Sunday, October 6, 2024

“ক্রাইসিস আছে বলেই উত্তরণের প্রচেষ্টা। এখানেই অস্তিত্বের লড়াই।এখানেই ইনভল্বমেন্ট।” -- কবি সন্তোষ রায়

 

ক্রাইসিস আছে বলেই উত্তরণের প্রচেষ্টা। এখানেই অস্তিত্বের লড়াই।এখানেই ইনভল্বমেন্ট।


 বাংলা কবিতায়  প্রবেশ মুহূর্ত থেকেই কবি সন্তোষ রায় নিঃসন্দেহে   উজ্জ্বল নাম। মন্ত্রের মত কখনো গাঢ় থেকে ক্রমশ গাঢ়তর তাঁর লেখায় উচ্চারণ। তির্যক ভঙ্গি, কোথাও এক গভীর এক মমতাময় তাঁর প্রকাশশৈলী। পাথরকে জল বলার কলাশৈলী।  সত্তর দশকের আলোড়ন থেকে উঠে আসা কবি সন্তোষ রায়-এর সাথে কথোপকথনে তমালশেখর দে।    

 

প্রশ্ন ঃ একজন কবির কবিতা-সমুদ্রে ঝাঁপ দেয়ার আগে তাঁর ব্যাহ্যিক জীবনযাপন, প্রেম-অপ্রেম, স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন, মান-অপমান, এককথায় তাঁর দীর্ঘ দিনলিপির রান্নাঘর খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে দেখার পর তাঁর কবিতার মুখোমুখি হওয়া উচিত । না-হলে পাঠ-প্রতিক্রিয়ায় হতাশ হওয়াটাই স্বাভাবিক, কিংবা বিভ্রান্তি ।-- আপনি কী বলেন ?

 

উত্তর ঃ  বুঝতে পারছি তুমি প্রস্তুতিপর্বের কথা বলতে চাইছো । কবির প্রস্তুতিটা-ই জীবন । এই জীবনের আলাদা কোনো অংশ কবিতা নয় । যেমন, সময় এক কবিতা, প্রকৃতি এক কবিতা । যাক্ তোমার উত্তর শুরু করার আগে ভাবতে হবে, কবিতা কবিকে সৃষ্টি করেন, না-কি কবি কবিতা সৃষ্টি করেন । ‘সৃষ্টি’-র পাশাপাশি ‘নির্মাণ’ যদি মানি তবে উপরের দু-টো কথাই ঠিক । কেউ কেউ কবি হয়েই আসেন, কেউ কেউ আবার জন্মের পর কবি হন । তবে কবিত্ববোধ সুপ্ত না-থাকলে জন্মের পর শত অনুশীলন- অনুসরণেও কবি হওয়া যায় না । হ্যাঁ, সবার মধ্যেই কম-বেশি কবিত্ব থেকেই যায়, হয় সুপ্ত, না-হয় জাগ্রত । তা’ নাহলে গ্রামের চাষি-মজুর-গৃহবধূরা দেহতত্ত্বে  রহস্যের সন্ধান পেতেন না । এই বোধকে আরও বেশি জাগ্রত করা-ই কবির অনুশীলন আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি হাজারও বছরের রক্তের ধারা বিশ্বাস করে । আমার কৃষ্টিতে মূলতঃ আমি আমার রক্তকেই পরিশোধিত করি । যা আমার জীবনকবিতা ও পরবর্তী প্রজন্মকে নান্দনিক করে তোলে । এই সত্যে জীবনে প্রথম প্রথম আসে সংস্কৃতি তারপর সাহিত্য । সংস্কৃতি জীবন গড়ে তোলে । এই সত্যে জীবনে প্রথম আসে সংস্কৃতি তারপর সাহিত্য সংস্কৃতি জীবন গড়ে তলে,সাহিত্য তা প্রকাশ করে ।আমার প্রেম, স্বপ্ন কখনও অপ্রীতিকর হয় না, যদি আমি সাংস্কৃতিক হই আমার অঙ্গ-প্রত্যাঙ্গাদি অবাধ্য হয় না, যদি ভেতর সংস্কৃতি পূর্ণ হয় । মন প্রস্তুত হলে দেহ প্রস্তুত । এভাবেই চাষবাস, এভাবেই অভিজ্ঞতা-অনুভব- উপলব্ধি সঞ্জাত রান্নাঘর । কবিতা কবিকে ধরা দেয়, কবিকে প্রকাশ করে ।

