কবি অজিতা চৌধুরী ঃ
মন্দ্র উচ্চারণের গভীরে দ্রোহের এক গভীর উচ্চারণ
তমালশেখর দে
“বৃষ্টি
আমার
কবিতার
উৎস
।
জলধারার
অবিরল
প্রবহমানতা
অনর্গল
খুলে
– জন্ম
হয়
কবিতার
। আরও কিছু অভিমুখ, কোন ঘটনা, গভীর কোন দুঃখবোধ অনিবার্যভাবে কবিতায় উঠে আসে । আমার কৈশোর, যৌবন, মধ্যবয়স ত্রিপুরার আলো ছায়ায়
কেটেছে,
সেখানের
বাস্তবতা,
সমস্যা,
প্রকৃতি
সবই
তো
আমার
। ভালোবাসি স্থানিক
ভূগোলকে
। জীবনের প্রান্তসীমায় উপলব্ধ
হলাম
কবিতার
মূল
শর্ত,
ভালোবাসা
।” – কবি অজিতা চৌধুরী আমার প্রিয় কবিদের মধ্যে অন্যতম একজন
। কবিতা- আড্ডায় তাঁকে প্রথম দেখি,
চেহারায় একটা মা, মা, ভাব । স্থির, ধীর । নম্রভাষী । কথা বলার মধ্যেও সেই রেশ ।
ব্যবহারেও একটা মা মা ভাব। সেলিম মুস্তাফা বললেন, এই আমাদের ‘মেজদি!’ আমরা সবাই
তাঁকে মেজদি বলেই ডাকি । তুমিও মেজদি ডেকো । সেই থেকে তিনিও আমার মেজদি হলেন । আজও
মেজদি । এরপর বহু কারণে-অকারণে মেজদির বাড়ি গেছি । আজ যখন পেছন ফিরে সেইসব দিনের
দিকে তাকাই, তখন বুঝতে পারি, আমি মূলত মেজদির ভিতর দিয়ে একটি গ্রাম-বাংলার, আমার
খুব আপন, খুব প্রিয়, যার কাছে সব বেদনা বলা যায়, এমন একটি চরিত্রকে মূলত কাছ থেকে
দেখার, পর্যবেক্ষণের চেষ্টা করতাম । এবং সেই অভিজ্ঞতা আমি আজও বহন করি । এই যে এখন
মেজদির “কবিতা সমগ্র”-টি পড়ে চলেছি, তখনও আমি সেই মেজদির দিকেই তাকিয়ে আছি । তাঁর
স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কবি সন্তোষ রায় লিখেছেন – “ কবি যেমন কোমল মনের, তাঁর কবিতাও
নম্র স্বভাবের । মন্দ্র সপ্তকে উচ্চারণ,
তাঁর মনের মায়া জড়িয়েছে ভাষাকে, শত যন্ত্রণায় বিরুদ্ধে শব্দ তাঁর উচ্চকিত নয়, বরং
দরদী এক ভাষায় পাঠকমনে পৌঁছে যায় যন্ত্রণার অনুভব। শুরু থেকে কবিতার এই গুণগুলি
কবি লব্ধ করেছিলেন বা বলা যায়, জন্মসূত্রে প্রাপ্ত হয়েছিল । ওইসময় থেকেই তিনি স্বতন্ত্র
এবং কাব্যঘ্রাণে আভাসিত । কবি অজিতা চৌধুরী কবিতা লেখার চেষ্টা করেন না, সাদা
কাগজে নিজেকে উজাড় করে দেন, নিজেকে ঢেলে দেয়াই তাঁর কবিতা, তাই কবিতা হয়ে ওঠে তিনি
যেমন ।”
কবি অজিতা চৌধুরী-র
প্রথম কাব্যগ্রন্থ “ দীঘল বাঁকের জল” প্রকাশিত হয় ১৯৯৩ সালে । স্থানিক একটি খালের
বাঁকের নামেই গ্রামটির নাম দীঘল বাঁক
। মিষ্টি একটা নাম তো বটেই । কিন্তু এর
ভিতরে কোথায় যেন একটি কাব্যিকতা রয়েছে । রয়েছে একটি গোপন নারী মনের কথা । কেবল
নারী-মন ? না, ভুল বললাম, আমাদের প্রত্যেকের মনের ভিতরেই একটা দীর্ঘ-বাঁক থাকে ।
হৃদয়ে থাকে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘ সুড়ঙ্গ । সুড়ঙ্গের বাঁকে বাঁকে গোপন মনের যত গোপন কথা
। সুখ-কথা, দুঃখ-কথা। মায়াবি বিকেলের কথা । নিঃসঙ্গ দুপুরের উদাসী কথা । আনন্দে আঁচল উড়ার কথা –
“হাওয়ায় উড়ছে আঁচল
জরির আঁচলে বিস্তীর্ণ
সুখ
হলুদ পাখির খোঁজে
ডাকবাক্স খুলি
... ... ...
