Friday, July 4, 2025

নাটকে নান্দনিক শিল্প, বিনোদন ও সর্বোপরি সমাজের ঘটমান বিষয়ে মানুষের মনের ভেতরের সুপ্ত ভাবনাকে জাগ্রত করাই মূল লক্ষ্য। -- কার্ত্তিক বনিক

 


 

 

 

 

 

১। প্রশ্ন   প্রথমেই আপনার কাছে জানতে চাইবো, নাটক বিষয়টা আপনার মননকে নাড়া দিল কখন ? ঠিক কখন মনে হল আপনার, নাটক আমাকে করতেই হবে ?

 

উত্তর -  ১৯৬০ সালের কার্তিক পূজার দিন আমার জন্ম জন্মের পরে একটু বড় হতেই শুনতাম, আমার বাবা আজ রাতে বাড়ি ফিরবে না কারণ, বাবার আজ যাত্রাপালা আছে তখন আমি বুঝতাম না যাত্রা কি? পালা কি? কিন্তু এই যাত্রাপালা শুনতে শুনতেই আমি আর একটু বড় হলাম তখন অভিনয় শব্দটার মানে একটু একটু বোধগম্য হচ্ছে পাড়ার সত্যদা (সত্যপ্রসাদ চক্রবর্তী), শংকরদা( শংকর ঘোষ), পাড়াতে এই দুই দাদার অভিনয় দেখে অনুপ্রাণিত হলাম একদিকে বাবার যাত্রাভিনয়, সেইসাথে এই দাদাদের অভিনয় দেখে খুব সখ হল অভিনয় করার কিন্তু কি করে সম্ভব? আমি তখন অষ্টম শ্রেণি কি নবম শ্রেণির ছাত্র বড়দোয়ালী স্কুলে আমার পাঠ একদিন সাহিত্য ক্লাশে আমি গোপা ( গোপা চক্রবর্তী) রচনা পাঠে যুগ্মভাবে প্রথম হলাম মনে মনে ভাবলাম তৃতীয় বেঞ্চের ছাত্র হয়ে ফার্স্ট গার্ল গোপার সমান হয়ে গেলাম এই একটি জায়গায় এই জায়গাটাই আমার পক্ষে সহজ তাই মনের গোপন ভাবনা নিয়ে পাড়ার বন্ধুদের সাথে কথা বললাম তখন তো পাড়ায় জলসা হত এছাড়া মনোরঞ্জনের আর কোন বিষয় নেই তাই আমি  নাটককে মনোরঞ্জনের মাধ্যম হিসেবেই ভাবতে শুরু করলাম এবার আমাদেরও নাটক করতে হবে কিন্তু নাটক কোথায় পাব? আমার ধারণা তখন ছোটদের জন্য কোন নাটক লেখা হত না নিজেই নাটক লিখতে শুরু করি মনে রাখতে হবে, আমি তখন অষ্টম কি নবম শ্রেণিতে পড়ি নাটক লিখলাম ' ভারত বিপ্লবী' স্বাধীনতার আন্দোলনে বিপ্লবীদের ভূমিকা নিয়ে এই নাটক নাটক লিখে সাহস করে পাড়ার দাদাদের দেখালাম কাঁচা বয়সের কিছু অপরিণত সংলাপ তারা সংশোধন করে দিলেন আর সাথে দিলেন উৎসাহ রিহার্সাল চলল এবং মুখস্থ হল এবার মঞ্চের ভাবনা এল তখনও নাটকের মঞ্চ দেখিনি আমি যে নাটক তৈরি করলাম তাতে তিনদিক ঘেরা সামনে পর্দা চাই যা প্রয়োজনে উঠবে নামবে সেই সাথে চাই মঞ্চে প্রয়োজন মত আলো সেসব কিছুই আমার ধারণা ছিল না এই বিষয়ে আমার দু'বছরের বড় ছোড়দা ( নিমাই বণিক) পুরো দায়িত্ব সামলে নিল নির্দিষ্ট দিনে নাটক শুরু হল পাড়ার ছোট বড় সবাই যে যার মত করে আসন নিয়ে এসে নাটক দেখতে বসে গেল নাটক দেখতে এলেন রজত স্যার, তিনি সম্ভবত কোন এক কলেজের অধ্যাপক ছিলেন তিনি এই কাঁচা বয়সীদের নাটক দেখছিলেন এমন একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে, এখন যে জায়গায় উইংস থাকে, সেখান থেকে নাটকের একটি কারাগারের দৃশ্য দেখানো হচ্ছিল, কোন সংলাপ ছিল না সেই সংলাপহীন অংশে তিনি গান ধরলেন 'কারার লৌহ কপাট ভেঙে ফেল......' এই গান আমার নাটকে ছিল না আমি জানিও না কিন্তু সেই গান নাটককে দারুণ ভাবে উচ্চ মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছিল নাটকের শেষে অনেকেই একটু বেশি স্নেহ করতে শুরু করলেন পরের বছর আবার একটি নাটক করি সেই নাটকের নাম মনে নেই বুঝলাম নাটক করা আমার পক্ষে সম্ভব কারণ আমার ধারণা ছিল এই শিল্প সহজেই আয়ত্তে আনা যায় তাছাড়া অল্প বিদ্যা এবং অল্প জ্ঞানে অন্য কোন শিল্প আমার দ্বারা সম্ভব হবে না আমার ধারণা ছিল নাটক অল্প একটু চেষ্টাতেই যথেষ্ট যদিও এখন আমি বুঝি যে, নাটক নিয়ে যতই পড়ি বা জানি তা যথেষ্ট নয় সঙ্গীত, নৃত্য বা অঙ্কন বিদ্যার জন্য যেমন বছরের পর বছর ধরে সাধনা করে তবেই সফলতা আসে, নাটক তার চেয়েও বেশি তবে সেসময় এতকিছু না ভাবলেও মনে মনে নিজেকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার একটা তাগিদ ছিল আর সেই থেকেই আমার নাটক করার এই  উগ্র বাসনা জাগে হয়ত আরও 'একটি বিষয়ও কাজ করে থাকতে পারে                                                                   

