“ প্রকৃত ছবি কথা বলে দর্শকের সাথে ”
ত্রিপুরা রাজ্যের আর্ট কলেজ প্রতিষ্ঠার সাথে যে
দু’তিনজনের উদ্যোগ,পরিকল্পনা শ্রম-ভালোবাসা জড়িয়ে ছিল, তাদের মধ্যে শান্তিনিকেতন
ফেরত আগরতলার চিত্র-ভাস্কর্য- ক্রাফট-স্কাল্পচার শিল্পী
সুনীলকৃষ্ণ রায় অন্যতম একজন। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল তাঁর সাক্ষাৎকার নেয়ার। অজস্র কথামালার ভিতর থেকে কিছু
কথা তুলে ধরলাম এখানে।
প্রশ্ন ঃ আপনার জীবনের আর্টের বা ছবির প্রতি একটা মোহ ঠিক কখন বা কীভাবে জন্মায় ?
উত্তর ঃ আমার ছোটবেলা থেকে ছবি আঁকার প্রতি একটা
ঝোঁক ছিল।আমার মা আমাকে এই ব্যাপারে খুব উৎসাহ দিতেন। তা’ছাড়া আমাদের পারিবারিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও এখানে কিছুটা কাজ করেছিল বলে
আমার মনে হয়।আমার ঠাকুরদাদা,বাবা, জ্যেঠু, ত্রিপুরার মহারাজাদের ব্যক্তিগত
জুয়েলারস হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। শুধু রাজপরিবারেরই কাজই করতেন। যাই হোক, মাধ্যমিক পরীক্ষার পর পারিবারিক
আর্থিক কারণেই চাকরির খোঁজ করতে লাগলাম। কিন্তু তখনও ব্যক্তিগত তাগিদ, ভালোবাসা থেকে ছবি আঁকার কাজ
চালিয়ে যাই।এরমধ্যে একদিন বাবার বিশেষ বন্ধু নলিনী মজুমদার, ছবির ব্যাপারে আমার আগ্রহ
জানতে পেরে বললেন --‘দূর বোকা! ভাত মিলত না, ভাত মিলত না!’সময়টা ১৯৫২ সাল।এর
অনেকদিন পর বুঝেছি খুবই সত্য কথা বলেছিলেন। আমাদের পরিবারের আরেক এক হিতৈষী আবার আমাকে বেশ জোর দিয়ে বললেন- ‘না, তোমার যেহেতু আর্টের দিকে
ঝোঁক, আমি বলবো, তুমি ঐ লাইনেই পড়াশোনা
কর।’ মূলত তাঁর প্রেরণা এবং সহযোগিতায়ই বাবা আমাকে নিয়ে শান্তিনিকেতনে কবিশুরুর
আশ্রমে নিয়ে ভর্তি করালেন। সেখানে গিয়ে বাবার বন্ধু চিফ মেডিক্যাল অফিসার শচিন্দ্র
মুখোপাধ্যায়, একসময় কবিগুরুর চিকিৎসকও ছিলেন, তিনি আমাকে খুব সাহায্য করেন । প্রথম দিকে আমার
মনটা একটু খারাপ হয়ে গিয়েছিল,এটা জেনে যে, শান্তিনিকেতনে ওয়েল পেইনটিং চর্চা করা
নিষিদ্ধ। আমার আবার ‘তেল রং’ ছবির প্রতি ছিল প্রবল ঝোঁক। তখন বাবা এবং বাবার আরেক
বিশেষ পরিচিত পশ্চিম বঙ্গের সরকারি আর্ট
কলেজের প্রিন্সিপ্যাল রমেন চক্রবর্তী আমাকে বোঝালেন, শান্তিনিকেতনের মত এত
খোলামেলা সাংস্কৃতিক পরিবেশ,ছবি শেখার মত
বিশাল প্রেক্ষাপট তুমি আর কোথাও পাবে না। আমি বলি কি, তুমি আর কিছুদিন থেকে দেখো। তারপর ভাল না-লাগলে আমি ত
আছিই। তোমার যেখানে ভাল লাগে আমি সেখানেই তোমার দেন এন্ দেয়ার ভর্তি করিয়ে দেব।’ তারপর যতই দিন
যেতে লাগলো, ততই শান্তিনিকেতনের বিশালতা উপলব্দি করতে পারছিলাম এবং বুঝলাম
‘ইন্ডিয়ান আর্ট’ শিখতে গেলে, এরচেয়ে ভাল আর কোন প্রতিষ্ঠান হতে পারে না। এভাবেই
শান্তিনিকেতন এবং ভারতীয় আর্টের প্রেমে পড়ে যাই।শান্তিনিকেতনের সেই পরিবেশ,সেই
প্রকৃতির নিবিড়তা আজ অনেকটাই নেই।
প্রশ্ন
ঃ শান্তিনিকেতনে সেই সময়ের পাঠ, পঠন শৈলী শিক্ষার্থী-শিক্ষক সম্পর্ক নিয়ে আমাদের
কিছু বলুন?
