Tuesday, May 9, 2023

কবি সেলিম মুস্তাফা এবং ছোরার বদলে একদিন / তমাল শেখর দে

 

         কবি সেলিম মুস্তাফা এবং ছোরার বদলে একদিন   

 

“আমি এই রকম,

আমার জীবন এইরকম

সত্য এইরকম

ফুল নয়, সমস্ত ফুলের ।

ছোরা নয়

ছোরার বদলে একদিন সব ফুল নড়ে উঠবে...”

 

কবি সেলিম মুস্তাফা, যার সম্পর্কে বলতে গিয়ে প্রদীপ চৌধুরী বলেছিলেন“ ‘ছোরার বদলে একদিন’ সেলিমের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ, সেলিমের প্রথম কবিতার বই ‘বাহান্ন তাসের পর’ বেরিয়েছিল প্রায় সাত বছর আগে৩২ পৃষ্ঠার একটিই দীর্ঘ কবিতাফর্ম এবং স্পিরিট দু-দিক থেকেই অত্যন্ত ঋজু, সাবলীল এবং পরিণামী; কোন অজ্ঞাত কারণে বইটি সেলিমের বৃহত্তর পাঠক সমাজের মধ্যে প্রচারিত হয়নি; ফলে, একজন সচেতন ও অতিশয় জীবিত কবির ক্ষেত্রে যা হবার তাই হয়েছে । মধ্যবর্তী বছরগুলিতে সেলিমের জীবন ও জীবিকা, ভালোবাসা ও ঘৃণা, তার আবিষ্ট অপভ্রমণ সম্পূর্ণ এক নতুন মোড় নিয়েছে । বাহান্ন তাসের সেই গথিক নির্মাণ কালপ্রবাহে ভেঙে-চুড়ে তছনছ হয়ে গেছে, সেলিম আরো সাঙ্ঘাতিকভাবে জীবনের একেবারে মূল রান্নাঘরে ঢুকে পড়েছে, রান্নাঘর এবং শোবার ঘরের মধ্যবর্তী শেষ পর্দাটাও সরে গেছে তার কবিতা থেকেযেখানে একজন নামহীন মোনালিসা, প্রকৃতপক্ষে এক উপজাতি রমণী তাকে মায়ের মতো সস্নেহে উন্মোচিত করে দেখায় বহুবর্ণ সেই পৃথিবী, যাদুঘর, যেখানে থরে থরে লক্ষ্য জন্ম  লক্ষ্য মৃত্যু, স্বপ্ন, কল্পনা, নিহত ভাইয়ের মৃতদেহ, বাইসনের নীচে উপুড় হয়ে থাকা রেখা গোপের ঐতিহাসিক শরীর...ছোরার বদলে একদিন সেলিমের জীবন কবিতার একটি তাৎপর্যময় নতুন ধাপ এবং তা-ও সেলিম অতি দ্রুত অতিক্রম করে যাচ্ছে সেলিমের কবিতায় পরিণত হাংরি রচনার অনেক লক্ষণ অত্যন্ত স্পষ্ট ।”

        এখানে কবি সেলিম মুস্তাফা সম্পর্কে অনেকগুলো উল্লেখযোগ্য কথা বলেছেন প্রদীপ চৌধুরী । কিন্তু কে এই প্রদীপ চৌধুরী ? কবির সাথেই বা কি করে গড়ে ওঠে সম্পর্ক ? খুব সংক্ষেপে যদি বলি, তবে বলতে হয়, তিনি হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের প্রবক্তাদের একজন । এবং তিনি তাঁর গোটা জীবনই সাহিত্যসেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন । তিনি চাকরি সূত্রে আগরতলায় আসেন এবং বন্ধুত্ব হয় শঙ্খপল্লব আদিত্য, মানিক চক্রবর্তী, কল্যাণব্রত চক্রবর্তী, অরুণ বণিক, খগেশ দেববর্মণ সহ আরও অনেকের সাথে । এরপর ১৯৭৮ সালে বদলি হয়ে আসেন ধর্মনগর বীরবিক্রম ইনস্টিটিউশন স্কুলে । আগরতলা থেকে আসার সময় নাট্যকার মানিক চক্রবর্তী প্রদীপ চৌধুরীকে বলেছিলেন‘ধর্মনগর যাচ্ছেন, সেলিম নামে একটি ছেলে আছে, কথা বলে দেখবেন ।’ সেই থেকে কথা বলা শুরু । টানা দুই বছর দুজনের মনন- মানসিকতায় চলে দীর্ঘ বিচরণ । সেলিম মুস্তাফাকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম – “আপনার সাহিত্যভাবনার পেছনে প্রদীপ চৌধুরীর প্রেরণা কতটুকু ?” উত্তরে সেলিম বলেছিলেন“পুরোটাই ! জীবনের প্রথাগত সাজানো ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে তিনিই প্রথম আমার চোখ খুলে দিতে সাহায্য করেন । প্রদীপ-ই আমাকে প্রথম বলেছিলেন, আমাদের সাজানো-গোছানো এই জীবনযাত্রার ভিতরে একটা অন্ধকার জগৎ আছে । একটা বিকৃতি আছে, একটা চাপা যন্ত্রণা আছে, যৌন ব্যথা আছে, তাকে আপনার চেনা উচিত। ভাবা উচিত ।”

সেই থেকে সেলিম মুস্তাফার চিন্তাজগতে পরিবর্তনের শুরু এবং আজও অব্যাহত । পরবর্তীটিতে তারই চিন্তার প্রভাব বা  প্রকাশ দেখি তাঁর কবিতায় কবিতার চেতনায় । সেই অর্থে এত পর্যবেক্ষণের পর প্রদীপ চৌধুরী যখন বলেন“সেলিম আরো সাংঘাতিকভাবে জীবনের একেবারে মূল রান্নাঘরে ঢুকে পড়েছে” কিংবা “রান্নাঘর এবং শোবার ঘরের মধ্যবর্তী শেষ পর্দাটাও সরে গেছে তার কবিতা থেকে” কিংবা “সেলিমের জীবন কবিতার একটি তাৎপর্যময় নতুন ধাপ এবং তা-ও সেলিম অতি দ্রুত অতিক্রম করে যাচ্ছে ।” তখন এই কথাগুলোকে খুব গুরুত্ব সহকারেই নিতে হয় । কেননা, বিশ্বাস হয় নেহাত মুখ চেয়ে মুখ রক্ষা করার মতো লেখা এটা নয় । এবং তার ইঙ্গিত দেখি তার ‘ছোরার বদলে একদিন’ নামকরণের । একদা আক্রমণের হাতিয়ার ছিল ছোরা বা চাকু । ৮-এর দশকের দিকটায় প্রথম আত্মপ্রকাশ করে পিস্তল ।

প্রচ্ছদে তাই পিস্তলের ছবিতবে শব্দের আক্ষরিক ভাবগত ভাবে একটা পরিবর্তন এখানে দেখতে পাচ্ছি । ছোরা থেকে পিস্তল মূলত একটা পরিবর্তনের ইঙ্গিতবস্তুগত অর্থে যান্ত্রিক পরিবর্তন । আর সে বস্তু থেকে আসে ভাবগত পরিবর্তন । টেলিফোন থেকে মোবাইল একটা বস্তুগত পরিবর্তন, যেমন আমাদের জীবনযাত্রা, ভাষা আমূল পাল্টে দিল । প্রতিটি বস্তুগত পরিবর্তনই একটা অগ্রগতি বোঝায়, আর বস্তুর সে অগ্রগতিতেই আমাদের অগ্রগতি । ভাবগত অগ্রগতি । আবেগের যুক্তির মায়াহীনতারও বটে । সেই পরিবর্তিত জীবন যেন কবিকেও ইঙ্গিত দেয়, তোমারও থেমে থাকার কোনো মানে নেইতুমিও পাল্টাও । সেই প্রেম, সেই হতাশা, সেই মধুরতা, সেই বিতৃষ্ণা, সেই জীবনমুখিনতা, সেই জীবনবিমুখতা । তাহলে কিভাবে একজন কবি পাল্টায় ? নিশ্চয়ই তার কবিতায়, তার শব্দচয়নে, তার উপমা ব্যবহারে, তার আক্রমণে, তার ভালোবাসায়কবি পাল্টায় তার মনোজগতে । কবি ও বিজ্ঞানীর আবিষ্কার দু-রকমের । দুজনেই জীবন-সচেতন । দু-জনেই জীবনের পরিবর্তন কাজে লাগাতে তৎপর । দু-জনই জীবনকে দিতে চান নতুন পরিধি, নতুন ভাষা ।  যিনি জীবনকে নতুন একটা বস্তুগত পরিবর্তন এনে দেন বিজ্ঞানী । আর যিনি ভাবগত পরিবর্তন এনে দেন তিনি কবি ।

“তোমাদের জ্যামিতিক অবয়ব আমাকে চব্বিশ ঘণ্টা আহত রাখে আমি কোন হারানো রুমালের কথা মনে করতে পারি না, আমি ভুলে যাই কেবল ঢাকনাটা হাতে রেখে কলমটা কবে কোথায় কাকে দিয়েছিলাম, আমি বুঝতে পারি না একজন নিবারণ পালের সঙ্গে সেলিম মুস্তাফার তফাৎ কোথায় !

 

খবরের কাগজ দেখেপ্রতিদিন নিঃস্ব হয়ে যাই, সেখানে খবরের বদলে স্মাগলারের সিঁদকাঠি ছাপানো হয়, সেখানে বুদ্ধি করে টিউবলাইটের বিজ্ঞাপনে অন্ধকার ছাপানো হয়, সেখানে হারানো-প্রাপ্তি কলামে টয়লেট পেপারে ছাপানো মার্কশিটের উল্লেখ হয়, আমার জন্য কোন সিঁড়ি ছাপানো হয় না ।” (উত্তর)

 

‘খবরের কাগজ দেখে প্রতিদিন নিঃস্ব হয়ে যাই’ – বাধ্য হয়েই লাইনটা পড়ে কিছুটা থেমে যেতে হয় । কবিতার প্রচলিত ফর্ম ভেঙে কবির এ প্রথম সরল আত্মপ্রকাশ আমাকে আঁকড়ে ধরে । এখানে গোপন কোন কাব্য-টেকনিক নেইএখানে হতাশাকে কবি দিলেন এক নতুন ভাষা-চিত্র “আমি ভুলে যাই কেবল ঢাকনাটা হাতে রেখে কলমটা কবে কোথায় কাকে দিয়েছিলাম ।” এটা কি নিছকই ভুলে যাওয়া ? আসলে এটা আমাদের বস্তুগত শূন্যতার দিকেই কবির পারিভাষিক ইঙ্গিত । প্রচলিত ভাবনার বা উপমার ছক বদলে নতুন রক রূপ তৈরি করতে চাইলেন । সেটা সার্থক হল কিনা তা নিয়ে তর্ক হতেই পারে । আমার যেমন মনে হয়েছে এই লাইনটা সার্থক এক প্রয়োগ হয়েছে ।

আমি একবার সেলিম মুস্তাফাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম“লোকে বলে আপনি হাংরি ? আপনি ব্যক্তিগতভাবে কি নিজেকে হাংরি জেনারেশনের একজন মনে করেন ?” উত্তরে তিনি বললেন“লোকে ভুল বলে । আমি আমার জীবনে কোথাও নিজেকে হাংরি বলে উল্লেখ করিনি । তাঁদের প্রতি আমার ভালোবাসা থাকতেই পারে । আমার প্রতি তোমার যেমন রয়েছে, আমার জীবনের এক চূড়ান্ত সময়ে প্রদীপ চৌধুরীর আগমন । আমার বাবা ছিলেন তখনকার হোমিওপ্যাথির ডাক্তার । আর্থিক স্বচ্ছলতা আমাদের কোনোদিনই ছিল না । প্রচণ্ড শীতে প্রদীপ চৌধুরী তাঁর ফুটো উলের জাম্পারটা দিয়ে বলেছিলেন, ‘আপনি এটা পরবেন ?’ এমন অকপট আপনত্বের দানকে সারাজীবনেও ভোলা যায় না । আমার প্রচণ্ড দাঁতে ব্যথায় প্রদীপ হাতে পাঁচ টাকা দিয়ে বলেছিল, ‘আর কিছু যোগ করে দাঁতটা ফেলে দিন আজ দাঁতটা নেই, কিন্তু লোকটার সেই সহজ সরল উপকারগুলো ভুলবার নয় । এটা নেহাতই ভালোবাসা । প্রদীপ নিজেও আমাকে হাংরি বলতো না । তাই তো আমার বইয়ের ভূমিকায় লিছেছিলেন‘সেলিমের কবিতায় পরিণত হাংরি রচনার লক্ষণ অত্যন্ত স্পষ্ট কিন্তু আমি হাংরি নই । হাংরি হতে পারিনি । আমার কবিতা, কবিসত্তা বারবার প্রচলিতের ধারে কাছেই থেকে গেছে । লোকে ভুল বলে, সেটা তাদের ব্যাপার । আমি তাতে নাক গলাতে চাই না হয়তো এইজন্যই কবি তার  ‘উত্তর’ বলতে পারলেন –“আমি বুঝতে পারি না একজন নিবারণ পালের সঙ্গে সেলিম মুস্তাফার তফাৎ কোথায় !”

তবে পাঠক হিসেবে আমার বুঝতে অসুবিধা হয় না, একটি সাধারণ দৃষ্টির সঙ্গে কবি সেলিম মুস্তাফার তীক্ষ্ন মননদৃষ্টির তফাৎ অনেকটাই । সাধারণের ভিতর দিয়ে অসাধারণ কিছুকে দেখে ফেলাই তার স্বভাব । জীবনকে, কবিতাকে, ছন্দকে তথাকথিত জ্যামিতিক ব্যাখ্যায় দেখা তার অক্ষমতা । হয়তো তাই তিনি নিজেই বলে নিলেন‘তোমার জ্যামিতিক অবয়ব আমাকে চব্বিশ ঘণ্টা আহত রাখে ।’ এবং কবি কি অদ্ভুতভাবে সময়ের নিঃস্বতা তুলে ধরেন তার কবিতায়

 

         “খবরের কাগজ দেখেপ্রতিদিন নিঃস্ব হয়ে যাই সেখানে খবরের বদলে স্মাগলারের সিঁদকাঠি ছাপানো হয়, সেখানে বুদ্ধি করে টিউবলাইটের বিজ্ঞাপনে অন্ধকার ছাপানো হয়, সেখানে হারানো-প্রাপ্তি কলামে টয়লেট পেপারে ছাপানো মার্কশিটের উল্লেখ হয়, আমার জন্য কোন সিঁড়ি ছাপানো হয় না ।”

 

কবি নিঃস্বতাকে কোথায় নিয়ে এলেন ! সাংবাদিকতার মূল ভিত্তিকেই আঘাত করলেন তিনি । ‘টিউবলাইটের বিজ্ঞাপনে অন্ধকার ছাপানো হয়’ –এই উদাহরণ দিয়ে কবি কি প্রমাণ করতে চাইলেন ? খুব কায়দা করে কবি খবরের সূত্রধরকেই অন্ধকার জগতের সাথে তুলনা টেনে দিলেন । এরপরই বলছেন “আমার জন্য কোন সিঁড়ি ছাপানো হয় না এবং কোনই সাংবাদিক বলতে পারে না আমার রুমাল আমি কোথায় হারিয়েছি আমার কলম আমি কাকে দিয়েছি । মানুষ, আমি দক্ষিণ থেকে এসেছিলাম, তোমাদের শহর ছেড়ে উত্তরে যেতে পারিনি, আমি জানি না আমার উত্তর কোথায়, কেবল একটা নয়া পয়সার তুচ্ছ শব্দের জন্য আমি আজ টিনের তোবড়ানো পাত্র হয়ে আছি !”

        এখানে কবি ‘উত্তর’ এবং ‘তোবড়ানো’ শব্দটি খুব কৌশলে ব্যবহার করেছেন । আসলে, এই দুটো শব্দেই তিনি যা বলতে চেয়েছেন, আসলে তা বলেননি, বলেছেন একটু ঘুরিয়ে । শব্দের অর্থকে নিয়ে গেছেন শব্দার্থ থেকে দূরে ! একটা অর্থহীন জীবনের প্রতীক করে তুলে এনেছেন বর্তমান সময়ের বোধকে । শুধু ঢাকনা দিয়ে কি হয়, যদি কলমের মূল শক্তিটা না–থাকে হাতে ! তাহলে ঘুরে-ফিরে কবি আমাদেরকে একটি অর্থহীন বয়ে বেড়ানো জীবনের দিকে টেনে নিয়ে গেলেন । খবরের কাগজে যেমন মূল খবর নেই, বিজ্ঞাপন ছাড়া, তেমনি আমাদের জীবনও অনেকটা তেমনি । কবি শুধু বললেন “আমি জানি না আমার উত্তর কোথায়” কবি এই প্রশ্নই মূলত করতে চেয়েছেন । এটাই বলতে চেয়েছেন তার গোটা কবিতা জুড়েশেষ অবধি বলতে চেয়েছেন “প্রতিদিন আশা করি, প্রতিদিন নিঃস্ব হয়ে যাই”

    

        জীবনের দ্বৈত-সত্তাকে আক্রমণ করে কবি সেলিম মুস্তাফা কবিতা কবিতা লিখলেন 

“গ্রীষ্মে তোমার

কথার গূঢ় অর্থ ছিল

বেঁচে থাকার

                                সার্থকতা

শীতে এবার

মানে সহজ হল

সবই তোমার

                                স্বার্থ-কথা ।”           (শীতে)

 

ছোট্ট একটি কবিতা । শুধু শব্দে নয়, কবি এখানে ব্যঞ্জনা তৈরি করেছেন নিজস্বতায়ও । সাধারণত শীতেই আমরা জড়োসড়ো  হয়ে গাঢ় থেকে গূঢ় হই কিন্তু কবি এখানে দ্বৈততাকে বোঝাতে গিয়ে পাঠককে এক প্রশ্নের মিষ্টি ফাঁকি দেবার ভণিতায় “শীতে এবার / মানে সহজ হল / সবই তোমার / স্বার্থ-কথা এখানে ‘সার্থকতা’ শব্দের ষড়যন্ত্র ভেঙে তাকে কবি রূপ দিলেন ‘স্বার্থ-কথা’-য় । এই  দ্বৈততার মাঝে কোথায় যেন এক বেঁচে থাকার ইচ্ছাও নিহিত ।

তবে কি আমরা বাঁচার জন্যও মাঝে মাঝে দ্বৈতসত্তার আশ্রয় নিয়ে থাকি ? বিভক্ত হয়ে পড়ি দ্বৈততায় ? বেঁচে থাকার সার্থকতা  আর ‘সবই তোমার স্বার্থ-কথা’ এই দ্বৈততায় শেষ পর্যন্ত কবি নিজেই বুঝতে থাকেন, কবি যেন বলতে থাকেন – সবই জীবন । জীবন ।

 

“জীবন জীবন বলে একদিন যে চেঁচিয়েছিল

আজ তার বাহু খুলে জঙ্গলে পড়ে যায়, একদিন

যে কঠিন মুষ্টি তুলে মানুষকে দেখিয়েছিল

পুষ্টিকর খাদ্যের ভাঁড়ারের পথ আজ

নিজের মাথার চুলও সে মুঠিতে ধরা পড়ে না

সামান্য মূল্যের ঘড়ি বাঁধা ছিল, জঙ্গলে

কে জানতো তারই জন্য একজন চোর বসে আছে !” (ঘড়ি)

 

প্রথম দুই লাইনের যে কোনো ব্যাখ্যাই ব্যর্থ হতে বাধ্য । আসলে এই লাইন দুটির ব্যাখ্যা যার যার মননেই হওয়া উচিত । ব্যাখ্যায় নষ্ট হয়ে যাবে এর ব্যঞ্জনা । কালিমা লেগে যেতে পারে তার গায় । খোদ কবির আর কোন অধিকারই যেন রইল না লাইনটির ব্যাখ্যা করার । যেন কবিকেও পেছনে ফেলে গেল কবির রচনা । এর কী ব্যাখ্যা দেবেন কবি ? এরই নাম ঘড়ি ! এরই নাম সময় । অথচ যেন কত সাধারণ একটা চিত্রকল্প । কত সাধারণ সামান্য মূল্যের ঘড়ি বাঁধা ছিল, কব্জিতে নয়, জঙ্গলে । এসব সাধারণ শব্দ, চিত্রকল্প ব্যবহারের জন্য সেলিম মুস্তাফাকে একটু আলাদা করে গুরুত্ব দিতে হয়  

 

“কে জানতো মানুষের নির্মিত জঙ্গলে

এত ঝিলিক দেয়া ডোরাকাটা বাঘ –

কেউ কেউ বলছে শিকারীরা গন্ধ পাচ্ছিল

                                                বেশ কিছুদিন ধরেই

জুত করতে পারছিল না, কেননা

তারা কোন মানুষের কাছে হানা দেয় না ।”    (বাঘ)

 

কোনো কোনো কবিতা নীরবে একটা নির্মম কাহিনিকে বহন করে যায় । এটা সে রকমই একটি কবিতা । এখানে সাড়া ফেলা গোবিন্দ তেলী হত্যাকাণ্ডের দিকে কবি ইঙ্গিত করছেন । গোবিন্দ তেলী একজন নকশাল নেতা ছিলেন তাঁরা হিংস্র ছিলেন শোষকের প্রতি । সমাজের তথাকথিত ধনিক শ্রেণির প্রতি তাঁদের ছিল তীব্র প্রতিহিংসা । ঠিক এই কারণেই শোষক শ্রেণি হয়ত তাঁদের কোনদিন মেনে নিতে পারেনি উগ্র এই বামপন্থী দলের কর্মতৎপরতার প্রভাব ধর্মনগরে বেশ ব্যাপক ছিল । সেই প্রেক্ষাপটেই কমরেড গোবিন্দ তেলী একজন খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন । সেই সব নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে । কিছু কথা রাজনৈতিক কারণেই গোপন রয়েছে । কিন্তু একটি রাজনৈতিক হত্যা কবিকে মর্মাহত করেছিল বই কি ! না-হলে কবি কি লিখতেন 

 

“একদিন মানুষই গেল বাঘের ঘরে

সদলবলে

সঙ্গে গেল গেরিলা বুদ্ধির জাল

বিদ্ধ সেই ন’টা বাঘকে আমরা দেখিনি

কেউ না

শুধু তাদের ঝিলিক দেয়া ডোরাকাটা

                                                কাহিনি শুনেছি ।”     (বাঘ)

 

১৯৮০ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি ঘটনাটা ঘটেছিল । হাড়কাঁপানো সিনেমাকেও হার মানিয়ে, সে সকাল এসেছিল ধর্মনগরের বুকে । গোপন খবরের সূত্রে সাতজনকে, পরে আরও দু’জনকে জিরো পয়েন্ট থেকে গুলি করে একে একে হত্যা করা হয়েছিল নয়জন-কে । এখানে কবি মানুষের নির্মিত জঙ্গল বলতে সেই প্রশাসনকেই বোঝাতে চেয়েছেন । প্রতিবাদী মানুষগুলোকে কবি বললেন “ডোরাকাটা বাঘ’’তার মানে দাঁড়ায় কবিরও তাদের পক্ষে একটা যুক্তি ছিল । কবি তার স্মৃতিচারণে বলেন “পুরো ধর্মনগর সে ঘটনায় স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল । কেননা এর আগে ধর্মনগরে এরকম ঘটনা ঘটেনি । আমি শহরেই ছিলাম । বাকরুদ্ধ । পুলিশ গাড়ি করে তাদের লাশ নিয়ে এসেছিল । পরবর্তীতে এই নিয়ে মামলা হয়েছিল । এবং ক্রমশই স্পষ্ট হচ্ছিল এটা একটা রাজনৈতিক হত্যা ছিলআমি রাজনৈতিকভাবে কতটা তাদের সমর্থক ছিলাম সেটা বড় প্রশ্ন নয় । প্রশ্ন হচ্ছে, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে রাষ্ট্র একটি হত্যাকাণ্ড চালাতে পারে না । এই সব ভাবনাই মাথার ভিতর খেলা করছিল । তখন আমি ২৭-২৮ বছরের টগবগে বেকার যুবক । রাতে ঘুমাতে পারিনি । পরদিনই এই কবিতাটি লিখেছিলাম মনে আছে  আসলে, মানবিকভাবেই কবি এই হত্যাকাণ্ডকে মেনে নিতে পারেননি ।

কবি সেলিম মুস্তাফা প্রায় ৩৭ বছর পর তাঁর “একদিন যে-কোনোদিন” কাব্যের “শ্বদন্ত” কবিতায় সে-ই খুনি পুলিশের  একজনকে দেখে এই কবিতাটি লেখেন  সম্ভবত 

 

“৩৭ বছর আগেকার কথা,

৩৭ বছর আগের গাছপালা কেটে

রাস্তা এখন অনেক বড় হয়েছে, সামনেই থানা

লোকটার মুখ থেকে গড়িয়ে পড়ে ফেনা

 

ভিজে ন্যাকড়া দিয়ে আদালত

সর্বদাই রক্ত মুছে ফেলে

রাত ও করাত কেটে ফেলে গাছ,

চেয়ার টেবিল হাতুড়ি ও পেয়াদারা

সবসময় হাসে ”               (শ্বদন্ত)

 

শ্বদন্ত- শব্দের অর্থ হচ্ছে কুকুরের দাঁতের মতো তীক্ষ্ন । এ-থেকেই বোঝা যায়, কবিকে ঘটনাটা কতটা আঘাত করেছিল । আমাদের আইন-কানুনকেও কবি তীব্র আক্রমণ করেন এই কবিতায় । কাফকার সেই আদালতের কথা মনে পড়ে যায় । সেই ঘটনায় একটা প্রমোশন হয়েছিল নেতৃত্বদানকারীর । তাই কবি লিখলেন“রাত ও করাত কেটে ফেলে গাছ” হয়ত সেই ঘটনায় এই লোকটাও ছিল, যাকে আজ কবি দেখছেন, আর ভাবছেন

 

“লোকটা দাঁত পরিষ্কার করছে

মুখ থেকে

ঝরছে রক্তাক্ত ফেনা !”      (শ্বদন্ত)  

 

আরেকটা খুনের ঘটনাও ঘটেছিল ওই সময়। কবির আপন বড় ভাইকে খুন করা হয় ধর্মনগরের তৎকালীন “মায়া সিনেমা হল ”–এর সামনে । কোনো বিচার হল না । মানে বিচার হল না, সবাই ছাড়া পেয়ে গেলো আইনের ফাঁকফোঁকর দিয়ে । যে ঘটনা কবির ভাবনা জগতকে আমূল পাল্টে দেয় জীবনের ভয়ংকর একটা টার্নিং পয়েন্টও এটা কবির মনস্তত্ত্বে কবি তাঁর কবিতায় লিখলেন 

 

“আমার ভাইকে ওরা খুন করেছিল,

ওরাও ভাই, আমার না হলেও অন্য কারোর

ওরা বাড়ি ফিরে যাবার পর

ওদের ভাই জিজ্ঞেস করেছিল :

                                                 দাদা, এ কী করলি !

ওরা ওদের ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল,

 

ওরা ওদের ভাই জিজ্ঞেস বলেছিল : রুপু সোনা, খোকন !

কাঁদিস না, আমি বুঝতে পারিনি, আমরা বুঝতে পারিনি       

(একা গ্রীণরুমে একা একা )

 

এই কবিতাটা কবির জীবনের খুবই উল্লেখযোগ্য একটি কবিতা । কবির হৃদয়ের রক্ত মেশানো আছে এর প্রতিটি ছত্রে ছত্রে । এই রকম কবিতা শুরুতেই একটু ভিন্নতা রাখে আলোচনার পক্ষে । প্রথমেই প্রশ্ন জাগে, কবি কবিতাটির নাম “একা গ্রীণরুমে একা একা” রাখলেন কেন ? গ্রীণরুম তো নাটকের আগের সাজসজ্জা করার ঘরটাকে বলা হয়ে থেকে । তবে কি লেখক এখানে কী অর্থে গ্রীণরুম শব্দটি ব্যবহার করেছেন ! তাছাড়া গ্রীণরুমে তো কবির এভাবে একা একা থাকার কথা নয় ? তাহলে কি কবি একাই এই জীবন-নাট্যের নট এবং নাট্যকার ? এভাবে “একা একা” তিনবার শব্দটি ব্যবহার করে কি কবি তার একাকীত্বকে দীর্ঘ থেকে আরও দীর্ঘতর করতে চাইলেন ! নিশ্চয়ই তাই । নাকি কবির ভাইয়ের মৃত্যুর পর যে জীবন তিনি বয়ে বেড়াচ্ছেন, সেটাই তার বেঁচে থাকার অভিনয় মূলগত অর্থে হয়ত তিনি আর বেঁচে নেই । একটি হত্যা তার মনকে, তার পরিবারকে ভেঙে দিয়েছে । কবি তার ভাইয়ের মৃত্যুর প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বলেছিলেনওটা শুধু আমার জীবনে নয়, আমাদের পুরো পারিবারিক-গোষ্ঠীর কাছে একটা বিশাল ঘটনা ছিল, আজও আছে কারণ সে ছিল আমাদের বংশে সকলের কাছে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি, অত্যন্ত ভদ্র অত্যন্ত শান্ত এবং শিক্ষিত যে বড় আওয়াজে কথাও বলে না খুনিরা আমার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টাও করেছে আমি উৎসাহ পাইনি রাগও করিনি সব তো আমার আশেপাশেরই লোক  !

ওরা সন্দেহের অবকাশে (Benefit of doubt) মুক্তি পেয়ে যায় জনের মধ্যে কে ছুরি মেরেছে প্রমাণ হয়নি বা প্রমাণ করা হয়নি আমার ভাইয়ের জবানবন্দি রেকর্ড করা ছিল সেটা তখনকার এস.ডি.. গায়েব করে দেন এস.কে. নন্দী সম্ভবত নাম মনে নেই আমার সাইকেলটা থানাতে যে নিল আর দিল না ২৬ ডিসেম্বর ছুরি মারে, ২৭ ডিসেম্বর কৈলাসহরে মারা যায় সঙ্গে আমার মা আর এক দিদি ছিলেন দেবীপ্রসাদ পুরকায়স্থ (কংগ্রেস নেতা) লাশ আনতেও মানা করেছিল বলে, গাড়ি পাবেন না মা বলেন- আমি ছেলেকে ঠেলা গাড়ি করে হলেও বাড়ি নিয়ে যাব সে অনেক কাহিনি  আরও বলেন আমার ভাই স্কুলে ছাত্রদের কাছে খুব প্রিয় ছিল তারা যখন খবর পায়, কদমতলা থেকে সাইকেল চেপে দলে দলে চলে আসে ধর্মনগর, এখানে এসে খবর পায় তাকে কৈলাসহর নেয়া হয়েছে, তখন তারা সাইকেলেই কৈলাসহর চলে যায় আমার কাছে ঘটনা অভূতপূর্ব যাই হোক ভাইয়ের লাশ শেষ পর্যন্ত এলো বাড়িতে বাড়ির সামনের বেড়া কারা যেন খুলে দিল শহর থেকে মিছিল করে এলেন শিক্ষকরা ছবি তোলা হলো সেই ছবি আমরা স্টুডিও থেকে আনতে পারিনি টাকার জন্য মাস্টারমশাইরা একে একে সরে গেলেন যার যার পথে

ভাই-এর মহাধমনীতে ছুরির ফলা ঢুকে যাওয়াতে রক্ত দেয়া হলেও তা আটকাতো না ধর্মনগরের ডাক্তার ওয়াদ্দেদার তখন ছুটিতে ছিলেন ডাঃ সোম আমার ভাইকে দেখেন, কিন্তু কিছু বুঝতে না পেরে শুধু পিঠে সামান্য একটা চেরা কাটা দেখে ব্যাণ্ডেজ করে দেন, ভেতরে তখন রক্তক্ষরণ হচ্ছিলো চোখ সাদা হয়ে যেতে দেখে প্রাইভেট ডাক্তার মাখনলাল দাস চৌধুরীকে নিয়ে আসা হয় তিনি এসে চোখ দেখেই বললেন এখানে হবে না, কৈলাসহর নিতে হবে রাত দুটোর সময় কৈলাসহর পাঠানো হয় এম্বুলেন্সে করে যাবার সময় খুব যন্ত্রণা হয়, বার বার গাড়ি থামাতে বলে এত রাত্রে রক্তের ব্যবস্থা করতে না পেরে ডাক্তাররা তারই শরীর চিরে চিরে রক্ত নিয়ে পুশ করেন পরে অবশ্য সেখানেই রক্তের ব্যবস্থা হয়  কিন্তু মেইন আর্টারী ছিদ্র থাকায় সেই রক্ত আবার বেরিয়ে যেত সকাল ৮টার সময় মারা যায় খুনিরা আজও বহাল তবিয়তে আছে

আসলে কবিতার লাইন যখন জীবন থেকে উঠে আসে, তখন সেখানে একধরনের সরল স্বীকারোক্তি থাকে । এই কবিতার ক্ষেত্রেও আমরা তাই দেখতে পাচ্ছি । প্রকৃত কবি নিজের জীবনকেই পুঁজি করে থাকেন তার কবিতায় । সেলিম মুস্তাফাও তাই করেছেন । কবিতার তার কবিতার পরবর্তী অংশে আরও লিখছেন 

 

“আমিও বুঝিনি, আমি এখনো  বুঝতে পারছি না

এই ঘটনায় আমি কোন চরিত্র কি না,

বিব্রত নাট্যকার আমার মুখে কোন সংলাপ

দিতে পারছে না, একা একা

নিজে নিজে খুন হয়ে যাচ্ছি       (ঐ)

 

এই ছত্রে কবি কবিতার মেজাজ একটু সরিয়ে আনলেন, আগের ছত্র থেকে । এরফলে কবিতা ভিন্ন আরেকটা মেজাজ পেল । সেই সাথে পাঠকও “আমিও বুঝিনি, আমি এখনো বুঝতে পারছি না / এই ঘটনায় আমি কোন চরিত্র কি না” এই সংলাপ দিয়েই কবি নিজেকে আড়াল করে একটা নৈর্ব্যক্তিক চরিত্রের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে নিয়ে, নিজেই যেন আরও গভীরভাবে দেখতে শুরু করলেন । বিব্রত নাট্যকার” এখানে কাকে বলছেন কবি ?  একা একা নিজে নিজেই বা কবি কী করে খুন হয়ে যাচ্ছেন ? আত্মহননের এক ভয়াবহ চিত্রই যেন কবি আঁকলেন তার এই কবিতায় । কবি এখানে নিজের অস্তিত্বকে সরিয়ে বলছেন “ওরাও ভাই, আমার না-হলেও অন্য কারোর” কবি তার কবিতায় এই মানবিক বোধ জড়িয়ে দিয়ে, তাঁর অনুভূতিকে আরও তীক্ষ্ন এবং মহৎ করে তুলতে পেরেছেন । অনুভূতি নিয়ে এই ধরনের খেলা একজন পরিণত কবির পক্ষেই সম্ভব । মানুষ ভুল করে, কিন্তু তার ভুলের কষ্ট পাচ্ছেন কবি একা একা“একা একা / নিজে নিজে খুন হয়ে যাচ্ছি ।” যাকে খুন করা হল, সে তো মরে গেল । কিন্তু আসলে তো খুন হল যারা তাকে ঘিরে বেঁচে থাকলেন, তারাই ! খুনিকে ক্ষমা করে দেবার পরও কবি একা নিজে নিজে সে যন্ত্রণায় খুন হচ্ছেন অবিরত । কবির এ  অসহায়তা, যন্ত্রণা, পাঠককেও আক্রমণ করে বসে । বিচারের বাণী কেঁদে গেল গ্রীণরুমে । অসহায় । একা একা ।

 

“ওরা চারজন, সে একা,

তার চোখে তৃষ্ণা, ওদের চোখে রক্ত,

তার সার্টের কলার ছেঁড়া, ওদের কলারে দম্ভ ।

সে আবার চাইলো জল !

ওরা আবার বলল আগে বিচার হোক তোমার তৃষ্ণা পায় কেন,

এই বলে ওরা চারজন খুব শান্তভাবে তাকে বালিতে ঠেঁসে ধরলো ।

                                                        (বিচার)

 

বিচারব্যবস্থা ও বিচারপ্রার্থীর অসহায়তারই প্রকাশ এই কবিতা ।  গোবিন্দ তেলীর ক্ষেত্রে যা হল । কবির ভাইয়ের সাথে যা হল ! এক নির্মম দ্বৈত অবস্থান । জল চাইলে সবাই বালিতে ঠেঁসে ধরে মুখ । কিন্তু কবিই তো মূলত জীবনমুখী । মুখ নিয়ে পুনরায় ভেসে ওঠার মাঝেই তো কবির সুখ । সভ্য বা অসভ্য যাই হোক, প্রতিটি মানুষই শেষ অবধি বেঁচে থাকতে চায় । দুটো কবিতাতেই কবি বিচার ব্যবস্থার দিকেই আঙুল তুলেছেন । এত হতাশা, নির্মমতা, বিচারহীন অব্যবস্থার পর কবি সেলিম মুস্তাফা লিছেন 

 

“ডুবে যেতে যেতে ফের ভেসে উঠছি আমি,

জন্মের প্রতি এক লোভী টান

ডাঙা ও জল জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে ”        ( আমার অনার্য হাত )

 

জন্মের প্রতি টান, না জীবনের প্রতি তীব্র এক মোহ কবির ? বেঁচে থাকার লোভ-টা ছড়িয়ে রয়েছে জীবনের সর্বত্র ! একজন সৎ কবি তো বেঁচে থাকতেই চাইবেন শেষ অবধি !

 

“জেনে রাখ আমার অপরিণামদর্শিতার নামই আমার জীবন

আমার অনার্য হাত অন্ধকারে কমলাগাছের দিকে উঠে যায়,

আমার অসভ্য হাত ভাতের দিকে চলে যায়

নরম একটা শাদা শব্দের নাম ভাত

ভাতের গন্ধে আমি পাগল হয়ে উঠেছি ।

আমি কি মানুষ ? আমি কি মানুষ নই ?   (আমার অনার্য হাত)

   

“আমার অসভ্য হাত ভাতের দিকে চলে যায়” কবি এখানে “অসভ্য” শব্দটা প্রয়োগ করলেন কেন ? নাকি “অনার্য” শব্দের সাথে মিলিয়ে এই শব্দ প্রয়োগ করেছেন ? কিন্তু অনার্য মানেই তো অসভ্য নয় ! “সাদা” শব্দের বানানে লিখলেন “শাদা” ! আসলে এই ছোটো ছোটো বিষয়ের ভিতরেই কবি লুকিয়ে রেখে দিয়েছেন তার ভাবনার মূল বীজ ! এবার প্রথম থেকে কবিতাটিকে যদি আবার পড়ে আসা যায়, তখন আরেকটি স্বাদ পাওয়া যাবে । আসলে এখানে “অনার্য” শব্দটা নিপীড়িত মানুষদের প্রতিনিধিত্ব করছে । “শাদা ভাত” প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছে । “আমি কি মানুষ ? আমি কি মানুষ নই ?” এই প্রশ্ন তিরের মতো সরাসরি চলে যাচ্ছে পাঠকের দিকে ।  এরপরই কবি সশরীরে নিজেকে উপস্থিত করিয়ে বলছেন 

 

“কেউ আমাকে ফেরাতে পারে না আলোর দিকে

কেউ আমাকে ডোবাতে পারে না এই অন্ধকারে”

 

এটাই কবির প্রকৃত স্বরূপ । নিজের প্রতি কবির আত্মবিশ্বাস । এখানে আবার পড়তে হবে কবির মধ্যের সেই লাইন – “জেনে রাখ আমার অপরিণামদর্শিতার নামই আমার জীবন” এই লাইন থেকে “অপরিণামদর্শিতার” শব্দটা সরিয়ে দেন এবার । এভাবে পরতে পরতে কবিতাকে ভেঙে ভেঙে দেখতে জানলে, পাঠ করতে পারলে,  সেলিম মুস্তাফার কবিতা আরও একটা ভিন্ন মেজাজ নিয়ে আত্মপ্রকাশ করবে পাঠকের সামনে । কবিতার লাইনের পেছনেও একটা লাইন থাকে কবিতায়, যা দেখতে পাওয়া যায় না কিন্তু অনুভব করা যায় । সেই অনুভবেই মূলত বসবাস করে কবিতার মূল রহস্য । সেখানেই লুকিয়ে থাকে কবিতার প্রকৃত আনন্দ ।  আস্বাদ ।

 

“আবার জ্বলছে সব

শহরের সভ্যতা ও তার মানুষ

 

সমতলের মানুষ পাহাড়ে যায়

পাহাড়ের মানুষ নেমে আসে সমতলে

সনির্বন্ধ পাথরের মত

ক্রোধে জ্বলে ওঠে চিতা

ক্রোধে জ্বলে ওঠে এক বোকা চিতা

ক্রোধে জ্বলে ওঠে এক অবিশ্বাসী চিতা

 

ক্ষতির কথা আমরা সবাই বুঝতে পারলাম

কিন্তু বাবা কাঁদলেন না বলে আমরা কেউই

                                                                 কাঁদলাম না ” ( জ্বলছে )

 

পৃথিবীর ইতিহাসে সভ্যতা বারবার পুড়েছে । আবার জেগেছে । আর তারই ধারাবাহিক একটা পর্যায়ে ত্রিপুরা ১৯৮০ সালে জাতিদাঙ্গায় রক্তাক্ত হয়েছিল । ক্রোধে জ্বলে উঠেছিল অবিশ্বাস । ১৯৭১-এর বাংলাদেশ যুদ্ধ, ত্রিপুরায় শরণার্থীর আগমন, পুনরায় বাঁচার চেষ্টা, সংগ্রাম । ১৯৮০ সালের দাঙ্গা ত্রিপুরার সাহিত্যে গভীর ছাপ ফেলেছে । কবিতা, ছোটোগল্প, উপন্যাসে এর প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই । একসময় সময়ের নিয়মেই সব ঠিক হওয়ার পথে যাত্রা শুরু করে । কিন্তু সব কি ঠিক হয় ? “সমতলের মানুষ পাহাড়ে যায় / পাহাড়ের মানুষ নেমে আসে সমতলে / সনির্বন্ধ পাথরের মত”

পাহাড়-সমতলে তবু মানুষকে যেতে হয় জীবিকার প্রয়োজনে । কবি খুব সুন্দর তিনটি মাত্র শব্দ ব্যবহার করে বিষয়টিকে স্পষ্ট করলেন“সনির্বন্ধ পাথরের মত” তার মানে সম্পর্কটা আর বন্ধুত্ব পর্যায়ে রইল না । “সনির্বন্ধ” পর্যায়ে এসে দাঁড়াল । তাও আবার পাথরের মতো ! ভয় উভয়ের ভিতরেই স্থায়ী একটা দানা বেঁধেছে । তবু জীবনকে চালাতে হবে । সমতলের লোক-কে যেতে হবে, পাহাড়ে । আবার পাহাড়ের লোক-কে যেতে হবে সমতলে । আশ্রয়দাতা এবং আশ্রিতর মধ্যে উঁকি দিয়ে জায়গা করে নিল দ্বিধা দ্বন্দ্ব । এরচেয়ে মর্মান্তিক আর কী হতে পারে ? কিন্তু এই দাঙ্গাটা কি জীবনের স্বাভাবিক গতিতে এসেছিল ? অনেকের মতে না । এর পেছনে জড়িয়ে ছিল অন্যরকমের এক ইতিহাস । কবিতাটা পড়তে পড়তে আমরা আরও একবার বুঝলাম, অবিশ্বাস তার ডালপালা কিভাবে মেলেছিল তৎকালীন সময়ে

কবি সেলিম মুস্তাফা তার মেধাবী ভাষায় লিখলেন“ক্রোধে জ্বলে ওঠে চিতা / ক্রোধে জ্বলে ওঠে এক বোকা চিতা / ক্রোধে জ্বলে ওঠে এক অবিশ্বাসী চিতা”মানুষ মরে গেলে তো সে বোকাই ! আগুনই তার শেষ প্রতিবাদ । “অবিশ্বাসী চিতা” বললেন কেন ? তাহলে কি মৃতব্যক্তি বিশ্বাসই করতে পারলেন না যে, তিনি এইরকম ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মারা গেলেন ! ক্ষতির কথা ভেবে সবাই আমরা কাঁদবো ভেবেছিলাম । কিন্তু বাবা তার অভিজ্ঞতায় কি বুঝলেন জানি না, তিনি কাঁদলেন না ! তাই তার দেখাদেখি আমরাও কাঁদলাম না । “কাঁদলাম না” বাক্যকে আলাদা মূল্য দিয়ে কবি বিশেষ জোর দিলেন । এবং বুঝিয়ে দিলেন কাব্যিক কৌশলে যে এটাই ঠিক ছিল । “বাবা”–র প্রতিনিধিত্ব এখানে কে করছে ? আমি তাকে “জীবন-ই” বলতে চাইবো । এখানে জীবনই আমাদের অভিভাবক । আবার অন্যপাঠও হতে পারে এর যে, বাবা সব অভিমান বুকে চাপা দিয়ে রইলেন, সময়ের অপেক্ষায় ! তা হতেই পারতো ! কিন্তু এখানে সেলিম মুস্তাফার কবিতার মেজাজ যতটুকু বুঝতে পারি, তাতে মনে হয়েছে কবি এই কাঁদতে না-পারাকে জীবনের সদর্থক অর্থেই নিয়েছেন । কবিতাটি কবি শেষ করলেন এভাবে“আমরা তাকিয়ে রইলাম পলকহীন / আগুনের ফাঁকে-ফাঁকে দেখা যেতে লাগল / তার হাসি”জীবনের ব্যঞ্জনা বুঝলেন বলেই কি এই হাসি ? হয়ত বা কবিতার পরতে পরতে কবি আমাদের ভিতরের মানসিকতাকে উন্মোচন করে কবি এগিয়ে গেলেন তার পথে ।

 

“অবিশ্বাসের আগুন ক্রমশঃ ছড়িয়ে পড়ল এদিকেও

আমরা ডেকে তুললাম যে যার ভাইকে, বললাম 

                                                                         জেগে থাকো !

লোকে লোকারণ্য হয়ে গেল ইস্কুলবাড়ি

ময়দান ঘাড় গুঁজে ঢুকে গেল তাঁবুর ভেতর”

 

১৯৮০-র দশকের সে সময়টা, সে মুহূর্তটা এইরকমই ছিল । ময়দান ভর্তি ছিল আতঙ্কিত মানুষের ঢল । লোকে লোকারণ্য হয়ে গিয়েছিল ইস্কুল বাড়ি । প্রথম লাইনে বললেন“অবিশ্বাসের আগুন ক্রমশঃ ছড়িয়ে পড়ল এদিকেও” । “এদিকেও” বললেন কেন ?  তারমানে “ওদিকও” একটা শব্দ এর ভিতরে লুকিয়ে রয়েছে । নাহলে তো বাক্যটা পুরো হচ্ছে না । তবে কি কবি তার বক্তব্যের মধ্যে থেকে কবিতাটি ধরেছেন ! অবশ্যই  “হ্যাঁ” বলতে হয় ।  

কিন্তু কেন এই হত্যা, কেন এই পরিণতি, পরিস্থিতি ? কবি শুধু বললেন

  

“আমি জানি উত্তর,

এখন সকলেই জানে, তবু বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখে

লাশের পর লাশ লাশের পর লাশ লাশের পর লাশ

উড়ে আসছে লাশ

ভেসে আসছে লাশ

গড়িয়ে নেমে আসছে মানুষের পায়ের কাছে

মানুষের ভাই তার লাশ”    

(মানুষের পায়ের কাছে)

 

এত “লাশ” শব্দের প্রয়োগ কি কবির সুচিন্তিত ? চারপাশে এত এত লাশ ! শেষমেশ কবি সে চিত্রকল্পে আনলেন আরও ভয়াবহতা“গড়িয়ে নেমে আসছে মানুষের পায়ের কাছে / মানুষের ভাই তার লাশ ”দাঙ্গার ভয়াবহ চিত্র এখানেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে । কিন্তু লাশের পরেও তো জীবন থেমে থাকে নাজীবন তো চলার নামই । তাই কবির পরবর্তী কবিতায় তার ছাপ পাই, যেখানে কবি লিখছেন

 

“সমস্ত কোলাহল থেমে গেছে এখন,

কোলের কাছে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েছে নারী

পরিশ্রান্ত ঠোঁট ও বুক একইভাবে

                        সম্পদহীন বাড়ির মত নির্ভয়ে খোলা”                (মধ্যরাতে)

 

উৎকণ্ঠার কোলাহল থেমে গেলে মানুষ বোধহয় একটু নিশ্চিন্ত হয় । কবি চিত্রকল্পটি লক্ষ্য করুন“কোলের কাছে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েছে নারী”! এই ঘুম কি বহুদিন পর নিশ্চিন্ত তৃপ্ত একটি সম্ভোগ পরবর্তী ঘুম ? কবি কিন্তু কোথাও এমন ইঙ্গিত দেননি । কিন্তু কেন জানি আমি নিশ্চিত কবি এটাই বুঝাতে চেয়েছেন কেননা কবির এরপরের লাইনটি পড়ে বা হৃদয়ঙ্গম করে আমার তাই মনে হয়েছে । না-হলে কবি কেন এর পরের লাইনে বলতে যাবেন“পরিশ্রান্ত ঠোঁট ও বুক একইভাবে / সম্পদহীন বাড়ির মত নির্ভয়ে খোলা” । কবিতার নামও কবি রেখেছেন “মধ্যরাতে” । সম্পদহীন বাড়ির মত খোলা ঠোঁট, বুকআহা ! এমন সংযত, সুসংহত, মার্জিত  আধুনিক উপমার প্রয়োগ বিরল । এখানে নিশ্চিন্ত, পরিশ্রান্ত, সম্পদহীন শব্দগুলো কি গভীর ব্যঞ্জনা তৈরি করল ।  এরপরই কবি আস্তে আস্তে করে ক্রমশ শরীরের ভিতরে প্রবেশ করলেন । এবং লিখলেন

 

“রাস্তার তীর্যক আলো একইভাবে ছুঁয়ে আছে

                                                অন্ধ এই শহরের একজন পুরুষ ও একজন নারী,

আলোর ভেতর থেকে সরে গিয়ে ভেসে উঠছি আমি

জেগে উঠছে আমার আত্মার ভেতর আরেক শরীর, আগে

অন্ধকারে কিছুই দেখতে পেতাম না, এখন

উষ্ণতার তারতম্যে সমস্ত টের পাইঐ শরীরে

                                        ঐ যোনির মধ্যে এক রক্তে ভেজা পেণ্ডুলাম ।” 

                        

সময়ের সাথে বদলে যায় সমাজ-পরিস্থিতি । বদলায় ভাষা বদলে যায় বয়ান । কবি শব্দ দিয়ে, প্রতীক দিয়ে আসলে একটি সময়কেই ধরতে চান । ব্যক্ত করতে চান সময়ের জটিলতা, সময়ের সংকেত কবি খুঁজে বেড়ান তার শব্দচিত্রের মধ্যে দিয়েই । কবি সাহসী উচ্চারণ এই কবিতায় ক্রমেই ঊর্ধ্বমুখী হয়ে গেছেনিজেকে বিদ্ধ করেছেন । আহত করেছেন । তাই তো কবি লিখতে পেরেছেন এমন লাইনগুলো

 

“দুই উরুর মাঝখানে অবৈধ অন্ধকার ঝুলিয়েছে যারা

তারা জানে না নিপুণ যুদ্ধে তাকে ফাটিয়েছি আমি,

সমস্ত কোলাহল থেমে গেছে তখন, শহর জুড়ে

ঘুমিয়ে পড়েছে বনের মানুষ, চোখ থেকে

খসে পড়ে চোখ, আমি দেখি

 

যোনির ভেতরে আর অন্ধকার নাই

রক্ত ও বীর্যে মাখা আমারই মুখ ভেসে ওঠে ।”

 

অবশেষে কবি যোনির ভিতর থেকে অন্ধকারকে ছিনিয়ে আসেন এবং বৈধতা দেন নিজেই নামেই । মেকি অন্ধকারকে দেন মানবীয় মূল্যবোধ । মনে পড়ে মধ্যের সেই লাইনটি আবার“উষ্ণতার তারতম্যে সমস্ত টের পাইঐ শরীরে / ঐ যোনির মধ্যে এক রক্তে ভেজা পেণ্ডুলাম ।” এইসব কবিতায় আমরা কবি সেলিম মুস্তাফাকে আলাদা করে টের পাই । তার স্টাইল, প্রতীকের ব্যবহারআসলে ঐ-সময়ের প্রভাব, প্রদীপ চৌধুরীর সাথে মেলামেশার প্রভাব পড়ছিল তার কবিতায়, ভাবনায় কিন্তু তাঁর বড় গুণ হচ্ছে, তিনি নিজের মৌলিক ভাবনা থেকে প্রভাবিত হয়ে সরে যাননি । প্রদীপ চৌধুরীর প্রভাবকে গ্রহণ করেছেন, কিন্তু ভেসে যাননি । এই মেলামেশার ফলে, সেলিম মুস্তাফার ভাবনা জগতে একটা আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল । বিষয়কে নানাভাবে দেখার একটা কৌতুহল, দৃষ্টি তৈরি হয়েছিল তাঁর মননে । যা তাঁর কবিতায় উঁকি দিয়ে গেছে বারবার । কবিকে প্রদীপ চৌধুরীর প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন করলে, উত্তরে বলেছিলেনআমি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি আলোচনায় নতুনের খোঁজ পেলাম প্রদীপ সব সময় জীবন নিয়ে কথা বলেন, কবিতা বা কোন লেখা নিয়ে নয় যা বলেন জীবনের সঙ্গে তুলনা করে, ভবিষ্যতের সঙ্গে সম্ভাব্য তুলনা করে কথা বলেন কিছুই অস্বীকার করেন না জীবন যে রকম, লেখাও সেরকম তবে শব্দ সম্পর্কে অত্যন্ত স্বাভাবিকতা বজায় রাখতে বিশ্বাসী  

“পর্দা” শব্দের খুব সুন্দর ব্যবহার দেখি কবির “পর্দা” কবিতায় ।

 

“পর্দা দুলছে

এপাশে সভ্য মানুষ, ওপাশেও

ওপাশে স্বস্তি ও নিরাপত্তা, এপাশেও,

তবু পর্দা, পর্দা দুলছে এখন ।”        (পর্দা)

 

জীবন থেকে পর্দা-কে অস্বীকার করার উপায় নেই । স্বস্তি পর্দার এপার ওপার দুই দিকেইতারপরও একটা পর্দার  অস্তিত্বকে আমরা অস্বীকার করতে পারি নাকিন্তু কবি সেলিম মুস্তাফা “পর্দা” কবিতায় শেষ দুই লাইনে কবিতার মেজাজকে অন্য আরেকটা দিকে টার্ন করে দিয়ে বিদায় নিলেন, অনেকটা পাঠককে অপ্রস্তুত করে দিয়েই

 

“তবু, এই ঘর, ঘর ।

এর ভেতরে যা-খুশি থাক

                                বাইরে অন্য কিছু আছে ।”    (পর্দা)

 

এই অন্য কিছু কি আছে ? এই দিকে পাঠককে ঠেলে দিয়ে, কবি কিছু না-বলেই চলে গেলেন । আবার পাঠককে কবিতাটি শুরু থেকে পড়তে হবে আমি নিশ্চিত তখন পাঠক কবিতার মধ্যে থেকে এই তিনটি লাইন আবার আবিষ্কার করবেন, যেখানে কবি লিখেছেন - 

 

“এই ঘর লাল হবার সম্ভাবনা আছে, রক্তে

ধুয়ে যেতে পারে এ-ঘরের সমস্ত কালি

                                 ছাদ ও দেওয়ালের ঝুল”         (ঐ)

 

সেলিম মুস্তাফার কবিতার এই খেলা আমাকে খুব প্রভাবিত করে । আমাকে আনন্দ দেয় । আমাকে ভাবায় তাকে একবার প্রশ্ন করেছিলাম“একটি কবিতা ঠিক কি রকম হওয়া উচিত ?” উত্তরে কবি বলেছিলেন“ত্রিশূলের মতো । দেখো, ত্রিশূলের মধ্যের অংশটা বিঁধে কিন্তু বাকি দুটো অংশ তাকে একটা পদ্মফুলের মতো ইঙ্গিতবাহী করে তোলে । আমি মনে করি, কবিতায় একটি কবিতা একই সঙ্গে যেমন হৃদয়কে বিঁধবে, তেমনি তাকে আবার একটা সৌন্দর্যের দিকেও নিয়ে যাবে ।”        

         “আর কবিতায় বাক্য গঠন ?” উত্তরে বললেন“সাপের মতো অত্যন্ত সরল । কিন্তু ভিতরে যাতে বিষ থাকে ।” সেলিম মুস্তাফার কবিতায় কিন্তু এই বিষের প্রভাব লক্ষ্য করা যায় । কবির “সম্প্রদায়” কবিতায় এর সুন্দর প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায় । যেখানে কবি বলছেন

 

“আমরা ঈশ্বরে বিশ্বাস করি না, কেননা

আমরা সেই সম্প্রদায়ঈশ্বর যাদের মেরেছিলেন ।”         (সম্প্রদায়)

 

সেলিম মুস্তাফার বেশির ভাগ কথাই খুব সোজাসুজি । তাঁর রচনা পদ্ধতিতে ভাব ও ভাষার অবিচ্ছিন্ন সমীকরণ লক্ষ্য করা যায় । কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত বলেছিলেন“কবির বক্তব্য, তার প্রতিদিনের বিশৃঙ্খলা অভিজ্ঞতায় একটি পরম উপলব্ধির মাল্য রচনা । কবির উদ্দেশ্য তার চারপাশের অবিচ্ছিন্ন জীবনের সঙ্গে প্রবহমান জীবনের সমীকরণ । কবির ব্রত তার স্বকীয় চৈতন্যের রসায়নে শুদ্ধ চৈতন্যের উদ্বাবন ।”

 

“ছোট কিংবা বড় নিয়ে আমার কোন

মাথাব্যথা নেই, প্রত্যেকেরই

একই ম্যাজিক যিনি রাজনীতি করেন আর

যিনি তা করেন না, যিনি

দাড়ি রাখেন এবং

যিনি তা রাখেন না ”          (একই)

 

কবি সেলিম মুস্তাফার কবিতায় ব্যবহৃত শব্দের রেখাচিত্র, চিত্রকল্প গভীর মমতায় পাঠকের সাথে সহমর্মিতা সৃষ্টি করে নিতে পারে । পাঠককে কবি কোনভাবেই বিব্রত করেন না । তাঁর কবিতার উৎস এবং  লক্ষ্যও শুধুমাত্র হৃদয় ।

 

“আমার ঘুম আসে না

আমার কোন স্বপ্ন নেই আমার কোন দুঃস্বপ্ন নেই

আমার সন্দেহ আর বিশ্বাস আজ সমান সমান”     (নিঃশব্দ সাইরেন)

 

কবি অরুণ মিত্র একবার বলেছিলেন“কী বলা হল শুধু তাই নয়, কীভাবে বলা হল তাও আধুনিকতার ধারণার পক্ষে জরুরী ।” সাতের দশকে ত্রিপুরার বাকি কবিদের থেকে এখানে নিঃসন্দেহে কবি সেলিম মুস্তাফা এগিয়ে ছিলেন

 

“প্রার্থনার যে হাত আকাশে উঠে গেছে

                                                তা আমার নয় ।

পায়ের যে পেশী বিদ্রোহে ফুলে উঠেছে

                                                তা আমার নয়

আমার কোন স্বপ্ন নেই আমার কোন দুঃস্বপ্ন নেই

গভীর ষড়যন্ত্রে ঘুমিয়ে পড়েছে শহর

আমি আমাকে খুঁজে পাচ্ছি না

ঘরে অন্ধকারে যে শুয়ে রয়েছে

                                                        সে আমি নই”       (ঐ)

                 

জীবন ও জগতের সংস্পর্শে কবি যা অনুভব করেছেন তাই তিনি লিখেছেন । কি অনাড়ম্বভাবে বিষয়টি অনুভবের দুয়ারে নিয়ে এসেছেন । কবি বারবারই বলছেনআমার কোন স্বপ্ন নেই । এমনকি দুঃস্বপ্নও নেই । কিন্তু তারপর পরই বলছেন“গভীর ষড়যন্ত্রে ঘুমিয়ে পড়েছে শহর / আমি আমাকে খুঁজে পাচ্ছি না” । এরপরই কবি আবার নিজেকে অস্বীকার করে বলছেন“ঘরে অন্ধকারে যে শুয়ে রয়েছে / সে আমি নই” কেননা, আমি এমন হতেই পারি না কবি নিজের ব্যর্থতাকে স্বীকার করে নিচ্ছেন প্রকারান্তরে সময়টা তো কিছু করার । না-করতে পারার দায় তাই নিজের কাঁধে নিয়ে আবার বলছেন

 

“শহরতলির বড় বড় রাস্তা দিয়ে যার ছ’ফুট শরীর সটান হাঁটছে

                                                    সে আমি নই

অন্ধকার

সমস্ত স্বপ্নের ভেতর শব্দ হোক

সমস্ত শব্দের ভেতর স্বপ্ন হোক

কে যেন তার স্বপ্নের ভেতর দিকে আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে”  

(ঐ)

 

স্বতঃস্ফূর্ত মনোলগ ভঙ্গির আদলে একটি লেখা । কবির তাঁর স্বীকারোক্তির মতো বলে যাচ্ছেন একের পর এক অনুভূতিমালা । যা তাঁকে অনবরত যন্ত্রণা দিচ্ছে । তাঁর ভিতরের মননকে খুঁড়ে খুঁড়ে খাচ্ছে । কবি নিজেও খুব অসহায় অনুভব করছেন । তাই তো কবি এরপরই বলছেন

 

“আমি হারিয়ে যাচ্ছি, চিলড্রেন্স পার্ক হারিয়ে যাচ্ছে, শিশুদের পার্ক

এক গুচ্ছ চাঁপাফুলের ভেতর,

এই গন্ধ, আমি পেয়েছিলাম একটি মেয়ের শরীরে,

শহরটাকে এখন সেই মেয়েটার মতো মনে হচ্ছে

তার ঠোঁটগুলো ভয়ংকর মোটা

তার চোখ নুয়ে পড়েছিল অজ্ঞাত কারণে

রাস্তার বাটি দমকা ঝড়ে নিভে গিয়েছিল 

                                                        তারও এক ঘণ্টা আগে

আকাশ জুড়ে একটা পৈশাচিক পরিকল্পনা”        (ঐ)

 

এখানে “মেয়ে”-টি কে ? একটা প্রতীক ? প্রতীক হলে কিসের প্রতীক ? কেন এই প্রতীক ! মেয়েটির চোখ কোন্ অজ্ঞাত কারণে নুয়ে পড়েছিল ? কবি আসলে কি বুঝাতে চাইছেন এখানে ! এই বিষয়গুলো নিয়ে অবশ্যই ভাবা দরকার । আকাশ জুড়ে কিসের পরিকল্পনা ছড়িয়ে রয়েছে । তাহলে তো সে পরিকল্পনা কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয় । তবে কি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ? তাই কি কবি কবিতার নাম দিলেন “নিঃশব্দ সাইরেন” । তাই কি কবি প্রথমেই বলেছিলেন“আমার কোন স্বপ্ন নেই আমার কোন দুঃস্বপ্ন নেই / আমার সন্দেহ আর বিশ্বাস আজ সমান সমান” ! তাহলে তো কবিতাটিকে আবার প্রথম থেকে পড়তে হয় । কেননা, হয়ত কবিতার মোক্ষম ইঙ্গিতগুলো ফেলে এসেছি আগে ! অতএব পুনর্পাঠ জরুরি । আসলে, এভাবেই একটি কবিতাকে মননে আবিষ্কার করতে হয় । সব কবিতায় সেই রসদ থাকে না । যে কবিতায় থাকে, সে কবিতাকে নিঃসন্দেহে বারবারই এভাবেই পড়ে দেখতে হবে ।   

সটান দাঁড়ি-কমাহীন সাপের মতো সরল একটি কবিতা । কিন্তু ভিতরে বিষকামড়ের ছোবল যন্ত্রণা ঠিক টের পাওয়া যায় । এখানে একটি অসহায় মানুষের যন্ত্রণার ছবি দেখতে পাই । কোথাও কোন চিত্রকল্পের জটিলতা নেই । প্রতিভাধর কবির পক্ষেই এমন তির্যক প্রকাশ সম্ভব হয় । সরল বুননের ভিতর দিয়ে এগিয়ে গেছে অসহায় জটিল এক জীবনযাত্রার বিকাশ । এইরকমই জটিল ভাবনার সরল প্রকাশ দেখতে পাই “মধ্যজুলাইয়ের কবিতা-১”-য় ।

 

“এই মুহূর্তে থেমে থাকা কঠিন,

এই মুহূর্তে এত কাছাকাছি যে

আর সংঘর্ষ হয় না

এবং

বন্ধুত্বও না ।”         (মধ্যজুলাইয়ের কবিতা-১)   

 

ছোটো ছোটো কথাকে ভারি চমৎকারভাবে সাজিয়েছেন কবি । প্রকৃত কবিতার থাকে না কোনো বর্তমান ভবিষৎ । যখনই পঠিত হবে, তখনই তা হয়ে উঠবে সে সময়ের । কবি ব্যক্তিক অনুভূতিকে যৌথ অনুভবের সাথে চমৎকারভাবে মিলিয়ে দিয়ে পেরেছেন ।

 

                        “এখানে রাত্রির কথা বলা হচ্ছে

যে রাত পাকস্থলীর মত উত্তপ্ত

                                                যন্ত্রণাময়

যে রাত ক্ষুধার মত খালি

                                                রক্তে আটকে পড়া বাদামি অন্ধকার

এসময় আমার মৃত্যু হয়ে যেতে পারে

বাতাসে আমার নীলাভ শিরা-উপশিরা

বাতাসে আমার অক্লান্ত রোদন”               ( মধ্যজুলাইয়ের কবিতা-৩)

 

 

“তুমি যা চাও না, তা আমিও চাই না,

তবু তোমার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয় না

কেননা

তুমি যা চাও, তা আমিও চাই”               (দেশীপদ্য-৫)   

 

            সেলিম মুস্তাফার কবিতার আরও একটি বড় দিক হচ্ছে বিশ্বাসযোগ্যতা । কবিতা পড়া-মাত্র পাঠক সেই কবিতার সাথে একটা সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন । কোথাও একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায় কবির সাথে পাঠকের । এখানেই কবি হিসেবে সেলিম মুস্তাফার জয় । এমন অনেক কবি দেখা যায়, যাদের কবিতা পড়ি, ভালোও লাগে । কিন্তু কোথায় যেন পুরোপুরি বিশ্বাস করতে বাধে । মনে হয়, কবি শব্দ, বাক্য সাজিয়েছেন ভালো, স্মার্ট, মর্ডান, কিন্তু  ঠিক ভালোবাসা হচ্ছে না । প্রেমে জড়িয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে না । কবিতাটি  যে কবি মন থেকে লিখেছেন, নিজেকে আবিষ্কারের ক্ষুধা থেকে লিখেছেন, এই বিশ্বাসযোগ্যতাটা আদায় করে নিতে পারলেন না পাঠকের কাছ থেকে কিন্তু আমার কাছে সেলিম মুস্তাফা এক্ষেত্রে অত্যন্ত শক্তিশালী । তাঁর শব্দের গতি, ভাবের অকাট্য যুক্তি, আন্তরিকতায় পাঠককে জড়িয়ে ফেলেন এক কাব্যিক রুচিতে, কাব্যিক গাম্ভীর্যে, আনন্দে ।

            সেলিম মুস্তাফা কথা বলেন সরাসরি । এতক্ষণের কবিতায় নিশ্চয়ই এই লক্ষণগুলো প্রতিফলিত হতে দেখেছেন । বাক্যের রহস্যের থেকে কথার রহস্যে তিনি বেশি বিশ্বাস করেন । জটিল রূপক ব্যবহার করতে কবি একদমই ভালোবাসেন না । কবি ভালোবাসার মতো ক্রোধের কথাও সরাসরি বলেছেন ।

            একবার কথা তিনি প্রসঙ্গে বলেছিলেন“তুমি সত্য হলে, তোমার ভাবনা সত্য হতে বাধ্য আর তোমার ভাবনা সত্য হলে তার বহিঃপ্রকাশও সত্য কাঠামোয় দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য । আর যা সত্য তা পাঠককে আকৃষ্ট করবেই ।” আরও বলেন“তুমি কথা বলে যাও, কবিতা হল কিনা ভাবতে যেও না । প্রথাগত ছন্দে হল, কি হল না, তা ভাবতে যেও না । কবি হিসেবে তোমার লক্ষ্য পাঠক নয় । তোমার একমাত্র লক্ষ্য তুমি । তোমার ছন্দও তুমি । তোমার ভালোবাসাও তুমি । তোমার আলিঙ্গনে তুমি তোমাকেই জড়াও বারবার । সাজানো ষড়যন্ত্রের আড়ালে তোমার সত্তাকে তুমি আবিষ্কার করো । সবাই সাজানো কথা শুনতে চায়, যা চলে আসছে তা-ই শুনতে চায় । অথচ তোমাকে বলতে হবেতোমার কথা । তুমি যা মনে করো, তুমি যা বিশ্বাস করো, তুমি যা ঘৃণা করো; অতএব, তুমি তোমাকেই জড়াও । নিজেকে আঘাত করো । আবিষ্কার করো কবিতায়, চিন্তায়, চেতনায় ।”

 

            তাঁর “দেশী পদ্য” নামক ছোটো ছোটো ১৪টি কবিতার মধ্যে কয়েকটি নিচে উল্লেখ করছি 

                       

                        “বহু কথা জমে আছে ?

                        জানি,

                        শহর জুড়ে তাই তো এত

                                       কানাকানি !”          (দেশী পদ্য–৮)

 

 

                        “কেন কাঁদো

                        আমরা তো এভাবে বাঁচবো না

                        আমরা এভাবে বাঁচতে পারি না,

                        লোকে যে যা-ই বলুক

                        আমরা তো জেনে গেছি কার কী অসুখ ।

                        আমরা তো জেনেছি ওষুধ-ও               (দেশী পদ্য–১০)

 

            কবির এই ধরনের কবিতায় আরেক ধরনের আমেজ তৈরি হয় । ছোটো ছোটো কবিতার ভিতরে মূলত কবির কংক্রিট ইমেজ পাওয়া যায় । এখানে কম কথায় বেশি কথা বলার একটা চ্যালেঞ্জ থাকে । খুব বেশি এই ধরনের কবিতা কবি লেখেননি । তবু কয়েকটি অসাধারণ লিখেছেন ।

 

            এবার কবি অরুণ মিত্রের “গদ্য কবিতা তার স্বপক্ষে” প্রবন্ধ থেকে প্রাসঙ্গিক কিছু কথা উল্লেখ করছি । যেখানে তিনি লিখছেন“বর্তমান কালে বাংলা কবিতায় অন্তর্বস্তুর বৈচিত্র্য সঙ্গে নিয়ে এসেছে রূপের বৈচিত্র্য । তাই ঘটে থাকে যখন পরিস্থিতির বিবর্তনের সঙ্গে মানুষ তার নতুন অভিজ্ঞতা ও অনুভূতিকে, তার নতুন উপলব্ধিকে ভাষা দিতে চায় । পুরনো অভ্যস্ত কাঠামো তখন ভাঙতেই হয় । এবং অন্য কাঠামো তৈরি করে নিতে হয় ।

            প্রকাশপদ্ধতি হিসেবে অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত, ও স্বরবৃত্তের অজস্র রূপ আধুনিক বাংলা কবিতার এক আকর্ষণ কিন্তু গঠনের দিক থেকে আধুনিক কবিতার প্রধান প্রবণতা তা নয়, বরং তার বিপরীত বলেই আমার মনে হয় । কবিতার চরণে চরণে মিল দেওয়ার রীতির প্রতি এবং সাধারণত যাকে ছন্দ বলা হয় তার প্রতি আজকের কবিদের উপেক্ষা ।

            এখনকার কবিতা সাধারণত রূপ নিয়ে থাকে মোটামুটি তিন ধরণে১) মিলহীন ছন্দে ২) গদ্যবাক্যভাঙা হ্রস্বদীর্ঘ ছত্রের বিন্যাসে এবং ৩) টানা গদ্যে । কবিদের এই “অকাব্যিক” আচরণে কেউ কেউ ক্ষুদ্ধ, অভিযোগও অনেক সময় শোনা যায় । কিন্তু এই ক্ষোভ কবিতার বিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তিসঙ্গত কিনা তাও আলোচনা করা দরকার ।”

 

                        “আমি সম্পদহীন আদিবাসীশরীরে আমার শরীর ছাড়া আর কিছু নেই

                        কেবলই খাদ্য চাই আমার ! আমি কাকে কি বলব ? আদিম

                        বিপ্লব ছাড়া আর কি মুক্তি আছে কোনো ? তাকে আমি

                        কী বলে ডাকব ? গোলাপ ?

 

                        আমি রাত্রির ভেতর ঘুরে বেড়াচ্ছি । জানি রাত অন্ধকার, শুধু

                        রাতের ভেতর কোনো লোকালয় নেই আমি ইদানীং টের পাই,

                        মানুষের কাছ থেকে মানুষ উঠে চলে গেছে আরো দূরের দিকে, পথে

        মরা বাঁশপাতা, ভাইয়ের পাশ থেকে বোন উঠে চলে গেছে এপথেই”      

                                        (সম্পদহীন আদিবাসী ও গোলাপ)

 

আসলে, জীবন ও জগতের সংস্পর্শে এসে কবি যা অনুভব করেন, যা উপলব্ধি করেন, তাই তিনি ব্যক্ত করেন তার কবিতায় । সেলিম মুস্তাফাকে এই কবিতার পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন করেছিলামসম্পদহীন আদিবাসী শরীরে আমার শরীর ছাড়া কিছু নেই

কেবলই খাদ্য চাই আমার”— এখানে শরীর ও খাদ্য কি কোনো সংকটের দিকে ইঙ্গিত করছে এই লাইনের কি কোন প্রেক্ষাপটগত ইতিহাস আছে ?

উত্তরে কবি বললেন—“তখন কী ভেবে কোন অনুষঙ্গে কি লিখেছিলেম এখন বলা সঠিক নাও হতে পারে শরীরের খাদ্য দুটোই মাত্র ভাত আর নারী শরীর এখানে গোটা অস্তিত্বকেই সিম্বলাইজ করছে কী চাই জানিনা, কিন্তু চাই সৃষ্টির প্রথম আকুলতা বোধ হয় এটাই প্রকৃত লেখার জন্য ক্রমশ গড়ে ওঠা Urge নারী মূলত সমস্ত অদৃশ্য ক্ষুধারই প্রতীক । আদিবাসী সমাজবা বলতে পারো কাঞ্চনপুরকে দেখে, কাঞ্চনপুর যদি আমার জীবন দেখার প্রথম প্রতীক হয়ে থাকে, তবে সেটা আমার অকল্পনীয় দেখা, বিস্ময়ে দেখা, কৌতুহলে দেখা, আগ্রহে দেখা, এক রিয়ালিটিকে দেখাজীবনের ভেতরে ভেতরে বয়ে চলা আরেক জীবন, বাইরের জীবনের ভেতরে চলা যে মেশিনঘর যা বাইরের জীবনকে রসদ জোগাচ্ছে, জেনারেট করছে, তার মুখোমুখি হওয়া । বিনিময় ছাড়া যে সৎ বা অসৎ, মহান বা সাধারণ, সুখী বা অসুখী কোনো জীবনই চলে না, তার সরাসরি মুখোমুখি হলাম সেখানে আমার প্রথম রিয়ালিটিকে ছোঁয়া ! আমার মনে হলো ভালবাসাও  বিনিময়-মাধ্যম । আমি অনেক পরে জেনেছি বলে অনেকে হয়তো হাসবেন । এই ইমোশনকে যথেষ্ট সম্মান জানিয়েই বলতে চাই, যা যতটুকু দেয়া যায়, তা ততটুকু পাওয়া যায়  কোন কোন আদিবাসী যদি যৌনতা দিয়ে কিছু আদায় করেও থাকেন, সেটা বিনিময়ের কড়ি হিসেবেই দিয়েছেন আবার কারো কারো যৌনতা লুণ্ঠিত হয়েছে, সেটা আলাদা ব্যাপার ওখানে অনুপজাতিরা বুঝেছিল, শরীর খুবই সস্তা বিষয়, আর বিশেষ সম্প্রদায়ের উপজাতিরা বুঝেছিল, আরে এরা তো দেখি শরীর পেলেই সন্তুষ্ট ! তাই শরীর দিতে কারো আপত্তি হয়নি বিশেষ, যদিও কিছুটা হলেও সংকোচ তো ছিলোই ।

এতে দোষ ছিল অবশ্যই, তবে প্রায়শ্চিত্তের বিধান ছিল । প্রকাশ্যে হলে, বা অননুমোদিত হলে অর্থদণ্ড তো ছিলোই যাক এসব মূল কথা হল যা আমরা যত ইমোশনালি মহান ভাবাদর্শ নিয়ে ভাবি, জীবনের কঠিন জ্যামিতিতে, তা ততটা মোটেই নয় যে যেরকম ভাবে তাকে সেই পদ্ধতিতেই বশ করা হয়, ভোলানো হয় কাঞ্চনপুরকেও সেভাবেই ব্যবহার করা হয়েছে, হচ্ছে, অন্যান্য এই রকম এলাকার মতোই

ঠিক এভাবেই রাজনীতিও আমাদের ভুলিয়ে রাখে কেউ অংক কষে এগোয়, কেউ আবেগে এগোয় । জাতি বা উপজাতির ব্যাপার আসলে নয়, আসল ব্যাপার ব্যবহারকারী আর ব্যবহৃতউপজাতিরা শুধু তিল কার্পাস ভুট্টা বা যৌবন দিয়েছে তা নয়, তারা তাদের সংস্কার, সংস্কৃতি ইতিহাস আর মিথ কাহিনিগুলোও দিয়েছে বিশ্বের বাজারে সামান্য বিনিময়ে ইমোশনালি ব্ল্যাকমেইল্ড হয়েছে লাগাতর যারা নিয়েছে তারা পরজীবী হয়ত সংসার এভাবেই চলে লুন্ঠন করা হয়েছে কাঞ্চনপুর এমনই এক বাজার, যেখানে বাজারের ভেতরে সব সময় চলছে আরেক বাজার

ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী নৃপেন চক্রবর্তীর সময়কালে চালু ফর্ম-১৬-র কন্ট্রাক্টরীর কাজ পেতে মিজো যুবতীদের অনেককেই হয়তো রাত কাটাতে হয়েছে বিশেষ কোন অফিসারের কোয়ার্টারে, এমনকি তার পিতার সম্মতিতেই কখনো এটা পারস্পরিক সম্মতিতেই হয়ত । তবু হয়েছে কেউ প্রেমের নাটকে ভুলিয়ে ভোগ করেছে যৌবন । এগুলো এখনও আছে, সর্বত্র । কিন্তু আমার কাছে তখন ছিল একেবারেই নতুন । এখন হয়ত বিষয় নয় তখন ছিল বিষয় । ছিল বিস্ময় !

        একটি কবিতার ভিতরে কত কথাই-না লুকিয়ে থাকে । সেই অর্থেই বোধহয় বলা হয়, কোনো কোনো কবিতার ভিতরে অজস্র ছোটোগল্প, কখনও কখনও একটি উপন্যাসও বসবাস করে থাকে । “সম্পদহীন আদিবাসী ও গোলাপ” কবিতায় “আদিম বিল্পব ছাড়া আর কি মুক্তি আছে কোনো ?” খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি লাইন ।

সেলিম মুস্তাফাকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম“আচ্ছা, আপনি কবিতা লিখেন কেন ? উত্তরে বললেন “কবিতা লেখা শিখে গেছি, হয়ত তাই লিখি ! সাইকেল চালানো একবার শিখলে যেমন ভোলা যায় না, এ-ও তেমনি । না-লিখে পারি না । একবার তো পাঁচবছর একটানা একটাও কবিতা লিখিনি । দেবুদা ( দেবব্রত দেব) একদিন হঠাৎ এসে বুকে জড়িয়ে বললেন “তুমি না-লিখলে আমি প্রকাশনা জগতে এলাম কেন ? সেদিনই বাড়ি ফিরে আবার কবিতা লিখতে বসে পড়লাম । এভাবে কবিতা থেকে সরে যেতে চেয়েছিলাম বহুবার কিন্তু কারো না কারো অকৃত্রিম বন্ধুত্ব কবিতার জগতে টেনে এনেছে বারবার ।”

আমি বললাম“দেবুদা তো আপনাকে দিয়ে ছোটোগল্প লিখাতে চেয়েছিলেন কয়েকবার, লিখলেন না কেন ?”  উত্তরে বললেন “ইচ্ছে করে যে লিখিনি তা নয় । আসলে পারিনি । একবার দেবুদা এসে খুব ধরল একটা গল্প লিখতেই হবে । বসলাম কাগজ-কলম নিয়ে । কিন্তু সেই যে বসলাম, বসলাম-ই ! একঘণ্টা গেল, দুই ঘণ্টা গেল, কলম আর এগোল না আমি ভাবতে থাকলাম, আদৌ কোনো গল্প হয় কিনা ! গল্প বিষয়টাই বা কী ? এই যে আমি বসে আছি, এটাও তো একটা গল্প । গল্পের শুরু-ই বা কেন হল ? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে অর্থে গল্প শুরু করে গিয়েছিলেন, সে-ই প্রাসঙ্গিকতা কি এখনও রয়েছে ? আজ তো পথেঘাটে গল্প, অহরহ গল্প, তাহলে লিখবো-ই বা কি ? বিশ্বসাহিত্যে ছোটোগল্পের অবস্থান এখন কোন্ পর্যায়ে আছে ! এই যে, ভাবনার শুরু হল, এর আর শেষ হল না । একদিন, দুইদিন, তিনদিন, শেষ অবধি দেবুদাকে আর গল্প দেয়া হয়নি । আজও না !

 

শুনেছি আপনার লেখালেখিতে দেবুদা অনেক প্রেরণা যুগিয়েছিলেন । আপনি কি  বলেন ? সত্যিই কি তাই  ?”

সেলিম মুস্তাফা বললেন“একশোবার । চাকুরির প্রথম দিকে আমি যখন কাঞ্চনপুর ছিলাম, দেবুদা আমাকে তখন ঘরে বন্ধ করে বলতেন, তুমি কবিতা লেখোবাকি সব আমি দেখছি । এইসব প্রেরণাকে কি করে ভুলবো ! এসব ভালোবাসাই বারবার আমাকে কবিতার দায়বদ্ধতার দিকে টেনে রাখে । আমার সৌভাগ্য আমি এমন সঙ্গ পেয়েছিলাম   

 

সেলিম মুস্তাফার কথাগুলো শুনতে শুনতে ভাবছিলাম তাঁর কবিতার লাইনগুলো

 

“মেয়েমানুষকে ভালো না বাসলে সে আমাকে নাস্তিক বলে, ভালোবাসলে

বলে কাম-ই আমার অভিপ্রেত ছিল, সে সফল কণ্ঠে ঘোষণা করে

মানুষ মরণশীল এবং মানবিকতাও । ঠিক একইভাবে আজ একজন

তরুণ বিপ্লবী তার পিতাকে বলে কামুক, মাকে বলে নষ্ট ফুল,

প্রতিবেশীকে বলে শ্রেণিশত্রু, শুধু নিজেকে

‘ধর্ষিত আত্মার করুণ সঙ্গীত’ বলে 

অরুন্ধতীর পাশের বাড়িতে গোলাপের খবর নিতে যায়, আমি

কাকে কী বলব ? কে এদিকের কে ওদিকের ? আমি আমাকে

কী বলবো ? তাকে কি বলে ডাকব আমি ?”…

(ঐ)

 

কি অদ্ভুত ব্যঞ্জনাপূর্ণ লাইন । জীবনকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখা । নৈতিক মানবিকতার একেবারে নিচতলায়ও তলিয়ে যেতে দেখা গেল অতি বিপ্লবীদের । তাই কি কবি বললেন“মানুষ মরণশীল এবং মানবিকতাও   

আমি বহু আগে তাঁর কাছে একবার জানতে চেয়েছিলেম“আচ্ছা, কবিতা নিয়ে আপনার কোন ধরনের ম্যানিয়া আছে কি আপনার ? কিংবা কোনো প্রকারের নির্দিষ্ট আদর্শবোধ ? ছন্দ বা ধ্বনি এমন কিছু ? তখন উত্তরে আমাকে বলেছিলেন“না, এরকম কিছু নিয়ে তেমন ভাবি না । কোনো প্রকার কোনো বাতিকও নেই । জীবন নিয়ে, নিজেকে নিয়ে যখন যা অনুভব করেছি, তা-ই লিখে গেছি । লাইন বাই লাইন লেখা একটা সংস্কার । বহুদিন থেকে এভাবেই লেখা হয়ে আসছে । নিশ্চয়ই এর একটা অর্থ আছে । কি অর্থ আছে জানি না । তবু লাইন সাজিয়েই লিখি । তবে, প্রচলিত ছন্দে ক্লান্ত বোধ করছিলাম । মনে হচ্ছিল নির্দিষ্ট মাত্রায়, অক্ষরে কথাগুলো কেমন যেন কষ্ট পাচ্ছে । তাই ছন্দ বলতে কানের শ্রুতিমধুরতার দিকেই বারবার ফিরে আসি । মূল ছন্দ তো কবিতার ভাবনায় । ভাবনার শৃঙ্খলা না থাকলে নেহাত ছন্দ-শৃঙ্খলতায় কী যায় আসে ! তাই আমি ওসব প্রথাগত ছন্দ-সাধনার দিক কোনোদিন যাইনি ।”

এই উত্তরের বহু পরে আবার একবার কবিকে প্রশ্ন করেছিলাম“আপনি আমাকে দেয়া উক্ত মন্তব্যের পর দেখেছি, প্রথাগত ছন্দ নিয়ে আপনি বহু কাজ করেছেন আপনার পরবর্তী অনেক অনেক কবিতায় । এমন কি বেশ বড় ধরনের একটা গদ্য লিখেছেন প্রথাগত ছন্দ নিয়ে আপনার হঠাৎ এই পরিবর্তনের রহস্য কী ? কেন মনে হল, কবিতায় ছন্দটাও জরুরি ?

উত্তরে কবি বললেনকবিতা বলতে আমরা এই সময়ে যা বুঝি, তা নিঃসন্দেহে অন্তত -এর দশক পর্যন্ত কবিতাকে বোঝায় না শুধু বাংলা কবিতার কথা বলছি কবিতা বা কবিতা আকারে বা কবিতা হিসেবে বা কাব্যচেতনা বলতে যা বোঝায় এখন, তা আগের কাব্যচেতনা থেকে বহুদূর চলে এসেছে আগে লেখায় (সংস্কৃত প্রভাব অনুযায়ী) ছন্দকেও (মাত্রা গণনার হিসেবে) কবিতার অনিবার্য অংশ মানা হত যেমন দক্ষিণ ভারতীয় সঙ্গীত এখনো তালপ্রধান এমনকি অন্ত্যমিলকেও এখনো অনেকেই ছন্দ বলে জানেন, যা আসলে অলংকার আগের কবিতায়(?) দার্শনিক কথার, শিক্ষামূলক কথার বোঝা ছিল, আসলে কবিতা ছাড়া বাকি সবই ছিল, এখন তা প্রায় নেই এতে যেমন লাভ হয়েছে তেমনি ক্ষতিও হয়েছে ছন্দ জানলে আগের কবিতার সঠিক বিচার সম্ভব, এখনের কাব্যভাবনার আলোকে এবং সে সময়ের কাব্যভাবনার আলোকে

বাংলায় মাত্র তিনটিই ছন্দ বিশেষভাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে আর থাকে অলংকারের বোঝা অনুপ্রাসকেও অনেকেই ছন্দ বলেন ন্দ ক্ষতি করে এভাবে যে, সে কবিকে বাধ্য করে নির্দিষ্ট মাত্রার শব্দটিকে খুঁজে বের করে বসাতে তা- না পাওয়া গেলে কবির বক্তব্যকেই ঘুরিয়ে দিতে হয় এটা তো মস্ত বাধা ছন্দ কবিকে তাঁর ভাবনা থেকে আলাদা করে নিয়ে অন্যরকম গড়ে নেয় mould করে নেয় অন্য ছাঁচে  এটা কোনো 'জীবন্ত' কবির পক্ষে মানা কষ্ট তবে আমার কৌতূহল ছিল ছন্দ নিয়ে ছোটো ছোটো পদ্য বা কবিতা বহু আগেই লিখেছি ছন্দ আর শব্দালংকার মিশিয়ে কেমন যেন খেলা খেলা মনে হয় তবে রবীন্দ্রনাথ যেমন দক্ষ কারুশিল্পীর মতো তাঁর তাবৎ চারুশিল্পকে সাজিয়েছেন, সেখানে তাঁর মূল বক্তব্য আসলে কী ছিল, কেমন ছিল, তা আজ বোঝা মুস্কিল তাঁর নির্মাণ দক্ষতা এতোই নিপুণ যে, কোনো সন্দেহের অবকাশ থাকে না তাঁর পাণ্ডুলিপি দেখলেই বুঝতে পারবে কেমন কাটাছেঁড়া করেছেন আর হয়ত সেখান থেকেই প্রকৃত কবিতায় চলে গেছেন ছবির মাধ্যমে !

আমার কিছু কিছু ছন্দ ব্যবহার আসলে তেমন গুরুত্ব রাখে না আমার কাজে তবু কখনো রক্তের উল্লাসজনিত কারণেই হয়ত, কখনো ছন্দে লিখেছি এতে কিছু কমেডি করা যায়, ব্যঙ্গ করা যায়, আবার ইমোশনালি পাঠককে অ্যাটাক করাও যায় ছন্দ যতই মহৎ হোক এটা তো পাঠককে সুড়সুড়ি দেয়া মাত্র ! আমি লিখেছি প্রচলিত তিনটি ছন্দ ছাড়াও, মন্দাক্রান্তা আর তোটক- ব্যাপারটা অনেকটাই মূলত বিষয়নির্ভর পাঠক যেদিন বর্তমান (সমসাময়িক) কাব্যচেতনার ( যা নিয়ত পরিবর্তনশীল) বোধে জেগে উঠবে, তখন ছন্দকেও তার এক্সট্রা বিষয় বলে মনে হবে কাব্যচেতনায় বা বোধে ছন্দের কোনো ডিউটি নেই তবে আনন্দ বা প্রতিবাদকে ছন্দ উসকে দেয়, একথা ঠিক

আর একটা কাজও হয় ছন্দে লিখতে লিখতে সহসা পাঠককে ছন্দহীনতার অথৈ সমুদ্রে ফেলে দেয়াও যায় একই রচনায় তালফেরতা গানের মতো এটা দীর্ঘ কবিতার খুব কাজে লাগে কবির অভিব্যক্তিকে প্রকাশ করার জন্য ছন্দ জানি মোটামুটি, তবে ব্যবহার করি কম তাই ব্যবহার করুক বা না-করুক, ছন্দ সকলেরই আয়ত্তে থাকা দরকার

 

সেলিম মুস্তাফার “ছোরার বদলে একদিন” কাব্যগ্রন্থের প্রতিটি কবিতার নির্বাচন এত নিখুঁত হয়েছে, যা অন্য আর কোনো কাব্যে দেখিনি । এর একটা অন্যতম কারণ হতে পারে, প্রদীপ চৌধুরীর নির্মম কাটছাঁট । কবিও তখন কাঞ্চনপুরের আবহাওয়ায় তারুণ্যে টগবগ করছিলেন । সাথে সাথী হিসেবে পেয়েছিলেন কবি সত্যেন্দ্র দেবনাথ, সহকর্মী দেবব্রত দেব, সুদীপ মজুমদার, স্বপন পাল, ম্যানেজার তপনময় চন্দ এবং শিবেন্দ্র দাশগুপ্তর মতো মননসঙ্গী ।

সেলিম মুস্তাফার মুখেই শুনেছ হোমিওপ্যাথি ডাক্তার সত্যেন্দ্র দেবনাথ তার ছোট্ট দোকানের পেছন ছেড়ে দিয়েছিলেন তাদের কবিতার আড্ডার জন্য । তাঁর সহযোগিতা সেলিম মুস্তাফা বারবার কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্বীকার করেছেন । কবি হিসেবেও সেলিম মুস্তাফা পেয়েছিলেন কাঞ্চনপুরের অভিনব প্রকৃতি । দেও নদীর ছোঁয়া । যা তার কবি মনকে নিশ্চয়ই বারবার উসকে দিয়েছিল কবিতার দিকে ।

 

“এক এক করে আমি সমস্ত সত্যকেই ছেঁড়া কাগজের ঝুড়িতে

                                                                উড়ে যেতে দেখলাম

এখন চতুর্দিকে এক হিম-অন্ধকার;  

এখানে প্রত্যয় নেই

প্রণামের ভঙ্গি করে হাঁটু পেতে দুঃখ-পাওয়া আছে ”

(আনহাইজিনিক)

 

সত্য পাল্টায় । পঞ্চাশ বছর আগের সত্য, পরিস্থিতি অনুযায়ী  পঞ্চাশ বছর পর পাল্টাতেও পারে । এটাই জীবনের সত্য । আমরা বড় হতে হতে, অভিজ্ঞতার নিরিখে এভাবেই নিজেদের জানা সত্যকে পুনর্মূল্যায়ন করে থাকি । কবি একই কবিতায় লিখছেন“আমি দেখি / আমার বরাদ্দ আহার এবং ঘুম / একজন ঘুমন্ত পিয়ন ভুল ঠিকানায় বিলি করে দেয় ।” (আনহাইজিনিক) এই কবিতায় কবি একটু পরীক্ষা-নিরীক্ষারও চেষ্টা করেছিলেন ।  বিষয়কে একটা ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার চেষ্টা করেছেন । এই বৈশিষ্ট্য অবশ্য সেলিম মুস্তাফার শুরু থেকেই ছিল । প্রদীপ চৌধুরীর সাথে দেখা হওয়ার আগে থেকেই ছিল । প্রদীপ চৌধুরীর সাথে মেলামেশার পর তা আরও সুচারু হয়েছে বলা যায়

আমাকে যারা নিয়ন্ত্রণ করতে চাও

একথা অভ্রান্ত আমি তোমাদের নই, যে অপরাধ

আমি প্রতিদিন করি, সে আমাকেই

আন্দোলিত করে সবচেয়ে বেশি, যে নিঃশ্বাস

আমি এইমাত্র নিলাম, সে তো আমার-ই

জীবনের নাম ।

যে গহ্বর অন্ধকার জেনে আমি নিশ্চিত ছিলাম আজ

তারই অদ্ভুত আলো আমাকে উন্মাদ করে, আমার

আকাশ আর যৌনতা তছনছ করে শিয়র

ভর্তি হয়ে এক মেয়েমানুষ জাগে, তার খোঁপায়

ফুল নেই, শুধু গন্ধ আছে

 

আমি ভালোবাসা করি ।”             (ছোরার বদলে একদিন)

 

        “যে গহ্বর অন্ধকার জেনে আমি নিশ্চিত ছিলাম আজ / তারই অদ্ভুত আলো আমাকে উন্মাদ করে” কী চমৎকার ব্যবহার । কবি খুব সুন্দর করে ধাপে ধাপে এগিয়েছেন তার গন্তব্যের দিকে । যৌনতার শব্দের ভিতর দিয়ে এগিয়ে গিয়ে, যৌনতাকেই পাশ কাটিয়ে গিয়ে কবি উচ্চারণ করলেন“তার খোঁপায় ফুল নেই, শুধু গন্ধ আছে/ আমি ভালোবাসা করি ।” এখানে “ ভালোবাসা করি” কি রকম ছন্দপতন করে দেবার মতো একটি শব্দ । কিন্তু কবির ব্যবহারের মুন্সিয়ানায় এই লাইনটা যেন চিরকালের হয়ে গেলকবি দাঁড়িয়ে গেলেন দাঁড়ি টেনে । কিন্তু পাঠক থামতে পারলেন না । যৌনতাকে তছনছ করে ঢুকে গেলেন ভালোবাসার গভীর অন্ধকারে ।

সেলিম মুস্তাফার ক্ষেত্রে যৌনতার খুব প্রখর ব্যবহার আমরা কিন্তু দেখতে পাই না “যৌনতাকে আপনি কিভাবে দেখেন বা ব্যবহার করে থাকেন কবিতায় ?”  এই সম্পর্কে কবিকে এক আড্ডায় জিজ্ঞেস করেছিলাম । উত্তর বলেছিলেনযৌনতা ছাড়া জীবনের কোন মানে আমি এখনো বুঝিনি যৌনতা হঠাৎ যদি উদয় হয়, সেটা হয়তো পাশবিক, প্রেমহীন আমার যৌনতা কিছুটা শোকাশ্রয়ীও বটে, হয়তো আমরা দার্শনিক নই, তাই সঠিক বলতে পারছি না নারী আমার কাছে প্রকৃতি কূল নেই কিনারা নেই এখানে শুধুই নিবেদন

 

“যদি পার, তবে আরো অন্ধকার দাও, তোমাদের

অন্ধকার আমি চিনি, তোমাদের ভালোবাসা

বেলি যুঁই চামেলি থেকে যূথিকার ঘর পর্যন্ত

তোমাদের জ্যোতি আজ ছড়িয়ে পড়েছে তোমাদের

গোপন অসুখ !”

