Thursday, October 3, 2024

“মনিপুরী নৃত্যেকে ভারতবর্ষে আরো ব্যাপক স্তরে নিয়ে যেতে চাই ।”--- শিল্পী সুদীপ ঘোষ

 




মনিপুরী নৃত্যেকে ভারতবর্ষে আরো ব্যাপক স্তরে নিয়ে যেতে চাই ।

 

পরিবারে কেউ নাচ জানতো না। অথচ নাচ দেখলেই তাঁর শরীরে অজানা এক অনুভূতি সুড়সুড়ি দিত । সেই সুড়সুড়ির তাড়নায় প্রথমে ঘর, ক্রমে বাইরে , একে একে এভাবেই আজ তিনি মনিপুরী নৃত্যে দেশের প্রথম শ্রেণির একজন শিল্পী। শিল্পী সুদীপ ঘোষ- এর সাথে আলাপচারিতায়

প্রশ্ন ঃ একজন  সাধারণ বাঙালি  হয়ে আজ আপনি মনিপুরী নৃত্যে জাতীয় স্তরের  একজন তরুণ শিল্পীএই দীর্ঘ পাড়ির রহস্য বা রোমাঞ্চকর কিছু কথা আমাদের বলুন? 

উত্তর ঃ সে অর্থে কোনো রহস্য নেই ।সবই ভগবান ও গুরুর কৃপাসাথে অবশ্যই একটা নাছোড়বান্দা জিদ কাজ করে ছিল।আমার ছেলেবেলা খুব সাধারণ । আমার পরিবারে কেউ নাচের জগতের সাথে জড়িত নন। কিন্তু কোথাও নাচ দেখলে আমি বুঝতাম বুকের কোথায় যেন একটা পুলক অনুভব করতাম।বাড়িতে নিজে নিজেই নাচ প্র্যাকটিস করতাম। কোথাও নাচ হলে নাচের চেষ্টা করতাম । তাই দেখে ধর্মনগরের বিখ্যাত ‘কলামন্ডল’ সংস্কৃতিক সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা তথা প্রাণপুরুষ সন্তোষ সূত্রধর  আমাকে ডেকে তাঁর স্কুলে নাচ শেখার কথা বলেন। সেখানে নৃত্যশিল্পী সজল বিশ্বাস এবং লক্ষ্মী সিনহা( রামনগর)অধীনে নাচ শেখা শুরু করি

প্রশ্ন ঃ তারপর ...

উত্তর     তারপর হঠাৎ মনে হল, আমাকে এখানে থেমে থাকলে হবে না। বড় কিছু  করতে গেলে বাইরে বের হতে হবে ২০০৪ সালে আমি কলকাতায় পাড়ি দিই  সেখানে আমার মঞ্জুশ্রী  বন্দোপাধ্যায়-এর সাথে পরিচয় হয়। তাঁর কাছে আমি ওড়িশি নাচ এবং পাশাপাশি পৌষালী ট্টোপাধ্যায়ের কাছে   মনিপুরী নাচ  শিখতে থাকি। ২০০৯ সালে আমি ত্রিপুরা থেকে মনিপুরী নৃত্যে আমি প্রথম হয়ে বাইরে যাই২০১০ সালে আমি ‘শৃঙ্গারমনি ওর্য়াড’-এর জন্য নমিনেশন পাই আগরতলায় ‘ বসন্ত উৎসব’-এ আমার সাথে  পরিচয় হয় বিখ্যাত নৃত্য-ব্যক্তিত্ব মাধবী সিনহা’র । আর এটাই আমার জীবনের বড় একটা  টার্নিং-পয়েন্ট ।   মাধবী সিনহা’র সাহায্যে আমি শান্তিনিকেতনে যাই । শান্তিনিকেতনে নৃত্যগুরু জিতেন সিং বললেন ‘প্রকৃত মনিপুরী-নৃত্য শিখতে হলে তোমাকে ইম্ফল যেতে হবে ।’তখন আমার ইম্ফল যাবার মত টাকাও ছিল না। তিনি আমাকে টাকা দিয়ে পাঠানসেখানে আমি ‘জহরওয়াল নেহেরু ডান্স কাডেমী’-তে যাইসেখানে পদ্মশ্রী বাবু সিংহ আমাকে  শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করলেন । তখন দেখলাম  কলকাতার মনিপুরী নাচের সাথে মনিপুরী নাচের শিক্ষার ধরণ অনেক আলাদা ।ফলে আমাকে আবার নতুন করে শিখতে হয় । সেখানে আমি টিউশনি করে শিক্ষার খরচ  ম্যানেজ করতামএভাবে আমি একে একে ওজা পি.ধনঞ্জিত সিনহা,  ওজা আই নলিনী দেবী, ওজা এন অমুসনা দেবী, ওজা পদ্মশ্রী বাবু সিংহ  দেহত্যাগ করার পর আমি তাঁর পুত্র ওজা থিয়াম চিরঞ্জিত সিনহা’র শিষ্যত্ব গ্রহণ করি ।২০১২ সালে আমি মণিপুর থেকে দিল্লী যাই , সেখানে ‘সুহিনি বাসুনি নৃত্যাঙ্গনা ইন্সষ্টিটিউশন’-এ মনিপুরী ক্রিয়েটিব ড্যান্সার হিসেবে কাজ করি।সেখানে সিংহজিৎ সিংহ-এর সাথেও কিছু কাজ করি। এবং নরেন্দ্র শর্মা উদয়শঙ্কর এর একেবারে প্রথম দিকের ছাত্র । দিল্লীতে আজকাল যত ক্রিয়েটি ড্যান্স হচ্ছে তাঁর বেশির ভাগ তাঁরই ছাত্রতাঁর ইন্সষ্টিটিউশনে বর্তমানে আমি মনিপুরী নাচ শেখাই ।সেখান  থেকেই দেশের বিভিন্ন গুরুজীদের সাথে পরিচিত হই

