Thursday, October 3, 2024

‘জীবন বড় নেশা হে... জীবন বড় নেশা !’ --- কবি- লোক-গবেষক সমর চক্রবর্তী

 






৭০দশকে নকশালবাদী আন্দোলনে উত্থান-পতন, বাংলা সাহিত্যের ভাঙা-গড়া বলুন, সবকিছুতেই সরীসৃপের মতো বুকে-পিঠে কাদা লাগিয়ে যারা দামাল তারুণ্যের স্বপ্নে বিভোর ছিলেন, সেই স্বপ্ন-চাষাদের একজন সমর চক্রবর্তী।হয়ত বা কখনো কলমের মত বন্দুকও হাতে তুলেছিলেন। তাঁকে কেউ বলেন মূলত সে কবি, গবেষণার মোড়কে আসলে কবিতাই লিখে। কেউ বলেন, কবিতা তার নেশা, মূলত তিনি লোকগবেষক। এই তর্ক-বিতর্ক এড়িয়ে মানুষ সমর চক্রবর্তী-র প্রতিক্রিয়া জানতে  আজ মুখোমুখি  তমাল শেখর দে।

 

প্রশ্ন ঃ কেউ বলেন আপনি প্রথমত কবি। লোকজীবনের গবেষণার আড়ালে আপনি আসলে একটি কবিতাই লেখেন।আবার কেউ বলেন, আপনি মূলত প্রাবন্ধিক। কবিতা আপনার শখ কিংবা নেশা।আপনি ব্যক্তিগতভাবে নিজেকে কি মনে করেন ?

উত্তর ঃ সাক্ষাৎকারের প্রথমেই এমন একটা দীর্ঘ-উত্তর দেওয়ার মত প্রশ্ন দেখে বেশ শক্তই মনে হচ্ছে।  স্কুলের বার্ষিক  সাহিত্যপত্রে একটা কবিতা চুরি করে লিখতে গিয়ে বন্ধুর কাছে ধরা পড়ে যাই।আর সেই লজ্জাই আমাকে কবিতার প্রতি সিরিয়াস করে তোলে।এরপর আমি সত্যি অর্থে কবিতা পড়তে শুরু করি।  সে কবিতার উড়ান আজও থামেনি পরিচয় হল দেবাশি ভট্টাচার্য, সুনীল ভৌমিক, ক্রমে কবি-বংশীবাদক নকুল রায়-এর সাথে।যার কথা শনে রাজ্যের যুবকরা অন্তত কবিতার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে অবহেলায়। সত্যি বলতে কি সে ঝাঁপিয়ে পড়া উড়ান  কখন যে আমার মননের দিক পাল্টে দিল আমি নিজেই বুঝতে পারিনি । আজও না।

-তো গেল কবি-কবিতার কথা। আর একজন প্রবন্ধকার-গবেষক হিসাবে ? হ্যাঁ! যে কথা বলছিলাম, অন্যদিকে আমার স্কুলে তখন পরিচয় হয় নদীয়াপুর গ্রাম থেকে আসা গোবিন্দ তেলী-র সাথে। (যাকে ১৯৮০ সালে সাতজন কৃষক-সংগ্রামীর সাথে ঠান্ডা মাথায় খুন করে তৎকালিন পুলিশ বাহিনী।)  তাঁর সাথে প্রথম ‘কৃষিকেন্দ্রিক ভারতবর্ষ’-এর গতি প্রকৃতি  তথা ত্রিপুরার আর্থ-সামাজিক চরিত্র নিয়ে আলাপ-আলোচনা শুরু করি। এবং ক্রমে পরিচিত হই এই স্লোগানের সাথে –‘ছাত্রদের রাষ্ট্রযন্ত্রের গিনিপিগ হওয়া থেকে বাঁচতে হলে, অতি অবশ্যই গ্রামের কৃষকদের কাছে যাওয়া উচিত।’ চিন্তার মোড় গেল ঘুরে। একে একে পরিচিত হতে থাকি অচেনা-অজানা কৃক-শ্রমিক-মজুর-চা-শ্রমিকদের সাথে। রাতের পার রাত কাটাতে থাকলাম মাটির বিছানায়। সে এক ভিন্ন জগৎ--ভিন্ন খোঁজআত্মরক্ষার হাতিয়ারের পাশাপাশি কবিতা লেখার জন্য  একখানা সাদা কাগজ ছাড়া  থাকতে পারিনি কোনদিনই । তবে তোমার প্রশ্নের উত্তরে  একটা লাইন মনে পড়ে গেল, সেটা বলেই শেষ করি, ‘যে কাননের পাখি আমি,জাত আজও সেই বাগান ’ আমার শেকড় অন্য কোথাও, যেখানে আমার অস্তিত্ব নিয়ে অন্তত তর্ক-বিতর্কের কোনো অবকাশ নেই।