একসময় কোনো একটি কবিতাতে আমার একটি পংক্তি এসেছিল – “আমাকে আবৃত্তি করে কবিতা আমার...”। এই বিশ্বাস এখনও রাখি । কবি বিনয় মজুমদার কবিতাকে কবির রান্নাঘর বলেছিলেন একবার । আমি কবির কথা পড়ে লিখেছিলাম – কবির রান্নাবান্না হয় সালেক-সংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় । মেলে রাখা মনে অভিজ্ঞতা সঞ্জাত হয়ে কখন যে পংক্তি রচিত হয়, কবিও জানেন না ।

 আসলে কোনো কবি,কবি হতে চান না । হয়ে উঠতে চান কবিতা । সেটা-ই হল প্রকৃত কবিতা, যেখানে কবি ও পাঠকের পৃথক কোনো চৌহদ্দি থাকে না । জীবন-সময় এবং কবিতা অপার সমুদ্র।

 

 প্রশ্ন ঃ এই যে একটি মূল্যবান কথা বললেন,  ‘সংস্কৃতি জীবন গড়ে তোলে, সাহিত্য প্রকাশ করে’ – এই যে গড়ে তোলা, তাহলে রবীন্দ্রপরবর্তী সময়ে যেভাবে পাশ্চাত্য-ভাবাদর্শ, মতবাদ, ধ্যান-ধারণা, চিন্তাচর্চার কাজ করেছে এবং সাহিত্য হয়ে উঠেছে, সেটা কী করে জাত হয়ে উঠল ? এই প্রবণতাকে কোনভাবেই তো আমাদের সাংস্কৃতিক জীবন থেকে উঠে এসে প্রকাশিত হয়েছে বলা যায় না । বিভূতিভূষণের মতো দু-তিনজন ব্যতিক্রমী লেখক ছাড়া । আপনি বিষয়টি কীভাবে দেখছেন ?


 উত্তর ঃ আমার কথাটি ছিল ব্যক্তিজীবন গড়ার ভিত্তি নিয়ে নিজস্ব সংস্কৃতি ছাড়া জীবন সুগঠিত হতে পারে না । ভেতর সুগঠিত হলে, বাইরে সুপ্রকাশ ঘটে । একজন লেখকের মনের প্রস্তুতিই প্রথম ও প্রধানসুপ্ত সাংস্কৃতিক চেতনা নিয়ে জন্মালেও, সবাই পারিবারিক কি সামাজিক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল পেয়ে থাকে না । রবীন্দ্রনাথ যেমনটা পেয়েছিলেন । বঞ্চিতরা  সন্ধান করে নেয় তার সংস্কৃতি ঐতিহ্যের । অনেক পরিবারে রিচুয়্যাল থাকে বটে, তবে তা’ অন্ধবিশ্বাসেরমানুষ নান্দনিকতা, শৃঙ্খলা,কৃষ্টি, ঐতিহ্য-বোধ ভিন্ন সুচেতনাসম্পন্ন  হতে পারে না । এই ব্যক্তি তৎপরতার কথা আমি বলেছিলাম । তুমি বললে সময়ের কথা । ব্যক্তি ও সময়ের সাংস্কৃতিক তৎপরতা এক নয় । সময়ের তৎপরতা এক সামগ্রিক তৎপরতা, যা দেশকালজাতিকে সুসংহত করে । বাংলার সংস্কৃতি অনেক বর্ণসংস্কৃতির সমন্বিত রূপ । যাক্ সে কথা, কথায় আছে – রাজনৈতিক বিপ্লবের আগে চাই সাংস্কৃতিক  বিপ্লব । অর্থাৎ আগে রুচি তারপর রুটি । রুটি না হোক, সাহিত্যের ক্ষেত্রে রুচি তো চাই । আগে রুচি তারপর সাহিত্য । এহেন জীবন; সংস্কৃতি ভিন্ন বিকশিত হতে পারে না । আমি ভেতর ও বাহিরকে একই রূপে দেখি। ভেতরে কালো, বাইরে আলো – এই আলো নিজস্ব হতে পারে না, তা’ কেবল অনুকরণ / অনুসরণ মাত্র । কিছু কিছু সময়-কাল এই রূপে যায় --- স্ব-সংস্কৃতি-ঐতিহ্যের সজ্ঞান অনুপস্থিতির কালে সাহিত্যে – অন্য মেধা চিন্তাচেতনা অধিকার নিতেই পারে । রবীন্দ্রপরবর্তী সময় বলতে ত্রিশের দশক থেকেই বস্তুবাদী চিন্তা, প্রগতি সাহিত্য স্থান পায় । ক্রমে ফরাসী সাহিত্য প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে বোদল্যায়ারের মাধ্যমে । এই সময় বাংলা সাহিত্যে, ভারতীয়তা এবং বাংলা সংস্কৃতির জাগরণ কতটুকু ছিল, সময়ের প্রয়োজনীয়তা ছাড়াও রবীন্দ্রধারা থেকে সরে  আসার প্রবণতা কতটুকু ছিল তা-ও বিচার্য্য ।