   

প্রশ্ন ঃ নাচ শিখতে গেলে নাচের বাইরে তাঁদের নিজস্ব সংস্কৃতি জানাটা কতটুকু জরুরী বলে আপনি মনে করেন ?

উত্তর ঃ খুবই জরুরী। যেমন আমি আমার মনিপুরী নাচের ক্ষেত্রে বলছি, তাঁদের চলন-গমন-উঠা-বসা ,ওদের পোষাক কি,ওরা কিভাবে অতিথি অভ্যর্থনা করে – সব কিছু জানতে হবে।নিজেকে সেই অনুযায়ী তৈরি করা দরকার ।এসব যত বেশি করে জানা থাকবে, ততবেশি করে ঐ নাচের স্বাভাবিকতার কাছাকাছি পৌঁছা সম্ভব হবে।  

প্রশ্ন ঃ মনিপুরী নৃত্য এবং রবীন্দ্রনাথ এই নিয়ে কি বলবেন ?

উত্তর ঃ রবীন্দ্রনাথের কাছে তো আমাদের ঋণের শেষ নেই। মণিপুরী নৃত্যকে তিনিই প্রথম বিশ্বের সামনে এত ব্যাপকভাবে তুলে ধরেন। অভিনয়ের ভিতর দিয়েই তো  নাচকে প্রতিষ্ঠা করতে হয়। মণিপুরী নৃত্যের লাস্য ভাবের ব্যাপকতাকে রবীন্দ্রনাথই প্রথম বুঝতে পেরেছিলেন। তাই তিনি রবীন্দ্রনৃত্যের সাথে মণিপুরী নৃত্যের এত সুন্দর করে সংমিশ্রণ ঘটিয়ে ছিলেন।মনিপুরীনৃত্যের এই দিকটা  রবীন্দ্রনাথকে খুব স্পর্শ করেছিল




প্রশ্ন ঃ একজন মনিপুরী নৃত্যশিল্পীর কোন কোন  দিকটা খেয়াল রাখা খুব দরকার বলে আপনি মনে করেন ?

উত্তর ঃ মণিপুরী ডান্সের ক্ষেত্রে সবথেকে প্রথমে যেটা খেয়াল রাখা দরকার সেটা হল, কী করে মঞ্চে দাঁড়াবে। সেটা হল আমরা যদি দেখি ঘোড়া যখন দাঁড়ায় তখন তার পেছনের একটি পা একটু বাঁকা থাকে , ঠিক সেই ভাবে আর আমাদের চারপাশে যেসব পাখীরা আছে, যেমন কাক, হাঁস  এইসব পাখীরা যে ভাবে চলে সেই স্টাইল আমাদের মণিপুর নাচে ব্যবহার হয় । তারপর একজন শিল্পী তার হাত কীভাবে রাখবে , কীভাবে চালনা করবে , কতটুকু দূর যাবে , তার পরিধি কতটুকু ।মণিপুরী নাচে  খুব খেয়াল রাখা খুব দরকার ,  শিল্পীর হাত যেন কোমরের নিচে যেন না যায় । এবং চোখের উপর যাবে না । বিশেষ  বিশেষ ক্ষেত্রে হাত চোখের উপর উঠতে পারে । ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যে একমাত্র মনিপুরী এবং কথাকলি নৃত্যে তান্ডব ও লাস্য আলাদা । মনিপুরীনৃত্যে দাঁত দেখানো হয় না । তাছাড়া এই নৃত্যে কখনো পুরুষ নারী চরিত্রে অভিনয় করে না। বরং একজন মহিলা ইচ্ছে করলে পুরুষ চরিত্রে অভিনয় করতে পারে। মনিপুরীনৃত্যে পোশাকও একটা খুব জরুরি বিষয় । এই ক্ষেত্রে অনেক মারাত্মক ভুল লক্ষ্য করা যায় । যেমন,আমরা যখন কৃষ্ণ বেশ ধারণ করি তখন অনেকে দেখি পিসিন্ধাই ছাড়া নৃত্য করে। এটা ঠিক নয়। আরেকটা বিষয় হল, যখন কোন পুরুষ মণিপুরি নৃত্য পরিবেশন করে তখন তাকে পৈতে এবং তুসির মালা অবশ্যই পরতে হবে, বিশেষ করে জয়দেব-এর গানের সাথে।  এভাবে ছোট ছোট অনেক ভুলের কথাই বলা যায় । যেগুলো গুরু ওজা পদ্মশ্রী বাবু সিংহ-এর খুব কাছ থেকে শেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে ।

