Monday, September 9, 2024

“আবৃত্তি-নাটক মূলত মানুষের হয়ে মানুষের কথা বলতে শেখায়।” -- সুকোমল দেব

 

 

 



আবৃত্তি-নাটক মূলত  মানুষের হয়ে মানুষের  কথা বলতে শেখায়

 আশির দশকের উন্মাদনার দিনগুলিতে জমিয়ে নাটক-আবৃত্তি, মঞ্চ পরিচালনার সাথে জড়িয়ে ছিলেন সুকোমল দেব। তার সাথে একান্ত কথোপকথনে তমালশেখর দে ।   

 

প্রশ্নঃ নাটক আবৃত্তি মঞ্চসঞ্চালনা এই নিয়ে জড়িয়ে রয়েছেন দীর্ঘদিন। আজ পেছন ফিরে থাকালে, মনে পড়ে। কীভাবে জড়িয়ে গিয়েছিলেন এই জগতের সাথে! কেমন ছিল আপনাদের নাটক শুরুর সেসব উদ্দাম দিনগুলো ?

 

উত্তর ঃ সেটা ছিল ছয়ের দশকের গোড়ার দিকের কথা আমার বুনিয়াদী শিক্ষালয় শ্রীরামকৃষ্ণ শিক্ষা সদনে প্রতি শনিবার আমগাছের নিচে সাহিত্য সভা আয়োজিত হত সেই সাহিত্য সভাই আমার জীবনের প্রথম উদ্যম, উদ্যোগ, অনুপ্রেরণা যাকিছু ঠিক কি কারণে সাহিত্য সভায় যোগদান করি আজ আর স্পষ্ট মনে করতে পারছি না যতটুকু মনে পড়ে সাহিত্য সভায় প্রথমে কবিতা পাঠ,  পরে একক নাটকে অংশগ্রহণ করাই  মুখ্য ছিল পাঠ্য বইয়ে আমার ভালো লাগা এবং ভালোবাসার অংশবিশেষ সবাইকে শোনাবার জন্যে প্রতি মুহূর্তে উদগ্রীব হয়ে থাকতাম আরেকটু বড় ক্লাসে যাবার পর শ্রদ্ধেয় শিক্ষকমশাইরা উৎসাহিত করলেন সাহিত্য সভার সঞ্চালনা করার জন্য

সেই সময়ে কৈলাশহরে যাত্রার খুব প্রভাব ছিলআমার বিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রধানশিক্ষক শশাঙ্ক চক্রবর্তী, যিনি স্থানীয় যাত্রা জগতে মহিলা চরিত্রে অভিনয় করতেন তিনি একটি নাটক লিখেছিলেন সেই নাটকে আমার প্রথম অভিনয় তখন আমাদের পাড়াতে চৌপায়া লাগিয়ে, পেট্রোমাক্স জ্বালিয়ে অভিনয় চলতো

 

 

 প্রশ্নঃ ত্রিপুরা রাজ্যে এখন মঞ্চ সঞ্চালনা একটা প্রতিষ্ঠিত শিল্প। উপস্থাপনা-টাও একদিন প্রকৃত অর্থে শিল্প হয়ে উঠবে, আপনি হয়ত  একসময় ভাবতেও পারেননি! এই নিয়ে আপনার ব্যক্তিগত উপলব্ধি জানতে চাইছি --   

 