জীবনের ছোট বড় ঢেউ,
অগণিত পায়রা
গম্বুজে, খিলানে,
গীর্জায় শুধু কবুতর
মোনালিসার মুখ,
গণ্ডোলা ভেসে চলে
সারারাত টুপটাপ শিশির
ভালবাসার নির্মেঘ
আকাশ, জীবনের সরল সত্য
বারবার ফিরে আসে।” ( কবিতার পাণ্ডুলিপি)
এই তো আমাদের মেজদি ! দীঘল বাঁকের জলের হাওয়ায় উড়ছে আঁচল । জরির
আঁচলে ‘বিস্তীর্ণ সুখ’ নাকি ‘নারী-সুখ’ নিজের সাথে নিজে থাকার এক অজানা সুখ ।
সুখের ছোটো ছোটো অনুভব, সারারাত টুপটাপ শিশির বিন্দুর মতো মনোরম, মায়াবি মৃদু এক
সুখ । আর তখনই কবি অনুভব করছেন যেন জীবনের এক পরম সত্য – “জীবনের সরল সত্য বারবার
ফিরে আসে।”
কবি জীবনের সরল এক সত্যকেই দেখতে চেয়েছেন । দেখাতে চেয়েছেন
। এই অনুভব অজিতা চোধুরীর অনুভব । একজন নারীর অনুভব যে – জীবনের সরল সত্য বারবার
ফিরে আসে । এবং জীবনের বেশ কিছুটা পথ হেঁটে আসার পর আমিও সহমত এই এই সত্যে ।
জীবনকে আমরা যতটা জটিল ভাবি, জীবন কি সত্যিই ততটা জটিল ?
“একটা একটা করে পাথর
গড়িয়ে পড়ে
কাছে এসে দেখে যাও
শুয়ে আছে রক্তাক্ত
মানুষ
চত্বর ভেঙে গেছে;
বাসস্থান নেই
দৃশ্য ঠিক হয়ে আছে
অশ্রুজলে আঁকা,
আমার ঘরের কাছে তোমার
শ্মশান
বিতর্কিত সীমানার কাছে
পড়ে আছে
আমাদের যৌথ জীবন।” (
চত্বর)
ওমা! একী চিত্র অঙ্কন
করলেন কবি ! ‘একটা একটা করে পাথর গড়িয়ে পড়ে’ কিন্তু এরপর কবি কাকে বলছেন – ‘কাছে এসে দেখে
যাও’ । ‘যাও’ শব্দের ভিতরে একটা ‘তুমি’ খুব নীরবে লুকিয়ে আছে। কে সে-ই তুমি ? যখন কবিতার ভিতরে নীরবে বয়ে চলা ‘তুমি’-কে
খুঁজে পেলাম, তখনই মনে হল তাহলে তো তুমি-র ভিতরে আরও নীরবে একটা ‘আমি’ লুকিয়ে
রয়েছে ! সে আমি কী তবে কবি নিজে ? যার জন্য কবি পরে লিখছেন – “আমার ঘরের কাছে
তোমার শ্মশান / বিতর্কিত সীমানার কাছে পড়ে আছে / আমাদের যৌথ জীবন।” এখানে ‘যৌথ
জীবন’ শব্দটা এসেই উপরের যাবতীয় পাঠের পরিকল্পনা পাল্টে দিল । তুমি আর আমি কি অবলীলায় মিশে গেল এখানে । এবার
পেছন ফিরে পড়লাম সেই লাইন – “শুয়ে আছে রক্তাক্ত মানুষ” কে সেই মানুষ ? মানব না মানবী ? নিশ্চয়ই দুজন !
