Saturday, January 18, 2025

‘ ভাঙা দেওয়াল, আরও একটু ভেঙে...’ / গ্যান-পয়েণ্ট কবিতা সংকলন’ / আলোচনা সেলিম মুস্তাফা


                 ‘ ভাঙা দেওয়াল, আরও একটু ভেঙে...’


সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে কবি তমালশেখর দে-র ষষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ ‘গ্যান-পয়েণ্ট কবিতা সংকলন’ । অনু কবিতার সংকলন ।

তমালের অনুকবিতাগুলো যে কেবল শারীরিক মানসিক ও আস্তিত্বিক সম্পর্কের গভীর আবহে জন্মেছে, বা সেগুলো শুধু কবি বা তার অপর সত্তার মিথষ্ক্রিয়ায় আশ্লিষ্ট, এমন নয়, বরং গ্রহীতা পাঠকের দিকেও আয়না তুলে ধরেছে নির্মমভাবে । প্রায় সব রচনাই আত্মসমালোচনার অ্যাসিড বহন করে, যেখানে কবি হয়ে ওঠেন পাঠকেরই প্রতীক । ছোটো কবিতা । অসহ্য আত্মমোক্ষণে জর্জরিত হয়ে বই বন্ধ করে দিলেও  উচ্চারণগুলো পিছু ছাড়ে না যেন ।

দুঃখেরও একটা লালন আছে আমাদের সকলেরই ভেতরে ভেতরে । তমালশেখর দে-রও আছে । এই গ্রন্থের শুরুর টু-লাইনারটি সে কথাই বলে এবং আমাদেরকে বিব্রত করে । কবি বলেন—‘ভাঙা দেওয়াল, আরও একটু ভেঙে দিয়ে/দেখছি চাঁদ ।’ (দারিদ্র্যবিলাস) । আমরা সকলেই কমবেশি এমন । এমনকী কখনো এই দুঃখকে ব্যক্ত করে আমরাও নির্দ্বিধায় কোনো না কোনোভাবে কারো না কারো কাছ থেকে সহানুভূতিও আদায় করে ফেলি । কাজেই গ্রন্থের শুরুতেই এই পঙ্ক্তিদ্বয় এমন এক ব্লাস্টার, যা শুধু আমাদের বিব্রত নয়, অস্তিত্বকেই একেবারে উলঙ্গ করে ফেলে ।  কনফেশনের বিচিত্র এই পঙ্ক্তিদ্বয় উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে কবি নিজেকেও টার্গেট করে নিলেন এক নির্মল দুঃসাহসিকতায় । কবিতাটি আরও একটু অভিনিবেশ সহকারে অনুভব করার চেষ্টা নিলে আমরা টের পেয়ে যাব, বাচনের গভীরে লীন পরা-বাচনের শিহরণ । এই ‘দেওয়াল’ চিহ্নায়কটি কেবলই একটি ঘরের দেওয়ালকে চিহ্নায়িত করছে না, তার চেয়ে আরও বেশি কিছু, যা হয়ত আমাদের যার যার অস্তিত্বের সেট্-বিলিফের ঘেরাটোপকেও ইঙ্গিত করছে ।

যেমন বলেছি যে দুঃখের একটা প্রতিপালন রয়েছে, তেমনি আত্মনিগ্রহেরও আছে একটা তুমুল নেশা । কবি বলেন—‘আমি দুয়ার খুলে বসে আছি/ বিরহ, আমাকে রাঙাও/ তোমার মতো রাঙিয়ে দিয়ে যাও/কথা বলার মতো ঘরে কেউ অবশিষ্ট নেই !’ (নীরবতা) । সম্ভবত বিরহ ছাড়া প্রণয় অসম্পূর্ণ । প্রেমেরই অপর সত্তা বিরহ । দূরত্বের অসহনীয়তার ডোরে বাঁধা যেমন রাধা আর কৃষ্ণ, তেমন । সম্পর্ক যখন কেবল দু-জনের মধ্যে, তা বিচ্ছেদের বা দূরের হলেও একান্তই কাছের । 

তমালের ছোটো ছোটো কবিতাগুলো এমনি করে ধারণ করে আছে বাচন আর পরা-বাচনের কুহেলি, যার অবর্তমানে কবিতা নিষ্প্রাণ শব্দের ঝুড়ি মনে হতে পারে ।

