“রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রাণের আর গনসঙ্গীত সংগ্রামের।আমি এভাবেই এক আত্মায় দুই
চেতনাপ্রবাহকে নিয়ে বেঁচে আছি।”
মা’র তাগিদ-ভাললাগা, বাবার আড়াল থেকে কান পেতে গান শোনার আগ্রহ তাঁকে ভীষণভাবে গান শেখার প্রেরণা দিত। বাবা পার্টির
কাজে আগরতলা গেলেই কিনে আনতেন গনসঙ্গীতের ক্যাসেট ।বাড়িতে দলবেঁধে চলতো গানের
মহড়া। সেই সব স্মৃতি নিয়ে শিল্পী রত্না দত্ত-এর সাথে একান্ত আলোচনায় মাতলেন
তমালশেখর দে।
প্রশ্ন ঃ আপনার মেয়েবেলা থেকে গানের জগতে আসা নিয়ে আমাদের কিছু বলুন ?
উত্তর ঃ আমার মেয়েবেলা আর দশজন মেয়ের মতই সাধারণ ছিল। তবে আমি বড় হয়েছি বিশাল একান্নবর্তী পরিবারে। বাবা অমৃতলাল দত্ত ছিলেন কমিউনিস্ট
মতাদর্শে বিশ্বাসী একজন একনিষ্ঠ
কর্মী। সারাদিনরাত পার্টির কাজকর্ম নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। ফলে তাঁকে বেশি সময় কাছে
পাওয়া সম্ভব ছিল না। মা’য়ের কাছ থেকেই গান শেখার প্রেরণা পেয়েছি। মা বিভিন্ন ধরণের
গান জানতেন। মা’য়ের হারমোনিয়ামটা দিয়েই গান গাওয়া শিখেছি।এখনও সেই হারমোনিয়াম
দিয়েই গান গাই। তিনিই আমাকে হারমোনিয়াম বাজানো শিখিয়েছেন।প্রথমে রঞ্জিত
ঘোষ-এর কাছে, পরে ভানু ধর-এর কাছ থেকে
শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিখেছি। বেশি বাবা রেওয়াজ করার দিকে খুব বেশি জোর দিতেন।প্রতিদিন
সকালবেলা দুই ঘণ্টা এবং বিকেলবেলা দুই ঘণ্টা রেওয়াজ করতাম ।তাছাড়া আমার কাকা। আমার
বড়দা মানে মানিক দত্ত আমাকে খুব উৎসাহ দিতেন। বই এনে দিতেন।
মীরা বাকচি ধর্মনগর নগর পঞ্চায়েতের প্রাক্তন চেয়ারপার্সন
আমাকে একটি রবীন্দ্রসঙ্গীত শিখিয়েছিলেন, ‘যা ছিল কালো ধলো তোমার রঙে রঙে রাঙ্গা হলো’। তিনি তখন বলেছিলেন, তুমি পারবে। শেখো।’তাঁর এই প্রেরণা
আমাকে খুব প্রানিত করেছিল।এবং আমি পেরেছি, শিলচর থেকে আগরতলা সব জায়গায় থেকেই
আমন্ত্রণ পেয়েছি, গেয়েছি। আজও গাইছি...
প্রশ্ন ঃ
আপনি তো প্রথমত রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে থাকেন এবং ভালোবাসেন।সেই রবীন্দ্রপ্রেম নিয়ে আমাদের
কিছু বলুন ?
উত্তর ঃ রবীন্দ্রসঙ্গীত আমার কাছে ভগবানের মত
পবিত্র। তাঁর গান আমাকে আনন্দ দেয়। রাঙ্গিয়ে তুলে ভালোবাসার বিচিত্র রঙে। তাঁর
সুর-কথা আমাকে অনুভবের মোহময় এক জগতে নিয়ে যায়, যার বর্ণনা করা আমার পক্ষে সম্ভব
নয়। গীতবিতানকে আমি আমার নিভৃত সময়ের সঙ্গী করে রাখি। আত্মিক সংকট থেকে পরিত্রাণ
পেতে বারবার তাঁর গানের কাছেই ছুটে যাই।তুমি দেখো, আমার ঘরে টিভি নেই।কারণ আমি
আমার মনের ভিতরের রবীন্দ্র-বলয়ের বাইরেই যেতে চাই না।আমার দিবারাত্রি থাকে নিয়েই
কাটে। যখন গান গাই তখনও, যখন গান গাই না তখনও।আমি আমার চেতনায় সবসময় তাঁকেই অনুভব
করি। বেশি বলে ফেলছি কিনা বুঝতে পারছি না। কিন্তু আমি সত্যি মনের ভিতরে এমন ফিল
করি।এবং আমার সৌভাগ্য আমার স্বামী গৌতম মজুমদারও খুব ভালো রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে
পারে। তিনি কখনো আমাকে গানের ব্যাপারে বাধা দেননি, বরং উৎসাহ দিয়েছেন বারবার। ফলে
আমার জীবনে ব্যক্তিগত কোন দুঃখ নেই। আমি আমার স্বামী,দুই মেয়ে নন্রতা ও রিনিতা-কে
নিয়ে খুব খুশি।তাদের পাশাপাশি অবশ্যই আমার আত্মার আত্মীয় রবীন্দ্রনাথ, যাকে ছাড়া
এ’জীবন আমি ভাবতে পারি না।রবীন্দ্রনাথের গান গাইতে গাইতে একসময় মনে হল, তাঁকে
বুঝতে হলে, তাঁর সাহিত্য জগৎ নিয়ে পড়াশুনা করা উচিত। তখন আমি তাঁর গল্প-উপন্যাস
পড়তে শুরু করলাম।এতে তাঁকে বুঝতে, তাঁর মননের জগতে ঢুকতে আমার আরও সুবিধা হয়েছে।
প্রশ্ন ঃ
রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে আজকাল অনেক ধরণের এক্সপেরিমেন্ট চলছে, এটাকে আপনি কীভাবে
নিচ্ছেন ?
