“আমি জম্বু-কাশ্মীর সম্পর্কে একটা পজিটিভ আলো ফেলতে চাই জনমনে”
বলবন্ত ঠাকুর মানেই বিস্ময়ে ভরা এক নাট্য ব্যক্তিত্ব । ভারতের নাটকে তিনি ম্যাজিকম্যান নামেই খ্যাত । ভারতে সবচেয়ে কম বয়সে ‘ সঙ্গীত নাটক আকাদেমি’ এবং ‘পদ্মশ্রী’ প্রাপকের নামও বলবন্ত ঠাকুর । ত্রিপুরার নাট্যদল নিয়ে ভ্রমণের সময় সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম ।
প্রশ্ন ঃ জম্বু-কাশ্মীরের মতো বিপর্যস্ত রাজনীতি, উগ্র জঙ্গিবাদের মধ্যে দাঁড়িয়ে আপনি কি মনে করেন সংস্কৃতিচর্চা সম্ভব ? বর্তমান সময় কি নাটকের দাবি রাখে ?
উত্তর ঃ অবশ্যই রাখে! এবং আমি মনে করি, এখনই নাটকের উৎকৃষ্ট সময় । এখন জম্বু-কাশ্মীরে এক ধরণের অ্যাবসার্ড সিচ্যুয়েশন । কিন্তু এটাই সব নয় । আমি জম্বু-কাশ্মীর সম্পর্কে একটা পজিটিভ আলো ফেলতে চাই জনমনে । আপনারা টিভি, সিনেমা, পত্রপত্রিকা বা অন্যকোনো গণ মাধ্যম থেকে মূলত যা বার্তা পান, তাতে মনে হয়,জম্বু-কাশ্মীর মানেই কেবল উগ্র জঙ্গিবাদ, গুলাগুলি, হত্যা, বোমা-বিস্ফোরণ ইত্যাদি ইত্যাদি । কিন্তু আমি খুব জোর দিয়ে বলতে চাই, এর বাইরেও এক জম্বু-কাশ্মীর আছে । এবং সেটাই বড় সত্য । সেই সত্যের একটা ঝলক নিয়েই এবার আমি ত্রিপুরাতে এসেছি । আমাদের সংস্কৃতিচর্চাকে পুরায় রিভাইব করা দরকার । এটাকে বাঁচিয়ে তুলতে পারলে, জম্বু-কাশ্মীরের সমস্ত সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে বলে আমি মনে করি । বর্তমান সময়টা নাটকের। আর্টের। সাংস্কৃতিক আন্দোলনের...। মানুষ কোন পরিস্থিতিতেই পাথরের মতো হয়ে যেতে পারে না । কিংবা তাকে হয়ে যেতে দেওয়া যায় না । যুবকদের নেগেটিভ এননগেজমেন্ট বন্ধ করে, পজিটিভর দিকে তাকে ট্রার্ণ করিয়ে দিতে হবে । আমি সেই কাজই করছি নাটকের মধ্যে দিয়ে বা বিভিন্ন ধরণের ক্যালচারাল এ্যাক্টিবেটির মধ্য দিয়ে ।
প্রশ্ন ঃ আপনি একের পর এক মাইলষ্টোন মঞ্চ নাটক, পথ-নাটক করে যাচ্ছেন । এর মাধ্যমে আপনি কি সমাজের যুবক-যুবতীদের চিন্তা-চেতনায় প্রভাব ফেলতে পেরেছেন ?
উত্তর ঃ এটাই তো আমার চ্যালেঞ্জ! আর এত বছর কাজ করার পর নিঃসন্দেহে বলতে পারি, ‘আমি পেরেছি’। যদিও সংগ্রাম বহমান । আমার উপর প্রায়ই হুমকি আসে, ফেইসবুকে অনেকেই যা-তা মন্তব্য করেন । তবু,আমি অটল আছি । কারণ, আমি মনে করি, এই বিপর্যস্ত সময় থেকে একমাত্র শিক্ষা এবং সাংস্কৃতিক-চেতনাই আমাদের জীবনের ও মনের মুক্তি এনে দিতে পারে ।
প্রশ্ন ঃ আপনি কীভাবে জম্বু-কাশ্মীরের রাজনৈতিক সমাধান সম্ভব বলে মনে করেন ?
উত্তর ঃ দেখুন, নাথিং গুড অর ব্যাড, বাট থিংকিং মেইক ইট সো । যে-কোনো পরিস্থিতিতে ডায়লগ হওয়া প্রয়োজন । ডায়লগের জন্য প্রয়োজন দুই তরফেই একে অন্যের প্রতি কনফিডেন্স বিল্ডিং করা । কনফিডেন্সের ডেফিসেট উভয় দিকেই । ফলে কথাবার্তা খুব একটা ফলপ্রসূ হচ্ছে না, বলে আমি মনে করি। কমিউনিটি-লাইফকে আগে ঠিক করতে হবে । না-হলে এটা সম্ভব হবে না । আত্মবিশ্বাসকে পুনরায় জাগিয়ে তোলাকেই এখন প্রাথমিকতা দিতে হবে । তাহলে রাজনৈতিক অনেক দোকান দেখবেন, আপনা- আপনিই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ।
প্রশ্ন ঃ নাটক ও রাজনৈতিক এই দুটোকে কীভাবে মূল্যায়ন করে থাকেন আপনি ?
