Thursday, May 18, 2023

আবারও আলো ছড়ালঃ তমালশেখরের কলম” / আলোচক – কিশোররঞ্জন দে

** আবারও আলো ছড়ালঃ তমালশেখরের কলম” / আলোচক – কিশোররঞ্জন দে

 

হৃদয়ের আলো জ্বালাবার জন্যই কলম হাতে নিয়েছিল একজন ভাবুক তরুণ । স্বাভাবিক, তার জীবনের চলার পথে পরপর এসেছে জোয়ার ভাটার টান । আর এই দুয়ের মাঝেই লুকিয়ে থাকে জীবনের অমোঘ টান । তমালশেখর নামের সেদিনের সেই ভাবুক তরুণটি আজ পরিণত যুবক । তার দেখার চোখ, বোঝার মন পাল্টেছে, যেভাবে নদী তার গতিপথ পাল্টায় । চলতে গেলে নদীকে গতিপথ পাল্টাতেই হয় । তার তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ “ আজ আকাশে মেঘ করেছে শ্রাবণী” । প্রথমেই তার এক, দুই পঙক্তির আশ্চর্য কিছু কবিতা পড়ে নিই ।

 ১। “ কাঁথার গায়ে কান্নার কোনও দাগ নেই,

তবু কাঁথা জানে –

মা কাল কেঁদেছিল  সারারাত নীরবে” ( কান্না)

 ২। “বিড়ম্বনা এই, তারপরও তাকে ভালোবেসে যেতে হয়” (দাম্পত্য)

 ৩। “ কেন যে বারবার জীবনের বাহানায় নিজেকে ঠকাই” ( মুখ ও মুখোশ)

 ৪। “তুই শ্রাবস্তীর কথা জিজ্ঞেস করেছিলি !

আজ অফিস থেকে ফেরার পথে, দরজায়

হেলানো মোমবাতির মতো দেখে এসেছি তাকে । ( প্রিয় বান্ধবী)

 

এই কবি এক-দুই পংক্তির সার্থক কবিতা লেখার কৌশল আগেও দেখিয়েছেন ।এক- দুই পঙক্তিতে কবিতা  -- তাও এক তরুণ বা যুবকের কলম থেকে যখন বের হয়, তখন মেপে নেওয়া যায় তার অনুভবের গভীরতা । এতে পাঠক হৃদয় আক্রান্ত হতে বাধ্য । কারণ জীবন থেকে এরকম জরুরি বার্তাই বহন করে তুলে এনেছেন কবি । এমনই নাতিদীর্ঘ তার কবিতা । স্বল্প দৈর্ঘ্যের কবিতা ছাড়াও প্রকাশিতব্য সংকলনে কবিতার শরীরে যুক্ত হয়েছে তার দীর্ঘ পদচারণার কারুকাজও । যেমন – ‘পথকে মনে হয় সাপ’ ‘বাবা-২’ ‘বাবা-৩’ ‘প্রশ্নরা উত্তর না দিয়ে পালায়’ ইত্যাদি চমৎকার কবিতা সব । তবে কবিতায় নাম নিয়ে আরও ভাবতে হবে কবিকে । কবিতার শিরোনাম শুধু কবিতার বীজ ধারণ করে রাখে না, নামের মধ্যে লুকিয়ে থাকে কবিতার সুপ্ত অবয়বও ।

যাই হোক, এবার প্রবেশ করা যাক কবির দীর্ঘ কবিতায় । ‘বাবা’ নিয়ে দুটো কবিতা আছে । মনে পড়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন – ‘কবিরে খোঁজ না তার জীবন চরিতে’ । কবির জীবনকে কবিতায় খুঁজতে যাওয়া ভুল । তবু, এখানে দুটো কথা বলতেই হয় ! মানুষ তমালের জীবনে তার বাবার আত্মা জড়িয়ে আছে রন্ধ্রে রন্ধ্রে । এই দুটো দীর্ঘ কবিতাই আবার গদ্যের ভাষায় লেখা হলেও নিঃশব্দে বহন করেছে কবিতার মায়া ।

 ১) ‘ আজকাল রাত হতেই বাবার শরীরের গন্ধে ভরে ওঠে ঘর । যেন বাবা এইমাত্র উঠে এসেছেন বিছরা থেকে । যেন বাবা এইমাত্র উঠে এসেছেন ঘাস কাটতে কাটতে, যেন বাবা এইমাত্র কোথাও টাকার অভাবে অপমানিত হতে হতে উঠে এসেছেন ।’

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য এখানে ‘বিছরা’ মানে হল, বসতবাড়ির সংলগ্ন একটা উঁচু জমি, যেখানে মূলত রবিশস্য চাষ হয়ে থাকে ।