উত্তর ঃশিক্ষার্থী-শিক্ষক সম্পর্ক ছিল বন্ধুর
মত।সেখানে শিক্ষকমশাইকে সবাই ‘দাদা’বলে সম্বোধন করা হত। অতএব বুঝতেই পারছ
সম্পর্কের সহজাত-সতেজ দিকটা।আমাদের সময় পেন্টিং,
স্কাল্পচার, প্রিন্ট-মেকিং,ক্রাফট সবই শেখানো হত।যা এখন আর নেই। এখন সব বিভাগ আলাদা আলাদা হয়ে গেছে।এর সাথে ওর
যোগাযোগ নেই। আমরা কিন্তু সব বিভাগে কাজ করেছি, হাতে-কলমে শিখেছি। রবীন্দ্রনাথের
সেই ‘রূপকলার প্রাণনিকেতন’ আমরা সত্যিই
খুব উপভোগ করেছি। সেখানে আমি আমার প্রিয় মাস্টারমশাইকে ধীরেণ কৃষ্ণ
দেববর্মণ’কে পাই।রাজপরিবারের মেয়ে জামাই ছিলেন।
সেই
সূত্রে বাবার সাথে খুব ভাল সম্পর্ক আগে থেকেই ছিল। ধীরেণ’দার কাছে আমি যা শিখতে
পেরেছি, সেটাকে আমি সারাজীবন পথেয় করে বলেছি। আমার সৌভাগ্য জগৎবিখ্যাত চিত্রকর নন্দলাল বসুকেও আমি মাস্টারমশাই হিসেবে পেয়েছিলাম।প্রথম বর্ষে পড়ার
সময় তিনি একদিন আমার কাজের পাশে এসে বসলেন, অনেকক্ষণ ধরে আমার কাজ, কাজের ধরণ
পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেন। আমার শরীর ত তখন রোমাঞ্চে টগবগ করছিল, টেনশনও হচ্ছিল খুব,
‘কি জানি বলবেন!’ না, শেষ পর্যন্ত তিনি খুব খুশি হয়েই আমাকে কিছু কিছু মূল্যবান পরামর্শ দিলেন।যা আমার জীবনে
আজও অক্ষয়,অমূল্য এক সম্পদ।শিল্পী নন্দলাল বসুর -- শিল্প অভিমুখ সবসময়ই ছিল ভারতীয়
জাতীয়তাবাদের দিকে।এটা আমাকে খুব ইমপ্রেস করেছিল।আজও এই ধারায় আমি
ইম্প্রেস্ট।
প্রশ্ন ঃ নন্দলাল বসুর সে-ই পরামর্শগুলো ঠিক কি রকম ছিল ?
উত্তর ঃ নন্দলাল’দার মুখ থেকে শোনে রোমাঞ্চিত
হওয়ার অনুভূতিটাই ছিল অন্যরকম। তিনি আমাকে একেবারে এঁকে দেখিয়ে দিয়েছিলেন একটা
বস্তুকে কীভাবে দেখতে হবে, তাকে জানতে হবে। তিনি বললেন- ‘ দেখা’টা আগে সম্পূর্ণ কর।
তারপর তাকে আঁক। আঁকার এই পর্যায় সম্পূর্ণ হয়ে গেলে, তবেই তুমি তাকে ভেঙে বের হতে পারবে।দেখা অসম্পূর্ণ থাকলে তোমার
ছবিতেও সে অসম্পূর্ণতার ছাপ পড়বে।’তাঁর এই কথাটাই আমার কাছে মহামন্ত্রের মত মনে হল। এবং তিনি আরও বলেছিলেন- ‘শিল্পের সাথে সাথে নিজের
জীবনশৈলীকে নান্দনিকতার সাথে পরিচালনা করা করতে হবে।তোমার চলাফেরা, তোমার যাপন
শৈল্পিক না-হলে তুমি সুন্দর শিল্প তৈরি করবে কি করে। এটাও শিল্প-শিক্ষার একটা
প্রধান অংশ। এই কথাগুলো কিন্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি আজও মনে করি।
প্রশ্ন ঃ আপনি তো বিশ্ববিখ্যাত রামকিঙ্কর বেইজ্-কেও শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন ?
