Friday, July 4, 2025

যন্ত্রশিল্পী হিসেবে বিজয় দেবনাথ ত্রিপুরায় একটি উল্লেখযোগ্য নাম । -- তমালশেখর দে


 যন্ত্রশিল্পী হিসেবে বিজয় দেবনাথ ত্রিপুরায় একটি উল্লেখযোগ্য নাম । কীবোর্ড সিনথেসাইজার, হারমোনিয়ামে তার হাত চলে সহজাতভাবে । আজ একান্ত আলোচনায় তমালশেখর দে । 



প্রশ্ন ঃ প্রথমেই জানতে চাইবো, সঙ্গীতজগতে কখন কীভাবে জড়িয়ে গেলেন ?

উত্তর ঃ গান বাজনার পরিবেশ আমাদের বাড়িত সব সময়ই ছিল। আমার পিসি গান করতেন। আমার মা বাবা উভয়ই সংগীতানুরাগী । বাবাও গান গাইতেন একটা সময়ে   সুপ্রকাশ চাকী শ্যামল মিত্র মান্না দে তাদের গান। সুতরাং সংগীতের প্রতি অনুরাগ অনুপ্রেরণা আমার মা বাবা পরিবার থেকেই পাই। ক্লাস সেভেন পড়ি সময় মা বাবা দুজনের ইচ্ছায় আমার গান শেখা শুরু হয়। শ্রদ্ধেয় সংগীত শিক্ষক শ্রী হরিচরণ শর্মার মহাশয়ের কাছে গান শেখা শুরু করি। পরবর্তীতে গান শেখার সাথে সাথে যন্ত্রসংগীতের প্রতি আকৃষ্ট হলাম। হারমোনিয়াম এর প্রতি আকৃষ্ট হই প্রতাপরঞ্জন নাথের বাজনা শুনে এবং শুভজিৎ দেবরায়ের অনুপ্রেরণায় সিনথেসাইজার কীবোর্ড-এর প্রতি আকৃষ্ট হলাম। 


প্রশ্ন ঃ জীবনে অনেক গুণিজনের সাথে সঙ্গত করেছেন । স্মরণীয় একটা মঞ্চের অনুভূতি শুনতে চাইছি? 

উত্তর ঃ আমার সংগীত জীবনের আত্মপ্রকাশ ঘটে ২০০১ সালে। সে সময় যুব উৎসবের জাতীয় স্তরের মঞ্চটা একটা শিল্পীর কাছে বিশাল পাওনা ছিল। ২০০৩ সালে কেরালায় জাতীয় যুব উৎসবে অংশ গ্রহণ আমার কাছে বিশাল প্রাপ্তির। মাত্র দুই বছরের মাথায় তখনকার সময়ে এতো বড় মঞ্চে অনুষ্ঠান করা সত্যি একটা পাওনা এবং খুশির ছিল, যা জীবনে যত অনুষ্ঠান করি না কেন, সর্বকালেরই আলাদা অনুভূতি থাকবে। সন্দীপ নাথের তবলার সাথে হারমোনিয়মে নাগমা আর পিয়ালী পালের কত্থকের সাথে ঠুমরি এবং নাগমাতে সঙ্গত করি। একটা কথা সংযোজন করি। আমার ইচ্ছা সব সময় মানুষের দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানো, তাই আমি নিজেকে একজন সহশিল্পী হিসেবেই চেয়ে এসেছি। সহশিল্পীরা যে কাজটা করে সেটা পাশে দাঁড়ানোর কাজটাই করে থাকে এবং শিক্ষা এবং ক্ষেত্রটা সবারই একরকম, যে গায় তার এবং যে বাজায় তারও। 

প্রশ্ন ঃ  আজকের যুগে যেখানে আধুনিক মিউজিক্যাল ইন্সট্রুমেন্টের ব্যবহার এত বেশি হয়, সেখানে আমাদের পরম্পরাগত বাদ্যযন্ত্র হারমোনিয়ামের গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু বলে আপনি মনে করেন? 

উত্তর ঃ এই প্রশ্নের উত্তরে প্রথমেই বলি হারমোনিয়ামের গ্রণযোগ্যতা কমেনি বা কোনোদিন কমবেও না। সাড়া ত্রিপুরা রাজ্যে সার্ভে  করলে দেখবেন যারা গানবাজনা করে তাদের প্রত্যেকের বাড়িতে হারমোনিয়াম আছে। সেখানে ইলেকট্রিক ইনস্ট্রুমেটের সংখ্যা নগন্য। গান শেখার ক্ষেত্রে প্রথমে যে যন্ত্রটা প্রয়োজন সেটা হচ্ছে তানপুরা এবং হারমোনিয়াম। এখন কথা হচ্ছে কোন জায়গায় কোনটার ব্যবহার হবে সেটা নিয়ে। শাস্ত্রীয় সংগীতের মঞ্চে নিশ্চয়ই আমরা ইলেকট্রিক ইনস্ট্রুমেন্টের ব্যবহার আমারা দেখি না! কাওয়ালি গজলের মঞ্চে প্রধান সুরের ইনস্ট্রুমেন্ট  হারমোনিয়াম। সুতরাং এক একটা ইনস্ট্রুমেন্টের ব্যবহার এক একটা জায়গায় ক্ষেত্র বিশেষে। বিষয়টা হচ্ছে শাস্ত্রীয় সংগীত কাওয়ালি গজল এসবের অনুষ্ঠান খুবই কম হয় তাই হারমোনিয়াম যে একটা প্রধান বাদ্যযন্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয় সেটা আমাদের কাছে পরিলক্ষিত কম হয়।