নাহলে ‘আমাদের যৌথ জীবন।’ শব্দবন্ধটা কবি আনতেন না । আবার লিখছেন – “দৃশ্য ঠিক হয়ে
আছে / অশ্রুজলে আঁকা” । তাহলে বিতর্কিত সে-ই সীমানা কোনটা ? এই সীমানা কি জমির ?
না ব্যক্তিত্বের ? এক একটা পাথর কোথায় গড়িয়ে পড়ছে ? কবির বুকে ? না, বিছানার
বিতর্কিত সীমানায় ? নাকি নিছকই এক বিচ্ছেদের মন-ভার কবিতা এটা ? কবির উদ্দিষ্ট যাত্রা যে-দিকেই হোক, আমি এখানে
মর্মে-আহত একটি নারী হৃদয়ের চিত্রকথা দেখতে পাচ্ছি । দেখতে পাচ্ছি, একটা মরমিয়া
কাহিনি । যা যেমন প্রেমের হতে পারে ! হতে পারে রক্তাত্ত এক যৌথ জীবনের
চিত্র । পাঠকের মেজাজের সাথে সে মিশে যাবে, তার ভাব নিয়ে । এই কবিতার একটা
বহুমাত্রিক যাত্রার সুযোগ আছে । এখানে কবি কী বলতে চাইছেন, আমার কাছে সেটা বড় কথা
নয় , আমার কাছে বড় কথা, আমি এই লাইনগুলিকে ব্যবহার করে, পাঠক হিসেবে আমি কোথায় ভেসে যাচ্ছি । এই ভাসমান অবস্থা
থেকে আমি নিজেকে আটকে রাখতে পারছি না । কবি
লিখছেন- “আমার ঘরের কাছে তোমার শ্মশান/
বিতর্কিত সীমানার কাছে পড়ে আছে/ আমাদের যৌথ জীবন।” আর আমি পড়ছি, আমার বুকের মাঝে
তোমার স্মৃতির শ্মশান / ভালোবাসার বিতর্কিত সীমানার কাছে পড়ে আছে/ আমাদের যৌথ
জীবন।” কবি কী তা বলতে চেয়েছেন ? জানি না ! কিন্তু আমি পাঠক হিসেবে এভাবেই অনুবাদ
করেছি । কবি কি আমাকে বাধা দেবেন ? না, কবির সেই অধিকার নেই । কারণ আমি তাকে সে
অধিকার দিইনি । এখানেই পাঠক- ভাবনা বদলে যায় । এখানেই পাঠকের মনস্তত্ত্বই শেষ কথা
বলবে । কবিতার অর্থ- গ্রহণের স্বাধীনতা পাঠকের পক্ষেই থাকবে । পাঠকই পাঠের অর্থকে
মূলত মূর্ত করে থাকেন ।
“যখন নিজের সঙ্গে
একাত্ম হই নির্জনতাকে
বড় ভাল লাগে, অকারণ
কলরব শুধু
ভারাক্রান্ত করে কোন
নিবিড় উপলব্ধির,
দক্ষিণের জানালা যা
অগোচরে গড়ে ওঠে,
মনে মনে তার মুখোমুখি
হই,
চলমান দৃশ্যপট ভেসে
যায় –
মানুষ হয়েও মানুষের
কাছ থেকে
দূরে সরে যাই” (দক্ষিণের
জানালা)
এই ব্যক্তি-মেজদিকে
আমি যেন দেখেছি । এই কবি-মেজদিকে আমি যেন খুব কাছে থেকে দেখেছি । তাঁর কবিতা পাঠ
