* কবি সেলিম মুস্তাফাঃ কবিতায় স্বতন্ত্র এক সুড়ঙ্গের নাম *
কবি সেলিম মুস্তাফা কবি হিসেবে বাংলাকবিতার জগতে এক অবশ্যম্ভাবী নাম। ত্রিপুরার প্রসঙ্গে তো আরও। প্রায় চারদশক পেরিয়ে এসে এখনও তাঁর কবিতা মগ্ন-চৈতন্যের প্রতিভাস। সেলিম মুস্তাফাকে পাঠ না-করলে ত্রিপুরার কবিতাচর্চার একটা পর্যায় অসম্পূর্ণই থেকে যায় বলে মনে করি । যে কোনো কবিকে নিয়ে আলোচনা করা বেশ মুশকিল । কেননা, কবিরা সময়ের সাথে সাথে আবর্তিত হতে থাকেন নিজস্বসত্তায় । কখনও বেগবান তো কখনও ম্রিয়মাণ । তাই কবিকে মূল্যায়ন করা মুশকিল, অনেকক্ষেত্রেই বিপদজনক । কেননা, আমি পাঠক হিসেবে আমার সামর্থ এবং সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল । কবিতার সাথে পরিচয়ের প্রাথমিক পর্যায়েই তাঁর কবিতার সাথে আমার পরিচয় । ধর্মনগরে “ জলজ” সাহিত্য আড্ডায় কবি-গবেষক সমর চক্রবর্তী এবং দীপঙ্কর গুপ্তের আহ্বানে আমি প্রথম যাই । সেদিনই প্রথম দেখি কবি সেলিম মুস্তাফাকে। শ্যামবর্ণ, গালে হাল্কা দাঁড়ি । তখনও জানতাম না, কবির আসল নাম পীয়ূষ দাসগুপ্ত। প্রথমদিন কোন্ কবিতা শুনেছিলাম আজ আর মনে নেই । তবে ভালো লেগেছিল । এরপর থেকে যতই সেলিম মুস্তাফার কবিতা শুনেছি, ততই মুগ্ধ হয়েছি । কবি-জীবনের প্রথম দিকে প্রায় প্রতিদিনই কবির বাড়ি যেতাম । সাহিত্য বিষয়ক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা হত । সাহিত্য সম্পর্কে তখন আমার আগ্রাসী সব জিঘাংসা । সারাদিন ব্যাঙ্কে কাজ করে এসেও সন্ধ্যায় আমাকে ঠিক সময় দিতেন কবি । আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করতাম । সেই দীর্ঘ কথামালা আমাকে অনেক সমৃদ্ধ করেছে । তখন আমার হঠাৎ মনে হল, সেলিম মুস্তাফার কবিতা নিয়ে কিছু একটা কাজ করা যায় । প্রথম দিকে খুব গভীর চিন্তা-ভাবনা করে কিছু শুরু করিনি । মূলত কবির “ছোরার বদলে একদিন ” কাব্যগ্রন্থ পাঠ করার পর আমি একটা মোহে পড়ে যাই । তন্ময় সে মোহ । সেই মোহ থেকেই আমি ক্রমশ কবির প্রেমে পড়ে যাই। কাঞ্চনপুর ঘিরে কবির প্রকৃতিকে দেখা, প্রকৃতির ভিতরে বসবাস করা সব সহজ-সরল জীবনকে দেখা । জঙ্গলের ভিতর থেকে ফুলের মতো উঁকি দেয়া মানব-মানবীদের চেহারা, তাদের জীবনের অভাব, তাদের প্রেম-ভালোবাসা-সরলতা, দেও নদী, নদীর চর , সন্ধ্যার মাদকতা কবির সাথে সাথে আমাকেও ক্রমেই মুগ্ধ করতে লাগল । আমি চোখের সামনে একের পর এক ছবির মতো সব যেন দেখতে পারছিলাম । শুধু দেখা নয়, কোথাও যেন কবির সাথে নিজেকেও কমিউনিকেট করতে পারছিলাম। কবি সেলিম মুস্তাফা ১৯৫৩ সালে অধুনা বাংলাদেশের সিলেট জেলার হবিগঞ্জের ভাদেশ্বর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমানে উত্তর ত্রিপুরা জেলার ধর্মনগরে স্থায়ী বসবাস। ১৯৭৪ সালে তাঁর প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়।এযাবৎ ছ’টি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে। একাধিক কবিতার কাগজ সম্পাদনা করে বর্তমানে ‘পাখি সব করে রব’ নামে একটি মাসিক কবিতাপত্র সম্পাদনা করছেন বারো বছর।
