ত্রিপুরার লিটল ম্যাগাজিনের ইতিহাসে ‘জলজ’ একটি উজ্জ্বল নাম
তমালশেখর দে
ত্রিপুরার
সাহিত্যের ইতিহাসে একের পর এক প্রচুর বলিষ্ঠ লিটল ম্যাগাজিনের আবির্ভাব হয়েছে ।
আবার সময়ের সাথে সাথে তারা তাদের অবদান
রেখে একসময় হারিয়েও গেছে সময়ের দাবি মেনে । তবে বর্তমানে ত্রিপুরার সবচেয়ে
গুরুত্বপূর্ণ একটি লিটল ম্যাগাজিনের নাম বলতে বললে, প্রথমেই যে নামটা উঠে আসে, তার
নাম – “জলজ”। ‘জলজ’ মানেই এক চমক । নতুনের এক উন্মাদনা । এর প্রতিটি সংখ্যাতেই থাকে নতুনত্বের
ছোঁয়া! সেই ‘জলজ’ সম্প্রতি তার ১০০ তম সংখ্যা, ২৫বর্ষ,প্রকাশ করেছে । ‘জলজ’ লিটল ম্যাগাজিনের শততম সংখ্যায়
“অসম্পাদকীয়”-তে বিস্তারিত লেখা রয়েছে ‘জলজ’
লিটল ম্যাগাজিনটির অতীত- বর্তমান
এবং তার যাত্রাপথ নিয়ে । সম্পাদক লিখেছেন -- “ ‘জলজ’ শততম সংখ্যা এটি । না, শত
কোনো গন্তব্য নয় । যাত্রা পথের একটি মাইলস্টোন মাত্র । লিটলম্যাগাজিন কতদূর যাবে,
তার আয়ুষ্কাল কত হবে, কোন সম্পাদক-প্রকাশকের পক্ষেই নির্ধারণ করা সম্ভব নয়, কারণ লিটল ম্যাগাজিনের ভাগ্যলিপি কল্পনায়ও আসে না ।
স্বল্পায়ু নিয়েই জন্মায়, তারপর যা পায় পুরোটাই বোনাস । আসলে সম্পাদক,প্রকাশকের একাগ্রতা, দায়বদ্ধতা ও নিষ্ঠার
উপরই তার দীর্ঘায়ু, হ্রস্বায়ু নির্ভর করে । আমরা দীর্ঘজীবনের জন্যেই চর্চা ও চর্যায় ছিলাম ও আছি । একশ’ বা
দু’শ নয়, লক্ষ্য অসংখ্যের । জলজ অভিজ্ঞ হবে প্রাজ্ঞ হবে, সময়ের সাথে পা মিলিয়ে
ধরিত্রির পাশে থাকবে, এ লক্ষ্যেই লালন-
পালন।” জলজের এই শততমের যাত্রা এত বর্ণময় যে, একে একে তার উল্লেখযোগ্য সব বিষয়ের
উপর ছুঁয়ে যেতে গেলেও পাতার পর পাতা দরকার । একটি লিটল ম্যাগাজিন কেবলই লেখা
প্রকাশ করেই ক্ষান্ত হয় না, লেখক- কবি- সময়কেও প্রকাশ করে । পঁচিশ বছর সময়কালে
অনেক অন্যান্য তৎপরতার মধ্যে প্রকাশন একটি । ‘জলজ’-কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে
প্রকাশন, আড্ডার নামেই যার নামকরণ হয়েছে –‘ সাতদিন’ । এখন পর্যন্ত প্রায় সত্তর-
আশিটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে । ত্রিপুরার ছোট্ট শহর ধর্মনগরে সাহিত্যকেন্দ্রিক বড়
আয়তনে যেসব উৎসব-সম্মেলন হয়েছে তার মধ্যে ‘জলজ সাহিত্য সম্মেলন’-একটি । ‘জলজসম্মান
সাহিত্যেৎসব’ এখন পর্যন্ত দেওয়া হয় – কবি কল্যাণব্রত চক্রবর্তী, কবি নন্দকুমার
দেববর্মা, কবি পীযূষ রাউত, কবি কৃত্তিবাস চক্রবর্তী, কবি মিলনকান্তি দত্ত এবং কবি
অমিতাভ দেবচৌধুরী-কে । ২০১০ সালে জলজ-এর
সাহসী পদক্ষেপ – ‘ লিটলম্যাগাজিন সম্পাদক সম্মেলন’ । এরপর নির্জন চা-বাগানে আয়োজন
করা হয় ‘রৌদ্র গানে কবিতা’- এর উৎসব ।
এভাবেই একে একে আসে – ‘ চিত্রকলা ও কবিতা উৎসব’ ‘সান্ধ্য পংক্তিমালা’ । এককথায়
‘জলজ’ এভাবে একের পর এক উত্তেজনা জিইয়ে রেখে আসছে এত বছর থেকে ।
‘জলজ’
১০০তম সংখ্যা সেজে উঠেছে –
গদ্য,কবিতা, অণুগল্প, অনুবাদ, আলোচনাসহ এক জমজমাট ১০০ পৃষ্ঠায় । ‘পূজাবিজ্ঞানের
আলোকে রবীন্দ্রনাথঃ পূজা পর্যায়’ – নামে গদ্য লিখেছেন মিলনকান্তি দত্ত । মিলনকান্তি দত্ত মানেই নতুনত্বের এক অজানা চমক । এখানেও তার ব্যতিক্রম হয়নি । তিনি
লিখছেন – “পূজা কাকে বলে ? দেবদেবীর পূজা জড়ের পূজা নয় । চৈতন্যের পূজা নয়। ভাবতত্ত্বের পূজা । ভাবতত্ত্বের পূজা । এক-একটি
বিশিষ্ট ভাব, শক্তি ও অন্তঃপ্রজ্ঞার পূজা । পূজাই যোগ । যোগই পূজা । পূজাযোগ । ...