কালে-কালে কাব্যে বিদেশী প্রভাব পড়তেই পারে । বাংলার রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দও মুক্ত নন। কিন্তু সেই প্রভাবকে নিজস্ব করে তুলতে পারেন একজন ঐতিহ্য অনুসারী-ই । যার জন্যে রবীন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথ-ই বা মানিক  বন্দ্যোপাধ্যায়--  মানিক  বন্দ্যোপাধ্যায়ই । তারপরেও কিছু আন্দোলন বা তৎপরতা দেখি, যা-সব পশ্চিম থেকে আছড়ে পড়েছিল বাংলা সাহিত্যে, নিজস্ব সস্কৃতিহীন সে সাহিত্য কালের বিচারে একদিন ম্লান হয়ে যায় । কোনো কোনো সময়-কালে, জাতি-সমাজ ঐতিহ্য থেকে দূরে যেতেই পারে । তখনই প্রয়োজন জাগরণের। আর নয়তো কালের স্বাভাবিক প্রবাহে ফিরতে গেলে কালক্ষয় হয় । আজ যেমন বাংলাকবিতা আবার নিজমুখী হতে চলেছে । প্রভাবিত সাহিত্য সমৃদ্ধ হলেও স্ব-পরিচয়ের নয় --- অননুকরণ মাত্র ।

 প্রশ্ন ঃ দিবারাত্রি যাপনের কোন পর্যায়ে আপনি একটি কবিতা লিখতে বাধ্য হয়ে পড়েন ?

 উত্তর ঃ ‘বাধ্য’ কথাটি উচ্চারণ করলেই ‘অবাধ্য’ শব্দটি মনে আসে। লিখার ক্ষেত্রে আমি ‘বাধ্য’ লেখক নই, তেমনি ‘অবাধ্য’ও নই। তবে কখনো  কখনো  না লিখে উপায় থাকে না। না লিখে মনটাকে অন্য কোথাও সংস্থাপিত করতে পারি না। এমনি এক অস্বস্তি। এহেন এক নেশাকাল কখনো কখনো আসে। না, দিবা কি রাত্রি এর কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। যে কোনো প্রহরেই তা’ ঘটতে পারে। বিশেষতঃ কিছু পাঠ করার সময়, এমনকি সংবাদপত্র পাঠ করলেও তাড়িত হয়ে যাইআরেকটি কথা,প্রতিনিয়ত প্রবাহে থাকলেও রুটিন করে লিখার অভ্যেস আমার নেই।প্রথম দিকে কিছুটা ছিল—সবাই ঘুমালে আমার লেখার  তন্দ্রা আসত।আজকাল সে অভ্যেস বর্জিত।