 

এখানে কবি আকারে-ইঙ্গিতে অনেক কিছুই বলতে চাইছেন ।  এখানে বেলি, যুঁই, চামেলি থেকে যূথিকা এরা কারা ? ফুলের নাম ! নিশ্চয়ই না । আসলে, এখানে ফুল নয়, ফুলের মতো মেয়েগুলোর কথা বলছেন কবি । আর “তোমাদের জ্যোতি” মানে কি বলতে চাইছেন কবি ? এই কি সেই “জ্যোতি” যা থেকে গোপন অসুখ ছড়ালোবেলি, যুঁই, চামেলির মধ্যে ! অবৈধ মিলনের জ্যোতি, তাদের জীবনে নিয়ে এলো অন্ধকার । যে অন্ধকার ভালোবাসাহীন । এখানে আমি আর তুমি-র দ্বন্দ্বপ্রকৃত ভালোবাসা আর ভালোবাসাহীনতার দ্বন্দ্ব । দেহ অতিক্রম করে, যৌনতাকে তছনছ যেখানে ভালোবাসা প্রতিষ্ঠিত হয়, তার ঠিক বিপরীতেই অন্ধকারের অবস্থান । তাকেই কবি “গোপন অসুখ” বলছেন । তারপরই কবি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছেন । নিজের অস্তিত্বকে জানান দিচ্ছেন, অনেকটা এভাবেই

 

“আমি এই রকম

আমার জীবন এই রকম

সত্য এই রকম

                                ফুল নয়, সমস্ত ফুলের ।

ছোরা নয়

ছোরার বদলে একদিন সব ফুল নড়ে উঠবে

আকাশ ভেঙে নেমে আসবে বৃষ্টি, আমি

পাহাড়চূড়ায় দাঁড়িয়ে দেখব ভালোবাসার গল্পের মত

নদী ছড়িয়ে পড়ছে গভীর ক্ষুধায় ।      (ছোরার বদলে একদিন)

 

কবি সেইদিনের অপেক্ষায় আশাবাদী, একদিন দেখবেন“ভালোবাসার গল্পের মত / নদী ছড়িয়ে পড়ছে গভীর ক্ষুধায় ।” কবি চিত্রকল্পে ধরা পড়ে পাহাড়ি ত্রিপুরার কথা । নদীর কথা !  ছোরার বদলে একদিন নিশ্চয়ই সব ফুল হয়ে নড়ে উঠবে । যেহেতু, জীবন মানেই এইরকম । জীবন মানেই পজিটিভ ।

 

কবি সেলিম মুস্তাফা ত্রিপুরার কবিতা জগতে একটা ভিন্ন মেজাজের নাম । সত্তর-দশক ছিল তীব্র এক পালা বদলের দশক । পঞ্চাশ-ষাট দশকের চিন্তাধারা ভেঙে চুরমার হয়ে যায় । তাদের মেজাজের সাথে, ধ্যান-ধারণা থেকে বেরিয়ে আসার তীব্র এক তাড়না অনুভব করে সত্তর-দশক । কবিতায় শুরু নতুন নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা । তার ছোঁয়া এসে লাগে ত্রিপুরায়ও । তখন কবিতার জগতে পরিচিত মুখ যারা ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতমরা ছিলেন – নকুল রায়, রাতুল দেববর্মণ, দিব্যন্দু নাগ, দিলীপ দাস, সন্তোষ রায়, কিশোর রঞ্জন দে, হিমাদ্রি দেব, রামেশ্বর ভট্টাচার্য, সমরজিৎ সিনহা, কল্যাণ গুপ্ত , সনজিৎ বণিক, অসীম দত্ত রায়, কৃত্তিবাস চক্রবর্তী, শুভেশ চোধুরী এবং নিঃসন্দেহে সেলিম মুস্তাফাসহ আরও অনেকে

সত্তর-দশকে কবিদের মধ্যে নানা কারণেই আমার সেলিম মুস্তাফাকে ব্যতিক্রম মনে হয়েছে । নকুল রায়, দিব্যন্দু নাগ,  দিলীপ দাস, সন্তোষ রায়,  কিশোর রঞ্জন দে,  সমরজিৎ সিনহা প্রমুখরা নিজেদের মতো ভাষা নির্মাণের চেষ্টা করে গেছেন । অন্যদের তুলনায় সেলিম মুস্তাফা তার কবিতায় অন্যদের থেকে ভিন্ন মত পোষণ করতেন । হাংরি আন্দোলনের সাথেও নিজেকে যুক্ত করে রাখার চেষ্টা করেছেন ।

সে সময় “গ্রুপ সেঞ্চুরী”-ও নানাভাবে তাদের সাহিত্য-কর্মধারা চালিয়ে যাচ্ছিল । কিন্তু “ গ্রুপ সেঞ্চুরী”-কে আমি কখনও সাহিত্য আন্দোলন বলবো না । কেননা তাদের কর্মতৎপরতা ছিল সাহিত্য নিয়ে, এবং ত্রিপুরার সাহিত্যে খুব বড় ভূমিকা নিয়েছেন তারা । কবিতার বই, লিটিল ম্যাগাজিন, ফোল্ডার প্রকাশ, নাটক, ছবি, বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে মাতিয়ে ছিল গ্রুপ  সেঞ্চুরীর তৎপরতা । কিন্তু তারপরও কোনভাবেই সেটাকে আন্দোলন বলা যায় না আমি অন্তত ব্যক্তিগতভাবে তাই মনে করি । আন্দোলনের একটা নির্দিষ্ট মেনিফেস্টো বা ইশতাহার থাকা জরুরি । সেই অর্থে গ্রুপ সেঞ্চুরীর সেরকম কিছু ছিল না

কিন্তু হাংরিদের সেটা ছিল । যদিও হাংরি আন্দোলন ত্রিপুরায় খুব একটা ভূমিকা নিতে পারেনি । তবে একটা উন্মাদনা তৈরি করতে পেরেছিল । প্রদীপ চৌধুরীর ভূমিকা এই ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল । তিনি  “স্বকাল/ফু:” তিন-চার সংখ্যা ত্রিপুরা থেকে বের করেছিলেন “গেরিলা” “অনার্য “ঢিল” “চিদাত্মা” “গান্ডীব” “ক্ষুধার্ত সময়” প্রমুখ কবিতাপত্রগুলো হাংরি আন্দোলন দ্বারা প্রভাবিত ছিল  

অন্যদিকে ত্রিপুরার সাহিত্য পরিমণ্ডল তখন উন্মাদনায় তৎপর । একে একে বের হচ্ছিল “পৌণমী” “তাতার” “হাল” “আলোকবর্ষ” “ওডিকোলন” “রানার” “দ্যুতি” “সমকাল” “পূর্বমেঘ” “শব্দস্নান” “ব্রততী” “এখন বাল্মিকী” “জ্বালা” “ধ্বনিপ্রান্তর” “শাব্দিক” “স্পন্দন” “স্ফুরণ” “এবং মানুষ” “সৈকত” “কবিতার মুহূর্ত” “প্রতিলিপি” “বহুরূপী” “সাঁকো” “সংশপ্তক” “খেয়াল” এমন আরও ।

এর থেকে সহজেই বোঝা যাচ্ছে সত্তর-দশক কী রকম সাহিত্যে তৎপর ছিল ।  বাংলাদেশের যুদ্ধ, আগত শরণার্থীদের দুঃখ-কষ্ট, অসহায় কান্না, অন্যদিকে বামপন্থার রাজনৈতিক উত্থান, আবার পরবর্তীতে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের উগ্র তৎপরতা, সব মিলিয়ে সময়টা ছিল ঘটনাবহুল সেই সব তৎপরতা থেকে ত্রিপুরায় অনেক কবি সাহিত্যিক উঠে এসেছেন । সেলিম মুস্তাফাও তারই অংশ । যদিও তিনি নিজেকে কখনই হাংরি বলেননি । বলেছেন “আমি হাংরি হতে পারিনি।” কিন্তু এর প্রভাবকে কোন সময়ই তিনি অস্বীকার করেননি । আমি বরং বলতে পারি, তিনি হাংরি ভাবনা থেকে যা নেয়ার তাই নিয়েছেন অকৃপণভাবে । এবং কাজে লাগিয়েছেন, তার মতো করে । এজন্যই তার কবিতায় একটা স্বতন্ত্র ছাপ পড়েছে । তার কবিতায় এটা স্পষ্টতই ধরা পড়ে ।

 

“ভালোবাসা খুঁজে বেড়াচ্ছে পরিত্রাণ, অন্ধকারে আমি

খুঁজে বেড়াচ্ছি আমার অলৌকিক মেয়েমানুষ, পুলিশ

আমাকে বলে, বাঁ-দিকে হাঁটুন;

 

এক ভয়ের সাম্রাজ্যে আমি ঢুকে পড়েছি, আমার

আচরণ শীতার্ত, শীতের ভয়ে আমি ঢেকে রেখেছি

যাবতীয় অসুখগুলি, আমার গোপন জায়গাগুলি আর

কিছুতেই দেখি না, মানুষের ভালোবাসার ভয়ংকর দ্যুতি

শামুকের মতো ঘিরে আসছে আমার অন্ধকার ঘোচাতে”

(ঈশ্বর নেমে আসুক )    

 

সেলিম মুস্তাফাকে একবার প্রশ্ন করেছিলাম“আপনার কবিতায় একটি স্বতঃস্ফূর্ত ব্যাপার থাকে । অঙ্ককষা কোনো মনোভাব থাকে না । প্রথমে মানসিক একটা ঝোঁক থেকে লেখা শুরু করেন, তারপর কবিতা তার নিয়মেই চলে । পড়ার সময় এভাবেই মনে হয় । কিন্তু কয়েকবার পড়ার পর মনে হয়, বিষয়টা বোধ হয় এই রকম না । আপনি কবিতা লেখার সময় ভীষণ রকম সিরিয়াসই থাকেন । আসলে, আমি আপনার কাছ থেকে এই বিষয়ে কিছু শুনতে চাই ! আপনি বিষয়টাকে কীভাবে বলতে চাইবেন ?”  

        উত্তরে তিনি বললেনঠিকই ধরেছো আমি বেশ সিরিয়াস থাকি যাতে আমার তরফে কোনো ত্রুটি না-থাকে, যা নিজেকেই ফাঁকিবাজ মনে না-হয় পরে যা যখন সত্য বলে বিশ্বাস করি, তাই যাতে বলতে পারি আমি আমার অভিজ্ঞতার বাইরে খুব একটা যাই না, বা যেতে পারি না লেখা যাতে কবিতার পোজ (Pose) বা ভান না-হয়ে দাঁড়ায় এমন ভেবেই লিখি ব্যঙ্গ বা শুধু মজা করার জন্য লিখতে ইচ্ছে করে না সন্তোষ রায় আমার এই সিরিয়াস থাকার ব্যাপারটা নিয়ে বলেছিলেন যেম সিরিয়াস নয়, সিন্সিয়ার থাকা জরুরি কথা হলো সিন্সিয়ার না-হলে তো কেউ লিখবেই না যা লিখবে সিন্সিয়ারিটি নিয়েই লিখবে কিন্তু যা লিখবে তা কি সিরিয়াস ? অন্যকে কিছু ভাবাবে ? যদি না ভাবায়, তবুও হবে লেখা, কিন্তু সেটা কেবলই নিজের জন্য কিন্তু আমরা মুখে এসব বললেও কবিতা শুধুই নিজের জন্য নয় এটা মানুষের ধর্ম যে অন্যকেও পড়াতে, জানাতে চায় ব্যথা হোক বা দুঃখ হোক বা সুখই হোক, মানুষ শেয়ার করতে চায়, আর সেটা শুধু বাহাদুরি পাবার জন্য নয় আর কাজ সিরিয়াস না-হলে সম্ভব নয়

 

তাঁর উপরের কথাগুলোর প্রভাব দেখতে পাই তার কবিতায়“ঈশ্বর নেমে আসুক” কবিতায় কবির ভয় একসময় পাঠককেও আক্রমণ করে বসে । কবি এই কবিতায় নিজেই নিজেকে বারবার আঘাত করছেন । নিজেকেই দেখতে চাইছেন যেন, নিজের কবিতায় । নিজের আয়নায় । সেলিম মুস্তাফার কবিতা তাই মুখোশহীন কবিতায় তাঁর প্রতিটি উচ্চারণই জীবন থেকে নেয়া । তার দেখা মেয়েমানুষ, স্বৈরিণী, পতিতা, নষ্ট ফুল, এরকম অজস্র চিত্রকল্প তার কবিতায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে । মানবিকভাবে উঠে এসেছে

 

“দেও নদী ভেঙে নিয়ে নিয়ে গেছে, কোন দুঃখ নেই আমার,… …

তারা কোথায়, যারা ভালোবাসা করবে বলে

ঘৃণা করে উঠে গিয়েছিল ?

আশ্রয় নাই,

পাহাড়ি মেয়ের উদোম শরীরে

ঝাঁপিয়ে পড়েছে মানুষের সহোদর । ” (ঈশ্বর নেমে আসুক)

 

কাঞ্চনপুর থাকার সময়ের এইসব কবিতা । আগেও বলেছি, তিনি তাঁর কবিতায় কাঞ্চনপুরের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েছিলেন ভরপুরভাবে । দেও নদীর চঞ্চলতা অনুভব করেছেন শরীর দিয়ে । বর্ষায় তার ভয়ংকর রূপ দেখেছেন । মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখেছেন তার ছুটে যাওয়া, শীতে হতাশ ভঙ্গিতে দেখেছেন তার শুকিয়ে যাওয়া ! কবি তাঁর স্মৃতিচারণে আমাকে বলেছেন“তখন নদীর উপর পাকা সেতু ছিল না । শীতের দিনে হেঁটে যেতাম দেও নদীর মাঝ দিয়ে, সে-কি আনন্দ মাতালের মতো সারাদিন রাত কবিতা নিয়ে পড়ে থাকতাম । লিখতাম । যা সামনে দেখেছি, তা-ই লিখে গেছি । দেখেছি মেয়েমানুষের খোঁজে গেছে এক বন্ধু, আরেক বন্ধু যেতো না সে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতো বন্ধুর আসার অপেক্ষায় । আমি তাই লিখেছি আমার কবিতায় । আসলে, জীবনটাই তখন হয়ে উঠেছিল কবিতাময় । যাই দেখেছি, তাই মনে হয়েছে কবিতার বিষয় ।”

আমিও আবেগের মুহূর্তে আরেকটা প্রশ্ন করে ফেললাম“সেদিনের সেলিম মুস্তাফার সাথে আজকের সেলিম মুস্তাফার তফাৎ কতটা ?”

বললেন“অনেক তফাৎ ! সেদিন অবিবাহিত ছিলাম । পিছুটান বলতে যা বোঝায়, তা ছিল না । অভিভাবক বলতে যা বোঝায়, তাও ছিল না । নতুন চাকরি । নতুন উদ্যোগ । ‘কুছপরোয়া নেহি’ একটা ভাব । তাই তখনকার শব্দ ব্যবহার ভাষা প্রয়োগ, বিষয় নির্বাচন, সবই ছিল অবাধ । সাহসী । তুলনায় এখন আমি অনেক বেশি শব্দ সচেতন । অনেক কম্প্রোমাইজ করি শব্দের সাথে । ভাবের সাথে । চিত্রকল্প নির্বাচনের সময়েকবিতায় কিছুটা রক্ষণাত্মক । শব্দেও হয়ে পড়েছি হিসেবি ।

কবির এই সরল স্বীকারোক্তি কবি সম্পর্কে অনেক কিছুরই মানে বলে দেয় । কবিকে বুঝতে সুবিধে করে দেয় ।

 

“বাতাসে মদের গন্ধ কেবলমাত্র ভাটিখানা জেগে আছে

আমি কোন উত্তরণ বুঝি না আর

কোন অধঃপতন বুঝি না

আজ সন্ধ্যে থেকে মদ খেয়েও কোন নেশা হয়নি

আমার যৌনতা আমি খোলা আকাশের নীচে ছড়িয়ে দেব

আমি জন্মের ভেতর ঢুকিয়ে দেব হাত”     

( ঈশ্বর নেমে আসুক )

 

নীরব শব্দে কবি ঢুকে পড়েন মানুষ আর মেয়েমানুষের ভিতরে । কবি একবার জীবন পেরিয়ে হতাশার দিকে, আবার হতাশা পেরিয়ে জীবনের দিকে ফিরে আসছেন । আজ কবির মদ খেয়েও কেন নেশা হচ্ছে না ? এখন আমার আবার এই কবিতার উপরের আরেক লাইন মনে পড়ে গেল, যেখানে কবি লিখেছেন“এক ভয়ের সাম্রাজ্যে আমি ঢুকে পড়েছি ।”  কবি আজ যৌনতার বদলে জন্মের ভিতরেই ঢুকিয়ে দিতে চাইছেন হাত । কোন উত্তরণ আর কবি বুঝতে পারছেন না । আবার কোন অধঃপতনও বুঝতে পারছেন না । কবি দ্বিধান্বিত । জীবন বোধ হয় তাই । কবি জীবনের এ-পিঠ ও-পিঠ দুই দিক থেকেই দেখতে চান । দাম্পত্যের ভিতরে উঁকি দিয়ে দেখে নেন

 

“মানুষ আর মেয়েমানুষ কোথাও অন্ধকারে

শোকহীন সহবাসে মেতে উঠেছে

 

আচ্ছা, এখানে কবি মিলনে “শোকহীন” শব্দটি ব্যবহার করলেন কেন ? শোক না থাকলে  “শোকহীন” শব্দ কেন আনলেন কবি ?  আসলে, এটাই হচ্ছে শব্দের প্রয়োগকৌশলের বৈশিষ্ট্য কবির মূল শক্তি আসলে কবির শব্দের প্রয়োগগত কৌশলের উপরই । এই বৈশিষ্ট্যের জন্যই তো আমরা মূলত কবিকে ভালোবাসি । নাহলে, কবির কাছে তো আমরা সমাজনীতি, রাজনীতি, বা দর্শক পাঠ শিখতে আসি না কবির অনুভবের জন্যই কবির কাছে আসি । কবির অনুভব পাঠককে তাঁর কাছে আনে কিংবা দূরে সরায় । আমি অনুভবের ভিতর দিয়েই কবির সাথে জড়াই । তাকে ভালোবাসি । তাকে মননে ধারণ করি ।   

  

কবির পরবর্তী কবিতাগুলো পড়ার আগে কিছুটা তাঁর কবিতা সম্পর্কে ভাবনার আলোকপাত জেনে নিলে মন্দ হয় না । তিনি আগেই বলেছেন, প্রদীপ চৌধুরীর সাথে কাটানো মুহূর্তে তারা অনবরত কবিতা নিয়েই কথা বলতেন । কবিতার মননেই থাকতেন তাঁরাপ্রদীপ চৌধুরীও তাঁর এক লেখায় উল্লেখ করেন

“সেলিমকে জানি প্রায় দেড় দশক ধরে, বলা যেতে পারে ওর প্রথম যৌবন থেকে । খ্যাতি–অখ্যাতির চূড়ান্ত আবর্তে আমার গোটা অস্তিত্ব যখন কবিতা ও চলন্ত আগুনের শিখার উপরে দগ্ধ ও ভাসমান একের পর এক আমি ছুটে চলেছি শহর থেকে বন্দীদশায়, কারাগার থেকে বিদ্যালয় চত্বরে বিবাহ ও বিছিন্নতার মধ্যে তাড়িত হচ্ছি ঠিক তখনই রোমান্টিক সিনেমার সেটের মত এক ছোট্ট উপত্যকাঘেরা শহরে সেলিমের সাথে আমার প্রথম দেখা । নামহীন বিনিময় ও বন্ধুতা ... বনপথ পেরিয়ে সাইকেল চেপে সে শহরে আসে আবার অন্ধকার বনের পথ ধরে সে কোথায় মিলিয়ে যায় । জঙ্গলের সঙ্গে তার নাড়ীর যোগাযোগ । তারপর একদিন তার বিশেষ জীবন যাপনের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে, উঠোনের একপাশে গজিয়ে ওঠা ঝোপ থেকে মন্দির চূড়ার মত উঁচু আখ কেটে খাওয়া হয় । পাহাড়ের পথ পেরিয়ে ধানখেতের আল ধরে হাজার মাইল হাঁটা হয়, ওদের “সোনিক অর্কষ্ট্রা”-য় ওর সঙ্গীত ও কবিতা পাগল বন্ধু আর সেলিমের সঙ্গীতপ্রীতির সঙ্গে পরিচয় হয়, আর মাঝে মাঝে কবিতার কথা হয় ।

এক মহাসন্ধ্যায় জানতে পারি কী করে তার বেহালাবাদক দাদাকে আততায়ীরা ছোরার আঘাতে এই অসম্পূর্ণ পৃথিবী থেকে চলে যেতে হয় । হয়ত তাই তার ২য় কবিতার বইয়ের নাম “ছোরার বদলে একদিন” মধ্যবিত্ত ও কর্মচারীদের প্রথাসিদ্ধ পদ্যে এসব মহাজীবনের স্থান নেই । ওদের লেখার ধারণা দিয়ে সেলিমের কবিতাকে বোঝার চেষ্টা করেও তাই কোন লাভ নেই । কারণ একজন কবির কাছে ঘটনা নিছকই ঘটনা নয় । যে অন্ধশক্তি (প্রকৃতি, মানুষের অন্তর্গত প্রকৃতি) এইসব ঘটনাকে নিয়ন্ত্রণ করে, একই সঙ্গে শব্দের ভুল এবং নির্ভুল ব্যবহারে কবি এই শক্তির বিপরীতে দাঁড়িয়ে মানুষী সম্পর্কগুলিকে বোঝার ও স্পষ্ট করে তোলার চেষ্টা করেন । কবিতা ঐ বোঝার কাজে তাকে সাহায্য করে । তাই একসময় রক্তমাংসের চোখ দ্রষ্টার দৃষ্টিতে উন্নীত হয় । সকলের মাঝে থেকেও কবি তখন এক স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বে পরিণত হন । আর তখনই উপত্যকা শহরের রুদ্ধ ঘরে প্রজ্বলিত মোমের আলোর চারপাশে গোল হয়ে বসা কবিতার “সাপ্তাহিক আসর ” থেকে নিঃশব্দে পিছলে পড়তে হয় তাকে । লক্ষ পাঠকের কবি হয়েও সেই বিশেষ মুহূর্তে কবি একা । বিপজ্জনকভাবে একা । আর একা যে, “সম্প্রদায়তো তাকেই চিহ্নিত করবে প্রথম !  কিন্তু সেলিমের কবি-ব্যক্তিত্ব এমনই যে, তাকে কেউ সন্দেহ অব্দি করার প্রবণতা বোধ করে না হয়তো করে, কিন্তু তার রহস্যময় ভাষা তাকে ব্যূহ থেকে বের করে আনে ।” (আলোচনা : যেদিন সব সাইরেন একসঙ্গে বেজে উঠবে : প্রদীপ চৌধুরী )

 

প্রদীপ চৌধুরীর এই মূল্যায়ন, কবির এক চরম প্রাপ্তি । দু-জনের রসায়ন সহজেই টের পাওয়া যায় উপরের লেখা থেকে । কীভাবে তাদের বন্ধুত্ব ছিল । বোঝাপড়া ছিল ।  

প্রদীপ চৌধুরী কবিতা নিয়ে যা বিশ্বাস করতেন, মূলত তাই ছিল তাদের মধ্যে আলচনার বিষয়সেই আলোচনা কী কী হতে পারে, তার একটা ধারণা  করা যেতেই পারে । প্রদীপ চৌধুরী তাঁর “কবিতা ধর্ম” বইয়ে কবিতা নিয়ে তাঁর ভাবনা পরিষ্কার করেছেন । তার উল্লেখযোগ্য কিছু কথা  এখানে আমি উল্লেখ করছি । তাতে তিনি যা বলেছেন, আমার ধারণা তা-ই তাদের আলোচনার বিষয় ছিল আমি আমার পছন্দ মতো কয়েকটি উক্তি উল্লেখ করছি । আমার ধারণা তাদের কবিতা বা সাহিত্য বিষয়ক আলোচনা এর মধ্যেই চলাফেরা করেছিল । দেখা যাক, কী কী ধারণা করেছি আমি 

১।  কবিতাই মানুষের নির্বাণ ও পরমপুরুষার্থ । কবিতাই সবচেয়ে নিজস্ব, কারণ, মানুষ নিজেই এক রচয়িতা । যে কোন আধুনিক কবির কাছে কবিতাই মানুষের শেষ ধর্ম । পৃথিবী- সময়-কবিতা-পাঠক এবং রুচি অভিন্ন ও অবিভাজ্য ।

২। মেকী সভ্যতা ও কৃত্রিম শিক্ষার দিকে মানুষের ঝোঁক বাহ্যিক ভেতরের দিক থেকে মানুষ সব সময়ই চাপিয়ে দেয়া শিক্ষার জামা খুলে ফেলে কবিতার স্বাধীন জীবনে ফেরার জন্য উন্মুখ । অনুভূতির জীবনদেবতার কাছে নিজেকে নিজের মতো ফিরে পাওয়ার জন্যে ছটফট করছে সে । 

৩। কবিতায় দুর্বোধ্য’’ বা “অশ্লীল শব্দ বলে কিছু নেই । দুর্বোধ্যতার  অভিযোগ করে তারাই, কবিতার সামগ্রিক প্রভাব থেকে শব্দকে যারা আলাদা করে দেখে যারা গোটা জীবন থেকে আলাদা করে দেখে জীবনের বিশেষ কোন ঘটনা, শরীর থেকে আলাদা করে, শরীরের বিশেষ কোন অংশ, “আত্মা” থেকে বিচ্ছিন্ন করে, মরণশীল দেহ ।

৪। “সকলেই কবি নয়” এর মতো সকলেই পাঠক নয়, কেউ কেউ পাঠক । কেউ কেউ যারা পাঠক এবং কেউ কেউ যারা কবি, তাদের কাছে “দুর্বোধ্য কবিতা” জিনিসটাই সবচেয়ে বেশি দুর্বোধ্য । পাঠক যদি একবার কবিতার ইন্দ্রজালের মধ্যে ঢুকে পড়েন তাহলে সেই আবেষ্টনীতে সবকিছুই তার কাছে অর্থপূর্ণ । যা অর্থপূর্ণ নয়, সুতরাং কবিতা নয়, তা তিনি নিঃশব্দে লাথি মেরে ফেলে দেন ।

৫। একজন প্রকৃত পাঠক তার প্রিয় কবির কাছে যা আশা করেন তা নয় ব্যবহারিক কোন সমস্যার সমাধান । শ্লীল অশ্লীল, সুন্দর কুৎসিত, সুবোধ্য-দুর্বোধ্য এ ধরনের কোন নৈতিক বা আধ্যাত্মিক প্রশ্নের কোন প্রত্যক্ষ উত্তর নয়, ভাল ভাল মুখোরোচক শব্দও নিশ্চয়ই চান না পাঠক । পাঠক চান জীবন সম্পর্কে কবির বিশেষ চেতনা, কবি যেভাবে জীবনকে interpret করেছেন পাঠক নিজের interpretation–এর সঙ্গে সেটাকে মিলিয়ে নিতে চান । সামগ্রিকভাবে জীবনই উভয়ের একমাত্র বিষয়বস্তু ।

৬। একমাত্র লেখক-কবিদের হাতেই ভাষা শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণ করে । কবিদের  কাছে ভাষা স্বীকারোক্তি করে এবং মানুষের যাবতীয় কনফেশন জাষ্টিফাই করে পৃথিবীতে মানুষের অতি সামান্য অস্তিত্বকে শতাব্দীব্যাপী প্রসারিত করে দেয় ।

সাহিত্য জিনিষটাকেই এক অর্থে “জীবনচরিত” বলা যায় । বাসুদেব দাশগুপ্তের গোপন জীবন যাঁদের কাছে অজানা, দেবতাদের কয়েক মিনিট বা রতনপুরের, বমন রহস্যের কিছু অংশ তাঁরা বুঝতে পারবেন না । টিকিটহীন সুভাষ ঘোষকে একদিনও যাঁরা  রাত একটায় বরানগর রেল প্ল্যাটফর্মে দেখেননি তাঁরা কি করে সুভাষের অসাধারণ ভাষা ও তাঁর লেখার পারস্পর্যহীনতাসূত্র  বুঝতে পারবেন ? ... যে কোন প্রকৃত লেখকই স্বয়ংসম্পূর্ণ ।

৮। লেখকের সংস্কারহীনতা ও সততার পাশাপাশি পাঠকের সংস্কারহীনতা ও সততা কাজ করলেই সাহিত্য ও সংস্কৃতি অভিন্ন হতে পারবে লেখক-পাঠক-সাহিত্য-সংস্কৃতি ।

৯। “কবিতা কি ?”  কোন্ সত্যযুগ থেকে কবিতার স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে, বাংলাদেশ- ভারতবর্ষ-পৃথিবীর শাস্ত্রকার ও আলংকারিকরা আরিস্টটল, হোরেস, আনন্দবর্দ্ধন অভিনবগুপ্ত এঁরা সব, কখনো বুঝে কখনো বা না বুঝে ( তা নইলে একের মতবাদ অপরে খণ্ডন করেন কেন, কিসের মতবাদ, খণ্ডনই বা কিসের ?) প্রচুর বই লিখে গেছেন । ওঁরা কবিতার বিচার করেছেন নানা দিক থেকে, কবিতাচারিত্র্য বোঝার জন্যে এঁরা কবিতার উপর তাবৎ বর্ম নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন বিচার বিশ্লেষণের দ্বারা কবিতাকে ছিন্নভিন্ন করে গেছেন শুধু ...। 

        ১০ । বিশেষ কোন ইজম, বিশেষ থিয়োরি এসব শিক্ষিত ব্যাপারের ভিত্তিতে কবিতা সম্পর্কে চিরাচরিত “ফর্মাল” আলোচনার মতো ক্ষতিকর জিনিস আর কিছু নেই । ... কোন ফর্ম বা মতবাদের মধ্যেই কবিতাকে আবদ্ধ করে রাখা যায় না কবিতা জীবনেরই বিকল্প কবিতা আমাদের ক্ষয়িষ্ণু জীবনের এক প্রাণময় অবস্থা ।

১১। কবিতার ক্ষেত্রে “শ্রেষ্ঠ” বা “নিকৃষ্ট” এধরনের শব্দপ্রয়োগ বিশেষভাবে আপত্তিজনক এবং পাঠকের কাছে বিভ্রান্তিকর । যে কবিতা ব্যক্তিকে যত বেশী সত্য উপলব্ধির দিকে এগিয়ে দেবে সে কবিতা তত বেশী প্রয়োজনীয় ।

১২। আশা, নিরাশাবাদী দুটোর কোনটাই নই আমরা । কোন পরিকল্পনা করে আমরা লিখতে শুরু করি না এমন সময় আসে পরিকল্পনা মাথা ভারী হয়ে গেলেও এক লাইন লেখা হয় না আবার এক মুহূর্তের অতিতুচ্ছ ঘটনা এটমের মতো আমাদের জাগ্রত চেতনাকে অবশ করে ভেতর থেকে টেনে বের করে আনে এমন সব ব্যাপার, যেগুলি লিখে না ফেলা অবধি কিছুতেই পৈশাচিক আত্মপীড়ন, দুরারোগ্য মাথাব্যথা থেকে ত্রাণ পাওয়া যায় না ।

 

উপরের এইসব বিষয় নিয়ে কবি সেলিম মুস্তাফার সাথে প্রদীপ চৌধুরীর আলোচনা হয়েছে । এবং খুব স্বাভাবিকভাবেই কবি এইসব আলোচনার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন । যা পরবর্তীতে তাঁর কবিতায় ছাপ ফেলেছে নিশ্চিতভাবে । কবি সেলিম মুস্তাফাও তা বারবার স্বীকার করেছেন কবিতাকে বোঝার আগে কবির মনোজগৎ বোঝাও অত্যন্ত জরুরি একটা বিষয় । তাহলে, কবির কবিতায় ব্যবহৃত শব্দের, চিত্রকল্পের ইঙ্গিত এবং প্রতীকগুলো আমরা সহজে বুঝতে পারবো । কমিউনিকেট করতে পারবো ।      

 

“বাতাস নড়ে উঠেছে

আমি জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম

প্রবল বৃষ্টির ভেতর জম্পুই পাহাড় আর দেখা যায় না

এখন গভীর রাত্রি হলে বাধা ছিল না

বৃষ্টির পেছনে আরো বৃষ্টি

বাতাসে ঐতিহাসিক মেয়েমানুষের গন্ধ তার

ভৌতিক চুল আমার হৃৎপিণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে ।

পাশের বাড়িতে সাদা অন্তর্বাস

কারা যেন রোদে দিয়েছিল, এখন বৃষ্টিতে ভিজছে,

তাদের শাদা বিষণ্ণতা আমাকে নাভির কুণ্ডে

আক্রমণ করে, আমি টের পাই

মানুষ আর মেয়েমানুষ কোথাও অন্ধকারে

শোকহীন সহবাসে মেতে উঠেছে”

( বাতাস নড়ে উঠেছে )

 

প্রকৃতির ভিতর দিয়ে জীবনকে দেখা । জীবনের সুখ এবং শোক অনুসন্ধান করা ।  মনে পড়ে গেল কবি বলেছিলেনআমার যৌনতা কিছুটা শোকাশ্রয়ীও বটেএখানে কবি দুই ধরনেরই এফেক্ট আনার চেষ্টা করেছেন । একটা চিত্রকর্মকে যেমন ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বহুভাবে দেখা যায়, তেমনি একটি কবিতাকেও একই সময়ে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হয় । সাদা  অন্তর্বাসের ভিতরে কবি শাদা বিষণ্ণতাকে গুঁজে দিলেন ! তার মানে কি এই মিলনের ভিতর কবির তথাকথিত “শোকাশ্রয়ী” মনোভাব ছিল ! একদিকে প্রবল বৃষ্টি, অন্যদিকে জম্পুই পাহাড়, বাতাসে নড়ে উঠছে পর্দা, আবার বাতাসে ঐতিহাসিক মেয়েমানুষের গন্ধ, পাশের বাড়ির ছাদে সাদা অন্তর্বাস, মানুষ আর মেয়েমানুষ কোথাও অন্ধকারে, কবি ক্যানভাসের মতো একে একে চিত্রকল্প এঁকে গেলেন অদ্ভুত কাব্যিক চতুরতায় । একই সাথে একটি কবিতাকে যৌনকাতর এবং শোকাশ্রয়ীও করে তুললেন । প্রদীপ চৌধুরীর ঐ-কথাটা এখানে বলতেই হয়“কবিতায় দুর্বোধ্য বা “অশ্লীলশব্দ বলে কিছু নেই । দুর্বোধ্যতার অভিযোগ করে তারাই, কবিতার সামগ্রিক প্রভাব থেকে শব্দকে যারা আলাদা করে দেখে” আত্মার কাছে মরে গেলেই একটি মেয়েমানুষ আতর মেখে রাস্তায় বের হয়, কিন্তু কবি দেখতে পেলেন এর ভেতরেও জীবনের ছোঁয়া, বৃষ্টির ফোঁটা, বেঁচে থাকার প্রতি তীব্র ইচ্ছাবোধ কবি “বাতাস নড়ে উঠেছে” কবিতায় বাতাস, বৃষ্টি, উদ্দামতার  মিলন পরবর্তী পর্যায়ে প্রকৃতির বিষণ্ণতা আনছেন এইভাবে

 

“যখনই ঘণ্টা বেজেছে কয়েদীরা

পরস্পর পরস্পরের দিকে নিঃশব্দে তাকিয়েছে,

আমাদের সন্তাপহীন ঘুমে সেই আওয়াজ

কোন ঢেউ তোলেনি, শরীরের

বিব্রত আকাশ দিয়ে এক জর্জরিত নদী শুধু

ছুটে বেরিয়ে গেছে এই শহর ছাড়িয়ে

এই শহর ছাড়িয়ে গভীর কোন জঙ্গলের দিকে

 

এই বৃষ্টি আর থামবে না, আমি জানি,

আমি চাই না এই বৃষ্টি এক্ষুণি থেমে যাক,

একটি আতরমাখা মেয়েমানুষ মৃত্যুর মত

আমার ঘরের ভেতর এগিয়ে আসছে এই বৃষ্টির ভেতর”

(বাতাস নড়ে উঠেছে)

 

কবিতাটি পাঠের পর গা-টা সত্যিই কেমন ঝিম করে উঠলো । কবিতাটি এইভাবে টার্ন করবে, ভাবতে পারিনি ! “একটি আতর মাখা মেয়েমানুষ মৃত্যুর মত”এলো, তাও কবির ঘরে ? যেন জর্জরিত এক নদী । শরীরের বিব্রত আকাশ জুড়ে বিষণ্ণতা ! মৃত্যুর মতো আতরমাখা কেবলই এক শরীর, এখন কবির সামনে । কবি এখন বলছেন 

 

“আমি তার জন্য সতের বছর আগেকার লেবুফুল কুড়িয়ে রেখেছি

সে আসবেই, আমি জানি ।”                      

(বাতাস নড়ে উঠেছে)

 

কবিতাটি শেষের আগে আবারও মোচড় দিয়ে গেলেন । এবার পাঠক হিসেবে আপনি ভাবতে থাকুন, এই সতের বছর” আবার কোত্থেকে এলো ? তার সাথে মৃত্যুর মতো আতরমাখা মেয়েমানুষটার কি সম্পর্ক হতে পারে ? নাকি কবি কেবলই একটা চিত্রের স্কেচ করে গেছেন মুহূর্তের ? এর আগে কবি বলেছেন“বাতাসে ঐতিহাসিক মেয়েমানুষের গন্ধ”এখানে  “ঐতিহাসিক” বললেন কেন ? আবার একটানে কবিতাটি পড়লে, একটা কোলাজ ফর্ম তৈরি হবে, আসলে কবিতাটি সেই কোলাজ ফর্মের ভিতরেই লুকিয়ে আছে । যা শুধু অনুভবেই ধরা দেবে । যেখানে প্রদীপ চৌধুরী বলেছেন “কবিতা জীবনেরই বিকল্প কবিতা আমাদের ক্ষয়িষ্ণু জীবনের এক প্রাণময় অবস্থা ।”

 

একবার হাংরি জেনারেশনের প্রাণবন্ত পুরুষ, গদ্যকার সুভাষ ঘোষকে “বাঘের বাচ্চা-৩, বইমেলা ২০১৭, সংখ্যায় প্রকাশিত একটা ইন্টার্ভিউতে প্রশ্ন করা হয়েছিল“আপনারা আপনাদের দার্শনিক ভিত্তি তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেছেন । এই দার্শনিক ভিত্তিটা কি ?”

        উত্তরে সুভাষ ঘোষ যে কথাগুলো বলেছিলেন, তা আজও খুব প্রাসঙ্গিক । অন্তত এই মূল ভাবনাগুলো জানা থাকা খুবই জরুরি । সেলিম মুস্তাফাকে পাঠ করতে গেলে, অবশ্যই এই প্রসঙ্গগুলো জানা প্রয়োজন তাই আমি সুভাষ ঘোষের এই উত্তরটি খুব ভেবেচিন্তেই নির্বাচন করেছি ।

সুভাষ ঘোষ প্রথমেই বলেন“একথা জানাজানিই যে ক্ষুধার্তদের প্রসঙ্গ ছাড়া বাংলা সাহিত্য সংক্রান্ত কোন আলোচনাই আজ আর শুদ্ধ নয়, প্রবহমান হাংরি তরঙ্গে দু-দশক তোলপাড়, ক্ষুধার্তদের কোনো না কোনো প্রভাব বা ছোঁয়াচ থেকে বাঙালী পাঠক বা লেখক আজ আর কোনোভাবেই মুক্ত নয়, এ-সব কিছুই আজ আর নয় কারোর “এলার্জি” বা চাওয়া না চাওয়ার অধীন, আসলে হাংরি সাহিত্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে “হাংরি-দর্শন”-দিকে ২ দশক বাদে হাংরি সাহিত্যের “দার্শনিক ভিত্তি” জানার কৌতুহল আপনার । এ-কথা পরিষ্কার যে একই গজকাঠি দিয়ে “তত্ত্ব” আর সৃজনশীল সাহিত্যের তালা যাই হোক, আপনার কৌতূহলের কারণে আপাতত প্রথমে নীচের “এক নম্বর” পড়ুন তারপর “ দু-নম্বর” তারপর “তিন নম্বর” :

১) হাংরিসাহিত্য মনে করে ক্ষুধা জীবনের মূল drive-  ক্ষুধা বা ক্ষুধার্ত চেতনা থেকেই অতীতে যা কিছু ঘটার ঘটে গ্যাছেআজও ঘটছেআগামী দিনেও ঘটতে থাকবেহাংরিরাই প্রথম এই নিউক্লিয়াসটিকে সচেতনভাবে চিহ্নিত করে এবং তাবৎ ঐতিহাসিক চেতনায় তাকে যুক্ত করে... ক্ষুধা দিয়েই গ্রহণ, বর্জনীয় স্থির হয়... আর এই চেতনাবোধ থেকেই তাবৎ সৃজনশীল মানুষের শোভাযাত্রাতাই, বলা যেতে পারে, এই ক্ষুধার্ত চেতনা কোন দশকের বা নির্দিষ্ট জেনারেশনের নয়... এটি শতাব্দীরশতাব্দীরশতাব্দীর, এদিক থেকে আরো বলা যায়, তাবৎ সৃজনশীল মানুষ হাংরি-চেতনা-ভুক্ত বা হাংরি জেনারেশানের...

এই ক্ষুধা-চেতনা থেকেই হাংরি সাহিত্যের অভিযান বলেই ক্ষুধার্তরা মৃতের বুকে চচ্চড় পা তুলে দেয়... জীবনের সবুজ অলিভ পাতার দিকে হাত চলে যায় তার, হাংরি সাহিত্যকে প্রতিবাদী, বিদ্রোহী, আক্রমণাত্মক চেতনায় ঠেলে দেয়যুদ্ধে, যা Continuous. এই হেতু হাংরিসাহিত্য surrender জানে না... মরমীয়া মানুষ, ট্রাজেডি বিলাসী মানুষ, নিখাদ যৌনকাতর, জোঁক, চাঁদি, সোনা ... রূপোর দাস, হাংরিসাহিত্য অগ্রাহ্য করে

হাংরি সাহিত্য সত্য হননে নয়, সত্য উদ্ধারে বিশ্বাসী... হাংরিরা সে কারণে বুর্জোয়াদের cash— মাপ নির্মিত character উন্মোচন করেতাদের নামাবলী খানখান্ করে, তাদের প্রাসাদ ষড়যন্ত্রকে করে লিফলেট্ঠিক এসব কারণেই হাংরিরা তাবৎ হায়ারারকির পতন চায়বাস্তবতা ও জীবনের কোন খিলকেই রেয়াত করে না তারা ...

ক্ষুধার যে যাচাই ও অগ্রাসী ক্ষমতা, হাংরি সাহিত্যেরও তাইহাংরিরা মনে করে এখানে কেউ কারো ক্রীতদাস হতে আসেনিজোয়াল বহন করতে আসেনি

২) “ক্ষুধা” এই এক শব্দ যার উচ্চারণ মাত্র জীবন্ত এক পাখা ফরফর খুলে দেয়মৃত কোন Echo তৈরি করে না ।

ক্ষুধা এক অদ্ভুত Touch Stone,

স্বরূপ যাচাইয়ের পক্ষে “ক্ষুধার” প্যারালাল আর কোন উচ্চারণ নাই ।

রূপক মানুষের তাৎক্ষণিক পরিচয় পেতে গেলে ক্ষুধার আশ্রয় নেয়া ছাড়া উপায় নাই আমাদের । রূপ, রূপক, স্বরূপের খোলস আলগা করে যে শব্দ, ক্ষুধা, হে, তুমি স্বাগতআমৃত্যু এ এক জীবন্তের সঙ্গে ছায়ার মত লেগে থাকা এই শব্দ যাকে খুন করা যায় নাবধ্যভূমিতে নিয়ে গিয়ে বধ করা যায় নাযার কানে কানে টান লাগালে মাথা এগিয়ে আসেক্ষুধার ঐ মারাত্মক ‘হা’ বিশ্বরূপ ঐ কুরুক্ষেত্রের স্রষ্টা দেখেছিলেন, খুব ভালভাবেই দেখেছিলেন

ক্ষুধার ঐ বহুমুখ দেখার পর এক অর্জুন About turn করতে চায় কিন্তু তা শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে না ব্যাপার ঠিক এরকমইএরকমই মানে অন্তর্জলী যাত্রার আগ মুহূর্তেও একজন ক্ষুধার ঢেউয়ে লুটোপুটি খায়, দেখা গেছে ক্ষুধার হাত ধরা প্রাণীকুলের সাড় / Response-গুলি ভারী অদ্ভুত ঐ যে উনি মিঃ X ওঁর কানে গায়ত্রী উচ্চারণের মতো বলে যদি “আত্মার ক্ষুধা” “প্রেমের ক্ষুধা”, “জ্ঞানের ক্ষুধা”, “ভালবাসার ক্ষুধা”, “ঈশ্বরের ক্ষুধা ”, তাহলে আলিঙ্গনে, চুম্বনে আপনাকে ভরিয়ে দেবেন ।

ঐ যে উনি মিঃ X যেই মাত্র বললেন কানে ওঁর, অন্নের  ক্ষুধা, যোনির ক্ষুধা তৎক্ষণাৎ, ‘কই হে ২৯২ একে এক্ষুণি অন্ধকূপে নিয়ে যাও’ব্যাপারটা ঠিক এরকমই, “ক্ষুধা” কথাটা একদম বরদাস্ত করতে পারি না ... ক্ষুধা “ক্ষুধা আর ক্ষুধা”

অথচ দেখুন ব্যাপারটা খুব সোজা পেট চোঁ চোঁ করে বলে মানুষ মাঠে ছোটে, ধান ফলায়, ভাতের হাড়ির ঢাকনা খোলে, ক্ষুধা থেকে কেউ বিয়ে করে, রেপ করে, হাসতে হাসতে হাড়িকাঠের দিকে যায়, মুক্তি হে ক্ষুধা, স্বাগত, স্বাধীনতা হে ক্ষুধা স্বাগত ।

মাঝে মাঝে খবর বেরোয় দেখেননি, চোর কিছুই লয় নাই, রান্না ঘরে ঢুকিয়া ভাত ডাইল  যাহা ছিল চাঁহিয়া মুছিয়া খইয়া চলিয়া গিয়াছে ।

তবেই দেখুন ব্যাপারটা, “ক্ষুধা” এই এক শব্দ যার চারপাশে আমি এক নেশাখোর ঘুরছি আমি এক খুন্নিবৃত্তিপরায়ণ মানুষ ঘুরছি এর পাশে আমি এক শোষক আমি, আমি এক শোষিত, আমিওআমি যে আমি বহুমুখ মেলাতে পারছি না সেও ঘুরছি একে কেন্দ্র করেমূল্যবোধের ক্ষুধা আমার মিটল না বলে আমি পাতার পর পাতা লিখে গেলুম, রাতের দৈর্ঘ্যপ্রস্থের মাত্রা রেয়াত করলুম না ।

হাঃ আমি এক নামকাতুরে এই জ্বালায় ইতিহাসের পা ধরে টানাটানি করলুম । ক্ষমতাক্ষুধা মেটাতে গিয়ে কত মানুষ গায়েব গুম করলুম, কত ভিটেতে ঘুঘু চরালুম, কত মদ খেলুম, মেয়ে মানুষ খেলুম, কত ভল্ল প্রয়োগ করলুমতবু ক্ষুধা মিটিল না হায় !

খুব মজাদার ব্যাপার যে, ক্ষুধা এক অদ্ভুত ক্যাপিটালএ গ্রেট ক্যাপিটালএক স্বর্ণ প্রসবিনী হাঁস ।

ক্ষুধার্তের ঐ প্রাণভোমরা ভাত আমার গোলায় বলে ক্ষুধায় আক্রান্তকে আমি পেটে মারতে পারি, সাদা কাগজে উহার সহি লইতে পারি, উহাকে হামাগুড়ি খাওয়াইতে পারি, পোঁদে কিক্ করিতে পারি, উহার বিতরণ করিয়া, গোলা ফাঁক করিয়া চরচর দখল করিতে পারি ইতিহাসের পাতা ।

হ্যাঁ, আমি গৌতম বুদ্ধ, আত্মার ক্ষুধা বলিয়া, আমি বুদ্ধ হইয়াছি ...

        “ক্ষুধা” এই এক শব্দ যা শ্রেণিবিন্যাস ঘটায়বিদ্রোহ বিপ্লবের কারণ হয়ঘটায় মারি আঁতোয়ানের কবররাজার মাথা ঐ প্রজার পায়ের নীচে এনে ফ্যালেক্ষুধা চ্যালেঞ্জ করে প্রত্যেকের Identity Card—আসলে বস্তুর নিজস্ব সক্রিয়তার মূলেক্ষুধাতাড়িত এই সক্রিয় মানুষ নিজেই বলে দেয় সে কে, সে কিতার ক্ষুধার চরিত্র বলে এসব

 

৩)

·         বুর্জোয়া সাহিত্যের Bankruptcy,  তাই হাংরি সাহিত্যের অভ্যুত্থান

·         হাংরি সাহিত্য গতিশীল, জীবন যে যেমন

·         হাংরি সাহিত্যই একমাত্র যা জীবনের ফর্মকে সাহিত্যের ফর্ম হিসেবে গ্রহণ করেছে ।

·         হাংরি সাহিত্য জীবন ও বাস্তবতার কোন পরতকেই গোপন করে না ।

·         জীবন ও সাহিত্যের ফারাকে বিশ্বাস রাখে না হাংরি সাহিত্য

·         জীবন যাপনের যোগ্য, হাংরি সাহিত্য বলে এ-কথা

·         মানবসৃষ্ট কোন শব্দকেই হাংরি সাহিত্য অচ্ছুৎ মনে করে না

·         বুর্জোয়া সাহিত্যের যেকোনো ফর্মকেই হাংরিরা ভাবে প্রজন্মের পক্ষে অকেজো

·         তথাকথিত পারম্পর্য বা Continuity-তে  বিশ্বাস রাখে না ।

·         সাহিত্যে VIOLATION-এর স্বপক্ষে হাত তোলে

·         হাংরি সাহিত্য বুর্জোয়া মূল্যবোধে থু করে

·         হাংরি সাহিত্যের ভাষা অন্তর্জগতের কথ্য ভাষা

·         হাংরি সাহিত্য “নিজের Condition-এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ”

·         শুধু বিশ্লেষণেই ক্ষান্ত হয় না হাংরি লেখা আক্রমণাত্মক হয় ও দৃষ্টিভঙ্গীর জন্ম দেয়

 

  উপরের এই অংশগুলো আমাদের জানা দরকার পাঠক হিসেবে । সেলিম মুস্তাফাকে সিরিয়াসলি পাঠ করতে গেলে, তার ভাবনার আশপাশ জানলে চাইলে, এই বেসিক বিষয়গুলো জানা একান্তই দরকার । তিনি জীবনের এই বিষয়গুলো অতিক্রম করেছিলেন সেই সময়ে । প্রদীপ চৌধুরীর সংস্পর্শে আসার পর এইগুলো নিয়ে পড়েছেন, ভেবেছিলেন ।  যাই হোক, আবার আমরা কবিতায় ফিরে যেতে চাই ।           

  কবি তখন কাঞ্চনপুর মেসে থাকতেন । আমরা সাধারণত জানি, মেস মানেই বিশৃঙ্খলা, উদ্দাম চলা, মাঝ-মধ্যে মদ খাওয়া, আরও কত কী !  কবি তারই চিত্রকল্প আঁকছেন তার “শাদা” কবিতায়

 

“সমস্ত দিন আমরা মদ খেলাম

সন্ধ্যে সাতটার পর দুজন বেরিয়ে গেল মেয়েছেলের খোঁজে,

আমি জানি একজন শুধুই বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবে

ঘুপচি ঘরের তামাটে অন্ধকারে তার জন্মের কথা মনে পড়ে যায় ।  

 

জন্ম ! এক ঐতিহাসিক দালানের ধ্বংসস্তুপে আমরা

জড়াজড়ি করে কেঁদে উঠেছি, কখনো হেসেছি, এখন

ঘুম পায়, বোতল খালি করে তুলেছে, এই ঘুম

ফর্সা মেয়েদের কালো করে তোলে, আমরা ঘুমের ঘোরে

রোজ দশটার আগেই অফিসে চলে যাইরাত নটার আগে

কিছুতেই বেরোতে পারি নাএত ঘুম ! এত বৃষ্টিপাত, তবু

বৃষ্টির উৎসবে আমরা যোগ দিতে পারি না ।”

(শাদা মশারী)

 

এই কবিতাটির ভিতর কবি একের পর এক ছবি এঁকে গেছেন চিত্রীর মতোকোলাজ ছবির সিরিজের মতো । মদ খাওয়া হল, ঠিক আছে ।  মেয়েমানুষের ঘরে বন্ধু গেল, ঠিক আছে একজন বাইরে দাঁড়িয়ে থাকলো, তাও ঠিক আছে । কিন্তু এই লাইন কি অদ্ভুতভাবে ঢুকিয়ে দিলেন কবি“ঘুপচি ঘরের তামাটে অন্ধকারে তার জন্মের কথা মনে পড়ে যায় ।” যে ঘরের ভিতরে রমণ করতে গেল, মেয়েমানুষটার সাথে, তারই কী মনে পড়ার কথা ছিল ! তাও এমন মুহূর্তে ? তারপরই কবিতাটার মুড পুরোপুরি ঘুরিয়ে নিলেন অন্যদিকে । নিয়ে এলেন আরেক ধরনের ইমেজ ।  জন্ম, দালান, ধ্বংসস্তুপ, কান্না, হাসি, ঘুম, খালি বোতল, ঘুম, অন্ধকারএমন কোলাজ ইমেজের ভিতর আমরা কোথায় যেন একটা দুঃসময়ের মধ্যে হারিয়ে গেলাম, কবি এবং আমরা । কবির সাথে আমরাও যেন জড়াজড়ি করে কেঁদে উঠলাম ।

 

“পেছনের দরজা দিয়ে

কোন মুহূর্তে ঢুকে পড়েছে একটা বিহ্বল জোনাকি, আমাদের

হৃদপিণ্ডের মতোই তার জ্বলা

আর নিভে যাওয়া, নিভে গিয়ে ফের

জ্বলে ওঠা

আমরা ভালবেসেছি মদ

আমরা ভালবেসেছি মেয়েছেলে

আমরা ভালবেসেছি অন্ধকার”      (শাদা মশারী)

 

এখানে আসলে কবি ঘুরেফিরে সেই জঙ্গলের অন্ধকারকেই খুঁজে চলেছেন । অক্ষরে, শব্দে শব্দে স্কেচ করে চলেছেন কবিতায় । অন্ধকারের ভিতরেই এনেছেন জোনাকির জ্বলে ওঠা । আবার নিভে যাওয়া । বনের শাল বনের ছবি এঁকেছেন ।

 

“আমি জানি মানুষ ইঙ্গিতে নির্ণয় করেছে

আমাদের অপরাধ, ঠিক এম্নি করে সে

ইঙ্গিতে প্রকাশ করেছিল তার স্ত্রী সন্তানসম্ভবা,

ভালবাসার ইঙ্গিতে সে সঙ্গম বুঝিয়েছিল,

                                                        সন্তান বোঝায়নি

এবং সন্তান দিয়ে সে বুঝিয়েছিল তার আর কিছুই দেবার নাই”… 

(শাদা মশারী)

 

আহা! কবি তার প্রকাশকে কিভাবে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণের দিকে ছড়িয়ে দিলেন । “সঙ্গম”-কে কতটা বিস্তৃত করে দিলেন । সন্তান দিয়ে সে বুঝিয়ে দিল, এই তার শ্রেষ্ঠ দান । এর উপর আর কী দেবে সে ! কীই-বা আর দেবার থাকতে পারে । অসাধারণ চিত্রকল্প স্কেচ করেছেন, এখানে কবি । অবশেষে কবি লিখছেন

 

“আমারও স্বর্গের দিকে চলেছি, শরীরে হাত দিলে টের পাই

বসন্তের মতো অসহ্য যন্ত্রণায় এই অন্ধকারে

আত্মার গায়ে কোটি কোটি তারা ফুটেছে

আর মানুষ আমাদের শরীর ঘিরে ঝুলিয়ে দিয়েছে তার

আপাৎকালীন শাদা মশারী

(শাদা মশারী)

 

এই “শাদা” শব্দের প্রয়োগ খুব ভেবেচিন্তেই করেছেন কবি । গোটা কবিতার নিরিখেই এই শব্দের প্রয়োগ করেছেন এখানে । আমাদের জীবনের যন্ত্রণা আছে, আমাদের ভালোবাসায় যন্ত্রণা আছে, আমাদের সঙ্গমেও যাতনা আছে । সবই জানেন কবি । তবু তাঁর আত্মার গায়ে কোটি কোটি তারা । তাঁর চেতনায় বিশ্বাসে আলো । একজন কবির কাছে এই তো চাই । কবি পুরো কবিতায় যে কোলাজ আঁকার চেষ্টা করেছেন, তা সবকিছুর পরও আমাদের জীবনের দিকে নিয়ে যায় । কবির বিশ্বাস পাঠকের বিশ্বাসকেও বাড়িয়ে দেয় । মশারির নিরাপত্তার দিকেই নিয়ে যায় । একটা শাদা মশারির মমতা কোথাও না কোথাও আমাদের আগলে রেখেছে । আবার কখনও মনে হয়, এই বুঝি একটা মশারি আমাদের ঝাপটে ধরে আছে । আমরা সে-অর্থে সীমাবদ্ধতায়ও ভুগছি না তো ? দুইভাবেই ভাবা যায় । কবিতাটির মজা এখানেই । এখানেই কবির বিশ্বাস এবং ভালোবাসা ।

কবির ভালোবাসা প্রকৃত পাঠককেও ভালোবাসতে বাধ্য করে । বাড়িয়ে দেয় তার নির্ভরতার জগৎ ক্রমাগতই কমে আসছে এমন নির্ভর করতে পারা কবির সংখ্যা । রবীন্দ্রনাথের পাঠক যে অর্থে রবীন্দ্রনাথের শব্দ-চেতনা দ্বারা ভক্তির মতো একটা আবেগে জড়িয়ে ছিলেন, আজ আর সে-রকম পাঠক দেখা যায় না । আজ কবির মতো পাঠকও অনেকাংশে যান্ত্রিকএই পরিস্থিতি কি সংকটের না মুক্তির ? ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না । একবার মনে হয় সংকটের আরেকবার মনে হয় মুক্তির । সংকট মনে হয় এই কারণে, আমাদের জীবন থেকে ক্রমশ সাহিত্য সরে যাচ্ছে । সাহিত্য সরে পড়া মানে তোজীবনের বোঝাপড়া থেকে সরে পড়া । তাই নয় কী ? রবীন্দ্রনাথের “চিত্রাঙ্গদা” নিয়ে মোহিতলাল মজুমদার যে অর্থে তর্ক-বিতর্ক করেছিলেন, রবীন্দ্রনাথের “বাংলা কাব্য পরিচয়” সংকলন নিয়ে বুদ্ধদেব বসু যে অর্থে তর্কে-বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন, সেরকম অর্থের জন্য আজকাল আর কেউ লড়তে চায় না । সংকটটা এখানেই ! সংকটটা এখানেই যে তরুণ পাঠকরা, কবিরা, ফেলে আসা দিনগুলোকে আর পেছন ফিরে তাকাবার আগ্রহ প্রকাশ করছেন না । আমাদের জীবনযাত্রার সংকটে একসময় সাহিত্য, ধর্মগ্রন্থ, রামায়ণ, মহাভারতের রচনাংশ উল্লেখ করে করে সাহস পেতাম না যোগাতাম, আজকের তরুণ প্রজন্ম তার ধারেকাছেও নেই তার প্রখর যুক্তির সামনে এগুলো একপ্রকার অর্থহীন ।

আমি বলতে চাইছি, আমাদের জীবনে যাপনে সাহিত্য নির্ভরতা কমে আসছে । ফলে আমরা ভাবনার রাজ্যে দিনদিন একা হয়ে আসছি

তাহলে মুক্তি কোথায় ? অবশ্যই মুক্তির একটা দিকে আছে । মুক্তির দিক হল, রবীন্দ্রনাথের আবেগীয় মোহ থেকে বেরিয়ে পড়ার মাঝে । আমি রবীন্দ্রনাথের ভাবগত দিকটার কথা বলছি না  । সে ঋণ তো কোনদিনই শেষ হবার নয় । আমি বলছি, অনেকটা কপিরাইট থেকে বেরিয়ে পড়ার মাঝে । মুক্তিটা ছিল বলার স্পর্ধার কাছে । রবীন্দ্রবলয়ে যা বলার সাহস আমরা পাচ্ছিলাম না, আজ তা পারছি । যে শব্দপ্রয়োগের সাহস ছিল না । আজ তাতে সততা খুঁজে পাচ্ছি । একদা শরীর নিয়ে কথা বলা অপরাধ ছিল, আজ আমরা শরীরে শরীর ছুঁয়ে অনেক কিছুই বলতে পারছি--ভালোবাসা আমার । সেলিম মুস্তাফা লিখছেন

“সবই সুখের

তবু একটি অসুখ

একটি দাবানল

অন্তরালে !

 

সে আমাকে

আমি তাকে ।

এইসব কিছুটা ভালোবাসা,

কিছুটা কি ঘৃণা নয় ?

কিছুটা নষ্ট বাস্তব,

কিছুটা বিনষ্ট আত্মার

পরিণামহীনতার !             (সে আমার)

 

এই বলতে পারার সাহসটাই মুক্তি । “কিছুটা কি ঘৃণা নয় ?”এই প্রশ্ন করতে পারারস্বীকারোক্তির সাহসটা কিন্তু রবীন্দ্রপরবর্তী । রবীন্দ্রপরবর্তী “কবিতা”, “কালি-কলম”, “কল্লোল”,  “পরিচয়”,--এমন একের পর এক এসব আন্দোলন বাংলা পাঠককে ক্রমাগত সাহস যুগিয়ে আসছিল । কিন্তু সাহসটা কিসের ?  জীবনের বাস্তবতাকে সাহিত্যে প্রকাশ করার সাহস, মেনে নেওয়ার সাহস । কল্পনা-বাস্তবতার দ্বন্দ্বে আমরা বহু সময় নষ্ট করেছি । সাহিত্য এ-দুটোর মিশ্রণে এক পৃথক সত্তাবোধে পাঠক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে, এই শর্তগুলোকে বুঝে নেয়ারমেনে নেয়ার মাঝে । এই মেনে বা মানিয়ে নেয়ার জন্যই এত আন্দোলন । তর্ক-বিতর্ক । যে কবি যেটা বিশ্বাস করেন, মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন, তিনি তা আরেকজনকে বলতে চান । বোঝাতে চান বুঝলে তর্ক হয় না । আর বুঝতে না-চাইলে তর্ক জুড়ে দেন । রাগ করে বসেন । অভিযোগ করেন । অথচ সবটাই ঘটে মূলত ওই সাহিত্যকে কেন্দ্র করেই ।

এই নিয়ে সম্ভবত শেষ বিতর্ক হয়ে গেল হাংরি আন্দোলন । সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে বাংলা সাহিত্য হয়ত তার জন্য ততটা প্রস্তুত ছিল না । হাংরি আন্দোলন যদি আজ হত, তাহলে হয়ত এতটা সমালোচনা হত না তবে এটাও ঠিক যে, হাংরি আন্দোলন না-হলে, আজকেও হয়ত এই মুখ খোলার পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না কারণ, হাংরি আন্দোলনের ফলে আমাদের সাহিত্যে কিছুটা মৌলিক পরিবর্তন এসেছে, এটা অস্বীকার করা যায় না । কিছু যে বাড়াবাড়ি হয়নি, সেটা অস্বীকার করি না । তবে এই আন্দোলনের কিছু বৈশিষ্ট্যকে স্বীকার করতেই হয় । এই নিয়ে প্রচুর লেখালেখি হয়েছে । হাংরি লেখকরাই লিখেছেন । অন্যরাও লিখেছেন । এই বিষয় নিয়ে লেখক অভিজিৎ পালের একটা লেখা আছে“বাংলা সাহিত্যে হাংরি আন্দোলনের প্রভাব” খুব ভালো লেগেছে আমার । এতে ঠিক এই বিষয়ে তিনি কিছু আলোকপাত করেছেন, আমি তারই উল্লেখযোগ্য কিছু অংশ তুলে ধরছি । কেননা, আমি তার সাথে সহমত পোষণ করছি বলেই লেখাটি  তুলে ধরলাম ।

     

১। হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের প্রথম ও প্রধান বৈশিষ্ট্য হল, তারা সাহিত্যকে পণ্য হিসাবে চিহ্নিত করতে অস্বীকার করেছিলেন । কেবল তাই নয়, তারা এক পৃষ্ঠার লিফলেট প্রকাশ করতেন ও বিনামূল্যে আগ্রহীদের মাঝে বিতরণ করতেন । তারাই প্রথম ফোলডার-কবিতা, পোস্ট-কার্ড  কবিতা ও পোস্টারে কবিতা ও কবিতার পংক্তির সূত্রপাত করেন ।

 

২। হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অবদান প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা । তাদের আগমনের পূর্বে প্রতিষ্ঠানবিরোধীতা করার কথা সাহিত্যিকরা চিন্তা করেন নাই । সুভাষ ঘোষ বলেছেন, প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার অর্থ সরকার বিরোধিতা নয়, সংবাদপত্র বিরোধিতা নয়, হাংরি জেনারেশনের বিরোধ প্রচলিত সাহিত্যের মৌরসি পাট্টাকে উৎখাত করে নবতম মূল্যবোধ সঞ্চারিত করার । নবতম শৈলী, প্রতিদিনের বুলি, পথচারীর ভাষা, ছোটোলোকের কথার ধরন, ডিকশন, উদ্দেশ্য, শব্দ ব্যবহার, চিন্তা  ইত্যাদি ।...তা প্রথম করেন হাংরি জেনারেশনের কবি ও লেখকগণ । পরবর্তী দশকগুলিতে লিটিল ম্যাগাজিনের লেখক ও কবিদের রচনায় এই প্রভাব দিন দিন স্পষ্ট হয়েছে ।

 

৩। হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের তৃতীয় অবদান কবিতা ও গল্প-উপন্যাসে ভাষাকে ল্যাবিরিনথাইন করে প্রয়োগ করা ।

 

৪। হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের চতুর্থ অবদান হল, পত্রিকার নামকরণে বৈপ্লবিক পরিবর্তন । হাংরি জেনারেশনের পূর্বে পত্রিকাগুলির নামকরণ হত, “কবিতা”, “কৃত্তিবাস”, “উত্তরসূরী”, “শতভিষা”, “পূর্বাশা”, ইত্যাদি যা ছিল মধ্যবিত্ত মূল্যবোধের বহিঃপ্রকাশ হাংরি জেনারেশন আন্দোলনকারীগণ পত্রিকার নামকরণ করলেন “জেব্রা”, “জিরাফ”, “ধৃতরাষ্ট্র”, “উন্মার্গ”, “প্রতিদ্বন্দী” ইত্যাদি । পরবর্তীকালে তার বিপুল প্রভাব পড়েছেপত্রিকার নামকরণে সম্পূর্ণ ভিন্নপথ আবিষ্কার হয়েছে ।

 

হাংরি জেনারেশন আন্দোলনে সর্বপ্রথম সাবঅলটার্ন অথবা নিম্নবর্গের লেখকদের গুরুত্ব প্রদান করতে দেখা গিয়েছিল

 

৬। হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের ষষ্ঠ গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হল, রচনায় যুক্তিবিপন্নতা, যুক্তির কেন্দ্রিকতা থেকে মুক্তি, যুক্তির বাইরে বেরোনোর প্রবণতা, আবেগের সম-উপস্থিতি, কবিতার শুরু হওয়া ও শেষ হওয়াকে গুরুত্ব না-দেয়া, ক্রমান্বয়হীনতা

কিন্তু আগে থাকতো যুক্তির প্রশ্রয়, সিঁড়িভাঙা অঙ্কের মতন যুক্তি ধাপে-ধাপে এগোতো, কবিতায় থাকতো আদি-মধ্য-অন্ত, রচনা হত একরৈখিক, কেন্দ্রাভিগ, স্বয়ংসম্পূর্ণতা ।

 

৭। হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের পূর্বে “আমি” থাকতো রচনার কেন্দ্রে, একক আমি থাকতো, লেখক-কবি “আমি”-র নির্মাণ করতেন, তার পূর্বনির্ধারিত মানদণ্ড থাকতো, সীমার স্পষ্টিকরণ করতেন রচনাকার, আত্মপ্রসঙ্গ ছিল মূল প্রসঙ্গ, “আমি”-র পেডিগ্রি পরিমাণ করতেন আলোচক হাংরি জেনারেশন আন্দোলনকারীগণ নিয়ে এলেন একক আমির অনুপস্থিতি, আমির বন্ধুত্ব, মানদণ্ড ভেঙে ফেললেন তারা, সীমা আবছা করে দিলেন, সংকরায়ণ ঘটালেন

 

৮। হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের পূর্বে শিরোনাম দিয়ে বিষয়কেন্দ্র চিহ্নিত করা হত । বিষয় থাকতো রচনার কেন্দ্রে, একক মালিকানা ছিল, লেখক বা কবি ছিলেন টাইটেল হোলডার  হাংরিরা বলল, শিরোনাম জরুরি নয় । তারা বললেন, পাঠকই টাইটেল হোলডার

 

৯। হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের পূর্বে কবিতা-গল্প-উপন্যাস রচিত হত ঔপনিবেশিক মূল্যবোধ অনুযায়ী একরৈখিক রীতিতে । হাংরিরা এসে তা বর্জন করে বহুরৈখিক রচনার সূত্রপাত ঘটালেন ।

 

১০। হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের পূর্বে মনে করা হত কবি একজন বিশেষজ্ঞ । হাংরি জেনারেশনের কবিরা বললেন, কবিত্ব হোমোসেপিয়েন্সের প্রজাতিগত বৈশিষ্ট্য । ইত্যাদি                    

 

সেলিম মুস্তাফার প্রথম “বাহান্ন তাসের পর”কাব্যগ্রন্থে আমরা কিন্তু এসবের অনেক লক্ষণ দেখতে পাই । মৌলিকতা দেখতে পাই তার কাব্যভাবনা, চিন্তায়সেই ভাবনায় আরও ব্যাপ্তি এবং বৈচিত্র্য আসে, প্রদীপ চৌধুরীর সাথে মেলামেশার পর । সেলিম মুস্তাফার কাব্যভাবনার নতুনত্বকে তাই আমরা কিছুতেই অস্বীকার করতে পারি না ।

 

“সে আমার স্বপ্নোত্থিতা

সে আমার সমস্ত অপরাধ ও ভয়

সত্য ও মিথ্যা সে

সে আমারই আত্মার

নির্মম পরাজয় ।”             (সে আমার)

 

নিজেকে নিষ্ঠুরভাবে আক্রমণ করার প্রেরণা হাংরি প্রভাবেরই ফল । এই নিষ্ঠুর আক্রমণের ভিতর অনেকে হয়ত সৌন্দর্যকে খুঁজে পান না । মাধুর্যকে পান না । কিন্তু আজকের পাঠরীতিতে অনেক পরিবর্তন এসেছে । আগামীতেও আসবে । আজকের প্রেক্ষাপটে সত্য স্বীকারোক্তির ভিতর, এই সততার ভিতর অনুভব করা যায় এক নির্মম সৌন্দর্যবোধের ।  

 

“মহাশূন্যে আরো এক শূন্যতা দেখি

আমার বুকের মধ্যে আরও একটি বুক

গোধূলি আচ্ছন্ন করে নিগূঢ় সন্ধ্যা

ঘুমন্ত পাখার নিচে জেগে ওঠে পাখি ।”       (দ্বিতীয় সন্ধি)   

                            

এই পাখির যন্ত্রণা, শূন্যতা, আমাদের নাড়া দেয় । কবি এর আগে প্রথম লাইনে বলেছেন

“আমার ক্ষুধার মধ্যে এইমাত্র ঢুকেছে আকাশগোধূলিতে আচ্ছন্ন সন্ধ্যা । “নিগূঢ়” শব্দের ব্যবহার, মনের ভিতরে যে পরিমণ্ডল  তৈরি করল তার ভিতরে প্রবেশ না করে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা যায় না । কিন্তু এই নিগূঢ় সন্ধ্যার ভিতর ঢুকলে চমকে যেতে হয়কবির ভাবনার চমৎকারিত্ব দেখে

 

“এতদিন শুধু আমি নিজেকে খুঁটেছি

আজ তোর যাবতীয় সুখ ও অসুখ

দু’হাতে নিংড়ে খাব সন্ধ্যা

আজ আমি ভালোবেসে জেগে উঠেছি ।”     ( দ্বিতীয় সন্ধি ) 

 

একে কি আপনি নিছক শব্দের চমৎকারিত্ব বলবেন ? এ চমৎকারিত্বের জন্য মননের জগতে, জীবনের গভীরে, একা ত্রিসন্ধ্যার নিগূঢ় গভীরে কবিকে হাঁটতে হয়েছে অনেকদিন । “নিগূঢ়” শব্দ ব্যবহারের আগে সন্ধ্যা নামক পরিস্থিতির, সন্ধিক্ষণের পরিভাষাকে বুঝতে হয়েছে । এক-একটি শব্দকে পরম যত্নে নির্বাচন করেছেন কবি । তাকে তার প্রাপ্য ভালোবাসা দিয়েছেন । এই কবিতায় কবি ক্ষুধা”-কে কত তীব্রভাবে প্রকাশ করেছেন প্রথম লাইনে, তারপরই কবি আরেকটা আলাদা ইমেজ তৈরি করত চলে যান । ক্ষুধার ভিতরে কবি আবিষ্কার করেন মহাশূন্যতা, বুকের ভিতরে আরেকটা বুকএছাড়াও আরও দুটি শব্দ নিয়ে ভাবিয়েছে । একটা হল “দ্বিতীয় সন্ধ্যা” আরেকটা হল “তুই” শব্দের ব্যবহার । “তোর”এই শব্দটা হঠাৎ আনলেন  কেন কবি ? কবি সেলিম মুস্তাফার কবিতার প্রেমে পড়ে গেলে, এইসব বিষয়  নিয়ে একটু ভাবতে হবে । এবং বললেন“আজ তোর যাবতীয় সুখ ও অসুখ / দু’হাতে নিংড়ে খাব সন্ধ্যা”, এখানে সন্ধ্যা শব্দকে নিয়ে কি চমৎকার খেললেন কবি ! সন্ধ্যার এই অন্ধকার সুখ-অসুখ কার জীবনে নেমে এসেছে ? আমাদের জীবনে ? না শুধু সন্ধ্যা নামে মেয়েটিরক জীবনে ! কিন্তু এই ক্ষুধার রাজ্যে কে এই সন্ধ্যা ? একটি মেয়ে ? নাকি সময় ? এটা পাঠক হিসেবে, আপনাকেই খুঁজে বের করতে হবে । যতই বের করার চেষ্টা করবেন, ততই আপনি কবিতার প্রেমে পড়তে থাকবেন । কেননা, কবিতার মজাই এখানে । এই আনন্দ আপনি উপন্যাসে পাবেন না, নাটকে পাবেন না, গল্পেও পাবেন না কবিতার এই মৌলিক আনন্দের আস্বাদ একবার পেয়ে গেলে, আর সমস্যা থাকে না । তখন কবিতা আপনা থেকে ধরা দেবে । তবে, সব কবিতা সবাইকে নাড়া দেবে, তাও ঠিক নয় । অবশ্যই মন, মনন, ভালো লাগা, না-লাগার একটা পৃথক বিষয়ও থাকে ।

 

কবিতায় সময় বিষয়টা অনেকক্ষেত্রেই খুবই জরুরি একটা বিষয় । কবিতায় ব্যবহৃত সময়কে ধরতে পারলে, কবিতার মেজাজটাও ধরতে পারা যায় । সেলিম মুস্তাফার কবিতায় সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্র হয়ে ওঠে । সে চরিত্রকে বুঝে নিতে পারলে, তারা শ্লীল হয়ে ওঠে । না-হলে অশ্লীল হয়ে পড়ে । শ্লীল আর অশ্লীলতার মধ্যে এই যা ক্ষণিক তফাৎসময়কে এখানে তার জায়গা ছেড়ে দিতেই হবে । ১৮ শতকের সাথে ১৯ শতকের বা বিংশ শতকের এখানেই যা পার্থক্য ।

 

                        “স্টেশনের কাছাকাছি আমার নির্বোধ মেয়েমানুষ

ঘুমিয়ে পড়েছে, ঘুম পাচ্ছে আমারো, দেশি মদের মতো কুয়াশায়

পতনশীল আমার আত্মা, পা দুটো তবু ক্রমাগত উঠে যায়

                                                                ওই নীল পাহাড়ের দিকে

মেয়েমানুষকে ছেড়ে আমি মানুষের দিকে চলেছি, আমার

পরিকল্পিত যাত্রাপথে আর কোন সমুদ্র নাই,

শীতের রাতে কুঁকড়ে শুয়ে থাকা রেললাইন আমি

পেরিয়ে এসেছি, শুধু এক নষ্ট চাঁদ আমার মাথার উপর

ছড়িয়ে রয়েছে, আর এক শিকারী”          

(শুধু এক নষ্ট চাঁদ)

 

কবি আবার একটি কোলাজ আঁকতে বসেছেন, এই কবিতায় । একের পর এক চিত্র এঁকে চলেছেন । এবং প্রথম লাইনেই পাঠককে কি-রকম একটা ধাক্কা দিয়েই শুরু করলেন যেন “স্টেশনের কাছাকাছি আমার নির্বোধ মেয়েমানুষ ঘুমিয়ে পড়েছে” আচ্ছা এখানে “নির্বোধ” শব্দটা আনলেন কেন ? এই শব্দটা না-থাকলে এক ধরনের সহজ চিত্রকল্প পরিকল্পনা করা যেত কিন্তু এই নির্বোধ শব্দটা এসেই, পরিস্থিতিকে ব্যাপক অর্থে নিয়ে গেল । আবার এর আগে বসিয়েছেন “আমার” শব্দটা । মায়া আছে, মমতা আছে, কিন্তু ঠিক প্রেমিকা নয় । তাই কি বলছেন“পতনশীল আমার আত্মা” খুব সুন্দর একটি উপমা টানলেন কবিদেশি মদের মতো কুয়াশায়” এবং কবিতার এক পর্যায়ে কবি মেয়েমানুষকে যখন ছাড়লেন, এরপরই বলছেন“আমার পরিকল্পিত যাত্রাপথে আর কোন সমুদ্র নাই ।” যেন মেয়ে-মানুষটাই ছিল সমুদ্রের উৎস । এরপরই কবি আবার ইমেজ পাল্টে অন্য ইমেজে চলে গেলেন কবি লিখলেন এবার

 

“শিকারী এসেছে; শিখার জানালা থেকে

আমার পায়রাগুলো বুলেটের দিকে উড়ে গেল দেখলাম

পৌষের জঙ্গল ভেঙে তারপর ধূধূ বাতাস

আর কোথাও কোন শব্দ নেই; আমি জানি

এই রহস্যের ভেতর কোথাও আমার জন্য

                        নিঃশব্দে গড়ে উঠছে এক অনিবার্য চুম্বন

কোথাও ছড়িয়ে পড়ছে আমার অসহ্য সুনাম

(শুধু এক নষ্ট চাঁদ)

 

একবার  মনে  মনে  কল্পনা করুণ তো “শিকার” থেকে “শিখার”-এর দূরত্ব কতদূর হতে পারে ? কবির পায়রাগুলো উড়ে গেল বুলেটের দিকে । কবি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আবার তাই দেখলেন ! এটা কি কবি নিজের স্বপ্নের আত্মহননের দৃশ্যকল্প আঁকলেন ? আবার কবি হতাশ না-হয়ে আরেকটা দৃশ্যের দিকে আমাদের নিয়ে গেলেন “এই রহস্যের ভেতর কোথাও আমার জন্য / নিঃশব্দে গড়ে উঠছে এক অনিবার্য চুম্বন” । “চুম্বন”-ও কী গড়ে ওঠে ? এখানে কবি “গড়ে”  শব্দটা ব্যবহার করলেন কেন ? চুম্বন কি গড়ে ওঠার ব্যাপার ! আবার এর পরের লাইনেই কবি ব্যবহার করলেন“আমার অসহ্য সুনাম” এটা কি করে হয় ? সুনামও কি কারও “অসহ্য হয় ?  কবি কিন্তু এখানে পাঠকের হৃদয় তোলপাড় করে খেলে নিলেন কবিতার খেলা । দৃশ্য কল্পনার খেলা । হয়ত এমন অনুভবের ভিতর দিয়ে আমরা আগে যাইনি । এই যে বললেন“নিঃশব্দে গড়ে উঠছে এক অনিবার্য চুম্বন”, এই রকম চুম্বন কখন, কীভাবেই বা গড়ে ওঠে ? নিঃশব্দে চুম্বন হতে পারে । কিন্তু “অনিবার্য” কখন হয়ে উঠতে পারে, বলতে পারেন ? এখানে কিন্তু বিটুয়িন দা লাইন অনেক কথা আছে । কথা থেকে যায় অনিবার্যভাবে সেটা পাঠক হিসেবে আপনাকে ভাবতে হবে । কবির কবিতার সাথে হাঁটতে হবে অনেকক্ষণ । আমারও পাঠক হিসেবে যেমন মনে হচ্ছে, আমি কোথাও যেন কবিতার বিষয়টা বুঝতে পারছি, কিন্তু ঠিক বুঝিয়ে বলতে পারছি না । কবি সেলিম মুস্তাফার এই বৈশিষ্ট্য কিন্তু খুবই মৌলিক ।

 

“শাদা উরুর খেলা দেখিয়ে কাঞ্চনপুরের জঙ্গলের পাশে চাঁদ

                                                                        কাৎ হয়ে পড়েছে

ভালবাসার নাম নাকি কাঞ্চনপুর ! ভালবাসার বদলে… …

সুন্ধিবনে উদ্দাম পিকনিক !

 ...      ...        ...      ...

আবার ঘুম পাচ্ছে আমার, শিখার লিরিক্যাল চোখের মত

করুণ আর হাস্যকর ঘুম”

(শুধু এক নষ্ট চাঁদ)

 

আহা! কবির এমন লিরিক্যাল দৃশ্যকল্পনার সামনে মুগ্ধ হয়ে বসে থাকতেই হয় । এই কাব্যগ্রন্থের ভিতরে এত এত চমৎকার কবিতা আর কোনো কাব্যগ্রন্থে দিতে পারেননি কবি । এটা আমার ব্যক্তিগত মনে হয়েছে । কাঞ্চনপুরের পরিবেশ, পরিস্থিতি, স্থানিকতাকে এত ভালো ভাবে কাজে লাগিয়েছেন কবি তার তৎকালীন কবিতায় । মুগ্ধ হতেই হয় । পাহাড়ি মানুষদের সমস্যা কবি লক্ষ্য করেছেন । এক পরম মমতায় । পাহাড়িদের জীবন, তাদের সরলতা, উদ্যমশীল শরীর, তাদের ক্রোধ, অসহায়তা, এসব একদিন ফেটে পড়াটা ছিল স্বাভাবিক পরিণতি । তাদের ক্রোধের ভিতর লুকিয়ে ছিল আরও অনেক কথা । কবি তাই বলছেন

 

“কথা আছে ।

একটা কথার ভেতর আরেকটা কথা

ওরা বহু আগে বলে রেখেছে, একদিন

শিমূল তুলোর মতো ফেটে ছড়িয়ে যাবে ।

সেইসব আবদ্ধ ক্রোধ !

… … … … … … … … … … … … … …

কথা আছে ।

একটা কথার ভেতর আরেকটা কথা

 

স্বাধীনতা ।                   

(কথা আছে)

 

সেলিম মুস্তাফার এই ধরনের কবিতা একবার পড়লেই মনের মধ্যে কেমন যেন গিঁথে যায়। খুব সরল অথচ তাৎপর্যময় । এই রীতিতে তাঁর প্রচুর কবিতা আছে ।  মানবতার সংকটের খুব সময়োপযোগী একটি কবিতার নাম“এইসব সন্ততিরা জারজ বসন্তে” কবি লিখছেন

 

“আক্রান্ত আত্মার কাছাকাছি জল, আমি দেখি না

যন্ত্রণা টের পাই, হৃৎপিণ্ডে কুয়াশা জমে, কিছু লোক

কিছু না-বলেই হাত পা ছুঁড়ে মিছিল করে যায়, এদের প্রত্যেকের

চেহারাই একরকম ঠিক বাংলো প্যাটার্নের ।”

(এইসব সন্ততিরা জারজ বসন্তে)

 

মানুষের আত্মার সংকটকে এভাবেই তুলে ধরেন কবি । “হৃৎপিণ্ডে কুয়াশা জমে”এই কুয়াশা কিসের ? আক্রান্ত আত্মার দমবন্ধকর পরিণতি নাকি এই যন্ত্রণা !

 

“মানুষের প্রতি মানুষের আজ বধিরতা প্রিয় উপহার !

মানুষের দরজায় নাড়বার মত আর একটাও কড়া নেই

নৌকো থেকে তীর অব্দি তীব্র কোলাহল, তারপর খরবালি

শরীরের ছায়া দিগন্ত স্পর্শ করলেও আত্মার কোন ছায়া পড়ে না, বুকের

ভেতর থেকে তুমুল হাঙর ফুঁসে ওঠে

(ঐ)

 

সেলিম মুস্তাফা কবি হিসেবে বারবার আমাদের মনের ভিতরের অন্ধকার দিকের কথা, অসহায়তার কথা বলার চেষ্টা করেছেন কবিতায় । মানুষ আজ মানুষের প্রতি বধিরতা কেন উপহার দিচ্ছে ! মানুষের দরজায় মানুষের জন্য নাড়বার কড়া পর্যন্ত মানুষ রাখেনি ! তাহলে, এটা কী ধরনের সোসাইটি হল ? নাকি এই কড়া না-থাকার পেছনে কাজ করছে, একটা দীর্ঘ ইতিহাস? সে ইতিহাসটা তবে কী !

 

“শহর কাঁপিয়ে যারা এসেছিল, তারা চলে গেছে,

দলের লোক ছাড়া আর কেউ জানতেও পারেনি, তারা

শ্মশানে একদিন কবিতা পাঠের আসরও করেছিল

তারপর সকলেরই একদিন বসন্ত হলদুরারোগ্য গুটি ।

মানুষের ভালবাসা মানুষের খুন মানুষের অন্ধকার

                                                        মানুষের আলোর পিপাসা

আদৌ কোন মানুষের কিনা বুঝতে পারি না,

শুধু টের পাই এদের নখের ঘায়ে

প্রতিদিন নষ্ট হয় পৃথিবীর যাবতীয় নরম উদ্যান !”          (ঐ)

 

এখানে আমরা একজন শান্তিপ্রিয়, নির্জন থাকতে ভালোবাসে এমন মানুষের যন্ত্রণার ছবি দেখতে পাচ্ছি । অথচ সে তার নির্জনতা পাচ্ছে না । সে তার কাঙ্ক্ষিত ভালোবাসা পাচ্ছে না । নানাভাবে সে ব্যতিব্যস্ত । তার চোখের সামনে, আত্মার সামনে, প্রতিদিন কষ্ট পাচ্ছে পৃথিবীর নরম মানুষ । নরম উদ্যান প্রকৃত মানবতার সামনে আরেকটা মানবাত্মা মুখোমুখি সান্ত্বনার ভাষা নেই আজ । তারা একে অন্যকে দৃষ্টির বিনিময়ে উপহার দেয় বধিরতা ।   

 

“পৃথিবীর নরম মানুষ

প্রতিদিন কাঠ হয়ে যায়, প্রতিটি গর্জন-কাঠ

নির্জনে ফেটে গিয়ে হা হয়ে থাকে, শুধু

 

প্রতিটি মৃত্যু আমাকে বিশাল যুদ্ধের দিকে

ক্রমাগত ঠেলে দেয়ঠেলে দ্যায় দ্রুত”               (ঐ)

 

প্রকৃতির ভিতর থেকে মানুষের হা-করা চিৎকারের প্রতিচ্ছবি এক অদ্ভুত কায়দায় ফুটিয়ে তুলছেন কবি । প্রতিদনের প্রতিটি মৃত্যুই কবিকে আক্রান্ত করছে । সমাজ-ধর্ম-নীতি-অনুশাসনের দম বন্ধ করা এই পরিবেশে শৃঙ্খলিত মানুষের সামনে যখন অন্য কোনও আশা বা সম্ভাবনা থাকে না, তখন কবির সামনে এইরকম একটা অনুভূতি উঠে আসে হয়ত বা ! একটা বিচ্ছিন্নতাবোধ কবি টের পাচ্ছিলেন কোথাও তাই তো লিখেছিলেন এই কবিতায়“এদের নখের ঘায়ে প্রতিদিন নষ্ট হয় পৃথিবীর যাবতীয় নরম উদ্যান !”

মৃত্যু কবিকে বিব্রত করবে, তা-ই তো স্বাভাবিক । মৃত্যু কবিকে ঠেলে দেয় হতাশার দিকে, দুঃখের দিকে, স্মৃতিচারণের দিকে । মৃত্যু মানেই তো কারও না কারও, কোনো না কোনো প্রিয়জনের বিচ্ছেদ, বেদনা, এক অন্তহীন স্মৃতির দিকে হেলে পড়া । কিন্তু কবির সামনে কবির মননে আজ এ-কার মৃত্যু হল, যা কবিকে রাগিয়ে দিল । যা বিদ্রোহের আগুন জ্বালিয়ে দিল তাঁর বুকে । কবিকে ক্রমাগত একটা যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে আসলে, অন্যায়ভাবে যে যুদ্ধ হচ্ছে, হত্যা করা হচ্ছে, ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে গলা টিপে ধরা হচ্ছে, কবি সে রকম প্রতিটি মৃত্যুর বিরুদ্ধেই দাঁড়াতে চান । প্রতিটি মৃত্যুই কবিকে কষ্ট দেয় । কবিকে বিদ্রোহী করে তোলে । “গর্জন-কাঠ নির্জনে ফেটে গিয়ে হা হয়ে থাকে”এই একান্ত অনুভূতি কি কবির নিজের ! নিশ্চয়ই । কিন্তু কবি তাঁর প্রয়োগ-কৌশলে এই অনুভূতিকে অভিনব এক রূপ দিলেন ।

 

কবি তাঁর “আনহাইজিনিক–৩” কবিতায় কবি বলছেন

 

“রাত যতটাই হোক, এখন আর ঘরে ফেরার কোন

মানে হয় না , একটা ধাবমান ট্রাকের তীব্র

                                                                        ব্যাকলাইট

সূর্যাস্তের চেয়েও অর্থবহ মনে হতে পারে এসময়

এসময় আমার প্রচণ্ড শব্দ করে জেগে ওঠার কথা;

 

পারছি না, কেউ কেড়ে নিয়ে যাচ্ছে আমার

উষ্ণতা”

(আনহাইজিনিক–৩ )

 

কবি তাঁর ভিতরের যাবতীয় যন্ত্রণার কথাই বলছেন । কবি বারবারই জেগে ওঠার কথা ভাবেন । কিন্তু কোথাও যেন তিনি তাঁর সীমাবদ্ধতার কথাও টের পেয়ে যান ।  তাঁর মনে হয়, কোথাও যেন কুয়াশার মতো একটা পাতলা বাতাস কুয়াশার মতো তাকে ঢেকে আছে । ঘুরে বেড়াচ্ছে তাঁর চারপাশ । কিন্তু তা-কি সত্য ? মনে হয় না । কবি আসলে, আমাদের, পাঠক হিসেবে একটা সন্দেহের দিকে এগিয়ে নিচ্ছেন । কবি পরবর্তীতে তাই নিজেই বলছেন

 

“পারছি না, কেউ কেড়ে নিয়ে যাচ্ছে আমার

উষ্ণতা, ঘরে একটুকরো মোম ছিল, চাঁদের কথায়

মোমের কথা হারিয়ে ফেলেছি, এখন এই

ময়দান ছেড়ে আমি নড়তে পারি না ।”      (ঐ)

 

এবার আমি আমার কথা না-জড়িয়ে, বিদগ্ধ ব্যক্তিত্ব তথা কবি তপোধীর ভট্টাচার্যের লেখা একটু পাঠ করছি তাঁর “কবিতার রূপান্তর” বই থেকে । যেখানে তিনি বিষয়টা নিয়ে লিখছেন“যথার্থ পড়ুয়া জানেন, স্পন্দমান জগৎ থেকেই তৈরি হয় পাঠকৃতির আদি-বয়ন কেননা অভিজ্ঞতা, কবিতায় কিংবা কোনো মানবিক নির্মিতির, হুবহু রূপান্তরিত হয় না । অভিজ্ঞতার নির্যাসই সৃজনের দ্বিবাচনিকতাকে উসকে দেয় । তারপর পড়ুয়া আদি-বয়নে অভিব্যক্ত ঐ নির্যাসকে খানিকটা গ্রহণ করেন, খানিকটা বর্জনও করেন; আবার যোগও করেন কিছুটা । এভাবে গড়ে ওঠে পাঠকৃতির আদল ।” 

এবার এই যে “গড়ে ওঠা” বিষয়টা কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ । এই জায়গায় সেলিম মুস্তাফাকে একবার বিবেচনা করতে হবে । কবি সেলিম মুস্তাফাও বিশ্বাস করেন, এই জায়গাটা । একজন কবিকে যখন পাঠক তার অভিজ্ঞতার নির্যাসই সৃজনে দ্বিবাচনিকতার স্তরে নিয়ে যাবেন, আসলে, তখনই কিন্তু একটি কবিতা তার পরিমণ্ডল থেকে বেরিয়ে প্রকৃত পাখা মেলে । কেননা, কবিতার ভাষা তো মূলত প্রতীকী । রূপকাত্মক । সেলিম মুস্তাফার কবিতা তাই বিবরণ দেয় না, ব্যাখ্যা করে না। বরং বিষয়কে মনের ভিতরে উদ্রেক করে, উদ্বোধিত করে । এই উদ্রেক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া একই সময়ে এক পাঠক থেকে অন্য পাঠকের কাছে ভিন্ন হতেই পারে । সময়ের ব্যবধানে এক দশক থেকে অন্য দশকের ক্ষেত্রেও একই কবিতার বোধ পাল্টে যেতে পারে । অর্থ গ্রহণের এই পাঠ-প্রতিক্রিয়া চলতেই থাকে । কবি এবং পাঠকের পরিপূরক সম্পর্কের ভিতর দিয়েই একটি কবিতা তার পূর্ণতা পায় ।

 

“একটা লাল-পদ্ম ফুটিয়ে দিলাম আমি

তার ফর্সা-বুকে,

ঐ তো শুয়ে আছে সে, বুক খোলাই

লক্ষ্য করুন, বুকের ঠিক মাঝখানেলাল পদ্ম;

যার ক্ষমতা আছে তুলে নিন ।”

( মিডনাইট ভার্সেস-৪)

 

সেলিম মুস্তাফার এই ধরনের রোমান্টিক কবিতার সামনে আবার হাত তুলে আত্মসমর্পণ করে বলতেই হয়, আপনার লালপদ্ম নিয়ে আপনিই সুখে থাকুন । একে তুলে নেবার সাধ্য আমাদের নেই । আমরা বরং আমাদের যার যার বুকের দিকে এগুবো । আপনার কবিতার কথা ভেবে তার বুকেও একটা লাল পদ্ম আঁকবার চেষ্টা করবো । আপনমনে তাকেই সাজাবো অন্ধকারে, যত সময় লাগে লাগুক । একটি ফুটফুটে লালপদ্মের জন্য যত জলেই নামতে হয় নামবো । দেহের যত আগুন খরচ করতে হয় হয় করবো । তবু কবির কবিতার মতো আজ মিডনাইটে আমরাও একটা বুকজোড়া পদ্ম চাই । লাল টুকটুকে এক পদ্ম ! সকালবেলা আয়নার সামনে নিয়ে তাকে বলবো এই পদ্ম আমি তোমাকে দিলাম । এই লাল খেলা করুক তোমার সর্বাঙ্গে । সে লজ্জা পেয়ে মিষ্টি করে মুখ লুকিয়ে আমার বুক জড়িয়ে ধরবে আর আমি তাকে বলবো, তোমাকে যেন এ রূপেই সারাজীবন পাই ।

আপনারা হয়ত ভাবছেন, কবির কবিতা নিয়ে একটু বাড়াবাড়ি করে ফেললাম । হয়ত বা তাই । আসলে, কোনো কোনো কবিতা নিয়ে আবেগের একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যায় । কোনো কোনো কবিতা বোধ হয় পাঠককে এভাবেই টেনে নেয় । জড়িয়ে নেন তার অনুভবের ভিতরে । এটাই তো সহিত । এটাই তো সাহিত্য । এভাবেই সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয় পাঠকের সাথে । কবিতা প্রকাশ হয়ে গেলে, সেটা তো পাঠকেরই হয়ে যায় শেষ পর্যন্ত ।

কবি সেলিম মুস্তাফাকে একবার জিজ্ঞেস করলাম“কবিতা আসলে কী আপনার কাছে ?” উত্তরে কবি বললেন“কবিতা কী ? আমার কিছু স্বপ্ন অথবা দুঃস্বপ্ন আছে, তোমারও আছে, আমাদের সকলেরই আছে । যার ভেতর আছে হায়েনার নাটকীয় অট্টহাসি, শেয়ালের পদচারণা, আর আমার কিংবা আমাদের কান্না কিংবা কান্নাহীনতার নির্ঘুম রাত, যা নিয়ে আমি বাঁচতে চাই বা মরতে চাই । জানি, আমার বাঁচা-মরার সঙ্গে এই পৃথিবীর বাঁচামরা মেলে না, কিন্তু আমি কিছু চাই, চাই-ই যার সঙ্গে আমার প্রিয়া কিংবা মায়ের সৌরভ জড়িত, হয়ত বাঁচাতেই চাই, এই পৃথিবীর ভাষায় তাকে কী বলে জানি না । হয়তো স্বাধীনতা বলে, তাহলে স্বাধীনতাই আমি চাই । মাকে চাই । প্রিয়াকে চাই ।”

 

“রাজধানী” শব্দ নিয়ে কবি কেন জানি কিছুটা বিমুখ চিরদিনই । তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতাই হয়ত তাকে এভাবে রাজধানী সম্পর্কে একটা হতাশার দিকে ঠেলে দিয়েছিল । হয়ত তাই । দিল্লির লোকেরা কলকাতাকে পাত্তা দেয় না । এভাবে কলকাতা পাত্তা দেয় না আসামের দিকে । আসাম পাত্তা দেয় না ত্রিপুরাকে । ত্রিপুরার রাজধানী পাত্তা দেয় না মফস্সলকে ! কেন এমন হয় ? এ-ধরনের অবজ্ঞার গূঢ় মানেটাই বা কী ? কবি সেলিম মুস্তাফা তাঁর কবিতায় লিখলেন

 

“উৎসব মুখর রাজধানী ছেড়ে ফিরে যাচ্ছি

দু’শো কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে আমার নিজগ্রাম

উত্তর কিংবা পূর্ব থেকে দক্ষিণে বা পশ্চিমে আসার কোন

মানে নেই জেনেও এসেছিলামফিরে যাচ্ছি            

(উপজাতি)

 

কবির এই কবিতায় নীরব একটা যন্ত্রণা আছে । অস্ফুট, অব্যক্ত  কিন্তু  তীব্র  তার ভিতরের নড়াচড়া কবি খুব যত্নে তাঁর বেদনাকে স্থান দেন কবিতায় । মায়াবী চিত্রকল্পে ।

 

                        “আমি ফিরে যাচ্ছি              

                        মা মরে গেলে আমাকে কাঁদতে হবে

দিদি মরে গেলে আমি কাঁদতে চাই

                                                 মরুবাতাসের মত;

এত লাশ !