উত্তর ঃ হ্যাঁ, এটা আমার আরও একটা সৌভাগ্য বলতে পারো,
আমি বিশ্ববিখ্যাত অনেক আর্টিস্টের নিবিড়সান্নিধ্যে আসার সুযোগ পেয়েছিলাম। তাঁর মধ্যে অবশ্যই রামকিঙ্কর
বেইজ্ অন্যতম। তিনি আপন মনেই থাকতেন। আমরা বাইরে এদিকওদিক বসে কিছু আঁকছি
রামকিঙ্কর’দা হাঁটতে হাঁটতে হয়ত কোথাও বেরিয়ে ছিলেন, হঠাৎ আমাদের দেখে দাঁড়িয়ে পড়লেন। তখন তিনি ছবি নিয়ে
বিভিন্নরকম কথা বলতেন, দেখিয়ে দিতেন এবং তখন তাঁর কথাগুলো ছিল
এক-পরম-পাওয়া।শান্তিনিকেতনের শিক্ষা, মননবোধ’টাই হয়ে উঠবে শিল্পময় । শিল্পীর অন্তরের তীব্র অভিব্যক্তি-টা আমি তাঁর মধ্যে দেখেছি।
প্রশ্ন ঃ আপনাদের সময়ে তো ভীষণ ভাঙচুর চলছিল। আর্টের ফর্ম, প্লটের
জটিলতা-সরলতা জিনিস’টা আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করে থাকেন?
উত্তর ঃ তা ঠিক। বিশ্বের সাথে সাথে ভারতেও তখন
নানা পরীক্ষানিরীক্ষা চলছিল। তাছাড়া ভারত এমনিতেই এর আগে থেকেই অনেক আর্ট ঘরানা
দেখেছে, যেমন অজন্তা, গ্রীকের প্রভাবে গান্ধার আর্ট, মোগল আর্ট, রাজপুত, পার্সিয়ান
স্টাইল এভাবে অনেক শিল্পআঙ্গিকের প্রভাব। কিন্তু তুমি লক্ষ্য
করে দেখো, এত বিভিন্নতার মধ্যেও একটা ঐক্য মিল খুঁজে পাবে। তোমার দেখলেই মনে হবে,
এটা ভারতীয় আর্ট। আমি মনে করি, শিল্পের আবেদন সার্বজনীন হওয়া উচিত। প্রকৃত-ছবি কথা
বলে দর্শকের সাথে। রামকিঙ্করদা যেমন বলতেন — ‘ছবিকে তার নিজের ভাষায়
কথা বলতে হবে – মুখের ভাষায় নয়।’ এখানেই তাঁর চূড়ান্ত সার্থকতা। সংক্ষেপে আমার কথা হচ্ছে, নিজস্ব ঐতিহ্যের
ভিত্তিভূমিকে কেন্দ্র করেই আধুনিকতার যাবতীয় এক্সপেরিমেন্ট করা উচিত বলে আমি মনে
করি ।
প্রশ্ন ঃ ত্রিপুরার আর্ট কলেজের শুরুর একটা
ইতিহাস আছে, যার সঙ্গে আপনি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।সেই ইতিহাস ও তাঁর ইতিবৃত নিয়ে আজ
আমাদের কিছু বলুন ?