উত্তর ঃ এটা একটা শ্রেণির দাবি হয়ে থাকতে পারে।
হয়ত কারো কারো ভালোও লাগছে, কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে কেন জানি, মন থেকে এটাকে
মেনে নিতে পারছি না।আমার কান তাতে সায় দেয় না, আমার তাতে নাড়া দেয় না। বুকের ভিতর
কোথায় যেন সে শান্তিটা, স্বস্তিটা পাই না। তাঁর গানকে আমি সাধনার মত
গাই।রবীন্দ্রনাথের দেওয়া সুরটাই আমার কাছে চূড়ান্ত মনে হয়।
প্রশ্ন ;
আপনার কি কখনো আধুনিক গান গাইতে ইচ্ছে করে নি ?
উত্তর ঃ ওমা! আমি তো আধুনিক গানও অনেক গেয়েছি।
আমার বড়দাদা,শংকরদা আমাকে প্রচুর আধুনিক গানের ক্যাসেট এনে দিতেন, এমন কি বড়দা
আমার জন্য সিনেমা হলে টেপ-রেকর্ডার নিয়ে গিয়ে গানের অংশটা রেকর্ড করে এনে
দিতেন।বাড়িতে বসে আমি সেসব গান গলায় তুলতাম। যেমন লতা-সন্ধ্যা-প্রতিমা মুখোপাধ্যায়
এদের গান আমি গাইতাম।হেমঙ্গ বিশ্বাসের অনেক গান আমি গলায় তুলে গেয়েছি। যদিও সেটার
অন্যমাত্রা ছিল ।
প্রশ্ন ঃ
রবীন্দ্রসঙ্গীতের পাশাপাশি আপনি তো গনসঙ্গীত নিয়েও ব্যস্ত থাকেন । গনসঙ্গীতের
সুখ-দুঃখ নিয়ে আমাদের কিছু বলুন ?
উত্তর ঃ হ্যাঁ, গনসঙ্গীতও আমি বলতে আমরা গাই।
গাইতেই হবে। সে আর এক জীবনের তাগিদ এবং অবশ্যই একটা সংগ্রাম।সবাইকে নিয়ে অন্যায়ের
বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার সংগ্রাম। এখনও মনে আছে, বাবা পার্টির কাজে আগরতলা গেলেই
আমারজন্য গনসঙ্গীতের রেকর্ড কিনে আনতেন।আমরা দল বেঁধে রিহারসেল দিতাম এবং
পরবর্তীতে কোনো অনুষ্ঠানে তা গাইতাম ।কোথায় না গেয়েছি!আমি, বিশ্বজিৎ, আমার বোন
বেবি,জয়ন্তী,রিনা, দীপঙ্কর-অপন-জয়ন্ত আরও
অনেকে কত নাম বলবো! আমরা সবাই মিলে গাইতাম। শংকর’দার(ভট্টচার্য) কথা অবশ্যই বলতে হয়। তিনি আমার বা আমাদের সাথে তবলা
বাজাতেন। আমাকে গানের ক্ষেত্রে খুব প্রেরণা দিতেন। তখন সম্পর্কগুলোও খুব নিবিড় ছিল
। একটা প্রাণবন্ত ভাব ছিল। বাবাও খুব খুশি হতেন।বাবার পার্টির কোনো কাজে আসতে পেরে
আমারও খুব ভালো লাগতো। সমগ্র নর্থে যত পার্টি অনুষ্ঠান হত, আমরা যেতাম, গান করতাম।আসলে রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রাণের আর গনসঙ্গীত সংগ্রামের।আমি এভাবেই
এক আত্মায় দুই চেতনাপ্রবাহকে নিয়ে বেঁচে আছি।
প্রশ্ন ঃ
আর দুঃখ ?