দেবতা মানেই আলো । ‘দিব্’ ধাতু । আলো-কে ভালোবাসলে জীবন দিব্য হয়ে ওঠে । ‘দিব্য’
মানে আলোকিত। প্রিয়কে যা দিতে পারি, তা দেবতাকে দিয়ে,দেবতাকে প্রিয় করে তোলার নামই
পূজা। প্রাগার্য-আর্যের সম্মিলনের হিতফল আধুনিক হিন্দুজাতি ।” এভাবেই একটু একটু
মিলনকান্তি দত্ত বিষয়ের গভীরে ঢুকতে
থাকেন । তারপরই আমরা পাই তার মোক্ষম ভাবনার প্রকাশ – “ রবীন্দ্রনাথের ধর্ম কবির
ধর্ম । তাঁর সাধনা মূলত আর্টিস্টের সাধনা । কবি পূজাতত্ত্বকে দেখেছেন আর্টের দিক
থেকে । পূজার ভাব ও পূজনসামগ্রী থেকে শিল্পগত উপাদান সংগ্রহ করেছেন ।” মিলনকান্তি দত্ত লিখছেন – “ তোমায় বসাই
এ-হেন ঠাঁই / ভুবনে মোর আর কোথা নাই,/ মিলন হবার আসন হারাই আপন-মাঝে-- /সুর ভুলে
যেই ঘুরে বেড়াই।” – ঘটস্থাপন করতে হবে আনন্দময়ের কৃপাধারার তলে । ঘটস্থাপন । ঘট মানে দেহঘট । কলস । “কলাং কলাং গৃহীত্বা বৈ দেবানাং
বিশ্বকর্মনা।” দেবতাদের কলা-কলা শক্তি দিয়ে বিশ্বকর্মা নির্মিত ঘটই ‘কলস’। জলপূর্ণ
ঘটে “ইমং ঘটং সমারুহ্য তিষ্ঠ দেবগণৈঃ সহ” সকল
দেবদেবীর প্রতিষ্ঠিত হোক, এটাই পূজকের কামনা । কামনা পূর্ণ হয় । কবি
গেয়েছেন – “ তোমারই ঝরনাতলার নির্জনে ।/ মাটির এই কলস আমার ছাপিয়ে গেল কোন্
ক্ষণে।” ধ্যাননির্জনতা চাই । কখন আমার
দেহঘট তাঁর কৃপাশীর্বাদের ধারায় উপচে পড়েছে ।” এভাবেই একের পর এক পূজা- পর্যায়ের
গান ধরে মিলনকান্তি দত্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে আমাদের সামনে নতুন এক রূপে যে পরিচয়
করিয়ে দিলেন ।
এরপর যে গদ্যটায় আমার চোখ আটকে যায় অশোক দেব-এর “হস্তিপরিচয়” । “হস্তিপরিচয়” গদ্যটিতে অশোক দেব বেশ কিছু বিষয়
নিয়ে সঠিকভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ করছেন ।
তারপরও গদ্যটি পড়তে পড়তে একটা জায়গায় এসে প্রায় চমকে যাই, যখন তিনি লিখছেন –
“বাংলা কাব্যসাহিত্য মূলত বিকলাঙ্গ,
রূপবিচ্যুত । একথা বলা বড়ো বিপদজনক হল । তথাপি বলতে হল। ইংরেজ আসার কিছু আগেও তার
দীর্ঘ উত্তরকাল ধরে বাংলা কাব্যকে মেরে মেরে বিকলাঙ্গ করা হয়েছে ।” আবার কিছু পরে
একই প্রসঙ্গে লিখছেন –“ছন্দ প্রকরণকে আঁচলবদ্ধ করার জন্য নানা নামকরণ ও
চলনবিন্যাসকে মান্যরূপ দিয়ে বলা হল এই নাও বাংলার সবেধন তিন ছন্দ । হল বিদেশি
প্রকরণের প্রচার । সনেট থেকে হাইকু, রুবায়েত থেকে গজল সব চেষ্টা করা হল । তাতে
ভাষা মহত্ত্বর বাঁক নিয়েছে, সন্দেহ নেই । কিন্তু তাঁর মৌলরূপটি আজ খুঁজে পাওয়া যায়
না । মূলত ইংরেজি সাহিত্যের চালচলন এনে বাংলায় অনুপ্রবিষ্ট করা হল । ... কথায় কথায়
কবিতাকে ক্ষণে স্যুররিয়াল, ক্ষণে