উত্তর ঃ মঞ্চ সঞ্চালনা অবশ্যই আজ একটা শিল্প সমগ্র বিশ্ব জুড়ে সেখানে দর্শককে শ্রোতার সাথে  একাত্ম করে দিতে হয় এই একাত্মতা যত সুচারু হয় ততই প্রানবন্ত হয় আমি ব্যক্তিগত ভাবে কোনদিনই ভাবতে পারিনি যে  মঞ্চ সঞ্চালনা বর্তমানের এই রূপ নেবে সব সময়ই আমি নজর রাখি  অন্য বড় সঞ্চালক কোন সময়ে কি কি আঙ্গিক প্রয়োগ করলেন আমার   অভিজ্ঞতা  বলে, একজন ভালো সঞ্চালকের প্রখর তাৎক্ষনিক বুদ্ধি সমাহিত করার  ক্ষমতা থাকা দরকার আমি জানি না, মঞ্চে আমি কতটা কি করি বা করতে করি!  তবে অনুষ্ঠানের মূল বিষয়ের ব্যাপারে  আমি খুব সজাগ থাকার চেষ্টা করি । খুঁটিনাটি খুব ভালো করে জেনে নেয়ার চেষ্টা করি আগে থেকেই এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় ।

 

 প্রশ্নঃ   ত্রিপুরার নাটকের ধারাবাহিকতার সাথে আপনি ভালোভাবেই পরিচিত। সেই নাট্যধারায় বর্তমানের আলোকে তার অভিমুখী যাত্রাটাকে কীভাবে মূল্যায়ন করতে আগ্রহী আপনি!

 

উত্তর ঃ আমাদের সময়ের নাট্য প্রস্তুতি বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপট অনেকটা বদলে গেছে তাই এর তুলনামূলক বিচার করা আমার মনে হয় প্রায় অসম্ভব

তবে হ্যা , প্রথমে আমাকে বদলাতে হবে, তবেই না নতুনকে নিতে পারব নাটকের নতুন ধারা তো বেশ ভালো  কিছু দিন ধরে আমি ভাটার মধ্যে চলছিলামহয়তো সরে গেছিলাম  আশার কথা এখন নতুনদের সাথে কাজ করতে ভালোই লাগে অনেক নতুনরা এগিয়ে আসছে, আর তা তো নাটককে ভালোবেসেই    

 

প্রশ্নঃ জাতীয় স্তর থেকে শুরু করে বিভিন্ন কর্মশালার মাধ্যমে  নাটকে এখন অনেক তরুণ অভিনেতা-অভিনেত্রীর ভিড়। তারপরও কোথাও যেন স্পার্ক-করা কোনো তরুণতুর্কিকে মনে মনে মিস করেন?

 

উত্তর ঃ  মিস করি তো বটেই মঞ্চায়নও  তুলনামূলক  কম  হচ্ছে বর্তমানে নাটক প্রযোজনা অনেকটাই ব্যয়বহুল লাইট, ডিজাইন সব মিলিয়ে বেশ একটা মোটা অংকের আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন হয় সেটাও একটা ব্যাপার হয়ত বা   টিকিট কিনে ,বেচে  নাটক দেখা এবং করার মতো  অবস্থায় আমরা কতজন আছি ! এর একটা চাপ স্বাভাবিকভাবেই পড়েছে ।

আসলেই নাটক তো  খুব সহজ ব্যাপার নয় ৬৪ কলার সমন্বয়আয়ত্বও করতে হয় সাধনার দরকার  তারপরও বলবো, আমার  অনেক তরুন-তুর্কির এখনও দেখা পাই আলাদা করে আর নাম নিচ্ছি না তবু বলি ওরা আছে  এবং থাকবেও ।ওরা আছে বলেই তো এখনও নাটক হয়  

 

  প্রশ্নঃ আবৃত্তির সাথে আপনি সরাসরি জড়িয়ে। তাই জানতে চাইছি, ‘আবৃত্তি’ শেখা আমাদের জীবনে ঠিক কতটা প্রয়োজনীয় বলে আপনি মনে করেন?   

