেখা যায়, সৈয়দ আলী বরাবরই সুফী মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। বিশ্বাসী ছিলেন মুক্তির সন্ধানে। না-হলে তিনি কেনই বা যাবেন সুদূর বাংলাদেশের দরবেশের সন্ধানে।
কবি জাফর সাদেককে দাদুর এইভাবে চলে যাওয়া হয়ত ভাবিয়েছিল ছোটবেলা থেকেই। জাফর সাদেক নিশ্চয়ই দাদুর এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। নাহলে একথা তিনি কেন কবিতায় বলবেন- ‘এমন কোন সম্পদ সঙ্গে করে আসিনি/যেখানে নির্ভয়ে পিতামহের নামটি পর্যন্ত লেখা যায়’। সেই দরবেশ পিতামহ যার নাম কবি জাফরের আদর্শ ছিল, সেই নাম লেখার মতো একান্ত নিজস্ব কোন কিছু কবি খুঁজে পাচ্ছেন না এখন। কিন্তু পেলেন তাকে কবিতায়। যেখানে কোন ব্যাকরণ নেই। সেই বন্ধনহীনতায় কবি ছুটে যেতে চান তার দাদুর কাছে। যে বন্ধনকে ছিন্ন করে তিনিও জীবনের কোন অমোঘ সত্যকে খুঁজতে চেয়েছিলেন। আজ কবিও যেন সেখানে চলে যেতে চান সেখানে। তাই তো কবি লিখছেন–‘ উদ্ধত শূন্যতার কানে কানে/ছুটে যেতে পারি দুরন্ত ট্রেনের গতিতে।’ ‘শূন্যতা’ শব্দের আগে ‘উদ্ধত’ শব্দটা জুড়ে দিয়ে গতিকে দিলেন অন্য এক মোড়ক। পরবর্তী বাক্যে তাকে আবার মাটিতে যেন নামিয়ে আনলেন। এবং বললেন –‘ছুটে যেতে পারি দুরন্ত ট্রেনের গতিতে।’ এই ‘শূন্যতা’ এবং ‘গতি’ দুটো শব্দের অদ্ভুত এক মিশ্রণ পাওয়া যায় জাফর সাদেকের কবিতার মর্মে । পরিণত কবি শূন্যতাকে নিয়ে যান গতির চূড়ান্ত সীমায়। এ-শূন্যতা সব সময় নিঃস্বতাকে বোঝায় না। নিঃস্বতার বুক ছিঁড়ে এসে দাঁড়ায় জীবনের মুখোমুখি।
কবি জাফর সাদেকের “নিহত রাত্রির দরজা”-য় কাব্যগ্রন্থের ভূমিকায় বা শুরুতে কবি যে কবিতাটি লিখেছেন সেটা উল্লেখ না-করলেই নয়। কবি লিখছেন–
“যদি এই সংঘবদ্ধ কণ্ঠস্বরকে প্রমাণ বলি।
সময়মুগ্ধ প্রকাশকে আর দূরে টানবো কেন ?
যেহেতু মেলে দেওয়া আছে ঘরে বাইরে অথবা সোজাসুজি মানুষের কাছে
ব্যস নিবেদ রাখলাম শ্রেষ্ঠ মুহূর্তের ।
বিষবৃক্ষের নীচে যে একাকিত্বের আলিঙ্গন আমি সহ্য করতে পারলাম না
তার মাত্রা, স্পর্শ রূপ রসা গন্ধ মোহ প্রেম বিরহ যোগ আত্মিক প্রতীক
একে একে সবার কাছে গেলাম
কবিতার কাছে যেতে পেরেছি তো?
জীবনের গেয় মানচিত্র তুলতে গিয়ে
হয়তো কখনো গুনে ফেলেছি আকাশের নক্ষত্র ।
জন্মদাকে ভুলতে গিয়ে দাঁড়িয়ে গেছি
কবরের পাশে।
না, আমি দরজার সামনে এসেই দাঁড়ালাম ।
পাঠক-পাঠিকাগণ আমাকে ভেতরে প্রবেশ করতে দিন ।
এ আমার প্রাণের প্রথম ঝাঁপি তোলা ।
হে উদ্ধারকারীগণ অশেষ ঋণ জমা রইলো ।”
“এই সংঘবদ্ধ কণ্ঠস্বর” কণ্ঠস্বর বলতে কবি নিশ্চয়ই তাঁর কাব্যগ্রন্থটিককেই বুঝিয়েছেন । এই কাব্য-কথাকেই কবি বলতে চেয়েছেন- ‘নিবেদ রাখলাম শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত’ । কবিতার লেখার মুহূর্তগুলোই কবির কাছে শ্রেষ্ঠ সময়, এই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই । এরপরই কবি বলছেন- “বিষবৃক্ষের নীচে যে একাকিত্বের আলিঙ্গন আমি সহ্য করতে পারলাম না / তার মাত্রা, স্পর্শ রূপ রস গন্ধ মোহ প্রেম বিরহ যোগ আত্মিক প্রতীক/একে একে সবার কাছে গেলাম/ কবিতার কাছে যেতে পেরেছি তো?”- এখানে কবি কী জীবনকেই ‘বিষবৃক্ষ’এর সাথে তুলনা করলেন? ‘একাকিত্বের আলিঙ্গন’ শব্দদ্বয় মনকে নতুন এক ভাবনা দেয় । তার মানে কবি একাকিত্বের থেকে মুক্তি পেতেই একসময় কবিতার কাছে আসেন। কবি লিখলেন– ‘জন্মদাকে ভুলতে গিয়ে দাঁড়িয়ে গেছি/কবরের পাশে।’ আসলে, মায়ের মৃত্যুর পরই মূলত তিনি কবিতা লিখতে শুরু করেন। এই কবি সম্পর্কে কবি সন্তোষ রায় বলেন –‘‘ত্রিপুরার বাংলাকবিতাপ্রবাহে কবি জাফর সাদেক একটি দীঘলবাঁক।’ কবি সেলিম মুস্তাফা লিখেন –“উপমা,প্রতীক, বাক্ প্রতিমা, অনুষঙ্গ, মিথ ইত্যাদি নির্মাণ-বিনির্মাণ এত স্বাভাবিকভাবে, এত অলক্ষ্যে ঘটে যায় তার শব্দচয়নের স্বতঃস্ফূর্ত ধারায় যে, আমাদের মতো সহজপাঠের সাধারণ পাঠককে সহসাই বাকরুদ্ধ করেদেয় জীবনের গহীনতার সামনে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়ে।”
‘নিহত রাত্রির দরজা’ কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতা– ছয় লাইনের। কবিতার নাম “ব্রাহ্মলিপি”। এই কবিতার কয়েকটি লাইন –
“উন্নাসিক ছুঁড়ে ফেলে হাতের চাবিকাঠি
বুকের ব্রাহ্মলিপি কি সব ক্ষতবিভূতি
পাখীগুলো উড়ে যায় বাসায় বাসায়
বুকের ব্রাহ্মলিপি বোঝে না কেউ ।”
প্রথম কবিতাটির শুরুতেই পাচ্ছি–‘বুকের ব্রাহ্মলিপি কি সব ক্ষতবিভূতি’। ‘ক্ষতবিভূতি’ শব্দটি থেকেই ভিন্নতার একটা সুর শুরু হয়ে যায়। ‘বিভূতি’ শব্দের আগে কি অবলীলায় ‘ক্ষত’ শব্দটি জুড়ে দিয়ে ‘বিভূতি’ শব্দটিকে অন্য এক মাত্রায় নিয়ে গেলেন । ‘বিভূতি’ মানে ভস্ম । ক্ষতের ভস্ম থেকেই এলো ‘ক্ষতবিভূতি’। শব্দের কি সুন্দর ব্যবহার । উপস্থাপনা । তারপরই কবি চলে গেলেন অন্য আরেক লাইনে - ‘পাখীগুলো উড়ে যায়’ ! এখানে কী কবি পাখীর বাড়ি যাওয়া দেখে লাইনটি লিখলেন! না, নিজের অব্যক্ত কথাগুলোকে ব্যঞ্জনা দিলেন পাখীর আড়ালে? আমার তো তাই মনে হল ! এজন্যই কি কবি পরের লাইনে লিখলেন– ‘বুকের ব্রাহ্মলিপি বোঝে না কেউ’ কিন্তু লিপিকে কবি ‘ব্রাহ্মলিপি’ বললেন কেন? একবার বললেন– ‘বুকের ব্রাহ্মলিপি কি সব ক্ষতবিভূতি’ আরেকবার বললেন–‘বুকের ব্রাহ্মলিপি বোঝে না কেউ’। তার মানে কবির ক্ষতবিক্ষত কথামালাগুলো কেউ বোঝতে পারছে না, এটাই বোঝাতে চেয়েছেন। কিন্তু কী অপূর্ব ব্যঞ্জনায় কথাটি উপস্থাপিত করলেন পাঠকের সামনে। এখানেই কবি নিজের দক্ষতার পরিচয় দিলেন। একটা নিঃস্বতার ছবিও আঁকলেন পাখীর প্রতীকের আড়ালে আড়ালে। ‘ব্রাহ্মলিপি’ শব্দটা কি কবি কোড-ওর্য়াডের মতো ব্যবহার করলেন! হয়ত তাই। এখানে কবির ভাষাবিন্যাস লক্ষণীয়। এখানে ‘কলল’ ‘জনিতৃ কোষ’ – এইসব শব্দের ব্যবহারও চমকপ্রদ। সচরাচরের বাইরে। অথচ মনকে টেনে রাখে। কবিতাকে বিরক্তিকর হতেও দেয় না। বরং প্রতিটি শব্দে পাঠককে ধরে রাখেন সচেতনভাবে ।
এরপরের কবিতা পাই ‘ইতিহাস’।
“বলপেনে সারাদিন ধরে রাখি কিছু আত্মপরিচিতি
আমার নিস্বন নিবিড় থেকে
একটা বাইসন মুণ্ড
ক্ষমাহীন ইস্পাত হাত
কিছু প্রিয় ফুল
উদ্বেল করতালি
নিখোঁজ হয়ে যায় ”
শুরুতেই চমক লাগে ‘নিস্বন’ শব্দের ব্যবহারে। দেখতে এবং শুনতে কত সরল মনে হয়। অথচ শব্দটার অর্থ জানা নেই। অভিধান থেকে সম্ভাব্য অর্থ পাই ধ্বনি, রব। আমি বহু চেষ্টা করেও ‘নিস্বন’ বিকল্প শব্দ এখানে খুঁজে পেলাম না।‘নিস্বন নিবিড়’ এই শব্দচিত্র মনকে কোথায় যেন একটা অচেনা জায়গায় নিয়ে যায়। কবি কবিতাটির শেষ টানছেন অদ্ভুত ভঙ্গিমায় –
‘এভাবে প্রতিদিন কবিতার হৃদয়ে-
বাঁচে কিছু অনুভব
এছাড়া বাঁচা ও মরার আর কোন ইতিহাস নেই। ”
কবিতাটি কবি লেখেন ১৪-০৭- ১৯৯০ সালে। মারা যাবার প্রায় পাঁচ মাস আগে। সেই নিরিখে দেখতে গেলে শেষের এই লাইন ‘এছাড়া বাঁচা ও মরার আর কোন ইতিহাস নেই।’ অন্য এক মানে নিয়ে আসে আমার কাছে। তারমানে কবিতার ভিতর দিয়েই তখন তাঁর যাপন ছিল। তিনি প্রতিদিন কবিতার হৃদয়ের মধ্যেই বেঁচে থাকতে চেয়েছেন। কিছু প্রিয় ফুল, উদ্বেল করতালি সবই যেন উদ্দেশ্যহীন হয়ে যায় একটি কবিতা ছাড়া। কবিতার ভিতর দিয়েই কি তবে তিনি ইতিহাস হয়ে থাকতে চেয়েছিলেন? এবার কবিতার প্রথম লাইন যদি লক্ষ করি দেখি কবি লিখছেন- “বলপেনে সারাদিন ধরে রাখি কিছু আত্মপরিচিতি”। তার মানে নিজের কথাই কবি তার কবিতায় লিখে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন।
‘নিহত রাত্রির দরজা’ কাব্যগ্রন্থের পরের কবিতা ‘খুলেছি অ্যালবাম’ কবিতাটির প্রথম স্তবক খুলে দেখি এবার।
“ছুটে যেতে পারি দুরন্ত ট্রেনের গতিতে
এমন আশ্চর্য কিছু নেই।
মেঘের খোঁপা খুলে বৃষ্টির জল
ধ্যানমগ্ন মাটিতে মিশাই
এমন আশ্চর্যও কিছু নেই।”
আমরা এমন এক সময়ে এসে পৌঁছেছি, যেখানে সব কিছু ছুটছে প্রচণ্ড গতিতে। ভাঙচুর হচ্ছে প্রতীকের। কোলাহল ভেঙে দিচ্ছে সব নৈঃশব্দ্যকে। ‘আশ্চর্য কিছু নেই।’ কবি কি অদ্ভুতভাবে ব্যঞ্জনা তৈরি করেছে– ‘মেঘের খোঁপা খুলে বৃষ্টির জল/ধ্যানমগ্ন মাটিতে মিশাই ’। ‘মেঘের খোঁপা’ এবং ‘ধ্যানমগ্ন মাটি’– এই যে চিত্রকল্প, এখানেই তো কবি কল্পনার জয় এবং ভিন্নতা।
কবিতার এর পরের স্তবকে আমরা দেখতে পাই কবি লিখছেন–
“শুধুই দিতে পারি ছন্দাঘাত– মুমূর্ষ বেলার
ঘনান্ধকার নিকুঞ্জ-ক্ষত রাত
দেখতেই পাচ্ছেন অপক্ষপাতিত্বে যোজন এগিয়ে
যাচ্ছে বায়বীয় করাত ।
দুরন্ত বাতাস অগ্নিবান
এখন চৈত্রমাস
নেতার মতো ধুঁকছে ক্ষয়ে মাঠের ঘাস ।”
এই স্তবকেও শব্দের চমকপ্রদ ব্যবহার মুগ্ধ করে। যেমন–‘নিকুঞ্জ-ক্ষত’ ‘অপক্ষপাতিত্ব’ ‘বায়বীয় করাত’ । এবং ভীষণভাবে টানল এই তুলনামূলক চিত্রকল্প, যেখানে কবি লিখছেন– ‘নেতার মতো ধুঁকছে ক্ষয়ে মাঠের ঘাস ।’ তার মানে কবি ‘নেতা’ চরিত্রকে কীভাবে মূল্যায়ন করলেন তবে! ক্ষয়ে যাওয়া মাঠের সাথে তুলনা টানলেন। আবার দেখুন ‘ঘনান্ধকার নিকুঞ্জ-ক্ষত রাত’ এই লাইনের ব্যবহার। ‘ঘনান্ধকার নিকুঞ্জ’ এই পর্যন্ত একটা প্রেমের বা কামের আভাস পাওয়া যায়। বা এর পরবর্তী অংশ প্রেমভাব নিয়ে আসবে, এমন একটা ধারণা মনের ভিতর তৈরি হবার পথে থাকে। কিন্তু হঠাৎ করে একটা শব্দ সব কল্পনায় জল ঢেলে কবি ‘নিকুঞ্জ-ক্ষত রাত’ ব্যবহার করেই পুরো অর্থটাকেই পাল্টে দেন। ‘ক্ষত’ শব্দের ব্যবহার থেকেই বোঝা যায়, কবি আগামীতে বেঁচে থাকলে আরও কত উজ্জ্বল কবিতা পেতে পারত পাঠক । ছোটো ছোটো শব্দের চমকপ্রদ ব্যবহারে কবি হঠাৎ করেই গোটা চিত্রকল্পকে নিমিষে পাল্টে দিচ্ছেন । যেমন ‘বায়বীয় করাত’ শব্দের ব্যবহার ! এভাবেই পলে পলে কবি শব্দ,শব্দের চিহ্নায়ন পাল্টে পাল্টে কবিতাকে গড়েছেন ‘নিহত রাত্রির দরজা’ কাব্যগ্রন্থে । নিজেকে প্রমাণ করেছেন প্রায় প্রতিটি কবিতায় ।
‘খুলেছি অ্যালবাম’ কবিতার পরের স্তবকে দেখি কবি লিখছেন–
“এমন কোন সম্পদ সঙ্গে করে আসিনি
যেখানে নির্ভয়ে পিতামহের নামটি
পর্যন্ত লেখা যায় ।
সমস্ত ব্যাকরণের অন্তর্দাহে
সকাল থেকেই পাগলাঘণ্টি
মগডালে সময় তাড়ায় ।”
সময় থেকে এবার কবি এলেন অসহায়তার কথায়। কবি নিজেকে নিয়ে খেলছেন এখানে। কবিতার নামও কি এই কারণেই রেখেছেন –‘খুলেছি অ্যালবাম’! এখানে কোন সম্পদের কথা বলছেন কবি? ‘পিতামহ’ শব্দটা এখানে কীসের প্রতীক হয়ে এসেছে ? নাকি এখানে কবি পিতামহের অনন্তকে জানার উদ্দেশ্যে নিরুদ্দেশ হওয়ার ঘটনাকে মন থেকে মেনে নিয়েছেন! কবি কিন্তু কোথাও একটা অসময়ের দিকে ইঙ্গিত করছেন প্রথম স্তবক থেকেই। এখানে এসে তাই কি কবি লিখলেন– ‘সমস্ত ব্যাকরণের অন্তর্দাহে / সকাল থেকেই পাগলাঘণ্টি’। ব্যাকরণের অন্তর্দাহ শব্দদ্বয়কে এখানে কী অর্থে বা ব্যঞ্জনায় বর্ণনা করতে চেয়েছেন কবি ? ব্যাকরণ কি নিয়মের কথাই বলছেন! অন্তর্দাহ কি নিজের ভিতরেই! না, রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিতরেই! ‘সকাল থেকেই পাগলাঘণ্টি’– এই ‘পাগলাঘণ্টি’ প্রতীকের ভিতর দিয়ে কবি কোন অসময়ের দিকে ইঙ্গিত করতে চাইলেন !
এইসব বিষয়গুলো খুব ভাবায় জাফর সাদেকের কবিতা পড়তে পড়তে। নতুন করে অনেক ভাবনা নিজের ভিতরে উঁকি দেয়া শুরু করে। মননের ডগায় লাগে নতুন অনুভবের সুর। এই ধরণের পরিস্থিতিতে পাঠক কীভাবে কবিকে অনুসন্ধান করবেন! কবি, তাত্ত্বিক তপোধীর ভট্টাচার্যের একটা কথা মনে পড়ছে। যেখানে তিনি বলছেন– ‘পাঠক তাহলে কী করবেন? এ ধরণের পরিস্থিতিতে কোনো নির্দিষ্ট পরিমাপকের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করা চলে না। কবিতার ভালো-মন্দ নেই, আছে কেবল প্রায়োগিক সার্থকতা কিংবা ব্যর্থতা– এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছতে হলেও ন্যূনতম অবস্থান গ্রহণ করা জরুরী।... কিন্তু তাৎপর্য-রিক্ততার সাম্প্রতিক পরিসরে পাঠকেরা কবিতার নৈঃশব্দ্য ও চিহ্নায়কের গ্রন্থনায় কোন তাৎপর্য সন্ধান করবেন এবং কোন্ পদ্ধতিতে? এর সম্ভাব্য মীমাংসার জন্যে একটু অন্যদিক থেকে বিষয়টি দেখা যেতে পারে। এ সময় যত নিশ্চিহ্নায়নের দিকে এগিয়ে যাক না কেন, কবির বাচন নিরন্তর এক জিজ্ঞাসা থেকে অন্য জিজ্ঞাসায় প্রসারিত হয়ে যাবে। যে-পর্যায়েই থাকুন কিংবা যে-অবস্থান নিন না-কেন, কবিসত্তা, প্রচ্ছন্নভাবে হলেও, স্বভাবে সামাজিক। তার দ্বিরালাপ অক্ষুন্ন থাকে নানাভাবে, নানা স্তরে, নানা বিভঙ্গে, এমন কি গোলকধাঁধার ধূসর ছায়াতে । এইজন্যই তার ভাষা পরাভাষায় গ্রথিত ও তার পরিসর পরা-উপস্থিতির কূটাভাসে বিদীর্ণ হয়েও অব্যাহত রাখে নিজের জিজ্ঞাসাকে। পাঠকের প্রধান দায়িত্ব কবির জিজ্ঞাসা ও আততির প্রতি তর্জনি সংকেত করা।’ (কবিতার রূপান্তর)
এরপরের কবিতা শুরু করছেন জাফর সাদেক এই বলে–
“হাজার বছর মুখোমুখি
হাতে তোলা তরবারি সুস্থির”
এখানে ‘হাজার বছর মুখোমুখি’ শব্দদ্বয় মনে এক ধরণের আবেশ তোলার পাশাপাশি, প্রশ্ন তুলে ধরে। এখানে কি কোন্ হাজার বছরের কথা বলছেন ? এই হাজার বছরের মুখোমুখি কেই-বা দাঁড়িয়ে আছে! কবি এরপরের লাইনেই লিখছেন –‘হাতে তোলা তরবারি সুস্থির’ । প্রথম লাইনের পর দ্বিতীয় লাইন কিছুটা চমকায়। তবে কি দ্বন্দ্বটা চলমান ? ‘মুখোমুখি’ শব্দটাই তো দ্বন্দ্বের বিষয়টা স্পষ্ট করছে। কবি এরপর বলছেন– ‘যুদ্ধের সাজসজ্জা’। এই পর্যন্ত লিখেই কবি কবিতার মোড় ঘুরিয়ে দিলেন অন্য এক মেজাজে। কবি এবার বুনন করলেন যে শব্দমালা তাহল– “পোকায় কেটেছে তোমারে
এ নবান্ন ফিরিয়ে নাও”
কাকে পোকায় কেটেছে ? ‘তুমি’ এখানে কাকে বোঝাতে চাইছেন কবি ! ‘পোকা’ কি এখানে সিম্বলিক অর্থে এসেছে ! নবান্ন-কে ফিরিয়ে নেয়ার কথাই-বা কেন বলছেন কবি ? আমার মনে হয়েছে কবি তার সময়কে কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না। কেননা, কবি এর পরেই বলছেন–‘হেমন্ত যেখানে রাদ্দিন ব্যবধান গড়ে’, এই কথার মধ্যে দিয়েই তো কবি সামাজিক অসাম্য ব্যবস্থার কথা তুলে ধরেছেন। আসলে, এখন কবিতাটা অনেকটা পরিষ্কার হয়ে ওঠে। কবি এখানে সাম্য আর অসাম্যের ব্যবধানকেই তুলে ধরতে চেয়েছেন। তরবারি, সুস্থির যুদ্ধের সাজসজ্জা কি এজন্যই ! এই অসাম্যের জন্যই কি কবি ‘এ নবান্ন’-কে ফিরিয়ে নেয়ার কথা বলছেন ! কবিতাটির নাম কবি রেখেছেন–“আজীবন” । এই কবিতায় যে লাইনটা আমাকে বেশি ভাবিয়েছেন সেই লাইনটি হল–“পোকায় কেটেছে তোমারে”। এই ‘পোকা’-কে অনেকভাবেই ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। এবং এই লাইনকে মধ্যে রেখেই কবিতাটিকে বারবার দেখতে হবে। তবেই কবিতাটি বিভিন্নরূপে আমাদের কাছে ধরা দেবে ।এমনভাবে দেখলেই কবি জাফর সাদেকের কবিতা ভাবনার সূক্ষ্ম দিকটাও আমরা বুঝতে পারবো। মূলত আমরা একটা অসাম্য ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে যে এগিয়ে চলেছি, এরই বার্তা যেন বহমান এই ‘আজীবন’ কবিতায়। কবির নিজস্ব পরিসর ভাবনা এবং উচ্চারণ আমাদেরকে মুগ্ধ করে।
কবি,আলোচক সাত্ত্বিক নন্দী তাঁর “অরাজক আত্মার ক্ষুধা” নিবন্ধে লিখছিলেন – “ “বিদ্রোহী এবং বিপ্লবীর সত্তা বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে আলবেয়র কাম্যু বলেছেন, বিকল্প ব্যবস্থার প্রতি বিশ্বাস এবং আনুগত্যবোধ থেকেই একজন বিপ্লবী বিদ্যমান ব্যবস্থাটিকে ভাঙতে চায়, সেটাকে আক্রমণ করে । নতুন ব্যবস্থা দ্বারা পুরনো ব্যবস্থাটির প্রতিস্থাপনই তার উদ্দেশ্য । অর্থ্যাৎ একটি সংগঠিত এবং পরিকল্পিত সক্রিয়তা । একজন বিদ্রোহীর ক্ষেত্রে বিষয়টি কিন্তু সেরকম নয় । কোনও পরিকল্পনা তার মাথায় থাকে না । সে শুধুই ভাঙতে চায় । যা কিছু তার স্বাধীনতাকে খর্ব করে, যা কিছু তার কাছে বাধা বা অবদমন বলে মনে হয় – সমস্ত কিছুকে সে তার আক্রমণের লক্ষ্য করে তোলা । সমস্ত খাঁচা, সমস্ত কাঠামোগুলি সে অস্বীকার করে । কোনও ব্যবস্থাই সে মেনে নেয় না । সকল ব্যবস্থাকেই সে তার অরাজক আত্মার চূড়ান্ত স্বাধীনতার পরিপন্থী বলে মনে করে । তার বিদ্রোহ বস্তুত গোটা অস্তিত্বটিরই বিরুদ্ধে । তার শরীরসংগঠন থেকে শুরু করে চিন্তাচেতনার বিবর্তন, সমাজসংগঠন থেকে মানবসভ্যতার ইতিহাস– সবকিছুতেই সে দেখতে পায় ভয়াবহ ষড়যন্ত্র ।”
জাফর সাদেক-কে পড়তে পড়তেও পাঠক হিসেবে নিজেকেও এমন অনুভূতির মধ্যে আবিষ্কার করবেন কখনও কখনও । বারবার নিজেকে খনন করেছেন নির্মমভাবে করেছেন ।
“আজীবন” কবিতাটি কবি লিখেন ১৭.১১.১৯৮৮। কবির প্রিয় দাদী দীর্ঘ ১১ বছর প্যারালাইসিসে ভোগার পর ৬ই জুন দেহত্যাগ করেন। ঠিক পাঁচমাস পর কবি এই কবিতাটি লিখেন। ‘পোকায় কেটেছে তোমারে’ লাইনটা কার কথা মাথায় রেখে লিখেছিলেন কবি? ‘এ নবান্ন ফিরিয়ে নাও’– এ কথা কাকে বলছেন কবি ? কেন তিনি এই নবান্নকে মেনে নিতে পারছেন না ! এর একটা কারণ কি মাত্র পাঁচ মাস আগে দাদীর মৃত্যুকে তখন অবধি তিনি সহজে মেনে নিতে পারছিলেন না। “হেমন্ত যেখানে রাদ্দিন ব্যবধান গড়ে / আকাশে নক্ষত্রে পাশাপাশি শয্যায়’’-এই লাইন দুটিরই বা কী ব্যাখ্যা হতে পারে! এখানে আকাশ, নক্ষত্রের পাশাপাশি শয্যার তুলনা করে কি মৃত্যুকেই বোঝাতে চাইছেন কবি !
কবির এর পরবর্তী লেখা ‘হৃদয়ের পাথর ভাঙতে ভাঙতে’। রচনাকাল ০৪.১২.১৯৮৮
“হৃদয়ের পাথর ভাঙতে ভাঙতে অমানুষ হয়ে যাই
ব্যূহে নামবার আগে পাগলা বেশেই
জান্নামে যেতে দরকার ছিল অন্তত একবার
আমার মাথার উপরের আকাশটা ক্রমাগত
যতটানীল।”
হৃদয়ের পাথর ভাঙতে ভাঙতে মানবতা ফিরে পাই
তোমাদের কাছে যেতেও দরকার ছিল
সবটুকু রহস্যের ঝুলন্ত আশা নিয়ে
আমার বুকের উপরের আকাশটা ক্রমাগত
যতটানীল।
হৃদয়ের পাথর ভাঙতে ভাঙতে সকাল থেকে সন্ধ্যায় পৌঁছাই
রাত্তির আঁধারে যে শব্দগুলি জেগে থাকে
তাদের অধিকার দিতে দরকার ছিল
আমার কানের উপরের আকাশটা ক্রমাগত
যতটা নীল।
হৃদয়ের পাথর ভাঙতে ভাঙতে মোহনার মুখের পাত্তা পাই
ঊর্মিমালার বার্ত্তা শুনতে চেয়েছিলুম
তবে সমাধির দরকার ছিল
আমার চোখের উপরের আকাশটা ক্রমাগত
যতটা নীল।
হৃদয়ের পাথর ভাঙতে ভাঙতে মৃত্তিকার ভেতর চলে যাই
সেখানেও কে জানি চিৎকার করে
দরকারের তাগিদে প্রতিকূল তেজারতে
আমার বিলকুল আকাশটা ক্রমাগত
যতটা নীল।”
এবার কবিতাটির দিকে যদি আবার ফিরে তাকাই, এভাবে –
‘হৃদয়ের পাথর ভাঙতে ভাঙতে অমানুষ হয়ে যাই’
‘হৃদয়ের পাথর ভাঙতে ভাঙতে মানবতা ফিরে পাই’
‘হৃদয়ের পাথর ভাঙতে ভাঙতে সকাল থেকে সন্ধ্যায় পৌঁছাই’
‘হৃদয়ের পাথর ভাঙতে ভাঙতে মোহনার মুখের পাত্তা পাই
‘হৃদয়ের পাথর ভাঙতে ভাঙতে মৃত্তিকার ভেতর চলে যাই’
অর্থাৎ পাঁচ লাইনে পাঁচবার ‘হৃদয়ের পাথর ভাঙতে’ কবি কোথায় কি পেয়েছেন, তার ইঙ্গিত দিচ্ছেন এখানে। নাকি এভাবে বলা যায়, এখানে কবি কবিতার হৃদয় ভাঙতে ভাঙতেই– অমানুষ থেকে মানুষ, সকাল থেকে সন্ধ্যা, জন্ম থেকে মৃত্যুকে স্পর্শ করেন। নাকি, পাঁচটি স্তবকের পাঁচটি প্রথম লাইন-ই কবির জীবনবোধের মূল কথা । বাকী সব জীবনের অস্থিরতা, চঞ্চল-কথামালা, স্বপ্ন দেখা। কবি ব্যূহে নামবার আগে একবার পাগলা বেশে জান্নামে যাবার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। জগতের কিছু রহস্যকে ভেদ করতে চান, অধিকার দিয়ে যেতে চান – রাত্রির আঁধারে জেগে থাকা শব্দগুলোকে । কবি সমাধির নীরবতায় শুনতে চান– ঊর্মিমালার মানে সমুদ্রের বার্তা । কবি শুনতে পান– প্রতিকূল তেজারতে কার যেন চিৎকার। কবি পাথর ভাঙতেভাঙতে সব শুনতে পান। দেখতে পান। তবু ইচ্ছের কোনো শেষ নেই! যে দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখা হোক না কেন, আকাশটা ক্রমাগত। এর কোনো শেষ নেই। স্বপ্নেই তার স্থিতি এবং বিস্তার । ‘আমার মাথার উপরের আকাশটা ক্রমাগত/ যতটা নীল’ মানুষ স্বপ্নেই বাঁচে, বেঁচে থাকতে হয় বাস্তবতার পাথর ভাঙতে ভাঙতে। এই কবিতার ‘রাত্তির আঁধারে যে শব্দগুলি জেগে থাকে / তাদের অধিকার দিতে দরকার ছিল ’ এই কবিতার এই দুটি লাইন বিশেষভাবে আমাকে আকর্ষণ করে । সত্যিই তো রাত্রির আঁধারে কত শব্দই জেগে থাকে। আমরা ক’জনই বা তাদের নিয়ে ভাবি ! শেষ স্তবকে কবি লিখছেন– “হৃদয়ের পাথর ভাঙতে ভাঙতে মৃত্তিকার ভেতর চলে যাই / সেখানেও কে জানি চিৎকার করে / দরকারের তাগিদে প্রতিকূল তেজারতে ”। ‘মৃত্তিকার ভেতর চলে যাই’- এখানে কি কবি মৃত্যুর কথা বলছেন ? সেখানেও লেনদেন ! ‘তেজারত’- মানে হচ্ছে, বিনিয়োগ ব্যবসা । জীবনের প্রতিকূল পরিস্থিতির বিরুদ্ধে আমরা আমৃত্যু যেন ক্রমাগত সংগ্রাম করেই চলেছি। এই সংগ্রামই যেন আমাদের বহমান স্থিতি।
সেদিন অন্নদাশঙ্কর রায়ের “কবি ও তার স্বকাল” নিবন্ধ পড়ছিলাম। সেখানে এক জায়গায় লেখক বলছেন– “কবি কি তার স্বকালের? কবি তার স্বকালের বই-কি। কিন্তু কবির উক্তি একবার উচ্চারিত হলে চিরকালের।হাওয়ার পিঠে সওয়ার হয়ে বীজ যেমন দূরদেশে যায় তেমনই সময়ের পাখায় ভর দিয়ে কবির উক্তি যেতে পারে নিরবধি কালের শেষসীমানা অবধি ।”
কবি জাফর সাদেকের একমাত্র কাব্যগ্রন্থ “নিহত রাত্রির দরজা”-য় এর পরের কবিতা পাই “ঘর থেকে ঘরে মেঘ ডুবে থাকে”। রচনা কাল– ১৫-০৫- ১৯৮৯ সাল। ছয় লাইনের ছোট্ট একটি কবিতা। কবিতাটির ভিতর এক অদ্ভুত ধরনের খেলা আছে। মায়াময় চিত্রকল্পের পাশাপাশি কেমন একটা রহস্যের হাতছানিও আছে। বহুবার পড়ার পরও মনে হয়, কোথায় যেন কবিতাটিকে ছুঁতে পারছি না । আবার কবিতার বয়ান পদ্ধতি এত সহজ যে, মনে হয় পড়লেই বোঝে ফেলবো। উপেক্ষা করে যেতেও মন চায় না। কবিতাটি শুরু হয় খুব সহজ এবং সুন্দর একটি চিত্রকল্প দিয়ে– “ঘর থেকে ঘরে মেঘ ডুবে থাকে”। ‘মেঘ’ এখানে একটি চরিত্র হয়ে ওঠে। যারা উত্তর ত্রিপুরার জম্পুই পাহাড়ে বেড়াতে গেছেন, তাদের চট করেই মনে পড়ে যাবে, জম্পুই পাহাড়ের কথা। যদিও কবি কখনই জম্পুই যাননি। কিন্তু চিত্রকল্পটি জম্পুইয়ের সাথে খুব মিলে যায়। মেঘলা দিনে সত্যি জম্পুই পাহাড়ের সব ঘরই যেন মেঘের ভিতরে ডুবে থাকে। মেঘের এমন অপরূপ খেলা ত্রিপুরার আর কোথাও দেখা যায় না। কিন্তু কবি জাফর সাদেক এমন একটি মায়াময় চিত্রকল্প আঁকার পরই পরের লাইনে লিখে ফেললেন– “স্বপ্নের কাছাকাছি আসে নিরুদ্দেশ পৃথিবী/ মুছে যায় শেষতম নাম”। প্রথম লাইনের পর দ্বিতীয় লাইন কেমন যেন ধাক্কা দেয় । আবার চমকিতও করে। তবে কি এটা আশাভঙ্গের লাইন। এরপরই লিখছেন– ‘মুছে যায় শেষতম নাম’। এখানে ‘শেষতম’ কেন বলছেন কবি? তবে কি মৃত্যুর কথা বলছেন ? তাই কি লিখছেন– “খোলা পৃথিবীকে কোথায় রেখে যাবো / ঘর থেকে ঘরে মেঘ ডুবে থাকে/ দুয়ার পেরিয়ে গেলে ধ্বংস হবো ।” এই কবিতায় শেষ তিন লাইনে এসে আমার কেমন যেন খটকা লাগল। তবে কি বলতে চাইছেন ঘরের বাইরে গেলেই মৃত্যু! কবিকে অসুস্থতাজনিত নানা কারণে সবসময় ঘরেই থাকতে হত। রোমান্টিক একটা ভাবনার দু-পাশে কেমন যেন মৃত্যু- চেতনার হাতছানি। কবিতাটির ভিতরে স্বপ্ন যেমন আছে । তেমনই আছে স্বপ্নভঙ্গের হাতছানি। কবি তাই পরপর চিত্রকল্প আঁকছেন অনেকটা এভাবেই– ‘স্বপ্নের কাছাকাছি আসে নিরুদ্দেশ পৃথিবী’ ‘খোলা পৃথিবীকে কোথায় রেখে যাবো’ ‘দুয়ার পেরিয়ে গেলে ধ্বংস হবো’ । এর মধ্যে বলছেন আবার ‘ঘর থেকে ঘরে মেঘ ডুবে থাকে’ । ‘মেঘ’ কি তাহলে এখানে দুঃখের প্রতীক হিসেবে আসছে ! তাহলে তো গোটা কবিতাকে আবার নতুন নিরিখে দেখতে হয়! তাহলে কী প্রতিটি ঘরের ভিতরেই এভাবে একটুকরো মনখারাপের ‘মেঘ’ বসবাস করে বা করছে । কবি জাফর সাদেককে এই কারণেই পড়তে মজা পাওয়া যায়। বারবার দৃষ্টিকোণ পাল্টে পাল্টে কবিকে পাঠ করা যায়।ক্ক কবি একই সাথে কথা বলছেন যেন স্পন্দন ও নৈঃশব্দের সাথে । ক্ক
কবির এরপরের কবিতার নাম “ শীত বসন্তের কবিতা”।
“তুমি কি ব্যর্থ শীত, ইষ্টিশানে রাত কাটানো
পাগলের রোমাঞ্চ ?
জানি কোথাও পেছনের দেয়াল ভেঙে পড়ছে
চোখের কবর থেকে মুহুর্মুহু ভেসে
আসছে জীবনের তীব্র ছবি ”
এই কবিতার প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে আলোচক শঙ্খ ঘোষের রচনার এই অংশটি ছুঁয়ে যেতে যাই, যেখানে তিনি লিখছেন– “নতুন শব্দের সৃষ্টি নয়, শব্দের নতুন সৃষ্টিই কবির অভিপ্রায় । মধুসূদনের মতো পরিশ্রমী শব্দচয়ন কবিতাকে একটা স্বতন্ত্র চেহারা দেয় বটে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে আবার তারই মধ্যে লুকোনো থাকে পতনের বীজ। একরকম অভ্যাস তৈরি হতে পারে কবিতায়– ম্যানারিজম–যা হয়তো কবির স্বাতন্ত্র্যকে ঠিক ঠিক ধরিয়ে দেয়, কিন্তু কবিতার কাজ তো কেবলমাত্র কবির স্বাতন্ত্র্য বুঝিয়ে দেওয়া নয়, প্রতিটি কবিতায় আরো একবার নিজেকে প্রতিফলন করে তোলাই কবির পক্ষে প্রয়োজন । শব্দরচনার অতিসাধ্য প্রেরণা শেষ পর্যন্ত কবিকে ঐ জড় অভ্যাসের মহাতমসায় ঠেলে নিতে পারে, এ আশঙ্কা থেকেই যায়।নতুন শব্দের সৃষ্টি তাহলে শেষ কথা নয়, শব্দের নতুন সৃষ্টিই মূল ।”
জাফর সাদেকের কবিতার প্রসঙ্গে এই কথাগুলো কেন টেনে আনলাম, তা আরও সামনে গেলে হয়ত আমরা অনুভব করতে পারব। উপরের উল্লেখিত কবিতায় প্রথম দুই লাইনে কবিতাকে ছুঁয়েই কবি হারিয়ে গেলেন কিংবা পাঠককে টেনে নিয়ে গেলেন জীবনের তীব্র এক চিত্রকল্পে। “চোখের কবর থেকে মুহুর্মুহু ভেসে / আসছে জীবনের তীব্র ছবি”-এখানে কবি উল্লেখ করলেন ‘চোখের কবর’। এটাকে কী আমরা শব্দের নতুন সৃষ্টি বলতে পারি! হয়তবা। এমন চিত্রকল্প কি এর আগে আমরা পেয়েছি ত্রিপুরার কবিতায় ? ‘চোখের কবর’ সে-জীবনের ছবিটা কী রকম ? কবি পরের লাইনে লিখছেন– “যেন কালরাত্রি গৈরিক বসন খুলে / উলঙ্গ নৃত্য করছে শিয়রে”। এখানে কবি জীবনের অব্যবস্থার কথাই তুলে ধরতে চেয়েছেন উলঙ্গ নৃত্যের প্রসঙ্গ টেনে। মিথকথা অনুযায়ী কবি এরপরই চিত্রকল্প আঁকছেন– “আর তুমি পুনরুত্থিত হয়ে আমাকে/করছো গঠন” । নতুন সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই পুরনো অব্যবস্থাকে ধ্বংস করা। নৃমুণ্ড হাতে তাই কালীকে দেখতে পাই। যদিও তন্ত্র মতে এর আরও বিশাল এবং ব্যাপক তাৎপর্য রয়েছে। ইতিহাসের কোনো এক বিপন্নতায় এ উলঙ্গ নৃত্য হয়েছিল। অব্যবস্থার এক চরম সীমায় শিব প্রলয়নৃত্যে মেতে উঠে পৃথিবীর সব অশুভ শক্তিকে ধ্বংস করে পুনরায় সুন্দরের, সত্যের প্রতিষ্ঠা করেন। এ প্রলয় নৃত্য দেবী দুর্গা এবং কালীর ক্ষেত্রেও লক্ষ্য করা যায়। অশুভ থেকে পুনরায় শুভ ভাবনার দিকে ফিরে যাবার এই চিরন্তন সত্যকেই এখানে কবি জাফর সাদেক অনুভব করালেন আবার । গোটা স্তবক পড়লে অদ্ভুত এক ওঠা-পড়া দেখা যায় । একবার মনে হয়, কবি বোধহয় ‘এই’ বলতে চেয়েছেন । আবার পরক্ষণে মনে হয়, না,না, কবি বোধহয় ‘এটা’ বলতে চেয়েছেন । এই দ্বি-বাচনই প্রক্রিয়াই তো কবিতার মূল রহস্য ।
কবি জাফর সাদেক এরপরের পংক্তিতে আরও বাঁক নিয়ে কবিতার ভিতরে গিয়ে লিখলেন –
“আড়ষ্ট পংক্তির পাঁজর খোলার অন্ধকারে
কেঁপে কেঁপে উঠেছে সৌরলোক
আর কবিত্ব পাপোষে পা মোছা সময়কে
আমি ছুঁড়ে দিচ্ছি নগ্ন পায়ের ধুলো”
‘কবিত্ব পাপোষে পা মোছা সময়কে/আমি ছুঁড়ে দিচ্ছি’– এমন দীপ্ত উচ্চারণ, তাও এমন তরুণ বয়সে, ত্রিপুরা দেখেছে বলে আমার মনে হয় না। কবি কি নিজেকে আক্রমণ করছেন এখানে ? না-হলে “কবিত্ব পাপোষে” শব্দদ্বয় কেন ব্যবহার করলেন কবি ! এরপরই বলছেন –‘আমি ছুঁড়ে দিচ্ছি নগ্ন পায়ের ধুলো’ । এত স্পর্ধা। এই লাইনের পরই কবি ভয়ঙ্করভাবে উচ্চারণ করলে–
“সময়ের অনুজ্ঞায় ধর্ষিত গাছ চিৎকার
করে তন্বী যুবতীর মতো শেকড়ে তার জীবনের স্তব
সেই মতো আমি বাড়ীতে সাজিয়ে
রেখেছি দু’খান পুষ্প টব
ভগ্ন চুল্লীর ভেতর কাঠের অনন্ত বিপ্লব ।”
প্রকৃতির ভিতর দিয়ে জীবনকে দেখা । আবার জীবনের ভিতর দিয়ে প্রকৃতির কাছে যাওয়া জাফর সাদেকের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য । ‘ধর্ষিত গাছ চিৎকার/করে তন্বী যুবতীর মতো’ –দৃশ্যটা কল্পনা করতেই গা-টা কেমন যেন রি রি করে ওঠে । এবং এরপরই কবি বলছেন– ‘শেকড়ে তার জীবনের স্তব’। এই যে পরিণতি বোধ, এতেই তো চমকে যেতে হয় । যদি দৃশ্যটা এভাবে ভাবি–‘ধর্ষিত তন্বী যুবতী চিৎকার / করে গাছের মতো শেকড়ে তার জীবনের স্তব’। আমরা কিন্তু এভাবেও পড়তে পারি । দেখতে পারি কবির অবস্থানকে এদিক-ওদিক করে ।
কবি বারবার তার কাব্যিক স্থিতি পাল্টে দিয়েছেন উপমার অভিনবত্বে । “ভগ্ন চুল্লীর ভেতর কাঠের অনন্ত বিপ্লব” –কোথা থেকে কোথায় নিয়ে গেলেন কবিতার গন্তব্যকে । ভাঙাচুরা জীবনের ভেতর মানুষের অনন্ত সংগ্রামের লেলিহান শিখা নয়, গনগনে আগুনের সঙ্গীত আজ তিনি দেখে ফেলেন । ধ্বংসের সাথে যেন সৃষ্টির যুদ্ধে একদিন গান গেয়ে উঠতে পারে জীবন। জীবন এবং বিচ্ছিন্নতার যন্ত্রণা এখানে স্পষ্ট।‘কবর’ শব্দটি এখানে নৈরাশ্য আনলেও ‘তীব্র’ ও মুহুর্মুহু’ শব্দ দুটি জীবনের গতির ছবিটি পরিস্ফুট করে। কবি কত অনায়াসে নিপুণভাবে ‘ কবর’ এবং ‘গৈরিক’ শব্দ দুটো নিয়ে ঢুকে গেলেন জীবনের গভীরে। যেখানে কোন দ্বন্দ্ব নেই। এবং এটাই জীবনের সত্য । শব্দের কোন বাধা-বন্ধন নাই । জাতপাত নাই । কবি যে শব্দে হাত রাখেন তা-ই উপভোগ্য হয়ে ওঠে। এটাই কবির দক্ষতা ।
জাফর সাদেকের কবিতায় শব্দে কৌশল টের পাওয়া যায়। কিন্তু তা এত সহজে কবিতার ভাবনার সাথে মিশে যায় যে, টেরই পাওয়া যায় না । মনে হয়, খুবই স্বাভাবিক একটা চিত্রকল্প বা দৃশ্যকল্প। জাফর শব্দকে প্রাধান্য দেন, অথচ পাঠককে তা সহজে বুঝতে দেন না। এটাও তার একটা বৈশিষ্ট্য । শব্দ কখনও কবিতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ওঠে না তার কবিতায় । অথচ শব্দ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার করার ক্ষেত্রে এখানেই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি থেকে যায় । জাফরের মতো শব্দ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা ঝুঁকি নিতে খুব কম দেখেছি ত্রিপুরার কবিতা ভুবনে । অথচ কোথাও শব্দ কবিতাকে মাড়িয়ে যায়নি। মনে হয়নি বাড়তি জোর দিয়ে কবি ব্যবহার করতে চাইছেন । কবিতা থেকে কখনই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়নি তার শব্দকৌশল।
কবিতায় কবির উপলব্ধি বা অভিজ্ঞতাকে কখনও সংহতি, কখনও ব্যাপ্তি ও বৈচিত্র্য দানের প্রয়োজনেই চিত্রকল্পের জন্ম । চিত্রকল্প কবিতাকে রসোত্তীর্ণ ও লাবণ্যময় করে গড়ে তুলতে সাহায্য করে। কবিতা যত বেশি অভিজ্ঞতার বিভিন্ন শেকড়কে স্পর্শ করে, ততই কবির মেধা প্রকাশ পায়।
“আয় কথা বলি অনন্ত আকাশ” কবির পরবর্তী ছোট্ট ছয় লাইনের একটি কবিতা। কবিতাটি এরকম–
বিকল্প নামব্রতে যজ্ঞ করছিল এক মহাকাব্যের নায়ক
যেমন নশ্বর চিন্তারা চুপচাপ হাঁটে আপনি মস্তিষ্কের ভেতর
ভ্রমান্ধ দার্শনিক বারবার টিপে দেখে দর্শনের হাত পা
দেখতে দেখতে নিয়মের ঠোঁট কেটে বেরিয়ে আসে নির্মাণ
তিমির ছুঁই ছুঁই অন্ধকারে নেচে ওঠে গাছ
আয় কথা বলি অনন্ত আকাশ ।”
আমি আগেই উল্লেখ করেছিলাম, ত্রিপুরার কবিতার জগতে জাফর সাদেক এক দীঘলবাঁক। শব্দের এই সংগঠন, এই সংযোজন, আর কারও মধ্যে লক্ষ করা যায় না। “ভ্রমান্ধ দার্শনিক বারবার টিপে দেখে দর্শনের হাত পা” – কাকে বললেন কবি কথাটি ? তারপরই প্রসঙ্গ থেকে সরে গিয়ে পরের লাইনেই লিখছেন–“দেখতে দেখতে নিয়মের ঠোঁট কেটে বেরিয়ে আসে নির্মাণ / তিমির ছুঁই ছুঁই অন্ধকারে নেচে ওঠে গাছ”-এই ‘গাছ’ কি আমাদের আশার দিকে নিয়ে যায়! ‘নশ্বর চিন্তারা চুপচাপ’ কার দিকে হেঁটে যায় ? ‘ভ্রমান্ধ দার্শনিক’ শব্দটিই বা কেন ব্যবহার করলেন কবি ! এমন অনেক কিছু আমাকে ভাবায়। কিছু হয়ত অনুমান করি । কিছু হয়ত বুঝেই পাই না। তখন মনের অজান্তে অবকাশ খুঁজি। মনে মনে বলে উঠি– ‘আয় কথা বলি অনন্ত আকাশ’ ।
জাফর সাদেক কবিতায় ধরা পড়ে জীবনের যন্ত্রণা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অবক্ষয়, ধর্মীয় সংঘাত । কবি ছুঁয়ে ফেলতে চেয়েছেন কবিতায় অন্য এক মাত্রা ।
কবি জাফরের ‘নির্মাণের সাতরঙ’ কবিতাটি পড়েও আমি খুব বিস্মিত হয়েছি। মুগ্ধ হয়েছি । কবির বয়ানটাই যেন নতুন । যেমন ধরুন এই কবিতায় –
“কিছু ইন্দ্রিয় মরে গেলে স্ট্যাচুর নির্মাতা তুমি সমগ্র প্রহর
জুড়ে বানাও আমাদের বিগ্রহ
প্রকাশ কাব্যময়ী থাকে যেন গভীর সমস্ত দিন নির্মিত মিনারে”
--কী অদ্ভুত ভাবনার বিকাশ! ‘প্রকাশ কাব্যময়ী থাকে যেন গভীর সমস্ত দিন নির্মিত মিনারে’ এই লাইনটির প্রকাশভঙ্গীমার সাথে কোন পূর্বসূরির মিল খুঁজে পাওয়া যায়? না, কোন উত্তরসূরির ?