প্রশ্ন ঃ  কী-বোর্ড এবং হারমোনিয়াম  কোনটার ক্ষেত্রে আপনি মানসিকভাবে বেশি আনন্দবোধ করেন কীসে ? 

উত্তর ঃ কীবোর্ড সিনথেসাইজার হচ্ছে একটা বৈদ্যুতিক সুরের যন্ত্র যেটা বিদ্যুতের সাহায্যে চলে। এটার মধ্যে প্রাকৃতিক উপায়ে তৈরী করা যন্ত্রের শব্দ গুলা সমন্বয় বা যুক্ত করা থাকে। তাই এক ব্যক্তি হাজারো যন্ত্রের শব্দ এটা থেকে বের করতে পারেন। দুটো যন্ত্রই আমার পছন্দের। শুধুমাত্র ব্যবহারিক দিক থেকে আলাদা। আবেগ তৈরি করার জন্য দুটো যন্ত্রেরই প্রয়োজন।

প্রশ্ন ঃ  আমাদের ছোট্ট ত্রিপুরায় বাদ্যযন্ত্রীদের সুযোগ-সুবিধা খুব একটা নেই বলেই আমার ধারণা ! এনিয়ে আপনি কী বলেন ? সময় কী নতুন বাঁক নিচ্ছে কোথাও ?  

উত্তর ঃ এভারেস্টের চূড়ায় যারা গেছেন বা সমুদ্রের তলায় যারা গেছেন সেই পথে না-ছিল সুযোগ না- সুবিধা। কিন্তু মানুষ তো সেখানে পৌঁছেছেন।কথা হচ্ছে আমরা যদি নিজেকে তৈরী না করতে পারি সেখানে সুযোগ-সুবিধা থাকলেও কোন লাভ হবে না। যারা সাধনা করেন তারা সুযোগ বা সুবিধার আশায় সাধনা করেন না। গান-বাজনাটা সাধনার বিষয়। ব্যক্তিগত ভাবে আমিও সাধনা কম করি । তাই আমার কাছে যদি সুযোগ বা সুবিধা আসে আমি কি সেটা কাজে লাগাতে পারবো? ইচ্ছা শক্তিকে কাজে লাগিয়ে নিজেকে দক্ষ করলে সুযোগ এবং সুবিধা নিজে থেকেই আসে এটাই আমার বিশ্বাস। আর সময় একটা অস্থির বিষয়। সে কোথায় যাবে বা না --যাবে আমরা কেউই আগে থেকে কিছু বলতে পারবো না। আমি যেটা মনে করি, নিজেকে স্থির রেখে নিজের  কাজের প্রতি ভালোবাসা অনুরাগ জন্মানোটাই লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন।

প্রশ্ন ঃ  ‘সঙ্গীত নাটক আকাদেমি’-র সাথে আপনি অনুষ্ঠান করেছেন অনেক জায়গায় । সেসব উপলব্ধি নিয়ে আমাদের কিছু বলুন ?

উত্তর ঃ  “সঙ্গীত নাটক অকাদেমি”-র অনুষ্ঠানগুলো সহজাতভাবেই এক অন্য রকম অভিজ্ঞতা। তাদের যে সিস্টেমেটিক উপস্থাপনা, সময়ের গুরুত্ব, পাশাপাশি একজন  পারফর্মার, বা যিনি অনুষ্ঠান পরিবেশন করবেন তার  সহকারি শিল্পীর গুরুত্ব  অকাদেমি খুব  ভালো বোঝে এবং যোগ্যসম্মানও দেন, এটা আমাকে খুব মুগ্ধ করে। তাদের উপস্থাপনা এবং আন্তরিকতা মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক পরিবেশ একটা সৃষ্টি করে, অনুষ্ঠানকে এক অন্য মাত্রায়  নিয়ে যায়।  আমি যতবার তাদের অনুষ্ঠানে গেছি,  ততবারই সমৃদ্ধ হয়েছি ।

No comments:

Post a Comment

অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎

  'অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎ ‎সত্তর দশকের উন্মাদনায় এক ভিন্ন উচ্চারণ-ভঙ্গ...