ঈশ্বরের সিটি মারা দেখে যে তরুণ কবি
বুক রিভিউ – তমালশেখর দে
প্রখ্যাত কবি-আলোচক
লুই বোর্হেস বলেছিলেন –
“ আমি কবিতায় অনুভবে বিশ্বাস করি, শিক্ষা লাভে নয়” । এই কথাটায় আমি খুব বিশ্বাস করি । পড়ছিলাম “৪৩তম আগরতলা বইমেলা”
প্রকাশিত কবি শম্ভু শংকরের প্রথম কাব্যগ্রন্থ “সিটি মারে ঈশ্বর” । তরুণ
কবি । ঝরঝরে কবিতার কাব্য ভাষা । সটান কথা বলতে ভালোবাসেন । নিজেকেই কেন্দ্রে
রাখেন কবিতার মূল ভাবনায় । যেমন- “ আমার শরীরে অসংখ্য
গল্প / কোনো গল্পই ভরসা যোগাতে পারে না ” এভাবেই শুরু হয় ‘কত কথা বলা বাকি’ ৮০ লাইনের দীর্ঘ কবিতাটি । নিজেকে, নিজের চারপাশকে ফালাফালা
করে দেখার চেষ্টা করেছেন নির্মোহভাবে, কখনও ভালোবাসার কথা বলছেন, কখনও বলছেন ঘৃন্য রাজনীতির কথা । কবি কখনও লিখছেন – “আমার দিকে ওরা তিরের ফলার
মতো / বিষ মাখিয়ে ছেড়ে দেয় কিছু কীটপতঙ্গ / আনার নির্দিষ্ট কোনো মন্দির নেই” কিংবা “ কত কথা রয়ে যায় ফিসফিস ফিসফিস /
একটি গেরিলা-সংক্রমণ আমার দিকে তেড়ে আসে / এ. আই হয়তো কেড়ে নেবে আমার শেষ স্যান্ডো গেঞ্জিটুকু / অথচ সে বলতে পারবে না / রেললাইনে মাথা দিয়ে স্বর্ণেন্দুদা কী বলতে চেয়েছিল” কিংবা “ ম্যাসেঞ্জারে আমাকে টি-শার্ট খোলাতে না পেরে / হতাশ হয়ে যদি সেই মহিলা ঘুমিয়ে পড়ে তার স্বামীর বুকে / সে রাত বৈষ্ণব না শাক্ত
জানি না” কিংবা “ কত কথা হলো, কত কথা বলা বাকি / আমি ভালো কথাই বলতে চাইছিলাম / নিজের বুকেই হোঁচট খাচ্ছিলাম / কারো বিশ্বাস ভাঙতে নেই /
যে আত্মীয় দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল মুখের উপর/ তাদের সন্তান কিছু হয়ে উঠার আগেই আমি একজন /
কবি হয়ে গেলাম” । এভাবেই কবি পরতে পরতে নিজেকেই ঘুরেফিরে দেখার চেষ্টা
করেছেন বারবার । চোখ-কান খোলা রেখে কবি যেন হেঁটে হেঁটে সামাজিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া লক্ষ করছেন আর লিখছেন – “ দীর্ঘদিন ধরে পড়তে থাকা শ্যাওলা সভ্যতার আস্তরণ / হাটবাজার, হাসপাতাল, রাস্তায়
পায়চারি করা সোনালী যুবক যুবতি /
এবং আমার বন্ধুস্থানীয় ভাইয়েরা প্রত্যেকেই / আমার সন্দেহের নজরে আছেন” ( একটি লাইটার) । এই সন্দেহ, আজকের প্রজন্মের সন্দেহ । এই অবিশ্বাস, আজকের প্রজন্মের অবিশ্বাস । খুবই অবাক হলাম, যখন দেখি এই একই কবিতায় কবি লিখছেন – “ হোয়াটঅ্যাপ- গ্রুপে বন্ধুর পাঠানো নীল লিঙ্কে চাপ দিতেই / গোলাপি হয়ে উঠে চোখ / স্থলিথ চোখ নিয়ে বন্ধুর বোনের দিকেও আর তাকাতে পারি না। ”
তরুণ
কবি শম্ভু শংকর সম্ভাবনাময় এই বিষয়ে কোনো
সন্দেহ নেই । চারপাশে যা কিছু দেখছেন, তাকেই কবিতার বিষয় করছেন ।
এই
স্বাভাবিকতা আমাকে পাঠক হিসেবে খুব টেনে রেখেছিল। আশাকরি, আগামীতে জীবনের আরও নির্মম অভিজ্ঞতার ভিতরে কবি যত ঢুকবেন, ততই
কবি তার কবিতায় নিজেকে সমৃদ্ধ করতে পারবেন । এক সময় টের পাবেন, শুধু অনুভবটাই বড় কথা নয় । কবিতার জন্য চাই আরও বহু কিছুর সঠিক সমন্বয় । সঠিক
বাক্যের
চয়ন ও গঠন । “ এই প্রথমবার তোমার
সামনে কাঁদলাম / তুমি ধরতেই পারলে না” ( ফাঁকি) । এমন ছোটো ছোটো কবিতায়ও কবি আশার
আলো জাগিয়েছেন আমাদের । ঈশ্বরের সিটি মারা
দেখে যে তরুণ কবি, তাকে নিয়ে
আমি খুবই আশাবাদী। খুবই মননশীল এবং
ইঙ্গিতবাহী প্রচ্ছদ এঁকেছেন উমা মজুমদার । কবিতার সামগ্রিক মেজাজ ধরা পড়ে তার
শিল্প কর্মে । অজস্র ধন্যবাদ প্রচ্ছদ শিল্পীকে ।

No comments:
Post a Comment