তবু একটাই শরীর আমি দেখি

এই বিশাল শরীর আজ থেকে দশ বছর আগে

দাদার চিতায় আমি পুড়িয়েছিলাম

ফের কোথা থেকে নেমে এসেছে ভাই ? তার

বিশাল শরীরে একে একে ঢুকে পড়েছে এই শবমিছিল

রক্তে বেজে উঠেছে তাদের মৌনতা              (ঐ)

 

কবি আবার জাম্প করে কোলাজ নির্মাণের দিকে ছুটে যাচ্ছেন, একের পর এক চিত্রকল্প এঁকে চলেছেন শুরুতে বললেন, “উৎসব মুখর রাজধানী” কিন্তু কবিতাটি পড়তে পড়তে পাচ্ছি, এক ভয়াবহ চিত্র । “তার বিশাল শরীরে একেএকে ঢুকে পড়েছে এই শবমিছিল”এই মিছিল প্রকৃত অর্থে কি মানুষের শবের মিছিল ! না, মননহীন এক শহরের চালচিত্র কবি এখানে তুলে ধরতে চেয়েছেন । মা–দিদি-দাদার মৃত্যুর প্রসঙ্গ এলো কেন এখানে ? আসলে, শহরের যান্ত্রিকতা কবিকে ক্রমেই অস্থির করে তুলেছিল । শহরের চতুরতাও কবিকে ক্লান্ত করে তুলেছিল । তাই তো কবি অবশেষে অরণ্যেই ফিরে যেতে চেয়েছেন । যে প্রকৃতির কাছে গেলেই কবি পেতেন শান্তি । তাই কবিতার শেষে কবি লিখছেন

 

“আমি ছুটছি

সামনে খুলে যাচ্ছে যোনির মত

                                        অরণ্যের পর্দার পর পর্দা –

আমি ঢুকে যাচ্ছি তার অন্তহীন গভীরে”         (ঐ)

 

কবিতার নামটা চট করে কমিউনিকেট না-হওয়ার একটা ঝুঁকি থেকে যায় । আসলে, এখানে কবি  কবিতার নাম “উপজাতি” শব্দকে দুইভাবে দেখার চেষ্টা করেছেন । প্রথমত, আমরা সাধারণ অর্থে যে উপজাতি সম্প্রদায়দের বুঝে থাকি । কিন্তু কবি সম্ভবত, দ্বিতীয় অর্থে অর্থাৎ আদিজাতি হিসেবে দেখার চেষ্টা করেছেন যারা এক অর্থে আদিম থেকেই জঙ্গলকে ভালোবেসে জঙ্গলেই রয়েছেন কিন্তু এখানে জঙ্গল অর্থে কি কেবল বন-পাহাড়কে বুঝিয়েছেন কবি ? আমার মনে হয় না । অর্থটাকে আরও ব্যাপক অর্থে না-নিলে “আমি ছুটছি / সামনে খুলে যাচ্ছে যোনির মত / অরণ্যের পর্দার পর পর্দা” এই লাইনটার সাংকেতিক অর্থকে বিশ্লেষণ করা যাবে না । আর কবিতার নিরিখে বুঝতে গেলে দেখবেন, কবি মানুষের সেই আদিম-যাত্রাকেই এখানে ইংগিত করে কবিতাটির চিত্রকল্প রচনা করেছেন “এত লাশ ! / তবু একটাই শরীর আমি দেখি”এই লাইনগুলোর ভিতর কবি সেই আদিমযাত্রাকেই ঘুরেফিরে দেখার চেষ্টা করেছেন । “তার বিশাল শরীরে একে একে ঢুকে পড়েছে এই শবমিছিল” এই সব “শবমিছিল” তো সেই অনন্ত যাত্রারই প্রতীক । 

 

সেই অর্থে কবির অরণ্যের ভিতরে হারিয়ে যাওয়ার কামনার সাথে যোনির খুলে যাওয়ার তুলনা চমকপ্রদ লেগেছে আমার । যোনির গভীরও এক অন্তহীন পথ চিত্রকল্পে অভিনবত্ব আছে । সাথে সৃজনশীলতাও ।

 

“তুমি বিশ্বব্রহ্মাণ্ড দেখতে পাচ্ছ, আমি পাচ্ছি না ।

তুমি শহর দেখতে পাচ্ছ, আমি নিজেকেও দেখি না

আমি হাতিয়ে বেড়াচ্ছি অন্ধকার

খাবলে তুলছি অন্ধকার

মুখে পুরছি অন্ধকার

আমার মায়ের শরীর অন্ধকার

আমার দিদির শরীর অন্ধকার

আমি অন্ধকারের প্রসাদ তুলছি অন্ধকারেবাগান গড়ছি

বাগানে পেচ্ছাপ করে ফেলছি আমি

 

আমি কি নষ্ট করে ফেলছি

তোমাদের শহর, তোমাদের বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ?

(অরুণেশ ও জামালকে)

 

কবি সুকান্ত বলেছিলেন“এ পৃথিবীকে শিশুর বাসযোগ্য করে যাবো আমি ।” আর কবি সেলিম মুস্তাফা বলেন“এ পৃথিবী শিশুর বাসযোগ্য ছিল চিরকালই । পৃথিবী মূলত শিশুর জন্য । শিশুর মতো সরল লোকজনদের জন্য । আমরা তাকে প্রতিনিয়ত দূষিত করছি । বাসযোগ্য জায়গাকে ক্রমাহত আমাদের আচরণ দ্বারা, ব্যবহার দ্বারা, আমরাই বাস অ-যোগ্য করে তুলছি ।  কিন্তু কে এই আমরা ? কবিই বলছেনআমি ! আমি ব্যক্তিগত সেলিম মুস্তাফা । অন্যকে দোষ দেবার কোনো অর্থ হয় না । সাধারণ মানুষের প্রাথমিক দোষত্রুটির আমিও একজন । হয়তো আমিই প্রধান । তাই তো কবি বললেন“আমি কী নষ্ট করে ফেলেছি তোমাদের শহর ? আমিই সেই চরিত্র যার জন্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে শিশুদের বাসযোগ্য শহর

        কবিতাটি কবি অরুণেশ ঘোষ এবং কবি জামাল উদ্দিনকে উৎসর্গ করেন কবি । তারা একবার ধর্মনগর বেড়াতে এসেছিলেন কুচবিহার থেকেকবির সাথে খুব আড্ডা হয় সেই আড্ডার প্রেক্ষাপট থেকেই এই কবিতার জন্ম । তাই তাদেরকেই কবিতাটি উৎসর্গ করেন কবি । কবিতার নামকরণ সেই স্মৃতিকে মনে রেখেই ।

 

        সেলিম মুস্তাফার কাছে একদিন জানতে চেয়েছিলাম“আপনি যখন কবিতার জগতের প্রায় মাঝামঝি, মোটামুটি সাতের দশক, তখন ত্রিপুরার মননে সাহিত্য তৎপরতায় একটা উদ্দামতা চরমভাবে চলছিল । সেই সময় একের পর এক লিটিল ম্যাগাজিন আত্মপ্রকাশ করছিল । “গ্রুপ সেঞ্চুরী”-ও তাদের তৎপরতা শুরু করেছিল । সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে আপনার সাথে আগরতলার বা ত্রিপুরার অন্যান্য জায়গার সাহিত্য-বিষয়ক যোগাযোগটা ঠিক কী রকম ছিল ? কিংবা কতটা সক্রিয় ছিলেন রাজ্যের অন্যান্য সাহিত্য তৎপরতার সাথে ?”  

উত্তরে কবি বললেনসম্পাদক বিকাশ দেবরায়ের সঙ্গে সহসম্পাদক (পীযূষ কান্তি দাশ বিশ্বাস ) হিসেবে থেকে আমরা বের করি গাণ্ডীব নামে একটা সাহিত্যপত্র ধর্মনগর চন্দ্রপুর থেকে কয়েকটা সংখ্যা বেরিয়েছিল এখন কোনো সংখ্যাই নেই আমাদের কারো কাছে ১৯৭৫/৭৬ সাল হবে, ঠিক মনে নেই আগরতলা থেকে তখন বেরোত অনেক কাগজ এর পেছনে অনেক কারণ আছে ১৯৭১-এর বাংলাদেশ নিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ, শরণার্থীর ঢল, দেশে জরুরি অবস্থা, ছয়ের দশকের শেষার্ধে নক্সাল আন্দোলনের প্রভাব, এর / বছর আগের হাংরি আন্দোলনের সামূহিক প্রভাব ইত্যাদি ছাড়াও গোটা সাতের দশকেই সরকারী বিজ্ঞাপনের ঢালাও ব্যবস্থা ছিল এমন শোনা যা যে, পুজোর আগে একটা সংখ্যা করতে পারলে পুজোর সময়ের শার্ট-প্যাণ্টের ব্যবস্থা হয়ে যেতো আমরা তো এসব লাইন জানতামই না

যাই হোকে, আগরতলার সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ কেবল নকুল রায়ের সঙ্গেই বেশি হতো এছাড়া আমাদের সঙ্গে (এখানে আমাদের বলতে প্রয়াত দীপক দেব, কিশোর রঞ্জন দে, দীপক চক্রবর্তী, রঞ্জিত রায় এবং আমি) সবচেয়ে উষ্ণ সম্পর্ক ছিল এক্সপেরিমেন্টাল গল্প লিখিয়ে দুলাল ঘোষ, অনুপ ভট্টাচার্য-এর সঙ্গে তাদের ছিলপদক্ষেপএবং পরে পাঁচ/ছয় ক্রীতদাসেরইত্যাদি গল্পের কাগজ এছাড়া আগরতলায় যোগাযোগ হতো কেবল আমরা কেউ কখনো গেলে অনুপদা আর দুলালদা প্রায়ই ধর্মনগর আসতো দীপক দেব আর কিশোর ততদিনে গুরুত্বপূর্ণ গল্পলেখক হয়ে গেছে নকুল রায় এক দুবার এসেছেন ধর্মনগর আমার চন্দ্রপুরের বাড়িতে এক দুই রাত কাটিয়েও গেছেন তখন সারা ত্রিপুরাতেই তাঁর সাহিত্য নিয়ে ভ্রমণ ছিল আমরা ততদিনে একটু বেশিই এগিয়ে গিয়েছিলাম সম্ভবত এর কারণ ১৯৭৬ সালে পীযূষ রাউতের ধর্মনগর আগমন পীযূষদার বাসায় আসতেন শক্তিপদ ব্রহ্মচারী তপোধীর ভট্টাচার্য, ব্রজেন্দ্রকুমার সিনহা তাদের সঙ্গে আমাদের আমাদের বহুবার সাক্ষাৎ আড্ডা হয়েছে পীযূষদা বি বি আই স্কুলে প্রতি মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সাহিত্য আসর বসাতেন তাতে আমরা ৩২ জন কবি লেখক পাঠক একত্রিত হতাম কাজেই একদিক দিয়ে আমরা প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণই ছিলাম আগরতলার জন্য বিশেষ কাতরতা ছিল না

কিছুদিন বাদেই ধর্মনগরে বদলি হয়ে এলেন কবি প্রদীপ চৌধুরী প্রায় দু-বছর ছিলেন এখান থেকেই টার্নিং পয়েণ্ট আমরা যা ভাবছিলাম সেটা তার মধ্যেও পেয়ে গেলাম এর মধ্যে আমাদের সঙ্গে আরও এলেন রত্নময় দে কবি দেবাশিস ভট্টাচার্য জয়ন্ত রায় জয়ন্ত রায়ের সম্পাদনায় বেরোল "আমি" ব্রডশীট, মানে বড় সাইজের কাগজে এটাও দু-এক সংখ্যা বেরিয়েছিল রত্নময়ের ঢিল এলেন কবি সুজিত চক্রবর্তী (সন্তু) তার কাগজ সাইরেন আগরতলার কবিদের কবিতা খুব একটা আমরা পড়িনি তখন একমাত্র নকুল রায় ছাড়া আমাকে মাঝে মাঝে যেতে হতো আগরতলায় তখন পরিচয় হয় কৃত্তিবাস চক্রবর্তী, সন্তোষ রায়-দের সঙ্গে তখন সেখানে বড় কবি হলে কল্যাণব্রত চক্রবর্তী নকুল রায় জাগরণ পত্রিকায় আসার পর মানস পালের সঙ্গে আমার পরিচয় সেটা ১৯৭৫/৭৬ সাল মানস বের করলো সৈকত এটা নিয়মিত আসতো আমার কাছে এখানে বিলি/বিক্রি করতাম প্রদীপ ধর্মনগর থেকে স্বকাল/ফুঃ বের করলেন দুয়েক সংখ্যা সেটার কভারের জন্য লিনোতে ছবি কেটে দিতাম আমি আমাদের আগে এখানে কাগজ ছিল একটা যা তখন বন্ধ হতে গেছে নাম ছিল "এবং" সম্পাদক অমিয় ভট্টাচার্য (আছেন) আর অধিপ চক্রবর্তী (নেই) এটাই ধর্মনগরে প্রথম লিটল ম্যাগাজিন সম্ভবত

এই উত্তর থেকে তৎকালীন সময়ের একটা চিত্র পাওয়া যায় । সাথে সাথে এটাও বোঝা যায়, সেলিম মুস্তাফা নিজেই নিজেকে সমৃদ্ধ করছিলেন । এবং এটাও বোঝা যায়, উত্তর ত্রিপুরা থেকে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিককে পেয়েছি আমরা । ত্রিপুরার সাহিত্যকে যারা নিঃসন্দেহে সমৃদ্ধ করেছেন তাঁরা ।

 

“আবার জেগে উঠেছে হত্যাকারীরাযারা

ভালবাসার মঞ্চে উঠে আলো নিভিয়ে দেয়,

নদীর ওপার থেকে পাহাড়তলির বাজার পর্যন্ত

তাদের গুপ্ত চলাচল অফিস-ফেরৎ মানুষ এখনো

টের পায়নি”

(এই পাহাড় ঘুম দাঙ্গা প্রেম ও প্রণিপাত)

 

এই কবিতাটি কবির খুবই উল্লেখযোগ্য একটি দীর্ঘ কবিতা । দীর্ঘ কবিতার ক্ষেত্রে সেলিম মুস্তাফা এমনিতেই অনবদ্য । দীর্ঘ কবিতা নিয়ে তাঁর মতো পরীক্ষা-নিরীক্ষা ত্রিপুরাতে আর কেউ করেনি এখন পর্যন্ত । এই কবিতাটির  প্রথম লাইনটাই এত চমৎকার এবং আকস্মিক যে চমকে যেতে হয় । “আবার জেগে উঠেছে হত্যাকারীরা” তার মানে আগেও একবার জেগেছিল তারা । যারা প্রত্যেকবারই ভালবাসার মঞ্চে উঠে আলো নিভিয়ে দেয় । হিংসার বীজ ছড়ায় । নদীর ওপার থেকে তাদের গুপ্ত চলাচল ।

 

“যারা শুধু হাট-বার দুপুরবেলা

পিঠে ঝুড়ি নিয়ে ঝুঁকে ঝুঁকে নেমে এসেছিল

...     ...    ...    ...    ...    ...

আমি একজন মানুষ খুঁজে পেতে চাই, যার সঙ্গে

আমি তার বাড়ি-অব্দি যেতে পারি !

আমি বাড়ি-বাড়ি যেতে চাই, মানুষের ঘরে-ঘরে, নদীর ওপরে

কোন ব্রীজ ছিল না, তবু ঢুকে পড়েছি আমি”        (ঐ)

 

কবির কথায় দ্বিধা-দ্বন্দ্ব স্পষ্ট । ঝুঁকে ঝুঁকে যারা হাটে এসেছে তারাও যেন ত্রস্ত কিন্তু কেন ? কবি প্রথম লাইনেও বললেন“আবার জেগে উঠেছে হত্যাকারীরা” কবিতার নামের  ভিতরে “দাঙ্গা” শব্দটা থাকায় প্রথম থেকেই একটা সূত্র কাজ করছিল । এবার যত কবিতাটি পড়ছি, তত যেন আরও উৎকণ্ঠা বাড়ছে । ঝুঁকে ঝুঁকে যারা হাটে এসেছে, তাঁরা পাহাড় থেকে এসেছে বোঝাই যাচ্ছে । কিন্তু কবি কেন তাদের সাথে জঙ্গলের ভিতরে যেতে চাইছেন ? তাও আবার মানুষের বাড়ি বাড়ি, ঘরে ঘরে ? তিনি কি কোনো বার্তা দিতে চাইছেন ? কিন্তু তার আগে ত্রিপুরার ঐ-সময়ের বাতাবরণ কেমন ছিল, তা একটু জেনে নেওয়া ভালো হবে । আমি বিদগ্ধ লেখক শ্যামাচরণ ত্রিপুরার “ত্রিপুরায় উগ্রপন্থাঃ কারণ ও সমাধান” থেকে কিছু কিছু অংশ তুলে ধরছি । এতে ঐ-সময়ের প্রেক্ষাপট বিষয়ে কিছু জিনিস জানা যাবে । কবি “আবার” শব্দের ব্যবহারের ইতিহাসও জানতে পারবো । কবি তো কেবল ইঙ্গিতের দিকেই পাঠকদের ঠেলে দেবেন, প্রকৃত সত্য তো জানতে হবে, ইতিহাস ঘেঁটেই । লেখক লিখছেন

“ত্রিপুরার বাতাসে এখন বারুদের গন্ধ । সন্ত্রাস, খুন, অপহরণ নিত্যদিনের ঘটনা । এসব খবর পত্রিকায় দেখে মানুষ আর বিস্মিত হয় না । এ যাবৎ উগ্রপন্থীদের হাতে কতজন অপহৃত হয়েছেন, কতজন খুন হয়েছেন সঠিক সংখ্যা কেউ জানে না ।...নব্য ইংরেজী শিক্ষিত উপজাতিদের মনে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করে । শিলং ফেরৎ বিজয় রাংখলের প্রতি নয়া প্রজন্মের যুবক-যুবতিরা আকৃষ্ট হয় । বিজয় রাংখলের বক্তব্য একটাই ছিল—‘আমরা নিজ দেশে পরবাসী, উত্তর পূর্বাঞ্চলকে দেখো, শিলং দেখো, গৌহাটি দেখো, আইজল দেখো, ইম্ফল দেখো, কোথাও রিফুজীরাজ নেই । আমরা কি মানুষ না ? আমরা কেন অন্যের শাসনে থাকবো ? এখান থেকেই টি. এন. ভি. উগ্রপন্থার জন্ম ।...৬ই জুন, ১৯৮০ সালে ত্রিপুরায় ভয়াবহ জাতিদাঙ্গা শুরু হয় একটি সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে ।”

এরপর রাজ্যে একে একে এ. টি. পি. এল.., এরপর আসে এ. টি. টি. এফ., এন. এল. এফ. টি.এভাবেই রাজ্যের পরিস্থিতি খারাপ থেকে খারাপের দিকে যেতে থাকে । সে-ই   প্রেক্ষাপটের ভিতর থেকে গড়ে উঠে এই কবিতার বিষয় এবং বিস্তার ।

 

“এই পাহাড় ঘুম দাঙ্গা প্রেম ও প্রণিপাত” এই কবিতার পুরো হৃদয় জুড়েই এই সব পটভূমির আর্তনাদ 

 

                                                            “এত কবরের সমাবেশ

এখানে যে, একটা জীবন এখান থেকে শুরু করা যায়, শুধু

মরে যাওয়াটাই এখানে ঠিক হবে না, মরে গেলেই

আমার শহুরে বন্ধুরা ফুল দিয়ে জল দিয়ে কবর

ঢেকে দেবে, ফুল আমাকে মেয়েমানুষের মত জড়িয়ে ধরে

ফুলের পর্দা সরিয়ে আমি কিছুতেই জেগে উঠতে পারি না;

এই শতাব্দীর সমস্ত দুর্বলতা যেন আমাকেই ভর করেছে,

আর আমাকেই যেন সমস্ত জয় করে দাঁড়াতে হবে ।”          (ঐ)

 

বিখ্যাত নাট্যকার শম্ভু মিত্র হয়ত এই কারণেই তাঁর মৃতদেহে ফুল ছিটাতে উইল করে বাধা দিয়ে গিয়েছিলেন । আসলে বাধাটা ফুলের দিক দিয়ে নয় । বাধাটা শহুরেপনা নিয়ে ।  কৃত্রিমতা নিয়ে । “আমার শহুরে বন্ধুরা”শহুরে, শব্দটাই এখানে ব্যঙ্গাত্মকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে । কবি মৃত্যু থেকেই আরেকটা জীবনের স্বপ্ন দেখা শুরু করতে চাইছেন । নিজের ভিতরেই  দুর্বলতাকে কবি জয় করতে চাইছেন । কবি জয় করতে চাইছেন, এই ভয়াবহতাকে । কবি কাঞ্চনপুর পাহাড়ের ভিতরে অনুভব করছেন উত্তপ্ত এই পরিস্থিতি । কবি লিখছেন তাই

 

“রাত ন’টা বাজলেই কেউ আমাকে বিছানার দিকে

টেনে নিয়ে যায়, বিছানা গড়িয়ে যায় এক অনিশ্চিত

পাহাড়ি-রাতের খাদে, লোকে বলে কাঞ্চনপুরকাঞ্চনমালা

নামে কোনদিন কেউ ছিল কিনা জানি না, ফুলবতী আছে,

আমি বলি সোনার গাঁওআমি বলি গোরস্থান

ভালবাসা আর ম্যালেরিয়ার দেশফুলবতী রিয়াং-এর দেশ

যার যৌবনের ঠোঁট ছোঁয়াবার আগেই নীল হয়ে যায়

যাবতীয় লাল, এক ঐশ্বরিক মেঘ নিয়ে মৃত্যু যেন তার

বুক ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে, নেশা হয়ে যায়, তার নাভিকুণ্ডে

কবরের বোঁটকা গন্ধ, চুলে বুনো শাদা ফুল, তার অস্তিত্বের

আর কোথাও কোন অলংকার নেই তবু নেশা হয়ে যায়,

সন্ধ্যার অন্ধকারে অকস্মাৎ ঢলে যায় হলুদ যুবক

দেও নদী তারও লাশ বয়ে নিয়ে আসে !”           (ঐ)

 

এই দীর্ঘ কবিতা যেন একটা ঢেউয়ের পর আরেকটা ঢেউয়ের খেলা । ছবির মতো একের পর এক কম্পোজিশন করে গেলেন কবি একেক ফ্রেমে একেক ধরনের চিত্রপট । চিত্রকল্প । এবার কাঞ্চনপুরের পাহাড়ি সবুজের ঢেউয়ে একটি মেয়ে উঁকি দিল, শরীরে ভালোবাসার গন্ধ নিয়ে, ম্যালেরিয়ার দেশে । মেয়েটির নাম দিয়েছেন কবি ফুলবতী রিয়াং । তার মাথার উপরে পাহাড়ি ঐশ্বরিক সাদামেঘ খেলা করে । কিন্তু এই অপূর্ব দৃশ্যের ভিতর ছোটো ছোটো শব্দে ভয়ানক কিছু শব্দচিত্র আনলেন, যেমন

১। যৌবনের ঠোঁট ছোঁয়াবার আগেই নীল হয়ে যায় যাবতীয় লাল ।

২। ঐশ্বরিক মেঘ নিয়ে মৃত্যু যেন তার বুক ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে

তার নাভিকুণ্ডে কবরের বোঁটকা গন্ধ ।

৪। সন্ধ্যার অন্ধকারে অকস্মাৎ ঢলে যায় হলুদ যুবক

৫। দেও নদী তারও লাশ বয়ে নিয়ে আসে !

উপরের দৃশ্যগুলো ভয়ানক কিন্তু উপস্থাপনা কবিতার মতো, মর্মভেদী । কিন্তু নিরলংকার । শীতল বরফের মতো ধরালো । কবিও এখানে যেন দেও নদীর মতো, তাঁকেও সব ব্যথা বহন করে নিয়ে যেতে হয় । বহন করাই তাঁর কাজ । ধর্ষণ করে যুবতীর লাশ ফেলে গেলেও তাঁকে বহন করে নিয়ে যেতে হয় । আবার কোনো কিশোরীর খোঁপা থেকে ফুল খসে পড়ে গেলে তাঁকেও বহন করে নিয়ে যেতে হয় । নদীর কাছে শ্লীল, অশ্লীল বলে কিছু নেই । নদীর বুকের মতো কবির বুককেও সব বহন করতে হয় । এতে লাভ কী, লোকসান কী, সবই একাকার । একটি কবিতাও তার ব্যবহৃত শব্দ, দাঁড়ি, কমা, উপমা নিয়ে মূলত একটি চিত্রকল্পই বহন করে । এখানে কবি অনেকটাই নিরুপায় । এখানে ইচ্ছে করলেই কবি উলঙ্গ নারীদেহে শব্দের চাদর দিতে পারেন না । এই মুহূর্তে ফুলবতী রিয়াং ভাবাচ্ছে কবিকে । তার নীরব ক্রোধ ভাবাচ্ছে কবিকে । ফুলবতী  ঝিনুকের মতো হাসে, তার বুকের নিচেই হলদে ভয়ংকর ঢেউগুলো দেও নদীর ঘোলা জলে ভ্রম হয়, কবরের আরেকটা কপাট তখন সরে যায় ।

 

বন্দুককে বন্ধু বলে বুকে জড়িয়েছে আরো কয়েকশ যুবক

আমি চিনি না ওদের, কিন্তু আমি জানি

ওরা কারা,

                                                          

                        বাজার থেকে মোমবাতি আচমকা সরে যায়, আকাশে

বিদ্যুৎময় মেঘ আর ফাটল, প্রতিটি মানুষের পেছনে

আরো একজন করে মানুষ, ফুলবতী এদের প্রত্যেককে

চেনে, সে জেগে থাকে এই গায়ের যুবকদের পাশে পাশে

ফুলবতী ঝিনুকের মত হাসে, তার বুকের নিচেই হলদে

ভয়ংকর ঢেউগুলো দেও নদীর ঘোলা জল বলে ভ্রম হয়, কবরের

আরেকটা কপাট তখন সরে যায়, ঊরুর ওপর হা করে

ঝুঁকে পড়ে সমস্ত পৃথিবীখুনীরা পঞ্চাশটা দেশলাই

কাঠি নিয়ে একই ম্যাজিক দেখায়, আমি টের পাই

ভালবাসার বত্রিশটা দাঁত কী ভয়ংকর শাদা !”        (ঐ)

 

“ফুলবতী” চরিত্রকে অসাধারণ দৃষ্টিকোণ থেকে এই কবিতায় তুলে ধরেছেন কবি । ফুলবতী এই গায়ের প্রতিটি যুবকের পাশে পাশে চলে । এই কথার গূঢ় অর্থ কি হতে পারে ? ফুলবতীর হাসি ঝিনুকের মতো । তার বুকের নিচে ভয়ংকর ঢেউ  অপূর্ব  এই  চিত্রকল্প  এঁকেই কবি পরের লাইনে বলছেন       কবরের আরেকটা কপাট তখন সরে যায়এখানে কবি মৃত্যুর ছোঁয়া আনলেন কেন ? ফুলবতী চরিত্রটির পাশাপাশি কি মৃত্যুও হাঁটে ? কবি এর পরেই লিখলেন ঊরুর ওপর হা করে ঝুঁকে পড়ে সমস্ত পৃথিবী ! তাহলে, কবি কি “ফুলবতী”-কে প্রতীকে রেখে অন্য কিছু বলতে চাইছেন ? বন্দুককে বুকে যারা জড়িয়েছে, তারাও ফুলবতীকে চেনে । প্রত্যেকের বুকের গন্ধই ফুলবতীর পরিচিত । ফুলবতী কি তবে সবার ভিতরের বেদনাকে চেনে ? তাদের দুঃখ বোঝে ? তার ঊরুর উপরেই হা করে আজ সবাই । তবে কি সবাই ভালোবাসা চায় ! এখানে আবার “শাদা” শব্দের প্রয়োগ করেছেন কবি । যে প্রয়োগ কবি সহজে করতে চান নাতবু পরিস্থিতির সামনে, সময়ের সামনে কবি বাধ্য হয়ে পড়েন । আটের দশকের ভয়ংকর পরিস্থিতির চিত্রকল্প আমরা এখানে পাচ্ছি । কবি লিখছেন মাঝে মাঝে গভীর রাতে বাড়ি ফিরে এলে শূন্য  ঘরময় তাদের গন্ধ পাই, তাদের ব্যবহৃত বিছানা আর ফুল জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল পুলিশ আসার আগেই একজন ঢুকে গেছি আরেকজনের অন্ধকার গর্তে, শিং উঁচিয়ে ঢুঁ মেরেছি, আমাদের চোখ থেকে ঠোঁট বেয়ে নেমে এসেছে লাল অশ্রু । আমাদের হৃদয় দেখেছে সারা শহর জুড়ে শত কুমারীর অযথা রক্তপাত আর আগুন আর অসহ্য বাতাস ।

দীর্ঘ এই কবিতায় এরকম অসংখ্য চিত্রকল্পের ভিতর দিয়ে আসলে কবি এক অস্বাস্থ্যকর, ক্ষতিকর যুদ্ধের, সংঘর্ষের দিকেই আমাদের ইঙ্গিত করেছেন সময়ের বৃত্তে রেখেছেন ফুলবতীকে । সময়কে চিহ্নিত করেছেন সাংকেতিকভাবে । জাতি-উপজাতি অবিশ্বাস, দাঙ্গা, অস্তিত্বের লড়াই । উভয় পক্ষেই বাঁচার প্রশ্ন, বাঁচার লড়াই । একদিকে সর্বস্ব খুইয়ে আসা বৈধ, সরকার-স্বীকৃত  শরণার্থী । অন্যদিকে উপজাতিদের নিজস্ব-সংকট, অস্তিত্বের প্রশ্ন । উভয়ের বিপন্নতাকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো অন্য আরেক পক্ষ । সেই আরেক পক্ষ কে ?  আমরা জানি না । কবি কি তবে তাকেই খুঁজে বেড়াচ্ছেন তার কবিতা জুড়ে ? আমরা কি সেই অন্য-একজনের দাবার ঘুঁটির শিকার সবাই ! আমরা কেবল প্রাণপনে বাঁচার কথা ভাবছি । কিন্তু কী ভাবে বাঁচা যায় ! কিছু মরেছে বাংলাদেশে, কিছু এখানে । আমরা সবাই ঘরপোড়া গরুর মতো কেবল তাকিয়ে আছি । “কী কী সঙ্গে নিয়ে যাব আমি ?” কবি তার বঞ্চনার বর্ণনাকে আরও খুলে বলছেন

 

“শেষ রাতে কাঠের সাঁকো ভেসে গিয়েছিল, তার বহুক্ষণ পর

                                                                         দেখা গেল চাঁদ,   

খুব হাসতে ইচ্ছে করে আমারপ্রচণ্ড জোরে

যেন খুলে পড়ে যায় সমস্ত অপমান !

যেন খুলে পড়ে যায় স্মৃতি ও প্রতিপত্তি

                                                        বোধ ও লাঞ্চনা !

একটি চুম্বনের পর আরেকটি জোরদার চুম্বন আমি

আশা করেছিলাম একটি ছোবলের পর আরেকটি

বিষাক্ত ছোবল ঠিক ব্রহ্মতালুতেএকটি গুলির পর

আরেকটি গুলিতারপর আরেকটি, তারপর আরো

অনেকগুলি ! কিন্তু ওরা তা করেনি, ওরা নিঃসাড়ে

ফিরে গিয়েছিল, অন্ধকারে বোঝা যায়নি সবুজ

ঘাসের ওপর কত ফোঁটা রক্ত ঝরে পড়েছিল ? নাকি কিছুই পড়েনি

                                                                শুধু শূন্যতা ?”  (ঐ)

 

একটি ভয়ংকর পরিস্থিতির বর্ণনা দিতে দিতে কবি শেষ অবধি শূন্যতার প্রশ্নে এসে থামলেন কেন ? চুম্বনের পর চুম্বন দাবি করার পরই কবি বলছেন এবার আমি একটি বিষাক্ত ছোবলও আশা করেছিলাম । তাও আবার ব্রহ্মতালুতে ! এই কবিতায় কবি পাঠককে নিয়ে অসম্ভব খেলেছেন আমরা সবাই জানি, শব্দের দুই ধরনের ক্ষমতা থাকে । শব্দ রূপ অর্থাৎ মানসিক রূপে অমূর্তও এবং এই মানসিক অমূর্ততাকে নিরূপণও করে, অর্থাৎ অর্থের দ্যোতনাও করে । যথার্থ বাক্য নিজের ভাবমূর্তিকে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে থাকে । বাক্য পূর্ণতা পায় তার সমগ্রতায় । কবি এই কবিতায় চুম্বনে, ছোবলে, অন্ধকার অবয়বে একাকার । সবুজ ঘাসের উপর এ-কার রক্ত ঝরেছিল ? তবে কবি এরপরই শূন্যতার কথা তুললেন কেন ? নাকি এই অস্থিরতার ভিতর কোথাও একটা অর্থহীনতার গন্ধ পাচ্ছেন ! কবি আবার এই প্রেক্ষাপট থেকে সরে গিয়ে অন্যভাবে বিষয়টাকে দেখার চেষ্টা শুরু করলেন

 

“শূন্য বোতলগুলি ঘরের ভেতর ভাসতে থাকে, শূন্য বোতল,

কোন বোতলেই আর মদ নেই

...    ...     ...    ...    ...        

এ কি আশার ফুল, অথবা সর্বনাশা ?

সব-ই নেশার কথা নয়, একথা গোপন নয়

গুপ্ত-ঘাতকেরা আবার প্রস্তুত, একথা মিথ্যে নয় সজল শান্তিকে

কাঞ্চনছড়া থেকে তুলে নিয়ে এসেছে, বলেছে পুকুর দেবে

আর পাঁচটি টাকা, শান্তি তারপর শুয়ে পড়ে একটা

রাতের জন্য, শান্তি তারপর জেগে ওঠে একটা রাতের

জন্যমেয়েমানুষ ভেতরে-ভেতরে জাগে, শান্তি তারপর

মরে যায় একটা রাতের জন্য, শরীরের বদলে পুকুর,

সময়ের বদলে টাকামেয়েমানুষ কখনো মরে না,

আধপোড়া মরদ আর বাচ্চার তোবড়ানো মাংস

সে দেখেছেসে দূর থেকেই দেখেছিল তার

প্রিয় টং-ঘরে আগুন”                  (ঐ)

 

ফুলবতী-র পর এবার দেখতে পাচ্ছি, “শান্তি” নামের মেয়েমানুষকে । একটা পুকুরের সুবিধার জন্য, আর পাঁচটি টাকার জন্য শান্তি শুয়ে পড়ে একটা রাতের জন্য । একটা শোষণের চিত্র ফোটে ওঠে ।

            তৎকালীন কাঞ্চনপুরের অভিজ্ঞতায় কবি তার অভিজ্ঞতা এভাবেই বর্ণনা করেছিলেনকোনো কোনো আদিবাসী যদি যৌনতা দিয়ে কিছু আদায় করেও থাকেন, সেটা বিনিময়ের কড়ি হিসেবেই দিয়েছেন আবার কারো কারো যৌনতা লুণ্ঠিত হয়েছে, সেটা আলাদা ব্যাপার ওখানে অনুপজাতিরা বুঝেছিল, শরীর খুবই সস্তা বিষয়, আর বিশেষ সম্প্রদায়ের উপজাতিরা বুঝেছিল--আরে, এরা তো দেখি শরীর পেলেই সন্তুষ্ট  তাই শরীর দিতেকারো আপত্তি হয়নি বিশেষ, যদিও কিছুটা হলেও সংকোচ তো ছিলোই । এতে দোষ ছিল অবশ্যই, তবে প্রায়শ্চিত্তেরও বিধান ছিল । প্রকাশ্যে হলে, বা অননুমোদিত হলে অর্থদণ্ড তো ছিলোই ...কাঞ্চনপুর এমনই এক বাজার, যেখানে বাজারের ভেতরে সব সময় চলছে আরেক বাজার

            এই পাহাড় ঘুম দাঙ্গা প্রেম ও প্রণিপাত”—এই কবিতায় আমরা তারই একটি কাব্যিকরূপ দেখতে পাচ্ছি । কিন্তু একজন মেয়েমানুষের কষ্টকেও কবি তুলে ধরেছেন অদ্ভুত মুদ্ধতায় । এত কিছুর পরও তার প্রিয় টংঘরে আগুন কেন ? কে দিল এই আগুন ? এখানেই আসে সেই উগ্রপন্থীদের কথা । তাদের দ্বারা উপজাতিরাও খুব শোষিত হয়েছিল, একথাও অসত্য নয় । শান্তি সবই টের পায় । কবি শান্তির চোখ দিয়ে দেখছেন

 

                        “শান্তি টের পায় মানুষের চোখে চোখে অন্য এক আগুন

                        কারুর চোখ শুধুই ঘুমায়, ব্রীজের নিচ থেকে

                        সরে যায় কাঠের বিশাল খুঁটিবাজার থেকে

                        সরে যায় চাল, নুন আর কেরোসিন, শান্তির

                        বুকের মধ্যে রাখা পাঁচ টাকার ময়লা নোট আরো

                        ভিজে ওঠে ঘামে, সে জানে না পরিণামে কী হবে

                        কার কার কী হবে ।                    (ঐ)

 

            পাঁচ টাকাটার পর্বে কবি “ময়লা” শব্দটা ব্যবহার করলেন কেন ?  ঘামে ভিজে ওঠে টাকাটা ! বাজার থেকে সরে পড়ছে সব কিছু । এটা কীসের ইঙ্গিত ! কবি দেখছেন একজন আরেকজনের অন্ধকারে ঢুকে পড়ছে । আমাদের চোখ থেকে ঠোঁট বেয়ে নেমে এসেছে লাল অশ্রু । সারা শহর জুড়ে শত কুমারীর অযথা রক্তপাত, আর আগুন, আর অসহ্য বাতাস । কাটা স্তন । বিকৃত যোনি, বিচ্ছিন্ন হাত-পা । তার মানে দাঙ্গা তার চরম রূপ নিয়ে নিয়েছে । কবিকে এই বিকৃতি যন্ত্রণাবিদ্ধ করেছে । একজন মায়ের দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি গোটা বিষয়কে যখন দেখলেন, তখন তার চোখে ধরা পড়ল

 

                        “ফুল পাখি আর বন্দুক সবই মেয়েমানুষের দিকে গেছে,

                        মেয়েমানুষ কোনদিকে গেছে আমরা কেউ জানি না, আমি

                        জানি না, মাঝে মাঝে গভীর রাতে বাড়ি ফিরে এলে

                        শূন্য ঘরময় তাদের গন্ধ পাই”                        (ঐ)

 

            শেষ অবধি একজন মেয়েমানুষ  কারো মা, কারো মেয়ে, কারো প্রেমিকা, কারো শেষ আশ্রয় । আজ ঘর ভর্তি শূন্যতা । কিন্তু এতো এতো অশান্তির পরও কবি আশাবাদীকবি জানেন, ফুলবতীরা, শান্তিরা, হারতে পারে না । তাই শেষ অবধি কবি আবিষ্কার করেন

 

                                                  “পাহাড়ের উপর প্রথম গ্রামটি

                        এই দূর থেকেও স্পষ্ট দেখা যায়, পারী নামে একটি মেয়ে

                        ঐ গ্রামে থাকে, আমি দেখিনি সেই মিজো-যুবতীকে,

                        আমার দেখার কোন অর্থও নেই, যে কোন যুবতীকেই আমার

                        ফিল্ম-স্টারের মত সুন্দরী মনে হয়, আমি জানি ওরা

                        সকলেই একদিন ফুল ফোটাবে, ওরা সকলেই একদিন

                        আড়-চোখে হেসে চলে যাবে যে যার দায়িত্বে, ঠিক

                        যেমন করে ওরা আজও শুধু নিজেদের দায়িত্বে বেঁচে আছে;

                ওরা যে উঁচুতে আছে । মাথা বাঁচানোর দায় ওদেরই বেশি !”      (ঐ)

 

            দীর্ঘ এই কবিতা এভাবেই শেষ হয়, আরও দীর্ঘ আশা নিয়ে । একজন দক্ষ কবির মতোই কবিতাটিকে তিনি শেষ অবধি টেনে নিয়ে গেছেন । যেন একটা উপন্যাস পড়লাম । একের পর এক চিত্রকল্প । কখনও নরম চিত্রকল্প, কখনও ভয়াবহ । কবিতার নামেই মধ্যেই রেখেছেন কবিতার বিষয়যেমন পাহাড়, তারপর ঘুম, ঘুমের বিষয়, ঘুমের ভিতরের যন্ত্রণা, শোষণ, আবার এসেছে দাঙ্গার ভয়ংকর রূপ, প্রেমও এসেছিল কবিতার বুকে, প্রণিপাতও হয়েছেন শেষ অবধি একজন মিজো মেয়েমানুষের কাছে । কেননা, মেয়েমানুষ সব জয় করতে পারে । জীবনকে তারাই দেয় আশ্রয়-প্রশ্রয় । ফুলবতী, শান্তি, পারী, লিলিরা জীবনে প্রাণ সঞ্চয় করে । জীবনকে দেয় সুধা । মাথা বাঁচানোর দায় ওদেরই তাই বেশি ।  

            কবিতার নামটার ভেতরেই কবি নীরবে গেঁথে দিলেন গোটা কাঞ্চনপুর, তার পাহাড়, তার সৌন্দর্য, তার ঘুমপ্রিয়তা, তার দাঙ্গার ভয়ংকরতা, তার সরল বুকখোলা ভালোবাসা, তার প্রণিপাত ।

 

            কবিকে বড় কবিতা নিয়ে প্রশ্ন করেছিলাম“আমি দেখেছি, আপনি বিশেষ করে বড় বা দীর্ঘ কবিতার ক্ষেত্রে বারবার একই কবিতায় একটা ইমেজ বা চিত্রকল্প তৈরি করে, তার পরিবেশ তৈরি হতে হতেই তার থেকে আবার বেরিয়ে পড়েন । এটা কি ইচ্ছে করেই করেন ? না, সহজাতভাবেই চলে আসে ?”

            উত্তরে কবি বললেন“ঠিকই ধরেছ । অনিচ্ছাকৃতভাবেই নিজের দ্বারা সমর্থিত বলতে পারো । একটা তির্যকভাব এনে ছেড়ে দিই । মনে হয়, আর বলা নিষ্প্রয়োজন । মনের মধ্যেই এক ধরনের কোলাজ কাজ করে । লাগাতর সিরিয়েলি বলে যাওয়া আমার ভালো লাগে না । হয়তো এখানে চিত্রকলার কিছু টেকনিক এসে যায় । এক গল্প থেকে অন্য গল্পে চলে যেতে চায় মন । পাঠকের ওপর কিছুটা নিষ্ঠুরতা হয়তো হয়ে যায় এতে লেখার সময় অনেক সময়ই পাঠকের কথা মাথায় থাকে না । ফলে, পাঠক বুঝবে কি বুঝবে না, তখন এসব মাথায় থাকে না । বরং লক্ষ রাখি, আমার বলায়, মানে রচনাগত যাতে কোনো ত্রুটি না-থাকে, তার চেষ্টা করি । পাঠক শেষ অবধি  হয়তো মূল সুরে পৌঁছতে না-ও পারে, কিন্তু কিছু একটা সে বুঝবেই, এমন বিশ্বাস রেখেই লিখি ।”

            সত্তর-দশকের কবি কৃত্তিবাস চক্রবর্তী তাঁর এক লেখায় উল্লেখ করেন“আমি / সম্পদহীন আদিবাসীশরীরে আমার শরীর ছাড়া আর কিছু নেই / কেবলই খাদ্য চাই আমার” কিংবা “আমাকে যে খুঁজতে বেরোবে তাকেও এপথেই আসতে হবেচলে / যেতে হবে গভীর জঙ্গলে কোন আদিবাসী গ্রামে, / সেখানে বিপুল সম্ভার যার নাই তাকে আমি স্পর্শ করতে চাই ।” আদিবাসী জীবনের দুর্দশাবোধ সেলিমের অন্তরাত্মা জুড়ে । তাছাড়া পার্বতী ত্রিপুরার কাঞ্চনপুর সেলিমের জীবন ও কবিতায় এক নতুন ডাইমেনশন এনে দিয়েছে । বলা যায় সেলিমের ভালোবাসা ও বিশ্বাসবোধকে তিনি যেন নতুন করে আবিষ্কার করেছেন ।” (সেলিম মুস্তাফা : বাহান্ন তাসের পর এবং… / কৃত্তিবাস চক্রবর্তী / নান্দীমুখ : জুলাই ১৯৯২)

            কবি কৃত্তিবাস চক্রবর্তীর সাথে একমত পোষণ করে আমিও বলতে চাই, কবি সেলিম মুস্তাফার কবিতার সবচেয়ে বলিষ্ঠ দিক হচ্ছে, তাঁর পর্যবেক্ষণের দিকটা । অভিজ্ঞতার ছাপ তাঁর কবিতাকে ঋদ্ধ করে । কবির কবিতা পড়লেই বোঝা যায়, নিছক শব্দসচেতনাকে কাজে লাগিয়ে এমন কবিতার জন্ম দেয়া সম্ভব নয় । কবি আসলে কাঞ্চনপুরের সাথে সাথে যাপন করেছেন তার প্রকৃতি, মানুষ, রাজনীতি সবকিছুর সাথে

 

                        “গতকাল রাতে ভালবাসার সাথে

                চেয়ার-টেবিল-কাগজ-কলম তুমি গুলিয়ে ফেলেছোতুমি কেঁদেছো

                        কাদের যেন ভালবাসাকাদের প্রতি তোমার ভালবাসা

                                        রক্তে জীবাণুর মত

                        তোমার মুখে আরেকজনের মুখতোমাকে বিব্রত গাছ মনে হয়

                        তুমি আমার দিকে তাকাচ্ছ না

                        তুমি আমার দিকে তাকাচ্ছ না কেন ? তুমি জানো না

                        মৃত্যুর সঙ্গে কান্নার কোন সম্পর্ক নেই

                        আমাদের মায়ের শরীরে ছিল আমনধানের গন্ধ

                        আমাদের প্রিয়ার শরীরে ছিল পানিফল”

                                        (আমাদের প্রিয়ার শরীরে ছিল পানিফল)

 

            কবির আরেকটা দীর্ঘ কবিতা “আমাদের প্রিয়ার শরীরে ছিল পানিফল”এখানেও কবি চমৎকার সব চিত্রকল্প এঁকেছেন । “তোমাকে বিব্রত গাছ মনে হয়”অভিনব প্রয়োগ । এই কবিতার ভিতরেও কবি একের পর এক  কোলাজ এঁকে গেছেন ।

            কবি শুরুই করেছেন এই বলে“কান্না থামিয়ে দাও, ফালতু /...মানুষের জঙ্গলে এত লাশ !” শুরু থেকে কবি আক্রমণাত্মক মুডে ।  তারপরই কবি বলছেন“তুমি জানো না, কান্নার সাথে মৃত্যুর কোন সম্পর্ক নেই । মানুষের জঙ্গলে এত লাশ”—এর মানে কি হতে পারে ? কখন একজন কবি এমন বলতে পারেন ! যখন আমাদের সামাজিক পরিস্থিতি-পরিবেশ মানবিকভাবে আর সুস্থ থাকে না । কবি এই গোটা কবিতায় এরকমই একটি অমানবিক পরিস্থিতির চিত্রকল্প এঁকেছেন কোলাজের মতো । প্রাবন্ধিক তপোধীর ভট্টাচার্যের লেখা থেকে প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করছি“বাক্য, প্রতীক, চিত্রকল্প ইত্যাদি আলাদা আলাদাভাবে তাৎপর্যকে ধারণ করে । আবার এদের পৃথক একক অস্তিত্বের যতই গুরুত্ব থাক, প্রতিবেদনের সামগ্রিকতায় এদের অবস্থান শেষ পর্যন্ত গড়ে তুলে তাৎপর্যকে । সুতরাং তাৎপর্যের অনুশীলন মানে পাঠকের উপলব্ধির সঞ্চরণএক স্তর থেকে অন্য স্তরে পৌঁছাতে পৌঁছাতে পূর্বার্জিত ধারণাকে ভাঙা এবং গড়াএই হলো পাঠকের দায় । কীভাবে পাঠকৃতি থেকে তাৎপর্যের নির্যাস নিঙড়ে নিচ্ছেন তিনি, তার উপর কেবল কবিতার সার্থকতা নয়পাঠকের পড়ার বিশিষ্টতাও নির্ভরশীল । পাঠকৃতি ও পড়ুয়ার নিরন্তর দ্বি-বাচনিকতা যেখানে নেই, কবিতা সেখানে ব্যর্থ ।” (কবিতার রূপান্তর)

            সেলিম মুস্তাফাকে বুঝতে তপোধীর ভট্টাচার্যের এই কথাগুলো খুবই জরুরি । অনুভূতি তার যোগ্য ভাষা খুঁজে নেয় এবং খুঁজতে খুঁজতে, কথনের দৃশ্য ও অদৃশ্য শৃঙ্খল ভেঙে দেয় । এমনও হয় যে, কবিতা বলে এক কিন্তু বোঝাতে চায় অন্য । প্রত্যক্ষতার বদলে আশ্রয় করে পরোক্ষতাকে ।

 

                                    তুমি ভালবাসার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছো হলুদ-বিস্মৃতি, তুমি

                                    জনতার কাছে চাইছো প্রতিকার, বিনীত ইস্তাহার ছাপিয়ে ছাপিয়ে

                                    বিশাল তাঁবুর ভেতর গড়ে তুলছো জারজ-সংসার আর

                                                                                  ঝাণ্ডার মিছিল, আমি

                                    মেয়েমানুষের সঙ্গে করি বাদামি-ব্যবহার, যোনির মত সিরিয়াস

                                    এক অর্থ কিংবা অর্থহীন ভাষায় তোমার দ্ব্যর্থক কবিতা আমি বুঝি না ।

                                                                                                                                    ()

 

            সাহিত্যে বিষয়টা শ্রেষ্ঠ, না, ভঙ্গিটা শ্রেষ্ঠ, কোনটা বেশি রহস্যময় ? এই নিয়ে অনেক অনেক কথা হয়েছে । আলোচনা হয়েছে । একেকজন বিষয়টাকে একেকভাবে নিয়েছেন । কেউ বলছেন বিষয়টা দেহ, আর ভঙ্গিটা জীবন । দেহটা বর্তমানেই সমাপ্ত । জীবনটা চঞ্চল, অসমাপ্ত । সাহিত্যে বিষয়মাত্রই পুরোনো । সে তুলনায় ভঙ্গি বারবার নিজেকে চিরনবীন করে রাখে । সেলিম মুস্তাফার কবিতায় ভঙ্গিটা বেশি প্রাধান্য পায় ।

            এই কবিতায় কবি দুটো লাইনকে বারবার ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে প্রতিফলিত করার চেষ্টা করেছেন, বা মূল থিম করেছেন । শেষ করছেন কবি এভাবেই

 

                        “আমাকে কেবলি আমার

                                        গাছ মনে হয়

                        শরীরে লাফিয়ে নামছে চাঁদ, আমার

                        আমাদের মায়ের শরীরে ছিল আমনধানের গন্ধ

                                        প্রিয়ার শরীরে ছিল পানিফল

                        মাদার ! মাদার !

                        আমার কপালে তুমি চুমু খাও, মা ”        (ঐ)

 

            “আমনধান থেকে পানিফল”অবাক-করা এক চিত্রকল্প । আমনধানের সাথে মায়ের সম্পর্ক, যেন শিকড়ের দিকেই আমাদের নিয়ে গেলেন । মায়ের গায়ের গন্ধের সাথে আমাদের যে নিবিড় সম্পর্ক থাকে, তার সাথে আমনধান শব্দটা জড়িয়ে দিয়ে, চিত্রকল্পকে এমনভাবে কম্পোজ করেছেন যে, মুহূর্তেই মনটা কেমন কেমন করে ওঠে । কল্পনার ফ্রেমে এবার চিত্রকল্পটা ভেবে দেখুন, অদ্ভুত এক ইমেজ তৈরি হয় । আবার পানিফল এক ধরনের ফল, যা পানি ধরে রাখে । এমনিতে দৈনন্দিন জীবনে কোনো কাজে আসে না । ছোটোবেলায় শ্লেট মোছার কাজে লাগাতাম । এখানে জীবনের স্পন্দন হয়েই এসেছে । এই কবিতায় “তুমি”-কে শব্দকে কবি একেক বার একেক অর্থে ব্যবহার করেছেন । বিভিন্ন দিক থেকে “তুমি”-কে তুলে ধরেছেন । এমন কি এই কবিতাটিকেও কবি বিভিন্ন এঙ্গেল থেকে দেখার চেষ্টা করেছেন । কবির শেষ অবধি নিজেকে কেন গাছের মতো মনে হচ্ছিল ? এটাও একটা প্রশ্ন রেখে যায় মনে ! অবশেষে কবি ক্লান্ত পৃথিবীর থেকে, সমাজ থেকে সরে এসে, মায়ের পাশ ঘেঁষে বসে থাকতে চান । প্রিয়ার কাছে চান জীবনের আশ্রয় । পানিফল । কবি এই কবিতায় পাগলের মতো, এক মোহের আবর্তে লিখে গেছেন অবিরত ।  কোনো অর্থ খোঁজার চেষ্টা করেননি কোথাও ।  

            কবি নিজেই দীর্ঘ কবিতার শেষে এই কথা উল্লেখ করে লিখেছেন“এটা কোন সমাপ্ত কিংবা অসমাপ্ত কবিতা নয়, কবিতা কী ? কবিতা কী ? আমার কিছু স্বপ্ন অথবা দুঃস্বপ্ন আছে, তোমারও আছে, আমাদের সকলেই আছে, যার ভেতর আছে হায়েনার নাটকীয় অট্টহাসি, শেয়ালের পদচারণা আর আমার কিংবা আমাদের কান্না কিংবা কান্নাহীনতার নির্ঘুম রাত, যা নিয়ে আমি বাঁচতে চাই বা মরতে চাই জানি নাআমার বাঁচা-মরার সঙ্গে এই পৃথিবীর বাঁচা-মরা মেলে না কিন্তু আমি কিছু চাই, চাই-ই, যার সঙ্গে আমার প্রিয়া কিংবা মায়ের সৌরভ জড়িত; হয়ত বাঁচাতেই চাই, এই পৃথিবীর ভাষায় তাকে কী বলে জানি না, হয়ত স্বাধীনতা বলে, তাহলে স্বাধীনতাই আমি চাইমা-কে চাই প্রিয়াকে চাই !

            যে ক্রীতদাস আমাদের ভাইকে মেরেছে ও মারছে, তার জন্য আমি কবর খুঁড়তে চাই একটা এপিটাফ লিখে যেতে চাই সেই নিরক্ষর খুনীর জন্য !”     

 

            কবির তাঁর কবিতার মর্মকথা এখানেই হয়ত বলে ফেলেছেন । কবির ব্যক্তিত্ব কবিতায় ধরা পড়ে কবিতা কবির ব্যক্তিত্বেরই বহিঃপ্রকাশ । কবিতা লেখা ব্যাপারটা আসলে জড়ের সঙ্গে চৈতন্যের সংগ্রামকবিতার প্রকৃত মূল্য তার নিজের মধ্যেই, বিষয়ে ততটা নয় হয়ত । বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন“সত্য বলে অনুভব করানোই কবির কাজ ” আবু সয়ীদ আইয়ুব যেমন বলেছিলেন“কবিতার বিপুল শক্তির বারো আনাই নির্ভর করে তার সাংকেতিক বৃত্তি অর্থাৎ অর্থ-ব্যঞ্জনা-বৃত্তির উপর ।”

   

“যে ক্রীতদাস আমাদের ভাইকে মেরেছে ও মারছে, তার জন্য আমি কবর খুঁড়তে চাই একটা এপিটাফ লিখে যেতে চাই সেই নিরক্ষর খুনীর জন্য !”  সেই খুন ! তবু তাকে, নিরক্ষর উল্লেখ করে কবি যাবতীয় দুঃখের যন্ত্রণার বোঝা নিয়ে আবার ফিরে গেলেন মানবিকতার জগতে । প্রকৃত শিক্ষার অভাবেই মানবিক হওয়ার বদলে হাতে অন্ত্র নিয়ে খুন করে ফেললএকটা জীবন । একটা স্বপ্ন । কবির ভাই । মানবতার জগতে একটা ফুটন্ত ফুল ।

আসলে প্রাণপণে বাঁচা, বেঁচে থাকাটাই তো আমাদের জীবন । আমাদের উদ্দিষ্ট । যে যেভাবেই আছে সে বাঁচতে চায় । মরতে মরতেও বাঁচতে চায় ।

 

“এইভাবে বেঁচে থাকা হয়

কিছু খেয়ে কিছু না-খেয়ে

কিছু দেখে কিছু না-দেখে

কিছু বুঝে এবং

       না-বোঝার ভান করে

আমাদের বেঁচে থাকা হয় ।

… … … … … … … … … … … …

আমাদের চিৎকার ও আত্মবলিদান

                                                        পাঁঠার মতন

শুধু ভালবাসা আমাদের

মানুষের ।”                (এইভাবে বেঁচে থাকা হয় )

 

আমাদের দৈনন্দিন বেঁচে থাকাকে এভাবেই মূল্যায়ন করলেন কবি । সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার এক অসাধারণ চিত্র অঙ্কন করেছেনকিছু খেয়ে, কিছু না-খেয়ে, কিছু বুঝে, কিছু না-বোঝার ভান করে । এইসব সীমাবদ্ধতার থেকে আমাদের বুঝি মুক্তি নেই । অথচ বিপ্লবের সময় সেই সাধারণ আমাদেরকেই বলির পাঁঠার মতো মরতে হয় । নেহাত বেঁচে থাকার লোভেই বেঁচে থাকা । শুধু ভালোবাসাই আমাদের সম্বল । ভালবাসা ছাড়া কি থাকা যায় ? কিন্তু তারপরও কোথাও যেন সে-ই স্বস্তিও বিঘ্ন হয় । বেঁচে থাকার জন্য একটা পরিকল্পনার প্রয়োজন হয় । সেই পরিকল্পনা আমাদের কোথায় ? আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ সেই পরিকল্পনা কি নিয়েছে ? কবি তাই তার কবিতায় লিখছেন

 

“কোনই পরিকল্পনা ছাড়া এই বাঁচা

সে তোমাকে নয়, আমাকেই

চিহ্নিত করে বারবার,

                                        তুমি কেন জড়াতে আসো সহসা

তুমি কেন ভেঙে দাও তীব্রতা আমার !

 

কেন তুলে ধরো সহজ প্রশ্নমালা ?

জল ধরে না কোথাও, এ-অন্ধকার

সম্পূর্ণ অবারিত, এই রাত

আমি একে স্বাধীনতা জানি”       (যে রাত তুমি কখনো দেখনি)

 

এ-কোন রাতের কথা বলছেন কবি ? কার দিকে আঙুল তুললেন কবি সেলিম মুস্তাফা ! সামাজিক মানুষের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হচ্ছে রাষ্ট্র । পণ্ডিত প্লেটো সেই কবেই দেখিয়েছিলেনব্যক্তির মঙ্গল, অমঙ্গল ও তার নৈতিক উন্নতি, নির্ভর করে রাষ্ট্রব্যবস্থার উপরে । যেখানে রাষ্ট্র অবিচার ও অসাম্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত, যেখানে রাষ্ট্র দুর্বল, যেখানে রাষ্ট্রের পরিচালনার ভার ন্যস্ত হয় অযোগ্য, অপটু, দুর্নীতিপরায়ণ, যেখানে নাগরিকদের রাষ্ট্রের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য নেই, সেখানে ব্যক্তির নৈতিক জীবন বিপর্যস্ত হতে বাধ্য । কিন্তু কবি তার দৃষ্টিতে সে রাষ্ট্র পাচ্ছেন না স্বাধীনতার নামে, তিনি যা পেয়েছেন, তাতে তিনি সন্তুষ্ট নন । সে সমাজ তিনি পেয়েছেন, সেখানে ভালবাসা পাচ্ছেন না । কবি চারদিকে একটা অন্ধকার দেখতে পাচ্ছেন । তাই তিনি লিখছেন

 

“যে রাত তুমি কখনো দেখনি, সে-রাত

আমি কোথাও দেখেছি, আমার হিংসার মত সেই রাত

কখনো উধাও আমার ভালবাসা তাকে

কখনো তাড়িয়ে বেড়ায়, সহজ প্রশ্নমালা, যা সহজে হারায়

তুমি কেন তুলে ধরো নক্ষত্রের মত ! ওরা

নক্ষত্র নয়, তুমি নক্ষত্র নও, আমি নই !”           (ঐ)

 

এই কবিতার আলোচনার বিষয় মানুষ । ব্যক্তিমানুষের সুখ, দুঃখ, আসক্তি, বিরক্তি, বুদ্ধি, ইচ্ছা ইত্যাদির সুষ্ঠ ও সুসংবদ্ধভাবে আলোচনা করে সাহিত্য । কিংবা বিভিন্ন ফর্মের মাধ্যমে সাহিত্যের বিভিন্ন শাখা । ব্যক্তির মনের প্রকৃতি, গতি, কুশলতা, রুচিবিকাশ সামাজিক পরিবেশের উপর বহুলাংশে নির্ভর করে । কবির এই কবিতার বেশির ভাগ জুড়েই সমাজবিদ্যার বা উপলব্ধির এদিক ওদিক জড়িত । কবিকে এখানে অজস্র প্রশ্নমালা তাড়িয়ে বেড়ায় । সহজ কিছু প্রশ্নের উত্তর কবি খুঁজে পাচ্ছেন না ! তাই তো কবি বিরক্ত হয়ে বলছেন“আমাদের চিৎকার ও আত্মবলিদান পাঁঠার মতন ।”  

কবি এই উপলব্ধি মাড়িয়ে গিয়ে লিখছেন

 

“সবই আছে

তবু কেউ মাড়িয়ে যায় –

                                        কেউ মাড়িয়ে গেল;

বিশ্বাস ও ভালবাসা               (কাঞ্চনপুর–দুই)

 

জীবনের পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে কবি বলছেন

 

চৈত্রের

পাতাগুলি ঝরে গেল তারই শ্বাস লেগে । হায় !

এরকম নিঃস্ব অরণ্য আমি এর আগে কখনো দেখিনি”

 

আমি কখনো পড়িনি আমার অন্তর্গত শিলালিপি,

হে বাতাস, আমাকে আরো বেশি উন্মোচিত কর

মানুষের নোনা ঘামে ছিদ্র হলো

মানুষের-ই বুক, ভালবাসা হলো কি হলো-না

জানা গেল না, দূর থেকে দেখা গেল

তার বিস্ফারিত দুরন্ত যোনি ঘন

অন্ধকার ভেদ করে স্বর্গের দিকে ছুটে চলেছে !” (হে বাতাস)

 

গাছের বাতাসই গাছের পাতা ঝরায় চৈত্র মাসেএই চিত্রকল্পটি অসাধারণ । তিনি সাধারণত তাঁর চারপাশ থেকেই কবিতার উপকরণ সংগ্রহ করেছেন । নিঃস্বতার প্রতীক হিসেবেই কবি চৈত্র মাসকে নিয়েছেন । তার সাথে নিজের পরিস্থিতিকে তুলনামূলক পর্যালোচনা করেছেন । মানুষের নোনা ঘামে ছিদ্র হল মানুষের বুক । নোনা ঘামে কাদের বুক ছিদ্র হতে পারে ? সাধারণ মানুষেরই ।

 

“আমি জানি না, আমি দেখি টেবিলে

সাতটি বোতল ওরা পরপর সাজিয়ে রেখেছে, ক্রমে

নেমে এল রক্তে সেই গল্প আর সিঁড়ি, স্বর্গ এল, এবং

এই আসরে আমরা সেই লাঞ্ছিত ঈশ্বরকে আমাদের

পুত্র বলে স্বীকৃতি দিলাম, আমরা

লাথি মেরে গুঁড়িয়ে দিলাম স্বর্গের সিঁড়ি, আমরা

ভেঙে দিলাম একে একে শূন্য সাতটি বোতল

আমাদের পরস্পরের মাথায় । হে বাতাস

আমরা মুক্তি চাই !”  (হে বাতাস)

 

কবি কী তবে একটা সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্তি চাইছেন ? প্রতীকের আড়ালে আসলে, একটা নিঃস্বতাকেই আঁকড়ে ধরেছেন কবি । চারপাশের অস্থির পরিস্থিতি থেকে চাইছেন মুক্তি । বলছেন “আমি মুক্তি চাই । ভালবাসা/ এইবার বিচ্ছিন্নতা হোক !”  

কবি তাঁর কবিতায় বারবার নিজেকেই কেন্দ্রে রেখেছেন । তাঁর চিত্রকল্প সব সময়ই খুব সাধারণ দৃশ্য পাই । ভালোবাসা পাই, বিদ্রোহ পাই । মরে যেতে যেতেও বেঁচে থাকার আস্বাদ পাই । শত দুঃখের মধ্যেও ভালোবাসার সাহস পাই । তাঁর মেয়েমানুষগুলো বড় মায়াবী । তাঁর কবিতায় আমরা বিশালতার পাশাপাশি সীমাবদ্ধতাকেও পাই । তাঁর কবিতায় “আমি” চরিত্রটি কেন্দ্রে অবস্থান করে । মনে হয়, প্রতিটি চরিত্রই যেন আমি । আমি মানে পাঠক । আমাকেই যেন তাড়া করে তাঁর প্রতিটি কবিতা । “আমি” চরিত্রের বিকাশই যেন সেলিম মুস্তাফার কবিতা ।

 

“আমি বেরিয়ে এসেছি এক জঙ্গল থেকে, আমার পথ

আরেক জঙ্গলের দিকে, জীবন যদি ভালবাসার

আমি তা বেসেছি, জীবনে যা ভালবাসার

আমি বেসেছি

একটি নদী আমি ভালবেসেছি ।

শূন্যতা আর অন্ধকার নিয়ে সমুদ্রের মত তার পারাপারহীনতা

আমার বিস্ময় নিয়ে জেগে আছে কত কাল, শুয়ে আছে

আমারই বুকের নিচে কতকাল সে এক

নষ্ট মেয়েমানুষআমারই মায়ের মত কোলে

নিহত সন্তান নিয়ে কতকাল নক্ষত্রের দিকে তার

আরণ্যক চোখ                    (সুবর্ণরেখা যার নাম)

 

আবারও কবিতার মূল সুর আমি বা আমাকে ঘিরে ! এই কবিতা “ছোরার বদলে একদিন” কাব্যগ্রন্থের শেষ কবিতা । কবি কি কাঞ্চনপুরের পাহাড়-জঙ্গল থেকে বেরিয়ে পড়ার আভাস দিচ্ছেন ?  “জীবন যদি ভালবাসার / আমি তা বেসেছি”তা কি এই জঙ্গল জীবনের কথা বললেন ? এই নদী ভালবেসেছি, বলতে কি দেও নদীর কথা বলছেন ? এই দেও নদীরই শূন্যতা আর অন্ধকারের কথা বলছেন কবি ।

আসলে, এই কাঞ্চনপুরের মোহ-মায়ার কথাই বলছেন কবি। “আমারই বুকের নিচে কতকাল সে এক / নষ্ট মেয়েমানুষ”এই মেয়েমানুষের দুঃখ, যন্ত্রণা, তার সংগ্রাম কবিকে বারবার দুঃখ দিয়েছে, আবার তাদের বুকভর্তি ভালবাসা তাঁকে প্রেরণাও দিয়েছে ।  কিন্তু আমাকে অবাক করেছে  “নিহত সন্তান নিয়ে কতকাল নক্ষত্রের দিকে তার / আরণ্যক চোখ”আরণ্যক চোখ-এর চিত্রকল্পটি । মৃত্যু-কে, মৃত্যুজাত যন্ত্রণাকে কবি খুব কাছে থেকে দেখেছেন কিশোরকালেই । তাঁর সে যন্ত্রণা তাঁর পিছু ছাড়েনি আমারই মায়ের মত কোলে / নিহত সন্তান নিয়ে কতকাল নক্ষত্রের দিকে তার / আরণ্যক চোখ–” এই যে এখানে নিহত সন্তান নিয়ে নক্ষত্রের দিকে তার, এই তারশব্দে এখানে জননীকেই উল্লেখ করেছেন কবি চোখটা সেই জননীর কবি কেবল এর আগে ছোট্ট একটি শব্দ বসালেন– “কতকাল” ! এই কতকাল শব্দ ব্যবহার করে কবি অনাদিকালের জননীকে গোত্রভুক্ত করে নিলেন । কোন নক্ষত্রের দিকে চেয়ে আছেন জননী । একজন মা ! কিসের আশায় চেয়ে রয়েছেন অনাদিকাল ধরে ? কীসের অভিযোগ ? নাকি বিচারের অপেক্ষা ! নাকি এক বিস্ময় ?  অরণ্যের মতো সর্বগ্রাসী এক চোখ । সর্বগ্রাসী এক জিজ্ঞাসা ! এই আরণ্যক চোখ”-এর বর্ণনা কোন ব্যঞ্জনা দিয়ে হয়ত বুঝিয়ে বলা যাবে না । পাঠকের মনন অনুযায়ী হবে তার ব্যাখ্যা । এবং তার কাব্যময়তার যাত্রা । অনেক শক্ত ভাবনার ভিত বুনেছেন কবি এখানে ।

অভিজ্ঞতাহীন কবিতা দেখলেই বোঝা যায় এই ধরনের কবিতা লিখতে মানসিক স্থিতির দরকার হয় । সাধনা লাগে । সেলিম মুস্তাফার এই জায়গাগুলো খুব শক্ত বলেই আমার বিশ্বাস । সেলিম মুস্তাফা তার কবিতায় সাঙ্কেতিকতাকে খুব চুপিসারেই লুকিয়ে রাখেন খুব সাবলীলভাবেই সংকেতগুলো রেখে রেখে যান কবি । এই সাঙ্কেতিকতার আড়ালে আঙ্গিক খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা ভূমিকা পালন করে থাকে । নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতিসমূহকে দ্বিবিধ উপায়ে কবিতার ভিতর ব্যবহার করে থাকেন কবি ।

 

“শরীর আমার দুলে ওঠে হাওয়ায়, ভালবাসার প্রতিশব্দ

শরীর ধরে আন্দোলিত হয় প্রতি মুহূর্তে

যত মৃত্যু ঘটে সবই আমার, প্রতিটি মৃত্যুর আগে

একই গান নরকের মতো বেজে ওঠে রক্তেআমি

সাহসী নই, দেবতার বিন্দুমাত্র ছায়া নেই

আমার শরীরে, আমার ভালবাসার

নেই কোন মৃত্যুঞ্জয়ী নাম ।”          (ঐ)

 

কবি সহজে ধরা দিতে চান না, পাঠকের কাছে । পাঠকের সাথে বারবার এক লুকোচুরির খেলায় মেতে ওঠেন । যদি আপনিও পাঠক হিসেবে জড়িয়ে পড়তে পারেন, তাঁর লুকোচুরির ফাঁকে ফাঁকে তাহলে পৌঁছে যাবেন আনন্দ-বেদনার এক বিচিত্র বহুমুখী সাহিত্যরসের জগতে । ভালোবাসায়, আনন্দে, বেদনায় তখন সে কবি হয়ে উঠবেন আপনার একান্ত প্রিয়জন । যাকে হয়ত দেখেননি । তাতে কী এসে যায় ! এ সম্পর্কে জাগতিক কোনো লেনদেন নেই । অনেক প্রিয় কবিকে চাক্ষুষ দেখতে গিয়ে হতাশ হয়ে ফিরে আসতে পারেন । চিত্রকর দালি যেমন তাঁর প্রিয় ভাবুক ফ্রয়েডের সঙ্গে দেখা করার পর তাঁর চিন্তা, চেতনা, তাঁর ক্যানভাসে আর স্থান দেননি, যা এতদিন ধরে তাঁর ক্যানভাসে, ভাবনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে আসছিল । সাক্ষাতে এমন মোহভঙ্গও হতে পারে । অথচ সব সময় তো আমরা কেবল ব্যক্তিকে দেখি না ভালোবাসি তাঁর কবিতাকে, তাঁর প্রকাশ ক্ষমতাকে ।

 

“তবু, সে আসে, কোন সোনালি ঝড়ের মতো

রাতভর রূপালি করাত আর রক্তজবার গাঢ় অন্ধকার

আমাকে আমার চেয়ে বন্য করে তোলে, ভালবাসা

মৃত্যুর চেয়েও সত্য হয়ে ওঠে ।”             (ঐ)

 

রবীন্দ্রনাথ থেকে জীবনানন্দের দূরত্ব ছিল কতটুকু ? আমাকে যদি উত্তর দিতে বলেন, আমি বলবোযতটা দূরত্ব হয় একটা একটা দীর্ঘশ্বাসের । মূলত, দৃষ্টির দূরত্ব । আমাদের রবিঠাকুর আনন্দ খুঁজেছেন সারাজীবন । দুঃখের মধ্যেও, বেদনার মধ্যেও জীবনকে বারবার নেড়েচেড়ে দেখেছেন, জীবনের কোথায় কোথায় আনন্দ আছে । সুখে-দুঃখে তারই সন্ধান করেছেন আজীবন । জীবনানন্দ আবার শুরু করেছেনএকটা দীর্ঘশ্বাস দিয়ে । তাঁর একের পর এক কবিতা, উপন্যাস, ছোটোগল্প, মূলত একটা দীর্ঘশ্বাসকেই বহন করে চলেছিলেন তিনি । তাঁর জীবনের উচ্ছ্বাসের ভিতরেও কোথাও যেন একটা  দীর্ঘশ্বাস, ক্লান্তি খুঁজে পাওয়া যায় । এই ক্লান্তি থেকে কিন্তু শেষ অবধি তিনি উঠে আসতে পারেননি । আমাদের সেলিম মুস্তাফাও তেমনি বারবার মানবিকতার কাছে ফিরে ফিরে আসেন । গাঢ় অন্ধকারেও ভালবাসা পেলে, কবি সব দুঃখ  ভুলে যান । আবার কোথাও গভীর যৌনতার ভিতরেও শোকাশ্রয়ী হয়ে পড়েন ।  

 

মেয়েমানুষকে

ভুলে যেতে হবে তাঁর প্রিয় শরীর ও সংগীত, ফুলকে সেদিন

ফুটতে হবে শুধুমাত্র কবরের কাছেঅন্ধকারে ফুল সেদিন

শুধুই ফুল, সেদিন

শুধুই ফুল, সে দিন আমি আর চিৎকার করে বলতে পারব না

আমার ভালবাসা আর আসন্ন সন্ধ্যায় কিছু

হারিয়ে ফেলাবলতে পারব না

আমি হারিয়ে ফেলেছি সেই নদী

                        সুবর্ণরেখা যার নাম ।”                (ঐ)

 

আজ কি কবি হতাশ । কেন হতাশ বুঝতে পারছি না । যুদ্ধের মধ্যেও যিনি জন্মের কথা ভাবেন, তিনি কেন আজ হতাশ ? পরিস্থিতি কি সত্যিই হতাশার দিকে! তাই কি কবি আবার এমন এক চিত্রকল্প ফুটিয়ে তুলতে গেলেন, যা আপাত নীরব, কিন্তু এ-নীরবতার অর্থ হতাশাজনক । এ-নীরবতা যেন ভালবাসা-হারা মানুষের নীরবতা । এখানে ফুল ফুটে আছে, কিন্তু কেউ তাঁকে গ্রহণ করছে না । গ্রহণের উৎসাহ পাচ্ছে না প্রেমিক কিংবা প্রেমিকা । ফুলটা অর্থহীন হয়ে পড়ে রয়েছে প্রতিবাদের ভাষাও হয়ে পড়েছে নীরব । কবি তাঁর  হতাশার চিত্রাঙ্কন করেছেন ।

     

        সেলিম মুস্তাফা আগাগোড়াই একজন সিরিয়াস কবি । তাঁর কবিতায় তাঁর জীবনের যাত্রাই ফুটে উঠেছে বারবার । “বাহান্ন তাসের পর” কাব্য থেকে শুরু করে এখন ২০২০ সাল পর্যন্ত কবির জীবনই তাঁর কবিতার বিষয় । তিনি তাঁর জীবনের যাত্রাপথে যা যা শুভ এসেছে, অশুভ এসেছে, ভালো-মন্দ এসেছে, অকাতরে তা-ই তাঁর কবিতার বিষয় হয়ে এসেছে । কবি জীবনানন্দের দাশের “কেউ কেউ কবি, সকলেই কবি নয়” এই বাক্যকে কবি সেলিম মুস্তাফা তাঁর এক নিবন্ধে লিখছিলেন এই রকম করে

“একজন মানুষ কোনো কোনো সময় কবি, সকল সময় নয় ।” বাক্যের এই বিনির্মাণ আমার দারুণ লেগেছে । এখানে কবি সম্পর্কে অনেক বিতর্কিত প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাচ্ছি আমরা । আমরা অনেক সময়ই বলি, তিনি কবি হয়ে কী করে, এই কাজটা করতে পারলেন ? এই নানা ধরনের কথাই আমরা প্রয়োজনবোধে অনেক সময়ই বলে থাকি । আসলে একজন কবি কি সব সময় তাঁর কবি-সত্তায় থাকেন ? বা থাকা যায় ! থাকা কি সম্ভব ?  হয়ত সব সময় তাঁর কবি সত্তায় থাকতে পারেন না । পারা সম্ভব নয় । যখন থাকেন, যতক্ষণ থাকেন, ততক্ষণই তিনি কবি । তখনই তিনি কবিতা লিখতে পারেন । কিংবা লেখার চেষ্টা করেন কিন্তু যেই তাঁর ধৈর্যে, আচরণে, জীবনে বিচ্যুতি ঘটে, তখন তিনি কিন্তু আর কবি থাকতে পারেন নাসেই সত্তা থেকে স্খলল ঘটে তাঁর । তাই মাঝে মাঝে কবির মুখেই শুনতে পাওয়া যায়, “আমি কবি, তাতে কী হয়েছে ! আমার কি দোষ-ত্রুটি থাকতে পারে না । আমার লোভ-কাম-ক্রোধ থাকতে নেই ? আমি তো সাধারণ লোকের মতই । মাঝে মাঝে কি হয়ে যাই, তখন কবিতা লিখে ফেলি ।” কথাগুলো নিঃসন্দেহে বিবেচনা করে দেখা যেতে পারে । যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে তাতে ।

সাধারণ মানুষ কবি-সাহিত্যিকদের অন্যরকম একটা মর্যাদা দিয়ে থাকেন । কিন্তু আমরা সবসময় তার যোগ্য হয়ে উঠতে পারি না বোধ হয় ! এটা আমাদের বা কবি সাহিত্যিকদের দুর্বলতা হতেই পারে । কবিদেরও মুখোশ থাকে । অনেকক্ষেত্রে সাধারণ মানুষদের থেকে বেশিই থাকে । সব শিল্পেই থাকে । সবসময় শিল্পবোধ নিয়ে থাকতে গেলে যে সাধনার প্রয়োজন সেটা অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয়ে ওঠে না । কবি অর্থে ঋকবেদের সেই “ঋষি” শব্দ আজ কোথায় ?

তবে সিরিয়াস প্রত্যেক কবিরই জীবন সম্পর্কে একটা স্পষ্ট কমিটমেন্ট থাকে । থাকাটা দরকার । আমি মনে করি, কবি হিসেবে, সেলিম মুস্তাফার সে কমিটমেন্ট আছে ।

 

সেলিম মুস্তাফার “ছোরার বদলে একদিন” কাব্যগ্রন্থের যদি মূল সুরকে ধরি তাহলে, দেখবো একটা বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হই আমরা বারবার, রাজনীতি বলুন, সামাজিক জীবন বলুন, ব্যক্তিগত ঘর-সংসার বলুন, প্রেমের স্থিতিশীলতা, অস্থিতিশীলতা বলুন,সব অর্থেই পরিস্থিতি বিব্রতকর । কবি কখনও দেখা যাচ্ছে ভীষণ রকম আশাবাদী, আবার কখনও দেখা যায় হতাশায় মৌন । এরই মধ্যে দিয়েই তাঁর কাঞ্চনপুর এগোচ্ছিল । প্রেম এগোচ্ছিল । অপ্রেম  এগোচ্ছিল । যন্ত্রণা মেলছিল তার পাখা । এভাবেই কবি তাঁর মন-মানসিকতা, কাব্যবোধ, জীবনদর্শন বোধ তুলে ধরেছেন তাঁর “ছোরার বদলে একদিন” কাব্যগ্রন্থে ।

 

প্রদীপ চৌধুরী আগেই সেলিম মুস্তাফা সম্পর্কে বলেছিলেন“সেলিম যতটা বিপ্লবী (শিল্পী মাত্রেই বিপ্লবী ) ততটাই বিষণ্ণ সারাদিন শ্রমিকের অন্ধ ক্রোধে যে যত শব্দ চূর্ণ করে, তা শেষ হবার আগেই তার চেয়ে বেশী শব্দ সে সৃষ্টি করে । সেলিম বিপ্লবী কিন্তু বিদ্রোহীর নির্দিষ্ট ঝাণ্ডা সে কাঁধে তুলে নেয় না । কারণ সমস্যা সমাধানের চেয়েও তার কাছে বেশী জরুরী জীবনের সাজঘরে অবাধ প্রবেশ । কখনো অনুপ্রবেশ ! সে নিয়ন্তা নয় তাই, জীবন ও জীবিত মানুষ তার সামনে উলঙ্গ হয়ে রহস্যলালিত শরীরের সব গোপন প্রদেশগুলি খুলে দেখায়সবচেয়ে রহস্যময় প্রদেশ আত্মা ! সেলিম দেখে, কিন্তু জীবনের উপর কোনো সিন্থেটিক আদর্শের জামা পরিয়ে দেয় না । বরং তার কবিতাগুলি তার দেখা জীবনের প্রথমে প্রতিচ্ছবি এবং পরে বিকল্প জীবন হয়ে ওঠে জন্ম মৃত্যু নদী পাখি সুখ ভালোবাসা সীমাহীন বেদনাযতই বর্জনীয় বলা হোক এসব যে আদৌ বর্জনীয় নয়...সেলিমের কবিতা পড়তে পড়তে এসব সত্য মনে হয় । কবির সত্য এভাবেই  পাঠকের সত্যকে প্রভাবিত করে ! আমি সেলিমের একজন ভক্ত পাঠক ! সেলিমের সম্প্রতি প্রকাশিত কবিতাগুলি পড়তে পড়তে আমি বুঝতে পারি তার অনুপ্রেরণার উৎস কোথায় । ১৫ বছর আগে ওর সঙ্গে যোগাযোগ না ঘটলে আমাদের দু-জনেরই কি দারুণ ক্ষতি হয়ে যেত

সেলিমের ভাষা এবং বিচরণভূমি এমনই যে সিদ্ধান্ত নিতে অসুবিধা হয় । কবিতাগুলি পড়তে পড়তে আমার মত দুষ্ট, চিহ্নিত সাবালককেও কখন সেলিমের ফাঁদে বহুসময় আটকে পড়তে হয়তার অভ্যুত্থানক্ষম কুশীলবদের একজন হয়ে যেতে হয় । প্রশ্ন তীব্রতা হারাতে হারাতে একসময় কবিতার মধ্যে বিলীন হয়ে যায় । সেলিম সম্পর্কিত ছোট একটি লেখায় আমার বাল্যবন্ধু কবি (অথবা অকবি) অরুণ বণিক লিখেছিল “আমাদের মধ্যে এসে গেছে এক স্বভাব কবি, পট হাতে ভ্রাম্যমান এক ব্যালে সিঙ্গার”সমালোচকের ভাষায় অরুণ অকবি, সেজন্যই হয়তো সেলিমের গোপন ব্যাপারটা অরুণ সহজে ধরতে পেরেছিল ।

কিন্তু, আমি অরুণকে জিজ্ঞাসা করেছি : অরুণ, ব্যালে সিঙ্গাররা কি খুন করে না ? আমি কিন্তু যতই সেলিমের কবিতা পড়ছি, ততই প্রায়-নিশ্চিত হচ্ছি ভালোবাসা বা সঙ্গীত নয়, সেলিমের প্রধান প্রবণতা হচ্ছে খুন । রসসিক্ত মধ্যবিত্তদের, “আনন্দম” এর কর্মচারী লেখকদের হন্তারক হিসাবেই আমি সেলিমকে চিহ্নিত করেছি । গৃহপালিত মধ্যবিত্ত / মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের ভাষায় শুয়োরের বাচ্চা গেরিলা সে, তাই জঙ্গলই তার স্বাভাবিক আশ্রয় । জঙ্গল ও জঙ্গলবাসীদের সুখদুঃখ সেলিমের নিজস্ব সুখ-দুঃখ । মধ্যবিত্তদের কাছে যা উপকথাতা-ই সেলিমের “কাব্যকথা” ঋত্বিকের চলচ্চিত্রের মতো এই অরণ্যের গাছপালারা “মানুষের মতো শব্দ করে” জীবনানন্দ বর্ণিত ঐ একই কবিতায় (জীবন) অরণ্যের গাছপালা ও অরণ্যবাসীরা “মানুষের মনে পিপাসাকে” আরো তীব্রতর করে তোলে । প্রবেশপত্র ছাড়াই এই জঙ্গলে ঢুকে পড়া ছাড়া একে জানার আর কোনো বিকল্প উপায় নেই ।”

প্রদীপ চৌধুরীর মতো চাঁচাছোলা সমালোচকের কাছে থেকে এই দীর্ঘলেখা কবি সেলিম মুস্তাফার জীবনে এক চরম প্রাপ্তি বলেই আমি মনে করি । প্রদীপ চৌধুরী সেলিম মুস্তাফার কবি-সত্তার মর্মকথাই বলে দিয়েছেন তাঁর  উক্ত লেখায় । সেলিম মুস্তাফা এমন প্রশংসার দাবি রাখেন । এবং এটা তাঁর প্রাপ্য বলেই আমি মনে করি ।

 

কবি সেলিম মুস্তাফার “বাহান্ন তাসের বদলে” কাব্যসহ তাঁর চারটি কাব্যের আলোচনা করতে গিয়ে কবি কৃত্তিবাস চক্রবর্তীর পুরনো একটি অতিমূল্যবান লেখা আমার হাতে আসেলেখাটি বেরিয়েছিল ত্রিপুরার বিখ্যাত লিটিল ম্যাগাজিন “নান্দীমুখ” ২৫ বর্ষ ৩য় ও ৪র্থ সংকলন জুলাই ১৯৯২ সালে সেলিম মুস্তাফা : বাহান্ন তাসের পর এবং” এই শিরোনামে গুরুত্বপূর্ণ এই লেখাটি ছিল । সেই লেখাটি পুরোটাই এখানে উল্লেখ করতে চাইছি আবশ্যিক বোধে  কেননা, কৃত্তিবাস চক্রবর্তীর কবিতার মেজাজ সেলিম মুস্তাফা থেকে ভিন্ন এক মেজাজ এবং আঙ্গিকের । তাই তার বিশ্লেষণ বিশেষ এক মর্যাদা দাবি করে স্বাভাবিকভাবেই । সেলিম মুস্তাফাকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন তিনি । যা নিঃসন্দেহে কবির এক গুরুত্বপূর্ণ প্রাপ্তি

সেই অর্থেই কবি কৃত্তিবাস চক্রবর্তীর দীর্ঘ লেখাটির বড় একটা অংশ এখানে উল্লেখ করছি “মধ্য সত্তরে, যখন স্থানীয়ভাবে কবিতা চর্চা একদল তরুণের আন্তরিক চেষ্টায় চর্চাসফল হতে চলেছে, যে-মুহূর্তে স্থানীয় কাব্যচর্চা “কলকাতা কেন্দ্রিক”এই অভিধা থেকে মুক্তির চেষ্টায় প্রাণপণ সংগ্রাম-মুখর, যখন চেহারা-চরিত্রে-অবয়বে-ভাষায়-বক্তব্যে স্থানীয় ছোট পত্র-পত্রিকাগুলো স্বাতন্ত্র্যের অভিমুখীনিঃসন্দেহে কবি সেলিম মুস্তাফাও সেই সময়ের একজন সহযোদ্ধা । প্রসঙ্গত বলতে দ্বিধা নেই, চল্লিশের দশক থেকে এ রাজ্যে কাব্যচর্চার উদ্গম হলেও পঞ্চাশ, ষাট পর্যন্ত বৃহত্তর বাংলা সাহিত্যে যুক্ত হবার মতো স্পর্ধিত তেমন কবিতা তখনও লেখা হয়নি । ব্যতিক্রমটা ঘটে মূলত সত্তরের গোড়ার দিকদ থেকে । একথা বলছি না যে ঠিক সেই সময়ই লেখা হয়ে গেছে একেবারে নতুনভাবে ভিন্ন কোন লেখা, কিন্তু নতুন করে ভাবনার চিন্তার ঝোঁকটা মূলত সেই সময় থেকেই । 

কবি সেলিম মুস্তাফা নামের এক তরুণ তখন হাত খুলে লিখছেন । বলা যায় একেবারে বাছ বিচারহীন বিচিত্র বিষয় শব্দে-ভাষায় বন্দি হচ্ছে সেলিমের কলমে । একেবারে মক্সো পর্যায়ে, যখন প্রতি মুহূর্তের অভিজ্ঞতাই কবিকে নাড়া দিচ্ছে বিভিন্ন ভাবে, আঘাত করছে, সমৃদ্ধ করছে, তিনি দেখছেন পড়ছেন, শিখছেনঠিক সেই সময় এবং কিছুটা অপ্রত্যাশিতভাবেই, আচমকা সেলিম আমাদের উপহার দিলেন একটি মাত্র দীর্ঘ কবিতার একটি পুস্তিকা “বাহান্ন তাদের পর” চমক তো বটেই, কেননা এ রাজ্যে দীর্ঘ কবিতা তেমন উল্লেখযোগ্যভাবে চোখে পড়েনি তখনও; তাছাড়া স্বয়ং সেলিমও এর আগে আমাদের সংক্ষিপ্ত লেখাই পড়িয়েছেন । ফলে, স্বাভাবিক কারণেই বাহান্ন তাসের পর’ তরুণ-প্রবীণদের মধ্যে আলোচ্য হয়ে উঠেছিলো । এই কাব্য-পুস্তিকা সেলিমের মুক্ত, স্বতঃস্ফূর্ত বোধের এক বিস্ফোরণ বলা যায় । সেটা কতদূর পরিশীলিত, আধুনিক, ভাষা ও শব্দের বিন্যাস ও যোজনা কতখানি যুক্তিগ্রাহ্য সে আলোচনায় আমরা পরে আসছি ।

আমাদের আলোচনার যে সময় পরিধি সেটা বাহান্ন তাসের পর’—এর প্রকাশকাল ১৯৭৮ থেকে ১৯৯১এই বারো-তেরো বছরে কবি সেলিমের ধারাবাহিক পরিশ্রমের অভিজ্ঞতার যোগ-বিয়োগ, তার উত্থান-পতন, এই সময়-সমাজ-দেশ-কাল-রাষ্ট্রের প্রেক্ষিতে তিনি কতদূর যৌক্তিক অর্থাৎ তার কবিতার উপজীব্য সামগ্রিকতাই আমরা তলিয়ে দেখার চেষ্টা করবো ।

সেলিমের এযাবৎ প্রকাশিত মোট চারটি কাব্য গ্রন্থপাঠের পর এটা উপলব্ধিতে আসে, যে তুরুপের তাসটি তিনি লুকিয়ে রেখেছিলেন সেটি নিঃসন্দেহে তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ “ছোরার বদলে একদিন” যা ১৯৮৪ সালে প্রকাশিত হয় । মূলত এটাই সেলিমের টার্নিং পয়েন্ট যেখান থেকে সেলিম এগিয়েছিলেন অনেক দূর । এখানেই  জীবনের মূল জিজ্ঞাসা ও উত্তরগুলো তিনি খুঁজতে চেয়েছেন । এখানেই ধরা পড়ে তার যাবতীয় দ্বিধা, দ্বন্দ্ব, ধরা পড়ে সাজানো-গোছানো তথাকথিত ড্রয়িং রুমের মতো সেলিমের জীবন নয়; “কোন পরিকল্পিত জীবনের আমি নই”সেলিম বুঝেছেন জীবন খুব সাংঘাতিক রকমই বক্র, কোন সহজ সাবলীল সরল রেখা নয় । ফলে সেই জীবনের রহস্য খুঁজতে কিছুটা বোহেমিয়ান প্রকৃতির সেলিম চলতে থাকেন কঠিন চড়াই-উৎরাইগুলো, চলতে চলতে একসময় ঢুকে পড়েন মানুষের গভীর অরণ্যের অন্তরে । এখানে এসেও যেন ঠিক পরিতৃপ্তি ঘটে না তার । তিনি সঠিক নির্ণয় করতে পারেন না “মানুষের ভালোবাসা, মানুষের খুন, মানুষের অন্ধকার মানুষের আলোর পিপাসা । আদৌ কোন মানুষের কিনা” কিন্তু এই অপরিতৃপ্তি সত্বেও মানুষের থেকে দূরে সরে যান না তিনি । কেননা তিনিও বিশ্বাস করেন সবার ওপরে মানুষই সত্য পরিশ্রান্ত মানুষ, ধ্বস্ত ভাঙাচোরা মানুষ, “শয়তান” “নরম মানুষ” “ফেরারী মানুষ” শোষিত, ষড়যন্ত্রকারী, সৎ, সবার দরজায়ই কড়া নাড়েন সেলিম, রীতিমতো সশব্দেই জেগে উঠতে চান । পাশাপাশি এই অরণ্য প্রকৃতি, জল-মাটি-পাহাড়-সমুদ্র-বাতাসে মিশে থেকে, সর্বোপরি মানুষের অন্তরে মিশে থাকতে চেয়েও তার আফশোষ থেকেই যায় । হয়ত ঠিক যতদূর কাছে থাকলে তিনি মানুষের প্রকৃত বন্ধু হতে পারেন তার থেকে তিনি অনেক দূরে । দ্বিধাগ্রস্ত সেলিমের উক্তি “মানুষকে বলি না আর/ সরে যাও, হটো !/ মানুষকে বলি না আর/ কাছে এসো, বসো ।/ ও-দুটো বলতে যত কাছে যেতে হয়/ আমি তার থেকে বহু দূরে আছি ।”

মনে হয়, এই আর্তি থেকেই কারও খুব বড়ো মাপের মানুষ হয়ে ওঠা সম্ভব । সমগ্র কাব্যগ্রন্থ জুড়েই আছে সেই মানুষ ও মনুষ্যত্বকে ছোঁয়ার এক প্রবল আকুতি । আবার সেলিম অনায়াসেই দেখতে পারেন মানুষরূপী সেই জীবের ভেতরে “হায়েনার হাসি”, শয়তানের ক্রুরতা ও ধূর্তামিপাশাপাশি তিনি দেখেন সমগ্র মনুষ্যসমাজের এক বৃহত্তর অংশের চোখের জলব্যথার অশ্রুই যাদের সম্বল । অনুভব করেন ভুখা পেটের যন্ত্রণাময় পাকস্থলীর ক্ষুধা নিবৃত্তির চেষ্টায় যার “হাত ভাতের দিকে চলে যায়’সেলিম বলে ওঠেন “নরম একটা শব্দের নাম ভাত ভাতের গন্ধে আমি পাগল হয়ে উঠেছি ...।”

এখানেই শেষ নয়, চারদিকের এই ক্ষুধা, অবিশ্বাস, সন্দেহ, ষড়যন্ত্র, বিভীষিকাময় রাত্রিএ থেকে এক উত্তরণের কথাও তিনি বলেন । সেলিম পুরোমাত্রায় আশাবাদী, ফলে গভীর অন্ধকারের ভেতর তিনি অনুভব করেন এমন এক “বীজের ফুটে ওঠা যে বীজ থেকে অঙ্কুরিত হবে এমন এক নতুন জীবন, যে জীবনে থাকবে না কোন অবিশ্বাস ভয় সন্দেহ ক্ষুধা বা হাহাকার, থাকবে নিরাপত্তা, এক মহৎ সুন্দর আনন্দ-উজ্জ্বল পরমায়ু নিয়ে বেঁচে থাকা এক সুখী সমাজ ।  সেলিম মানুষের সেই সামগ্রিক বিপ্লবে বিশ্বাসী । সেই বিপ্লবের দীর্ঘজীবন কামনা করেন তিনি । তথাকথিত সৌখিন মেকী “বিপ্লবী” ভেল্কিবাজ রাজনীতিকদেরযারা পেট পুরে খেয়ে সর্বহারার ঢেঁকুর তোলেনতাদের বিরুদ্ধে ক্রোধে জ্বলে ওঠা সেলিম তীব্র ধিক্কার ও বিদ্রুপে ফেটে পড়েন ।  “প্রস্তুত থাকুন, / ভালোবাসার মুখোমুখি এসেই আমরা / টার্ন করবো বিপ্লবের দিকে / এবং সূর্যাস্তের সঙ্গে-সঙ্গে / মার্চ করবো শহরের দিকে কমরেড / গায়ের চামড়া দিয়ে ততক্ষণ / বারুদগুলো ঢেকে রাখুন ...।”

প্রসঙ্গতঃ সেলিম জীবনের সিংহভাগই এই পার্বতী ত্রিপুরার জল-বায়ু-শস্যের লালন-পালন বাৎসল্যে বেড়ে  উঠেছেন । ফলে, তার পায়ের নিচে যে মাটি এবং সে মাটিতে মাখামাখি যে জীবন তাকে কতটুকু চিনেছেন, বুঝেছেন সে দিকটাও আমরা যাচাই করে দেখতে পারি ।

একটা সার্বিক জিজ্ঞাসা এই মুহূর্তে খুবই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে যে এ রাজ্যে যারা দীর্ঘদিন ধরে লিখেছেন তাদের লেখ্য বিষয়ে ত্রিপুরা নামের এই ভূখণ্ডের কতটুকু পরিচিতি মেলে ?  আমি বলতে চাইছি এই ত্রিপুরার পাহাড় অরণ্য ও মানুষ, এই অঞ্চলের উপেক্ষিত অথচ উল্লেখযোগ্য কৃষ্টি ও সংস্কৃতি, দেশভাগের পর ওপার বাংলা থেকে আছড়ে পড়া ক্রমবর্দ্ধমান উদ্বাস্তুর ঢেউয়ে গড়ে ওঠা যে মিশ্রভাষা ও সংস্কৃতি তার কতদূর আন্তরিক স্পর্শ মেলে স্থানীয় কবিতা-গদ্য-গল্পে ? মনে হয় জিজ্ঞাসাটা অবাস্তব কিছু নয় ।

না, কবি সেলিম মুস্তাফা অন্তত এ ব্যাপারে নিরাশ করেননি আমাদের । তার কবিতায় খুব প্রত্যাশিত ভাবেই এসেছে এই অঞ্চলের মাটি ও মানুষের ঘ্রাণ ।

...“উত্তুঙ্গ জম্পুই আজ বিষ খাওয়া যুবতীর  মত নীল হ’য়ে আছেকিংবা “কাঞ্চনপুরের জঙ্গলের পাশে চাঁদ / কাৎ হয়ে পড়ে আছে” ... “সর্বত্র ঝরে পড়ছে রাতের সমস্ত রূপালি, প্রায় দু’শ গজ দূরে শালবন, শালের / পাতাও এনামেল করা রূপালি, আমি / একটা কবিতা লেখার জন্য তছনছ হতে থাকি” অন্যত্র “ প্রতিটি গর্জন কাঠ / নির্জনে ফেটে গিয়ে হা হয়ে থাকে...”