প্রশ্ন ঃ রাগ করলেন মনে হচ্ছে ?

উত্তর ঃ দূর বোকা! রাগ করবো কেন? আমার যা সত্য মনে হল,তাই বললাম।

প্রশ্ন ঃ তীরন্দাজের মত তাক করা বন্দুক কোন্‌ যাদুবলে কলমে রূপান্তরিত হয়ে গেল? আপনার প্রথম কবিতার বইয়ের নামও তো রেখেছিলেন ‘খাকি পোশাক ছিঁড়ে কবিতার খাতা’—

উত্তর ঃ তোমার কাছে যা যাদু বা হঠাৎ মনে হচ্ছে, আমার কাছে সেটা জীবনের বস্তুগত ক্রিয়ার প্রতিফলনমাত্র। কখন বন্দুক ঠাতে হবে বা কখন চাঁদের আলোয় বাঁশিটি হাতে নিয়ে বসতে হবে, তৎকাল কোন প্রশ্নের মধ্যেই তার উত্তর দেওয়া তো   অসম্ভব। কারণ দুটিই জীবনের প্রধান দিক। সময় এসে দুটিকে আলাদা করে দিয়েছে মাত্র। ১৮৫৫ সালে সাঁওতাল বিদ্রোহের কথা, মুন্ডাদের হুলগুলান,১৮৫৭ সালের মিউটিনি,১৯৫২-র তেলেঙ্গানা, ১৯৬৯সালের নকশাল বাড়ীর ‘বসন্তের বজ্র নির্ঘোষ’ এবং দেশের ঐসব মহান ঘটনাগুলোর সাথে জড়িত সমস্ত সাহিত্য শিল্পকর্মগুলো কোনটাই আলাদা নয়। এখানে একজন কবির কাজ ছিল সম্পৃক্ত থাকা এবং  এভাবে অনেক কবি-লেখকরা  জড়িয়েও ছিলেন। আর তুমি বলছো আমার প্রথম কবিতার বইয়ের নাম নিয়ে-? তুমি অবশ্যই জানো, বৃটিশ আমলে দেশপ্রেমিক শক্তিগুলোকে ধ্বস্ত করতে যে খাকি পোশাকের সৃষ্টি করা হয়েছিল, যখন খোদ রাষ্ট্রনেতারাই বলেন,‘সৈন্যবাহিনী একটি সরকারী গুন্ডাবাহিনী মাত্র।’ তখন আমার কবিতার বইয়ের ঐ নাম দেওয়াটা কি খুব একটা ভুল ছিল?

প্রশ্ন ঃ রাজনৈতিক মতাদর্শগত কারণে লোকজীবন চারণ করেছিলেন অনেকদিন ঠিক  কখন তা লোকসংস্কৃতির গবেষণা পর্যায়ে নেমে এলো ?

উত্তর ঃ তুমি দেখছি আমাকে গবেষক বানানোর জন্য প্রথম থেকেই লেগে আছ!   আসলে, তোমার এই প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে মনে হয়, কৃষক সংগ্রামী গোবিন্দ তেলী-র মৃত্যুর সম্ভবত এক দেড় বছর আগে, আমাদের রাজ্যে ‘কৃষক সমিতি’ গঠন করার জন্য সে যে দলিল রচনা করেছিল এবং আমরা অনেকে যেভাবে তাঁর পরিকল্পনাকে সহায়তা করেছিলাম, সম্ভবত সেদিন থেকেই লোকসংস্কৃতির বীজটিও অঙ্কুরিত হয়ে উঠেছিল। সে এক ভিন্ন বাঁক ---।