শুনেছি । তাঁকে আনমনে দূর থেকে দেখেছি । কী অপূর্ব অনুভূতির প্রকাশ - “দক্ষিণের
জানালা যা অগোচরে গড়ে ওঠে /মনে মনে তার মুখোমুখি হই” কোন্ ‘ তার’ – এর মুখোমুখি হন কবি ? নিজেই
নিজের মুখোমুখি হন কবি, একান্ত নির্জনতায় । একান্ত অবেলায়, নিজের কাছাকাছি দক্ষিণের জানালায়, ভারাক্রান্ত হৃদয়ে, নিজের
মুখোমুখি হওয়া কিন্তু সাহসী একটা কাজ । নিজের কাছে নিজের আত্মসমর্পণ বড় ভয়ানক এক
উপলব্ধি । একথা জেনেও কবি নিজের মুখোমুখি
দাঁড়ান ! একের পর এক দৃশ্য ভাসতে থাকে । কী-এক মর্মঘাতী বেদনায় কবি নিজেই নিজের কাছে স্বগতোক্তি করেন – “মানুষ হয়েও
মানুষের কাছ থেকে / দূরে সরে যাই”
এইসব কবিতার, অনুভূতির
কোনো ব্যাখ্যা হয় না । কেবল তাকিয়ে থাকতে হয়, কবির দিকে । কবির মুখের দিকে । তাঁর
অনুভবের দিকে । কবির সেই অনুভবের যাত্রা
একসময় পাঠক হিসেবে আপনাকেও আক্রমণ করে ফেলবে । আপনিও তলিয়ে যেতে থাকবেন, আপনার এক
নিজস্ব অনুভবের দিকে । একসময় লাইনগুলো আর
আপনার থাকবে না, হয়ে উঠবে একান্ত আপনার । আপনি এসে পড়বেন আপনার মুখোমুখি , আপনারই
অজান্তে । এবং হঠাৎ লক্ষ করবেন, আপনিও কোথায় যেন দূরে সরে যাচ্ছেন । মানুষ থেকে ।
আপনার থেকে । তখন হঠাৎ লক্ষ করবেন, আপনিও আপনার দক্ষিণের জানালা খুলেননি বহুদিন । নিজেকে
স্পষ্ট দেখার যন্ত্রণাও কম পীড়াদায়ক নয় । কবি সেই পীড়া থেকেই যেন লিখেছেন এই কবিতা ।
সেই ঘোর থেকেই কবি যেন
লিখে চলেন –
“এক পা দু-পা করে যত
উঠি
ক্রমশ সিঁড়ির ধাপ উঠে
যায়
অবেলায় স্নান সেরে
ভিজে চুলে
সংক্ষিপ্ত করে নিতে
চাই সবকিছু
সন্ধ্যার আগে।
কি যেন রয়েছে সম্মুখে
পশ্চাতে
সমাপ্তির আগে শেষ
সিঁড়ি
দীর্ঘ হয়ে আরও আরও উঠে
যায়।” (বিক্ষিপ্ত)
কবি এই কবিতার নামের
মতোই কবিতার সর্বাঙ্গে একটা বিক্ষিপ্তপনা আছে । চিত্রকল্পটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এবং
সংযমী । ‘অবেলায় স্নান সেরে’ খুবই
সাংকেতিক একটা লাইন। একটা প্রতীকের চিহ্নায়ন । ‘সংক্ষিপ্ত করে নিতে চাই সবকিছু’ –
কিন্তু কেন ? কী হয়েছে ? কবি স্পষ্ট কিচ্ছু বলছেন না । কেবল আঙুলের মতো ইঙ্গিতে
