Thursday, October 3, 2024

“ছন্দের ভিতরেই জীবনকে পেতে চেয়েছি বারবার...” -- কবি-সংগীতশিল্পী বিনয় সিনহা

 

 




ছন্দের ভিতরেই জীবনকে পেতে চেয়েছি বারবার...  


রিফিউজি-বাবার কড়া নিষেধের পাশ কেটে অবাধ্য বালকের মত সংগীতের হাল-ধরে ছিলেন,জীবনের বহু দুঃখেও তানপুরা থেকে হাত সরাননি।  কবি-সংগীতশিল্পী বিনয় সিনহা-র সাথে একান্ত আলাপচারিতা 


প্রশ্ন ছোটবেলায় কিভাবে এবং কী ভেবে গানের জগতের সাথে জড়িয়ে পড়লেন?

 উত্তর গানের জগতে আর আসতে পারলাম কই! জড়াতে চেয়েছি বারবার। ছোটবেলা থেকেই গানের প্রতি একটা সহজাত ঝোঁক ছিল। বাবা বুঝতে পেরে সরাসরি বললেন,নুন আনতে যাদের পান্তা ফুরায়তাদের জন্য সংগীত নয়। তখন বুঝিনি বাবার কথার মানে কত গভীরে! কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে অনুভব করেছি শূন্য হাতেরিফিউজিহয়ে দুকন্যা সহ আমাদের পাঁচজনের জীবন-সম্মান বাঁচাতে রাতের অন্ধকারে যারা খালিহাতে  পার বাংলায় পাড়ি দিয়েছিল, তারা কতটা অসহায়। অথচ মানসিক দৃঢ়তায় তাঁরা ভরপুর ছিল। যদি তা না-হতো, তবে খোলা আকাশের নিচে পরিবারসহ সাতদিন কাটাবার পর পাটকাটির চালা তৈরি করে নতুন জীবন শুরু করে মানে জিরো থেকেআবার একটা বাঁচার মত অবস্থায় আসতে সক্ষম হতো? যার ফসল আমরা আমরা কিছুই নই, কিন্তু লবণভাতখেয়ে মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে আমরা চর্চা করতে পারি, একাল-সেকাল, দেশবিদেশের নানাবিষয়সহ ইতিহাসের পাতাখুলে দেখতে পারি-- তা শুধুমাত্র সম্ভব হয়েছে, সেইসব বাবা-মায়েদের মানবিক দৃঢ়তা, সততা এবং মানব প্রেমের কারণে।

তবুও হাল ছাড়িনি তখনকার সময়ে যা গান শুনতাম, তা গাইতাম খালি গলায়স্কুলে টিফিন-আওয়ারে আধঘণ্টা প্রায় রোজই গান গাইতাম ক্লাসরুমে বসে। আর কয়েকজন বন্ধু, টেবিল বাজাতো বাজাতো তবলার ঢং-এ। জমে উঠতো আধাঘণ্টার আসর। আর মুষ্টিমেয় কয়েকজন এই আসরের সঙ্গী হতো, বাকিরা কেউ কেউ বাদাম, আইসক্রিম খেতে ব্যস্ত। তখনকার গানের মানে বুঝতাম না।কিন্তু গাইতে ভালো লাগতস্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে টিউশনি করে কলেজে পড়ার সময় ৩৫০ টাকা দিয়ে একটা হারমোনিয়াম কিনেছিলাম বাবার অনুমতি না-নিয়েই। সময়টা ১৯৭৮ সাল। সংগীত শিক্ষক সুধীর পাল-এর কাছে ১০ টাকা মাইনে সপ্তাহে মাসে একদিন। স্থায়ী হয়নি। কলেজ শেষে চাকরির ধান্ধা।এরপর জীবনের অনেক এলোমেলো পথ পেরিয়ে সুদূর নদীয়া থেকে ত্রিপুরার কদমতলায় চলে আসি চাকরি সূত্রে এখানে সংগীত শিক্ষক হিসেবে প্রথমে প্রমোদ দাস, এরপর সংগীতগুরু রঞ্জিত ঘোষ-এর কাছে এম মিউজ কোর্স শেষ করি

 




প্রশ্ন ঃ গানের শিক্ষকতা করেছেন দীর্ঘদিন। সেই নিরিখে গানের একাল-সেকালকে এই মুহূর্তে কিভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন ?    