আজ সরাসরি শরীরী-রাজনৈতিক আন্দোলন থেকে সরে আসলেও সেই লোকজীবন থেকে কোনভাবেই সরে আসতে পারিনি গ্রামের সাথে সাথে কোল-ভীল-মুন্ডা-সাঁওতাল-ওরাঁঙ-রা আমার মনে চিরস্থায়ী একটা জায়গা করে নিয়েছিল তাদের জীবনযাপন-সংস্কার-আচার-আচরণ সংস্কৃতির সাথে আমার আত্মা কোথায় যেন মিলে  গিয়েছিল। আমি চিনতে পারি এই তথাকথিত সভ্যতার আড়ালে যে আগ্রাসন ও বিতাড়ন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, নতুন ভারতের স্লোগানের মধ্যেও তার সেই রূপটি দেখে, সমাজের নিচুস্তরের(!)এইসব আদিবাসিদের সামনে মাথা নত করা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। তাদের যন্ত্রণা আমাকে ব্যথা দেয়। তাদের নির্মল হাসি আমাকে তৃপ্ত করে তোলে। আমি তাদের প্রেমে পড়ে যাই সব অর্থে । তোমাকেও তো নিয়ে গেছি। তুমি তো দেখেছো, তাদের সরলতা ভালোবাসা সেই ভালোবাসা ভাল লাগা থেকেই তাদের জীবনের, সংস্কারের গভীরে যেতে যেতে, একসময় মনে হয়েছিল তা লিখে রাখা রুরী লেখা শুরু করলাম। লেখা হলে, বন্ধুদের দেখে ভাল লাগলো, ছাপাও হল। একসময় বই আকারেও একে একে বের হতে লাগলো। আরও বের হবার প্রস্তুতি পর্যায়ে আছে। এই বলা যায় ... 

 


প্রশ্ন ঃ ‘সমর বা সমরদা নিখোঁজ’ – আপনার পরিচিতদের কাছে এটা সাধারণ ঘটনা। এই সাধারণের ভিতরে যে অসাধারণত্ব লুকিয়ে ছিল তা নিয়ে আজ আমাদের অন্তত কিছু বলুন ?

 

উত্তর ঃ  আসলে ছোটবেলা থেকে বাঁধন-ছাড়া একটা ব্যাপার আমার মধ্যে ছিলই। কিন্তু সেটা রাজনৈতিক দিক পায় তখন, যখন স্কুলে গোবিন্দ তেলী-র সাথে দেখা হয়। সি.পি.আই.(এম এল) দলটি তখন নিষিদ্ধ ছিল। ফলে দলের কাজকর্ম গোপনে করতে হত। রাতের পর রাত, গ্রামের পর গ্রাম ঘুরতাম পায়ে হেঁটে। সে জন্য নিখোঁজ থাকতেই হত। মানুষকে জানা, তাদের সাথে সম্পর্ক গড়া, তাদের নিয়ে নতুন দিনের স্বপ্ন নিয়ে ছিলাম বিভোরটাকার অভাবে, রঙের বদলে কচুপাতা দিয়ে দেয়ালে দেয়ালে স্লোগান লিখতাম-- ‘রাজনৈতিক কর্মীদের, খুনি ও ডাকাতদের সাথে গুলিয়ে ফেলার চক্রান্ত নস্যাৎ করুএভাবে প্রথম চা-বাগানে রাত কাটাই বাঁশি ও মাদলের সাথে। সমবেত মেয়েদের কন্ঠে ঝুমুর গান শুনলাম আর হারিয়ে গেলাম কি এক অজানা গভীর টানে, যা আমি নিজেও জানি না। ১৯৮২ সালে ‘খাসজমি ভূমিহীনদের ন্যায্য পাওনা’ এই দাবি নিয়ে পূর্ব হুরুয়া-য় আমরা একটা বিশাল জায়গা দখল এবং বিতরণ করি। জীবন-মৃত্যুর এক-দু ইঞ্চির ফারাক দিয়ে বেঁচে এসে সকালের মুখ দেখেছি কতদিন, কতবার ...!   নিখোঁজ- এর রহস্য লুকিয়ে আছে এরকমই শত     শত ঘটনার ভিতর সব কি আজও বলা যায় তমাল ? না, আছে মনে ...    