 

২। প্রশ্ন নাটককে আপনি কোন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে ভালোবাসেন ? নাটককে কি আপনি প্রকৃষ্ট প্রতিবাদের একটা  মাধ্যম মনে করেন ?

 

  উত্তর - : নাটকে নান্দনিক শিল্প, বিনোদন সর্বোপরি সমাজের ঘটমান বিষয়ে মানুষের মনের ভেতরের সুপ্ত ভাবনাকে জাগ্রত করাই মূল লক্ষ্য জন্মলগ্ন থেকেই নাটকের মধ্যে প্রতিবাদ ধ্বনিত  হয়ে আসছে ইসকাইলাস, সফোক্লেস, কালিদাস, শূদ্রক হয়ে রবীন্দ্রনাথ থেকে উৎপল দত্ত নাটকে কখনও রাজার বিরুদ্ধে, শাসকের বিরুদ্ধে বা রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্মমতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উঠে এল শাসকের হাতে নাটক লাঞ্ছিত হল চালু হয় নাট্য নিয়ন্ত্রণ আইন তাই সর্বকালের প্রতিবাদের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে নাটক                                                 

 

 

প্রশ্ন নাটক নিয়ে চিরকাল এক্সপেরিমেন্ট হয়েই চলেছেন নাটকের এই পরীক্ষা-নিরীক্ষার   ক্ষেত্রে কোন বিষয়টাকে আপনি প্রাথমিকতা বা বেশি গুরুত্ব দিতে চান ? কেন  চান ?