উত্তর ঃ ১৯৫৬ সালে ত্রিপুরায় এসে প্রথমে বিলোনিয়া,এরপর খয়েরপুরে ড্রয়িং টিচার হিসেবে
কাজ করি। এরপর পানিসাগর ‘বেসিক টিচার ট্রেনিং কলেজে’ অন-প্রমোশন লেকচারার হয়ে চলে আসি
এবং ১৯৭৫ এর জুলাই মাসে পুনরায় অন-প্রমোশন আগরতলা বেসিক টিচার ট্রেনিং কলেজে আবার
আমি বদলি হয়ে আসি। খ্যাতনামা আর্টিস্ট সুমঙ্গল সেন তখন ছিলেন রবীন্দ্র ভবনের
সিনিয়ার লেকচারার, তিনি আমার খুব বন্ধু মানুষ ছিলেন, তারপর বিমল করও ছিলেন। তখন একদিন আমাকে সুমঙ্গলবাবু ডেকে বললেন – ‘চলুন না,
সুনীলবাবু আমরা একটা আর্ট কলেজের সূত্রপাত করি।’ প্রস্তাব’টা নিঃসন্দেহে ছিল
চমৎকার। যদিও আমার কাজের চাপ ছিল সুমঙ্গলবাবুর থেকে অনেক বেশি।তারপরও রাজি হয়ে
বললাম, ‘আমরা কিভাবে এত বড় কাজ করবো? আরও তো লোক লাগবে?’ তিনি বললেন, ‘আসুন না,
দেখি কি করা যায়!’ আরও লোকের খোঁজ করে
পাওয়া গেল – শান্তিনিকেতন থেকে পাশ করে আসা দীপা সেন, সাথী দেববর্মা, সংঘমিত্রা
নন্দিকে।তাঁরাও খুব উৎসাহ নিয়ে এগিয়ে এল। আর আমরা দুজন তো ছিলাম’ই । এখানে একটা প্রশ্ন ছিল
আমাকে নিয়ে – ‘আমি কি পারমিশন পাব সুমঙ্গলবাবু?’ যাই হোক, আমরা যোগাযোগ করলাম
হাইয়ার এডুকেশনের ডিপারমেন্টের অধীর চৌধুরী-র সাথে। তিনি ত শুনেই খুব হলেন এবং
বললেন, ‘আপনরা কাজ শুরু করুণ! দেখি আর কি করা যায়!’ তা হলে আর চিন্তা কি? সব বাধা
পেরিয়ে বর্তমান রবীন্দ্র শতবার্ষিকী ভবনের বারান্দার এক কোণে অল্প কিছু
ছাত্রছাত্রী নিয়ে প্রথম আর্ট কলেজের ক্লাস শুরু করা হল। আমি যথারীতি বেসিক টিচার
ট্রেনিং কলেজ এবং আর্ট কলেজ দু’দিকেই
ছুটোছুটি করে ক্লাস নেওয়া শুরু করলাম। প্রথমবর্ষ
শেষ হয়ে যখন দ্বিতীয়বর্ষে পড়ল, তখন ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা আরও বাড়তে থাকলে, অধীর
চৌধুরীর অনুমতি নিয়ে বর্তমানে ‘মুক্তধারা’ পূর্বে মিউজিক কলেজ ছিল, তাঁরই
অডিটোরিয়ামে আর্ট কলেজ স্থানান্তরিত করে আবার আর্ট কলেজের ক্লাস
শুরু করা হল।কিন্তু ক্রমে এখানেও ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা আরও বাড়তে থাকলে
মোটরস্ট্যান্ডে মনীন্দ্র সাহা-র বাড়ি ভাড়া নিয়ে সেখানে আর্ট কলেজ পুনরায় স্থানান্তরিত
কলেজ শুরু করা হল।তখন ক্রাফটে যোগ দিলেন শিল্পী
সমর সরকার । পুরোদমে শুরু হল, অবশ্য সে সময় ঘর ভাড়া সরকার থেকে মিলতে শুরু করেছে।কিন্তু সেখানেও আনুমানিক বছর-দেড়েক ক্লাস চলার পর সেই
জায়গার অভাব! তারপর অনেক চেষ্টার পর বর্তমান ‘নজরুল কলাক্ষেত্রে’ স্থান হল। ঠিক
হল, ক্রাফট টিচার ট্রেনিং ইন্সটিটিউটের একদিকে এবং তার অন্যদিকে বড় একটা অংশে আর্ট কলেজের ক্লাস হবে।
এইভাবে দীর্ঘ সংগ্রামের শেষে আর্ট কলেজ একটা প্রতিষ্ঠান পায়। এরপর তো আজ
ক্রমবিকাশের ধারায় আর্ট কলেজ রাজ্যের এবং দেশের গর্ব।
প্রশ্ন ঃ শিশুদের উপর আর্টের ভূমিকা বা গুরুত্ব নিয়ে
আপনি সব সময়ই সোচ্চার। এই প্রেক্ষাপট নিয়ে আপনার দৃষ্টিকোণ জানতে চাইছি ?
উত্তর ঃ এখন সরকারি স্কুলে ড্রয়িং টিচার নাই। এটা
আমার কাছে শিক্ষা ব্যবস্থায় একটা বড় ত্রুটি বলে মনে হয়। আর্ট হচ্ছে শিক্ষার একটা
মূল স্তম্ভ। শিল্প ছাড়া প্রকৃত শিক্ষা সম্পূর্ণ হতে পারে না। প্রজেক্ট আছে, ওয়ার্ক
এডুকেশন আছে , অথচ একজন ড্রয়িং টিচার নেই? আর্টের ইন্সট্রাকশন দেয়ার লোক নেই!