এবার যদি যাপনের কথা বলি,তবে বলবো, কি দিন কি রাত নয়, কবিতার জন্য জীবনযাপন ।কবিতার উপযোগী হয়ে থাকা।আমরা সংসারী মধ্যবিত্ত, এহেন যাপনে অনেক সংকট আছে। তবু যতটুকু সংবেদনশীল হয়ে থাকা যায় মধ্যবিত্তের সংকটগুলো কখনোই কবিতার প্রতিবন্ধক নয়, বরং সহায়ক, কেন না কোনো কিছুই কবিতার বাইরে নয়। এই বোধে নিজেকে নিমগ্ন রাখা।

 

প্রশ্ন ঃ কবিতা-আধুনিকতা এবং সময় এই ত্রয়ী শব্দবন্ধ-কে আপনি কীভাবে বিশ্লেষণ করতে চাইবেন ?

 

উত্তর ঃ  আধুনিকতার মাঝে ‘অধুনা’, তেমনি কবিতা ও সময়ের সাথেও অধুনা যুক্ত হয়ে আছেএই বিশ্বাসে বলি,কেউ কি আর পিছিয়ে যেতে চায়? নতুন হতেই চায়। যেমন সময় চায়,তেমনই কবিতা ও আধুনিকতা...প্রাচীনের কাছে তখনই আমরা শরণ নিই ; সেই প্রাচীন যখন চির আধুনিক।এভাবেই মিথের কাছে ফিরে ফিরে যাওয়া।পুরাতনে ফিরে যাওয়া মানে বিগতের কাছে নয়, বরং আগামী আধুনিকতার কাছে। চর্যাপদে, মহাকাব্যে, পুরাণে যেতে বাধ্য হই—শুধু কি ঐতিহ্য-অস্তিত্ব-শেকড়ের খোঁজে? না, ওই আধুনিকতাকে ডিঙোতে পারছি না বলেও। তোমার ওপরের তিনটি শব্দ — কবিতা-আধুনিকতা ও সময় – এদের পারস্পারিক সম্পর্ক অতিশয় নিবিড়। বা বলা যেতে পারে – এক নাড়িতে বাঁধা, টান পড়লে অন্তরাত্মা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।

 

 প্রশ্ন ঃ গল্প এবং কবিতা দু-টোতেই আপনি স্বাছন্দ, তবু গল্পতে আপনাকে কম পাওয়া যায় কেন?

 

উত্তর ঃ গল্প যে লিখি না, তা নয়। একসময় লিখতে লিখতে টের পেলাম গল্পে কবিতাকেই ছড়িয়ে যাচ্ছি । আমার ভাষারীতিও হয়ে উঠলো গদ্য-পদ্য ভাষার মিশ্রণে এক ভাষা। সেই সময় থেকে যখন টের পাই ভেতরে অনেক কথা জমেছে, তখন দীর্ঘ কবিতা লিখতে শুরু করি ।এছাড়া আমার এক অসুখ ; আমি ছড়াতে পারি না।  ছড়ানো ছিটানো সবকিছুকে একবিন্দুতে নিয়ে আসতে চাই ।সবকিছু যেন একশব্দতে ঢুকে যেতে চায়। এই টেন্ডেন্সি  গল্প-উপন্যাসের নয় । গল্প তো শাখা-প্রশাখায় বিস্তৃত এক বৃক্ষ, যার অনেক বংশ পরম্পরা আছে। আর কবিতা হল বীজ। শেষ পর্যন্ত কবিতা-ই আমাকে আনন্দ দিল।

 প্রশ্ন ঃ প্রত্যেক পাঠকই নির্দিষ্ট স্বভাব-অভিজ্ঞতা-প্রশিক্ষণ-পূর্বধারণা ও মূল্যবোধের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। সেই প্রেক্ষিতে কবি ও পাঠকের সম্পর্ক আপনি কীভাবে দেখেন ?