 

উত্তর- : নাটকের বিভিন্ন ক্ষেত্রেই এক্সপেরিমেন্ট হচ্ছে নাটককে আধুনিক করতে এক্সপেরিমেন্ট চাই এখন তো আঙ্গিকের সাথে অ্যাক্রোবেটিক্সও যুক্ত হচ্ছে আমি সবসময় নাটকের 'বিষয়ের' উপর  প্রাধান্য দিই এবং যতটা সম্ভব আমাদের চারপাশের ঘটনাকে গুরুত্ব দিই                                                           

 

 

প্রশ্ন   একাঙ্ক নাটক নিয়ে অনেক ধরণের এক্সপেরিমেন্ট হয়েছে যদি খুব সোজাসুজি জানতে চাই,  আপনি একজন নির্দেশক হিসেবে, দর্শকের সাথে কি ধরণের সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী ?  

 

উত্তর-: একজন নির্দেশক হিসেবে আমার লক্ষ্য থাকে নির্দেশনার পাঁচটি মৌল বিষয়কে নাটকে যথাযথ ভাবে ব্যবহার করে প্রযোজনাটি তৈরি করা  কম্পোজিশন, পিকচারাইজেশন, রিদম্, মুভমেন্ট এবং প্যান্টোমাইমিক অ্যাকটিং-এর যথাযথ  প্রয়োগে নাটক যেন যথার্থ পদবাচ্যে রূপ পায় এবং একজন দর্শককে বিষয় ভাবনায় উদ্বুদ্ধ করতে পারে                      

 

৫। প্রশ্ন একজন নাট্যকার হিসেবে আপনি যখন কোন নাটক লেখার পরিকল্পনা করেন, তখন মূলত কি কি বিষয়ের উপর গুরুত্ব দিয়ে থাকেন ? এবং কেন ?

 

উত্তর  : আমার নাটকে আমি সমাজ ভাবনাকেই প্রধান্য দিতে চেষ্টা করি সেটি কখনো এপিকের ঘটনা থেকে তুলে আনি  যেমন আমার  পুস্পহার’ নাটক ।  কিংবা কোন সমসাময়িক ঘটনায় তুলে ধরার চেষ্টা করি যেমন আমার নীরাকে চাই’ নাটকটি ।  যেখানে নাটকের বিষয় নিয়ে দর্শকের মনে নতুন কোন আশার সৃষ্টি করতে পারে                    

 

 

৬। প্রশ্ন ঃ   আপনি আগামিতে নতুন একটি নাটক কেন করতে চাইবেন ? নাটক না-করে থাকতে পারবেন না, শুধু কি এই কারণেই ?

 

    উত্তর  : আমার প্রথম স্বীকারোক্তিতে বলেছিলাম যে, নাটকের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠা পেতে চেয়েছিলাম আজ আমি এই সাধারণ জ্ঞানটুকু  নিয়ে যেভাবে নাট্যকর্মে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছি এবং আমার প্রিয়জনদের যে আস্কারা উদ্দীপনা পেয়ে আসছি তাতে নাটক ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারিনা যেভাবে লেখাপড়া না করেও ক্লাসে ফার্স্ট গার্লের সমকক্ষ হতে পেরেছিলাম, যেভাবে এই সামান্য শিক্ষার জ্ঞান নিয়ে আজও এই ষাটোর্ধ যৌবনে এখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছি, তার কারণ এই নাটক যেখানে মিলে বিশুদ্ধ অক্সিজেন তাই এই অক্সিজেন নিতে বার বার সেখানে যাব মঞ্চস্থ হবে নাটক, নাটক এবং নাটক কারণ, নাটকই একমাত্র শিল্প, যেখানে একজন মানুষ প্রকৃত মানুষ হয়ে গড়ে ওঠে

 

  

 

প্রশ্ন ঃ  ত্রিপুরায় ‘ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামা’ ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে আমরা নাটকের উপর অনেক ভালো ভালো উদ্যোগ দেখতে পাচ্ছি ।  এতে আমরা কতটা উপকৃত হয়েছি বলে আপনি মনে করেন ?

