“সর্বকালের প্রতিবাদের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে নাটক”
কার্ত্তিক বণিক বহুদিন থেকে
নাটকের সাথে জড়িয়ে আছে। নাটক তার ধ্যান-জ্ঞান।
নিজে নাটক লেখেন, নির্দেশনা করেন। আজ তার সাথে আলাপচারিতায় তমালশেখর দে
।
প্রশ্ন ঃ প্রথমেই আপনার কাছে জানতে চাইবো, নাটক বিষয়টা আপনার মননকে নাড়া দিল কখন ? ঠিক কখন মনে হল আপনার,
নাটক আমাকে করতেই হবে ?
উত্তর - ১৯৬০ সালের কার্তিক পূজার দিন আমার জন্ম। জন্মের পরে একটু বড় হতেই শুনতাম, আমার বাবা আজ রাতে বাড়ি ফিরবেন না। কারণ, বাবার আজ যাত্রাপালা আছে। তখন আমি বুঝতাম না যাত্রা কি? পালা কি? কিন্তু এই যাত্রাপালা শুনতে শুনতেই আমি আর একটু বড় হলাম। তখন অভিনয় শব্দটার মানে একটু একটু বোধগম্য হচ্ছে। পাড়ার সত্যপ্রসাদ চক্রবর্তী, শংকর ঘোষ, পাড়াতে এই দুই দাদার অভিনয় দেখে অনুপ্রাণিত হলাম। একদিকে বাবার যাত্রাভিনয়, সেইসাথে এই দাদাদের অভিনয় দেখে খুব সখ হল অভিনয় করার। কিন্তু কি করে সম্ভব? আমি তখন অষ্টম শ্রেণি কি নবম শ্রেণির ছাত্র। বড়দোয়ালী স্কুলে আমার পাঠ। একদিন সাহিত্য ক্লাশে আমি ও গোপা চক্রবর্তী রচনা পাঠে যুগ্মভাবে প্রথম হলাম। মনে মনে ভাবলাম তৃতীয় বেঞ্চের ছাত্র হয়ে ফার্স্ট গার্ল গোপার সমান হয়ে গেলাম এই একটি জায়গায়। এই জায়গাটাই আমার পক্ষে সহজ। তাই মনের গোপন ভাবনা নিয়ে পাড়ার বন্ধুদের সাথে কথা বললাম। তখন তো পাড়ায় জলসা হত। এছাড়া মনোরঞ্জনের আর কোন বিষয় নেই। তাই আমি নাটককে মনোরঞ্জনের মাধ্যম হিসেবেই ভাবতে শুরু করলাম। এবার আমাদেরও নাটক করতে হবে। কিন্তু নাটক কোথায় পাব? আমার ধারণা তখন ছোটদের জন্য কোন নাটক লেখা হত না। নিজেই নাটক লিখতে শুরু করি। মনে রাখতে হবে, আমি তখন অষ্টম কি নবম শ্রেণিতে পড়ি। নাটক লিখলাম ' ভারত বিপ্লবী'। স্বাধীনতার আন্দোলনে বিপ্লবীদের ভূমিকা নিয়ে এই নাটক। নাটক লিখে সাহস করে পাড়ার দাদাদের দেখালাম। কাঁচা বয়সের কিছু অপরিণত সংলাপ তারা সংশোধন করে দিলেন। আর সাথে দিলেন উৎসাহ। রিহার্সাল চলল এবং মুখস্থ হল। এবার মঞ্চের ভাবনা এল। তখনও নাটকের মঞ্চ দেখিনি। আমি যে নাটক তৈরি করলাম তাতে তিনদিক ঘেরা ও সামনে পর্দা চাই। যা প্রয়োজনে উঠবে ও নামবে। সেই সাথে চাই মঞ্চে প্রয়োজন মত আলো। সেসব কিছুই আমার ধারণা ছিল না। এই বিষয়ে আমার দু'বছরের বড় ছোড়দা নিমাই
বণিক পুরো দায়িত্ব সামলে নিল। নির্দিষ্ট দিনে নাটক শুরু হল। পাড়ার ছোট বড় সবাই যে যার মত করে আসন নিয়ে এসে নাটক দেখতে বসে গেল। নাটক দেখতে এলেন রজত স্যার, তিনি সম্ভবত কোন এক কলেজের অধ্যাপক ছিলেন। তিনি এই কাঁচা বয়সীদের নাটক দেখছিলেন এমন একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে, এখন যে জায়গায় উইংস থাকে, সেখান থেকে। নাটকের একটি কারাগারের দৃশ্য দেখানো হচ্ছিল, কোন সংলাপ ছিল না। সেই সংলাপহীন অংশে তিনি গান ধরলেন 'কারার ঐ লৌহ কপাট ভেঙে ফেল......'