 উত্তর ঃ কবিতার অবস্থান হল কবি ও পাঠকের মাঝখানে। কথাটি  বলার কারণ এই যে, কবিমাত্রেরই ইচ্ছে থাকে পাঠকের কাছে যাওয়া। তো একদিকে পাঠক, আরেকদিকে কবি স্বয়ং।কবি, কবিতার মাধ্যমে পাঠক সন্নিধানে যান, পাঠকও কবিতার মাধ্যমেই কবির কাছে পোঁছান। একজন ভাষার ভেতর রোপণ করেন অনুভবী  শব্দ, আরেকজন আসতে আসতে উদ্ধার করেন  সেইসব  উপলব্ধি-অনুভূতি-আনন্দ-বেদনা-জয়-পরাজয় -- এই গমনাগমনে তিনিই গন্তব্যে পোঁছতে  পারেন, যিনি দীক্ষিত পাঠক।

এই সমাজে পাঠকই নিয়ন্ত্রিত নয় কেবল, কবিও নিয়ন্ত্রিত কোথাও না কোথাও । অতিসচেতনাই একপ্রকার নিয়ন্ত্রণ। রচনা ও পাঠে কবিতা হল মুক্তমনের ফসল। ‘সমীহ’ ভাবনা কবিতাকে মুক্ত হতে দেয় না কখনো । মুক্তমনের অধিকারী না হলে তিনি কবি নন, পাঠকও নন।

কবি ও পাঠকের সম্পর্ক অতিশয় নৈকট্যের।একজন মননশীল পাঠক কবিতুল্য। কবির মতোই তিনি অখন্ড এবং দিব্যনেত্রের অধিকারী। একজন দীক্ষিত পাঠক কবিতাকে তাঁর রাজনৈতিক ধর্মীয় এবং সকলপ্রকার আদর্শ ও দর্শন থেকে মুক্ত রাখেন। তিনি জানেন কবিতার স্বকীয়স্থান । মজার ব্যাপার হল—কোনো কোনো পাঠক, ভিন্ন ডাইমেনশানে গিয়ে কবিতার মর্মোদ্ধার  করলেন  এমন এক জায়গায় , কবিও ভাবেননি যা কোনদিন। তখনই মনে হয়, কবিতা  অর্দ্ধেক লেখেন কবি অর্দ্ধেক পাঠক ।

 

প্রশ্ন ঃ ‘একজন দীক্ষিত পাঠক কবিতাকে তাঁর রাজনৈতিক ধর্মীয় এবং সকলপ্রকার আদর্শ ও দর্শন থেকে মুক্ত রাখেন।’—এ’ব্যাপারে আপনি এতোটা নিশ্চিত কি করে হতে পারেন ? এটা  সম্ভব নাও হতে পারে

 

উত্তর ঃ কবিতা ‘অখণ্ড’। কবিতাকে কোনো বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে পাঠোদ্ধার করা যায় না। সাধারণ পাঠক তাঁর রাজনৈতিক বা ধর্মীয় দর্শনে সীমিত করে রস নিতেই পারেন। তাতে কবিতার কোনো তারতম্য ঘটে না। রাজনৈতিক বা ধর্মীয়  কবিতাকে সেই-সেই  দৃষ্টিকোণ থেকে পাঠোদ্ধার হয়, কিন্তু ‘অখণ্ড’ কবিতার রসোদ্ধারে পাঠককে সেই দীক্ষায় দীক্ষিত হতেই হয় । বাংলা কাব্যজগতে প্রকৃত কবি যেমন হাতে গোনা,তেমন-ই প্রকৃত পাঠকও ।


প্রশ্ন ঃ পাঠকের সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে আপনি  কী ভাবেন ?

 

উত্তর ঃ সমাজের জন্যে প্রকৃতপক্ষে কিছু করতে গেলে ‘অসামাজিক’ হতেই হয়। কবির এই অসামাজিকতার ধারণ ক্ষমতা আমাদের সাজানো সমাজের নেই।

সচেতনভাবে সমাজের প্রতি কবির কোনো দায়বদ্ধতা নেই। কেননা অবচেতনে কবি জগৎকল্যাণে কামনারত। তাঁর প্রতিটি শব্দ-শান্তি সৌন্দর্য্য সমৃদ্ধির বাইরে নয়। সত্যকে উদ্ঘাটিত করা তারই ধর্ম।


প্রশ্ন ঃ ‘যা কিছু পূর্বসূরীরা লিখে গেছেন প্রত্যেকটি রচনা তারই পরির্বদ্ধন মাত্র’—এই আপ্তবাক্যটি ঘিরে আপনার মনন প্রতিক্রিয়া কী রকম ?

