“ভাবাই আমার কাজ । তাই ভাবি
সারাদিনমান”
বা
“জীবন আমার দাস নয় কিন্তু জীবনে যাপন আমার দাস”
ত্রিপুরার কবিতার ইতিহাসে কবি নকুল রায় এক
অবিস্মরণীয় নাম । সত্তর দশকের উন্মাদনা পর্যায়ের এই উজ্জ্বল নক্ষত্র তিনি ।
ত্রিপুরার সাহিত্য তৎপরতায় “গ্রুপ সেঞ্চুরি”-র বলিষ্ঠ ভূমিকাকে অস্বীকার করার সাহস
কে দেখাতে পারবে ? সেই “গ্রুপ সেঞ্চুরি”-র
যাবতীয় উন্মাদনার তিনিই ছিলেন প্রাণপুরুষ । প্রায় চার বছরের তীব্র
উন্মাদনায় দিনরাত কেটেছে গোটা আগরতলাসহ ত্রিপুরার কাব্যভূমি । কবিতা- নাচ- গান-
নাটক, কী ছিল না ! সেই গ্রুপ সেঞ্চুরি
নিয়েই তার কাছে জানতে চাই – ‘গ্রুপ সেঞ্চুরি’ আপনার মনমস্তিষ্কপ্রসূত একটি
সাস্কৃতিক আলোড়ন । এই নিয়ে আমাদের কিছু বলুন ?” উত্তরে বললেন – “ একেবারে সঠিক কথা
বলেছ – ‘মনমস্তিষ্কপ্রসূত একটি সাস্কৃতিক
আলোড়ন । স্থানীয়- অস্থানীয় অনেকেই বলেন, এটি ছিল
সাস্কৃতিক আন্দোলন। আলোড়নই ঠিক । দেখো, গ্রুপ সেঞ্চুরি নামটা আমিই ঠিক করি
। আগরতলার বন্ধুদের পছন্দ হল । আমাদের সিম্বল বা প্রতীক ছিল পেঁচা। পেঁচার দুই
ডানা মেলা, উড়বে- উড়বে ভাব ।ব্যাখ্যা করলাম এই প্রতীকের । সময়টা ছিল ভয়ঙ্কর । ১৯৮০
সালের দাঙ্গার পর ঘরে বাইরে সর্বত্র অস্থির পদচারণা । রাজনৈতিক আর্থ-সামাজিক
অবস্থা ভেঙে ফেটে টুকরো হচ্ছে সব । হচ্ছে মূল্যবোধও । কবিতার লাবণ্য সব উধাও । তখনই মনে হল এটাই সময় কিছু করার । আমরা
কয়েকজন মিলে শুরু করে দিই পরিকল্পনা ।
গ্রুপ সেঞ্চুরির আমরা সবাই ছিলাম
তখন বেপরোয়া । যৌবনের উন্মাদনায় উদীপ্ত । সেই থেকেই শুরু ।” সেই উন্মাদনা একটা পর্যায়ে থেমে গেলেও এর প্রভাব
আজও বহমান । নকুল রায় ত্রিপুরায় কাব্য-তৎপরতায় বিশেষ গুরুত্ব রেখেছেন । কবিতার
জন্য ঘুরে বেড়িয়েছেন ত্রিপুরার আনাচেকানাচে । ত্রিপুরার লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনেরও
প্রাণপুরুষ বলা যায় তাকে। ২০২০ সালে তার প্রায় ২২টি কাব্যগ্রন্থ নিয়ে প্রকাশিত হয়
তার ‘কাব্য সমগ্র’ । নকুল রায় আদ্যোপ্রান্ত কবিতা পাগল লোক । একবার তাকে জিজ্ঞেস
করেছিলাম – “ কবিতার ভিতর কি এমন আছে, যা আপনাকে সারাক্ষণ পাগলের মত বাঁচিয়ে রাখে
?” উত্তরে বললেন – “ আমার অগ্রজ কবি কল্যাণব্রত চক্রবর্তী একবার আমাকে প্রশ্ন
করেছিলেন –‘ তুমি সারাদিন কী কাজ কর?’ উত্তরে বলেছিলাম – ‘ ভাবাই আমার কাজ । ভাবি
সারাদিনমান কবিতার জন্য । কবিতা লেখাই
আমার কাজ । সেই সাত বছর বয়েস থেকে আপন মনে ভাবি, আজ ৭৬ বছর পরও সেই ভাবনাতেই ডুবে
আছি । এবং আজও এই নিয়ে ভালো আছি ।” তখনই কেন জানি টুক করে প্রশ্নটা চলে এল –