তার ‘হুইলচেয়ার’ কবিতাটি তাৎপর্যের চেয়ে তার দৃশ্যময়তাই যেন ডেকে আনে অনির্বচনীয় কোনো বার্তা । ‘ভেঙে যাওয়া হুইলচেয়ার সরিয়ে রেখেছিলাম/ উঠোনের পরিত্যক্ত কোনায়/হঠাৎ একদিন চেয়ে দেখি/বনলতায় ছেয়ে গেছে গোটা শরীর/ ভিতরে গুনগুন করছে পাখি’ (হুইলচেয়ার) । একটা পরিত্যক্ত নিষ্প্রাণ হুইলচেয়ারের ওপর দুটি জীবন্ত দৃশ্য, যেন গোটা চেয়ারটিই প্রাকৃতিকভাবে তার সমস্ত সত্তা নিয়ে জেগে উঠেছে এবং ক্রমশ মিশে যাচ্ছে চির-পরিব্যাপ্ত প্রকৃতির কোলে, যাকে আর কিছুতেই ফেরানো যাবে না ।

তমালশেখর সাধারণত দু-ধরনের কবিতা রচনা করেন, খুব দীর্ঘ আর খুব ছোটো । দীর্ঘ কবিতায় একধরনের ম্যাজিক্যাল পুনরাবৃত্তি ঘটান, যেগুলো ভিন্ন ভিন্ন অভিব্যক্তি নিয়ে বিভিন্ন জানালা খুলে দেয় পাঠকের সামনে । ছোটো কবিতাগুলো তেমনি তুলির  এক একটা আঁচড় ফেলে যায় যাদের  প্রকৃত কোনো শুরুও নেই, সমাপ্তিও অধরা থাকে, যেন সমুদ্রের এপার দেখা গেলেও ওপার বলতে কেবল নিঃসীম আকাশ । এমন কবির প্রেমের অনুভূতি কেমন ? দেখা যাক—‘আমাদের গ্রামে কোথাও কোনো নদী নেই ।/ তবু আপনাকে যখন দেখি, নদীর মতো তাকিয়ে থাকি ।’(প্রেম)। শঙ্খ ঘোষ লিখেছিলেন—‘… …আমার ভালো লাগে না যদি ঘরে ফিরে না দেখতে পাই/

তুমি আছো তুমি ।’  তমাল এখানে ‘তোমাকে’ না লিখে ‘আপনাকে’ লিখেছেন, যা দূরত্ব, সম্ভ্রম আর শ্রদ্ধারও প্রতীক হয়ে উঠেছে যেন কবির অপর সত্তার প্রতি

এবার যুদ্ধের কথায় আসা যাক । এও প্রেমেরই যুদ্ধ । ‘এই যে পেছন হাঁটছি,/ এটা যুদ্ধ/ এই যে তোমার সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসে আছি / এটাও যুদ্ধ ।’ (যুদ্ধ) । বস্তুত, এই যে লিখলেন কবি, এই লেখাটাও একটা যুদ্ধ । মনীষী  লিওতার বলেছিলেন--‘To speak is to Fight’ । সত্যিই তো ! কত না তাৎপর্য এই কথাটার । মনের কথা লিখে ফেলা কি সহজ ? তাও যদি সত্যিকারের কনফেশন হয় ! অন্যরা যা বলতে পারে না, কবি তো সেটাই বলেন । তিনিও মুখে বলে যা বোঝাতে পারেন না, সেটাকেই ধরতে চান শব্দে আর নৈঃশব্দ্যে !

জীবন ও যাপনের, শরীর ও মনের অজস্র মুহূর্ত কবি তমালশেখর শব্দের আড়ালে নীরবতার মধ্যে গেঁথে গেঁথে রেখেছেন । একটি ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের মনস্তত্ত্বকে কবি এভাবে  প্রকাশ করেন—‘যেদিন আমার খুব মন খারাপ থাকে/দুর্ভাগ্যবশত সেদিনই তোমার উৎসাহ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে ।/এমন মিলনই আজকাল আমাদের মাঝে স্থায়ী হয় বেশি ।’ (শঙ্খলাগা মুহূর্ত) । দাম্পত্য নিয়ে অনেক কবিতা আছে । বস্তুত আমার মনে হয়েছে দাম্পত্য বিষয়টা অনেকটাই যেন এই কবির একটা গবেষণার বিষয় ও প্রিয় বিষয় । এমনি আরেকটি অসাধারণ তাৎপর্যময় উচ্চারণ—‘শুধুমাত্র মশারির ভিতরে ছোট্ট একটা মশা/ এছাড়া তেমন কোনো সমস্যা নেই আমার দাম্পত্য জীবনে ।’ (দাম্পত্য/১) । মশারি শব্দটাই যথেষ্ট ছিল, কারণ এটাই একটা বিশাল প্রতীক হয়ে উঠেছে দাম্পত্যের । তেমনি মশা হয়ে উঠেছে দাম্পত্যের মাঝে কোনো অজানা দূরত্বের প্রতীক । কবিতার আসল বক্তব্যকে ধরে রেখেছে এই দুটি শব্দ ।