ছাত্রছাত্রীরা বাইরে গিয়ে বিভিন্ন
কমার্শিয়াল সেন্টার থেকে ছবি আঁকিয়ে নিয়ে এসে জমা দিয়ে দিচ্ছে। আর শিক্ষকরা সব
জেনে শুনেও এর উপর নাম্বার দিচ্ছেন। এতে কি আদৌ কোন শিক্ষা হচ্ছে? এই জন্য আমি
চাইল্ড আর্টের প্রশিক্ষণের খুব পক্ষপাতী। আমি চাই আমাদের সময়ের মত এইসবের উপর
পুনরায় জোর দেওয়া হোক। বাচ্চাদের সাইকোলজি, তাদের শেখাবার পদ্ধতিকরণ না-জেনে
শিক্ষা দিতে না-পারলে, বিষয়টা হিতে বিপরীত হতে পারে ।এরজন্য পর্যাপ্ত শিক্ষা এবং
ট্রেনিং দরকার।যদিও সরকার এনিয়ে বিস্তর ভাবছে।তবু, আমি বলছি আবার, আর্টের কলেজ
থেকে যারা বের হচ্ছে, তারা ত এডাল্ট-আর্ট নিয়ে পড়াশোনা করে বের হচ্ছে। এক্ষেত্রে
তারা যখন শিশুদের শেখাবে তখন কিছুটা হলেও তাদের চাইল্ড আর্টের বিষয়ে পড়াশুনা করা
এবং ট্রেনিং নেওয়ার প্রয়োজন রয়ে গেছে বলে আমি মনে করি।আমি আরও মনে করি, স্কুলের
পড়াশুনার বিকাশের পাশাপাশি, উপযুক্ত শিল্পশিক্ষক দরকার।এতে আর্ট কলেজ থেকে যে সব
ছাত্রছাত্রীরা পাশ করে বেরিয়ে আসছে, তাদেরও একটা কর্মসংস্থান হয়।এর মাধ্যমে আমরাও
সৃজনশীল সুস্থ একটা সমাজ পেতে পারি। এবং একমাত্র সুস্থ আর্টের চর্চার মধ্যে দিয়ে
তা সম্ভব বলে আমি মনে করি।আমি বিশ্বাস করি,শিল্পী তৈরি করা যায় না, তারা শিল্পী
হয়েই জন্মায়। তাদের একটু দিশা দিতে হবে শুধু।এই দিশা দেওয়াই চিত্রশিক্ষকের কাজ।
প্রশ্ন ঃ আজকাল তো অলিতেগলিতে আর্টের স্কুল,
সারা বছরই প্রায় একটা-না-একটা প্রতিযোগিতা লেগেই থাকে। এই বিষয়টাকে আপনি কীভাবে
দেখছেন ?
উত্তর ঃ এখন পাড়ার এদিকেওদিকে আর্ট শেখার স্কুল দেখা যায়। এটা একদিকে ভালো।
কিন্তু কোথাও কোথাও এর আবার না-বাচক একটা দিকও আছে।আমার বত্রিশ বছরের শিক্ষকতা
করার অভিজ্ঞতার নিরিখে এই কথা বলছি, শিশুদের হাতে ধরে আর্ট শিখিয়ে দিলে তাদের
সৃজনশীলতা নষ্ট হয়ে যায়।শিশুকে তাঁর কল্পনার হাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত।বাচ্চাদের আর্ট কিন্তু খুব
সরল,স্বতঃফূর্ত এবং অকপট হয়ে থাকে। সে গাছ আঁকে, মানুষ
আঁকে, তাঁর হাত পা আঁকে এবং সাথে সাথে চারপাশের সাথে নিজেকে চিনতে শিখে। এতে তাঁর
ক্রিয়েটিভ সেন্স বাড়তে থাকে। এখানে ধৈর্য ধরে তাকে কেবল একটু সহায়তা করতে হবে
আমাদের। অথচ এমন হচ্ছে না । বরং কম্পিটিশন বাড়িয়ে তাদের সৃজনশীল মানসিকতাকে সিজ বা বিভ্রান্ত করে দেয়া
হচ্ছে কোথাও কোথাও। এই বিষয়’টাকে আমাদের সম্ভাবনার দিকে নিয়ে যেতে হবে। আমি চাই
সঠিকভাবে আর্ট জীবনের কাজে আসুক।আর্টের ভিতর দিয়ে গড়ে উঠুক সুন্দর সতেজ মননশীল এক সমাজ।
------------------




No comments:
Post a Comment