কাঁপা কাঁপা হাতে যেন বললেন – “কি যেন রয়েছে সম্মুখে পশ্চাতে” । এইসব লাইন কিন্তু
মারাত্মক। দেখতে তেমন কিছু স্পষ্ট বলে না
। অথচ ইশারায় বলে যায় বহু বহু কথা । কবি কবিতার সগুরু করলেন এই বলে - “এক পা দু-পা
করে যত উঠি/ ক্রমশ সিঁড়ির ধাপ উঠে যায়”। আবার শেষ করছেন – “সমাপ্তির আগে শেষ সিঁড়ি
/ দীর্ঘ হয়ে আরও আরও উঠে যায়।”
ওমা ! দৃশ্য, দৃশ্যট
সব যেন পাল্টে গেল । ‘অবেলা’ পুনরায় পড়তে গিয়ে কেমন যেন ভয় ভয় করতে লাগল । এখানে
‘অবেলা’ শব্দের সাথে ‘স্নান’ শব্দটা কেমন গোটা কবিতাটাকে খচ্ করে শেকলের মতো আঁকড়ে ধরে বুকটাকে । অথচ এই কবিতায়
কবি সত্যি কিছুই বলেননি । ‘বিক্ষিপ্ত’
কবিতার নামের মতো কবি যেন ক্যানভাসে বিক্ষিপ্ত কিছু তুলির টান মেরেছেন । তারপরই
সরিয়ে নিয়েছেন তার তুলি । আমরা পাঠকরা যেন অসহায় একটা ক্যানভাসের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়েছি । কিছু একটা
বুঝেও বুঝে উঠতে পারছি না । এই কবিতায়
এই খেলার মুহূর্তটা ধরা সব সময় সম্ভব হয়
না । সহজও নয় ।
কবি অজিতা চৌধুরীর কবিতায় বলিষ্ঠ উচ্চারণ আছে
প্রচুর । বলিষ্ঠ চিত্রকল্পও আছে । তবে তা
চলে নীরবে-নিভৃতে । আমি অনুভব করেছি, কবির
ভিতরে কোথাও একটা না- বলা কথা আছে । না- বলা ব্যথা আছে । উচ্চারণ আছে । যা তিনি
খুব চুপ করে কবিতায় বলতে চেয়েছেন –
“যে রাত অবগুণ্ঠিত তার
কাছে আত্মসমর্পণের
গ্লানি মর্মান্তিক ।
তোমার সান্নিধ্যে
শব্দেরা বাঙ্ময় হয়ে
ওঠে, রাত গভীর হয়
বাসনার কালো ঘোড়া
দুর্দম বেগে
নিথর রাত্রিকে চুরমার
করে
রাত্রির কৌমর্য নষ্ট
হয়, বিরল সতীত্বে
স্বপ্নের সিঁড়ি দীর্ঘ
হয় ।” ( আশ্চর্য স্বপ্ন)
কবিতার ভিতরে কিন্তু
দাবানল আছে । খুব নিরীহ উচ্চারণ কিন্তু এটা নয় । “যে রাত অবগুণ্ঠিত তার কাছে আত্মসমর্পণের গ্লানি মর্মান্তিক ” – এই লাইনটার ব্যাখ্যা
করতে গেলেই তো আপনাকে দীর্ঘ একটা দ্রোহের
অনুভবের ভিতর গড়িয়ে গড়িয়ে যেতে হবে । ‘গ্লানি’
শব্দটাই তো এখানে ভয়ানক । তার উপর কবি লিখছেন- ‘আত্মসমর্পণে গ্লানি’ ।
‘আত্মসমর্পণ’ শব্দটা তো সম্মতিসূচক । তাহলে কবি এরপরই ‘গ্লানি’ শব্দটা জুড়ে দিলেন