 

উত্তর ঃ আশির দশকের গোড়ার দিকে আমি আমার বন্ধু মিলে কৈলাসহরে খুব পরিমানে আবৃত্তি করতে শুরু করি এমনও হয়েছে কোনো কোনো অনুষ্ঠানে  জোর করে ঢুকে গিয়ে আবৃত্তি করেছি আসলে কি আবৃত্তি শেখা বা শেখানো যায়? তো বোধের প্রকাশ তবে কোন শব্দ কোথায় ব্যবহার করা হয়েছে আর তার প্রকাশ কি করে করলে তা শ্রোতাকে সেই বোধে জাগরুক করবে তার ইংগিতটুকু ধরিয়ে দেওয়া যেতে পারে আমি মনে করি, এটাই একজন আবৃত্তিকারের কাজ।

এক সময়ে আবৃত্তির কারণে দেশদ্রোহী আখ্যা পেয়েছিলাম  তারপরও  আবৃত্তি ছাড়িনি আজও আবৃত্তি নিয়ে আছি আবৃত্তি-নাটক মূলত  মানুষের হয়ে মানুষের  কথা বলতে শেখায় মানুষের মানবিকতার জয় গানই তো আবৃত্তি বোধের বিকাশ ঘটানোই যার মূল কাজ ।

 

 

 প্রশ্নঃ  সম্প্রতি রবীন্দ্রনাথের উপর ভিত্তি করে রচিত “ রাজ অতিথি” নাটকে আপনি মধ্য-বয়সের রবীন্দ্রনাথ চরিত্রে অভিনয় করেছেন।  সে-ই নাটকে  আপনার অভিনয় এবং তৎপ্রেক্ষাপটের  অভিজ্ঞতা নিয়ে আমাদের কিছু বলুন!  

 

উত্তর ঃ   " রাজ অতিথি" নাটক আমার জীবনে এক মাইলফলক বন্ধুবর সঞ্জয় কর কেন আমাকে নির্বাচিত করার জন্য কৃতজ্ঞ  প্রথম খুব ভয় পেয়েছিলাম মহড়া চলাকালীন সময়ে সকলের এতো সহযোগীতা পেয়েছি যা অভাবনীয়এতো শৃঙ্খলা ভরা মহড়া করা যায় , আমি আগে দেখিনিখুব কঠিন চ্যালেঞ্জ ছিল এই চরিত্রে অভিনয় করা পদে পদে প্রৌঢ় রবীন্দ্রনাথের অস্তিত্ব আমার ভিতরে অনুভব করেছি । যাপন করেছি । এটা আমার জীবনের চরম পাওয়া । একজন অভিনেতা এমন একটি স্মরণীয় চরিত্রে অভিনয় করার দিকেই তো তাকিয়ে থাকেন । বেশ কয়েকবার অভিনীত হয়ে গেছে নাটকটি । যতবারই করছি, ততবারই জীবন্ত মনে হচ্ছে । প্রতিবারই যেন নতুনের স্বাদ পাচ্ছি ।

 

প্রশ্ন ঃ একটা সময় ত্রিপুরায় যাত্রাও নাটকের সাথে সাথে শিল্পের ভীষণ জনপ্রিয় ছিল। আজ প্রায় অতীত হয়ে পড়ছে শিল্পটি । এই বিষয়টা কি কখনও আপনাকে ভাবিয়েছে ?

উত্তর ঃ   যাত্রার সাথে ছোটবেলা থেকেই সম্পর্ক যাত্রার সে-কি উন্মাদনা । ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়কে খুব কাছে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে । সারারাতের সেই উত্তেজনার সাথে আজ আর কোন কিছুরই তুলনা করা চলে না । টিভি, মোবাইলের মতো বোকা বাক্সরাই কি এর জন্য দায়ি? জানি না। আমার মাথায় কিছুতেই আসে না, যাত্রার মতো শিল্প  কীভাবে প্রায় বিলুপ্তির পথে চলে যায় ? সরকার যথেষ্ট উদ্যোগ নেয়ার পরও তেমন কাজ হয়নি। আমি খুবই বেদনাহত এই ব্যাপারে            

No comments:

Post a Comment

অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎

  'অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎ ‎সত্তর দশকের উন্মাদনায় এক ভিন্ন উচ্চারণ-ভঙ্গ...