রাহুল শীলের
কবিতায় আত্মক্ষরণের পদচিহ্ন
তমালশেখর দে
“জম্পুই গেলে সাথে নিয়ে যাই
আত্মশোক,/ দহনের সাথে শীতলতা
মিশিয়ে নিতে গিয়ে/
ফুলডুংসের গ্রামের যুবতীরা চেয়ে থাকলে ভাবি / সমতল থেকে আমরা যেন প্রতারক সেজে এসেছি” – কবিতার নাম ‘পাহাড়-প্রেরিত’ । পড়ছিলাম ‘৪৩তম আগরতলা বইমেলা’-য় প্রকাশিত তরুণ কবি রাহুল শীলের তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ - ‘স্বনির্মিত জতুগৃহ ও আত্মক্ষরণ’
। “সমতল থেকে আমরা যেন প্রতারক সেজে এসেছি”—কবির এই স্বীকারোক্তি আমাকে
মুগ্ধ করেছে । প্রথম লাইনে লিখেছেন –
‘“জম্পুই গেলে সাথে নিয়ে যাই আত্মশোক’ । এই ‘আত্মশোক’ এবং ‘প্রতারক’
দুই লাইনের শব্দদুটিকে অনেকক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে
কবির ব্যথা অনুভব করার
চেষ্টা করলাম । কোনো ধরণের ভূমিকা না-
রেখেই হঠাৎ কবি নিজেকে প্রতারক বলতে গেলেন কেন ? এই বিষয়টা আমাকে উৎসাহিত
করল । আগ্রহ বাড়ল । দেখলাম
এরপর কবি লিখছেন – “ নীরবতার পাহাড়ে ঘুরে ঘুরে দেখি / কোথাও কোনো শব্দ নেই হিংস্রতার! / আলোগুলো নিভে যায় রাত বেড়ে গেলে / আমরা তখন উন্মাদ হয়ে রাস্তায় চিৎকার করে বলি - / জম্পুই উই লাভ ইউ / ইয়োর পীসফুল ডার্কনেস ইজ আওয়ার এক্সট্রিম নীড”। কবির শান্তির সন্ধান আমাদের ভাবায় । ইংরেজি বাক্যের চমৎকার ব্যবহার ভাল লেগেছে । ‘এক্সট্রিম নীড’ শব্দটা গোপনে যেন
অনেক কথাই বলে গেল । কিন্তু এরপের দুটি কাইনে
আমি একটু অবাক এবং মুগ্ধও হলাম,
যেখানে কবি লিখছেন – “আর পাহাড়প্রেরিত প্রতিধ্বনিতে শুনতে পাই একগুচ্ছ তিরস্কার / এবং শুনতে পাই আমাদেরই সমস্ত ইচ্ছাকৃত হিংস্রস্মৃতি”।
কবির সরল পাহাড়িদের ‘একগুচ্ছ তিরস্কার’ অনুভব ক্রেতে পেরেছেন । তাও আবার একগুচ্ছ । এবং যা আমাদেরই ফেলে আসা । অর্থাৎ কবি এখানে নিজেও জড়িয়েছেন । কবি নিজের ‘আত্মশোক’ পোষণ করতে করতে, কিংবা তার বেদনা ভুলতে পাহাড়ে গিয়ে নিজেকেই খুঁজে পেলেন ‘হিংস্র’ হিসেবে । কিংবা তার প্রতিনিধি হিসেবে । এই প্রত্যাখ্যান,
একগুচ্ছ তিরস্কার, নিয়ে যেন কবি ফিরলেন জম্পুই থেকে । এই আত্ম-উপলব্ধি কবির । নিজেকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেখার এই স্পর্ধা আমার ভালো লেগেছে । একজন তরুণ কবির
কাছে আজ তো এটাই কাম্য । তিনি নিজেকে দেখবেন । নিজের ভিতর দিয়ে অন্যকে দেখাবেন, তার দেখা । নিজেকে দেখার এই প্রবণতা কবির অন্যান্য ৫৭টি কবিতায়ও দেখতে পেয়েছি । “নিজস্ব কালো ছায়ার কাছে রোজ মিশে যাচ্ছে যে বিড়ালটি / খুবলে খাচ্ছে গার্হস্থের স্মৃতি, মধ্যরাত্রির শীৎকার !/ তার কাছে কি করে দাঁড়াই সংস্কারপন্থী হয়ে/ এই অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্য এঁকে যাচ্ছে
আমারই আত্মপ্রচ্ছদ”
( প্রচ্ছদ)
কিংবা “ দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা প্রেমিকারা / বসে আছে শুধু শুধু / জম্পুই হিলসে চুম্বনোপযোগী কোনো দৃশ্য নেই।” ( স্মৃতি বিজড়িত) । কিংবা ‘প্রেমিকার কথা লিখলে/ভাববেন না আমি একতরফা লিখি,/রাষ্ট্রের কথা লিখলে /ভাববেন না আমি বিপ্লব ঘটাতে চাইছি !’(অনুরোধ)
কবি
রাহুল শীল সম্ভাবনাময় এই কথা তো বলাই যায় । প্রস্তুত্তিপর্ব
সফলভাবেই অতিক্রম করতে পেরেছেন,
এ-কথা এখন বলাই যায় । তবে কবিতার মূল পর্ব এখান থেকেই গড়তে হবে কবিকে। সমাজজীবন, আমাদের ব্যক্তিজীবন, আমাদের ভালোবাসার ভিতরে দহনজ্বালা, তার রাষ্ট্রীয় প্রকাশ, এখন
এইসব বিষয় নিশ্চয়ই আরও
সংযম এবং গভীরতার
সাথে কবির কবিতায়
উঠে আসবে, এটা
আমরা প্রত্যাশা করতেই
পারি।
প্রচ্ছদ আরও
কবিতাকেন্দ্রিক হতে
পারত ।
পাঠকরা রাহুল
শীলের “স্বনির্মিত
জতুগৃহ ও
আত্মক্ষরণ”-টি
হাতে তুলে দেখুন,
আশাকরি ভাল
লাগবে ।
No comments:
Post a Comment