“সারাদিন ছুটোছুটি সারাদিন কাজ / সারাদিন ঘাম লালা ভালোবাসা মান অভিমান - / তারও পর সারারাত জেগে বসে থাকা / একা একা / স্বপ্ন আর দুঃস্বপ্নের সমান সমান / অভিযান” ( সংকট -১) সেলিম মুস্তাফা ত্রিপুরার কাব্য জগতে সেই সত্তর দশক থেকেই একটি ভিন্ন সুরের নাম । তাঁর প্রতিটি কাব্যই মূলত নিজেকে একেকভাবে পরিক্রমা করে দেখার পরিক্রমা । তিনি নিজেকে নির্মমভাবে বিদ্ধ করতে জানেন । প্রশ্নে প্রশ্নে জর্জরিত করা তাঁর কাব্যস্বভাব । নিজেকে পাল্টে পাল্টে দেখাই তাঁর কাব্যচলন । সেই ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত তার “বাহান্ন তাসের পর” কাব্যের ছয় বছর পর ১৯৮৪ সালে প্রকাশিত “ছোরার বদলে একদিন” হয় । এর দশ বছর পর ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত হয় – “ ইতি জঙ্গল কাহিনি” এর নয় বছর পর ২০০৩ সালে প্রকাশিত হয় “দেবতার অনুরোধে” কিংবা ২০২৩ সালে লেখা “ বারবার পাল্টে যাই”। এভাবে প্রতিটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের আগে কবি নিজেকে প্রচুর সময় দেন । নিজেকে নিয়ে নিজেই খেলেন পর্যাপ্তভাবে এবং সেই খেলার ছাপ আমরা দেখতে পাই তাঁর কবিতায় । কবি ক্রমেই চিত্রপট, ভাষা পালটাচ্ছেন । এবং এই ধারাবাহিকতা কবি গোটা কবিতা জীবনেই বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন । কবিতার ভিতরে ঢুকে কবিতার ভিতরকে অনেকটাই তছনছ করে দেখার চেষ্টা করেন কবি । কতটা সফল হয়েছেন, তার থেকেও আমার কাছে বড় মনে হয়েছে, তাঁর নিজেকে নিয়ে এই ঝুঁকি নেয়ার প্রবণতা । এই ঝুঁকিটাই আমরা পাঠক হিসেবে অনেকের ভিতরে খোঁজে ফিরি । বেশির ভাগ সময়ই হতাশ হই । কবিতায় কবির একটা ভাষা-ফর্ম প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবার পর সাধারণত সেটা থেকে প্রতিষ্ঠিত কবিরা বেরিয়ে আসার সাহস দেখান না । এই ক্ষেত্রে সেলিম মুস্তাফাকে কিছুটা ব্যতিক্রম মনে হয়েছে আমার । তিনি তাঁর প্রচলিত ফর্ম বা তাঁর পরিচিত কাব্যভাষাকে বারবার আক্রমণ করেছেন । প্রতিবারই পাল্টাতে চেয়েছেন নিজেকে । নিজের কাব্যভাষাকে । “আমি এই রকম,/আমার জীবন এইরকম/সত্য এইরকম—/ফুল নয়, সমস্ত ফুলের ।/ ছোরা নয়/ ছোরার বদলে একদিন সব ফুল নড়ে উঠবে...” কবি সেলিম মুস্তাফা, যার সম্পর্কে বলতে গিয়ে প্রদীপ চৌধুরী বলেছিলেন—“ ‘ছোরার বদলে একদিন’ সেলিমের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ, সেলিমের প্রথম কবিতার বই ‘বাহান্ন তাসের পর’ বেরিয়েছিল প্রায় সাত বছর আগে—৩২ পৃষ্ঠার একটিই দীর্ঘ কবিতা—ফর্ম এবং স্পিরিট দু-দিক থেকেই অত্যন্ত ঋজু, সাবলীল এবং পরিণামী; কোন অজ্ঞাত কারণে বইটি সেলিমের বৃহত্তর পাঠক সমাজের মধ্যে প্রচারিত হয়নি; ফলে, একজন সচেতন ও অতিশয় জীবিত কবির ক্ষেত্রে যা হবার তাই হয়েছে । মধ্যবর্তী বছরগুলিতে সেলিমের জীবন ও জীবিকা, ভালোবাসা ও ঘৃণা, তার আবিষ্ট অপভ্রমণ সম্পূর্ণ এক নতুন মোড় নিয়েছে । বাহান্ন তাসের সেই গথিক নির্মাণ কালপ্রবাহে ভেঙে-চুড়ে তছনছ হয়ে গেছে, সেলিম আরো সাঙ্ঘাতিকভাবে জীবনের একেবারে মূল রান্নাঘরে ঢুকে পড়েছে, রান্নাঘর এবং শোবার ঘরের মধ্যবর্তী শেষ পর্দাটাও সরে গেছে তার কবিতা থেকে—যেখানে একজন নামহীন মোনালিসা, প্রকৃতপক্ষে এক উপজাতি রমণী তাকে মায়ের মতো সস্নেহে উন্মোচিত করে দেখায় বহুবর্ণ সেই পৃথিবী, যাদুঘর, যেখানে থরে থরে লক্ষ্য জন্ম লক্ষ্য মৃত্যু, স্বপ্ন, কল্পনা, নিহত ভাইয়ের মৃতদেহ, বাইসনের নীচে উপুড় হয়ে থাকা রেখা গোপের ঐতিহাসিক শরীর...