        এইরকম  অনেক পংক্তিমালা চিত্রকল্পে এসেছে সেলিমের কবিতায় । এসেছে ফুলবতী রিয়াং-এর কথা, তার টংঘর, এসেছে “যারা শুধু হাট-বার দুপুরবেলা / পিঠে ঝুড়ি নিয়ে ঝুঁকে ঝুঁকে নেমে এসেছিল / এক হপ্তার কেনাকাটা করতে...”

        প্রশ্ন হলো, এরকম দু’চারটে চিত্রকল্প, জম্পুই বা টং ঘরের বিবরণ শুনিয়েই যদি সেলিম থেমে যেতেন তাহলে নিঃসন্দেহে এক কৃত্রিম ও ভণ্ড দরদী বলে তাকে চুটিয়ে গাল দেয়া যেতো । কিন্তু সে সুযোগ সেলিম দেননি আমাদের । এক আদি ও অকৃত্রিম হৃদয় তার পড়ে থাকে ত্রিপুরার ত্রিপুরার পাহাড়-জঙ্গলে, নদী ও ছড়ায়, মাটি ও মানুষের মধ্যে । দিনের পর দিন রক্তচক্ষুর শাসনে-শোষণে রিক্ত হয়ে যাওয়া ভুখা নিরক্ষর আদিবাসীদের যন্ত্রণা তিনি অনুভব করেন নিজের ভিতরে ।” 

 

        উপরে কৃত্তিবাস চক্রবর্তীর আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারি, সমসাময়িক কবিরাও কীভাবে কবি সেলিম মুস্তাফাকে মূল্যায়ন করেছিলেন । তৎকালীন নান্দীমুখ-এর মতো ম্যাগাজিনে এই আলোচনা এক অর্থে কবির বড় প্রাপ্তি । গ্রুপ সেঞ্চুরি-র গুরুত্বপূর্ণ কবি কৃত্তিবাস চক্রবর্তী । অন্যদিকে হাংরি সাহিত্য ভাবাদর্শে প্রভাবিত কবি সেলিম মুস্তাফা । দুটো ধারাই তখন ত্রিপুরার সাহিত্য আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে সেই অবস্থায় কৃত্তিবাস চক্রবর্তীর এই আলোচনা বিশেষ গুরুত্ব রাখে । 

 

সমাবর্তনআগরতলা বইমেলা সংখ্যা ১৯৯৪ সাল-এ তীর্থঙ্কর দাস পুরকায়স্থ সেলিম মুস্তাফার কবিতা নিয়ে একটি মন্তব্য করেন “সেলিম মুস্তাফার কবিতা, বলতে দ্বিধা নেই, আমাকে মুগ্ধ করেছে।... সেলিম মুস্তাফার কবিতায় হিংস্র সময়ের নিঃশব্দ উপস্থিতি টের পাই, আছে স্বপ্ন আর কামনার টানা-পোড়েন, নীরব আত্মবিক্রয়ের বিনিময়ে বেঁচে থাকার পরিহাস, নিহত শরীরের পিঠে চন্দ্রালোক আর তারপরেও চমৎকার বেঁচে থাকা ।” সংক্ষেপে অপূর্ব মূল্যায়ন করেছেন আলোচক ।

 

 

 

                                        দুই

 

বিংশ শতকের প্রথম দশকে তিনটি বেগবান ধারা এসে সম্মিলিত হয় কথাসাহিত্যে প্রভাবিত হয় কবিতা শিল্পও । পরিবর্তিত হয় মানুষের প্রকৃতিও । মানুষের মূলগত প্রকৃতির হয়ত কোনো পরিবর্তন হয়নি কিন্তু তার জীবনবোধ, মূল্যায়ন-প্রকৃতির পরিবর্তন হয় । বস্তুকে পারিপার্শ্বিকতা থেকে মুক্ত করার প্রচেষ্টা শুরু হয়ে যায় । সাহিত্যিকরা বিশেষ একটা মানসিকতা থেকে জগতকে দেখার চেষ্টা করতে থাকেন ভিয়েনার ফ্রয়েড তাঁর মনোবিজ্ঞনের নতুন তত্ত্ব প্রকাশ করেন এ সমস্ত কারণ ও তৎকালীন অবস্থা একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মানুষ তখন খুব আত্মসচেতন হয়ে ওঠে । আমরা মানুষকে দেখতে পাই পারিপার্শ্বিকতার সৃষ্টি হিসেবে । প্রকৃতিবাদ ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছিল । মানুষের জীবনের উপলব্ধি-অনুভূতি কেবলমাত্র কিছু ঘটনার সমষ্টিমাত্র নয় নিশ্চয়ই । অস্বচ্ছ কুয়াশার ভিতর দিয়ে একটা জীবনকে যতটা দেখা যায়, জীবন ততটাই ! তার প্রকাশই সাহিত্য ।

কবি সেলিম মুস্তাফার তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ “ইতি জঙ্গল কাহিনি” প্রকাশিত হয় ১৯৯৪ সালে । মূলত ততদিনে দিনে কাঞ্চনপুর বেরিয়ে গেছেন । হয়ত তাই কাব্যগ্রন্থের নাম রেখেছিলেন ইতি জঙ্গল কাহিনি । বইটি উৎসর্গ করলেন সে-ই দাদামণি’-কে ! যার মৃত্যু বা হত্যাকে কবি কোনভাবেই মেনে নিতে পারেননি । সারাজীবন বিদ্ধ করে চলেছে তাঁকে । এমনকি আজও !

মাত্র কুড়িটা কবিতা নিয়ে এই কাব্যগ্রন্থ বের হয় “অক্ষর পাবলিকেশনস” থেকে । আগেই বলেছি এই কাব্যগ্রন্থের নামের সাথে কবির জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসার একটা যোগসূত্র আছে । কবির “ছোরার বদলে একদিন” কাব্যগ্রন্থটি ছিল জঙ্গলের প্রবেশকাহিনি এবং তার বিকাশ, বিস্তারপর্ব । ছোরার বদলে একদিন কাব্যের শেষ কবিতা ছিল “সুবর্ণরেখা যার নাম” । আর  “ইতি জঙ্গল কাহিনি ” কাব্যের প্রথম কবিতার নাম “কোথাও নদীর নাম সুবর্ণরেখা”

   

                        “জল ফুলে উঠেছে,

                        পারাপারহীনতার অসুখ পাঁজর ফাটিয়ে উঠছে কোথাও;

কোথাও নদীর নাম সুবর্ণরেখা ।

                        ...   ...    ...    ...   ...        

আমি গল্পচ্ছলে ভুলে যাই আমার মায়ের কথা, কারোর

সহজ ঠিকানা সহসা অতিবাস্তব বলে মনে হয়, সন্ধ্যার অন্ধকারে

চোখের ওপর মিলিয়ে যায় স্বর্গের কাছাকাছি এক মাটির পাহাড়;

 

আমি দাঁড়িয়ে থাকি, ভালোবাসার গল্প থেকে ছিটকে পড়ে

আমার ভালোবাসা, আমি দেখতে পাই চেনা-অচেনার মাঝামাঝি

একটা ঘর ছেড়ে ধীরে-সুস্থিরে হেঁটে বেরিয়ে যাস তুই, তোর দাবি

উজ্জ্বলতা, তবু যাবতীয় করুণ কাহিনির মতো নীল কুয়াশায়

ছড়িয়ে পড়ে তোর অবয়ব”          

 (কোথাও নদীর নাম সুবর্ণরেখা)

 

কবির ভাষারীতিতে যথেষ্ট পরিবর্তন এসেছে, বোঝাই যাচ্ছে । অনেক বেশী সতর্ক এবং শৃঙ্খলিত শব্দচয়ন ব্যবহার করছেন এখন কবি । তবে জীবনকে খুঁড়ে দেখার বাসনা এখনও আগের মতোই তীব্র । এখনও নিজেই বিষয় করেন । নিজেকেই সন্দেহ করেন ।

 

“নরকের কাছাকাছি এক স্বর্গে আছি আমি,

যে-সরলতা এখানের, তা মানুষের, যে উদাসীনতা পাই

তা মানুষেরই, যে যন্ত্রণা আমি বহন করি

তা কোনও মানুষের নয়;

আমি কি মানুষ ? শয়তান ছাড়া যে আজ

মানুষের মতো বাঁচে, সে কে ?                         (ঐ)

 

সেলিম মুস্তাফা মোটামুটি তাঁর স্বতন্ত্রধারা এই কাব্যগ্রন্থেও অব্যাহত রেখেছেন । আমরা সামনের কবিতার দিকে দেখে নেবো, তিনি কী কী আরও নতুন অনুভব যুক্ত করলেন ।

 

রাত্রির ভেজা অন্ধকার থেকে যাকে

তুলে এনেছি তাঁকে কী বলব ? স্বৈরিণী ?

 

নাকি কিছু বলা যাবে না !

যাকে অন্ধ ভেবেছি সে তো অন্ধ ছিল না ।

যাকে দরিদ্র ভেবেছি সে তো...” 

(তথাগত ! কে ডাকে আমাকে)

 

দেখুন, কবি কিন্তু খুব আস্তে আস্তে তাঁর কবিতায় নতুনত্ব আনছেন । পাহাড়ের সেই ফুলবতী রিয়াং, শান্তি, এদের নাম আর এখানে আসেনি । সরাসরি এবার কবি লিখছেনস্বৈরিণী” বলছেন “তথাগত ! কে ডাকে আমাকে ? / স্বৈরিণী ?”  এত অরণ্য, এত জনসমাগম, কেন সহসা শূন্যতা ?  একান্ত ঝিঁঝিঁর মতো কে ডাকে ? কবির মনোজগতের পরিবর্তন কিন্তু স্পষ্ট ধরা পড়ছে, তাঁর এইসব দ্বন্দ্বের ভিতর দিয়ে । স্বৈর শব্দের অর্থ হচ্ছেস্বেচ্ছাচার, নিজের ইচ্ছানুযায়ী আচরণ, অবাধ্য ব্যভিচারিণী বিশেষণ পদ হচ্ছেস্বৈরিণী । এই শব্দটা কবি এর আগে ব্যবহার করেননি কিন্তু কী অদ্ভুত কৌশলে কবি ব্যবহার করলেন, সেটাই এখানে দেখার । কবি কেন লিখছেনযাকে অন্ধ ভেবেছি, সে তো অন্ধ ছিল না । এই “অন্ধ ছিল না”কথাটা কেন জানি, মেয়েটির দিকেই নিয়ে যায় । কেন জানি মনে হচ্ছে, কবি শব্দে যাকে “স্বৈরিণী” মন থেকে আসলে, তাকে তিনি তা বলছেন না বরং তিনি প্রশ্নবোধক চিহ্ন ব্যবহার করছেনবারবার । এই জন্য কি কবি বলছেন “এত ইঙ্গিত আমি ধারণ করতে পারি না ।”

 

“মিলন” নামের একটা অদ্ভুত সুন্দর কবিতা পাই ইতি জঙ্গল কাহিনিতে । কবিতাটি ছিল এই রকম

 

“রাতকে দু-ভাগ করে ভালোবাসার দুই পা

দুদিকে নেমেছে, গভীর শিকড়ে

ফুটেছে একটি রক্তজবা

অদ্ভুত অচেনা প্রদাহে

 

আমার পশু পুড়ে যায়

আমার প্রভু পুড়ে যায়

 

অপার আকাশ থেকে ঝরে পড়ে গুচ্ছ অন্ধকার !” (মিলন)

 

কবিতাটির ভিতরে অদ্ভুত একটা ব্যালেন্স আছে । শিকড়ের মতো নেমেছে যেন পাএমন চিত্রকল্প সবসময় কবির কাছেও মনে ধরা দেয় না । “রক্তজবা”-এর কী সুন্দর ব্যবহার । আবার কবি কবিতার নাম দিয়েছেনমিলন । যে মিলনের ভিতরে কবির পশু সত্তা, প্রভু সত্তা দুই ধূলিসাৎ হয়ে যায় অপার আকাশ যেন তখন বিস্ময়ে তাকায় । প্রথম লাইনের পর শেষ লাইনে কবি কবিতার ভাবনাকে প্রেম থেকে যেন পূজা পর্যায়ে নিয়ে গেলেন । এই কবিতাকে ভিত্তিকে কবিকে একটা প্রশ্ন করেছিলাম “মিলন কবিতাটি আমার প্রিয় কবিতার মধ্যে একটা এখানে প্রেম, প্রেমের ওঠানামা, তার শরীরী আলাপ, অশরীরী বিস্তার, তার শঙ্খলাগা মুহূর্তের অদ্ভুত অচেনা প্রদাহের  প্রবহমানতা, ঐশ্বরিক অন্ধকারের  ভিতরে যেভাবে গুলিয়ে গেল পশু ও প্রভু, এক কথাত দারুণ আমার প্রশ্ন হলো, আপনি এই কবিতার ভিত্তিতে আমাকে আপনার যৌনদর্শন, কবিতায় তার মাত্রাবোধ বা রুচিবোধ অর্থাৎপশু ও প্রভু”-র একাকার হয়ে যাওয়া নিয়ে কিছু বলুন

উত্তরে কবি বললেন“যৌনতা ছাড়া জীবনের কোন মানে আমি এখনো বুঝিনি । যৌনতা হঠাৎ যদি উদয় হয়, সেটা হয়তো পাশবিক, প্রেমহীন । আমার যৌনতা কিছুটা শোকাশ্রয়ীও বটে, হয়তো । আমরা দার্শনিক নই, তাই সঠিক বলতে পারছি না । নারী আমার কাছে প্রকৃতি । কূল নেই, কিনারা নেইএখানে শুধুই নিবেদন । একজন নারীর চেয়ে একজন পুরুষ হাজার গুণ তুচ্ছ । পুরুষ আসলে নারীর দ্বারা ব্যবহৃত হয় । কিন্তু, নারী ছদ্ম ব্যবহার করে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে, বা ব্যবহৃত হতেও চায় । পারস্পরিক নিবেদনই প্রকৃত যৌনতা যা প্রেমের কাছে নিয়ে যায় হয়ত ঈশ্বরও নারীর কাছে আনত নয় কি ?”

কবি তাঁর কবিতার বুকে যেন একটা নতুন আলোকপাত করলেন একজন নারীর চেয়ে একজন পুরুষ হাজার গুণ তুচ্ছ ” এই কথা থেকেই কবির ব্যবহৃত “স্বৈরিণী” শব্দ নিয়ে পুনরায় ভেবে দেখা যেতে পারে

তবে এখানে সেলিম মুস্তাফা সম্পর্কে কৃত্তিবাস চক্রবর্তীর মূল্যায়নটা আরেকবার দেখে নেওয়া যেতে পারে । কবির দেখা আর একজন আলোচকের দেখা ভিন্ন ভিন্ন হতেই পারে । কৃত্তিবাস চক্রবর্তীর বলছেন “সেলিম তফাৎ করতে পারেন না শ্লীল আর অশ্লীলতা । অশৈল্পিক যৌনতা, শব্দ প্রয়োগে তথাকথিত সংস্কারের ঊর্ধ্বে ওঠার ছলে স্বসৃষ্ট পথে তিনি নিজেই পিছলে পড়ে যান । “নৈরাজ্য” সম্পর্কে সেলিমের বক্তব্য বিশ্লেষণের অপেক্ষা রাখে । তার মতে নৈরাজ্য অর্থাৎ মনোজগতের নৈরাজ্য । যাবতীয় মানবিক মূল্যবোধগুলোকে তলিয়ে দেখার জন্য, মানুষের ভেতরে যে আরেকটি মানুষ অত্যন্ত গোপনে তৎপরতা চালিয়ে যায় তার প্রকৃত চেহারা-চরিত্র উদ্ঘাটন, সর্বোপরি সমস্ত পাপ ও ভণ্ডামিগুলোকে প্রকাশ্য করে যথার্থ সত্যকে চিত্রিত করার তাগিদেই এই “নৈরাজ্য” সৃষ্টির প্রয়োজন । তার মতে প্রচলিত মূল্যবোধগুলোকে ভেঙে দিয়ে সবকিছু ওলোটপালোট করেই তবে প্রকৃত সত্যকে আবিষ্কার করা সম্ভব । তাই সেলিম আঘাত করতে চান । ভালো কথা । কিন্তু আঘাতের জন্য তিনি যেসব শব্দাস্ত্রের আশ্রয় নেন তা অনেক ক্ষেত্রেই গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে না বা বলা যায় প্রাণে গ্রাহ্য হয় না । আঘাত প্রত্যাঘাত হয়ে ফিরে যায় অন্তর্গত “পাপ ও ভণ্ডামি” মুক্ত হবার বদলে । ঐতিহাসিক কুতুব মিনার যখন সেলিমের কবিতায় লিঙ্গের প্রতীকে আসে তখন মানুষের সভ্যতার সনাতন রুচিশীলতার ঐতিহ্যে আঘাত আসতে পারে । সৌন্দর্য ও রুচিবোধ যে মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি । “যোনির ভেতর অন্ধকার”, “যোনির মধ্যে এক রক্তে ভেজা পেণ্ডুলাম”, “দুই উরুর মাঝখানে অবৈধ অন্ধকার” কিংবা “রক্ত ও বীর্যে মাখা মুখ”, “বিস্ফোরিত দুরন্ত যোনি”, “যোনির মত অরণ্যের পর্দা” “সঙ্গম” বা “বহু ব্যবহারে ধ্বস্ত মেয়েমানুষ” শব্দের অপপ্রয়োগএমন অগণিত বাক্য শব্দের অপযোজনা সেলিমের একমাত্র আঘাতের অস্ত্র, সবকিছু ওলোটপালোট করে আসলে “সত্য” উদ্ঘাটনের একমাত্র রণকৌশল ! সেলিম তাকে বলেন “প্রসেস” স্বীকার করছি স্বয়ং শব্দ চিরকালই তথাকথিত শ্লীল-অশ্লীলের ঊর্ধ্বেকিন্তু এর সঠিক ব্যবহার নৈপুণ্যেই কি শব্দ বা একটি বাক্য মহৎ-সুন্দর হয়ে উঠতে পারে না ? কেবল এখানেই সেলিমের ধারাবাহিক চিন্তা-চেতনা সম্পর্কে বিভ্রান্তি আসে । প্রয়োগ যদি অক্ষম হয় তাহলে উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবার বদলে ঘটে পাঠকের বিমুখতা । এটাও সেলিমের মনে রাখা জরুরি যে পাঠক খুব আশ্চর্যরকমভাবেই বিভিন্ন । তাছাড়া যাদের প্রতিপক্ষে তার এই “আক্রমণ” তারাই কি এই সমাজ-রাষ্ট্রে শতকরা নিরানব্বই ভাগ ? এমন ভাবনা একেবারেই ভ্রান্ত । কাজেই সেলিমের ওই নিরীক্ষা বা ট্রিটমেন্ট হইতে বিপরীত হয়ে ওঠে । শব্দ ব্যবহারে কবির সংযম ও সচেতনতা আমরা কি প্রত্যাশা করবো না ?”

        উপরের খুবই গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট নিয়ে আলোচনা করেছেন কৃত্তিবাস চক্রবর্তী । লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ২৮ বছর আগে । আজ এত বছর পর সাহিত্য অনেক বাঁক নিয়েছে । বাঁক নিয়েছে পাঠকের মনন-চিন্তাধারা । আজ এত বছর পর কৃত্তিবাস চক্রবর্তীর উপরে উল্লেখিত উদাহরণের মধ্যে কেবল “ঐতিহাসিক কুতুব মিনার”-এর উদাহরণ ছাড়া কোনটাই আমার রুচিবোধ, চিন্তাবোধকে আঘাত করেনি । সেই অর্থে কবি না সমালোচক কে সেদিন সঠিক জায়গায় ছিলেন, বলা মুশকিল ! সাহিত্যবোধ তার রুচিবোধ, আস্বাদবোধ যুগের সাথে সাথে নিজেই তৈরি করে নেয় মনে হচ্ছে । সময়ের সাথে সাথে শব্দের অর্থের তাৎপর্যতাও পাল্টে যায় । পাল্টে যায় তার চিহ্নায়নও । তবে, উপরের আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে, কবি তার সময়ে, তার কবিতায় নতুনভাবে কিছু করার চেষ্টা করেছিলেন । কবিতাকে দিতে চেয়েছিলেন তার মতো করে ভাষা, আঙ্গিক এবং নিজস্ব শৈলী । তথাকথিত রুচিবোধের ঊর্ধ্বে  উঠেই তিনি সেদিন তার কবিতায় শব্দ, চিত্রকল্প রচনা করেছিলেন । সেজন্য তাকে সাধুবাদ জানাতেই হয়।      

        ইতি জঙ্গল কাহিনি-র “ভারতী” কবিতায় আমরা আর এক দুর্ভাগ্য নারী কমরেডের দেখা পাই । যার জীবন ছিন্নভিন্ন করে দেয় একটা দল । এই রকম কবিতার দৃশ্যকল্প কিন্তু আমরা এর আগে পাইনি । কবি তখন কাঞ্চনপুর জঙ্গল থেকে বেরিয়ে গেছেন । উত্তর জেলার পানিসাগর, পরে আগরতলায় দীর্ঘদিন চাকরি করেন । এই পর্যায়েই তাঁর এই কাব্যগ্রন্থের উপজীব্য বিষয় এবং দেখা । এই চরিত্র তখনই কবির কলমে এসেছে । কবি লিখছেন

 

“সবই হারিয়ে যায়, কেবল তোমার গল্প

ঘুরে ফিরে আমার কাছে আসে, আমার জানা হয়ে যায়

নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে কার ঘরে

একা শুয়েছিলে, একা কে তোমাকে ভেঙেচুরে

নষ্ট করে যায় !

...  ...  ...   ...                 

পার্টি অফিসের খাতা থেকে পরদিন ভোরেই

কাটা গেল তোমার উচ্ছল নাম, হায় !”      (ভারতী)

 

নিঃসন্দেহে কবি জঙ্গলের বাইরে এসে আরেক নিঃস্ব ফুলবতী রিয়াং-এর মুখোমখি হয়েছেন । কিন্তু এই ফুলবতী তো নয়, সে ভারতী । সে বিপ্লবের নামে পথে নেমেছিল । তাহলে, সে লুণ্ঠিত হল কেন ?  এই শোষণ, এই আক্রমণকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে ? কবি শুধু ভারতীর ব্যথা তুলে ধরলেন । এবং কবি কোথাও-না-কোথাও ভারতী-র মতো নারীশক্তির এই অপমান, এই শোষণ দেখে দেখে কবি নিজেকেই দোষী ভাবছেন । বামপন্থা আন্দোলনের একটা নেতিবাচক দিক এখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি । কবি “ভারতী-২” কবিতায় লিখছেন

 

“আমি এই সময়ের স্বার্থপর কবি; কবিতাকে

আমি কিছুতেই করতে পারি না সমাজমুখী,

আমি বামপন্থী ভাবনাকে মনে রেখে রেখে

কেবলি ভারতীর কথা লিখি ।

                        ...  ...  ...  ...  ...           

ভারতীও মানা করে ওদের সঙ্গে ঘুরে বেড়াতে,

ওরা নাকি সাম্রাজ্যবাদী, দুটি রূপ দিনে ও রাতে,

ওরা চেয়েছিল তাকে বিছানায় পেতে

ওরা চায় মেয়েমানুষ বাঁচুক পেটে-ভাতে”           

(ভারতী-২)

 

বামপন্থী আন্দোলনের ভিতরে এক শ্রেণির নেতিবাচক চরিত্রকে কবি নির্মমভাবে তুলে ধরেছেন এই কবিতায় । এবং সাথে সাথে নিজেকেও নির্মমভাবে আঘাত করে লিখেছেন

 

“কেউ পড়ো না আমার লেখা, আমি নির্লজ্জ, স্বার্থপর, কবিতাকে

আমি কিছুতেই করতে পারি না সমাজমুখী !”      

(ভারতী-২)

 

আসলে এখানেই কবি নিজেকে চিহ্নিত করেন । আক্রমণ করেন নিজেকে । এবং কবিতাকেও । কত সরাসরি কবি আক্রমণ করেছেন তৎকালীন রাজনৈতিক চরিত্রকে । এই রকম আক্রমণও কবিকে এর আগে করতে দেখা যায়নি । শহরের পরিবেশ কবিকে ক্লান্ত করে তুলেছিল । শোষণ কবি এর আগেও চিত্রায়িত করেছেন, কিন্তু এখানে তার রূপ পাল্টেছে শ্রেণিচরিত্র পাল্টেছে । এ যেন আরেক ভয়াবহ জঙ্গল । কবির এই উপলব্ধি আমাদের ভাবায় । এখানে যেন কবি নির্লজ্জ হচ্ছেন না, প্রকারান্তরে আমরাই নির্লজ্জ প্রমাণিত হচ্ছি ।

 

ইতি জঙ্গল কাহিনি-তে আমার খুব প্রিয় কবিতা হল“ইতি জঙ্গল কাহিনি” দীর্ঘকবিতা । এই কবিতায় কবিকে আমি পুরোনো মেজাজে ফিরে পাই । তবে আঙ্গিকগত অনেক পার্থক্য এসেছে । বলার  এবং দেখার ভঙ্গি অনেকটাই পাল্টে গেছে । শব্দ ব্যবহারেও যথেষ্ট সচেতন এবং সতর্ক মনে হচ্ছে কবিকে । এই সতর্কতা আগে তেমন তাঁর কবিতায় দেখা যেত না । হয়ত আড়াল থেকে যেত । এখন তাঁর কবিতা পড়লেই বোঝা যাচ্ছিল, কবি কিছুটা ডিফেন্সিভ হয়েই লিখতে বসেছেন । আমাদের শহুরেপনা, বা ছদ্ম একটা সচেতনাবোধ বা আরোপিত একটা বোধ যেন তাঁর শব্দকে, বাক্যকে, অনুভূতিকে ঘিরে ফেলেছে ।

 

“তীব্র বিষক্রিয়া ছড়িয়ে পড়েছে

বাতাস কখনো উত্তরে, কখনো দক্ষিণে

অনাবশ্যক চাঁদ

আবার উঠে এসেছে আকাশে, কেউ

জাগেনি কোথাও, সর্বত্র

স্পষ্ট হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে

মানুষের প্রয়োজনহীনতা ।”           ( ইতি জঙ্গল কাহিনি )

 

কবি সেলিম মুস্তাফা নিরন্তর ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়েই প্রতিনিয়ত খুঁজে চলেছেন কবিতার নতুন সন্ধান । কবির পরিবেশ-পরিস্থিতি, সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থান কবির শব্দকে, চিন্তাকে, চিন্তার সংগঠনকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সেলিম মুস্তাফার কবিতা লক্ষ করলেই তা বোঝা যায় । “ছোরার বদলে একদিন”–এর কবির সাথে “ইতি জঙ্গল কাহিনি”-র কবির আজ অনেক তফাৎ । কেন এই তফাৎ ? এই প্রশ্ন করলেই, তা থেকে কবি-র পরিবেশ-পরিস্থিতি, সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থানের ইতিহাস খুব সহজেই উঠে আসবে । “বাঁচার চেয়ে বাঁচার পদ্ধতি / কেন বড়ো হয় আজ” এইরকম প্রশ্নের ধারেকাছে  “ছোরার বদলে একদিন”–এ কবি ছিলেন না । কবির চিত্রকল্প রচনার ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলেছে তার পরিবেশ ।

 

“মদির দুই চোখে তখন মৃত্যুর তুমুল গল্প

ঠোঁটে মৃত্যুর চেয়ে বড়ো এক চিলতে হাসি

আলো নিভে যায়

ঘরে তছনছ আওয়াজ । অন্ধকারে

কাচ ভেঙে উড়ে যায় কতশত প্রবক্তার ছবি ।

ঘরে তছনছ আওয়াজ

আলো জ্বলে ওঠে; আলো দেখা যায় না

শোনা যায়

বাসুদেব ! বাসুদেব !

মদে বিষ মিশিয়েছে কোন শুয়োরের বাচ্চা ?”  

(ইতি জঙ্গল কাহিনি)

 

“কাচ ভেঙে উড়ে যায় কতশত প্রবক্তার ছবি / ঘরে তছনছ আওয়াজ” কবি এই দৃশ্যকল্প রচনা করে শেষে টুক্ করে কেন বসিয়ে দিলেন “মদে বিষ মিশিয়েছে কোন শুয়োরের বাচ্চা ?” এরপরই আবার কবি এই দৃশ্যপট থেকে সরে গেলেন, দক্ষ গল্পকারের মতো । “বাসুদেব” শব্দের প্রয়োগও করেছেন বুদ্ধি করে । এই বুদ্ধি বোধের বুদ্ধি । আসলে কবি যাপন থেকে সরলেও, কবিতা নিয়ে তাঁর যে রুচি এবং দীক্ষা সেটা থেকে তো সরতে পারেননি ! এই শব্দকে সিরিয়াসলি না-নিলে, কবি সেলিম মুস্তাফাকে বুঝতে জটিলতা চলে আসবেএই শব্দে কবি দ্বিবাচনিকতার সুবিধা নিয়েছেন ।

 

“কারা যেন সরে যাচ্ছে লোটা কম্বল ঘটিবাটি

কোলের সন্তান নিয়ে

মেরুদণ্ড হাতে নিয়ে কারা যেন সরে যায়

পুবে ও পশ্চিমে ।

... ... ... ...  ...               

হায় ! কী বা ছিল বিধাতার মনে

খবরের কাগজ এল বনে,

বনের মানুষ গেল শহরে

                        মানুষীরা বাবুদের ঘরে !

                    সুদিন সুদিন !

সুদিন ? নাকি জঙ্গল ভরে ওঠে ঋণে!”

(ইতি জঙ্গল কাহিনি)

 

এ-এক বিষণ্ণ সময়ের, বিপন্ন মানুষের কথা তুলে ধরলেন কবি । কবির সেই স্বপ্নিল বন-জঙ্গল আর আগের মতো নেই ! কবি এখান “সুদিন সুদিন” বলে আর্তনাদ করছেন । এই বেদনা একজন কবির । বনের মানুষ শহরে গেল, আর শহরের মানুষ নিঃস্ব করে দিল জঙ্গল । জঙ্গলের কাঠ একে একে সরে যাচ্ছে জঙ্গল থেকে । নিঃস্ব হচ্ছে বন-পাহাড় । পাহাড়ের সরলতা । কবি তাই লিখছেন

 

“হয়তো একদিন ‘অক্সিজেন অক্সিজেন’ বলে

চেঁচিয়ে উঠতে হবে ! এর মানে তো

প্রাকৃতিক বিপর্যয় ! ভারতবর্ষে কোথাও আর

ছায়া বলে কিছু থাকবে না ।

না । থাকবে না এই জঙ্গল !” 

(ইতি জঙ্গল কাহিনি)

 

কবির এই হাহাকার এর স্পষ্ট হয় পরবর্তী পর্যায়ে । শব্দ আর নৈঃশব্দ্যের ভিতরে কবি গিঁথে দিয়েছেন এই সময়ের চিত্র । ত্রিপুরার বন আর সেই বন নেই । কাঠ পাচার হয়ে গেছে কোথায় কোথায় ! ভূমিপুত্ররাও সেই বন পাচ্ছে না সরকারি নিয়মে । অথচ কারা তবে কেটে নিয়ে যাচ্ছে একের পর এক বন ?

 

“ভোররাতে কেউ ডেকে যায়

আমি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসি,

কে ? ঘুঙুর ?

এলোমেলো হাওয়া

শুধু একটা শব্দকেই আমি একবার

গড়ে উঠতে দেখি আবার ভেঙে যেতেঅরণ্য

অরণ্য, অরণ্য, অরণ্য

মানে বনস্থলী ।

মানে ভূ

মানে বনভূমি । এই বনভূমি আমার ।

এই মাথা । এটা আমার ।

এই হৃদয় । ওরা জবরদখল করেছে ।”

(ইতি জঙ্গল কাহিনি)

 

 

অরণ্য, অরণ্যজনিত সমস্যা কবিকে ক্লান্ত করছে । এখানে অরণ্য”-কে কবি একটা চরিত্র হিসেবে ধরেছেন । তাই তো বলছেন“নির্বাসিত বনভূমি সহসাই শিহরিত হয়/ পায়ের দাগ ধরে এসে কে যেন মরে পড়ে থাকে / একা অরণ্যের বন হারিয়ে যাচ্ছে । জবরদখল হচ্ছে । কবি আহত হচ্ছেন । একা কে মরা পড়ে আছে ? সেকি কবি নিজেই ? হয়ত বা ।

কবি প্রথম জীবনে অটোমেটিক লেখার ধরণেই কিছুটা বিশ্বাসী ছিলেন । লিখেওছেন । কিন্তু “ছোরার বদলে একদিন”-এর কবি যখন “ইতি জঙ্গল কাহিনি” লিখলেন, তখন দেখলাম কবি কিছুটা সতর্ক হয়ে পড়েছেন । ধীরস্থির একটা পরিকল্পনা তাঁর কবিতায় উঁকি দিতে লাগল ।  যা ইতিপূর্বে তাঁর কবিতায় ততটা ছিল না । এই পর্বে তাঁর কবিতায় আবেগের সাথে বুদ্ধিও যোগ হয়েছে । এতে কি তবে তাঁর কবিতার মেজাজের ক্ষতি হয়েছে ? না, একথা আমি বলছি না । সময়, সময়ের অভিজ্ঞতা, তার ছাপ ব্যক্তির মনে পড়বে, এবং সেই অনুযায়ী ব্যক্তি প্রতিক্রিয়া করবে, এটাই স্বাভাবিক কবি তাই করেছেনকবিতা কখন, কাকে, কিভাবে ধরা দেবে, সেটাও এক বিস্ময়প্রক্রিয়া ।  

এইখানে আরেকবার আলোচক কৃত্তিবাস চক্রবর্তীর কথা উল্লেখ করতে হয়, যেখানে তিনি বলছেন “সেলিমের নির্মিতিতে তথাকথিত কোন জটিল কবিত্ব নেই । এই স্ফূর্ততাই কখনও বা তার কবিতার শরীরকে করে তোলে দীর্ঘায়িত দীর্ঘকবিতা নির্মাণে সেলিমের কব্জির জোর অনস্বীকার্য । “বাহান্ন তাসের পর” থেকে “ইতি জঙ্গল কাহিনি”-র দীর্ঘ কবিতাই তার প্রমাণ ।” আলোচক আরও লিখছেন“ইতি জঙ্গল কাহিনি” আসলে “ছোরার বদলে একদিন”-এরই ইতিকথা । যেনো “ছোরার বদলে একদিন ”–এ এত কথা বলেও অতৃপ্ত সেলিম আরও কিছু কথা বলতে চান । তবুও এই বই পড়ে মনে হয় তত্ত্বের চেয়ে সত্যকেই আঁকড়ে থাকেন সেলিম ।”

“ছোরার বদলে একদিন” প্রকাশের প্রায় উনিশ বছর পর সর্বমোট বিশটি কবিতা নিয়ে প্রকাশিত হয় “ইতি জঙ্গল কাহিনি” মাত্র বিশটি নিয়ে । আজকের সময়ে তা ভাবাই যায় না ।    

এরপর প্রায় ছয় বছর পর ২০০৩ সালে কবির তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ বের হয় “দেবতার অনুরোধে”, সৈকত প্রকাশন থেকে । কবি বইটি উৎসর্গ করলেন এই বলে“কবিবন্ধু প্রদীপ চৌধুরীকে”

সেলিম মুস্তাফার কবিতার প্রাণ তাঁর বাকস্পন্দে । তাঁর নিজস্ব একটা বাকরীতি আছে । যা পাঠক হিসেবে আমাকে চমকিত করে । ধ্বনির উপরেও তিনি হাল্কা এক্সপেরিমেন্ট করে থাকেন বলে আমার মাঝে মাঝে মনে হয়েছে আসলে, এই চেষ্টাগুলো কবি কেমন যেন নীরবেই করে ফেলেন মুখের ভাষাকেও নীরবে নিয়ে আসেন কবিতায় । জটিল বিষয়কেও সহজ করে তুলে ধরেন কবিতায় ।

 

“বাড়ির গেট খোলা দেখে

চমকে উঠল ওরা,

গেট বন্ধ করার জন্য দুই বোন

ঠেলাঠেলি করল পরস্পরকে;

 

গেট বন্ধ হলো না,

খোলা রইল

                                সারাদিন

                                সারারাত

কেউ গেল না

কেউ এলোও না

 

কেউ ঘুমোল না সারা রাত !”       (আবদ্ধ)

            

আপাত সাধারণ, সাদামাটা, স্বাভাবিক এক দৃশ্যকল্প সাজালেন কবি যেন চিত্রকল্প বলে দিচ্ছে, ঘরের দরজার বাইরের পরিস্থিতি অজানা এক ভয়ের । যে ভয়ে মেয়েরা ঠিক নিরাপদ নয় । কিংবা জীবন । যেখানে ঘরের বাইরে কেন জানি, নিজেদের নিরাপদ মনে করছেন না দুই বোন । তারা সারারাত দরজার ভিতরে জেগে রইল, কেননা জীবন এখানেও নিরাপদ মনে হল না তাদেরঅথচ রাত শেষে দেখা গেল কিছুই হয়নি । কিন্তু ভয়টাই কবির কবিতার বিষয় ছিল । এই ভয়ের জন্য দায়ী কে ? সাময়িক পরিবেশ-পরিস্থিতি ? না, ওই দুই মেয়ে ভীতু ছিল ? কবি নিরুত্তর । তিনি কেবল দেখলেন দুই কিশোরী জীবনের শঙ্কা । অবিশ্বাস । অথচ ভিতরে বেঁচে থাকার তীব্র ইচ্ছা, কুয়াশা আছে । আছে কুয়াশার ভিতর বাস্তবতাও । কবি কাউকে না-ছুঁয়ে না ব্যাখ্যা করে অবলীলায় বেরিয়ে গেলেন দুটি শঙ্কাময় জীবনের কথা বলে ।

 

“ভারতবর্ষ  নামে  একটা দেশ । এখানে

আটকে আছে কোথাও, আমার গলার কাছে,

দিনান্তের রক্তরাগে তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে কত লোক

নদীর তীরে, বনের শেষে, পাহাড়চূড়ায়

নারীর বুকে, পাটলীপুত্রে, পশ্চিমবঙ্গে, ললিতকলায়

আমি দেখতে পাচ্ছি, আমি দেখতে পাচ্ছি সব

আমি দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু বলতে পারছি না ।”

(জীবন মহুয়া)  

 

এও এক আশঙ্কার পরিস্থিতি । দীর্ঘ বলা যায় কবিতাটিকে । এখানে যাবতীয় কথাই  আপাত মনে হতে পারে, হয়ত এলোমেলোভাবে ঘোরাফেরা করছে । কিন্তু প্রকৃত অর্থে আমার তা মনে হয়নি । আসলে, জীবনের বহুমূল্য ক্ষয় হচ্ছে । কবি পরবর্তীতে বলছেন

 

“একটা অন্ধকার শরীর আমাকে দাও,

একটা শরীর আমি দিতে চাই !

ফণীমনসার

সবুজ ঘুমের কাঁটা অন্ধকারে জেগে বসে আছে,

আমি তাকে কী করে ফেরাই !

তুমি তাকে কী করে ফেরাও ?

তাঁর যে সবটাই শরীর, সবই হৃদয় !

আমার স্বভাবে আছে এইসব দ্বিচারিতা

(জীবন মহুয়া)

 

কবির স্বভাব নদীর মতো । বহন করাই কবির কাজ । তার বাধ্যবাধকতা । সামগ্রিক পরিস্থিতিকে তিনি তাঁর কবিতায় ভাষা দিয়ে থাকেন । সেই বহমানতায় অন্ধকার এসে জমা হলেও কবিকে তা বহন করে নিয়ে যেতে হয় । তাই কবির মনে হচ্ছে তাঁর এই বহমানতা তাঁকে ভ্রষ্ট করে ফেলছে । তাঁর স্বভাবে এসে মিশেছে দ্বিচারিতা । অথচ কবির নিরুপায় উক্তি“আমি তাকে কী করে ফেরাই !”

এইরকম অসহায় পরিস্থিতির মধ্যেই কবির দিনযাপন । কবির জীবনে ক্রমশ ঢুকে পড়েছে দ্বিচারিতাপনা । মূলত এই সময়টাকেই ঘুরেফিরে দায়ী করছেন কবি । মনে পড়ে স্টিফেন মালার্মে বলেছিলেন“অস্থির আধুনিক সমাজের পরিস্থিতি কবিকে স্বচ্ছন্দে বাঁচতে দেয় না । অস্থিরতার ভিতর দিয়েই কবির গমন । এই গমন, তাকে টানে ভালোবাসার দিকে, একটা আশ্রয়ের দিকে, এবং কবি পেয়ে যান এক আশ্চর্য আশ্রয় ।” কবি অবশেষে জীবনের কাছে ফিরে আসেন

 

“মাথার ওপরে ফ্যান ঘুরছে, তবু

খুব হালকা একটা গন্ধ আবার ছড়িয়ে পড়ে

সারা ঘরেলেবু ফুল ! কোথা থেকে আসে ?

আমি ছেলের দিকে তাকাই –

তাকে আমার খুব শুঁকে দেখতে ইচ্ছে করে আজ !”         (ঐ)

 

কবিতাটির নাম খুব সঙ্গত কারণেই কবি রেখেছেন“জীবন মহুয়া” জীবনের চারিদকের  নেগেটিভ পরিস্থিতির পরও কবি কখনও যেন হতাশ হতে পারেন না । ছেলের প্রতি এই যে মায়া, সে তো জীবনকে ফিরে দেখারই মায়া । জীবন তো মায়াময় । তাই তো কবি তাঁর কবিতায় লিখেছিলেন“রোজ কত গল্প শুনি / কত গান শুনি / কত আলোর রেখা / মায়াবী সাপিনীর মত পথ জুড়ে পড়ে থেকে / আমাকে প্রলুব্ধ করেএস !”  

 

দেবতার অনুরোধে কাব্যের অসাধারণ একটি কবিতা । সেলিম মুস্তাফা আমার ধারণায় একজন যথার্থ কবি । আর যথার্থ কবি তাঁর চেতনায় মানবিকতারই চাষবাস করবেন, এটাই স্বাভাবিক ।

 

“কেউ আমাকে ছুঁয়ে দেখল,

শেষ রাতের নদী যেমন তীরকে ছোঁয়

 

আযান ছুঁয়ে যাচ্ছে মিনারের পর মিনার

শহরের পর শহর,

কাঁচের জানালা থরথর কাঁপে, গ্রামের

পরিত্যক্ত বাড়ির যুগল তালগাছের পাতা

শিরশিরিয়ে ওঠে !”                  

(আযান)

 

অসাধারণ চিত্রকল্প এঁকেছেন কবি । আযানের সাথে শেষ রাতের নদীর তীর ছুঁয়ে যাওয়ার উদাহরণ মনের ভিতরে উঁকি দিতেই, একটা শান্তির প্রলেপ মনকে স্পর্শ করে গেল । ভেবেছিলাম, যাক এই বার কবি বোধহয় কিছুটা শান্তি পেলেন ! কিন্তু তা হল না । কাঁচের জানালাগুলো এভাবে থরথর করে কেঁপে উঠলো কেন ?  আসলে, যাবতীয় প্রচেষ্টার পরও কিছু অশুভ শক্তি বোধহয় থেকে যায় ।  কবি শান্তি পাচ্ছেন না । তাই অবশেষে লিখলেন

 

“কেউ আমাকে দেখল,

দেখল আমি শুয়ে আছি আমার চোখের ভেতর

চোখ নড়ছে !”                (ঐ)

 

এই যে বললেন, আমার চোখের ভিতর চোখ নড়ছেএটা কিসের ইঙ্গিত দিলেন কবি ? একটা দৃশ্যরচনা করেই, কবি ইতি টানলেন কবিতার । অনেকটা ছবির মতো, তুলির টান দিয়ে গেলেন যেন । এবার পাঠক হিসেবে, আপনার ভাবনা আপনাকে যেখানে নিয়ে যাবে, সেখানেই কবিতা । অব্যক্ত একটা খেলা আছে এই কবিতায় ।

একবার সেলিম মুস্তাফাকে কথাপ্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করেছিলাম“আপনার কি মনে হয়, আজ থেকে দেড়শো- দুশো বছর পর কবিতার আবেদন কতটা থাকবে ? মানুষ তো আরও অনেক বেশি যান্ত্রিকতার দিকে এগিয়ে যাবে !” উত্তরে কবি বললেন “মানুষ আর কতদূর পর্যন্ত যান্ত্রিকতার দিকে এগিয়ে যাবে ?  আফটার-অল সে মানুষ ! তাকে হৃদয়ের কাছে ফিরে আসতেই হবে । তখন তাকে সেই কবিতার কাছে আসতে হবে । হতাশ মানুষ কবিতা লিখবে, পড়বে । এই পৃথিবীতে মানুষ নিয়ে যে ভাববে, সে হতাশ হতে বাধ্য । তাছাড়া যেহেতু আমি বেঁচে আছি, সেহেতু বেঁচে থাকার প্রেরণাকে অস্বীকার করা যায় না । তাই উত্তরণকে মেনে নিতে হয় । উত্তরণই পথ ও সত্য । এই আকাশ, বাতাস, গাছ-পালা সবার ঋণ নিয়েই তো আমরা বেঁচে আছি । কবিতায় মানবিক সত্যকে মূল্য দিতেই হবে । মানবিকতাই প্রধান । বাকি সব সম্পর্কই অর্থহীন ।” সেই মানবিকতার সূত্র ধরেই চলে আসে কবির কবিতা “যুদ্ধ”

 

“যুদ্ধ তো বিনিময়

গুলি বিনিময়

হাঙ্গামা বিনিময়

মনোযোগ বিনিময়

এবং সবশেষে বন্দী বিনিময়

 

ব্যবসাকে বিনিময় বলে, কেউ কেউ

ভালবাসাকেও”                        (যুদ্ধ)

 

কবি অবশেষে যুদ্ধের সাথে ভালোবাসা বিনিময়কে মিলিয়ে দিয়ে ইঙ্গিতকে বড়ো ব্যাপক করে দিলেন কবিতাটিকে । তাই বুঝি প্রথম লাইনেই লিখে ফেললেন চরম কথাটি“যুদ্ধ হলে সৌহার্দ্য বিনিময় বন্ধ হয়ে যাবে / এমন কোন কথা নেই” তাহলে কি কবি জানতেন, কবিতার শেষটা এভাবেই হতে যাচ্ছে ?  হয়ত না ।  তাহলে কি আমরা ভালবাসাকেও গুলিয়ে ফেলবো, যুদ্ধের সাথে ? কিন্তু এই ধরনের যুদ্ধের কৌশল কি নতুন ? নিশ্চয়ই না । আসলে, ইদানিং এই ধরনের যুদ্ধ আমাদের ঘরের ভিতরেও ঢুকে গেছে কবে, আমরা নিজেরাই জানি না হয়ত ।

কবি আমাদের এইরকমই আরেকটা জটিলতার চিত্রাঙ্কন করেছেন  তাঁর “মুগ্ধ রজনী” কবিতায়

 

“নষ্ট মাটির ওপর কুণ্ডলী পাকানো ধোঁয়া

ধোঁয়ার ওপর কোটি কোটি বছরের

মুগ্ধ রজনী

এই রাত হিরোশিমা

এই রাত নাগাসাকি”           (মুগ্ধ রজনী)

 

এই একই কবিতায় একই রাতের আরেকটা চিত্র আঁকলেন কবি

 

“সিঁড়ি বেয়ে জ্যোৎস্না আসে

সিঁড়ি বেয়ে নামে

অ্যান্টেনা কেঁপে কেঁপে ওঠে

দুঃখেরও সিঁড়ি থাকে ইতিহাস থাকে

 

এই রাত গোয়ের্নিকা

এই রাত বিভূতিভুষণ”        (ঐ)

 

আশ্চর্য বিকাশের দিকে নিয়ে গেলেন কবিতাটিকে । প্রকৃতি এখানে নীরব । প্রকৃতি তাঁর মুগ্ধতায় ভরপুর । তাকে বিষাক্ত করেছে যেন, তার নাম মানুষ । প্রকৃতিকে দ্রষ্টার দৃষ্টিতে যে দেখেছে, সেও মানুষ । একই মানুষের সামনে হিরোশিমা, বিভূতিভুষণ । একই মানুষের সামনে  নাগাসাকি, গোয়ের্নিকা । কী অপূর্ব কাব্যিক-কৌশল নিয়েছেন কবি এই কবিতায় । যে মানবিকতাবোধ কবির মৌলিক ভাবনা, তারই এক বিপন্ন অসহায় রূপ দেখতে পাই  “মুগ্ধ রজনী কবিতায় । কবিতাটির ভিতর নৈঃশব্দ্যের একটা ভূমিকা আছে । কবির উচ্চারণ খুব তীব্র নয়, কিন্তু অনুভব এই কবিতায় তীব্রতর । অন্যভাবে বলা যায়Silences shape all speech”

 

আমরা সাধারণ মানুষ হিসেবে, কেবল চেয়েই থাকি, অনেকটা অসহায়ের মতো কিংবা টিভি-র সামনে বসে থাকি । সংবাদও কি সত্য বলতে পারে সবসময় ? কর্পোরেট সেক্টরই মূলত নিয়ন্ত্রণ করে থাকে তাদের । আমাদের সামনে জ্যোৎস্না আসেজ্যোৎস্না চলে যায়কোনো কোনো রাত বিভূতিতে ভূষিত হয় । আবার  কোনো কোনো রাত গোয়ের্নিকা-র মতো চিত্রময় যন্ত্রণা নিয়েও আসে । আমরা আমাদের দুঃখ নিয়ে বসে থাকি । আর মনে মনে ভাবিএইসব দুঃখেরও দীর্ঘ একটা ইতিহাস আছে ।

 

কবিকে একদিন জিজ্ঞেস করলাম“এইসব পরিণতির পরও, আপনি লিখেন কেন একটি কবিতা ? এই লেখার অর্থই বা কী ?” উত্তরে কবি সেদিন বলেছিলেন“বীজের অশান্তিটা কোথায় ? আমরা কি জানি ? কেনই বা সে পাতা বের করে, তারও কি মানে জানি আমরা ? আসলে, প্রকাশের আনন্দেই প্রকাশ । মানুষ গান গায় যেমন করে, নাচে যে সত্তাবোধ থেকে, আমি কবিতা লিখি সে-ই সত্তাবোধ থেকে । এসব প্রশ্নের আসলে কোনো উত্তর নেই । প্রশ্নটাই অর্থহীন

এই প্রসঙ্গে কবি-সমালোচক মোহিতলাল মজুমদারের একটি কথা মনে পড়ছে, যেখানে তিনি বলেছিলেন “সাহিত্যের প্রধান আখ্যা এই যে, তাহা মানুষেরই আত্মকাহিনী, জগতের উপরে আপনাকে প্রসারিত করিয়া আপনাকেই আপনি দেখার যে অপূর্ব ভঙ্গি, তাহাই সাহিত্য সৃষ্টির সর্বস্ব । সাহিত্য কোনও বিদ্যা নয় ।”

সেলিম মুস্তাফার কবিতায় এইসব কথার অপূর্ব প্রকাশ দেখতে পাই । সাদ্দাম হত্যার পর সরাসরি তিনি হয়ত এই নিয়ে কোনো কবিতা লেখেননি । কিন্তু তার মানে এই নয় যে, তিনি সাদ্দামের বিরোধী ছিলেন না । মূলগত ব্যাপার হচ্ছে, মানবতার সংকট নিয়ে । সাদ্দাম হোসেন তো একটা ঘটনামাত্র এইসব ব্যাপারে দর্শন রবং কাব্যের অবস্থান আলাদা আলাদা । ক্রোচে খুব সুন্দর এই বিষয় নিয়ে বলেছেন “দর্শন মনকে শৈশব সংস্কার থেকে মুক্ত করে আর কাব্য ওই সংস্কারে মনকে নিমজ্জিত করে । দর্শন ইন্দ্রিয়-প্রত্যয়কে অবাধে স্বীকার করে না । কাব্য শুধু ইন্দ্রিয় প্রত্যয়কেই সত্য বলে মানে । দর্শন কল্পনাবৃত্তিকে দুর্বল করে । কাব্য কল্পনাবৃত্তিকে সবল করে । দর্শনের গর্ব সে ভাব-কে রূপে পরিণত করে না, আর কাব্যের একমাত্র চেষ্টা থাকে ভাবকে রূপের দেহে পরিণত করা । সুতরাং দর্শনের ভাবনা বা চিন্তা স্বভাবতই বিমূর্ত হয় আর কাব্যের ভাব ততই সুন্দর হয় যত তা রূপের দ্বারা আচ্ছাদিত হয়...মানবসমাজের ইন্দ্রিয় হচ্ছে কবিরা আর বুদ্ধি হচ্ছে দার্শনিকেরা । চিন্তাকে ছন্দোবদ্ধে প্রকাশ করা যায় বটে, কিন্তু তা করলে কাব্য রচনা করা যায় না । তত্ত্বকথা ছন্দে লেখা হলেও তত্ত্বই থাকে ।”

 

বাংলা সাহিত্যের কবিমাত্রই দার্শনিকতার দিকে ঝোঁকে পড়ার একটা প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় । প্রথমদিকে সেলিম মুস্তাফার ক্ষেত্রে দেখা না-গেলেও মধ্যপর্ব থেকে মানে “দেবতার অনুরোধে” কাব্যগ্রন্থ থেকে কিছুটা ছাপ দেখা যায় তাঁর কবিতায় । “ছোরার বদলে একদিন” কাব্যে যে কাব্যিক তীক্ষ্নতা দিয়েছিলেন কবি, পরবর্তী কাব্যে সে সংকটকেই দিলেন দার্শনিকতার মনোভঙ্গি । যা তাঁর ভাবনায়, চিন্তার উৎকর্ষ হয়তো প্রমাণ করল, কিন্তু পাঠকচিত্তকে বা চিন্তাকে কতটা আকর্ষণ করতে পারলো, সে নিয়ে একটা প্রশ্ন থেকেই যায় !  “দেবতার অনুরোধে”-এর কাব্যে তাঁর শব্দপ্রয়োগ, বাক্যের বাঁধন, কোথায় যেন মনে হয়, কবির অনেক ভাবনার ফসল । প্রতিটি শব্দই মনে হচ্ছিল খুবই সুচিন্তিত । যা তাঁর স্বাভাবিক উচ্ছ্বাসকে কিছুটা ম্লান করেছে অনেক জায়গায়ই “দেবতার অনুরোধে” কাব্যের কবি বেশ সতর্ক । সাবধানী । শব্দপ্রয়োগ যথোপযুক্ত না-হওয়ার ভয়ে ভীত । বক্তব্য তার নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে না-পারার ভয়ে ভীত । ফলত কবি আরও বেশি মনোযোগ দিলেন তাঁর কবিতার ভাবনায়,কাব্যিক প্রকাশে, শব্দব্যবহারে, লাইন বিস্তারে । ফলে তাঁর কবিতার গায়ে ধরা পড়ে গেল অতিরিক্ত ঘষামাজার দাগ । যা কবির স্বাভাবিক প্রকাশকে বারবার ব্যাহত করেছে । “ছোরার বদলে একদিন” থেকে কবি কিছুটা সরে এসেছেন বলে মনে হয়েছে আমার কিন্তু এই সরে আসাটা হয়তো স্বাভাবিক ছিল ।  কবি তো তাঁর জীবনের চলা থেকেই শব্দ, শব্দচিত্র কুড়িয়ে আনবেন, এটাই স্বাভাবিক । জীবন তাঁর ছাপ ফেলবে কবিতায় এটাই তো হওয়া উচিত

 

“দেবতার অনুরোধে” তারপরও অসাধারণ কিছু চিত্রকল্প উপহার পাই আমরা ।

 

“রাত্রির রটনা নিয়ে উসখুস ভোর

ভেজা ঘাসে শিউলির শাদা পা

কাঁচা আলতা গলে গলে পড়ে”       (ভোর)

 

চিত্রকল্পটি অসাধারণ বলতেই হয় “শিউলি” শব্দের দ্বিবাচনিকতাকে এখানেও কাজে লাগালেন কবি । কিন্তু সাদা-কে কবি যখন সাদা না-বলে উচ্চারণ করলেন “শাদা” তখনই আমি কোথায় যেন একটা ভয়ের আভাস পেলাম । যেহেতু আমি কবিতা অনেকদিন পড়ছি, তাই তাঁর ভাষাব্যবহারের ব্যঞ্জনা বুঝতে পারি আমি । এবং আমার আশঙ্কাই ঠিক হল, যখন পরবর্তী অংশে কবিকে লিখতে দেখলাম

 

“পৃথিবী এখানেই শেষ

এরপর মহাশূন্য

দালির ঘড়ির সময় গলে গলে নেমে আসে

                                                তার দুই ঊরু বেয়ে

আর আলতার সঙ্গে ঘাসে মিশে যায়”        (ঐ)

 

        আলতার সঙ্গে ঘাসে মিশে যায়চিত্রকল্পটা আপাত নিরীহ মনে হলেও, কিন্তু ভয়ানক একটা ইঙ্গিতের দিকেই কবি আমাদের টেনে নিয়ে গেলেন । এবং “দালির ঘড়ি”-র চিহ্নায়ন করে, কবি বিষয়টাকে আরও স্পষ্ট করে দিলেন । আসলে, এতটা স্পষ্ট কবি না-করলেও পারতেন ! এখানে আসলে, কবি নিজের প্রতি বিশ্বাস রাখতে পারেননি তাই স্পষ্ট করতে গেলেন । এখানেই আমি বলি  “ছোরার বদলে একদিন” –এর কবির চেয়ে “দেবতার অনুরোধে”-এর কবি কিছুটা ভীতু । কিন্তু তাহলেও, কবি কবিতাকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই । সময়ের ভয়ংকর রূপকে কবি ঠিকই তুলে ধরেছেন । মানুষের বিপর্যয়ের কথা এখনও কবি লিখে চলেছেন কিন্তু কীভাবে ? নিচের কবিতাটি দেখুন

 

“মানুষের টানে মানুষ চলে এসেছে

ঘরে অন্ধকার উঁকি দিয়ে দেখে

মানুষ শুয়ে আছে মলিন কাঁথায়

এ কোন্ মানুষ ?

কলসী কাৎ হয়ে পড়ে আছে,

কান্না নেই কোথাও”                  

(সম্পর্ক)

 

এই কবিতায়ও মানুষের সম্পর্ক নিয়ে কথা এসেছে । দুর্দশা নিয়ে কথা উঠেছে । “কলসী কাৎ হয়ে পড়ে আছে”এই এক সিম্বল ব্যবহার করে, কবি এখানে বাজিমাত করে দিয়েছেন । এই এক দৃশ্য কবিতাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে আগামীর দিকে । এখানে কবিকে বুঝতে হলে, কিছুটা ছবির ভাষা বুঝতে হবে । ছবির ভাষা কিন্তু কবিতার খুবই কাছাকাছি । একজন চিত্রকর কোন্ এঙ্গেল থেকে তাঁর চিত্রকর্মকে তুলে ধরতে চান, সেটা বুঝতে হবে প্রথমে  দর্শক হিসেবে কবির ক্ষেত্রেও অনেকটা তাই । কিন্তু এই দুঃসময়ে কি সম্পর্ক থাকবে না, মানুষে মানুষে ? কবি তারও একটা চিত্রকল্প এঁকেছেন

 

“মানুষের টানে মানুষ চলে এসেছে

কোন শব্দ নেই কোন রঙ নেই

শুধু আমারই গলায়

দলা পাকিয়ে ওঠে এক না-ফোটা প্রশ্ন

কেমন আছো

 

কেমন আছো তুমি ?”                 (ঐ)

 

আহা ! কী তীক্ষ্নতায় কবি তাঁর ভাবনাকে, ভালাবাসাকে, সম্পর্ককে প্রকাশ করলেন এখানে । “দলা পাকিয়ে ওঠে এক না-ফোটা প্রশ্ন”এই এক লাইনেই কবি পাঠককে বিদ্ধ করে দিলেন পাঠককে নিয়ে গেলেন, মরমি এক সম্পর্কের দিকে । গভীর এক দুঃসময়েও যারা একে-অন্যকে মনে করে বেঁচে আছে । কবি তাঁর কবিতার মাধ্যমে এই ভাবেই তো সম্পর্ক ধরে রাখেন পাঠকের সাথে । সময়ের সাথে

 

“মানুষের ঘরগুলি এখনো সটান,

শুধু দরজাগুলি খোলা,

পাখিদের একটাই দরজা থাকে

মানুষের দুটি, তাই শূন্যতাও বেশি

সামনে ও পেছনে তার দু’রকম শূন্যতা !”           (পাখি-১)

 

এইরকম দৃশ্যকল্প কিন্তু কবির কবিতায় নতুন । কিন্তু কী নিখুঁতভাবে জীবনের দ্বান্দ্বিকতাকে প্রকাশ করেছেন এখানে । যাপিত জীবনের দ্বান্দ্বিক অবস্থানকে অপূর্ব ব্যঞ্জনায় সামনে এনেছেন কবি এই কবিতায় । এই দিকগুলো তাঁর কবিতায় আবার নতুন করে উঁকি দিয়েছে । প্রথম জীবনের উচ্ছ্বাসময়তা সরে গিয়ে, এসেছে ভাবনায় গভীরতা । চিত্রকল্পেও এসেছে পরিণত গাম্ভীর্য । তবে কবিতার চলনে, এখনও তরলতাকে ধরে রাখতে সমর্থ রয়েছেন কবি

 

        “দেবতার অনুরোধে” কাব্যগ্রন্থে অপূর্ব একটি কবিতা “পরি সিরিজ”পরি কবিতাটি আসলে পাঁচটি কবিতার সিরিজ একটি । সেই সিরিজ কবিতা নিয়ে গল্পকার দীপক দেব অসাধারণ একটি লেখা লিখেছিলেন তৎকালীন লিটিল ম্যাগাজিন “বাংলা কবিতা”-পত্রে । এখানেই আমি সেটাই হুবহু তুলে ধরলাম কবিতাসহ সমালোচক তথা গল্পকার প্রয়াত দীপক দেব-কে তুলে ধরাও আমার একটা লক্ষ্য বটে কী অসাধারণ আলোচনা করেছেন তিনি ।

 

        পরি-(এক)

রান্নাঘরের পেছনে ছিল একটা কাঁঠালি চাঁপার গাছ । বারোমাস ফুল ফোটে । তারও পেছনে ঘন বাঁশঝাড় । সেখানে দিবালোকেও পরিরা থাকে । জন্মমৃত্যু বিবাহে এ বাঁশের প্রয়োজন আমাদের বংশ পরম্পরা হয়তো পরিদের গন্ধ আছে বলেই…”  (অংশত)

পরি-(দুই)

আগরতলা থেকে আটঘণ্টা বাসে চেপে ধর্মনগর । সেখান থেকে দীর্ঘ ট্রেন । টানেলের পর টানেল । জাটিঙ্গার জলে আর এই সব টানেলে পরিরা থাকে । এরকম অনেক পরি পেরিয়ে চা-বাগানের সবুজ অন্ধকারে ধবধবে সাদা একটা ঘরে দেখা যাবে আমার মা আমাকে চিঠি লিখছেন —‘আগের মতো চক্ষে আর দেখিতে পাইনা, তাই লিখিতে পারি না । রাত্রি হইলে মনে হয় আর বাঁচিব না । সম্ভব হইলে একবার আসিয়া আমাকে দেখিয়া যাইয়ো । দাদুভাইকে আমার আদর দিয়ো । আর বৌমাকে বলিও...

আমরা তিনজনেই চিঠিটা পড়েছি । আমি, আমার স্ত্রী আর আমাদের একমাত্র পুত্র । ছোটো পরিবার । আমরা যা খাই যা দেখি সবই এই তিনজনে মিলে । এমন কি কোনও পরিকেও ভাগ দিই না । চিঠিটাও পড়ার পর আমরা লুকিয়ে ফেলেছি

পরি-(তিন)

 

                        আমি বলতে পারি এমন বৃষ্টি আর

কেউ দেখেনি

আমি ভিজছিলাম

আর পরিরাও

 

পরি-(চার )

 

এই যে আমি সর্বত্রই আমি

এই যে তুমি শুধু তুমি

যেন প্রেম

যেন পরি তুমি বিকলাঙ্গ সহোদরা

যেন জননী বা প্রেমিক বা

ধর্ষিতা বা ধর্ষণকারিণী

এই যে বাজছে সময়

ঘণ্টা বাজছে

দেয়াল বাজছে আকাশ পাতাল

                                নাচছে ত্রিশূল মেদিনী । (অংশত) 

 

পরি-(পাঁচ)

 

ফুলগুলি  নেই,

পরিদের ডানা থেকে বাগানের দিনে

তারাই খুলেছিল দুয়েকটা পালক,

এগুলিই আছেভুলগুলি,

নিঃসঙ্গ

কেউ বিবর্ণ, কেউ কালিঝুলি মাখা ,

যেদিন দূরে কোথাও যাব

এগুলি আর সঙ্গে নেব না

পরির পালক

আমার পালক হয়ে পড়ে থাক এখানেই ।

 

তাঁর আলোচনাটিই তুলে ধরছি এবার

(এখানেপরিবানানটি পূর্বে প্রচলিতপরীরূপেই ব্যবহার করেছেন দীপক দেব)

 

“বয়ঃসন্ধিতে আমেরিকান একজন কবির একটা কবিতা পড়েছিলাম । বিষয়বস্তু ছিল ভিয়েতনাম যুদ্ধ মানুষের মৃত্যু দেখে একদল লোকের ভাষাগত হাহাকার । একজনের পর একজন মানুষ মরছে আর মানুষ ব্যবহার করছে শুধু ভাষা, রেডিও দিয়ে টেলিভিশন দিয়ে এবং ঢেকে দিচ্ছে প্রকৃত বিভীষিকা । কবিতার বাস্তবিক দিক তখন আমার সামনে অনেকটা স্পষ্ট কিন্তু নিজস্ব মতবাদকে দৃঢ় করেছে একটি বিশেষ কবিতাকবিতার ব্যাপারে আমার নির্ভেজাল প্রেম আছে । বিশেষত(এক) কবিতা যদি Specific Philosophy consist করে । (দুই) বাক্য বিন্যাস যদি স্ববিরোধ রহিত হয় । (তিন) কবি যদি পুরোপুরি Commit করেন । (চার) সুপ্ত ছন্দ যদি মাত্রা দেয় নতুন এবং (পাঁচ) কবিকে আমি যদি চিনি । কারণ আমি Who says, what says-এ বিশ্বাসী ।

এ-পর্যায়ে আমার আলোচনার বিষয়বস্তু সেলিম মুস্তাফা-র “পরী” কবিতা এক, দুই, তিন, চার এবং পাঁচ [বেরিয়েছে “বাংলা  কবিতা” ১ম বর্ষ, ২য় সংখ্যা ] এই পাঁচখানা কবিতার পর্যায় এতো বিষাক্ত যে নিজেকে অনেক সময়ই চুলচেরা বিশ্লেষণে নিয়ে আসে । পার্থিব সম্পর্ক এবং সম্পর্কহীনতা, সহনশীলতা, এবং মাত্রাযুক্ত আকুতি, অনেকসময় রাগ এইসব জাগতিক বিষয়বস্তুর কবিতাই পরী

পরী লিখেছেন কবি একান্ত নিজস্ব অনবদ্য ঢঙে । সুপ্ত মানসিকতাকে স্পষ্ট করার তাগিদ অনেকদিনই ছিল এই কবির; সমর্পণ শুধু সমর্পণ বাচনভঙ্গী যখন এইরকম হয়ে ওঠে তখন সেলিম তেড়ে ফুঁড়ে উঠেন এবং লেখা হয় পরী

পরী-র কবি প্রথম পর্যালোচনা করেন নিজেকে । কিছুটা নষ্টালজিক হয়েও উদ্বাস্তু সমস্যা, Settle up–এর স্বপ্ন দেখা । যখন সবাই বাঁশঝাড়ে ভূত দেখে, কবি দেখেন পরীএবং কারণে আবার উদ্বাস্তু হওয়া, বাড়িটা হাট হয়ে যাওয়া । কে পরীর খবর রাখবে । মাংস তো বিক্রি হয় প্রতিনিয়ত, এজন্যই তো হাট । 

পরী- দুই, আমাকে এক অদ্ভুত Condition-এ পৌঁছায় । ভৌগলিক দূরত্ব আশ্চর্যভাবে মিলেমিশে গিয়ে এক বিশাল উত্তর-পূর্ব হয়ে ওঠে । বাস্তবতা আসে নির্মমভাবে । আসলে “হাম দো হামারে দো” অর্থনৈতিক কারণেই প্রযোজ্য, Psycofant–দের সামাজিকতাতেও তাই নিয়ে এসেছে । তিনজনের সাথে Share করতে হয়কই আমি বোধহয় ভুলে গেছিকবি আমাকে মনে করিয়ে দেন

আমরা তিনজনেই চিঠিটা পড়েছি । আমি, আমার স্ত্রী আর আমাদের একমাত্র পুত্র । ছোট পরিবার । আমরা যা খাই যা দেখি সবই এই তিনজনে মিলে । এমনকি কোনো পরিকেও ভাগ দিই না । চিঠিটা পড়ার পর আমরা লুকিয়ে ফেলেছি(রী–দুই)

পরী-তিন, হয়তো সামান্য বিশ্রাম দেয় আমাকে, আগে ছ’কামরার ট্রেনটা যাক না । ওদিক থেকে উঁকি দেবে আবার পরিচিত দৃশ্যাবলি । জীবনের ভিতর থেকে টেনে আনা ছবি । পরী-তিন, এভাবে টেনে আনে পরীকার-কে”হুড়মুড় করে ভেঙ্গে পড়ে সাজানো সবকিছু । আর্তচিৎকার করেও নিস্তার নেই । আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়ে গেছি তখন । কবিতাতে আমি হয়ত বাস্তব, পরাবাস্তব, অতিবাস্তব কিছু বুঝি না । বুঝি শুধু বোধ এবং মেধা । আর কবিতার শরীর থেকে বেরিয়ে আসা চাবুক হাতে কবি । শহুরেপনা, এর curse অনেকেরই কবিতার বিষয়বস্তু আছে, কিন্তু সেলিম অনন্যতার চিন্তায়, মুক্তি চান তিনি, মুক্তি দিতে চান পরীকেহয়ত আড়ালে বলে ফেলেন আমরা শুনে ফেলি অবশ্য “আমাদের শরীরে ঢুকে যা পরি, এবার আমি নাগরিক” সভ্যতা তার মুখোশ এবং Specific condition-এ বাঁধা কিছু অসত্য জীবনবোধ । আহা আজ আমাকে কি এভাবে  চেনাতে আছে ? এবং কি রকম Penetrate করতে পারলে লেখা যেতে পারে, “মানুষের জন্যে আমি এর আগে কখনও কাঁদিনি” সারাটা কবিতা জুড়ে কোথায় যে মানুষের জন্য কান্না নেই, দগ্ধ ঘা নেই ! সত্যিই বুঝতে পারলাম না কবি ।

পরী–পাঁচ, কবিতাটি বেশ পরিপাটি করে সাজানো আহ্বান । আমার কাছে যা কিছু আছে তাতো শুধু আমার জন্য নয় Generation উৎসর্গ করা আমন্ত্রণ জানানো । দধীচির মতো পালক ফেলে রাখেন কবি (কবিদের শরীরের কোন হাড় থাকে না) এবং স্বভাবতই মনে বাজে  Coexistence–এর ঐক্যতান, ত্যাগের পরস্পরাতারাও তো কত কিছু ফেলে আসবে কোথাও

পরী-র সেলিম মুস্তাফা তাই আমার অনেক কাছাকাছি, পরিচিত হয়ে উঠেনমূল্যবোধের নির্যাস আপ্লুত করে আমাকে । Basic Instinct স্পষ্ট হয়ে ওঠে; এখানেই বোধ হয় কবির সার্থকতা । লুকানো ছাপানো কিছুই যে শিল্প নয় তা বোধহয় এই কবিতাগুলি স্পষ্ট করে দেয় । কাঁচা বাঁশের স্বাদ আমার জিভে লাগিয়ে কবি আমার সমস্ত শরীরকেই এক আবেগময় বাঁশে তৈরি করে ফেলেন । হ্যাঁ সত্যি কবিরাই সবকিছু বানিয়ে ফেলতে পারেন । অন্তত, সেলিম মুস্তাফা পেরেছেন তার “পরী” পর্যায়ের কবিতাগুলিতে ।”

গল্পকার দীপক দেব ভালো সমালোচকও ছিলেন, এটা আমার জানা ছিল না ।  দীপক দেব “পরী” সিরিজের কবিতার পাশাপাশি কবি সেলিম মুস্তাফার কবিতার বেসিক বিষয়গুলি নিয়েও এখানে আলোচনা করেছেন । এ-এক পরম প্রাপ্য

“যদি কেউ জেগে থাকো এখনো

তবে এই নিদ্রাহীনতার কিছু নাম দাও !

 

এই যে অসহায় ঘুম

এই যে রক্তমাখা ঘুমের শরীর

                        ...  ...   ...  ...   ...  ...      

এই যে খবরখবরের ঘ্রাণ

                                                চুপিচুপি টেলিফোন 

                         এর নাম দাও !”    

                                                (খোয়াই)

 

        ছোট্ট কবিতাটির ভিতর একগুচ্ছ অসাধারণ চিত্রকল্পের জন্মদিলেন কবি । কোন্ দুঃসময়ের  কথা ভেবে কবি জেগে থাকার কথা বলছেন ! এই নিদ্রাহীনতারকারণ কি হতে পারে ? খবর, খবরের ঘ্রাণ, চুপিচুপি টেলিফোনের চিত্রকল্পের ভিতর কীরকম একটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতির গন্ধ পাচ্ছি । কবির কবিতায় “চক্রবৎপরিবর্তন্তে দুঃখানি চ সুখানি চ” এই দুয়ের দোলাচল দেখা যায় । ছোটো ছোটো চিত্রকল্প তৈরি করে করে জীবনের দীর্ঘ-সুড়ঙ্গের দিকেই কবির সম্ভাব্য যাত্রা ।  

 

                           “ভাত ফুটছে

                           ধবধবে শাদা ভাতঅন্ন

                           যাবতীয় যুদ্ধের শেষ কথাঅন্ন

                           ভালবাসার মর্মকথা অন্ন

                           ভালবাসার কথা স্বীকৃত না-হলেও

                           পেটে বাচ্চা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে পাখি

                           পাখি সব করে রব

                           অন্ন অন্ন

                           প্রিয়ংবদা

                           এই অন্ন তুমি খাও

                           আমাকে দিও না ”                  (নিষাদ বেলা) 

 

        আবেগ এবং যুক্তির নিখুঁত প্রয়োগ । তবু আবেগকে ছাপিয়ে উপরে উঠে পড়ে যুক্তি । তবু, কবি “অন্ন” শব্দকে কেন্দ্র করে আমাদের সামাজিক জীবন থেকে রাষ্ট্রীয় জীবনের সংকটকে এই কবিতায় কবি তুলে ধরেছেন দক্ষতার সাথেই । আসলেই তো অন্ন-কে কেন্দ্র করেই তো জীবনের যত জটিলতা । যত সংগ্রাম । যত যুদ্ধ । যত ভালোবাসা । “পেটে বাচ্চা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে পাখি / পাখি সব করে রব / অন্ন অন্ন” পাখির ভিতর দিয়ে খুবই অভিনব এবং নিপুণভাবে চিত্রায়িত করেছেন কবি । 

        ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইম্প্রেশনিজম নামে এক নতুন ইজম রূপ আসে শিল্প-সাহিত্য চিন্তনের জগতে । বাস্তবকে স্বরূপে প্রত্যক্ষ করতে গিয়ে এদের কেউ কেউ দেখলেন বস্তুর ধরা-বাঁধা রূপটি যথাযথভাবে আঁকতে পারলেই সৃষ্টি বাস্তব হয় না । আসল বাস্তবতা নিহিত থাকে বিষয়ীর চোখে বিষয়টি যেভাবে গৃহীত বা প্রতীয়মান হচ্ছে সেই ভাবটির মধ্যে । সংকেতবাদের ক্ষেত্রেও তাই । আমরা প্রত্যেকেই জানি, সংকেতের নিজের কোনো প্রকৃত মূল্য নেই । সংকেত প্রকাশের উপায় বিশেষমাত্র । যে উদ্দেশ্যে সংকেত প্রযুক্ত হয় সেই উদ্দেশ্য যে পরিমাণে সিদ্ধ হয়, সেই পরিমাণে সংকেতের সার্থকতা । 

        আসলে আনন্দ দেওয়ার এবং পাওয়ার জন্য মানুষের ভিতরে একটা সহজ বাসনা কাজ করে সবসময় । এই বাসনার প্রেরণাতেই মানুষ শিল্প সৃষ্টি করে । পাঠক কবিতা পড়েন সেই কবেই কবিগুরু বলেছিলেন“শিল্পের আবেদন মূলত মানুষের কল্পনাবৃত্তির কাছে । কল্পনাবৃত্তি চরিতার্থ করাই শিল্পের উদ্দেশ্য ।” শিল্পের মধ্যে সত্য-মিথ্যা খুঁজতে যাওয়া অনেকটাই অর্থহীন ।

        আমাদের যাবতীয় ঘটনাই একটা চূড়ান্ত লক্ষ্যের দিকে ধাবমান, এটা কবি বিশ্বাস করেন । কবির মতে“আমাদের যাবতীয় ঘটনার পেছনে একটা সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে । সে কারণটা হয়তো আমারা নিজেও জানি না ।”  

        এই কাব্যগ্রন্থের নাম “দেবতার অনুরোধে” রাখার পেছনেও কবির একটা দার্শনিক ভাবনা রয়েছে লুকায়িত রয়েছে বলেই আমার ধারণা । সেই ভাবনা ঠিক ঈশ্বর-ভাবনা নয় । এই কাব্যগ্রন্থের অসাধারণ বলতেই হয় “স্বৈরিণী” কবিতাগুচ্ছকে

 

                   “কত রাত্রির গল্প পথে

                           পড়ে আছে কত পথের কাহিনি রাত্রির

                           মেরুণ জবার বুকে

                           নীল, যেন কালশিটে

                           যেন অপরাজিতা

 

                           কেউ ভাল বেসেছিল

                           কেউ ভাল বাসেনি, কেউ

                           আবছা অন্ধকারে পিছু ধাওয়া করেছিল

                           অস্পষ্ট অপস্রিয়মাণার কেউ

                           নাম জিজ্ঞাসা করেনি

 

                           দেবতার অনুরোধে পথে ফুটেছে ফুল

                           স্বৈরিণী স্বৈরিণী ”                    (স্বৈরিণী-১)

 

 

স্বৈরিণীদের নিয়ে এত মুগ্ধ, এত দগ্ধ এত ভালো কবিতা আমি অন্তত পড়িনি হয়ত গল্প পড়েছি কিন্তু কবিতার মেজাজ, স্বাদই আলাদা স্বৈরিণী শব্দের অর্থের কথা আগেই বলেছি এখানে এসেছে তাঁর জীবন ঘিরেই অপূর্ব সব বেদনার কথা সুখেরও কথা আছে তাদের কথা বলতে গিয়েই কবি বলছেন কত রাত্রির গল্প পথে পড়ে আছে...

পথে কেন পড়ে আছে কথা ? তাও রাতের বেলা ? আসলে, স্বৈরিণীদের সাথে রাতের এক অদ্ভুত সম্পর্ক আছে । কবি এখানে সেই সম্পর্কগুলোকে স্পর্শ করার চেষ্টা করছেন । চেষ্টা করছেন অনুভব করার । কবি তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে একই কথার ওপিঠ ঘুরিয়ে দেখে নিলেন অন্যদিকও । কথা কী কেবল রাতের থাকে ?  তাই কবি লিখলেন “কত পথের কাহিনি রাত্রির মেরুণ জবার বুকে নীল” কিন্তু রাত্রির রঙ তো কালো । কবি “মেরুণ” বললেন কেন ? স্বৈরিণী, কি সেদিন ঠোঁটে মেরুণ রঙের লিপিস্টিক লাগিয়েছিল ? তার নাম কি জবা ছিল ? তার বুকটা কি বেদনায় নীল কাতর ছিল ?

কবির এই লাইন পড়ার পর থেকে, কত ধরনের চিত্রকল্প মনের ভিতর আনাগোনা করছে । “যেন কালশিটে, যেন অপরাজিতা”এই লাইন আরও ব্যঞ্জনা বাড়িয়ে দিল । “কালশিটে” দেখাচ্ছে কেন ? সেটা তো মেরুণ ছিল !  এখানে কি কবি ইঙ্গিতে কোনো নিষ্ঠুরতার কথা তুলে ধরলেন, প্রতীকের আড়ালে ? মেয়েটির নাম কি তবে, জবা নয়, অপরাজিতা ? নাকি দুটোই তার নাম !

        এবার কবি আবার কাহিনিতে নতুন মোড় নিলেন । বলছেন“কেউ ভাল বেসেছিল / কেউ ভাল বাসেনি / কেউ আবছা অন্ধকারে পিছু ধাওয়া করেছিল” কবি এখানে ভালোবাসার কথা বলছেন কেন ? ভালোবাসার কথা বলে, বিষয়টাকে একটু উসকে দিলেন । তাদের ভিতরেও তো ভালোবাসা হয় । কেউ বাসে । আবার কেউ বাসে না । কিন্তু যে ভালোবাসলো ? তার কি হবে ?  কবি তার চরিত্র তুলে ধরেছেন একটিমাত্র বাক্যে“অস্পষ্ট অপস্রিয়মাণার কেউ” সে অপস্রিয়মাণ কেন ? সে তার কথা বলতে ভয় পাচ্ছে ?  ভয় পেলে, পিছুই বা করে কেন ?  অদ্ভুত একটা চিত্রকল্প বা নাট্যও বলতে পারি । পুরো একটা গল্প আছে এখানে । এরপরই কবি অসাধারণ একটি কথা লিখলেন “দেবতার অনুরোধে পথে ফুটেছে ফুল”  ফুল ফুটে ওঠার কি কারণ থাকতে পারেফুল তার স্বাভাবিক নিয়মেই ফোটে । কিন্তু কবি এখানে বলছেনদেবতার অনুরোধেই ফুল তার প্রকাশ ঘটায় । ভাবনাটা একটু ভাববাদের দিকে নিয়ে গেলেন কবি । কিন্তু কি অসাধারণভাবে উপস্থাপিত করলেন । নিশ্চয়ই সেই অদৃশ্য ঈশ্বরের একটা ইচ্ছা তো অবশ্যই আছে । সব ফুল তো ফুটে উঠতে পারে না । আসলে, প্রকৃতির এই আপন মনে ফুটে ওঠার  সৌন্দর্যকেই কবি এখানে “দেবতার অনুরোধে” বলতে চেয়েছেন । প্রকৃতির খেলাই তো তাঁর খেলা । কিন্তু বড় কাব্যিক টার্ন করলেন, এর পরের লাইনে“স্বৈরিণী স্বৈরিণী” বলেই । কবির কবিত্ব এখানেই খেলে গেল । তার মানে স্বৈরিণীও কি ফুলের মতো । তার ফুটে ওঠা, বেঁচে থাকাও কি তবে দেবতার অনুরোধেই ! কবি আর কোনো কথায় গেলেন না । কবিতাটি এখানেই শেষ করলেন । এবার আপনি পাঠক হিসেবে, আপনার ভাবনা ভাবুন । কাকে কোথায় স্থান দেবেন!

 

                           “আজ তার শরীর ভাল নেই,

                           শুধু মন ভাল

                           আজ কিছুই মনে থাকবে না তার

                           কিছু মনে রাখবে না

 

                           আজ সম্পূর্ণ নিরাবরণ হয়ে

                           মাটিতে মাদুর পেতে শুয়ে থাকবে সে

                           ঘুম নেই, জাগরণও নেই,

                           যে আসে আসুক

                           যে যায় যাক

                           আজ শরীর ভাল নেই

                           শুধু মন ভাল”                      (স্বৈরিণী-২)

 

        এই কবিতায় কবি স্বৈরিণী-র অন্য এক প্রেক্ষাপট তুলে ধরলেন । স্বৈর-স্বৈরিণী-র কিন্তু অনেক অর্থ হতে পারে । সে-ই অনেক অর্থেই এই কবিতাকে ঘুরিয়ে দেখতে হবে, অনুভব করতে হবে । এই কবিতায় কবি কি বলছেন ?  আজ তার শরীর ভালো নেই । শুধু মন ভাল । বাক্যটার ভিতরে কীভাবে টুইস্ট নিয়ে এলেন কবি ! তবে কি বলা যায়, আজ তার শরীর ভালো নেই বলেই, মন ভালো । সাধারণত কি এমন হয় ? হয় না । কিন্তু তার হল । আজ তার কোনো চিন্তা নেই, কে এলো, আর কে গেল !  তাই আজ সম্পূর্ণ নিরাবরণ । এই নিরাবরণের ভিতরে শান্তির, স্বস্তির একটা আভাস আছে । রিলাক্সের একটা বিষয় আছে । আজ তার ঘুম নেইজাগরণও নেই । মুক্তির তীব্র এক আনন্দ আজ তার মনের ভিতর । আত্মার ভিতর ।

        শরীর এবং মন নিয়ে অদ্ভুত এক কাব্যিক খেলা খেলছেন কবি এই কবিতায় এই রকম ভাবনার জন্য কবিকে ঋদ্ধ হতে হয় । জীবনকে জানতে হয় কাছে থেকে । শরীর, মনকেও জানতে হয়, স্থিত হয়ে । সেলিম মুস্তাফা এখানেই প্রিয় আমার । একারণেই তিনি আমার প্রিয় কবি তাঁর এইসব নীরব দেখা, দর্শন আমাকে মুগ্ধ করে । আপ্লুত করে । স্বাভাবিকভাবেই করে ।

এই স্বৈরিণী-কে কি ব্যভিচারিণী বলা যাবে ?  কিংবা স্বেচ্ছাচারী ! কিংবা যথেচ্ছাচারী ? আমার মতে না । তাহলে, কী বলবো ? একটা উপন্যাসের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ার মতো, আমিও ভাবছি এই স্বৈরিণী-কে কি নামে ডাকা যায় ! অপরাজিতা ?

 

                           “মহল্লায় শুধু একটিই খবর

                           কচি লাউডগার মত তার শরীর

                           যেন চাঁদ

                           যেন ফাঁদ

                           তাই ভিড়”          (স্বৈরিণী-৩)

 

        শরীরের এই অসাধারণ বর্ণনা শুধু শরীর হয়েই থেকে যেতো যদি কবি শেষে বলতেন না “যেন ফাঁদ” এই ফাঁদ-টা কিসের ? শরীরই তার ফাঁদ ? যেন “আপনা মাংসে হরিণা বৈরী”কবির এই অনুভবকে কবি কি আবার এক নতুন রূপে দেখতে চাইলেন, এই কবিতায় ? কিন্তু কবি এরপরই আবার টার্ন নিয়ে লিখলেন

 

                           “সেই ভিড়ে শুধু একজন থাকে না সে জানে

                           কোন একজন

 

                           সে এলে কোথায় বসাবে ? বিছানায় ?

                           হয়ত সে ঘরেই ঢুকবে না,

                           তাহলে কেন আসবে সে ?

                           নিজের তো ঘর নেই

                           শরীর রয়েছে, তা-ও পর”                  (স্বৈরিণী-৩) 

 

 

        সে-ই ভিড়ে কে থাকে না ? “কেউ ভাল বেসেছিল” প্রথম কবিতায় বলেছিলেন কবি, সেই কি একজন ? “অস্পষ্ট অপস্রিয়মাণার কেউ” সে-ই কেউ কি সে ? আগে তো নাম জানতে পারেনি । এবার কি পেরেছে সে ! সে এখন বিব্রত । সে এলে কোথায় বসাবে তাকে ?  বিছানায় ? বিছানা কি তার উপযুক্ত স্থান হবে ? সে কি বসবে, বিছানায় ? স্বৈরিণী-র মনে অসংখ্য দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ! সে যেন স্থির থাকতে পারছে না অজানা এক উৎকণ্ঠায় । নাকি ভালোবাসায় ? আবার মনে মনে ভাবছে, সে ক ঢুকবে ঘরে ? সত্যি ঢুকবে ! যদি নাই–বা ঢোকে, তবে আসে কেন ? স্বৈরিণী ভেবে পায় না ! তারপরই স্বৈরিণী নিজের দিকে তাকায় । এবং খুঁজে পায় সে নিজের নিঃস্বতাঘর নেই । যে শরীরের উপর সে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, সেও আজ আর তার নেই । তাই সে অনুভব করে“শরীর রয়েছে, তা-ও পর”আজ কোথায় বসাবে, তার প্রেমিককে ? যে তাকে ভালোবাসে যে তার কাছাকাছি থাকে, তাকে না–জানিয়ে । কেউ তাকেও ভালোবেসেছিল । তাকে আজ কোথায় বসেবে সে ? অদ্ভুত ব্যঞ্জনাময় এক কবিতা । সেই স্বৈরিণী   মেয়েটির নাম কি অপরাজিতা । কবি তার পরবর্তী কবিতায় বলছেন

 

                           “অপরাজিতার নাম পাল্টে রাখা হয়েছে নীলা,

                           নীলা রক্তমুখি হয়ে ওঠে ঠিক সন্ধ্যাবেলা

                           নীলা নীল শাড়ি পরে,

                           নীলের সঙ্গে কাব্য জুড়ে আছে,

                           ইনল্যাণ্ড লেটারের মত তার

                           ঘরের রঙও নীল”                  (স্বৈরিণী-৪)

 

         অপরাজিতার নাম পাল্টে গেল কেন ? নাম হল নীলা । নীলা প্রত্যেক সন্ধ্যায় রক্তমুখী হয়ে ওঠে । তবে কি সে তার প্রেমিককে পায়নি ? নাকি সে নিজেই যায়নি ? কেন গেল না ? “সে-ই শুধু একজন” তার জীবনে কেন এল না ! এরপরই কি সে তার নাম আবার পাল্টে ছিল । এরপর থেকেই কি সে নীলা হল ? বিষের মতো নীল ।

 

                           “নীলা একা একাই হাসে

                           বহুরকম তার হাসি

                           নেশায় ঢু লু  ঢু লু  মানুষ দেখতে পায় না

                           তার দাঁতের রঙও নীল ।”         (স্বৈরিণী-৪)

 

        জবা, অপরাজিতা হল । অপরাজিতা হল নীলা ! তাদের জীবন এভাবেই পাল্টে পাল্টে যায়  । নীলা একা একা হাসে । হাসে কেন সে ? নিজের উপরই কি সে হাসছে ? না জীবনের উপর ? নাকি গোটা সমাজের উপর ? নাকি নিয়তি ! নীলা আজ একা একাই পাগলের মতো হাসে । কবিতার শেষ যেন জীবনেরই শেষের ইঙ্গিত দিচ্ছে । স্বৈরিণীদের কি এভাবেই জীবন শেষ হয়, একা একা ! হয়ত এভাবেই হয় । তখন তাদের  দাঁতের রঙও নীল হয়ে ওঠে । কবি  প্রথমেই একটি  লাইনে বলেছিলেন “দেবতার অনুরোধে পথে ফুটেছে ফুল / স্বৈরিণী স্বৈরিণী”  

   

        “স্বৈরিণী” কবিতা গুচ্ছ একটি উপন্যাসের মতো । একের পর এক চিত্রনাট্য যেন উপস্থাপিত হয়ে গেল সিনেমার মতো । Sign of ideas  থেকে  Sign of feeling–এ ঢুকে যাবার এক উৎকৃষ্ট কবিতা এটা । এখানে রবীন্দ্রনাথের একটা মন্তব্য খুব মনে পড়ছে, যেখানে কবি বলছেন–“ভাষার মধ্যে এই ভাষাতীতকে প্রতিষ্ঠিত করিবার জন্য সাহিত্যে প্রধানত ভাষার মধ্যে দুইটি জিনিস মিশাইয়া থাকে, চিত্র এবং সংগীত...কথার দ্বারা যাহা বলা চলে না, ছবির দ্বারা তাহা বলতে হয় । সাহিত্যে এই ছবি আঁকার সীমা নাই । উপমা তুলনা রূপকের দ্বারা ভাবগুলি প্রত্যক্ষ হইয়া উঠিতে চায়”  

        কবি সেলিম মুস্তাফার কবিতায় কোনোপ্রকার চিত্র জটিলতা নেই । চিত্রকল্পও সাধারণত সহজ-সরল । যত বিন্যাস তা থাকে, তাঁর ভাবপ্রকাশে ঠিক এই জায়গাতেই তিনি স্বমহিমায় উজ্জ্বল । তাঁর কবিতা-প্রতিভা স্বতন্ত্র একটি সত্তা বহন করে । জীবনকে দেখা এবং বিশ্লেষণ করার অসাধারণ ক্ষমতা রাখেন তিনি । ত্রিপুরার কবিতা জগতে তিনি অম্লান থাকবেন । থাকবেন চিরতরুণ ।

 

                                        তিন

 

ভাষাশহিদ স্টেশনের দিকে একটি আহত ট্রেন কাব্যগ্রন্থটি কবির ষষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ   প্রকাশ কাল জানুয়ারি, ২০১৪ সাল অক্ষর পাবলিকেশনস্‌” থেকে প্রকাশিত হয়েছে প্রথম কবিতা ‘তারাদের কথা’ এরপর ‘পুনরায়’ কবিতার পর চোখ যায় ‘সম্পর্ক’ কবিতার দিকে   মনে মনে আমি যে কবি সেলিম মুস্তাফার অভাব অনুভব করি, এই কবিতায় তাকে পেয়ে যাই

কবিতাটায় এমন এক ঢেউ খেলিয়েছেন কবি যে, সেই ঢেউয়েই মন ভেসে যায় সম্পর্ক-কে এখানে কবি এক আলাদা মাত্রা দিয়েছেন শুধু সম্পর্ককে, না প্রেম-কেও ?