উত্তর ঃ আমি জানতাম, তুমি এখন আমাকে এই
প্রশ্নটাই করবে! হ্যাঁ (একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে) এটা ঠিক যে, সেই সময়ের মত এখন
গনসঙ্গীত উঠে আসছে না। গনসঙ্গীতের সে উন্মাদনাটাও নেই। তুমি হয়ত এটাই বলতে বা
জানতে চাইছো। এই মুহূর্তে গনসঙ্গীতের উপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।এই সময়ের সামাজিক,
রাজনৈতিক সংকট তাই দাবি রাখছে বলে আমি মনে
করি। অন্যান্য বিষয়ের মত গনসঙ্গীতের উপর কর্মশালা হওয়া খুব দরকার। গোটা ভারতবর্ষের
পরিমণ্ডল সেই অর্থে ভালো নেই।
প্রশ্ন ঃ
আজকাল ছেলেমেয়েরা খুব দ্রুত একটা কিছু পেতে বা অর্জন করতে চাইছে, এই প্রবণতাকে
আপনি কীভাবে দেখছেন ?
উত্তর ঃ এটা ঠিকই খুবই কষ্টদায়ক এক অনুভূতি।আমি
আমার স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের যত দেখছি, দিনদিন তত বেশি করে অবাক হচ্ছি। তারা খুব
দ্রুত একটা কিছু করে ফেলত চায়। তা সেটা গানের বেলা যতটা সত্য, নাচের বলাও ততটা
সত্য। অভিবাবকরা চাইছেন, তাদের বাচ্চা যেন নাচে-গানে-আর্টে-পড়ায় সবকিছুতেই এগিয়ে
থাকতে দেখতে চায়। অথচ তা কি সম্ভব ?আমাদের তুলনায় আজকের একটা শিশুকে কতটা চাপের
মধ্যে বড় হতে হচ্ছে, ভাবলেই খারাপ লাগে।গানের ক্ষেত্রেও দেখছি, অভিবাবকরা একই সাথে রবীন্দ্র-নজরুল-লোকসঙ্গীত-তবলা-নাটক
সবই শিখিয়ে নিতে চাইছেন। এতে তারা যেমন
বিভ্রান্তির স্বীকার হছে, তেমনই কোন-না-কোনভাবে একটি প্রতিভার সম্ভাবনা শুরুতেই
বিক্ষিপ্ত হয়ে যাচ্ছে বলে আমি মনে করি। যদিও এটা সব সময় সত্যি নাও হতে পারে।
প্রশ্ন ঃ রবীন্দ্রসঙ্গীত
বলুন, নজরুল বলুন, কিংবা নাটক আমাদের এদিকে উচ্চারণ ভঙ্গিমায় ব্যাপক ত্রুটি লক্ষ্য
করা যায়। যার ফলে অনেক সময়ই উপস্থাপনায় আমরা দুর্বল হয়ে পড়ি। আপনি কি বলেন এই ব্যাপারে ?
উত্তর ঃ এটা একদমই ঠিক কথা। আমাদের
উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এটা একটা বিরাট সমস্যা বা ত্রুটি। আমি আমার ক্ষেত্রে এটা বারবার
বাড়িতে সঠিক উচ্চারণ অনুশীলন করে করে সঠিক অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। এর
জন্য নিজের কানকে সচেতন রাখতে হবে। গুরুত্ব দিতে হবে নোটেশনের দিকে। আমি
রবীন্দ্রনাথের ৬৫টা স্বরবিতানের বই সংগ্রহ করেছি। যেকোনো গান গাইতে গেলে সঠিক সুর
লাগার পাশাপাশি সঠিক উচ্চারণ খুব জরুরি ।তা সে যে ধরণের গানই গাওয়া হোক না কেন ? আমি
আমার জীবনে হারমোনিয়মকে বক্সে ঢুকাই নি।কারণ চোখের সামনে থাকলে ভুলে যাওয়ার
সম্ভাবনা থাকে না। রেওয়াজ,শুদ্ধ উচ্চারণের অভ্যাস সেই থেকে আজও আমার অব্যাহত।
প্রশ্ন ঃ
আপনার জীবনের স্মরণীয় কোনো ঘটনা যা আপনাকে আজও মর্মাহত করে?
উত্তর ঃ আমার বাবার মৃত্যু! যা আমাকে আজও তাড়িত
করে। কেবল মনে হয়, আর তো কেউ চুপিচুপি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আমার গান মনযোগ দিয়ে
হয়ত শোনবে না, হঠাৎ দেখবো না, জানালাটা নড়ে উঠেছে।রেডিও সেন্টারে গান যেদিন দিত,
বাবা ঠিক সময়ে বাড়ি চলে আসতেন।যতদিন যাচ্ছে বাবার এইসব ছোটছোট কিন্তু খুব আদরের,
ভালোবাসার মুহূর্তগুলো মিস করি।
প্রশ্ন ঃ বাকি
জীবন কীভাবে কাটাতে চাইছেন ?
উত্তর ঃ অবশ্যই, বাবার স্বপ্নকে সামনে রেখে।
বাবার মত হয়ত সর্বহারাদের জন্য ঘরবাড়ি ভুলে বর্তমানে আমার ভাই জন্টু মানে অমিতাভ
দত্ত(প্রাক্তন বিধায়ক) যেমন সারাক্ষণ
থাকে, সে রকম না-পারলেও গানে গানে, মাঠে-ময়দানে অবশ্যই যতদিন আছি গেয়ে যাবো। আমার
বাবার সংগ্রামকে আমি ভুলে থাকতে পারি না।


No comments:
Post a Comment