Saturday, January 18, 2025

“কবিতায়, কবির নিজস্ব একটা ভাষা নির্মাণ এবং বয়ানের ঢঙ আছে ।” আলোচনা তমালশেখর দে

 


“ বাসব মৈত্রের কবিতায় নিজস্ব একটা  ভাষা নির্মাণ এবং বয়ানের ঢঙ  আছে  

 

মানুষ কেবল মানুষ নামক প্রাণীই নয় তার মধ্যে ভাষা আছে, ভাষার প্রকাশ আছে, পরিপার্শ্ব বদলাবার উদ্যম আছে। কেউ কেউ মনে করেন সমাজবদ্ধ হবার পর মানুষ সমাজবদ্ধ জীবনের প্রত্ন নিয়েই জন্মগ্রহণ করে। ফলে জন্মের পরের স্তরগুলো সে অনায়াসে স্ব-সামাজের সামাজিক জীব হিসেবেই অতিক্রম করতে পারে। ধারণা করি, জন্মউৎস হতে মানুষ কতগুলো সামাজিক ক্রিয়ার প্রত্ন নিজ শরীরে ধারণ করে এবং বেঁচে থাকবার সংগ্রামে সেগুলোই শারীরিক ক্রিয়ায় সক্রিয় হয়। হতে পারে এ কারণেই মানুষ সামাজিক জীব এবং পরবর্তী জীবনপ্রবাহে সে সমাজ দ্বারাই পরিপুষ্ট হয়। তার যা কিছু জ্ঞান তা কেবল পাঠশালা নয়, সমাজ থেকেই সে অনুমান, অনুসন্ধান, অনুধাবনে সক্ষম হয় আমরা যে বেঁচে আছি তা  আমরা অনুভব করতে পারি কারণ আমরা চিন্তা করতে পারি। সম্প্রতি “অভিযান পাবলিশার্স” থেকে প্রকাশিত বাসব মৈত্রের “জন্ম-জড়ুল” কাব্যগ্রন্থটি পাঠ করতে করতে উপরের ভাবনাগুলো জাস্ট ভাবনায় একটা হালকা ঢেউ তুলে দিয়ে গেল ।  “জন্ম-জড়ুল” নামটা নিয়েই মূলত আমার প্রথম ভাবনার  সূত্রপাত । আমার জন্ম, আমার উপর সামাজিক পরিপার্শ্বের প্রভাব, প্রতিক্রিয়া এবং আমার ভাবনায় তার প্রতিফলন এবং প্রতিক্রিয়া, এই নিরিখকে মাথায় রেখেই আমি পড়ে গেলাম – ‘অন্তর্জগৎ’  ‘স্পর্ধা’ ‘মৃদুগান’ ‘তরঙ্গ’ ‘আগুন নেই আর’ ‘দাম্পত্য’ এভাবে একের পর এক ২৪টি ছোটো-বড়ো কবিতা । মূলত কবি শহুরে  জীবনের মধ্যবিত্ত ভাবনার মনোজগতকেই নানাভাবে ধরার চেষ্টা করেছেন । অসংখ্য চরিত্রের সমাবেশের ভিতর দিয়ে কবি নাগরিক জীবনের ভালবাসা, উৎকণ্ঠা, মনের ভিতরে চেপে রাখা রাগ-অভিমান, দুঃখ-কষ্টের ভিতরের জীবনের সংকটকে তুলে আনতে চেয়েছেন তার কবিতায় । তার ‘অন্তর্জগৎ’ কবিতাটি ১৬১ পঙ্ংত্তির ভিতরে ৭টি পর্যায়ে  সাজিয়েছেন ।  “তুমি কী ভাবছ রুনি তুমি যাকে ভালোবাসো / সেই একমাত্র জগৎ ? আর, যে বাঞ্চোত – তোমার পিছু নিল/ দিনের পর দিন, তোমাকে ভাবল একান্ত মনে / মৈথুনশিল্পে যে তোমার নাম তীব্র আকাঙ্ক্ষায় / প্রার্থনার মতো জপতে চাইল” ... এভাবেই কবিতার শুরু করে রুনির ভিতর দিয়ে গোটা সামাজিক সংকটকেই যেন সাত পর্বে জীবনকে ছুঁয়ে নির্যাসে কবি লিখছেন – “ রুনি, দ্যাখো সতীত্ব বলে কোন শব্দ দেখাতে পারে না আর এ তরুণ শহর...”অথচ এই কবিই চার নম্বর পর্বে লিখছেন – “ আমি তোমার কাছে স্বস্তি পাই রুনি / তোমাকে আমার দেখতে ইচ্ছে করে / কথা বলতে ইচ্ছে করে, ছুঁতে ইচ্ছে করে সারাটাদিন”দুটি মনের মনস্তাত্ত্বিক দুটানার চিত্রও একই পর্বে পাচ্ছি আমরা – “ কী করতে পারি বলো যদি প্রেম না থাকে তোমার / কী করতে পারি বলো যদি থাকতে না চাও সঙ্গে / কত চেঁচাব / কতবার বলব আমি লড়ব, আমি লড়ব রুনি শেষপর্যন্ত / আমাকে একটু বিশ্বাস করো ।”  কবির ‘অন্তর্জগৎ’ এই দ্বিধা-দ্বন্দ্ব চলতেই থাকে গোটা কাবিতা জুড়ে, এবং একসময় এসে আমরা গোটা ব্যবস্থাকেই এক অসহায় পর্যায়ে আবিষ্কার করি । “স্পর্ধা” কবিতায় কবি রাজনৈতিক অবক্ষয়কে তুলে আনেন সামাজিক ঘটনাপ্রবাহের ভিতর দিয়ে – “শ্যাওলা ধরা দেওয়াল ক্ষরণের বোধগম্যতার আড়ালে রাজনৈতিক চেতনা / যারা ছুঁয়ে দেখল না ঘাম / যারা ছুঁয়ে দেখল না মাটি / কীভাবে তাদের হাতে এল লাল পতাকা” কিংবা “ ধারহীন শিকড় / দেখি ধর্ষিতার যোনি পাতা কাঁপছে, রাজনীতির হৃৎপিণ্ড/ নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে অকাট্য যুক্তি / মৃত এক কঙ্কাল” কিংবা “সমকামী মিছিল ধীরে ধীরে ঢুকে পড়ে কুলুঙ্গি বিছানায় / জানালার কাছে ভাঙা স্মৃতির আওয়াজ / যৌনতা তলে তলে কুরে খায় মুগ্ধ মানুষের স্থুলত্ব” --- এইসব কবিতার পঙক্তির ভিতর দিয়ে আমরা মূলত কী দেখতে পাচ্ছি ? পাঠক হিসেবে অনেকগুলো চিত্রকল্পের  সামনে আমি  দাঁড়িয়ে রইলাম যেন ! সমকামী চেতনার জর্জরিত চিত্র – “ মাত্র অর্ধাঙ্গিনী আমি / পুরুষ, তোর কাছে । অথচ আমিও পুরুষ, ভেতরে নারী সিঞ্চন/ রূপান্তরিত চাবুকের মতন এসে পড়ে রুদ্ধতাপ / স্তনের ঘর্ষণ থেকে জ্বলে ওঠে দাবাগ্নি”