 

“রাতের কথা ভাবতে পারো তুমি

পরিপূর্ণ অন্ধকার

একটি কুলুকুলু নদী

যা খুশি একটা নাম দিতে পারো”

 

আহা ! কি অপূর্ব ব্যঞ্জনা একটি কুলকুল নদী’নদী এখানে কিসের প্রতীক?  ‘কুলুকুলু’ শব্দটি কি মায়াময় আবার কবি বলছেন, নাম যা খুশি দিতে পারি ! রাত-অন্ধকার-নদী এবং কবিতার নাম ‘সম্পর্ক’, ফলে খুব স্বাভাবিকভাবেই এখানে আলতো করে গোপনে রাখা ‘নারী’ শব্দটি ভেসে ওঠে অথচ কবি একবারের জন্যও কোথাও ‘নারী’ শব্দের কথা বলেননি কারও নাম নেননি কিন্তু কী এক অদ্ভুত সম্পর্ক তৈরি করলেন, সম্পর্কের সুতো টানলেন কী কাব্যময়তায়

 

একটা আধভাঙা নৌকো

তীরের কাছাকাছি দুলছে কোথাও

কোথাও একজন পথভাঙা ক্লান্ত মানুষ

 

কোথাও দাঁড়ি, কমা নেই, অনাবিল এক শব্দযাত্রা এখানে কবি ‘আধভাঙা নৌকো’ এবং ‘পথভাঙা ক্লান্ত’ শব্দমাত্রা যোগ করে, পাঠককে নিয়ে গেলেন, কবির উদ্দিষ্ট ভাবনার জগতে দুটি হৃদয়ের মিলনকে অদ্ভুত এক সম্পর্কে জড়ালেন এই সম্পর্কটি কেমন ? এবার পাঠককে ভাবতে হবে এখানেই কবি একজন গল্পকারকে পেছনে ফেলে দেন এখানে পাঠক একবার কল্পনায় ডুব দিলে, কত সমুদ্র যে সাঁতার দিতে পারবেন তবে, এরজন্য তাকে সাহিত্যে সাঁতার কাকে বলে, তা জানতে হবে সব কবিতায় সাঁতার দেয়া যায় না কিন্তু এ কেমন সম্পর্ক ? কবি লিখছেন

জড়াজড়ির নয়

ছাড়াছাড়ির নয়

কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের নয়

পরবর্তী মুহূর্তে যা ঘটবে

তার ওপর নির্ভর করবে না এই সম্পর্ক

 

এই প্রেম ঘটনার সাথে পাল্টায় না এই প্রেমে প্রেমটাই যেন মোহ শর্তহীন দেয়া-নেয়া কেবলই যেন এক আশ্রয় কিসের আশ্রয় ?  ‘আধভাঙা নৌকো’-র কাঁধে ‘একজন পথভাঙা ক্লান্ত মানুষ’-এর আশ্রয় প্রকৃত অর্থে, এই আশ্রয়ই তো চায় জীবন অভিজ্ঞ ভাবুক কাম-মোহ একসময় শরীর থেকে ঝরে যায় এই কবিতায় আশ্রয়ের একটা ব্যাপার আছে এক মানবীর তরে এক মানবের আশ্রয় কিংবা এক মানবের তরে এক মানবীর আশ্রয় মধ্যে আর কোনো কপটতা নেই। এই কবিতা পড়তে পড়তে কোথায় যেন নিজেকেই মনে হয়ক্লান্ত এক  জীবনপথিক রাতের অন্ধকারে এক নির্মল আশ্রয়

 

এই রাত

এই সংস্থাপানা

এই সত্য অথবা ভ্রান্তি

যা খুশি তুমি ভাবতে পার

 

পাঠকের কাছাকাছি এটাই কবির স্বগতোক্তি ! কবি কিন্তু ‘একটা আধভাঙা নৌকো / তীরের কাছাকাছি দুলছে কোথাও / কোথাও একজন পথভাঙা ক্লান্ত মানুষ’এখানেই কবিতাটিকে আটকে রেখেছেন নোঙরের মতো বাকি আয়োজন কবিতার শরীরকে মৃদুমন্দ করেছে আবেশ ধরে রেখেছে কবিতার

 

কবি সেলিম মুস্তাফা ‘সময়’ কবিতায় সময়কে ধরেছেন কীভাবে ?

 

সামান্য একটা ভয় ভয়

আজ আমার বুকের ভিতর তিরতির করে,

...             ...  ...   

সামান্য একটা ভয় ভয়

খুবই সামান্য,

সময় পাল্টাচ্ছে না কিছুতেই

এরকম ধারণা সত্যি কি মিথ্যে

এই উচাটন আমার আগে আগে যায়—”

 

এখানে ‘উচাটন’ শব্দটার প্রয়োগই কবিকে ভিন্ন এক মাত্রা দিয়েছে এই শব্দ না-থাকলে কবিতাটা সাধারণের থেকে কোন অর্থেই ব্যতিক্রম মনে হত না আমার ‘সময়ের ধারণা / ঘড়ি থেকে ঝরে পড়ে ফোঁটা-ফোঁটা মাটির ভিতর / কেউ দেখে / কেউ দেখে না’দালির ‘ঘড়ি’র কথা স্মৃতিপটে মনে পড়লেও, কবি এখানেই এক ভিন্ন দৃষ্টিকোণ তৈরি করার চেষ্টা করেছিলেন খুব বেশি সফল হয়েছেন বলে, আমি মনে করি না ঘড়ি নিয়ে আমরা সময়কে যতবারই প্রতীকী করার চেষ্টা করবো, ততবারই আমরা মুখ থুবড়ে পড়বো এখানেই দালি চিরকালীন এখানেই তার মহত্ত্ব তবে এখানে কবি সেলিম মুস্তাফার প্রয়োগকৌশল প্রথম দিকে চমৎকার কিন্তু সময়ের সাথে ঘড়িকে ধরার মোহ সহজে এড়িয়েও থাকা যায় না আর যা সহজে এড়িয়ে যাওয়া যায় না, সেখানেই অপেক্ষা করে বসে থাকে বিপদ

এরপরই আমরা ‘ঘর ও আকাশ’ একটি আসাধারণ কবিতার মুখোমুখি হই আমার প্রিয় কবিতাও কবির এমন কবিতার লোভেই তার কাছে বারবার ছুটে ছুটে আসি এরকম কবিতা খুব কমই আসে কবির জীবনে কী ব্যঞ্জনা, কী প্রয়োগ কৌশল, কী উপস্থাপনার ঢং অথচ কবি নির্মোহ অবস্থান নিয়েছেন কটি শব্দেও অপব্যবহার করেননি আমি মননের ছন্দ খুঁজে পাই এমন কবিতার ভিতরেই যেখানে কবি লিখছেন

‘এই তো আকাশ দরজামুখী’এই বাক্যেই তো কবির অসাধারণ কৌশল পরিলক্ষিত হয় দরজাটা আকাশমুখী’ শব্দও হতে পারতো ! কিন্তু এখানেই কবি চমক দিলেন এবং সাধারণকে অসাধারণ রূপে রূপায়িত করলেন ছোটো ছোটো এইসব বিষয়েই কবির শক্তি নির্ধারিত হয় আসলে     

 

        “…মানুষের

অন্নজলে শিহরিত কপাট ও খিল

তাকে ডাকে বাগানের ফুল;

ভালোবাসায় উচ্ছিষ্ট ঘর নীরব, একা,

পেনসিলে আঁকা—”

 

এখানে ‘উচ্ছিষ্ট’ শব্দটা খুব লক্ষণীয় এই শব্দের অভিধানিক অর্থএঁটো, খাওয়ার পর পাতে যা অবশিষ্ট থাকে, খাওয়ার পর মুখ ধোয়া হয়নি এমন কবি বলছেনভালবাসায় উচ্ছিষ্ট ! শব্দকে নিয়ে কী অপূর্ব ব্যঞ্জনা তৈরি করলেন কবি উচ্ছিষ্ট’ শব্দের বোধকেই যেন পাল্টে দিতে চাইলেন এর ঠিক আগেই বললেন ‘অন্নজলে শিহরিত কপাট ও খিল’এই কপাট এবং খিল শব্দ আগের পংক্তিতে ব্যবহার না-করলে, পরের লাইনে কিন্তু ‘উচ্ছিষ্ট’ শব্দটা বসাতে পারতেন না কবি কবিতার ভিতর শব্দ এবং বাক্য তার ব্যালেন্স বজায় রাখতে পারতো না কবিতার স্পন্দনে মসৃণ ভাবটা হুঁচোট খেত অথচ কবি অসাধারণ দক্ষতায় সামলে নিলেন কবিতাটিকে আমি একজন আলোচক হিসেবে, এইসব ছোট ছোট বিষয়ের ভিতরেই কবির বড় বড় গুণ খোঁজার, আবিষ্কার করার চেষ্টা করি আমি ব্যক্তিগত কবিতার ভিতর বিরাট কিছু দর্শন আশা করি না জীবনের ছোটো বিষয়কে কবি কোন জাদুবলে মহৎ করে নেন মুহূর্তে, তাই দেখি এবং অবাক হই পুলকিত হই মুগ্ধ হই জীবনকে কবিতার ভিতর খুঁজে পাই পলে পলে এই আনন্দ আর কোথাও পাওয়া যায় না, কবিতা ছাড়া এইজন্যই যারা কবিতা ভালোবাসে, তারা ঘুরেফিরে  কবিতার কাছেই এসে আশ্রয় নেয়, আশ্রয় চায় বারবার ভালোবাসায় উচ্ছিষ্ট ঘর নীরব, একা’দৃশ্যকল্পটিই মনকে কবিতার মনমোহিনী জগতে ভাসিয়ে নিয়ে যায় দুটি নিথর দেহ, যেন নীরবতাকে উপভোগ করছে তাহলে এখানে ‘একা’ এলো কেন ? দেহ তো দুটি ! তবে কি দু-জন পৃথক পৃথক করে, নিজেকে উপভোগ করছিলেন ? নাকি এখন আর দুটো দেহ নয়, দুই অঙ্গ, মিলনের পর এক অঙ্গে একীভূত ? ‘একা’ শব্দকে নিয়ে এখানে বিভিন্নভাবে খেলেছেন কবি বা খেলতে চেয়েছেন পাঠকদের সাথে এই কবিতার পরতে পরতে কবিতার মন মাতানো খেলা মিশে আছে সব কবিতা এতটা রহস্য, এতটা স্বাভাবিকভাবে রাখতে পারে না এই কবিতা পেরেছে কবি আরও মুহূর্তের লীলাকে লীলায়িত করছেন

 

দরজা পেরিয়ে ভেতরে যে নীল

ভেতরে যে কাতর বিছানা

ফুলরেণু মাখা

তাও পেনসিলে আঁকা

 

এই দরজা পেরিয়ে ঘরের ভিতরের নীল, কাতর বিছানা ! হায় ! কী অপূর্ব উদাহরণ কাতর বিছানা, ফুলরেণুমাখা ! আসলে, কবি বিছানার চাদরের প্রসঙ্গ টানছেন এবং এক সময় এই সম্পর্কের আনন্দকে কবি কী অসাধারণভাবে বিশ্ব-আনন্দের সাথে, বিশ্বযজ্ঞের সাথে মিলিয়ে আরও ব্যাপকতা বাড়িয়ে দিলেন

 

তবু আকাশ আজ ঝুঁকে পড়ে

ঘরের ভেতরে

আরও শূন্য, আরও নীল

বিশ্বনিখিল

 

কবিতার নাম ‘ঘর ও আকাশ’ নামকরণের মধ্যেও কবি ঘরের সাথে আকাশকে মিলিয়ে আনন্দকে বিশ্বের সাথে মিলিয়ে দিয়েছেন  

 ‘সে আমার কেউ নয়’ কবিতাটি কী প্রেমের কবিতা ? কিন্তু এ কেমন প্রেমের কবিতা !

 

সে আমার কেউ নয়

তবু পাশাপাশি চলার উত্তাপ

ছড়িয়ে পড়ে মহাদিগন্ত পর্যন্ত

 

এটা কি প্রেমের কবিতা ? প্রেমের কবিতা হলে প্রথম লাইনেই এই কথা কেন ‘সে আমার কেউ নয়’। আচ্ছা, কেউ যদি না-ই হয়ে থাকেন তবে পরের লাইনে কেন লিখছেন ‘তবু পাশাপাশি চলার উত্তাপ / ছড়িয়ে পড়ে মহাদিগন্ত পর্যন্ত’  এখানে ‘উত্তাপ’ শব্দটা যে কতভাবে কত মানে ছড়াচ্ছে, তা অনুভূতিপ্রবণ পাঠকমাত্রই বুঝতে পারছেন এবং শুধু এখানেই থেমে থাকলেন না কবি ! কখনও কখনও কবির কবিতাও যে কবিকে মাড়িয়ে যায়, তা বুঝতে পেরেই কবি পরের লাইনে তার অনুভব লিখছেন

 

এমনকি

আমার কবিতাগুলিও অতিক্রম করে যায়

এক-একটা অবরোধ, অচেনা ভিড়ে

তাদের বোকা কোলাহল আমি টের পাই;…

 

কবি তার অনুভূতি নিয়ে আরও এগিয়ে যান— “কোলাহলের ঠিক উপরেই মস্ত আকাশ/ আকাশের নিচে সারাদিন আমি তার / পায়ে পায়ে হাঁটি” সে হাঁটা কেমন হাঁটা হবে ? এখানেই পাঠকের ভাবনার স্পেস কবি এখানে পাঠককে দাঁড় করিয়ে চলে যান পরবর্তী ভাবনায়

 

“রাত্রি গভীর হলে

এক পা গুটিয়ে এক পা ছড়িয়ে

নির্বিকার শুয়ে থাকে

সে সমুদ্রসমা

মূক ও বধির কুয়াশার নিচে

সে এক নিতান্ত মাটি !”

 

কবি এখানে ‘সমুদ্রসমা’ এবং ‘মাটির’ সাথে তুলনা করলেন ‘সে’-কে কিন্তু এখানে ‘সে’-টা কে ? কবি কোনো কিছুই ইঙ্গিত করলেন না   কেবল নীরবে উল্লেখ করলেন

 

“আমি তাকে নক্ষত্রের নামে ডাকি

আমি তাকে নদীর নামে ডাকি”

এখানে উল্লেখ কবি কিন্তু কোন দাঁড়ি ব্যবহার করেননি দুটো ডাক-ই গেছে অসীমান্তিকের দিকে। হয়ত তাই তিনি দাঁড়ি ব্যবহার করেননি কত ছোটো ছোটো বিষয় একটি কবিতাকে সুন্দর-কবিতায় রূপান্তরিত করে

        এমন সমন্বয়ের কবিতা এই কাব্যগ্রন্থে খুব বেশি একটা পাইনি ‘ঘর ও আকাশ’ ‘সে আমার নয়’ পর পর দুটো কবিতাই আমাকে মন্ত্রের মতো তন্ময় করে রেখেছিল অনেকক্ষণ এই তন্ময়তা কি কেবল কবিতার সাথে ? না এখান থেকেই তৈরি হয়, কবির সাথে পাঠকের সেতুবন্ধন এভাবেই বারবার প্রেমে পড়ে যাই কবির কবি কোথায় যেন আমাকে জড়িয়ে দিলেন কিংবা বলা যায় ফিরিয়ে দিলেন আমাকে আমার কাছে আমার ভুলে যাওয়া কিছু অতি পুরনো স্মৃতির কাছে এরকম তো আমিও হেঁটেছিলাম তার সাথে ! আমার বাইকের পেছনে সেও তো বসেছিল বসেছিল বলছি কেন ? ‘সে আমার কেউ নয়’ কবিতাটা পড়ার পর থেকে সে তো আমার পাশেই চলে এসেছে এই তো আমার অনুভবে বসে আছে   মূক ও বধির সময়ের পাশাপাশি সে বসে আছে সে সমুদ্রসমা রাত্রির বিছানায় শুয়ে আছেএক পা গুটিয়ে এক  পা ছড়িয়ে আকাশের নিচে আমিও তার সাথে হেঁটে চলেছি মহাদিগন্ত পর্যন্ত এই যে কবির সাথে তার ভাবনাকে অবলম্বন করে, পাঠক হিসেবে আমার পথচলা এখানেই তো কবির সার্থকতা আর পাঠক হিসেবে আমার প্রাপ্তি একটি কবিতা

 

এবার একটা কবিতার কথা বলি কবিতার নাম ‘পাগল’। এই কবিতাটা একটু অন্য মেজাজের এই কবিতাটা একটা ঘটনার হুবহু বয়ানমাত্র কিন্তু কি অসম্ভব দক্ষতায় কবি তাকে কবিতায় রূপান্তরিত করে ফেললেন, এখানে এটাই দেখার কবিতাটি হল

 

“ব্যাংকের বারান্দায় বসে বিড়ি টানছিল পাগলটা,

বিড়ি টানছিল আর কাগজ ছিঁড়ছিলটাকা

জমা দেবার কাগজ টাকা তোলার কাগজ,

এলাকার সবাই তাকে ব্যাংকের পাগল বলে

নাম চরিত্রদেবব্রত দেব তাকে নিয়ে

গল্পও লিখেছেন চরিত্র ও শীত;

 

কাজের চাপ একটু হালকা হলে আমি

বারান্দায় এসে দাঁড়ালামতার কাছাকাছি,

সে আমার দিকে একবার তাকিয়ে

আবার কাগজে মন দিল,

আমি একটু ঝুঁকে বললামতুমি কি পাগল ?

আমার দিকে অন্যমনস্কভাবে একবার তাকাল সে

তারপর এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়ে আমার দিকে

আঙুল তুলে বললতুই পাগল ! তুই পাগল ! তুই পাগল !”

 

এই কবিতাটির মধ্যে একটা দেখা ঘটনার হুবহু বর্ণনামাত্র কিন্তু কবিতাটি কবিতা হিসেবে দাঁড়িয়ে পড়ল কখন ?  নিঃসন্দেহে শেষ লাইনে ! নাকি শেষ লাইন থেকে আসলেই শুরু হচ্ছেকবিতাটি ! এখানে ‘পাগল’ কে ? কবি নিজে তার শেষ অনুভূতির কোন ব্যাখ্যা দেননি কিন্তু পাঠক হিসেবে আমার মনে হচ্ছে, কবি যা বলার তা শেষ লাইনেই বলে দিয়েছেন কবি কি খুব দুঃখ পেয়েছেন পাগলের কথায় ? নাকি এক গভীর উপলব্ধির দ্বার খুলে গেছে কবির, পাগলের এই মন্তব্যটি শোনার পর থেকে সত্যিই কি পাগলটা অস্বাভাবিক ! নাকি স্বাভাবিক হিসেবে দাবি করা, কবিরই এখন মনে হচ্ছে, তিনিই বোধহয় একটা সামাজিক স্তরে অস্বাভাবিকের  দলে বসবাস করছেন আমাদের চারপাশে যা হচ্ছে, তা কি সবই খুব স্বাভাবিক ? কবিতাটির নামও কবি রেখেছেন ‘পাগল’। আসলে, এটা এক ধরনের কৌশল যেখানে নিছক সত্য বচনই কবিতা হয়ে যায় কবি সেলিম মুস্তাফা হাতে গোনা চার-পাঁচটা কবিতাতেই তা করেছেন মাত্র এই কাব্যগ্রন্থেই আছে। যেমন ‘অম্বিকাপট্টি’ 

 

‘ভাষাশহিদ স্টেশনের দিকে একটি আহত ট্রেন’ কাব্যগ্রন্থের ২৯ নম্বর কবিতা ‘ভালোবাসি’। কবির খুব প্রিয় একটি আঙ্গিকে লেখা কবিতাটি শুরু হচ্ছে এইরকম

 

“এই রোদ

এই কুয়াশা

এই যে কথা বলা

এই যে ভেঙে পড়ল পুল

লাইন ফেলে উল্টে গেল ট্রেন

এই যে বন ছেড়ে উড়ে গেল পাখি

                                অন্য কোনও অরণ্যের দিকে

এই অস্থিরতা

এই নদী

 

নদীটির পারে পরে নির্জন নীরবতা

                                                        একটি নারী

আমি আঙুল ডুবিয়ে তুলে আনি ওম্”

 

কবিতাটি আরও আছে আমি পাঠক হিসেবে থামলাম এখানে আমি আঙুল ডুবিয়ে তুলে আনি ওম্এই ‘ওম্’ শব্দটার পর আমি জাস্ট আর কিছু নিতে পারছিলাম না আঙুল দিয়ে ওম্ তুলে আনার বিষয়টা আমাকে চমকে দেয় এভাবেই বলা যায় ! এ-কোন ‘ওম্’ তুলে আনলেন কবি ? একটা দেহ আরেকটা দেহ থেকে যেভাবে ওম্ তোলে আনে ! একটা ঠোঁট থেকে আরেকটা ঠোঁট থেকে যেভাবে ওম্ তুলে আনে ! একটা আস্ত শরীর আরেকটা শরীরকে জড়িয়ে যেভাবে ওম্ তোলে আনে ! অনেকটা সেভাবেই কি কবি ‘ওম্’ তুলে আনার কথা বলছেন এখানে ? কবি যে আনমনে আমার মধ্যে এই অনুভূতির সঞ্চার করে তুলতে পারলেন, এখানেই আমি তৃপ্ত কবি ইচ্ছে, থাক বা না-থাক, আমি কিন্তু এখানেই থামতে চাই কবি এরপর আরও ছয় লাইন লিখে, তার কবিতাটি শেষ করেছেন কিন্তু আমি থেমে গেছি ওম্-তে এসেই এবার উড়ছি আমার প্রিয়তম শরীরের ওম্ নিয়ে কবি তার শব্দের বুনন দিয়ে আমার আবেগকে আবেগ তাড়িত করে দিয়েছেন আমি এখন উড়ছি, আমার সে-ই রোদ, সে-ই কুয়াশা, সে...ই যে কথা বলার দিকে যাচ্ছি, আর ভাবছি ‘নদীটির পারে পারে নির্জন নীরবতা/একটি নারী’ আর আমি ‘আঙুল ডুবিয়ে তুলে আনি ওম্’  এবং অবশেষে যোগ করলাম কবির এই কবিতার শেষ লাইন ‘আমি চিৎকার করে বললামভালোবাসি ! ভালোবাসি !’

 

এরপর আমি কবির পরপর ‘না-লেখা’ ‘ঘর-১’ ‘ঘর-২’ ‘ছোটো কথা’ ‘স্থাবর-২’ ‘মৃত মাছেদের কথা’ কবিতা পড়লাম কিন্তু আমার সে কবিকে পেলাম না কেন পেলাম না ? মন বলল ‘এই না, পাওয়াটাই স্বাভাবিক কোন কবিই তার সব কবিতায় স্পার্ক করেন না এখানেই তো সাধনা এই শব্দময় ব্রহ্মে শব্দের কি আর অভাব আছে ! কিন্তু একজন কবিকে খুঁজতে হয় অমোঘ সেই সব শব্দ, যা তার ব্যক্ত অনুভবকে দেবে মহত্ত্ব

এবং আবারও এগিয়ে গেলাম এবং একটি ভালো লাগা কবিতা পেয়ে গেলাম কবিতাটির নাম ‘দোলননাল’

 

“যে কথা তোমাকে বলি

                        তা কোনও কথা নয়

 

তুমি যা দেখ

আমি যা দেখি

আকাশ আর মাটি মুখোমুখি

 

একথা সত্যি এখন বৃষ্টি পড়ছে

জলের ছাঁটে ক্রমশ ভিজে উঠছে বারান্দা

চল ভেতরে যাই

 

বৃষ্টির ভেতর দুলছে একটি নয়নতারা ফুল

ফুলেদের দোলনকাল খুবই স্পর্শকাতর

 

কবিতাটির ভিতরে একটাও দাঁড়ি-র ব্যবহার করেননি কবি কিন্তু কবি এখানে ঘরের ভিতরে যাবার কথা বলছেন কেন ? ‘ফুলেদের দোলনকাল খুবই স্পর্শকাতর’—এই কারণে ! কিন্তু প্রথমেই কবি এ-কথা বললেন কেন ‘যে কথা তোমাকে বলি / তা কোনও কথা নয়’তাহলে সেটা কী ? যে-কথা অর্থহীন, সে-কথা কেনই বা বলা ? কবিতাটি কী তবে এখানে লুকিয়ে আছে ? না, শেষ লাইনের ভিতরে লুকিয়ে আছে ? এই ভাবনা থেকেই বারকয়েক কবিতাটি পড়ে ফেললাম এবং বুঝলাম, গোটা কবিতার হৃদয় জুড়ে একটা রহস্য ‘তুমি-আমি’-র মতো মুখোমুখি যেন পড়ে রয়েছে এভাবেই কবি সেলিম মুস্তাফা আমাদের হৃদয়কে দোলাতে থাকেন তার কবিতায়

কবি সেলিম মুস্তাফা আসলে, কবিতার ভিতরে শব্দমালার বাইরেও কিছু বলতে চান তার কবিতায়। সেটা অনুভব করা খুব জরুরী, অন্তত তার কবিতা বুঝতে গেলে নিবিড় পাঠক নিশ্চয়ই জানেন, শব্দের সাথে সাথে কবির ব্যবহৃত কমা, ড্যাস, সেমিকলন, দাঁড়ি, স্পেস্ সবই কবিতার মধ্যে নিহিত একটি ইঙ্গিতময় অর্থ বহন করে উপরের কবিতায় কবি কোনো প্রকার  ‘কমা, ড্যাস, সেমিকলন, দাঁড়ি’ ব্যবহারই করেননি, এটাও একটা অর্থ প্রকাশ করছে কবিতায় শব্দের সাথে সাথে নৈঃশব্দ্যকেও সেলিম মুস্তাফা চমৎকারভাবে কাজে লাগিয়ে নেন

এখানে বাংলা কবিতার গবেষক তপোধীর ভট্টাচার্যের কিছু কথা প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করছিকবিতাকে এখন “শুধু নির্মিতির চাতুর্য বা শব্দ-সমবায়ের আকস্মিকতা কিংবা প্রতিবেদনের দার্শনিকতা দিয়ে কবিতার সাম্প্রতিক দিগন্ত-বিস্তারকে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না এমন কি, যাঁরা কবি, তাঁরাও নিশ্চিত নন পাঠকের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে ব্যবহারিক জগতে দৃশ্যমান অনুপুঙ্খগুলি ইদানীং এত দ্রুত বদলে যাচ্ছে যে তথাকথিত ‘বাস্তবতা’ খানিকটা কাকতাড়ুয়ার মতো হাস্যকর ও অলীক প্রতিপন্ন হচ্ছে নির্দিষ্ট কোনো কক্ষপথ নেই পরিক্রমার, নেই কোনো কেন্দ্র বা লক্ষ্যবিন্দুও; কবিতার মধ্যে নির্মীয়মাণ সন্দর্ভ প্রতিনিয়ত সম্ভাব্য এক প্রতিসন্দর্ভের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে পড়েছে চুরমার হয়ে যাচ্ছে আত্মগত ভাস্কর্য, যত্নে-গড়া প্রতীকায়িত চিত্রকল্পগুলি কবিতা পড়া মানে যেহেতু মূল্য নির্ণয়, বিবর্তনশীল পরিধির কোনো-এক অনির্দেশ্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে পড়ুয়াকে পুরনো ধরনের ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে আসতেই হয়; পুরনো ধরন বলতে পাঠকের নৈর্ব্যক্তিক ও নিরপেক্ষ অবস্থানের কথা বলছি জীবন ও জগতের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমস্ত সীমা যখন মুছে যাচ্ছে এবং মুছে গিয়ে, বহুস্বরসঙ্গতির আয়তনকে ক্রমশ জোরালো করে তুলেছেপাঠক তখন কবিতা-প্রক্রিয়ার অংশীদার

সবার ক্ষেত্রেই কথাটা আমি সমর্থন করি তবে এখন যেহেতু, সেলিম মুস্তাফার কবিতা নিয়ে বলছি, তাই তাকে ঘিরেই থাকতে চাই সেলিম মুস্তাফার কবিতার সাথেও ঠিক এভাবেই মিলিয়ে মিশিয়ে ভাবতে হবে তবেই পাঠক তার সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে কবিতার সাথে চলতে পারবেন সেলিম মুস্তাফা তার কবিতার মধ্যে দিয়ে তার সময়কে মাড়িয়েও আজকের তরুণের কাছে অনায়াসে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পেরেছেন

৩৫ নম্বর ‘দোলনকাল’ কবিতাটি পড়ার পর সরাসরি পছন্দের কবিতা এসে থামল ৪৬ নম্বর কবিতায়, যার নাম ‘ভাষাশহিদ স্টেশনের দিকে’। মূলত শিলচরের ভাষাশহিদদের স্মরণ করেই লেখা আমরা সবাই জানি ১৯৬০ সালে আসামের প্রদেশ কংগ্রেস কমিটিদ্বারা অসমীয়া সংখ্যাধিক্যের জোরে অসমীয়া ভাষাকে একমাত্র সরকারি ভাষারূপে গ্রহণ করার প্রস্তাব পাশ করানো হয় মূলত এরপর থেকে বাংলা ভাষাকেও সরকারি স্বীকৃতি দিতে হবে, এই দাবি নিয়ে উত্তাল হয়ে পড়ে বাঙালি একসময় এই আন্দোলন সংগঠিত রূপ নিতে থাকে আন্দোলন মুখর থেকে মুখরিত হতে থাকে তীব্র আবেগে অসমীয়ারা নামে ‘বঙাল খেদাও’ আন্দোলনে বাসে, ট্রেনে বাঙালিদের হেনস্থা করতে থাকে করিমগঞ্জ থেকে শিলচর ক্রমেই উত্তাল হতে থাকে পরিবেশ এমতাবস্থায় ১৯৬১ সালে কাছাড়বাসি জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে জাতীয় সংগ্রাম হিসাবে ১৯শে মে ১৪৪ ধারা অমান্য করে বৃহত্তর এক নির্ণায়ক আন্দোলনের ডাক দেয় ততক্ষণে জেলায় পোঁছে গেছে কেন্দ্রীয় বাহিনী, আসাম রাইফেলসের সামরিক বাহিনী সকলের মুখে মুখে শ্লোগান চলছে ‘জান দেব তবু জবান দেব না’ ‘মাতৃভাষা জিন্দাবাদ’। একদিকে বাহিনীর হাতে লাঠি, বন্দুক, কাঁদানে গ্যাস, অন্যদিকে সংঘবদ্ধ জনতা, আর উত্তাল স্লোগান কাঁদানে গ্যাসের হাত থেকে বাঁচতে মাইকে বলা হচ্ছে‘কাপড় ভিজিয়ে চোখে মুখে দিন চোখে মুখে জলের ঝাঁপটা দিন’। এত সবের পরও আন্দোলনকারীরা মরিয়া একসময় পুলিশ হিংস্র হয়ে ওঠে আন্দোলন থামাতে, এবং গুলি করা শুরু করে এরই পরিপ্রেক্ষিতে একে একে ১১টি তরতাজা  প্রাণ শহিদ হয়ে যায় এই নিয়েই মূলত এই কবিতা স্টেশনকে ঘিরেই কবির স্মৃতিবেদনা কবিকে কীভাবে পীড়া দেয়, সে ঘটনা এটাই এই কবিতার নীড়-বেদনা কবি লিখছেন

 

“সেদিন যে-রক্তের রঙ ছিল লাল

আজ তা ধূসর, আগ্নেয়গিরির

লালাভ লাভা আজ জমে জমে

কালো পিচের মতো পথে পথে

শক্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে

...       ...        ...      ...   

আমরা সেই সেই পথে এখন

জুতো পায়ে মচ্ মচ্ করে হাঁটি”

 

(ভাষাশহিদ স্টেশনের দিকে একটি আহত ট্রেন)

 

এই কবিতাটি কবির একটি আহত হৃদয়ের দলিলও বলা যায় যেহেতু ঘটনাটি শিলচর স্টেশনেই সংঘটিত হয়েছিল, তাই আবেগের একটা স্পর্শ তাকে ঘিরে থাকেই বাঙালি মাত্রেই তাই সমবেত একটা দাবি উঠেছিল শিলচর স্টেশনের নামটা ‘ভাষাশহিদ স্টেশন’ রাখা হোক !  কিন্তু আসামের শাসক গোষ্ঠী তা মেনে নেয়নি তবু সবাই এটাকে মনে মনে ভাষাশহিদ স্টেশনের নামেই সম্মানিত করেছে কবিও সে পথেই বিশ্বাস রেখেছেন

কবিতাটি শেষ হচ্ছে এভাবে

 

“শেষ রাতের মুষলধার বৃষ্টির পর ঝকঝকে ভোর

প্রাতঃভ্রমণের পথে পথে মাটির সুগন্ধে আমি টের পাই

ওপারের বাংলার সঙ্গে এপারের বাংলার

কোন ভিন্নতা নেই,

 

ভোরের বাতাসে ভেসে আসে রেলের বাঁশি

ধর্মনগর স্টেশন থেকে ভাষাশহিদ স্টেশনের দিকে

যাত্রা করেছে

                                     একটি আহত ট্রেন” 

 

কবিতাটির ভিতরে আবেগ আছে তবে মনে হল, যুক্তি যেন তার চেয়েও বেশি কাজ করেছে এই কবিতাটির ভিতরে কবির ব্যথা-বেদনা আমাদের চিন্তার দিকে নিয়ে যায় কিন্তু আবেগে উদ্বেলিত করে না কোথাও যেন মনে হল, কবি যা বলছেন, তা সবই একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্যকে সামনে রেখে যেমন ‘পেছনের জংলায় যে সামান্য সবজি বাগান/ তারই নাম ভারতীয় উত্তর-পূর্বাঞ্চল’ কিংবা ‘মুম্বাই থেকে নয়ডা হয়ে নামে কলিকাতার বাংলা/ তা’তে অন্তস্থ ‘র’ নেই, সবই ‘ড়’/ তা’তে ণত্ব-ষত্ব নেই, শুধু অপিনিহিতি/ হিন্দি আমার রাষ্ট্রভাষা / বাংলাআমার কী ?’

 

এই রকম কবিতার ঢঙ সেলিম মুস্তাফার সাথে যায় না কিংবা বলতে পারি, এইরকম কবিতা তিনি ভালো সাজাতে পারেন না কিংবা মননশীল করে তুলতে পারেন না কবি এই কবিতার নামেই এই কাব্যগ্রন্থের নাম রেখেছেন এর থেকেই বোঝা যায়, এই কবিতাটির প্রতি কবির ব্যক্তিগত একটা আগ্রহ আছে ভালোবাসা আছে ফলে যুক্তি দিয়ে এই কবিতার প্রতি কবির ভালোবাসা কিন্তু যখনই কবিতার মানদণ্ডে কবিতাটিকে দেখার বা বোঝার চেষ্টা করি, তখন কেমন যেন মনটা আনচান করে একটা অতৃপ্তি কাজ করে আমি মনকে বহুবার প্রশ্ন করেছি, এতো গুরুত্বপূর্ণ একটা কবিতা ! অথচ কেন আমার টানছে না ! ঘটনা সত্য বেদনাটাও সত্য কোনও উত্তর পেলাম না হয়ত এখানেই লুকিয়ে রয়েছে কবিতার রহস্য   

        কার কবিতা কখন কার ভালো লাগে, তা বুঝে ওঠা মুস্কিল তবে এই কবিতার কনসেপ্ট ভীষণ ভালো ছিল নিঃসন্দেহে এই কাব্যগ্রন্থেই ‘ঈশ্বর আদালত অথবা বারাক ওবামা’ ‘ভারতীয় গরু’ কবিতাটিও কবির একই স্টাইলের লেখা আবার “ভাষাশহিদ স্টেশনের দিকে একটি আহত ট্রেন”–এর শেষ কবিতাটি মনকে কেড়ে নিল

 

“রাত কখন খুইয়ে ফেলল অন্ধকার

নৌকা চলে গেল দুলতে দুলতে দূর

দিনগুলি পাতা ঝরার

ক্ষতচিহ্ন ফেলে রেখে কেউ চলে যাবেই এবার” (বনলতা)

 

আমি যতদূর জানি এবং কবি সেলিম মুস্তাফাকে দেখেছি, তাতে আমার মনে হয়েছে, যখনই আপনি কোন উদ্দেশ্য নিয়ে কিছু লিখতে গেছেন, সেখানেই আপনি আপনার মতো লিখে উঠতে পারেননি আপনার কলমের মূল শক্তি আপনমনে হেঁটে যাওয়ার ভিতর বিমূর্ত ভাবনার ভিতর দিয়ে চলতে চলতে হঠাৎ করে এক অজানা জগতে পৌঁছে যান আপনি যা আমি ত্রিপুরায় অন্য কারও ক্ষেত্রে কম অনুভব করেছি আপনার কবিতায় একটা ছোঁয়া, না-ছোঁয়া ব্যাপার থাকে অজস্র কবিতা এর সাক্ষ্য বহন করে আপন ভাবাবেগের অনুভবের অভিব্যক্তি হল আপনার কবিতা আমি বিশেষভাবে আপনাকে এভাবেই আবিষ্কার করেছি কিন্তু “ভাষাশহিদ স্টেশনের দিকে একটি আহত ট্রেন” এই কাব্যগ্রন্থের কিছু কবিতায় আপনি বিশেষ পরিকল্পনা করে, কিছু কিছু কবিতা লেখার চেষ্টা করেছেন, যেমন-‘পাগল’ ‘পরির উড়ান’ ‘রেশন’ ‘পুরনো আলপিন’  ‘ভাষাশহিদ স্টেশনের দিকে একটি আহত ট্রেন’ ‘পিতলের ঠাকুর’ ‘ঈশ্বর আদালত অথবা বারাক ওবামা’ ‘ভারতীয় গরু’  এই রকম আরও কয়েকটি আমার জানার ইচ্ছে, আপনি এমনভাবে হঠাৎ আপনার কবিতার গতি ইচ্ছে করেন, কীসের আশায় ? কেন এই ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় নিজেকে জড়িয়ে রাখেন ? যেখানে নির্দিষ্টভাবে কিছু বলা, বা তাদের ইঙ্গিতে কিছু বলা আপনার স্বাভাবিক লিখনশৈলীর প্রায় বিরোধী ! আপনি কি ভাবছেন এই বিষয়ে ?”

এর উত্তরে কবি বলেনতোমার কথা ঠিকই আছে তুমি যেভাবে সেলিমকে আবিষ্কার করেছো, সেটা তার Automatic Writing বা স্বয়ং-লিখিত ধরনের জন্য এটার সঙ্গে হয়তো Surrealism বা অধিবাস্তবতার যোগসূত্র রয়ে গেছে কোথাও রয়ে গেছে ইম্প্রেশনিজমের ছোঁয়া একটা ঘোরের মধ্যে অবাধ গতিতে এসব লেখার জন্ম কিছুটা আবেগাচ্ছন্নতার আলো-আঁধারিতে কিন্তু কোনো এক জায়গায় থাকা, সারাজীবন থাকা, কোনো কবিরই সাধ্যের মধ্যে হয়তো থাকে না সময় সমাজ আর নিকৃষ্ট রাজনীতি কবিকে বরাবরই ধর্ষণ করে যায় লাথি খেতে খেতে পঙ্গুও একসময় উঠে দাঁড়ায় চিৎকার করে, গালিগালাজ করে সময় বলিয়ে নেয় এগুলো এমনই ঘটনা তবে সবই আমার অভিজ্ঞতার ভেতরের জিনিষ, লোক-দেখানো তথাকথিত প্রতিবাদের ফ্যাশন নয় এছাড়া এগুলো জীবন লেখার মোড়ও, যা কখনো সামান্য হলেও ইচ্ছাকৃতভাবেই লেখা, যা পরবর্তী লেখার আগাম বার্তাও বটে এই সময়ে আমি লেখাকে আরও পালটে দিতে চাইছি, যা সময়কে সঠিকভাবে, কিন্তু সস্তাভাবে নয়, আরও সামনে নিয়ে যাবে, বা অন্তত পিছিয়ে পড়বে না অনেক সময়, কবিতার মূল ব্যাপারটা তেমন মূল্যবান আর থাকে না, তার জায়গায় লক্ষণীয় হয়ে দাঁড়ায় তার গতি, বা দিশামুখ কোনো কিছু আশা করে কবিতা লেখা যায় না আমার ক্ষেত্রে তো নয়ই তুমি যে লেখাগুলোর কথা বলছো, সেগুলোর অন্তরে হয়তো কোনো না কোনো নির্মম সত্য লুকিয়ে আছে, যা আমার অভিজ্ঞতার বাইরে নয় সেই হিসেবে, যদি আরও গভীরভাবে দেখো, তাহলে দেখবে সেখানেও পুরোনো সেলিমই আছে লিখনশৈলী স্বাভাবিকভাবেই নিজেকে পালটে নেয়, যে স্বাভাবিকতার বাইরে কেউ ইচ্ছে করে পাল্টাতে পারে না আর যদি পালটায়, তবে তা অন্যকিছু হতে পারে, কবিতা হবে না

 

১৮টি দীর্ঘ কবিতাসেলিম মুস্তাফার সপ্তম কবিতা সংকলন

প্রকাশকসৈকত প্রকাশন প্রকাশকাল২০১৭ সাল ।  

 

দীর্ঘকবিতা আমার কাছে টেস্ট ম্যাচের মত উপভোগ্য এই ধরনের কবিতায় কবির  পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, কবিতার উপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ, আবেগের শ্বাস-প্রশ্বাসের ওঠা নামা, সর্বোপরি শুরু থেকে শেষ অবধি একটি কাহিনি বা প্লটকে ঘুড়ির নাটাইয়ের মত ধরে রাখার নাটকীয় শক্তি লক্ষণীয় ব্যাপার কবিতা দীর্ঘ হলেই যে, সে একটি সার্থক দীর্ঘকবিতা হবে, তা বলা যায় না আমার কাছে এটি উপন্যাসের মত তার দু-হাতে জড়িয়ে ধরার পরিধি বিশাল সে অনেককিছুকে ভালোবেসে, মাড়িয়ে, জীবনের কাদামাটি গায়ে লাগিয়ে তরতর করে এগিয়ে যায় কবি সেলিম মুস্তাফা-র ১৮টি দীর্ঘকবিতা”-র বইটি মূলত তাঁর পুরনো এবং নতুন মিলিয়ে ১৮টি কবিতার ঘনীভূত রূপ ত্রিপুরার কবিতা জগতে তিনিই সম্ভবত দীর্ঘকবিতা বেশি লিখেছেন তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ বাহান্ন তাসের পর মূলত একটি দীর্ঘকবিতা তার প্রতিটি কাব্যগ্রন্থই দীর্ঘকবিতার কাব্যিকতায় উজ্জ্বল তা সে ছোরার বদলে একদিন হোক, কিংবা ইতি জঙ্গল কাহিনি কিংবা দেবতার অনুরোধেসহ অন্যান্য কবি সেলিম মুস্তাফা মনে করেন, দীর্ঘকবিতা  কোন একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের বিস্তৃত বিবরণ নয় বরং অনেকগুলো বিষয়ের সংকোচিত এবং ইঙ্গিতময় রূপ একধরনের কোলাজ চিত্রকল্প  

স্বাভাবিকভাবেই দীর্ঘকবিতার ক্ষেত্রে গতি একটি প্রধান বিষয় একটু অন্যমনস্ক হলেই কবিতা তার গতি হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ে কিংবা হারিয়ে ফেলে তার তরতর ছন্দ, আবেগের আকর্ষণ আর আকর্ষণ হারিয়ে ফেললে কি-ই বা থাকে ? কবি সেলিম মুস্তাফার তারুণ্যে ভর্তি প্রথম কাব্য থেকে সম্প্রতি প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ, প্রায় সব কাব্যেই দীর্ঘ জীবনের ছোঁয়া পড়েছে তার কবিতায় তার জীবনের যাত্রা খুলেছে ক্রমান্বয়ে ফলে বিষয়টা আরও ইন্টারেস্টিং হয়ে উঠে সেই দৃষ্টিকোণ থেকে যদি দেখি, তবে দেখবো তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ বাহান্ন তাসের পর শুরুই হচ্ছে এই লাইন দিয়ে তুমি জীবন শেখাবে ? কতটুকু জান ? আমার কাছে, এটা নিছক তারুণ্যের অহংকার ছাড়া আর কিছুই নয় কিন্তু পরের লাইনেই কবি যখন বলেন

বাহান্ন তাসের পরও আরো এক তাস থেকে যায়- / যার কোন খেলা নেই এই কথা দেখা মাত্রই  বুকের ভিতরে ধাক্কা লাগে আর এখানেই তিনি প্রমাণ করেন যে, তিনি দীর্ঘ রেসেরই ঘোড়া এবং প্রমাণিতও হয় তাই কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থের গতির ডগা তিরের মত যতটা তীব্র ছিল, অনুভবের ছোঁয়ায়ও ছিল ততটা গোটা কবিতাটাই কবি ‘মানুষ’ সম্বোধন করে বা লক্ষ্য করে, তাঁকে কেন্দ্র করে গোটা জীবনকে পরিক্রমা করেছেন, তার মতো তিনি যেভাবে অনুভব করেছেন, যেভাবে তার চারপাশকে ছুঁয়েছেন, সেই ভাবেই লিখে গেছেন অনর্গল আবেগের ফিনকি বেরিয়েছে তীব্রতায়, একের পর এক অনাবিল চিত্রকল্প এঁকে গেছেন নির্দ্বিধায় অকপটে আমাদের লক্ষণীয় হল সেই তীব্রতার ভাষা, সংযম, তার নিয়ন্ত্রিত ডিগবাজি, একের পর এক ভিন্ন রূপরেখার পরিবর্তনের সাথে সাথে পাঠ ও পাঠককে ধরে রাখার দক্ষতা নিঃসন্দেহে ত্রিপুরার প্রথম কাব্যগ্রন্থে এই ক্ষমতা দীর্ঘকবিতার ক্ষেত্রে আর কেউ দেখাতে পারেননি এখানেই সেলিম মুস্তাফার প্রথম কৃতিত্ব তিনি কবিতার জগতে আগুন নিয়ে প্রবেশ করেছিলেন এবং সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল যখন কবির মুখ থেকে শুনি,ওটা বেরোনোর পর সকলে দল বেঁধে বিক্রি করেছিল ’ এই আনন্দের বোধহয় আলাদাই মাত্রা ছিল সত্তর দশকটাই যেন ছিল এমন ! কবিও তখন তারুণে টলমল করছেন, যা তার কবিতার ছত্রে ছত্রে প্রকাশিত হচ্ছিল

 

তুমি থামো, মুর্খামির চেয়ে ভালো

                        ঠোঁটে বন্ধ-তালা, শুধু দেখা হোক

                        মাছের সঙ্গে যেমন মাছেদের দেখা হয়।

জ্যোৎস্নার নিচে মেঘের সঙ্গে যেমন মেঘেদের দেখা

 

কি অদ্ভুতভাবে ছুরির মতো ঠাসটুস কথা বলে বেরিয়ে গেলেন সঙ্গে রেখে গেলেন অভিনব উপমা কিন্তু ‘মেঘের সঙ্গে যেমন মেঘেদের দেখা ’ উপমা বলে কবি কি একটু শান্ত হলেন ? না, এরপরই আবার পিঠ টান করে আগ্রাসীর মতো উক্তি করে বসলেন

 

তোমারই পিতামহ

গভীর অরণ্য থেকে তালপাতা কেটে এনে

রাজার চাঁদের হাটে চাঁদ হয়ে যেতেন,

গুড়ের বাতাসা পেতেন

                        বেঁচে থাকার কী-নিগূঢ় ভিন্ন-অর্থই ছিল !

                        এখন সে গুড় নেই, স্মৃতির যোনির কাছে

                        লাখ লাখ পিঁপড়ের সার !

 

        এখানে ‘তালপাতা-রাজা-বাতাসা-বেঁচে থাকার-নিগূঢ়-অর্থ’এসব উদাহরণ সমষ্টি যোগ করে শেষ অবধি কবি কবি কী বলতে চাইছেন ? তার মানে কি রাজার মুখ চেয়েই চাঁদের হাটে  গুড়ের বাতাসার মতো তালপাতায় কাব্য বা গুণগাঁথা লেখা হয়েছিল ? পেছনে প্রাণভয় নিয়ে বেঁচে থাকার মতো একটি গোপন ছুরির ভয়ও ছিল ! আমার তো মনে হয়, কবি সেই দিকেই ইঙ্গিত করছেন কিন্তু এখানে ভাববার বা দেখবার বিষয় কবির নিয়ন্ত্রণ মেঘের খেলা থেকে চলে চলেন সটান একজন কবির আত্মসমর্পণে বলছেন

 

                        এই তো সার !

                ঐতিহ্যের নাম নিয়ে এযাবৎ বহুবার

তুমি এই অচল-ছবি বিশ্বকে দেখিয়েছ

 

ওমা ! এই ‘তুমি’টা কে এখানে? এ-তো একটা শ্রেণির দিকে আঙ্গুল তুলছেন কবি।

 

এইবার থামো, ল্যাজফুলো বেড়ালের মতো

                        কতদিন এ-ঘর ও-ঘর ?

                        এইবার থামো, বিশ্বব্যাঙ্কের রাজা

তোমার ঐ খড়োল্যাজে ঐ দ্যাখো পেট্রোল ঢালে,

হে মানুষ, হে আমার ভাই, হে বাঁদরের দল

                        এবার ল্যাজ রক্ষা কর

 

        রাজা থেকে বিশ্বব্যাঙ্ক রাজত্বের দীর্ঘ পরিক্রমা এখনও তারাই ঠিক করছে আমরা কী ভাববো, কার কথা ভাববো, কেন ভাবতে হবে সে-ই ‘নিগূঢ় অর্থ’! এখানেই কবিকে, কবির নতুন করে দেখবার, ভাববার উদ্যমকে স্বাগত জানাতে হয় বইটির প্রকাশকাল যখন ফেব্রুয়ারি ১৯৭৮ আজ ২০১৮ কবিতাটি আজ পড়লে মনে হয়, এটা যেন আজকের পরিপ্রক্ষিতে লেখা আসলে এখানেই একটি কবিতা কাল-কে ছুঁয়ে ফেলে কাব্যিক অর্থে শব্দ অতিক্রম করে ফেলে সময়কে আবার সেই একই কবির কবিতা প্রায় ৩৮ বছর পর সেপ্টেম্বর ২০১৫ সালে তার ‘আমি কোথাও নেই’ কবিতায় লিখছেন,

 

আমি তো নিজেই নিজেকে সন্দেহ করি

আমার শরীরে পাগলের হাত পা

আবার রক্তে নির্ঘুম সমুদ্রলবণ 

 

কিংবা

 

তবু হাসতে পারি না

কান্নাও মানা

দু-হাতে লাগেজ নিয়ে মানুষ কাঁদে না

শুধু দেখে যায়

                                কীরকম অন্ধকার ঘনিয়ে আসে

                                কীরকম বাদুড়েরা ঘিরে ফেলে উজ্জ্বল শহর

                                কীরকম পঙ্গপাল উজাড় করে ফসলের ক্ষেত

                                কীরকম ভাঁড়ারে নামে শকুনের দল

 

হে সময় রাত্রি আসন্ন

আমার

ঠিকানাটা দাও ! 

 

         কৈলাসহর থেকে ১৯৭৯ সালে প্রকাশিত এবং কবি ও ছড়াকার, অধ্যাপক সুব্রত দেব সম্পাদিত সাহিত্যপত্রসুখে অসুখে”-এর ২য় বর্ষ ২য় সংখ্যায় “বাহান্ন তাসের পর” কবিতা নিয়ে প্রথম আলোচনা করেন অধ্যাপক অনিলকুমার চক্রবর্তী । বস্তুত সেলিম মুস্তাফার কোনো কবিতা নিয়ে আলোচনা হিসেবে এটাই সর্বপ্রথম তিনি লিখেন “দশ পৃষ্ঠার একটি কবিতা । এতে বেদনা আছে, চিত্র আছে, আছে বক্তব্যও । যেমন ভীষণ শোকের উচ্ছ্বসিত কান্না প্রলাপে বিলাপে থেকে থেকে সোচ্চার হয়ে ওঠে, এ-কবিতাও তেমনি । ...মানুষের প্রতি ভালোবাসা একদিন ছিল কবির । কিন্তু মানুষের বিশ্বাসঘাতকতা আর নীচ আচরণের ইতিহাস পরিক্রমা করে এসে, অতীত বর্তমান আর ভবিষ্যতের মানুষের প্রতি যেন আর কবির কোন শ্রদ্ধা থাকে না । তবে গ্রাম্য সাধারণ মানুষগুলির মধ্যে ভবিষ্যতের তথাকথিত উন্নততর মানুষের জন্মবীজ সুপ্ত হয়ে থাকে বলে কবির মনে হয় ।

সুদীর্ঘ কবিতা জুড়ে মানুষের নানা রূপ এবং প্রকৃতির সমীক্ষা- প্রাগৈতিহাসিক যুগের মানুষ, স্বাধীনতাপূর্ব যুগের মানুষ, গ্রাম্য সহজ মানুষ এবং আমলাতন্ত্রের কর্তাভজা মানুষের চিত্র ।”

        “বাহান্ন তাসের পর” কাব্যটি নিয়ে এটি ছিল প্রথম আলোচনা । সে-ই অর্থে এই আলোচনার গুরুত্ব অনেক । এবং শুরুতেই আলোচক কবিতাটির মূল কেন্দ্রবিন্দুটি অত্যন্ত নিপুণভাবে ধরে ফেলেছিলেন । আলোচক কৃত্তিবাস চক্রবর্তীও এই কাব্য নিয়ে  মন্তব্য করেছিলেন “বাহান্ন তাসের পরও আরো এক তাস থেকে যায়/ যার কোন খেলা নেই ।” সেই বাহান্ন তাসেই সেলিম জীবনকে বাজী রেখে খেলেছেন । কখনও জয়ী, কখনও-বা পরাজিত হয়েছেন ।” সময়ের নিরিখে উপরের আলোচনা অপরিসীম গুরুত্ব রাখে । নতুন কবিকে মূল্যায়ন করা একজন আলোচকের পক্ষে খুব কঠিন একটি কাজ । কিন্তু সেই কঠিন কাজটি প্রায় সবাই সঠিকভাবেই করেছিলেন সেদিন এতে নিঃসন্দেহে ত্রিপুরার কবিতা পাঠকের মানদণ্ড পরিশীলিতএবং দীক্ষিত ছিল, তারই প্রমাণ পাওয়া যায় ।  

 

‘বাহান্ন তাসের পর’ কাব্যে কবি বলেছিলেন, ‘হে মানুষ, হে আমার ভাই, হে বাঁদরের দল...’ আজ এত বছর পর কবি কি নিজেই হতাশ যৌবনের ক্ষোভ রূপ নিয়ে হতাশায় আসলে এই দেখাই এক অর্থে প্রকৃত দেখা জীবনের ভিতর দিয়ে দেখা কিন্তু সবই কি তাই ! না, চলুন দেখা যাক

 

কবি ‘বাহান্ন তাসের পর’-এ আরও লিখছেন

 

দাঁড়ানো কি সোজা কাজ ?

বৃক্ষ সে-ও ক্রমান্বয়ে গ্রীষ্ম থেকে শীতে হেঁটে যায়...

তবু, কোমলতা দিয়ে তার

মাটির সঙ্গে উষ্ণ সুকঠিন যোগাযোগ, যেন

হাতে-হাতে জড়াজড়ি, পরস্পর বেঁচে থাকা

হাতের ভেতর,

এই তো বেঁচে থাকা ! এই তো বেঁচে থাকা !

বেঁচে থাকা নয় ?

 

ওমা ! এখানে কবি যে আরেক মোড় নিয়ে নিলেন কবি ‘হাতে-হাতে জড়াজড়ি’ করে বেঁচে থাকার কথা বলছেন কখন মানুষ মানুষের হাত ধরে ? কবি বলছেন

 

“…বেঁচে থাকা বৃক্ষরা সত্য নিয়ে বাঁচে,

আমি আজ নিজের ভেতর সেই সত্য চাই, যা

গলিত বেশ্যা-যোনির নির্বিকল্প আত্মা হতে পারে

এর চেয়ে গাঢ় সত্য

এর চেয়ে দৃঢ় সত্য পৃথিবীর কোনোখানে নেই !

 

        কবি আরেকবার বিপজ্জনক স্পীডে মোড় নিলেন, ‘গলিত বেশ্যা-যোনির নির্বিকল্প আত্মা হতে পারে’ এই লাইনে এই এলাকাটা সার্বিক অর্থে বিপজ্জনক। কিন্তু কবি এখানে মুন্সিয়ানা করে ‘নির্বিকল্প’ শব্দটি ব্যবহার করে বেরিয়ে গেলেন, কোন দুর্ঘটনা ছাড়াই একে আমরা গানের ভাষার মতো ‘কবিতার মুড়কি’ বলতেই পারি এবং এখানে পাঠককে ক্ষণিকের জন্য থামতে দিলেও সমস্যা ছিল তাই কবি পরের লাইনে কোথা থেকে কোথায় গেলেন ‘এর চেয়ে দৃঢ় সত্য পৃথিবীর কোনোখানে নেই !’

সামাজিকভাবে যুগে যুগে যাদের, যেভাবে আমরা জেনে আসতে শিখেছি, বা শেখানো হয়েছে, কবি বলছেন, এর চেয়ে সত্য নাকি নেই ! পাঠককে টার্নিং করে কোথায় ঘুরিয়ে দিলেন তারপরও থামতে দিলেন না, ধর্ষণ সম্পর্কে একটা খোঁচা দিয়েই কবি চলে এলেন

 

‘আমাদের একটাই ঘর, আমাদের একটাই উনুন,

শুধু, একজন রান্না হয়, আর

একজনে রাঁধে’

 

আমি ভেবেছিলাম, শুধু একজন রান্না ‘করে’ লিখবেন কবি কিন্তু লিখলেন ‘শুধু, একজন রান্না হয়,আর / একজনে রাঁধে’কি ভয়ানক চিত্র এবং কল্পও গোটা নারীজীবনকে কীভাবে আগুনের মতো ছুঁয়ে বেরিয়ে গেলেন অথচ কিছু বুঝেও যেন বুঝে উঠতে পারছি না এখানেই গতির খেলা কবির গুগলি মিডিলস্ট্যাম্প গেল, অথচ পাঠক টের পেয়েও যেন পেলেন না ! কেউ হয়ত টেরই পেলেন না দীর্ঘকবিতার খেলাটা আসলে এখানেই গতি এবং মেজাজ এই দুটো না-থাকলে আপনি দর্শকের মতো পাঠক হারাবেন আপনার খেলা দেখতে কেউ বসেও থাকবে না এতক্ষণ ধরে জীবনের প্রথম টেস্টেই সেঞ্চুরি মারার মতো কবি সেলিম মুস্তাফাও জীবনের প্রথম কাব্যগ্রন্থ তথা প্রথম দীর্ঘ কবিতায় বাজিমাত করলেন গ্যালারি ভরা পাঠককে মুগ্ধ করলেন নিজের দক্ষতায় কলমের জোরে

 

ভেবে দ্যাখো, ভোগের জন্য আসলে

                                                প্রকৃতই রাজা চাই,

তুমি তো গোলাম হোসেন, বেহুলার ঘরে তুমি

সাপ !

 

এবং লখাই জাগে,

কঙ্গো নদীর জলে লখাইয়ের লাশ নিয়ে

লক্ষীন্দরই ভেসে যায় গভীর গভীরতম আফ্রিকার দিকে’

 

প্রকৃতই বোঝা যাচ্ছে, কবি একটা দিশার দিকেই এবার ইঙ্গিত করছেন এবং এই প্রথমবার কবি ধরা দিয়ে বলছেন, ‘আমার ভেতর আমি এইভাবে জেগে বসে আছি

কিন্তু কবির যত রাগ দেখলাম মানুষের উপর তাদের সটান না-দাঁড়ানোর উপর কবি বলছেন

‘এবার দাঁড়াও দেখি কোথায় দাঁড়াও!

এবার পালাও দেখি কোথায় পালাও!

...........................................

দাও, যদি দিতে পারো চাবুকটা দাও,

তারপর মানুষ, অন্তত একবার,

অন্তত একবার তুমি

 

পিঠ খুলে উবু হয়ে বসো ! 

 

গোটা কবিতাকে নৈপুণ্যের সাথে এগিয়ে নিয়ে আসলেও শেষটা পাঠক হিসেবে আমাকে খুব বেশি উচ্ছ্বসিত করতে পারেনি বা পরিণত মনে হয়নি সেটা হতেই পারে ! একটা সহজ সমীকরণ চলে এসেছে আর এই ফাঁকা জায়গাটা কবি ধরা পড়েছে ৩৮ বছর পর পূর্বের উল্লেখিত ‘আমি কোথাও নেই’ কবিতায় অন্তত আমার তাই মনে হয়েছে তুলনামূলক পাঠ প্রতিক্রিয়ায় বিশ্লেষণ করে দেখুন, কবি কোথাও-না-কোথাও আজও একা হাজারও প্রশ্ন তার এপাশে ওপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে কবি দিশাহারা

 

আমি বুঝেও না-বোঝার ভান করি

আমি কি উদ্ধার পেতে চাই

কীরকম উদ্ধার আমার জন্য প্রতীক্ষারত

আমাদের ঘর কোথায়, পথ কোথায়

                                        কোথা গেল আমাদের ছায়া-শ্যামল বাড়ি!    

                                                                (আমি কোথাও নেই)

 

প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও প্রশ্ন এক জীবনের যুক্তিহীন অবিন্যস্ততাকে স্বাভাবিকভাবে মানতে পারা, না-পারার দ্বন্দ্বের মধ্যে কবি গোটা জীবনই ঘোরাফেরা করেছেন কখনও প্রশ্নের উত্তর পেয়েছেন, কখনও পাননি কিন্তু একই প্রশ্ন কবি সেলিম মুস্তাফা যৌবনে যখন করছেন তখন একরকম মনে হয়েছে আবার আজ যখন অবসর জীবনের গণ্ডি পেরিয়ে জিজ্ঞাসা করছেন, তখন তার মানে বদলে যাচ্ছে মেজাজ বদলে যাচ্ছে গভীরতা মোড় নিতে থাকে অন্য আরেকদিকে

 

বেলা চড়ছে আকাশের গায়ে গায়ে

ধূসর আকাশ আর মসৃণ বটের পাতা ছায়াছায়া অনিত্য সাজিয়ে বসেছে

দূরের পথিক দুলেদুলে আরও দূরে মিলিয়ে যায়

যেখানে রেললাইন বিদায় নিয়েছে পৃথিবী থেকে 

                (আমি কোথাও নেই)

 

আবার এই কবিরই ১৯৮৩ সালের কাঞ্চনপুর সিরিজের লেখার সাথে একবার তুলনামূলক পড়ে দেখি কবিকে এভাবেই তন্নতন্ন করে পড়ে, তার নাভি অবধি পৌঁছনো দরকার এভাবে পুনর্পাঠের মজাই অন্যরকম কবিকে সময় ছুঁয়ে থাকে, নাকি সময়ের কাছে কবি একেক সময় একেকভাবে ধরা দেন ? প্রকৃত কবি সময় নিয়ে খেলা করেন সময়কে নিয়ন্ত্রণ করেন, নিজের মতো না-হলে কি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পক্ষে ঐ বয়সে ‘শেষের কবিতা’ লেখা সম্ভব হত ?

আমাদের কবি ১৯৮৩-তে লিখলেন

 

একটি চুম্বনের পর আরেকটি জোরদার চুম্বন আমি

আশা করেছিলাম, একটি ছোবলের পর আরেকটি

বিষাক্ত ছোবল ঠিক ব্রহ্মতালুতে, একটি গুলির পর

আরেকটা গুলি  

(এই পাহাড় ঘুম দাঙ্গা প্রেম ও প্রণিপাত)

 

আজ আমার আবার প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করছে, ১৯৮০ সালে এমন ভয়াবহ দাঙ্গা হল কেন ? আর ভাবি, কবি কি অবাক করা চিত্রকল্প আঁকছেন কবিতার ভিতর দিয়ে কিছু না-জেনেই, সবুজ পাহাড়ি বুকের গভীরে বসে

 

    ...এই গাঁয়ের যুবকদের পাশে পাশে,

ফুলবতী ঝিনুকের মতো হাসে, তার গলার নিচেই হলদে

ভয়ংকর ঢেউগুলো দেও নদীর ঘোলা জল বলে ভ্রম হয়, কবরের

আরেকটা কপাট তখন সরে যায়, ঊরুর ওপর হা করে

ঝুঁকে পড়ে সমস্ত পৃথিবী, খুনিরা পঞ্চাশটা দেশলাই

কাঠি নিয়ে একই ম্যাজিক দেখায়, আমি টের পাই

ভালোবাসার বত্রিশটা দাঁত কী ভয়ংকর সাদা ! লবণের

দানা তার সমস্ত জিভে, ডিমের বর্ণহীন অংশের মতো তার

ভৌতিক আলিঙ্গন—নৌকার মতো বিস্ফোরিত তার

আর্তি, সমস্ত ঘটনার পর সে ধীর কণ্ঠে বলে

‘মনে থাকবে তো ? 

(এই পাহাড় ঘুম দাঙ্গা প্রেম ও প্রণিপাত)

 

এইখানে কবির দেওয়া সাক্ষাৎকারের একটা অংশ তুলে ধরছি তাহলে এই কবিতাটা দেখার ক্ষেত্রে আমাদের সুবিধা হবে কবি কাঞ্চনপুরের আর্থ-সামাজিক তথা সার্বিক পরিস্থিতি পুনরায় স্মরণ করতে গিয়ে বলছেনআদিবাসী সমাজবা বলতে পারো কাঞ্চনপুরকে দেখে, কাঞ্চনপুর যদি আমার জীবন দেখার প্রথম প্রতীক হয়ে থাকে, তবে সেটা আমার অকল্পনীয় দেখা, বিস্ময়ে দেখা, কৌতুহলে দেখা, আগ্রহে দেখা, এক রিয়ালিটিকে দেখা জীবনের ভেতরে ভেতরে বয়ে চলা আরেক জীবন, বাইরের জীবনের ভেতরে চলা যে মেশিনঘরযা বাইরের জীবনকে রসদ জোগাচ্ছে, জেনারেট করছে, তার মুখোমুখি হওয়া বিনিময় ছাড়া যে সৎ বা অসৎ, মহান বা সাধারণ, সুখী বা অসুখী কোন জীবনই চলে না, তার সরাসরি মুখোমুখি হলাম সেখানে আমার প্রথম রিয়ালিটিকে ছোঁয়া ! আমার মনে হলো ভালবাসাও  বিনিময়-মাধ্যম । আমি অনেক পরে জেনেছি বলে অনেকে হয়তো হাসবেন । এই ইমোশনকে যথেষ্ট সম্মান জানিয়েই বলতে চাই, যা যতটুকু দেয়া যায়, তা ততটুকু পাওয়া যায় কোনো কোনো আদিবাসী যদি যৌনতা দিয়ে কিছু আদায় করেও থাকেন, সেটা বিনিময়ের কড়ি হিসেবেই দিয়েছেন আবার কারো কারো যৌনতা লুণ্ঠিত হয়েছে, সেটা আলাদা ব্যাপার ওখানে অনুপজাতিরা বুঝেছিল, শরীর খুবই সস্তা বিষয়, আর বিশেষ সম্প্রদায়ের উপজাতিরা বুঝেছিলআরে, এরা তো দেখি শরীর পেলেই সন্তুষ্ট !’

কবির এই উপলব্ধির প্রেক্ষাপট থেকে পুনরায় যদি কবিতাকে আরেকবার পুনর্পাঠ করি, তাহলে আপনি পাঠক হিসেবে ভিন্ন এক মাত্রা পাবেনই এবং চমক লাগবে ‘খুনিরা পঞ্চাশটা দেশলাই / কাঠি নিয়ে একই ম্যাজিক দেখায়, আমি টের পাই / ভালোবাসার বত্রিশটা দাঁত কী ভয়ংকর সাদা !’ এই লাইন পড়ে কিংবা ‘সমস্ত ঘটনার পর সে ধীর কণ্ঠে বলে/ ‘মনে থাকবে তো ?’

প্রশ্নটা যেন সমস্ত মানবজাতিকেই করে ফেলছে সে ? মনে কেউই রাখে না শোষকরা কেবল শোষণ করে কোথাও মায়াবী, কোথাও চালাকি করে, কোথাও রক্তচক্ষু লেলিয়ে...এবার আপনি ফিরে যান ৮-এর দশকের সেই কাঞ্চনপুরে কবির চোখ দিয়ে দেখে আসুন আরেকবার চারিদিকে তাকালেই আপনার মনে হবে, কেউ যেন প্রশ্ন করছে ‘মনে থাকবে তো ?’ ‘ফুলবতী ঝিনুকের মতো হাসে’ এই ফুলবতীরা কার প্রতীক ? কেন প্রতীক ? এত কিছুর পরও তারা ‘ঝিনুকের মতো’ কেন হাসে ? কি তাদের ট্র্যাডিশন ? কতদিনের ট্র্যাডিশন ? ‘ফুলবতী’ কি রিয়াং, না, চাকমা ? না, অন্য কেউ ? কেন তারা এভাবে বলে‘‘মনে থাকবে তো ?’ কবি আরও ভয়ংকর দৃশ্য আঁকছেন পরবর্তীতে

 

...শান্তি তারপর জেগে ওঠে একটা রাতের জন্যমেয়েমানুষ

ভেতরে-ভেতরে জাগে, শান্তি

তারপর মরে যায় একটা রাতের জন্য,

শরীরের বদলে পুকুর, সময়ের বদলে টাকামেয়েমানুষ

কখনো মরে না

(এই পাহাড় ঘুম দাঙ্গা প্রেম ও প্রণিপাত)

 

কিন্তু একি, কবি এর পরবর্তী লাইনে আরও মনোজগতের সাথে সাথে সামাজিক, সরাসরি রাজনীতির ভিতরে ঢুকছেন রাজনীতি কারা করে ? মানুষ ! তবে তো মানুষের ভিতরেই ঢুকছেন কবি কী লক্ষ করছেন, যা আরও ভয়ংকর ?

 

কিন্তু আজকের আগুন চোখে দেখার নয়, যৌবন নিয়ে

শান্তির আর তেমন কোনো যন্ত্রণা নেই, এক ভয় আর

বিভ্রান্তি তার সময়কে তাড়া করে—মেয়েমানুষের

মাংস ছাড়াও ঘর জ্বলে উঠতে পারে, শান্তি

টের পায় মানুষের চোখে চোখে অন্য এক আগুন

(এই পাহাড় ঘুম দাঙ্গা প্রেম ও প্রণিপাত)

 

এভাবেই ক্রমে ক্রমে কবি কবিতাকে নিয়ে গেছেন একের পর এক শিহরণের দিকে বিষয় একই কিন্তু তাতে একের পর এক ডাইমেনশন আনছেন বারবার মোড় ঘোরাচ্ছেন, সংকটের সম্ভাবনার দুর্ভাবনার এইগুলিই দীর্ঘকবিতার সম্পদ কবির বোধের, ভাবনার, কল্পনামেধার শক্তি

 

যদিও কাঞ্চন পুরে ১৯৮০ সালে দাঙ্গা হয়নি কিন্তু কবি চোখ তাকে সম্বল করেই যেন দেখে ফেলতে চেয়েছে গোটা ত্রিপুরার চিত্র সেলিম মুস্তাফার কবিতা পড়তে পড়তে বিখ্যাত চিত্রকর মকবুল ফিদা হুসেনের একটা উক্তি আমাকে খুব প্রভাবিত করেছিল যেখানে তিনি বলেছেন‘আমি কখনই চিত্রকর্মে চালাকি করতে চাইনি, রাখঢাক রাখিনি বা দুর্বোধ্য কিছু করিনি আমি সহজ একটা কিছু বলতে চেয়েছি ক্যানভাসে একটা গল্প বলতে চেয়েছি আমি চেয়েছি, আমার চিত্রকর্মগুলো মানুষের সঙ্গে কথা বলুক।’ কবি সেলিম মুস্তাফার কবিতা পড়লেও আমার এরকমই অনুভূত হয়  

একটি কবিতা লেখার জন্য কবিকে অনেক অকবিতা লিখতে হয় শব্দের জটিলতা ছাড়াও যে কবিতা রচনা সম্ভব সহজ-সরল ভাষ্যের ভেতর দিয়ে নিজের অনুভূতিকে যে প্রকাশ সম্ভব উত্তর-আধুনিকতার আছড়ে পড়া ঢেউয়ের ভেতর দিয়েও শব্দের বিচিত্র বর্ণবিভায় নিজেকে স্বতন্ত্র করে তোলা সম্ভব কবি সেলিম মুস্তাফা শব্দের দ্যোতনায়, কোন উদ্দেশ্যহীন স্বপ্ন নির্মাণ করেন না বরং সযত্নে নিজেকে নির্মাণের চেষ্টা করেন হৃদয় খুঁড়ে খুঁড়ে নিজেকে উপস্থাপন করেন অভিনবভাবে আমাদের সমাজের অন্তর্বস্তু এবং প্রকরণ যখন অহরহ বদলে যাচ্ছে, তার সাথে তাল রেখে কবিও পরিবর্তন করছেন তার ভাষা প্রকরণ-শৈলী কবি সেলিম মুস্তাফা তার কবিতায় আমাদের ব্যক্তিসত্তা ও সামাজিক অস্তিত্বের চেনা আদলকে কবিতায় তুলে আনতে চেয়েছেন  

          

আমরা এই বইয়ে পরের কবিতা পাই ‘ছোরার বদলে একদিন’ কাব্যগ্রন্থ থেকে নেয়া ‘আমার প্রিয়ার শরীরে ছিল পানিফল’। আবেগ আর পরিণত চিন্তার সুচিন্তিত প্রয়োগ লক্ষ করার মত

 

                        তুমি জান না

মৃত্যুর সঙ্গে কান্নার কোনো সম্পর্ক নেই !

আমাদের মায়ের শরীরে ছিল আমন ধানের গন্ধ

                        আমার প্রিয়ার শরীরে ছিল পানিফল 

 

আবার কবিতার মাঝ পথে গিয়ে বলছেন

 

আমাদের প্রিয়ার শরীরে ছিল আমন ধানের গন্ধ,আমাদের

মায়ের শরীর তুমি বাসনায় ডলে ডলে

আগুন করেছ, মানে চিতা

চিতার আগুন এত লাল, কারা যেন চুরি করে

আগুন পোহায়

পানিফল পুড়ে পুড়ে ছাই হয়ে আছে, লাঠি দিয়ে

                        কারা যেন খুঁচিয়ে তুলছে ক্রোধ

 

        কি অসাধারণ কোলাজ চিত্রকল্প কবির পরবর্তী কাব্যগ্রন্থ এবং কবিতা ‘ইতি জঙ্গল কাহিনি’ কাঞ্চনপুর থেকে চলে আসার সময়ের প্রেক্ষাপটে লেখা এবং এই কবিতায় কবি সত্যি একটা ক্রমশ জটিল হয়ে যাওয়া সময়কে সামনে রেখেই যেন ইতি জানাচ্ছেন বনকে। চাকরি থেকে বদলিও হয়েছেন এই জঙ্গলকে ইতি জানাতেই হবে কিন্তু কবি ব্যথা অন্য কোথাও—

 

কবিতা নেই তবু

                        নির্বাসিত বনভূমি সহসাই শিহরিত হয়—

                        পায়ের দাগ ধরে এসে কে যেন মরে পড়ে থাকে—

একা—

                        উপুড় করা শরীর

 

        ছোরার বদলে একদিন কাব্যে ছিল কবির কাঞ্চনপুরে প্রবেশ, প্রকৃতির অবাক করা বিস্ময়, তার আবাহন কবিকে পাগল করেছিল তেমনি ঘরে ফেরার সময় কবির দেখা পাহাড়ের এখন যেন অনেক তফাৎ তার কবিতায় কিভাবে সময়ের ছাপ পড়ছে তা খুব লক্ষণীয় । কবি তার দেখা জীবন থেকেই শব্দ কুড়িয়েছেন বারবার । এখানেই তার কৃতিত্ব স্বীকার করে নিতে হয় ‘এই পাহাড় ঘুম দাঙ্গা প্রেম ও প্রণিপাত’ কবির আরেকটি আসাধারণ দীর্ঘকবিতা— ‘আবার জেগে উঠেছে হত্যাকারীরা—যারা / ভালোবাসার মঞ্চে উঠে আলো নিভিয়ে দেয়’ মনে হয় যেন আজকের চিত্রকল্প গত তিনদিন ধরে যে ভয়ের আশংকায় ইন্টারনেট বন্ধ রাখা হয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতেই যেন এই লাইন উঠে আসতে বাধ্য হয়েছে কবির কলম থেকে ! অথচ তা নয় এই লাইনটি প্রায় ২৫ বছর আগের লেখা, এখনও কত প্রাসঙ্গিক আর এখানেই কবি সেলিম মুস্তাফা সবাইকে টেক্কা দিয়ে কবিতা-পাঠকের ভালবাসার ডালি নিয়ে যান আপনমনে তার কবিতার ভিতরে ত্রিপুরার পাহাড় ও সমতলীয় ভাবনার একটা সমন্বয় লক্ষ্য করা যায় তার কবিতায় পাহাড়ি-বাঙালি এই সংকীর্ণ শব্দ ভেদ করে উঠে আসে মানুষের কথা শোষিত মানুষের কথা ষড়যন্ত্রের শিকার মানুষের কথা খুব সহজেই অনুভবের দরজায় টোকা দেয় এই বোধ—

 

... কিন্তু আমরা ভালোবেসেছি, এ কেমন ভালোবাসা !

                              

বিছানা গড়িয়ে যায় এক অনিশ্চিত পাহাড়ি-রাতের খাদে,

লোকে বলে কাঞ্চনপুর, কাঞ্চনমালা

নামে কোনোদিন কেউ ছিল কিনা জানি না, ফুলবতী আছে,

                        আমি সোনাগাঁও—আমি বলি গোরস্থান

                        ভালোবাসা আর ম্যালেরিয়ার দেশ, ফুলবতী রিয়াং-এর দেশ

যার যৌবনে ঠোঁট ছোঁয়াবার আগেই নীল হয়ে যায়...’’

 

কবিতাটি কবি লিখেছেন ১৯৮৩ সালের কাছাকাছি এক মায়াময় কাঞ্চনপুর কবি নিজেও আপ্লুত সেই পরিবেশে কিন্তু প্রকৃতি আপ্লুত করলেও ‘ফুলবতী রিয়াং’ কবির ভাবাবেগে আঘাত এনেছে রিয়াং রমণীদের যন্ত্রণা কবিকে মর্মাহত করেছে

 

        “যার যৌবনে ঠোঁট ছোঁয়াবার আগেই নীল হয়ে যায়।” কবি ফুলবতীর নারী-বেদনার ব্যঞ্জনাকে আরও বাড়িয়ে তুলেন‘প্রতিটি মানুষের পেছনে / আরো একজন মানুষ, ফুলবতী এদের প্রত্যেককেব/ চেনে, সে জেগে থাকে এই গাঁয়ের যুবকদের পাশে পাশে’ কবির এই ‘ফুলবতী’ গোটা ব্যবস্থার প্রতীক হয়ে ধরা দেয় কবি তার বিশাল দুঃখকে এঁকেছেন আলতো তুলির টানে

 

“ফুলবতী ঝিনুকের মতো হাসে, তার গলার নিচেই হলদে

                        ভয়ংকর ঢেউগুলো দেও নদীর ঘোলা জল বলে ভ্রম হয়, কবরের

আরেকটা কপাট তখন সরে যায়, ঊরুর ওপর হা করে

        ঝুঁকে পড়ে সমস্ত পৃথিবী, খুনিরা পঞ্চাশটা দেশলাই

                        কাঠি নিয়ে একই ম্যাজিক দেখায়, আমি টের পাই

                        ভালোবাসার বত্রিশটা দাঁত কী ভয়ংকর সাদা !”

 

এখানে কবি কবিতার আড়ালে আশি-দশকের কাঞ্চনপুরের সন্ধ্যার পরের একটা তৎপরতার কথা তুলে ধরেছেন আরেকটা কপাট তখন সরে যায়, ঊরুর ওপর হা করে’  কি অদ্ভুতভাবে ‘কপাট’ শব্দ কবি এখানে ব্যবহার করেছেন ।  আমি তো কপাট পড়তে গিয়ে ‘কপট’ পড়ে ফেলেছি দু-বার আসলে গোটা প্রক্রিয়ার ভিতর আমি নীরব একটা কপটতা লক্ষ্য করেছি করেছেন কবি কপাট’ শব্দটা এখানে কি অদ্ভুতভাবে যোনি-দুয়ারের সাথে মিলে যাচ্ছে । ‘আরেকটা কপাট তখন সরে যায়, ঊরুর ওপর হা করে’—বাক্যটা এখানে শেষ হয়নি, যেখানে আমি শেষ করেছি কিন্তু আমি করেছি কেননা, আমি এখান অবধি একটা অর্থ বের করার বা ধরার চেষ্টা করেছি   এবং কবিও প্রাণের তাগিদে উন্মাদের মতো কলমের ডগায় যা এসেছে, তাই লিখে গেছেন অবিকল

 

“সমস্ত ঘটনার পর সে ধীর কণ্ঠে বলে/ ‘মনে থাকবে তো ? আমাকে তোমার মনে থাকবে তো?”প্রত্যেক পতিতাই ভুল করে হলেও কোনো এক অসতর্ক মুহূর্তে হলেও জিজ্ঞেস করে ফেলে ‘মনে থাকবে তো ?’ এবং এই বাক্যবন্ধটাই প্রমাণ করে, কবি কতটা হুবহু বাস্তবতাকে  চিত্রায়ন করতে চেয়েছেন তার কবিতায় ! 

 

                        “কাঞ্চনছড়া থেকে তুলে নিয়ে এসেছে, বলেছে পুকুর দেবে

আর পাঁচটি টাকা, শান্তি

                        তারপর শুয়ে পড়ে একটা রাতের জন্য, শান্তি

তারপর জেগে ওঠে একটা রাতের জন্যমেয়েমানুষ

ভেতরে-ভেতরে জাগে, শান্তি

তারপর মরে যায় একটা রাতের জন্য,

শরীরের বদলে পুকুর, সময়ের বদলে টাকা

 

এখানে কবি খুব পরিষ্কারভাবে একটা জনজীবনের চিত্র তুলে ধরেছেন । কবি কবিতাটি লিখেছেন ১৯৮৩ সালের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে কবি সময়ের ইংগিত দিচ্ছেন তার কবিতায় ‘সে দূর থেকেই দেখেছিল তার / প্রিয় টং-ঘরে আগুন’ । কিন্তু ১৯৮৩ সালে এসে কবি তার পরের লাইনগুলিতে বলছেন‘কিন্তু আজকের আগুন চোখে দেখার নয়,  যৌবন নিয়ে / শান্তির আর তেমন কোনো যন্ত্রণা নেই, এক ভয় আর / বিভ্রান্তি তার সময়কে তাড়া করে—মেয়েমানুষের / মাংস ছাড়াও ঘর জ্বলে উঠতে পারে, শান্তি / টের পায় মানুষের চোখে চোখে অন্য এক আগুন’

আমি চুপ করে ভাবলাম কী হতে পারে সে  ‘অন্য এক আগুন’ ! যৌবনের স্বাভাবিক আগুনকে পেরিয়ে সে আগুন কি হতে পারে ? কোন আগুনের কথা বলতে চাইছেন কবি ? ‘শান্তির বুকের মধ্যে রাখা টাকার ময়লা নোট আরো / ভিজে ওঠে ঘামে, সে জানে না / পরিণামে কী হবে কার কার কী হবে !’ কবি কি অপূর্ব ব্যঞ্জনা এনেছেন, এই উক্তি করে ‘ময়লা নোট আরো ভিজে ওঠে ঘামে’ তার মানে সংকটটা আরও গভীর আসলে কবি ৮০-র দাঙ্গার পর বাঙালি আর উপজাতির ভিতরের সম্পর্কের ভাঙনটাকেই এখানে ধরতে চেয়েছেন । এভাবেই পরতে পরতে কবি ‘এই পাহাড় ঘুম দাঙ্গা প্রেম ও প্রণিপাত’ কবিতায় কাঞ্চনপুরের তৎকালীন পরিস্থিতি খুলেছেন ক্রমে ক্রমে  

 

‘ভালোবাসা আর অপরাধে

বার বার আমি আমারই মতো, কারো

সময় কখনো বিপন্ন করিনি, মানুষ শব্দটা

মনে রাখতে গিয়ে আমি

পরিহার করেছি সব সামাজিক পরিভাষা,

যারা বলে ভালোবাসা অপরাধ, আর

যারা বলে অপরাধই ভালোবাসা

তারা প্রণম্য’

 

 

        জীবন মহুয়াএমনি আর একটি দীর্ঘকবিতা

কবি ‘জীবন মহুয়া’ কবিতায় মানুষকে নিয়ে দোদুল্যমান । যেন বুঝে উঠতে পারছেন না, মানুষকে নিয়ে ঠিক কি বলা যায় ! ‘ভালোবাসা’ আর ভালোবাসাহীনতা-র ভিতর দোদুল্যমান কবিতাটি লিখেছেন ১৯৯০ সালে অথচ ১৯৭৮ সালে লেখা ‘বাহান্ন তাসের পর’ কবিতায় কবি সেই একই সামাজিক মানুষ সম্পর্কে কি বলছেন ? বলেছেন

 

হে মানুষ, হে আমার ভাই, হে আমার বাঁদরের দল

এবার ল্যাজ রক্ষা কর ! পালাও

ঢাকের ওপর তপ্ত বারুদের কাঠি এসে পড়ল বলে !

যাও পালাও !

 

আসলে, জীবন বদলায় আজ কবি নিজেই দ্বিধাবিভক্ত জীবন হয়ত তাই । কবি ‘ভালোবাসা’ আর ভালোবাসাহীনতা-র ভিতর আজ কবি যেন স্থবির কবি আজ বলছেন—

 

                        “জীবনের বহুমূল্যতা ক্ষয় করে,

                        কোনো সংঘাত আমি কখনো চাইনি,

গল্পের অন্ধকারে কবিতার অনিবার্য স্থিতি কিংবা

                        ধানী-ইঁদুরের গর্তে শীতল সাপের যে

                        প্রবীণ কাহিনি, আমি তা জানি—

                        আমি তো সবই জানি !”              (জীবন মহুয়া) 

 

ভাবনার ক্রমবিবর্তনে আজ কবি অনেক বেশি  সতর্ক দৃষ্টি নিয়ে চলার পক্ষপাতী কেবল তাঁর অনুভূতি আগের মতো, এখনও অনর্গল বলে যাচ্ছেন দিশা কবির কাছেও নেই ! কবি এই দিশা কোথাও দেখতেও পাচ্ছেন না তাই বলছেন—আমি  দার্শনিক নই, সকলের মতো / আমিও শব্দমাত্রআমার ভিতর / আরো অজস্র শব্দ, যারা ক্রমশ / রূপান্তরিত হচ্ছে বর্ণ আর বর্ণহীনতায়”

কবি সম্ভবত এভাবেই পাল্টান ! তাহলে কবির বিশ্বাস বারবার পাল্টায় ?পাল্টাতেই  পারে এই কবির ক্ষেত্রে আমি অন্তত লক্ষ্য করেছি   বিশ্বাস’ শব্দটাকে প্রায়ই আমরা ততটা গুরুত্বের সাথে ভাবি না ! বিশ্বাস—খুব একটা সরল মানসিক প্রক্রিয়ার নাম নয় জ্ঞানেরই একটি বিশেষ রূপ সমাজ-চেতনার চিন্তনের অবগতিমূলক মানসবৃত্তিই বিশ্বাস ফলে, কবির কবিতায় তার  মননের ভাষা, বিশ্বাস পাল্টায় সচল কবির ক্ষেত্রে পাল্টাতে তা বাধ্য          

কবি এই কবিতাটি শেষ করছেন অদ্ভুত এক ব্যঞ্জনায়

 

আমার স্বভাবে আছে এইসব দ্বিচারিতা—

কাঁটার সংলাপ,

মনে হয় ভ্রষ্ট হয়ে আছি,

তবু আছি

 

আসলে, আমাদের এই কবি দর্শনে সংশয়বাদী স্কেপ্টিসিজম কোনো কিছুকে নিশ্চিন্ত বলে ঘোষণা দিতে তিনি নারাজ যেকোনো কিছুকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এই কবির স্বভাকবি তার এক কবিতায় সরাসরি বলেছেনআমি তো নিজেই নিজেকে সন্দেহ করি

এই কবিতায়ও আমরা দেখছি, কবি বলছেন

 

‘জীবনানন্দের ‘ক্যাম্পে’ পড়ার পরও আমি

হরিণ খেয়েছি, সবাই খায়,

আবার খাব হরিণ !’

 

কবি সেলিম মুস্তাফা খুব স্বাভাবিকতার ভিতর দিয়ে জীবনকে বোঝতে চান আমি দেখেও দেখি না, সন্তানের চেয়ে অধিক দূর / দৃষ্টি আর যায় না আমার !

 

‘জীবন মহুয়া’ দীর্ঘ কবিতায় একক্ষণ, এত এত চিন্তাচক্রের ভিতর পরিভ্রমণ করে কবিকে এসে পেলাম এক মরমিয়া ছোঁয়ায়  মাথার উপরে ফ্যান ঘুরছে, তবু / খুব হালকা একটা গন্ধ আবার ছড়িয়ে পড়ে,/ সারা ঘরেলেবুফুল ! কোথা থেকে আসে ?/ আমি ছেলের দিকে তাকাই/ তাকে আমার খুব শুঁকে দেখতে ইচ্ছে করে আজ !

এই কবিতায় কবি একটা কোলাজফ্রেমে কাজ করেছেন ছবির পর ছবি এঁকে গেছেন অনর্গল    

 

আজ পাঠশালা বন্ধ” কবিতায় খুব সুন্দর করে ‘মুনলেইদেন’ একটা চরিত্র এনেছেন । কবিতাটা কোলাজ একটা ভাব নিয়ে শুরু হয়েছিল, কিন্তু অচিরেই কবিতার মধ্য থেকেই ‘মুনলেইদেন’ চরিত্রটি প্রবেশ করার পর থেকেই কবিতাটা কেমন যেন তাঁকে ঘিরেই বৃত্তাকারে ঘুরতে থাকে কবিও যেন এরপর তার প্রেমেই পড়ে গেলেন, কবিতাকে আর মুনলেইদেনের ঘোরের বাইরে নিতে পারলেন না হয়ত দরকারও পড়ল না আর ! কবিতাটা শুরু হয় খুব সরল একটা প্রেক্ষাপট নিয়ে ‘আজ পাঠশালা বন্ধ’ তারপর গুটি গুটি লাইনে কবিতা হাঁটলেও, কবিতা ঠিক হচ্ছিল না কোথায় যেন কবিতাটি তার ভাব ধরে রাখতে পারছিল না পাঠক হিসেবে  যখন কবিতাটা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেব ভাবছিলাম, তখন প্রায় কবিতার মধ্যেই ‘মুনলেইদেন’ চরিত্রটি প্রবেশ করে এবং প্রবেশ করেই মন জয় করে নেয় কবিতাটিও নিয়ে থাকে এক ভিন্নমাত্রা এবং চরিত্রটিকে বড় স্বাভাবিক মনে হল কবি রানিং কম্পোজে লিখছেন—

 

“ডলুবাড়ি থেকে মুনলেইদেন প্রতিদিন হেঁটে হেঁটে পানিসাগর বাজারে আসে বাজার খুব বড় নয় এর বুক চিরে চলে গেছে ৪৪ নং জাতীয় সড়ক সড়কের টান সে এড়াতে পারে না বাজারের ইশারা তাকে ভিনজগতে টেনে নিয়ে যায় সত্তরের কাছাকাছি মুনলেইদেন হালাম একদা সুন্দরী ছিল এটা স্পষ্ট এখন সে একা একাকিনী ...কবেকার ফর্সা যুবক কোথায় যেন হারিয়ে গেল তবু তার পা থামে না হাত থামে না জুম থামে না জঙ্গল পোড়ানো আগুনের ফুটফাট্ আওয়াজ তার কানে ঝুমঝুম্ বাজে, রিনিরিনি বাজে মুনলেইদেন হাসে মুনলেইদেন হাঁটে।

 

ঠিক এই জায়গায় এসে কবি সেলিম মুস্তাফা কীভাবে কবিতাটিকে টার্ন করলেন দেখুন ! ত্রিপুরার আর কোনো কবি এরপর এই পঙক্তি হয়ত লিখবেন না

 

“শব্দ আজ অনন্তকে ছুঁইয়াছে নিরক্ষরা বুড়ি আজ বেহুলার মতন কান্দে শব্দ আজ অনন্তকে ছুইয়াছে।আসলে এই খেলাই কোলাজের খেলা সেলিম মুস্তাফা এই খেলা ভালোই খেলেন তার কবিতায় এই খেলাকে আর একটু এগিয়ে গিয়ে দেখলে দেখতে পাই, কবি তার কোলাজে সংযোগ করছেন

 

“মুনলেইদেন অন্ধকারে হাঁটে তার আগে-পিছে জোনাকিরা যায় সহস্র জোনাকি-আঁখি পঞ্চাশ বছর আগেও সে এমনই দেখেছে সেদিন নেইবানফির্ তার পাশে ছিল

 

ধোঁয়া ওড়ে

এ ধোঁয়া জুমের নয়

এ ধোঁয়া সিগারেটের নয়

ধোঁয়া আজ শব্দকে ছুঁইয়াছে

 

        আগে আমরা দেখলাম কবি লিখছেন ‘শব্দ আজ অনন্তকে ছুঁইয়াছে এবার কবি লিখছেন— ‘ধোঁয়া আজ শব্দকে ছুঁইয়াছে       

 

এভাবে কবি পরতে পরতে তার শব্দের জাদু লিপিবদ্ধ করে চলেন সবসময় এর পেছনে কোন সূত্র কাজ করছে এমন নয় কবি যেন মনে যা-ই আসছে, তা-ই লিখে চলেছেন মনকে ছেড়ে দিয়েছেন কলমের ডগার কাছে তার যা ইচ্ছে তা-ই লিখে চলেছে সে এবং অবশেষে দেখা গেল, সব মিলিয়ে অপূর্ব এক ছবির আত্মপ্রকাশ ঘটছে কবিতার বুকে কবিতাটি শেষও হচ্ছে অদ্ভুত এক কাতরতা নিয়ে—

 

“মুনলেইদেন্ হাঁটে

রাজ-আমল থেকে হাঁটে

ভিলেজ কাউন্সিল থেকে গাঁওসভা—গাঁওসভা থেকে ভিজেল কাউন্সিল

জঙ্গল থেকে জাতীয় সড়ক জাতীয় সড়ক থেকে জঙ্গল

তদন্ত নিষ্প্রোজন

                   ডলুবাড়ি ইজ্ রুর‍্যাল ইণ্ডিয়া

                   পানিসাগর ইজ্ রুর‍্যাল ইণ্ডিয়া

                   মুনলেইদেন্ ইজ্ রুর‍্যাল ইণ্ডিয়া”

 

এখানে শেষে কবি ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করলেন কবি ? এর ভিতর দিয়ে কি বোঝাতে চাইলেন ? অবশেষে কি সবই রাজনীতির গভীর ষড়যন্ত্রের শিকার মূলত ভারতীয় শাসন ব্যবস্থা যে মূল কাঠামো অবধি কোনভাবেই কার্যকরীভাবে এগিয়ে যায়নি, এই বাস্তবতাকে কবি তুলে ধরেছেন এভাবেই ! ‘মুনলেইদেন্ ইজ্ রুর‍্যাল ইণ্ডিয়া’

এই কবিতাটি ২০০৬ সালে দিকে লেখা আমরা লক্ষ্য করছি তার দীর্ঘকবিতা একটা বাঁক নিয়েছে যৌবনের গতির সাথে এখানে একটা ধীর রূপ শাখা নিয়েছে এটাই স্বাভাবিক  

 

        কবি সেলিম মুস্তাফার কাছে জানতে চেয়েছিলাম‘কবিতার বাইরে বেরিয়েই জানতে চাইছি ‘মুনলেইদেন’ চরিত্রটি আপনাকে এত আকর্ষণ করলো কেন ? আমার কোথায় যেন বারবার মনে হল, মুনলেইদেন চরিত্রটির ভিতর দিয়ে কবি নিজেও এক অজানা জীবন-জিজ্ঞাসায় হারিয়ে গিয়েছিল আমি আসলে জানতে চাইছি, মুনলেইদেন চরিত্রটির প্রেক্ষাপট কীভাবে বা কখন আপনাকে ছুঁয়ে গিয়েছিল!