 

উত্তর ঃ সাহিত্যে মৌলিক বলে কিছু নেই বলে জানি ,রূপান্তর-ই কখনো কখনো মৌলিক। অখিল-নিখিলের অন্তর-বাহিরে যা কিছু বর্তমান তারই সন্ধানে সাহিত্য। একজন কবি মূলতঃ খননকারী অর্থ্যাৎ সে অর্থে গবেষক। আমার পূর্বজদের খননের শুরু ছিল শেষও ছিল। আমার শুরু ছিল, শেষও থাকবে,আমার অনুজেরও থাকবে। কথাটি হল, আমার পূর্বজরা খনন যেখানে শেষ করেছেন, সেখান থেকে আমার শুরু নয়। কেননা আমি হাঁটি হাঁটি পা পা করে শিখেছি।তাই আমি পরির্বদ্ধন বলতে পারি ন। তবে ঐতিহ্য বলে একটি কথা আছে।পূর্বজ কবিদের সাথে আমাদের সম্পর্ক শেকড়ের  সম্পর্ক। এক ভূগোল, এক ভাষা ,এক সংস্কৃতিজাত ।পূর্বসূরীদের এই প্রবাহ থেকে উত্তরসূরীরা বেরুতে পারেন না। এটাই প্রাকৃতিক নিয়ম। যেমন, চর্যাপদের সাথে আজকের আধুনিক কবিতার কোথাও এক নিবিড় যোগসূত্র থেকেই গেছে। মূল থেকে প্রবাহিত হয়ে আমরা শাখায় শাখায় প্রকাশিতবাংলাভাষার হাজারও কবি মূলতঃ জীবন-সময়-প্রকৃতি নিয়েই ব্যাপৃত হয়েছেন এবং হচ্ছেন। সে অর্থে বাংলার একটি-ই কবিতা নানা আঙ্গিকের শাখাপ্রশাখায় বিস্তৃত হচ্ছে।  


প্রশ্ন ঃ ‘মাটির ভাষা জানি না বলে / ভাষা আমার মাটি হয়ে যায়।’—আপনার ‘ভাষা’ কবিতার দুটি লাইন। এখানে আপনি ভাষার মৌলিক দু’টি স্তরের কথা সম্ভবত বলতে চেয়েছেন। যদি একটু বিস্তারিত করে বলেন ?

 উত্তর ঃ পংক্তিটি আমার প্রিয় একটি কবিতার পংক্তি। নিজের কবিতাংশ নিয়ে কথা বলা আমারও ভাল আগে না। বিশ্লেষিত  অনেক অভিজ্ঞতার নির্যাস হ’ল একেকটি পংক্তি । সেই নির্যাসকে পুনরায় বিশ্লিষ্ট করতে কা’র মন সায় দেয়! আক্ষরিকভাবে তা’ করাও যায় না, সে যে উপলব্ধিজাত। বরং বলতে পারি – ভাষা-ই প্রকাশের মাধ্যম, ভাষা সন্ধান-ই হয়ে ওঠে প্রথমতঃ মুখ্যকঠিন স্তর থেকে সন্ধান করতে করতে মরমের ভাষার দিকেই যান কবি। সে ভাষা আছে সরলমুখে, সত্যের মুখে,সুন্দরের মুখে –প্রাণের ভাষা। শুনি, কিন্তু আয়ত্ব করতে পারি না। এত স্বচ্ছ যে তাঁর কোনো অহঙ্কার নেই, সাধুরূপের অলঙ্কার নেই, বসন-ভূষণহীন নগ্ন-সুন্দর।সে ভাষা কবিতার মতই অধরা।

প্রশ্ন ঃ লিটল ম্যাগাজিন এবং আপনি, একে অপরকে ছাড়া থাকতে পারেননি কোনোদিন।এই সম্পর্ক, তার টানাপড়েন, দুঃশ্চিন্তার ক্রমবিকাশ নিয়ে কিছু  বলুন ?

