ত্রিপুরার ছড়া- কবিতা- শিশুপত্রিকা সম্পাদনা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই একান্তে কাজ করে চলেছেন অমলকান্তি চন্দ। আজ তার সাথে একান্ত আলোচনায় তমালশেখর দে ।
“কঠিন বাস্তবের মুখামুখি দাঁড়িয়ে শিশুরা ছড়া-সাহিত্য থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে।”
প্রশ্ন ঃ ত্রিপুরার তরুণ ছড়াকারদের মধ্যে আপনি অন্যতম। ছড়া নিয়ে আপনার ব্যক্তিগত ভাবনা জানতে চাই -
উত্তর ঃ --স্বরবৃত্তের চালই ছড়ার ছন্দ। ছড়া সাহিত্যের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে লক্ষ্য করা যায় যে, তখনকার সময়ে লোকমুখে উচ্চারিত ছন্দোবদ্ধ দ্যোতনাগুলোই প্রত্যেক শিশুমনকে তার কল্পনার জগতে নিয়ে যায়, পরীদের কাছে, ফুল, পাখী, প্রজাপতিদের কাছে। প্রকাণ্ড ধু ধু মাঠ, রাজপুত্রের ঘোড়া ছুটছে, মেঘ রাক্ষসীরা দাঁড়িয়ে আছে দূরের পাহাড়ে, চারিদিকে এক অদ্ভুত আলো আঁধারি খেলা। একজন ছড়াকার কিংবা শিশু সাহিত্যিক শিশু-শ্রোতাকে স্বপ্নের জগতে নিয়ে যেতে যেতে তিনিও সাঁতার কাটতে থাকেন স্বপ্নের সায়রে। আমার মনে হয় শিশুরা যেহেতু উপদেশ ভালো পায় না, তারা নিজেদেরকে এক অদ্ভুত কল্পলোকের নায়ক ভাবতে পছন্দ করে। একজন শিশু সাহিত্যিকের কাজ হবে শিশুদের উপযোগী ভাষাশৈলীর মাধ্যমে কল্পলোকের দরজা খুলে দেওয়া। আর কাজটা যথাযত ভাবে সম্পন্ন হলে ছোটদের সাথে শিশুসাহিত্যিকদের ভাব বিনিময় পর্বটা হবে দারুণ উপভোগ্য।ভাব বিনিময়ের এই মিশ্রণ করে দেয়াটাই হবে আমাদের
মতো ছড়াকারদের হবে মুখ্য কাজ।
প্রশ্ন ঃ আপনার অনেকগুলো ছড়ার বই প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে দুটো কবিতার বইও প্রকাশিত হয়েছে। দুটো বিষয়কে আপনি কিভাবে দেখেন?
উত্তর ঃ এখন পর্যন্ত আমার চারটি ছড়ার বই এবং দুটো কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে। কবিতা ও ছড়াকে আমি কখনও আলদা ভাবে দেখি না। ছন্দের নিরিখে বিচার করলে ছড়াগুলো দ্রুত তালের লয় এবং কবিতাগুলো হল মধ্য ও ধীর তালের লয়। স্বরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত,ও অক্ষরবৃত্তের এই তো চলনভঙ্গি !
এই চলনভঙ্গিই ছড়া এবং কবিতাকে তার
নিজস্ব ভাষাশৈলির মাধ্যমে পথ চলতে শেখায়। আমি মনে করি, ছন্দ গড়তে জানলে ভেঙে দেয়া সহজ। এই ভাঙার মধ্যে দিয়েই প্রত্যেকটি কবিতার জন্ম হয়। ছড়াগুলো আমার কাছে পৌষ-পার্বনের কীর্তনের মতো । খোল, করতাল, কাসা, হারমোনিয়ামের বিভিন্ন মেজাজের সুরগুলোর
মতো তারা একাকার।
কবিতাও আমার সংসার। সংসারের প্রতিটি মানুষের সাথে যেমন মায়া মায়া খেলা চলে, কবিতার সাথে ঠিক তেমনই
সম্পর্ক আমার। রোজ সকালে রান্নার পসরা সাজিয়ে বসেন আমার স্ত্রী। কটু কথায় মাঝে মাঝে আমার কবিতার শরীরে আগুনের আঁচ লাগে। আরেকটু দূরে সরে বসি। সংসারি হওয়ার চেষ্টা করি। আগুনের তাপে সংযমী হওয়ার চেষ্টা করি। কবিতাকে ভালোবাসি বলে আমিও রান্নার পসরা সাজাই। শব্দেরা কখনও হলুদের রঙে, কখনো রাঙ্গা মরিচের রঙে, পুরণ দিলেই সুস্বাদু গন্ধ ছড়ায়।আমি কবিতাকে ভালোবেসে বাঁচতে শিখি। জীবনের পাঁচমেশালি রঙে সাজতে থাকে আমার কবিতা।
প্রশ্ন ঃ ত্রিপুরায় তুলনামুলক ছড়াকারের অভাব। এর কারণ কি মনে হয় আপনার?