মোট চার স্তবকে শেষ হয়েছে ‘নির্মাণের সাতরঙ’ কবিতাটি। দ্বিতীয় স্তবকের চিত্রকল্পটি এইরকম–
“কেউ যেন ছুঁয়ে গেছে শোণিত শাবক প্রারম্ভ বেলায়
প্রতিটি ধ্রুপদী আশার আকাশ দহনে যেমন নক্ষত্রেরা
গলে গলে যায়
সাঁকো হয়ে থাকে অনন্ত সময়
বেঁচে থাকে সহোদরা হয়ে মৃদু কল্পনার সূর্যঘ্রাণ ”
এখানে শব্দানুষঙ্গ তার পরিচিত আদল পাল্টে এসে ধরা দেয়। ‘সাঁকো হয়ে থাকে অনন্ত সময়’– এই কল্পচিত্রের সামনে কিছুক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়াতেই হয়। এই এক লাইনের ভিতর দিয়ে কবি যেন কত কথাই-না বলে গেলেন। আবার এর পরের স্তবকেই কবি আবার বাঁক নিয়ে লিখছেন–
“আঘাত-বর্ধিত চেতনার ভেতর তবুও মুখের আদলগুলো
ক্ষণে ক্ষণে গড়েছে আমার অস্তিত্বের মুক্ত বিকাশ
চিত্রিত চেতনার ভেতর বহুদূর চলে গেছে আড়াল কাঙ্খিত
ঘ্রাণ ”
প্রতিদিনই কি আমরা আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হই! আঘাতই কি বিকাশ ঘটায় আমাদের চেতনার ! উপরোক্ত লাইনে কবির কম্পোজিশন দেখার মতো । ‘চিত্রিত চেতনার ভেতর বহুদূর চলে গেছে কাঙ্খিত ঘ্রাণ’ এভাবেও তো লাইনটি লেখা যেত। কবি এখানে ‘আড়াল’ শব্দটি ব্যবহার করতে গেলেন কেন ? এই ‘আড়াল’ শব্দ এবং তার ভিতর দিয়ে গড়ে ওঠা চিত্রকল্প বোঝার চেষ্টা করলাম বহুবার। কোথায় যেন ধরেও ধরতে পারছি না। অথচ এই লাইনটা থেকে নিজে সরিয়েও নিতে পারছি না।আবার ‘চিত্রিত’ শব্দ চয়নটাও ভাবার মতো । চেতনা শব্দের সাথে কীভাবেই বা একে মেলানো যায় ! অথচ মিলে গেল, কোনো প্রকার জোরাজুরি ছাড়াই । ‘বহুদূর’ এবং ‘ঘ্রাণ’ এই দুটি শব্দও কীভাবে লাইনটিকে বহুমাত্রিক করে তুলল । এত সুচিন্তিত শব্দের প্রয়োগ যে চেয়ে থাকেই হয় কবি মুন্সিয়ানার দিকে । পরের স্তবকেও কবির উপমার চমৎকারিত্ব অবাক করে। কবি লিখছেন–
“বৃদ্ধের ধরনে নুয়ে পড়া দিনের শেষের ছায়ায়
যেমন একাগ্র চারণ মাঠপ্রান্তে ঘুরে একা একা
যেন দিবান্ধ পেঁচার মতো ধারণার জগতে ডুবে আছে বেলা
না–বললেই উড়ে যাবে কোন গোপন টিয়াপাখি
বিষণ্ণ গোধূলির মতো নির্মাণের সাতরঙ”
পড়ন্ত বিকেলকে তুলনা করলেন পড়ন্ত বয়সের সাথে । চিত্রকল্প আঁকলেন পড়ন্ত বিকেলে মাঠপ্রান্তে হেঁটে বেড়ানোর সাথে । কিন্তু আমি তন্ময় হয়ে ভাবছি কবি এখানে ‘নির্মাণ’ শব্দটি কেন ব্যবহার করলেন ! এর আগে কবিতার প্রথম দিকে কবি ব্যবহার করেছে ‘আচারের সুশ্রাব্য ভণিতা’ দৃশ্যপট। গোটা কবিতার নিরিখে অবশেষে কী এল আমাদের অনুভবে ? কবিতাটির লাইনে লাইনে হাঁটতে হাঁটতে কোথায় যেন যাবতীয় পরম্পরা ভুলে গিয়ে, অজানা অনুভবের ভিতর দিয়ে শুধু যেন গড়িয়েই গেলাম । পাঠক হিসেবে আপ্লুত হলাম । আচ্ছন্ন হলাম । মুগ্ধ হলাম । এক একটা চিত্রকল্পের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবলাম জীবনের বিচিত্র অনুভবের কথা । কোথায় যেন একটা বিষণ্ণতা মনকে ছুঁয়ে গেল । কবিতার ভাষা, কল্পনা প্রতিভার দিকে চেয়ে রইলাম একদৃষ্টে । অথচ পৃথকভাবে শব্দ নিয়ে ভাবলে মনে হয়, সব শব্দ বা চিত্রকল্প যেন ঠিক কবিতার ছিল না। কিন্তু শেষঅবধি কোথায় যেন সব মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল । এই বিষয়গুলিই বিস্ময় জাগায়। আলাদা একটা অনুভূতি জাগায় মননের ভিতর। এখানেই যেন জাফর সাদেক অনন্য ।
“নিহত রাত্রির দরজা”-র পরের কবিতা ‘৮ই অক্টোবর ১৯৯০’। কবি লিখেছেনও ঐ-দিন কবিতাটা । এই নামকরণের পেছনে কোনো উদ্দেশ্য থাকলেও থাকতে পারে। কবি তার কবিতায় এনিয়ে কোনো ইঙ্গিত করেননি । কবিতাটি হল–
“বৃষ্টির গাঢ় কণ্ঠস্বর শুনতে শুনতে
ঝনাৎ শব্দে চৈতন্য ফিরে চুপ হয়ে আছি ।
ঝাপসা আকাশে মেঘপরীরা দুরন্ত খেলছে
দিগন্তে প্রসারিত মায়াবী ঝালর
থিরথির কাঁপছে আশ্বিনের ধানক্ষেত
সদিচ্ছার কুঁড়িগুলো সারাদিন
ভিজছে একা একা”
ছোটো কবিতার মধ্যে অসাধারণ বিস্তৃতি নিয়েছে কবিতাটা। বৃষ্টির মৃদু স্বরের ব্যবহারই আমরা সাধারণত দেখে থাকি।কিন্তু কবির এই বৃষ্টি গাঢ় । ‘ঝনাৎ শব্দে’ কি বিদ্যুৎ চমকাল ! এত নীরবে কী ভবছিলেন কবি ? প্রকৃতির মাঝেই কবির বাড়ি । গোটা আকাশের মগ্নতাই দেখা দেখা যায় জানালা দিয়ে। কিন্তু ‘গাঢ়’ শব্দটার ভিতরে কোথাও কি অন্তর্গূঢ় টানাপড়েন লুকিয়ে রয়েছে এই জন্য কি এই কবিতার নামই উৎসর্গ করলেন ‘৮ই অক্টোবর ১৯৯০’ দিনটিকে ! জানি না কিছুই। আমরা শুধু কবিতাটির ভিতর দিয়ে কিছু দুরন্ত চিত্রকল্পের মুখোমুখি হচ্ছি। ‘দিগন্তে প্রসারিত মায়াবী ঝালর’– আহা কি অসাধারণ শব্দপ্রয়োগ । এরপরই কবি টার্ন করলেন কবির উদ্দিষ্ট ছায়াপটে- ‘থিরথির কাঁপছে আশ্বিনের ধানক্ষেত / সদিচ্ছার কুঁড়িগুলো সারাদিন / ভিজছে একা একা” । কবি কি এখানে নিজেই দাহ্য হচ্ছেন একা একা ! হয়তবা । কবি এখানে ‘ইচ্ছাগুলো কুঁড়িও’ বলতে পারতেন । ‘সদিচ্ছা’ বললেন কেন ? এইসব নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে । নাহলে, কবিকে উন্মোচন করা কঠিন হয়ে পড়বে । আকাশে ‘ঝাপসা আকাশে মেঘপরীরা দুরন্ত খেলছে’ আর কবি একা ঘরে বসে ‘আশ্বিনের ধানক্ষেত’-এর মতো মন খারাপের বৃষ্টিতে ভিজচ্ছেন একা একা । হয়ত সামনের জানালা খোলা । হয়ত ‘থিরথির কাঁপছে’ মাঠের ধান গাছগুলো ।
জাফর সাদেককে ভালবাসতেই হয়, তার এইসব দৃশ্যকল্পনার অভিনবত্বের জন্য। তৎকালীন কোনো কবির কবিতার ছাপ তাঁর কবিতায় পাওয়া যায় না। বরং উল্টো সব শিল্প-ছক ছিন্নভিন্ন করে তুলে নিয়ে এসেছেন নতুন নতুন অনুভবের ছোঁয়া । যা একান্ত যেন তাঁরই । কিন্তু কবির কি ‘সদিচ্ছা’ ছিল ? কবির মৃত্যু হয় ২৯-১২-১৯৯০ সালে। আর কবিতাটি কবি লিখেছেন – ৮-১০-১৯৯০ তারিখ। কবি ঠিক এর একদিন পর ৯ তারিখ কবি লিখেন আরেকটি কবিতা । কবিতাটির নাম– ‘খেলে মহাকাল’। এর মধ্যে একটি লাইন ছিল এমন–
“ভোরের বাতাসে দীর্ঘ কেঁদে যায় জন্ম
…...... … …
বাঁশের সাঁকোর মতো কাঁপে মায়াবী হরিণ।”
‘দীর্ঘ কেঁদে যায় জন্ম’ শুধু এই লাইনের অন্তরালে কবি কত-কী-যে বলে গেলেন। শব্দের ভিতরের এই খেলার জন্যই কবিকে পাঠ করতে ভালো লাগে। মন্থন করতে ভালো লাগে। সব কবিতা নিঙড়াতে ভালো লাগে না। কোনো কোনো কবিতা যেন আবার নিঙড়াতেই মজা । মননের ক্ষণে ক্ষণে সে যেন তার নিজস্ব ভঙ্গিমায় পাল্টায়। ক্ষুধার্ত পাঠক হৃদয়কে দেয় তৃপ্তি ।
এর পরবর্তী দুটি কবিতা হল ‘চতুর্দশপদী রাত্রি’ এবং ‘কথা অসীম’ কবিতায় কবিকে পাই ভিন্ন মুদ্রায় ।
“রাতভোর ভার্যার আয়ু কেটে যায় স্বৈরনাদিনী প্রেম
তীরে তার সতৃষ্ণ নারায়ণ জাগে প্রণম্য জিজ্ঞাসায়
রচয়িতা জানে তার নির্মাণের হাত দুটি কত অসহায়’’।
এই কবিতার প্রতিটি লাইন অসাধারণ । অসম্ভব এক ভালোলাগা কাজ করে । কিন্তু কেন ভালো লাগল, বলতে পারবো না। কিন্তু একটা মোহ কোথায় যেন আটকে রাখে । এই যেমন, ‘স্বৈরনাদিনী প্রেম’ বলতে কবি ঠিক কী বোঝাতে চাইলেন, কিছুই বুঝলাম না । অথচ পড়তে বেশ ভালোই লাগছিল । ‘প্রণম্য জিজ্ঞাসা’ শব্দবন্ধ ভালো লেগেছে। কিন্তু পুরো লাইনটা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারলাম না। কিংবা “ললিত লজ্জা ফিরে ফিরে চায়, ঠোঁটের শালুক করে লেনদেন / লেপাপোঁছা উঠোনে লক্ষ্মীর পা যেন লয়হীন মহাকাল”– দুটো লাইনই কৌতুহল জাগালো । কিন্তু কিছুতেই হৃদয়ঙ্গম করতে পারলাম না । কবিতাটিতে কেমন দুর্ভেদ্য থেকে গেলেন কবি আমার কাছে। ছুঁয়েও ছুঁতে পারলাম না ।‘ঠোঁটের শালুক করে লেনদেন’ – কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায় লাইনটিকে ? বুঝেও বুঝতে পারলাম না । ‘উদ্যত দেয়াল ভেঙে মৃত্যুগামী হয় প্রচক্র রাত্রিচর’ কিংবা ‘পাষাণপ্রতিমা রাত পরাঙ্মুখ দিনগুলি হারায় সতীচ্ছদ’- কথাগুলো পড়লেই মনে হয়, বুঝতে পারবো। কিন্তু পারলাম না । ‘পরাঙ্মুখ দিনগুলি হারায় সতীচ্ছদ’ কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন ? এই ভাষাশৈলী কী আমরা এর আগে পেয়েছি ত্রিপুরার কবিতায়? কবির এই কাব্যভাষা একদমই পরিচিত মনে হয়নি ।ঠিক এই কারণেই আমি বলেছিলাম– ত্রিপুরার কবিতার ক্ষেত্রে জাফর সাদেকের কোন পূর্বসূরি নেই। উত্তরসূরিও নেই। এই ভাষা যেন একান্ত জাফর সাদেকের। কিন্তু এইরকম ক্ষেত্রে পাঠক তাহলে কী করবেন ? তাত্ত্বিক তপোধীর ভট্টাচার্য বলছেন– “পাঠকের প্রধান দায়িত্ব কবির জিজ্ঞাসা ও আততির প্রতি তর্জনি সংকেত করা । আজকের জীবন ও সময়কে যত নিরবয়ব ও অস্থির মনে হোক না কেন, তার মধ্যেও লুকিয়ে রয়েছে নিজস্ব প্রতিবেদন তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা অর্থাৎ নিরবিচ্ছিন্ন জিজ্ঞাসার গ্রন্থনা এবং সেইসব জিজ্ঞাসা থেকে সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া ও মীমাংসার দিকে এগিয়ে যাওয়া ।”
“রাত রাতের ভেতরেই ঘুমোয়
দিন দিনের তলস্পর্শে
বুক ঘুমোয় বুকেই”
এভাবেই শুরু হয় ‘রাত দিনে আসে না’ কবিতাটি । খুব গভীর বোধ নিয়ে ধরা না- দিলেও কবিতাটিতে চমৎকার কিছু চিত্রকল্প অঙ্কন করেছেন কবি। যেমন–
“ স্মৃতির তসবী আঁকড়ে থাকে
ভাবনার দিগন্তপ্রসারী ঝালর”
কিন্তু এই কবিতার পরেই মন কেড়ে নেয়– “অবিনাশী” কবিতাটি। কেমন গা ঝিম ধরিয়ে দিয়ে কবি উচ্চারণ করলেন–
“বিনিদ্র রমণী যেন দুটো পাখী মেরে রেখে ঝাঁপির ভেতর
আরো দুটো চায় সঙ্গমে, চাকতির নাভি ছুঁয়ে পথের মতো
প্রলম্বিত আশা রম্য বুকের কাছে হাত দুটো রাখে”
কবি জাফর সাদেক তাঁর কবিতায় নিজস্ব একটা স্বাতন্ত্র্য রেখে যেতে পেরেছিলেন । কী অসাধারণ কবিতার ধারাভাষ্য। আবার কোথায় মনে হয় কবিতাটি ভয়ঙ্করও। ‘বিনিদ্র’ রাতের যন্ত্রণা বেড়ে যায় যখন এরপাশে এসে যোগ হয় ‘রমণী’ শব্দটি। কিন্তু এর পরের চিত্রকল্পটি বেশ অপ্রস্তুতভাবেই যেন আমার কাছে ধরা দিল–‘দুটো পাখী মেরে রেখে ঝাঁপির ভেতর’ । এই মরা-পাখী কি বিনিদ্র রমণীরই প্রতীক। না, তার আশা-আকাঙ্খার মৃত্যুর প্রতীক ! কিন্তু কবি আবার বাঁক নিয়ে পরের লাইনেই লিখলেন– ‘আরো দুটো চায় সঙ্গমে’ । মৃত্যুর বিপরীতে সঙ্গম । এই প্রতীক কী দুঃখকে আগলে রেখে সুখকে আলিঙ্গনের ? নিশ্চিত করে কিছুই বলার উপায় নেই। কবি শুধু আমাদের উৎসুক করে তুলেছেন তার ভাবনার দিকে । কিন্তু এর পরের দৃশ্যপটটা আমার কাছে প্রায় অচেনা ছিল, যেখানে কবি লিখছেন– ‘চাকতির নাভি ছুঁয়ে পথের মতো প্রলম্বিত আশা রম্য বুকের কাছে হাত দুটো রাখে’। আহা ! নাভি ছোঁয়া প্রলম্বিত আশা, কি অসাধারণ মনন । এবং চিত্রণ । এর পরই কবি বুকের কাছে হাত দুটি যেন সমর্পণ করলেন । প্রলম্বিত হাত রাখলেন প্রিয়ার বুকের উপর।
কবি তার ভাবনার জাদু আরও বাড়িয়ে দিয়ে লিখছেন–
“কি দুর্বিষহ তার স্নায়ু জ্বলে ছতরীর শিল্পময়
জলপ্রিয় পাখী যেন সতৃষ্ণ ঠোঁট দেয় উষ্ণ প্রস্রবণে”
অপূর্ব ভাবনাশিল্প। যদিও ‘ছত্ররীয়’ শব্দটার মর্মউদ্ধার করতে আমি সমর্থ হতে পারিনি। তারপরও, এতে বিশেষ অসুবিধা হয়েছে বলে মনে হয়নি আমার । এখানে ‘জলপ্রিয় পাখী’ কাকে উল্লেখ করলেন কবি ? ‘সতৃষ্ণ ঠোঁট দেয় উষ্ণ প্রস্রবণে’– কি সার্থক প্রয়োগ । সটান ভাষা এবং চিত্রকল্প । ‘প্রস্রবণ’ শব্দের প্রয়োগ আমাকে আল্লাদিত করেছে । ‘প্রস্রবণ’ মানে – নির্ঝরিণী, ঝর্ণা, নিঃসরণ। শব্দ নিয়ে জাফর সাদেকের পরীক্ষা-নিরীক্ষা অবাক করার মতো । কোথা থেকে এই সব শব্দগুলো কবির মনে উঁকি দিত, তাই ভাবতে অবাক লাগে। চট করে শব্দগুলোকে খুব কাব্যিক মনে হয় না। অথচ কবি এমনভাবে ব্যবহার করতেন যে, সময়ের সাথে মিলিয়ে যেত। মেজাজের সাথেও মিলিয়ে নিতেও সময় নিত না শব্দগুলো। ‘উষ্ণ’ শব্দের বা ভাবনার কি সুন্দর এবং সার্থক প্রয়োগ করলেন এখানে । এই সবই কবিকে মূল্যবান করে তোলে।
কবির “ভালোবাসার ঝনন-রণন শব্দে” কবিতাটি একটু অন্য মেজাজের, তাই মনে অন্য আরেক ধরণের অনুভূতি জাগায় । তিনটি স্তবকে লেখা হয়েছে কবিতাটি।
“ভালোবাসার ঝনন-রণন শব্দে রক্তে
সন্ন্যাস জাগে
ঝাউফুল তুমি । ঝাঁকামুটের ভাতের
স্বপ্নে জাগো ।
জল-ঝাপ্টায় ভেজা চুলের শুচি গন্ধ ।”
নিছক ভালোবাসার গল্প। অনুভূতি। কিন্তু শব্দের কি চাতুরি। বাহাদুরি । আচ্ছা, ভালোবাসার ঝনন-রণন শব্দে রক্তে সন্ন্যাস জাগবে কেন মনে ? প্রথমেই শব্দের এই সংমিশ্রণ আমাকে নাড়া দিল । তারপরই কবি ‘তুমি’-কে তুলনা করলেন- ‘ঝাউফুল’–এর সাথে । ‘ঝাঁকামুটের ভাতের’ এর সাথেও তুলনা করলেন । এরপরই আশ্চর্যভাবে বললেন– “জলসত্র হয়ে/জল-ঝাপ্টায়ভেজা চুলের শুচি গন্ধ।” ‘জলসত্র’ এর মানে কি ? অভিধান খুঁজে পেলাম – ‘তৃষ্ণার্থ পথিকের বিনামূল্যে জল দান করিবার স্থান ।’ কিন্তু কবি এই অভিধাকে ব্যবহার করলেন এর পরের লাইনের জন্য। যেখানে কবি উল্লেখ করছেন– ‘ভেজা চুলের শুচি গন্ধ’ । আহা! মনের ভিতর পাঠক হিসেবে কোথায় যেন আমিও সেই গন্ধ পেলাম । সত্যি ভেজা চুলের একটা রোমান্টিক গন্ধ থাকে । যা মনকে তন্ময় করে তোলে । পরের স্তবকে কবি লিখছেন–
“ভালোবাসার ঝনন-রণন শব্দে রক্তে
নদী জাগে ।
স্রোত তুমি । দুই তীরে তরমুজ খেত
ঝলসানো শ্মশানের পোড়াকাঠ
বিস্তীর্ণ নির্জনতায় ।”
কবি প্রথমে বললেন– “ভালোবাসার ঝনন-রণন শব্দে রক্তে সন্ন্যাস জাগে”। আর এবার বলছেন – ‘নদী জাগে’। আর তুমি হলে-‘স্রোত’ ।কিন্তু এই তোমার চারপাশের চিত্র আঁকতে গিয়ে কবি একী লিখলেন ! বিস্তীর্ণ নির্জনতা ! ঝলসানো শ্মশানের পোড়াকাঠ ! তাহলে, সেই ‘তুমি’-র পরিস্থিতি কেমন হতে পারে ? এত নির্জনতা কেন তাঁকে ঘিরে ! এই ‘নির্জনতা’ কি কবিকেও ছুঁয়ে গেছে ? সে-ই নির্জনতাকে আরও ভারি করে তুলে পরের লাইন– “তরুতলে দুগ্ধবতী/গাভী ওলানে দুধের মমতা ।” এই লাইনকে আমরা দুই ভাগে দেখতে পারি । এক হচ্ছে– ‘তরুতলে দুগ্ধবতী গাভী’ এবং দুই হচ্ছে– ‘ওলানে দুধের মমতা’ । দুধের মমতার সাথে কী সুন্দর তুলনা টানলেন– ‘ওলান’ শব্দের।গাভীর ওলান প্রদাহকে ম্যাস্টাইটিস বা ওলান ফোলা বা ওলান পাকা রোগও বলে । কিন্তু কবি রোগের কথা বলেননি, বরং তাকে মমতায় পাল্টে দিয়েছেন । ‘ওলান’ শব্দেরও যে এত সুন্দর ব্যবহার হতে পারে, ভাবতে পারিনি । এবার যদি লাইনটিকে উল্টো দিক থেকে পড়ি, এবং ‘তুমি’ শব্দের নিঃস্বতাকে বোঝার চেষ্টা করি, তবে কেমন হবে ? নতুন এক আলোক পাওয়া যাবে। পড়ে দেখতে পারেন । এই বিনির্মাণ আপনাকে কবিতাটির অন্য আরেক জগতে নিয়ে যাবে নিঃসন্দেহে । কবির ভালোবাসার ঝনন-রণন’কেও টের পাওয়া যাবে ।
কবি তৃতীয় স্তবকে কবিতাটি সম্পূর্ণ করছেন এভাবে–
“ভালোবাসার ঝনন-রণন শব্দে রক্তে
আগুন জাগে ।
ছাই তুমি । চুপচাপ ক্ষত কর বুক
দপ করে জ্বলো নিবো
চিরদিন জাগরুক প্রেমেন্দ্র বিলাপ”
এই ৭-৮-১৯৯০ তারিখেই কবি লিখেছিলেন –
“কবিত্ব পাপোষে পা মোছা সময়কে
আমি ছুঁড়ে দিচ্ছি নগ্ন পায়ের ধুলো
সময়ের অনুজ্ঞায় ধর্ষিত গাছ চিৎকার
করে তন্বী যুবতীর মতো শেকড়ে তার জীবনের স্তব” (শীত বসন্তের কবিতা )
আবার ঐ-একই দিনে লিখলেন- ‘ভালোবাসার ঝনন-রণন শব্দে’–এর মতো কবিতা। সে-ই কবিতায় ছিল ‘তুমি’ শব্দটি ! মনে পড়ে প্রথম লাইন– “তুমি কি ব্যর্থ”!এই ‘তুমি’-র কোনো নাম নেননি কবি । কেবল বললেন– “ছাই তুমি । চুপচাপ ক্ষত কর বুক”। এখানে কী সে-ই ‘তুমি’ নিজেই আত্মঘাতী । নিজেই নিজেকে দগ্ধ করেন । কিন্তু পরের লাইনে এসে আবার একটুথমকে যেতে হয়, কবি যখন বলেন– “চিরদিন জাগরুক প্রেমেন্দ্র বিলাপ”। তার মানে এই ‘প্রেমেন্দ্র বিলাপ’ শেষ হবার নয় । ‘চিরদিন জাগরুক’ থাকবে । হয়ত সময়ের ক্ষণে ক্ষণে জ্বলবে । নিভবেও । কবিতাটির ভিতর দিয়ে ভাবনাপ্রতিভা যেমন প্রতিভাত হচ্ছে, তেমনই প্রকাশিত হচ্ছে জীবনের ক্লান্তি । অন্তঃসারশূন্যতা । আত্মপীড়নের হাহাকার ।
জাফর সাদেক সম্ভবত চেয়েছিলেন, প্রচলিত সামাজিক মূল্যবোধকে নস্যাৎ করে পাঠককে এমন একটি নান্দনিক দৃষ্টির অধিকারী করতে, যার মাধ্যমে পাঠক অবশেষে ভেদ করতে সক্ষম হবেন যাবতীয় ভণ্ডামি ও রীতিনীতির বেড়াজাল। পৌঁছাতে পারবেন বস্তুর অন্তর্নিহিত সত্যে । একথা তো প্রায় সকলেই জানেন– কবিতার অর্থকে তার ভাষার কাঠামোগত সম্পর্কগুলির আলোয় দেখলে চলে না। কবিতাকে বুঝতে হয় তার লিখিত বিন্যাসকে ধীরে ধীরে ভেঙে ভেঙে ।এভাবেই চর্চায় চর্চিত হতে হতে একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে পাঠকের সাথে লেখকের । আবার অনেক ক্ষেত্রে এও দেখা যায় যে, কোনো একটি কবিতার নিপুণ ব্যাখ্যা তৈরি করেছেন একজন পাঠক, যার সাথে ঐ-কবির কোথাও কোনো সম্পর্ক নেই । এইভাবেও একজন পাঠক বা সমালোচক একটি কবিতার সাথে তার ইচ্ছের মাধ্যমে সম্পৃক্ত হন বা কম্যুনিকেট করে থাকতে পারেন ।
কবি জাফর সাদেক “জীবন বাজছে দ্রুত” কবি লেখেন–
“দুটো জীবনের মুখোমুখি জ্বলন্ত টিকা
ভাঙচুর স্বপ্নের মতো খণ্ড বিকাশ”
এ-কী দৃশ্যকল্প আঁকলেন ১৯ বছরের জাফর সাদেক ? দুটো জীবনবোধের মধ্যে ‘জ্বলন্ত’ শব্দটা বসিয়েই তো বাজিমাত করে দিলেন কবি । এরপরই জুড়ে দিলেন – ‘ভাঙচুর স্বপ্ন’ । এখানেও ভাবনার বীজকে জাগিয়ে রেখে, পরবর্তীতে লিখছেন – ‘খণ্ড বিকাশ’ । এই ‘বিকাশ’ কেমন বিকাশ ? মূলত ভাঙচুর এক জীবনের খণ্ড চিত্রপটকেই কবি এখানে তুলে ধরতে চেয়েছেন । কবিতাকে আরও তীব্র দিকে নিয়ে যাচ্ছেন, পরের স্তবকে -
“আমি দেখি বাষ্পজমা বৃত্ত
বনপোড়া সাপের মতো বর্ষানদী
দাঁড়ানো বিশঙ্ক কাল, দূরের বাতিদান
নদীর ওপারে বসন্ত, শূন্য গোঠের মেলা”
আমরা এখানে জীবনেরদ্রোহ কি কোথাও দেখতে পাচ্ছি ? ‘বনপোড়া সাপের মতো বর্ষানদী’– এই চিত্রকল্প থেকে আমরা কি পাচ্ছি মূলত ! পাহাড়ি ত্রিপুরার প্রেক্ষাপটে দুর্দান্ত একটা উপমা ! দৃশ্যচিত্র । এর ভিতর দিয়ে কবি আমাদের কোন্ দৃশ্যপটের দিকে লেলিয়ে দিতে চাইছেন ! কেননা, এরপরই কবি বলছেন – ‘দাঁড়ানো বিশঙ্ক কাল’ । এখানে ‘বিশঙ্ক’ শব্দটা পছন্দ কেন করলেন কবি ? ‘বিশঙ্কা’-র প্রশ্ন কেন আসছে এখানে ? ‘বিশঙ্ক’ অর্থ তো নির্ভীক । এর উত্তর কি পরের লাইনে পাওয়া যাবে, যেখানে কবি লিখছেন– ‘নদীর ওপারে বসন্ত, শূন্য গোঠের মেলা’ । ‘ওপারে বসন্ত’ হলে কবি এই মুহূর্তে কোন্ পারে দাঁড়িয়ে ! ‘শূন্য গোঠের মেলা’-এই প্রসঙ্গ টানলেন কেন কবি ? তার মানে কি এই কবি এই মুহূর্তে ‘এপারে’ দাঁড়িয়ে আছেন । তাই কি তার দ্রোহ । তাই কি তিনি পরের লাইনে লিখছেন– ‘দেখি মানুষের বুক থেকে ধ্বসে পড়া পাথর’ । এই ‘পাথর’ কীসের পাথর ? জাফর সাদেককে এভাবে ধাপে ধাপে পাঠ করতে হবে। নাহলে, ভুল পাঠের সম্ভাবনা থেকে যেতেই পারে । কেননা, জাফর আমাদের জীবন-বিচ্যুত হতাশার কথা বারবার তাঁর কবিতায় তুলে ধরতে চেয়েছেন । আবার অনেক সময় দেখা যাচ্ছে, কবি একের পর এক দৃশ্যের কোলাজ রচনা করে চলেছেন । এই কবিতার কবির শব্দের প্রয়োগ দেখুন কি অদ্ভুত – ‘বাস্পজমা বৃত্ত’ ‘বিশঙ্ক কাল’ ‘রুদ্রদৌঁড়’ ‘ মদ্ভেদী বীজ’ ‘বৃক্ষ-বিভূতি’ ‘ব্যুমেরাং আকাশ’। শব্দ নিয়ে কী ধরণের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন কবি, তারই ছোট্ট একটা উপমা যেন এই কবিতা ।
এরপরের – ‘তট’ কবিতায় কবি লিখছেন –
“গমনের ভেতর গীত কোলাহল কিংবা
ভালোবাসার শানপাথরে যাবতীয়
কলাকৌশল, স্থির অস্থির চিত্রকল্প
এই তো থাকে আশা করার ।”
আসলেই তো এই থাকে আশা করার । অথচ দেখুন, এই কবিতার লাইনের ব্যবহার কি চমৎকার । ‘ গমনের ভিতর কোলাহল’ লিখেই একই লাইনে ব্যবহার করে নিলেন –‘কিংবা’ শব্দটি । এই কিংবা ব্যবহার কিন্তু কবিতার ছন্দ-পতন ঘটাতে পারত । কিন্তু কবি সাহস দেখালেন, এবং অবশ্যই বাজিমাত করলেন । করলেন কি সুন্দর শব্দকল্পের চিত্রণ । এরপরই প্রশ্ন জাগে, কবি তাহলে এই কবিতার শেষ এমন করে কেন টানলেন –
“এপারে ওপারে তুমি মাঝে
সংলাপ সেতু
ভুল হরফে আলিঙ্গন করে তট ।”
ভালোবাসার যাবতীয় কৌশল ‘এপার-ওপার’ হয়ে গেল কেন ? কীসের সংকটে ? ‘ভুল হরফে আলিঙ্গন’-ই বা হল কেন ? জাফর সাদেকের কবিতা ভাবায় । ‘ভুল হরফে আলিঙ্গন করে তট’– শব্দের এই জাদুকরী মিশ্রণ আজও অধরা যেন ত্রিপুরার কবিতায় । শব্দ, চিত্র, উপমা, দৃশ্যকল্প নিয়ে জাফরের মাতাল করে দেয়া খেলা, পাঠক হিসেবে, আমাকে মুগ্ধ করেছে বারবার । মানুষের নিঃসঙ্গতা, চরম একাকিত্ব, কারও সাথে সংযোগ-স্থাপনের ব্যর্থতা জাফর সাদেকের কবিতায় প্রভাব ফেলেছে বেশ প্রকটভাবেই।
আমরা এরপর পাই কবির নামহীন একটি কবিতা । যেখানে কবি লিখছেন–
“পাহাড়চূড়োর দিন যৌবন সীমান্তের ভুবন
পেরিয়ে গেছে
দুপুর কোথাও না কোথাও থেকে যায়
থেকে যায় প্রেমিকার জবুথবু পা
কিংশুক শয্যার পাশে”
এত আবেগময় চিত্রকল্প খুব কমই পাই আমরা “নিহত রাত্রির দরজা” কাব্যগ্রন্থে। ‘দুপুর কোথাও না কোথাও থেকে যায়’- এখানে কবি ‘থেকে যায়’ কথাটা বলছেন কেন ? তার আগে ব্যবহার করলেন– ‘কোথাও না কোথাও’ । দুপুর কি কোথাও না কোথাও থাকার মতো কোনকিছু! তাহলে, কবি বললেন যে ? এবং তারপরই বলছেন– ‘থেকে যায় প্রেমিকার জবুথবু পা’ । এই ‘জবুথবু’ শব্দের ব্যঞ্জনা এবং চিত্রকল্প কী এখানে লিখে ব্যাখ্যা করা যাবে ? কোনদিনও না। এটা একান্ত অনুভবের ব্যাপার । কবি এই অনুভবের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়ে যোগ করলেন– ‘কিংশুক শয্যার পাশে’। কিংশুক মানে হচ্ছে– পলাশ ফুল বা বৃক্ষ । এবং এই ফুলের রঙ হচ্ছে টকটকে লাল । কবি এখানে চিত্রকল্প আঁকছেন কিংশুক শয্যার পাশে। শয্যা-টা কি এখানে রক্তাক্ত ? আমি জানি না । ‘প্রেমিকা’ কী আজ ভালোবাসার লাল রঙে প্লাবিত ? তাও জানি না । এজন্যই কি কবি আগে বলেছেন– এই দুপুর থেকে যাবে কোথাও না কোথাও । সে-ই ‘কোথাও’ হৃদয়ের ভিতরের কথা বলছেন কবি ? হয়তবা। হয়তবা না । এখানে পাঠকের স্বাধীনতা । হয়ত এখান থেকেই গড়ে উঠবে পাঠকের নির্মাণ বা বিনির্মাণবোধ । দেরিদা যেমন বলেন– “লেখা এবং পঠনের প্রক্রিয়া এতটা সহজ, স্বচ্ছ ও সরল নয় যে তা থেকে নিশ্চয়তা প্রত্যাশা করা যায় ।”
এর দৃশ্যায়নের পর কবি পরবর্তীতে লিখছেন-
“আর অন্ধধারণা যার বুকের তায়ুশ চুরি
করে নিল
নরম স্তনে বসিয়ে গেল দাঁত
সারারাত ভাসাল ডালিম
সাতরঙে নন্দিত ভোরের জঙ্ঘায়
রৌদ্রযোনি গড়িয়ে নামে শৈলবালারূপে”
‘নরম স্তনে বসিয়ে গেল দাঁত’– এইরকম সরাসরি শব্দপ্রয়োগ বা চিত্রায়ন আমরা এর আগে দেখেছি জাফর সাদেকের কবিতায় ? আমার তো মনে হয় না দেখেছি বলে ! ‘তায়ুশ’– শব্দের অর্থ ‘ময়ূর’ । কিন্তু কী-অর্থে কবি ব্যবহার করলেন, আমি ধরতে পারিনি । এটা আমার কাছে পাঠক হিসেবে রহস্যই থেকে গেল । এরকম রহস্য অবশ্য প্রায়ই থেকে গেছে জাফর সাদেককে পাঠ করতে গিয়ে । যাই হোক, কবি এরপরই ছবি আঁকছেন– ‘সাতরঙে নন্দিত ভোরের জঙ্ঘায়/রৌদ্রযোনি গড়িয়ে নামে’ । ‘নন্দিত’ শব্দের কী সার্থক প্রয়োগ করলেন কবি ! এখানেই আশ্চর্য হতে হয়, তাঁর শব্দ ব্যবহারের সৌন্দর্যবোধ নিয়ে । ‘যোনি’ শব্দের আগে বসিয়ে দিলেন– ‘রৌদ্র’ শব্দটি । আবার গড়িয়ে পড়ার উদাহরণ দিতে গিয়ে উপমা টানলেন– ‘শৈলবালারূপে’ । এবার শৈলবালারূপটি কী ? কী তার রকম ? তাও আবার ‘সাতরঙে নন্দিত’ ! কবি জাফর সাদেককেএভাবে যত বেশি নির্মাণে-বিনির্মাণে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখা যাবে, ততই মুগ্ধ হতে হয় । সে মুগ্ধতা হয়ত চট করে ধরা নাও দিতে পারে । হয়ত এই জন্যই সমালোচনা সাহিত্যে কথিত আছে– “পাঠকই পাঠের অর্থ নির্ধারণ করেন। কাব্যের অস্তিত্ব থাকলে তা ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকট হয় না যতক্ষণ পর্যন্ত সেটি পড়া হয় না । অর্থগ্রহণের জন্য পাঠের সাথে পাঠকের সংঘাত হওয়া জরুরী । পাঠের মধ্যে কয়েকটি স্থান শূন্য থাকেই, যেগুলি শুধুমাত্র পাঠকই পূর্ণ করতে পারেন ।”
সার্বিক কবি জাফর সাদেককে নিয়ে কবি সেলিম মুস্তাফা তাঁর “আমি আর দেবদূত বৃষ্টি ভিজে বাড়ি যাই ...” নিবন্ধে লেখেন – “উপমা, প্রতীক, বাক্-প্রতিমা, অণুষঙ্গ, মিথ ইত্যাদি নির্মাণ-বিনির্মাণ এত স্বাভাবিকভাবে, এত অলক্ষে ঘটে যায় তার শব্দচয়নের স্বতঃস্ফূর্ত ধারায় যে, আমাদের মতো সহজপাঠের সাধারণ পাঠককে সহসাই বাকরুদ্ধ করে দেয় জীবনের গহীনতার সামনে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়ে। মৃত্যুচেতনা কখন যে জীবনেরই রূপ ধরে আসে, কখন যে জীবন ছাড়িয়ে চলে যায় কোনো এক অতিজীবনের দিকে, তা টের পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। নিঃসন্দেহে, এ পাওয়া যেন একথাই মনে করিয়ে দেয় যে, কাব্যচেতনা এমনই এক চেতনা, যা সামাজিকভাবে কখনো অলক্ষে থাকলেও, মানুষের কাছাকাছি থাকে, জীবনের কাছাকাছি থাকে, আর বার বার তাকে জীবনপিয়াসী করে তোলে– অমরতা দিয়ে যায় । বস্তুত কবিতা ছাড়া মানুষের আর কোনো আশ্রয় নেই ।”
“বাকরুদ্ধ করে দেয় জীবনের গহীনতার সামনে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে”- জাফর সাদেককে পড়তে গিয়ে আমিও বারবার এই অনুভবের মুখোমুখি হয়েছি ।
“আমি আর দেবদূত” কবিতায় কবি জাফর সাদেকের মধ্যে একটা ঘোর লক্ষ করি । কবি এ-কথা সে-কথা দিয়ে কবিতার শুরু করে, হঠাৎ করে বেশ গম্ভীর হয়ে উচ্চারণ করলেন–
“আমি আর দেবদূত
বৃষ্টি ভিজে বাড়ী যাই
বাড়ী ফাঁকা অসংখ্য লতায়
ঢাকা থাকে দুয়ার ”
এখানে ‘আমি’ যদি কবি ধরে নিই, তবে প্রশ্ন আসে –‘দেবদূত’ কে ? দেবদূতও কবি নিজেই ? নিজের আত্মার প্রতিনিধিত্ব যে করছে, সে-ই কী প্রতীকী অর্থে এখানে ‘দেবদূত’ হয়ে উঠে আসেছে ! তাই বুঝি, কবি ভিজলে সেও ভিজে ! কবি আহত হলে, সেও আহত হয় । কিন্তু এখানে ‘বাড়ী যাই’ বলে কবি কোথায় ছুটে চলেছেন ? কবি নিজেই বলছেন– বাড়ি ফাঁকা ! অসংখ্য লতায় ঢেকে রয়েছে দুয়ার! তাহলে, স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, এ-তবে কেমন বাড়ি ? কেমন দুয়ার ? কবিরই কী মোহ এই বাড়িটার প্রতি ! দুয়ার কেন ঢাকা থাকে ? ভিতরে কে থাকে ? কার সাথে কবি যাপন করেন এই দুয়ারের ভিতরে ? কি রকম অদ্ভুত এই চিত্রকল্প আঁকলেন এখানে কবি । অচেনা এক নীরবতা মনের ভিতর উঁকি মারে । নিস্তব্ধতা গ্রাস করে ফেলে মননকে । কবি এখানে কী নিজের মনের ভিতরের চিত্রকল্প অঙ্কন করলেন ? নিঃসঙ্গতার এক ভয়াবহ চিহ্নায়ন । কবি এরপর আবার তাঁর অনুভব এগিয়ে নিয়ে গেলেন –
“জুম খেত সাপ চরাচর
পিঠে স্মৃতির লাঙ্গল
দঙ্গল বেঁধে শূয়োর নামে
মগ্ন করে জঙ্গল ”
‘স্মৃতির লাঙ্গল’ কি অপূর্ব উপমা টানলেন কবি । জুম খেতে সাপের চরাচর । কিন্তু কবি জানান দিলেন না, কীসের স্মৃতি ! ‘লাঙ্গল’ কি এখানে পরিশ্রমের দ্যোতক হিসেবে এসেছে ? কষ্টের, পরিশ্রমের জুম খেতে হঠাৎ সাপের চিত্রকল্প এলো কেন? ‘দঙ্গল বেঁধে শূয়োর নামে / মগ্ন করে জঙ্গল’– এই পরিস্থিতিতে কবি এখানে ‘মগ্ন’ শব্দটি ব্যবহার করলেন কেন ? ধ্বংসের মধ্যে ‘মগ্ন’ শব্দটা বসিয়ে পাঠককে বেশ চিন্তায় ফেলে দিলেন বটে ! এখানেই তো জাফর সাদেক ব্যতিক্রমী । কবি এর পরেই আবার লিখছেন– “আমি আর দেবদূত/বৃষ্টি ভিজে বাড়ী যাই”– যেন কিছুই হয়নি । যেন এটাই ভবিতব্য ছিল । এটাই হবার ছিল । এই কবিতায় কবির ফেলে আসা পেছনের লাইন মনে পড়ে গেল , যেখানে কবি লিখছেন–
“আমার প্রিয় গজল গান
আমার প্রিয় আজান গান
পথে পথে বাজতে দাও”
কবি কি পথে পথে হাঁটতে হাঁটতে শুনবেন সে-ই সব গান! এই জন্যই কি প্রথম দিকে কবি লিখছেন– “আমি আর বৃষ্টি নই/বা বৃষ্টিভেজা ভ্রূণ / দরবেশও নই / কি করে হবো স্বয়ংসিদ্ধ জীব ।” অসাধারণ এক ব্যঞ্জনা তৈরি করেছেন কবি, এই কবিতায় । এখানে অর্থগ্রহণের প্রক্রিয়া যেন অন্তহীন । কবিতা মাত্রেই তাই ।
জীবনের শুরু থেকেই জাফর সাদেক রোগের সাথে লড়াই করে বেঁচে ছিলেন । ছয় বছর বয়সেই ডিপথেরিয়ার মতো মারাত্মক অসুখে ভুগেছিলেন ।আবার আট-নয় বছর বয়স থেকেই ভুগছিলেন রিউম্যাটিক ফিভারে । মানে বাতব্যাধি জ্বর । গিঁটে গিঁটে অসহ্য ব্যথা । অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও সন্ধিতে স্ফীতিসহ প্রবল জ্বর দেখা দেয় । এটি একটি জ্বালাকর ও প্রদাহযুক্ত রোগ। Streptococcus বা স্ট্রেপটোকক্কাস পায়োজেনাস নামক ব্যাক্টেরিয়া প্রথমে গলকোষ, মুখমধ্য এবং গলমধ্যের অভ্যন্তরস্থ গহ্বরে আক্রমণ করে । এর অপর্যাপ্ত চিকিৎসার কারণে শরীরে স্ফীতিসহ জ্বালাতন ও প্রদাহযুক্ত প্রবল জ্বর ছড়িয়ে পড়ে । এমনকি হার্টের বাল্ব ধ্বংস, হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধও হয়ে যায় । এবং আমরা জানি কবি শেষে হার্টফেল করেই দেহত্যাগ করেন । এই রোগে প্রায় অর্ধেক ক্ষেত্রে হার্টেই আক্রান্ত হন। কবি আজীবন জ্বর, অস্থিসন্ধিতে তীব্র ব্যথা যা প্রায়ই পায়ের গোড়ালি, হাঁটু, কনুই, হাতের কব্জি, কাঁধ, কোমর, হাতের, পায়ের পাতায় প্রচণ্ড ব্যথায় ভুগেছিলেন কবি । তাছাড়া এই রোগে বুকে ব্যথা, বুক ধড়ফড় করা, ক্লান্তি লাগা, শ্বাসকষ্ট এইসবও দিনের পর দিন সহ্য করতে হয়েছে কবিকে।
এই রোগে ব্যক্তির নিজের শরীরের টিস্যুর বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি হয় । তবে যাদের শরীরে এই রোগের জিন রয়েছে তারা অন্যদের তুলনায় খুব সহজে এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে । প্রসঙ্গক্রমে আমরা কবির বড়ভাই আকবর আহমেদের কাছে থেকেই জানতে পারি যে, কবির বাবাও এই বাত রোগে দীর্ঘকাল ভুগেছিলেন। তার অর্থ কি এই যে, এই রোগ কবি তার পিতার কাছ থেকেই পেয়েছিলেন ! জিনগত একটা ব্যাপার যেহেতু এর সাথে জড়িয়ে রয়েছে । অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে পুষ্টিহীনতা, দারিদ্র্য প্রভৃতি । কবি জাফর সাদেক এসবের ভিতর দিয়েই বড় হয়ে ছিলেন । বাতজ্বরে আক্রান্ত ব্যক্তিকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে হয় । আক্রান্ত জয়েন্ট নড়াচড়া করা থেকে বিরত থাকতে হয় । ব্যথানাশক ঔষধ হিসেবে অ্যাসপিরিন খুবই কার্যকর ।
যাই হোক, সে-ই যন্ত্রণার কথা কবি খুব কমই এঁকেছেন তাঁর কবিতায় । কবিতায় যন্ত্রণার এপাশ-ওপাশ ঘোরাফেরা করেছেন নিঃসন্দেহে । কিন্তু সরাসরি তিনি তাঁর অসুখ-বিসুখ নিয়ে কিছু বলতে যাননি। বলতে যাননি তার কষ্টের কথা। অথচ দেখা যায়, যন্ত্রণার সাথে তার সম্পর্ক প্রায় আবাল্য কাল থেকেই গড়ে উঠে ছিল । অসহ্য বাত-ব্যথার মধ্যে দিয়েই তার বড় হওয়া । কবিতা লেখা । কবির কবিতা পড়ার সময় এইসব বিষয়গুলো আমাদের মননে থাকলে, কবিকে পাঠ করতে এবং বোঝতে সুবিধে হবে ।
‘সময় ধমনীময়’ কবিতায় কবি লিখছেন–
“একাকী কবিত্ব অন্ধকার ; আত্মার মস্তকে তুমুল বৃষ্টি
স্মৃতি থেকে খুলে যাওয়া বাল্ব
উপকূলে নেত্রমায়া, স্বাধীন উচ্চারণ
যেখানে মোহনবাঁশি পাশে নিধুবন
যেখানে বৃত্তস্রোতে কাঁদে মহাজীবন”
এই কবিতায় কি কিছুটা অ্যাবসার্ড চিত্রকল্প তৈরি করতে চেয়েছিলেন ? ‘আত্মার মস্তকে তুমুল বৃষ্টি’ কিংবা ‘স্মৃতি থেকে খুলে যাওয়া বাল্ব’ এইসব চিত্রকল্প বেশ রহস্য এবং জটিল চিত্রকল্প তৈরি করে বৈকি ! সে তুলনায় ‘একাকী কবিত্ব অন্ধকার’ লাইনটা কিছুটা হলেও কমিউনিকেট করা যায়। ‘বৃত্তস্রোতে কাঁদে মহাজীবন’– এই লাইনটাও মনকে নাড়া দেয় । কোন্ ‘বৃত্তস্রোতে’ কেঁদে চলেছে জীবন ? কবি বলছেন - যে জীবন মহৎ । যে জীবন মহান । তাহলে কি কবি নিজের কথাই এখানে বলতে চেয়েছেন ! হয়ত-বা ।
“ক্রমশ চলে যাই দূরে ক্রমশ কাছাকাছি
ক্রমশ প্রীতিসুখ দেয় দগ্ধ মরুবাসী
পাথর, সমিধ, বায়ু জীবন ও যুদ্ধজয়
নিস্বনে বেজে ওঠে সময় ধমনীময়”
এখানেই আমরা কিছু বিচ্ছিন্ন এবং বিক্ষিপ্ত শব্দের আড়ালে চিত্র পাচ্ছি । যা সরাসরি কিছু বলছে না । কিন্তু কিছু একটা ইঙ্গিত করছে । ‘নিস্বন’ শব্দের অর্থ হচ্ছে– শব্দ, ধ্বনি, রব । ‘সময় ধমনীময়’ বলতে কবি কি বুঝাতে চাইছেন ? কবি প্রকৃত অর্থেই এখানে কিছু শব্দচিত্রের উপর নিজের অনুভব এবং উপলব্ধিকে ছেড়ে দিয়েছেন পাঠকের সামনে ।
“কবিতার হারানো শ্লোক” কবির মিষ্টি তিনটি কবিতার ধারাপাত । তিনটি কবিতা মিলে একটা কাহিনি তৈরি হয় । একটি মেয়ের কাহিনি আছে। তার মেয়েবেলা আছে। যৌবন আছে । আবার তার বিবাহপরবর্তী জীবনচিত্রকেও কবি ছুঁয়ে গেছেন। কবি এখানে দর্শকের মতো দেখে গেছেন কেবল । ‘কবিতার হারানো শ্লোক-১’ কবি লিখছেন–
“খেলতে এসে হারিয়ে গ্যাছো
নোলক নাকচাবি
তখন তুমি কেঁদেছিলে, কেঁদেছিলো কবি ”
‘তুমি কেঁদেছিলে’ আর ‘কেঁদেছিলো কবি’- এখানে ‘তুমি’-টি কে ? ‘কবি’-টিই বা কে? তুমি এবং কবি– দুজনেই কেঁদেছিল সেদিন । দুই সমব্যথী । এই চিত্রকল্পে শৈশব সহজেই প্রতিভাত হয় ।
‘কবিতার হারানো শ্লোক-২’ কবি লিখছেন-
“গাঁয়ের পথে হাঁটতে হাঁটতে
পানাপুকুর ধারে
লুকিয়ে গিয়ে তুমি যখন
নষ্ট গণিকা
তমালতলে মোহনবাঁশি
ডাকতো ছুটিবারে,
এখন শুধু ঘণ্টা বাজে তুমি লজ্জাহীনা ।”
আহা ! কবির বাড়ির সেই গাঁয়ের পথের কথা মনে পড়ে গেল । কী অপূর্ব, ছবির মতো গ্রাম । কবির বাড়ি ঢোকার পথেই মস্ত পুকুর । সামনে, পেছনে ধানের জমি । কিন্তু এই সব বলতে বলতে কবি একী চিত্র অঙ্কন করলেন! ‘নষ্ট গণিকা’ এবং ‘লজ্জাহীনা’-এই দুটি শব্দে হয়ত কবি অনেককিছুই বলার চেষ্টা করেছেন । ছোটবেলার খেলার সাথী এখানে কী লজ্জাহীনা! “এখন শুধু ঘণ্টা বাজে”– কোথায় বাজে এই ঘণ্টা ? কবির বুকে ?