উত্তরে কবি বলছেন, “এটা সত্যিকারেরই একটা চরিত্র । কিছু কল্পনা করেছিতবে তার জীবনের সঙ্গে ১০০% না মিললেও অনেকের জীবন থেকে টুকরো টুকরো করে এনে সাজালে এমনই হবে এটা একটা গড় জীবন এবং বহুকাল থেকে একই রকম হয়ে আছে আমার মনে হয়েছে গোটা প্রত্যন্ত ভারতই এরকমযেন সভ্যতা এগিয়ে গেল আর সংস্কৃতি রয়ে গেল অন্ধকার কোণে । ভারতের সময় নেই এমন জীবনের কথা ভাবার । এটা যেন সময়েরই একটা অন্ধকার টুকরো । রুর‍্যাল ইন্ডিয়াই আসল ইণ্ডিয়া, যা বহুকাল ধরে একই আছে

 

কবি সেলিম মুস্তাফার ‘অতিকথনের মায়া’ আরেকটি উল্লেখযোগ্য কবিতা রচনাকাল ২০০৬ সাল দামছড়া থেকে লিখেছেন কর্মসূত্রে তিন বছরের জন্য আবার গিয়েছিলেন ইতি জঙ্গল কাহিনি’ লিখেছিলেন কাঞ্চনপুর, ১৯৮২ সালে তার কবিতা লক্ষ করলে, সময়ের সে ছাপ ধরা পড়বে কিন্তু সময়টা কীভাবে পাল্টেছে ! এখন কী দেখছেন কবি ? কবি এই কবিতা শুরুই করছেন, এই বলে—

“গুলির শব্দ এখন আর শোনা যায় না”— প্রায় ২৪ বছর পর কবির আবার জঙ্গল দেখা এবং কবি শুরুতেই বললেন, এখন আর গুলির শব্দ শোনা যায় না তার মানে ৮-এর দশকের ত্রাসের সংকট আর নেই কিন্তু কবি এর পরের লাইন থেকেই পুরোপুরি পরিস্থিতি পাল্টে যেতে দেখে লিখছেন

“তা এখন অন্যভাবে অনূদিত, বাঁশের

বোঝার নিচে চাপা-পড়া লঙ্গাই

যেন বা নাই,

আর শীত এমনভাবে এল যে

কেউ টেরই পেল না,

গরমে অস্থির মোটা মানুষের কোলাহল

শীতকাতর মানুষদের

অস্ফুট গোঙানির নিচে ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।” 

 

পরিবর্তন’টা কবি তার ভাষায় স্পষ্ট তুলে ধরেছেন অনূদিত’ শব্দটির ব্যবহার খুবই লক্ষণীয় গুলির শাসন, শোষণ এখন তার ধারা পাল্টেছে ২৪ বছর আগে কবি ‘এই পাহাড় ঘুম দাঙ্গা প্রেম ও প্রণিপাত’ কবিতায় লিখেছিলেন— ‘প্রতিটি মানুষের পেছনে / আরো একজন করে মানুষ, ফুলবতী এদের প্রত্যেককে / চেনে, সে জেগে থাকে এই গাঁয়ের যুবকদের পাশে পাশে,/ ফুলবতী ঝিনুকের মতো হাসে’

কিন্তু ২৪ বছর পর কবি এবার ‘অতিকথনের মায়া’ কবিতায় লিখছেন—

 

“তবু, শব্দ আছে,

পীতাভ গুল্ফ থেকে সে-শব্দ ছিটকে আসে

পাহাড়ের কোল বেয়ে উঠে যাওয়া পার্বতী যুবতির,

আমি তার পায়ের তলায় মেদিনীর কেঁপে ওঠা দেখি;”

 

সেদিনের ঝিনুকের মতো হাসিটি আর নেই যুবতির দাঁতে এরপরই কবি লিখছেন

 

“কবিরা শব্দের খোঁজে এখানে আসেন,

ছোট বড় সাংবাদিক, মাঝারি নেতা—

শব্দের ভিখারি সব— শব নিয়ে খেলা”

 

এখানে কবি সেলিম মুস্তাফা একথা কেন বললেন—কবিরা শব্দের খোঁজে এখানে আসেন ? শব্দের ভিখারি সব ! ‘শব’ নিয়ে খেলা কেন বললেন ? সাংবাদিক থেকে নেতা সবাইকেই জড়ালেন সন্দেহের জালে আমি আবার কবির প্রথম দুই লাইনের দিকে তাকালাম, যেখানে শুরুতেই কবি বলেছেন— ‘গুলির শব্দ এখন আর শোনা যায় না,/ তা এখন অন্যভাবে অনূদিত’ এই কবিতাটির দ্বিতীয় পর্যায়েও দেখি কবি লিখছেন—

 

“রাতের অনেক উপরে সপ্রতিভ চাঁদ,

বাতাসে পুনর্মিলনের অঙ্গীকার—

একটু অচেনা একটু অনিশ্চিত;

 

জীবন অলৌকিক, জীবন

ঘোলাটে লঙ্গাই,

তবু কার চোখে যেন বেদনার

সুস্মিত আলো খুঁজে পাই”

 

        কবি এখানে ‘পুনর্মিলনের অঙ্গীকার’ লিখেও কেন লিখছেন ‘একটু অচেনা’ ‘একটু অনিশ্চিত’! নিতান্ত লৌকিক জীবনকেই বা কেন আখ্যা দিলেন ‘অলৌকিক’!  জীবনের এই লৌকিক থেকে অলৌকিকের দিকে যাত্রাই তো এক বিশাল যাত্রা আবার কবি এর ভিতরেও কীভাবে কবিতা মিলিয়ে দিলেন শুধুমাত্র এক লাইন ব্যবহার করে— ‘তবু কার চোখে যেন বেদনার / সুস্মিত আলো খুঁজে পাই’বেদনার আলো’ সে আলো কেমন আলো ?  এভাবে অপূর্ব চিত্ররেখা এঁকে এঁকে চলেন কবি এও এক স্টাইল তার

 

“বটের গভীর শাখার নিরাপদ অন্ধকারে

বাদুড়ের ডানা ঝাপটানো, ক্কচিৎ ফুলের গন্ধে

ক্ষীণ হাহাকার—”

 

আহা ! কি অপূর্ব চিত্রকল্প কবি একাধারে তার মনের ভাবের সাথে সাথে মানানসই রূপরেখা এঁকে চলেছেন অথচ অনর্গল কোথাও মনে হচ্ছে না, কবি কষ্ট করে কিছু কল্পনা করছেন মোহাচ্ছন্ন, অবচেতন এক অবস্থার ভিতর দিয়ে কবি যেন কেবল লিখেই চলেছেন লোহার ব্রীজ, শীতল সবুজ, সব কিছুকে নিয়ে যেন কবি চলছেন প্রকৃতিকে অনুভব করছেন নিবিড়ভাবে তার এই কবিতায় প্রকৃতি একেকটা চরিত্র হয়ে আসছে যেন

 

“বুনো বাতাস এসে একা একা ঘুরে যায়,

ভুঁইকুমোড়ের চারা চুপিচুপি চোখ বুজে ফেলে

লোহার ব্রীজের নিচে শীর্ণ লঙ্গাই আরও

চুপিসারে বয়ে যেতে চায়—

হায় !

যদি এই বয়ে-যাওয়া না-গেলে হত !” 

 

এই নৈব্যক্তিক চিত্রকল্প আঁকার পরই কবি আবার চলে আসছেন, কবিতাটির মূল সুরে যেখান থেকে কবি চলা শুরু করেছিলেন

 

“লহরী ডার্লং আজ হাটে যায়নি,

                        লহরী ডার্লং আজ ঘরেও নেই—

হাটখোলা বাঁশের দরজা

যিশুর ছবি-অলা একটা পুরনো ক্যালেণ্ডার

তরজার বেড়ার ওপর কাৎ হয়ে আছে—

 

জীবন এক অলৌকিক শব্দ— জীবন

অতিকথনের মায়া !

 

রাতের অনেক নিচে চাঁদ—

টাঙবমে মুখ বাঁধা,

নিরাবরণ—

নিথর শীতল

 

এখানেই কবিতাটি শেষ হচ্ছে অজস্র প্রশ্ন নিয়ে টাঙবমে’ হচ্ছে ডার্লং রমণীর উর্ধ্বাঙ্গের পোশাক তা এই টাঙবমে মুখ বাঁধা কেন রমণীর ? তাও নিথর ! শীতল !  এ কোথায় দাঁড় করিয়ে কবি বিদায় নিলেন পাঠকের কাছ থেকে একটু আগেই কবি বলছিলেন— ‘জীবন এক অলৌকিক শব্দ— জীবন / অতিকথনের মায়া!’ আর এখন বলছেন— নিথর শরীর ! 

আমি আবার কবিতাটি প্রথম থেকে পড়তে লাগলাম। এবং এসে মধ্যখানে থামলাম যেখানে কবি লিখেছিলেন

 

“কে কাকে গুলি করে এ প্রগাঢ় বিতর্ক,

বিতর্ক বন্দুকের চেয়ে শক্তিশালী, বিতর্ক

সময়ের চেয়ে গূঢ় সম্মোহক,

আগে যারা কাঁদছিল তারা এখন ভাবছে,

তারা ভাবছে, সেগুনের বনে অতি সত্বর কোনো

বিভাগীয় সম্মেলনের কথা

 

        সেদিন সম্মেলনে কী কথা হয়েছিল ? সেদিন ‘সবুজ’-কে কী কবি এ কারণেই ‘শীতল’ বলেছিলেন ? দীর্ঘ কবিতা পড়ার এই এক মজা সহজে ফুরিয়ে যায় না যতবার পড়বেন, ততবার নতুন করে ধরা দেয় অনেক সময় কবি নিজেও তা টের পান না হয়ত এজন্য একজন কবিও তার কবিতা বারবার পড়ে, তাকে বোঝার চেষ্টা করেন কারণ, এই ধরনের কবিতা খুব ভেবে চিনতে লেখার লোক অন্তত কবি সেলিম মুস্তাফা নন তিনি এর আগেও দীর্ঘ কবিতা নিয়ে বলেছেন ‘দীর্ঘকবিতা (আমার কাছে)  কোন একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের বিস্তৃত বিবরণ নয় বরং অনেকগুলো বিষয়ের সংকোচিত এবং ইঙ্গিতময় রূপ একধরনের কোলাজ চিত্রকল্প অতএব আমরা কেবল বলতে পারি, তার দীর্ঘকবিতাকোলাজ চিত্রকল্প অসাধারণ অবশেষে কবির কাছে জানতে চেয়েছিলাম— “আপনি প্রায় ২৪ বছর আগে কাঞ্চনপুরের নির্মল প্রেক্ষাপটে  ‘এই পাহাড় ঘুম দাঙ্গা প্রেম ও প্রণিপাত’ কবিতায় লিখেছিলেন—

 

                        “প্রতিটি মানুষের পেছনে

                        আরো একজন করে মানুষ, ফুলবতী এদের প্রত্যেককে

                        চেনে, সে জেগে থাকে এই গাঁয়ের যুবকদের পাশে পাশে,

ফুলবতী ঝিনুকের মতো হাসে”

 

কিন্তু ২৪ বছর পর সেই আপনি ‘অতিকথনের মায়া’ কবিতায় লিখছেন—

 

“তবু, শব্দ আছে,

পীতাভ গুল্ফ থেকে সে-শব্দ ছিটকে আসে

পাহাড়ের কোল বেয়ে উঠে যাওয়া পার্বতী যুবতির,

আমি তার পায়ের তলায় মেদিনীর কেঁপে ওঠা দেখি;”

 

সেদিনের ঝিনুকের মতো হাসিটি আর নেই যুবতির মুখে এরপরই আপনি লিখছেন

 

“কবিরা শব্দের খোঁজে এখানে আসেন,

ছোট বড় সাংবাদিক, মাঝারি নেতা—

শব্দের ভিখারি সব— শব নিয়ে খেলা”

 

এই বিরাট সময়ের ব্যবধানে পরিস্থিতি পাল্টে গেছে অনেক আবার কোথায় যেন আপনার কবিতা পড়ে মনে হচ্ছে, মূলত পাল্টেনি কিছুই যদি কিছু পাল্টে থাকে, তবে পাল্টেছে কিছু কৌশলগত চতুরতা আপনি বিষয়টাকে আসলে কীভাবে দেখতে চেয়েছিলেন, সেটাই জানতে চাইছি ! সেই পরিবর্তনটা আপনার চোখে ঠিক কীভাবে ধরা পড়েছিল ? উক্ত কবিতার বাইরে গিয়েই বিষয়টা সম্পর্কে কিছু জানতে চাইছি !”

কবি উত্তর বললেন—“হ্যাঁ, পরিস্থিতি পাল্টেছে বটে । সারল্যের জায়গায় চতুরতা এসেছে । দার্শনিক গ্রামসী বলেছেন— সবই রাজনীতি । অর্থাৎ রাজনীতির ভেতরে সব ঢুকে পড়েছে । কিন্তু কিছু ব্যাপার রয়ে গেছে চিরকালীন যেমন প্রেম, নারীর প্রতি পুরুষের বিস্ময় দৃষ্টি । পীতাভ গুল্ফ থেকে সে-শব্দ ছিটকে আসে,/ পাহাড়ের কোল বেয়ে উঠে যাওয়া পার্বতী যুবতির,/ আমি তার পায়ের তলায় মেদিনীর কেঁপে ওঠা দেখি

এই কাঁপন ভয়ংকর ভূকম্পের চেয়েও ভয়ংকর । এক একটা মানুষ মুহূর্তে হারিয়ে যাবার মতো, উবে যাবার মতো, অদৃশ্য কাঁপন, মৃত্যুকামনার মতন প্রেম আর যৌনতা একাকার হয়ে আজও প্রতিটি নারীর প্রতি লোমকূপে বসে আছে । কোনো রাজনীতির সাধ্য নেই একে অবহেলা করে । আসলে সমস্ত কলুষতার মধ্যেও প্রকৃতির কাছাকাছি যে মানুষেরা এখনও আছে, অতি তুচ্ছ দাবি আজও জীবনের কাছে, তবু তারা হয়তো আমাদের চেয়ে বেশি সুখী । এই ঘোর শহরে নেই । আর আমরাই শেষ করে দিচ্ছি প্রকৃতির কোলে থাকে সেই আশ্রয়স্বরূপ পরিবেশকে । কবি তো স্বপ্ন দেখে । তাই এই সময়ের মধ্যে দিয়ে হয় তো সেই সময়কেই খুজেছিলাম !”

 

 

কবি সেলিম মুস্তাফার ‘কাঁটাতার’ আমার আরেকটি প্রিয় দীর্ঘকবিতা রচনা কাল ২০০৯ সাল কাঁটাতার মানেই সীমানা কিন্তু শুধুই কি সীমানা ! আমাদের জীবনের-যাপনের, রাজনীতির, কামনা-বাসনার পরতে পরতে লুকিয়ে রয়েছে একটি অদৃশ্য কাঁটাতার কবি সেই বিশাল ক্ষেত্রকেই করে তুলেছেন ‘কাঁটাতার’ কবিতার অন্তর্গত আসুন, আমরা দেখি কবিতার প্রকরণ, কৌশল, কবির আবেগ, কবিতার নির্মাণ শৈলী

        ‘কাঁটাতার’ কবিতার শুরুই হচ্ছে দুর্দান্ত এক কৌশল নিয়ে একদম পিক্-পয়েন্ট থেকে কবি ক্লিক করেছেন, এভাবে—

 

“কাঁটাতারের ওপার থেকে

ধানগুলো আনা গেল না ছোঁয়া গেল না তার

দীপ্র সোনালী ধার শফিকুল দাওয়া ছেড়ে ওঠে

বিরক্ত হয়ে তাড়া করে উঠোনে শুয়ে থাকা কুকুরটাকে

কুঁইকুঁই করতে করতে ওটা

তীরবেগে কাঁটাতার গলে’

                                                ওপারে চলে যায়

আমি ঘুরে দাঁড়িয়ে তোমাকে দেখি

 

তুমি জেগে আছ,

বাতাস তোমার জাগরণের ইশারাতে বয়

 

এভাবেই শুরু হয় কবিতাটি এবং প্রথম থেকেই কবি পাঠককে চেপে ধরেন কোন প্রকার প্রস্তুতির সুযোগ না-দিয়ে। ‘শফিকুল’ এই নামটা ব্যবহার করেই তো কবি একটা বিরাট কৌশলগত দিক নিয়ে নিলেন আমাদের প্রথম কাঁটাতার তৈরিই তো হয়েছে জাতপাতের উপর ভিত্তি করে বৃহৎ একটা ইতিহাসকে কবি বগলদাবা করে সাথে নিয়ে নিলেন নিছক কৌশলগতভাবে এবার প্রশ্ন শফিকুল পাকা ধানগুলো আনতে পারলো না কেন ? দীপ্র সোনালী ধার ! কবি খুব সূক্ষ্মভাবে ‘ধার’ শব্দটা ব্যবহার করলেন এখানে যেকেউ ‘ধার’ লেখার পরিবর্তে ‘ধান’ লেখাই পছন্দ করতেন কিন্তু এখানেই কবি নিজের বাহাদুরিটা দেখালেন এরপর শফিকুল কুকুরকে এভাবে লাথি মারল কেন ? এই লাথিটা কে কাকে মারল ? এরপর কবি অদ্ভুতভাবে একটা চরিত্রের প্রকাশ ঘটালেন— “আমি ঘুরে দাঁড়িয়ে তোমাকে দেখি / তুমি জেগে আছ”—এই ‘তুমি’-টা এখানে কে ? এর উত্তর কিন্তু কবি দেননি এখানে কবি টেকনিক ব্যবহার করলেন তুমি-টা এখানে কীসের প্রতীক ?  কবি লিখেই চলেছেন—

 

“তুমি জেগে আছ,

চোখ বন্ধ—জাগ্রত নয়ন,

তল পায় না অন্ধকার

দেশ পায় না আলোর কিরণ !”

 

লক্ষ করার মতো লাইন— ‘চোখ বন্ধ— জাগ্রত নয়ন’! এটা কবি আবার টেকনিক ব্যবহার করে, বিরক্ত পাঠককে থামালেন আবার একটা চমকও দিলেন কোন চোখই বা বন্ধ ! আবার কোন নয়নই বা জাগ্রত ! কবি এখানে সরাসরি ঘটনার প্রেক্ষিত এড়িয়ে চলে গেলেন অন্যকথায়— “প্রণয়ের শব্দাবলি তোমাকে খুঁজে খুঁজে / সহসাই বাক্যে হারালো—কোনো / পরিধি পেল না— কোনো দুর্বলতা, না-পেল / কোনো অভিশাপ !”

        এভাবে আরও ২০ লাইন শেষে কবি প্রশ্ন রাখছেন—

 

যারা

বি পি এল ছিল তারা বি পি এল, যারা

নিরক্ষর ছিল তারা নিরক্ষর, যারা

অন্ত্যোদয় তারা অন্ত্যোদয়ই রয়ে গেল—

সয়ে গেল সমাজের,

সূর্যোদয়ের কথা দিল্লীর কথামতো পিছিয়ে গেল !

মানুষের অধিকার মানুষকে দেয়া হবে—

ইস্তেহারে আছে, 

...   ...   ...  ...   ...   ...  ...   ...

 

                                                তুমি

জিরাফের মতো গলা তুলে

এইবার দেখে নিতে পার

ইণ্ডিয়ার তাতাল সূর্য

ও-পাড়ার সবুজ দেশে কীরকম

লাজুক হয়ে নামে !”     

 

উপরের এই কথাগুলো কবি কার সাথে বললেন ? পাঠকের সাথে ! নাকি কবিতাকে নিয়ে গেলেন নির্মাণের দিকে ! অথচ কোথাও অহেতুক মনে হল না কিন্তু ! কোথাও মনে হয়নি কবি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গিয়েছেন িন্তু এই নৈর্ব্যক্তিক পরিভাষা বা টেকনিকটিকে এক সময় পাঠক বুঝেই ফেলত কিন্তু তখনই কবি সাবধান হয়ে পড়েন এবং ফিরে চলে যান আবার কাহিনির বুননে এবার কবি লিখছেন

 

“শফিকুল বিরক্ত হয়ে দৃষ্টি ফেরায়,

নজর  ঘুরতে ঘুরতে এসে থামে

উঠোনের বাসন মাজতে থাকা

সদ্য বিধবা সজিনা বিবির ওপর—

নীল শাড়িতে ঢাকা

ব্লাউজহীন ভরাট বুকে দুটো দুলছে

                                                        বাসন মাজার ছন্দে

অতিকষ্টে সে আবার চোখ সরিয়ে নেয়

অদূরের কাঁটাতারের ওপর

 

এখানে কবি সবার অলক্ষ্যে আরেকটা কাঁটাতার নিয়ে এলেন শরীরও তো একটা কাঁটাতার সম্পর্কও একটা কাঁটাতার এভাবেই কবি পরতে পরতে খুলতে থাকেন জীবনের কাঁটাতার সীমাহীন কাঁটাতারের বাঁধনে আমরা জর্জরিত  

কবি তাই লিখছেন

“জীবনের অধিকারে আমি কিছু অন্ধকারও চাই—

অন্ধকারে যাওয়া-আসা—একা একা—

আমি আঁধারের চাষী, কাঁটাতার

দারিদ্র্যসীমার !”

 

ব্রেকিং নিউজের প্রোপাগাণ্ডায় বিরক্ত হয়ে কবি এক পর্যায়ে লিখছেন—

 

“দিদিমণি, ক্যামেরা রাখুন

                                                মোবাইল রাখুন, আপনার

                        ব্রেকিং জীনস্ থেকে উড়ে যায় দুরন্ত নিউজ,

                        ….    ....    ....    ....   ....    ....    ….

                        আমি কোনো কাঁটাতার সরাতে পারি না !”

 

কবি এর আবার চলে যান শফিকুলের কথায় আসলে শফিকুলের হয়েই ভাবতে থাকেন—

 

“কাঁটাতারের ওপার থেকে

কিছুই আনা গেল না, শীতের

কুয়াশাভেজা বাঁধাকপি পড়ে রইল ক্ষেতে, ক্রমশ

নীলাভ হতে হতে একদিন হলদে হল—লোভাতুর

                                                        দু-চোখের সীমানায় দূরে”

 

‘সীমানা’ শব্দটা এখানে বড় ভয়াবহ হয়ে ওঠে একটু পরে আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে

 

চুপিচুপি সারারাত

কাঁটাতার কেটেছে ওরা—ইণ্ডিয়ার দুধভরা

জোড়া জোড়া গোরু— শফিকুল

ভেবে পায় না কী করে কী হয়,

সে কেন দরজার হুড়কোও খুলতে পারে না !

অন্ধকারে একা একা কতদিন দাঁড়িয়ে থেকেছে

দরজায় হাত দিয়ে সারা শরীরে ঘাম !

....    ..    ....    ....    ....    …..

শফিকুল যদি দরজা খুলে ফেলে...

সজিনা ...! সজিনা ...!

 

জলের ফোঁটা নেমে আসছে অতি ধীরে,

একটা ঘোড়া ছুটে যাচ্ছে অতি দ্রুত”

 

এভাবে শফিকুল একটা কাঁটাতার পেরিয়ে যায় সমস্ত কবিতা জুড়ে কাঁটাতারের ছড়াছড়ি কবি একবার প্রশ্ন করেন, একবার ভাঙেন আবার প্রশ্ন করেন একসময় কবি পুরো পৃথিবীর পরিক্রমা করে ফেলেন অবশেষে এসে স্বীকার করে নেন

 

“বীজ যেখানেই পড়ে, চোখ খোলে সেখানেই !

মাটির সর্বাঙ্গে ওম, তস্ তার শিরায় শিরায়,

যদি উড়তে না-পারি ঐ আকাশ সীমায়

যদি না-খুলতে পারি দু-পাতার বই—

তবু আছি আমি, জেনো,

 

কাঁটাতারই বন্ধু আমার

 

কাঁটাতার সই !”

 

এখানেই শেষ হয় কবিতাটি কাঁটাতারে জর্জরিত চারপাশ নিয়ে এরকম একটি দীর্ঘ কবিতা ত্রিপুরায় অন্তত লেখা হয়নি কবির গমন প্রলুব্ধ করে কবিতার স্তর থেকে স্তরান্তরে কবিতার যাত্রা এক অনন্ত পথে কবি এখানে কেবলমাত্র প্রস্তাবকের ভূমিকা পালন করেন আর পাঠক নির্মাণ করেন তার স্বাধীন ভাষ্য এই ধরনের কবিতার ভাল-মন্দ থাকে না থাকে প্রয়োগের সার্থকতা বা ব্যর্থতা আজকের জীবন ও সময়কে কবি চিহ্নিত করেছেন তার মতো করে সেলিম মুস্তাফা তার কবিতা নির্মাণ করেন খুব সহজাতভাবে এটাই তার কবিতা বয়নের পদ্ধতি আমরা সবাই কবিতা আসলে, পাঠক এবং কবির মধ্যে এক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টিকারী পদ্ধতি মাত্র  

 

‘কাঁটাতার’ কবিতার পর এসেছে ‘জল পড়ে পাতা নড়ে না’

 

        এই কবিতায় কবি জীবনের কথা বলে গেছেন উপন্যাসের ভঙ্গিমায় আগেই বলেছি, ত্রিপুরায় দীর্ঘকবিতা নিয়ে তাঁর মতো কেউ এক্সপেরিমেন্ট করেননি   

 

“সুতারকান্দি বর্ডার দিয়ে মাত্র সাত বছর বয়সে

                        বাবার সঙ্গে ইণ্ডিয়া এসেছিল

মা-মরা শ্রীমতী, জুড়িন্দা নৌকায় পার হচ্ছিল গাড়ি,

পাটাতনে বাবার হাত ধরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে

সে দেখেছিল দুই পার—

একই রকম দেখতে— এপারে গাছ, ওপারেও গাছ,

উপরে তো একই আকাশ !

আকাশে নদী নেই

                                        এপার-ওপার নেই”

(জল পড়ে পাতা নড়ে না)

 

ওপার থেকে বাবার হাত ধরে আসা মা-মরা বাসন্তী, ওরফে শ্রীমতী বা সুমতির জীবনের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে, বর্ণিল এই কবিতার স্তরে স্তরে । সাথে এসেছে রাষ্ট্র, দেশভাগ, ভালোবাসার আকুতি, ভালাবাসা না-পাওয়ার অতৃপ্তি , আশ্রয়হীনতার বেদনামাখা আখ্যান । বাসন্তীর চোখ দিয়েই কবি দেখার চেষ্টা করেছেন এই বিশ্বসংসার—

 

“যে-খবর পাখি জানে

মোবাইল তার মানে বোঝে না,

বালিশের কোণা ভিজে ওঠে,

ওয়ারের সাদা ফুল তিলতিলে কালো হয়,

দত্ত-বউ দেখেও দেখে না,

বাসন্তীর মা একদিন এলো যদি

                                        তিনদিন আর আসে না ;

কে কোথায় ভাসিয়া যায় কেউ জানে না

জল পড়ে, জল পড়ে

পাতা নড়ে না !”                       (জল পড়ে পাতা নড়ে না)

 

কবিতাটার মর্মে এই কথাটাই মূলত ধ্বনিত হয়— “কে কোথায় ভাসিয়া যায় কেউ জানে না”এই দীর্ঘকবিতায় আর আগের মতো কোলাজ এঁকে এঁকে যাননি । স্পষ্ট একটা কাহিনিকেই এগিয়ে টেনে নিয়ে গেছেন একের পর এক চরিত্র যোগ হয়েছে ।

 

“দীপু মামা পাড়া কমিটির মেম্বার

১২০ জর্দার গন্ধ বাসন্তীর

কানের ভিতর দিয়া মরমে নামে—

কান কামড়ে দিয়েছে মামা, কোমরে

দিয়েছে হাত !”                 (জল পড়ে পাতা নড়ে না)

 

নিছক এই দৃশ্যের ভিতরে অনেক কাহিনি কথা বলে । বাবার হাত ধরে আসা সুমতির কি হল আজ ? কেন হল ?  শোষণের নির্মম একটা গন্ধ পাই । রাজনৈতিক অবক্ষয় টের পাই—

 

“বাসন্তী টের পায় শরীরের কোশে কোশে

                        একটি শ্রমদিবস আর শাবলের গান

সহ্যের ভেতরে একটু অপমান

কী আর এমন ?”             (জল পড়ে পাতা নড়ে না)

 

এই যে কবি বললেন— “কী আর এমন ?”  সত্যিই কি কবি এই কথাই বলতে চাইলেন ? নাকি এর ভিতর দিয়ে আরও বড় কিছু আমাদের সামনে নিয়ে আসতে চেয়েছেন কবি ! “সহ্যের ভেতরে একটু অপমান” এই মানসিকতায় আজ কেন এল বাসন্তী ? এর একটা ক্রমবিবর্তন আছে সেই বিবর্তনটা আমাদের পাঠ করতে হবে, কবিতাটির ভিতর থেকেই । যেহেতু, কবিতাটির মর্ম কথা ওখানেই পড়ে রয়েছে

এভাবেই আরও একটা কাহিনি নিয়ে আসে— “বড় সড়ক” । এই কবিতায় সড়ক-ই চরিত্রের ভূমিকা নিয়েছে । সড়কের ভিতর দিয়ে কবি দেখেছেন, তার চলা । আর দেখা । তার অনুভব, কবি অনুভব করেছেন ।  এখানে আমরা রমেশ, রমেশের বউ মালতির আকুল চোখের দেখা পাই । এই দীর্ঘকবিতাটি যেন চিত্রকরের হাতে আঁকা দীর্ঘ একটা ল্যান্ডস্কেপ ছবি ।

 

“খালের জলের ধারে জিওলের

                                        শীতল ছায়ায় বসে

ঝাঁঝালো রোদের দিকে বহুদূরে তাকিয়ে রয়েছে,

কাছেপিঠে আর কিছু নেই—

একা মাঠ ফেলে রেখে

ধান চলে যায় বাঁকে

রমেশের কাঁধে ভারে ভারে

তাদেরই বাড়ির

মেহেন্দির বেড়া ছুঁয়ে ছুঁয়ে

হেলানো কলাগাছটির পাতার আদর ছুঁয়ে, বউ

মালতির আকুল চোখের

চিক্ চিক্ কোণা ছুঁয়ে”                (বড় সড়ক)

 

জ্বলন্ত দুপুরের গ্রাম । নদীর মতো বয়ে যাওয়া সড়ক । রোদের তেজে তিরতির কেঁপে উঠে বটের পাতা । ক্রমে সন্ধ্যা আসে । সন্ধ্যা মিলায় এক সময় । রমেশ ক্ষেতের আলে উঠে এসে আজও প্রতিদিনের মতো একবার পেছনে ফিরে তাকায় । মালতি হয়ত হাসে । একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস নেমে আসে রমেশের হাফরের মতো সুবিশাল বুক থেকে । এভাবেই ইতি হয় কবিতাটির । মায়াময় স্নিগ্ধ এক দৃশ্যপট কবি এঁকেছেন তাঁর এই কবিতায় । গ্রামকে খুব কাছে থেকে, হৃদয় দিয়ে না-দেখলে, এমন কবিতা লেখা যায় না । কবির জীবনের অভিজ্ঞতাই রূপ নিয়েছে এই কবিতায় ।

“ঘর” কবিতায় কবি ঘরকেই করেছেন বিষয় । কবির সাথে তাঁর ঘরের সম্পর্ক কী রকম হতে পারে ? কবি ভাবেন তাঁর নিজেকে নিয়ে ! এত কী কথা থাকে, ঘর জড়িয়ে নাকি ঘর  জড়িয়েই আমাদের জীবন !

 

“ঘর এক দুর্নিবার টান

 

ছোট আর বেঁটে একটা কাঠের টেবিল

কোণায় একটা ফোকর

প্রয়োজনে মোমবাতি বসানো যায়,

একটা ক্লিপবোর্ড, কিছু অরক্ষণীয় শব্দাবলী তাতে—

পিঁপড়ের মতো সন্ত্রস্ত আর ব্যস্ত,

সারারাত তারা আমাকেই কুরে কুরে খাবে—”                (ঘর)  

 

এই কবিতায় কবির একান্ত ব্যক্তিগত ঘরের বস্তুগত বর্ণনাই করছেন এর সাথে মিলিয়ে দিয়েছেন কবির অনুভব । কবিদের কাজ শব্দ নিয়ে, কিছু শব্দ চিন্তন-পর্যায়ে থাকে, ক্লিপবোর্ডের সাদা পাতায় লেখা থাকে । এখনও চূড়ান্ত হয়নি হয়ত । সেই অরক্ষণীয় শব্দাবলী হয়ত কবিকে সারারাত ঘুমাতে দেয়নি । একটা অসম্পূর্ণতা কবিকে কুরে কুরে খেয়েছে । এই যে আমি ব্যক্তি-তমাল কবিকে নিয়ে লিখছি, সেই অনুভূতির কথাও জড়িয়ে রয়েছে কবির ঘরে । কবির অনুভবে, কবি লিখছেন—

 

 

“কবির জীবন নিয়ে নানা কথা সেখানে সাজানো—

তমাল রেখে গেছে, কবিকে জানার তার তুমুল কৌতূহল ! 

 

কবিদের অশ্বডিম্ব থেকে কখনোই

ঘোড়া বেরোয় না, জঞ্জাল আর অবমাননা,

সব এখানেই আছে, এই ঘরে,

ঘরের ভেতর আরও একটা ঘরে—অন্ধকারে,

তবু,

ঘর এক দুর্নিবার টান !”              (ঘর)

 

একজন সৎ কবিই তো এমন বলতে পারেন— “কবিদের অশ্বডিম্ব থেকে কখনোই ঘোড়া বেরোয় না” অনেক জঞ্জাল থাকে । অবমাননাও জড়িয়ে থাকে তাঁর আশেপাশে । ঘর কবিতায় কবি নিজেকেই খনন করে দেখেছেন নানাভাবে । কবির পুরোনো বাড়ির কথা এসেছে । গ্রামের  বাড়ির কথা এসেছে । শহরের বাড়ির কথা এসেছে । জার্নি অফ লাইফ বলা যায় । যা কবির একান্ত ব্যক্তিগত । এযাবৎ আমার কবির জীবনের মেজোভাইয়ের খুনের কথা, তার ব্যথা এই নিয়ে কবির বেদনার কথা জেনেছিলাম । কিন্তু এই কবিতায়, কবি নিজের দিকে তাকিয়ে ফেলে আসা অতীতকে রোমন্থন করলেন । মায়ের প্রসঙ্গ তুলেছেন অতুলনীয় এক মায়াময় ভঙ্গিতে । এত অল্প কথায়ও বুঝি, এতকথা বলা যায় ? ঘরের বিড়াল, পাখি, কাক, শালিক, ডাহুক থেকে সবাইকে স্থান দিলেন তাঁর এই কবিতায় । ঘরের পুরোনো এ্যালবামকেও ভুললেন না তবে অবশেষে, মায়ের কথা উল্লেখ করেছেন অদ্ভুত মায়ায় । কবির বাড়ির নাম “ষোড়শী ভিলা”। কবি তাই লিখছেন—

 

“এখন বাবাও নেই বাড়িটিও নেই, শুধু

মায়ের নামটুকু আছে আমার বাড়ির

কপালে, মায়ের নাম থাকলে

বাবার নামও থেকে যায় মনে-মনে, হয়তো

আমিও সবার মনে-মনে আছি—

মনে হার্ডডিস্কে এত বেশি জায়গা যে

কাউকে ভুলে যাওয়া আসলে অসম্ভব !”              (ঘর)

 

কবি তাঁর জীবনের অসংখ্য ভুলের স্বীকারোক্তিও করেছেন, তাঁর মতো করে, এটাই তো কবির কাছে কাম্য । জীবনের যাত্রাপথে কতকিছুই তো জড়ায় ! ভুলও জড়ায় । কবি লিখছেন—

 

“তবু ভুল হয়,

ঘর ও জীবন

একসাথে মেলাতে গেলে বার বার ভুল হয়ে যায়,

যতবার ঘরে ফিরি মনে হয় এ-ঘর আমার নয়,

আরও কিছু ছিল—যা এখন নেই, আর কোনোদিন

ফিরে আসবে না ।”                   (ঘর)

 

হয়তো তাই সত্যি । ফেলে আসা দিন কী আর ফিরে আসে ! কিন্তু কবি বলছেন, তিনি আসবেন । হয়ত পুনর্জন্মের কথা বলতে চাইছেন । কিন্তু কোথায় আসবেন কবি ? কেমন হবে সে ফিরে আসাটা !

কবি কল্পনা করছেন—

 

                        “একটি মোমের শিখার গোপন কাঁপন

কোথাও প্রতীক্ষারত মনে হয়, মনে হয়

একটা অস্পষ্ট ঘর কোথাও

                                একা একা পড়ে আছে—

নির্জন, আপন”                        (ঘর)

 

কবিতাটি একান্ত কবির কবিতা কবি আত্মজীবনীর মৌলিক খন্ড মনে হয়েছে এই কবিতা । আর কোনো কবিতায় কবিকে এভাবে পাইনি আমি । দীর্ঘকবিতায় আমি মূলত কবিকেই ঘর্ষণ করতে করতে এগিয়ে গেছি তাকেই পলে পলে অনুভব করেছি যেন কবিরই আত্মজীবনী

সেলিম মুস্তাফার একটা কথা খুব মনে পড়ছে এই শেষ পর্যায়ে এসে, তিনি আমাদের একান্ত আড্ডায় একবার আমাকে বলেছিলেন— “বেশিদূর পর্যন্ত যে যায়, তাকে সব সময় একাই যেতে হয় ! সবাইকে সঙ্গে নিয়ে সন্ন্যাসী হওয়া যায় না । ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে’—গানটা নিছক দেশাত্মকবোধক নয়, এর অর্থ আমার কাছে আরও ব্যাপক ।” আসলে, বিষয়কে একটা আলাদা দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা কবির বৈশিষ্ট্য । সেই বৈশিষ্ট্য কবির কবিতায়ও লক্ষ্য করা যায়, এইটুকুই শুধু আমার বলার ।

 

        কবি সেলিম মুস্তাফা কবিতায় ছন্দ আনেন অনেক পরে, তা-ও অনিয়মিত তবু আমি তাঁর সমগ্র কবিতা যতটুকু পারি, খুঁজে দেখেছি, তাতে কিছু কবিতায় আমি ছন্দের প্রয়োগ লক্ষ করেছি । আবার কবি তাঁর শেষ কাব্যগ্রন্থ “একদিন যে কোনোদিন” কাব্যে  ছন্দ নিয়ে অনেকগুলি কবিতা লিখেছেন । আমি সেই হিসেবে একটা তালিকা করেছিলাম, তা এই রকম দাঁড়ায়— প্রতীক্ষা (শ্রেষ্ঠ কবিতা/পৃঃ৭১) মাত্রাবৃত্ত>/, ঘর (১৮টি দীর্ঘকবিতা)  মুক্তক, নিশিকন্যা (শ্রেষ্ঠ কবিতা) স্বরবৃত্ত> ///, ভুলিনি (শ্রেষ্ঠ কবিতা) ১৮ মাত্রার সনেট “একদিন যে-কোনোদিন” কাব্যগ্রন্থএটার প্রায় সব কবিতাই মুক্তক-এ রচিত হেই দিন আর নাই কবির ব্যবহৃত সিলেটি ভাষায় লেখা তাঁর বেশিরভাগ লেখায়ই ইম্প্রেশনিজমের ছোঁয়া আছে “একদিন যে-কোনোদিন” গ্রন্থে কিছু রচনায় এক্সপ্রেশনিজমের ছোঁয়া রয়েছে


        ইজমের চিন্তাধারা নিয়ে আমি কবিকে আলাদা করে বিচার করিনি এই পর্যন্ত । কারণ, থিয়োরির গুরুত্ব নিয়ে সমালোচনা করতে গিয়ে টেরি ইগল্টন একটি কথা বলেছিলেন—“এটি একটি ভ্রান্ত ধারণা যে থিয়োরি জীবনের বাইরের কোনো বস্তুর নাম । যেখানেই জীবন আছে, সেখানেই থিয়োরি উপস্থিত । জীবনের কোনো দিক বা যে কোনো কর্মের বিষয়ে ভাবুন, তার পিছনেও কোনো-না–কোনো থিয়োরি অবশ্যই পাওয়া যাবে । সমাজ-জীবনের সমস্ত ঘটনার তত্ত্বগত অর্থ থাকে, অর্থাৎ  কোনো-না–কোনো থিয়োরি কাজ করে ।”

        ইম্প্রেশনিস্টরাই প্রথম যারা বাহ্যিক অবয়বের হুবহু নকলের বাইরে এসে চিত্র-শিল্প নির্মাণ শুরু করে । আর উনিশ শতকের একদম শেষের দিকে, মনের আবেগময় অনুভূতিকে ক্যানভাসে চিত্রায়ন করেন ভ্যান গখ, গগাঁ, এডভার্ড মাঞ্চ । যে ফর্ম এক্সপ্রেশনিজম নামে খ্যাত হয় । এতে  শিল্পীর একান্ত ব্যক্তিগত অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যম হওয়ায়, অন্য গ্রুপের তুলনায় এদের আঁকা ছবিগুলি বেশ দুর্বোধ্য ছিল । ছবিগুলো কখনও একদমই বাস্তবতার সাথে খাপ খায় না । আবার কখনও হালকা বাস্তব জগতে কোনো কিছুর অবয়বয়ের সাথে মিলে যায় । আবেগময় অনুভূতির যে অর্থবাচকতা আছে, তার উপস্থাপনা পরবর্তীতে সাহিত্যেও ছড়িয়ে পড়ে

কবি সেলিম মুস্তাফার কবিতায় এই দুই ধারার খুব প্রভাব পড়েছে কবি তাঁর কাব্যধারায় অসংখ্য ছবি এঁকেছেন । তাঁর প্রতিটি কবিতাই এক একটা চিত্রপট মনে হয়েছে আমার । তাঁর কাব্যধারায় একজন চিত্রীর সেই কোলাহল টের পাওয়া যায় ডাডাইজমের কাছাকাছি কবি হয়ত বারবার যাওয়া চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু  শেষ পর্যন্ত তার ছাপ খুব একটা পড়েনি তাঁর কবিতায় । যে জন্য তিনি প্রকৃত হাংরি হতে পারেননি, সেই একই কারণে ডাডাইজমকেও কবি ছুঁতে পারেননি । আবার ব্যক্তির অবচেতন মনে লুকিয়ে থাকা জগৎ নিয়েও খেলেছেন কবিসেই অর্থে  তাঁর কবিতায় আমি সুরিয়ালিজমের ছোঁয়া পেয়েছি । তাঁর বহু চিত্রকল্প আমাকে এই স্বাদ দিয়েছে । মুগ্ধ করেছে ।

এই প্রসঙ্গে আবারও কৃত্তিবাস চক্রবর্তীর কথা একটু উল্লেখ করতে হয় । তিনি বলছেন—“ সেলিম নিজেই রিয়্যালিষ্টিক থেকে অবচেতনভাবেই সুররিয়্যালিষ্টিক চিন্তায় আক্রান্ত হয়ে পড়েন । বোধ করি সেলিম বলতে চান আগে থেকেই যেন তত্ত্বটা কোন কবির মস্তিষ্কে বন্দি না হয়ে পড়ে । এতে যান্ত্রিকতা এসে যেতে পারে । আমিও এতে একমত ।”

কবি সেলিম মুস্তাফা তাঁর কবিতায়  নিজেকেই খুঁজে ফিরেছেন বারবার । যাকে বলা যায় ক্রাইসিস্ অফ আইডেনটিটি । তাঁর প্রতিটি কবিতার ভিতরের বৃত্তে তিনিই ছিলেন কেন্দ্রে । আমি এই আঙ্গিকেই আমার প্রিয় কবিকে দেখতে চাই । নিজেকে খুঁজে ফেরার একটা ঘোর পেয়ে বসে তাঁর কবিতা পড়লেআমি পাঠক হিসেবে, সেই আনন্দটাই নিই । ঘুরে-ফিরে সে-ই রসের সন্ধানই আমার সন্ধান । রসবাদই ঘুরে ফিরে আমি বিশ্বাস করি, কবিত্ব নিহিত থাকে, কী প্রকাশ করা হয়েছে, তার মধ্যে নয়, বরং কীভাবে প্রকাশ করা হয়েছে তার মধ্যে । আর এখানেই কবি সেলিম মুস্তাফা আমার প্রিয় কবি । আমার মনের, অনুভবের প্রিয় প্রকাশক । কবির সাথে আমার বিশ্বাস এবং আস্থার সম্পর্ক । কবিতাই এই সম্পর্কের সেতু এবং বন্ধন । এটাই আমার আশ্রয় । এর বেশি একজন কবির কাছে পাঠকের কী-ই বা আর প্রাপ্য থাকতে পারে ? তাই তো বলি, আমার কবি সেলিম মুস্তাফা ।   

 

‘হৃদয় থেকে জাম্পুই ও অন্যান্য গদ্য’

কবি সেলিম মুস্তাফার গদ্য সংকলন প্রকাশিত হয়েছে ‘মুখাবয়ব’ প্রকাশনী থেকে ২০১৬ সালে এই সংকলনের পরিচিতি পর্বে লেখা আছে“শব্দসমবায় যখন ভাবাদর্শে হস্তক্ষেপ করে, তখন লেখকের প্রচ্ছন্ন মননে জেগে ওঠেধীরে, অতি ধীরে জেগে ওঠে যে উপকূল, তারই শৈল্পিক কৃতি গড়ে সৃষ্টির নিহিত উচ্চারণে পাঠকৃতির নিরুদ্ধতাকে অস্বীকার করে সংকেতের পুনর্বয়ন এবং তাৎপর্যের পুনরুপলব্ধির মধ্য দিয়ে লেখক কার্যত হয়ে ওঠেন নতুন নির্মাতা তাই কবিতার পাঠকৃতিকে নির্বাচিত ও পুনর্পঠিত শব্দ দিয়ে স্তরে-বিস্তারে নবায়িত করে গড়ে ওঠে কবির গদ্য।”

এই বইতে মোট ১৯টি রচনা গ্রন্থিত হয়েছে ১৮২ পৃষ্ঠা জুড়ে প্রকাশকের কথাপর্বে খুবই উল্লেখযোগ্য কিছু কথা আছে সেই কথাগুলোকে না-বুঝলে এই বইয়ের মেজাজ ধরতে একটু কষ্ট হতে পারে মূল যে কথাটা প্রকাশক বলতে চেয়েছেন, তা অনেকটা এরকম : “...এমন অনেক সৃষ্টিকার আছেন যাঁদের সৃষ্টি সম্পর্কে একটা চলিত ধারণা ও পাঠ আমরা অর্জন করেছি অথচ সেই একই ব্যক্তির ভিন্ন আঙ্গিক ও ভাষায় রচিত কিছু সংগোপন আমাদের চোখ এড়িয়ে গেছে এই বিষয়টা অবশ্যই দুঃখের এবং আত্মদংশনের তো অবশ্যই

এমনই একজন হলেন সেলিম মুস্তাফা একজন কবি হিসেবেই সমধিক পরিচিত জন তাঁর কবিতার আপাত যৌগগুলি প্রথমপাঠে শ্রুতিকে আলিঙ্গন করলেও দ্বিতীয় তৃতীয় চতুর্থ পাঠে সেই একই কবিতার অভিঘাত এত প্রবল এবং অনতিক্রম্য হয়ে ওঠে যে পাঠকের অবচেতনে সহজেই বাসা বাঁধে অতি যত্নে

কিন্তু সেই সেলিম মুস্তাফা যখন গদ্য সৃষ্টি করেন তখন তা হয়ে ওঠে অবচেতনার বাহির সঞ্চারিত অথবা অর্জিত কিংবা এই দুয়েরই সমাহারে যে বোধের সৃষ্টি তাঁর পরিশ্রুতিতে পৌঁছবার বা অতিক্রম করে যাবার রসদ হয়তো পাঠক খুঁজে নিতে পারেন এইসব গদ্যলিখন থেকে বিভিন্ন সময়কালের অতিদীর্ঘ যতি কাটিয়ে-কাটিয়ে তাঁর গদ্যগুলো সৃষ্টি হওয়া এবং বিভিন্নতর বিষয় অবলম্বন করার কারণে পড়তে গিয়ে যদি পাঠকের খানিক ক্লেশ হয়ওতবুও আমরা বিশ্বাস করি সর্বশেষ জয়টি সেলিম মুস্তাফারই হবে   

লেখক সেলিম মুস্তাফা যদিও শুরুতেই উল্লেখ করছেন“প্রথাসিদ্ধ গদ্যলেখক আমি নই সব কথাই আমার নিজস্ব ভঙ্গিতে একান্ত ব্যক্তিগত কখনও উৎসাহী প্রিয়বন্ধুদের চাপে পড়ে লিখতে হয়েছে তবে আমি আমার বাইরে যাইনি কখনো

লেখকের প্রথম গদ্য ‘‘হৃদয় থেকে জাম্পুই অবধি’।  জাম্পুই নিয়ে বিস্তৃত লেখা প্রায় দেখাই যায় না এটা মূলত লেখকের ভ্রমণমূলক একটা লেখা কিন্তু লেখক এত মনোরমভাবে বর্ণনা করেছেন, যে পড়তেই ভালো লাগে জাম্পুই গিয়ে জাম্পুইয়ের প্রেমে পড়েনি, এমন কাউকে খুঁজে পাওয়াই যাবে না । লেখক খুবই সহজ ভাষায় তার অনুভূতি প্রকাশ করেছেন জাম্পুইয়ের প্রথম গ্রামের নাম ‘মনপুই’ (Hmunpuii) মিজোভাষায় ‘‘মনপুই’ শব্দের অর্থ বাংলায় দাঁড়ায়‘যে জায়গাটি শ্রেষ্ঠ’। লেখক লিখছেন—‘দখুমা সাইলো(Dokhuma Sailo) আনুমানিক ১৫০টি পরিবার সঙ্গে করে নিয়ে ১৯০৩ সালে তৎকালীন মিজো পাহাড় (বর্তমান মিজোরাম)–এর শেরমুন্ (Serhmun) থেকে জাম্পুই পাহাড়ের ব্যাটেলিয়াংশিপ (Bateliangeship)–ত্রিপুরার সর্বোচ্চ স্থান ৯৭৫ মিটার) আর সাবুয়াল হয়ে কুমারঘাটের কাছাকাছি মুন্টাটীলায় আসেন’অজিতবাবু (জাম্পুই ভ্রমণে লেখকের সঙ্গী) শুরু করেন সংগৃহীত তথ্য ও কাহিনী তখন সকাল সাতটা হবে বারান্দায় বসেছি আমরা ক’জন দূরে আরেকটা টিলার মাথায় দেখা যাচ্ছে ভাঙমুন থানা থানার একপাশ দিয়ে ধোঁয়ার মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে নিচ থেকে উঠে আসছে শাদা মেঘ।” – এভাবেই এগিয়ে যেতে থাকে লেখকের বর্ণনা প্রথম পর্বে আমরা ‘মনপুই’ অবধিই জানতে পারি প্রথম নিবন্ধটি শেষ হয় এইরকম :

“কাঞ্চনপুরে গাড়ি থেকে নেমে আমি অজিতবাবুকে জিজ্ঞেস করিআচ্ছে অজিতবাবু, জামপুই (আগে বানানটা ছিল Zampui, বর্তমানে Jampui প্রচলিত) শব্দটির অর্থ কী ?

অজিতবাবু খানিকক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থেকে আস্তে আস্তে করে বলেন ‘ভয়ংকর ভয়’।

দ্বিতীয় নিবন্ধের নাম ‘একদা সুন্দিবন পথে’।

এই নিবন্ধ শুরু হচ্ছে এইরকম : “সাল ১৯০৩ আনুমানিক ১৫০টি পরিবার নেতা দখুমা সাইলো সর্দার ত্রিপুরার এভারেষ্ট ব্যাটেলিয়াংচিপ (Beteliangchip-৯৭৫ মিটার) সহসাই দেখলো পুবের পাহাড় (মিজোরামের শেরমুন) থেকে পিলপিল করে নেমে আসছে একটি দ্বিপদ বাহিনী কাছে আসতে দেখা গেল তাকেও সকলের আগে যেন কোনো গ্রীক দেবতা হ্যাঁ, দখুমা সাইলো ব্যাটেলিয়াংচিপ্ তাঁর দীর্ঘতম সুন্দি গাছটির ক’টি পাতা ঝরিয়ে স্বাগত জানাল সেই লুসাই সর্দারকে সেই শুরু সেই ত্রিপুরায় ঐতিহাসিক মিজোসঞ্চার সুন্দিবন সেই প্রথম দেখল মানুষের মুখ

ওরা থামলেন না ফুলডুংশী সাবুয়াল পেরিয়ে রাতদিন হেঁটে হেঁটে ওরা চলে এলেন কুমারঘাটের কাছাকাছি মুন্টাটিলায় কিন্তু এখানেই শেষ নয় জুমচাষ নির্ভর দখুমারা ৩/৪ বছর পর পর ক্রমান্বয়ে এলেন মঙচুয়ান (Hmawngchuan), বেলিয়াংচিপ্ (Belhianchhip) আর  মুনপুই ( Hmunpui)-মুনপুই- ‘শ্রেষ্ঠ  জায়গা’ শুরু হল স্থায়ী বসবাস

 

এভাবেই শুরু হয় লেখকের জাম্পুই পর্ব   লেখক যেহেতু একজন কবি তাই তার দেখার মাঝে অদ্ভুত এক টানাটান মেজাজ লক্ষ্য করা যায় একটু বর্ণনা দিচ্ছি তার“ যূথবদ্ধতাকে পরম শক্তি জেনে আজও সারা গাঁয়ের লোক নিমন্ত্রিত হন এদের যে কোনও আচার-অনুষ্ঠানের না, আজও দরজায় এখানে তালাচাবি নিষ্প্রয়োজন গাঁয়ের যুবক্লাবগুলি সন্ধ্যে থেকেই হ্যাজাকবাতি জ্বেলে মশগুল থাকে নাচ-গান-বাজনায় নিজস্ব আদিম কিছু বাদ্যযন্ত্র বাদে স্প্যানিশ গীটার এদের অত্যন্ত প্রিয় এদের একান্ত নিজস্ব নাচ ‘ব্যাম্বো ডান্স’ জীবনসংগ্রামের রূঢ়তা ও কৌতুকে প্রতীকীকৃত

পোশাকের ক্ষেত্রে পুরুষরা সবাই আধুনিক পাশ্চাত্যরীতিই পছন্দ করেন মিজোরাম-ফেরৎ এবং স্থানীয় মেয়েদের একাংশ জিনস্ পরলেও অধিকাংশ মেয়েরাই পরেন সম্পূর্ণ মিজোপোষাক উর্দ্ধাঙ্গে বিভিন্ন ফ্যাশনের ব্লাউজ, কোমর থেকে গোড়ালি পর্যন্ত হাতে বোনা অত্যন্ত সুদৃশ্য পাছড়া রিয়াং বা চাকমাদের পাছড়ায় রয়েছে রঙ ও বুননের এক ধরনের সীমাবদ্ধতা কিন্তু এদের সেটা নেই অত্যন্ত উজ্জ্বল রঙ এরা পছন্দ করেন এই পাছড়ায় মিলন ঘটেছে বিভিন্ন আদিবাসী গোষ্ঠীর বুননশৈলী মনমাতানো দৃষ্টিনন্দন ডিজাইনের পাছড়া বা উলের পোশাক সুন্দরী মিজোযুবতীর মতোই রাজকীয় তথা দেবগ্রাহ্য বলে মনে হয়   জম্পুই সম্পর্কে ছোটো করে  জানতে এই নিবন্ধ খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা লেখা

লেখকের পরবর্তী যে  নিবন্ধ আমাকে মুগ্ধ করে তার নাম “কালোগর্ত : প্রদীপ চৌধুরী   প্রদীপ চৌধুরী-র নিবিড় সম্পর্ক নিয়ে আগেও অনেক লিখেছি তবে, এই নিবন্ধে লেখক সেলিম মুস্তাফা প্রদীপ চৌধুরী-র বিতর্কিত কাব্যগ্রন্থ ‘কালোগর্ত’ নিয়ে তার মতো আলোচনা করেছেন

লেখক বলছেন ‘প্রদীপ চৌধুরীর বিতর্কিত দিগ্বিজয়ী কাব্যগ্রন্থ ‘কালোগর্ত’। প্রদীপের বিশালত্বকে স্পর্শ করা আমার কর্ম নয়, তবু চেষ্টা করেছি নিজের জড়তাগুলিকে ভেঙে ফেলার, যাতে তাঁর কবিতার খুব কাছাকাছি যেতে পারি লেখক আরও লিখছেন ‘আমার বক্তব্য, কবিতাকে তার আপন মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার তৎপরতায়ভারতীয় সাহিত্যে, আমার বিশ্বাস, প্রদীপও একজন   আরও লিখছেন ‘প্রদীপের কবিতা মানুষের কবিতা, মানুষের জন্য মানুষের কবিতা কালোগর্ত আমাকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় ‘জীবন’ আর ‘যাপন’-এর মাঝামাঝি আরেক Space-এর কথা !’ লেখক আরও লিখেন ‘প্রদীপের কবিতা পড়লেই একটা ব্যাপার খুব স্পষ্ট ধরা পড়ে যে লেখাকে কবিতা করে তোলার জন্য কোনো মেকি কাব্যপ্রয়াস নেই   উদাহরণ হিসেবে লেখক কয়েকটি কবিতাও তুলে দিয়েছেন আমি এর থেকে মাত্র দুটি কবিতার কিছু লাইন উল্লেখ করছি

‘আবেগের

নীলস্তর পেরিয়ে যেখানে

প্রকৃত অভিযানকয়েকশ মৃতের

সঙ্গে যারা আমাদের একই সারিতে

তাদের দিকে আমি...’

 

কিংবা

 

‘বিস্তীর্ণ গোলার্দ্ধে আমাদের একরোখা

একই সমুদ্র

এই নগরীর প্রবেশ ও প্রস্থান পথগুলি

আমাদের ক্ষুদ্ধ শরীরের আঘাতে

তছনছ হয়ে গেছে...’

 

এর লেখকের নিবন্ধ ‘অরুণ বণিকএক চির-বাম চির অভিমন্যু’।  লেখক, অরুণ বণিক সম্পর্কে লিখছেন ‘অরুণকে মেরে ফেলা হয়েছে ১৯৯২-এর সেপ্টেম্বরে অরুণকে মাথায় আঘাত করে বালিশচাপা দিয়ে খুন করে অমরপুরের অমরসাগরে ( এটা ফটিকসাগর হবে) ফেলে দেয়া হয় বিচার হয়নি আজও যে সমাজ, যে আত্মজনের পরিমণ্ডলে তিনি বাস করতেন, তাদের মেকিপনার বিরুদ্ধে কখনো গর্জে উঠে সকলের কাছে অনভিপ্রেত হয়ে, বামপন্থী রাজনীতিকে ভালবাসার কারণে, সমাজের উঁচুস্তরে যে-সব মানুষের নাম মানুষ হিসেবে গৃহীত হয় না, সেই অবহেলিতদের ভালবাসতে গিয়ে, অকালে প্রাণ দিতে হয় অরুণকে এর কী বিচার হবে ? কে করবে বিচার ?”

মূলত অরুণ বণিক এবং তার সম্পর্কে লেখক খুব সুন্দর করে আলোকপাত করেছেন তিনি ‘গেরিলা’ লিটিল ম্যাগাজিন বের করেছিলেন তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ফাংগি অভিযান’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৪ সালে   ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘অধীশ্বর নেশা’। লেখক এখানে তাঁর কয়েকটি কবিতা তুলে ধরে, তার প্রভাব ও প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরেন তরুণ কবি-পাঠকদের জন্য খুবই মূল্যবান একটি নিবন্ধ

 

এভাবে লেখক একের পর এক নিবন্ধ যেমন

 

৬। শৈলেশ্বর : বাংলা সাহিত্যের নবগঙ্গার ধারক

৭। নিষিদ্ধ মানিক : অ-ধারণযোগ্য মানিক

৮। শৈলেশ্বর : এক নীরব দধীচি

৯। আমি আর দেবদূত বৃষ্টি ভিজে বাড়ী যাই

১০। অনিল সরকার : এক নিভৃত প্রেমিকলোকজীবনের চারণকবি, দলিতের গীতিকার ১১ভাড়াটে সৈন্য দিয়ে কি আর যুদ্ধ হয়  

১২। ভাষা যখন বিষয়

১৩। লেখা ও জীবন

১৪। আত্মভোলার মাতৃভাষা

১৫। সময়ের পাড়ে পাড়ে শব্দের চিতা

১৬। সাহিত্য ও তার মূল্যায়ন

১৭। কাব্য থেকে পাওয়া না-পাওয়া

১৮। কবিতার গ্রহণযোগ্যতা, অপরপক্ষ এবং একটি প্রশ্ন এবং

১৯। কাব্যের সংকট

 

“নিষিদ্ধ মানিক : অ-ধারণযোগ্য মানিক” এর নিবন্ধ থেকে লেখা থেকে একটা ঘটনার অংশ তুলে ধরছি, কেবলমাত্র“সন ১৯৭৪/৭৫ হবে আনুমানিক । ধর্মনগর কালীদীঘির পাড় ধরে দৌড়ুচ্ছে কয়েকটি যুবক । আর মুখে ধ্বনি দিচ্ছে হরি বোল্ বোলা, হরি বোল্ বোলা...”। আমি হতভম্ব হয়ে হাঁ করে দেখছি । গ্রামের ছেলে শহরে এলে এমনিতেই মুখ হাঁ হয়ে যায় । পথচারী একজন জিজ্ঞাসা করলেন “কে গেলেন দাদা ? উত্তর এল “গান্ধী, সংবিধান, চেতনা ।”

দৌড় এসে থামল দীঘির এক কোণায় বটগাছের তলায় । থামল বলা চলে না । এসেই ধপাস্ করে পড়ে গেলেন একজন কলার বাকলে পিছলে গিয়ে পড়ে যাবার মতো । কী সর্বনাশ ! ভদ্রলোক হাত-পা শার্ট-প্যান্ট ঝেড়ে ঝেড়ে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে অদ্ভুত ভঙ্গিতে এদিক-ওদিক তাকিয়ে বলতে লাগলেন“কেউ দেখেনি, কেউ দেখেনি...ভঙ্গুর ইমেজের হীনপ্রাণ, দীন-মধ্যবিত্তের হুবহু নকল কী অভিনয় । কী দারুণ বডি ফিটনেস্ ।”

এটা ছিল আসলে মানিক চক্রবর্তীর “থিয়েট্রোন” ডায়লগ বলতে তিন চারটেই থাকত । অদ্ভুত একটা মাদকতা, নাটকীয়তা তারা তৈরি করে নিতেন, এর ভিতর দিয়েই । মানিকদা এভাবেই নাটক করে ঘুরে বেড়িয়েছেন বহু জায়গা । এসবই আজ স্মৃতি । সেই মানিক চক্রবর্তীকে নিয়ে সেলিম মুস্তাফা লিখেছেন বেশ গুছিয়ে । সেলিম মুস্তাফার কবিতা নিয়ে একটা ঘটনার কথা কবি উল্লেখ করেছেন । কবি তাই লিখছেন “মানিকের মতো বোদ্ধা, যাঁরা আমার জীবনের পৃষ্ঠায় বিশেষভাবে চিহ্নিত রয়েছেন

        লেখকের “অরুণ বণিকএক চির-বাম চির- অভিমন্যু” লেখাটা খুবই উল্লেখযোগ্য একটি লেখা । কারণ, অরুণ বণিককে নিয়ে লেখা খুবই কম তাঁকে জানা খুবই প্রয়োজন । এটা নিয়ে আমি আগের পৃষ্ঠায় বলেছি  এখানে অরুণ বনিকের একটি কবিতার অংশ উল্লেখ করে নিচ্ছি, যা লেখক উল্লেখ করেছেন

“আততায়ীর শানিত ফলকের দিকে

নজর রাখুনচেয়ে দেখুন ঠাণ্ডা

মেজাজেরই বেরিয়ে আসে নীরব চোখের

শানিত জিঘাংসা

ঘাতকের চোখেই

জেনে নিইঘাতক হওয়ার আবশ্যকতা ।”    (বিকার পরিধি)

 

কবিতা নিয়ে, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে তার নিজস্ব চিন্তাধারা তিনি মেলে ধরেছেন ‘ভাষা যখন বিষয়’ শুরু করে ‘কাব্যের সংকট’ নিবন্ধে

এখানে লেখকের লেখা থেকেই একটা স্বীকারোক্তি প্রথমেই তুলে ধরছি, এতে তাকে মূল্যায়ন করতে সুবিধে হবে। তিনি ‘কাব্য থেকে পাওয়া না-পাওয়া’ নিবন্ধের শুরুতেই লিখছেন  

‘এই রচনাটি প্রকৃতপক্ষে আমার নিজের প্রয়োজনেই লেখা আমি প্রবন্ধকার বা নিবন্ধকার নই লেখকের এমন স্বীকারোক্তির পরিপ্রেক্ষিতে তার লেখার বিষয় নিয়ে আমি ব্যক্তিগত কোনো মন্তব্যে যাবো না কেননা, এখানে তার কোন সুযোগ নেই আমি শুধু তার মোদ্দা যে বিষয়গুলো লেখক বলতে চেয়েছেন, তাই ধরিয়ে দিতে চেষ্টা করবো পাঠকদের যেমন, ‘ভাষা যখন বিষয়’ নিবন্ধে লেখক লিখছেন “সাহিত্যে ইদানিং সবকিছুকেই কোনো না কোনো ‘নিয়ম’ বা ‘ইজম’ বা ‘সময়ভাগ’-এ চিহ্নিতকরণের প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় এটাও এক ধরনের ব্যাধিই বলা যায় খণ্ডিত মানুষের খণ্ডিত ভাবনায় এর জন্ম যশপ্রতিপত্তি আর অর্থের স্রোতকে কায়েমী করে রাখার প্রয়োজনেই হয়ত এই প্রয়াস।

“অনিল সরকার : এক নিভৃত প্রেমিকলোকজীবনের চারণকবি, দলিতের গীতিকার” নিবন্ধে লেখক ছোট্ট করে হলেও খুবই মূল্যবান কথা বলেছেন । তাঁর কবিতা নিয়ে করেছেন অসাধারণ আলোচনা । লেখক লিখছেন অনিল সরকার সম্পর্কে মৌলিক অর্থেই লিখছেন“ তিনি সেই সমাজ, সেই জীবনস্তর ও সেই সংস্কৃতির একটি একক-স্বরূপ, যাকে দেখে একটা সুস্থ  সদর্থক সাম্যবাদী গঠনমূলক রাজনৈতিক দল গড়ে উঠতে পারে বা নিজেদের এজেণ্ডা স্থির করে নিতে পারেতিনি রাজনীতি থেকে শিক্ষা যতটা নিয়েছেন, রাজনীতি তাঁর কাছ থেকে নিয়েছে এর চেয়ে বেশি তাই তাঁর জীবন কখনোই ছিল না কট্টর এজেণ্ডানির্ভর ।”  এখানেই বোঝা যায়, লেখক কবি অনিল সরকার থেকে ব্যক্তি অনিল সরকারকে সঠিক পরিমাপ  করেছিলেন । অনিল সরকারের কবিতা নিয়ে নিয়েও এই নিবন্ধে নিবিড় আলোচনা করেছেন লেখকতাঁর কবিতার ভিতর দিয়ে ব্যক্তি মানুষকে খোঁজার চেষ্টা করেছেন লেখক ।  

“লেখা ও জীবন” নিবন্ধে লেখক লিখছেন “আমার কোনো লেখাই শেষ পংক্তির উদ্দেশ্যে গড়ে ওঠেনি যদি জীবনেই চমক না থাকে, লেখার শেষ লাইনে আর কী-ই বা দেখানো বাকী থাকে ?” এখানে লেখা সম্পর্কে লেখকের এক ধরনের স্পষ্ট মত দেখতে পাওয়া যায়

লেখক স্পষ্টত বলেন “জীবনবিচ্ছিন্ন কোনো মহৎ রচনার বা কোনো সৃজনশীল চেতনার সন্ধান আমার জানা নেই কিন্তু যদি জীবনই ঘুরেফিরে সাহিত্যের এ-দরজা ও-দরজায়, এ-জানালা ও-জানালায় উঁকি দিতে থাকে অহরহ, তবে একটি রচনা যত শৈল্পিকতত্ত্বশালীই হোক, যত শীর্ষারোহীই হোক, তার আরোহণকালীন অস্থায়ী ক্যাম্পগুলির কথাও বলতেই হবে, নইলে হারিয়ে যাবে তার বেসক্যাম্প— জীবনের সঙ্গে তার সংলগ্নতা মায়ের সঙ্গে তার নাভি-রজ্জুর কথাও— যা ছিন্ন হলেও বিচ্ছিন্ন নয়

লেখক এবং লেখার সম্পর্কের কথাই মূলত সেলিম মুস্তাফা এখানে গুছিয়ে বলতে চেয়েছেন এরপর ‘আত্মভোলার মাতৃভাষা’ নিবন্ধে লেখক লিখছেন “বাঙালি স্বভাবতই কিছুটা অনুকরণপ্রিয় অনুকরণের শৈল্পিক কুশলতা তার সহজাত গুণ ! মনে হয় অন্য ভারতীয়দের তুলনায় একটু বেশিই তবু তার নিজ বাসভূমি এখনও সেই অর্থে উন্নত বা উন্নীত নয় কারণ দ্রুত এগিয়ে যাবার বাসনায়, বাঙালি সন্তানরা নিজ বাসভূমি ছেড়ে আরও দ্রুত পাড়ি দিচ্ছেন ভারতের অবাঙালি এলাকাগুলোতে এবং ভারতের বাইরে পৃথিবীর অন্যান্য দেশে 

লেখক এই প্রবণতার পরিপ্রেক্ষিত থেকে বেরিয়ে ক্রমশ আমাদের ভাষা-প্রসঙ্গে আসেন এবং সেই নিয়ে তার চিন্তাভাবনা শেয়ার করেন   যদিও সেসব কথা খুবই প্রাথমিক স্তরের লেখা আসলে, প্রতিটি লেখাই বিভিন্ন লিটিল ম্যাগাজিনের জন্যই লেখক একটু লঘু চালেই লিখেছিলেন লেখক নিজেও সে-কথা স্বীকার করেছেন

তারপরও লেখক খুবই সমৃদ্ধ লেখা লেখছেন সাহিত্য ও তার মূল্যায়ন’ নিবন্ধে লেখক লিখছেন “সাহিত্য আর মূল্যায়ন, বিষয় দু’টি যে কখনোই  সমবয়সী হবে না এটা স্বতঃই স্পষ্ট দ্বিতীয়টি প্রথমটির উপজ মাত্র ...মূল্যায়ন ছাড়াই সাহিত্য এগোতে পারে তার মূল্যবোধের কারণে মূল্যায়ন ব্যাপারটা সম্পূর্ণতই মূল লেখার উপর নির্ভরশীল ...কোনো লেখার প্রকৃত মূল্য এবং তাৎপর্য মূলত নিহিত কালের পৃষ্ঠায় এবং পাঠকমনের অতল গভীরে এই স্বয়ংক্রিয় ঘটনা ক্রমশ মূল লেখার অধিষ্ঠান ও আয়ুকে প্রাকৃতিকভাবেই নির্দিষ্ট অথবা সীমাহীন করে তোলে  

আবার লেখক ‘কাব্য থেকে পাওয়া না-পাওয়া’ নিবন্ধে স্পষ্ট লিখছেন ‘কবিতা থেকে কী কী পেতে পারি, যদি এভাবে বুঝতে চেষ্টা করি, তাহলে কবিতার কিছুই বোঝা সম্ভব হয় না কোন অতলান্তের দিকে সে শেকড় ছড়াচ্ছে কে জানে ? কবিতার অথৈ জলে বুদ্ধির হাবুডুবু অবস্থা দাঁড়ায় নিরাশা, হতাশা আসে  

লেখক তার পরের নিবন্ধ ‘কবিতার গ্রহণযোগ্যতা, অপরপক্ষ এবং একটি প্রশ্ন’-এ  এই প্রসঙ্গকে আরেকটু টেনে বলেছেন “কবিতাকে গ্রহণযোগ্য আর সংবেদনশীল করতে গিয়ে এমন তো হতেই পারে যে কবিতাটি আর কবিতাই রইল না, বা মান কমে গেল ! কবি সেটা করবেন না এটা জরুরী মনে হয় না তার কাছে ...এখানে দুটো বিষয় পরিষ্কার এক, কবিকে পাঠকের কাছে যেতেই হচ্ছে, ইচ্ছায়-অনিচ্ছায়, প্রকারান্তরে ...লেখা কেউ পড়বে না, জানবে না, চিরকাল খাতার পাতায় লুকোনোই থাকবে, এমন ইচ্ছেয় বোধকরি কেউই লেখেন না   দুই, কবিতা সমাদৃত হোক এই বাসনা কবিমাত্রেই থাকে তাই ‘বিরক্তি’ও থাকে

 

এই বইয়ের শেষ নিবন্ধ ‘কাব্যের সংকট’ লেখকের আরেকটি  গুরুত্বপূর্ণ নিবন্ধ এখানে একটু কথা আমাকে খুবই প্রভাবিত করেছে ‘কারোর লেখায় দায়বদ্ধতা খোঁজার কোনো প্রশ্নই ওঠে না, যদি-না বিশেষ কোনো কারণ থাকে, যদি না প্রশ্ন ওঠে তার বিশ্বস্ততায় কবি যদি মানুষ হয়, দায় তার থাকবেই, মানবিক দায় মনুষ্য-হৃদয়ের সকল আকুলতা-ব্যাকুলতা সবই অন্যের জন্য এই হৃদয়-ধর্মই মানবিক দায় ফুল ফোটার পরই অন্যের হয়ে যায় যেমন...”

 

এভাবে পরতে পরতে আমরা কবি সেলিম মুস্তাফাকে তার নিবন্ধে একটু একটু করে চিনতে পারি এই বই পড়লে, আমরা কবিকে আরও কাছে থেকে জানতে পারি সেলিম মুস্তাফাকে জানতে হলে, ‘হৃদয় থেকে জাম্পুই ও অন্যান্য গদ্য’ এই বইয়ের বিকল্প নেই কবিতাকে পরতে পরতে কবি কীভাবে অনুভব করতেন, তার একটা আভাস পাওয়া যায় এই গ্রন্থ থেকে

                                               


 

 

 কবি সেলিম মুস্তাফা ১৯৫৩ সালে অধুনা বাংলাদেশের সিলেট জেলার হবিগঞ্জের ভাদেশ্বর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমানে উত্তর ত্রিপুরা জেলার ধর্মনগরে স্থায়ী বসবাস। ১৯৭৪ সালে তাঁর প্রথম কবিতা  প্রকাশিত হয়।এযাবৎ  ছটি  কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে। একাধিক কবিতার কাগজ সম্পাদনা করে বর্তমানে  পাখি সব করে রব নামে একটি মাসিক কবিতাপত্র সম্পাদনা করছেন।

 

 ১। জানি আপনাকে এমন প্রশ্ন করা বোকামি,তবু ইতিহাসের স্বার্থে সময় ও সামাজিক অবস্থানের প্রেক্ষাপটে আগন্তুক তরণ কবিদের জানা উচিত আপনার কবিতা লেখার প্রেরণা কি ছিল ? আপনি ঠিক কি রকম মুহূর্তে ভেবেছিলেন কবি হবেন, বা কবিতা লিখবেন ? সময়ের ব্যবধানে আজ একজন তরুণ কি ভেবে কবিতা লিখতে আসছে বা প্রেরণা পাচ্ছে।এখানে একটা বোঝাপড়ার দরকার মনে হয়। কবিতা লেখার তাগিদও কি সময়ের সঙ্গে পরিবর্তনশীল ? আপনাদের সময়ের মানসিক, সামাজিক জটিলতা নিশ্চয়ই এখন থেকে অনেক সহজ ছিল। না-কি, জটিলতা কোননা-কোনভাবে ঘুরে ফিরে একই আবর্তে আবর্তিত ? ঘুরে ফিরে সেই প্রেম, ব্যর্থতা, হতাশা,না-পারার বিভিন্ন যন্ত্রণা।

 

 

সেলিম মুস্তাফাঃ  লেখার প্রেরণা তেমন কিছু ছিল বলে মনে পড়ে না। প্রথমে গান টান কিছু লিখেছি, সুর দিয়েছি । কবি হব এমন কিছু ধারণা ছিল না ।শ'পাঁচেক কবিতা লিখে খাতা ভরিয়েছি প্রকাশ হবার আগেই প্রথমে ছন্দ দিয়েই লিখতাম জীবনানন্দ-এর কবিতা পড়ে ঘাবড়ে যেতাম । আমার কলেজের বন্ধুরা বলত - ভাবিস না ছন্দ দিয়ে কবিতা লেখা আবার ফিরে আসবেতবু ছন্দ ছাড়াই লেখার চেষ্টা করতে লাগলাম । কৈলাসহরের মৃদুল বণিক (নামটা ঠিক বললাম কি না কে জানে) আমার প্রথম গদ্য কবিতা ছাপেন । সম্ভবত জাটিঙ্গা নদী নিয়ে লেখা ছিল ওটা । গান লিখে নিজে সুর দিয়ে নিজেই গাইবার চেষ্টা করতাম। আমার গলা ভাল নয়। তবে অন্যরা আমার গান স্টেজেও গেয়েছে  বাবার পরোক্ষ প্রেরণা ছিলো। গান বাজনার চল ছিল আমাদের পরিবারে। যন্ত্রপাতিও ছিল। পূর্ব বঙ্গে থাকাকালীন আমাদের বাড়ির নিজস্ব যাত্রাদল ছিল।  বাড়িতে দুর্গা পূজার সময় যাত্রাপালা হতো বাবার নির্দেশনায়ইণ্ডিয়াতে আসার পর এসব বাদ হয়ে যায় । তবে আমার মা খুব ভালো গান (গীত) গাইতেন

যাক এসব কবিতা লেখার মত আরও নানান বিষয় আছে কেউ তো ছবিও আঁকতে পারে । যেকোন কিছু করতে হলে, ওটার সঙ্গে অন্তত প্রাথমিক একটা পরিচয় থাকা দরকার কবিতা যদি কেউ পড়েই না, বা অন্য কাউকে পড়তেও দেখে না, তবে কবিতার প্রতি আগ্রহ কী করে জন্মাবে ? পরিবেশ তো জরুরী ব্যাপার ! তবে সকল লোকের পক্ষেই কবিতা বা গান বা অন্য কিছু করা সম্ভব নয়, যদি না তাগিদ থাকে ভেতরে কবিতা লেখার তাগিদ পরিবর্তনশীল নয় যে লেখে সে যদি সত্যি কবি হয় তো লাভ লোকসানের কথা না-ভেবেই লিখবে । কবি না হলে এক সময় লেখা ছেড়ে দিতে পারে । তবে কাব্যচেতনা পরিবর্তনশীল সামাজিক অবস্থার কথা ভেবে কেউ কবিতা লেখা শুরু করে বলে মনে হয় না আমার । যদি কেউ লেখে, তা স্লোগান তার উদ্দেশ্য কবিতা লেখা নয় । আর সময়-- সময়কে চিরকালই সকলেই খারাপ ভাবে । এটা একটা কথার কথা । ভালো সময় এলে সেটা কেউ মনে রাখে না প্রেম ভালবাসা ঘৃণা হতাশা- এগুলো জীবনের মূল বিষয়, এগুলো এড়ানো যায় না আবার এগুলো বাদ দিলে আর থাকে কী জীবনের ?

 

২। পূর্ববঙ্গ- বাড়িতে যাত্রাপালা, দুর্গাপুজা, বেশ এলাহী পরিবার ছিল বলা যায় তাহলে!তারপরও  ভারতে আসা হল কি সেই চিরাচরিত নিপীড়নের অংশ হয়েই ? আপনার বড় হওয়া তো যতদূর জেনেছি দরিদ্রতার সঙ্গে মেলেমেশা করেই মেসোমশাই তো হোমিওপ্যাতি প্র্যাকটিস করতেন।  সেই সব সংমিশ্রণের উত্থান-পতনের কথা কিছু কি বলবেন ?

 

সেলিম মুস্তাফাঃ  পূর্ববঙ্গে আমাদের অবস্থা খারাপ ছিল না নিপীড়নের ব্যাপার ছিল না, তবে হয়ত ভবিষ্যতের নিরাপত্তার কথা ভেবেই একজন দু’জন করে আমরা ইণ্ডিয়ায় চলে আসি সব শেষে আসেন বাবা আর আমার দিদিদের মধ্যে সবচেয়ে ছোটজন ধর্মনগরেও আমাদের বিষয় কম ছিল না, তবে সেটা ছিল আমার বড় ভাইয়ের নামে কারণ সে ছিল ইণ্ডিয়াতে আমাদের প্রথম সদস্য তাই ১৬ কানি সম্পত্তির সবটাই তার নামে কেনা হয় আর বিপদটা ঘটে এখানেই- আমরা কেউই এই সম্পদের সুফল পাইনি, এমনকি আমার বাবাও না বাবাকে প্রায় বিনা চিকিৎসায়ই এ পৃথিবী ত্যাগ করতে হয়বাবার ডাক্তারীর সা জমানো আর বয়স ছিল না  ইণ্ডিয়াতে এসেই কিছুদিনের মধ্যে এক ছেলেকে হারাতে হল চাকুরিজীবী ছেলে আমার বড় ভাই (মেজো) তখন সে কদমতলা স্কুলে চাকুরি করতো ১৯৭০-এর ২৬শে ডিসেম্বরে ‘মায়া সিনেমা’হলের সামনে  তার পিঠে ছুরি মারে আততায়ী । সম্ভবত দেবী প্রসাদ পুরকায়স্থের চার আদর্শ-শিষ্য- দিলীপ নাগ, প্রমেশ মালাকার, রাখু সোম যার কথায় এরা এই কাণ্ডটি ঘটায় সে লোকটা হল নির্মলেন্দু ধর

        ব্যস, এরপর আমাদের দুর্দশা শুরু হল বাবাও ধীরে ধীরে অসুস্থ হতে লাগলেন আমাদের অবস্থাও অবনতির দিকে গড়িয়ে গেলো বিবাহিত দুই বোন সাহায্য করতে লাগল অল্প করে সবার বড় ভাই টাকা পাঠাতেন অনিয়মিত ভাবে বাবার রোজগার দু টাকা পাঁচ টাকা আমরা চারজন আমি বেকার কলেজে পড়ি কিন্তু মন নেই ডাক্তারী পড়ার কথা ছিল বড় ভাই বললেন, তার ছেলেকে পড়াবেন, খরচ দিতে পারবেন না জায়গা বিক্রি করার উপায় নেই জায়গা বড় ভাইয়ের নামে

 

৩।  “ আমার ভাইকে ওরা এখানেই খুন করেছিল,

ওরাও ভাই, আমার না-হলেও অন্য কারুর ,

ওরা বাড়ি ফিরে যাবার পর

ওদের ভাই জিজ্ঞেস করেছিল ঃ

দাদা ,এ কি করলি !

ওরা ওদের ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়েছিল,

ওরা ওদের ভাদের বলেছিলঃ রুপু , সোনা , খোকন!

কাঁদিস না, আমি বুঝতে পারিনি ...

 

আমিও বুঝিনি, আমি  এখনো বুঝতে পারছি না

এই ঘটনায় আমি কোন চরিত্র কি না,

বিব্রত নাট্যকার আমার মুখে কোনও সংলাপ

দিতে পারছে না, একা-একা

নিজে নিজে খুন হয়ে যাচ্ছি। (একা গ্রিনরুমে একা একা)”

 

কবিতাটা সাথে সাথে মনে পড়ে গেল। ‘ছোরার বদলে একদিন’ কাব্যগ্রন্থ’এ প্রকাশিত হয়েছিল  ফেব্রুয়ারী ১৯৮৪ সালে।  এই কবিতায় আপনাকে এক নৈর্ব্যক্তিক আবেগময় অবস্থানে দেখতে পাই। এবং খুব নাটকীয় মোড় আসে যখন আপনি নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করেন, ‘আমিও বুঝিনি, আমি এখনো বুঝতে পারছি না/ এই ঘটনায় আমি কোনও চরিত্র কি না!’ কবিতাটার ভিতর দিয়ে ঘটনাকে আপনি সার্বিক ভয়ংকর এক মানবিক সংকটের দিকে নিয়ে গেলেন । আমার প্রশ্ন ঘটনার এত বছর পর এখনো কি আপনি তেমনই বিব্রত ? সেই সংকট কি এখনও সমানভাবে  বিদ্যমান ? এখনও কি  একা একা মননের অন্তরালে ভাবেন, বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কেন গ্রিনরুমে কাঁদে ? না, সমাজের একটা অংশ চিরদিনই এভাবেই কেঁদে যায় ? এটাই তাদের ভবিতব্য ? 

 

 

সেলিম মুস্তাফাঃ  হ্যাঁ, আমি এখন রকমই ভাবি ওটা শুধু আমার জীবনে নয়, আমাদের পুরো গোষ্ঠীর কাছে একটা বিশাল ঘটনা ছিল, আজও আছে কারণ সে ছিল আমাদের বংশে সকলের কাছে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি, অত্যন্ত ভদ্র অত্যন্ত শান্ত এবং শিক্ষিত যে বড় আওয়াজে কথাও বলে না খুনীরা আমার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টাও করেছে আমি উৎসাহ পাইনি রাগও করিনি সব তো আমার আশেপাশের লোক !

 

সম্ভবত তাই। ওরা সন্দেহের অবকাশে (Benifit of doubt) মুক্তি পেয়ে যায়। জনের মধ্যে কে ছুরি মেরেছে প্রমাণ হয়নি বা প্রমাণ করা হয়নি। আমার ভাইয়ের জবানবন্দি রেকর্ড করা ছিল। সেটা তখনকার এস ডি গায়েব করে দেন এস.কে. নন্দী সম্ভবত নাম মনে নেই। আমার সাইকেলটা থানাতে যে নিল আর দিল না ২৬ ডিসেম্বর ছুরি মারে,২৭ ডিসেম্বর কৈলাসহরে মারা যায়। সঙ্গে আমার মা আর এক দিদি ছিলেন দেবিপ্রসাদ লাশ আনতেও মানা রেছিল বলে ,গাড়ি পাবেন না মা বলেন- আমি ছেলেকে ঠেলা গাড়ি করে হলেও বাড়ি নিয়ে যাব সে অনেক কাহিনি এস.কে.নন্দী নামটা ভুলও হতে পারে তবে নন্দী ছিল টাইটেল শুনেছি ওর ছেলে বারবেল করতে গিয়ে পড়ে মারা যায় আমার ভাই সবার নাম বলে গিয়েছিলো বলেছিলো ওদের যেন শাস্তি না হয় পরে ওরা  আমার ভাইএর নামে অনেক  কুৎসা রটনা করে

 

৪। থামলেন কেন?

সেলিম মুস্তাফাঃ  থাক সে সব কথা। আজ আর বলে কি লাভ?

৫। থাক, কেন সে সব কথা? একজন কবিকে বুঝতে গেলে তার জীবনের নিষ্ঠুর দুঃখগুলোও জানা  দরকার!       

সেলিম মুস্তাফাঃ  আমার ভাই স্কুলে ছাত্রদের কাছে খুব প্রিয় ছিল তারা যখন খবর পায় কদমতলা থেকে সাইকেল চেপে দলে দলে চলে আসে ধর্মনগর, এখানে এসে খবর পায় তাকে কৈলাসহর নেয়া হয়েছে, তখন তারা সাইকেলেই কৈলাসহর চলে যায় আমার কাছে ঘটনা অভূতপূর্ব যাই হোক ভাইয়ের লাশ শেষ পর্যন্ত এলো বাড়িতে বাড়ির সামনের বেড়া কারা যেন খুলে দিল শহর থেকে মিছিল করে এলেন শিক্ষকরা ছবি তোলা হলো সেই ছবি আমরা স্টুডিও থেকে আনতে পারিনি টাকার জন্য মাস্টারমশাইরা একে একে সরে গেলেন যার যার পথে ভাইএর মহাধমনীতে ছুরির ফলা ঢুকে যাওয়াতে রক্ত দেয়া হলেও তা আটকাতো না ধর্মনগরের ডাক্তার ওয়াদ্দেদার তখন ছুটিতে ছিলেন ডাঃ সোম আমার ভাইকে দেখেন, কিন্তু কিছু বুঝতে না পেরে শুধু পিঠে সামান্য একটা চেরা কাটা দেখে ব্যাণ্ডেজ করে দেন, ভেতরে তখন রক্তক্ষরণ হচ্ছিলো চোখ সাদা হয়ে যেতে দেখে প্রাইভেট ডাক্তার মাখন লাল  দাস চৌধুরীকে নিয়ে আসা হয় তিনি এসে চোখ দেখেই বললেন এখানে হবে না, কৈলাসহর নিতে হবে রাত দুটোর সময় কৈলাসহর পাঠানো হয় এম্বুলেন্সে করে যাবার সময় খুব যন্ত্রণা হয়, বার বার গাড়ি থামাতে বলে এত রাত্রে রক্তের ব্যবস্থা করতে না পেরে ডাক্তাররা তারই শরীর চিরে চিরে রক্ত নিয়ে পুশ করেন কিন্তু মেইন আর্টারী ছিদ্র থাকায় সেই রক্ত আবার বেরিয়ে যেত সকাল ৮টার সময় মারা যায় খুনিরা আজও বহাল তবিয়তে আছে

 

 

৬। যদি  কিছু মনে না করেন, তাহলে আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে, এই সব যন্ত্রণার কথা, বিশেষত্ব ‘বড় ভাই সম্পর্কিত’ যা অত্যন্ত ঘরোয়া অথচ সাংঘাতিক মর্মান্তিক আমি জানতে চাইছি, আপনার কবিতায় সম্পর্কের এই নির্দয় টানাপোড়েন খুব একটা  দেখতে পাওয়া যায় না কেন ? অথচ আপনি এই যন্ত্রণা যাপনের ভিতর দিয়েই বড় হয়েছিলেন। এখনও হচ্ছেন ।   

 

সেলিম মুস্তাফাঃ  হ্যাঁ ভাইয়ের এপিসোড ক্রমশ সচেতনতা দিয়ে এড়িয়ে গেছি কারণ এর মূল্য আমার কাছে যতখানি, অন্যদের কাছে ক্রমশ তা ফিকে হয়ে আসে এটার উল্লেখও আমি এত বেশি করেছি যে, আর করলে তা সহানুভূতি পাবার হাতিয়ার ভাববে অন্যরা দুঃখের প্রকৃত জায়গা যার যার মনের ভেতর সকলেরই দুঃখ আছে নিজের কাছে রেখে র থেকে সম্মানের সঙ্গে শিক্ষা নেয়াই সঠিক মনে হয়

 

৭।কেন ঘটনাটা ঘটেছিল, তাঁর কিছু আভাস পেলেন ? আমি খবর নিয়ে কিছু কানাঘোষা শুনলাম, তাতে মনে হল  প্রেম সম্পর্কিত কিছু ছিল যেন ? আবার আরেকটা খবর পেলাম সেটা সাজানো হয়েছিল, ঘটনাটাকে অন্য দিকে মোড় দেবার জন্য প্রকৃত ঘটনাটা ঠিক কি ? আপনি কিছু খবরাখবর নিয়েছিলেন ? প্রেম তো থাকতেই পারে ?

 

সেলিম মুস্তাফাঃ  না, প্রেম ছিল না তার তো বিয়ে প্রায় ঠিক হয়েই রয়েছিল । প্রেম বলতে এখনকার দিনে তোমার যা মনে হয়, সে-সময় এত সহজ বা সম্মানজনক ছিল না । আমার ভাইয়ের পক্ষে তো অসম্ভবই ছিল । যেমন আমার জন্য মার্বেল খেলা বা পথে আড্ডা দেয়া নিষেধ ছিল । পরিবারের পক্ষে তখনকার দিনে সামাজিক মূল্যবোধটা খুব বেশি গুরুত্ব পেতো । তা ছাড়া সে একজন শিক্ষক হিসেবে অত্যন্ত সম্মানজনক একটা অবস্থানে ছিলো তার খুনের ঘটনার পর সাইকেলে চেপে দলে দলে ছাত্রদের কৈলাসহর চলে যাওয়া থেকেই ব্যাপারটা অনুমান করে নিতে পার।

        ঘটনাটা ছিলো অন্যরকম । ভাইয়ের এক সহকর্মী ছিলেন নিখিল চক্রবর্তী । আমার ভাইয়ের ডাকনামও ছিল নিখিল । তাই ঘনিষ্টতা ছিল বেশি । এরা দুজনের সঙ্গে ব্যাডমিন্টন  খেলছিলেন আরো দুজন, যাদের একজন নির্মলেন্দু ধর । ফ্লাওয়ারটা (কর্ক) পুরোনো বলে একজন ছাত্রকে পাঠানো হয়েছিল বাজারে নতুন কর্ক আনার জন্য ।  নির্মলেন্দু পুরোনোটাই বার বার নিখিল চক্রবর্তীকে সার্ভ করছিলেন, কিন্তু নিখিলবাবু সেটা ফেরত মারছিলেন না । এই করে তর্কাতর্কি, এবং শেষ পর্যায়ে গালাগালি । তখন আমার ভাই মাঝখানে কথা বলেছিলো। নির্মলেন্দুকে বলেছিলো- ‘আ রে মশাই, ভদ্রভাবে কথা কন না !’ তখন নির্মলেন্দু বলে- ‘ধর্মনগর যাও, ভদ্রতা শিখাইমু !’