 উত্তর ঃ লিটল ম্যাগাজিন থেকে দূরে থাকা মানে তারুণ্য থেকে দূরে থাকা। যেদিন সরতে হবে, সেদিন বুঝবো বৃদ্ধ হলামআমার বয়স যখন পঁচিশ অনুর্দ্ধ তখন থেকে লিটল ম্যাগাজিনে জড়িয়ে আছি,আজ আমি ষাটোর্দ্ধ, তারুণ্য এখনো যায়নি মন থেকে। লিটল ম্যাগাজিন থেকে আমি পেয়েছি —স্পর্দ্ধা-সততা-গতি-জেদ-আপোষহীনতা এবং নতুন ভাবনার স্পৃহা। এই মানবিক গুণগুলি কোন না কোন ক্রাইসিস থেকে সৃষ্ট।   ক্রাইসিস ব্যতিরেকে লিটল ম্যাগাজিন  জন্মাতেই পারে না। ক্রাইসিস আছে বলেই উত্তরণের প্রচেষ্টা। এখানেই অস্তিত্বের লড়াই।এখানেই ইনভল্বমেন্ট।

সময় পাল্টায়। যুগ পাল্টায়, মানুষও পাল্টায়। সত্তর দশকের সময় আর এই শতাব্দীর সূচনা দশকের সময় এক নয়। ম্যাগাজিনের অবয়ব ও চরিত্র পাল্টে গেছে। আজকাল বেশিরভাগ লিটল ম্যাগাজিনের ক্রাইসিস আছে বলেই মনে হয় না। পশ্চাতে সুখ সরবরাহকারী উৎস বর্তমান বলেই বোধ হয়। চারপাশে অনেক অবিচার থাকলেও জেহাদ নেই।নিজের লেখনিতে সময়ের প্রতিফলন নেই।লিটল ম্যাগাজিন সাহিত্যকে যেমন অস্বীকার করে না, সময়কেও না। ৭০ দশক থেকে ৮০ দশকের রাজ্য লিটিল ম্যাগে সাহিত্য ও সময় সমান সমান প্রতিফলিত হত। আজকের রাজ্য ম্যাগাজিন পর্যালোচনা করলে সাহিত্য পাওয়া যাবে সময় নয়।এদিকে আমাদের অবনমন ঘটেছে।লিটল ম্যাগাজিন এক তৎপরতা । এই তৎপরতায় আগামীর লেখক বেরিয়ে আসে। অনেকাংশে লিটল ম্যাগাজিন লেখকের আতুড়ঘর ও বিচরণের সৈকত। এই ক্ষুদে পত্রটিকে টিকিয়ে রাখতে জীবনের অনেক কিছুতে ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। আমার হাতে অনেক পত্রের মৃত্যু ঘটেছে আবার জন্মও নিয়েছে। লিটলম্যাগ ছাড়া বাঁচিনি কোনদিন। আমার কাছে লিটল ম্যাগাজিন ছাড়া বাঁচার অর্থ কবিতাহীন বাঁচা।     

 

প্রশ্ন ঃ  ‘আজকের রাজ্য ম্যাগাজিন পর্যালোচনা করলে সাহিত্য পাওয়া যাবে সময় নয়।’—আবার সেই ‘সাহিত্য-সময়’ জটিলতা।যদি আর একটু বিস্তারিত করতেন প্রসঙ্গটাকে –

 