শব্দ, এবং পঙ্ক্তিতে শব্দের বসার জায়গা নিয়ে ভীষণ খুঁতখুঁতে এই কবি । বহুবার এ প্রসঙ্গে আমাদের মধ্যে আলোচনাও হয়েছে । কোনো কবির জন্য এ এক অসাধারণ গুণ । শব্দই সব । কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে শব্দের নির্বাচন আর তার বসার সঠিক জায়গা নির্ণয় । কার কাছে বসলে, কোন ইশারা নিয়ে আসে, সেটা কবিতার ক্ষেত্রে অত্যন্ত জরুরি ব্যাপার ।

‘ভালোবাসা’ কবিতায় মোবাইলের ব্যবহার সময়কে চিহ্নিত করে । ‘তার নিসঙ্গতায় সঙ্গ দেবার কোনো উপায় নেই ।/কেবল মোবাইলে ছুঁয়ে রাখি হাত ।’ (ভালোবাসা) । যদিও একটু হালকা কথা, তবু এটা অমোঘ সত্য যে  আজকালকার দিনে প্রেম ভালোবাসার জগতে মোবাইলের বিরাট ভূমিকা রয়েছে । আগেকার দিনে ছিল চিঠি । ‘যাও পাখি উড়ে গিয়ে বল তাহারে/সে যেন না ভুলে আমারে’ । চিঠি লেখার সেই  নীল প্যাড তো আর নেই এখন ! দাম্পত্য বা প্রণয়ের আরও কত রূপ আমরা পাই  এই কবির উচ্চারণে— ‘মিলনের সময় তুমি যখন বুকের নিচে/পাখির মতো ছটফট করো তখন আমার আনন্দ হয়/আমার দুঃখ হয়—/যখন তোমাকে উড়ন্ত পাখির মতো সুখ দিতে পারি না ।’  (বিহঙ্গ)  

কোনো কবিই সময়কে অস্বীকার করতে পারেন না । সামাজিক মানুষের দ্বারা নীতি নির্ধারণের মাধ্যমে সময়ের স্থানিক চেহারা বদলে বদলে যায় । নীতি নির্ধারণের লক্ষ্য একদা ছিল বহুজন সুখায় চ, বহুজন হিতায় চ । আজ থিসিস এন্টি থিসিসের খেলায় এর ইচ্ছা পরিবর্তিত হয়েছে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার লক্ষ্যে । রাজনীতি । রাজনীতিই সব । এ ব্যাপারেও তীব্র অনুভূতির কবিতা পাই এই গ্রন্থে । ‘বেয়নেট থেকে গুলিটা তখনই বেরিয়েছিল/যখন কৃষকের মুখ থেকে বেরিয়েছি—‘না’/আজ ‘না’ পেয়ে গেল নায়কের সম্মান/দেহ পড়ে রইল মাঠে।/কিছু লোক এতক্ষণে জেনে গেছে—/ ‘কাল মিছিলটা জমবে !’ (রাজনীতি) । এই গ্রন্থে ১৬০টার মতো কবিতা রয়েছে সবগুলোই বিস্ময়করভাবে আত্মোন্মোচক। সাধারণত এ ধরনের রচনায় স্টান্টবাজীই মুখ্য হয়ে থাকতে দেখেছি আমরা । কিন্তু এই গ্রন্থে কোনো বালখিল্য চমক একেবারেই নেই, যা আছে তা কেবলই আত্মার শিহরণ । আর একটা লেখার উল্লেখ করে আপাতত ইতি টানব । 

আত্মদর্শনের আর এক মোক্ষম স্বরলিপি—‘উত্থানে স্বাদ আছে জানতাম/এই প্রথম জানলাম পতনেও এত স্বাদ ।/ সর্বশেষ মুহূর্তে আপ্রাণ জড়িয়ে ধরলাম তাকে ।/ পতনেও সে যে আমার শেষ ঠিকানা ।’ (পতন) । পতন শব্দের ব্যবহার লক্ষ করার মতো । একটা শব্দ, একটা কথাকে কোথা থেকে কোথায় নিয়ে যায়, তা সম্ভবত কবি নিজেও অনুমান করতে পারেন না । একেই বলে অনেকার্থদ্যোতনা ।

সুন্দর প্রচ্ছদ সাজিয়েছেন অনিমেষ মাহাতো ।

গ্রন্থ : গ্যান পয়েণ্ট কবিতা

প্রকাশক  : নীহারিকা পাবলিশার্স

No comments:

Post a Comment

অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎

  'অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎ ‎সত্তর দশকের উন্মাদনায় এক ভিন্ন উচ্চারণ-ভঙ্গ...