। এই গান আমার নাটকে ছিল না। আমি জানিও না। কিন্তু সেই গান নাটককে দারুণ ভাবে উচ্চ মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছিল। নাটকের শেষে অনেকেই একটু বেশি স্নেহ করতে শুরু করলেন। পরের বছর আবার একটি নাটক করি সেই নাটকের নাম মনে নেই। বুঝলাম নাটক করা আমার পক্ষে সম্ভব। কারণ আমার ধারণা ছিল এই শিল্প সহজেই আয়ত্তে আনা যায়। তাছাড়া অল্প বিদ্যা এবং অল্প জ্ঞানে অন্য কোন শিল্প আমার দ্বারা সম্ভব হবে না। আমার ধারণা ছিল নাটক অল্প একটু চেষ্টাতেই যথেষ্ট। যদিও এখন আমি বুঝি যে, নাটক নিয়ে যতই পড়ি বা জানি তা যথেষ্ট নয়। সঙ্গীত, নৃত্য বা অঙ্কন বিদ্যার জন্য যেমন বছরের পর বছর ধরে সাধনা করে তবেই সফলতা আসে, নাটক তার চেয়েও বেশি। তবে সেসময় এতকিছু না ভাবলেও মনে মনে নিজেকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার একটা তাগিদ ছিল। আর সেই থেকেই আমার নাটক করার এই উগ্র বাসনা জাগে। হয়ত আরও দ'একটি বিষয়ও কাজ করে থাকতে পারে।
প্রশ্ন ঃ নাটককে আপনি কোন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে ভালোবাসেন ? নাটককে কি আপনি প্রকৃষ্ট প্রতিবাদের একটা মাধ্যম মনে করেন ?
উত্তর - : নাটকে নান্দনিক শিল্প, বিনোদন ও সর্বোপরি সমাজের ঘটমান বিষয়ে মানুষের মনের ভেতরের সুপ্ত ভাবনাকে জাগ্রত করাই মূল লক্ষ্য। জন্মলগ্ন থেকেই নাটকের মধ্যে প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়ে আসছে। ইসকাইলাস, সফোক্লেস, কালিদাস, শূদ্রক হয়ে রবীন্দ্রনাথ থেকে উৎপল দত্ত। নাটকে কখনও রাজার বিরুদ্ধে, শাসকের বিরুদ্ধে বা রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্মমতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উঠে এল। শাসকের হাতে নাটক লাঞ্ছিত হল। চালু হয় নাট্য নিয়ন্ত্রণ আইন। তাই সর্বকালের প্রতিবাদের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে নাটক।
উত্তর- : নাটকের বিভিন্ন ক্ষেত্রেই এক্সপেরিমেন্ট হচ্ছে। নাটককে আধুনিক করতে এক্সপেরিমেন্ট চাই। এখন তো আঙ্গিকের সাথে অ্যাক্রোবেটিক্সও যুক্ত হচ্ছে। আমি সবসময় নাটকের 'বিষয়ের' উপর প্রাধান্য দিই এবং যতটা সম্ভব আমাদের চারপাশের ঘটনাকে গুরুত্ব দিই।
প্রশ্ন ঃ একাঙ্ক নাটক নিয়ে অনেক ধরণের এক্সপেরিমেন্ট হয়েছে ।
যদি খুব সোজাসুজি জানতে চাই, আপনি একজন নির্দেশক হিসেবে, দর্শকের সাথে কি ধরণের সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী ?
উত্তর : আমার নাটকে আমি সমাজ ভাবনাকেই প্রধান্য দিতে চেষ্টা করি। সেটি কখনো এপিকের ঘটনা থেকে তুলে আনি। যেমন আমার ‘পুস্পহার’ নাটক । কিংবা কোন সমসাময়িক ঘটনায় তুলে ধরার চেষ্টা করি যেমন আমার ‘ নীরাকে চাই’ নাটকটি । যেখানে নাটকের বিষয় নিয়ে দর্শকের মনে নতুন কোন আশার সৃষ্টি করতে পারে।
প্রশ্ন ঃ আপনি আগামিতে
নতুন একটি নাটক কেন করতে চাইবেন ? নাটক না-করে থাকতে পারবেন না, শুধু
কি এই কারণেই ?

No comments:
Post a Comment