        এর পর সকলে মিলে আপসে এই ঘটনার আপস মীমাংসা হয়, করমর্দন হয় । সবে মিটে যায় ।  কিন্তু এর একমাস পরে ঐ খুনের ঘটনা ঘটে । নির্মলেন্দু তার পিসতুতো ভাই রাখুকে নিযুক্ত করে আমার ভাইকে অপমান করার জন্য । অপমান করতে গিয়ে ওরা খুনই করে ফেলে । ঘটনার রাতে, যখন ওরা মায়া সিনেমা হলে সিনেমা দেখে রাত ন’টার সময় বেরিয়ে আসেন  তখন আমার ভাইয়ের সঙ্গী ছিলেন আরেক শিক্ষক, নয়াপাড়ার অধীর কর্মকার । সিনেমা হলের সামনের চৌমুহনীতে ঘটনাটি ঘটে  প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যে । তখন কর্মকারমশাই সঙ্গে ছিলেন না । হঠাৎ গায়েব হয়ে যান । মনে হয় যোগসাজস ছিল অপরাধীদের সংগে । তিনি কোর্টে বলেছেন, তখন তিনি প্রস্রাব করতে গিয়েছিলেন । ভাইয়ের ডানহাতে সাইকেল ছিল । ওরা এসেই  ভাইকে ধাক্কা দিয়ে ড্রেনের পাশে ( এখন যেখানে আমরা স্কুটার সাইকেল পার্ক করি, এর আগে এখানে চানাচুর বিক্রি হতো) কাঁটাতারের ওপর । পিঠে কাটাতার, বুকের ওপর সাইকেলতারপরো সে উঠে দাঁড়ায় আর সজোরে লাথি মারে সামনেরটাকে । সেটা ছিটকে গিয়ে পড়ে দূরে । তারপর ভিড়ের মধ্যেই কেউ তার পিঠে ছোরা ঢুকিয়ে দেয়, যা প্রথম আধ ঘণ্টা টেরই পাওয়া যায়নি । স্প্রীং দেয়া ছোরা । পিঠে লাগিয়ে লিভার টিপলেই সোজা ভেতরে ঢুকে যায় । ছোরার ডগাটা ভেতরে ঢুকে গিয়ে মহাধমনীও স্পর্শ করে ফেলে, যেখানে রক্তপতন বন্ধ করার কোন উপায়  ছিলো না এ ঘটনা ২৬শে ডিসেম্বর ১৯৭০, শনিবার রাত ৯টার পর । পরদিন ২৭শে ডিসেম্বর সকাল ৮টায় আমার ভাই মারা যায় কৈলাসহর হাসপাতালে । ভাই ধর্মনগর হাসপাতালে থাকতেই তার জবানবন্দি রেকর্ড (ক্যাসেট) করা হয় , যা বিচারের সময় পাওয়া যায়নি । সে  সকলের নাম বলে যায় । বলে কারোর কোন শাস্তি যেন না-হয় । মানুষ মৃত্যুর কথা হয়তো টের পেয়ে যায় আর তখন কোন প্রতিশোধস্পৃহা আর থাকে না মনে হয়

        ১৯৭১-এর মার্চে আমার হায়ার সেকেণ্ডারী পরীক্ষা । দিতে চাইছিলাম না। কিন্তু সবাই চাপাচাপি করাতে দিলাম । রেজাল্ট ভালো হল না। হাইয়ার সেকেন্ড ডিভিশন । আগরতলায় গেলামএক দূর সম্পর্কের কাকা এগ্রি বি এস.সি-তে সুযোগ করে দেবেন বলেও দিলেন নাতারপর কৈলাসহর রামকৃষ্ণ মহাবিদ্যালয়ে পিওর সায়েন্স নিয়ে ভর্তি হলাম । শেষ হলো না পার্ট ওয়ান, পার্ট টু দুটোতেই থিয়োরীতে ফেল প্র্যাক্টিক্যাল-এ পাশ । ৫ নং আ ৬ নং-এর জন্য ফেল । আর পড়িনিকলেজ লাইব্রেরীতে পেয়ে গেলাম জাগরণ পত্রিকার সাহিত্যের পাতা , সেই শুরু । আজো চলছে ।

 

আপনার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ বাহান্ন তাসের পর’ যা মূলতএকটি দীর্ঘ কবিতা ।  শুনেছি, আপনার বন্ধুবান্ধবরা চাঁদা তুলে প্রকাশ করেছিল।  ভাবতেই কেমন অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে। কিভাবে সম্ভব হল ? তারা কি সেদিন কবিতাকে ভালবেসেছিল, না, আপনাকে ? পেছন ফিরে সেই সময়’টাতে আমাদের একটু নিয়ে যাবেন ?  

 

 

সেলিম মুস্তাফাঃ  কবিতাকে হয়তো  ততটা নয়, যতটা আমাকে  তবে এই নির্দিষ্ট কবিতাটিকে সকলেই ভালবেসেছিল কথা বলতে পারি এবং কবিতার প্রতি সকলেরই ভালবাসা জেগে উঠছিলো তখন তা ছাড়া এত বড় একটা কবিতা সকলের অভিজ্ঞতাতেই এই প্রথম এলো-- সেটাও একটা বিষয় বটে । এর প্রধান কারিগর রবীন্দ্র দেবনাথ, সহযোগী বিকাশ পাল, সন্তু চক্রবর্তী, জগন্ময় দে, কল্যাণব্রত সোম, সুদীপ ভট্টাচার্য, শ্যামল ভট্টাচার্য (এখন প্রয়াত),  রীতা ভট্টাচার্য এবং আরো অনেকে  প্রধান প্রেরণাদাতা অধ্যাপক সুব্রত দেব ( এখন বেহালা, কলকাতা , সম্প্রতি ইনি বেহালা থেকে যোগাযোগ করেছেন, আমার লেখা নিয়ে ছাপিয়েছেন ওখানের একটি কগজে, যার নাম 'শ্লোক' যাক, ওটা বেরোনোর পর সকলে দল বেঁধে বিক্রি করেছিল 'সোনিক অর্কেস্ট্রা' ছিল এই সকল কাণ্ডের পেছনেএরপর সকলেই প্রায় লিখতে শুরু করে -- সন্তু, বিকাশ (বিকাশ এখনো লিখছে) জগন্ময়, সকলেই কম বেশি লিখেছে রবিও লেখে মাঝে মাঝে সে তো 'রোদবৃষ্টি' নামে কাগজও বের করে

 

 'সোনিক অর্কেস্ট্রা' এবং  রবীন্দ্র দেবনাথ,   প্রসঙ্গ  আসতেই মনে পড়লো আপনারা কয়েকজন বোধহয় এর সাথে ভীষণভাবে জড়িয়ে ছিলেন। বর্তমান ‘ভাবা মেডিকেল’ এর পাশে বা উপরে আপনাদের অফিস ছিল সেই সময়ের কথা যদি কিছু বলেন ? ধর্মনগরের সাংস্কৃতিক পরিবেশ তখন কি রকম ছিল ?

 

সেলিম মুস্তাফাঃ হ্যাঁ, ভাবা মেডিকেল-এর ওপরে ছন বাঁশের ঘর বানিয়ে তা'তে শুরু হয়েছিল 'সোনিক মিউজিক ইন্সটিটিউশন' প্রেসিডেন্ট নলিনী দা, ভাইস প্রেসিডেন্ট অরুণ দা, সেক্রেটারী আমি, রবি ক্যাশিয়ার, বাকিরা সদস্য সেটা ১৯৭৭ সাল সোনিক অর্কেস্ট্রা'কে শক্তিশালী করার জন্য এই কলেজের জন্ম ধর্মনগরে লখনৌ ইউনিভার্সিটির কোন গানের কলেজ এর আগে ছিল না যা ছিল সেটা এলাহাবাদ ইউনিভার্সিটির লখনৌ ইউনিভার্সিটির কলেজ ছিল করিমগঞ্জে , শিলচরে আর কৈলাসহরে আমরা যোগাযোগ করলাম তারা বিরক্ত হলেন করিমগঞ্জের লোকটি তো মানা- করে দিলেন আসলে ধর্মনগর থেকে সবাইকে মানা করে দেয়া হয়েছিলো আমাদের সাহায্য করতে আমরা শেষ পর্যন্ত লখনৌ- যোগাযোগ করি প্রচুর চিঠিপত্র লিখতে হয়েছিল শেষ পর্যন্ত (খুব সম্ভবত) নীলরতন বন্দ্যোপাধ্যায় তখনকার দিনে রেডিওতে খবর পাঠক প্রশান্ত বন্দ্যোপাধ্যায় ( আবার তবলার গ্রামার বইএর লেখক) -এর পিতা একদম বুড়ো মানুষ, কিন্তু গলার আওয়াজ বাঁশির মত সুরেলা তিনি কৈলাসহরে পরীক্ষা নিতে আসার পথে আমাদেরটা দেখে রিপোর্ট করে দেন তারপর আমরা এফিলিয়েশন পাই তিনি এসেই সব দেখে একেবারে মুগ্ধ হয়ে যান বলেন -তোমাদের এটা তো একেবারে আশ্রমের মত সুন্দর তখন আমার কবিতা চর্চার বছর হয়ে গেছে গানের পরীক্ষার ব্যাপারে কৈলাসহরে যাই রবির সঙ্গে সাথে 'বাহান্ন তাসের পর' নিয়ে যাই রবির পরামর্শে সুব্রত দেব স্যরকে দেখবার জন্য তিনি শুনে বলেন- এটা কী হয়েছে জানি না, তবে একটা দারুণ স্পীড আছে, তুমি এটা ছাপিয়ে ফেলো ব্যস, রবি এসেই সবার সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে ছাপিয়ে ফেলে খরচ ২০০ টাকা সব রবি দেয় অবশ্য সকলে মিলে বিক্রি করে টাকা তুলে ফেলে প্রায় কলেজে আমরা ক্লাশ শেষ হলে নিজেরা গান বাজনা করতাম রবি ধর্মনগরের প্রথম গীটারিস্ট বিকাশ পাল ড্রামসেট বা পিয়ানো একোর্ডিয়ান, বাবু (রবির ভাগ্নে সম্ভবত) কঙ্গো বঙ্গো, দেবাশিস ম্যাণ্ডোলিন, সুদীপ ভট্টাচার্য আর কল্যাণব্রত সোম বাজাতো তবলা আমিও তবলা, ম্যারাকাস, বা গীটার বাজাতাম আমাদের সঙ্গে বর্তমানে স্টুডিও রক্সি- মালিক সনৎ, এবং আরো কয়েকজন ছিল গায়িকা ছিল টুলটুল আমাদের কলেজের ছাত্রছাত্রী একসময় ছিল প্রায় ৩০০ জন এটা একটা গানের প্রতিষ্ঠানের জন্য মস্ত ব্যাপার এটা ১৯৭৭ সাল এবং পরের কথা এটা বলার কারণ, আমরা যখন গান বাজনা করতাম, তখন মাঝে মাঝে অর্কেস্ট্রার সঙ্গে মিলিয়ে কবিতাপাঠও হত কবিতার সঙ্গে বিশেষ করে ড্রামসেট বাজানো হত কখনো একটা ঈজিপ্সিয়ান মিউজিক এস পি রেকর্ড বাজানো হতো

১৯৭৪ সালের শেষ বা ১৯৭৫-এর শুরু থেকে দীপক চক্রবর্তী, দীপক দেব, কিশোর রঞ্জন দে সহ আমরা পাবলিক লাইব্রেরীতে বিকেলে মিলিত হতাম বই নিয়ে নেবার পর আমরা রাস্তায়  বেরিয়ে যেতাম দীপক দেব কবিতা (যা হয়ত কিছুক্ষণ আগে দেশ'- পড়ে এসেছি) বলত আর ব্যাখ্যা করতো বা নিজেদের লেখা নিয়ে নোয়াখলী স্টলে চলে যেতাম সেখানে সবার পকেট ঝেড়ে পয়সা যোগাড় করে কিশোর সিঙাড়া- র্ডার দিতো কখনো আমরা আমরা স্পেশাল বাটি চা' খেতাম আমাদের সঙ্গে গৌরা পাল নামে একজন থাকতো  সবসময় সে কবিতা লিখতো না, বা ততটা রস পেতো না কিন্তু আমাদের সঙ্গ দিত নিয়ম করে এখন তাকে আর পাই না

১৯৭৬ সালে পীযূষ দা আসার পর বি. বি. আই. তে প্রতি মঙ্গলবার সন্ধ্যায় টীচার্স কমন রুমে আমাদের আড্ডা বসতো প্রত্যেকে ৩টে করে লেখা আনতেই হতো বেশি আনলে সবার শেষে আবার বাকিগুলো পড়া হতো কখন প্রায় ৩২ জন কবি সেখানে নিয়মিত/ অনিয়মিত ভাবে আসতেন এই আড্ডার মুখপত্র হিসেবে ' যখন যেমন' নামে পৃষ্টার কাগজ বেরোয় মাসে মাসে আমরা কবিতা বা সাহিত্য নিয়ে প্রচারও করতাম রিক্সায় মাইক লাগিয়ে বিভিন্ন বক্তব্য রাখা হতো, স্লোগান দেয়া হতো ছেলেমানুষী মনে হয় এখন, কিন্তু আমরা করেছি 'বোঝার জন্য হাজার আছেন, যিনি লেখার তিনিই  লেখেন' ইত্যাদি এরপর আমি আর বিকাশ দেবরায় মিলে 'গাণ্ডীব' নামে কাগজ করি এটা করতে গিয়ে আর্থিক অনটনেও পড়তে হয় ১৯৭৭ সালে সোনিক-এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ি সাহিত্য আর গান বাজনা চলতে থাকে

 

১০।  সে সময় বোধহয় প্রদীপ চৌধুরী’ও ছিলেন ধর্মনগর ?

 

 সেলিম মুস্তাফাঃ না, প্রদীপ চৌধুরী  ১৯৭৮ সালে এখানে বদলি হয়ে আসেন আমরা দেখলাম আমাদের চিন্তা ভাবনার সঙ্গে তাদের চিন্তা ভাবনা মিলে যায় আমাদের চিন্তা ভাবনা স্বতোৎসারিত কোন পূর্ব পাঠ ছিল না  প্রদীপও আগরতলা থেকে আমাদের নাম শুনে এসেছেন, পরিচয় হল আমি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি আলোচনায় নতুনের খোঁজ পেলাম প্রদীপ সব সময় জীবন নিয়ে কথা বলেন, কবিতা বা কোন লেখা নিয়ে নয় যা বলেন জীবনের সঙ্গে তুলনা করে, ভবিষ্যতের সঙ্গে সম্ভাব্য তুলনা করে কথা বলেন কিছুই অস্বীকার করেন না জীবন যে রকম, লেখাও সেরকম তবে শব্দ সম্পর্কে অত্যন্ত স্বাভাবিকতা বজায় রাখতে বিশ্বাসী আমরা আসলে আরোপিত শব্দ বসাই কবিতা লিখতে গেলেই শব্দের স্বাভাবিকতা আমরা বর্জন করে ফেলি স্থান কাল পাত্র ভেদে  অত্যন্ত  স্বাভাবিক  শব্দটি চয়ন করা আসলেই খুব কঠিন পরিষ্কার দৃষ্টিভঙ্গি না থাকলেই আরোপিত শব্দ এসে যায়, আমরা টের পাই না প্রদীপের ভাষা তাই খুব সরল কিন্তু স্বাভাবিকতা নিয়ে অত্যন্ত ঝকঝকে  তিনি বছর এখানে ছিলেন আমার কবিতার একটি শব্দও পাল্টাতে বলেন নি কখনো কিন্তু আমার নজরের কুয়াশা কাটিয়ে দিতেন একটি বা দুটি কথায় আমার বিশ্বাস জীবন সম্পর্কে তাঁর নিজের ধারণা অত্যন্ত পরিষ্কার থাকাতে এটা সম্ভব হতো জীবন সম্পর্কে সত্য উপলব্ধিটাই একান্ত নিজের ভাষায় লিখে ফেললে একটা লেখা হয়ে যায়, কোন মশলার প্রয়োজন পড়ে না আমার লেখার কখন প্রশংসা করেননি, শুধু যেদিন ধর্মনগর ছেড়ে চলে যান, সেদিন বাসে ওঠার সময়, বাসের পা দানিতে এক পা রেখে মুখ ঘুরিয়ে বললেন-‘ লিখে যান, আপনার

হবে

এবার একটু আগের কথা বলি কৈলাসহর রামকৃষ্ণ মহাবিদ্যালয়ে আমাকে ভর্তি করে দিল আমার দিদি  দিদি তখন চাকুরি করতো এই দিদি আমাদের বাড়ির মূল গায়িকা পরে এক গায়ক সঙ্গীত শিক্ষকের সঙ্গেই তার বিয়ে  হয় দিদি সাকাইবাড়ি স্কুলে চাকুরি করার সময় আমার জন্য স্কুল থাকে গল্পের বই নিয়ে আসতো  বিশ্বসাহিত্যের কিশোর সিরিজ- পিরামিড সিরিজ। আমি সব পড়ে ফেলেছি পিরামিড সিরিজ থেকেই আমার প্রথম ছদ্মনাম রেখেছিলাম- পিরামিড, যা পীযূষ রাউত পছন্দ না করায় আমার কোন লেখা তখন ছাপেননি দীপক দেবরা- জানতো এই নাম ফলে লেখাগুলো কেমন হচ্ছে বুঝতে পারতাম না। পরিচিত লোকের লেখার ওপর কেউ সঠিক মন্তব্য করে না কলেজে ভর্তি হবার পর কলেজ লাইব্রেরীতে একদিন দেখলাম 'জাগরণ' কাগজে ছোটদের সাহিত্যের পাতা। পরে দেখলাম বড়দের জন্যও আছে, প্রতি বুধবারে। প্রথমে ছোটদের বিভাগে পাঠাতে শুরু করলাম ছাপা হতো ছড়া যোগাযোগ হল সেটা কিন্তু ১৯৭২-৭৩ সাল। বা ১৯৭৪- হতে পারে, সঠিক মনে নেই। তখন ধীরে  ধীরে এত লেখা পাঠাতে শুরু করলাম যে ওরা (মানস পাল,নকুল রায়) আমার জন্য একটা আলাদা ফাইল তৈরি করেছিলো আমার মিনি একটা গল্প বড়দের বিভাগে প্রথম ছাপা হয়। সেটার নাম ছিল-ত্রাস সেদিন আমাকে আর পায় কে সেদিনের আনন্দ আজ আর নেই। এর পর আরো গল্প লিখেছি।  একদিন নকুল রায়ের চিঠি পেলাম- আপনি একটা ভ্রমণ কাহিনি লিখুন। আমার ভ্রমণ তো তখন মাত্র ধর্মনগর থেকে কৈলাসহর প্রতি সপ্তাহে যাওয়া আসা করি তাই লিখে পাঠিয়ে দিলাম। ছাপা হল। এরপর চিঠি এলো, আপনার কবিতা হবে কবিতা লিখুন সেই শুরু ওরাই আমার প্রথম গুরু

 

এর পর আমি আরো দুটো গল্প লিখি যা দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত হয়। আমার সব গল্পই ছিল মনোলগ মিনি গল্প পীযূষ দা ফেরত দিলেন ছদ্ম নামের কারণে কৈলাসহর ফিরে গিয়ে নিজের নাম পাল্টালাম সেলিম মুস্তাফা দৈনিক সংবাদ একই দিনে ছাপলো দুটো গল্প হেডিং ছিল- সেলিম মুস্তাফার দুটি গল্প। একটা গল্পের নাম মনে আছে- বাবার মত লোকটাওরা আমাকে তো চিনতোও না। এর পর মানস ' সৈকত' বের করতে শুরু করে টেলিপ্রিন্টার নিউজ শীটের এক দিক সাদা থাকে, লম্বা রোল। ওটাকে কেটে কেটে - সাইজ করে সাদা পৃষ্ঠায় পয়েন্ট টাইপে কবিতার কাগজ। সেটা জাগরণের হকার আমার কাছে পৌঁছে দিতো। সেখানে সেলিম মুস্তাফা নাম দেখতে দেখতে একদিন দীপক, কিশোররা আবিষ্কার করে ফেললো আমাকে যাই হোক এরকম চলতে লাগলো কিন্তু আমি তো বেকার বাবা মারা যান ১৯৭৮ সালে প্লুরিসি-তে। এটা ক্ষয় রোগের পূর্বাবস্থা আমাকে বেকার অবস্থায় আমার বন্ধুরা খুব সাহায্য করেছে। রবি, সন্তু, বিকাশ, সুদীপ কল্যাণ শ্যামল, আরো কতজন। এমন কি রবি আমাকে লেখার জন্য কাগজও দিয়ে দিতো বিড়ি খেতাম, তা- সন্তু কিনে দিতো সন্তু আমার স্যান্ডেলে পিন- মারিয়ে দিতো তার বন্ধুর মত এক মুচির দোকানে তার নাম অশোক ঋষিদাস (বা রবিদাস- হতে পারে) সে এখনো আছে কংগ্রেস ভবনের সামনে। আমি এখনো যাই তার দোকানে মাঝে মাঝে, কাজ না থাকলেও যাই। সে আমারো বন্ধু এখনো। তখন পিন মারতে দশ পয়সা লাগতো। সেটাও বাকিতে এসব আমি জীবনে কখনো ভুলতে পারবো না বাবা মারা যাবার কারণ খাদ্যাভাব অভ্যস্থ খাবার সহসা কমে গেলে ক্ষয় রোগ হয়। আমার বড় ভাই সেটা বুঝলেন না। আউট অব সাইট আউট অব মাইণ্ড, একটা কথা আছে তাই হয়েছে বড় ভাইকে আমি সারা জীবনে / বার দেখেছি মাত্র আসামে নগাঁও-এর সালানা চা-বাগানে থাকতেন। দুবার আমি গিয়েছি মা- সঙ্গে। একবার ১৯৬৪-এ। ওখানে গিয়েই রেডিওতে শুনলাম জহরলাল নেহেরু মারা গেছেন এর পরের বছর সম্ভবত ধর্মনগরে রেল আসে। তখন রেলে ডাকাতি হত বাতি নিবিয়ে, আসাম এলাকায়। কদিন আগেও হয়েছে শুনেছি তবে মনে হয় এই গ্যাং পুলিশ ধরে ফেলেছে

আমার প্রকৃত বন্ধুরা সব আমার জুনিয়র তাদের মধ্যে অশোক সাহাও আছে বাজারে এদের বড় হোল্‌সেল্‌ দোকান আছে সে খুব ভালো মাউথ অর্গ্যান বাজায়

আমার যে ভাই খুন হল , সে- বড় ভাই-এর খুব পছন্দের ছিল না আমি আর আমার ছোটদিদি (আমার থেকে বছর পাঁচেকের বড়) দুজনে মিলে যুক্তি করে বহুবার বড় ভাইকে লিখেছি জায়গা কিছু বিক্রি করে দিয়ে বাবার চিকিৎসার জন্য টাকা যোগাড় করে দিতে কোন লাভ হয়নি। বলেন- ছোট মুখে বড় কথা ভাল নয়

আমার মনে হয়  ভারতে আসা সব পূর্ববঙ্গীয় পরিবারের এই একই অবস্থা জমি জায়গা খুবই বাজে জিনিষ কেউ কিছু নিয়ে যেতে পারে না, তবু এটা নিয়েই যত অশান্তি ভাই গেল বাবা গেলেন দুই দিদির বিয়ে হয়ে গেল সম্পত্তি ভূতে খেলো  আমি কিছুই নেব না তখনি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম

আমার পড়াশোনা আর হলো না যেদিন রিস্ক পরীক্ষা ছিল, সেদিন অনুপ ভট্টাচার্য আর দুলাল ঘোষের সঙ্গে সারাদিন ধর্মনগর ঘুরে বেরিয়েছি সাহিত্যের ব্যাপারে রুটিন ভুল ছিল সন্ধ্যার সময় জানলাম পরীক্ষা শেষ খুব কষ্ট হয়েছিলো একটা অনুশোচনা এখনো কাজ করে যদি স্নাতক হতাম, আমার জীবন অন্যরকম হতো তবে চাকুরী ভালোই করেছি যারা আমার থেকে বেশি বিদ্যান, তারাও আমার সঙ্গেই প্রমোশন পেয়েছেন বিধিলিপি কারণ ২০ বছর প্রমোশন এবং চাকুরী বন্ধ ছিলো কিন্তু কিছু কিছু মানুষ আমাকে অন্য নজরে দেখেছে পড়াশোনা কম থাকার কারণে। এটা ওদের রোগ আমার নয় ওরা বিদ্যান, কিন্তু বিদ্যার দান ওদের আত্মা হয়ত গ্রহণ করতে পারেনি আমি সেই কলেজীয় বিদ্যাকে অবশ্য কখনোই পছন্দ করিনি। আমার প্রতিজ্ঞা ছিল পৈতৃক ধন নেব না, বাড়ি করব নিজের টাকায় করেছি আমার বড় ভাই বলেছিলেন আমার সাহিত্য করা হবে না। কোন এক গুরু-মা তাকে বলেছিলেন কিন্তু একটা অবাক কাণ্ড, বড় ভাই আমাকে রাইটিং প্যাড ছাপিয়ে দিয়েছিলেন একবার হয়ত সেটা আমাকে কোনো কারণে খুশি করার জন্য আমার ৩টা নামে ৩টে প্যাড ছাপিয়ে দিয়েছিলেন

 

 

১১। আপনাদের জীবনে ‘মেজো ভাই’ এর  মৃত্যু বড় রকমের একটা  বিপর্যয় নিয়ে আসে সে তুলনায় আপনার কবিতায় তার প্রসঙ্গ দু’একবার দেখা গেছে আপনি কি সচেতনভাবে সেটা এড়িয়ে গেছেন ?  সে রকমভাবে তাঁর প্রসঙ্গ কবিতায় আসেনি ?

 

সেলিম মুস্তাফাঃ হ্যাঁ, বাহান্ন তাসে পর-এর ব্যাক পেজ- কিছু কথা আছে ' আমার প্রিয়ার শরীরে ছিল পানিফল' কবিতার শেষ অংশেও কিছু আছে এছাড়া আরো বিভিন্ন কবিতায় আছে এই বিহবলতা কাটাতে আমার অনেক সময় গেছে এই যন্ত্রণা আমার ব্যবহারিক জীবনেও মারাত্মকভাবে চলে এসেছিল কাঞ্চনপুরে থাকতে নেশা করলেই ওগুলো চলে আসত, বা কেউ প্রসঙ্গে কিছু বললেই অসুবিধা হয়ে যেত আমার কলিগরা এব্যাপারে আমাকে আগলে আগলে রাখতেন ব্যাপারে নিষেধ করা সত্ত্বেও, আমার বা আমার ভাইয়ের সহমর্মী একজন এই প্রসঙ্গ তোলাতে আমার এক কলিগের সঙ্গে তার হাতাহাতি পর্যন্ত হয়ে যায় আমি ক্রমশ এই বেদনা থেকে উত্তরণ চেয়ে চেয়ে আজ এই অবস্থায় এসেছি এটা শুধু আমার ক্ষেত্রে ছিল না, আমার বোনদের মধ্যেও ভয়ংকরভাবে ছিল তারাও অনেক কষ্টে এর থেকে মুক্তি নিয়েছেন আমাদের গোটা বংশেই এটা একটা মস্ত ধাক্কা ছিল খুনটা ছিল,  বলা যায় ধর্মনগরের প্রথম খুন সারা শহর যেন মিছিল করে আমাদের বাড়িতে চলে যায় বাড়ির সামনের পুরো বেড়া সবাই মিলে খুলে দিয়েছিলো বরেন রায়, তারাবিনোদ চক্রবর্তীরা ( যাদের পরে আর দেখিনিছিলেন সারা শহরে মিছিল হয় ছবি তোলা হয় কিছুই আনা হয় নি পরে তো কাউকেই পাওয়া যায়নি খুনের সময় তোমাদের গীটারিস্ট অভিজি কর্মকারের কাকা ( খুব সম্ভবত) অধীর কর্মকারকে পাওয়া যায় নি অথচ আগেও ছিল, পরেও ছিল আমাদের তো তাকেও সন্দেহ হয় তবে সে জানতো পরে ভয় পেয়ে যায় বীরবল্লভ সাহা তখন কদমতলা স্কুলের হেডমাস্টার ছিলেন আমার ভাইকে  তার ডান হাত বলা হতো তারা ছিলেন ATTA-All Tripura Teacher's Association ভুক্ত পরে উনি বদলি হয়ে যান আমি চাকুরীর জন্য তার কাছেও গিয়েছি কোন লাভ হয়নি নৃপেন চক্রবর্তীর কাছে গিয়েছি, কোন লাভ হয়নি দশরথ দেবের কাছে গিয়েছি কোন লাভ হয়নি ভাইয়ের মৃত্যুর প্রভাব আমার এক দিদির (বর্তমানে কৈলাসহর, এই দিদিই তখন চাকুরী করতো ভাই বলেছিল তাকে- তুই সংসার দেখবি, আমি তপনকে পড়াব আমার ডাক্তারী পড়ার কথা চলছিল হাইয়ার সেকেণ্ডারীর পরে) ওপর এমন পড়েছিল যে ভাইয়ের সমস্ত ছবি সরিয়ে লুকিয়ে ফেলা হয় নইলে দিদি সারাক্ষণ ছবির সামনে দাঁড়িয়ে থাকত কিছুদিন পর এই দিদিরও বিয়ে দেয়া হল এর ছোটজনের বিয়ে আগে হয় দিদি আর বড় ভাইয়ের সাহায্যে বিয়ে হয়ে যায় কোনরকমে এক বোন বাকি থাকে আমি চাকুরী পাবার পর তার বিয়ে দেয়া হয় ঋণ করে দিদিদের বিয়ে হয়ে গেলেও আমরা সাহায্য পেতাম কিন্তু তাতে ভাল করে চলতো না আমি সব সময়ই ভাত পেয়েছি , খেয়েছি কিন্তু মা বাবা আর দিদি হয়তো রুটি খেয়েছেন অথচ বাবা তখনো ১৬ কানি জমির মালিকএক কণাও বিক্রি করতে পারছেন না জমি যে বড় ভাইয়ের নামে ! আমি রেশনের চাল খাইনি, তারা খেয়েছেন আমার জন্য কিলো হলেও ভাল চাল রাখা হত বাবার স্নেহ আমি লেখালেখি করি জেনে বাবা রোজ একটা মোমবাতি আমার টেবিলে রেখে দিতেন আমি সোনিক মিউজিক ইন্সটিটিউট-এর কাজ সেরে হয়ত রাত এগারোটা বারোটায় বাড়ি আসতাম সবাই মেনে নিয়েছেন সেটা আগরতলার দিদি একটা টেবিল ল্যাম্প কিনে দিয়েছিল বাবার শ্রাদ্ধের সময় বাড়িতে প্রথম কারেণ্ট আসে রাতে ভাত ঢাকা থাকত সবাই ঘুমে, দরজা ভেতর থেকে একটা চেয়ার দিয়ে আটকানো থাকতো আমার প্রিয় একটা কুকুর ছিল কুকুরী নাম টমি শুধু সেটাই জেগে থাকতো আমি রাত ১২টা ১টাপর্যন্ত লিখতাম

টমি আমাকে বাড়ির প্রবেশ পথ থেকে এসে নিয়ে যেত। কি করে যেন টের পেয়ে যেত যে আমি এসে গেছি একদিন দিদি ভুলে তাকে ভাত দেয়নি সবাই ঘুমিয়ে গেছে। অনেক্ষণ চুপ থাকার পর যখন বুঝতে পারলো যে সবাই আসলে ঘুমিয়ে গেছে, তখন বাইরে থেকে দরজার চৌকাটের শেকল ধরে শব্দ করে আমাদের ডেকে তোলে। এরপর তাকে ভাত দেয়া হয় ১০ বছর বেঁচে ছিল সব সময় বারান্দায় ঘুমাতো একটা চেয়ারের ওপর আমি কৈলাসহর থেকে এক দিন এসে শুনি টমি নেই। মারা গেছে মরার আগে বারান্দায় যে চেয়ারে সে ঘুমাতো সেটা থেকে নেমে এসে উঠোনে একটা লিচু গাছে তলায় শুয়ে পড়ে এবং মারা যায় খুব কষ্ট পেয়েছিলাম একদম নিখুঁত কালো রঙের ছিল

 

 

 

 

 

১২।  আপনার পরবর্তী জীবন সম্পর্কে কিছু বলুন ?

 

সেলিম মুস্তাফাঃ এর পর 'বাসুদেব প্রেস'- আমি কাজ নিই এই প্রেসটা এখন নেই। রয়েল লাইব্রেরী- ছিল। রয়েল লাইব্রেরী -তে আমার ভাইয়ের নামে একাউণ্ট ছিল সেটা আমার জন্যই ভাই বলতে যে ভাই খুন হলতাঁর নাম ছিল প্রত্যেশ চন্দ্র দাশ বিশ্বাস (ডাক নাম নিখিল) আমার বই খাতা কলম কাগজ, যা প্রয়োজন হতো, সেখান থেকে নিয়ে আসতাম। দাদামণি পরে টাকা দিতো যখন 'গাণ্ডীব' করি, সেখান থেকেই ছাপাতামমালিক, জগন্ময় দে- বড় ভাই, চিন্ময় দে তিনিও আমাকে খুব স্নেহ করতেন দাদামণি মারা যাবার পর আমার জন্য তাঁরাও সমানভাবে চিন্তিত থাকতেন দাদামণি কে সবাই ভাল বাসতেন এবং সমীহ করতেন। তাই সকলেই আমাকেও অন্য চোখে দেখতেন তখন বাসুদেব প্রেসে সমস্ত পরীক্ষার প্রশ্ন জমা হত সেখান থেকে আরো ১২টা প্রেসে বিতরণ করা হত ছাপার জন্য ছাপা হয়ে এলে আমি সব প্রশ্নের প্রুফ দেখে দিতাম। কোন ভুল এলাউ করা হত না ভুল থাকলে ওরা আবার ছেপে দিতেন আমার চোখের ওপর ভয়ংকর চাপ পড়লো এক সময় ডান চোখ ফুলেও গেলো। মনে পড়ে আমার অবস্থা দেখে সুদীপ ভট্টাচার্য (এখন নগর পঞ্চায়েতে কাজ করে) আমাকে একটা সান গ্লাস কিনে দেয় টাকা দিয়ে। সেটা ১৯৮০ সালের মাঝামাঝি হবে মাস কাজ করেছিলাম মাসে ৩০০ টাকা এরপর চাকুরি হয়ে গেল কাঞ্চনপুর শুনেই মা কান্নাকাটি শুরু করে দিলেন অফার- প্রথমে ধর্মনগর- ছিল, ওটা কেটে কাঞ্চনপুর করা ছিল। ভালই হল সে এক অভিজ্ঞতা টি,আর,টি,সি, বাসে গিয়ে পায়ে হেঁটে দেও নদী পেরিয়ে কাঞ্চনপুর  সামনে তাকালেই জম্পুই   কাঞ্চনপুর আর জম্পুই আমাকে পালটে দিল সারাজীবনের জন্য। এর পর দিদির বিয়ে কিছু ঋণ নিলাম বড় দুই দিদি, যাদের বিয়ে হয়ে গিয়েছে আগেই, তারা সাহায্য করল তাদের সাহায্যেই আমাদের এতদিন চলছিল এবার শুধু আমি আর মা মাকে আসাম পাঠাতে হল বড় ভাইয়ের কাছে এখানে এই বয়সে একা থাকা সম্ভব নয় কিন্তু মায়ের কোন ভয় ছিল না মা খুব- সাহসিনী ছিলেন। আমার সকল সাহস স্বাধীনতা উৎসাহ আর কর্মের মূল আমার মা।

কাঞ্চনপুর যাবার কিছুদিন পর আমার কলিগ দেবব্রত দেব (বর্তমানমুখাবয়বএর সম্পাদক এবং খ্যাতনামা গল্পকার), সত্যেন্দ্র দেব নাথ (কাঞ্চনপুরের হোমিও ডাক্তার), আমার অন্যান্য কলিগ এবং সেখানকার স্থানীয় কিছু ছেলেদের সাথে যোগাযোগ গড়ে ওঠে সাহিত্যের ব্যাপারে এবং শেষ পর্যন্ত স্টেনসিল কেটে সাহিত্য পত্রিকা করার উদ্যোগ নিই আমরা নাম ' এই বনভূমি' কয়েক সংখ্যা বেরোনোর পর প্রেসে ছেপে বই আকারে কবিতার কাগজ করি- 'মন্বন্তর' , সবই খুব সাড়া ফেলে ওখানে অনুপদা আর দুলালদা 'মন্বন্তর' নামে একটা কাগজ করার কথা ছিলো, কিন্তু করতে পারেনি, তাই ওটার তৈরি করা ব্লকটা আমি নিয়ে আসি এর পর একবার পূজার ছুটিতে বাড়ি যাবার সময় দেবুদা আর আমি অফিস শেষ করে বিকেলেই মাছমারা চলে আসি গৌতম চাকমার বাড়িতে বললাম দেয়াল পত্রিকা করবো, এক্ষুণি লেখা যোগাড় কর গৌতম বেরিয়ে গেল আর এলো রাত ৯টার সময় সারা গ্রাম ঘুরেঘুরে লেখা নিয়ে এসেছে আমরা কাগজ কলম সব নিয়েই এসেছিলাম নাম ঠিক হলো-'মনোবীজ' সারা রাত লাগিয়ে পুরো আর্ট সীট ভর্তি করা হলো লিখলাম আমি গ্রাফিক্স করলো দেবুদা ভোরবেলা সমীরণ বড়ুয়ার চা মিস্টির দোকান 'নীলাচল' (খুব সম্ভবত)- টাঙিয়ে দিয়ে আমরা চলে আসি আমি ধর্মনগর, দেবুদা আগরতলা পেচারথল থেকে দুই পথে দুজন চলে গেলাম এর আগে কাঞ্চনপুরেও আমরা দেয়াল পত্রিকা করেছি বড়দের জন্য দুটো, ছোটোদের জন্য একটা ছোটোদেরটা পরে সেখানকার মর্নিং স্কুলে নিয়ে যায় কারণ ওটা খুবই সুন্দর হয়ে ছিলো সেটা ১৯৮২ সাল কাঞ্চনপুরে আমার প্রবেশ ২৩.১১.১৯৮০সন আমি কাজে যোগ দিই ২৪.১১.১৯৮০, শনিবার, পরের দিন বেরিয়ে আসি ডিসেম্বর ১৯৮৩ সালে 'মন্বন্তর' প্রকাশের জন্য আমাদের সম্বর্ধনাও দেয়া হয় কারণ সেখান থেকে সেই প্রথম ছাপার অক্ষরে কিছু প্রকাশ পেলো

এর পর বদলী সোজা কৈলাসহর টীলাবাজার সেখানে হিমাদ্রিদা রয়েছে পরিচয় হলো বিশ্বজিতের সঙ্গে  বেরোল '' নাম নিয়ে টস্‌ হল কবি ডাক্তার দেবাশিস তরফদারের ঘরে কিন্তু সে কাগজটাকে ধরে রাখতে পারেনি বিবেকানন্দের বাণী দিয়ে- 'আমার কিছু বলিবার আছে, উহা আমি নিজের ভাবে বলিব' টুকুই ছিল প্রথম সম্পাদকীয় এর পর সম্ভবত জুলাই ১৯৮৪তে পানিসাগর তৈরি হল 'পানিসাগর সাহিত্য চক্র' প্রতি সপ্তাহে পাঠচক্র তৈরি হল ' পানিসাগর শিল্পী সমাজ'- অনার্য শুরু হল শুরু হল 'কিরাত', বিনয় দেবনাথের(সম্প্রতি প্রয়াত)সম্পাদনায় অনার্যের একটা ক্রোড়পত্র- জেরক্স হয়ে বেরোল কিছুদিনবীজাণুনামে নানান প্রিণ্টেড লেখা আঁঠা দিয়ে পেস্ট করে জেরক্স - কাগজে পানিসাগর থেকে ১৯৮৮ ডিসেম্বর আবার বদলী আগরতলায় সেখানে অরুণ বণিক আবার কাগজ এবার প্রেসের ছাট্ কাগজে কভার ছাপতে গেলে / ইঞ্চি পাশ-এর লম্বা সীট কেটে অনেক সময় ফেলে দিতে হয় সেগুলোই ছোট করে কেটে কবিতার কাগজ হত রতু (শুভব্রত দেব, দেবুদার ছোটভাই বর্তমান অক্ষর পাব্লিকেশনের কর্ণধার) যত্ন করে ছেপে দিতো অরুণকে সবাই খুব সম্মান করতো বিশ্বসাহিত্য তাঁর খুব দখলে ছিল অসাধারণ ইংরাজী জ্ঞান কাগজের নাম ঠিক করলাম 'গেরিলা' ছোট ছোট সম্পাদকীয় লিখতো অরুণ অত্যন্ত ঝরঝরে সহজ গদ্য কয়েকটা আমরা অনার্যে পুনর্মুদ্রিত করেছি মনেপ্রাণে বামপন্থী কংগ্রেসীরা ওকে মেরে ফেলল গলা টিপে এরপরগেরিলাআর বের হয়নি অনার্য কিন্তু চলতেই থাকলো আমি আগরতলা থেকেও ছেপে দিয়েছি এর পরের খবর তো তুমি জানোই

 

 

১৩ মেয়েমানুষের নাম অরুন্ধতি বলে ভালোবাসার নাম হল গোলাপ,

গোলাপ কাগুজে প্রতিভায় ফুটে  উঠল তৎক্ষনাৎ   অরুন্ধতির বুকে এবং

শহর জুড়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা , পাটের গুদামে আগুণ – সমান

ম্যাজিক আমার অন্ত্র থেকে অন্তরময়, তবুও সংবাদ – শহরে

মা আনন্দময়ী এসেছেন, বিপ্লবীরা সকলেই তাঁর শরণাগত।

 

বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক! এরকম বিপ্লব আরো দীর্ঘজীবী হোক –

তা না হলে কোনও প্রতিবিপ্লব আর আসন্ন হবে না ! আমি

সম্পদহীন আদিবাসী – শরীরে আমার শরীর ছাড়া কিছু নেই

কেবলই খাদ্য  চাই আমার ! আমি কাকে কি বলবো ? আদিম

বিপ্লব ছাড়া আর কি মুক্তি আছে কোনো ? তাকে

কী বলে ডাকব ? গোলাপ ?

 

আমি রাত্রির ভিতর ঘুরে বেড়াচ্ছি ! জানি রাত অন্ধকার, শুধু

রাতের ভিতর কোনো কোলাহল নেই—আমি ইদানিং টের পাই,

মানুষের কাছ থেকে মানুষ উঠে চলে গেছে আরো দূরের দিকে, পথে

মরা বাঁশপাতা,ভাইয়ের পাশ থেকে বোন উঠে চলে গেছে এ পথেই,

আমাকে যে খুঁজতে বেরোবে তাকেও এ পথেই আসতে হবে—চলে

যেতে হবে গভীর জঙ্গলে কোনো আদিবাসী গ্রামে, যেখানে

বিপুল সম্ভার যার নাই তাকে আমি স্পর্শ করতে চাই!

 

মেয়েমানুষকে ভালো না বাসলে সে আমাকে নাস্তিক বলে, ভালবাসলে

বলে কাম-ই আমার অভিপ্রেত ছিল,সে সফল কণ্ঠে ঘোষণা করে

মানুষ মরণশীল এবং মানবিকতাও ! ঠিক একইভাবে আজ একজন

তরুণ বিপ্লবী তাঁর পিতাকে বলে কামুক, মাকে বলে নষ্টফুল,

প্রতিবেশীকে বলে শ্রেণিশত্রু, শুধু নিজেকে

‘ধর্ষিত আত্মার করুণ সংগীত’ বলে

 

অরুন্ধতী  পাশের বাড়িতে গোলাপের খবর নিতে যায় আমি

কাকে কী বলব ? কে এদিকের, কে ওদিকের ? আমি আমাকে

কী বলব ? তাকে কী বলে ডাকবো আমি ? অরুন্ধতী ?

 

কিন্তু তা কী করে সম্ভব ? আমি জানি

তাঁর কবরে আজও গোলাপ ফোটেনি, গোলাপ যে

এখনো জানে না তাকে কোথায় গিয়ে ফুটে থাকতে হবে।’(সম্পদহীন আদিবাসী ও গোলাপ)

 

আমরা যারা আপনার কবিতার নিবিষ্ট পাঠক  তারা মোটামুটি  সবাই জানি,  এই কবিতার জন্ম কাঞ্চনপুর’এর পটভূমিকে কেন্দ্র করে আপনার নিজের  কথাতেও আপনি বহুবার উল্লেখ করেছেন,  ‘কাঞ্চনপুর’  আপনার  কাব্য-মননে আলাদা একটা মাত্রা যোগ করেছে আপনার তৎকালীন কবিতা পড়লেও তা অনুভূত হয়। যেমন এই কবিতার ছত্রে ছত্রে। ‘সম্পদহীন আদিবাসী ও গোলাপ’ এই কবিতার প্রক্ষাপট জনিত ইতিহাস সম্পর্কে কিছু জানতে চাই, যাপন থেকে কবিতা অব্দি ...    

 

সেলিম মুস্তাফাঃ কাঞ্চনপুর আমার জীবনের একটা বিশাল অধ্যায় প্রথম বৃষ্টির জলের মত সেখানে মূল চরিত্রগুলোর সঙ্গে মিশে ছিল বাইরের লোকজন বহিরাগত কর্মচারীরা সেখানে P W D, Bridge বানানোর কোম্পানী, শিক্ষক শ্রেণী, ব্যাঙ্ক কর্মচারী ব্লক কর্মচারী এমনই প্রায় সব দপ্তর, সেই সঙ্গে সন্ধ্যার পর টের পেতাম মেয়েমানুষ চালাচালি হচ্ছে খবর এমনি ভেসে বেড়াতো বাতাসে- কার ঘর থেকে কার ঘরে কে যাচ্ছে কোন বিকার ছিল না কারো অনেকটাই খুব স্বাভাবিক ঘটনা যেন কারণ এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল মিজো কালচার অবিবাহিত অবস্থায় মা হলেও দোষণীয় ছিল না, তবে ফাইন দিতে হতো তবে জোর করে কিছু হতো না জোর করার প্রয়োজন হতো না পাহাড়ি হোক বাঙালি হোক, স্বল্প অপরাধ যেন সহনীয় ছিল সকলের কাছেই পয়সার বিনিময়ে বিপদমুক্তি ঘটে যেতো কিন্তু বনেদী সম্ভ্রান্ত পরিবারও ছিল অনেক বয়স্ক নীতিবান কর্মচারীও ছিলেন অনেক তারা দূরে দূরেই থাকতেন আমরা যা দেখতে চাইতাম, তা আমরা সহজেই দেখতে পারতাম সেটা ছিল ১৯৮০- জুনের দাঙ্গার ঠিক পরবর্তী সময় সেখানে কিন্তু এক কণাও দাঙ্গা হয়নি খুবই অবাক করার মত ঘটনা আদিবাসী- বাঙালি সম্প্রীতি ব্যাপারটা ছিল অতি স্বাভাবিক ব্যাপার এটাই ছিল আমার কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ব্যাপার সন্ধ্যার পরের ঘটনাগুলো ছাড়াও সুন্দর সাদা প্রাপ্তির অনেক মিথষ্ক্রিয়া ছিল যার কোন প্রতিদান কারোর পক্ষে দেয়া সম্ভব নয় বিশেষ করে দেবুদা আর আমার কাছে ধরা দেয় এক অন্য জগত, যার দেখা পাওয়া শহরে একেবারেই সম্ভব নয় আমরা দিই নি কিছুই, শুধু ধরাবাঁধা ডিউটি করে গেছি মানুষের সঙ্গে মিশেছি এই মেলামেশাও আমাদের ডিউটির মধ্যেই ছিল বলতে হয় এর জন্য আমাদের ম্যানেজার তপনময় চন্দ -এর প্রভাব ছিল বলব এই সব interaction থেকেই লেখাগুলো এসেছে আমাদের নিজেদের জীবনের ভেতর বাহির সব দেখে ফেললাম ওখানে গিয়ে একটু দিলে, পাওয়া যায় তার  একশ গুণ কিন্তু পাওয়াটা যখন দাবি হয়ে যায়, তখনই সেটা অত্যাচার হয়ে ওঠে  ওখানে গিয়ে মনে হয়েছে মানুষের জীবন শুধু তার নিজের জন্য কখনো নয়

 

 ১৪। “সম্পদহীন আদিবাসী – শরীরে আমার শরীর ছাড়া কিছু নেই

কেবলই খাদ্য  চাই আমার” – এখানে শরীর ও খাদ্য কি কোন সংকটের দিকে ইঙ্গিত করছে। এই লাইনের কি কোন প্রেক্ষাপটগত ইতিহাস আছে ?

 

সেলিম মুস্তাফাঃ  তখন কী ভেবে কোন অনুষঙ্গে কি লিখেছিলেম এখন বলা সঠিক নাও হতে পারে  শরীরের খাদ্য দুটোই মাত্র-- ভাত আর নারী শরীর এখানে গোটা অস্তিত্বকেই সিম্বলাইজ করছে কী চাই জানিনা, কিন্তু চাই সৃষ্টির প্রথম আকুলতা বোধ হয় এটাই  প্রকৃত লেখার জন্য ক্রমশ গড়ে ওঠা Urge নারী মূলত সমস্ত অদৃশ্য ক্ষুধারই প্রতীক ।

আদিবাসী সমাজ-- বা বলতে পারো কাঞ্চনপুরকে দেখে, কাঞ্চনপুর যদি আমার জীবন দেখার প্রথম প্রতীক হয়ে থাকে, তবে সেটা আমার অকল্পনীয় দেখা, বিস্ময়ে দেখা, কৌতুহলে দেখা, আগ্রহে দেখা, এক রিয়ালিটিকে দেখা--জীবনের ভেতরে ভেতরে বয়ে চলা আরেক জীবন, বাইরের জীবনের ভেতরে চলা যে মেশিনঘর--যা বাইরের জীবনকে রসদ জোগাচ্ছে, জেনারেট করছে, তার মুখোমুখি হওয়া । বিনিময় ছাড়া যে সৎ বা অসৎ, মহান বা সাধারণ, সুখী বা অসুখী কোন জীবনই চলে না, তার সরাসরি মুখোমুখি হলাম সেখানে। আমার প্রথম, রিয়ালিটিকে ছোঁয়া ! আমার মনে হলো ভালবাসাও  বিনিময়-মাধ্যম । আমি অনেক পরে জেনেছি বলে অনেকে হয়তো হাসবেন । এই ইমোশনকে যথেষ্ট সম্মান জানিয়েই বলতে চাই, যা যতটুকু দেয়া যায়, তা ততটুকু পাওয়া যায়  কোন কোন আদিবাসী যদি যৌনতা দিয়ে কিছু আদায় করেও থাকেন, সেটা বিনিময়ের কড়ি হিসেবেই দিয়েছেন আবার কারো কারো যৌনতা লুণ্ঠিত হয়েছে, সেটা আলাদা ব্যাপার ওখানে অনুপজাতিরা বুঝেছিল, শরীর খুবই সস্তা বিষয়, আর বিশেষ সম্প্রদায়ের উপজাতিরা বুঝেছিল-- আরে, এরা তো দেখি শরীর পেলেই সন্তুষ্ট ! তাই শরীর দিতে কারো আপত্তি হয়নি বিশেষ, যদিও কিছুটা হলেও সংকোচ তো ছিলোই । এতে দোষ ছিল অবশ্যই, তবে প্রায়শ্চিত্তের বিধান ছিল । প্রকাশ্যে হলে, বা অননুমোদিত হলে অর্থদণ্ড তো ছিলোই যাক এসব মূল কথা হল যা আমরা যত ইমোশনালি মহান ভাবাদর্শ নিয়ে ভাবি, জীবনের কঠিন জ্যামিতিতে, তা ততটা মোটেই নয়। যে যেরকম ভাবে তাকে সেই পদ্ধতিতেই বশ করা হয়, ভোলানো হয় কাঞ্চনপুরকেও সেভাবেই ব্যবহার করা হয়েছে, হচ্ছে, অন্যান্য এই রকম এলাকার মতই । ঠিক এভাবেই রাজনীতিও আমাদের ভুলিয়ে রাখে কেউ অংক কষে এগোয়, কেউ আবেগে এগোয় । জাতি বা উপজাতির ব্যাপার আসলে নয়, আসল ব্যাপার ব্যবহারকারী আর ব্যবহৃতউপজাতিরা শুধু তিল কার্পাস ভুট্টা বা যৌবন দিয়েছে তা নয়, তারা তাদের সংস্কার, সংস্কৃতি ইতিহাস আর মিথ কাহিনিগুলোও দিয়েছে বিশ্বের বাজারে সামান্য বিনিময়ে ইমোশনালি ব্ল্যাকমেইল্ড হয়েছে লাগাতর । যারা নিয়েছে তারা পরজীবী হয়ত সংসার এভাবেই চলে লুন্ঠন করা হয়েছে কাঞ্চনপুর এমনই এক বাজার, যেখানে বাজারের ভেতরে সব সময় চলছে আরেক বাজার । নৃপেন চক্রবর্তীর সময়কালে চালু ফর্ম-১৬-র কন্ট্রাক্টরীর কাজ পেতে মিজো যুবতীদের অনেককেই হয়তো রাত কাটাতে হয়েছে বিশেষ কোন অফিসারের কোয়ার্টারে, এমনকি তার পিতার সম্মতিতেই কখনো এটা পারস্পরিক সম্মতিতেই হয়ত । তবু হয়েছে কেউ প্রেমের নাটকে ভুলিয়ে ভোগ করেছে যৌবন । এগুলো এখনও আছে, সর্বত্র । কিন্তু আমার কাছে তখন ছিল একেবারেই নতুন । এখন হয়ত বিষয় নয়। তখন ছিল বিষয় ।

 

 

১৫ রাতকে দু ভাগ করে ভালোবাসার দুই পা

দুদিকে নেমেছে, গভীর শিকড়ে

ফুটেছে একটি মাত্র রক্তজবা –

অদ্ভুত অচেনা প্রদাহে –

আমার পশু পুড়ে যায়

আমার প্রভু পুড়ে যায়

অপার আকাশ থেকে ঝরে পড়ে গুচ্ছ অন্ধকার !” (মিলন)

 

আমার প্রিয় কবিতার মধ্যে একটা এখানে প্রেম, প্রেমের উঠা-নামা, তাঁর শরীরী আলাপ, অশরীরী বিস্তার, তার শঙ্খলাগা মুহূর্তের অদ্ভুত অচেনা প্রদাহের  প্রবাহমানতা, ঈশ্বরিক অন্ধকারের ভিতরে যেভাবে গুলিয়ে গেল পশু ও প্রভু , এককথায় দারুণ আমার প্রশ্ন হল, আপনি এই কবিতার ভিত্তিতে আমাকে আপনার যৌন-দর্শন, কবিতায় তার মাত্রাবোধ বা রুচিবোধ, অর্থাৎ ‘পশু ও প্রভু’র একাকার হয়ে যাওয়া নিয়ে কিছু বলুন।   

 

সেলিম মুস্তাফাঃ  যৌনতা ছাড়া জীবনের কোন মানে আমি এখনো বুঝিনি যৌনতা হঠাৎ যদি উদয় হয়, সেটা হয়তো পাশবিক, প্রেমহীন আমার যৌনতা কিছুটা শোকাশ্রয়ীও বটে, হয়তো আমরা দার্শনিক নই, তাই সঠিক বলতে পারছি না নারী আমার কাছে প্রকৃতি কূল নেই কিনারা নেই এখানে শুধুই নিবেদন একজন নারীর চেয়ে একজন পুরুষ হাজার গুণ তুচ্ছ পুরুষ আসলে নারী দ্বারা ব্যবহৃত হয় কিন্তু, নারী ছদ্ম ব্যবহার করে  ব্যবহৃত  হচ্ছে  বলে , বা  ব্যবহৃত হতেও চায় পারস্পরিক নিবেদনই প্রকৃত যৌনতা যা  প্রেমের কাছে নিয়ে যায় হয়ত ঈশ্বরও নারীর কাছে আনত নয় কি ?

 

 

 

১৬ কবিতায় তার মাত্রাবোধ, রুচিবোধনিয়ে কিছু বললেন না ? মাত্রা নিয়েই তো যত-শত তর্ক, বিতর্ক ...  আপনার উক্ত কবিতায় পশু প্রভু এই প্রশ্ন টাও আপনি আনেছেন এই দুটো পরস্পর সম্পর্ক কিভাবে করলেন ?

 

সেলিম মুস্তাফাঃ মাত্রাবোধ তো থাকতেই হবে তবে সিচুয়েশন অনুযায়ী কবিতার আবেগই স্থির করে দেয় মাত্রাবোধ রুচিবোধের কারণে সহসা মিতাচার ঘটালে রচনা সচেতনতার কারণে মিথ্যাচারে পরিণত হবে রুচিবোধের বেড়াজালে পড়লে সঠিক রচনাটি লিখিত হবে না কখনোই সেটা অসত্য প্রকাশ হবে মনে এক জিনিষ আর লিখলাম আরেক জিনিষ, এমন হয়ে যাবে না ? কবিতাই স্থির করবে সব আমার কবিতায় পশু যেমন থাকছে না, প্রভুও থাকছে না অপার আকাশ থেকে ঝরে পড়া অন্ধকারই স্থান নিচ্ছে আমি বিশ্বাস করি যৌনতায় একটি শোকের স্থান আছে, পরস্পরের প্রতি সহানুভূতির আরেক আবেগ, যা হয়তো পশু আর প্রভুর মিশ্রণও হতে পারে--আনডিফাইন্ড ! দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে কান্না বা, কান্নার চেয়ে বেশি কিছু নিবেদন পশু একা থাকে না প্রভুও একা থাকে না। মানুষের মনন মানুষকে এখানে এনে দাঁড় করিয়েছে একজন সাধু এই জায়গাটা চেনে না, একজন লম্পটও চেনে না, কারণ তারা পশু আর প্রভু নিয়ে আলাদাভাবে ভিন্ন পথের যাত্রী

 

১৭রুচিবোধের বেড়াজাল’ বলতে আপনি কি বুঝাতে চাইছেন ?

 

সেলিম মুস্তাফাঃ তবে এটাও সত্য যে ‘মিতাচার’ আর ‘রুচিবোধ’ এই শব্দগুলো আসলে সামাজিক শব্দ । এগুলোর প্রকৃত কোন মাত্রা নেই । একটি রচনা-ই ঠিক করবে এর পরিমাণ । সাধারণ পাঠকের কাছে সেটা অস্বাভাবিক-ও মনে হতে পারে সহসা । ‘মিতাচার’ আর ‘রুচিবোধ’ আমাদের যেমন সংস্কার, তেমনি কুসংস্কারও বটে । এর পরিপ্রেক্ষিত ‘সমাজ’ নামের অদৃশ্য অনুশাসন—স্থবির মূল্যবোধ ।

রুচিবোধের ব্যাপারটা প্রত্যেকের ভিন্ন । সামাজিক ন্যায় অন্যায়বোধ নিয়ে আমাদের প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু পূর্বধারণা রয়েছে, আমরা যে যে বন্ধুবান্ধবের পরিমণ্ডলে চলা ফেরা করি, তাদের রুচিবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমাদের রুচিবোধ গড়ে ওঠে। সামাজিক ও বৌদ্ধিক শ্রেণির তারতম্যে রুচিবোধের ভিন্নতা গড়ে ওঠে যৌনতার ব্যাপারটাও এই রুচিবোধের সংঘাতে কোথাও অশ্লীল মনে হতে পারে আমার মনে হয় কোন কিছুরই কোন প্রামাণ্য মাত্রা নেই । আবার যৌনতার ব্যবহারে কবিতা নির্মিত হলে, একজনের কাছে তা ভিন্ন ভিন্নভাবে,অর্থাৎ দশজনের সামনে একরকম, আবার গোপনে একা একা আরেক রকম মনে হতে পারে সামাজিক রুচিবোধ ব্যতিরেক, পারিবারিক রুচিবোধও আছে। আদপে, তাই, রুচিবোধেরও কোন নির্দিষ্ট মাত্রা নেই, বা হতে পারে না। জীবনানন্দের সময় যা অশ্লীল ছিল, আজ তা, বা তারও চেয়ে বেশি কিছু স্কুলপাঠ্য হতে চলেছে । যৌনতা জীবনের প্রাথমিক এবং অক্ষয় ব্যাপার । কিন্তু বিভিন্ন উদ্দেশ্যে, বা যখন সাহিত্যে সাহিত্যের উদ্দেশ্য ছাড়া কেবলই জৈবিকতার জন্য এর ব্যবহার হয়, তখনও তাকে অশ্লীল না বলে 'যৌন সাহিত্য' বা পর্ণসাহিত্য বলা হয় । কবিতায় যৌনতার ব্যবহার যখন কাব্যের উদ্দেশ্যকে পূর্ণ করে না, বা করতে পারে না, তখন তা যৌনতার (জৈবিকতার) দিকে ঝুঁকে যায় স্বয়ংক্রিয়ভাবেই। এই সংঘাতটুকু একজন বোদ্ধা পাঠকের কাছে রুচিবোধের সংঘাত নয়, সাহিত্যবোধের সংঘাত, বা আমি বলব, সাহিত্য-সংকট তখন তিনি এটাকে 'অশ্লীল' বলতে পারেন , বা 'কিছু হয়নি'-ও বলতে পারেন কারণ বোদ্ধা-পাঠক হলে, কবির প্রয়াসটুকু তার চোখ এড়ানোর কথা নয় শৈলেশ্বর ঘোষের কবিতায় যৌনতার প্রচুর ব্যবহার আছে। তিনি বা তারা (হাংরিরা) চেয়েছিলেন সমাজের সকল অবদমিত বিষয়, যা পুরুষতান্ত্রিক অবদমন, বৌদ্ধিক সমাজের অবদমন, সামন্ততান্ত্রিক অবদমন ইত্যাদি নানা কারণে বহুযুগ ধরে স্তূপীকৃত হয়ে আছে, সেখানে 'বৌদ্ধিক নৈরাজ্য' সৃষ্টি করে সত্যকে সামনে এনে ফেলা তাই ষাটের দশক সত্তরের দশকের কাছেও হয়ত নিন্দিত হয়েছে, কিন্তু আজ আর এসব কোন বিষয়ই না। তথাকথিত বৌদ্ধিক সমাজের কূপমণ্ডুকতায় জীবনানন্দকে নিন্দিত হতে হয়েছিল আজ তাই ঐ সব মৌলবাদী বৌদ্ধিক সমাজের কোন মূল্য কেউ দিতে চান না, বা তারা তাদের প্রাপ্য মূল্যবোধের আসন থেকে ছিটকে পড়েছেন শব্দ তো কোন ভাব বা ভাবসংগঠনের অংশের প্রতীকমাত্র ! একটি শব্দের মধ্যে নিহিত থাকে রচয়িতার উদ্দেশ্য বা ইন্টেনশন বা অভিসন্ধান দোষী যদি হয়, তো উদ্দেশ্য বা ইন্টেনশন হবে, শব্দ নয় কিছু শব্দ আছে যা কেবলই হয়ত যৌনতাকে প্রকাশ করার জন্য ব্যবহৃত হয়, সেগুলোকে আমরা ইংরাজীতে স্ল্যাং বলে থাকি সেগুলো আবার সোস্যাল ডায়ালেক্ট হিসেবে স্ল্যাং না-ও হতে পারে। শৈলেশ্বর ঘোষের রচনায় অজস্র তথাকথিত যৌন শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, কিন্তু কোথাও তা কবিতার কাব্যময়তাকে ডিঙিয়ে যায়নি উদ্দেশ্য থেকে টলেনি কিন্তু অনেক সমালোচকই নিজেদের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য অতিসরলীকরণের ব্যাখ্যায় টেনে নিয়ে গেছেন এ ক্ষেত্রে তারা কাব্য না খুঁজে যৌনতাই খুঁজেছেন, বলাই বাহুল্য । তাই আমার মনেহয়, স্থূল অর্থে যদি, রুচিবোধের একটা সাধারণ মান আছে বলে ধরেও নিই, সেখানেও এখন একটু চলমানতার প্রয়োজন এসে গিয়েছে তা ছাড়া যৌনতা নিজেই কাব্যের একটি বিষয় হবে না কেন ? এটাকে যারা অস্বীকার করেন, তারা কি মৃত নন ? শিব পার্বতী, রাধাকৃষ্ণ, এদের নিয়ে যে যে কাহিনি রয়েছে, সেগুলো বিশ্লেষণ করলে, তাদের আবরণে ধর্মের মোহর রয়েছে বলে নিন্দিত হয়নি এটা আমরা বুঝতে পারি । মঙ্গলকাব্যেও তাই। আঞ্চলিক গীতিকাব্যেও তাই। ইউরোপীয়ান কাব্য অনুবাদ করলে যৌনতার ব্যবহারকে আমরা প্রশ্রয় দিই। এখন কবি যদি রচনা করতে গিয়ে প্রচলিত রুচিবোধকে মনে রেখে তার কবিতাকে ভিন্ন পথে চালিত করেন, তা হলে 'হায়' বলা ছাড়া আর কি-ইবা বলার থাকে। অয়দিপাউসের রচনা কি আজকের ? খাজুরাহের শিল্প কি আজকের ? 

  

১৮ আপনি না বললেও আপনাকে সবাইহাংরিবলেই মনে করে।  এই ধারণা যে একবারে ভিত্তিহীন তা আমারও মনে হয় না অনেকে আপনাকে প্রদীপ চৌধুরী ভাবশিষ্যও মনে করে আমিও তাঁর ব্যতিক্রম নই। এনিয়ে  সরাসরি আপনার সাথে কোনদিন আলোচনা হয়নি মনে হয়েছিল, এটা একান্তই আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপার কিন্তু আজ যখন আপনাকে পরতে পরতে জানছি, তখন মনে হচ্ছে, ব্যাপারেও সরাসরি জানা উচিত। শুধুমাত্র মেনে-নেওয়া একটা ধারনার কোন মূল্য থাকতে পারে না। আপনার কি মনে হয় ?

 

সেলিম মুস্তাফাঃ আমি প্রদীপের শিষ্য নই, কিন্তু প্রদীপ আমার গুরু আমাকে হাংরি না বলে উত্তর-হাংরি বললেই সঠিক হবে যদি বলতেই হয় আমার 'ছোরার বদলে একদিন'-এর পেছনে প্রদীপের যে লেখাটা ছিল, সেখানে তিনি আমার লেখাকে পরিণত হাংরি লেখার মত বলেছিলেন প্রদীপের সঙ্গে থেকে লেখা নয় ওগুলো তাঁর সঙ্গে পরিচয়ের আগেই কিছু লেখা আবার তিনি চলে যাবার পর কিছু লেখা তিনি লেখা এডিট করেন না, তাই তাঁর ছাপ চট করে পড়ার কথা নয় তিনি শুধু জীবনকে দেখার চোখ খুলে দিয়েছেন কারোই কবিতা নিয়ে কখনো কিছু বলার অভ্যেস তাঁর নেই, কিন্তু কবির জীবনদর্শনের ওপর কথা বলে সিদ্ধান্ত নিতে বলেন তাঁর ভাষা লেখায় আনা অসম্ভব ব্যাপার অরুণ বণিক, বা অরুণেশ ঘোষও হাংরি নন উত্তর-হাংরি বলা যায় তবে তাঁরা আরো কাছের আমাকে হাংরি বললে আমার কোন আপত্তি নেই, কিন্তু সেটা ইতিহাসবিকৃতি হবে এদিকে একমাত্র শঙ্খপল্লব আদিত্য হাংরি কবি কল্যাণব্রতরা নিন্দার ভয়ে সরে এসেছেন, নইলে তাঁরাও হাংরি খ্যাতি পেতেন হয়ত এছাড়া হাংরি প্রভাবিত কবি আছেন ত্রিপুরাতে অনেকেই, যারা তা স্বীকার করতে চান না বরং তারা আরো উগ্র হবার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু সেই কন্সেপ্ট ভেতরে না থাকলে যা হয় সত্যিকারের হাংরি কবি তখন ত্রিপুরাতে আরো ছিলেন নামে বেনামে, চাকুরিসূত্রে ছিলেন, চলে গেছেন আমার গুরুর শেষ নেই নকুল রায়, মানস পালও আমার গুরু আর সত্যিকার অর্থে আমার পরিচিত সব পাঠক/পাঠিকাই(যারা সব সময় কমেন্ট করেন নিন্দা বা প্রশংসা, দুই অর্থেই) আমার গুরু

 

  ১৯ সময়ের প্রবাহে (বলা ভালো দাবীতে)  ‘হাংরি আন্দোলন’এর যে ঢেউ বিশ্ব জুড়ে এসেছিল। তা তো তার ছাপ রেখে আবার চলেও গেছে তাহলে নিজেকে উত্তর-হাংরি বলছেন কেন ? একটু যদি আলোচনা করেন, তাহলে আপনি ও আপনার কবিতার মেজাজ বুঝতে সুবিধে হয়।

 

সেলিম মুস্তাফাঃ আন্দোলন কেউ আনে না, আসে স্মৃতি রেখে যায়, ছাপ রেখে যায় কিছু না রেখে যায় না আসে সময়ের দাবিতেই কাজ করে যায় পরবর্তীর জন্য সেই সময় থেকে আমার এখনের অবস্থান সেই সময়েরই পরিণতি যেকোন 'সময়'- তার পূর্ববর্তী সময়ের ফসল এটা অস্বীকার করা তো ইতিহাস অস্বীকার করা হাংরি-পরবর্তী হাংরি-অনুরাগীদের উত্তর-হাংরী- বলা হয়ে থাকে এটা আমার কথা নয় কেউ স্বীকার না করলেও, যদি লেখায় তার কখন প্রভাব এসে থাকে, সেটা কি -জীবনে মোছা সম্ভব ? আমি কোন কিছু- অস্বীকারের পক্ষপাতী নই  আজকের স্পষ্টবাদীতার যে ধারা বিশেষ করে ত্রিপুরা, উত্তরবঙ্গ এমন কি বাংলাদেশের কোথাও কোথাও ( বাংলাদেশে ছিলেন রবিউল হক--এক সময়ের ঢাকার চীফ্‌ আর্কিটেক্ট, 'ক্ষুধার্তে'- নিয়মিত লেখক-- ইনি নাটকও লিখেছেন, মানিক চক্রবর্তী মঞ্চায়নও করেছেন) দেখা যায়, তা তো এমনি এমনি আসেনি ! কে কোন পন্থী সেটা কখনোই আলোচ্য নয় কেউ একরকম থাকে না রাজনীতিতেও এরকমই শুধু পরিণত হয় তবু নাম তো দিই আমরা দিই বিভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে কখনো ইতিহাস লিখতে গিয়ে, কখনো কোন সংকীর্ণ মানসিকতার প্ররোচনায় আমাকে কেউ হাংরি বললে ঠিক হবে না বললে উত্তর-হাংরি- বলা ঠিক হবে, এই কথাই বলেছি

 

 

২০ প্রদীপ চৌধূরী সঙ্গে আপনার মেলামেশা দীর্ঘ দিনের। আপনি খুব কাছে থেকে তাকে জেনেছেন, অনুভব করেছেন সে সব দিনের স্মৃতি নিশ্চয়ই আপনাকে এখনও তাড়া করে। বন্ধুত্ব হোক, কবিতা নিয়ে আলোচনা হোক, জীবনমুখী আলোচনা হোক। আপনি আজ পেছন ফিরে তাকালে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন সেই সব দিনগুলোকে ?

 

সেলিম মুস্তাফাঃ সে দিন গুলো অবশ্যই খুব উত্তেজনার ছিল আমাদের কথাবার্তার সঙ্গে প্রদীপ চৌধুরীর কথাবার্তা বা চিন্তাধারা মিলে যায় বলেই আমরা কারো কারো বাধা সত্ত্বেও তার প্রতি আগ্রহী হয়ে পড়ি পরে কেউ কেউ অন্য ধারাতে আগ্রহী হয়ে গেলে অন্যত্র সরে যান, কিন্তু লেখা পড়লেই বোঝা যাবে এই চক্ষুরুন্মিলন কিভাবে হয়েছে আজকের দিনের লেখালেখি থেকে হাংরি আদর্শ আছে এমন লেখা খুঁজে বের করা আর সম্ভব নয় বহিরঙ্গ থেকে তো নয়- কারণ কিছু উদ্দেশ্যপূর্ণ লোক যেভাবে হাংরি চিহ্নিতকরণ শুরু করেছিলো সেটার পেছনে হীনম্মন্যতা ছিলো এটা পরিষ্কার, এবং সেই ধরণের চিহ্নায়ন আজ সকলের লেখাতে স্বাভাবিকভাবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে উপস্থিত, কেউ এজন্য দুঃখিত, বা লজ্জিত, বা সংকোচিত বা উৎফুল্লও নয়, কারণ, কারণটা তারা জানে না, এবং জানতেও চায় না ( এই জানতে না-চাওয়াটাও একদিন বিপদ হয়ে দাঁড়াবে, কারণ, এই ভাষাটার অন্তরাত্মা, গতি, অনুসন্ধান তার অধিগত নয় ) কোন আন্দোলনের ব্যর্থতা হয়ত এখানেই যেমন এখনকার অনেক বামপন্থীরা জানেই না বামপন্থা কি জিনিষ প্রদীপের সঙ্গের দিনগুলো এখন শ্রেষ্ঠ দিন বলে মনে হয় কারণ এখনো তাঁর থেকে পাওয়ার আছে মনে হয় ৭২/৭৩ বছর বয়সে লোকটা সমান জীবিত মানিক চক্রবর্তী থাকলে, সুস্থ থাকলে, কিছুটা অভাব পুরণ করতে পারতেন আমাদের আর একজন সত্যিকারের পাঠক ছিলেন, যিনি প্রকৃতপক্ষে লেখালেখির লোকও না,  কিন্তু সব বোঝেন এবং জানতে চাইলেই বোঝাতে পারেন আমার পানিসাগর থাকাকালীন ম্যানেজার রবীন্দ্র নাথ সরকার , বলা বাহুল্য, এঁর পড়াশোনা সীমাহীন

 প্রদীপ যৌনতাকে বহুমাত্রিক সিগনিফিকেন্সে ব্যবহার করেছেন । সব সময়-ই পাঠকের সামনে প্রেজেন্ট করেছেন যা, তার মূল ব্যঞ্জনা আরো গভীরে তিনি এখানে শৈলেশ্বর থেকে আলাদা প্রদীপে যেখানে ভাষাগত প্রকরণগত তীক্ষ্ণতা পাই, শৈলেশ্বরে পাই আপাদমস্তক প্রেমে ও যৌনতায় জড়িয়ে থাকা, কিন্তু দুজনের ক্ষেত্রেই, পড়ার পর, অনেক পর, তার নিহিতার্থের ঠিকানা মেলে হাংরি হয়েও সকলেই যে যৌনতাকে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় ব্যঞ্জনায় তীক্ষ্ণতায় এবং কাব্যপরিসরের অন্তর্গত থেকেই করেছেন এটা একটা মস্ত বিষয় যৌনতা ছাড়া মুক্তি নেই, কিন্তু যৌনতা জীবনের একটা স্তর মাত্র, একসময় প্রকৃত জীবন দ্বারা এটা অতিক্রমিত হয়ে যায়, যদি না এর সঙ্গে লেপ্টে থাকার সুপ্ত বাসনা জীইয়ে রাখা হয়, নিজের চরিতার্থতার জন্য, বা, কবি সাহিত্যিক হিসেবে পাঠকদের প্রলোভিত করার জন্যে, 'দেশ' পত্রিকায় এমন বহু লেখা ইদানীং-ও আমরা দেখতে পাই দীর্ঘ উপন্যাস হিসেবে মূলত পর্ণগ্রাফির সিরিয়েল । সুভাষ ঘোষের বা বাসুদেব দাশগুপ্তের গদ্যপদ্ধতি বাংলাসাহিত্যে দুটি অমিল ধারা সমরেশ বসুর যৌনতা থেকে এগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন । সন্দীপন, সমরেশ কিন্তু ঐ সময়েরই। পাঠকের মনে যৌন আবেশ গড়ে ওঠার প্রাকমুহূর্তে কখনো, কখনো রচনা শেষ করার পর যৌনতাকে তছনছ করে দিয়েছেন হাংরিরা রচনাকে সর্বত্রগামী করার জন্য যৌনতাকে জীইয়ে রাখেননি কিন্তু প্রদীপ ব্যতীত, যৌনতার চেহারা প্রায় সকলেরই কখনো কখনো সামান্য হলেও বিদ্ঘুটে, দৃষ্টিকটু, শ্রুতিকটু হয়েছে কখনো অতিরিক্ত হয়েছে বলে আমার ব্যক্তিগত ধারণা পাঠকের বোধেএটা ইচ্ছাকৃত আক্রমণপ্রদীপের কথায় আসছি পরে আন্দোলন আসে, কেউ তৈরি করে না বিপ্লবও আসে সময় আনেএটা আমার কথা নয় একজন মনীষীর এরকম একটা কথা একসময় আমি আমার ঘরে (১৯৭৪/৭৫ সালে) লিখে বাঁধিয়ে রেখেছিলাম আমাদের দেশে কখন কি হলো সেটা বড় কথা নয়, বড় কথা কোন সময়ে পৃথিবীতে কী হলো । সুনামীর মত অবশ্যই কোথাও একটা কেন্দ্র থাকে, এবং সেন্সেটিভ জায়গাগুলিতে ছড়িয়ে পড়ে ।

ষাটের মাঝামাঝি যেমন হাংরি ঢেউ এসেছিল, সঙ্গে এসেছিল নক্সাল আন্দোলন কিন্তু কোনটারই সঠিক জায়গা হয়নি নতুন জিনিষের অবস্থা এমনই হয় আজ বহুদিন বাদে নক্সালীদের গ্রহণ করতেই হল বামপন্থীদের--সময়ের দাবি মাওবাদীদেরও আগে পরে প্রহণ করতে হবে  নইলে সময়ের ফাঁকে পড়ে যেতে হবে কোন একটি ধারাকে সময়ের অভ্যুত্থান এগুলো, আন্দোলনের নয় কাউকে বাদ দেবার কোন প্রশ্নই ওঠে না যারা সময়ের একটা সামান্য ইঙ্গিতও বাদ দিতে চাইবে, তারা নিজেরাই বাদ পড়ে যাবে তাদের দলেরই নতুনদের দ্বারা কারণ একটার ভেতরে আরেকটার জন্ম যাক, যা বলতে চাইছিলাম, সবচেয়ে বড় সত্যি কথা যেটা আমার মনে হয়েছে, সেটা হচ্ছে, হাংরিরা মূলত যৌনতাবিরোধী কথাটা শুনলে ধাক্কা লাগবে   হাংরি কন্সেপ্ট অনেকেরই অধিগত হয়নি আদৌকারণ কোথাও কোথাও শুধু নালিশের কবিতাও দেখি   কিন্তু তাদের প্রচারে ছিল—‘নালিশের, ক্ষোভের, রাগের কবিতা হয় না তাদের লক্ষ্য শিল্প নয়, সত্যতাদের পথ--বৌদ্ধিক অবস্থাকে নৈরাজ্যের মাধ্যমে তছনছ করে সত্যের কাছাকাছি যাওয়া, সমাজের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক, আর্থিক, মৌলবাদী অন্যান্য স্বার্থ দ্বারা লুক্কায়িত অবদমিত সমস্ত তথাকথিত অন্ধকারকে আলোয় টেনে নিয়ে আসা এই কাজটি অত্যন্ত সুচারুরূপে হয়ে গেছে ইতিমধ্যে, এবং আরো হচ্ছে এই প্রক্রিয়া আর কেউ বন্ধ করতে পারবে না প্রদীপ কখনো ছন্দকে সেরকম ভাবে ব্যবহার করেননি শৈলেশ্বর করেছেন খুব বেশি শৈলেশ্বর জীবনানন্দের মত সমস্ত অস্বিত্ত্বের ভেতর দ্রবীভূত হয়ে যান, প্রদীপ ভাষার তীক্ষ্ণতায় সংক্ষিপ্ততায় তুলির টানে ধরেন উপলব্ধিকে প্রদীপের কথা সরাসরি অত্যন্ত নির্বাচিত শব্দের মাধ্যমে বার বার না পড়লে আসল কবিতাটি অনাবিষ্কৃত থেকে যায় তার কালো গর্তের ব্যাখ্যা ভারতীয়রা অত্যন্ত স্থূলভাবে করেছে- ইচ্ছে করেই, কারণ তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীরা সকলেই তৎকালীন কাব্যজগতে অনেক শিরোপা আদায় করে নিয়েছেন--যাদের মূল্য একমাত্র আধুনিকতাবাদীদের ধারাতেই বিচার্য আজ তারা কোথায় ? অলোকরঞ্জন থেকে শক্তি সুনীল এমনকি ত্রিপুরার কল্যাণব্রত পর্যন্তহাংরিদের চর্চা হয়, হচ্ছে---গোপনে নাম বলতে পারি কিন্তু বলব না চোখ রাখলেই দেখতে পাবে  তার আগে হাংরিদের উদ্দেশ্যটুকু সম্পর্কে পরিষ্কার হতে হবে হিন্দি সাহিত্যের খবর আমরা রাখিনা হাংরি নিয়ে হিন্দিতেই মনে হয় সব চেয়ে বেশি গ্রন্থ রচিত হয়েছে আমার কাছে নেই কালোগর্ত যেমন নারীকে ব্যাখ্যা করে, তেমনি ব্ল্যাক হোল-কেও ব্যাখ্যা করে প্রদীপের ' কবিতাধর্ম ' একটি অসাধারণ গদ্য, এটা পড়লে একজন কবি বার বার নিজেকে খুঁজে পেতে পারেন কবিতার বিবর্তন নিয়ে বা কবিতার আলোচনার গাম্ভীর্য কতটুকু হাস্যকর হতে পারে একজন কবির দৃষ্টিতে, কেন হতে পারে, এসব নিয়েও তার নিজস্ব বক্তব্য রয়েছে তার ফরাসী সাহিত্য নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে, যা একজন কবির পক্ষে চট করে এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব গঠনবাদী তত্ত্ব তার আগের সবকিছুকে নস্যাৎ করে, সত্যকেও জীবনকে নাটক বলেছেন অনেক দার্শনিক মানিক বলেছেন পুতুল নাচ ভূপেন হাজারিকা গান গেয়ে স্বীকার করেন-- জীবন নাটকের নাট্যকার সে কি বিধাতাপুরুষ... তার আফ্রিকান গুরু পল রোবসন বলেছেন--গীটারের একটি ভ্যাম্প (কর্ড) একটি সমাজ পালটে দিতে পারে কবিরাজ জর্জ ডাউডেন বলেছেন- মেক ইয়োর লাইফ পোয়েম, বলেছেন-- মন্ত্রের একটি সিলাবেল-এর উচ্চারণ (হ্লীং ক্লীং ... ইত্যাদি) পালটে দিতে পারে গোটা বিশ্ব(ইউনিভার্স) শৈলেশ্বর বলেছেন-- বস্তুর ষড়যন্ত্রময় অবস্থান... গুলো সবই  ভারতাত্মার কথা আমাদের সব ধারণাই আসলে পূর্বধারণা আঁতে ঘা লাগে যখন প্রদীপ বলেন--' তোমার আত্মার অবিশ্বাস্য স্ফু্লিঙ্গগুলি একের পর এক রূপান্তরিত হবে মুদ্রা সন্তানে'...............

বস্তুর ষড়যন্ত্রময় অবস্থান প্রসঙ্গে আরেকটা কথা বলার ছিল, সেটা হল কেউ বলেছেন (মনে নেই) প্রত্যেকটা বস্তুই হচ্ছে শব্দের বা তরঙ্গের জমাটবাঁধা (কঠিনীভূত) রূপ এই কথাটা যদি hypothesis (যা এখনো প্রমাণসাপেক্ষ ) হিসেবে ধরে নিই, তাহলে উপরের অনেক কথারই জট খুলে যাবে বৌদ্ধিক স্তরে নৈরাজ্যের ব্যাপারটা খুব ভেবে দেখার এটা বুঝে নিলে হাংরি কনসেপ্ট একদম পরিষ্কার হয়ে যায় তাদের কাণ্ডকারখানার ব্যাখ্যা ( যদিও কোন ব্যাখ্যাতেই যেতে কবিতার শরীর বা কবি রাজী থাকা উচিত নয়) বা হদিশ পাওয়া যায় অন্ধকারেই সব লুক্কায়িত কিন্তু অন্ধকারের শেষ নেই তবু সামাজিকভাবে ভেবে কিছু কিছু স্তর তো (অন্ধকারের) আমরা পেতেই পারি সত্য (গঠনবাদের কথা আপাতভাবে এড়িয়ে গিয়ে) তা সে যতই অর্ধসত্য হোক, বা পূর্বধারণাপ্রসূত হোক, কিছু ব্যাপার তো আমরা আবিষ্কার করতেই পারি অন্ধকারকে তছনছ করে দিয়ে কবরে গোলাপ বা যেকোন ফুলের কথা আমরা পাই যেমন শৈলেশ্বরে, তেমনি জাফর সাদেকে আমরা বাল্মীকিকে পাই রত্নাকরের মধ্যে, যখন সে তার পরিবারের মায়াটিকে ভেঙে গিয়ে ছাড়খার হতে দেখে স্থূল অর্থে 'ঘোলা জলে মাছ ধরা' কথা বলা হয় প্রকৃতপক্ষে জল ঘোলা না হলে মাছ বেরোয় না নজরুল বলতেন 'দে গরুর গা ধুইয়ে' পদ্মফুল যদি সৃষ্টির প্রতীক হয়, সে পাঁকেই ফোটে কিন্তু এইসব কোন কথাই নতুন নয় বা হাংরিদের দ্বারাই প্রথম সামনে এল, এমন মনে হয় না আমার এগুলো আগেও ছিল  এরা প্রকাশের নতুন রূপ বা মাত্রা নিয়েছে মাত্র সময়ের স্ফূর্তিতে এসব সেন্সেটীভ জায়গাগুলোতে প্রকাশ পাবার প্রয়াস নিয়েছে মাত্র আমরা কেবল আমাদের পছন্দমত ধারণা নিয়ে চলি সত্য আমাদের ব্যক্তিগত, কখন সমাজগত নির্মাণ রবীন্দ্রনাথ স্পষ্ট বলেছেন ' আমার চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ' আমার বিশ্বাস ' মানুষ একটা ধারণার’ নাম আমি লিখেছিও দেখে নাও --'অরক্ষণীয় শব্দাবলী' তবু এসব সাধারণভাবে আমাদের আটপৌরে জীবনে ভাবার প্রয়োজন পড়ে না তবে নিজের ভেতরের ধারণাগুলিকে আত্মসমালোচনা দ্বারা অচলগুলিকে পরিত্যাগ না করলে নতুনের জায়গা দিতে অসুবিধে হবারই তো কথা !

২১ প্রশ্ন ঃকি রকম গুলিয়ে ফেলছি সব। দু’একটা উদারণ দিয়ে  যদি বলা  যায় ?

সেলিম মুস্তাফাঃ যৌনতা যদি কাব্যচেতনাকে ( এই পৃথিবীতে যা কখনোই মানবতাকে ডিঙিয়ে যায়নি) ছাড়িয়ে যায়, তার উদ্দেশ্য ভিন্ন এই ভিন্ন উদ্দেশ্যকে প্রদীপরা নানাভাবে আঘাত করেছেন

 

' একজন   যুবতীর  

কষানো উরুর বিস্তারই ছিল কবিদের পতন মৃত্যু' (গোলপার্ক)

                বা

 ' মিথ্যা নিয়মের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত থাবা

কাউকে রেহাই দেয়না, তাইতো বালিকা

কেবল একবার হারিয়ে যাবার যাওয়ার অপরাধে

আর ফিরে যেতে পারেনি মনিহারি-

মেলা থেকে আলের ধারের ঘরে,

মই লাগিয়ে একদিন আব্রুহীন রাস্তা থেকে তাকে

উঠিয়ে দেয়া হয় গম্বুজনগরে;

সেখান থেকে রোজ সন্ধ্যায় চুঁইয়ে পড়ে

বীর্য আতরের গন্ধ--এসো

 নতমুখে কাঁপতে কাঁপতে আমরা

অপেক্ষা করি, কাঁদি

এই ধারাবাহিকতা একদিন খোলসের মতো সকলের শরীর থেকে খসে পড়বে

......পূর্ব গোলার্ধের সবাইর সঙ্গে আমরাও

 দেখব একদিন অস্তগামী সূর্য

গলিত সোনার মতো শরীর বিছিয়ে দিয়েছে

 শহরের আর গ্রামের/ গ্রামের আর শহরের প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে

আর তখুনি পিঠভর্তি চুল এলিয়ে

 গম্বুজ থেকে রাস্তায় নেমে এসেছে

 আমাদের বোন;

 তার মুখে গর্বিত আর অর্থপূর্ণ হাসি ( নাগরিক উপকথা )

 

        এটি একটি অসাধারণ কবিতা এখানে সবচেয়ে মরমী জায়গাটা হচ্ছে, কবির আকাঙ্ক্ষা, সুদূর বিশ্বাসে রঞ্জিত শেষটুকু...পুর্ব গোলার্ধের ......

 

'হঠাৎ অস্ফুট গোঙানীর শব্দে মনে হয়

 খুব কাছেই কেউ একাকী প্রসব করছে

 রোমকূপে সমুদ্রের অস্থির নিঃশ্বাস

 চোখ খোলার আগেই টের পাই কার

 এলোচুল আমার শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে---

 ফুঁপিয়ে কেঁদে চলেছে সে...(পাহারা)

 

 আরো দেখো---

 

' এই ক্ষতস্থান অনেকেই ব্যবহার করেছে,

 সংকুচিত নালা

 দ্বিখণ্ডিত সূর্যাস্ত

 মানুষের প্রণালীতে এনে দিয়েছে

 ব্যবহারের অস্পষ্টতা ;

 সাময়িক, তবু বিভ্রান্তি---

আমি কখনো আমাকে সম্পূর্ণ দেখতে পাই না (ব্যক্তিগত-)

    বা

 ' আমার বুকে একবারও চেপে ধরেনি

প্রসাধনহীন প্রেমিকা তার বুক...(দুই অধ্যায়)

                বা

'...দাবী আদায়ের বহু পরেও একজন কর্মচারী

 মিছিল থেকে বেরুতে পারছে না

 আমার বান্ধবীটি কিছুতেই বলতে পারছে না

 ক্ষুধা আগুনের মতো সর্বত্রগামী---জামা-পাজামার আকাশের মতো সহজ অফুরন্ত (টুকরো লেখা -তিন)

 

২২।  প্রদীপ চৌধূরী’কে আর কোনভাবে ব্যাখ্যা করতে চাইবেন ?

 

সেলিম মুস্তাফাঃ না। প্রদীপকে ব্যাখ্যা করা এতটা সহজ নয় আমার পক্ষে । প্রতিটি পংক্তিতে ভিন্ন ধরণের চমক আর অভিজ্ঞতা এক অন্য উদাসীনতায় নিয়ে যায়, যৌনতা থাকে, কিন্তু তা এক অন্য মাত্রার ।

 

'সুরভিত উরুতে হাত রেখে দেখি তেমনই

 প্রদাহ আছে, কিন্তু সেই পাখিগুলি

 ভুল ব্যবহারের ফলে উড়ে গেছে, চোখে পড়ে,

 কালো কালো ক্ষত ; তাদের ঝলসানো

 পালকগুলি সারামুখে লেগে আছে ।

 অভ্যস্ত আঙুল জানে এ কার অধিগ্রহণ ।

 ...চণ্ডাল গঙ্গার কাছে এসে যায়, বলে, যাবে নাকি !'......(অধিগ্রহণ)

 

জীবনের পজিটিভ দিকগুলি বা তার স্বপ্ন, যার জন্য একজন কবির লেখালেখিতে যুক্ত হওয়া, লিপ্ত হতে বাধ্য হয়ে যাওয়া, এই আর্জগুলি তাঁর রচনার আষ্টেপৃষ্ঠে লেগে থাকে। মনে হয় এক কঠিন বর্মের ভেতর এক অন্য হৃদয়

 

'ওদের কোমর থেকে খসে পড়েছে লাইফ-বেল্ট

এক শতাব্দীর ভুল যুদ্ধের শেষে ওদের

 রাইফেলের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে

 বুনো পাখির ঝাঁক

......এখন ইউকেলিপটাসের গন্ধে পুনরায়

 জেগে ওঠে মহামারীগ্রস্ত এলাকা' (যুদ্ধ)

 

প্রদীপ ১৯৮০-র দাঙ্গার পর ত্রিপুরা ছেড়ে চলে যান মাত্র ১৭ বছর  চাকুরি করে । কোলকাতায় গিয়ে একটা প্রাইভেট স্কুলে জয়েন করেন । তাঁর স্ত্রী ত্রিপুরাতেই থেকে যান PWDতে চাকুরীসূত্রে। ১৯৯২ সালে উনিও চলে যান চাকুরী শেষ করে তাদের এক ছেলে দিমিত্রি ওঁর স্ত্রী শান্তিনিকেতনের ছাত্রী, বাড়ি কৈলাশহর । ওঁর বাবা প্রমোদ চৌধুরী ত্রিপুরাতে শিক্ষকতা করতেন । হয়ত সেই সূত্রেই প্রদীপেরও চাকুরী পরবর্তী সময়ে ত্রিপুরাতে হয় এর আগেই তিনি ত্রিপুরা থেকে এরেস্ট হন হাংরি আন্দোলনের ব্যাপারে । ভালবাসার বিয়ে হলেও জীবনের দীর্ঘ সময় তাদের ব্যবধানেই কাটে। ওঁর স্ত্রী অত্যন্ত রুচিশীলা ডিগনিফায়েড মহিলা ছিলেন। ৭/৮ বছর হল উনি গত হয়েছেন ।

প্রদীপ বিশ্বাস করেন শেষ পর্যন্ত একটা কবিজীবন নিঃসঙ্গই !! এর জন্য মানসিক প্রস্তুতি তাঁর ছিল, এখনো আছে।

' যাবতীয় জন্মের সংস্কার

 আমাকে সাপটে আছে চারদিক

 থেকে ; সন্তানের জনক

 আমি, আমি পিতা অথবা সন্তান ! ...।

আমি অপেক্ষা করে আছি

 কখন উদ্যত ছোরা নিয়ে

 আমার ছেলে আমার দিকে

 এগিয়ে আসবে অপরিচিত

 পিতার মতো ।' (ব্যক্তিগত-১)

একটি কবিতার শেষ সামান্য নোট রেখেছেন যা তাঁর বিশ্বাসের অংশ--(আর্তুর র‍্যাঁবো) কেবল ফরাসী সাহিত্য না , বিশ্বসাহিত্যে র‍্যাঁবোর চিরস্থায়ী তাৎপর্য না বোঝা অব্দি এক লাইনও লেখার অর্থ হচ্ছে, হয় শব্দ নিয়ে অজ্ঞতার কানামাছি খেলা, না হয় পুরোনোকে আরো বেশি পুরোনো বোতলে ঢেলে গেলার চেষ্টা । আত্মাকে সম্পূর্ণ অরাজক না করা অব্দি, এবং সেই অরাজক মানসিক স্তরকে পরিণত শিশুর হাসি-কান্নার মতো 'সম্পূর্ণ' ভালবাসার কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া অব্দি র‍্যাঁবো কিংবা প্রকৃত কবিতাটির ( নরকে এক ঋতু-র কথা বলছেন প্রদীপ) একটি চুলের নাগালও পাওয়া সম্ভব নয় । আলো এবং অন্ধকার দুটোকেই তিনি আবৃত করেছিলেন । তিনি পৃথিবীকে এতটা সম্ভাবনাযুক্ত মনে করতেন হাজার হাজার জীবনেও যার স্বরূপ পূর্ণ প্রত্যক্ষ করা সম্ভব নয় । সব বৈপরীত্যের মর্মে দাঁড়িয়ে তার নির্ভুল ঘোষণা " এগিয়ে যাও, এগিয়ে সারাক্ষণ !" অপরিমেয় তাঁর উদ্যোগ, তাঁর ইচ্ছা দমে থাকার মতো নয় । নিবৃত্তিহীন তাঁর ক্ষুধা । " না-শোনা এবং নামহীনের(নাম না-জানার) পেছনে ছুটতে ছুটতে ফেটে পড়ুক কবিরা ।"

 

 

২৩  এবার একটু অন্য প্রসঙ্গ টেনে আনতে চাইছি।

 যে-কবির যে স্বভাব এবং যে-মেজাজ সেই অনুযায়ীই তিনি লেখেন কেউ লেখেন দার্শনিক ভাষণের মনোভাব নিয়ে, কেউ লেখেন নিছক শিল্প সৃষ্টির অভিলাষে, কেউ লেখেন মস্তিষ্ককে প্রবল রেখে, আবার কেউ লেখেন হৃদয় ও অনুভবকে থেকে আপনার এব্যাপারে ব্যক্তিগত মতামত কি ?