 

 উত্তর -  : ত্রিপুরাতে এন এস ডি প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১২ সালে কিন্তু এন এস ডি- সাথে ত্রিপুরার সম্পর্ক গড়ে উঠে খুব সম্ভবত ২০০০ সালে তার আগেও বিভিন্ন সময়ে সঙ্গীত নাটক একাডেমি, নয়াদিল্লি এবং ত্রিপুরা সরকার মিলে নাটকের উন্নয়নে বিভিন্ন সময়ে কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে তাদের উদ্যোগে প্রখ্যাত নাট্যকার বাদল সরকার, নীলকন্ঠ সেনগুপ্ত, ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় এসেছেন ভারতের বিখ্যাত চলচ্চিত্র অভিনেতা পুনের ফিল্ম এন্ড টেলিভিশন ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহন আগাসে এবং সতীশ আলেকর এসে কর্মশালা করেছেন ২০০০ সাল থেকে এন এস ডি প্রায় প্রতি বছর ধারাবাহিক ভাবে এসে নাটকের কর্মশালা করেছে তখন আন্তর্জাতিক খ্যাতিপ্রাপ্ত নাট্য ব্যক্তিত্ব পদ্মপুরস্কারে ভূষিত এইচ কানহাইয়ালাল, রতন থিয়াম এসে কর্মশালা করে গেছেন তাতে অবশ্যই নাটকের প্রতিটি বিভাগকে আরও উন্নত করার চেষ্টা অনেক বেড়েছে সেই সাথে ২০১২ সালে এন এস ডি স্থায়ীভাবে একাডেমিক কোর্স চালু করার ফলে নাটক প্রযোজনার ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতাও বেড়েছে নতুন নতুন নাট্য সংস্থার জন্ম হয়েছে উন্নত প্রযোজনা তৈরির ক্ষেত্রে নতুন নতুন আইডিয়ার জন্ম হচ্ছে, যা আগে আমরা কমই দেখেছি অতীতে অভিনয়ের কলাকৌশল বাচিক প্রধান ছিল তখন আমি স্তানাশ্লাভস্কি বা ব্রেখট বা গ্রোটোভস্কি কে জানতাম না তাদের আলাদা আলাদা ধারার সাথে ধীরে ধীরে পরিচিত হয়েছি এখন নাট্য প্রযোজনা সময় সেসব ধারা প্রয়োগ করার চেষ্টা করছি যদিও আশানুরূপ উন্নত প্রযোজনার ক্ষেত্রে আজও বহু বাধা বিদ্যমান তবু বলব, আমি নিজেকে তৈরি করার  ক্ষেত্রে এন এস ডি সহ প্রতিটি কর্মশালায় আসা ব্যক্তিত্বদের ভূমিকা প্রতি মুহূর্তে অনুভব করি                                                         

 

 

প্রশ্ন ঃ  যুব সমাজকে থিয়েটার থেকে দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে নানাভাবে, নানা অছিলায় । কারণ থিয়েটারটা মানুষকে ভাবায় আর ওরা ভাবতে দিতে চায় না । আমাদের রাজ্যে তাই হয়েছে বারবার । কংগ্রেসি আমলে, বাম আমলে এবং এখন তৃণমূলের আমলেও তাই হচ্ছে । কেন্দ্রে মোদী সরকার আসার পর থেকে থিয়েটারের গ্র্যান্ট নিয়ে এত টালবাহানা শুরু হয়েছে।”- বক্তা কলকাতার প্রখ্যাত নাট্য ব্যক্তিত্ব কৌশিক সেন । কথাটার সাথে আমি কতটা সহমত ? আপনি  ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করতে চাইবেন ?