 

 প্রশ্নঃ পূর্ব হুরুয়া-য় আমরা একটা বিশাল জায়গা দখল এবং বিতরণ করেছিলাম চাষিদের মধ্যে —এই বিতরণের  ভিতর কি হিরোইজমের গর্ব কাজ করেছিল ? পূর্ণমূল্যায়ন করে দখতে ইচ্ছে করে? না, করেছেন ?

 

উত্তরঃ হ্যাঁ, পরে অনেকবার পূনর্মূল্যায়ন করেছি। সেদিন আমার মধ্যে কোথাও একটা হিরোইজমের গর্ব কাজ করেছিল। এবং সেটা পরে বুঝেছিলাম সেই তথাকথিত গরীব খেটে খাওয়া মানুষদের কাছে থেকেই । এখন সেটা আরও স্পষ্ট করে বুঝি, উপর থেকে চাপিয়ে দিয়ে কোনো কিছুই করা যায় না। তখন সেটা ভিক্ষা, করুণা, দয়ামাত্র হয়ে যায় ।  বর্তমানে তার নগ্নরূপটি আমরা আরও ভালো করে দেখছি – মুক্তি দেওয়ার কথা বলাদের আসল রূপের মধ্যে।  গ্রামগুলোতে জমে উঠছে আরও বেশি ক্ষোভ, আরও দারিদ্র্যের ভীড়হায়! সোনার ভারতবর্ষ! ‘উপেন’-এর ভারতবর্ষ !        

 



প্রশ্ন ঃ ‘অন্ধকারে ঝাঁপির ভিতর / সাপটা একা ঘুরে / খিদের জ্বালায় নিজের লেজ / নিজেই গিলে মরে / খেল জমেছে বাবুলোগ ! / হাততালি দেয় জোরে /’ সাপটা এখন উঠে আসবে / মাথায় মনি পরে /-- ক্ষোভে ফণা তোলা দৃশ্যকল্প। এই খেল এবং খেলা নিয়ে আপনার বিশ্লেষণ আমাদের কিছু বলুন ?

 

উত্তর ঃ আসলে কবিতাটি নিজের মৃত্যুর মধ্যে বাঁচার অঙ্গীকার। আমার মনে হয়েছে, যারা খেলাগুলো দেখে বা দেখি তারা নিজেরাই জানি না,  আমরাও এই নিষ্ঠুর খেলার শিকা একদল উচ্চবিত্ত ঠিক দেখছে আমাদের অসহায়তা, আমাদের বন্দীদশা। ঝাঁপিটা যে তাদের হাতে। তাই তারা নিশ্চিন্তখাঁচার ভিতরে বাঘের মত আমাদের ক্ষোভের বর্তমান অবস্থা দারিদ্র্য দূরীকরণ নিয়ে যারা পরিকল্পনা করে, তারা কোনদিন তা দেখেওনি । হয়ত ঠান্ডা ঘরে বসে এনিয়ে  পড়াশুনা করেছে বিস্তর । ঝোঁপে ঝোঁপে ক্ষোভ জমে আছে স্পষ্ট, আমি দেখতেও পারছি বা পেয়েছি বলেই লাইনটা এসেছে । এর বিস্তর বিশ্লেষণ সম্ভব নয় ।বোধের ভেতরে আছে সব । আমি আমার মত লড়াই এখনো চালিয়ে যাচ্ছি বিভিন্ন প্রবন্ধে-কবিতায় তাদের কথা লিখি, প্রতি রোববার চা-বাগানের বন্ধুদের জন্য নির্দিষ্ট থাকে। সারাদিন তাদের সাথে কাটাই, সুখ-দুঃখের কথা শুনি। কোনদিন আনন্দ, তো কোনদিন দুঃখ নিয়ে বাড়ি ফিরি !     

 প্রশ্ন ঃ ‘সংস্কৃতি বিপ্লবের হাতিয়ার’—এই স্লোগানকে কিভাবে পুনর্পাঠ বা মুল্যায়ন করতে চাইবেন?