 

সেলিম মুস্তাফাঃ শৈলেশ্বরও আমার গুরু, এই অর্থে যে, তাঁর কিছু কথা আমি সব সময় মনে রাখি

 '* কবিতায় দার্শনিকতার মোড়কে কোন কথাই বা দার্শনিক কোন কথাই থাকবে না

*' দার্শনিকতা আবিষ্কৃত হবে কবির সারাজীবনের সমস্ত রচনা বিশ্লেষণ করে, তা করবেন একজন সমালোচক বা পাঠক আমি জীবনবাদী রচনায় বিশ্বাসী, শুধু শিল্প সৃষ্টি তো প্রাণহীন ব্যাপার এই জঞ্জাল বয়ে বেড়ানোর কোন মানে আমার কাছে নেই

একদিন কবিতা যদি শুধু জ্যামিতি হয়ে যায়, তখন হয়ত মস্তিষ্কের কবিতা হবে কবি যদি কেউ হয়েই থাকে, আবেগ ব্যতিরেক কী করে তার কবিজন্ম সম্ভব ? আবেগ সংকোচন করে স্মার্ট হতে গিয়ে যদি সে শুধু মাথা চালায়, সে তো আমার বিচারে ফাঁকিবাজ, -সৎ কবি

প্রদীপের বিশ্বাস- যার ভিশন (Vision) নেই সে কবি হতে পারবে না আমিও বিশ্বাস করি যার দূরদৃষ্টি নেই, আনলিমিটেড কল্পনাশক্তি নেই, সে কী লিখবে ? যা লিখবে তা তো তার আগের কারোর লেখার পুনরাবৃত্তিই হবে ! যারা যন্ত্র বানান, তারাও তো আবেগহীন নন শুধু মাথা দিয়ে মনে হয় না আমার জন্য কেউ একটি ভাল কবিতা লিখতে পারবে, বা জীবনে এর কোন ভূমিকা থাকবে আবার শুধু আবেগ দিয়েও লেখা হবে না, আবেগের পরিমিতি না থাকলে তা এফেক্টীভ হতে পারবে না কবির নির্মাণটুকু এখানেই

ছাড়া নালিশের, ক্ষোভের, রাগের বশে কবিতা হবে না , তা যতই প্রতিবাদের হোক সবের জন্য আলাদা আলাদা জায়গা রয়েছে যারা বিষয়হীন কিছু লিখতে চান, তাদের ক্ষেত্রেই এই সমস্যা আসে  কবিতায় আমার মতে সত্যের সন্ধান থাকবে প্রচলিত পথগুলি ছেড়ে, কবিতার পথে একটা মাধ্যম (কবিতা) কেন আরেকটা মাধ্যমকে (দার্শনিকতা, শিল্প) নকল করবে, বা সাহায্য নেবে ? কবিতা  সবকিছুর মিশ্রণ হয়েও আলাদা কিছু হবে, যেমন সব কিছু নিয়েও সিনেমা সম্পূর্ণ একটি আলাদা মাধ্যম

 

২৪আপনি তো ত্রিপুরার ৮০’এর দশকের কবিদের নিয়ে একটা প্রবন্ধ লিখতে গিয়ে অনেক কাজ করেছেন। আপনাদের সময়ের ক্রাইসিসের সাথে তুলনামূলক বিচার করলে কিভাবে দেখলেন ‘ত্রিপুরার ৮০’এর দশকের  ক্রাইসিসকে ? যদি আপনি আদৌ বিষয়টাকে এভাবে ব্যাখ্যা করতে চান ?

সেলিম মুস্তাফাঃ দশকের হিসেব আমার খুব পছন্দ নয় । কেউ তো দশক হিসেব করে লিখতে শুরু করে না।   আর যে দশকে শুরু সেই দশকে হয়তো তার নিজস্ব ভাষাই খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়অন্তত ৫/৬ বছর না-লিখলে তার একান্ত নিজস্ব ধারায় নিজেকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলা কঠিনঅবশ্য ব্যতিক্রম তো থাকেই । যেমন জাফর সাদেক । তবে জাফরের কবিতা তাঁর কাব্যজীবনের চূড়ান্ত একটা পর্যায়ে লেখা, এটা তাঁর কবিতা পড়লেই অনুভূত হয় । তাঁর সাহিত্যপাঠের পরিচয় ফুটে উঠেছে তাঁর লেখার গুরুত্বে, গাম্ভীর্যে, আত্মবিশ্বাসী বয়ানে আর অভ্রান্ত নির্মাণে । তাঁর শব্দপ্রয়োগ দেখলে, তাঁর পরবর্তী ও দীর্ঘপথ অতিক্রমকারী অনেককেই এখনো দুর্বল আর শব্দের প্রতি অমনোযোগী মনে হয় । শব্দ তো সাহিত্যের ইঁটস্বরূপ । একে অবহেলা মানে তো ষোলো আনাই মিছে ! ভাবও গেল, বিষয়ও গেল ! সাতের দশকে শুরু হলেও তীব্র শ্লেষ, তির্যক বাক্যযোজনা, প্রাপ্তজীবনকে অস্বীকার, যেকোন প্রাপ্তিকে স্বীকার না-করা, নিজের জীবনের চেয়ে ওজনদার বাক্যযোজনা, অন্য সময়ের অন্য পরিবেশের অন্য জীবনের অন্যের দর্শনের আলোকে বা অন্ধকারে নিজেকে স্থাপিত করে, নিজেকে জরুরী ও প্রচারিত করার বায়বীয় প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় । খাওয়া নাওয়া ঘুম আড্ডা নেশা পেশা ভ্রমণ এমনকি সখী-বিচরণ করেও নকল অশান্তির কষ্টকল্পিত বিলাসিতা কারো কারো রচনায় কখনো কখনো লক্ষ্যণীয় । এটা সময়েরই অভিব্যক্তি, বাঁশ-কড়ুলের মত সময়েরই উদ্ভেদ । বেশির ভাগ সংকটই কখনো সমাজরহিত, কখনো ভূমিহীন । দোষণীয় নয়, সময় যা ভাবায়, মানুষ তাই ভাবে । প্রত্যেকের সময় তার নিজের রচনা—তাঁর অভিজ্ঞতা, তাঁর যাপন, তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক বোধ, তাঁর দূরদর্শিতা থেকে উৎসারিত বলে মনে হয় আমার । রচনাকাররা নিজেকে সৃষ্টিকর্তা ভাবেন, কিন্তু সময়ই প্রকৃত লেখক । আটের দশক আমার মতে, পরিবর্তনের একটা অস্থায়ী ক্যাম্প, অতীতের সঙ্গে আগামীর হাওয়ার রসায়ন । যাঁরা এখানে অসুবিধে বোধ করেছেন তাদের কারো কারো কিছু কিছু রচনা দার্শনিকতায় ভারী হয়ে উঠেছে, যা তাঁর অস্তিত্বের চেয়েও কখনো ভারী বলে মনে হয় আমার প্রতিবাদ মাত্রা ছাড়াতে ছাড়াতে কখনো ফ্যাশনের পর্যায়ে চলে যাচ্ছে । এই প্রবণতা জলীয় । তবে আস্তে আস্তে  কেউ কেউ তার মাটি খুঁজে পাচ্ছেন, কেউ কেউ এখনো কল্পলোকের শূন্যতায়আত্মস্থ না-হলে কি ফেরা সম্ভব ? কবিতা সৃজনাত্মক পরিবেশনা বা উপস্থাপনা ।  তাই বিষয়ে কোন মন্তব্যই সঠিক না-ও হতে পারে আমি আমার সময় থেকে কথা বলছি, এটা কখনোই প্রামাণিক ধরে নেয়া ঠিক নয় । তুমি জানতে চাইলে তাই বললাম । আমাদের শুরুর সময়ের সঙ্গে ৮-এর দশকের সংকটের বাহ্যিক দিকটাই শুধু দেখা গেলো । কিন্তু সংকটের প্রকৃত বসতি তো রচনাকারের অন্তরেতাই কেউ কোথা থেকে লিখছেন, অন্তর থেকে, নাকি নিউজপেপার থেকে, সেটা চট করে ধরা যায় না । আমার মতে ব্যক্তিগত পরিচয় না-থাকলে, বা একজনে সমস্ত রচনার পাঠ না-থাকলে কোন মন্তব্য করা ধৃষ্টতা । সংকট ধরা যায় না । আর ধরা যায় না বলেই সংকট আরো ঘনীভূত হয়, আর এই সংকট লেখকের চেয়ে পাঠকের বেশি !

 

২৫ত্রিপুরায় কার কবিতা ভালো লাগে না-লাগে এরকম বিব্রতকর প্রশ্ন করবো না তার বদলে জানতে চাইবো, এই সময়ের কবিতাকে আপনি কিভাবে দেখছেন ? কোথাও কি কোন অপূরণ  

 

সেলিম মুস্তাফাঃ জীবনে যার যার পাওনাটুকুর স্বীকৃতি যেন নেই কোথাও । থাকলেও  খুব কম । তার চেয়ে বেশি তাদের জেহাদ, দুঃখ, অযথা প্রতিবাদ আর বিভ্রম, বিভিন্ন ‘বাদ’-এর স্থূল চিহ্নায়ন, সম্পর্কহীন জল মাটি আর মানুষের অনুষঙ্গের আমদানী, নিজের অবস্থান স্বীকার না-করে অন্য ভুবন থেকে লিখে যাওয়াকবিতা যেন শুধুই নালিশের জন্য । মুষ্টিমেয় কয়েকজন বাদে, টের পাওয়া যায়, সাহিত্যপাঠ সকলেরই অত্যন্ত নগন্য । লেখা অত্যন্ত তাৎক্ষণিক । ফেসবুকের কল্যাণে লেখা হবার সঙ্গে সঙ্গেই পাঠকের দরবারে চলে আসছে অজস্র ভুল বানান আর নির্মাণের অপটুতা নিয়ে  লেখা ছড়িয়ে যাচ্ছে বিশ্বজুড়ে অসংবৃত অবস্থায় । সময় নেই নিজেকে দেখার, নিজের সৃষ্টিকে দেখার । এতে অনুমান হয়, দ্রুত আরেকটি পরিবর্তন হয়ত আসছে । আমার এই বলাটা হয়ত গোঁড়ামী মনে হচ্ছে, পুরাতনী মনে হচ্ছে । তবে এটা ঠিক, আগামীর দিনগুলো আরও পাতলা, আরও স্বচ্ছ, এবং অবশ্যই আরও নির্দয় । কবিতে কবিতে দলাদলি, প্রতিযোগিতা, অবিশ্বাস আরও প্রকট হবে, আবার সমন্বয়ের জন্যও কেউ কেউ মাথা ঘামাবে । হাস্যকর । যারা থাকবে, লেখার জোরেই থাকবে । সৃজন সব সময়ই নিরিবিলির চর্চা ।

        তবু কারো কারো লেখায় আশ্চর্য কল্পনাশক্তি আর জীবনকে পর্যবেক্ষণ করার মোক্ষম উপস্থাপনা দেখি । তখন বিস্ময়ের সঙ্গে ভাবি যে আমি কেন তার মতো নজর পেলাম না ! তখন  কবি আর কবিতার প্রতি আবার বিশ্বাস ফিরে আসে, আর মনে হয় কবিতা একজন পাঠককে যা দিতে পারে তা চিরস্থায়ী দেয়া, এবং সৃজনের আর কোন মাধ্যম তা  দিতে পারে না । একটা সার্থক কবিতা একজন পাঠককে চিরজীবনের জন্য পালটে দিতে পারে ।

 

২৬   ‘শব্দের অতিরিক্ত মিতাচার কাজেই চাতুর্য বেশি’ – কথাটার মধ্যে কি ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে না ? এভাবে আপনি বলতে পারেন কি ? যে জায়গায় আপনার ছোট ছোট মিতাচারী  কবিতার  সংখ্যা নেহাত কম নয়।

 

সেলিম মুস্তাফাঃ  আমার ছোট কবিতায় যা বলা আছে তাই এর অর্থ   অভিজ্ঞতা ছাড়া নয়  তবু কিছু তো আছেই  তুমি হয়ত লক্ষ্য করনি, আমি বলেছি, যখন অভিজ্ঞতা থাকবে না, তখনই দর্শনের আশ্রয় নেবার প্রয়োজন দাঁড়াচ্ছে তাছাড়া ঝুঁকির কোন ব্যাপার নেই আজ যা সত্য মনে হয় , আজ তা সত্য

 

২৭ এর একটা কারণ কি এটা হতে পারেআপনারা যে  সংগ্রাম করেকবিউপাধি লাভ করেছিলেন, আজ  সে রকম কিছু করতে হয় না। বই ছাপাটাও চলে এসেছে হাতের মুঠোয়। না, সহজ কথায় বলা যায়সমসাময়িক নতুন কবিদের কাজ নিয়ে কোন যুগেরই পূর্বজ কবিরা  খুশি হতে পারেন নি, তারই একটা ধারা আপনিও বহন করছেনএই অভিযোগের প্রেক্ষাপটে আপনি কি আরেকবার ভেবে দেখতে চাইবেন   যেখানে আপনি  নতুন কবি  সম্পর্কে  বলছেন -- ‘ কোথাও না কোথাও জীবন নিয়ে, সংকট নিয়ে, শব্দ নিয়ে, তাৎক্ষণিক ফল লাভের আশায় জাগলারি চলছে

   

সেলিম মুস্তাফাঃ জীবনকে যাপন করছি । এটা যদি সংগ্রাম হয় তো সংগ্রাম । কবি হবার জন্য আলাদা কিছু করিনি । তা ছাড়া কবি হলাম কি হলাম না, তা বলবে কে ?  আর তবু, যদি কবি হয়েই থাকি, তাহলে তো আমৃত্যুই কবি ! এখানে সময়ের কোন বাউণ্ডারী নেই । সকলেই এই সময়ের কবি । আবার প্রত্যেকের সময়ও ভিন্ন ভিন্ন । ‘এই সময়’ কথাটা হয়তো বলা যায়, কিন্তু কারোর সঙ্গে কারোর সময়ের তুলনা চলে না । যারা আগে জন্মেছেন তারা অগ্রজ, বয়সে প্রাচীন, সময়কে দেখার আর লালন করার তথা ব্যবহার করার পদ্ধতি আলাদা । যেকোন জিনিষকেই দেখার আঙ্গিক কারোর সঙ্গে কারোর মেলার কথা নয় যদি হতো তাহলে সৃজনশীল কাজ এই বিশ্বে হতো না।  বিভিন্ন ইজ্‌ম্‌-এর জন্ম হতো না, যেমন কিউবিজ্‌ম্‌, শুধু তো দেখার ভঙ্গী আলাদা, তাই তাৎপর্যও আলাদা । কবিতাকে কে কিভাবে দেখেন সেটাও একটা ব্যাপার ।

৬০-এর দশকের কেউ কেউ এখনো এখানে আছেন, যারা নিজের লেখা নিজেই বিশ্বাস করেন না জায়গার  গুণে বা কাছাকাছি থাকার গুণে হয়ত এরাই এই প্লাস্টিক কবিতার চকচকে ধারাটির জন্ম দিয়েছেন আমার  মনে হয়েছে  এখানে জীবন কোন বিষয় নয়, শুধুই চতুর শব্দযোজনা ?     কিংবা বলতে পারি , আমি এগুলো ঠিক বুঝিনা  আর এভাবে বোঝাটাও ঠিক হবে না, কারণ পৃথিবীর তাবৎ মৌলিক রচনাই ভিন্ন ভিন্ন তুলনার কোন ব্যাপারই নেই যে যা লিখছেন, সময় যদি তাকে বয়ে নিয়ে যেতে পারে, তবে তো কোন কথাই নেই ! বিচারক যদি কেউ থাকে, তা সময় লেখা অবশ্যই ব্যক্তির কবিসত্ত্বাটিকে কোয়ালিফাই করবে এখানে কোন কালেই কোন সন্দেহের অবকাশ ছিল না আজো নেই জীবনের আঁশ কবিতায় যদি না থাকে তবে তা তো Art for art sake হয়ে যাচ্ছে তবু মন্দ নয় যদি কবির ইচ্ছা পূরণ হয়, যার জন্য এত হাঙ্গামা শেষকথা অবশ্যই সময়মানে ভবিষ্যত শেষকথা মানে ফলাফল, যদি কেউ ফলাফল জানতে চায় ।  কবিরা সম্ভবত ফলাফলের জন্য বসে থাকেন না । কারণ লেখার সঙ্গে সঙ্গেই যে ফলাফল উঠে আসে, এর পরে আর কিছু পাবার থাকে না ।

ত্রিপুরায় একটা সম্ভাবনা ছিল সত্যিকারের জীবনবাদী লেখার ত্রিপুরার বাইরের যে সব লেখা দেখি (যেমন ফেসবুক’কে ধর) বাংলাদেশের কিছু লেখা ছাড়া বেশিরভাগ লেখাই জলো, পঙ্গু,বা অতিস্মার্ট তাহলে কেমন হবে কবিতা ? আমি জানি না কেউ জানে না শুধু মাঝে মাঝে বলা যেতে পারে (অবশ্যই পাঠক হিসেবে)--না, এরকম নয় আগের একটা কথাই আবার বলছি--বর্তমান কবিতাবলি সামূহিক যে-জীবনের ইঙ্গিত বহন করে গণজীবন  এখনো সেই ধারায় এসে পৌঁছোয়নি ' যদি পৌঁছায়ও, দেখা যাবে গ্যাপ্‌ রয়ে গেছে কোথাও সুধীন্দ্রনাথ , বুদ্ধদেব বসুরা এরকমই হয়ত আত্মবিশ্বাসহীনতার যাঁতাকলে পড়ে মিউজিয়াম হয়ে গেলেন, তবে এখানেও , যদি কেউ চায় তার বিশ্বাসকে খুঁজে পেতে পারে কারণ ঘটনা দুর্ঘটনা সবই অভিজ্ঞতা মাত্র। আমরা তাই খুব সরল ভাবে , সাধারণ মানুষ হিসেবে চট করে রবীন্দ্রনাথ থেকে জীবনানন্দে চলে আসি মানুষ, হয়  বাঁচার জন্য, আনন্দের জন্য, তৃপ্তির জন্য, তার সুবিধার জন্য সব সময়ই, গ্রহণের চেয়ে বর্জন করে বেশি

 

২৮ আপনার কাব্য জীবনের শুরুবাহান্ন তাসের পরএর মত দীর্ঘ কবিতা দিয়ে। ত্রিপুরার দীর্ঘ কবিতার ইতিহাসে নিঃসন্দেহে আপনি প্রথম সারির অনিবার্য একজন দীর্ঘ কবিতার সুখ,অসুখ, প্রাপ্তি , ব্যাপ্তি নিয়ে কিছু সহজ সরল  অনুভব  জানতে চাই আপনার কাছ থেকে আপনি কিভাবে নিজের সাথে একে  অঙ্গীভূত করেন ? স্বস্তিটা কোথায় পান ? নির্দিষ্ট কোন লক্ষ্য নিয়ে এগুতে হয়, না-কি চেতন-অবচেতনের ডলাডলিতে শেষ অবধি যা দাঁড়ায় , তাই দীর্ঘকবিতা ?    

 

সেলিম মুস্তাফাঃ না, কোন টার্গেট নিয়ে নয় মানুষের সামনে শুরুতেই একটা অদৃশ্য টার্গেট স্থির হয়ে থাকে, সেটা তার জীবন । এই টার্গেট অবহেলা করলেই বিপদ । মিথ্যাচারের বিপদ সামনে এসে দাঁড়ায় । এজন্য অনেকেই নিজের জীবনকেই বিদ্রূপ করে লেখালেখি শুরু করে ফেলেন, এমনকি লেখালেখির শুরুতেই, জীবনকে বিন্দুমাত্র স্বীকার করার আগেই ! বিরূপ মনোভাব নিয়ে শুরু করলে, মূল জীবনে ফেরার আর পথ থাকে না ।  ‘সুভা কা ভোলা সাম্‌ কো ‘ আর ঘরে ফেরার পথ পায় না , পেতে পারে না, তার ‘নকল প্রতিবাদী ইমেজ’ তাকে ঘরে ফিরতে আর এলাউ করে না ।

আমার লেখা, সে বড় হোক আর ছোটই হোক, লিখতে লিখতেই আসে তবে বড় লেখা একটা ঘোরের মত চেপে ধরে থাকে  শেষ না হওয়া পর্যন্ত আসলে এর প্রস্তুতি হয়ত শুরু হয় লেখার অনেক আগে থেকেই পুরো স্নানের মতই, ওটাতে লিপ্ত থেকে যেতে ভাল লাগে বা লেখাটাই টেনে ধরে রাখে দীর্ঘ কবিতা অন্যের কাছে কেমন জানিনা, আমার কাছে উপন্যাসের জীবনতৃষ্ণা নিয়ে আসে কোথাও পৌঁছানোর লক্ষ্য যে একেবারে থাকে না, সেটাও নয় ডলাডলির কোন ব্যাপার নেই, কুস্তি করে কি আর কোন রচনা হয় ? ক্রমশ গভীরের দিকে যাত্রা চলে সুর কেটে গেলে আর ফেরানো যায় না কোন একটা বিষয় কাজ করে না, বরং একটা সময়, একটা জীবন, বা একটা জনপদ, বা একটা শ্রেণি বা একটা নদী, একটা পাহাড়, বা একটা বিশেষ চরিত্র বা একটা আদর্শ মূল সূত্র হিসেবে কাজ করে থাকে এসব  ব্যাখ্যা দেয়া যায় না বরং বলা যায় আমি যা জানিনা সেটাই চরিত্র হয়ে দাঁড়ায় অন্বেষাই টেনে নিয়ে যায় দীর্ঘকবিতা- অর্থ জীবনকবিতা- life poem !

 

 

২৯ তীব্র বিষক্রিয়া ছড়িয়ে পড়েছে

বাতাস কখনো উত্তরে , কখনো দক্ষিণে

অনাবশ্যক চাঁদ

আবার উঠে এসেছে আকাশে ,কেউ

জাগেনি কোথাও, সর্বত্র

স্পষ্ট হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে

মানুষের প্রয়োজনহীনতা 

 

কিংবা

 

কারা যেন সরছে

কারা যেন সরে যাচ্ছে লোটা কম্বল ঘটি বাটি

কোলের সন্তান নিয়ে

মেরুদণ্ড হাতে নিয়ে কারা যেন সরে যায়

পুবে পশ্চিমে

 

 উপরের মারাত্মক লাইনগুলিইতি জঙ্গল কাহিনিথেকে নেওয়া। যতদূর জানি, এই দীর্ঘ কবিতাটি আপনি কাঞ্চনপুর থেকে ফিরে আসার পর  লিখেছিলেন।  আমার জানতে ইচ্ছে করছে,  জঙ্গল-ইতিপূর্বে আপনার এমন মনে হওয়ার পেছনে কি কোন প্রেক্ষাপট ছিল ? পুরো কবিতাটাতেই যেন ক্ষোভের আগুণ জ্বলছে।

 

 ‘পায়ের দাগ ধরে এসে কে যেন মরে পড়ে থাকে --

 একা --

উপুড় করা শরীর। তার উপরে ?

তার উপরে কী চাঁদ, নাকি চন্দ্রালোক ?

হায়! স্তব্ধ অরণ্যে কোন বিস্মিত ভোর !’

এইসব  রোমহর্ষক লাইনগুলো পড়তে পড়তে মনে হল, এটা যেন একটা স্বপ্ন ভঙ্গের আত্ম-ক্রন্দন। সত্যিই কি   ইতি জঙ্গল কাহিনিতাই

 

 

সেলিম মুস্তাফাঃ জানি না কিন্তু এখনো পড়লে আমি জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়ি মনে হয় স্তব্ধ অরণ্যে কোন বিস্মিত ভোর !’ যেন আদিম পৃথিবীর কোন এক দৃশ্য যা কোন দীর্ঘ এক টানেলের পর এসে হঠাৎ এসে উন্মুক্ত হয়েছে প্রশ্ন করো না, প্রশ্নের কোন জবাব কখনো হয় না

তবে লেখাটা ওখানেও লেখা হয়ে থাকতে পারে, সঠিক মনে পড়ছে না কারণ আমি ১৯৮৩ শেষে বেরিয়ে এসেছি ১৯৮৪/৮৫ খুব অস্থির ছিলাম বদলি ইত্যাদি নিয়ে ১৯৮৫- শেষে বিয়ে এর পর বছর লিখিনি ১৯৮৯- শেষ বা ১৯৯০ থেকে আবার শুরু

ইতি জঙ্গল কাহিনি’- নাম প্রথম ভেবেছিলাম 'অথ জঙ্গল কাহিনি' আসলে আমি বেরোতে চাইনি হয়ত

 

 

৩০ আপনারভাষাশহিদ স্টেশনের দিকে একটি আহত ট্রেন কাব্যগ্রন্থে রাজনীতি ,প্রতিবাদ, মিলেমিশে একাকার ।বিশেষত ভাষা-রাজনীতি । আপনাকে এভাবে সরাসরি স্থানিক ব্যাপারে মাথা ঘামাতে দেখা যায় নাহঠাৎ মনের এই পরিবর্তন ?

 

সেলিম মুস্তাফাঃ হঠাৎ নয়। প্রতিবাদ তো চিরকালই ছিল বুকে লুকিয়ে ছিল ভাষার রাজনীতিটা আগে ততটা বুঝতাম না রাজনীতিতে এখন তো আর নীতি নেই, কৌঁশল আছে আগেও ছিল অবশ্য গোটা উত্তরপূর্বাঞ্চলের প্রতি নেহেরুর অবজ্ঞা ছিল গান্ধীকেও আমার কুচক্রী মনে হয় এসবই দানা বাঁধতে বাঁধতে প্রকাশিত হচ্ছে এই সব প্রতিবাদই চিরকালীন বলা যেতে পারে এই অর্থে যে, এগুলো মূলত সকলেরই প্রতিবাদের বিষয় হবার কথা কোন না কোনভাবে, যদি না হয়, সেটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলব  কোন স্থানিক ব্যাপারে খুব একটা প্রতিবাদ আমার নেই (প্রকাশ্য) প্রতিবাদই কবিতা নয়, যদিও অনেকে বলেন, কবিতা একটা ইচ্ছা মাত্র ! তবে যারা কবি, তাদের জন্মই একটা প্রতিবাদ নতুন করে লোকদেখানো কিছু করা বা বলা একটু দুর্বলতাও বটে  কিন্তু প্রতিপক্ষও তো 'বহেরা' বা 'কালা' হয়ে থাকে ! মানুষের বোধশক্তি যদি অবুঝ হবার ভান করে, তখন তো জোরে কথা বলতেই হয়!  এটাই প্রকাশ্য প্রতিবাদ, শিল্পের বিচারে স্থূল আর নিম্নশ্রেণির তৎপরতা, আত্মবিশ্বাসহীন কবির উচাটন !! চাঁদের যে পিঠে আলো নেই, তার জন্য হাহাকার বুঝতে পারি, যে পিঠে আলো আছে তা আমরা উপভোগ করি কিন্তু তার জন্য স্বীকারোক্তি কোথায় ?

 

 

 

৩১. 'স্বীকারোক্তি' বলতে ঠিক কি বুঝাতে চাইছেন , বুঝতে পারলাম না আর একটু যদি খুলে বলেন ?

 

 

সেলিম মুস্তাফাঃ এটা বয়স না হলে, নিজের কাছে নিজে না দাঁড়ালে, একা না থাকলে , হয়ত বোঝা যায় না কনফেশন নিজের- কাছে আত্মসমালোচনার অভ্যেস না হলে, সাহস না হলে, এটা অর্থহীন

 

 ৩২ কবিতায়দার্শনিকতা প্রভাবকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করেন ? জানি, আপনার স্বভাবসুলভ উত্তর হবে –‘ কিছুই ভাবি না!’ কিন্তু আমি চাইছি না আপনি ভাবে বিষয়টা দেখেন। আমাদের লেখার মধ্যেদেখা দর্শন তো স্বাভাবিকভাবেই থেকে যায়। প্রশ্ন তার মাত্রা নিয়ে। অনেকের  কবিতায় লালনের মত একটা দার্শনিকতা লক্ষ্য করা যায়, এটাকে আপনি কিভাবে দেখেন ?

 

 

সেলিম মুস্তাফাঃ  দার্শনিকতা শিখে কেউ কবিতা লিখতে বা সাহিত্য করতে আসেনা বহু নিরক্ষর গ্রাম্য কবি, নৌকার মাঝি, বাউল, ভিকিরি আছেন যারা এটা জানেন না, বোঝেন না, কখনো শোনেননি কিন্তু তাদের গানে,  কথায় দার্শনিকতা ফুটে ওঠে স্বাভাবিকভাবে কোন অসুবিধা তারা অনুভব করেন না

কিন্তু শিক্ষিত মানুষদের (কবি সাহিত্যিকদের) রচনায় দার্শনিকতার ব্যাপারটা খুব স্থূলভাবে আলগা হয়ে যেন বসে এর কারণ এরা কাজটা খুব সচেতনভাবে করেন রচনাটির গুরুত্ব বাড়বে ভেবে আমরা কি দার্শনিকতা জানার জন্য কোন রচনা পড়ি ? মনে হয় না তবে দার্শনিকতারও পাঠক আছেন তারা হলেন গবেষকরা সেটা তারা করে থাকেন নির্দিষ্ট রচনাকারের জীবনাদর্শ জানা বা বোঝার জন্য যা তার গবেষণাপত্রের জন্য দরকার কিন্তু সার্থক গবেষক তার আলোচ্য ব্যক্তির দ্বারা যুক্ত বা উদ্ধৃত দার্শনিক বাক্যটিকে গ্রহণ না করে, তার রচনার অভিমুখ থেকে উদ্ধার (স্থির) করেন তার জীবনাদর্শ, বা ভঙ্গিমা, বা বিশ্বাস বা অবিশ্বাস, বা ঘৃণা বা ক্রোধ বা ভালবাসা বা যে কোন আচরণ এবং অন্য রচনায়ও তার সমর্থন খোঁজেন লেখকের দার্শনিকতা তার আয়ত্তে থাকে না, থাকতে পারেনা , কারণ -ব্যাপারে তার মনযোগ না থাকার- কথা। কারোর জীবনের আজকের দার্শনিকতা আগামী কাল পালটে যেতেও পারে জীবন সব স্থির করে দেয় এর জন্য কোন মাথাব্যথা থাকার কথা নয় এছাড়া লেখক দ্বারা স্পষ্টিকৃত দার্শনিকতা তার রচনার সবচেয়ে দুর্বল অংশ। কারণ যে দার্শনিকতার তিনি উল্লেখ করেন সেটা কোনভাবেই তার নিজের নয়। যেকোন দার্শনিকতা যিনি সুচারুভাবে ভাষার অন্তরে আড়াল করতে পারেন , তিনিই দক্ষ লেখক ! অন্যের বাণী বা ধারণা গ্রহণ করলেই তো সেটা আর মৌলিক থাকেনা দার্শনিকতা কেউ সৃষ্টি করতে পারেনা স্থান কাল পাত্র যে প্রভাব ফেলে জীবনে তার অন্তিম অনুভব থেকেই হয়ত এমন কোন সিদ্ধান্ত বা সত্যের (অবশ্যই খণ্ডিত) ধারণা মনে গড়ে ওঠে, যার চ্যানেল থেকে সহজে পার পাওয়া যায় না এছাড়া আছে পূর্বধারণা, যার হাত থেকে কারো নিস্তার নেই। কবিতা বা এককথায় সাহিত্য আমার মতে দার্শনিকতা করার জায়গা নয়। আমরা তো কবি হতে চাই, দার্শনিক নয়

 

 

 

৩৩ হৃদয় থেকে জাম্পুই অব্দি ’  আপনার একটা গদ্য প্রকাশিত হয়েছিল সম্ভবত ১৯৮২ সালে।  ‘ত্রিপুরা দর্পণসংবাদপত্রএ। রচনার প্রেক্ষাপট অনুভব নিয়ে  কিছু জানতে চাই ? কবি সমর চক্রবর্তী কাছে এনিয়ে একটু কথা শুনেছিলাম। এবার সুযোগ যখন হল সরাসরি আপনার কাছ থেকে জানতে চাইছি।   

 

 

সেলিম মুস্তাফাঃ 'হৃদয় থেকে জম্পুই অব্দি ' একটি রম্য-ভ্রমণ গদ্য 'ত্রিপুরা দর্পণ ' সংবাদপত্রটির ১৯৮২ সালের পূজা সংখ্যায় প্রকাশিত হয় সদর্থে ত্রিপুরার প্রথম ঔপন্যাসিক দুলাল ঘোষ কাগজটির পক্ষে আমাকে উৎসাহিত করেন লাখাটির জন্য। আমি তখন ত্রিপুরা গ্রামীণ ব্যাঙ্কে সদ্য চাকুরি পেয়ে কাঞ্চনপুরে পোস্টিং পেয়ে জয়েন (২৪.১১.১৯৮০) করেছি, হ্যাঁ এক বছরের ওপর হয়ে গেছে তখন (এখনো) বড় ম্যাগাজিন বা বই ইত্যাদি কোলকাতা থেকে ছাপানো হতো কাজেই প্রুফ দেখার একটা জটিলতা থেকেই যেতো, ফলে আমার রচনাটির ভাগ্যেও কিছু ক্ষতচিহ্ন থেকে গেল আমার তৎকালীন ব্যাঙ্ক ম্যানেজার তপনময় চন্দ সব জানার পর আমাকে খুব উৎসাহিত করেন, এমনকি আমাকে কাজের ফাঁকেও লেখাটির জন্য সুযোগ করে দিতেন, কখনো কাজ কম থাকলে টিফিনেরপর না এলেও চলতো আমি ওখানকার মেস- বসে তখন লেখটিকে এগিয়ে নিয়ে যেতাম তিনি ব্যাংকের তরফে জম্পুই- তোলা কিছু ছবি দিয়েছিলেন যা আমার রচনাটির জন্য খুব উপযোগী হয়েছিল 'ত্রিপুরা দর্পণ ' -এর কাছে শ্ররত ছিল তারা ছবিগুলো ফেরত দেবেন দেন নি কথা ছিল জম্পুই- আমার যাতায়াত খরচ বাবদ কিছু দক্ষিণা (রাহা খরচ) দেবেন দেন নি। তারা আমাকে পত্রিকাটির একটা কপিও দিতে চান নি। আমি কাঞ্চনপুরের এজেণ্ট- কাছ থেকে প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে যাই একটি কপি আর 'ত্রিপুরা দর্পণ ' -এর সম্পাদককে বাজে ভাষায় একটা চিথি লিখে তা জানিয়ে দিই। পত্রিকাট প্রকাশের আগেই আমার কাছে খবর আসে যে আমার রচনাটি- নাকি সংখ্যার উল্লেখযোগ্য রচনা কিছু ছবি আমি নিজেও তুলেছিলাম, কিন্তু জম্পুই বেশিরভাগ সময়ই মেঘলা থাকে বলে আমার দীন ক্যামেরায় ছবি ভাল আসেনি। কিছু জিনিষের ছবি তোলার পর, ঐসবের মালিকরা শর্ত রাখেন যাতে তা প্রকাশ করা না হয়, সেটা অবশ্য চুরি ডাকাতির ভয়ে। আজ আমার কাছে কোন ছবি- নেই

পরবর্তী সময়ে এই লেখটি দেবব্রত দেব সম্পাদিত মাসিক সাহিত্যপত্র 'একুশ শতক '- প্রকাশিত হয়। কিন্তু আমার কাছে এর কোন কপি নেই পাণ্ডুলিপিটাও নেই আর আগের সেই জাম্পুই পাহাড়- নেই নেই সেই আদিম কৌমার্যের সৌন্দর্য বা রহস্য ! আমার লেখাটাই সম্ভবত জাম্পুই নিয়ে কোন প্রথম রচনা এখন তো দলবাবুরা যান, মন্ত্রীরা যান, আগে শুধু সৌন্দর্যপিয়াসীরা যেত, আর কমলার দালালরা যেত, এখন শুধু দালালরাই যায় কারণ সকলেই এখন কোন না কোন কিছুর দালাল ! আমার মনে হয় এই লেখাটা যদি তুমি পড়ে নিতে তবে সেটাই ভাল হত। কত বলব ? বলতে হলে পুরোটাই বলতে হয়, সেটা সম্ভব না সেখানে যা লেখা আছে তা সবই সত্যি আর বাস্তব। বানানো কোন কথা নেই আর খুব সাধারণ হলেও কিছু ইতিহাস পাবে

 

দেবুদার কাছে খোঁজ নিলে পাবে তাহলে আমিও পেয়ে যাবো

 

৩৪ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আপনার মননে কি কোন মৌলিক প্রভাব রাখেন ? তাকে কি অনুভবের কোন এক জায়গায় আপনার চিন্তারদিগ- দ্রষ্টা মনে হয় ?

 

সেলিম মুস্তাফাঃ রবীন্দ্রসঙ্গীত আমার প্রিয় সাহিত্যে তথাকথিত আধুনিকতার অনুষংগ ,উপকরণ তথা ব্যাধিগুলি জানতেন বা অনুমান তাঁর ছিল বলে, পূর্বাহ্নেই জীবনের প্রতি ভালবাসার পুনরুত্থানের কথার ইঙ্গিত দিয়েই রেখেছিলেন। জীবনকে স্বীকার না করে তো তার কাটা ছেঁড়া করা যায় না কিন্তু জীবনচক্র স্বীকার করার মধ্যে যে আনন্দ, তার স্বীকৃতি আজো তেমনভাবে দেখা যায় না কিন্তু তা আসবে, কারণ এক তরফা কিছু হয় না সম্প্রতি অনুপম মুখোপাধ্যায়ের একটি গদ্য রচনায় সেরকম একটি ইঙ্গিত পেলাম তিনি বলছেন পু্নরাধুনিক ( neo-modern, re-modern নয় ) এটা রবীন্দ্রনাথ কথিত সেই আশ্বাসের কথাই। নিশ্চয় তিনি আমার মননে আছেন সব তো পড়িনি, পড়লে আরো কত জানবো কে জানে ! তিনি সম্পূর্ণ একটি জীবনের অভিজ্ঞতার কথাই বলেছেন আধুনিক (৩০-এর দশকের পর থেকেই) সাহিত্য আমার মনে হয় পূর্ণতায় বিশ্বাসী নয় , বা আদৌ কোন 'বিশ্বাস'- আধুনিকতা বহন করে না ! সেই অর্থে রবীন্দ্রনাথ আজো বেশি প্রাসঙ্গিক

 

 

৩৫এই যে বললেন-জীবনচক্র স্বীকার করার মধ্যে যে আনন্দ, তার স্বীকৃতি আজো তেমনভাবে দেখা যায় না  কিন্তু তা আসবে, কারণ এক তরফা কিছু হয় না ” --এই কথাটা যদি আর একটু গুচিয়ে বলেন ?

 

 

সেলিম মুস্তাফাঃ জীবনের সব কিছু স্বীকার করে নেয়া একটা কথা আছে ' গিভেন পজিশন বা গিভেন সিচ্যুয়েশন  অর্থাৎ, যখন যেখানে যা দেয়া আছে, তাতে কোন প্রশ্ন না  করে  কাজ করে যেতে হবে।আরেকটা কথা আছে -'এজ ইজ হোয়ার ইজ' একই ব্যাপার, যেখানে যা আছে, সেই অবস্থায় দায়িত্ব নিতে হবে, সমাধান করতে হবে , মেনে নিতে হবে জীবন তো যুদ্ধ- ! যুদ্ধ কি কেউ সাজিয়ে দেয় ? আমার কথার অর্থ হল--জীবনচক্র এমনই ভাল সময় খারাপ সময় বলে যদি কিছু থাকে তা একটার পর আরেকটা আসে খুব বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি একটার ক্লাইম্যাক্স চূড়ান্ত হলেই শেষ হয়, এবং মনে হয় আরেকটা এলো। দিনের পর রাতের মত জীবনচক্র এরকমই ৩দিন উপবাস থাকার পর যদি কেউ ভাত খেতে পায় , ভাবে -- আমার সুদিন এলো একটা মেনে না নলে আরেকটা উপলব্ধি হবে না কবিরা, তাদের জীবনে যা নেই, শুধু তার কথাই বলছেন যা আছে তার কোন স্বীকৃতি নেই প্রশ্ন উঠবে --কার কাছে স্বীকৃতি ? উত্তর -- যার কাছে নালিশ, ক্ষোভ, তার কাছে ঈশ্বরও হতে পারেন , পাঠকও হতে পারেন কবি স্বয়ং- হতে পারেন যে চক্রের কথা বললাম, তা কাল্পনিক নয় 'সম্ভাবনার অংক' করলে দেখা যাবে যে, একটা কয়েন ১০০বার টস করলে, হেড আর টেলের সংখ্যা মোটামুটি আধা আধা হয়ে যায় ৫০/৫০ না হলেও ৪৫/৫৫ হতে পারে এর বেশি তফাৎ হয় না জীবন এমনই না হবে কেন সুদিন-এর প্রথম প্রমাণ- সে বেঁচে আছে, খাচ্ছে , ঘুমুচ্ছে দুর্দিনটা প্রথমেই মাথা থেকে আসে এবং সে তার পুরো বাঁচাটাই অস্বীকার করে বসে এজন্য- বলেছি এক তরফা কিছু হয় না এক হাতে তালি বাজে না রাত ছাড়া দিনের কোন অস্তিত্ব নেইমেরু প্রদেশে মাস দিন মাস রাত সেখানে জীবনচক্রের ঢেউগুলো বড় বড় আর কি এটা অনেকটা ভারতীয় অস্তিত্ববাদের ইশারা দেয়

 

৩৫ঃ প্রশ্ন ঃ  আপনার "ছোরার বদলে একদিন" কাব্যগ্রন্থটি নিয়ে মানিক চক্রবর্তী, অরুণ বণিক সহ কয়েকজন আগরতলা একটা আড্ডায় দীর্ঘ আলোচনা হয়েছিল আপনি তার একটা রেকর্ডও রেখেছিলেন আমি নিজেও শুনেছি সেসব আলোচনা সেই আলোচনার প্রেক্ষাপট নিয়ে আমাদের কিছু বলুন ! সেই আড্ডা, সেই উন্মাদনা, এবং চরম কবিতাপ্রেমী রসিকজনদের নিয়ে ! সেদিনের সে অভিজ্ঞতা আজও কি শিহরণ তুলে আপনার মনে ?

সেলিম : হ্যাঁ ঠিকই বলেছো সেদিনের সেই উন্মাদনা এখনো শিহরণ তোলে

১৯৮৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আমার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থছোরার বদলে একদিনকলকাতা থেকে বের করেন প্রদীপ চৌধুরী তাঁরক্ষুধার্ত-স্বকালপ্রকাশনা থেকে তার আগেই আমি চাকুরি পেয়ে গেছি এবং কাঞ্চনপুরেই আছি, যেখানে আমার প্রথম পোস্টিং হয়েছিল লেখা যা হচ্ছিল, সব পাঠিয়ে দিচ্ছি প্রদীপের কাছে ১৯৮০ সাল থেকে পাঠিয়ে যাচ্ছি, কোলকাতায় কারণ ত্রিপুরায় আশির দাঙ্গার পর তিনি ত্রিপুরায় শিক্ষকতার চাকুরি ছেড়ে ততদিনে কোলকাতা চলে গেছেন    বছর দুয়েক পর হঠাৎ একদিন তাঁর চিঠি পেলাম—‘আপনি কি মনে করেন, আজ থেকে  দশ বছর পরও কেউ আপনার কবিতা পড়বে ?’ আমি বুঝলাম যা বোঝার এর পর  দিন যায়, যেতেই থাকে

তারপর আবার একদিন হঠাৎ একটা পোস্টকার্ড পেলাম, Beg, borrow or steal, ৫০০ টাকা কালই পাঠান পড়লাম বিপদে আমার বেতন মাত্র ৪০০ টাকার মতো তখন ৫০০ টাকা কোত্থেকে পাঠাই ! দেবুদার (গল্পকার দেবব্রত দেব, আমার কলিগ, দুজনে এক ঘরেই থাকি) সঙ্গে কথা হল দুজনে মিলে আমাদের বস্‌ (ত্রিপুরা গ্রামীণ ব্যাঙ্কের কাঞ্চনপুর শাখার ম্যানেজার তপনময় চন্দ)-এর কাছে গেলাম তিনি ধর্মনগরের লোক, আমার বাল্যবন্ধুর ভগ্নীপতি, সে সূত্রে আমারও বললেন তিনি ধার দিয়ে দেবেন ৫০০ টাকা আমি রাজী হলাম না বললাম, ধার না-দিয়ে বরং একটা পারসোনাল লোন দিয়ে দিন মাসে মাসে বেতন থেকে কেটে নিয়ে যাবেন দিলেন পরদিন মনি-অর্ডার করে টাকা পাঠালাম তবে এর আগেই কিছু টাকা প্রদীপের কাছেই জমা করতে শুরু করেছিলাম সে টাকা হল আমার বইয়ের অগ্রিম বিক্রির টাকা অনেকেই টাকা করে আমাকে বইয়ের দাম বাবদ অগ্রিম দিয়েছিলেন সে সাহায্যের কথা জীবনে কখনো ভুলব না মোট খরচ হয়েছিল ১৪০০ টাকা ১২০০ টাকাতেই হতো, কিন্তু শেষ মুহূর্তে দেখা গেল বইয়ের একটা ফর্মা হারিয়ে গেছে রহস্যজনকভাবে তাই ওটা আবার ছাপাতে হয় যাক শেষ পর্যন্ত বই এলো বইয়ের দাম পরে দেখা গেল টাকা হয়েছে

কবে ঠিক মনে পড়ছে না, তবে সম্ভবত বই বেরোবার কিছুদিন পরেই আমি আগরতলায় যাই কিছু বই নিয়ে সেখানে আমার ঘনিষ্ট বন্ধুরা হলেন নাট্যকার তথা অভিনেতা মানিক চক্রবর্তী, কবি অরুণ বণিক, কবি দীপঙ্কর সাহা, কবি অরূপ দত্ত তাঁরা তো বই দেখে মহাখুশি সবাই বলল, চল একদিন বসি, সেলিমের বইটা আমরা সেলিব্রেট করা যাক

সেই মতো একদিন সত্যি সত্যি বসা হল মানিকের মূল ঘরের বড় কামরাটায়, মাটিতে মাদুর পেতে, গোল হয়ে উপরে যাদের নাম বললাম তাঁরা ছাড়া আরেকজন ছিলেন, তিনি শ্যামলতরু মুখোপাধ্যায় ঠিক মনে পড়ছে না, স্পভবত তিনি দীপঙ্কর সাহার পরিচিত এবং তার সঙ্গেই এসেছিলেন কোলকাতা থেকে গদ্য লিখিয়ে অরূপ দত্তের কাছ থেকে জানলাম তাঁর একটা চটি বইও আছে যার নামভারত ব্লেড

যাক, আসর শুরু হল মানিকের কণ্ঠে আমার কবিতা পাঠ দিয়ে সে কী গভীর কন্ঠ ! এর পর অন্যরাও একে একে যার যার পছন্দমতো পাঠ করে গেলেন একের পর এক কবিতা অরুণ, দীপঙ্কর, অরূপ সকলেই

ঐ পুরো অনুষ্ঠানটা আমি টেপ-রেকর্ডারে রেকর্ড করি সেটা এখনো আছে আমার কাছে কথাবার্তা তত পরিষ্কার নয়, তবু কান পেতে শুনলে বেশ বোঝা যায় আলোচনার চেয়ে পাঠই হয়েছিল বেশি আর আলোচনার কী-ইবা, থাকে তখন বলো নতুন বই পাঠ করা, তা-ও দূর মফস্সল থেকে আসা এক কবির কবিতা সবচেয়ে  গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার সেটাও ছিল যে, বইটা প্রকাশ করেছেন প্রদীপ চৌধুরী, যিনি কিছুদিন আগেও আগরতলা তথা ত্রিপুরায় ছিলেন, এবং এখানে উপস্থিত সকলেরই অত্যন্ত প্রিয় মানুষ

পাঠের মাঝে মাঝে হাসিঠাট্টা, চা, চানাচুর, মুড়ি আর সিগারেট তো ছিলই হতে পারে ঠিক সন্ধ্যের সময় মানিকের পাশের বাড়ি কালুয়ার ঘরেও আমরা গিয়েছি বিভিন্নজনের ভিন্ন ভিন্ন নেশার কারণ ছাড়াও কালুয়ার ঘরটা ছিল এমন অসাধারণ এক আড্ডার ঘর, যার কাছে কলকাতার কফি হাউসের আড্ডাও ম্লান মনে হতে পারে কারণ সেখানে কেবলই শিল্প-সাহিত্য-নাটক-সিনেমা আর বিভিন্নজনের সদ্যপঠিত কোনো বিখ্যাত গ্রন্থ নিয়েও খোলাখুলি আলোচনা হত সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার যে, কালুয়া, যে নাকি আগরতলা পৌর সভার স্যানিটেশন কর্মচারী, যার চোখ সবসময় গাঁজার নেশায় লাল হয়ে থাকত সে-ও নির্দ্বিধায় নিঃসংকোচে সেই আলোচনায় যোগ দিত এটা আমার কাছে তখনই খুব বিস্ময় কর মনে হত কিন্তু বিস্মিত হবার কারণ আসলে তেমন ছিল না কারণ মানিক চক্রবর্তীর প্রধান এবং এক নম্বর শ্রোতাই তো ছিল সে ! আর মানিকের শ্রোতা মানেই তো সাংঘাতিক ব্যাপার কারণ মানিকের আলোচনাই হত সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, কাম্যু, কাফ্কা, জয়েস এমনতর বিরল সব সাবজেক্ট নিয়ে    পৃথিবীর মহত্তম জিনিশগুলোই তো মানিকের বিষয়-আশয় ! এমন লোকের দেখা জীবনে আমি অন্তত পাব না, অন্য কেউ পাবে কিনা, তা- সন্দেহ আছে ত্রিপুরার সৌভাগ্য এবং একই সঙ্গে দুর্ভাগ্যও যে মানিকের মতো প্রতিভা এখানে জন্মেছিল কেউ চিনলোই না তাকে, এখনও না কিছু নিতেই পারলো না তাঁর কাছ থেকে ! হয়ত কেবল কালুয়াই চিনেছিল তাঁকে ! নইলে কী করে সে মানিককে সহ্য করতে পারত !! এই কালুয়াকে নিয়ে পরবর্তীতে আমার একটি কবিতা হয়, যা আমার পরবর্তী কাব্যগ্রন্থইতি জঙ্গল কাহিনি”- একেবারে শেষ পৃষ্ঠায় আছে একটু শোনো

        “যে-খোলস চাপানো ছিল তা কি খুলে পড়েছে ?

        পান করা হয়েছে কি অভয়নগরীর মদ ?

        তবে যাওয়া হোক কালুয়ার ঘরে

        তার গাঁজা-লাল চোখে আজ আমাদের ছুটির নিমন্ত্রণ !... …

 

                         … …পৃথিবীর পুরুষেরা আজ

কালুয়ার ঘোরে যাবে,

দগ্ধ গাছের মতো কালুয়ার উচ্ছন্ন শরীর

কালো পতাকার মতো কালুয়ার নাম

জ্বলন্ত উনুনের মতো কালুয়ার দুই চোখ

আজ দুই চোখে আমাদের সকলের

ছুটির নিমন্ত্রণ

       

 

কথায় কথায় অনেক দূর চলে এলাম আজ মানিক নেই, অরুণ নেই, দীপঙ্কর নেই, কিন্তু আমার সৌভাগ্য যে, তাঁদের কণ্ঠ রয়ে গেছে আমার কাছে অরুণের সেই বিখ্যাত হাসি- হা হা হাঘর ফেটে যায়আকাশ ফেটে যায়আজ আমার বুকটাও ফেটে যাচ্ছে

 

 

 

 

 

 

আপনার কবিতায় 'আমি' শব্দের ব্যবহার কি একান্ত আপনার ব্যক্তিগত চরিত্র ? এক ধরণের আত্ম-জৈবনিক ক্রমবিকাশ আপনার কবিতা ? আপনি কি বলেন ?

 

সেলিম মুস্তাফাঃ  হ্যাঁ তবে কয়েক রকম আমি আছে মনে হয় কিছু তুমিও আছে যেগুলো আসলে আমি পড়তে পড়তে পেয়ে যাবে

 

৩৭সময়ের নিরিখে যে কবিতা এখন আমাদের চোখে পড়া উচিত,তা যেন হচ্ছে না মনে হচ্ছে বর্তমান সময়ের কবিদের চারদিকে এমন এক পরিখা,যেখানে ছিন্ন হয়ে গেছে উদ্বর্তনের তাবৎ ধারাবাহিকতা আপনার এই মন্তব্যের পেছনে নিশ্চয়ই এক গভীর  নিরীক্ষা রয়েছে। কোন কবির নাম না-করে  শুধু সময়ের এই সংকট নিয়ে আপনার ব্যক্তিগত আত্ম-বিশ্লেষণ যদি আর একটু বিস্তারিত করে বলতে বলি,কি বলবেন ?   

 

উত্তর কবিতার গোটা ধারাবাহিকতায় যে কবি ইতিমধ্যে অবগাহন সেরে ফেলেছেন, তাবৎ কাব্যসাহিত্য যার ইতিমধ্যে অধীত, তাঁর মনন, তাঁর দার্শনিকতা, জীবনকে আর একমুখী বা একপেশে করে দেখার অবস্থায় থাকার কথা নয়। আজও কারো কারো বা বলা যায় ৮এর দশক থেকেই এখন পর্যন্ত কমবেশি সকল নবীন কবিদের লেখায় জীবনের নঞর্থক দিকটাই জোর পড়ছে বেশি যে জীবন পেয়েছেন, যা ভোগ করে যাচ্ছেন যদৃচ্ছভাবে, তার কথা কোথাও দেখি না এই অস্বীকার, এই ভুখা-নাঙ্গা পরিচিতি যেন নিজেকেই লুকোবার মুখোশ যা সত্য ছিল বিগত দশকগুলোতে, তা, আমরা জানি আর সত্য নয় এই সব এলিট কবিকুলে দেখি উচ্চমার্গের দার্শনিকতা, যা কোন নির্দিষ্ট কবির ক্ষেত্রে, বা তার এপর্যন্ত রচনার নিরিখে হয়ত সত্য নয় উপরন্তু দার্শনিকতা, আমার মতে কবির কাজই নয় দার্শনিকতাকে ওভারল্যাপ্ করেই কবিতার প্রকাশ একাধারে থাকে, কিন্তু দুটো এক জিনিষ নয় দুটো আলাদা মাধ্যম, যেখানে একে অপরকে প্রচ্ছন্ন রেখে নিজেকে প্রকাশ  করে   তো গেল একটা দিক

আরেকটা আরেকটা দিক নেহাৎই টেকনিক্যাল বলা যায় সেটা ভাষাগত অতি বিশেষণে ভারাক্রান্ত অনুপলব্ধ জটিল ভাব ইমেজারী এমন এমন বিচ্ছিন্নতা, যা থেকে টের পাওয়া যায়, কবির সাহিত্যপাঠ খুবই দুর্বল বা একেবারেই শূন্য

 

কিছু দেরী হল। ফেসবুকের ফুটপাথে হারিয়ে যাওয়া কবিরা সাদা কাগজের পৃষ্ঠায় কিছুতেই ফিরে আসতে পারছেন না। এর ভালমন্দ দোষগুণ বিচার করার ক্ষমতা কারো নেই। যা করার সময় করবে। অন্যদিকে, হাংরি-ফেরত,কৃত্তিবাস-ফেরত,দেশ-ফেরত কিছু কিছু কবি মরীয়া হয়ে মাথা তুলতে চাইছেন শরীরের স্পান্ডেলাইটিস মনের গেঁটেবাত সরিয়ে। দায় যদি কোনদিনই না-ছিল, আজ কোন দায় তবে তাড়া করে এইসব বানীকুমারদের! ফুটপাত থাকুক না পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন !” ‘পাখি সব করে রব, মার্চ -২০১৪ )

 

আবার , কবিদের হয়ত সাবধান হবার সময় এসে গেছে।ফেসবুক সমস্ত সৃজনমূলক কাজকে ভোঁতা করে দিচ্ছে(সমীক্ষা) কিছু ভাসমান কবি(?) শিল্পী(?)ফলস লেবার-পেইন’- গোঙাচ্ছেন। এবং ইতিমধ্যে অন্যের বিরক্তির কারণও হয়ে উঠেছেন কেউ কেউ। আমার প্রিয় কবিদেরও কেউ কেউ এই ইঁদুর-কলে পড়েছেন দেখে কষ্ট হয়। এত মুখোশের ভিড়, কে কোথায় বোঝা দায় ! এক ক্লিকে যদি হারিয়েই যাওয়া,কেন তবে আসা !” ( ‘পাখি সব করে রব, জুন-২০১৪ )

 

এখানে আড়ালে আবডালে অনেক কথাই আপনি বলে ফেলেছেন। আমি সে-সব ব্যাপারে না-গিয়ে, আপনার কাছে মোদ্দা যে বিষয়টা জানতে চাইছি তাহল, আপনি কি মনে করেন না, এভাবেও একটা কবিতার আড্ডা সম্ভব, যা আপনারা প্রযুক্তির কারণে আগে হয়ত কল্পনা করতে পারেন নি ? না, এখানে একটা দায়-সারা অবাধ ‘Like’এর প্রশ্রয় আছে , যা কোনো–না-কোনোভাবে তরুণ মননশীল কবি হয়ে উঠার ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে উঠছে ? আপনার একান্ত ব্যক্তিগত মূল্যায়ন কি বলে ?   

 

 সেলিম মুস্তাফা  না সাহিত্যের আড্ডা বলতে যা বোঝায়, তা অনলাইনে হবার কথা নয় আড্ডা আর সেমিনার এক জিনিষ নয় এখানে যা সম্ভব, তা সেমিনার জাতীয় কিছু যেখানে সাজিয়ে গুছিয়ে লিখে বা মুখস্থ করে, বেফাঁস কিছু না-বলে, নিজের পোশাকি পরিচয় অক্ষুণ্ন রেখে, পঠিত বিদ্যা জাহির করে, অজস্র কোটেশন দিয়ে বক্তব্য রাখা হয়ে থাকে এখানে বক্তার আসল চেহারার দেখা পাওয়া সম্ভব হয় না আর আড্ডা হলো এর সম্পূর্ণ বিপরীত ব্যাপার এখানে বাস্তবিকভাবে মুখোমুখি হতে হয় বক্তার অভিব্যক্তি নজরে আসে অন্যের প্রখর দৃষ্টির সামনে বক্তব্য রাখতে হয় অগোছালো ভাষায় স্বতস্ফূর্তভাবে কিছু গোপন করলে তা ধরা পড়ে যায় কাজেই ফেসবুকের আড্ডা নকল আড্ডা তবে ভবিষ্যতে, ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে তা কিছুটা সম্ভব হতে পারে, যদিও সেখানে সময়ের আর খরচের একটা চাপ থেকেই যাবে কবিতা কখন কোন রূপ নেয় তা বলা মুস্কিল এখন ফেসবুকে যে যে কবিতা আমরা পড়ি, সেগুলোর প্রকৃত পরিচয় জানা সম্ভব হয় না, কবিকে না-জানার কারণে, তার সাহিত্যপাঠের ইতিহাস না-জানার কারণে তবু এটাই হয়তো বর্তমানের কবিতার প্রকৃত পরিচয় সময়টাই এমন তাই কবিতাই এমন সে-কবিতা কালজয়ী হবে কি হবে না, সেটার উত্তরদাতা একমাত্র সময় অনেকেই তৎক্ষণাৎ কবিতা লেখেন মোবাইলে ফেসবুক খোলার পর আগে লিখিত নয় বানান সম্পর্কে অত্যন্ত উদাসীন, যা থেকে তার ভাষাজ্ঞান, শব্দজ্ঞান, কবিতার প্রতি বা সাহিত্যের প্রতি শূন্য-কমিটমেন্ট ইত্যাদি বহু ব্যাপার এক ঝলকে ধরা পড়ে যায় এছাড়া এটা আদৌ তার লিখিত লেখা কি না সে-সন্দেহও জাগে কখনো কখনো একজনের কবিতা দেখা যাচ্ছে / জন চুরি করে ফেলছে অধিকাংশ কবিতা এবং অনুগল্পই অত্যন্ত জলো, এবং ইস্যুভিত্তিক রচনা ধর্ষণ খুন ধর্ম রাজনীতি নিয়ে ওয়ান-টাইম স্লোগানধর্মী, এবং বিভিন্ন দিবস’, যেমন মা দিবস, বাবা দিবস, নারী দিবস, রাখী দিবস, বন্ধু দিবস, ভ্যালেন্টাইন দিবস, শিশু দিবস, ইত্যাদি ইত্যাদি উদযাপনের কোরিওগ্রাফী মনে হয় সাহিত্যে, হয়ে ওঠার যে একটা ব্যাপার আছে, সেটা ফেসবুক এখনো বোঝেনি তবে অনেকেই কিছু প্রবন্ধ জাতীয় রচনা পোস্ট করেন, বা পুনর্মুদ্রিত করেন, সেটা আমাদের কাছে ফেসবুকের সুফল

তবে এটাও ঠিক যে, আমি যখন এই কথাগুলো লিখেছিলাম, তার থেকে অবস্থা এখন অনেক পালটে গেছে ত্রিপুরারই কয়েকজন তরুণ কবি , মাঝে মাঝে একটু বিভ্রান্ত মনে হলেও, ভালো লিখছেন। তেমনি বাংলাদেশের কয়েকজন নবীন কবি খুবই ভালো লিখছেন আশা করি এই কবিতা রচনায় তারা আরও কমিটেড হয়ে যাবেন খুব দ্রুত অনেক সময় অনেকেই মন্তব্য করতে গিয়েও নানা কারণে সঠিক কথাটি গোপন রেখে দেন, বিতর্কে জড়িয়ে যাবার ভয়ে, এমন আমি লক্ষ্য করেছি অনেক ব্যাপারই তাৎক্ষণিক বলে বিস্তৃত মন্তব্য অনেকেই এড়িয়ে যান সঠিক মন্তব্যের জন্য আবার অনেক সময় ব্যাখ্যা আর কৈফিয়ৎ দিতে হয় তাই সঠিক মন্তব্য সবসময় আসে না উপরন্তু কিছু অসাহিত্যিক আছেন যারা মন্তব্যে যোগ দিয়ে বন্ধুকৃত্য সারেন, ফলে আলোচনা সঠিক লক্ষ্যে কখনোই যায় না

 

৩৯২১শে ফেব্রুয়ারী। মাতৃভাষায় কথা বলারয় দাবিতে আত্মবলিদানের এক রক্তঝরা দিন।২১শে ফেব্রুয়ারী দেশ কালের সীমানা ডিঙিয়ে আজ সারা বিশ্বের মাতৃভাষাদিবস।কিন্তু যুদ্ধ শেষ নয়। সাম্রাজ্যবাদের যত অস্ত্র রয়েছে তার মধ্যে ভাষাও একটি। বলা যায় ভাষাই আজ সাম্রাজ্যবাদের সুনিশ্চিত এবং অমোঘ হাতিয়ার, যা কর্কটরোগের মত অলক্ষ্যে ছিনিয়ে নিয়ে চলেছে আত্ম-সর্বস্ব লভোভী পরশ্রীকাতর মানুষের ঠোঁট জিহ্বা।এই রোগ চিহ্নিন্ত না করলে ভাষিক পরাধীনতা আর বেশি দূর ন্য।(২১--২০১৪ ইং)”  

 

ফেব্রুয়ারী। বাঙালি মাত্রেই অত্যন্ত আবেগের একটি মাস। ২১শে ফেব্রুয়ারী আজ বিশ্ববন্দিত মাতৃভাষা দিবস। ঘটনা আমরা জানি কিন্তু এই দিনটির প্রকৃত তাৎপর্য ধারণের ক্ষমতা আমাদের হৃদয় থেকে ক্রমশই যেন লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে বত্তৃতার সময় আমাদের মুখ থেকে যা যা উচ্চারিত হয়, তা প্রতিবছর প্রায় একই। সন তারিখ নাম অশ্রু একইভাবে নির্গত হয়ে বয়ে যায়, উবে যায় শূন্যে, মহাশূন্যে, এগারো শহিদের ঠিকানাহীন সাকিনের দিকে।এই তারিখের পর বাংলা আর মন টানে না। জিহ্বা তালব্য করে ন্যাকা আর ন্যাকীদের খুকি-বাংলা শুনে যাই সারাটা বছর (২১--১৬” –  দুই  মাতৃভাষা  দিবসে দুই রকম সংকটের দিকে আপনি অঙ্গুলি নির্দেশ করছেন।   আমি  আপনাকে এই ভাবনার পরিপ্রক্ষিতে সরাসরি যে প্রশ্নে আসতে চাইছি তা হল, আপনার কি মনে হয়  আগামীতে এর ফলে বাংলা সাহিত্য ভাণ্ডার দুর্বল হতে চলেছে ? একটা প্রজন্মের বাংলাশিক্ষা কাঠামোগত ভঙ্গুরতা থাকলে, এর উপর সাহিত্য ভাবনার  শক্ত ভিত কি করে গড়ে উঠবে ? আপনি কি মনে করেন ?  

 

সেলিম মুস্তাফা  বাংলা ভাষা শুধু দুর্বল নয়, এমন চললে এই ভাষা লুপ্ত হতে মনে হয় না বেশি সময় নেবে হিন্দি আর বাংলা দুটোই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে ইংরাজী দ্বারা, এবং তা হচ্ছে আমাদের হীনম্মন্য উচ্চাশার মাধ্যমেই, হচ্ছে নিজের ভাষাকে নিজেই দুর্বল ভাবার কারণে, হচ্ছে ভারতীয় যেকোন ভাষায় উচ্চশিক্ষার উপযুক্ত বইয়ের অভাবে ‘‘আমার ছেলে বাংলা জানে না, বা বলতে পারে না’’, এটা আজ স্ট্যাটাস সিম্বল এসব নতুন কথা নয়। বহুদিন ধরে বলা হচ্ছে, বহুদিন ধরে শোনা যাচ্ছে যারা বাইরে এসব বলেন, তারাই ঘরে শিশুদের বাংলা পড়াতে উৎসাহী নন অনুকরণ আর মিমিক্রি বাঙালির প্রিয় নেশা অভিভাবকদের চাপে(?) ত্রিপুরাতেই কত সরকারী স্কুল বাংলা মিডিয়াম থেকে ইংলিশ মিডিয়ামে বদলে দেয়া হয়েছে, আরও হচ্ছে কোলকাতায় বর্তমান প্রজন্ম যা- বাংলা বলছে তা ইংরাজীর ভঙ্গিতে বলছে,””-এর বদলেউচ্চারণ করছে টিভি খুললেই এই জিহ্বা উল্টিয়ে কথা বলার ধরণ টের পাবে মাতৃভাষায় কবিতা না-লিখে, মাতৃভাষায় সাহিত্য না-করে অনেকেই ইংরাজীতে লিখতে চাইছে, বা লিখছে এর পেছনেও হীনম্মন্যতা কাজ করছে যারা প্রতিষ্ঠিত লেখক তারা ইংরাজীতে লিখে পরে তা তাদের মাতৃভাষায় অনুবাদ করে বা অন্য কাউকে দিয়ে করিয়ে বাজারের ফায়দা তুলছে, যেমন চেতন ভগত, ঝুম্পা লাহিড়ী, বিক্রম শেঠ,এবং আরও অনেকে বাংলা যাদের মাতৃভাষা, তারাও এমন শুরু করেছেন ইদানীং ইংরাজী জানার অহংকারের (?) আড়ালে এখানে সেই ঔপনিবেশিক মানসিকতার ইনফেরিওরিটি কমপ্লেক্স- মূলত কাজ করছে সুতরাং বাংলা যে মিউজিয়ামে যাবে না, তার গ্যারান্টি কোথায় ? অবশ্য গেলেই বা কী ক্ষতি ? বাঙালির বাঙালিত্ব তো কোথাও দেখা আর যায় না না পোষাকে, না ঐতিহ্যে অথচ অন্যান্য রাজ্যের দিকে তাকিয়ে দেখো, গুজরাট, বিহার,পাঞ্জাব, রাজস্থান, আসাম, সকলেরই মাতৃভাষা জাতিগত ঐতিহ্যের প্রতি কেমন টান এমনকি বাঙালিরাও বিহুর নাচ নাচতে পারলে খুব খুশি হয় এবং একদিন এই বিহুও যদি নষ্ট হয় বাঙালির দ্বারাই হবে কারণ তারা বিহুর সঙ্গে ব্রেক ডান্স মেলাবার চেষ্টা করবে অসমীয়ারা এটা জানে, তাই তারা বাঙালি অপছন্দ করে এটা একটা উদাহরণ দিলাম কিছু করার নেই বাংলা যেখানে গিয়ে থামবে, যেখানে নিয়ে গিয়ে থামানো হবে, তাতেই হয়তো সাহিত্য হবে কারণ বাঙালি আবার সেই জাতি, যে খুব আবেগপ্রবণ, রাধাভাব তার অস্তিত্বে জড়ানো, তাই ঘুরে ফিরে গোয়ালে ফিরে আসতেই হবে, সাহিত্য তাকে করতেই হবে, কবিতা তাকে লিখতেই হবে, তা ভাষা যা- হোক না কেন আর সবকিছুর পেছনে রাজনীতি তো আছেই রাজনীতির জন্য কে কোথায় কী বলি দেবে তার কোন ঠিকানা নেই দিল্লির ভাষা ভেবে দেখো হিন্দি আর অন্যান্য বহু ভারতীয় ভাষার সঙ্গে ইংরাজী মিশে আছে প্রায় ৬০ শতাংশের মতো গোয়ার ভাষাও তাই এখনকেন নাএই বাক্যবন্ধের জায়গা নিচ্ছেকেন কি হিন্দিরকিঁউ কিঅনুকরণে সেদিন টেলিফোনে একজন অধ্যাপককেকেন কিবলতে শুনলাম ভগীরথ মিশ্র(খুব সম্ভবত) একটা গল্পের মধ্যে দুবার এই শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছেন এবং পংক্তিটাই লিখেছেন এমনভেবে যাতে এটা তিনি ব্যবহার করতে পারেন তার এই শব্দ-লোলুপতা, এই অনুকরণপ্রিয়তা, বলাবাহুল্য আমার ভালো লাগেনি

 

 

৪০ প্রশ্ন ভোরের বাতাসে ভেসে আসে রেলের বাঁশিধর্মনগর স্টেশন থেকে ভাষাশহিদ স্টেশনের দিকে যাত্রা করেছে একটি আহত ট্রেন’ -- ২০১৪ সালেঅক্ষর পাবলিকেশনথেকে আপনার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থভাষাশহিদ স্টেশনের দিকে একটি আহত ট্রেন’- কবিতাটি শেষ হচ্ছে রকম আসলে আমি এই আজবস্টেশনএবং তারআহতহওয়ার কারণ জানতে চাইছি ?  ‘বাংলা  আমার কী?’- কবিতার এই লাইনটিতে একটা ব্যঙ্গ ব্যঞ্জনারও ইঙ্গিত পাচ্ছি সব মিলিয়ে আসলে আপনার এই কবিতার ভাবনার প্রেক্ষাপট জানতে চাইছি ?

 

সেলিম মুস্তাফাঃ    ভাষাশহিদ স্টেশন বলতে শিলচর স্টেশনের কথাই বলেছি বাংলা ভাষা নিয়ে ওখানেই প্রাণ দিলেন কতজন ১৯৬১ সালের ১৯শে মে দাবি উঠেছিল এই স্টেশনের নাম পরিবর্তন করে নাম হোক ভাষাশহিদ স্টেশন হলো না অথচ কেন্দ্রিয় সরকারে তখন ছিলেন বেশ -জন বাঙালি এই আশাভঙ্গ নিয়েই আক্ষেপটি রূপায়িত বাঙালিরা মুখে যা বলে তা খুব কমই রূপায়িত করতে পারে অথবা যা রূপায়িত করে, বলে তার চেয়ে বেশি অন্যদিকে বাংলা ভাষার বিকৃতিও এই বাঙালিদেরই অবদান পশ্চিমবঙ্গীয়রা কিছুদিন আগেও ১৯শে মে- খবরই জানতো না ইংরাজী শিক্ষার প্রাদুর্ভাবে ওরা জিহবা উল্টিয়ে’-কেবা’- মতো করে উচ্চারণ করে এটা ব্যাকরণসিদ্ধবর্ণবিপর্যয়’- বলা যায় না নেহাতই ন্যাকামি যেমন ওদের উচ্চারণেভারতীয় নারীহয়ে যায়ভাড়তীয় নাড়ী এমন শোনার চেয়ে সাপের ছোবল খাওয়া ভাল বাংলা যেসব চ্যানেল আছে, সেগুলো বেশিরভাগই অবাঙালির সবগুলোতেই ভাষাগত ন্যাকামির রমরমা আর শিলচরে তো শুনেছি এই ১৯শে মে নিয়ে দলাদলি সকলেই এটাকে পুঁজি করে নিজেদের স্বার্থ আদায়ে ব্যস্ত কাছাড়ের অধিকাংশ কবি সাহিত্যিকরাই প্রচারের লোভে স্বভূমি ত্যাগ করে কোলকাতাবাসী হয়েছেন অনিল সরকারের দৌলতে ত্রিপুরায় ১৯শে মে-কেমাতৃভাষা প্রণাম দিবসহিসেবে মান্যতা দিয়ে পালন করা হয় এটা ওদের মাথায়ই আসেনি তবে নিমন্ত্রণ পেলে ওরা আসেন ত্রিপুরায় আমাদের শিলচর যেতে হয় স্টেশন দেখলে বুকের ভেতর হাহাকার ওঠে পলাশীর পরাজয়ের কথা মনে হয় বুকের ওপর পাথর চাপা নিয়ে কত শহিদ এখানে শুয়ে আছে !

 

৪১ প্রশ্ন হে সন্ধ্যা,/ হে দিন অবসান/ কথা দাও!/ তমসায় যাকে দেখি/ ঊষার আলোয় যেন তাকে ফিরে পাই’ – এইরকম একটা দৃশ্যভাবনার প্রেক্ষাপট হয়তো ৮০- দশকে ছিল আপনি কি আজও সেই সংকট বহমান দেখতে পাচ্ছেন? কোন্ দৃষ্টিকোণ থেকেই বা দেখতে পাচ্ছেন ?

 

 

সেলিম মুস্তাফাঃ     এটা -এর দশকের একমাত্র হবে কেন ? সারা বিশ্বের সব জায়গায় সময় আর পরিবেশ যেমন একই রূপ নিয়ে আসে না, একটা দেশে বা একটা রাজ্যে বা একটা গ্রামেও সমসত্ত্ব (Homogeneous) হয়ে অর্থাৎ সমানভাবে সময় পরিবেশের প্রভাব দেখা যায় না রাজধানীর ঔজ্জ্বল্যের সমকক্ষ কখনোই একটা মফস্সল হতে পারে না তাই তুমি -এর দশকের একটা দৃশ্য ৩০৮০ সালেও পেয়ে যেতে পারো মূল ব্যাপারটা বৈপরীত্যের ফারাকটা এই ফারাক কখনো কমে না, কমবে না মানুষ চাঁদে গেলেও এই ফারাক বজায় থাকবে একটা শ্রেণিহীন সমাজ কখনোই হবে না, হতে পারে না এই ইউটোপিয়া চিরকালই ইউটোপিয়া থেকে যাবে আমার লেখাটারও দিশা হয়তো সেদিকেই যে মলিন একটি বালিকার (অস্পষ্ট বালিকা) বিষণ্ন একটি ছবি বিষণ্ন আলোকে (ভাঙা মোম) এখানে দৃশ্যগত হয়, আমি চাই ভোরের আলোয়ও তাকে যেন পাই সুদিন আসবে, অথচ সে থাকবে না, এমন যেন না-হয় কিন্তু ট্র্যাজেডি এটাই যে, সন্ধ্যা আর ভোরের এই বৈপরীত্য কখনোই ঘোচে না হয়তো একটা জীবনের, এমনকি একটা সমাজেরও বয়ে চলার অন্তর্নিহিত শক্তিটাই (Force) এখানে লুক্কায়িত ব্যাপারটা নিষ্ঠুর, কিন্তু সত্য ভাঙা মোম জ্বলে জ্বলে নিঃশেষ হয়ে যায় ভোরের আশায় ভোরের সঙ্গে তার দেখা হয় না কোনদিন ভোর আসে, রাতের কথা তার মনেও পড়ে না ভাঙা মোমের মতো বালিকাটিও কোন না কোন জীবনের দিকে অদৃশ্য হয়ে যায়, হয়তো অন্ধকারেই মিলিয়ে যায় বিস্মৃতি তাকেও আবিষ্ট রাখে সে নিজেও ভুলে যায় তার অতীতের কথা আরও অনেক রকম ব্যাখ্যা হতে পারে আমি আমার কথা বললাম

 

৪২ প্রশ্ন কথা দিয়ে যারা পথে নামিয়েছিল / তাদের কথা মনে পড়ে,/ অনেক দূর থেকে তাদের পরোক্ষ স্বর/ ভেসে আসে-’ কিংবাপার্টি অফিস থেকে দুর্গাপূজার মিটিং- / কল্ দিয়েছে, যার অসুবিধা / তার বাড়িতে যাবে সকলে মিলে- / পঞ্চাশ কাপ চা একশো ব্রিটানিয়া -/ মামামিয়া!/ এই গ্রাম আমাদের গ্রাম’ (আমাদের গ্রাম/ভাষাশহিদ ষ্টেশনের দিকে একটি আহত ট্রেন’ -- এককথায় রক্ষকই ভক্ষক! সব কবিরই মনে একটা কাল্পনিক সমাজব্যবস্থা থাকে কম তো রাজনৈতিক পালাবদল বা পরিবর্তন হল না ! তারপরও আপনি স্বপ্ন দেখেন ? ঠিক কি রকমের পরিবর্তন আপনি দেখতে চাইছেন ?

 

সেলিম মুস্তাফাঃ   মানুষের পরিবর্তন না হলে সমাজের পরিবর্তন কী করে হবে ? সমাজ তো মানুষেরই সমষ্টি ! মানুষই তো পাল্টাচ্ছে না রাজনীতির কথা যদি ধরি, দেখতে পাই, নীতিকথা কোনটাই খারাপ নয় সমাজ নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখার কিছু নেই স্বপ্নের কোন কমতি নেই কিন্তু সেগুলো কেউ তো সফল করছে না সবগুলো রাজনৈতিক দল, বা সব শাসকই এক রকম একই লোক দল পালটে পালটে সরকারে ঢুকে যাচ্ছে তার চরিত্র তো পাল্টাচ্ছে না আমরা একই লোককে ভোট দিচ্ছি বার বার তার কথায় মুগ্ধ হয়ে এছাড়া আর বিকল্পও নেই সে অশিক্ষিত, সে লোভী, সে ভ্রষ্টাচারী, সে নিম্নরুচির জেনেও তাকেই আমরা সরকারে পাঠাচ্ছি সে যাচ্ছে টাকার জোরে, গায়ের জোরে, দলের জোরে বারবারইলাঠি যার মাটি তারহয়ে যাচ্ছে এই কথাটা, অনুরূপ কথা Survival of the Fittest এর চেয়েও শক্তিশালী শুধু আমি নই, সকলেই প্রথমত চায় ভ্রষ্টাচারবিহীন একটা ব্যবস্থা এটা হলে বাকি সব আপনাআপনি বহুদূর এগিয়ে যাবে

 

৪৩ প্রশ্ন আমি সারাদিন ভাবি তোমার মতো হব,/ তোমার মতো দীর্ঘ, বড়ো.../ তারপর সারারাত ভাবি/ যেন তোমার মতো / কিছুতেই না-হই’ (হওয়া না-হওয়া’ -- আপনার সমালোচকরা আড়ালে-আবডালে প্রায়ই বলে- ‘সেলিম বেশির ভাগ কবিতায় পলায়ন করে শেষ অবধি সাতেও থাকে না পাঁচেও থাকে না সব সময় নিরাপদ একটা দূরত্ব বজায় রেখে চলেআপনি কি বলবেন ?

 

 

সেলিম মুস্তাফাঃ এটা পালিয়ে যাওয়া বটে এক অর্থে অতিসরলীকরণ আর কি মোটা দাগের না-হলে অনেকেই অনেকেরই অনেক কিছু চোখে পড়ে না আমি নিয়ে ভাবিত নই কবি কি কোথাও থাকে ? পদ্মপাতায় জল পড়ে আর তাকে নাড়িয়ে দিয়ে মিশে যায় জলসমুদ্রেজনসমুদ্রে মিশে যায় কবি কবিতায় একটা দোলাচলের আভাস রয়েছে এটাই উপজীব্য কখনো সূর্যের মতো হতে চাই, সূর্য মেঘের আড়ালে চলে গেলে, আর তার মতো হতে চাই না এই দোলাচলই জীবন, এর থেকে মুক্তি নেই কারণ জীবন টের পায় সবই আপেক্ষিক যে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, সে গৃহবাসী আর থাকে না, থাকতে পারে না যখন যা সত্য মনে হয়, আমি তা- বলতে চাই আমি দার্শনিক হলে যাচাই করতে যেতাম আমাদের লোক-জীবনে সত্য যাচাই করার ধৈর্য বা প্রয়োজনীয়তা বা যথার্থতা আছে বলে আমি মনে করি না জীবন যখন যেমন, তখন তেমন নৃপেন চক্রবর্তী বলেছিলেন—‘আগে যা বলেছি সেটাও ঠিক, এখন যা বলছি এটাও ঠিক যা দেখছি সেটাই দেখছি এটা অস্বীকার করবো কোন জ্ঞানের বলে ? আর সেই জ্ঞানের যথার্থতাই-বা কী ? লোকে বলবেতোমার চোখ নেই ? দেখতে পাচ্ছো না ?

 

 

৪৪ প্রশ্ন আপনার ষষ্ঠ কবিতা সংকলন১৮টি দীর্ঘকবিতা২০১৭ সালে সৈকত থেকে প্রকাশিত হয় আপনার নির্বাচিত এবং অপ্রকাশিত ১৮টি দীর্ঘকবিতা এই বইয়ের সম্পদ ত্রিপুরার কবিতা জগতে সম্ভবত আপনিই বেশি দীর্ঘকবিতা লিখেছেন আপনার প্রথম কাব্যগ্রন্থবাহান্ন তাসের পরমূলত একটি দীর্ঘকবিতা এই প্রসঙ্গে খুব জানতে ইচ্ছে করছে, দীর্ঘকবিতাকে আপনি ঠিক কীভাবে বিশ্লেষণ করে থাকেন ? এর তৃপ্তি, আনন্দ উপলব্ধি নিয়ে আমাদের  কিছু বলুন ?

 

 সেলিম মুস্তাফাঃ দীর্ঘকবিতা সম্পর্কে আমার চেয়ে তোমার ধারণা অনেক বেশি আমি বেশি লিখেছি, হয়তো এটা ঠিক, কিন্তু বিশ্লেষণ করে সব বলা আমার কর্ম নয় শুধু দীর্ঘকবিতা লিখেই আমি বেশি তৃপ্তি বা আনন্দ পাই, এটাও সম্পূর্ণ ঠিক নয় যেকোন কবিতা, সার্থক হলে এক ধরনের মুক্তি পাই, এটা সত্য এটা সকল লিখিয়ের জন্যই সত্য মিতায়তন রচনার চেয়ে দীর্ঘায়তন রচনায় লেখকের সুযোগ একটু বেশি থাকে অনু গল্প বা ছোট গল্পের সঙ্গে একটা উপন্যাসের যে ফারাক, এখানেও কমবেশি তাই তবে দীর্ঘকবিতা হয়তো উপন্যাসকেও ছাড়িয়েও যায় এই অর্থে যে, উপন্যাসের সকল সুবিধা এতে থাকার পরও কবিতার এক উদ্দাম স্বাধীনতা এতে থেকে যায়, যা কোন ইতিহাস বা সময়বন্ধনী বা বিশেষ কোন সমাজসভ্যতার নির্দিষ্ট কোন আবেগ বা আচরণ একে বাঁধতে পারে না, বা বাঁধতে চাইলেও তা পাত্র থেকে উপচিয়ে পড়ে যায় আর যেহেতু এটাও কবিতা, এর নীরবতাগুলি(একটা বিশেষ কিছু বলার প্রস্তুতি তৈরি করেও না-বলে পাশ দিয়ে চলে যাওয়া) আর অবকাশগুলি আর সরবতাগুলিও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অর্থ প্রকাশ করে যেতেই থাকে

 

 

৪৫।প্রশ্ন   দীর্ঘ ২৫ বছর পর বামফ্রন্ট বা যুক্ত কমিউনিস্ট পার্টির ধরাশাই হল মার্চ, ২০১৮। এই দীর্ঘ সময় না-হলেও, আপনার ভিত্তিগত একটা রাগ বা অভিমান রয়েছে।পরান প্রিয় ভাই খুন, বিচার না-পাওয়া সহ বিভিন্ন অনেককিছুই। এখন কেমন লাগছে? আপনি ঠিক কীভাবে এই পরিবর্তনকে দেখছেন? এককথায়  জীবন-ট্রেনের যাত্রী হিসেবে এইক্ষণে আপনার প্রতিক্রিয়া জানতে চাইছি ?


সেলিম মুস্তাফাঃ  যা হবার ছিল তা-ই হয়েছে । আমার ভাইয়ের ব্যাপারে তেমন বলার আর কিছু নেই । অনেকেরই বিচার হয়নি । আমার ভাইয়ের খুনীকে তো এরাই আশ্রয় দিয়েছিল ! যাক । শুধু নালিশ করে করে, মানুষকে উত্তেজনা জিইয়ে রেখে কতদিন শাসন কায়েম রাখা যায় ? মানুষ কাজ চায় । ত্রিপুরার রোজগার স্বয়ংক্রিয়ভাবে যা হতো, তাই ছিল গোটা বাম-আমলেও । আমার এমনই মনে হয় । এরা এক টাকাও বাড়তি রোজগারের ব্যবস্থা করতে পারেনি । উপরন্তু দিনের পর দিন দুষ্কৃতীদের আশ্রয় ও প্রশ্রয় দিয়ে গেছে । আসলে সবই একসময় তাদের আয়ত্তের বাইরে চলে গেছে । একসময় ছিল শুধু মার্কিন সাম্রাজ্যবাদএটা একঘেয়ে হয়ে যাবার পর, কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে নালিশ । নালিশ কি সব সত্যি ছিল ? এ তো শিশুরাও বোঝে । কিন্তু ব্যবস্থা কী ? নালিশে কি পেট চলে ? নালিশ নিন্দে করে ভোটে হয়তো জেতা যায়, কিন্তু রাজ্যশাসন চলে না । বামপন্থাকে ভালোবাসে বলে মানুষ অপেক্ষা করেছে, সময় দিয়েছে অনেক । এখন হয়তো আরও বড় বিপদ ঘটবে । তাতে কী ? মানুষ তো সবই বোঝে । এ হল আমার সাধারণ উপলব্ধি এর বাইরে আর বোঝার কোন প্রয়োজন নেই । এতে যদি ভুল থাকে থাকুক । পতনের কারণ কী এরা নিজে যে জানে না, এমন নয় । পরিবর্তন তো ভালোই লাগে । কিন্তু এটা যদি আত্মঘাতীও হয়ে থাকে কিছু করার নেই । যা করার মানুষই তো করছে ।

 

৪৬ প্রশ্ন ঃ ফেইসবুকে আপনি ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন জায়গার কবি-লেখকদের লেখালেখি নিয়ে আলোচনা করে থাকেন।  ত্রিপুরার  সাহিত্য জগতে বরাবরই একটা আক্ষেপ গুনগুণ করে শোনা যায় যে, এখানে সাহিত্যের সব বিভাগই ক্রমেই  বলিষ্ঠ হয়ে উঠছে। উপন্যাসেও পিছিয়ে নেই এখন আমরা। কিন্তু সমালোচনার প্রসঙ্গ উঠলেই যেন একটু থামতে হয়! ঠিক এই জায়গায় মনে হয় আমরা এখনও কিছুটা পিছিয়ে।  আপনি কীভাবে দেখছেন বিষয়টাকে? কেন ত্রিপুরাতে ভাল সমালোচনা সাহিত্য গড়ে উঠছে না?

সেলিম মুস্তাফাঃ  উঠবে । কিন্তু সবার আগে প্রচুর পড়াশোনা দরকার । কিছু কথা বললেই আলোচনা হয় না । আমার যতটুকু জ্ঞান, ততটুকুই বলার চেষ্টা করি । আলোচনা যারা করতে পারেন, তারাও করেন না অন্যের বিরিক্তিভাজন হবার ভয়ে । বিখ্যাত আলোচকদের অনেক আলোচনা গ্রন্থ আছে সাহিত্যের ওপর । সেগুলোও পড়া প্রয়োজন । মূল সাহিত্যই অনেকে পড়েন না, আলোচনা পড়বেন কখন ? অভারতীয় সাহিত্য, বিশেষ করে ইংরাজী এবং ইংরাজীতে অনুবাদ করা অন্য বিদেশি ভাষার সাহিত্য অনেকেরই পড়া আছে। কিন্তু বাংলাসাহিত্যের পাঠ ততটা নেই । এর কারণ উন্নাসিকতা । ফলে বিদেশি সাহিত্যের গতিবিধি জানা থাকলেও বাংলাসাহিত্যের মোচড়গুলো অজানাই রয়ে গেছে । উপরন্তু, আলোচনা করাকে এখানের অনেকেই মনে করেন খুঁত ধরা । আমার ধারণা, আলোচনা হল লেখক বা কবিকে তার সময়ের প্রেক্ষিতে উন্মোচিত করা । এর জন্য খোলা মন, প্রশংসা করার সক্ষমতাও জরুরী । আমাদের তো শুধু লবি । গড়া জিনিশ ভাঙার গ্রাম্য রাজনীতি । আমরা কমবেশি সকলেই ডাইনী বটে । আলোচনা না-হলে সাহিত্য এগোবে কী করে ? বিরূপ আলোচনাও পথ দেখায় । তাছাড়া, কবি লেখকরা নিজেরাও তো নিজের লেখাটিকে ফিরে দেখেন না । তাই আত্মসমালোচনাও নেই । ফেসবুকে সবারই নিজস্ব সার্কেল আছে । ওখানে পাস হয়ে গেলেই হল । অতিআঁতেলও কম নয় । আলোচনা যে করবে, সেটা কিসের আলোচনা, তা-ই তো জানা নেই অনেকেরএটা তো আর জন্মগত করিশ্মা নয় !

 ৪৭। প্রশ্ন ২৫ বছর আগের একটি খবরঃ ফটিকসাগর থেকে শিক্ষকের মৃতদেহ উদ্ধারঃ সংবাদ প্রতিনিধি, অমরপুর, ২রা সেপ্টেম্বর (১৯৯২ইং)  আজ ভোরে  স্থানীয় ফটিকসাগরের জলে অমরপুর দ্বাদশশ্রেণী বিদ্যালয়ের জনৈক শিক্ষকের মৃতদেহ ভাসমান অবস্থায় পাওয়া সাহিত্যিকও ছিলেন। অরুণ বণিক গেরিলানামে একটি ম্যাগাজিনের সম্পাদকও ছিলেন।”  রাজনীতিতে বামপন্থার প্রতি অকুণ্ঠ ভালবাসার পুরস্কার এই মৃত্যু। এই রহস্য আজও অন্ধকারেই আছে। কোন রাজাই তার মৃত সৈনিকের দিকে আর ফিরে তাকায় না। – আপনার সম্পাদিত কাগজ ‘পাখি সব করে রব’ এর ৪র্থ বর্ষ, ১১তম সংখ্যায় আপনার সম্পাদকীয় লেখা। আপনার কাছে আমার  জানতে ইচ্ছে করছে, আপনি ছাড়া প্রয়াত কবি অরুণ বণিক নিয়ে প্রায় সবাই নীরব।‘বামপন্থা’র কবি হয়েও প্রায় ২৫ বছর বামপন্থীরা শাসন করে গেল। এখন তারা আবার বিরোধী দলের ভূমিকায়।  নিহত কবি নিয়ে সবাই চুপ।  আপনি  ফটিকসাগরের নাম পরিবর্তন করে ‘ অরুণসাগর’ রাখার আবেদন করেছেন। কিন্তু সেটা তো তখনই সম্ভব, যখন আমরা কবি অরুণ বণিককে প্রথমে মেনে নেব।  কবির প্রতি এই দীর্ঘ নীরবতার রহস্য কী হতে পারে বলে আপনার মনে হয়? না, সে-ই চিরপ্রবাদই  আমাদের সান্ত্বনা –‘বাঙালী আত্মভোলা জাতি!’

 

সেলিম মুস্তাফাঃ  শুধু



অরুণ বণিক কেন, ত্রিপুরার অনেক প্রতিভাবান ব্যক্তিত্ব মৃত্যুর পর বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গেছেন । এখানে কেউ কাউকে আসলেই পছন্দ করে না । গ্রাম্যপভাবে বলা যায়, হিংসে করে । শক্তিধর কেউ মরে গেলে আসলে আনন্দ পায়, ভাবে, যাক একজন তো গেলো প্রতিদ্বন্দ্বী ! সবাই সবাইকে প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবে । কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের কেউ বিদায় নিলে এদের কুম্ভীরাশ্রু আর থামে না । সলিলকৃষ্ণ দেববর্মণ, বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী, সত্যেন বন্দ্যোপাধ্যায়, অরুণ বণিক, মানিক চক্রবর্তী, জাফর সাদেক, তপন দেবনাথ এমনি আরও অনেকেই প্রতিভার সাক্ষর রেখে গেছেন । ত্রিপুরা এদের ভুলে গিয়ে আত্মতৃপ্তিতে বেঁচে আছে । আর লবির ব্যাপার তো আছেই । ব্যক্তিগতভাবে ভালোবাসা থাকলেই সামান্য আলোচনাসভা করা দায়মুক্তি ঘটে, আর ব্যক্তিগতভাবে ভালোবাসা না-থাকলে তো ভুলেও নাম নেয় নাদোষত্রুটি সকলেরই থাকে, কিন্তু কোনো গুণ না-থাকলে কি আমরা জানতাম তাঁদের ? কিন্তু এইটুকুরও স্বীকৃতি দিতে না-পারাটা আমাদের রিফিউজি মানসিকতার, হীনম্মন্যতারই লক্ষণ ছাড়া আর কী ?

 

৪৮। প্রশ্নঃ “... সাহিত্যে প্রতিবাদ না-থাকলে কীসের সাহিত্য, এমন যাদের শিরোবাণী ছিল একদা, আজ তাদের দেখি অশুভ-আঁতাতে লিপ্ত হয়ে নিজের নাসিকা কর্তনেও পিছ-পা নন।”  -- দীর্ঘ বাম রাজনীতির অন্ত হওয়ার পর আপনার লেখনি থেকে এই সম্পাদকীয় লেখা বের হল আপনার হাত ধরে।  ত্রিপুরার সাহিত্য জগৎ আপনার চোখের সামনে প্রায় গড়ে উঠেছে বলা যায়। সময়ের স্রোতে অনেকের অনেক পরিবর্তন দেখেছেন। সেই সব মূল্যায়নে আপনার  সার্বিক একটা ধারণা নিশ্চয়ই তৈরি হয়েছে। অনেক প্রবীণকবি-গল্পকারের  তারুণ্য, উন্মাদনা দেখেছেন। এখন তাদের বার্ধক্য দেখছেন। মতের  পরিবর্তন দেখছেন। অবশেষে আজ আপনার মূল্যায়নের উপলব্ধিটা জানতে চাইছি! বুঝতে চাইছি- মুখ ও মুখের আড়ালের কথোপকথন ...


সেলিম মুস্তাফাঃ  এটা তো তুমি দেখতেই পাচ্ছো । এটার দুটো দিক, একটা হলো সরাসরি রাজনৈতিক, আর অন্যটা হলো পরিবর্তিত অবস্থায় নিজের শৈল্পিক দৃষ্টিকোণটাই পাল্টে ফেলা । হয় আগে ভণ্ড ছিল অথবা পরে ভণ্ড হয়েছে, অথবা উভয় অবস্থাতেই সে মূলত ভণ্ড । সাংসারিক জীবনে অনেক সময়ই কম্প্রোমাইজ করে থাকতে হয়, এটা বাঁচার নীতি, যুদ্ধের নীতি, কিছু করার নেই, কিন্তু তাই বলে সৃষ্টিকর্মেও ? অবশ্য কেউ কেউ কোনো অবস্থাতেই কম্প্রোমাইজ করেন না । এমন লোক আমাদের এখানে আমার জানামত অবশ্য একজনও নেই । ভালো । আরেকটা কথা আছে । কোন্‌ অবস্থাটা সঠিক কোন্‌ অবস্থাটা বেঠিক, এটা জানারও কোন ফর্মূলা নেই । কাজেই কে ভণ্ড আর কে ভণ্ড নয়, এটাও নির্ধারণযোগ্য নয় । কিন্তু মানুষগুলোকে তো আমরা চিনি, জানি । তাদের সহসা পরিবর্তন বিস্ময় সৃষ্টি করে । তখন বলতে ইচ্ছে হয় এতোদিন কোথায় ছিলেন ? এতোদিন কী করলেন তবে ?

 

 

তমালশেখরঃ   প্রায় চার বছরের ব্যবধানে আপনার কাছ থেকে টুকরো টুকরো করে দেখা, অদেখায় প্রশ্নে প্রশ্নে অনেক উত্তর নিয়েছি। বেলা-অবেলায় আপনাকে বিব্রত করেছি অনেকবার আপনিও অসাধারণ ধৈর্য ধরে, ভালোবেসে আমাকে প্রশ্রয়, আশ্রয় দিয়েছেন, তারজন্য অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই আপনাকে! আপনার সাথে দীর্ঘ এই সম্পর্ক আমার হৃদয়ে আজীবন এক অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকবে। আবারও আপনাকে দীর্ঘ এই সাক্ষাৎকার  দেয়ার জন্য ধন্যবাদ জানাই।   



    

 

   

 

 

 

 

  

  

 

No comments:

Post a Comment

অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎

  'অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎ ‎সত্তর দশকের উন্মাদনায় এক ভিন্ন উচ্চারণ-ভঙ্গ...