উত্তর -  একটা জায়গায় শুধু ভিন্ন মত পোষণ করছি, সে জায়গাটি হচ্ছে, বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে যুব সমাজকে এই ভাবে অবক্ষয়ের দিকে যেতে দেয় নি সেটা যে হয় নি তার প্রমান হচ্ছে

৭নং প্রশ্নের উত্তর দেখলে দেখবেন, নাটকের উন্নয়নে বামফ্রন্ট সরকারের পক্ষে সবসময়ই একটি সদর্থক অগ্রণী ভূমিকা ছিল যদিও যুবসমাজকে ব্যাপকভাবে নাট্যশিল্পে ধরে রাখার ক্ষেত্রে যে ব্যর্থতা, তার জন্য দায়ী সর্বগ্রাসী ভোগবাদ সমাজ বিজ্ঞানী টিমোথি গ্রিন বলেছেন ' বর্তমান দুনিয়ায় হাইড্রোজেন বোমার পর সবচেয়ে বিপজ্জনক বস্তু হচ্ছে টেলিভিশন এখন আরও যুক্ত হয়েছে মোবাইল, ফেসবুক, হোয়াটস অ্যাপ, গুগল- যা ড্রাগসের চেয়েও সর্বনাশা ফলে এই ভোগবাদী সমাজ ভাবলেশহীন বিপন্ন অস্তিত্বের একদল যান্ত্রিক মানুষ সৃষ্টি করছে যার কেন্দ্রে রয়েছে যুবসমাজ ' এই ভাবে যুব সমাজকে মোহগ্রস্ত করে রাখার সর্বনাশা খেলা বর্তমানে ঘোড়ার গতিতে ছুটছে দেশের মোদী সরকারও এইসব সৃজনশীল কাজে মোটেই আগ্রহী নয় তাই নাটক প্রযোজনার ক্ষেত্রে এখনও অনেক বাধা অতিক্রম করার শক্তি সঞ্চয় করেই চলতে হচ্ছে                                                             

 

 

 

 

প্রশ্ন ঃ আজকাল বেশির ভাগ নাটক দেখে মনে হয়, নাটকটাই ডিজাইনের উপর চালাকি করে তৈরি করেছে। অনেকটা জাগলারির জায়গা নিয়ে নিচ্ছে । মিনিং খুঁজতে গিয়ে শেষ অবধি কিছু পাওয়া যাচ্ছে না ! এই প্রবণতা দিন দিন বেড়েই চলেছে বলে মনে হচ্ছে । ত্রিপুরাতেও তরুণ নির্দেশকদের মধ্যে এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে । এন এস ডি-এর নাটকে তো তা পড়েই । আপনার কি কখনও এমন মনে হয়েছে ?

 

 

উত্তর -: ত্রিপুরাতে যেসব নাটক হয় তাতে এর প্রবনতা কম তরুন নির্দেশকদের কথা যদি বলি তাদের একটি অংশের মধ্যে কিছু কিছু প্রবনতা আছে বিশেষ করে এন এস ডি থেকে যারা পাশ  করে বেরিয়েছে তাদের নাট্য নির্মাণে এমন কিছু দেখা যায় মনে রাখতে হবে ত্রিপুরাতে নাটকের পাঠদান করাচ্ছে এন এস ডি- থিয়েটার ইন এডুকেশন বিভাগ সেখানে পাঠদানের লক্ষ্য হচ্ছে স্কুলে ছাত্র ছাত্রীদের মধ্যে থিয়েটার প্রয়োগের মাধ্যমে  লেখা পড়াকে উন্নত করা, এবং একটি উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা সেখানে নাটককে আকর্ষণীয় করে তুলতেই বিশেষ শিক্ষা দান করা হয়ে থাকে সেক্ষেত্রে অবশ্য লক্ষ্য করা গেছে তারা বিষয়ের চাইতে চমকের প্রতি নজর দেন বেশি আমি মনে করি, সেখানে চমকের জন্য যা যা করা হচ্ছে তার প্রয়োজন রয়েছে কিন্তু মঞ্চ নাটকে কোন কোন ক্ষেত্রে অভিনবত্ব আনার জন্য এর কিছু প্রয়োগ হয় তাতে সবসময়ই নাটকের স্বার্থহানি হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না দেখতে হবে বিষয়কে ছাপিয়ে যাচ্ছে কি না এমন নাটকের সংখ্যা আমাদের রাজ্যে কম আর এন এস ডি প্রযোজনার  কথা যদি বলি, এই তো সম্প্রতি আমাদের রাজ্যে তাদের রেপার্টরি কোম্পানি পাঁচটি নাটক মঞ্চস্থ করে গেল সেই সমস্ত নাটকে কোথাও জাগলারির উপস্থিতি নেই উপরন্তু বিষয় বক্তব্যে নাটকগুলো ছিল অত্যন্ত উন্নত মানের এই নাটকগুলো আমাদের রাজ্যে খুবই প্রশংসিত হয়েছে তবে এন এসডি আমন্ত্রণে আসা কিছু কিছু নাটকের মধ্যে এসবের উপস্থিতি পরিলক্ষিত হয় সেক্ষেত্রে আমার বক্তব্য, বর্তমানে নাটকের উচ্চ শিক্ষায় অনেক কিছুই যুক্ত হয়েছে এমনকি বিদেশে নাটকের উচ্চ শিক্ষার মধ্যে ম্যাজিক, অ্যাক্রোবেটিক, তাতে দড়ির উপর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার মত কৃৎকৌশলও শেখান হচ্ছে সেসব যদি কোথাও সপ্রযুক্ত হয়, হতেই পারে মনে রাখতে হবে একটি নাটক যখন লিখিত অবস্থায় থাকে তা সাবজেক্টিভ পরিচালকের কাজ হল এই সাবজেক্টিভ ব্যপারকে অবজেক্টিভে পরিণত করা এক্ষেত্রে যে পরিচালক যত বেশি দক্ষ তিনি তার দক্ষতার পরিচয় রাখবেন দেখতে হবে নাটকের পাঁচটি মৌলিক সূত্র যাতে ক্ষুন্ন না হয়