‘ছোরার বদলে একদিন’ সেলিমের জীবন কবিতার একটি তাৎপর্যময় নতুন ধাপ এবং তা-ও সেলিম অতি দ্রুত অতিক্রম করে যাচ্ছে । সেলিমের কবিতায় পরিণত হাংরি রচনার অনেক লক্ষণ অত্যন্ত স্পষ্ট।”এখানে কবি সেলিম মুস্তাফা সম্পর্কে অনেকগুলো উল্লেখযোগ্য কথা বলেছেন হাংরি প্রবক্তাদের অন্যতম প্রদীপ চৌধুরী । সেলিম মুস্তাফার কবিতার একটা খেলা আছে, যা আমাকে খুব প্রভাবিত করে । আমাকে আনন্দ দেয় । আমাকে ভাবায় ।সেলিম মুস্তাফার বেশির ভাগ কথাই খুব সোজাসুজি । তাঁর রচনা পদ্ধতিতে ভাব ও ভাষার অবিচ্ছিন্ন সমীকরণ লক্ষ্য করা যায় । কবির বক্তব্য, তার প্রতিদিনের বিশৃঙ্খলা অভিজ্ঞতায় একটি পরম উপলব্ধির মাল্য রচনা । কবির উদ্দেশ্য তার চারপাশের অবিচ্ছিন্ন জীবনের সঙ্গে প্রবহমান জীবনের সমীকরণ । কবির ব্রত তার স্বকীয় চৈতন্যের রসায়নে শুদ্ধ চৈতন্যের উদ্বাবন । সেলিম মুস্তাফাকে আমি এভাবেই পাঠ করেছি বারবার । কবি সেলিম মুস্তাফার কবিতায় ব্যবহৃত শব্দের রেখাচিত্র, চিত্রকল্প গভীর মমতায় পাঠকের সাথে সহমর্মিতা সৃষ্টি করে নিতে পারে । পাঠককে কবি কোনভাবেই বিব্রত করেন না । তাঁর কবিতার উৎস এবং লক্ষ্যও শুধুমাত্র হৃদয় । “আমার ঘুম আসে না /আমার কোন স্বপ্ন নেই আমার কোন দুঃস্বপ্ন নেই/আমার সন্দেহ আর বিশ্বাস আজ সমান সমান” (নিঃশব্দ সাইরেন) – এই তো কবির সরাসরি বলার ধরণ । কবির স্টাইল । জীবন ও জগতের সংস্পর্শে কবি যা অনুভব করেছেন তাই তিনি লিখেছেন । অনেক্ষেত্রেই কবি স্বতঃস্ফূর্ত মনোলগ ভঙ্গির আদলে লিখে গেছেন। কবি স্বীকারোক্তির মতো বলে গেছেন তার একের পর এক অনুভূতিমালা । যা তাঁকে অনবরত যন্ত্রণা দিচ্ছে । যা তাঁর ভিতরের মননকে খুঁড়ে খুঁড়ে খাচ্ছে । সেলিম মুস্তাফার কবিতার এই বৈশিষ্ট্যই আমাকে মুগ্ধ করে বেশি ।
“লেখা ও জীবন” নিবন্ধে লেখক সেলিম মুস্তাফার স্পষ্ট করেছেন — “আমার কোনো লেখাই শেষ পংক্তির উদ্দেশ্যে গড়ে ওঠেনি । যদি জীবনেই চমক না থাকে, লেখার শেষ লাইনে আর কী-ই বা দেখানো বাকী থাকে ?” এখানে লেখা সম্পর্কে লেখকের এক ধরনের স্পষ্ট মত দেখতে পাওয়া যায় । লেখক স্পষ্টত বলছেন— “জীবনবিচ্ছিন্ন কোনো মহৎ রচনার বা কোনো সৃজনশীল চেতনার সন্ধান আমার জানা নেই । কিন্তু যদি জীবনই ঘুরেফিরে সাহিত্যের এ-দরজা ও-দরজায়, এ-জানালা ও-জানালায় উঁকি দিতে থাকে অহরহ, তবে একটি রচনা যত শৈল্পিকতত্ত্বশালীই হোক, যত শীর্ষারোহীই হোক, তার আরোহণকালীন অস্থায়ী ক্যাম্পগুলির কথাও বলতেই হবে, নইলে হারিয়ে যাবে তার বেসক্যাম্প— জীবনের সঙ্গে তার সংলগ্নতা— মায়ের সঙ্গে তার নাভি-রজ্জুর কথাও— যা ছিন্ন হলেও বিচ্ছিন্ন নয় ।”
ত্রিপুরার সাহিত্য যত পরিণতির দিকে এগিয়ে যাবে, সেলিম মুস্তাফা তত প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবেন বলেই আমি আশাবাদী ।

No comments:
Post a Comment