 কবি বাসব মৈত্র এই সময়ের ভাবনা জগতের জটিলতাকে তার কবিতায় মুখ্য বিষয় করেছেন । যৌন এবং যৌনতার মনস্তত্ত্বকে নানাভাবে, নানা দৃষ্টিকোণ থেকে পরিক্রমা, পর্যালোচনা করে দেখতে চেয়েছেন এই কবি । ‘মৃদুগান’ কবিতায় তাই তো কবি লিখছেন – “ রুমনীর একমাত্রিক স্তনে মুখ রেখে কতবার কিংবদন্তি জন্মের কথা ভেবেছি । কতবার / যোনির বৃক্ষ শিকড়ে পাঠিয়েছি সংকেত / এক নয়, দুই নয় – এ আমার লক্ষ জন্মের উত্তরাধিকার – রক্তের গাঢ়তম পূর্ণতা।/ উন্মাদ অস্পষ্টতায় রুমনীর চিবুক পোড়া দ্রাক্ষায় নিবিড় বিষাদের করতল ভেঙে লিঙ্গের / যৌন মসৃণতা দাবি করেছিল কয়েকটি মুহূর্ত”এভাবেই কবি পরতে পরতে নাড়িয়ে দেখতে চেয়েছেন জন্ম জড়ুলকে । আবার আমরা যদি কবির “ কয়েকটি পরিচিত দৃশ্য ও একটি টোপর” দীর্ঘ কবিতাটি পড়ি, তখন দেখবে, কবি বিশাল ক্যানভাসে মধ্যবিত্ত জীবনের টানাপড়েন, সংকট,  সামাজিক টানাপোড়েন, এবং তার বিচিত্র গতিভঙ্গিমা । একটা অংশে কবি লিখছেন – “ মেয়ের চাকরির জন্য ঘুস দেওয়ার টাকা জোগাড় করতে না পেরে গৌতমদা, গৌতমদার স্ত্রীর আত্মহত্যা আত্মহত্যার চিরকুটে লেখা , বিয়ে সবার জন্য নয়, মধ্যবিত্ত দরিদ্ররা ভাববেন।”

কবি বাসব মৈত্র “জন্ম-জড়ুল” কাব্যে আসলে কিছু  সামাজিক- রাজনৈতিক- অর্থনৈতিক এবং যৌনতার সাংস্কৃতিক নির্মাণের দিক নিয়ে নানাভাবে ভাবনা-চিন্তা করেছেন । তার ছাপ পাওয়া যায় “জন্ম-জড়ুল” কাব্যের নানাপ্রান্ত জুড়ে কবির কবিতায় ভাষা নির্মাণের নিজস্ব একটা ঢঙ মুগ্ধ করে । পাঠককে শেষ পর্যন্ত তার কাছেই টেনে রেখে দেওয়ার ক্ষমতা তিনি রাখেন । নিছক কবিতার আবহ তৈরি করা কবির লক্ষ নয় । বরং কবি কবিতার ভিতর দিয়ে সমাজকে একটা নির্মোহ দৃষ্টি দিয়ে দেখতে চেয়েছেন । যে কথাগুলো, বিষয়গুলো এই সময়ে উঠে আসা উচিত । কবিতার আঙ্গিকের দিকেও কবি সচেতন দৃষ্টি রেখেছেন । কোথাও কোথাও কবি কবিতার  নান্দনিকতাকেও  আক্রান্ত করে এগিয়ে গেছেন নিজ লক্ষ্যের দিকে  এককথায়,  “জন্ম-জড়ুল” মুগ্ধ করেছে আমায় । পাঠক হিসেবে আমি আপ্লুত । তৃপ্ত ।

 

কবি –  বাসব মৈত্র

কাব্যগ্রন্থ --  জন্ম-জড়ুল

অভিযান পাবলিশার্স/ কলকাতা

মূল্য – ২০০ টাকা

No comments:

Post a Comment

অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎

  'অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎ ‎সত্তর দশকের উন্মাদনায় এক ভিন্ন উচ্চারণ-ভঙ্গ...