 

 

প্রশ্ন । একজন নাট্য কর্মী হিসেবে কখন অস্তিত্বের সংকট অনুভব করেন আপনি ?

  

উত্তর - ১৯৬০ সালের কার্তিক পূজার দিন আমার জন্ম। জন্মের পরে একটু বড় হতেই শুনতাম, আমার বাবা আজ রাতে বাড়ি ফিরবে না। কারণ, বাবার আজ যাত্রাপালা আছে। তখন আমি বুঝতাম না যাত্রা কি? পালা কি? কিন্তু এই যাত্রাপালা শুনতে শুনতেই আমি আর একটু বড় হলাম। তখন অভিনয় শব্দটার মানে একটু একটু বোধগম্য হচ্ছিল । পাড়ার সত্যদা (সত্যপ্রসাদ চক্রবর্তী), শংকরদা( শংকর ঘোষ), পাড়াতে এই দুই দাদার অভিনয় দেখে এবং রুবিদি ( রুবি রায় বণিক) ও রেখাদি (রেখা রায়)-র কৌতুক নক্সা (অভিনয়) দেখে অনুপ্রাণিত হলাম। একদিকে বাবার যাত্রাভিনয়, সেইসাথে পাড়ার দাদা দিদিদের অভিনয় দেখে খুব সখ হল অভিনয় করার। কিন্তু কি করে সম্ভব? আমি তখন অষ্টম শ্রেণি কি নবম শ্রেণির ছাত্র। বড়দোয়ালী স্কুলে আমার পাঠ চলছে । একদিন সাহিত্য ক্লাশে আমি ও গোপা ( গোপা চক্রবর্তী) রচনা পাঠে যুগ্মভাবে প্রথম হলাম। মনে মনে ভাবলাম তৃতীয় বেঞ্চের ছাত্র হয়ে ফার্স্ট গার্ল গোপার সমান হয়ে গেলাম এই একটি জায়গায়।  এই জায়গাটাই আমার পক্ষে সহজ।ব্যপারটা উস্কে দিলেন আমাদের মানিক স্যার (মানিক দত্ত)। তাই মনের গোপন ভাবনা নিয়ে পাড়ার বন্ধুদের সাথে কথা বললাম। তখন তো পাড়ায় জলসা হত। এছাড়া মনোরঞ্জনের আর কোন বিষয় নেই। তাই আমি  নাটককে মনোরঞ্জনের মাধ্যম হিসেবেই ভাবতে শুরু করলাম। এবার আমাদেরও নাটক করতে হবে। কিন্তু নাটকের স্ক্রিপ্ট কোথায় পাব? আমার ধারণা তখন ছোটদের জন্য কোন নাটক লেখা হত না। নিজেই নাটক লিখতে শুরু করি। মনে রাখতে হবে, আমি তখন অষ্টম কি নবম শ্রেণিতে পড়ি। নাটক লিখলাম ' ভারত বিপ্লবী'স্বাধীনতার আন্দোলনে বিপ্লবীদের ভূমিকা নিয়ে এই নাটক। নাটক লিখে সাহস করে পাড়ার দাদাদের দেখালাম। কাঁচা বয়সের কিছু অপরিণত সংলাপ তারা সংশোধন করে দিলেন। আর সাথে দিলেন উৎসাহ। রিহার্সাল চলল এবং মুখস্থ হল। এবার মঞ্চের ভাবনা এল। তখনও নাটকের মঞ্চ দেখিনি। আমি যে নাটক তৈরি করলাম তাতে তিনদিক ঘেরা ও সামনে পর্দা চাই। এই পর্দা (কার্টেন) প্রয়োজনে উঠবে ও নামবে। সেই সাথে চাই মঞ্চে প্রয়োজন মত আলো। সেসব কিছুই আমার ধারণা ছিল না। এই বিষয়ে আমার দু'বছরের বড় ছোড়দা ( নিমাই বণিক) পুরো দায়িত্ব সামলে নিল। নির্দিষ্ট দিনে নাটক শুরু