‘কবিতার হারানো শ্লোক-৩’ এসে কবি লিখছেন–
“নিগূঢ় দেশের বনবহ্নি ফুটলো
শঙ্খফুলে
তুমি এখন শিশুর মা
শিশুকে নাও কোলে ”
সে-ই ‘তুমি’ এখন শিশুর মা ! কবি এখানে কার কথা উল্লেখ করছেন, জানি না। তবে একটি মেয়ের জীবনবৃত্ত এখানে আমরা স্পষ্টত দেখতে পাই । একটি বালিকা মেয়ের বড় হওয়া, তার ভিন্ন পথে হারিয়ে যাওয়া, আবার জীবনের মূল স্রোতে ফিরে এসে, জীবনের হাল ধরা, সংসার করা ! কবি যেন অদূরেই নীরব দর্শক হয়ে সব দেখে গেলেন । ছোটবেলার ভালো লাগা শেষ অবধি ধরে রেখেছিলেন, বোঝাই যাচ্ছে, নাহলে এত খবরাখবর কেন রাখতেন ! যদিও কবি জাফরের জীবনে কোনো মেয়ে উঁকি দিয়ে ছিল কিনা আমরা জানি না । হয়ত ছিল । হয়ত না । তবে এই কবিতার শরীরে যে একটি মেয়ের জীবনকাহিনি বর্ণিত হয়েছে, তা বলাই যায় । যে মেয়েটিকে কবি অন্তত চিনতেন । কাছে থেকে দেখেছেন তার জীবনের বিবর্তন । সংগ্রাম এবং বেঁচে থাকা । তাই শেষ পংক্তিতে বলছেন– ‘তোমার শিশু বড় হচ্ছে / প্রেমবীজের গোল বাটি”। একই রকম আরেকটা কবিতা পাচ্ছি -
(যার সঙ্গে কথা হয়নি। অথচ সে বন্ধু ছিল সবার। ক্লাসরুমের সেই হারানো মেয়েটিকে মনে রেখে) ।
“বনভোজনের রাত্রি ছিল, বনপদ্যে নারী—
চোখের ভেতর মেঘনা ছিল, নষ্ট করতালি
বাঁশের সাঁকো কাঁপছিল নদীতে ছিল জল
হাওয়ায় ওড়ে হলুদ শাড়ি মেয়েটি ডুবে গেছে।”
কবিতাটির নাম ছিল “বৈকুণ্ঠযাত্রা” । প্রকাশিত হয়েছিল– “উত্তরপূর্ব” পত্রিকায়- ৩য়বর্ষ, ১মসংখ্যা, জুন'৯১ সালে । এখানে কবি কবিতার নোট লিখেছেন– ‘যার সঙ্গে কথা হয়নি। অথচ সে বন্ধু ছিল সবার। ক্লাসরুমের সেই হারানো মেয়েটিকে মনে রেখ’। খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা কথা কিন্তু । এই কবিতাটি গ্রন্থে যায়নি । এমন আরও বহু কবিতা এই কাব্যগ্রন্থে যায়নি । অগ্রন্থিত আরও একটা খাতা রয়ে গেছে। নিশ্চয়ই আগামিতে তা প্রকাশিত হবে । তখন হয়ত আরও নতুন করে জানবো কবিকে । কবি সত্যিই রহস্যময় ।
‘কবিতা যখন পড়ি, আসলে কী করি আমরা ?’ বিদগ্ধ আলোচক তপোধীর ভট্টচার্য নিজের এই প্রশ্নের আলোচনা করতে গিয়ে বলেন–“শব্দে শব্দে মিতালি, সংঘর্ষ, বৈপরীত্য প্রভৃতি দিয়ে গড়ে-ওঠা গ্রন্থনা লক্ষ করি । কিংবা এই লক্ষ করাটাও খুব বড় কথা নয় । লক্ষ করতে করতে হঠাৎ আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে অনুভূতি ও চেতনা প্রবাহের নতুন কোনো উপকূল রেখা । একে আমরা বলি তাৎপর্য যা নিছক শব্দের প্রয়োগে থাকে না । থাকে গভীরের আয়তনে, থাকে বোধের সংরাগে । কবিতা পড়া তাহলে এই তাৎপর্য পড়া । বর্ণনাকে পড়া নয়, আকরণ-কে পড়া নয়; এমন কি রচনাশৈলীকেও পড়া নয় । পাঠকের প্রথম কাজ হলো– নিজের নতুন দেখার ক্ষেত্র-কে শনাক্ত করা । দ্বিতীয় কাজ, দৃষ্টি-কে লক্ষ্যাভিমুখী করা । তৃতীয় কাজ – নিজের প্রত্যাশা-কে বাচকের মধ্য থেকে বাচনের বাইরে নিয়ে আসা । প্রতিটি সার্থক কবিতায় থাকে পাঠকৃতির নিয়ামক অধিপ্রসঙ্গ যার বিচ্ছুরণ প্রতিফলিত হয় অন্তর্মুখী অণুপ্রসঙ্গগুলিতে ।”
আমরা জাফর সাদেকের কবিতাকেও এই নিরিখে পাঠ করতে পারি । কবির “অন্ধকারের সামনে” আমার প্রিয় কবিতাগুলির মধ্যে একটি ।
“ টুপটুপ শিশির রাত, গূঢ় হাওয়ার
ফিসফিসানি
নিশাচর পাখীর ডানা ঝাপটানো মুহূর্তগুলো
বিপুল আয়োজনে অন্ধকারকে
হাততালি দিচ্ছে ।”
‘টুপটুপ শিশির রাত’– এই শব্দচিত্র স্নিগ্ধ হতে পারতো, যদি-না কবি এরপর উচ্চারণ করতেন– ‘গূঢ় হাওয়ার / ফিসফিসানি’ ! কবি ‘ ফিসফিসানি’-কে আলাদা একটি লাইনের মধ্যে এনে তারগুরুত্বকে বাড়িয়ে দিয়েছেন । এবং এর সামনে অনেকটাই আলতো করে বসিয়ে দিয়েছেন– ‘গূঢ়’ শব্দটা । এই শব্দটাই তো শেষমেশ লাইনটাকে গম্ভীর করে তুলল । এবং এই চিত্রকল্পকে কবি আরও রহস্যঘন করে তোলেন পরের বাক্যে একটিমাত্র শব্দ ‘ফিসফিসানি’ ব্যবহার কর। এই ফিসফিসানি কি কোনো আনন্দঘন মুহূর্তে ফিসফিসানি ? ‘গূঢ়’ শব্দ ব্যবহারের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য কি তবে তাই ? ‘নিশাচর পাখীর ডানা ঝাপটানো মুহূর্তগুলো’- কি তবে একান্ত মানব-মানবীর প্রতীকী রূপ ! ‘নিশাচর পাখী’ কি তবে তারাই ? ‘ডানা’ শব্দ কি এখানে হাতের বিকল্প প্রতীক ? কবি এখানে পাঠককে ভাবনার, তাকে তার মতো করে দৃশ্য-রচনা করার প্রচুর সুযোগ করে দিয়েছেন । এবার পাঠক কোথায় যাবেন, তা পাঠককেই ঠিক করতে হবে ।
উপরোক্ত কবিতার অংশকে কী আবার অন্য প্রেক্ষাপটেও দেখা যেতে পারে ‘টুপটুপ শিশির রাত’– এই চিত্রকল্পের মধ্যে দিয়ে এখানে কবি, হাড়হিম করা একটা নীরবতার দিকেই ইঙ্গিত করছেন । ‘গূঢ় হাওয়ার ফিসফিসানি’- শব্দের মধ্যে দিয়ে একটা ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির দিকে কি পাঠককে এগিয়ে দিলেন কবি ? তারপরেই বলছেন– ‘নিশাচর পাখীর ডানা ঝাপটানো মুহূর্তগুলো’! এটা কি কোনোপ্রকার নির্যাতনের দৃশ্য হতে পারে ! কেউ কি নির্যাতনের শিকার হয় প্রতি রাতে ? ‘পাখী’র সাথে কি নারীর তুলনা করা যায় ? সে-কি প্রতিরাতেই এভাবে হাত-পা নাড়ে অসহায়ের মতো ? ধর্ষিত হয় নিশিরাতে ?
না-কি চিত্রকল্পটা সেদিক দিয়ে যাচ্ছে না ! চিত্রকল্পটা এমন হতে পারে । আবারও নাও হতে পারে। এইরকম মুহূর্তেই বোধহয় বলতে হয়- কোনো প্রতিবেদন নিজে নিজে সম্পূর্ণ নয়, গ্রহীতা পাঠকের সাথে দ্বি-বাচনিক সম্পর্কের প্রতিষ্ঠায় তার সার্থকতা ।
“অন্ধকারের সামনে” কবিতায় কবি একটা ঘোর তৈরি করেছেন । বারবারই দ্বি-বাচনিক সম্পর্ক তৈরি করছে । পাঠকৃতি ও পাঠকের নিরন্তর দ্বি-বাচনিকতা যেখানে নেই, কবিতা সেখানে ব্যর্থ ।
“নিশাচর পাখীর ডানা ঝাপটানো মুহূর্তগুলো
বিপুল আয়োজনে অন্ধকারকে
হাততালি দিচ্ছে ।”
এই রকম একটা লাইনের পর কবি হঠাৎ করেই লিখে ফেললেন –
“তারপর ঘাসের ভেতর মৃত জোনাকির
জীবনের মতো নির্জনতা ।”
স্ফূর্তির একটা মুহূর্তের পর এইরকম একটা চিত্র কি স্বাভাবিক ছিল ? কবি এখানেই তার শিল্পসত্তাকে কাজে লাগিয়েছেন কাব্যিক-চতুরতার সাথে । ‘জোনাকির’-র আগে কবি ‘মৃত’ শব্দটা কেন ব্যবহার করলেন ! ‘মৃত’ মানেই তো, জোনাকির সেই দীপ্তি আর নেই । রাতের উজ্জ্বলতার পর, সে ‘জীবনের নির্জনতা’ নিয়ে পড়ে রয়েছে ঘাসের ভিতর । একা । নিঃস্ব । গৌরবহীন । জীবনহীন । চিত্রকল্পটাই তো মারাত্মক। ‘নির্জনতা’ শব্দের ব্যবহারটাই তো এককথায় অসাধারণ ।
তারপর সমস্ত যন্ত্রণা, হতাশাকে নাড়িয়ে দিয়ে কবি বলছেন–
“তারপর মাঠের সামনের হিজল গাছের
সমস্ত আকাশটাকে
ইথার তরঙ্গের মতো কাঁপিয়ে দিয়ে
চৈতন্য ডালপালা দাঁড়িয়ে থাকে
অন্ধকারের সামনে ।”
অন্ধকারের সামনে কে দাঁড়িয়ে থাকে? হিজল গাছ! এই দাঁড়িয়ে থাকা কি জীবনেরই দাঁড়িয়ে থাকা ! হয়ত এই জন্যই কবি বলছেন– ‘চৈতন্য ডালপালা’ । এই চৈতন্য-বোধ তো জীবনেরই বোধ । অন্ধকারের সামনে আমাদের দাঁড়াতেই হয় । অস্থির আধুনিক সমাজের পরিস্থিতি অনেক সময়ই কবিকে স্বচ্ছন্দে বাঁচতে দেয় না ।
“আমাদের কবিতাসমগ্রের শ্রেষ্ঠ কবিতা” কবি জাফর সাদেকের অন্য স্বাদের আরেকটি কবিতা । রানিং-কম্পোজে কবিতাটি লিখে গেছেন কবি । এই স্টাইলে কবির এটিই প্রথম কবিতা পাচ্ছি আমরা । সাধু ভাষার ব্যবহার করেছেন । কবিতার নামটাও বেশ বুদ্ধিদীপ্ত । কবি নামের প্রথমে ব্যবহৃত ‘আমাদের’ বলতে কি বোঝাতে চাইলেন ? এভাবে কি কোনো কবিতাসমগ্র হয় ! যাই হোক, কবিতাটি প্রথম স্তবকটি এইরকম–
“মাতাল শাসকের ষড়যন্ত্রের মতন আমাদের জন্মনিধুবনে শ্মশান ঢুকিয়া যাইবে । ওলানের দুধের ধারা উধাওবশতঃ তোমারও অলগ্ন ছায়ায় দাঁড়াইয়া উঠিবে– তাহাই স্বাভাবিক । কারণ মাটির দিকে আমাদের বিরুদ্ধটান বশংবদ হইয়া দাঁড়াইয়া থাকিবে তাহা ঠিক নহে এবং তাহারাও চোখে আঙুল দিয়া দেখাইয়া দিবে ঃ জীবনের প্রথম শর্ত ছিল আমরা পাল্টাইয়া যাইব ।”
এখানে কবি প্রথম লাইনেই অনেক বড় প্রেক্ষাপটকে ধরে ফেলার চেষ্টা করেছেন । “মাতাল শাসকের ষড়যন্ত্রের মতন”- কথাটা কিন্তু বেশ ব্যাপক । শাসকের সাথে ষড়যন্ত্রের শব্দের সংযোগ নতুন কিছু নয় । বরং এটা অনেকাংশেই স্বাভাবিক একটা প্রক্রিয়া । যুগে যুগে রাজনৈতিক ইতিহাসে তাই দেখা গেছে । কিন্তু কবি এখানে চিত্রকল্পকে জটিল করে ফেলেছেন শাসকের আগে “মাতাল” শব্দটি বসিয়ে । শাসক মাতাল হলে, সেই দেশের বা প্রদেশের জনগণের দুঃসহ পরিণতি অবশ্যম্ভাবী। তবে ভাগ্য ভালো কবি এখানে বলেছেন “ষড়যন্ত্রের মতন” । তাহলে, আসল সমস্যাটা কোথায় ? মনের ভিতরে এই প্রশ্নটা উঁকি দিতেই, কবি বলে উঠলেন– “আমাদের জন্মনিধুবনে শ্মশান ঢুকিয়া যাইবে ।” কবি এখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি শব্দযুগল ব্যবহার করলেন– “জন্মনিধুবন”। নিধুবন শব্দের অর্থ অভিধানে দেয়া আছ- রমণ, কামকেলি, উপভোগ, বৃন্দাবনের কুঞ্জবিশেষ, আমোদ-প্রমোদ ইত্যাদি । তাহলে “জন্মনিধুবন” কী দাঁড়াচ্ছে ? তাহলে কি কবি, আমাদের জন্ম আসলে একটা মধু মিলনের মধ্যে দিয়ে তাই বোঝাতে চাইছেন ? হয়ত বা ! একটা আনন্দঘন মুহূর্তের ভিতর দিয়েই তো সাধারণত ঘটে আমাদের জন্মের বিকাশপর্ব । কিন্তু এই অপূর্ব দৃশ্যকল্পনা করার পরই কবি হঠাৎ কেন বলে উঠলেন – “শ্মশান ঢুকিয়া যাইবে” । কেন নিধুবনে শ্মশানের মতো চিত্রকল্প আঁকলেন ? “নিধুবন” শব্দের গোটা অবয়বকে এক নিমিষে কীভাবে ভেঙে দিলেন কবি । মাতাল শাসকদের ষড়যন্ত্র তিনি আগাম দেখতে পাচ্ছিলেন ।
মৃত্যুর প্রায় দু-মাস আগে, এই কবিতাটি লিখেছিলেন কবি । এতে বোঝাই যায়, কবি কবিতা নিয়ে শেষ দিকে একটু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার চেষ্টা করছিলেন । এই কবিতাটি তার সাক্ষ্য বহন করে নিঃসন্দেহে । এই কবিতার প্রথম ধাপের শেষ লাইনে কবি লিখছেন– “জীবনের প্রথম শর্ত ছিল আমরা পাল্টাইয়া যাইব ।” এখানে কোন্ পাল্টাইয়া যাইবার কথা বলছেন কবি ? জন্মের সময় তো আমাদের মাথা নিচের দিকে থাকে । জন্মের পর থেকে আমরা তো মাথা পাল্টাইয়া সোজা হয়ে থাকি এবং সারাজীবন সোজাই রাখি । এটাই কি এখানে মিন্করতে চাইছেন কবি ? এই কবিতায় কবি একদম নিজস্ব ভঙ্গিতে ধরা দিয়েছেন । এর আগেও কেউ এভাবে লিখেনি । পরেও না । কবি এর পরের পর্যায়ে লিখছেন–
“শিল্পীর ইজেলে লগ্ন হরিণ সাঁকোর পাড়ে জল খাইতে আসিবে । আমাদেরকরতলের আমলকী শুকাইবার আগেই আলিঙ্গন হইতে খুলিয়া পড়িবে ব্রাহ্মলিপি। টায়-টায় বাঁচিয়া থাকিবে সংসার আর জরতী আকাশে জীবনের নিবন্ধ উল্টাইয়া লেখা আমাদের প্রথম অক্ষর । শীত আসিবে । ঘাসবনে শুকাইয়া থাকিবে জ্যোৎস্না । ডিম-ভাঙা দুপুরে ভেজা চুলের জুবিলী উৎসবে আমাদের পূর্ণ হইবে একশো বছর ।”
এই কবিতায় একের পর স্কেচ এঁকে গেছেন কবি । এই কবিতায় প্রতীকের খেলা আছে । ইমেজের খেলা আছে । বাক্যে বাক্যে এর অর্থ খুঁজতে গেলে, ব্যর্থই হতে হবে, মনে হচ্ছে । আসলে, এই কবিতাই প্রমাণ করে, কবি আরও দীর্ঘজীবী হলে, তিনি আমাদের কবিতা জগতকে আরও সমৃদ্ধ করে যেতেন নিঃসন্দেহে । কবি কী অপূর্ব সুন্দর একটি চিত্রপট আঁকলেন– “ঘাসবনে শুকাইয়া থাকিবে জ্যোৎস্না”। ঘাসের উপর জ্যোৎস্না পড়ে সাধারণত । কিন্তু কবি বললেন– শীত আসার সাথে সাথে জ্যোৎস্না “শুকাইয়া থাকিবে” ঘাসের উপর। এখানে “শুকাইয়া” শব্দের ব্যবহারটাই তো খুব চমকপ্রদ। এরপরই কবি উদাহরণ দিচ্ছে – “ডিম-ভাঙা দুপুর”। এটা কি স্বর্ণালী দুপুরের সাথে তুলনা করলেন ? নিশ্চয়ই তাই । একসময় মনে হয়, এ-আবার কেমন দুপুরের কথা বলতে চাইলেন কবি ? কবিতার ছত্রে ছত্রে কবি কবিত্ব রেখে যাচ্ছেন যেন । আবার বলছেন– “ভেজা চুলের জুবিলী উৎসব” এটাও তার একটি মৌলিক উদাহরণ ।এবং অভিনব উদাহরণ গ্রহণ করার সাহসই বলতে হয় । “জুবিলী” এখানে “জয়ন্তী” অর্থে এসেছে । জয়ন্তী হল, নির্দিষ্ট বৎসর পূর্ণ হলে যে উৎসব হয় । ২৫ বছর হলে রৌপ্য জুবিলী, ৫০ বছর হলে পূর্ণ হলে স্বর্ণ জুবিলী, ৬০ বছর হলে হীরক জুবিলী ।এই কবিতায় কবি একের পর এক অসাধারণ দৃশ্যকল্প অঙ্কন করে গেছেন এবং কবিতাটিও শেষ টেনেছেন অসাধারণ মুন্সিয়ানায়–
“অতঃপর তোমাদের টালবাহানায়, হারানো টিকলির খোঁজে– আমাদের কবিতা সমগ্রের শ্রেষ্ঠ কবিতা তাহারা পড়িবে ।”
এই কবিতাটির টেকনিক,শব্দব্যবহার, উদাহরণ সবই অভিনব কায়দায় সাজিয়েছেন জাফর সাদেক । কোনো কবির ছাপ লক্ষ করা যায় না এখানে । যদিও রানিং কম্পোজ নতুন কিছু না । কিন্তু বাকি পরিকল্পনার ক্ষেত্রে নতুনত্ব যে ছিল, একথা মানতেই হয় । আর এখানেই তিনি মূল্যবান হয়ে উঠেন ।
কবি জাফর সাদেকের পরবর্তী কবিতার নাম “যেমন মনে পড়ে” । এই কবিতায় আবার আলাদা একটা মেজাজ স্থাপন করেছেন কবি । এটা ৩.০৫.৯০ সালেই লেখেন ।
“ যেমন তুমি পারো রতিবাণে নির্মাণ
ভেঙে দিয়ে
মানসাঙ্ক থেকে খুলে দিতে
বাসনার করাত–”
এই কবিতায় কবির অসাধারণ প্রয়োগ দেখুন পৌরানিক ইতিহাসে আমরা দেখেছি রতিবাণে অনেক তপস্বীর তপস্যা বা ধ্যান ভেঙে যেতে । এই প্রসঙ্গে উর্বশী, মেনকার গল্পও আমরা জানি। এখানে কবি এই মিথকে অদ্ভুত শৈল্পীক মহিমায় কাজে লাগালেন, ছোট্ট একটা শব্দ বসিয়ে । সেই শব্দটি হল– “নির্মাণ ভেঙে”। এই নির্মাণ শব্দ ব্যবহার করেই কবি এখানে বাজিমাত করলেন । যেমন ভাবনায়, তেমনি কাব্যিক নৈপুণ্যে ।এখানে কোন্ নির্মাণের কথা বলতে চাইছেন কবি ? নিশ্চয়ই ইট-পাথরের নির্মাণের কথা বলছেন না ! বলছেন, রতি মানে প্রথাগত যৌনতা সম্পর্কে আমাদের যে ধরণের ট্যাবু রয়েছে, এই ট্যাবুগুলো এক একটি সমাজ তার তার মতো করে গ্রহণ করে। বর্জন করে । আবার নতুন করে নির্মাণ করে । এভাবেই সমাজ-জীবন, গণজীবন এগোয় । একমাত্র নারী ইচ্ছে করলেই পারে, পুরুষের লালিত শিক্ষাদীক্ষাকে প্রলোভনে প্রলোভনে, ছলায়-কলায় ভুলিয়ে ভেঙে দিতে । ইতিহাস তার অজস্র সাক্ষ্য বহন করে । সেই “নির্মাণ ভেঙে” পড়ার কথাই এখানে কবি বলছেন । এরপর কবি যোগ করছেন– “মানসাঙ্ক থেকে খুলে দিতে / বাসনার করাত”– এই মানসাঙ্ক কীসের ? রতির ? মনে মনে যে অঙ্ক করা যায়, তাকেই তো মানসাঙ্ক বলে ।কবি বলছেন সেই “মানসাঙ্ক” থেকে বাসনার করাত-টাকে খুলে দিতে । করাত, যা কোনো বস্তুকে দু-ভাগ করে । কবি কী তবে বাসনার হিসেব-নিকেশ থেকে বের হতে চাইছিলেন ! কবি এরপর আরেক মনের কথা বলতে গেলেন –
“যেমন মনখোলা আকাশের নীচে দাঁড়ালে
আজো মনে পড়ে যায় মায়া মায়া দিনগুলো
মনে পড়ে শৈশবের বাঙ্ময়
পাঠশালার প্রথম জীবন পাঠ” ( যেমন মনে পড়ে)
কবি জাফর সাদেকের বাড়ি যাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে । কবির বাড়ি প্রকৃতির কোলেই । বাড়ির চারিদিকেই প্রায় খোলা মাঠ । পাঠশালা গ্রামেই । পায়ে হাঁটা পথ। শৈশব কবির সত্যিই বাঙ্ময় ছিল । ছোটোবেলার দিনগুলোকে কবি “মায়া মায়া” বলছেন । কবি লিখছেন –
“মনে পড়ে যুবতী চাঁদ ঝিঁঝির তান
জোনাকির ছায়ায় ছায়ায় নক্ষত্ররাত
অন্তরালে ধানক্ষেত, আম্রকানন
জ্যৈষ্ঠের বিভূতি আকাশ !”
(যেমন মনে পড়ে)
প্রকৃতির কি সুন্দর ব্যাখ্যা করেছেন । কবি জোনাকির ছায়াও যেন দেখে ফেললেন । ঝিঁঝিপোকার শব্দের ভিতরে কবি খুঁজে পেলেন ছন্দ । জ্যৈষ্ঠের রৌদ্রমাখা আকাশকে মনে হল কবির বিভূতিময় । কবিতাটি কবি শুরু করলেন কীভাবে, আর শেষে টেনে নিয়ে গেলেন কোথায় ? গোটা কবিতায় মনন-মেজাজ কবি ছন্দের মতো ধরে রেখেছেন । যে বয়সে দাঁড়িয়ে কবি এই সংযম, এই পরিণতিবোধ দেখিয়েছেন, তা রীতি মতো ঈর্ষণীয় ।
এরপর আমরা পাচ্ছি “নিহত রাত্রির দরজা” কাব্যের চব্বিশ নম্বর কবিতা
“সমাহিত” কবিতাটি ।
“স্তব ঘোষণা করে দাও
শুধু কথামালায় নিজেকে সাজিয়ে
রতি ও রমণে
কোন গৌরব নেই ।” (সমাহিত)
স্তব হল– দেবতাদির সন্তোষসাধনের জন্য মহিমা কীর্তন, স্ততি, প্রশস্তি গাওয়া । কিন্তু এখানে কোন্ স্তব-এর কথা বলছেন কবি ? শুধু কথায় যে বড় কিছু হয় না, রতি ও রমণের ভিতরের জীবনের খেলা, তা নিতান্ত সাধারণ পর্যায়ের । এই কবিতায় কবি একটি গুরুত্বপূর্ণ লাইন বলেছেন– “যে জন্মান্তর আমাদের মাঝে প্রতিদিন দ্বন্দ্ব করে” এই লাইন নিয়ে ইচ্ছে করলে কিন্তু অনেক প্রেক্ষাপট থেকে ভাবা যায় । আমরা যারা জন্মান্তরবাদে বিশ্বাসী, তারা কিন্তু নানাভাবে আমাদের বর্তমান ভাগ্যদশার জন্য, পূর্বজন্মকেই দায়ি করে থাকি । সেই দ্বন্দ্ব-এর কথাই কি কবি এখানে বলছেন ? হয়তবা !
“মানুষের করতল ছুঁয়ে অনিবার্য
হিংসে শিখে নাও !
শেখার কোন বিকল্প নেই ।
বরং তুমি তার আগে নিজেকে
একবার দ্যাখে নাও ।” ( অনিবার্য শেখা )
এখানে কবি “হিংসে” শব্দের আগে “অনিবার্য” শব্দটি কেন লাগালেন ? “করতল” শব্দের আগে বসালেন “মানুষের” ! তাহলে, এখানে কি দাঁড়াচ্ছে কথাটা ! মানুষের জীবনে কী হিংসে অনিবার্য ? কেন কবির এমন মনে হচ্ছে ? এই নিয়ে কবি অবশ্য বিশেষ কোনো ইঙ্গিত দেননি । কেবল পরের লাইনে বললেন–
“শেখার কোন বিকল্প নেই ।” মাত্র উনিশ বছরের জীবনেই কবি এটা শিখে নিলেন যে, হিংসাটা আমাদের জীবনে অনিবার্য । মৃত্যুর প্রায় তিনমাস আগে ২৫-০৯-১৯৯০ সালে লেখা কবিতাটি । কবি তখন আগরতলা শহরের ‘নেতাজী সুভাষ বিদ্যানিকেতন’ ছাত্রবাসে বসবাস করেন । আগরতলার বিভিন্ন কবিদের সাথে তখন কবির পরিচয় ঘটে । গ্রামের সরলতার সাথে শহরের জটিলতা মিশে ছিল নিঃসন্দেহে । সেইসব অভিজ্ঞতা তার চিন্তা-চেতনায় নিশ্চয়ই ছাপ ফেলেছিল । তবে কবি শেষ দুই লাইনে অনিবার্য হিংসে রপ্ত করার আগে নিজেকে একবার ভালো করে যাচাই করে নেয়ার কথা বলেছেন অবশ্য । কবিতার নাম দিয়েছেন কবি– “অনিবার্য শেখা” । তার মানে কবি এটা স্বীকার করেই নিয়েছেন যে, সমাজে ঠিকতে গেলে শেষ অবধি তোমাকে হিংসের সেই অনিবার্য শিক্ষাটা শিখে নিতে হবে । সমাজ মানেই দ্বন্দ্ব । প্রতিযোগিতা । এগিয়ে যাওয়ার দৌড় । আর এসব থাকলে, হিংসের সাথে তো খুব স্বাভাবিকভাবেই তো জড়িয়ে যেতে হয় । কবি কী তবে এই নিরিখেই কবিতাটিকে ধরতে চেয়েছেন ? বা পাঠকের সামনে তার উপলব্ধিকে তুলে ধরতে চেয়েছেন ! আমার তো মনে হয় তাই । সোসাইটি অর্থেই বোধ হয় তিনি প্রথমেই “মানুষের” শব্দটি চয়ন করেছিলেন । আমাদের সামাজিক ব্যবস্থাপনাই তো এই রকম । যেখানে হিংসে করাটাই অনিবার্য হয়ে পড়ে । কিন্তু কোথাও কি কবি একটা দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগছিলেন, এই সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে ? না হলে, শেষে কেন বললেন– “বরং তুমি তার আগে নিজেকে / একবার দ্যাখে নাও ।” নাকি কবির সিদ্ধান্ত কবি নিলেন । পাঠকের সিদ্ধান্ত পাঠককে ভেবে নিতে বলছেন কবি ! এইভাবে পাঠে-পুনঃপাঠে এই কবিতাকে বিভিন্নভাবে পাঠ করা যেতে পারে । এই কবিতার ভিতর সে সম্ভাবনা আছে । এই সম্ভাবনা রেখে দেয়ার মাঝেই কবির কবিত্ব।
এরপর আমরা পাচ্ছি কবির “তোমাকে দেবো জাতীয় সংগীত” কবিতাটি । কবিতাটি আমাকে খুব না-টানলেও এই কবিতায় ব্যবহৃত দুটো লাইন আমাকে বিহ্বল করেছে । একটি হচ্ছে– “তোমার চোখের পর্দা তুলে স্মৃতির জাবরকাটা”। আর অন্যলাইনটি হচ্ছেদ–“তোমার গালের খাসজমিতে ফসলের চিত্র এঁকে / দেখেছি মেঘবহ্নি”।
এই দুটো লাইনের কবি তাঁর ঋদ্ধ মননের পরিচয় দিয়েছেন । বিশেষ করে গালকে খাসজমির সাথে তুলনা করে ফলসের চিত্র এঁকে দেয়ার চিত্রকল্প আমার কাছে খুবই অভিনব মনে হয়েছে । সাথে “বহ্নি” শব্দের আগে “মেঘ” শব্দটি জুড়ে দিয়ে পুরো চিত্রকল্পকে এক ধাক্কায় ভিন্ন এক দিশা দিয়ে দিলেন। আসলে এভাবেই কবি জাফর সাদেক আমাদের কাছে একজন গুরুত্বপূর্ণ কবি হয়ে উঠেন ।
“প্রাণিত উপমা দিয়ে কাব্য না লিখলে
সত্যকে লিখা হয় না ।
খুব যখন নুয়ে পড়ি নিজের ভেতর
জন্মদিনের পাশাপাশি মৃত্যুদিন দেহরক্ষীর
মতো চোখ ঠেরে চায়, পাহারা দেয়
একটা সিগারেট জ্বালায়
এক একটা জন্ম মানেই এক একটা মৃত্যুর দাসখত।” (পরিকল্পিত হাত)
‘প্রাণিত’- মানে জীবন্ত, প্রাণবন্ত, উদ্দীপ্ত, প্রাণময় । অনেকটা সিদ্ধান্তের মতো কবি যেন প্রথম লাইনটা লিখলেন । আবার কবি এখানে ‘সত্য লিখা হয় না’– বলতে কী বোঝাতে চাইলেন ? তার মানে কবি কী বলতে চাইছেন, কবিতায় যা লেখা হয়, তা সত্য বলেই কবি বিশ্বাস করেন ! কিন্তু কবি এরপরই অন্য একদিকে মোড় নিয়ে লিখলে– ‘খুব যখন নুয়ে পড়ি নিজের ভেতর’ । এই লাইন দিয়ে কবি কী বোঝাতে চাইলেন ? এই নুয়ে পড়া কী তবে আত্মসমর্পণ ? কেনই বা কবিকে নুয়ে পড়তে হল ? কোথাও কী প্রাণিত উপমা-র অভাব অনুভব করছেন কবি ? এইসব ভাবতে ভাবতেই পরবর্তী লাইনটির দিকে অবাক হয়ে থাকিয়ে রইলাম– ‘জন্মদিনের পাশাপাশি মৃত্যুদিন দেহরক্ষীর মতো চোখ ঠেরে চায়’। একথা ঠিক জন্মদিনের পাশাপাশি মৃত্যুদিনও আমাদের দেহে লেগে থাকে । মৃত্যুকে দেহরক্ষী-র সাথে তুলনা করে অপূর্ব এক ব্যঞ্জনা আনার চেষ্টা করেছেন কবি । এখানে কবি খুব চমকিত করেছেন– ‘একটা সিগারেট জ্বালায়’ এই লাইনটি ব্যবহার করে । এই একটি লাইন হঠাৎ করেই-বা কবি আনতে গেলেন কেন ? অনেকক্ষণ এই নিয়ে ভাবলাম । লাইনটা কিন্তু এক ধাক্কায় কবিতাকে ভিন্ন একটা মাত্রার দিকে টেনে নিয়ে গেল যেন। এর মধ্যে দিয়ে কবি কি একটা তাচ্ছিল্যের ভাব আনার চেষ্টা করলেন ? এই লাইনটা কী স্টাইলের দিক দিয়ে কবিতাটাকে ভিন্ন একটা মাত্রা দিল! নাকি অর্থের দিক দিয়েও ভিন্ন একটা বার্তা দেয়ার চেষ্টা করেছে ? মৃ্ত্যুকে কি কবি একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবেই নিচ্ছেন, নাকি একটা স্বাভাবিক ঘটনার মতোই নিচ্ছেন ? কবি খুব সুন্দর করেই তাঁর ভাবনা পরবর্তী কবিতায় বর্ণনা করছেন-
“এক একটা জন্ম মানেই এক একটা মৃত্যুর দাসখত।
দ্রুত ব্যঞ্জনায় রাত ফুরনোর বাঁশী,
উৎসবের বাতি নিবিয়ে আলিঙ্গন থেকে
বেরিয়ে পড়া” (পরিকল্পিত হাত)
কবি এখানে জীবনকে একটা উৎসবের সাথে তুলনা করছেন স্পষ্টত । আর মৃত্যুকে ভাবছেন- জীবনের উৎসবের আলিঙ্গন থেকে বেরিয়ে পড়ার মুহূর্ত হিসেবে । বেঁচে থাকাকে দেখছেন– জীবনের সাথে জীবনের আলিঙ্গনের মতো । মৃত্যু মানেই নিছকই শরীর বেরিয়ে পড়া । কবি এরপরই আবার তাঁর ভাবনায় বাঁক নিলেন আরেক দিকে, লিখছেন –
“হে প্রেম নদীপারে গাছতলায় তুমি কি করেছো ?
অন্তর্ভুক্ত নারীর শরীরে
কনষ্টেবলের লাঠিতে
উজান ময়দানে তুমি কি করছো ?” (পরিকল্পিত হাত)
এখানে এসে আমি ‘অন্তর্ভুক্ত’ শব্দটার ব্যবহারে বেশ চমকে উঠলাম । ‘অন্তর্ভুক্ত নারীর শরীরে কনষ্টেবলের লাঠি’ কবি কী বোঝাতে চাইলেন ? এখানে কবি ‘অন্তর্ভুক্ত’ শব্দকে কয়েকটি পর্যায়ে বিস্তৃত করে চিত্রায়িত করার চেষ্টা করেছেন । এবং দিয়েছেন তার শক্তিশালী কাব্য-ভাবনার পরিচয় । আবার পাশাপাশি এনেছেন– “কনষ্টেবলের লাঠি”-র মতো নির্মম একটা উপমা । এই লাঠিকেও আমরা নানা অর্থে ব্যাখ্যা করতে পারি কবিতার প্রেক্ষিত অনুযায়ী ।
“অধিকারের ভুবন থেকে যুগলবন্দী
পোষাক রেখে স্বাধীনতা হারিয়ে গেলে
তবে হে প্রেম আমি কাকে ডেকে বলবো
কয়েকডজন সত্যকে একদা আমি
এইখানে দেখেছিলাম ? (পরিকল্পিত হাত)
‘পোষাক রেখে স্বাধীনতা হারিয়ে গেলে’– কবি কী এখানে প্রকারান্তে ‘স্বাধীনতা’কেই প্রশ্নবিদ্ধ করলেন ? তাই কি পরবর্তী লাইনে এমন প্রশ্ন রাখলেন –‘হে প্রেম আমি কাকে ডেকে বলবো/কয়েকডজন সত্যকে একদা আমি/এইখানে দেখেছিলাম ?’ তবে কি কবি তার জানা সত্যকে আজ হারিয়ে ফেলেছেন ! এবং সেই হারিয়ে ফেলার পেছনে কি পরিকল্পিত হাত-ই দায়ি ! তাই কি কবিতার নাম রেখেছেন– ‘পরিকল্পিত হাত’। তাই কি কবি প্রথমেই বলছিলেন– ‘যখন নুয়ে পড়ি নিজের ভেতর’ । আমরা প্রায়ই বাধ্য হয়ে যাই নিজের কাছে নুয়ে পড়তে ? স্বাধীনতা হয়ে পড়ে নিছক পোশাকি একটা ব্যাপার । এরপরই কবি তার বেদনার কথা বলছেন–
“কাকে ডেকে বলবো মানুষের বস্তাপচা কান্না
স্বর্গে পৌঁছায় না বরং তাকে আরো
কব্জা করতে এগিয়ে আসে পরিকল্পিত হাত” (পরিকল্পিত হাত)
এখানে কবি ‘বস্তাপচা কান্না’ বলতে কি বোঝাতে চেয়েছেন ? এর আগে কবি সত্যকে হারিয়ে যেতে দেখেছেন । আসলে কবি সব কিছুর পেছনেই একটা পরিকল্পিত হাত দেখতে পাচ্ছেন । মানুষের কান্নাকে এখানে কেউ মূল্য দিচ্ছে না। একটা পরিকল্পিত হাতের ইশারায় সব কিছু বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে । মানুষের কান্না তার মর্যাদা পাচ্ছে না । মানুষের এই কষ্টই কবিকেও মর্মাহত করে তুলেছে । তাই তো বলছেন– ‘আলিঙ্গন থেকে বেরিয়ে পড়ছে উৎসবের বাতি’ । পরিকল্পিত সে-ই হাতের ইশারায় সাধারণের হাতের নাগালের বাইরে কত কিছুই হারিয়ে যাচ্ছে । এই বোধটাই কবিকে মর্মাহত করেছে । করেছে উৎকণ্ঠিত । পাঠক হিসেবে আক্রান্ত হয়েছি আমরাও ।
প্রায় ঠিক একই রকম ৬-১১-১৯৯০ তারিখ কবি লেখেন তাঁর “নষ্ট করতালি অনিবার্য ভারতবর্ষ” কবিতাটি । যেখানে কবি লিখছেন–
“আমি যে আজ স্বপ্ন দেখি বড়ই খারাপ
পোড়ামাটির নীতিও দেখি, দেখি আবার ফ্ল্যাগমার্চ”
কবিতার নামটা থেকেই চমক লাগা শুরু হয় । ‘নষ্ট করতালি’- কাকে বলতে পারি আমরা ? যার জন্য করতালি দিচ্ছি সে নিজেই কি নষ্ট এখানে ? অনেক নেতার ভাষণ শেষে আমরা যে পুলকিতভাবে হাততালি দিয়ে উঠি, তাকেই কী কবি নষ্ট করতালি বলতে চাইছেন ? কিন্তু এখানেই থেমে থাকেননি কবি । কবি এরপর আরও যোগ করলেন–‘অনিবার্য ভারতবর্ষ’ । তার কি মানে হতে পারে ! এই নষ্ট করতালিতেই কি এখন ভরপুর হয়ে আছে ভারতবর্ষ ! প্রকৃত হাততালি, প্রকৃত মূল্যায়ন তাহলে কি হচ্ছে না কোথাও ? তাই কি কবি বললেন– ‘পোড়ামাটির নীতিও দেখি, দেখি আবার ফ্ল্যাগমার্চ’ । ‘পোড়ামাটি’-কে এখানে কীসের প্রতীক করে আনতে চাইলেন কবি ? আমাদের অভাব, হতাশা, স্বপ্নে পুড়ে যাওয়া প্রসঙ্গেই কি এই প্রয়োগ ! এর পাশাপাশি কবি ‘ফ্ল্যাগমার্চ’-ও দেখতে পেলেন । তাহলে কি কবি পরস্পর বিরোধী দুটো চিত্র দেখাতেই এমন প্রয়োগ করেছেন বাক্যের! তাই কি এর পরেই বললেন– “চেয়ারটা কি বল হয়ে যায়/ লুফতে লুফতে দৌড়ে সবাই” । এখানে কোন চেয়ারের কথা বলছেন কবি ? নাকি ‘চেয়ার’-টাকে একটা প্রতীক হিসেবে ধরছেন কবি ! আসলে ক্ষমতার প্রতীক হিসেবেই এখানে এই শব্দটা এসেছে এখানে । ‘এই ক্ষমতা’ বলতে কবি রাজনৈতিক ক্ষমতার কথা বলতে চেয়েছেন । এই অর্থটাকে ধরলেই গোটা কবিতার একটা সারমর্ম করতে পারি আমরা । এই একটা চেয়ারের দিকেই সবার নজর । অথচ নজর হওয়ার কথা ছিল জনগণের দিকে । উন্নয়নের দিকে । জনগণের দ্বারা জনগণের উন্নয়নই লক্ষ্য হওয়ার কথা ছিল । কিন্তু সেটা হয়নি । আমাদের করতালি নষ্ট হয়েছে তাই । তাই তো কবি কবিতার শেষে বাধ্য হয়ে বলছেন–
“ নষ্ট করতালির ঘেরাটোপে ডুবে যায়
অনিবার্য ভারতবর্ষ”
এখানে কবির ‘অনিবার্য’ শব্দের ব্যবহার আমাকে খুব প্রভাবিত করেছে । তাহলে এটাই কি আমাদের ভবিতব্য ? এই নষ্ট করতালির ঘেরাটোপের ভিতরেই কি চেপে থাকবে আমাদের প্রকৃত ইতিহাস ! আমাদের আশা-আকাঙ্কা ? নষ্ট করতালির অন্ধকারে আমরা কি ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছি । সে দিকেই কবির ইঙ্গিত ? আমার তো মনে হয় তাই । সেই নষ্ট করতালির তলদেশে আমরা আজও পিষ্ট হয়ে যাচ্ছি । এই কবিতার ভিতর দিয়ে কবি গোটা ভারতবর্ষের পরিস্থিতিকেই তুলেধরার চেষ্টা করেছেন কবি । হয়ত তাই শুরুতেই বললেন-“আমি যে আজ স্বপ্ন দেখি বড়ই খারাপ” ।
ঠিক এই কবিতার মতোই পরের কবিতা আসছে । নাম – “সভাকক্ষের চেয়ার” ।
“সভাকক্ষের টেবিলের সামনে মায়াবী চেয়ার
আমি ঐ চেয়ারের দিকে ঘুরপাক
খেতে খেতে প্রচণ্ড হিংসুটে হয়ে উঠি” (সভাকক্ষের চেয়ার)
‘মায়াবী চেয়ার’– এই শব্দটা কি কবি ইচ্ছে করেই করলেন ? এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় সবাই চেয়ারের দিকেই অধীর আগ্রহে চেয়ে থাকে । ব্যক্তির মূল্যায়ন হয়ে উঠে চেয়ারকেন্দ্রিক । চেয়ারকে আমরা এখানে প্রতীক হিসেবে ধরতে পারি । কবি চেয়ারের দিকে তাকাতে তাকাতে হিংসুটে হয়ে উঠেন কেন ? চেয়ার মানেই টাকা । ক্ষমতা । আর ক্ষমতা এক অদ্ভুত জিনিস। সে প্রত্যেকটা মানুষকে, সে যা না, তাকে তাতেই বদলে দিতে পারে । সভাকক্ষের কেন্দ্রিক-চেয়ার মানেই তো ক্ষমতা । আর ক্ষমতার দিকেই তো মানুষ হিংসুটে হয়ে উঠে । কবি এই কবিতায় তাঁর স্বাভাবিক কবিতা চলনের বদলে একটু এক্সপেরিমেন্ট করেছেন বলেই আমার মনে হয়েছে । তাই তো কবি এরপরেই বলছেন–
“মোটরষ্ট্যান্ডের অচল গাড়ী, স্বাভাবিক
গাড়ীর মতো তুখোড় পাল্লায় ছোটে
দোতলা ছাদের সমস্ত ইটবালি মুহূর্তেই
খসে পড়তে থাকে
দমকলের প্রতিটি কলকব্জা ছিটকে যায়
প্রতিটি হরিণের চোখ রক্তাক্ত হয়।” (সভাকক্ষের চেয়ার)
কী অসাধারণ এবং কিছুটা পরস্পর বিরোধী ভাবনার সমন্বয় । যে দমকল আমাদের বিপদের সহায়, সেই দমকলের কলকব্জা ছিটকে নিরীহ হরিণের চোখ রক্তাক্ত হল । টেকনিকের দিক দিয়েও প্রয়োগটা খুবই চ্যালেঞ্জিং হয়েছে । চেয়ারের ক্ষমতা পেয়ে অচল গাড়ির মতো অচল ব্যক্তিও যেন চলতে শুরু করেছে প্রবল বেগে । আর তারই পরিণামে ক্ষতবিক্ষত হল নিরীহ হরিণের শরীর । কবি এরপর তার ঘটনাপ্রবাহে পরিবর্তন নিয়ে এসে বলেন–
“আমি সভাকক্ষ থেকে বেরিয়ে এলেই
নষ্ট ইচ্ছার খোল, কর্তাল, মৃদঙ্গ পাখোয়াজ
দাঁড়িয়ে ওঠে।
আমার ছায়াও দাপট মেরে
আমাকে ছুঁড়ে ফেলতে চায়
আশ্চর্য এক গিলোটিন মাথা
থেকে ধড়ের বিচ্ছিন্নতার স্বপ্ন দেখায় !