২) ‘বাবাদের মুখ থাকে বুকে । প্রেম রাখালের মতো হাঁটে আড়ালে আড়ালে ।’

 ৩।‘ বাবার বুকের গন্ধ লেগে আছে নাকে । বাবা ঘুমাননি কতদিন । তার ঘুম চিতার আগুনে দাউদাউ করে জ্বলে ।’

 কবির এইসব সৃষ্টির গঠন আলাদা । কবিতার মতো আলাদা করে নয় । রানিং কম্পোজে সাজানো । কবিতার বিন্যাসে এ এক আলাদা নিরীক্ষণ । বড় কঠিন একটা চ্যালেঞ্জ । পরিবারের বৃ্ত্তে আবদ্ধ কবিতাকে উতরে দেওয়া নতুন এক জয় । কবির হাত ধরে পাঠক পৌঁছে যান একটি অজ্ঞাত দ্বীপে । কবিতার আকার যাই হোক, আসলে কবি তার জীবনের একটা মানে খুঁজে নিতে চান কবিতার ভিতর থেকে । পৌঁছতে চান নিজের মোহনায় নিজের মতো করে । অন্তর্গত দহন ছাড়া কেউ এমন হতে পারে না। তার কবিতায় সেই দহন খুঁজে পাওয়া যায় । “ সারাদিনই তো  মুখোশের মতো / মুখ নিয়ে ঘোরাফেরা করি, / মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে মুখোমুখি বসি / নিজেকে শুধাই / কেন যে বারবার জীবনের বাহানায় নিজেকে ঠকাই” ।

 

যে কোনও সার্থক কবিতা এক হাতে পাঠককে ছুঁয়ে থাকে, অন্য হাতে ধরতে চায় কবিকে । তাহলেই কবিতা অন্তরঙ্গে  উচ্চারিত হয় । মায়ার পোশাক খুলে যায় তার । মোট আটাত্তরটি কবিতা ।তার মধ্যে এক পঙক্তি, দুই পঙক্তির কবিতা যেমন হাজির, তেমনি দীর্ঘ, অতিদীর্ঘ কবিতাও রয়েছে । বাংলা কবিতাভুবন কবিতার আকার নিয়ে মাথা ঘামায় না ।সার্থকতা তার আকারে নয় । সার্থকতা হল, সেই অচিন পাখিকে ধরতে পারা । এখানেই পৃথিবীর আদিম অরণ্য থেকে নিজস্ব শৈলীতে তমালশেখর তুলে এনেছেন অমল রোদ ।

“ হয়ত দরজা খুলে, এত রক্ত দেখে অবাক হয়ে যাবে

পাগলের মতো ছুটে যাবে বালিশের তলায় ।

এই বুঝি, কান্নার পাশে ফুটফুটে একটা সুইসাইড নোট রেখে গেলাম ।

ভয় পেয়ো না, মাধবী, আমি মরবো না ।

ব্লেডের সাথে অদ্ভুত এক মাদকতায় জড়িয়ে  ফেলেছি নিজেকে ।

রাত হলেই রক্তের জন্য পাগল হয়ে যাই ।

নিজেকে ক্ষতবিক্ষত করার মাঝে কি যে নেশা,

কি যে মোহ - !” (ব্লেড এক উন্মুক্ত নেশা)

 

মানুষ জীবনের একটা মানে খুঁজে নিতে চায়, নিজের মতো করে ।  পৌঁছাতে চায় স্থিরত্বের বিন্দুতে । কোনও রকমের কপটতার আশ্রয় নিলে সেখানে পৌঁছানো যায় না ।

 

তমালশেখরের জীবনের অসম্ভব বেদনার সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন এক অমোঘ আমোদ । আসুন  পাঠক, অবগাহন করি সেই অনাবিল আনন্দে । এই সময়ের যে কোনও কবির কবিতা থেকে তার কবিতা আলাদা । তার একান্ত ব্যক্তিগত জীবনও আলাদা ।তার সেই ব্যক্তিগত জীবনটি শাসন করে একটি বিশুদ্ধ হৃদয় । ভালোবাসার হৃদয় । শিল্পী অনিমেষ মাহাতোর প্রচ্ছদের দিগন্তে হারিয়ে যেতে চাওয়া মেঘ যেন কবির কবিতার অনুগামী । ওই রাস্তায় পাঠকেরও হাঁটতে ইচ্ছে করবে ।

 

কাব্যগ্রন্থ -- “ আজ আকাশে মেঘ করেছে শ্রাবণী”

লেখক – তমালশেখর দে

প্রকাশক – নীহারিকা প্রকাশনী/ আগরতলা  

 

 

No comments:

Post a Comment

অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎

  'অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎ ‎সত্তর দশকের উন্মাদনায় এক ভিন্ন উচ্চারণ-ভঙ্গ...