 উত্তর ঃ আমাদের ভারতবর্ষে এই স্লোগানের অন্তস্থলে যে দর্শনটি ছিল, সেটি ছিল এক গভীর জীবনবোধ। আমি ব্যক্তিগতভাবে স্লোগানটির সামনে ‘লোক’ কথাটি বসাতে চাইবো শ্রদ্ধেয় সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়, দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, ডঃ শহীদ্দুল্লা, থেকে শুরু করে সম্প্রতি হেমাঙ্গ বিশ্বাসের নানা আলোচনায়, গানে, আমরা তার জীবন্ত প্রয়োগ লক্ষ্য করি। লক্ষ্য করি একেবারে হাল আমলে আমাদের আশেপাশের চা-বাগানগুলোতে।  সাঁওতাল ও মুন্ডাদের মধ্যে গাওয়া ‘ধুলো উড়ে যায় / ধুলো উড়ে যায়/’  ‘আখড়া’-তেও সেই একই ধ্বনি । আপাত্ ছোট্ট সহজ সরল এই গানটি প্রায়ই শোনা যায়।  সহজ সরল হলেও আদতে গানটি তাৎপর্য খুবই গভীর এবং অনেক দূর বিস্তৃত ভারতবর্ষের মূল ভূমিপুত্র কোল জাতির সমস্ত শাখা-প্রশাখার মধ্যে এই আখড়া শব্দটি খুব পবিত্রসারাদিনের কাজ শেষে সন্ধ্যায় তারা, তাদের জীর্ণ ঘরের সামনে ছোট্ট উঠোনটাকে আখড়া বানিয়ে গান গায়, মেয়েরা নাচে। মনের যাবতীয় কষ্টের সমস্ত নিবৃত্তি নিয়ে তোলে বাঁশি আর মাদলের বোল। আর এটা যে একটা প্রতিবাদ-দ্রোহ, শোনা যায় এই গানে। ‘ধুলো উড়ে যায়’ এই গানের মধ্যে দিয়ে তারা ব্যক্ত করে যে, এই চমক-ধমক সাতমহলার গৌরব কিছুই থাকবে না। গানে গানে পায়ের ঘূর্ণির চালে সব ধুলোয় মিশে উড়ে যাবে, যে ধুলিতে তারা বাস করে। এবং সবশেষে থাকবে প্রকৃতির মত স্বচ্ছ ও সরল এই মানুষ। এমন অজস্র গান ছড়িয়ে আছে চা-বাগানে। আর এখানেই আমাদের পুনর্পাঠ বা মুল্যায়নের আবার প্রয়োজন রয়েছে বলে আমি মনে করি।এখানে কাউকে মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় না। মনের কষ্টে অতিরিক্ত মদ খেলে কোনো মেয়ে কাতর চোখে বলে, ‘বা!(পিতৃস্থানয়)  নাই খাবি! পৌরা=মদ জহর হে কানা ওটা বিষ আছে বটে!’ আমার তো তাই মনে হয়।

 প্রশ্ন ঃ ‘খুমলুঙ যাদুঘর’-এর  জন্য উপজাতি পোশাক সংগ্রহ এবং তার উপর গবেষণামূলক কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়ে আমাদের কিছু বলুন ?

