Wednesday, January 22, 2025

ঈশ্বরের সিটি মারা দেখে যে তরুণ কবি --- তমালশেখর দে


 

        ঈশ্বরের সিটি মারা দেখে যে তরুণ কবি

            বুক  রিভিউ তমালশেখর দে  

 

 

 

প্রখ্যাত কবি-আলোচক লুই বোর্হেস বলেছিলেন – “ আমি কবিতায় অনুভবে বিশ্বাস করি, শিক্ষা লাভে নয়। এই কথাটায় আমি খুব বিশ্বাস করি । পড়ছিলাম  ৪৩তম আগরতলা বইমেলাপ্রকাশিত কবি শম্ভু শংকরের প্রথম কাব্যগ্রন্থ সিটি মারে ঈশ্বরতরুণ কবি । ঝরঝরে কবিতার কাব্য ভাষা । সটান কথা বলতে ভালোবাসেন । নিজেকেই কেন্দ্রে রাখেন কবিতার মূল ভাবনায় । যেমন-  আমার শরীরে অসংখ্য গল্প / কোনো গল্পই ভরসা যোগাতে পারে না এভাবেই শুরু হয়  কত কথা বলা বাকি৮০ লাইনের দীর্ঘ কবিতাটি । নিজেকে, নিজের চারপাশকে ফালাফালা করে দেখার চেষ্টা করেছেন নির্মোহভাবে, কখনও ভালোবাসার কথা বলছেন, কখনও বলছেন ঘৃন্য রাজনীতির কথা । কবি কখনও লিখছেন – “আমার দিকে ওরা তিরের ফলার মতো / বিষ মাখিয়ে ছেড়ে দেয় কিছু কীটপতঙ্গ / আনার নির্দিষ্ট কোনো মন্দির নেইকিংবা কত কথা রয়ে যায় ফিসফিস ফিসফিস / একটি গেরিলা-সংক্রমণ আমার দিকে তেড়ে আসে / . আই হয়তো কেড়ে নেবে আমার শেষ স্যান্ডো গেঞ্জিটুকু / অথচ সে বলতে পারবে না / রেললাইনে মাথা দিয়ে স্বর্ণেন্দুদা কী বলতে চেয়েছিলকিংবা ম্যাসেঞ্জারে আমাকে টি-শার্ট খোলাতে না পেরে / হতাশ হয়ে যদি সেই মহিলা ঘুমিয়ে পড়ে তার স্বামীর বুকে / সে রাত বৈষ্ণব না শাক্ত জানি না  কিংবা কত কথা হলো, কত কথা বলা বাকি / আমি ভালো কথাই বলতে চাইছিলাম / নিজের বুকেই হোঁচট খাচ্ছিলাম / কারো বিশ্বাস ভাঙতে নেই / যে আত্মীয় দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল মুখের উপর/ তাদের সন্তান কিছু হয়ে উঠার আগেই আমি একজন / কবি হয়ে গেলাম। এভাবেই কবি পরতে পরতে নিজেকেই ঘুরেফিরে দেখার চেষ্টা করেছেন বারবার ।  চোখ-কান খোলা রেখে কবি যেন হেঁটে হেঁটে সামাজিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া লক্ষ করছেন আর লিখছেন – “ দীর্ঘদিন ধরে পড়তে থাকা শ্যাওলা সভ্যতার আস্তরণ / হাটবাজার, হাসপাতাল, রাস্তায় পায়চারি করা সোনালী যুবক যুবতি / এবং আমার বন্ধুস্থানীয় ভাইয়েরা প্রত্যেকেই / আমার সন্দেহের নজরে আছেন( একটি লাইটার) এই সন্দেহ, আজকের প্রজন্মের সন্দেহ । এই অবিশ্বাস, আজকের প্রজন্মের অবিশ্বাস । খুবই অবাক হলাম, যখন দেখি এই একই কবিতায় কবি লিখছেন – “ হোয়াটঅ্যাপ- গ্রুপে বন্ধুর পাঠানো নীল লিঙ্কে চাপ দিতেই / গোলাপি হয়ে উঠে চোখ / স্থলিথ চোখ নিয়ে বন্ধুর বোনের দিকেও আর তাকাতে পারি না।

তরুণ কবি  শম্ভু শংকর সম্ভাবনাময় এই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই । চারপাশে যা কিছু দেখছেন, তাকেই কবিতার বিষয় করছেন । এই স্বাভাবিকতা আমাকে পাঠক হিসেবে খুব টেনে রেখেছিল। আশাকরি, আগামীতে  জীবনের আরও নির্মম অভিজ্ঞতার ভিতরে কবি যত ঢুকবেন, ততই কবি তার কবিতায় নিজেকে সমৃদ্ধ করতে পারবেন । এক সময় টের পাবেন, শুধু অনুভবটাই বড় কথা নয় । কবিতার জন্য চাই আরও বহু কিছুর সঠিক সমন্বয় । সঠিক বাক্যের চয়ন ও গঠন । “ এই প্রথমবার তোমার সামনে কাঁদলাম / তুমি ধরতেই পারলে না” ( ফাঁকি) । এমন ছোটো ছোটো কবিতায়ও কবি আশার আলো জাগিয়েছেন আমাদের ।  ঈশ্বরের সিটি মারা দেখে যে তরুণ কবি, তাকে নিয়ে  আমি খুব আশাবাদী খুবই মননশীল এবং ইঙ্গিতবাহী প্রচ্ছদ এঁকেছেন উমা মজুমদার । কবিতার সামগ্রিক মেজাজ ধরা পড়ে তার শিল্প কর্মে । অজস্র ধন্যবাদ প্রচ্ছদ শিল্পীকে । 

  

 

No comments:

Post a Comment

অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎

  'অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎ ‎সত্তর দশকের উন্মাদনায় এক ভিন্ন উচ্চারণ-ভঙ্গ...