ইম্প্রেশনিস্ট, আজকাল সাব অল্টার্ন বলে দাগিয়ে দেওয়া হতে লাগল । তরুণ কবিটি লিখতে
এসেই তাই বোধ সরিয়ে রেখে বুদ্ধির অভিভাবকত্বে পরিধান হয়ে যায়। জীবনের আকাশপাতাল
ভুলে নাগরিক হয়ে উঠবার চেষ্টা করে।” কবি-গদ্যকার, ভাবুক অশোক দেবের কথাগুলো ভাববার
মতো । আমাদের ভাবনা জগতের শিকড়ে ধরে টান মেরেছেন তিনি । ভালো লেগেছে আমার ।
এভাবে আরও গদ্য পাই আমরা ‘জলজ’-এর ১০০ তম সংখ্যায় । প্রখ্যাত কবি-
প্রাবন্ধিক রবীন্দ্র গুহ লিখেছেন – “ মাটি ও মানুষের বাঁটোয়ারা”, কবি-প্রাবন্ধিক
পল্লব ভট্টাচার্য লিখেছেন – “তোমার ভাষা বোঝার আশায়” । পল্লব ভট্টাচার্য মানেই
অচেনা- অজানা এক কৌতুহলের দিকে পাঠককে ঠেলে দেয়ার তৎপরতা। এখানেও তার ব্যতিক্রম
হয়নি –“ যদি বলা শোনার মধ্যে কোনও যোগাযোগ না ঘটতো, তাহলে এই যে আমাদের এত এত কথা
বলা আর এত এত কথা শোনা, সব কোথায় যেতো ? শব্দতরঙ্গ হয়ে যদি বাতাসে ভেসে না যেতে
পারতো, তবে কোন অন্ধ মরুপথে হারিয়ে যেতো আমাদের এত এত কথা ? যদি বাংলাভাষা তৈরির
সেই আদি যুগের কোনো একসময় উচ্চারিত ও গীত হয়ে, লিখিত না হত কাহ্নপা-র চর্যার এই পদ, তবে কীভাবে আমরা আন্দাজ
করতে পারতাম, ‘ সহজ কথা ঠিক ততটা সহজ নয়’!” খুবই মূল্যবান একটা গদ্য । এরপর একে
একে আমরা গদ্য পাচ্ছি, অমিতাভ দেব চৌধুরীরগদ্য – ‘ভাক্সো পোপাঃ একটি ভূমিকা” ।
কবি- গদ্যকার অভিজিৎ চক্রবর্তীর মূল্যবান গদ্য – “ ত্রিপুরার কবিতার হাংরি
প্রভাবিত আধুনিকতা ও টিনের তলোয়ার”। কবি-প্রাবন্ধিক
অশোকানন্দ রায়বর্ধনের গদ্য – “ রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ বাংলা কবিতায় ভিন্নতায় স্বরায়ন”
। গদ্য ছাড়াও এই সংখ্যায় রয়েছে প্রায় ৯২ জন কবির কবিতা, গল্পে পাচ্ছি – স্বকৃত
নোমান, অলক দাশগুপ্ত এবং মোজাফফর হোসেন । মূল্যবান দুটি অনুবাদ পাচ্ছি – “ফেদেরিকো
গার্সিয়া লোরকা চরিত” – জুয়েল মাজহার, “ আলফোনসিনা স্তর্নি ” অর্পিতা আচার্য
। “ লে সাইলেন্স ডিলা মার কুমার” আলোচনায়
পাচ্ছি অজিত দত্ত-কে ।
এককথায় ‘জলজ’ শততম সংখ্যা শততম পৃষ্ঠায় অসাধারণ একটি সংখ্যা । সম্পাদক সন্তোষ রায়কে
এজন্য অসংখ্য ধন্যবাদ জানাতেই হয় । ‘জলজ’ প্রকাশের প্রথম সংখ্যার উজ্জ্বল সাক্ষী
ছিলাম আমি । সেই চরম সৌভাগ্য হয়েছিল আমার । আজ সেই ‘জলজ’ এর শততম
সংখ্যা নিয়ে লিখছি, ভাবতেই ভালো লাগছে । আজ
ত্রিপুরার লিটল ম্যাগাজিনের ইতিহাসে ‘জলজ’ উজ্জ্বল একটি নাম । একটা উদাহরণ। একটা প্রেরণার নাম । সংগ্রামের নাম । ‘জলজ’
আরও এগিয়ে যাক, এই শুভ কামনা রইল ।
পত্রিকা --‘জলজ’—১০০
তম সংখ্যা
সম্পাদক – সন্তোষ
রায়
ধর্মনগর / উত্তর
ত্রিপুরা
মূল্য – ২০০
টাকা ।

No comments:
Post a Comment