প্রশ্ন ঃ আপনি তো নাটক নিয়ে পৃথিবীর সর্বত্র ঘুরে বেড়ান । সেই নিরিখে জানতে চাইছি, মূলত সব জায়গায় কি নাটকের মূলগত-ভাবনা প্রায় এক ?
উত্তর ঃ লোক-সংস্কৃতির মধ্যেই তো আমাদের সব সম্ভাবনার বীজ নিহিত । ‘ভান্ডপাত’ একটা থিয়েটার ট্র্যাডিশন আছে আমাদের এখানে, আপনাদের এখানকার পথ-নাটকের মত। এটাকে আমি পুনরায় রিভাইব করেছি । এত বছর ধরে যেখানে সেটা বন্ধ ছিল, আজ আমি সেখানে সাফল্যের সাথে এটা করতে পেরেছি । এবং পারছি । লোকজনও সাড়া দিয়েছেন । এখনও আমি যখন আপনাকে সাক্ষাৎকার দিচ্ছি, তখনও খোদ কাশ্মীরের মতো ঘাঁটিতে দাঁড়িয়ে আমার ছেলে-মেয়েরা নাটক করছে প্রকাশ্যে । এটা ভাবা যায়!
প্রশ্ন ঃ সাহিত্যের অন্যান্য বিভাগের মতো প্রাচ্য- পাশ্চাত্য একটা আঙ্গিক-ভাবনা, প্রকরণগত প্রকৌশলী চিন্তা, কিংবা বিষয়-কনসেপ্ট নাটকেও থেকে যায় । এই বোধকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করে থাকেন ?
উত্তর ঃ দেখুন, এই ভাবনা থেকে যাওয়াটাই স্বভাবিক । আমি প্রাচ্য ভাবনার উপরই জোর দিই । আমার চারপাশকে ঘিরে যে বিষয়, যে প্রকরণ, যে আঙ্গিক তাকে নিয়েই আমি কাজ করতে ভালোবাসি । এই ধরণের কাজের গন্ধ- মেজাজই আলাদা । আমাকে ঘিরে যে সোসাইটি, যে ঘটনা-পরম্পরা, তার ভিতর থেকেই তো নাটকের বিষয়, প্রকরণ-ভাবনা উঠে আসা উচিত । পাশ্চাত্য ভাবনাকে এখানে জোর করে প্রয়োগের পক্ষপাতি আমি নই ।
মোস্ট সব ধরণের শিল্পকলার এক অপূর্ব সমন্বয়। এই সমন্বয়, যাকে আমরা টোটাল-থিয়েটার বলতে পারি, তাকে নিয়ে আমি অদ্ভুতভাবে জড়িয়ে থাকি। হয়ত এই কারনেও সবাই আমাকে থিয়েটার জগতের ম্যাজিকম্যান বলে থাকেন।এই অল্প সময়ের মধ্যেই আমি জাতীয় স্তরের নাট্য উৎসবে দুই হাজারের উপর নাটক করে ফেলেছি। এটাকেও অনেকে ম্যাজিক বলে থাকেন।আমার নাটকের উপস্থাপনা-শৈলীর কাব্যিক-মাধুর্যের পাশাপাশি নাটকীয় আবেগের টানাপোড়ানের চমৎকারিত্বকেও অনেকে আবার ম্যাজিক বলে থাকেন।
প্রশ্ন ঃ ত্রিপুরা ও জম্বু-কাশ্মীর কোনভাবে সম্পর্কিত করতে পারেন ? তার সংস্কৃতি, তার সংকট ...
উত্তর ঃ ভীষণরকম একাত্মবোধ করছি।দুটো প্রদেশের মাঝে অদ্ভুত এক মিল আছে। ‘সংগীত নাটক আকাডেমী’- র তরফ থেকে আমন্ত্রণ পেয়েই খুশি হয়ে যাই। ত্রিপুরাকে জম্বু- কাশ্মীরের সাংস্কৃতিক বাতাবরণ সম্পর্কে একটা ধারণা দেওয়ার কথা মাথায় রেখেই ‘জেসনে জম্বু কাশ্মীর’ সাংকৃতিক একটা টিম নিয়ে চলে আসি। জম্বু-কাশ্মীর এমন এক প্রদেশ, যেখানে বহু গোষ্ঠীর একই সাথে সহবাস। এক সংস্কৃতি থেকে অন্য সংস্কৃতি পুরোপুরি ভিন্ন । ত্রিপুরাও তাই। এখানেও বিভিন্ন জনজাতির সহবাস। এখানেও টেরোরিস্ট সমস্যা ছিল, আছে।আমাদের চারপাশে পাকিস্থান, আপনাদের বাংলাদেশ।আমাদের প্রকৃতি ঘেরা, আপনাদেরও তাই। সবদিক থেকেই আমি খুব একাত্ম বোধ করছি।কেন্দ্র বিচ্ছিন্নতায় আপনারা ভোগছেন,আমরাও ভোগী। আমাদের মত আপনারাও পুরনো ক্যালচারকে রিভাইবের উপর জোর দিয়েছেন। এমন বহু জায়গায় অদ্ভুত রকমের মিল আমি খুঁজে পাই।




No comments:
Post a Comment