প্রতিটি চোখের দারুণ ভ্রুকূটিতে,
নানারকম ধিক্কার, ধূর্তোমি তীক্ষ্ন হয়।” (সভাকক্ষের চেয়ার)
এই পর্বে কবি আমাদের কয়েকটি দৃশ্যপট তুলে ধরলেন যেন । প্রথমে কবি আমাদের সভাকক্ষের রূপ-চরিত্র দেখিয়েছিলেন। এবার আমরা তার বাইরের রূপ দেখতে পাচ্ছি । প্রতিটি চোখের ভিতরেই দেখতে পান- ধিক্কার, ধূর্তোমি এবং আশ্চর্য এক গিলোটিন । ব্যক্তি কবির ভিতরের অস্থিরতা, জ্বালা-যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ দেখতে পাচ্ছি আমরা ।কবি সবই চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছেন । অনুভব করছেন। কিন্তু এর থেকে মুক্তির উপায় কী হতে পারে ? আদৌ কী মুক্তি আছে ? কবি তার কবিতায় বলছেন–
“ইদানীং আমি সুদীর্ঘ একটা নদীর
সামনে দাঁড়িয়ে
চেয়ারটার সঙ্গে জবরদস্তি করি
হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার কথা ভাবি
তারপর
যেই চেয়ারটাকে শ্মশানাগ্নিতে নিক্ষেপ করি
অন্য কেউ লুফে নিয়ে দৌঁড়ে পালায়।” ( সভাকক্ষের চেয়ার)
কবি কি তবে রেহাই পেলেন নিজের ভিতরের যন্ত্রণা থেকে ? না, ক্রমাগত এই প্রক্রিয়ার থেকে যেন আমাদের মুক্তি নেই । চেয়ারের বদল হয় । ক্ষমতার বদল হয়। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা থেকে যায় একই । জাফর সাদেক রাজনৈতিকভাবে সচেতন ছিলেন। তার বহু কবিতায় তিনি তা স্পষ্ট করেছেন । ‘সভাকক্ষের চেয়ার’ কবিতায়ও তার স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায় । আবার এর পরবর্তী কবিতা– “কবির জবাবদিহি”-তেও আমরা এই চেতনার পরিচয় পাই । কবি নিজের জীবনে সচেতন বা অচেতনভাবে যে-রাজনৈতিক বিশ্বাস বা দর্শন নিয়ে চলেন, তাঁর কবিতাতেও সেই দর্শনই প্রতিফলিত হয় না কি ? এই প্রতিফলন সব সময় একমাত্রিক বা সরলরৈখিক নাও হতে পারে । কবি মননের সাথে বিদ্যমান সমাজবাস্তবের দ্বন্দ্ব, সমাজ- পরিবেশের নিজস্ব ঘাত-প্রতিঘাত যেভাবে কবিকে নাড়া দেয়, তাঁর চিন্তাজগতের পরিবর্তন বা পরিণতি ঘটায়, সেই গতিশীলতা নানাভাবে ধরা পড়তে পারে কবিতায় । আজ কবি অনাগত দিনকে কবিতায় যেভাবে আঁকছেন, সেই ছবি বদলে যেতে পারে কবির রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের সাথে সাথে । কিন্তু একটি বিশেষ মুহূর্তে কবি যে-কবিতাটির জন্ম দিচ্ছেন, তার সাথে কোনও না কোনওভাবে কবির তৎকালীন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সাদৃশ্য থাকে এবং পাঠকও কবিতার রাজনীতির মধ্য দিয়ে, কবির রাজনীতিকে, কবির মনকে ছুঁতে চান, খুঁজে পেতে চান । জাফর সাদেকের কবিতাও সমাজের অন্যায় বৈষম্য কদর্য ভণ্ডামির দিকে আঙুল তোলে । শোষিত মানুষের পাশে থাকার উজ্জ্বল অঙ্গীকার দেখা যায় তাঁর কবিতায় । শিল্পগুণকে এতটুকু ক্ষুন্ন না করে তার প্রেরণা-জাগানো কবিতারা যে সুস্পষ্ট রাজনৈতিক অভিমুখ নির্দেশ করে, কবির রাজনৈতিক চেতনা আর কবিতার রাজনীতির একাত্মতা ছাড়া তা সম্ভব নয় । জাফর সাদেকের কবিতা সাধারণ মানুষের দুঃখ-বেদনার সাথে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত ছিল । শব্দকে তিনি নিজস্ব চেতনায় চুবিয়ে পুনর্জন্ম দিয়েছেন ।
‘কবির জবাবদিহি’ কবিতাটি কবি পাঁচটি পর্বে লিখেছেন-
১। গালগল্প চিন্তাতালাক বৃষ্টি ঘনঘোর
বেড়া ভাইঙ্গা ঘরের ভিতর ঢুইক্যা গেল চোর ।
২। কবাট তালা সিন্দুক চক্রমধু লালা
আমিও চোর তুমিও চোর চোর হগগল হালা ।
৩। উল্টাইয়া দে পাল্টাইয়া দে চিৎপটাং দে লাথি
বাইরে ঝরে ভিতরে ঝরে, খোঁজ এখন বাতি ।
৪। জ্যোৎস্না শাড়ি, রক্ততালু, লালুভুলোর খেলা
বেল্লারী বাতের ছিদ্র আমি, মন্ত্রিবাবুর চেলা ।
৫। উল্টাইয়া দে পাল্টাইয়া দে আয়রে লালুভুলো
মালগাড়ীর ডাব্বারা যায় কুকুর কুকুর কু ।
কবিতাটির নাম ‘কবির জবাবদিহি’ রাখলেন কেন ? এটা নিয়েই ভাবছিলাম। এখানে তো সরাসরি কবির জবাবদিহিতার কিছু নেই । নাকি কবি সমাজের একজন হিসেবে নিজেকেও দায়ী মনে করছেন ! ১ নম্বর কবিতার লাইনে ‘চিন্তাতালাক’ শব্দটা আমার খুব নজর কেড়েছে। আমাদের সু-চিন্তার বেড়া ভেঙেই কি চোর ঢুকে যাচ্ছে আমাদের মননের গহনে । আমাদের ঘর বলতে কবি কি বোঝাতে চাইছেন ? এরপরের কবিতায় মানে ২ নম্বর কবিতায় আবার বলছেন– “আমিও চোর তুমিও চোর চোর হগগল হালা ।” কবি এবার নিজেকেও জড়িয়ে নিলেন । কোথাও না কোথাও কবি নিজেকেও দায়ী মনে করছেন । তাই কি কবিতার নাম রাখলেন– ‘কবির জবাবদিহি’! হয়ত তাই । কেননা কবিও তো এই ব্যবস্থার বা মানসিকতার বাইরের কেউ নন । কিন্তু কবি এই ব্যবস্থার বাইরে যেতে চাইছেন । নাহলে কেন বলবেন- ‘দে চিৎপটাং দে লাথি’ । এরপরই আবার ৪ নম্বর কবিতায় আবার নিজেকেই সামনে রেখে বলছেন –‘বেল্লারী বাতের ছিদ্র আমি, মন্ত্রিবাবুর চেলা ।’
এই স্টাইলের কবিতার ভাষা কি তৎকালীন কবিতায় প্রচলিত ছিল ? মনে হয় না । ‘মালগাড়ীর ডাব্বারা যায় কুকুর কুকুর কু ।’ ভাবাই যায় না, এইসব লাইন সাহস করে কবি লিখেছিলেন । প্রথাগত ছন্দে যাননি । কিন্তু কি সুন্দর একটা রিদমকে ব্যালেন্স করে চলেছেন । ঝুঁকি নেওয়ার সাহস এবং দক্ষতা জাফর সাদেকের মধ্যে ছিল ।
ত্রিপুরার কবিতার ইতিহাসে জাফর সাদেক সত্যি অর্থেই এক মাইলফলক । তাঁর শব্দের প্রয়োগ, বাক্যের মধ্যে তার অদ্ভুত সমন্বয় আমাকে মুগ্ধ এবং অবাক করেছে বারবার ।
“স্বপ্ন ছুঁয়ে যৌন উল্লাস । শুরুতে মার্ডার ।
হ্যালো পাখীঃ সঙ্গমের দিকে ঝুলছে ঈশ্বর
না বাদুড়ের ছবি ?
ঠোঁটের মুখে ঠোঁট । হাতের তালুতে ভব্যতা ।
শূন্য কি ঈশ্বরীর ব্লাডার ?” ( অবৈধ উল্লাস-১ )
এই কবিতা কবি লিখেছেন ২-১২-১৯৯০ সালে । কবির অকাল মৃ্ত্যুর ২৭ দিন আগে । কবির কবিতা লেখার স্টাইলে বেশ পরিবর্তন লক্ষ করা যায় । ‘অবৈধ উল্লাস-১’ কবিতাটি পুরোটাই ভিন্ন এক মাত্রার । প্রথম লাইনেই দেখুন – ‘স্বপ্ন ছুঁয়ে যৌন উল্লাস।’ এরপরই একই লাইনে লিখছেন– ‘শুরুতে মার্ডার।’ কবিতার প্রথম লাইন হিসেবে এইরকম প্রয়োগ এর আগে কবি তার কোনো কবিতায় করেননি । ‘ঠোঁটের মুখে ঠোঁট ।’- এই রকম প্রয়োগও কি এর আগে পেয়েছি আমরা ? না, পাইনি । কবি হয়ত কবিতার মধ্যে ভিন্ন একটা ফর্মে বাঁক নেয়ার চেষ্টা করছিলেন । ‘হাতের তালুতে ভব্যতা’– এই ‘ভব্যতা’ শব্দটা এখানে ব্যবহার করলেন কেন ? তাও আবার হাতের তালুতে ? ‘ভব্য’- মানে হচ্ছে শান্ত, শিষ্ট, মার্জিত । এর বিশেষ্য হল– ভদ্রতা, আদব, সভ্যতা । হাতের তালুতে কেন থাকবে- ‘ভব্যতা’! এরপরই লিখছেন – ‘শূন্য কি ঈশ্বরীর ব্লাডার ?’ আমার মনে হয়েছে, কবি এখানে টুকরো টুকরো কিছু ভাবনার সমন্বয় ঘটাতে চেয়েছেন । বিচ্ছিন্নতার ভিতরে একটা ক্রম তৈরি করার কথা ভাবছিলেন কবি । এবং সেটা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যেই ছিল।
‘অবৈধ উল্লাস-২’ কবি লিখছেন –
“হৃদয়ে প্রহরী এল্যুশন । প্রণয়ে লহরী মৌমাছি ।
পর্দা কাঁপে । রাত্রি কাঁপে ।
উড্ডীন আরো উর্দ্ধে উড্ডীন আরব্য রজনী ।
সমস্ত স্তবক খুলে ঘুরে মারছে ভৈরবী ঢিল ।”
প্রতিটি পঙ্ক্তিতেই প্রায় চমক । এবং চমকপ্রদভাবে ব্যবহার করেছে,– ‘পর্দা কাঁপে। রাত্রি কাঁপে।’ এই সময়ে তাঁর জীবনেও এসেছিল নানারকম পরিবর্তন । তখন তিনি আগরতলায় পড়াশোনা করছেন । আগরতলায় বিভিন্ন কবিদের সাথে চলাফেরা করছেন । নব্বই এর দশক ত্রিপুরার কবিতায় বেশ উল্লেখযোগ্য সময় । স্বাভাবিক ভাবেই তাঁর চিন্তা-ভাবনার জগতেও পরিবর্তন আসে ।
“খাবি ? খা রত্নভাণ্ডার খা । সমস্ত পৃথিবী
খাঁ -- খাঁ । - তুই সুধা গন্ধময়ী কস্তুরী
পবিত্রতা ।” (অবৈধ উল্লাস- ৩)
“অবৈধপ্রিয় ঈশ্বরগামী সাধো আবার
প্রেমের সা ।
দিগ্বিদিক স্বপ্নদোষ ঈশ্বরীকে কামড়ে খা।”(অবৈধ উল্লাস- ৫)
কবি-আলোচক অভিজিৎ চক্রবর্তী তার গবেষণাধর্মী গ্রন্থ “ত্রিপুরায় বাংলা কবিতা”য় জাফর সাদেক-কে নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন – “স্বল্প বয়সের জীবনে জাফর কবিতার এমন এক ভাষার সন্ধান করেছেন যা অভূতপূর্ব ও অভিনব। তার বোধ, বলার ভঙ্গি, প্রকরণ, শৈলী, ধ্বনি-শব্দের পারম্পর্য ও বিস্তার, শব্দের অন্তর্নিহিত চেতনা, শব্দ ব্যবহার, বাক্যের গঠন, ভাবনা, ব্যঞ্জনা, বিষয় ও বলার ভঙ্গির অন্তর্নিহিত সৌকর্য, শ্লেষ ও বিদ্রুপ, তীব্র যুবকীয় স্পর্ধার সঙ্গে একান্ত মরমি অনুভব– তার কবিতাকে নিজস্বতা দান করেছে ।... জাফর সাদেকের কবিতার ভাষাভঙ্গিমা বিচার করলে দেখা যায়, তার কবিতার ভঙ্গিতে একপ্রকার দ্রুত ও মরমি অনুভবের মিশেল রয়েছে । তার কবিতায় তীব্র চোরাটানের ভিতর আছে উদ্ধত উচ্চারণ ।... রাজনীতি, সমাজ, বিজ্ঞান, ভূগোল, ইতিহাসের সারকথা কবি জানেন । কবি জাফর সাদেকের বলার স্বরে আছে সেই বহুমাত্রিক অভজ্ঞতা । সময় চেতনার উন্মেষ ছাড়াও যে বিষয়টি কবির কবিতায় গভীরভাবে আছে, তা হল মৃত্যুচেতনা ।... আধুনিক মানুষ জনবিচ্ছিন্ন । ধীরে ধীরে সে সমাজ-পরিবার থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছে । সরে যাচ্ছে । জাফর নব্বইয়ের এই ক্লান্তি, অসারতাকে অনুভব করেছিলেন । আর্থ-সামাজিক গ্যাঁড়াকলে পিষ্ট একজন সাধারণ যুবকের অন্তরের শূন্যতা তার কবিতাতে ছায়াপাত করেছে । ব্যক্তি-প্রেম নয় । যে সময় যৌবনের বিপুল হাতছানির কথা, সে সময় কবি প্রগাঢ় অনুভবে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি কবিকে ব্যথিত করেছে । জাফর জীবনের সবকিছুকেই উল্টেপাল্টে দেখতে চেয়েছেন । ব্যঞ্জনাময় উচ্চারণে তিনি স্বাধীনোত্তর ভারতবর্ষের চেহারাটি আঁকেন। স্বাধীনোত্তর ভারতবর্ষে দলবাজি, গদি নিয়ে মারামারি সাধারণ ব্যাপার। গণতন্ত্রের এ এক অনিবার্য করুণ কদর্য চিত্র । চেয়ারমুখী, ভোটমুখী গণতন্ত্র । নীতিভ্রষ্ট, মূল্যবোধহীন সমাজে চেয়ার দখলের রাজনীতিকে সচেতন সংবেদী কবি জাফর প্রত্যক্ষ করেন । শুধু সভা, মিছিল, মিথ্যা করতালির আওয়াজে ঢাকা বিপন্ন গণতন্ত্র । কবি জনগণের এই করতালিকে বলেছেন ‘নষ্ট করতালি’ । অনির্বচনীয় ব্যঞ্জনায় তিনি উচ্চারণ করেন প্রবাদপ্রতিম পংক্তিগুলি –
“আকাশ তুমি কার শেকড়ে আটকে আছো
আমি যে আজ স্বপ্ন দেখি বড়ই খারাপ
পোড়ামাটির নীতিও দেখি, দেখি আবার ফ্ল্যাগমার্চ
আকাশ তুমি কি বল আজকে
আমার দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছো
চেয়ারটা কি বল হয়ে যায়
লুফতে লুফতে দৌঁড়ে সবাই ?
আর নষ্ট করতালি ঘেরাটোপ ডুবে যায়
অনিবার্য ভারতবর্ষ ।”
এই বিচ্ছিন্নতা, শিকড়হীনতা একজন ব্যক্তিমানসের তথা রাষ্ট্রের জনমানসের। মাটির সঙ্গে যার যোগাযোগ গভীর । একজন প্রকৃত কবি কীভাবে এই ভাষার উত্তরাধিকারী হন, কোথা থেকে পান এমন স্বতন্ত্র উচ্চারণ তা ভাবার বিষয় । জাফর কীভাবে রপ্ত করলেন এই প্রকাশভঙ্গি, এই ভাষা ! প্রশ্নগুলি বারবার উঠলেও উত্তর পাওয়া যাবে না । এই উচ্চারণ আসলে তার অন্তর্দৃ্ষ্টি থেকেই আলো পেয়েছে।”
আলোচক সংক্ষেপে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর দিকে দৃ্ষ্টিপাত করেছেন । আবার সত্তর দশকের ত্রিপুরার প্রখ্যাত কবি-আলোচক সেলিম মুস্তাফা তাঁর গদ্যগ্রন্থ – “হৃদয় থেকে জাম্পুই ও অন্যান্য গদ্য”– এর ‘কবি জাফর সাদেকঃ স্বরে ও নিঃস্বরে এক বেদনালিপি’ নিবন্ধে লিখছেন– “জাফরের কাছে আমরা পাই না কোনো উপদেশবাণী, সামাজিক সংস্কারের কোনো নীতিনির্দেশিকা, এবং এগুলো আমরা আশাও করি না একজন কবির কাছে । কবিসত্তার অহংবিহীন এই কবি তাঁর অস্তিত্বে কেবলই ধারণ করেছেন একাধারে জীবন আর মৃত্যুর বর্ণনা-অযোগ্য যন্ত্রণাগুলো, কাউকে বিন্দুমাত্র বিরক্ত করার প্রয়োজন হয়নি । জীবনের সবগুলি পৃষ্ঠাই তাঁর চেতনায় যেন লিখিতই ছিল–
“এই তো সময়চিতা । যেখানে কণ্ঠ মধুরে তিক্ততায়।
বিশাল সমুদ্রের তলদেশ জুড়ে অপেক্ষমান
সার্বজনীন মৌনতা ।
তারপর বৃক্ষ নদী, পাহাড়-পর্বত পেরিয়ে আমিই
তাকে মৃত্যুর দিকে ছুটিয়ে নিই ...’
(অলগ্ন ছায়ার মুখোমুখি অনন্ত অসুখী আঁধার)
যে কবি এমন গভীরতায় টেনে নিয়ে যেতে পারেন তাঁর পাঠককে, তাঁর কি কোনোই খামতি ছিল না কোথাও ? এই প্রশ্ন অধিক মূল্যবান না হলেও, জরুরী । কারণ, না চাইলেও তুলনা এসেই যাবে । জাগতিক প্রেমের যে দুরন্ত পিপাসা, তাঁর উল্লেখ ক্ষীণভাবে কোথাও হয়ত আমরা পেয়ে যাই, তবু ঊনিশ-কুড়ির সদ্যযৌবনে তা যেভাবে পাবার প্রত্যাশা ছিল, জাফর তা হয়ত এড়িয়েই গেছেন, বা প্রেম তাঁকে সেভাবে আন্দোলিত করতে পারেনি, যেভাবে মৃত্যুচেতনা দখল নিয়েছিল তাঁর সমগ্র সত্তার । একটা অ্যাডোলোসেন্স কিভাবে মৃত্যুচেতনাকে হজম করে নিয়ে জীবন দিয়েই তাকে টেক্কা দিতে পারে ?
আবার ভাষার দিকটা যদি আমরা গ্রাহ্যের মধ্যে আনি, আমরা দেখতে পাব যে, তাঁর ভাষা ঠিক ততোটা তাঁর সময়ের নয় যেন । আবার এটাও মনে রাখতে হয় যে, তাঁর রচনার বিষয় আর গাম্ভীর্য বা গুরুত্বই হয়ত অধিগ্রহণ করেছে এই ভাষাশৈলী, যা ছাড়া উপায় ছিল না । একেবারে চলতি কথায় রচিত যে কবিতাগুলি আমরা পেয়েছি, সেগুলি একান্তই তাঁর কালখণ্ডের চিহ্নায়নবিশিষ্ট, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই । অর্থাৎ আশির দশকের কালখণ্ডে থেকেও, তিনি কোথাও ছিলেন ঊন কোথাও বা বেশি ! আবার এমনও তো হতে পারে আশির ভাষায় ঠিক মানিয়ে নিতে পারেননি জাফর । হয়ত চেষ্টা করেছেন এবং ফিরে গেছেন তাঁর নিজস্ব ভাষার জগতে, বা তার বিষয়কে, মননের গভীরতাকে প্রকাশ করার মতন উপযুক্ত মনে করেননি সেই শৈলীকে । তাঁর সময়ে, জাফরকে আমরা খুব সঠিকভাবেই সাহিত্যের একজন বলিষ্ঠ কুশীলব হিসেবে ধরে নিতে পারি, কারণ শ্লেষে ও আশ্লেষে তিনি সেই সময়টাকে সঠিকভাবেই উপস্থাপিত করেছিলেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই ।”
কবি-আলোচক সেলিম মুস্তাফা জাফর সাদেক-কে আরও ব্যাপক এবং ব্যঞ্জনায় ধরতে চেয়েছেন ।
যাই হোক, আমরা আবার সরাসরি কবিতার আলোচনায় ফিরে যাচ্ছি । ‘অবৈধ উল্লাস’ লেখেন কবি ২-১২-১৯৯০ সালে এর ঠিক দু-দিন পর তিনি লেখেন – “ইতি শিরে সংক্রান্তি নমঃ” । প্রায় একই স্টাইল ম্যানটেন করেছেন ।
“বোবা থিয়েটার । শূন্যে পা । হরি ওঁ ।
কবে আমি শিখেছিলাম আলিফ, বে;
আল্লাহু ।
তপ্ত কল্কি । চুমুক ঠোঁট । উপজীব্যস্বপ্ন ।
রামমন্দির, বাবরি মসজিদ ছোঁ
কুত্তা ছোঁ ছোঁ !” ( ইতি শিরে সংক্রান্তি নমঃ - ২)
আবার
“অশিব রাত্রি । গাজন ধোঁয়া । চিচিং
ফাঁক ।
স্বপ্ন ভেঙে কাঁঠাল খা শালা ।
অন্ধকারকে ঠুকরিয়ে তুই সন্ন্যাসী হ ।
ইতি শিরে সংক্রান্তি নমঃ” ( ইতি শিরে সংক্রান্তি নমঃ - ৩)
কবি জাফর সাদেকের বলার স্বরে আছে বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা । এখানে কবি ‘বোবা থিয়েটার’ বলতে কি বোঝাতে চেয়েছেন ? কিংবা ‘উপজীব্যস্বপ্ন’ কিংবা ‘অশিব রাত্রি’! কিংবা ‘স্বপ্ন ভেঙে কাঁঠাল খা শালা’ ! বিষয়গতভাবে কবি এখানে ধর্মের নামে যে অব্যবস্থা চলছে তা নিয়ে ব্যঙ্গোক্তি করছেন । তাদের পিছনে কুত্তা লেলিয়ে দেওয়ার কথা বলছেন । তাদের উদ্দেশ্যে বলছেন– ‘ছোঁ কুত্তা ছোঁ ছোঁ !’ এর চেয়ে বলিষ্ঠ উচ্চারণ আর কি হতে পারে !
কবির সমসাময়িক কোনো কবির মধ্যেই এই ধরণের ভাষাবৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায় না । স্টাইলের দিক দিয়েও এই দুই কবিতা ছিল একক এবং মৌলিক । তাঁর কবিতায় তীব্র চোরাটানের ভিতরে আছে উদ্ধত একটা উচ্চারণ ।
এরপর আমরা পাচ্ছি ৫-০৮-১৯৮৯ সালে লেখা তাঁর ‘ঘুম ও অঘুম’ কবিতাটি । ছোট্ট কবিতা কিন্তু কি অসাধারণ । কবি লিখছেন–
“অঘুম যারা রাত কাটায়
তাদের কাঙাল বলবে কে ।
তারা তো রাত্রির চোখ ফোটায়
ঘুম কি জানে অঘুমের চোখ
কখন ফোটে ।
বরং ঘুম সাত্ত্বনা নয়
মৃত্যুর বুক চেটে খাওয়া
বিষাক্ত শিশু ।”
এই কবিতায় খুবই চমকপ্রদ একটা লাইন লিখেছেন– ‘ঘুম কি জানে অঘুমের চোখ কখন ফোটে ।’ কবির অসুখজনিত তীব্র যন্ত্রণার কি কোনো বহিঃপ্রকাশ এখানে এসেছে ? সরাসরি বললে, বলতে হয় না । তবে একটা মৃ্ত্যুবোধ এসেছে । এই মৃ্ত্যুবোধের সাথে পরিচয় কবির প্রায় ছোটোবেলা থেকেই । কবির বড়ভাই কবি-আলোচক আকবর আহমেদ-এর কাছ থেকে আমরা জানতে পারি– “৬ বৎসরের জাফর ডিপথেরিয়ার মত মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হয়েছিল । V.M.Hospital-এ ডাঃ শীল- এর হাতে অপারেশান হয় গলায় । প্রথম দফায় বেঁচে যায়, অসুখ ভাল হয়ে বাড়ি ফিরতে বড় ভাইয়ের জন্য শার্ট, নিজের জন্য স্কুলে বই নেওয়ার বাক্স আর ছোট বোনের জন্য খেলনার বাক্স নিয়ে আসে । রোগ সেরে গেলে সব ভুলে গেছে জাফর, কোন কিছুই যেন তাকে দমাতে পারবে না । ৮-৯ বৎসর বয়সে Rheumatic fever- এর চিকিৎসা করেন বিশালগড় Hospital –এর ডাঃ বিধান দাস। এরপর ১৪-১৫ বৎসর বয়সে ধরা পড়ে Rheumatic heart fever অর্থাৎ বাতজ্বর থেকে Heart-এ attack-এর চিকিৎসা করেন- Dr. S. K. Datta. তিনি বলেন ১৪-১৫ বৎসর বয়স পর্যন্ত Benzyl penicillin (penedure / Pencom)- inj, এক মাস অন্তর অন্তর সাথে Cardioxin Tab. ব্যবহারে সেরে যাবে ।”
বাতজ্বর হল প্রদাহজনিত রোগ যা হার্ট, চর্ম, জয়েন্ট, মস্তিষ্ককে আক্রান্ত করে । এই রোগে ব্যক্তির নিজের শরীরের টিস্যুর বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি হয় । এই জ্বর সাধারণত বিটা হেমোলাইটিক স্ট্রেপটোকক্কাস নামক এক ধরণের জীবাণুর আক্রমণের কারণে হয়ে থাকে । এই বাতজ্বরে রোগীর শরীরে যেসব উপসর্গ দেখা দেয় তা হল –
১। রোগীর প্রায়ই জ্বর থাকে ।
২। অস্থিসন্ধিতে মৃদু বা তীব্র ব্যথা যা প্রায়ই পায়ের গোড়ালি, হাঁটু, কনুই অথবা হাতের কবজি এবং কখনও কখনও কাঁধ, কোমর, হাত, পায়ের পাতায় হয়ে থাকে।
৩। ব্যথা সাধারণত এক অস্থিসন্ধি থেকে আরেক অস্থিসন্ধিতে ছড়িয়ে পড়ে যা মাইগ্রেটরি পলি-আর্থ্রাইটিস নামে পরিচিত ।
৪। জয়েন্ট লাল, উষ্ণ ও ফোলা থাকে ।
৫। বুকে ব্যথা ও বুক ধড়ফড় করে ।
৬। অল্পতে ক্লান্ত বা দুর্বল বোধ হয় ।
৭। শ্বাসকষ্ট হয় ।
উপরোক্ত বর্ণনা থেকে আমরা কবি জাফর সাদেকের শারীরিক কষ্ট যন্ত্রণার একটা ধারণা হয়ত করতে পারি । এবং এরপর যখন কবির কবিতায় পাই– “বরং ঘুম সান্ত্বনা নয়/ মৃত্যুর বুক চেটে খাওয়া / বিষাক্ত শিশু ।” তখন চমকাতেই হয় বৈকি ! সেলিম মুস্তাফা এখানে বলছেন– “জীবনের প্রায় এক চতুর্থাংশ, ১৪/১৫ বয়স থেকে তাঁর কেটেছে রিউম্যাটিক ফিভারে । বাতব্যধি থেকে জ্বর । এই লাগাতার যন্ত্রণার মধ্যেই তাঁর লেখালেখি । এ যেন মৃ্ত্যুর ঘরে বসে জীবনের চর্চা । জীবনের চর্চা মানেই তো লাগাতর লড়াই ! ভাবা যায় না ।”
জাফর সাদেকের কবিতায় মৃ্ত্যু-চেতনা বারবার উঠে এসেছে, এ-বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কবির জীবনের অভিজ্ঞতাকেই তিনি তাঁর কবিতায় ব্যবহার করেছেন । শত জ্বালা-যন্ত্রণার মধ্যেও তিনি ছিলেন কবিতায় ।
“মনের দেউটি নিবে গেলে আমার চিন্তা জুড়ে
যখন বিপ্লাবন নামে
হাঁসের পালকের মতো ঝরে যায় পংক্তিমালা
জেটিতে স্পর্শ করে যেন বহুদূর চলে গেছে
বাণিজ্য জাহাজ ।
শতপদী দংশনের মতো হেসে ওঠে অন্ধপতন
জলজ রেখা ছুঁয়ে জন্ম জড়ুল মাটি
অদূরগামী কোন ভুল স্থাপত্যে মিশে যায় ত্বকে
সময়ের কুত-কুত হাঁটা দিন থেকে দিনান্তরে
একা একা । (সময়ের একাঘ্নী ঘাতক)
কবিতার নামটাই চমক লাগায় । ‘একাঘ্নী’ বাণের কথা আমরা মোটামুটি জানি। কর্ণ এই বাণ রেখেছিলেন অর্জুনকে হত্যা করার জন্য । কিন্তু পরে ঘটোৎকচ বধে কাজে লাগানো হয় । কিন্তু এখানে জাফর শুধু ‘একাঘ্নী’ শব্দটা এনেছেন । এবং এর সামনে ‘সময়ের’ শব্দটা ব্যবহার করে তিনি বিষয়টিকে তাঁর সময়ের সাথে মিলিয়ে দিয়েছেন । সময়টাকে কিভাবে চিহ্নিত করছেন কবি ? লিখছেন– “হাঁসের পালকের মতো ঝরে যায় পংক্তিমালা”– আহা, শব্দের এবং ভাবনা-চিন্তার কী সুন্দর প্রয়োগ । সাথে কবির পর্যবেক্ষণের কথাও বিশেষ করে উল্লেখ করতে হয় । কবি এখানে ‘বিপ্লাবন’ একটি শব্দ ব্যবহার করেছেন । যার অর্থ– জলপ্লাবন, ব্যাঘাত, বিঘ্ন, ধ্বংস । কবি খুব সহজেই তো ‘প্লাবন’ শব্দটি ব্যবহার করতে পারতেন ! করলেন না কেন? আসলে এটাও কবির একটা বৈশিষ্ট্য । সাধারণ শব্দকেও তিনি ব্যবহারের গুণে অসাধারণ করে তুলতেন । কবি এখানে কবিতার লাইনের কথা কি বলছেন ? ‘জেটি’ বলতে বোঝায় জাহাজ-ঘাটা, খিলানের অবলম্বন, পিল্লা । কবিকে একটা কবিতার লাইন ছুঁয়েই কি চিন্তারসমুদ্রে আবার ভেসে গেল লাইনটা ! এরপরই কবি প্রথম স্তবক শেষ করছেন এই বলে– “সময়ের কুত-কুত হাঁটা দিন থেকে দিনান্তরে/একা একা ।” এখানে কি আমরা কবির একাকিত্বের যন্ত্রণা প্রকাশিত হতে দেখতে পাচ্ছি ? মৃত্যুর চারমাস আগে লেখা কবিতাটা । ‘সময়ের কুত-কুত হাঁটা’ – কী অপূর্ব ব্যঞ্জনায় ব্যক্ত করেছেন কবি । একদিকে বাতের অসহ্য যন্ত্রণা, গায়ে জ্বর জ্বর, বিছানায় একা একা বসে থাকার যন্ত্রণার মধ্যে সময় যেন কুত কুত করে হাঁটছিল । এরপর কবি তাঁর পরবর্তী ভাবনার কথা বলছেন- “লাশঘরের মতো চারিদিকে উৎরায় আদিম অন্ধকার” । কী অসাধারণ একটি চিত্রকল্প । এখানে কবি কোন্ আদিম অন্ধকারের বলতে চেয়েছেন ? ‘লাশঘর’–শব্দের সাথে একটা মৃত্যুবোধ ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে । সময়ের কুত-কুত হাঁটা, লাশঘরের আদিম অন্ধকার, কবির এইসব উপলব্ধি পাঠক হিসেবে আমাকে খুব ভাবাচ্ছে । এরপর কবি লিখছেন -
“অমোঘ কণ্ঠ থেকে কে যেন বহুকাল ধ্বনিত
হয়ে একদা মিশে গেল লুপ্ত পরকালে
একে একে কাঙ্খিত প্রহর শেষে
কবোষ্ণ ভোর তারই অবয়বে খেলাচ্ছে
রাহিত্য আত্মাময়” (সময়ের একাঘ্নী ঘাতক)
‘রাহিত্য’ শব্দের অর্থ হচ্ছে – বর্জিত, বিরহিত, বাতিল, প্রত্যাহার । কবি তাহলে এখানে ভোরের বর্ণনা করছেন এভাবে– "কবোষ্ণ ভোর তারই অবয়বে খেলাচ্ছে রাহিত্য আত্মাময়”। ‘ভোর’ শব্দের আগে ‘কবোষ্ণ’ শব্দের কি অপরূপ এবং যথোপযুক্ত ব্যবহার করেছেন কবি । কবি সেলিম মুস্তাফা জাফরকে নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছিলেন- ‘এ কথা অনস্বীকার্য যে একজন সার্থক রচনাকার কখনোই তাঁর ইতিহাস ভূগোল সংস্কার ঐতিহ্য আর পারম্পর্য থেকে বিচ্যুত হয়ে থাকতে পারেন না । জাফর সাদেক এখানেই হয়ত সমসাময়িক অন্য সকলের চেয়ে অতিমাত্রায় ভিন্ন এবং অজস্র দ্রুতবিভঙ্গ ও বিনির্মাণে ধাক্কা সামলেও একজন পরিণত কবির আসনে বিরাজমান ।”
“ভুলের কাকপদে কোন সার্থক বর্ণমালা
লোপাট হয়ে গেলে
নির্বিকার দেহে জন্মায় ঘাস ও ভূমিজ লতা
তারপর একাগ্র প্রপাতে চলে যায় বহুকাল
ইতিবৃত্ত ঘুরে আশাপাশে ।
রোজ রোজ প্রত্যাঘাত বিহিতকালের সংযত করাতে
প্রণালী ঘুরে আসে ছন্দ পতনে
সময়ের একঘ্নী আঘাত থেকে বেঁচে যাই আমি” (সময়ের একঘ্নী ঘাতক)
‘কাকপদ’ শব্দটা আবারও চমক জাগালো । এর মানে বিভিন্ন হয়ে থাকে– যেমন, উদ্ধার চিহ্ন, উদ্ধৃতি চিহ্ন, লেখার মধ্যে পরিত্যক্ত বা শূন্যস্থান বোঝাবার চিহ্নবিশেষ, ভুলক্রমে পরিত্যক্ত অক্ষরাদির স্থানসূচক চিহ্নবিশেষ । এখানে কবি শেষের অর্থটাই গ্রহণ করতে হবে । কেননা কবিই বলছেন– ‘ভুলের কাকপদে কোন সার্থক বর্ণমালা লোপাট হয়ে গেলে, নির্বিকার দেহে জন্মায় ঘাস ও ভূমিজ লতা’ । কবির শব্দ ব্যবহারে বারবার বিস্মিত হয়েছি । আবারও হলাম । এই ‘প্রপাত’ শব্দটিও কবি কি অদ্ভুতভাবে সংগ্রহ করে ব্যবহার করলেন এখানে । ‘সংযত করাত’ শব্দটিও অবাক করার জন্য যথেষ্ট । করাত সংযত হয়ে না-চালালে মহাবিপদ ।এরপরই কবি শেষ লাইনে বললেন মুখ্য বক্তব্য– “সময়ের একঘ্নী আঘাত থেকে বেঁচে যাই আমি” । এখানে কবি কোন বাঁচার কথা বলছেন ? কবিতার নাম কিন্তু কবি রেখেছেন– “সময়ের একঘ্নী ঘাতক” । কিন্তু এখানে বলছেন – ‘সময়ের একঘ্নী আঘাত’ । তার মানে কবির এখন পর্যন্ত বেঁচে থাকার কথাই কি বলছেন! যদিও এর ঠিক ছয় মাস পরই সময়ের একঘ্নী ঘাতকে পরলোক গমন করেন তিনি ।
“সময়ের একঘ্নী ঘাতক” গোটা কবিতাটাই কবির অত্যন্ত পরিণত একটি কবিতা । এই কবিতায় কবি নিজেকে ঢেলে দিয়েছেন । কবির অভিজ্ঞতা, শব্দ-চেতনা, কাব্যবোধ, যেন উজাড় করে দিয়েছেন । বারবার মনের ভিতরে আঘাত করতে থাকে এই লাইন– “সময়ের কুত-কুত হাঁটা দিন থেকে দিনান্তরে একা একা ।” জর্জরিত এই দিনযাপন পাঠক হিসেবে আমাকে আক্রান্ত করে তোলে । আমিও পীড়িত হই । কবির মতো আমারও মনের ভিতর থেকে যেন ক্রমাগত ঝরে পড়তে থাকে – “হাঁসের পালকের মতো পংক্তিমালা” ।
ত্রিপুরার প্রখ্যাত লিটল ম্যাগাজিন “উত্তরপূর্ব”-এর ৩য় বর্ষ, ১ম সংখ্যা, জুন- ১৯৯১ সংখ্যায় কবি কৃত্তিবাস চক্রবর্তী ‘নিহত রাত্রির দরজাঃ বন্ধু কবি জাফর’ নামে একটি মূল্যবান নিবন্ধ লেখেন । তাতে কবি লেখেন– “মৃত্যুতে নিরর্থক আপশোশ সাধারণত আমার নেই যদি জীবনের অপরিমেয় কাজের একটা বড় অংশ সমাধা করে ফেলা যায় । মানুষের আয়ু অফুরন্ত নয় কিন্তু জীবন অফুরন্ত, অফুরন্ত কাজ । ক্লান্তিহীন কাজ করেও তো শুনি কবির মর্মোৎসারিত আকুতিঃ এণ্ড মাইলস্ টু গো বিফোর আই স্লিপ্ ...
সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ এক তরুণ যে-কিনা তার কাজে সবে মগ্ন হতে যাচ্ছিলো, যে- মগ্নতা থেকে এক দীর্ঘশ্রমের অভিযাত্রায় নিজেকে সামিল করার একেবারে আরম্ভেই যে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলো, চলে গেলো ‘হৃদয়ের পাথর ভাঙতে ভাঙতে মৃত্তিকার ভেতর’। সে এক কবি, কবি জাফর সাদেক তার নাম । বাঁচার সুস্বপ্নে কখনো সখনো যে দেখে ফেলতো খারাপ স্বপ্নগুলো, আবার সেই অসম্ভব দুঃস্বপ্ন থেকে উত্তরণের যুদ্ধেও যে ছিলো এক জাগ্রহ সৈনিক । মাত্র কুড়ি বছর বয়সেরও আগে হৃদয়ের পাথর ভাঙতে ভাঙতে যার অন্তরাত্মা গর্জে উঠতো নিহত রাত্রিকে চিরতরে মুছে দিতে ।
সাক্ষাৎ পরিচয় প্রায় বছর চারেক আগে এক কবিতা পাঠের আসরে । প্রাণ ভরে কবিতা পড়ছে ছিপছিপে দুর্বল স্বাস্থ্যের এক তরুণ ।মনে আছে, সামান্য কিছু আলোচনাও করেছিলাম তার কবিতা নিয়ে । তখন, বলতে দ্বিধা নেই, তার কবিতা স্রেফ শুনে কিন্তু তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু মনে হয়নি । জাফর নিজে থেকেই বলেছিলো– ‘কিছু কবিতা পাঠাবো আপনার কাছে।’অবশ্যই পাঠাবে । এবং দিন পনেরো বাদে গোটা ৩/৪ কবিতাসহ একটা খাম । সঙ্গে সঙ্গেই স্থানীয় একটি দৈনিকে এবং একটি ছোট সাহিত্যপত্রে তার কবিতা পাঠিয়ে দিলাম । এরপর অনেকদিন আর জাফরের সঙ্গে আমার দেখা হয়নি । কিছুদিন আগে (মৃত্যুর কয়েক মাস আগে) আরেক নিয়মিত আসরে জাফরের সঙ্গে ফের দেখা, সেদিন তার অনেকগুলো কবিতা আমাদের অনেকেরই মনোযোগ কেড়ে নিয়েছিলো । বন্ধু সমরজিৎ সিংহ, সন্তোষ রায় তার কবিতা নিয়ে আলোচনা করেছিলেন, যোগ দিয়েছিলাম আমিও । সেদিন থেকে আমাদের অনেকেরই একজন প্রিয় তরুণ বন্ধু কবি জাফর । কোথাও কোনো নতুন কাগজ বেরুলে অনায়াসেই জাফরের কবিতা প্রকাশের কথা এসে যেতো । সেদিন এমনই এক তরুণের রচনার অগ্নিসম্ভাবনা আমরা অনেকেই টের পেয়ে গিয়েছিলাম ।
কিন্তু আমরা অধিক আশ্চর্য ও বিস্মিত হলাম সেদিন, যেদিন জাফরের মৃত্যুর পর তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ (নিহত রাত্রির দরজা) প্রকাশের ব্যাপারে ইন্দ্রনগরে কবি বন্ধু নকুল দাশের বাড়িতে জড়ো হয়েছিলাম– আমি, সন্তোষ রায়, সমরজিৎ সিংহ, প্রবুদ্ধসুন্দর কর, নকুল দাশ, জাফরের দাদা আকবর আহমেদ এবং রামেশ্বর ভট্টাচার্য সমেত কয়েকজন । কবি প্রবুদ্ধ (জাফরের ঘনিষ্ঠ সুহৃদ) একটা একটা করে চমৎকার পড়ে চলেছেন জাফরের প্রায় অর্দ্ধ শতাধিক কবিতা, আমরা কবিতা শুনছি বুঁদ হয়ে । মুগ্ধ হচ্ছি, বিস্মিত হচ্ছি আর লজ্জা পাচ্ছি । তাঁর কবিতায় আমরা আবিষ্কার করছি ভারতীয় দর্শন ও সনাতন ঐতিহ্যের সারোৎসার, কেউবা আবিষ্কার করছি ভারতবর্ষীয় রাজনীতিকদের তথাকথিত সাম্প্রদায়িক জিগিরের বিরুদ্ধে বিদ্রূপে ফেটে পড়া জাফরকে, কেউ বিশ্লেষণ করে দেখাচ্ছেন তাঁর কবিতার মানবিক গুণ এবং ব্যাপকতা, কেউ খুঁজে পাচ্ছি জাফরের কবিতার ‘লিপির তলপেটে শ্রমিক মিছিল’ কিংবা তাঁর ইতিহাস চেতনা, তাঁর শব্দসৃষ্টি । নতুন শব্দের যোজনা বিশেষ করে তৎসম এবং ফার্সি শব্দের চমৎকার প্রয়োগ নৈপুণ্য, ছন্দ, তীব্র শ্লেষ ও গুড হিউমার, জীবন ও মৃত্যুর মাঝখানে দোদুল্যমান আমাদের নৈতিকতা ও মূল্যবোধ, দারুণ চিত্রকল্প, স্বীকারোক্তি- সব মিলিয়ে এ এক সংঘবদ্ধ কণ্ঠস্বর– যা আপাদ শীর্ষ প্রমাণ করেছে জাফরকে, কবি জাফর সাদেককে বিস্তৃত পাঠকের সামনে ।
জাফরের মাথাটা ছিলো এক বঙ্গীয় শব্দকোষ বিশেষ । ছিলো প্রখর স্মৃতিশক্তি, ফলে তাঁর বোধ ও চৈতন্য প্রকাশে কোনদিন উপযুক্ত শব্দের অভাবে ধুঁকতে হয়নি– অন্তত তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নিহত রাত্রির অন্ধকার’ পড়ে আমার তাই মনে হয়েছে। পংক্তি তুলে কত উদাহরণ দেবো ? লোভ সংবরণ করতে পারবো না, তাই দিচ্ছি না, পাঠক বইটি পড়ে নিজেই খুঁজে নিন । আমি বলতে চাই– কী নেই জাফরের কবিতায় ? সেটাই খুঁজে আমি ক্লান্ত হয়েছি । অথচ বিনীত জাফর বলছে – ‘রচয়িতা জানে, তাঁর নির্মাণের হাত দু’টি কত অসহায় ?’ সত্যিই কি তাই, জাফর?