 উত্তর ঃ তমাল, আপনার এই প্রশ্নের উত্তর যথার্থভাবে দেওয়া হয়ত আমার সম্ভব নয়। তবে প্রশ্নটার গুরুত্ব অস্বীকার না-করে বলছি, সংগীতের অনেকগুলো ধারা রয়েছে। আমরা ভারতীয় হিসেবে আমাদের সংগীতের যেসব  শাখা-প্রশাখা রয়েছে তা স্ব স্ব মহিমায় মহিমান্বিত। আমার  তো মনে হয় না —‘ একাল-সেকাল’ এর কারণে কোনো সংগীতের ধারা বদলে যাচ্ছে বলে। আবার এক জায়গাতে দাঁড়িয়েও নেই। বরং বলবো প্রতিনিয়ত সময়ের সাথে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছেই।তাতে স্ব স্ব ধারার পরিবর্তন ঘটছে, সাথে বলছে গুণগত মানের বিচার।  মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সঙ্গীতজ্ঞরা নানারকম নিরীক্ষণও করে চলেছেন অবিরত। এটা একটা ভালো দিক – সেকালকে না-ভুলে বর্তমানের সুখ-দুঃখ যন্ত্রণাকে সঙ্গী করে ‘মূলধারা’কে অব্যাহত রেখে যারা নতুন কিছু চিন্তা মানুষের সামনে হাজির করার প্রয়াস করছেন, তাদের এই প্রয়াসকে সাপোর্ট করার মাধ্যমে, অনুপ্রেরণা দেওয়াটা মনে হয় – সময়ের দাবি।

 

প্রশ্ন ঃ আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে যেসব বাদ্যযন্ত্র এসেছে যেমন,‘ কি-বোর্ড’ বা এইসব ডিজিটাল বাদ্যযন্ত্র, তারা কি সরাসরি লোকবাদ্যযন্ত্রের অপমৃত্যুর জন্য দায়ি? এই বিষয়ে আপনার নির্মম মূল্যায়ন কি ?

 

উত্তর ঃ তমাল, নির্মম বললে তো অনেক কথাই বলতে হয়। মানুষের সভ্যতা থেমে থাকবে না। প্রযুক্তির বাড়বাড়ন্ত চলবেই প্রতিনিয়ত। মানুষ আদিম যুগ থেকেই আবিষ্কারের পর আবিষ্কার করছে জীবনযাপনের সুবিধার্থে। এর কোনো শেষ নেই।লোকবাদ্যযন্ত্রের অপমৃত্যু নিশ্চয়ই ঘটে গেছে, আমার মনে হয় বিশেষ করে ৮০’র দশক থেকেই।কতিপয় মানুষ আবার পুরানো বাদ্যযন্ত্র এখনো ব্যবহার করতে দেখা যায়। আর একটা কারণ ঐ পুরানো মানুষগুলো নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার জানে না, বা  তা ব্যবহার করার যে ব্যয় এবং কৌশলগত দিক তাদের আয়ত্বের বাইরে। আর পরবর্তী প্রজন্ম ঐ লোকবাদ্য যন্ত্রের ধারে কাছে যাচ্ছে না বলেই এই অবলুপ্তি।   সহজলভ্য এবং ব্যবহারগত কৌশল খুব তাড়াতাড়ি আয়ত্ব করা যায় বলেই, এ-প্রজন্মের কাছে ‘ সিন্থেসাইজার বা কি-বোর্ড-এর কোনো বিকল্প তারা ভাবেন না। আমরা যারা মাঝামাঝি পুরনো মানুষ তারাও লোকযন্ত্রের ব্যবহার থেকে একটু একটু করে সরে আসছি।  কিন্তু আমি বলবো, লাউ দিয়ে তৈরি ‘তানপুরা’ যে ঝংকার সৃষ্টি করে, আধুনিক প্রযুক্তির ইলেকট্রনিক-তানপুরা তা সৃষ্টি করতে পারে না। লাউ দিয়ে তৈরি তানপুরাতে সুর বাঁধতে যে কৌশল এবং কান লাগে, তা শিখতে অনেক সময়  লাগে, অভিজ্ঞতা লাগে। যান্ত্রিক-তানপুরাতে তো স্কেল সিলেক্ট করে অন করলেই তা নিয়মিত স্কেলে বাজতে থাকে, এখানে কোনো ওস্তাদির প্রয়োজন হয় নাওস্তাদি থাকেও না। এখানে দুঃখ করা ছাড়া আমি অন্তত কোনো উপায় দেখি না। কি-বোর্ড বা অনুরূপ একটি যন্ত্র, একজন শিল্পী-এর থেকে একাধিক যন্ত্রের সুর বাজাতে পারে, তাই ধীরে ধীরে অপমৃত্যু হচ্ছে নানা ধরণের লোকযন্ত্রের । তারপরও যদি শেষ পর্যন্ত আমাদের সন্তানেরা ওদের ‘শান্তি সেতু বন্ধন’ করতে পারে, সে ‘ হার্ড-রক, সফট-রক, রবীন্দ্রসংগীত, বাউল নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করে, তবে তাই হোক – সেটাই কাম্য।তাদের ইচ্ছেকে গুরুত্ব দিতেই হবে। সময় হয়ত তাই চাইছে।দেখা যাক—কি হয়!  