‘কবিতা মধ্যে কি এমন আছে ?’ বললেন – ‘শোন, চিত্র- ভাস্কর্য- নাচ- গান- নাটক
ইত্যাদি ইত্যাদি ৬৪টি কলার জন্য প্রতিষ্ঠান আছে । একমাত্র ব্যতিক্রম কবিতার
ক্ষেত্রে । কবিতার কোনো ক্লাস নেই ।
ভাষাকে আক্রমণ করতে পারে একমাত্র কবিতাই । একমাত্র কবিতাই আমাদের বারবার নতুন করে
তোলে । তাই আমি কবিতায় ডুবে থাকি । কবিতা লিখি।”
এই হচ্ছেন কবি নকুল রায় । তাই তিনি কবিতায় উচ্চারণ করেন – “ ভালোবাসা লীন
হয়ে আছে / পাপের শরীর / কী রকম চিনির মতো গলে যায় ধোপার শরীর” ( দেয়ালে দেয়ালে)
কিংবা “ কখনো এই শরীর ছুঁয়েই পালক হয়ে
যাই/ কখনো কাঁটার মতো বিঁধে যায় ঈশ্বর / শিরায় শিরায় স্নান সেরে / পেছন দুয়ার খুলে
হারিয়ে যাই” ( হৃদপিণ্ডের হাট) । কিংবা “ ওই তো কাছেই নির্জনতা মগ্ন থাকি পরবাসী
বলে/ সবাই একপ্রকার ভালো থাকি শংকর হোটেলের মানুষ/ অন্ধকার ফুরালে ঠিক চোখের কোণে
/ পরাভূত মানুষের ভয় ও বিতৃষ্ণা জটিল” ( সাঁকো)।
কবি নকুল রায়ের কাব্য-ভাষা টানটান । দেশভাগ,
উদ্বাস্তু জীবনের শিকড় যন্ত্রণা, স্থানিক চিত্রকল্পের বুনন তার কবিতাকে করে তুলে
হৃদয়গ্রাহী । ত্রিপুরার কবিতা সম্পর্কে নিবিড় একটা ধারণা তৈরি করতে হলে, কবি নকুল
রায়কে স্পষ্টভাবেই ছুঁয়ে যেতে হবে । ত্রিপুরার সাহিত্য তৎপরতায় তার অবদান
অনস্বীকার্য। এমন ব্যক্তিত্বের পাশে দাঁড়িয়ে জানতে ইচ্ছে হল – “ আচ্ছা, আপনার
যাপনচরিত্রে জীবন-জীবিকা নিয়ে মৌলিক ভাবনাটা ঠিক কী রকম ? উত্তর নকুল রায় বললেন –
“ জীবনযাপনে আমার জীবনে বেশি কোনো চাহিদা নেই । তার কারণ আমি মনে করি, প্রতিযোগিতা
করার মতো আমার সেই মেধা নেই । আর ‘জীবন নিয়ে মৌলিক ভাবনা’ বলতে যা বুঝি তাহল, জীবন
আমি অনেকের মতো পেয়েছি, কেবল ভাবনাটা আমার । জীবন আমার দাস নয় । কিন্তু জীবনে যাপন
আমার দাস । আমি কীভাবে বাঁচব, কী করে মানুষের ভিতরে প্রবেশ করব, কী করে কোন অর্থে
এই জগতে বসবাস করব, সেটা ভাবাই আমার কাজ । সেই কাজ করতে গিয়ে আমার আবেগ, নিগূঢ়
স্তরের অনুসন্ধান করাই আমার কাজ । এই কাজ করতে গিয়েই আমি সারাদিন ভাবি । আমার কাছে
ভাবার এই কাজ মোটেই কোনো প্রকার বিলাসিতা নয়। আমি মনে করি এটাই
আমার যাপন পদ্ধতি ।”
আমি আগেই বলেছি, নকুল রায়ের কবিতায়
ব্যক্তি জীবনের ক্ষুধা, কাম, যন্ত্রণা, বিরক্তি, ক্ষোভ, হতাশা, প্রতিবাদ, লোভ ,
ঈর্ষা, ভালোবাসা সব মিলেমিশে একাকার, তার কাব্য-ভুবন । কবি ২০১০ সালে প্রকাশিত
কাব্যগ্রন্থ “ জন্মসূত্রকথা” কাব্যের জন্মসূত্রকথা কবিতায় লিখে ফেলেছিলেন যেন
আজকেরই সমাজচিত্র, যেখানে কবি লিখছেন – “ – কে যায় ? হ্যান্ডস্ আপ !/ - আমি স্যার,