অনেক অনেক কাজ ছিলো জাফরের, শুরুও করেছিলো সে তাঁর কাজ, কিন্তু একটা অসমাপ্ত অধ্যায় আমাদের সামনে (যারা ১০, ১৫, ২০ বা তারও বেশী সময় ধরে একটা ভালো কবিতা লেখার আপ্রাণ চেষ্টায় ধুঁকছি) পেণ্ডুলামের মতো দুলছে বিরামহীন– যা নির্দেশ করছে এই সময়-সমাজ ও মনুষ্যত্বের প্রতিটি অনুমুহূর্তকে । সেলাম জাফর।”
সত্তর দশকের কবি কৃত্তিবাস চক্রবর্তী-র লেখা থেকে জাফর সাদেক সম্পর্কে তার দেখা, তার অনুভূতি আমরা জানতে পারলাম । বিশেষ করে তার এই মন্তব্য ‘জাফরের মাথাটা ছিলো এক বঙ্গীয় শব্দকোষ বিশেষ।’ এবং ‘নতুন শব্দের যোজনা বিশেষ করে তৎসম এবং ফার্সি শব্দের চমৎকার প্রয়োগ নৈপুণ্য, ছন্দ, তীব্র শ্লেষ ও গুড হিউমার, জীবন ও মৃত্যুর মাঝখানে দোদুল্যমান আমাদের নৈতিকতা ও মূল্যবোধ, দারুণ চিত্রকল্প, স্বীকারোক্তি- সব মিলিয়ে এ এক সংঘবদ্ধকণ্ঠস্বর’ এই দুই উক্তি থেকে বোঝাই যায়, জাফর সাদেক নিজেকে কতটা তৈরি করেছিলেন কবিতা লেখার জন্য । আমি নিজেও কবির বাড়ি গিয়ে প্রচুর বইপত্র দেখে অবাক হয়েছি। খোলা মাঠ পেরিয়ে কবির খোলা বাড়ি । বারান্দা থেকে যেদিকেই চোখ যায়, প্রকৃতির মনোরম দৃশ্য দেখা যায় । পেছনে মস্ত বড় পুকুর । যেদিকে চোখ গেছে মুগ্ধ হয়েছি । যে কোনো ঋতুকেই উপভোগ করা যেত । কবির বাড়ি যাওয়ার পথে বারবার কবির কথা ভেবেছি । তাঁকে অনুভব করার চেষ্টা করেছি । তাঁর চোখ দিয়ে দেখার চেষ্টা করেছি । তাঁর কবিতার লাইন আবৃত্তি করেছি ।
“কবররাত্রির লাশের ভেতর
আমার জন্ম ঈশ্বর খোলস খুলে গল্প করে ।
কাফন কীর্তনে বীতকাম চারিধার
উৎসবের কালো কাফেলা হাতে শোকসভায়
ফুটপাতের রাজা ।
মাংসল স্বাদের গন্ধে ফুটে আছে শারীরিক ফুল । (কাফন কীর্তন)
‘কবররাত্রি’ বলতে আমরা কী বুঝবো এখানে ? আবার বলছেন– ‘কাফন কীর্তনে বীতকাম চারিধার’। ‘বীতকাম’- মানে হচ্ছে,‘কামনা দূর হয়েছে যার’। ‘কাফন কীর্তন’– শব্দের কী অপূর্ব ব্যবহার । এরপরই আনলেন– ‘বীতকাম’ শব্দটি । এখানে ‘কীর্তন’ শব্দটি কিন্তু আপাত বিরোধী । মৃত্যুর সময় হিন্দু সম্প্রদায় কীর্তন করে শ্মশানে নিয়ে গেলেও, মুসলিম সম্প্রদায়ে কিন্তু এই ধরণের কোনো প্রথা নেই। তারপরও কীর্তন শব্দটি ব্যবহার করেছেন । জেনেশুনেই করেছেন । ‘বীতকাম চারিধার’- চিত্রকল্পটি কী শোকাবহ! তবে কি এই কীর্তন– নিঃশব্দের কীর্তন ? ‘উৎসবের কালো কাফেলা’ বলতে কি কবি কারবালার কথা মনে করিয়ে দিতে চাইছেন ? পাঁচ লাইনের এই কবিতায় কবি ইতিহাস ও কবিত্ববোধ, সাহিত্যবোধ, জীবনবোধকে যেন নিংড়ে দিয়েছেন । এবং কবিতাটি শেষ করছেন আরও এক মারাত্মক লাইন দিয়ে– ‘মাংসল স্বাদের গন্ধে ফুটে আছে শারীরিক ফুল’ । এই লাইনে কী কবি আবার জীবনের দিকে ফিরে এলেন ? আগে বললেন - ‘বীতকাম চারিধার’। এখন বলছেন– ‘মাংসল স্বাদের গন্ধে ফুটে আছে শারীরিক ফুল।’ ‘শারীরিক ফুল’ শব্দের ব্যবহারও অবাক করেছে আমাকে । শব্দের মানে-কে কী অপূর্ব মহিমায় কিভাবে বিনির্মাণ করে ফেলেন অন্য একটা মানে, চিত্রকল্প তৈরি করে ফেলেন কবি জাফর সাদেক । কবিতাটির ভিতর এত এত চিত্রকল্প আছে, ভারি অথচ সতেজ শব্দের ব্যবহার আছে । মৃত্যুচেতনার পাশাপাশি আছে দেহচেতনার আভাস । সব মিলিয়ে কবির মননের অভিজ্ঞতাকে কুর্নিশ জানাতেই হয় ।
মৃত্যুচেতনার কবিতা পাই এরপরের কবিতা– “দ্বিখন্ডিত আত্মধ্বনি” কবিতার ভিতরে –
“উৎসবরাত্রি তুমি তো জানো আমার জীবন কতো
বেতালসিদ্ধ ।
স্বপ্নের কবর থেকে উদ্বেল চেতনা কতকাল
খুঁজেছে নিস্বন ?
সাঁকোর ওপারে একা একা হেঁটে গেছে
কতো পরলোক ।”
কবি নিজের কথাই বলছেন ? ‘আমার জীবন কতো বেতালসিদ্ধ’ কবির এই উপলব্ধি তো পরিষ্কার । ‘স্বপ্নের কবর’ বলতে কবি কী বলতে চাইলেন ? কবি কি জীবনের স্বপ্ন দেখেননি ! ‘উদ্বেল’ মানে– উচ্ছলিত । ‘নিস্বন’ মানে – শব্দ বা ধ্বনি । কবির কি তবে তাঁর বুকের ভিতরের কথা বলছেন ? কবির দেখা স্বপ্নের মাঝে কোনো উচ্ছ্বাস ছিল না । কীসের শব্দ শুনতে চেয়েছিলেন কবি ? কোন সাঁকোর কথা বললেন কবি ? ‘ওপার’ একা একা হেঁটে যাবার এক হৃদয়বিদারক চিত্রকল্প আঁকছেন কবি । এরপরই কবি লিখছেন–
“শুধু একটি উদ্বাহুকে দেখেছি ধীরে ধীরে কবরের
ভেতর মমি হয়ে যায়
একটি ফুলকে দেখেছি আকাশের দিকে
মুখ তুলে অকারণে আঙ্গিনায় ঝরে বারংবার” ( দ্বিখন্ডিত আত্মধ্বনি)
কবি কী এখানেও মৃত্যুচেতনাকে চিত্রায়িত করলেন ? ‘উদ্বাহু’ হচ্ছে- উর্ধ্ববাহু, উত্তোলিতবাহু । একটি ফুলের মৃত্যু-দৃশ্যকে কী অপূর্ব ব্যঞ্জনায় রূপায়িত করলেন কবি- ‘অকারণে আঙ্গিনায় ঝরে বারংবার’ । কবি নিজেকে সেই ফুলের সাথে তুলনা করার চেষ্টা করছেন ? হয়তবা ! কবি তাঁর এই মৃত্যুচেতনাকে আরও চিত্রায়িতকরেন–
“একটি নারীকে যিনি নিজস্ব বর্শায় বিদ্ধ
করছেন আদিম চুল্লী
একটি পাখীকে দেখেছি আমার দ্বিখণ্ডিত
আত্মার ভেতর বীজধান কাটে
একটি সন্ধ্যাকে দেখেছি সতৃষ্ণ সোনার তরী
তার শূন্য পাটে ।” (দ্বিখন্ডিত আত্মধ্বনি)
এখানে প্রতিটি দৃশ্যকল্পই হৃদয়বিদারক । কবি যেন নিজেকে নিংড়ে লিখছেন । নিজের অবস্থান বুঝে লিখছেন । নিজের ছোট্ট জীবনের কথা যেন আগেই জেনে লিখে ফেলছেন, তাঁর ব্যথার কথা । নাহলে কেন বলবেন– “একটি পাখীকে দেখেছি আমার দ্বিখণ্ডিত আত্মার ভেতর বীজধান কাটে” । ‘বীজধান’ কাটার দৃশ্যকল্পটি খুবই মর্মস্পর্শী । ‘সোনার তরী’ এবারও শূন্য । আত্মধ্বনি দ্বিখন্ডিত । এক জীবনে, দুই মৃত্যুতে । কবি এরপরও একটু ভিন্ন দিকে দৃষ্টিপাত করে লিখলেন–
“তারপর কতোকাল চলে গেছে আমি জানি না
নিয়ত নির্মিত হয়েছে কতো জগৎ
কতো প্রস্তুতিপর্ব অসমাপ্ত রেখে স্বস্তিহীন
উঠে গেছি গম্বুজের মতো
আমি জেগে দেখি সুসময় চলে গেছে
শূন্যমাঠ ভাঙা মুরলী, বাসনা কলকল হারা ” ( দ্বিখন্ডিত আত্মধ্বনি)
‘শূন্যমাঠ ভাঙা মুরলী, বাসনা কলকল হারা’– আবারও চূড়ান্ত নিঃস্বতার ক্যানভাস আঁকলেন কবি। পড়ন্তবেলার বিশাল এক ল্যাণ্ডস্ক্যাপে আঁকলেন যেন কবি । ‘ভাঙা মুরলী’– মুরলী তো প্রেমের প্রতীক । কোলাহলের প্রতীক । উচ্ছ্বাসের প্রতীক । কবি জেগে দেখলেন– সুসময় চলে গেছে ! এই ‘সুসময়’ বলতে কবি কী বোঝাতে চাইলেন ? কবির এই বেদনার জায়গাটা আমাদের ধরতে হবে । পড়ন্ত বেলার একা একা একটি পাখির ঘরে ফেরার দৃশ্য আঁকছেন কবি ।কবি দেখছেন তাঁর ভালোবাসার ‘এক দাঁত ভাঙা’ । হয়ত কবি ভালোবাসতে চেয়েও, কখনও ভালোবাসার কথা ভাবতে পারেননি । সেই সাহস নেননি । সে চেষ্টাও করেননি ।
গোটা কবিতায় কবি মূলত নিজেকে নিয়েই খেলেছেন । নিজের অনুভব ব্যক্ত করেছেন কবিতার ছলে । তাই কবি শুরুতেই বললেন– “উৎসবরাত্রি তুমি তো জানো, আমার জীবন কতো বেতালসিদ্ধ ।” জীবনের ছন্দে কবি কখনই তাঁর মতো করে ছন্দ মেলাতে পারেননি । জয়েন্ট লাল, উষ্ণ ও ফোলা,বুকে ব্যথা ও বুক ধড়ফড় করা,অল্পতে ক্লান্তি, দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট নিয়ে বেঁচে থাকতে হয়েছে কবিকে । তাই তো কবি বলেছেন–
“আমি জেগে দেখি ভালোবাসার এক ভাঙা দাঁত
জগদ্দল শায়িত-অন্ধকার জখম করছে
আলোর গতিপথ ।” (দ্বিখন্ডিত আত্মধ্বনি)
রাজ্যের বিশিষ্ট কবি সন্তোষ রায় তাঁর– “জাফর সাদেকঃ অনন্ত অসুখী আঁধার” নিবন্ধে লিখছেন– “... জাফর ১৯৭১ সালে জন্মগ্রহণ করলেও ১৯৮৭-র শেষ ভাগ থেকে কবিতা রচনা শুরু করে । ১৯৯০-র ডিসেম্বরে তাঁর মৃত্যু হয় । এই তিন বছরে রচিত কবিতা থেকে পঞ্চাশটি কবিতার সংকলিত গ্রন্থ ‘ নিহত রাত্রির দরজা’। সংকলিত কবিতা সমূহের ভেতর-বাহিরে যে অভিজ্ঞতা তা বিস্ময়ের এবং রাজ্য কবিতার মূল স্রোতের ব্যতিক্রম । ... ভাষার এহেন দুরন্ত গতি, বোধের গভীরতা, আশ্চর্য শব্দচয়ন ও অভিজ্ঞতা দেখে কে বলবে এই কবির বয়স মাত্র কুড়ি বছর ? হ্যাঁ, জাফর মাত্র কুড়ি বছরই বেঁচেছিল । আর ওই দিকে কবি সুকান্ত বেঁচেছিলেন একুশ বছর । দু’জনের আয়ুষ্কাল কাছাকাছি হলেও অভিজ্ঞতার দূরত্ব অনেক । এ-বয়সে এত দূর অভিজ্ঞতা হবার কথা নয়, যা, অর্জন করেছিল জাফর সাদেক । কীভাবে সম্ভব ? অলৌকিক লাগে । হয়ত কবি বলে সম্ভব, কবিরা যে হেঁটে বেড়ান জন্মজন্মান্তরে– ‘হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে’ এ তো শুধু কবির কল্পনা নয়, বিজ্ঞান-সত্য । জাফরের অভিজ্ঞতাও কেবলই কুড়ি বছরের লব্ধ আয়ুর অভিজ্ঞতা নয় । জাফরের দাদু ছৈয়দ আলি একজন কবি ছিলেন, ১৯৪৪ সালের জুন মাসে শিক্ষিত দরবেশের সাথে গৃহত্যাগী হয়ে আজও নিরুদ্দেশ । জাফরের পিতা তিনিও কবি ছিলেন । রক্তের এই বহমানতায় জাফর বিস্ফারিত এক ঢেউ মাত্র । তাই এক দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা নিতে হয়নি তাকে । অভিজ্ঞ হয়েই এসেছিল এই লোকে । কবি হয়েই জন্ম– না হলে কি আর সবেমাত্র কৈশোর ডিঙিয়ে ওঠা সদ্য যুবক বলতে পারে–
“আকাশ তুমি কার শিকড়ে আটকে আছো
আমি যে আজ স্বপ্ন দেখি শুধুই খারাপ
পোড়ামাটির নীতিও দেখি, দেখি আবার ফ্ল্যাগমার্চ”
(নষ্ট করতালি অনির্বাণ ভারতবর্ষ)
প্রথম চিত্রকল্পটি শিহরণ জাগায়– এক শূন্যতাকে আটকে রাখে কাল্পনিক শেকড় বা কোনো এক শক্তির কথা স্মরণ করায়, যে শক্তির বলে আকাশ ঝুলে থাকে । আবার শূন্যতাকে বস্তুরূপেও প্রত্যক্ষ করায়– আকাশ যখন শেকড় আটকে থাকে, তখন আকাশ বস্তু হয়ে যায় । উর্দ্ধে দোদুল্যমানতা, নিম্নে পোড়ামাটির নীতি, ফ্ল্যাগমার্চ– অখিলে নিখিলে যোগ । বিজ্ঞান, ইতিহাস, বহমান সময়– এক বিশাল ক্যানভাসে দুর্ভাবনা ভেসে ওঠে । এভাবেই জাফর অতলবাসী ও ব্যাপ্ত চরাচর । শব্দ ব্রহ্ম যখন, কবি তখন কবিতার ব্রহ্মা । তিনি সৃষ্টি করে গেছে তা’ অনেক ব্যাপ্ত ও গভীর।”
জাফর সাদেক আসলে তাঁর মায়ের মৃত্যুকে কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি । সেই মৃত্যুবোধ কবিকে প্রথম ধাক্কা দেয় । সেই বোধ থেকে কবির কবিতায় আসা এবং সেই বোধকে কবিতায় গ্রন্থিত করে গেছেন আমৃত্যু । আমার মতে কবির মৃত্যুচেতনা এসেছে মূলত চোখের সামনে মায়ের মৃত্যু দেখার পর থেকে । অনেকটাই মা-কেন্দ্রিক ছিল কবির জীবনযাপন। সেই আঘাতই কবিতার দিকে টেনে আনে তাঁকে। মাকে নিয়ে একটি কবিতা লিখতে গিয়ে কবি নিজেই বলেছেন– “যে জন্মদা মায়ের দৈব মৃত্যুতে আমি কবি হলুম । এক প্রেতম্বরে শয্যাশায়ী আমি, মাকে উঠে দেখার শক্তি ছিল কিনা আজও বলতে পারবো না । সেই চিরদুঃখ জননীকে নিবেদিত” । কবিতাটি ছিল এই রকম–
“বিলীন জ্যোৎস্না রাত । স্তিমিত শূন্য-কানন,
শূন্য কোরান; অন্ধকারে ডালপালা, ভেতর নির্জন।” ( স্থবির দুঃখ ইতিহাস)
কবিতার নামটা কী অদ্ভুত । ‘স্থবির দুঃখ ইতিহাস’ । মা মারা যাবার তিন বছর পর এই কবিতাটি লেখেন কবি । বাস্তবিক অর্থেই কবিকে গ্রাস করেছিল স্থবিরতা । কবির মা ছিলেন এক যোদ্ধা । গোটা পরিবারকে আগলে রেখেছিলেন পরম মমতায়। সংসারের সব ঝড়কে আগলে রেখেছিলেন দুই হাতে । স্বামীর দীর্ঘ অসুখের পর ছেলেকে আগলে রেখেছিলেন । গোটা জীবনটাই তাঁর কষ্টের, সংগ্রামের ছিল। উদাস, খামখেয়ালি স্বামীর সংসারকে তিনি নিজ দক্ষতায় আগলে রেখেছিলেন । জাফর সাদেক মায়ের মৃত্যুর আঘাত মন থেকে সামলে নিতে পারেননি । ভিতর ভিতর ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছিলেন । তাই তো লিখলেন– “স্তিমিত শূন্য-কানন”। কিন্তু আমি অবাক হলাম যখন দেখি কবি লিখছেন– “শূন্য কোরান”! শূন্যতার এরচেয়ে বড় উদাহরণ আর কী হতে পারে ? ধার্মিক যাবতীয় ব্যাখ্যাই যেন মুহূর্তে তাঁর কাছে শূন্য হয়ে গেল । স্তিমিত হয়ে গেল সামনে উঠোন । যে উঠোন জুড়ে ছিল মায়ের দিনরাত্রির আনাগোনা । বুকের ভেতরে স্থান করে নিল নির্জনতা । ‘অন্ধকারে ডালপালা’- মনের অবস্থা তুলে ধরতে কি সুন্দর উপমা টানলেন কবি । মায়ের মৃত্যুর তিন বছর পর কোনো এক জ্যোৎস্না রাতে কবি এই কবিতা লিখেছিলেন। বুকের ভিতরে নিঃস্বতাকে বোঝাতে গিয়ে আবেগতাড়িত কবি আরও লিখছেন–
“কোথায় প্রস্ফুটিত মৃত বলয় ?
কোথায় ঘুমের অবসান ?” ( স্থবির দুঃখ ইতিহাস)
কবির দুটো প্রশ্ন পাঠক হিসেবে আমাদেরকেও ঘিরে ধরে । এখানে ‘প্রস্ফুটিত’ শব্দটির নিপুন প্রয়োগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ । ‘মৃত বলয়’ কোথায় প্রস্ফুটিত হচ্ছে ? প্রকাশমান হচ্ছে । কিংবা পুষ্পিত হচ্ছে ? মৃত্যুরও কী বিকাশ হয় ? হয় বিকশিত ? এ-কেমন প্রশ্ন কবির ? এরপরই কবি আবার প্রশ্ন করছেন– “কোথায় ঘুমের অবসান?” কোন্ ঘুমের কথা বলছেন কবি ? মৃত্যু-ঘুমের কথা কী কবি বলতে চাইছেন ? নাকি পুনর্জন্মকে বলতে চাইছেন ‘ঘুমের অবসান’ ? মৃত্যুর পরের যাত্রা কোথায় সেটাই কী জানতে চাইছেন ? হয়ত বা । কবির এরপরই লিখছেন–
“দুটো কথার জন্যে আকাশ খুব
কাছাকাছি বৃত্তঘোষণা
দুটো জন্মচাকার মুখোমুখি মৃত্যুর
কঠিন ঘরানা ।
ইচ্ছা সেতুর নীচে স্বপ্ন বিলাস নদী
মানুষের পবিত্র সংযম স্নান করে জলে ।” ( স্থবির দুঃখ ইতিহাস)
এখানে ‘দুটো কথা’ বলতে কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন ? এক- জন্ম, দুই- মৃত্যু । এই কী ? যদি তাই ধরে নিই, তবে কবি এখানে “ইচ্ছা সেতু” শব্দবন্ধ দিয়ে কি বোঝাতে চাইছেন ? কবি আবার বলছেন– “মানুষের পবিত্র সংযম স্নান করে জলে।” ‘পবিত্র সংযম’– বলতে ঠিক কীবোঝাতে চাইলেন কবি ? এই লাইনের মধ্যে দিয়ে কি কবি শেষ স্নানের কথা বলতে চাইছেন ? তাহলে ‘সংযম’ শব্দটা আসছে কেন ? দেহ তো তখন সংযম-এর উর্দ্ধে । ‘মৃত্যুর কঠিন ঘরানায়’– তখন তো সে অসহায় ! পরাবাস্তবতার অদ্ভুত এক চিত্রকল্প এখানে অঙ্কন করতে চেয়েছেন কবি । যা সত্যিই অপূর্ব মননের উত্তরাধিকারী । এরপর কবি আরও লিখছেন তাঁর কবিতায়–
“কোথায় শানু বনমর্মরে বঙ্কিম নূপুর বাজে,
বিষম হরিণ কান্না পোড়ে বনতল ?
কোথায় ? শুনি না কিছুই আজ
শুধু প্রতিধ্বনি মা নাম সবুজে
রক্তিমে একাকার স্থবির দুঃখ ইতিহাস।” (স্থবির দুঃখ ইতিহাস)
এখানে ‘শানু’ শব্দের মানে কি ? ‘শানু বনমর্মরে বঙ্কিম নূপুর বাজে’– কি অসাধারণ দৃশ্যকল্প । এখানে ‘শানু’ মানে– পর্বতের উপরিস্থ সমতলভূমি । যেখানে বঙ্কিম নূপুর বাজে । ‘শানু’ শব্দের ব্যবহারেই তো চমক লাগে । কি মিষ্টি ব্যবহার । কিন্তু কবি যাবতীয় চিত্রকল্পের উন্মাদনাকে ব্যথার দিকে নিয়ে গেলেন– বাক্যের প্রথমেই ‘কোথায়’ শব্দটি প্রয়োগ করে । এবং ঠিক এরপরের লাইনে বলছেন– “বিষম হরিণকান্না পোড়ে বনতল ?” ‘হরিণকান্না’– কী হতে পারে ? বিষম কান্নায় পোড়ে যায় বনতল । সবুজের বিশাল সমতলে কী তবে হরিণের মৃত্যুদৃশ্য আঁকতে চেয়েছেন কবি ? বেদনার এক করুণ চিৎকার ! কবি বলছেন– “শুনি না কিছুই আজ/ শুধু প্রতিধ্বনি মা নাম সবুজে/রক্তিমে একাকার স্থবির দুঃখ ইতিহাস।” চারিদিকে কবি ‘মা’ নামের ধ্বনি শুনতে পাচ্ছেন । এই বনভূমি কি তবে কবির বুকের ভিতরের বনভুমি ? যেখানে বিষম হরিণের মতো কবির কান্না অনবরত পুড়েই চলেছে । সেই বনমর্মরে কেবল ‘মা’ নামটাই ধ্বনিত হচ্ছে অহরহ । আর কবি সবুজের ভিড়ে স্থবির । একা । বেদনার রক্তিম ইতিহাস নিয়ে স্থির । স্থবির । বনমর্মরে বাজতে থাকে বঙ্কিম নূপুর । স্তিমিত শূন্য কানন । বিলীন জ্যোস্না রাত । শূন্য কোরান । অন্ধকারে ডালপালা । আর বুকের ভেতর নির্জন ।
কবি-আলোচক সন্তোষ রায় তাঁর “জাফর সাদেকঃ অনন্ত অসুখী আঁধার” নিবন্ধে আরও লেখেন– “জীবনের শেষে মৃত্যু আর মৃত্যুর ভেতর জীবন– কথা দু’টো দু’রকম । কৈশোর-যৌবন স্বপ্ন দেখার সময়, ভেঙে গড়ার সময়, এই সময় যদি কেউ নিশ্চিত জ্ঞাত হয় মৃত্যু তাঁর সন্নিকটে তখন জৈবিক কামনা বাসনা ফেলে মৃত্যুকেই ভালবেসে নেয় । ‘কবর-শর্বরীর গাঢ় কণ্ঠস্বর শুনতে শুনতে একসময় ঈশ্বরের পায়ে সমাহিত হয়ে যায়।’
চারপাশে মৃত্যুবলয় মাঝে এক কেন্দ্রবিন্দু বা বলা যায় মৃত্যুর মাঝখানে যেটুকু অবকাশ তা-ই জীবন । মানুষ কেন্দ্র থেকে পরিধি পর্যন্ত-ই বেঁচে থাকে । এতটুকুই তার স্বাধীন বিচরণক্ষেত্র,ক্ষোভ আনন্দ দুঃখসুখের স্ফুরণ । পরিধি ছুঁলেই পেরিয়ে গেল দিগন্তরেখা । জাফর জেনেছিল তাঁর জীবন বলয়টি অতি ক্ষীণ, কেন্দ্রে রয়েছে পা, মাথা ছুঁইছুঁই বলয়রেখা । সীমিত মৃ্ত্যু-বার্তা জ্ঞাত হলে তাঁর অনুভবের স্ফুরণ ঘটতে থাকে মুহুর্মুহু – সীমিত কালটিকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে চায় । জাফরের বেলাতেও তা-ই ঘটেছিল । তিনবছরের লেখ্য জীবনকালে তাঁর অভিজ্ঞতা-অনুভব যেন পূর্ণজীবনের। যেহেতু তাঁর চেতনা আচ্ছন্ন ছিল মৃত্যুরঙে তাই তাঁর প্রেম দ্রোহ সহ প্রায় যাবতীয় প্রকাশ ঘটেছিল সেই রঙে । কথায় বলে, মৃত্যুচেতনা যাঁর যত প্রগাঢ়, জীবনবোধ তাঁর তত গভীর । জীবনের সেই গভীর বোধ-ই পাই আমরা জাফর সাদেকের কবিতায় । এই কবি একজন প্রেমী, এক দ্রোহী, একজন সময় সজাগ এবং প্রজ্ঞাবান । প্রেম দ্রোহ সময়– সকল অনুভব তাঁর মৃত্যু চেতনায় । পার্থিব কোনো নারী তাঁকে প্রলুব্ধ করতে পারেনি । তাঁর সকল প্রেমই যে মৃত্যুর কোলে অর্পিত । মৃত্যুতেই আলিঙ্গনাবদ্ধ । তাই তাঁর সব প্রেমোক্তি মূলত অশরীরী ।”
মৃত্যুচেতনা নিঃসন্দেহে কবিকে ভিতর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছিল । তবে এখানে কবি সন্তোষ রায়ের মতামতের সাথে একটু দ্বিমত পোষণ করতে চাইছি । আমরা মতে, কবির মত্যুবোধ মূলত কবির মনে প্রবেশ করেছে মায়ের মৃত্যুর পর থেকেই । আমি জাফর সাদেকের বড় ভাই কবি আকবর আহমেদকে জানতে চেয়েছিলাম - ‘আচ্ছা, জাফর ভাই কি কোনভাবে বুঝতে পেরেছিলেন যে এই রোগে তার মৃত্যু সম্ভাবনা ছিল ?’ উত্তরে তিনি বলেছিলেন– ‘না । মারা যাবার মতো কোন আশংকা ছিল না। ডাক্তার বলেছিল ২৫ বছর পর্যন্ত পেনিডিয়োর ইনজেকশন নিতে হবে। এরপর যদি না-সারে তবে হার্ট সার্জারি করতে হবে। তা ছাড়া চল্লিশ পরবর্তী বয়সে এই রোগের প্রবণতা স্বাভাবিকভাবেই কমতে থাকবে।’ আসলে কবি যে মারা যাবেন, এটা ধারণায় ছিল না। আকবর আহমেদও তা বলেন। শরীরটা হঠাৎ করেই খারাপ করে। সর্দি হয়েছিল।সর্দি থেকে জ্বর আসে। এটা রিলেটেড। তখন জাফর সাদেক ‘নেতাজী হোস্টেলে’ থেকে পড়াশোনা করতেন। মারা যাওয়ার দিন আকবর’দা ‘নজরুল ছাত্রাবাসে’ই ছিলেন। ডাক্তার বিমল ভৌমিককে দেখানোর পর বড় ভাই কবিকে ‘নজরুল ছাত্রাবাসে’ নিয়ে যান আকবর আহমেদ। সেখানেই ছিলেন কবি। কিন্তু রাতের দিকে আবার শরীর খারাপ করে। প্রথম আই জি এম এরপর জি বি হাসপাতালে নেয়া হয়। এবং সেখানেই তিনি হার্ট-ফেল করে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।সরাসরি মৃত্যু ভয় থেকে তিনি দূরেই ছিলেন। তবে শারীরিক একটা অসুস্থতাজনিত কষ্ট তিনি বহন করতেন। একবার ফুটবল খেলতে গিয়ে বুকে আঘাত লাগে। এরপর ডাক্তার তাকে ফুটবল খেলতে নিষেধ করেন। এটা তাকে কষ্ট দিয়েছিল বলে জানান আকবর আহমেদ।”
তাহলে সন্তোষ রায়ের এই অনুমান - “জাফর জেনেছিল তাঁর জীবন বলয়টি অতি ক্ষীণ”– এটা সম্পূর্ণ সত্য নয় । বরং জাফর জানতো সে ভালো হয়ে যাবে । সাবধানে থাকতে তাঁকে বলা হত সব সময়ই । বড় ভাই আকবরদাওআমাকে বলেছিলেন– “ভাই, মারা যাবে আমরা কেউই ভাবতে পারিনি । মরার কথাও ছিল না । বরং ডাক্তার বলেছিল– ‘এক পর্যায়ে রোগী ভাল হয়ে যাবারই কথা। কিন্তু হার্টের বাল্বগুলিকে এই রোগ এফেক্ট বেশি করে। পরিস্থিতি বিপরীত দিকে গেলে রোগী হার্ট-ফেলও করে।’ আর সেটাই ঘটে যায় কবি জাফর সাদেকের ক্ষেত্রে।” ২৯শে ডিসেম্বর ১৯৯০ সালে কবি মৃত্যুবরণ করেন। অথচ সাধারণত চল্লিশ বছরের পর এই রোগ ক্রমশ সেরে যায়। কিন্তু সে সুযোগ কবি জাফর সাদেক পাননি ।
কবি জাফর সাদেক তাঁর “অলগ্ন ছায়ার মুখোমুখি অনন্ত অসুখী আঁধার” কবিতায় কবি লিখছেন-
“এই তো সময়চিতা । যেখানে কণ্ঠ মধুরে তিক্ততায়;
বিশাল সমুদ্রের তলদেশ জুড়ে অপেক্ষমান
সার্বজনীন মৌনতা” (অলগ্ন ছায়ার মুখোমুখি অনন্ত অসুখী আঁধার )
লগ্ন হল, আপনার পার্থিব পরিচয় । যেমনভাবে আপনি পৃথিবীতে থাকেন, বা লোকে আপনাকে যেমনভাবে দেখতে পায় । এখানে কবি ‘লগ্ন’ শব্দের আগে ‘অ’ বসিয়ে দিয়ে তার মানেকে ভিন্ন আরেক পথের দিকে ধাবিত করে দিলেন । ‘অলগ্ন ছায়ার মুখোমুখি’ কে ওখানে ? তিনি কি স্বয়ং কবি ? ‘অনন্ত অসুখী আঁধার’ বলতে কবি কী বোঝাতে চাইছেন ? এখানে কে কার মুখোমুখি বসে ? ‘অনন্ত অসুখী আঁধার’ কি কবি নিজেকেই বোঝাতে চাইছেন ? তলদেশের মৌনতা– কী কবির বুকের ভিতরেই দুলছে ? কেননা কবি এরপরই বলছেন–
“তারপর বৃক্ষ নদী, পাহাড়-পর্বত পেরিয়ে আমিই
তাকে মৃত্যুর দিকে ছুটিয়ে নিই
আমার জন্ম-ধূলো কেবলি ভূমধ্য শিকড় বাড়িয়ে
দিচ্ছে চতুর্দিকে
ঔষধপত্রের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সখ্যতায় ডাকবাক্সের
একাকী চিঠির মতো নিঃসঙ্গ আলিঙ্গনে”
(অলগ্ন ছায়ার মুখোমুখি অনন্ত অসুখী আঁধার )
‘একাকী চিঠির মতো নিঃসঙ্গ আলিঙ্গন’– চিত্রকল্প হিসেবে খুবই অভিনব একটি প্রয়োগ । কী-সব অসাধারণ উপমা যে কবি তাঁর গোটা কাব্যে ব্যবহার করেছেন, ভাবলে অবাক হতেই হয় । এর ঠিক আগেও কবি মৃত্যুর আলোকপাত করেছেন । লিখছেন– ‘ঔষধপত্রের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সখ্যতা’ প্রসঙ্গ । এই দৃশ্যকল্পে নিঃসন্দেহে কবির অভিজ্ঞতার ছাপ পাওয়া যায় । কিন্তু মননকে টেনে নিয়ে যায় কবি যখন বলেন- ‘একাকী চিঠির মতো নিঃসঙ্গ আলিঙ্গন’ । এবং কোথাও না কোথাও এই নিঃসঙ্গতার শিকড় ছড়িয়ে পড়ছে কবির মনোভূমির চতুর্দিকেও । মৃত্যুর দু’মাস আগের এই কবিতাটি লিখেছিলেন কবি । কবিতাটির ছত্রে ছত্রে কবির মৃত্যু-ভাবনা প্রকাশ পাচ্ছিল । এটা কী নেহাত কাকতালীয় ছিল ? হয়ত বা । কবি তখন আগরতলায় পড়াশোনাকরছেন । ফুটবল খেলা থেকে বিরত রয়েছেন । আগরতলার কবিদের সাথে মেলামেশা করছেন । কবিতা নিয়ে নতুন করে ভাবছেন । তখন মৃত্যুবোধ তাকে ছেড়ে যায়নি । কবি লিখছেন–
“একাকী চিঠির মতো নিঃসঙ্গ আলিঙ্গনে
বেড়ে উঠছে শব্দরূপ– গাছ
যে গাছের দীর্ঘ সহবাসে আমার অন্তজ ঋতুর ভেতর
মুহুর্মুহু মৃত্যুর সূতো টানা অনেক জন্মের বুদ্ধিস্বপ্ন ।”
(অলগ্ন ছায়ার মুখোমুখি অনন্ত অসুখী আঁধার)
“শব্দরূপ–গাছ” বলতে আমরা কী বুঝবো ! কবিই বা কী বোঝাতে চেয়েছেন ? ‘অন্তজ’ শব্দটা অভিধানে দেখাচ্ছে– ‘অন্ত্যজ’ । এর মানে হল– নিম্ন, অবনত, মনমরা, বিষণ্ণ, অন্ধকরাচ্ছন্ন । আমি ‘মনমরা’ শব্দটাকেই গ্রহণ করেছি । ‘বুদ্ধিস্বপ্ন’ শব্দটাও আমাকে ভাবিয়েছে ? ‘স্বপ্ন’এর আগে কবি ‘বুদ্ধি’ শব্দটা কেন বসালেন ? এখানে কবি জন্ম-মৃত্যু এবং তার পরম্পরাকে একাকার করার চেষ্টা করেছেন । তবে এই চারলাইন বুঝতে হলে আমাদের আরও গভীরে যেতে হবে কবিতার ।
“তবে নিরভ্র জীবন পেতে আমি কি কৌতুহলী ?
না নিরবচ্ছিন্ন রাত্রির তরল অন্ধকারে
একত্র সভ্যতায় যে আমার সব নিয়ে গেছে বিমূর্ত করে
উথালে-পাথালে”
(অলগ্ন ছায়ার মুখোমুখি অনন্ত অসুখী আঁধার )
‘নিরভ্র’ শব্দের প্রয়োগ আমাকে চমকে দিল, প্রথমেই । এর মানে হচ্ছে- ‘মেঘশূন্য’। ‘মুহুর্মুহু মৃত্যুর সূতো টানা’ কবি মেঘশূন্য একটা জীবন পেতে চাইছেন । চাইলেন ? না, চাইতে কৌতুহলী হলেন কবি ? কবি সম্ভবত দ্বিধায় । রাত্রির নিরবচ্ছিন্ন অন্ধকার-কেই কী কবি বলছেন- অনন্ত অসুখী আঁধার ! এই অসুখ-টা প্রকৃত অর্থে কার ? এই অনন্ত আঁধার কি কবির মনের ? না, এই সভ্যতার ! এই বিমূর্ত উথাল-পাথাল কোথাও কী সভ্যতার প্রকৃত আঁধার ? এই কবিতার শুরুই করেছেন কবি– “এই তো সময়চিতা।” দিয়ে । ‘সময়চিতা’ বলতে কবি তাহলে সেই সময়ের সামাজিক- রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকই ধরতে চেয়েছেন । সেই সময় নিয়ে অভিজিৎ চক্রবর্তী তার ‘ত্রিপুরায় বাংলা কবিতা’-য় লিখছেন–“আটের দশকে ধীরে ধীরে উগ্রপন্থী সমস্যা চূড়ান্ত মাত্রা স্পর্শ করতে থাকে । সমস্ত ত্রিপুরার শহর অরণ্য-পাহাড় মূলত বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়। অপহরণ,ধর্ষণ, লুঠতরাজ, হত্যা, তোলাবাজি, মুক্তিপণ, গুলাগুলি, রাহাজানি, বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া– এই হয়ে যায় প্রতিদিনকার জীবন । নিরাপত্তার জন্য সাধারণ মানুষ ভিড় জমায় শহরে বা শহরের উপকণ্ঠে । শুধু ত্রিপুরাতে নয়, সমস্ত ভারতবর্ষেই তখন বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যকলাপ বাড়তে থাকে । ত্রিপুরার পার্শ্ববর্তী দেশ বাংলাদেশ মায়ানমার ও উত্তর পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলিতে নব্বইয়ের দশকে উগ্রপন্থী সমস্যা প্রধান সমস্যা হয়ে ওঠে । সুতরাং এই দশকে ত্রিপুরার জনজীবন কী দুর্বিষহ ছিল তা সহজেই আন্দাজ করা যায়।”
কবিতাটি কী তবে সেইসব প্রেক্ষাপটকেও ধরাতে চেষ্টা করেছিল ? হয়তবা । কবি কি তাই পরবর্তীতে লিখছেন–
“উথালে-পাথালে
একাগ্রমনে আমি কি খুঁজি তার মুখ ?