উত্তর ঃ সত্যিই তো তাই। এতো এতো কবিদের ভিড়ে ত্রিপুরায় ছড়া নিয়ে আর কজনই বা ভাবেন। দিন দিন কবিদের সংখ্যা বাড়ছে। আমরা বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের দিখে যদি লক্ষ্য করি তবে দেখবো কত কত সফল ছড়াকারেরা উঠে আসছেন। সে তুলনায় আমাদের ত্রিপুরা রাজ্যে হাতেগোনা কয়েকজন মাত্র। আমি মনে করি নতুন ছড়াকারদের না-উঠে আসার পেছনে অনেকগুলো কারণ আছে।যেমন- প্রথমতঃ ছন্দ জ্ঞানের ব্যাপার। এখন আমরা ছন্দ নিয়ে আর ভাবতে চাই না। ছন্দ বর্জনের এই যে প্রবনতা থেকেই আমরা ছড়ার ক্ষেত্রে ত্রিপুরায় পিছিয়ে আছি। এর জন্য
নিজেরাই দায়ি বলে
মনে করি। ছন্দকে রপ্ত করার পাঠ আমাদের সকলেরই নেয়া দরকার।
দ্বিতীয়তঃ শিশুদের উপযোগী করে লেখার জন্য সরল ভাষাশৈলীর প্রয়োজন। এই সরল ভাষাশৈলীর মাধ্যনে শিশুদের মনোজগতে স্থান করে নিতে না-পারার বিষয়টা নিয়ে আজকের দিনে ভাবতে হবে আমাদের। তৃতীয় কারণ বলা যায়, ত্রিপুরায় শিশু বিষয়ক কাগজ খুব কম সংখ্যক প্রকাশিত হয়। আমি মনে করি ছোটদের উপযোগী লেখার সম্ভার নিয়ে যত বেশী সংখ্যাক কাগজ বের হবে তত বেশী সংখ্যায় ছোটদের লেখক তৈরী হবে। চতুর্থ কারণ হল -
আমরা সব কালেই লক্ষ্য করি শিশুরা তো শিশুদের জন্য লেখেন না। যারা লিখেন তারা হলেন বড়োরা। অনেকেই ছড়া লেখার সময় নিজেদের শৈশবে ফিরে যেতে পারেন না। এই না-পারাটাও একটা প্রধান সমস্যা।পঞ্চম কারণ হিসেবে আমার মনেহয়,
শিশুদের বয়সের স্তরভেদে লিখতে না পারাটা। ষষ্ঠ কারণ মনে করি আমি, বিভিন্ন জায়গায় বর্তমানে ছড়া নিয়ে ওয়ার্কশপ হচ্ছে। কিন্তু আমাদের রাজ্যে এই পরিকাঠামো এখনও গড়ে উঠেনি। এই বিষয়গুলো নিয়ে অবশ্যই ভাবা দরকার ।
প্রশ্ন ঃ আপনি ছড়া লেখার পাশাপাশি ‘রসমালাই’ নামে ছড়ার একটি লিটিল পত্রিকাও সম্পাদনা করে থাকেন। এনিয়ে আপনার ভাবনা কিছু জানতে চাই।
উত্তর ঃ রসমালাই বরাবরই ছোটদের কাগজ। ত্রিপুরায় যারা ছোটদের জন্য যারা লিখেন তাদের লেখা বিশেষ গুরুত্ব সহকারে ছাপা হয়। রসমাইয়ের সম্পাদকীয় শিশু কিশোরদের উপযোগী ছন্দ-রসে উপস্থাপিত
করা হয়।
ত্রিপুরায় বিক্ষিপ্তভাবে কিছু ছোটদের কাগজ বের হয়। তার মধ্যে এমন কতগুলো কাগজ বের হয় যে গুলোতে ত্রিপুরায় যারা ছোটদের জন্য লিখতে এসেছেন তাদের লেখা স্থান পায় না। ‘রসমালাই’ নতুন নতুন সম্ভবনাময় ছড়াকারদের স্থান দিয়ে আসছে । রসমালাইয়ের এযাবৎ যতগুলো সংখ্যা বের হয়েছে, সবগুলো সংখ্যাই শিশু, কিশোরদের মনোজগতে ছড়া, কমিকস্, এবং গল্প সম্ভারের এক অদ্ভুত অনুভূতির ডালপালা বিস্তারে করতে সক্ষম হয়েছে। হামাগুড়ি দিতে দিতে চলতে থাকা “রসমালাই“ পত্রিকা আজ বেশ পরিণত। আজকাল শিশু কিশোরদের প্রত্যাহিক জীবন বেশ জটিল হয়ে উঠছে। আমাদের সমাজের বিভিন্ন অংশেই শিশুদের ঠেলে দেয়া হচ্ছে শিশু শ্রমের মত দীর্ঘ কারাবাসে। ফলে অচিরে ঝরে যাচ্ছে তাদের ফুলের মত সুন্দর জীবন। যে বয়সে ফুলঘুটিয় রপ্ত হয়ে উঠার কথা, সে বয়সে পাথর ভাঙার মতো কঠিন কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে অনেক শিশুরা । অন্যদিকে কেরিয়ার গঠনের প্রতিযোগিতা। এই কঠিন বাস্তবের মুখামুখি দাঁড়িয়ে শিশুরা ছড়া-সাহিত্য থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে । রসমালাই শিশুদের
কাছে ফিরে যাবার জন্য কাজ করে চলেছে।

No comments:
Post a Comment