বরুয়াকান্দির ফণীভূষণ, আমার সঙ্গে / ইকবাল হোসেন / সঙ্গে তার বিবি, আমার
স্ত্রীপুত্র বৃদ্ধ মাকে কোথাও খুঁজে/ পাচ্ছি না / স্যার সীমান্তে মিথ্যা অনুপ্রবেশ
নয় স্যার / জন্মসূত্রে আমরা ভারতীয় / স্যার । আমরা নিরুপায় -/ - চুপ শালা! কথা
বাড়াবি না, চল থানায়।”
কবি নকুল রায় বিশ্বাস করেন – “ বাস্তবতার বাইরে কোনো কল্পনা নেই এবং কোনো কবিতাই বাস্তবশূন্য নয় ।” তার কবিতার ভাষা টানটান । নির্মেদ। সটান । কবির জন্ম ১৯৪৮ সালে, তৎকালীন পূর্ব- পাকিস্তানের শ্রীহট্ট জেলার হবিগঞ্জে । ১৯৫২ সাল থেকে আগরতলার রামনগরে বসবাস ।১৯৭০ সালে ‘আহুতি’ লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদনা এবং প্রকাশনা দিয়ে সাহিত্যে পদার্পণ । এরপর “ সাঁকো” “ সময়” “ধ্বনিপ্রান্তর” এবং বর্তমানে “ স্বতন্ত্র মেধা” সাহিত্য পত্রিকা নিয়ে ব্যস্ত আছেন । স্বাভাবিকভাবে এখনও লেখ্যজীবনই তার উপার্জনের একমাত্র উৎস । বাইসাইকেল তার কাছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ যান । প্রচ্ছদ শিল্পে ছিল তার অসাধারণ দক্ষতা । পুরনো ম্যাগাজিনে তার লিনোকাটের প্রচ্ছদ ছিল অসাধারণ । সব মিলিয়ে হাজারখানেক হবে বলে কবি ধারণা করেন । তিনি বেহালা, মাউথ অর্গান, বাঁশি, ম্যান্ডোলিন বাজান আপন মনে । নাটক লিখেন । পথ- শিশুদের জন্য কাজ করেছেন অনেকদিন । এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন – “ পথশিশু আমার সাবজেক্ট । তাদের জন্য আমি মাইলের পর মাইল হেঁটেছি । আমি বিশ্বাস করি, এই সমাজে এখনও ভালো মানুষের সংখ্যা বেশি । না-হলে আমরা বেঁচে আছি কী করে ! টাকা নিয়ে কবি নকুল রায়ের রয়েছে অন্য এক বিশ্লেষণ । সেটা জানি বলেই জিজ্ঞেস করলাম – “ আচ্ছা, আপনি তো আগে প্রায়ই বলতেন – “টাকা কারও ব্যক্তিগত নয়’, যৌবনের সেই কথায় কী আপনি আজও অটল ?” উত্তরে বললেন – “ হ্যাঁ, এখনও আমি তাই মনে করি- টাকা কারও ব্যক্তিগত নয় । টাকা হল রাষ্ট্রযন্ত্রের এক বিশ্বস্ত মিডিয়া, যা দিয়ে সমস্ত দ্রব্যের মতো মানুষও কেনা যায় । অনুগত করে কখনও দাস করেও রাখা যায় । এই দাসত্বের গর্বে স্ফীত হওয়া সত্ত্বেও কোনো টাকাই আজ পর্যন্ত ভালোবাসা বা প্রেম কিনতে পারেনি । তুমি তোমার প্রয়োজনে রুচি অনুযায়ী টাকা খরচ করতে পারো, কিন্তু যেদিন ওই টাকা তোমার মাথায় চড়ে হুকুম চালাবে, সেদিন থেকে তুমি ক্রীতদাস হলে, বাউল হতে আর পারলে না ।” সব মিলিয়ে বলতেই হয় – কবি নকুল রায় ত্রিপুরার বাংলা কবিতার জগতে এক অবিসংবাদি উচ্চারণ ।


No comments:
Post a Comment