শুধু জানি, যে আমার বিরুদ্ধ কল্পনা
শূন্য-কুম্ভ–হাসে
তার কাছে যেতে হয় বারংবার
অলগ্ন ছায়ার মুখোমুখি অনন্ত অসুখী আঁধার ।
(অলগ্ন ছায়ার মুখোমুখি অনন্ত অসুখী আঁধার )
কবিতাটি শূন্যতার চিত্রকল্প এঁকে শেষ করছেন কবি । কোথাও কী কবি নিজের ছায়াকেই ‘অলগ্ন’ বলছেন ? আর নিজেরই মুখোমুখি অনন্ত এক অসুখী আঁধার । এই আঁধার, এই অন্ধকার কীসের? কবিতার শুরুতে বলেছিলেন - “অপেক্ষমান সার্বজনীন মৌনতা” । এই সার্বজনীন মৌনতা কি সময়ের ? এই আঁধার সময়ের । অনন্ত এক আঁধার দেখেছিলেন কবি সেদিন । মনে পড়ে তার ফেলে লাইন - “ ডাকবাক্সের একাকী চিঠির মতো নিঃসঙ্গ আলিঙ্গন ” । এই আলিঙ্গন বেদনার । এই নিঃসঙ্গতা - সময়ের । এই নিঃসঙ্গতা, অসুখ আগলে পড়ে থাকা এক কবির ।
৪-১১-১৯৯০ সালে কবি লেখেন ‘নষ্টবাড়ী’ । মৃত্যুর এক মাস আগের লেখা । যেখানে কবি লিখছেন –
“সাঁকোর উপর পড়লে ছায়া
বিপ্রতীপে
আমার দিকে টিকলি ছুঁড়ো
কোন সুখে
আমাকে ডাকে শ্মশান ঘুম
মৃত্যু এবং মায়াবিনী
আমাকে ডাকে পথের ডানা
সম্মোহিত নষ্টবাড়ী ।” (নষ্টবাড়ী)
যেহেতু কবির মৃত্যুর একমাস আগে লেখা কবিতাটা, সে-ই কবিতাটা আমার কাছে খুবই গুরুত্ব রাখে । বিশেষ করে এই লাইন– ‘আমাকে ডাকে শ্মশান ঘুম’ । এর আগের পঙক্তিতে কবি একটা চিত্রকল্প তৈরির চেষ্টা করেছেন । ‘শ্মশান ঘুম’- শব্দটা কবির অনুসন্ধানী চয়ন । এই দৃশ্যঅঙ্কনের পরই কবি লিখলেন– ‘মৃত্যু এবং মায়াবিনী’ । আচ্ছা, ‘মৃত্যু’ শব্দের পাশে কবি ‘মায়াবিনী’ শব্দটা বসালেন কেন ? মৃত্যু-র সাথে মায়াবিনী– শব্দের সম্পর্ক কোথায় ? কবিকেই বা মৃত্যু ডাকছে কেন ? নাকি কবি বুঝতে পেরেছিলেন যে, জীবন আর বেশি দিন নেই কবির হাতে ! কবির বাল্যবন্ধু ইনতাজ হোসেইন তার স্মৃতিচারণে বলেন– “জাফর, গল্পের ছলে প্রায়ই তার নিজের মৃত্যুর প্রসঙ্গ তুলে আনত । বলত, হয়ত আমি বেশি বাঁচবো না।” এই কবিতায়ও দেখতে পাচ্ছি – কবি মৃ্ত্যুর ডাক শুনতে পাচ্ছেন ।
“আমাকে ডাকে পথের ডানা
সম্মোহিত নষ্টবাড়ী ।”
এখানে লক্ষণীয় যে বিষয় আমাকে টানছে, তাহল, ‘মৃত্যু এবং মায়াবিনী’ শব্দের মতো পরের লাইনে কবি লিখছেন– “সম্মোহিত নষ্টবাড়ী ।” ‘সম্মোহিত’ মানে হচ্ছে -অতিশয়মোহপ্রাপ্ত; বিমোহিত; সম্পূর্ণমুগ্ধ। ‘নষ্টবাড়ী’-র প্রতি কবি এত বিমোহিত, মুগ্ধ হতে যাবেন কেন ? ‘পথের ডানা’ বলতেই বা কবি কী বোঝাতে চাইলেন ? ‘নষ্টবাড়ী’ বলতেই বা কবি কী বোঝাতে চাইছেন ? প্রতীকী অর্থে কি ‘মৃতদেহ’-কেই কবি বলতে চাইছেন, ফেলে দেওয়া বাড়ি ! যে বাড়ি আর ভালো নেই । নষ্ট হয়ে গেছে । জীবন উপযোগী আর কিছু নেই তাতে। তাহলে এর আগে কবি “সম্মোহিত” শব্দটা বসালেন কেন ? যে বাড়ি নষ্ট হতে যাচ্ছে তার প্রতি কি কবি তবে “সম্মোহিত”? আমাকে ডাকে - শ্মশান ঘুম, আমাকে ডাকে- সম্মোহিত নষ্টবাড়ী । দুটো প্রয়োগই কি কবি মৃত্যুর প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন ? “সাঁকোর উপর পড়লে ছায়া বিপ্রতীপে” – কবিতার প্রথম লাইন থেকেই কবি মৃত্যু-চেতনাবোধের ছবি আঁকতে চেয়েছেন । ‘সাঁকো’-কে প্রতীক করেছেন জীবন-মৃত্যুর । কবির শব্দবোধে বারবার মুগ্ধ হয়েছি । এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি ।
এবারে আমরা যে কবিতাটি পড়তে যাচ্ছি তার নাম– “শ্মশান রাত্রির উৎসব”। এই কবিতায় কবি পরীক্ষানিরীক্ষা করেছেন নানাভাবে । সাধুভাষায় এবং রানিং কম্পোজে লিখেছেন। কবিতাটি লেখা হয়েছে– ১৬-০৮-১৯৯০ সালে ।মৃত্যুর প্রায় দু-মাস আগে । কবিতাটির প্রথম স্তবকটি হচ্ছে এই রকম–
“এখন আমরা কঙ্কালবাড়ীর দিকে যাইতেছি । নির্জনে দাঁড়ানো এক কিশোরীর প্রার্থনার মতন বুদ্ধির স্বপ্ন চতুর্দিকে উৎরাইয়া পড়িতেছে । কিছুটা যুদ্ধ করিয়া তাহার পরে শান্তির কথা বলিব । এখন বঙ্কিম স্তবক ভাঙিয়া বাহুলীনা স্বপ্নমুগ্ধা হইয়া উঠিতেছে । মধুহীন ওষ্ঠের উপর নিঃশব্দ চুম্বনে পর্ণঝরা ঋতুর মুখে আজ যাহার সহিত দেখা হইতে পারে– সে নমনীয় থাকিবে না । তীব্র বিষ বিস্ফোরণে অথবা আশ্চর্য বোমা ফাটাইয়া সে পথে দাঁড়াইতে পারে । এই বিদ্রোহ যদি আজ জনপ্রিয়তা অর্জন করে তবে বুঝিতে হইবে আমি সঠিক সময়ে আসিতে পারি নাই।” (শ্মশান রাত্রির উৎসব)
ইতিপূর্বে কবি এই স্টাইলে আর কোনো কবিতা লেখেননি । ‘কঙ্কালবাড়ী’ বলতে কবি কী বোঝাতে চাইলেন ? সেদিকেই কেন ছুটে চলেছেন কবি ? কীসের কৌতূহলে ? এরপরই কবি নির্জনে দাঁড়িয়ে প্রার্থনারত এক কিশোরীর অদ্ভুত এক দৃশ্যকল্প আঁকলেন । কিন্তু জট পাঁকালো এরপর ‘বুদ্ধির স্বপ্ন চতুর্দিকে’ চিত্রকল্প নিয়ে । স্বপ্ন আবার বুদ্ধি দিয়ে দেখা যায় নাকি ! ‘কিশোরীর প্রার্থনা’ যতটা সরল প্রক্রিয়া ছিল, পরে শব্দমালায় তা জটিল হয়ে পড়ল । ‘কঙ্কালবাড়ী’র সাথেই বা এসবের সম্পর্ক কী ? নাকি কবি একের পর এক চিত্রকল্প এঁকে গেছেন এই কবিতায় ! কেননা, এরপরই কবি প্রসঙ্গ থেকে একটু সরে গিয়েই লিখছেন– ‘কিছুটা যুদ্ধ করিয়া তাহার পরে শান্তির কথা বলিব ।’ এটা তো একটা বুর্জোয়া টেকনিক । এরপরই কবি আবার একটা চিত্রকল্প আঁকলেন, যা এ-পর্যন্ত কখনও আঁকেননি । বললেন– “মধুহীন ওষ্ঠের উপর নিঃশব্দ চুম্বন”। আহা, জাফর সাদেকও এমন চিত্র এঁকেছিলেন তাহলে ? কিন্তু ‘মধুহীন ওষ্ঠ’ কেন ? এমন ওষ্ঠ কী চুম্বন চায় ? এই কবিতায় কবি একের পর এক ভয়ানক সব চিত্রকল্প আঁকার চেষ্টা করেছেন । ‘পর্ণঝরা ঋতুর মুখে আজ যাহার সহিত দেখা হইতে পারে’– তার মানে কি হতে পারে ! প্রথমে পেলাম- কঙ্কালবাড়ী, এরপর এলো– ‘নির্জনে দাঁড়ানো কিশোরী’, ‘মধুহীন ওষ্ঠ’, ‘পর্ণঝরা ঋতুর মুখে চুম্বন’ – প্রতিটি দৃশ্য, চিত্রকল্পই নতুন এবং চমকপ্রদ । কবি সন্তোষ রায় এই কবিতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে লিখেছেন–“এ প্রেম কেবলই অনুভবের । আকাঙ্ক্ষার অবসান যেন এক শূন্যতার– ‘যাহাকে ফলবতী করিয়া রাখিয়াছি সে কিছুই ভাবিতেছে না।’ এক শুদ্ধ-পবিত্র-স্বর্গীয় আভায় দীপ্ত প্রেম । প্রকৃতি-প্রেম-মৃত্যু মিলেমিশে অরূপ উপলব্ধি । এই প্রেমানুভূতি এক প্রজ্ঞাবান পৌরুষের।” ( জাফর সাদেকঃ অনন্ত অসুখী আঁধার’- জলজ -৯২ সংখ্যা)
আমি এই কবিতা অনুভব করতে গিয়ে প্রেম থেকে বেশি যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ দেখতে পেয়েছি ।“শ্মশান রাত্রির উৎসব” কবিতার নামটাই তো যন্ত্রণার । অনন্ত অসুখী আঁধারের আনাগোনা গোটা কবিতা জুড়ে । প্রেম ভাবনার ভিতরে সুপ্ত যন্ত্রণার হাহাকার যেন এই কবিতা । দ্বিতীয় স্তবকে কবি লিখছেন–
“পাঠকের কাছে ক্ষমা চাহিয়া এখন আমি তাহার শরীর স্পর্শ করিতে যাইতেছি । নিশীথ শীৎকারের পবিত্র পুষ্পাঞ্জলি তাহার ওষ্ঠে বাজিয়া উঠিতে পারে । সুতরাং এই প্রজন্মের আরোগ্যস্নানের কথা চিন্তা করিয়া দৃশ্যান্তরে ঘটানো হইল ।”
(শ্মশান রাত্রির উৎসব)
“নিশীথ শীৎকারের পবিত্র পুষ্পাঞ্জলি”– আহা! কী চমৎকার চিত্রকল্প। ‘পবিত্র পুষ্পাঞ্জলি’ – কী অপূর্ব শব্দের সমাহার । এমন চিত্রকল্প এটাই প্রথম এবং শেষ । কিন্তু শেষমেশ কি তাহার ওষ্ঠে চুম্বন পড়িল ? না, তেমন কোনো ইঙ্গিত এই কবিতায় নেই । বরং কবি বললেন– দৃশ্যান্তর ঘটানো হইল । এখানে কোন্ আরোগ্যস্নানের কথা কবি চিন্তা করলেন ? এবং সেটা কী ? শরীর স্পর্শ করতে গিয়েও কবি স্পর্শ করতে পারলেন না!বরং দৃশ্যান্তর ঘটানো চিত্রপটের । তৃতীয় স্তবকে কবি লিখছেন–
“ইহার পরে এখন আমরা শ্মশান-উৎসবে মিলিত হইব । মানুষ ও প্রকৃতির স্তব্ধতার ভিতর রাত্রির নূপুর বাজাইতে বাজাইতে শবশকট নদীতীরে আনয়ন করিব । মৃতকে স্পর্শ করিলে মানুষ বীতকাম হয়; চারিধারের জন্মান্তর ঘটিয়া যায় ।”
(শ্মশান রাত্রির উৎসব)
দৃশ্যান্তরে দেখতে পেলাম– ‘শ্মশান-উৎসব’ । ‘মানুষ ও প্রকৃতির স্তব্ধতার ভিতর’– হঠাৎ এসব কথা বলতে গেলেন কেন কবি ? রাত্রির স্তব্ধতা– কবিকে বারবারই অবাক করত । কখনও করতো ব্যথিত । আমাকে একথা বলেছিলেন কবির বাল্যকালের বন্ধু ইনতাজ হোসেন । একই সাথে প্রায় ঘুমাতেন তারা । তখনই তিনি বিষয় লক্ষ করেন । কবি বেশি ঘুমাতে চাইতেন না । বন্ধুকে বলেন– “যদি বেশি দিন না-বাঁচি, তাই !” বন্ধু বলেন, আমি প্রায়ই ওর এসব কথার অর্থ বুঝতে পারতাম না । কিন্তু রাত্রির নিস্তব্ধতার পাশে কবি-- “নূপুর বাজাইতে বাজাইতে শবশকট নদীতীরে আনয়ন করিব” এই দৃশ্য আনতে গেলেন কেন ? কী সুন্দর একটা শব্দ টুক করে তুলে আনলেন–“শবশকট” । শকট– মানে গাড়ি । কার শব কবি নদীতীরে আনয়ন করার কথা বলছেন ? তাও আবার ‘নূপুর বাজাইতে বাজাইতে’ ! তার মানে তিনি মৃত্যুকে উৎসবের সাথে তুলনা করতে চাইছেন । তাই কি কবিতার নাম রাখলেন – “শ্মশান রাত্রির উৎসব” । তবে কি মৃত্যুটা উৎসব কবির কল্পনায় । ‘নূপুর বাজাইতে বাজাইতে’– এই দৃশ্যকল্পে কোথাও বেদনার ছাপ নেই । বরং আলিঙ্গন রয়েছে । এবং কি অসাধারণ একটা লাইন বললেন– “মৃতকে স্পর্শ করিলে মানুষ বীতকাম হয়”। এরপর আর বোধকরি কোনো কামনা থাকে না । কবি তাই বলছেন– “চারিধারের জন্মান্তর ঘটিয়া যায় ।” এই জন্মান্তর কি বোধের ? বীতকামের পর মানুষের মনে এক জন্মান্তরই ঘটে । এইসব অর্থ মিলিয়েই কি কবি বললেন- শ্মশান রাত্রির উৎসব !
কবি এই কবিতায় তাঁর শেষ স্তবকে লিখছেন–
“সুতরাং অতঃপর কিছুটা জিজ্ঞাসা হাসিয়া কাঁদিয়া উঠিতে পারে । বলাবাহুল্য চরিত্রহীন আহ্লাদে চক্ষু খুলিয়া দেখিলাম চৌভিতে আগাছার জঙ্গল, বিলীয়মান তীর্থরাত; এতদিন আমি যাহাকে ফলবতী করিয়া রাখিয়াছি সে কিছুই ভাবিতেছে না।”
(শ্মশান রাত্রির উৎসব)
এখানে কোন্ ‘জিজ্ঞাসা’-র কথা কবি বলতে চাইছেন ? যে জিজ্ঞাসা কখনও হাসায়, কখনও কাঁদায় ! আবার বলছেন– ‘চৌভিতে আগাছার জঙ্গল’ । এই ‘চৌভিত’ বলতে কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন ? ‘চৌ’ মানে চতুষ্কোণ । মানে ঘর । ‘ভিত’ – মানে ভিত্তিস্থাপন । তারমানে কবি ঘর বোঝাতেই এই শব্দবন্ধের প্রয়োগ করেছেন । কিন্তু এই ঘর, -- আগাছার জঙ্গলে ভর্তি কেন ? এরপরই বলছেন– ‘বিলীয়মান তীর্থরাত’ । শ্মশানের বিলীয়মান এই রাতকেই কি কবি তীর্থরাত বলতে চাইলেন ? কি গভীরতা দিয়ে এই কবিতায় কবি জীবন-মৃত্যু-প্রেমকে পরাবাস্তবতার ভিতর দিয়ে দেখতে চেয়েছেন । ‘নিহত রাত্রির দরজা’ কাব্যে এই কবিতাটা আলাদা একটা মাত্রা রাখে ।
কবির বাল্যবন্ধু ইনতাজ হোসেনের সাথে কথা হলে তিনি জানান– “জাফর সাদেক আমার ছোটোবেলার বন্ধু । একসাথে খেলাধূলা, লেখাপড়া, এমনকি ঘুমানোর সঙ্গী ছিলাম আমরা । ছোটোবেলা থেকেই জাফরের ইচ্ছে ছিল কবি হওয়ার । কিন্তু এ-কথা সে কাউকে বলতো না । পৌষ-মাঘ মাসের বিকেলের মাঠের আলে আমাদের কয়েকজনকে সামনে বসিয়ে রেখে সে একের পর এক কবিতা শোনাত । মাঝে মাঝে জানতে চাইতো– ‘আমি কি কোনোদিন বড় কবি হতে পারবো ?’ আমরা তখন বলতাম– ‘আরে তুই তো কবিই !’ জাফর তখন মুচকি হাসত। আমাকে প্রায়ই বলতো– “আমার কেন জানি মনে হয়, আমি বেশ বাঁচবো না । তখন আমরা অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি । ওর এসব কথার অর্থ বুঝতাম না । এইসব রোগ নিয়ে তো এখনও অনেকেই বেঁচে আছে । জাফরের সাথে যখন হাঁটতাম, তখন মনে হত সে কিছু মনে মনে ভাবছে । প্রায়ই বলতো– “মরার আগে কিছু একটা করে যেতে চাই । যাতে মানুষ আমাকে মনে রাখে ।” জাতপাতে সে বিশ্বাস করতো না । মিশুক প্রকৃতির ছিল জাফর । গাছপালা, প্রকৃতির দিকে সে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতো । মাঝে মাঝে একা একা হাঁটতো । ছাত্র হিসেবে সে খুব মনোযোগী ছিল । প্রায়ই বাংলা অভিধান থেকে শব্দ খুঁজে খুঁজে একটা খাতায় লিখে রাখতো । আমি বলতাম, ‘এসব টুকে রেখে কি করবি ?’ সে বলতো– ‘এসব তুই বুঝবি না ।’ অসীম আকাশ এবং সমুদ্রের তলদেশ নিয়ে তাঁর বিস্ময়ের অন্ত ছিল না । নিজের পরিবার, বিষয়আশয় নিয়ে তেমন কিছু বলতো না । প্রায়ই বলতো– ‘ কিছু একটা করে যেতে চাই । যেহেতু বেশি দিন বাঁচবো না ।’ এটা তাঁর মূল ভাবনা ছিল । কবিতা আবৃত্তি করতো খুব সুন্দর । মাঝে মাঝে একাই বেরিয়ে যেত । নানীর অনুরোধে তাঁকে খুঁজতে গিয়ে দেখতাম– হয়ত কোনো আলের ধারে বসে রয়েছে । বলতাম– ‘চল, বাড়ি চল!’ উত্তরে বলতো– ‘বাড়ি গিয়ে কী লাভ ? বাইরে প্রকৃতির কাছে থাকতেই বেশি ভালো লাগে ।’ বিশেষ করে মায়ের মৃত্যুর পর তাঁর ক্ষেত্রে এই প্রবণতা বেশি দেখা যায় । প্রায় সময় দেখতাম, নাক দিয়ে রক্ত পড়ত । আবার ভালোও হয়ে যেত । এক বিছানায় আমরা ঘুমালেও সে বিছানায় যেত অনেক দেরিতে । ওসবের কিছুই সে কাউকে বলতে দিত না । জীবনে সময় কম এটা ভেবে সে রাত রাত পড়ত । জেগে থাকতো ।”
জাফর সাদেকের বড়বোন মৌসুমী আকতারের কাছে কথা প্রসঙ্গে জানতে পারলাম, ১১- ১২ বছরের সময় বিশালগড়ের লক্ষ্মীবিল হাসপাতালের ডাক্তার পি. কে. রায় আকবর আহমেদকে বলেছিলেন– এই রোগে আক্রান্ত রোগীরা বেশিদিন বাঁচে না । তাকে একটু যত্নে রেখো ।” এই কথাটা জাফর কোনোভাবে শুনে ফেলেছিল । এই কথা থাকে খুব ভাবিত করে তুলেছিল ।” মূলত এরপর থেকেই জাফর সাদেক মনে প্রাণে বিশ্বাস করতে থাকে যে, “সে আর বেশিদিন বাঁচবে না।”
কবি কবিতার ভিতর দিয়ে পাঠকের মনে বেঁচে থাকতে চেয়েছিলেন । কবির সে স্বপ্ন সত্যি হয়েছে। ত্রিপুরার কবিতার জগত থেকে তিনি কোনোদিনই মুছে যাবেন না । কবি সন্তোষ রায় তার “ জাফর সাদেকঃ অনন্ত অসুখী আঁধার” নিবন্ধে লিখছেন – “কবি জাফরের মধ্যে ছিল তিনভাগ দুঃখ ও একভাগ আনন্দ, ফলত তাঁর কবিতাসমূহে তিনভাগ মৃত্যুচেতনা । মৃত্যুচেতনা যতপ্রগাঢ় হয়েছে জীবন-দেখা হয়ে উঠেছে তত উজ্জ্বল । মরণে তাঁর কোনো দুঃখ ছিল না, ছিল আক্ষেপ । এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে কে যেতে চায় ! সেও জীবন প্রারম্ভে ! অবশেষে যেতেই হ’ল, যেন স্বেচ্ছায় বৃত্ত ভেঙে স্বাধীন আকাশে –
“নীড়ের পাখী উড়ে গেছে
নষ্ঠ নীড় ধুলোয় এখন
টেবিল উল্টে রাজার সামনে
বেড়িয়ে গেছে কে যে কখন।’
নিহত রাত্রির দরজা খুলে যেখানেই যাক্ না কেন, জাফর সাদেক কবিতা হয়েই আছে আমাদের ভিতর । সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও অতল জীবনবোধ সত্ত্বেও তাঁর সংশয় ‘কবিতার কাছে যেতে পেরেছি তো ?’ কবি জানেন না, মহাকাল জানে কবি কখন কবিতা হয়ে যান ।”
সত্যি, কবি জাফর সাদেকের ইচ্ছে সত্যি হয়েছে । তিনি তাঁর আকাঙ্ক্ষা মতো কবি হতে পেরেছেন । একক এক কবি, ত্রিপুরায় যার কোনো উত্তরসূরি নেই পূর্বসূরিও নেই । এবার আমরা তাঁর “জন্ম মহাকাল” কবিতাটা পড়বো । এই কবিতাটি কবি লিখেছিলেন– ১২-১১-১৯৯০ তারিখ ।
“তৃণমূলে নষ্ট কবিতা– গাছশিশু
ধরে আছে হাত ।
গভীরে রতিমুখ জন্ম মহাকাল
অনির্বাণ করতালি অহোরাত্র
উৎসবের দিকে যায় ।”
হঠাৎ কবি জাফর সাদেকের কেন মনে হল– ‘তৃণমূলে নষ্ট কবিতা’ ? এরপরই এই প্রসঙ্গ থেকে সরে গিয়ে কবি লিখলেন– ‘গাছশিশু ধরে আছে হাত ।’ ঘুরেফিরে আবার প্রকৃতির কাছে কবির আশ্রয় নেওয়া । কিন্তু সাধারণ আমরাই গাছকে ধরে থাকি এখানে কবি বিষয়টিকে পাল্টে দিয়ে বলছেন– গাছই যেন ধরে আছে কবির হাত । এবং সেই হাত ধরার অনুভূতি লিখছেন – ‘গভীরে রতিমুখ জন্ম মহাকাল।’
এখানে কবি ‘রতি’ শব্দটি কোন অর্থে ব্যবহার করেছেন ? আমরা সাধারণত জানি- অভিধানিক অর্থে ‘রতি’ মানে হচ্ছে – কাম-পত্নী, মৈথুন, রমণ, আসক্তি, অনুরাগ, প্রীতি, কোনো বিষয়ের প্রতি প্রবল আকর্ষণজনিত ব্যাকুলতা । কিন্তু কবি এখানে ‘রতি’-র সাথে ‘মুখ’ শব্দটি প্রয়োগ করে বিষয়টিকে একটা প্রতীকী দিকে নিয়ে গেলেন । এবং এরপরই বলছেন –‘জন্ম মহাকাল’। নাকি যে রতি-সুখের পর্যায়ক্রম শেষে আমাদের জন্ম হয়, এবং যার ভিতর দিয়ে মহাকালের ভিতরে প্রবেশ করি আমরা, তার কথা এখানে বলতে চাইছেন কবি ! কিন্তু এরপরের লাইনে গেলে কিছুটা দ্বিধা তৈরি হয়, যখন কবি লিখেন – ‘অনির্বাণ করতালি অহোরাত্র / উৎসবের দিকে যায় ।’ এখানে ‘করতালি অহোরাত্র’ শব্দের আগে ‘অনির্বাণ’ – যার মানে নির্বাণ বা মুক্তিলাভ হয়নি এমন, এই শব্দটি কোন উদ্দেশ্যে চয়ন করলেন কবি । তাহলে কীসের জন্য করতালি দেয়া হচ্ছে ? কোন উৎসবের দিকে ইঙ্গিত করতে চাইছেন কবি ? নাকি কবি এর ভিতর দিয়ে আগামি মৃ্ত্যুর কথা বলতে চাইছেন! ‘অনির্বাণ’ থেকে করতালির ভিতর দিয়ে নির্বাণের পথে যাবেন । আর তাঁর প্রস্তুতি হিসেবে অহোরাত্রি করতালির উৎসব চলছে ? আমরা কি এভাবে ব্যাখ্যা করতে পারি ? যে কবিতার ভিতর দিয়ে কবি মানুষের মনে বেঁচে থাকার কথা ভাবছেন, সেই তৃণমূল স্তরের কবিতাগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে । কিংবা কবি তাঁর মতো করে কবিতাগুলো লিখে যেতে পারছেন না ! হয়ত তাই । আর তখন কবির চোখের পড়ে--‘গাছশিশু ধরে আছে হাত ।’ যার গভীরে রতিমুখের ভিতর দিয়ে কবি মহাকালে এসে প্রবেশ করলেন । এই পৃথিবীরঅহোরাত্রই একটা উৎসব । প্রতিদিনের বেঁচে থাকাটাই একটা উৎসব । প্রতিটি আগামিদিনই একটা উৎসবের দিন । যার জীবন সীমিত, যে জানে তাঁর কাছে আর বেশি নেই, সেই কেবল বুঝবে– এক একটা মুহূর্ত বেঁচে থাকা কোনো উৎসব থেকে কম নয় । প্রতিটি মুহূর্তই আনন্দের । প্রতিটি মুহূর্তের ভিতরেই লুকিয়ে রয়েছে অমৃত । অপার এক আনন্দ । প্রতিটি জন্মই মহাকালের কাছে নিবেদিত । হয়ত তাই কবিতাটির নাম রেখেছেন কবি– ‘জন্ম মহাকাল ’ ।
কবি সন্তোষ রায় তার “জাফর সাদেকঃ অনন্ত অসুখী আঁধার” নিবন্ধে আরও লিখছেন– “জিজ্ঞাসা অনন্তই । জিজ্ঞাসায় জিজ্ঞাসায় জীবন ছোটে অনন্তে । জিজ্ঞাসা তারপর অনুভবে– ঘটে সত্য-মিথ্যার উন্মোচন । জীবনটা-ই যখন জিজ্ঞাসা তবে তার কি আর অন্ত হয় ? কবরের দিকে পা বাড়িয়ে জিজ্ঞাসা জাগে–
“আজ কে পারে সাত্ত্বিক হয়ে
জীবন জীবন রেখে ছুঁয়ে যেতে মন
কে পারে কামনাকে দাহ করে
আমাকে শ্রেষ্ঠ সূর্যোদয় দেখাতে ?”
কাকে ! কবির ব্যক্তিগত বলতে কিছুই নেই । অনুভবতা-ই কেবল, প্রকাশের শেষে হয়ে যায় সবার । জাফরের সুখ-অসুখ-প্রেম ঘৃণা-প্রতিবাদ বা কোনো জিজ্ঞাসাও নিজের হয়ে থাকেনি, যেন সবারই নিজের । তাই তাকে বিনির্মাণ করা সহজ নয় । লৌকিক-অলৌকক অধরা অবয়ব ।”
“যে স্তব্ধীভূত শব্দেরা এতোদিন সমবেত ছিল আমার
দুঃখের শিয়রে
আজ তারা দূর সন্ধ্যার সমুদ্র কোলে
সাহসী নক্ষরের মতো স্বাধীন ।
অন্ধিকা, আমার বিবর্দ্ধিত জগতের ভেতর
তুমি এতো সুস্পষ্ট হয়ে উঠলে কেন ?” ( দাঁড়াও সমাধি নিদ্রা )
কবি জাফর সাদেকের সামগ্রিক কবিতা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে সেলিম মুস্তাফা “আমি আর দেবদূত বৃষ্টি ভিজে বাড়ী যাই” গদ্যে লিখছেন– “কবিতা কখনো-কখনো আমাদের ভাসিয়ে নিয়ে যায় এমন কোনো জগতে যেখানে শুধু বিবশ হয়ে, প্রশ্নহীন হয়ে, মূক হয়ে বসে থাকা ছাড়া উপায় থাকে না । জাফর তাঁর সীমিত জীবনে কী আর পাঠ নিতে পেরেছেন, যা তাঁকে সাহায্যকরতে পারে কবিতার সুদক্ষ কারিগর হিসেবে গড়ে উঠতে ? কিছুই না । তবু তাঁর অতিজাগ্রত আত্মার যে নিঃসরণ ঘটে, তা ‘ভিশন’ ( Vision)- এর চূড়ান্ত মাত্রা নিয়ে অজান্তেই সার্থকভাবে ঘুরে আসে সেইসব জগৎ যাকে সাহিত্যবিশেষজ্ঞরা বলেন অধিবাস্তবতা, পরাবাস্তবতা, ইম্প্রেশনিজম্ ইত্যাদি ইত্যাদি, এমনকি অ্যান্টিপোয়েট্রিও ! জাফরকে আরও গভীর পাঠ ছাড়া গত্যন্তর নেই ।”
দুঃখের শিয়র থেকে জেগে উঠেছে কবিতা । ‘স্তব্ধীভূত শব্দেরা’ বলতে কবি কী বোঝাতে চাইলেন ? আসলে কবি তাঁর কবিতার কথাই বলছেন । কবির বাল্যবন্ধু ইনতাজ হোসেনের মতে, ‘জাফর কবিতা লিখতো । আলের ধারে আমাদের বসিয়ে কবিতা শোনাত । কিন্তু কেন জানি কাউকে বলতে দিত না । আমরা মুগ্ধ হতাম । তাঁকে কবি বলেই জানতাম । লিখিত আকারে সে তাঁর মায়ের মৃত্যুর পরেই সামনে আনে ।’
সেই অর্থে ‘স্তব্ধীভূত শব্দেরা’ যে মূলত কবিতার অর্থেই ব্যবহার করেছেন কবি বোঝাই যায় । তাই তো তিনি এরপরই বলছেন– “আজ তারা দূর সন্ধ্যার সমুদ্র কোলে / সাহসী নক্ষরের মতো স্বাধীন ।” কবিতাটির নামও রেখেছেন কি ব্যঞ্জনাময়– “দাঁড়াও সমাধি নিদ্রা” । ‘সমাধি নিদ্রা’ মানে তো মৃত্যু । তবে কী কবি মৃত্যুকে ‘দাঁড়াও’ বললেন ? হয়ত বা । ‘অন্ধিকা’– রাত্রি অর্থেই ব্যবহার করেছেন কবি । খুবই চমৎকার ব্যবহার । বুকের ভিতরের হাহাকার বোঝাতেই এখানে বলছেন– ‘তুমি এতো সুস্পষ্ট হয়ে উঠলে কেন ?’
“এতোদিন সময়কে যে দেখেছিলাম করুণ বর্শা হাতে
দেখেছিলাম পুরনো উইঢিবি,
বৃষ্টিস্নাত ভোরের স্নিগ্ধ গোলাপ
পাশে তার ব্যথাতুর কম্পন ।
আজ তারা হারিয়ে যাচ্ছে আমার বিবর্ণ পাণ্ডুলিপিগুলোর মধ্যে,
স্থির চার্বাক যেনো ভগবানকে অস্বীকার করে
হাত বাড়িয়ে বলছেঃ
আয় দুঃখ কাছে আয় তোকে হিম করে দিই
আমার বহুজন্মের বাসনার আকাশে
তোকে দার্শনিকের সফলতায় ফুটিয়ে তুলি ।” ( দাঁড়াও সমাধি নিদ্রা )
কবিতার এই উচ্চারণকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায় ? “বৃষ্টিস্নাত ভোরের স্নিগ্ধ গোলাপ / পাশে তার ব্যথাতুর কম্পন ।” –অতীব সুন্দর একটি চিত্রকল্পের পর কবি যেন হালকা করে বলে দিলেন– ‘পাশে তার ব্যথাতুর কম্পন ।’ কী বিশালতা নিয়ে পাঠকের সামনে দেখা দিল এই ‘কম্পন’ শব্দটা ! যেন মায়ের মুখের আদল নিল গোলাপ । কিন্তু এই ‘ব্যথাতুর কম্পন’ কেন লিখলেন কবি ? কবি যেন বলছেন– এই স্নিগ্ধতার পাশাপাশি একটি ব্যথাও পড়ে রয়েছে । শুধু ‘কম্পন’ লিখলে একদিকে যেত ভাবনা । কিন্তু এই ‘ব্যথাতুর’ শব্দটাই কেমন যেন সব প্রথাগত ভাবনার মূলে জল ঢেলে দিল । এভাবেই পলকে চমকে দেন জাফর সাদেক । যেমন– ‘আয় দুঃখ কাছে আয় তোকে হিম করে দিই’ । ছোট্ট একটা শব্দ ‘হিম’ কিন্তু পুরো চিত্রটাই পাল্টে দিল । কবি যেন তাঁর যাবতীয় দুঃখকে মুহূর্তে তুচ্ছ করে দিতে চাইছেন । কিন্তু পরক্ষণেই কবি লিখছেন–
“না, আমি কোন সুখের জন্যে এ কড়চা
লিখছি না,
বুকের সন্নিহিতে যে মুহূর্তগুলো ফেটে আছে
শূন্যময়
ওদের সমাদরে ডেকে এনে শুধু একবার
বলতে চাই, বসো । আমার আহতশয্যার
পাশে বসো । নির্ভয়ে বসো ।
হয়তো ওরা বসবে না কোনদিন
এমনিতেই দাঁড়িয়ে থাকবে কাল, কাল–
নদীর ওপারে, রহস্যলোক আকাশের মতো ।” ( দাঁড়াও সমাধি নিদ্রা )
এই কবিতায় কবি কি নিজের সাথেই কথা বলে যাচ্ছেন একাধারে ? কবির বুকের ভিতরে শূন্যতা ছিল । শূন্যতার ভিতর ছিল বেদনা । সে বেদনা নিশ্চয়ই জীবন নিয়ে ছিল । ‘মুহূর্তগুলো ফেটে আছে’ – ‘ফেটে’ শব্দ দিয়ে কবি পাঠককে কোথায় নিয়ে যেতে চাইছেন ? আবার কবি এখানে শূন্যতাকে বলছেন – ‘ওদের সমাদরে ডেকে এনে শুধু একবার / বলতে চাই, বসো । / আহতশয্যার পাশে বসো । নির্ভয়ে বসো ।’ কবি কি তবে – সমাধি নিদ্রার জন্য নিজেকে মনে মনে প্রস্তুত করছিলেন ? এই গোটা কবিতার ভিতরে কবির গুঞ্জরিত বেদনার হাহাকার ফুটে উঠছে ।
“শ্মশানরাজা আজ যদি যায় ফুলচুরিতে
বাগান অমনি উধাও হবে ।
ভাঙা সাঁকো হেঁটে যাবে বাড়ীর ভেতর
একদা সেও ভালোবাসতো ঘুড়ি উড়াতে ।
নীড়ের পাখী উড়ে গ্যাছে ,
নষ্ট নীড় ধুলোয় এখন” ( যাক না সেও)
কি সব অপূর্ব কল্পনা ! ‘ভাঙা সাঁকো হেঁটে যাবে বাড়ীর ভেতর’ পরাবাস্তবতার এমন চিত্রকল্প কি এর আগে আমরা দেখেছি ত্রিপুরার কবিতায় ? নীড় ভাঙা পাখির হাহাকার এখন কবির কণ্ঠে । জাফর সাদেকের কবিভাষার একটা বড় অংশ জুড়ে আছে তাঁর সঙ্গীতধর্মিতা । কবিতায় তাঁর সঙ্গীত অর্থ-ধ্বনি-ব্যঞ্জনা-ছন্দ সবকিছু বহন করে গঠন হয়েছে এক স্বতন্ত্র কাব্য-প্রকরণ । জাফরের সঙ্গীতধর্ম ছন্দের ধ্বনিস্পন্দনজনিত তরঙ্গভঙ্গে নয়, কথায়, শব্দে, অর্থে ও ব্যঞ্জনায় । জাফর সাদেক তথাকথিত ছন্দের খুব বেশি বাহাদুরি দেখাতে না-পারলেও তাঁর কবিতায় একটা সুর সুন্দরভাবে প্রবাহিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন ।
দু-এক জায়গায় অবশ্য জীবনানন্দের প্রভাব বা সুর পরিলক্ষিত হয়েছে । যেমনঃ ১। হাঁসের পালকের মতো ঝরে যায় পংক্তিমালা (সময়ে একঘ্নী ঘাতক) ২। ঘাসের ভিতর মৃত জোনাকির / জীবনের মতো নির্জনতা (অন্ধকারের সামনে) কিন্তু জাফর সাদেকের স্বতন্ত্রতা ধরা পড়ে অন্যখানে, যেখানে তিনি বলেনঃ ১। ঘুম সান্ত্বনা নয়/ মৃত্যুর বুক চেটে খাওয়া বিষাক্ত শিশু ( ঘুম ও অঘুম) ২। মাংসল স্বাদের গন্ধে ফুটে আছে / শারীরিক ফুল (কাফন কীর্তন) ৩। সাতরঙে নন্দিত ভোরের জঙ্ঘায় / রৌদ্র যোনি গড়িয়ে নামে শৈলবালা রূপে ৪। শুধু কথামালায় নিজেকে সাজিয়ে / রতি ও রমণে / কোন গৌরব নেই (সমাহিত) ৫। দুপুর কোথাও না কোথাও থেকে যায় / থেকে যায় প্রেমিকার জবুথবু পা / কিংশুক শয্যার পাশে । ৬। নিশীথ শীৎকারের পবিত্র পুষ্পাঞ্জলি তাহার ওষ্ঠে বাজিয়া উঠিতে পারে। (শ্মশান রাত্রির উৎসব)
এভাবেই একের পর এক সুরের অদ্ভুত ধ্বনিময়তায় কবিতাভাবনাকে সুদূরপ্রসারী করে তুলেছেন জাফর সাদেক । অর্থ ও ব্যঞ্জনার কি অপূর্ব সমন্বয় । জাফরের শব্দ-ব্যবহারের সময় সাধু, তৎসম, চলিতের পাশাপাশি আঞ্চলিক শব্দগুলোও অনায়াসে স্থান করে নিয়েছে স্ব-মহিমায় । ইংরেজি শব্দও তিনি ব্যবহার করেছেন, যেমন – ফরমুলা, স্কুপ, এজেন্ট, কলিংবেল, ইস্পাত, মার্ডার, ব্লাডার, ফ্ল্যাগমার্চ ইত্যাদি । কখনও কখনও লোকায়ত শব্দকেও টেনে এনেছেন সাহসিকতার সাথে । মাত্র পঞ্চাশটি কবিতার মধ্যে এত শব্দ-বৈচিত্র্য কবির অনুভবের চূড়ান্ত বিকাশেরই পরিচায়ক । শব্দপ্রযুক্তি, শব্দ-যোজনা, শব্দের মাত্রাজ্ঞানযা জাফরকে অনন্য করে তুলেছে ত্রিপুরার কবিতা জগতে । কবির বয়স আর কবির শব্দের অভিজ্ঞতা সহজ ধারণায় কিছুতেই মেলাতে পারি না । এখানেই অবাক হই । জাফর সাদেক-কে এজন্যই একজন মৌলিক কবি বলে আমি দাবি করি । আসুন, তাঁর বাকি কবিতাগুলোও পড়া যাক –
“স্বাভাবিক চলাফেরা খাওয়া দাওয়া
গল্প করা
নিজের কবরের জন্য একফালি জমি রাখা ব্যস–” ( দৈব )
ওমা ! কবি একী বললেন ? এমনভাবে “ব্যস-” লিখে যেভাবে ড্যাস দিয়ে পংক্তিটিকে ছেড়ে দিলেন, তাতে কিছুটা চমকেই উঠলাম । কবিতাটির তারিখ কবি লিখে যাননি । কিন্তু আমরা একটু আগেই কবির বন্ধুর মুখে যে-কথা শোনলাম, এই কবিতা যেন তারই বহিঃপ্রকাশ । নিজের কবর নিয়েই মানে মৃত্যু নিয়েই ভাবছিলেন কবি । লক্ষণীয় যে বিষয়টা, এখানে কবি মৃত্যুকে কবি অত্যন্ত সহজভাবে নিচ্ছেন । এবং এর প্রস্তুতি কীভাবে নিচ্ছেন তারও যেন একটা আভাস দিলেন এই কবিতায়–
“এখন দরকার বিশ্রাম, নিস্তব্ধতা,
বাসর ভাঙা রাত্রির অভিসার ” (দৈব )
কিন্তু এখানে ‘বিশ্রাম’ শব্দের পর ‘নিস্তব্ধতা’ শব্দটা আনতে গেলেন কেন ? “ব্যস-” শব্দের মধ্যে যে স্পিড বা গতি, যে দৃঢ়তা পেয়েছিলাম, ‘নিস্তব্ধতা’ শব্দে যেন একটু ধাক্কা খেলাম । এর ভিতর কোথায় যেন লুকিয়ে রয়েছে অসহায় এক নীরবতা । নিস্পন্দ একটা হাহাকার যেন টের পাওয়া গেল । আবার পরের লাইনে বলছেন– “বাসরভাঙা রাত্রির অভিসার” কি চমৎকার দুটো লাইনে কনট্রাস্ট । অভিসার হচ্ছে–অনুসরণ বা প্রেমিক প্রেমিকার সঙ্কেতস্থানে গোপনে মিলনের স্থানে গমন করা । কিন্তু এর আগে কবি ‘বাসরভাঙা রাত্রি’-র বেদনাটা যোগ করতে গেলেন কেন ? ‘দৈব’ কবিতার শুরুটাই করেছেন কবি কী অভিনবভাবে । প্রতিটি লাইনে, প্রতিটি শব্দের ভিতরে রেখে চলেছেন গোপন বার্তা । এক কাব্যিক তাৎপর্য ।
“যৌন বিছানায় ইঁদুর-সঙ্গমে মশারি
উঁচিয়ে চিন্তারা দেখে কাল কতটুকু গেলে
মরণের গলিপথে হাত রেখে কেউ নষ্ট
করে নির্মাণ
... ... ... ... ...
যেন সাতরঙ্গে নন্দিত লোকটা জানে
অপেক্ষমান জীবনের নির্বাসন ও
তার পরবর্তী শিল্পায়ন । (দৈব )
‘বাসরভাঙা রাত্রির অভিসার’– লাইনের পর এরকম একটা ক্রমদৃশ্যায়ন আমাকে খুব ভাবিয়েছে। ‘যৌন বিছানা’ ‘ইঁদুর-সঙ্গম’ এইরকম শব্দচিত্রও বেশ বিরল তাঁর কবিতায় । ‘অপেক্ষমান জীবনের নির্বাসন’ এবং এরপরই বলছেন– ‘তার পরবর্তী শিল্পায়ন’ ! তবে কি মৃত্যু-পরবর্তী জীবনকে কি কবি শিল্পের সাথে তুলনা করতে চাইছেন ? নাহলে- ‘অপেক্ষমান’ শব্দটা ব্যবহার করতে চাইবেন কেন ? এখানে- ‘নির্বাসন’ বলতে কি জীবন থেকে নির্বাসন বোঝাতে চাইছেন ! পাঠক হিসেবে যখন আমি এমনসব চিত্রকল্প নিয়ে ভাবছিলাম, তখনই দেখি কবি সটান এর পরের লাইন বলছেন– “সেকেলে গল্প বলে লাভ নেই ।” তাহলে কবি কি বলতে চাইছেন ?