 


প্রশ্ন ঃ ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের রাগরাগিণী নিয়ে আপনাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মগ্ন থাকতে দেখেছি। রাগ-রাগিণী-নৃত্য-তাল নিয়ে আপনার গৃহস্থালি’টা কেমন চলছে?  

 

উত্তর ঃ রাগরাগিণী নিয়ে কথা বলার দুঃসাহস আমার নেই।তবে আগাগোড়া মন টানে। এর আনন্দ ভাষা দিয়ে বোঝাতে পারবো না। একান্ত ব্যক্তিগত আত্মানুভুতি। ছোটোবেলায় যখন বয়স ১০/১১ তখন কোথাও একটা রাগের সুর শুনেছিলাম, পরবর্তী কালে প্রথম গুরুর কাছে জেনেছিলাম, রাগটির নাম—‘দরবারি কানাড়া’। রাগটির সৃষ্টিকর্তা সম্রাট আকব্রের রাজসভার গায়ক গুরু তানসেন। পরে এই রাগটি সৃষ্টির ইতিহাস পড়ে অবাক হয়েছি। আসলে সম্রাট আকবর সংগীত পিপাসুর সাথে সাথে বোদ্ধাও ছিলেন। দিনের পর দিন তিনি বিভিন্নভাবে তানসেনকে দিয়ে চেষ্টা করছিলেন, একটা সুর সৃষ্টির,যার মধ্যে থাকবে বিরহ, আবার শুধু বিরহ নয়, বিরহ জ্বালার ফাঁকে থাকতে হবে, মিলনের আশা। সে... নেই, নেই ...নেই, আবার আশাও বেঁচে থাকে। সুরের অন্তরালে, এই তো বুঝি-- সে আসছে, সে আসছে, আবার নেই, নেই , নেই। এই দ্বৈরথ ভাব সুরের মহিমায় ফুটিয়ে তুলতে বারবার চেষ্টা করছেন তানসেন।কিন্তু সম্রাটকে কিছুতেই খুশি করতে পারলেন নাবরং ভৎর্সনা পেয়েছেন । এর বহুদিনপর কোনো-একদিন রাগটি পরিবেষণের পর সম্রাট আকবর খুশি হয়ে রাগটির নাম দিয়েছিলেন ‘দরবারি কানাড়া’ পুরস্কৃত করেছিলেন তানসেন’কে।

তমাল, ছন্দ! এই ছন্দের ভিতরেই জীবনকে পেতে চেয়েছি বারবার।এ’নিয়েই আমার সুখ-দুঃখের ঘর-সংসার। গৃহস্থালি ...

 

প্রশ্নঃ আপনাদের সময়ের তুলনায় বর্তমানের শাস্ত্রীয়সংগীতের হাল-হকিকৎ নিয়ে  সংক্ষেপে কি বলতে চাইবেন ?   