 উত্তর ঃ হ্যাঁ , সেটা ছিল এমন এক স্বপ্ন-সফর যে আমি ভাবতেই পারিনি, ত্রিপুরার চুড়াইবাড়ি  থেকে শুরু করে সুদূর দক্ষিণের করবুক আবার  মাঝপথে আইজল হয়ে ১৯টি উপজাতি, তাদের লোকসংস্কৃতির, সামাজিক ও আর্থিক ব্যবস্থার ভিতরে চলে যাবো। একটার পর একটা অভিজ্ঞতা  আমাকে আরও টেনে নিয়ে গেল পোশাকের রঙ, বুনট, আকৃতির বিভিন্নতা ছাড়িয়ে মঙ্গোলীয়-অষ্ট্রিক এবং দ্রাবিড়ীয় সভ্যতার আশ্চর্য বিস্তারে। সে সব উপলব্ধি নিয়ে ‘ত্রিপুরার উপজাতি পোশাক ও একটি অধ্যয়ন’ নামে একটি বই বের করার চ্ছে আছে আগামিতে। যাক, এই কাজটি করতে গিয়ে অসখ্য উপজাতিদের সাথে যেমন মিশতে হয়েছে, তেমন পড়াশোনা করতে হয়েছে প্রচুর । অনুসন্ধানের এক পর্যায়ে জানতে  পারি যে, কাপড়ের সুতো আবিষ্কার এবং তার বুনন ভারতীয় সভ্যতায়, সাঁতাল,ভীল, হো, মূণ্ডা, খড়ীয়া, অসু্‌র, শবর, ভূমিজ, কোর-দের মধ্যেই এবং বস্ত্রে রঙের ব্যবহারে মঙ্গোলীয় ‘কিরাতগণ’ যে  মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছে তা এককথায় বিস্ময়কর! তুমি আমাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের দিকে সোজা তাকিয়ে দেখতে পারো, তাদের কাপড়ের লাল রং এবং অজস্র ‘ব’ ‘ডাইস’ চিহ্নের ব্যবহার, দেখতে পাবে লোকসংস্কৃতির তাৎপর্য সেখানে কোথায় লুকিয়ে রয়েছে।

পরিশেষে একটা মনোকষ্টের কথা বলি,এই কাজটি শেষ করার পর যেদিন  ‘খুমলুঙ যাদুঘর’-এর উদ্বোধন হল, সেদিন আমাকে কেউ নিমন্ত্রণ করার প্রয়োজন পর্যন্ত মনে করলো না। এটাকে তুমি কি বলবে ? তুচ্ছতা ...  

 প্রশ্ন ঃআজকের তরুণদের রাজনৈতিক ভাবনা-চিন্তা আপনাদের সাথে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলে  আপনি কি সন্তুষ্ট হন? না, হতাশ ... ?

 

উত্তর ঃ তুলনামূলক বিশ্লেষণের কথা উঠলে তার উত্তর তো দেবে সময়। আমার সময়ের কাকদ্বীপ আন্দোলন, খাদ্য আন্দোলন, নকশালবাড়ি বিদ্রোহ, শ্রীকাকুলাম হয়ে ত্রিপুরার জুনের দাঙ্গা, কাছাড়ের ১৯মে ভাষা আন্দোলন এবং এগুলোর সাথে জড়িত যেসব শিল্পকলা ও সাহিত্য  আমাকে যেভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল, আজকের সময়টা তা নয়। ইন্দিরা গান্ধীর ‘গরীবি হটাও’এর মতো আজকের মোদী সরকার ‘নয়া ভারত’ বা ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ বলে ঘোষণা দিচ্ছেন তোমরা নতুন, তোমরাই এটা ভালো বুঝবে বেশি। আজকের তরুণদের চাওয়া, না-পাওয়া ,যন্ত্রণা এবং আনন্দ আমাকে তাড়িত করে। তাদের যন্ত্রণা দেখলে কখনো কখনো মনে হয়, এটা আমাদেরই অপারগতা। আমরা তো তাদের জন্য একটা সুন্দর জীবন উপহার দেবার জন্যই নিজের জীবন-ভবিষ্যৎ বাজি রেখেছিলাম। সফল হতে পারিনি , সেটা অন্য কথা, অন্য এক ব্যথা।

আর আমার বা আমাদের সন্তোষ্টির কথায় – সেই প্রথম গানটাই আবার বলবো, ‘যে কাননের পাখি আমি,জাত আজও সেই বাগান ’ আর কি বলতে পারি! তবে এটা ঠিক জোয়ার-ভাটার মতো সময়ের উত্থান-পতন স্বাভাবিক। আর মানুষ সেখানে সবসময় ভালোই কামনা করে। সে ফাগুয়া ছুঁড়ে মারে রক্তের মতো লাল আর অরণ্যের মতো সবুজ  

প্রশ্ন ঃযদি জীবন নিয়ে এক বাক্যে কিছু বলতে বলি, কি বলবেন? 

উত্তর ঃ ‘জীবন বড় নেশা হে... জীবন বড় নেশা !   

No comments:

Post a Comment

অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎

  'অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎ ‎সত্তর দশকের উন্মাদনায় এক ভিন্ন উচ্চারণ-ভঙ্গ...