“কবর-শর্বরীর গাঢ় কণ্ঠস্বর শুনতে
শুনতে একসময় ঈশ্বরের পায়ে
সমাহিত হয়ে যায় ।” ( দৈব )
‘কবর-শর্বরী’– কী চমৎকারভাবে শব্দবন্ধ তৈরি করেছেন কবি । কবি তো খুব সহজেই ‘কবরের অন্ধকার’ও বলতে পারতেন ! কিন্তু কবি তাঁর মৃত্যু-চেতনাকে আবার ফিরিয়ে এনে লিখলেন– “কবর-শর্বরীর গাঢ় কণ্ঠস্বর” । এবং আরও আশ্চর্যজনকভাবে কবি ঈশ্বর এবং সমাহিত শব্দের প্রয়োগ করে লিখলেন– “শুনতে শুনতে একসময় ঈশ্বরের পায়ে / সমাহিত হয়ে যায় ।” কবিতার নাম দিলেন– ‘দৈব’ । তবে কি কবি করবের অন্ধকারের কণ্ঠস্বর শুনতে পেতেন ? কবর থেকে ঈশ্বর অবধি জার্নি অনায়াসে অতিক্রম করলেন কবি । এই নিস্তব্ধতার ভিতরেই কবি তবে বিশ্রাম নেয়ার কথা ভাবছিলেন ।
‘নিহত রাত্রির দরজা’ যেন মৃত্যুর ভিতর দিয়ে অদ্ভুতভাবে জীবনকে ফিরে ফিরে দেখা । জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে, আনন্দকে স্পর্শ করা । অবশেষে পাঠককে কবি নিয়ে যেতে চান তাঁর বাড়ি । বাড়ির উঠোন, তাঁর সেই মায়া মায়া ঘরে ।
জীবনানন্দ দাশের মধ্যে আমরা জীবনাকাঙ্খার সাথে মৃত্যু সম্বন্ধে সতর্ক ও সচেতনবোধ জাগ্রত থাকতে দেখেছি । ‘কবে যে আসিবে মৃত্যু বাসমতী চালে ভেজা শাদা হাতখানি / রাখে বুকে, হে কিশোরী, গোরোচনা রূপে আমি করিব যে স্নান ।’ কবি জানেন জীবন সত্য নির্দিষ্ট গতির দ্বারা আবর্তিত । প্রাণের মৃত্যুর সাথে নতুন প্রজন্ম আসে । এক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যে বিখ্যাত লাইন দুটো মনে পড়ে– “যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে / আমি বাইব না মোর খেয়াতরী এই ঘাটে ।’ আবার জাফর সাদেক ত্রিপুরায় বসে লিখলেন– ১। ‘ আমি আর দেবদূত / বৃষ্টি ভিজে বাড়ী যাই’ ২। ‘ ঘাসের ভেতর মৃত জোনাকির / জীবনের মতো নির্জনতা ও নির্বিকার দেহে জন্মায় ঘাস ও ভূমিজ লতা । ৩ । ‘আমাকে ডাকে শ্মশান ঘুম / মৃত্যু এবং মায়াবিনী ।’ ৪। ‘ঈর্ষাছিন্ন রাত্রির আলিঙ্গনে মৃত্যুর অম্লগন্ধে মহিমময় জীবন ।’ এমন বহু উদাহরণই দেওয়া যায় ।
জাফর সাদেক বাংলা কবিতায় এ-দিক দিয়ে এক স্বতন্ত্রমাত্রা যোগ করে গেছেন । যারা জীবন নিয়ে জাগ্রত বেশি তারাই মৃত্যু-সচেতন বা উল্টোভাবেও বলা যায়– যারা মৃত্যুসচেতন তারাই জীবনসচেতন । সমগ্র কাব্যগ্রন্থে জাফর সাদেক মৃত্যুকে দেখেছেন নানাভাবে । কখনও ফুলের মতো, কখনও পাখির মতো, কখনও নির্জনতায়, কখনও কোলাহলে, কখনও মৃত্যুকে নিয়ে হাসেন, কখনও কাঁদেন, মৃত্যুভাবনাকে নিয়ে খেলার পুতুলের মতো খেলেছেন জাফর সাদেক । হাসতে হাসতে বলে ফেলেন জীবনের অমোঘ সত্য– “ভালবাসার ঝনন-রণন শব্দে রক্তে নদী জাগে / স্রোতে তুমি / দুই তীরে তরমুজ খেত / ঝলসানো শ্মশানের পোড়া কাঠ / বিস্তীর্ণ নির্জনতায় । তরুতলে দুগ্ধবতী গাভী / ওলানে দুধের মমতা” (ভালবাসার ঝনন-রণন)। শুধু এই কবিতায় দেখা যায় কবির জাগতিক প্রেমের প্রতি একটা মোহবোধ । যদিও সরাসরি কথা বলতে পারেননি শেষ পর্যন্ত । অনেকটা হতাশ হয়েই কবিকে বলতে হয়েছে – “ছাই তুমি ! চুপচাপ ক্ষত করে বুক / দপ্ করে জ্বলো নিবো / চিরদিন জাগরুক প্রেমেন্দ্র বিলাপ ।” (ভালবাসার ঝনন-রণন )। ‘ছাই তুমি !’ কবির অভিমানের বাঁধ ভেঙে যায় । প্রেমের ক্ষতটাই এমন– ‘ চুপচাপ ক্ষত করে বুক’ । যেন একবার জ্বলে একবার নিবে । কবি চিরদিন এই প্রেমেন্দ্র বিলাপকে বহন করেছিলেন। তাঁর ‘কবিতার হারানো শ্লোক’ –এ ১নং কবিতায়ও তার একটা ছোঁয়া পাওয়া যায়– ‘খেলতে এসে হারিয়ে গ্যাছে । নোলক নাকছাবি / তখন তুমি কেঁদেছিলে, কেঁদেছিলেন কবি।’– তাহলে কবির কোনো বাল্যপ্রেম ছিল ? জানি না আমরা । কিন্তু কবিতায় বলছেন– “তুমি এখন শিশুর মা / শিশুকে নাও কোলে।” । হতে পারে কবি তাঁর মনের কথা কোনোদিনই বলে উঠতে পারেননি, তাঁর অসুখের কথা মাথায় রেখে । কবির এই অক্ষমতা, বলতে না-পারা আমাদেরকেও বেদনায় জড়িয়ে নেয় কিন্তু ঠিক এরপরই কবি চলে যান জীবনের ভেতর এক ভয়ঙ্কর বাস্তবতায়– ‘আমি দেখি বাষ্পজমা বৃত্ত / বনপোড়া সাপের মতো বর্ষানদী / দাঁড়ানো বিশঙ্ক কাল, দূরের বাতিদান / নদীর ওপারে বসন্ত, শূন্য গোঠের মেলা ’ (জীবন বাজছে দ্রুত)। ‘বনপোড়া সাপের মতো বর্ষানদী’-- বর্ষানদীর ভয়ঙ্করতা নিয়ে অনেক উপমা, তুলনা পেয়েছি, কিন্তু ‘বনপোড়া সাপের মতো’– কখনও কোথাও পাইনি । বনপোড়া সাপের চিত্রকল্প যে বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই আনুন না কেন– কবির তীক্ষ্ন পর্যবেক্ষণের কৃতিত্বকে স্বীকার করে নিতেই হয় । কবি নদীর ওপারে যেমন বসন্ত দেখতে পান, তেমনি দেখতে পান শূন্যতা । কবি যে পারে দাঁড়িয়ে সেই পারে কি দেখছেন ? মৃত্যুচেতনা ! কবি এখানে অনুভব করলেন– ‘দেখি মানুষের বুক থেকে ধ্বসে পড়া পাথর / শান্ত জীবনের কাছে ক্ষমার দূরন্ত রুদ্র দৌড়’– এখানে কবি শান্ত জীবনের প্রত্যাশী ।কিন্তু ধ্বসটা কীসের প্রতীক ? পাথর-টা কি জীবন-জটিলতার আর একটি রূপ ? কবি শান্তি কি তবে মৃত্যুর মধ্যে খুঁজতে চাইছেন ? না, আমার মনে হয়েছে,কবি জীবনের প্রকাশের মধ্যেই খুঁজে পেতে চেয়েছিলেন নিজেকে । কেননা এর পরবর্তী ‘ক্ষত’ কবিতায় কবি লিখছেন– “গমনের ভেতর গীত কোলাহল কিংবা / ভালোবাসার শানপাথরে যাবতীয় / কলাকৌশল, স্থির অস্থির চিত্রকল্প / এই তো থাকে আশা করার’ । কিংবা একই কবিতায় কবি যখন বলেন– ‘যদি আজ গান গাই সূর্যসুখে’– ‘সূর্যসুখে’ অপূর্ব শব্দ সংযোগ । জাফর এই সুখের-ই সন্ধান করেছিলেন । তাঁর মৃত্যু-চেতনার মাঝেও দেখি– সুখের যে সন্ধান, সাঁকোর ওপারে যে জন্ম, সেখানে যে সুখ, জীবনের উল্লাস, পুনর্জন্মের আহ্বান ।
জীবনের অসম্পূর্ণতা বারবার জাফর সাদেক-কে যন্ত্রণা দিয়েছে । বারবার এক আধ্যাত্মিক চেতনার দিকে, একটা পূর্ণতার দিকে যাওয়ার প্রবণতা ঘিরে ছিল তাঁর মননের সামগ্রিকতা– ‘আমি আর বৃষ্টি নই / বা বৃষ্টিভেজা ভ্রূণ / দরবেশও নই / কি করে হবো স্বয়ংসিদ্ধ জীব’... ‘আমি আর দেবদূত / বৃষ্টি ভিজে বাড়ী যাই’ (আমি আর দেবদূত) । এখানে কবির প্রেমিকের মত দেবদূত । বৃষ্টিভেজা পথে, বৃষ্টির ভেতর দিয়ে, সৃষ্টির মধ্য দিয়ে, সৃষ্টির ভেতর দিয়ে কোথায় তাদের যাত্রা – ‘ বাড়ি ফাঁকা আগাছা লতায় / ঢাকা থাকে দুয়ার।’ নির্জনতার দিকেই যাচ্ছেন কবি ও দেবদূত । একইভাবে কবি এ-কোন্ শীতলতার ছবি এঁকেছেন– “তারপর ঘাসের ভেতর মৃত জোনাকির / জীবনের মতো নির্জনতার / তারপর মাঠের সামনের হিজল গাছের / সমস্ত আকাশটাকে / ইথার তরঙ্গের মতো কাঁপিয়ে দিয়ে / চৈতন্য ডালপালা দাঁড়িয়ে থাকে অন্ধকারের সামনে ।’ (অন্ধকারের সামনে )
এত নির্জনতার মাঝে– মৃত্যুচেতনার এক সুরেলা বোধ । মৃত জোনাকির, নির্জনতা, হিজল গাছ, চৈতন্য, অন্ধকার– সবকিছুর মাঝে– দাঁড়ানো কবি । যেন স্থির পায়ে হেঁটে উঠে আসছেন, দাঁড়ানো অন্ধকারের সামনে, স্থির গলায় যেন বলে উঠছেন– চলুন, আরও সামনে যাওয়া যাক । ভাঙা যাক্ জীবনকে নির্বাপিত করার ষড়যন্ত্র–‘মাতাল শাসকের মতন আমাদের জন্ম নিধুবনে শ্মশান ঢুকিয়া যাইবে’ । ‘কারণ মাটির দিকে আমাদের বিরুদ্ধটান বংশবদ হইয়া দাঁড়াইয়া থাকিবে তাহা ঠিক নহে এবং তাহারাও চোখে আঙুল দিয়া দেখাইয়া দিবেঃ জীবনের প্রথম শর্ত ছিল আমরা পাল্টাইয়া যাইব !’– জীবনের প্রথম শর্ত ছিল আমরা পাল্টাইয়া যাইব !– কবি কি জন্ম-মুহূর্তের কথা বলছেন ? জন্মের পরই আমরা উল্টাইয়া যাই । বৈজ্ঞানিক এ শর্ত কোনোদিন জীবনের মুখোমুখি এসে দাঁড়াবে ভাবতে পারিনি । তাহলে কি জীবন কিছু শর্তের সমষ্টি ? মনে হয় না । আমার মনে হয়েছে কবি বলতে চেয়েছেন– জীবন আসলে কিছুসংখ্যক পরিবর্তনের সমষ্টি । জন্ম নিধুবনে শ্মশান চলে আসে, তাকে এড়িয়েই জীবনকে খুঁজতে হবে । ব্যর্থ করে দিতে হবে– সকল প্রকাশ, জীবনবোধের নাশকতামূলক ষড়যন্ত্রকে । জন্মান্তর নিয়ে কবির চিন্তাভাবনা দেখা যায় ‘সমাহিত’ কবিতায়– ‘যে জন্মান্তর আমাদের মাঝে প্রতিদিন দ্বন্দ্ব করে / অধিকারের শরবতে বিষ ঢেলে দেয় / ওকে ডেকে এনে ভোজ করাও / রসনা তৃপ্ত করো / উচ্চারিত প্রশংসার মুখোশ খুলে / রমিত হবার আগে / নিজস্ব সংলাপে ওকে সমাহিত করো ।’ কবি জন্মান্তর দিয়ে শুরু করে কোথায় চলে গেলেন । ধমকের সুরে বলে ফেললেন– ‘শুধু কথামালায় নিজেকে / সাজিয়ে রতি ও রমণে কোন গৌরব নেই ।’
এর পূর্ববর্তী ‘মনে পড়ে’ কবিতায় দীপ্ত কণ্ঠে বলেছিলেন– ‘তুমি পারো রতি বাণে নির্মাণ / ভেঙে দিতে ।’ এখানে আমরা কবির যুবকোচিত অভিমান স্পর্ধা লক্ষ্য করি। ‘ নিহত রাত্রির দরজা’ কাব্যে এরকম দৃপ্ত উচ্চারণে তাঁকে খুব বেশি দেখা যায়নি। বুকের উত্তেজনাকে পুরো কাব্যে কবি অতিসংযমের সাথেই নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন । এই সংযমই তাঁর কবিতাকে দিয়েছে অনন্য এক মাত্রা । কবি জাফর সাদেকের কবিতায় পরিণতবোধ, জীবনকে এত অল্প কয়েকটি শব্দে ধরা, শব্দকে তার আত্মায় চূড়ান্ত অধিকার দেওয়ার মাত্রাবোধ লক্ষ করা যায় । শব্দের সঠিক ও চূড়ান্ত অবস্থান নির্ণয় তাঁর অনন্য আরেকটি বৈশিষ্ট্য । জাফর আবার তাঁর জন্ম-মৃত্যুর দ্বন্দ্বটাকে টেনে আনেন তাঁর ‘পরিকল্পিত হাত’ কবিতায়– “খুব যখন নুয়ে পড়ি নিজের ভেতর / জন্মদিনের পাশাপাশি মৃত্যুদিন দেহরক্ষীর / মতো চোখ ঠেরে চায়, পাহারা দেয় । একটা সিগারেট জ্বালায় ।’ নিজের ভেতর নুয়ে গিয়ে এ-কেমন দেখা কবির ? জন্মদিনেই বুঝি মৃত্যুচেতনা জেগে ওঠে । এবং আশ্চর্য, বাস্তবে কবির মৃত্যুও ঘটে জন্মদিনের চারদিন পূর্বে । কেমন যেন মিলে মিশে যায় কবির জন্ম-মৃত্যু বোধ । কবি নির্ভয় । সিগারেট জ্বালানোর মতই শঙ্কাহীন । তাই তো কবিকে কবিতায় উচ্চারণ করতে দেখি– “এক একটা জন্ম মানেই এক একটা মৃত্যুর দাসখত / দ্রুত ব্যঞ্জনায় দ্রুত ফুরোনোর বাঁশি / উৎসবের বাতি নিবিয়ে আলিঙ্গন থেকে / বেরিয়ে পড়া ।’ কিংবা ‘হে প্রেম নদীপারে গাছতলায় তুমি কি করছো ।’ আমরা ইতিপূর্বে দেখেছি ‘কাফন কীর্তন’, ‘দ্বিখন্ডিত আত্মধ্বনি’-তেও মৃত্যুবোধ প্রখর, কবি আবার নিমগ্ন মৃত্যুর রহস্য সন্ধানে– ‘সাঁকোর ওপারে একা একা হেঁটে গেছে/ কতো পরলোক / একটি ধ্বনিও পাইনি আমি / শুধু একটি উদ্বাহুকে দেবোই ধীরে ধীরে কবরের / ভেতর মমি হয়ে যায় ।/ একটি পাখিকে দেখেছি আমার দ্বি-খন্ডিত / আত্মার ভেতর বীজধান কাটে ।’
দ্বিখন্ডিত আত্মার ভেতর বীজধান– মানবাত্মার অপূর্ব এক ব্যঞ্জনা এখানে দেখতে পাই । মৃত্যুবোধের ভেতর জন্মের সম্ভাবনা । জীবনেরই এক প্রতীক । যেন কবি বলছেন– মৃত্যু কোনো-না-কোনোভাবে জীবনেরই রূপান্তর । পুনরায় জন্মেরই এক অপূর্ব খেলা । আমিত্বের খেলা । ভালোবাসা, নিহত রাত্রির দরজা জানালা খুলে ঢুকে যাওয়া– ভোরের জঙ্ঘায়, দিনের আলোয়, জীবনের ভেতর। মৃত্যুকে তুলনা মায়াবিনীর সাথে– ‘আমাকে ডাকে শ্মশান ঘুম / মৃত্যু একমায়াবিনী / আমাকে ডাকে পথের ডানা / সম্মোহিত নষ্টবাড়ী ।’– জাফর সাদেকের কাছে মৃত্যু জীবনের মতই এক জীবন । মৃত্যু তাঁর কাছে একাধারে রহস্য ও বেদনার বিশিষ্ট উপকরণ । আবার জাফর টের পান মৃত্যু জীবনের চেয়ে বৃহত্তর কিছু নয় । মৃত্যু জীবনেরই একপ্রকার উৎসব, বড় ধীর তাঁর লয়, বড় করুণ তাঁর সুর । যেমন কবি লিখছেন– “এখন আমরা শ্মশান উৎসবে মিলিত হইব / মানুষ ও প্রকৃতির নিস্তব্ধতার ভিতর রাত্রির নূপুর / বাজাইতে বাজাইতে শবশকট নদীতীরে আনয়ন করিব / মৃত্যুকে স্পর্শ করিলে মানুষের বীতকাম হয়চারিধারের জন্মান্তর ঘটিয়া যায় ।”
কবি কৃত্তিবাস চক্রবর্তী তাঁর “নিহত রাত্রির দরজাঃ বন্ধু জাফর সাদেক” নিবন্ধে ঠিকই বলেছেন– “জাফরের কবিতায় আমরা আবিষ্কার করছি ভারতীয় দর্শন ও সনাতন ঐতিহ্যের সারোৎসার, কেউবা আবিষ্কার করছি ভারতবর্ষীয় রাজনীতিকদের তথাকথিত সাম্প্রদায়িক জিগীরের বিরুদ্ধে বিদ্রূপে ফেটে পড়া জাফরকে, কেউ বিশ্লেষণ করে দেখাচ্ছেন তাঁর কবিতার মানবিক গুণ এবং ব্যাপকতা, কেউ খুঁজে পাচ্ছি জাফরের কবিতার ‘লিপির তলপেটে শ্রমিক মিছিল’ কিংবা তাঁর ইতিহাস চেতনা, তাঁর শব্দসৃষ্টি । নতুন শব্দের যোজনা, বিশেষ করে তৎসম এবং ফার্সি শব্দের চমৎকার প্রয়োগ নৈপুণ্য, ছন্দ, তীব্র শ্লেষ ও গুড হিউমার, জীবন ও মৃত্যুর মাঝখানে দোদুল্যমান আমাদের নৈতিকতা ও মূল্যবোধ, দারুণ সব চিত্রকল্প, স্বীকারোক্তি- সব মিলিয়ে এ এক সংঘবদ্ধ কণ্ঠস্বর– যা আপাদশীর্ষ প্রমাণ করেছে জাফরকে, কবি জাফর সাদেককে বিস্তৃত পাঠকের সামনে ।”
এবার আমরা দেখবো “নিহত রাত্রির দরজা”-র “মানুষ ও তার জীবনের গান” এই কবিতাটি, যেখানে কবি লিখছেন -
“ঈর্ষাছিন্ন রাত্রির আলিঙ্গনে মৃত্যুর অম্লগন্ধে
মহিমময় জীবন
যেখানে আলোক ও অন্ধকার মুখোমুখি হয়
এই খোলা আকাশ অশনি মিলন
আলেখা পৃষ্ঠার উপর কলমের অভ্যাস ঘোষণায়
অনার্য হাসি ঢেলে দেয় উগ্রবিষ
ইহজন্মের নরলোকে” (মানুষ ও তার জীবনের গান )
মৃত্যুর একটা গন্ধও পেয়ে গেছেন কবি । কবির মতে সে স্বাদে ‘অম্ল’ । কিন্তু আমি ভাবছি কবি কবিতার শুরুটা-“ঈর্ষাছিন্ন রাত্রির আলিঙ্গন”– এখানে ‘ঈর্ষাছিন্ন’ বলতে কবি ঠিক কি বোঝাতে চাইলেন ? এরপর যোগ করলেন– “মহিমময় জীবন”। মৃত্যুর অম্লগন্ধে মহিমার কী আছে ? নাকি কবি মৃত্যুকে মহিম মানে মহৎ, গৌরবময় বলতে চাইছেন ! এরপরই কবি বলছেন– যেখানে আলো অন্ধকার মুখোমুখি হয় । সহজিয়া শব্দের ভেতর কবি যেন গুঁজে দিতে চাইলেন গভীর এক ব্যঞ্জনা । টুক করে কবি গভীর ব্যঞ্জনাময় একটি শব্দ গুঁজে দেন । যেমন– এই ‘খোলা আকাশ অশনি মিলন’ এবার লক্ষ্য করার বিষয় ‘অশনি’ শব্দটির ব্যবহার নিয়ে । অশনি অর্থ বজ্র । তার মানে কবি বলতে চাইছেন- ‘অশনি মিলন’ মানে বজ্রের মতো মিলন । এইভাবে কবি শব্দের ভিতর দিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করে গেছেন একের পর এক কবিতায় । দ্বিতীয় স্তবকেও আমরা এমনই কিছু শব্দচিত্র দেখতে পাবো–
“বহুলীন সভ্যতার ফুলদানী ভেঙে
আজ পঞ্চায়েত দৌড়ে যাচ্ছে আরক্ষা দপ্তরে
অরণ্য ভেঙে পড়ছে নগরে
তবুও আমার অশান্তি তুখোড় অনন্ত জিজ্ঞাসার
যেমন স্মৃতির উড়ুক্কু মাছ জলে ডোবে
তার উদ্ধার নেই
যেমন উদ্বীক্ষণে জ্বলন্ত চোখে দ্বিতীয়
বরে আগুনের উজ্জ্বলতার কোন মানে হয় না ।” ( মানুষ ও তার জীবনের গান )
এইখানে কবি– বহুলীন, উড়ুক্কু, উদ্বীক্ষণ, শব্দের ব্যবহার করেছেন প্রথাগত শব্দের বাইরে গিয়ে । জীবনের গতির সাথে তাল মিলিয়ে যেভাবে আমাদের সভ্যতায় পরিবর্তন এসেছে, তেমনি এসেছে আমাদের জীবনেও । অরণ্য ভেঙে ক্রমেই নগর গড়ে উঠছে । এসবের ভিতর থেকেই যেন কবি উঁকি দিয়ে বলতে চাইছেন– ‘তবুও আমার অশান্তি তুখোড় অনন্ত জিজ্ঞাসার’ । কিন্তু অশান্তিটা ঠিক কোথায় ? এই কথা কবি কোথাও স্পষ্ট করেননি । এই কবিতায় আরেকটি শব্দের প্রয়োগ দেখুন–
“দু’হাতে রক্তের পাট্টা, স্পন্দিত চারিধার
পদ্মদল যে ভাবে কেঁপে ওঠে জলের স্তম্ভনে
বৃক্ষ যে ভাবে কেঁপে ওঠে পাখীর স্তম্ভনে
পৃথিবীর যে ভাবে কেঁপে ওঠে সত্য প্রতিষ্ঠার আগে
... ... ... ... ...
শুধু সত্যের স্ক্রুপ খোলার তীক্ষ্নতায় আমাদের
জীবনের মূল্যদান
যে গানের পর্ণ খসে গেলে
পৃথিবীতে আর কোন গান থাকে না । ”
(মানুষ ও তার জীবনের গান )
এখানে পাট্টা, স্তম্ভন, স্ক্রুপ শব্দের ব্যবহার লক্ষণীয় । এবং এর ভিতরেই টুক করে কবি লিখে দিলেন– “পৃথিবীর যে ভাবে কেঁপে ওঠে সত্য প্রতিষ্ঠার আগে” । বড় সত্য প্রতিষ্ঠার আগে পৃথিবী কেঁপে উঠে, এটা চিরসত্যের একটা প্রবাদ । প্রতিটি শব্দ এমনভাবে গ্রহণ করেছেন, এতটুকু এদিক-ওদিক হলে গোটা কবিতার ব্যাল্যান্স নষ্ট হয়ে যেতে পারতো । তারপর জলের স্তম্ভনে পদ্মদলের কেঁপে উঠার দৃশ্যায়ন বা পাখীর স্তম্ভনে বৃক্ষের কেঁপে ওঠা– এইসব চিত্রায়ন পাঠক হিসেবে আমাকে আপ্লুত করেছে । মুগ্ধ হয়েছি শব্দচয়নের মুন্সিয়ানা দেখে । এই কবিতার নাম রেখেছেন কবি- ‘মানুষ ও তার জীবনের গান’ । শেষ অবধি কবি জীবনের গানই গাইলেন । যদিও কবি তখন খুব অসুস্থ । এই কবিতার ঠিক একমাস পর মায়ের মৃত্যু নিয়ে কবি লিখেছিলেন– ‘স্থবির দুঃখ ইতিহাস’ কবিতাটি । যদিও মায়ের মৃত্যুর প্রায় দুই বছর পর এই কবিতাটি লিখেছিলেন কবি । ‘বিলীন জ্যোৎস্না রাত । স্তিমিত শূন্য-কানন ’ । এই কবিতার ভিতরেই কবি লিখেছিলেন– ‘মানুষের পবিত্র সংযম স্নান করে জলে’ । এবং কবির দীর্ঘ অসুখের ছবি “স্বগত নির্মাণ” কবিতায় দেখতে পাই । যেখানে কবি লিখছেন–
“অনাসুখের আশায় আশায় আমি এখন
অসুখের ভেতর এক সুকণ্ঠ পাখী ।
প্রগত রাত্রির অন্ধকারে ভাসাই ভুলভ্রান্তির
ভাঙা নৌকাগুলো
কথামালা সাজাই আত্মজ প্রলাপে,
আমি নিজেও ভাবতে পারিনে নিহত দিনগুলো কি গেল ? ” ( স্বগত নির্মাণ )
কবি নিজের অবস্থান সম্পর্কে কি অদ্ভুত সুন্দর করে নিজের মনোভাব প্রকাশ করলেন– ‘অনাসুখের আশায় আশায় আমি এখন / অসুখের ভেতর এক সুকণ্ঠ পাখী ।’ নিজেকে সুকণ্ঠ পাখীর সাথে তুলনা করলেন । নিজের ‘অসুখ’-কে কি দৃঢ়তার সাথে মানিয়ে নিয়েছেন কবি । দ্বিতীয় লাইনটিও কি অসাধারণ – ‘প্রগত রাত্রির অন্ধকারে ভাসাই ভুলভ্রান্তির / ভাঙা নৌকাগুলো’- ‘প্রগত’ হচ্ছে– প্রস্থান করেছে এমন । প্রতিটি রাত্রির কাছেই যেন কবি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছেন । প্রতিটি ভুলভ্রান্তির জন্য কবি নিজেকে অনুতপ্ত করছেন । রাতজাগা রাত্রির অন্ধকারের ভিতর আত্মজ প্রলাপই কবির সঙ্গী । যে দিন গত হয়েছে, কবির কাছে সেদিন মৃত । একটা কিছু করতে না-পারা কবিকে তাড়িত করছে । এইজন্যই ব্যর্থ দিনটিকে তিনি মৃত বলতে চাইছেন । কবি নিজেও দ্বিধান্বিত– ‘নিহত দিনগুলো কি গেল ?’
“আমি কি পৃথিবীকে সূক্ষ্মকোণে দেখেছিলাম
নাকি স্বগত নির্মাণে অসুখের
ঘাড় মটকে লাফিয়ে পড়েছিলাম
কবিতার জঙ্গলে
অথচ যেদিন আমার মায়ের মৃত্যুতে
জীবনকে সেলামী দিয়েছি
মুমূর্ষ বিছানায়
নির্লজ্জের মতো চিৎকার করে ওঠেছি
জয়স্তু বলে ” ( স্বগত নির্মাণ )
মা অফিলা বেগমের হঠাৎ স্ট্রোক করে মৃত্যু জাফর সাদেককে জোর ধাক্কা দিয়েছিল। গোটা পরিবারই অসহায় হয়ে পড়েছিল তখন । কবি তাই লিখছে– “আমার মায়ের মৃত্যুতে / জীবনকে সেলামী দিয়েছি / মুমূর্ষ বিছানায়” । কিন্তু কবি এখানে ‘সেলামী’ শব্দটি ব্যবহার করলেন কেন ? মায়ের মৃত্যু কি কবিকে জীবনবিমুখ করে তুলেছিল ! এবং মায়ের মৃত্যুর পর যে কবি কবিতায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেনতারও ইঙ্গিত পাই কবিতায়– “অসুখের ঘাড় মটকে লাফিয়ে পড়েছিলাম কবিতার জঙ্গলে” । আসলে কবিতার মধ্যেই কবি নিজেকে ভুলিয়ে রাখার চেষ্টা করেছিলেন । আবার কোথাও না কোথাও দেখি কবি গোটা বিষয়টার জন্য ঘুরে-ফিরে নিজেকে অপরাধী ভাবছেন । সেই সময়ের মানসিক অবস্থানই দেখি তার কবিতায়–
“সেদিন কি বুকের ভেতর লুকিয়েছিল
এই চুনকামের বালতি
যা দিয়ে এখনো আমি দেয়ালের
অসহায় স্মৃতির
দাগ মুছতে ছুটে যাই
আর মুখোমুখি হই অষ্টপাশের কপটদ্বারের ।” (স্বগত নির্মাণ)
কী অসাধারণভাবে কিংবা বলতেহয় সাহসিকতার সাথে কবি ‘চুনকামের বালতি’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন । সাথে ব্যবহার করলেন ‘অসহায় স্মতির’ শব্দটি । মায়ের মৃত্যুর পর কবির মানসিক অস্থিরতা, অসহায়ত্ব বোঝাতে এই শব্দদ্বয় চয়ন করেছেন বুঝতে পারছি । কিন্তু ‘কপটদ্বার’ শব্দটি কবি কোন অর্থে ব্যবহার করলেন ? জীবনের দ্বারকেই কবি কপট বলতে চাইলেন ? নাকি প্রতিটি সকালের দ্বারকেই কবি কপট বলতে চাইলেন ? তাহলে কি আমরা প্রতিদিনই একটি কপট দরজা খুলে সকালের মুখোমুখি হই ! না, কবি এরপরই বলছেন-
“হে নিয়মনিষ্ঠ সেদিন থেকে এক
রুক্ষ উন্মাদের পা
কবরের দিকে ছুটে যায়
ছুটে যায় পরিচর্যাহীন একমুঠো
ধুলো শূন্যের দিকে
আজ কে পারে সাত্ত্বিক হয়ে
জীবনে জীবন রেখে ছুঁয়ে যেতে মন
কে পারো কামনাকে দাহ করে
আমাকে শ্রেষ্ঠ সূর্যোদয় দেখাতে ? ”
( স্বগত নির্মাণ )
‘সেদিন থেকে’ এই কথাটি থেকে বুঝতে পারি– ‘সেদিন’ বলতে কবি মায়ের মৃত্যু-দিনের কথাই বলছেন । আসলে ঐ-দিনের পর থেকেই মূলত প্রতিটি সকালকেই কবির ‘কপটদ্বার’ মনে হয়েছে । প্রতি সকালই যেন নিঃস্বতার বার্তা বয়ে নিয়ে আনছিল কবির কাছে । কবি স্বপ্নহীন হয়ে পড়েছিলেন । ‘স্থবির দুঃখ ইতিহাস’ এবং ‘স্বগত নির্মাণ’ দুটো কবিতাই আসলে মা-কে নিবেদিত । জীবনের শেষ দিনগুলোতে প্রতিটি সূর্যোদয়কেই মূলত কবি শ্রেষ্ঠ সূর্যোদয় মনে হয়েছে । তারপরও কবি কামনাহীন, জীবনকে জীবনের মতো উপভোগ করতে চেয়েছিলেন । মূলত কবি তাই উপভোগ করেছেন । তারপরও কোথাও কবির মনে হয়েছে– তিনি ‘সাত্ত্বিক’ হতে পারছেন না ! এখানে কবি মহত্ব । ‘অসুখের ভেতর এক সুকণ্ঠ পাখী’ হতে চেয়েছিলেন কবি । স্বগত মানে আত্মগতভাবে কবি মূলত নিজেকেই নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন । কবি তাঁর মৃত্যুকে মেনে নিয়েই বলেছিলেন - কবরের দিকে ছুটে যায় এক রুক্ষ উন্মাদের পা ! এই কথাটাই তো স্বগত । কবির একান্ত নির্মাণ ।
“যখন খুশী যাইবেন ডাকবেন” কবিতাটি আঞ্চলিক ভাষায় লিখিত । নিঃসন্দেহে এটা কবির এক সাহসী পদক্ষেপ । আঞ্চলিক ভাষায় এত সমৃদ্ধ কবিতা খুব বেশি দেখা যায় না । সৎ সাহস ছাড়া এমন কবিতা লেখা যায় না । ‘নিহত রাত্রির দরজা’ পাঠ করার সময় বারবার হোঁচট খেতে হয়েছে, কবিতাগুলো লেখার তারিখের ধারাবাহিকতা বজায় না-রাখায় । সম্পাদকরা হয়ত বিষয়টাকে অন্যভাবে সাজাতে চেয়েছেন । দেখা গেল ১৪ পৃ্ষ্ঠার ‘ইতিহাস’ কবিতাটি লেখা হল ১৮-৭-১৯৯০ সালে, অথচ এরপরের পৃষ্ঠার কবিতাটি লেখা হল ১-৪-১৯৮৯ সালে । পরের কবিতাটি লেখা হয়েছে ১৭-১১-১৯৮৮ সালে । আবার ৬৪ পৃষ্ঠায় দেওয়া হল ‘ যখন খুশী যাইবেন ডাকবেন’ কবিতাটি লেখা হয়েছে ১৬-৪-১৯৮৯ সালে । আবার কাব্যের শুরুতেই ‘৮ই অক্টোবর’ কবিতাটি, যা কবি লিখেছিলেন মৃত্যুর দু’মাস আগে লেখা । এভাবে সাজানোর ফলে কবির জীবনযাত্রা, দুঃখ-যন্ত্রণার সাথে কবিতার মানসিকতা মেলানো গেল না । মেলানো গেল না– কবির মৃত্যুচেতনা বোধের ধারাবাহিকতাকে । অথচ কবি তাঁর মৃত্যুচেতনাকে উপভোগ করেছেন প্রকৃত জীবনরসিকের মতো ।এই বোধ বুঝতে গেলে, নতুন করে কবির কবিতা কাল অনুযায়ী সাজিয়ে পড়তে হয় । সে পাঠেরও ভিন্ন এক আমেজ আছে । উপলব্ধি আছে । মৌলিকতা আছে ।
সে-ই অর্থে জাফর সাদেক-কে পুর্ণপাঠ প্রয়োজন । ‘নিহত রাত্রির দরজা’ কাব্যের শেষ লেখা ৫-১২-১৯৯০ ‘ ইতি শিরেসংক্রান্তি নমঃ’ । এটাই কি শেষ লেখা ? তিনি মারা ২৯-১২-১৯৯০তারিখে । এই চব্বিশ দিন জাফর সাদেক কি কিছু লেখেননি ? জানতে ইচ্ছে করে খুব । যে কবি মৃত্যু নিয়ে এত ভাবলেন, সে কবির মৃত্যু কখন হল, জানতে ইচ্ছে করে বই কি ?
“যখন খুশী যাইবেন ডাকবেন” কবিতায় কবি লিখছেন–
“যখন খুশী যাইবেন ডাকবেন
ধাক্কা দিয়া দরজা খুলবেন ।
ঘরে কেউ থাকেন না
আগে থাকতেন অন্য কেউ
এখন আমি থাকি
ঘরের ভেতর ঘর থাকে ।” ( যখন খুশী যাইবেন ডাকবেন)
কবির এই আহ্বান পাঠক হিসেবে আমাকে মুগ্ধ করে । এই প্রায় দীর্ঘ কবিতায় কবি অনেক কথাই বলার চেষ্টা করেছেন । ‘আগে থাকতেন অন্য কেউ / এখন আমি থাকি’– এই উক্তি সম্ভবত পরম্পরা বুঝাতেই ব্যবহার করেছেন । কিন্তু এই কবিতায় ঘুরে-ফিরে একটা লাইন এসেছে তা হল– ‘ঘরের ভেতর ঘর থাকে।’ কবি তাঁর বাড়ি নিয়ে যে কবিতাটি লিখেছেন তা বোঝা যায়, এইসব চিত্রকল্প থেকে –
“চিল্লান হুনবেন ডাইনাত বাওয়াত
ব্যাপ্ত করা চরাচরে
পইরা থাকি যমের ঘরে ।
ব্যক্তিগত সময়সূরী দশদিকেই এজেন্ট চায়
প্রদাহের তুলকালামে একটা দিক
ভেল্কি লাগায়
সময়ের শরীর থেকে খোলস খুইল্যা
রাখছি আমি
দৌড়ায় সময় ল্যাংডা অইয়্যা ” ( যখন খুশী যাইবেন ডাকবেন)
কবির বাড়ি আমি গিয়ে দেখেছি । ব্যাপ্ত চরাচরেই কবির বাড়ি । বাড়ির চারপাশ ঘিরেই বিস্তর ধানক্ষেতের ছড়াছড়ি । কিন্তু কবি এরপর এই লাইন কেন লিখলেন বুঝলামনা– ‘পইরা থাকি যমের ঘরে’ । ‘যমের ঘর’ হতে যাবে কেন ? এটা কি আমরা মৃত্যুভয় বা মৃত্যুআশংকা থেকে কবির উচ্চারণ বলতে পারি ? শুধু তাই নয় এরপরই বলছেন– ‘সময়ের শরীর থেকে খোলস খুইল্যা / রাখছি আমি’ । এখানে ‘খোলস’ বলতে কি বোঝাতে চাইলেন কবি ! কবির কাছে সময় নেই । সময় অতি মূল্যবান, কবি জানতেন । এর আগেই বলেছেন– ‘প্রদাহের তুলকালামে’ । প্রদাহ মানেই তো দাঁড়ায়– সন্তাপ, যন্ত্রণা, রোগজনিত অঙ্গের স্ফীতি ও টাটানি । আবার প্রদাহের পাঁচটি অতিপরিচিত লক্ষণ হচ্ছে– তাপ, ব্যথা, লালভাব, পায়ের ফুলে ওঠা ও কার্যক্ষমতা লোপ পেয়ে যাওয়া । আর এখানে কবি বলছেন- ‘প্রদাহের তুলকালামে’। তুলকালাম বলতে নিশ্চয়ই কবির শারীরিক যন্ত্রণার কথাই বলতে চেয়েছেন । ‘প্রদাহ’ শব্দের ব্যবহার কবির সাংঘাতিক শব্দ- সচেতনতারই পরিচয় বহন করে । এই কবিতায়ই একটু পরেই কবি বলছেন– “বাত বিমার বড় বিমার” । ‘বিমার’– আঞ্চলিক শব্দ । মানে রোগ । কবি বলছেন– বাতের রোগ বড় রোগ । কবির তাঁর শারীরিক যন্ত্রণা নিয়ে এই একটি লাইনই পাই গোটা কাব্যে । এই কবিতায় দুটো লাইন আমাকে খুব ভাবিয়েছে । সেই দুটো লাইন হল–
“নিঝুম জুমে রমণঘুমে পইড়্যা আছে
ভাই তাতেও যে শিল্প আছে ।”
কী অপরূপ একটা লাইন । একটা দৃশ্যকল্প । একটা প্রেম মুহূর্ত । কি সুন্দর একটা শব্দবন্ধ– ‘রমণঘুম’ । এবং এরপরই ‘শিল্প’ শব্দটার ব্যবহার । কবি রমণপ্রক্রিয়ার ভিতরে শিল্পের কথা বললেন । ভালবাসার কথা বললেন । এবং এরপরই আবার বললেন– “আমার কিন্তু জাইগ্যা আছে / মানুষখেকো মন ।” মানুষকে কাছে পাওয়ার প্রবণতা, ইচ্ছা এখান থেকে স্পষ্ট । মানুষের সাথে আপ্রাণ মিশতে চাইতেন তিনি । নিজের ভিতরের শূন্যতাকে মানুষের সাথে মিশে ভুলে থাকতে চাইতেন হয়ত ।
জাফর সাদেকের কাব্যজীবন নিয়ে, যার ভিত্তি ‘নিহত রাত্রির দরজা’ পর্যালোচনা করলে দু-একটা না-ছোঁয়া বিষয়, দু-একটা সীমাবদ্ধতার চোখে পড়ে । এবং এটা অত্যন্ত স্বাভাবিক । কোনো কবিই সীমাবদ্ধতার উর্দ্ধে উঠতে পারেননি, কমবেশি এটা হয়েই থাকে ।আমি মনে করি এটা জাফর সাদেকের ক্ষেত্রেও হয়েছে । একটা প্রাথমিক সময় থাকে, যখন পাঠক আর ঐ কবির কোনো সীমাবদ্ধতার কথা শুনতে চান না । কিন্তু এই বিরোধিতায় কতদিন নিজেকে আটকে রাখা যায়, ক্রমে সব মাটি-ই জলের তলায় চলে আসে, তখনই সত্যকে দেখে নিতে হয় । আজ যেমন বিষ্ণু দে-কে দেখা যায়, আজ যেমন নজরুল ইসলামকে দেখা যায়, যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জীবনানন্দ, সুধীন্দ্রনাথ, ফালগুণী, সুনীল, শক্তি চট্টোপাধ্যায়– এই মুহূর্তে এদের যেসব কবিতা পাঠকদের হৃদয়ে বেঁচে আছে, যে কবিতাগুলো আজও পাঠ করলে ভালো লাগে, পাঠককে বহন করার মতো বহনযোগ্যতা রাখে– সেগুলিই ভালো কবিতা, মৌলিক কবিতা, সে কবিতা সময়-কেও নিজের পিঠে বহন করে নিয়ে যায় । এই যে সময়কে নিয়ে চলার বৈশিষ্ট্য, এই বৈশিষ্ট্য সব কবির সব কবিতায় থাকে না । থাকাটা স্বাভাবিকও না । হয়ত এজন্য এত কবি বাংলা কাব্যে আসেন আবার সময়ের সাথে চলেও যান । কেন চলে যান ? আজ কবি ও পাঠকের এ প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া একান্ত প্রয়োজন । পালিয়ে গেলেই কবিতা চিরদিন বেঁচে থাকে না । এই আত্মোপলব্ধির প্রয়োজন মনে করি ।সাহিত্যআন্দোলন নিয়ে শেষ আন্দোলন ‘হাংরি আন্দোলন’ । আজ যদি ফিরে তাকাই, আর দেখি ঠিক কার কার কোন কোন কবিতার জন্য মন কেমন কেমন করছে তাহলে অনেকটাই হতাশ হতে হয় । কেন এই হতাশা !কেন ‘সময় ও কবিতা’-র দূরত্ব বেড়ে যায় ? কেন আজ সময়ের সাথে মেলাতে পারি না পুরনো অনেকের অনেক কবিতা ! এই এখন যারা ত্রিপুরায় এত এত লিখছেন– সবই কি ক্ষণিক সময়ের এক ভাবনার ফলশ্রুতি ! যতদিন সক্ষম আছেন, ছেপে গেলেন । পাঠক দেখল কবি বেঁচে আছেন । কবি মারা যাবার দুই তিন বইমেলার পর হঠাৎ আবিষ্কার করা গেল, কবি আর বেঁচে নেই । কেন এমন দূরত্ব তৈরি হয় ? আমরা কি জোর করে কবির সীমাবদ্ধতাকে অস্বীকার করতে পারবো ?
জাফর সাদেকেরও কিছু কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল । অন্তত আমার মনে হয়েছে । হয়ত সময়ের স্বল্পতা এর জন্য অনেকাংশেই দায়ি । হয়ত কবি মৃত্যু ও জীবন– এই ভাবনার বাইরে বের হতে চাননি । যে মৃত্যু- বেদনাবোধ থেকে কবি কবিতা লিখতে শুরু করেছিলেন, তারপর তার-ই মায়ায়, মোহে আটকে পড়েছিলেন । জন্ম-মৃত্যুর অন্তরালে একটা সীমানায় জড়িয়ে ফেললেন নিজের কবিতাকে । নিজেকে । এটাকে কি কবির মৃত্যুবোধজনিত প্রেম বলা যায় ! এটাই হবে, না-হলে কেন এই চেতনাবোধ থেকে জাফর নিজেকে কখনও সরাতে পারলেন না ? এর বাইরেও তাঁর একটা জীবনবোধ ছিল, ছিল উন্মাদনা । তাঁর কবিতায় যেটুকু উন্মাদনা আমরা পাই তা কিন্তু সেই মৃত্যুকে ঘিরেই । যেটুকু পাগলামি আছে সেই মৃত্যুকে ঘিরেই । অথচ কবি প্রেমিক ছিলেন । তাঁর কবিতায় সে জাগতিক কিশোরী উঁকি দিয়েছিল একবার । কেন বারবার উঁকি দিল না ? কবি কি তবে প্রেম থেকে ইচ্ছে করেই পালিয়ে গেলেন ? কবি ছাত্র হিসেবে হোস্টেল জীবন কাটালেন আগরতলায় । এত অলিগলি হাঁটলেন, হাঁটলেন নতুন নতুন বন্ধুদের সাথে । কখনও কি কোনো কিশোরীর সাথে হাঁটার সুযোগ হয়নি ! ভেবে নিলাম বাস্তবিক এমন হয়নি । কিন্তু মননে ? মনের নির্জনতায়, কোথাও কোনো বারান্দায় বসে, ঘুম না-আসা রাত্রিতে একা হাঁটতে হাঁটতে একবারও কি মনে আসেনি এমন কোনো ভাবনা ? বিশ্বাস করতে চায় না মন । বাস্তবে না থাক, কল্পনায় থাকাটা স্বাভাবিক ছিল । নাকি, আসলে কবি কবিতাকে ওদিকে নিয়ে যেতে চাননি । স্বভাবতই তিনি যখনই কবিতার কাছে, সাদা কাগজের কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছেন, তখন মায়ের মুখটাই ভেসে উঠেছে মনের কলমে । কবি হয়ত তখন ভাবতে পারতেন না অন্য কিছু । কিন্তু কবির কবিতা পড়লে মনে হয়, তিনি ভাবতেন । নাহলে ব্যঙ্গ, শ্লেষভিত্তিক কবিতাগুলো কীভাবে তাঁর ভাবনায় এলো । মৃত্যুর একমাস আগেও লিখেছেন– ‘ইতি শিরেসংক্রান্তি নমঃ’-র মতো চূড়ান্ত শ্লেষ-কবিতাটি । তাই মনে হয়, কবি ইচ্ছে করলেই পারতেন । পারতেন মৃত্যুবোধ থেকে প্রেমবোধে চলে আসতে, মৃত্যুবোধ থেকে কবি সরেছেন, কিন্তু এসে থেমেছেন জীবনবোধে । কিন্তু এক্ষেত্রে জীবনবোধ মৃত্যুবোধ থেকেই উঠে এসেছে । ফলত কোনো স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে পারেননি। শ্লেষযুক্ত কবিতাগুলো একটু অন্যরকম জীবনবোধ থেকে উঠে এসেছে । জীবনের বিশৃঙ্খলায়, অব্যবস্থায়, শাসনহীনতায়, ধর্মবোধহীনতায় কোনো কোনো কবি কাঁদেন, কেউ তীব্র যন্ত্রণায় ছুঁড়ে দেন শ্লেষ, ব্যঙ্গের হাসি, ঠাট্টা-তামাশা । জাফর সাদেক হাসলেন। হৃদয়বিদারক সে হাসি । যে হাসি কবিকেও জ্বালায় ।
এবার আবার জাফর সাদেকের কাব্যে ফিরে যেতে চাই । এখন আমরা পড়বো কবির ‘নিহত রাত্রির দরজা জানালা’ কবিতাটা । আমার প্রিয় কবিতার মধ্যে এটাও একটা । এই কবিতাটি রচনার দিনতারিখ উল্লেখ করে যাননি কবি । ফলে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না, এই কবিতাটি কবির কবেকার লেখা । তবু আমাদের এগিয়ে যেতে হবে– নিহত রাত্রির দরজার দিকে ।
‘বিষবৃক্ষের নীচে যে একাকীত্বের আলিঙ্গন আমি সহ্য করতে/ পারলাম না।/ তার মাত্রা, স্পর্শ রূপ গন্ধ মোহ প্রেম বিরহ যোগ আত্মিক প্রতীক/ একে একে সবার কাছে গেলাম’– কবি জাফর সাদেক। আগেই বলেছিলাম, কবি এই কাব্য দেখে যেতে পারেননি। মাত্র ১৯ বছর ১১ মাস বেঁচে ছিলেন। কবির একটি কবিতার নাম অনুযায়ী কাব্যগ্রন্থের নাম ঠিক করা হয়েছিল। যেহেতু, কবিও আর জীবিত নেই। তাই ‘নিহত’ শব্দের ভিতর একটা মৃত্যুর গন্ধ ছিল। ‘রাত্রির দরজা’ নামটার মধ্যে একটা সমাপ্তির ইঙ্গিত লুকায়িত আছে। কবি হয়ত কবিতাটা লেখার সময় ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেন নি, এই বইটা যেদিন প্রকাশিত হবে তিনি থাকবেন না এই পৃথিবীর আলোছায়ায়। আর আমি এই লেখাটি লিখতে লিখতে ভাবছি ‘নিহত রাত্রির দরজা’ কী অদ্ভুত এক কোলাহল তৈরি করে মনে ভিতর। মাত্র উনিশ বছর বয়সের একটি ছেলে লিখছে–
“অপস্রিয়মাণ আলো আর দ্রুতগামী সময়
ভেঙে পড়ছে সমুদ্রের তরঙ্গমালায়
লঘুহস্ত শিকারী ধনুকের ছিলায়
টানতে টানতে ঝুঁকে পড়ছে কুৎকুতে নীল
আকাশের দিকে ।”
( নিহত রাত্রির দরজা জানালা )
কবিতাটির প্রথম শব্দটিই আমাকে চমকিত করে । এখানে আরও কত শব্দ কবি নির্বাচন করতে পারতেন ! আবার ‘অপস্রিয়মাণ আলো’র ঠিক বিপরীতেই কবি ব্যবহার করলেন –‘দ্রুতগামী সময়’ ধাবমান সময় খুব দ্রুতই ফুরিয়ে যাচ্ছে । কিন্তু কোথায় ? কবি লিখছেন–‘ভেঙে পড়ছে সমুদ্রের তরঙ্গমালায়’। এখানে কবি ‘অপস্রিয়মাণ’ শব্দের ওজনের সাথে মিলিয়েই ‘তরঙ্গমালায়’ শব্দটি নির্বাচন করেছেন । না-হলে, পড়ার সময় মননের ছন্দটা কাটতো। এত শ্রুতিমধুর শোনাতো না।
‘অপস্রিয়মাণ’শব্দের মানে হল পরিবর্তনমান, পলায়নমান, প্রস্থান করেছে এমন । তার মানে কবি সূর্যাস্তের কথা বলতে চাইছেন । এই শব্দটা ব্যবহার কর প্রথম থেকেই কবি তাঁর ব্যতিক্রমী ভাবনার পরিচয় দিয়েছেন । ‘দ্রুতগামী সময়’– সময় সব সময়ই কবির কাছ থেকে দ্রুত পালাচ্ছিল । প্রতিটি মুহূর্তকেই তিনি উপভোগ করতে চাইতেন । কিন্তু সূর্য ক্রমেই ঝুঁকে পড়ে পশ্চিমের দিকে । কবি যার বর্ণনা দিচ্ছেন আরও অদ্ভুত এক ব্যঞ্জনায়– ‘লঘুহস্ত শিকারী ধনুকের ছিলায় টানতে টানতে ঝুঁকে পড়ছে কুৎকুতে নীল আকাশের দিকে ।’ এখানে কবি ‘কুৎকুতে’ শব্দটা ব্যবহার করলেন কেন ? তাও আবার ‘নীল আকাশ’ শব্দের সামনে! ‘শিকারী’ শব্দের আগে বসিয়ে দিলেন ‘লঘু’ শব্দটি। এখানে আমরা এই উঠতি তরুণের শব্দ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে একটা বেপরোয়া ভাব লক্ষ্য করা যায়। এরপর কবি আবার তাঁর প্রসঙ্গ থেকে একটু সরে গিয়ে লিখছেন–
“পাগলের প্রলাপ বকতে বকতে যে
প্রেমরাঙা নারী আজ মকরগঙ্গায়
শুকনো বকুলমালা ভাসাতে ভাসাতে যাবে
ফিরে এসে সব কটি পুরনো চিঠিপত্তর ছিঁড়ে ফেলবে
ঠিকানায় কালি ঢেলে দিয়ে
মৃদু আপত্তির অন্ধবিন্দুতে নিজস্ব
সংলাপে বাজাবে রিমিঝিমি
পৌরুষ যে দাঁতে কামড়ে ধরে প্রণয়শরীর
ক্ষাত্রপ্রেম জেগে ওঠে ধীরে
ক্রমাগত ছন্দিত ঘর্ষণে ” ( নিহত রাত্রির দরজা জানালা )
-–‘প্রেমরাঙা নারী আজ মকরগঙ্গায়/ শুকনো বকুলমালা ভাসাতে যাবে/ ফিরে এসে সবকটি পুরনো চিঠিপত্তর ছিঁড়ে ফেলবে’ এখানে কবির ‘প্রেমরাঙা’ ‘শুকনো বকুলমালা’ এবং ‘চিঠিপত্তর’ শব্দের ব্যবহার উল্লেখ্যের অপেক্ষা রাখে। তরুণ কবির এই বুনন তার দক্ষতাকেই প্রমাণ করে। পরবর্তী লাইনে কবির ভাব-বুননের সাথে সাথে চিত্রবর্ণনা দেখুন। কবি লিখছেন–‘পৌরুষ যে দাঁতে কামড়ে ধরে প্রণয়শরীর/ ক্ষাত্রপ্রেম জেগে ওঠে ধীরে/ ক্রমাগত ছন্দিত ঘর্ষণে’ এখানে ‘ক্ষাত্রপ্রেম’ এবং ‘ছন্দিত ঘর্ষণ’ শব্দের প্রয়োগকৌশল কবিকে এক অন্য মাত্রা দেয় । উচ্চতা দেয়। ‘ক্ষাত্রপ্রেম’ বলতে এখানে কি বুঝবো আমরা ? ‘ক্ষাত্র’ বলতে তো বোঝায় – ক্ষত্রিয় সম্বন্ধীয় । ক্ষত্রিয়োচিত । কিন্তু এরসাথে ‘প্রেম’ যোগ হলে কি অর্থ হতে পারে ? যেমন- ক্ষাত্রধর্ম বললে আমরা বুঝবো– ক্ষত্রিয়ের পালনীয় ধর্ম । ‘ক্ষাত্রবল’ বললে বুঝবো– ক্ষত্রিয়োচিত যুদ্ধ করার ক্ষমতা । কিন্তু এখানে কবি বলছেন – ‘ক্ষাত্রপ্রেম’ । ক্ষত্রিয়ের মতো বীরত্বর প্রেম । এজন্যই বোধ হয় কবি ‘পৌরুষ’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন । এবং এর পাশাপাশি লিখছেন– ‘দাঁতে কামড় ধরে প্রণয়শরীর’। মিলনের দৃশ্য কি সুন্দর করে কবি চিত্রায়ন করেছেন–‘ধীরে ক্রমাগত ছন্দিত ঘর্ষণে পুষ্পচয়ন’ । এমন অপরূপভাবে মিলনের দৃশ্যায়ন আমাকে মুগ্ধ করেছে । কিন্তু কবি হঠাৎ বইয়ের পাতায় গুঁজে রাখা ‘শুকনো বকুলমালা, পুরনো চিঠিপত্তর ছিঁড়ে ফেলতে চাইছেন কেন ? কেনই বা ঠিকানায় কালি ঢেলে দিয়ে নষ্ট করতে চাইছেন ? এখানে কবি কাব্যিক এক ধোঁয়াশা সৃষ্টি করেছেন । এভাবেই বলছেন কবি- ‘প্রেমের চাঁছি খেয়ে তারপর মৃত্যুর শ্লোক/যতদূর যায়” । এই একটি লাইনে কবিকে ব্যাখ্যা করলে অনেক কিছুর ইঙ্গিতই উদ্ধার করা যেতে পারে । মৃত্যুর আগে প্রেমের প্রতি এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা লক্ষ করা যায় ।
“যে যোগিনী ব্রত নিয়ে রাত জেগে থাকে
অনিন্দ্য সহায়ক ব্যক্ত রূপে
হে রাত্তির মাঝি স্তম্ভিত কর লগি
গর্ভবতী শব্দের পোষাক ঠেলে পোষাক ঠেলে
গ্রামের পরবর্তী গ্রাম
আমার লিপির তলপেটে শ্রমিক মিছিল
অথচ জীবনের পিছুটান পাশ ফিরে যায়
সন্ধ্যার আসন্ন বিপ্লবে
যে বিপ্লব ঘরমুখো লুপ্ত পাঁচালী”
(নিহত রাত্রির দরজা জানালা )
‘হে রাত্তির মাঝি স্তম্ভিত কর লগি’– এখানে কবি যখন ‘স্তম্ভিত’ শব্দটি ব্যবহার করেন তখন থেমে যেতে হয়, বৈটা তুলে নিয়ে হয় জীবনের তরলতা থেকে । এক কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি এই মুহূর্তে কবি ও কবিতা– ‘আমার লিপির তলপেটে শ্রমিক মিছিল’ । কবির এই বলিষ্ঠতা আমাদের মুগ্ধ করে ।একই সাথে মুদ্ধ এবং হতবাক করে কবি যখন বলেন–
“ত্বদীয় বিড়াল যদি যত্নে লালিত হয়
তীর্থের দাগ নিহত রাত্রির দরজা
জানালা খুলে অনিরুদ্ধ শূন্যতায়
দেহত্যাগ করে ।”
(নিহত রাত্রির দরজা জানালা )
কবিতায় ‘ত্বদীয়’ শব্দের সাথে আমার সাথে এই প্রথম পরিচয় । জাফর সাদেকের শব্দের ব্যবহারে আমি বারবার বিস্মিত হয়েছি । ‘ত্বদীয়’ – বিশেষণ পদ । অর্থ হচ্ছে – ত্বৎসম্বন্ধীয়, তোমার । এবং আরও চমৎকৃত হলাম, যখন কবি এরপরই ব্যবহার করলেন তাঁর অমোঘ লাইন– “তীর্থের দাগ নিহত রাত্রির দরজা/জানালা খুলে অনিরুদ্ধ শূন্যতায়/ দেহত্যাগ করে ।”
আমি এই লাইনটিকে বহুভাবে ব্যবহার করে ভিন্ন ভিন্ন বোধে বোধিত হয়েছি । যেমন– শুধু ‘নিহত রাত্রির দরজা’– এই শব্দদ্বয় আমাকে নানাভাবে ভাবিত করেছে । ‘নিহত’– মানে তো হত, বিনষ্ট । এখানে কি বিনষ্ট ? ‘দরজা’ বলতে আমরা কি এবং কাকে বুঝবো ? দরজা দিনের নয় কেন ? রাত্রির বললেই তো অনেক প্রশ্ন, অনেক গল্পকথার, কল্পনার প্রশ্রয়- আশ্রয় পেয়ে যায় । ‘দরজা’ মানেই তো একটা আড়াল । ‘দরজা’ মানেই একটা নিশ্চয়তা । একটা নিরাপত্তা । একটা নিজস্বতা । দরজার ভিতরটাই তো স্বাধীনতা । তাও আবার রাত্রির ! একটা ভালবাসার প্রশ্রয় । সেখানে ‘নিহত’ শব্দটাই তো ভয়ানক। কিন্তু কবি সেখানে থামলেন না । এরপর বললেন – ‘জানালা খুলে অনিরুদ্ধ শূন্যতায় দেহত্যাগ করে’ । ‘অনিরুদ্ধ’ শব্দটা এখানে আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ । ‘অনিরুদ্ধ’ মানেই অপ্রতিহত, অক্ষুন্ন, উদ্দাম, লাগাম-ছাড়া । এর আরও অর্থ আছে । কিন্তু আমার মনে যেটা স্ট্রাইক করেছে, সেটা হচ্ছে, কবি এখানে ‘শূন্যতা’-র আগে ‘অনিরুদ্ধ’ শব্দটা বসালেন কেন ? আমাদের জীবনে তবে কি শূন্যতা অনিবার্য ? যে শূন্যতার পর আর কিছু থাকে না । দেহও থাকে না । রাত্রির শূন্যতায় একটা ঘরের দরজা-জানালা সবই খোলা । অভিভাবকহীন । মায়াহীন । অনিরুদ্ধ শূন্যতায়– ভেসে গেল একটা শরীর । একটা জীবন । কবি এরপরের লাইনগুলোতে বলছেন– ‘প্রেমের চাঁছি খেয়ে তারপর/ মৃত্যুর শ্লোক যতদূরে যায় ’ । জীবন-মৃত্যু অনিবার্য । রাত্রির শূন্যতায় কেবল ভাসমান প্রেমের চাঁছি । তারপরও কবির ‘নিহত’ শব্দটা এখনও আমাকে স্তব্ধ করে রেখেছে । আমি ভাবছি । আমাকে ভাবনায় রেখেছে এই কয়েকটি লাইন । ‘নিহত রাত্রির দরজা খুলে অনিরুদ্ধ শূন্যতায়’– কে দেহত্যাগ করলো ? আর দেহত্যাগই যদি হয়ে থাকে, তবে ‘নিহত’ শব্দটা কেন বসবে ? এমন এমন সব গোলকধাঁধায় আমাদের রেখে কবি জাফর সাদেক পাড়ি দিলেন পরকালে । কবি নিজেই বলেছেন– ‘তারপর মৃত্যুর শ্লোক যতদূরে যায় ...’