হল। পাড়ার ছোট বড় সবাই যে যার মত করে আসন নিয়ে এসে নাটক দেখতে বসে গেল। নাটক দেখতে এলেন রজত স্যার, তিনি সম্ভবত কোন এক কলেজের অধ্যাপক ছিলেন। তিনি এই কাঁচা বয়সীদের নাটক দেখছিলেন এমন একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে, মঞ্চের যেদিকে উইংস থাকে, সেখান থেকে। নাটকের একটি কারাগারের দৃশ্য দেখানো হচ্ছিল, কোন সংলাপ ছিল না। সেই সংলাপহীন অংশে তিনি গান ধরলেন 'কারার ঐ লৌহ কপাট ভেঙে ফেল......'এই গান আমার নাটকে ছিল না। আমি জানিও না। কিন্তু সেই গান নাটককে দারুণ ভাবে উচ্চ মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছিল। নাটকের শেষে অনেকেই একটু বেশি স্নেহ করতে শুরু করলেন। পরের বছর আবার একটি নাটক করি সেই নাটকের নাম মনে নেই। বুঝলাম নাটক করা আমার পক্ষে সম্ভব। কারণ আমার ধারণা ছিল এই শিল্প সহজেই আয়ত্তে আনা যায়। তাছাড়া অল্প বিদ্যা এবং অল্প জ্ঞানে অন্য কোন শিল্প আমার দ্বারা সম্ভব হবে না। আমার ধারণা ছিল নাটক অল্প একটু চেষ্টাতেই যথেষ্ট। যদিও এখন আমি বুঝি যে, নাটক নিয়ে যতই পড়ি বা জানি তাও যথেষ্ট নয়। সঙ্গীত, নৃত্য বা অঙ্কন বিদ্যার জন্য যেমন বছরের পর বছর ধরে সাধনা করে তবেই সফলতা আসে, নাটক তার চেয়েও বেশি। তবে সেসময় এতকিছু না ভাবলেও মনে মনে নিজেকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার একটা তাগিদ ছিল। আর সেই থেকেই আমার নাটক করার এই  উগ্র বাসনা জাগে। হয়ত আরও দু 'একটি বিষয়ও কাজ করে থাকতে পারে।                                                                    উত্তর - ২): নাটকে নান্দনিক শিল্প, বিনোদন ও সর্বোপরি সমাজের ঘটমান বিষয়ে মানুষের মনের ভেতরের সুপ্ত ভাবনাকে জাগ্রত করাই মূল লক্ষ্য। জন্মলগ্ন থেকেই নাটকের মধ্যে প্রতিবাদ ধ্বনিত  হয়ে আসছে। ইসকাইলাস, সফোক্লেস, কালিদাস, শূদ্রক হয়ে রবীন্দ্রনাথ থেকে উৎপল দত্ত। নাটকে কখনও রাজার বিরুদ্ধে, শাসকের বিরুদ্ধে বা রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্মমতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উঠে এল। শাসকের হাতে নাটক লাঞ্ছিত হল। চালু হয় নাট্য নিয়ন্ত্রণ আইন। তাই সর্বকালের প্রতিবাদের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে নাটক।                                                 

