হৃদয়ের
আলো জ্বালাবার জন্যই কলম হাতে নিয়েছিল একজন ভাবুক তরুণ । স্বাভাবিক, তার জীবনের
চলার পথে পরপর এসেছে জোয়ার ভাটার টান । আর এই দুয়ের মাঝেই লুকিয়ে থাকে জীবনের অমোঘ
টান । তমালশেখর নামের সেদিনের সেই ভাবুক তরুণটি আজ পরিণত যুবক । তার দেখার চোখ,
বোঝার মন পাল্টেছে, যেভাবে নদী তার গতিপথ পাল্টায় । চলতে গেলে নদীকে গতিপথ
পাল্টাতেই হয় । তার তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ “ আজ আকাশে মেঘ করেছে শ্রাবণী” । প্রথমেই
তার এক, দুই পঙক্তির আশ্চর্য কিছু কবিতা পড়ে নিই ।
তবু
কাঁথা জানে –
মা কাল
কেঁদেছিল সারারাত নীরবে” ( কান্না)
আজ অফিস
থেকে ফেরার পথে, দরজায়
হেলানো
মোমবাতির মতো দেখে এসেছি তাকে । ( প্রিয় বান্ধবী)
এই কবি
এক-দুই পংক্তির সার্থক কবিতা লেখার কৌশল আগেও দেখিয়েছেন ।এক- দুই পঙক্তিতে
কবিতা -- তাও এক তরুণ বা যুবকের কলম থেকে
যখন বের হয়, তখন মেপে নেওয়া যায় তার অনুভবের গভীরতা । এতে পাঠক হৃদয় আক্রান্ত হতে বাধ্য । কারণ জীবন থেকে এরকম জরুরি বার্তাই বহন করে তুলে এনেছেন কবি
। এমনই নাতিদীর্ঘ তার কবিতা । স্বল্প দৈর্ঘ্যের কবিতা ছাড়াও প্রকাশিতব্য সংকলনে
কবিতার শরীরে যুক্ত হয়েছে তার দীর্ঘ পদচারণার কারুকাজও । যেমন – ‘পথকে মনে হয়
সাপ’ ‘বাবা-২’ ‘বাবা-৩’ ‘প্রশ্নরা উত্তর না দিয়ে পালায়’ ইত্যাদি চমৎকার কবিতা সব ।
তবে কবিতায় নাম নিয়ে আরও ভাবতে হবে কবিকে । কবিতার শিরোনাম শুধু কবিতার বীজ ধারণ
করে রাখে না, নামের মধ্যে লুকিয়ে থাকে কবিতার সুপ্ত অবয়বও ।
যাই হোক, এবার
প্রবেশ করা যাক কবির দীর্ঘ কবিতায় । ‘বাবা’ নিয়ে দুটো কবিতা আছে । মনে পড়ে কবিগুরু
রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন – ‘কবিরে খোঁজ না তার জীবন চরিতে’ । কবির জীবনকে কবিতায়
খুঁজতে যাওয়া ভুল । তবু, এখানে দুটো কথা বলতেই হয় ! মানুষ তমালের জীবনে তার বাবার
আত্মা জড়িয়ে আছে রন্ধ্রে রন্ধ্রে । এই দুটো দীর্ঘ কবিতাই আবার গদ্যের ভাষায় লেখা
হলেও নিঃশব্দে বহন করেছে কবিতার মায়া ।
প্রসঙ্গত
উল্লেখ্য এখানে ‘বিছরা’ মানে হল, বসতবাড়ির সংলগ্ন একটা উঁচু জমি, যেখানে মূলত
রবিশস্য চাষ হয়ে থাকে ।
২) ‘বাবাদের মুখ
থাকে বুকে । প্রেম রাখালের মতো হাঁটে আড়ালে আড়ালে ।’
যে কোনও সার্থক
কবিতা এক হাতে পাঠককে ছুঁয়ে থাকে, অন্য হাতে ধরতে চায় কবিকে । তাহলেই কবিতা
অন্তরঙ্গে উচ্চারিত হয় । মায়ার পোশাক খুলে
যায় তার । মোট আটাত্তরটি কবিতা ।তার মধ্যে এক পঙক্তি, দুই পঙক্তির কবিতা যেমন
হাজির, তেমনি দীর্ঘ, অতিদীর্ঘ কবিতাও রয়েছে । বাংলা কবিতাভুবন কবিতার আকার নিয়ে
মাথা ঘামায় না ।সার্থকতা তার আকারে নয় । সার্থকতা হল, সেই অচিন পাখিকে ধরতে পারা ।
এখানেই পৃথিবীর আদিম অরণ্য থেকে নিজস্ব শৈলীতে তমালশেখর তুলে এনেছেন অমল রোদ ।
“ হয়ত দরজা
খুলে, এত রক্ত দেখে অবাক হয়ে যাবে
পাগলের মতো ছুটে
যাবে বালিশের তলায় ।
এই বুঝি,
কান্নার পাশে ফুটফুটে একটা সুইসাইড নোট রেখে গেলাম ।
ভয় পেয়ো না,
মাধবী, আমি মরবো না ।
ব্লেডের সাথে
অদ্ভুত এক মাদকতায় জড়িয়ে ফেলেছি নিজেকে ।
রাত হলেই রক্তের
জন্য পাগল হয়ে যাই ।
নিজেকে
ক্ষতবিক্ষত করার মাঝে কি যে নেশা,
কি যে মোহ - !”
(ব্লেড এক উন্মুক্ত নেশা)
মানুষ জীবনের একটা মানে খুঁজে নিতে চায়, নিজের মতো করে । পৌঁছাতে চায় স্থিরত্বের বিন্দুতে । কোনও রকমের
কপটতার আশ্রয় নিলে সেখানে পৌঁছানো যায় না ।
তমালশেখরের জীবনের অসম্ভব বেদনার সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন এক
অমোঘ আমোদ । আসুন পাঠক, অবগাহন করি সেই অনাবিল আনন্দে । এই সময়ের যে কোনও কবির কবিতা
থেকে তার কবিতা আলাদা । তার একান্ত ব্যক্তিগত জীবনও আলাদা ।তার সেই
ব্যক্তিগত জীবনটি শাসন করে একটি বিশুদ্ধ হৃদয় । ভালোবাসার হৃদয় । শিল্পী অনিমেষ
মাহাতোর প্রচ্ছদের দিগন্তে হারিয়ে যেতে চাওয়া মেঘ যেন কবির কবিতার অনুগামী । ওই
রাস্তায় পাঠকেরও হাঁটতে ইচ্ছে করবে ।
কাব্যগ্রন্থ -- “ আজ আকাশে মেঘ করেছে শ্রাবণী”
লেখক – তমালশেখর দে
প্রকাশক –
নীহারিকা প্রকাশনী/ আগরতলা

No comments:
Post a Comment