 

উত্তর ঃ বর্তমানে শাস্ত্রীয়সংগীতের হাল-হকিকৎ ভাটার টানে।এর কারণ হিসাবে বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হয়, ‘রকগান’ চর্চার আকর্ষণ। এ’সময়ের যুবক-যুবতীদের সুখ, দুঃখ, আনন্দ, নিরাশায় আমাদের সাথে অনেক বদলে গেছে। এই বদলে যাওয়া এর একটা কারণ হতে পারে ।মনে হয়েছে, অল্প  সময়ে অনেককিছুকে ধর-ফেলার একটা ঝোঁক থেকে দীর্ঘমেয়াদি কোনো কিছুতে আকর্ষণ হারাছেন আজকের জেনারেশন   এরই ফলশ্রুতিতে যে-কোনো শাস্ত্রীয়সংগীত শিক্ষার ঝোঁক কমছে।যেমন—যুব উৎসব প্রতিযোগিতায় প্রতিযোগীর সংকীর্ণতা , শাস্ত্রীয়সংগীতের আসর বসানোর প্রয়াস কমে যাওয়া ইত্যাদিতে ভাটার টান টের পাচ্ছি। আমার মনে হয়,শাস্ত্রীয়সংগীতের এখনো যারা ধারক-বাহক রয়েছেন, তারা অন্যভাবে বিষয়টাকে চিন্তা-ভাবনা করতে পারেন, যাতে এর আকর্ষণ বাড়ানো যেতে পারে। ‘মূলধারা’-কে অব্যাহত রাখার প্রয়োজন এবং গুরুত্ব বোঝার এবং বোঝানোর সময় এসেছে আমার সময় আমি পালা করে সপ্তাহে একদিন শাস্ত্রীয়সংগীতের আসর বসাতাম কোনো-না কোনো ছাত্রছাত্রীর বাড়িতে,  আমি গাইতাম, তাদের দিয়েও গাওয়াতাম।কাউকে-না-কাউকে একটা পথ বের করতেই হবে।       

 

প্রশ্ন ঃ আপনি গায়ক হওয়ার পাশাপাশি একজন কবিও। সেই অভিজ্ঞতার নিরিখে আজকের যুগ –যন্ত্রণা’কে কিভাবে দেখছেন ?

 

উত্তর ঃ গান গাই, মনের তাগিদে কিছু লিখেও ফেলি, কিন্তু তা বলে আমি নিজেকে গায়ক বা কবি বলতে যা বুঝায়, তা  দাবি করি না। ভাবনা রয়েছে, আরও দশজনের মত, জীবনের প্রতি ভালোবাসা-মায়া-মমতা সবই রয়েছে, এতসব প্রভাবের মধ্যে থেকে কোনো কিছুই ঠিকভাবে করা গেল না, বা করতে পারিনি।তবু বলি, কোনো একজন পৃথিবী বিখ্যাত দার্শনিক বলেছিলেন, ‘ Music in food for soul’ আমাদের ভিতরে যে আমি রয়েছে সে সংগীত খায়। সংগীত আত্মার খাদ্য।

যান্ত্রিক সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে যন্ত্রণা বাড়ছে। বর্তমানের যুগ-যন্ত্রণা নিয়ে বলতে গেলে, বিস্তর কথা বলতে হয়। তবে সব যুগযন্ত্রণারই একটা মৌলিক বিষয়  থাকে। আজকের যন্ত্রণার সে-বিষয় আমার মতে -- ‘বিশ্বাসহীনতা!’ বিশ্বাসহীনতাই  বর্তমানে একটা বড় ফ্যাক্টর। আমি এটাকে ঠিক জেনারেশন গ্যাপ বলবো না, কারণ, যুগে যুগে এই গ্যাপ ছিল। কিন্তু অসহিষ্ণুতার একটা মাত্রাও ছিল। এখন দেখি এর কোনো মাত্রা নেই, এর কোনো মুখ নেই,নেই কোনো যুক্তি-তর্ক। শুধু বিশ্বাসহীনতা এবং দৃশ্যমানতার কারণে এর হৃদয়হীন আচরণ, আগ্রাসন লক্ষ্য করা যায়। কতদূর যাওয়া যাবে জানি না! তবে আমি সবসময় আশাবাদি। আগামিতেও আশা রাখবো ।

No comments:

Post a Comment

অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎

  'অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎ ‎সত্তর দশকের উন্মাদনায় এক ভিন্ন উচ্চারণ-ভঙ্গ...