প্রশ্ন ঃ বর্তমানে মণিপুরী-নৃত্য নিয়ে কি ভাবছেন বা করছেন ?

উত্তর ঃ বর্তমানে আমার ‘গন্ধর্বী ডান্স ইন্সষ্টিটিউশন’ আছে।কলকাতাতে এর তিনটা শাখা আছে,  মুম্বাইতে ‘অভিনয় ডান্স স্কুল’-এ প্রতি দুই মাস অন্তর অন্তর গিয়ে মণিপুর ডান্স শেখাই ।তাছাড়া আমি অনেক প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়ে  মণিপুর ডান্স নিয়ে  কর্মশালা করছি। যখন যেখান থেকে আমন্ত্রণ পাই সেখানেই যাই । তবে আমি যেটুকু দেখেছি আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি এখন অনেক জায়গা আছে সেখাকার  মানুষ মণিপুরী নাচ  যে শাস্ত্রীয় নৃত্য  সেটা জানে না আমি এমন অনেক জায়গাতে যাই যেখানে শুধু পাশ্চাত্য ডান্স  ছাড়া আর কিছু বোঝে না। তাদেরকে তাদের  ভালো  লাগার মধ্যে দিয়ে  মণিপুরী নাচ শেখাই।বর্তমানে মানকাচার  একটা জায়গা আছে আসাম মেঘালয় বাংলাদেশের সীমান্তে একটাই  নাচের স্কুলতাও আবার হিন্দি সিনেমার গানের নাচ শেখারসেখানে  গিয়ে মণিপুরী নৃত্যের উপর  পাঁচ দিনের কর্মশালা করে এসেছি  






প্রশ্ন ঃ আপনার জীবনের একটা স্মরণীয় ঘটনা যা আপনাকে ক্রমাগত প্রেরণা দিয়ে যায় ?

উত্তর ঃ আমি ২০০২ সালে লক্ষ্মী সিংহ আমায় কলকাতায় পাঠান গুরু বিপিন পাল এর জন্মদিন উৎসবে একটা কর্মশালায়।সেখানে আমি গুরুজর বাড়ি ছিলাম। একদিন সন্ধ্যাবেলা গুরু কলাবতী দেবী হঠাৎ আমাকে একটা নাচ দেখাতে বললেন। আমি মন ভরে নাচলাম। সেদিন তিনি আমাকে আশীর্বাদ দিয়ে বলেছিলেন, ‘তোর হবে।’ তখনি মনে মনে শপথ নিয়েছিলাম — ‘যতদিন বাঁচবো ততদিন মনিপুরী নৃত্য নিয়ে থাকবো’ আজ সেই মনিপুরী নৃত্যই আমার জীবন-যাপন ।

প্রশ্ন ঃ ত্রিপুরা নিয়ে কিছু ভাবছেন ?

উত্তর ঃ অবশ্যই ।আমি ত্রিপুরার ছেলে। তাই ত্রিপুরায় কভাবে মনিপুরী নৃত্যকে আরও জনপ্রিয় করে তোলা যায় সে নিয়ে আমার কিছু পরিকল্পনা রয়েছে। সবার সহযোগিতা পেলে নিশ্চয়ই তা করবো । দেখা যাক কি হয়   

No comments:

Post a Comment

অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎

  'অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎ ‎সত্তর দশকের উন্মাদনায় এক ভিন্ন উচ্চারণ-ভঙ্গ...