উত্তর ঃ জটিল নয় বরং সহজ করেই বলা।  যদি বলি, ‘সাহিত্যে সময়’ বা ‘সময়ের সাহিত্য’—দু’টো   কথাতেই সময়ের প্রতিফলন থেকে যায়। সাহিত্য সময়হীন হতেই পারে না। সাহিত্যে, সময়ের গূঢ় এক ইতিহাস রচিত হয় নিঃশব্দে। প্রকৃতি-জলবায়ু-কৃষ্টি-রাজনীতি-ধর্ম-অর্থনীতি কোনকিছুই বাদ থাকে না, আনন্দ-বেদনার মতো প্রতিফলিত হয়।এর কারণ, সাহিত্যে ‘সহিত’ বর্তমান। আমি ওখানে এক প্রবণতার কথা এনেছিলাম। আমাদের কবিতায় সময়ানুভব থেকে আমরা অনেক দুরেএই স্থানিকতার অনুপস্থিতি ইতিহাস চেতনাকে অস্বীকার করে এবং অস্তিত্ব সংকটের দিকে নিয়ে যায়। এইসকল ঋদ্ধ কবিতা আসলে পরিচয়হীন, তা’কেবল অনসৃত ও অনুকৃতমাত্র।আমাদের লিটল ম্যাগাজিনগুলোও বহুলাংশে এই দোষে দুষ্ট।

 

 প্রশ্ন :  একজন সমালোচকের দৃষ্টি কোণ থেকে আজকের তরুণ প্রজন্মের, কবিতা ভাবনা, ই-বুক কবিতা চর্চা- সার্বিক অর্থে কাব্য ভাবাদর্শকে কীভাবে মূল্যায়ন করছেন?

 

উত্তর ঃ আজকের তরুণ প্রজন্ম আন্তর্জাল অন্তর্ভুক্ত। আমাদের সূচনাকালে বইমেলাও ছিল না।একমাত্র ভরসা ছিল বীরচন্দ্র পাবলিক লাইব্রেরিফলতঃ সাহিত্যের গতিপ্রকৃতি জেনে উঠতে দশকের পর দশক যায়নিজের অস্থিমজ্জা ঘষতে ঘষতে অনেক কিছুই অর্জন করতে হয়েছেআজ যা ঘরে বসে বিনাশ্রমে লব্ধ হয়। এর ফলশ্রুতিতে আজকের তরুণ; জীবনের শুরুতেই অনেক অভিজ্ঞ। কবিতা ভাবনা ও ভাষারীতিতে অনেকটা ঋদ্ধ। তাদের স্মার্টনেস, ডেপথনেস, এবং দ্যুতিতে অনেকে অচিরেই ঈর্ষার পাত্র হয়ে উঠেছে।সব বিষয়ে সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে চললেও দুর্বলতা কোথাও না কোথাও থেকেই যায়। সেটা হল স্থানিকতা,তার অভাবটা সর্বকালেই বর্তমান ছিল।যা আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে বর্তায়। আমার ভূগোল এবং বিশেষ করে আমার চারপাশের  সময় প্রতিফলিত না হলে কবিতা স্বকীয়তা হারায়। এক সমীহ ভাবনা ত্রিপুরার কবিতাকে মুক্ত হতে দেয় না।

যাক, এবার বলি তোমার ই-বুক, ই-ম্যাগ, ফেসবুক জাতীয় আন্তর্জালিক প্রচার- প্রকাশ নিয়ে। যতই আন্তর্জাল সম্প্রসারিত হোক না কেন,কাগজ কলম তো থেকেই যাবে। মলাটবদ্ধ কবিতাগল্পউপন্যাস চিরকাল থেকেই যাবেমননে যান্ত্রিক না হলে কেউ যদি অনলাইন সাহিত্য চর্চায় অনায়াসে বোধ করেন ,তাতে কোনো ক্ষতি নেই। পরিবর্তিত সুযোগকে কাজে লাগানো মানুষের ধর্ম। সাহিত্যপত্রে কবিতা প্রকাশিত হওয়া ও ফেসবুকে প্রকাশিত হওয়ার গুরুত্বে ব্যবধান অনেক যদিও।সোস্যাল নেটওয়ার্ক পাঠকের চাইতে বন্ধুর কাছে নিয়ে যায় বেশি। বন্ধুত্ব রক্ষার্থে লাইক কমেন্টের এক বিনিময় প্রথারও প্রচলন রয়েছেএকনিষ্ঠ লেখকের দুঃশ্চিন্তার কারণ এখানেই।

 

 

 

 

 

 


No comments:

Post a Comment

অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎

  'অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎ ‎সত্তর দশকের উন্মাদনায় এক ভিন্ন উচ্চারণ-ভঙ্গ...