উত্তর-৩) : নাটকের বিভিন্ন ক্ষেত্রেই এক্সপেরিমেন্ট হচ্ছে। নাটককে আধুনিক করতে এক্সপেরিমেন্ট চাই। এখন তো আঙ্গিকের সাথে অ্যাক্রোবেটিক্সও যুক্ত হচ্ছে। আমি সবসময় নাটকের 'বিষয়ের' উপর  প্রাধান্য দিই এবং যতটা সম্ভব আমাদের চারপাশের ঘটনাকে গুরুত্ব দিই।                                                            

উত্তর-৪): একজন নির্দেশক হিসেবে আমার লক্ষ্য থাকে নির্দেশনার পাঁচটি মৌল বিষয়কে নাটকে যথাযথ ভাবে ব্যবহার করে প্রযোজনাটি তৈরি করা।  কম্পোজিশন, পিকচারাইজেশন, রিদম্, মুভমেন্ট এবং প্যান্টোমাইমিক অ্যাকটিং-এর যথাযথ  প্রয়োগে নাটক যেন যথার্থ পদবাচ্যে রূপ পায় এবং একজন দর্শককে বিষয় ভাবনায় উদ্বুদ্ধ করতে পারে।      

উত্তর - ৫): আমার নাটকে আমি সমাজ ভাবনাকেই প্রধান্য দিতে চেষ্টা করি। সেটি কখনো এপিকের ঘটনা থেকে তুলে আনি (নাটক : পুস্পহার) কিংবা কোন সমসাময়িক ঘটনায় তুলে ধরার চেষ্টা করি (নাটক : নীরাকে চাই) । যেখানে নাটকের বিষয় নিয়ে দর্শকের মনে নতুন কোন আশার সৃষ্টি করতে পারে।   

উত্তর ৬) : আমার প্রথম স্বীকারোক্তিতে বলেছিলাম যে, নাটকের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠা পেতে চেয়েছিলাম। আজ আমি এই সাধারণ জ্ঞানটুকু  নিয়ে যেভাবে নাট্যকর্মে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছি এবং আমার প্রিয়জনদের যে আস্কারা ও উদ্দীপনা পেয়ে আসছি তাতে নাটক ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারিনা। যেভাবে লেখাপড়া না করেও ক্লাসে ফার্স্ট গার্লের সমকক্ষ হতে পেরেছিলাম, যেভাবে এই সামান্য শিক্ষার জ্ঞান নিয়ে আজও এই ষাটোর্ধ যৌবনে এখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছি, তার কারণ এই নাটক। যেখানে মিলে বিশুদ্ধ অক্সিজেন। তাই এই অক্সিজেন নিতে বার বার সেখানে যাব। মঞ্চস্থ হবে নাটক, নাটক এবং নাটক। কারণ, নাটকই একমাত্র শিল্প, যেখানে একজন মানুষ প্রকৃত মানুষ হয়ে গড়ে ওঠে।

No comments:

Post a Comment

অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎

  'অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎ ‎সত্তর দশকের উন্মাদনায় এক ভিন্ন উচ্চারণ-ভঙ্গ...