কেন ? বিষয়টা আমাকে খুব ভাবিয়েছে । এত নরম কবির ভিতরে এই বিস্ফোরণ কীসের ? আত্মমর্যাদার
প্রশ্নে কবি দ্বিধান্বিত ? তাই কবি এরপর ক্রম অনুযায়ী লিখছেন – “ নিথর রাত্রিকে
চুরমার করে / রাত্রির কৌমর্য নষ্ট হয়” ।
এই লাইনগুলো পড়ে আমি ভাবছি, যেখানে যেখানে স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ, সেখানেই ‘নিথর’
শব্দটা কেন যোগ করলেন কবি ? ‘নিথর’- মানে তো স্থির, যা নড়ে না । স্পন্দনহীন,
নিস্তব্ধ। আর সেখানেই আমি একটা বিরোধাভাস পাচ্ছি । কবিতার চিত্রকল্পে একটা বৈপরীত্য,
অসঙ্গতি লক্ষ করছি । কবি একবার লিখছেন - শব্দেরা বাঙ্ময় হয়ে উঠে, মনের ভিতরে বাসনা
জাগে। অথচ নিথর দেহ । অচঞ্চল । গ্লানিময় । এবং কবিতা শেষ করছেন এই বলে – “স্বপ্নের
সিঁড়ি দীর্ঘ হয়” আর ব্যঙ্গ করেই কী বললেন – এর আগে – “বিরল সতীত্বে” । শব্দটা কি
ব্যঙ্গাত্মক ? আমার তো তাই মনে হয়েছে ? আপনার ...
আসলে এখানেই কবিতার
খেলা । পাঠক হিসেবে ভালোলাগা । ভাবা প্র্যাকটিস্ করা । কবিতা যে কখন, কীভাবে বাঁক
নেয়, তা সচেতনভাবে কবিও বলতে পারেন না । কবির এই যে, ছোটো ছোটো চিত্রকল্পে জীবনের
গভীরতাকে কি শান্ত সব শব্দে শুয়ে ফেলেন । এখানেই তো কবিতার মজা । কবির ‘দাহ’
কবিতায় আমরা একটি চিত্রকল্প দেখতে পাই –
“বিকেলের পড়ন্ত আলোয়
আমি শ্বাপদের গন্ধ পাই ।
... ...
...
ঘরগুলো পাথরের মতো
শক্ত
আমার নরম পায়ে বিঁধল
হাড়ের ছক্কা” ( দাহ)
নারীর জীবন তো প্রধানত
ঘরকেন্দ্রিক । তাহলে কবি কোন্
প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে লিখছেন –“ঘরগুলো পাথরের মতো শক্ত” । তাহলে কি সেটা
আর ঘর থাকে ? ‘হাড়ের ছক্কা’ – মারাত্মক একটি পাশা-খেলার চিত্রকল্পের দিকে আমাদের
নিয়ে যায় । যেখানে নারীর ইচ্ছার কোনো মূল্য নেই । সে নিছকই একটা বস্তুমাত্র । কবি
খুব নরম সুরে, খুবই ভয়ানক একটি জায়গার দিকে আমাদের টেনে নিয়ে যেতে চাইছেন। বর্তমান
শ্বাপদ দিয়ে শুরু করলেন । এখানে ‘শ্বাপদ’
কবি কি মানুষের কথা বলছেন ? নাকি স্বামীর কথা বলছেন ? নাকি প্রেমিকের কথা ?