‘নিহত রাত্রির দরজা’ কাব্যগ্রন্থের প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী কৃষ্ণধন আচার্য। তাকে সে দিনের সেই স্মৃতি মনে করিয়ে দিয়ে জানতে চেয়েছিলাম- ‘জাফর সাদেকের কাব্যগ্রন্থের প্রচ্ছদ করেছিলেন। তখন ঠিক কি ভেবেছিলেন প্রচ্ছদ করতে গিয়ে ? উত্তরে শিল্পী জানালেন- ‘আমিতখন আর্ট কলেজে পড়ি । জেলখানার পেছনে একটি বাড়িতে ভাড়া থাকতাম । তারপরের গলিতে সৈকত প্রকাশনের মানস পাল-দারও বাড়ি । ওই বাড়িতে অনেকেই আসতেন । খুব আড্ডা হত । কখনও বিমলেন্দ্রদা কখনও দেবব্রতদা, কখনও সেলিমদা । ঠিক সেই সময়ে একদিন বন্ধু ফকরুদ্দীন ও আকবর আহমেদ, পুষ্পেন্দু চৌধুরী ওরা আমাকে জাফরের ‘নিহত রাত্রির দরজা’ কাব্যগ্রন্থটির প্রচ্ছদ করার কথা বলে । আমি তো এক কথায় রাজি হয়ে যাই । কারণ, জাফর আমারও খুব ভালো বন্ধু ছিল । প্রচ্ছদটি করতে গিয়ে আমার শরীরে একটা ইমেজ ফিল করেছিলাম । জাফরের অকাল মৃত্যু ও একটি যুবকের বিষণ্ণ মুখ, অন্ধকার ঘরের বাইরে একটি ভাঙা দরজার সিম্বলিক ইমেজ । ক্রেয়ন দিয়ে এঁকেছিলাম স্পষ্ট মনে আছে । ছবিটির পেছনে একটি ধূসর রঙ ব্যবহার করেছিলাম । নামলিপিগুলি ক্যালিগ্রাফি ঢঙে নিজের হাতেই করেছিলাম । তাঁর অকাল প্রয়াণ কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না ।’
জাফর সাদেককের কবিতায় সুফীবাদের ছাপ কি দেখতে পাওয়া যায় ? উত্তরে বলতে হয় –, খুঁজলে অবশ্যই দেখা যায় । খুব বেশি না-হলেও মরমিয়া একটা টান প্রায় সব কবিতায়ই লক্ষ্য করা যায় । সুফীবাদ ইসলামের অন্তর্নিহিত আধ্যাত্মিক এক অভিব্যক্তি । ইসলামের দুটি দিক আছে– জাহের ও বাতেন, অর্থাৎ বাহির ও ভিতর । সুফীবাদের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে আল কুশাইরী বলেছিলেন– ‘বাহ্য ও অন্তর জীবনের বিশুদ্ধি-ই সুফীবাদ । আল্লাহ্-র সান্নিধ্য ও তাঁর ঈশ-তে বলীয়ান হওয়াই সুফী-জীবনের চরম লক্ষ্য । ইপ্সিত লক্ষ্যে উপনীত হওয়ার জন্য সুফীকে অনেকে ত্যাগ-তিতিক্ষা, কষ্ট-ক্লেশের মধ্য দিয়ে সন্তর্পণে বিনয়াবনত চিত্তে পথ অতিক্রম করতে হয় । সুদীর্ঘ এই পর্যায়ের দিকে না-গিয়ে জাফর সাদেক তাঁর কবিতার যেটুকু যা-প্রয়োজন তা তিনি সহজভাবেই গ্রহণ করেছেন । একটা সহজিয়া, মরমিয়া হৃদয় ছিল তাঁর শব্দের আত্মায় । বৈষ্ণবীয় একটা উদারতা ছিল তাঁর চেতনায় । আবার সুফীবাদের- জীবনের প্রতি আত্মসমর্পণ ছিল তাঁর ভাবনায় । শূন্যতাবাদের, ছোঁয়া ছিল জাফরের মননের গভীরতায় । যেমন– ‘একটা সন্ধ্যাকে দেখেছি সতৃষ্ণ সোনার তরী / তার শূন্য পায়ে’ কিংবা ‘আমি জেগে দেখি সুসময় চলে গেছে / শূন্য মাঠে ভাঙা মুরলী’। আবার দেখি– প্রকৃত সুফীবাদীর মতো তিনি মৃত্যুকে মেনে নেন পরম মমতায় । সুন্দরের মধ্য দিয়ে এক অপরূপ ব্যঞ্জনায়– ‘সাঁকোর ওপারে একা একা হেঁটে গেছে / কতো পরলোক / একটি ধ্বনিও পাইনি আমি / শুধু একটি উদ্বাহুকে দেখেছি ধীরে ধীরে কবরের / ভেতর মমি হয়ে যায়’ । এমন উদাহরণ গোটা কাব্য জুড়েই বিরাজমান । কবি যেন চিরন্তন এক চেতনার প্রতীক ।
‘স্বগত নির্মাণ’ কবিতায় আমরা আগেই দেখেছি একটা মরমিয়া ভাব । জাগতিক ভাবনার উর্দ্ধে উঠে জীবনকে দেখার আপ্রাণ চেষ্টা দেখেছি। দেখেছি পীরবাবার খুঁজে দুটি চোখ– ‘আজ কে পারে সাত্ত্বিক হয়ে / জীবনে জীবন রেখে ছুঁয়ে যেতে মন / কে পারো কামনাকে দাহ করে আমাকে শ্রেষ্ঠ সূর্যোদয় দেখাতে ?’ আবার আল্লাহ্-র সাথে যেন একান্ত আলাপে তিনি বলে গেলেন কথাগুলি– ‘অনাসুখের আশায় আশায় আমি এখন / অসুখের ভেতর এক সুকণ্ঠ পাখী / প্রণত রাত্রির অন্ধকারে ভাসাই ভুলভ্রান্তির / ভাঙা নৌকাগুলো / কথামালা সাজাই আত্মজ প্রলাপে / আমি নিজেও ভাবতে পারিনে নিহত রাত্রির দিনগুলো / কি গেল ?’ বোঝা যায় কবি শেষের দিকে এক একটা দিনরাত্রিকে শিশুর মতো গ্রহণ করেছিলেন । বেলা বাড়ার সাথে সাথে তাঁর শিশু-দিনটাও বড় হতো, বড় হতে হতে দুপুর, বিকেল, ক্রমে নিহত রাত্রির দিকে গড়াত । কি সুতীব্রভাবে জীবনের মাঝে প্রতিটি মুহূর্তের সাথে তিনি বেঁচে থাকতে চেয়েছিলেন । দুঃখের বিষয়, জাফর মানতেন তাঁর মৃত্যু ঘনায়মান– ‘কবরের দিকে ছুটে যায় / ছুটে যায় পরিচর্যাহীন একমুঠো / ধুলো শূন্যের দিকে।’ জাফর সাদেকের জীবনীশক্তির পরিচয় পাওয়া যায় এই নীরব মেনে নেওয়ার মাঝে । আর এখানেই সাধকের মতো উতরে যান তিনি আমাদের কাছে । কবিতা ছিল তাঁর সাধনার ধন। মোক্ষলাভের উপায় । তাই তো তাঁর স্বীকারোক্তি আমরা কবিতায় দেখতে পাই– “স্বগত নির্মাণে অসুখের / ঘাড় মটকে লাফিয়ে পড়েছিলাম / কবিতার জঙ্গলে’–- কেননা, তাঁর মনে হয়েছিল একমাত্র কবিতাই পারে তাকে মৃত্যুভয় ভুলিয়ে দিয়ে আরও একটা নতুন সূর্যোদয়কে বরণ করে নিতে । কবি তাঁর বাল্যবন্ধুকেও এই কথাটি বলেছিলেন । এখান থেকেই আমরা ধারণা করতে পারি, জাফর কবিতাকে কীভাবে নিজের জীবনে, চিন্তা-চেতনায় স্থান দিতেন । একটা জায়গায় কবি হয়ত লিখেছেন তাই– “যেন সাতরঙে নন্দিত লোকটা জানে/অপেক্ষমান জীবনের নির্বাসনও / তার পরবর্তী শিল্পায়ন’– সে লোকটা কি নিজে ? সম্ভবত জাফর মৃত্যুর গন্ধও অনুভব করার চেষ্টা করতেন–“মৃত্যুর অম্লগন্ধে মহিমময় জীবন/যেখানে আলোক ও অন্ধকার মুখোমুখি হয়’ । আসলে কোনো কবির পক্ষেই মৃত্যুকে মেনে নেয়া সম্ভব হয় না । কবি তো জীবনেরই প্রতীক । জীবনই তাঁর সাধনা । কেবল হাঁটাই তার পাথেয় । অথচ সামনে নিহত রাত্রির দরজা । জীবনকে থামিয়ে দেয় ! ভয় দেখায় । কবি ভাবেন আমার হাত থেমে গেলেও লিপির তলপেট ঘেঁষে জেগে থাকবে শ্রমিক মিছিল । ‘কবিতার সহোক্তি সহস্রধারায় স্তনিত/প্রহর ভেঙে সাঁই সাঁই ছোটে/যেখানে বজ্রদগ্ধ আমি/তারপর পায়ে পায়ে নিরুদ্দেশ পর্যটক’– যেখানে কবি মৃত্যু-পথে হাঁটছেন, জানেন না কোথায় যাচ্ছেন, শুধু জানেন, যেতে হবে । ‘যেতে হবে বহুদূর’ ।
প্রখ্যাত আলোচক আবু সয়ীদ একবার বলেছিলেন– ‘কবিতায় প্রতিবাদ-কে বুঝতে হয় কবির বেদনাবোধের ধরণ থেকে, তার বাইরের শব্দ-কাঠামো থেকে নয় ।” জাফর সাদেকের কবিতায় তার উৎকৃষ্ট বহু উদাহরণ গেলেও মূলত তাঁর বেদনা এগোয় বড় ধীরে ধীরে । কবিতা সম্ভবত তাই, যা দিয়ে আমাদের বেঁচে থাকাকে গভীরতম আর ব্যাপকতমভাবে ছুঁয়ে থাকতে পারি আমরা । কবিতা হল তাই, যা আমাদের অধিচেতনা আর অবচেতনার সাথে কেবলই যুক্ত করে দেয়– আমাদের সময়ের চেতনাকে । কবিতা হয়ত তাই, যা আমাদের অতীত আর ভবিষ্যৎকে বর্তমানের একটা বিন্দুতে এনে বাঁধে । আমার মতে জাফর সাদেক অনেক অর্থেই প্রায় সার্থক । অধিচেতনা ও অবচেতনার এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ ও যথার্থ প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়– ‘নিহত রাত্রির দরজা’ কাব্যগ্রন্থে । এক গভীর সহমর্মিতায় নিজের কবিতার সাথে পাঠককেও জড়িয়ে ফেলেন কবি । অনেকের কবিতায় সৃজনশীলতার পাশাপাশিপাণ্ডিত্য জিনিসটা কবিতায় ঢুকে কবিতাকে গিলে ফেলে । জাফর সাদেকের ক্ষেত্রে সে-রকম হয়নি কখনও । আমার সবচেয়ে আশ্চর্য লেগেছে এটা ভেবে, কবিতায় প্রথাগত ভাঙন যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে চলছে, ঠিক সেই সময়ে জাফর সাদেক ভাঙনের মধ্যে দিয়ে না-গিয়ে, বেশিরভাগ কবিতায় সেই প্রথাগত গঠন প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়েই পাঠককে জড়িয়ে নিয়েছেন কবিতার অচিন এক জগতে । যে জগৎ ছিল একান্ত জাফর সাদেকের ।
জাফর সাদেকের শব্দ-সম্পদের কথা শুরু থেকেই বলে আসছিলাম । ‘নিহত রাত্রির দরজা’ কাব্যগ্রন্থে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত এমন অজস্র শব্দ, শব্দদ্বয়, শব্দচিত্র এসেছে যার প্রয়োগ আগে কখনই দেখা যায়নি, অন্তত ত্রিপুরার কবিতায় । এত ব্যঞ্জনা, মিথের ছোঁয়া, এত প্রকৃতি-ঘেঁষা, প্রতিটি শব্দকল্প জীবনের অন্তত কাছাকাছি। পুরো কাব্যের ভিতর থেকে কিছু নমুনা তুলে দিচ্ছি আমার মন্তব্যটি পরিষ্কার করতে গিয়ে, যেমন–
কলল, জনিতৃকোষ, ক্ষত-বিভূতি, নিস্বন,ব্রাহ্মলিপি, বায়বীয় করাত, নিকুঞ্জ-ক্ষত রাত, তেজারত,আনত জলপটি,অপক্ষপাতিত্ব, ঊর্মিমালার বার্ত্তা, নৃমুণ্ড পতন, মদিনী প্রেম, প্রণমা জিজ্ঞাসা, ভ্রমান্ধ, ধ্রুপদী আশা, আঘাত-বর্ধিত চেতনা, ঝনাৎ শব্দ, স্বৈরনাদিনী প্রেম, প্রণম্য জিজ্ঞাসা, হেমলুণ্ঠিত, প্রচক্র রাত্রিচর, শুণ্ঠিমারা ভোর, আগুনের সান্দ্র বুক, ললিত লজ্জা, তসবী আঁকড়ে, অনিম বিছানা, তাকিয়া, চাকতির নাভি ছুঁয়ে, জলপ্রিয় পাখী, প্রস্রবণ, সাত্ত্বিক রোমন্থন, শব্দদ্রোহ, স্তবক আন্দোলন, নামের বর্তিকা, ভেজা চুলের শুদ্ধি গন্ধ, ভলোবাসার ঝনন-রণন, ওলানে দুধের মমতা, প্রেমেন্দ্র বিলাপ, বিশঙ্ক কাল, দুরন্ত রুদ্রদৌড়, মদ্ভেদী বীজ, বৃক্ষ-বিভূতি, ব্যুমেরাং আকাশ, ভালোবাসার শানপাথর,বিভ্রম আহ্লাদ, সংলাপ সেতু, জবুথবু পা, কিংশুক শয্যা, অন্ধধারণা, তায়ুশ চুরি, রৌদ্রযোনি গড়িয়ে নামে, বৃষ্টিভেজা ভ্রূণ, নিম্ব জমি, পিঠে স্মৃতির লাঙল, কবিত্ব অন্ধকার, নেত্রমায়া, নটপাখী, টুপটাপ শিশির রাত, ঘাসে ভিতর মৃত জোনাকি, চৈতন্য ডালপালা, জন্মনিধুবনে, রতিবাণে নির্মাণ, জ্যৈষ্ঠের বিভূতি আকাশ,নষ্ট ইচ্ছার খোল, যৌন উল্লাস, সঙ্গমের দিকে ঝুলছে ঈশ্বর, হৃদয়ে প্রহরী এল্যুশন, প্রণয়ে লহরী মৌমাছি, ভৈরবী ঢিল, উপজীব্য স্বপ্ন, বিপ্লাবন, সময়ের কুতকুত হাঁটা, রাহিত্য আত্মাময়, ভুলের কাকপদ, সংযত করাত, সময়ের একঘ্নী আঘাত, কবর রাত্রির লাশ, কাফন কীর্তন, শারীরিক ফুল, বেতালসিদ্ধ, শূন্যমাঠ ভাঙা মুরলী, আয়ুধ করাত, সময় চিতা, অন্তজ ঋতুর ভিতর, নিরভ্র জীবন, শূন্য কুম্ভ হাসে, অনন্ত অসুখী আঁধার, শ্মশানঘুম, সম্মোহিত নষ্টবাড়ী, কঙ্কালবাড়ী, বঙ্কিম স্তবক, বাহুলীনা, শ্মশান- উৎসব, শবশকট, চৌভিতে আগাছার জঙ্গল,গভীরে রতিমুখ, অনির্বাণ করতালি, স্তব্ধীভূত শব্দেরা, অন্ধিকা, বিবর্দ্ধিত জগত, ব্যথাতুর কম্পন, কবর-শর্বরী, ঈর্ষাছিন্ন রাত্রির আলিঙ্গন, অশনি মিলন, অনার্য হাসি, বহুলীন সভ্যতার ফুলদানী, স্মৃতির উড়ুক্কু মাছ, উদ্বীক্ষণ, বিমুক্ত মুখ, নির্মেন্দু রস, জলের স্তম্ভন, স্তিমিত শূন্য কানন, হরিণ কান্না, প্রগত রাত্রি, আত্মজ প্রলাপ, নিহত দিনগুলো, কপটদ্বার,ক্ষাত্রপ্রেম, সহোক্তি, স্তনিত, বজ্রদগ্ধ, অনিন্দ্য,গর্ভবতী শব্দের পোষাক, ত্বদীয় বিড়াল, অনিরুদ্ধ শূন্যতা, অযাচিত সন্ন্যাস, পিঠে স্মৃতির লাঙল ইত্যাদি আরও শব্দের সমাবেশ দেখি- ‘ নিহত রাত্রির দরজা’ কাব্যগ্রন্থে ।
আবার জাফর সাদেক-কের যেসব লাইন আমাকে খুবই প্রভাবিত করেছে , আমি তাদেরও একটা তালিকা করার চেষ্টা করেছি । এক ঝলকে দেখে নিতে পারি তাদের –
১। পাখীগুলো উড়ে যায় বাসায় বাসায়
বুকের ব্রাহ্মলিপি বোঝে না কেউ । ( ব্রাহ্মলিপি)
২।এভাবে প্রতিদিন কবিতার হৃদয়ে বাঁচে কিছু অনুভব ( ইতিহাস )
৩। এখন চৈত্রমাস / নেতার মতো ধুঁকছে ক্ষয়ে মাঠের ঘাস । ( খুলছি অ্যালবাম )
৪। উদ্ধত শূন্যতার কানে কানে / ছুটে যেতে পারি দুরন্ত ট্রেনের গতিতে (খুলছি অ্যালবাম )
৫। সময়ের অনুজ্ঞায় ধর্ষিত গাছ চিৎকার / করে তন্বী যুবতীর মতো (সহিত বসন্তের কবিতা)
৬। চিত্রিত চেতনার ভেতর বহুদূর চলে গেছে আড়াল কাঙ্ক্ষিত / ঘ্রাণ (নির্মাণের সাতরঙ)
৭। বৃদ্ধের ধরনে নুয়ে পড়া দিনের শেষের ছায়ায় (নির্মাণের সাতরঙ)
৮। বৃষ্টির গাঢ় কণ্ঠস্বর শুনতে শুনতে / ঝনাৎ শব্দে চৈতন্য ফিরে চুপ হয়ে আছি । (৮ই অক্টোবর ১৯৯০ )
৯ । থিরথির কাঁপছে আশ্বিনের ধানক্ষেত (৮ই অক্টোবর ১৯৯০)
১০। প্রণম্য জিজ্ঞসায়/রচয়িতা জানে তার নির্মাণের হাত দুটি কত অসহায় (চতুর্দশপদী রাত্রি )
১১। নিহত দিনগুলির শ্যাওলার তলে/যেন স্থলিত স্বভাব সুর ভেঙে খায় (চতুর্দশপদী রাত্রি)
১২। লেপাপোঁছা উঠোনে লক্ষ্মীর পা যেন লয়হীন মহাকাল (চতুর্দশপদী রাত্রি)
১৩। রাত রাতের ভেতরেই ঘুমোয় (রাত দিনে আসে না)
১৪। অনিম রাতের বিছানায়/জ্যোৎস্নার রস/ভালোবাসাকে মন্থন করেছে সারারাত (রাত দিনে আসে না)
১৫। প্রলম্বিত আশা রম্য বুকের কাছে হাত দুটো রাখে (অবিনাশী)
১৬। জল-ঝাপ্টায় ভেজা চুলের শুচি গন্ধ (ভালোবাসার ঝনন-রণন শব্দে)
১৭। ভালোবাসার ঝনন-রণন শব্দে রক্তে / আগুন জাগে (ভালোবাসার ঝনন-রণন শব্দে)
১৮। বনপোড়া সাপের মতো বর্ষানদী (জীবন বাজছে দ্রুত)
১৯। দেখি মানুষের বুক থেকে ধ্বসে পড়া পাথর / শান্ত জীবনের কাছে ক্ষমার দুরন্ত রুদ্রদৌড় (জীবন বাজছে দ্রুত)
২০। গমনের ভিতর গীত কোলাহল (তট)
২১। বহতা জলের মতো আমাদের চোখ দুটো / সময়ের জাদুবাক্সের দিকে ধাবিত (তট)
২২ । মাঝে সংলাপ সেতু / ভুল হরফে আলিঙ্গন করে তট (তট)
২৩। দুপুর কোথাও না কোথাও থেকে যায় / থেকে যায় প্রেমিকার জবুথবু পা ( এই কবিতার নাম করণ করে যাননি কবি )
২৪। সাতরঙে নন্দিত ভোরের জঙ্ঘায় / রৌদ্রযোনি গড়িয়ে নামে শৈলবালারূপে (এই কবিতার নাম করণ করে যাননি কবি )
২৫। নিশাচর পাখীর ডানা ঝাপটানো মুহূর্তগুলো (অন্ধকারের সামনে)
২৬। ঘাসের ভিতর মৃত জোনাকির / জীবনের মতো নির্জনতা (অন্ধকারের সামনে)
২৭। জীবনের প্রথম শর্ত ছিল আমরা পাল্টাইয়া যাইব (আমাদের কবিতা সমগ্রের শ্রেষ্ঠ কবিতা)
২৮। তোমার গালে খাসজমিতে ফসলের চিত্র এঁকে / দেখেছি মেঘবহ্নি (তোমাকে দেবো জাতীয় সংগীত)
২৯। জন্মদিনের পাশাপাশি মৃত্যুদিন দেহরক্ষীর / মতো চোখ ঠেরে চায় (পরিকল্পিত হাত)
৩০। এক একটা জন্ম মানেই এক একটা মৃত্যুর দাসখত (পরিকল্পিত হাত)
৩১ । কাকে ডেকে বলবো মানুষের বস্তাপচা কান্না / স্বর্গে পৌঁছায় না (পরিকল্পিত হাত)
৩২ । নষ্ট করতালির ঘেরাটোপে ডুবে যায় / অনিবার্য ভারতবর্ষ (নষ্ট করতালি অনিবার্য ভারতবর্ষ)
৩৩। প্রতিটি চোখের দারুণ ভ্রূকূটিতে / নানারকম ধিক্কার ( সভাকক্ষের চেয়ার )
৩৪ । ঘুম কি জানে অঘুমের চোখ / কখন ফোটে (ঘুম ও অঘুম )
৩৫। হাঁসের পালকের মতো ঝরে যায় পংক্তিমালা (সময়ের একঘ্নী ঘাতক )
৩৬। সময়ের কুত-কুত হাঁটা দিন থেকে দিনান্তরে / একা একা (সময়ের একঘ্নী ঘাতক )
৩৭। নির্বিকার দেহে জন্মায় ঘাস ও ভূমিজ লতা (সময়ের একঘ্নী ঘাতক )
৩৮। মাংসল স্বাদের গন্ধে ফুটে আছে শারীরিক ফুল (কাফন কীর্তন)
৩৯। সাঁকোর ওপারে একা একা হেঁটে গেছে / কতো পরলোক (দ্বিখন্ডিত আত্মধ্বনি)
৪০। আমি জেগে দেখি সুসময় চলে গেছে/শূন্যমাঠ ভাঙা মুরলী (দ্বিখন্ডিত আত্মধ্বনি)
৪১ । একাকী চিঠির মতো নিঃসঙ্গ আলিঙ্গন (অলগ্ন ছায়ার মুখোমুখি অনন্ত অসুখী আঁধার)
৪২। আমাকে ডাকে শ্মশান ঘুম / মৃত্যু এবং মায়াবিনী (নষ্টবাড়ী)
৪৩। নিশীথ শীৎকারের পবিত্র পুষ্পাঞ্জলি (শ্মশান রাত্রির উৎসব)
৪৪। মৃতকে স্পর্শ করিলে মানুষ বীতকাম হয় (শ্মশান রাত্রির উৎসব)
৪৫। বৃষ্টিস্নাত ভোরের স্নিগ্ধ গোলাপ / পাশে তার ব্যথাতুর কম্পন (দাঁড়াও সমাধি নিদ্রা)
৪৬। আয় দুঃখ কাছে আয় তোকে হিম করে দিই (দাঁড়াও সমাধি নিদ্রা)
৪৭। বুকের সন্নিহিতে যে মুহূর্তগুলো ফেটে আছে / শূন্যময় / ওদের সমাদরে ডেকে এনে শুধু একবার বলতে চাই, বসো । (দাঁড়াও সমাধি নিদ্রা
৪৮ । ভাঙা সাঁকো হেঁটে যাবে বাড়ীর ভেতর / একদা সেও ভালোবাসতো (যাক না সে)
৪৯। নীড়ের পাখী উড়ে গ্যাছে / নষ্ট নীড় ধূলোয় এখন (যাক না সে)
৫০ । বাসর ভাঙা রাত্রির অভিসার (দৈব)
৫১ । অনাসুখের আশায় আশায় আমি এখন / অসুখের ভেতর এক সুকণ্ঠ পাখী (স্বগত নির্মাণে)
৫২। প্রগত রাত্রির অন্ধকারে ভাসাই ভুলভ্রান্তির / ভাঙা নৌকাগুলো (স্বগত নির্মাণে)
৫৩। নিঝুম জুমে রমণঘুমে পইড়্যা আছে (যখন খুশী যাইবেন ডাকবেন)
৫৪ । হে রাত্রির মাঝি স্তম্বিত কর লগি (নিহত রাত্রির দরজা জানালা)
গোটা কবিতার নিরিখে এই লাইন গুলো এক ধরণের অনুভূতি জাগায়। আবার এককভাবে লাইন গুলোকে কবিতা থেকে সরিয়ে আলাদা ভাবে পাঠ করলে, আরেক রকমের ইমেজ তৈরি করে আমাদের মনে ।চিত্রের মতো যেন পলে পলে তার প্রেক্ষাপট পাল্টায়। এটাই কবিতার মজা। জাফর সাদেকের কবিতার মজা । মাইকেল মধুসূদন বলেছিলেন– ‘শব্দের সঙ্গে শব্দের বিয়ে দেন যিনি, তিনি কবি ।’ সেই অর্থে জাফর সাদেক বড় মাপের কবি । শব্দের সাথে শব্দ জুড়ে দেওয়ার কুশলতা দেখা যায় তাঁর ভিতর। তাঁর কবিতায় একই সাথে লিরিকধর্মী এবং অন্তর্মুখী । শব্দকল্প নির্মাণের স্ফূর্তিতে জাফর সাদেক অনন্য । কথামালার কোলাজ নির্মাণ করেছেন কোনো কোনো কবিতায় অসামান্য দক্ষতায় ।
জাফর সাদেকের শব্দ ব্যবহারকে আমরা তিনভাগে ভাগ করতে পারি । যেমন – ১। হিন্দুপ্রধান ২। ইসলামপ্রধান ৩। সাধারণ । এখানে জাফরের শব্দপ্রয়োগের নানাদিক তুলে ধরাই আমাউদ্দেশ্য। যেমন–
১। হিন্দুপ্রধান ঃ ব্রাহ্মলিপি, বিভূতি, ধ্যানমগ্ন, নিকুঞ্জ, সমাধি, ঊর্মিমালা, গৈরিক বসন,নৃমুণ্ড পতন, স্তব, যক্ষ, নামপ্রভ, ধ্রুপদী, চৈতন্য, নারায়ণ, প্রণম্য, নামাবলী, পাষাণ প্রতিমা, সন্ন্যাসী, সাত্ত্বিক, শ্মশান, শ্মশাননাগ্নি, শৈববালা, দেবদূত, মোহনবাঁশী, মৃত্তিকা, ঈশ্বর, ভৈরবী, রাম রাম, মন্দির, হরি ওঁ, পাঁচালী, যোগিনী, ব্রত, একঘ্নী, স্বৈরনন্দিনী, ইহজন্ম, নরলোক, মুরলী, কীর্তন, বঙ্কিম, ভগবান, পরলোক, নীড়, পিতামহ, ধরণী, দাহ, ইত্যাদি
২। ইসলামপ্রধান ঃ জান্নাম, কবর, পরী, তসবী, দরবেশ, তেজারত, আজান, আরবী, কাফের, মিঞা, তায়ুশ, তোবা, মসজিদ, আল্লাহ্, অলিফ, বে, নীকা, নূর, কোরান, সেলামী, গম্বুজ, তালাক, সরিকানা, হরম, তাকিয়ে ইত্যাদি ।
সবচেয়ে বড় কথা এই অজস্র শব্দকে কবি কী অসাধারণ দক্ষতার সাথে কবিতায় জড়িয়ে ফেলতে পেরেছেন । কোনো কোনো শব্দ এতটাই গদ্যধর্মী ছিল যে, ভাবতে অবাক লাগে তিনি কীভাবে সাহস করে এটাকে নির্বাচন করলেন । যেমন একটি শব্দ বলছি– ‘নিধুবন’। যার আভিধানিক অর্থ– রমণ, মৈথুন, কামকেলি ক্রীড়াকৌতুক, আমোদ-প্রমোদ । ‘নিধুবন’–এর দ্বিতীয় আভিধানিক অর্থ– বৃন্দাবনের নিধু নামক বন, রাধাকৃষ্ণের কেলিকানন ।
জাফর দুটি কবিতায় এর প্রয়োগ করেছেন কি অপূর্ব ব্যঞ্জনায়– ‘সেখানে মোহন বাঁশী পাশে নিধুবন / যেখানে বৃত্তস্রোতে কাঁদে মহাজীবন (সময় ধমনীময়)। আবার ‘আমাদের কবিতা সমগ্রের শ্রেষ্ঠ কবিতা’ নামের কবিতায় লিখলেন– ‘মাতাল শাসকের ষড়যন্ত্রের মতন আমাদের জন্মনিধুবনে শ্মশান ঢুকিয়া যাইবে।’ অথচ চট করে শব্দটা নজরে বা মননে ধরা পড়ে না । এভাবে বহু বিচিত্র শব্দ লুকিয়ে আছে ‘নিহত রাত্রির দরজা’-য় । আপনাকে শুধু একটু যত্ন করে দরজাটা খুলতে হবে ।
জাফর সাদেক আগরতলা আসার পর যাদের সাথে ঘনিষ্ঠ হয়েছিলেন, তাদের মধ্যে প্রবুদ্ধসুন্দর কর একজন । জাফরদা সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন– “আমাকে জাফরের পছন্দ করার কী কারণ ছিল জানি না । জাফর মারা যাবার তিন চারদিন আগে আমাদের বাড়ি এসেছিল । বাল্যবন্ধু অনুপম সেদিন আমার সাথে ছিল। আমরা তিনজন হাঁটতে যাই । যতদূর মনে পড়ে সময়টা সংক্রান্তির আশপাশ ছিল । আমরা এক সাথে পিঠেও খেয়েছিলাম ।মা হঠাৎ লক্ষ করলেন, জাফরের গায়ে কোন ধরণের শীতবস্ত্র ছিল না । তখন মা তার একটা চাদর জাফরের গায়ে জড়িয়ে দেন । আমরা তিনজন চানমারির দিকে হাঁটতে গেলাম । চরাই-উৎরাই পেরিয়ে হাঁটলাম অনেকক্ষণ । জাফর তখন হোস্টেলে থাকতো । মাঝমধ্যে আমার সাথে দেখা করতে আসতো । একবার তো একাদশ শ্রেণিতে রাষ্ট্রবিজ্ঞান পরীক্ষা না-দিয়ে চলে আসলো আমার এখানে । আমি বললাম– “কী ব্যাপার ? আজ না তোমার পরীক্ষা !” উত্তরে বলল, আজকের পরীক্ষা বহিষ্কার করলাম । এটা তো রাষ্ট্রবিজ্ঞান না, আমার কাছে এটা একটা নষ্টবিজ্ঞান ।
যদি জাফরের অকাল মৃত্যুটা না-হত,তাহলে জাফর যে কবিতাই লিখত, তা আগাম বলা খুব কঠিন । কারণ একটা সময় আর্তুর র্যাবোঁ কবিতা লেখা ছেড়ে দিয়েছিলেন । এবং তথাকথিত অন্যায় ব্যবসায় জড়িয়ে গিয়েছিলেন । নিজেকে সেখান ব্যস্ত রেখেছিলেন । জাফরের মধ্যে যেটা ছিল, শুরু থেকেই তাঁর মধ্যে একটা অদ্ভুত কবিতা-চেতনা ছিল । তাঁর যে, বাক্যকে এরেঞ্জ করা, বাক্য কমিউনিকেনট করানো, এই দক্ষতা জাফরের মধ্যে ছিল । আরও আশ্চর্যের ব্যাপার যে, শুরুর লেখালেখিতে কারও মধ্যে এমনভাবে মৃত্যু-চেতনা কাজ করতে পারে, এটা জাফরের মধ্যে দেখে আমি একটু অবাকই হয়েছিলাম । আরও অবাক হয়েছি তাঁর মৃত্যুর পরে, একটি ছেলের মধ্যে তখন তাঁর কত আর বয়েস,আমার ধারণা বিশ বা একুশ, এই রকম একটা সদ্য লিখতে আসা তরুণ, চেহারা খুবই সুন্দর, বিদ্যুতের মতো সুন্দর ছিল মুখটা । তাঁর মধ্যে এত মৃত্যু-চেতনা কেন আসবে, এটা আমাকে খুব ভাবিয়েছিল । জাফরের মৃত্যুর পরে তাঁর ‘নিহত রাত্রির দরজা’ যখন প্রকাশিত হয়, পারিবারিকভাবেই তারা বইটি করে ।তখন যেহেতু আমি কলকাতাতে পড়তাম, তাই সবাই দায়িত্বটা আমাকেই দেয় । আমি এটা তরুণ প্রিন্টার্স, কলেজ স্ট্রিক্ট থেকে করিয়ে আনি । প্রায় ৮০০ কপি বই করা হয়েছিল । বই নিয়ে এয়ারপোর্টে আসার পর একটা মুস্কিলে পড়ি । তুমি তো জানো, এখানে ওজনের একটা ব্যাপার থাকে । কী করা এখন ? তখন আমি একটা বই নিয়ে, পেছনে জাফরের ছবি ছিল, লাইনে দাঁড়ানো কয়েকজনকে বললাম- ‘দেখুন, আমাদের বন্ধু জাফর, খুব অল্প বয়সে মারা গেছে, খুব বেশি দিন হয়নি । তাঁর মৃত্যুর পরে বইটা প্রকাশ করা হয়েছে । এটা আমাদের জন্য একটা শ্রাদ্ধের মতো কাজ । প্লীজ, আপনারা যদি একটু সহযোগিতা করেন, তাহলে বইটা আমি আগরতলা পাঠাতে পারি !” জানি না, কী জাদু ছিল সেদিনের আমার কথায় । সব কিছু শোনার পর কয়েকজন রাজি হয়ে যায় । কয়েকজন ভাগ করে নেয় বইগুলি । এটা আমার জন্য একটা স্মরণীয় ঘটনা ছিল ।
যাই হোক, জাফরের শুরু, এই শুরু বোধ হয় অনেক কম কবিরই থাকে । এইরকম শুরু ত্রিপুরাতে খুবই কম দেখেছি । জাফর খুবই তরুণ, টেনডার এজ, এই বয়সের একজন কবিকে ভালো-মন্দ বলা খুবই মুস্কিল । তিনি জীবিত থাকলে আরও ভালো লিখতেন। খুব ভালো লিখতেন, এই কথাগুলো খুবই আপেক্ষিক ব্যাপার । তিনি আর নাও লিখতে পারতেন ! জাফরের মধ্যে একটা অদ্ভুত বাল্মীকি প্রতিভা ছিল । যেটা এত কম বয়সে, এত ডেপথ, এত ম্যাচিউরিটি, খুব কম লক্ষ করা যায় ।” কথার ফাঁকে প্রবুদ্ধদাকে জিজ্ঞেস করলাম,- ‘তুমি ব্যক্তি-জাফরকে কেমন দেখলে ? তাঁর চলাফেরা, তাঁর আচার-আচারণের নানা দিক নিয়ে আমাদের কিছু বল !’ উত্তরে প্রবুদ্ধদা বললেন, ব্যক্তি জাফর একটু লাজুকই ছিল । প্রথম পরিচয়টাই এত আন্তরিকভাবে হয়, কী বলবো ! তুমি তো জানোই, আমার একটু খুনসুটি করার অভ্যাস আছে । জাফরকে আমি প্রায় সময়ই খোঁচা দিতাম,- ‘এত সুন্দর চেহারা তোমার। সেই হিসেবে তো মেয়েরা তোমাকে বিব্রত করার কথা । প্রেম নিবেদন করার কথা !’ তখন জাফর মিটিমিটি, কখনও আবার সশব্দে হাসত। কিন্তু আমার মতে, তখনও ‘ব্যক্তি–জাফর’ বলাটা খুব মুস্কিল । বরং বলা যায়, একটি সাবালক, যে কিনা এখনও যৌবনে এসে পৌঁছায়নি । একটা সন্ধি-সময়ের ভিতরেই দিয়েই বড় হচ্ছিল সে । অদ্ভুত শিশুর মতো একটা সারল্য ছিল তাঁর চোখে-মুখে । তাঁর এই ব্যাপারটা আমাকে খুব মুগ্ধ করতো । কথায় কথায় প্রবুদ্ধদার কাছে, হঠাৎই জানতে চাইলাম,- ‘তোমার সাথে কখনও কী কোনো ধরণের প্রেম নিয়ে কথা বলেছিলেন জাফর-দার ?” উত্তরে বললেন,- “না, তেমন ভাবে কোনো কথা হয়নি । বা সেও বলেনি । শুধু একদিন বলেছিল, একটি মেয়ে যার সাথে তাঁর কখনও কথা হয়নি । কিন্তু হাব-ভাবে হয়ত বোঝা যেত, মেয়েটি জাফরকে খুব লক্ষ করতো । এই যা ! নাম টাম কিছু বলেনি ।’
‘মৃত্যুর খবরটা কখন শুনলে?’ আসলে ঐদিন আমি জিবিতে আড্ডা দেয়ার সময় হঠাৎ শোনলাম, জাফর আর নেই । শোনার পর আমি আর নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে পারিনি । সাথে সাথে আমি, অনুপম জিবি হাসপাতালের জরুরী বিভাগে দৌঁড়ে গেলাম । এবং যথারীতি শোনলাম– জাফর আর নেই আমাদের মাঝে । পরদিন বিশালগড় জাফরের বাড়ি যাই । আকবর আকস্মিক এই ধাক্কায় একদম ভেঙে পড়েছিল । আমাকে দেখেই খুব কান্নাকাটি করল । খুব স্বাভাবিকভাবেই মর্মান্তিক অবস্থা ছিল বাড়ির বাকি সবারও। এবং ঐদিন আমাকে আমার মায়ের চাদরটা আমার হাতে তুলে দেয়া হল, যেটা মা জাফরকে পরতে দিয়েছিলেন । এই চাদরটা আমাদের বাড়িতে বহুদিন যত্ন সহকারে ছিল জাফরের স্মৃতি হিসেবে । এটা দেখলেই জাফরের কথাটা মনে পড়ত । প্রচণ্ড একটা বিষণ্ণতা মনকে তখন গ্রাস করতো । জাফরের কবরটা দেখে আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না, যে মানুষটা চার-পাঁচদিন আগে আমাদের বাড়ি ঘুরে এলো,আজ সে নেই ! বিশ্বাস করতে পারছিলাম না কিছুতেই যে, সে আর কোনদিন জেগে উঠবে না । সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় জানো তমাল, তাঁর যে হার্টের সমস্যা বা সে-যে এত ঝুঁকির মধ্যে জীবন-যাপন করছে, এককথায় সে তাঁর অসুখ-বিসুখ নিয়ে আমাদের সাথে ঘুণাক্ষরেও কখনও কিছু বলেনি । বুঝতেও দেয়নি। আকবরও তার লেখায় উল্লেখ করেছে, তাদের বংশে নিয়তির একটা করুণ অভিশাপ খেলা করে । অদ্ভুত অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটে চলে তাদের পরিবারে । এত অভিজাত- সম্ভ্রান্ত পরিবার । শিক্ষা-দীক্ষায় সব দিক দিয়েই অভিজাত পরিবার । কিন্তু কোথায় যেন সেই এক অভিশপ্ত ঘটনাপ্রবাহ লেগেই আছে তাদের পরিবারের সাথে...! পরেও একদিন আমি নকুল রায়, দিব্যেন্দু নাগ ওদের বাড়িতে গিয়েছিলাম। থাকাও হয়েছিল । জাফরের জন্মদিনকে কেন্দ্র করে একটা অনুষ্ঠান হয়েছিল । সেদিন পুরো রাত জাফরের বাবার চিৎকার শোনলাম । বাতের যন্ত্রণায় অসহ্য কষ্ট পাচ্ছিলেন। দিনের বেলা একটু কম থাকলেও রাতের বেলা ব্যথাটা খুব বাড়ত । তাদের পরিবারের সাথে দুঃখ শব্দটা কেমন যেন সহজাত হয়ে গিয়েছিল । একের পর এক ঘটনা !
‘নিহত রাত্রির দরজা’ যেন মৃত্যুর ভিতর দিয়ে মায়াময় এক জীবনকে দেখা । আনন্দকে স্পর্শ করা । এই কাব্যের ভিতর দিয়ে জীবনের চিত্রময় এক জগৎ যেন ভ্রমণ করে এলাম । পরিশেষে আমার আবারও বলতে ইচ্ছে করছে – জাফর সাদেকের কোনো পূর্বসূরি নেই, উত্তরসূরিও এ-যাবৎ নেই । সব অর্থেই তিনি অনন্য । এবং একমাত্র ।
.......................................
(বইয়ের পেছনের পাতায় এই উক্তিগুলো থাকলে ভালো হবে মনে হচ্ছে । কবির বাড়ির রাস্তার ছবিটা দেয়া যায় কিনা ভাবা যেতে পারে ।)
(জাফরের মাথাটা ছিলো এক বঙ্গীয় শব্দকোষ বিশেষ । ... তাঁর কবিতায় আমরা আবিষ্কার করছি ভারতীয় দর্শন ও সনাতন ঐতিহ্যের সারোৎসার। – কৃত্তিবাস চক্রবর্তী
ত্রিপুরার একশো বছরের বাংলাকবিতাপ্রবাহে ‘ নিহত রাত্রির দরজা ’ একটি দীঘলবাঁক। ‘... ভাষার এহেন দুরন্ত গতি, বোধের গভীরতা, আশ্চর্য শব্দচয়ন ও অভিজ্ঞতা দেখে কে বলবে এই কবির বয়স মাত্র কুড়ি বছর ?’ -- সন্তোষ রায়
শব্দ তার সার্থকতা পায় তখনই, যখন বাক্য পায় সার্থকতা । জাফরের কবিতায় সেই সার্থকতা দেখা যায় – সেলিম মুস্তাফা
জাফরের মধ্যে একটা অদ্ভুত বাল্মীকি প্রতিভা ছিল । -- প্রবুদ্ধসুন্দর কর
জাফর সাদেকের কোনো পূর্বসূরি নেই, উত্তরসূরিও এযাবৎ নেই – তমালশেখর দে )
.jpg)


















No comments:
Post a Comment