প্রেমিক ‘শ্বাপদ’ হতে পারে না । তবে কি
স্বামীর কথা বলছেন ? যে সামাজিক কারণে অধিকারপ্রাপ্ত ! কবি তাকে মাংসাশী
বলছেন কেন ? তাহলে কেমন সে সম্পর্ক ? অজস্র প্রশ্ন ভিড় করে মনের ভিতর । কবির কবিতায় কেবল কিছু ইঙ্গিত পাই –
“কাঁচের দেয়ালে অজস্র
মডেলের নগ্ন দেহ
লাল আলোর সংকেতে
দেয়ালে মাথা ঠুকে
রক্তাক্ত বিবসনা ক্রমশ
ক্লান্ত হয়।” ( দাহ)
‘রক্তাক্ত বিবসনা
ক্রমশ ক্লান্ত হয়। ” – কী চরম একটি চিত্রকল্প । রক্তাক্ত, নগ্ন, উলঙ্গ একটি নারী
দেহ ক্রমশ ক্লান্ত হয় । কী ভয়ানক একটি চিত্রকল্প । অথচ কবি খুব সঙ্গোপনে চিত্রটি
চিত্রায়িত করেছেন । অথচ কী বীভৎস চিত্রকল্প । এবং কত বলিষ্ঠ উচ্চারণ । কবিতার নাম
দিয়েছেন- ‘ দাহ’ । কেন দহন হচ্ছে? কবি কী নিজেই ? প্রতীক তো বটেই ! কবি নিজেও তো
হতে পারেন ? কবি কি যন্ত্রণার উর্দ্ধে ? তিনিও তো ঘরণী ।
আসলে, এভাবেই কবিতার
পরতে পরতে লুকিয়ে থাকে চিত্রকল্পের রহস্য । কবির দক্ষতা । তাঁর বলিষ্ঠ উচ্চারণ ।
কবি-আলোচক সেলিম
মুস্তাফা “ কবি অজিতা চৌধুরী ও কবির ভূখণ্ড” আলোচনার একটা অংশে উল্লেখ করছেন- “ এই
কবিকে পাঠ করতে গিয়ে যে যে বিষয়গুলো নজরে এল, সেটা হচ্ছে এই যে, কবি অজিতা চৌধুরীর কবিতায় রান্নাঘর থেকে গাজাপট্টি,
দীঘলবাঁক থেকে কৌরবসভা, সমাজ, সময়, অর্থনীতির আর গোটা নিসর্গ, সবই এসেছে । খুবই
ইনফর্মেটিভ এই কবি ।”
আমি আমার মতো অজিতা
চৌধুরীকে পড়ার, বোঝার চেষ্টা করেছি । আপনারও করুন, আপনাদের মতো।আমার কাছে তিনি
একজন শক্তিশালী কবি । অনেকবেশি ব্যঞ্জনাময় । তাঁর জীবনকে দেখার মাঝে যেমন
অভিজ্ঞতার ছাপ দেখা যায়, তেমনই পাওয়া যায় নারীর বেদনার নিস্তব্ধ একটা দিক ।
অনুচ্চারিত এক বেদনা-বোধ । অপরিসীম এক ভালোবাসার ছোঁয়া । প্রকৃতির প্রতি এক
মোহমায়া ।
“খুব উঁচু, বাড়ি থেকে
একদিন রাস্তাকে দেখেছিলাম
মানুষ, বাড়ি, গাড়ি
সবকিছুকে বড় যান্ত্রিক
তাৎপর্যহীন মনে হয়,
নিজের অস্তিত্ব সম্বন্ধে
সন্দিহান হয়ে পড়ি—পারিপার্শিকের
সঙ্গে সম্পর্কহীন
হয়ে থাকার ব্যর্থতা;
বিচ্ছিন্ন মানসিকতায়
মাধ্যাকর্ষণহীন
অবস্থায় ঝুলতে থাকি ।” (মার্চ, ১৯৮০)
এই কবিকে নিয়ে দীর্ঘ
কাজ করার ইচ্ছে আছে । একজন কবিকে বিশদে জানতে গেলে, তাকে পরতে পরতে খুলে দেখতে হয়
। জানতে হয় । মিশতে হয় । সে অভিজ্ঞতা আমার আছে । তাই তো এই কবিকে নিয়ে আরও কাজ
করার ইচ্ছে রইল ।
কাব্যগ্রন্থ ঃ “কবিতা
সমগ্র”
কবি – অজিতা চৌধুরী
প্রকাশনী – পূর্বমেঘ
পাবলিকেশন
আগরতলা
মূল্য – ৩৫০ টাকা

No comments:
Post a Comment