কবি সেলিম মুস্তাফা ১৯৫৩ সালে অধুনা বাংলাদেশের সিলেট জেলার হবিগঞ্জের ভাদেশ্বর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমানে উত্তর ত্রিপুরা জেলার ধর্মনগরে স্থায়ী বসবাস। ১৯৭৪ সালে তাঁর প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়।এযাবৎ ছ’টি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে। একাধিক কবিতার কাগজ সম্পাদনা করে বর্তমানে ‘পাখি সব করে রব’ নামে একটি মাসিক কবিতাপত্র সম্পাদনা করছেন।
১। জানি আপনাকে এমন প্রশ্ন করা বোকামি,তবু
ইতিহাসের স্বার্থে সময় ও সামাজিক অবস্থানের প্রেক্ষাপটে
আগন্তুক তরণ কবিদের জানা উচিত আপনার কবিতা লেখার প্রেরণা কি ছিল ? আপনি ঠিক কি রকম মুহূর্তে
ভেবেছিলেন কবি হবেন, বা কবিতা লিখবেন
? সময়ের ব্যবধানে আজ একজন তরুণ কি ভেবে কবিতা
লিখতে আসছে বা প্রেরণা পাচ্ছে।এখানে একটা বোঝাপড়ার
দরকার মনে হয়। কবিতা লেখার তাগিদও কি সময়ের সঙ্গে পরিবর্তনশীল ? আপনাদের
সময়ের মানসিক, সামাজিক জটিলতা নিশ্চয়ই এখন থেকে অনেক সহজ ছিল। না-কি, জটিলতা
কোন–না-কোনভাবে ঘুরে ফিরে একই আবর্তে আবর্তিত ? ঘুরে ফিরে সেই প্রেম, ব্যর্থতা, হতাশা,না-পারার
বিভিন্ন যন্ত্রণা।
সেলিম মুস্তাফাঃ লেখার প্রেরণা তেমন কিছু ছিল বলে মনে পড়ে না। প্রথমে গান টান কিছু
লিখেছি, সুর দিয়েছি । কবি হব এমন কিছু ধারণা ছিল না ।শ'পাঁচেক কবিতা লিখে খাতা ভরিয়েছি প্রকাশ হবার আগেই। প্রথমে ছন্দ দিয়েই লিখতাম । জীবনানন্দ-এর কবিতা পড়ে ঘাবড়ে যেতাম । আমার কলেজের
বন্ধুরা বলত - ভাবিস না ছন্দ দিয়ে কবিতা লেখা আবার ফিরে আসবে । তবু ছন্দ ছাড়াই লেখার
চেষ্টা করতে লাগলাম । কৈলাসহরের মৃদুল বণিক (নামটা ঠিক বললাম কি না কে জানে) আমার প্রথম
গদ্য কবিতা ছাপেন । সম্ভবত জাটিঙ্গা নদী নিয়ে লেখা ছিল ওটা । গান লিখে নিজে সুর
দিয়ে নিজেই গাইবার চেষ্টা করতাম। আমার
গলা ভাল নয়। তবে অন্যরা আমার গান স্টেজেও গেয়েছে। বাবার পরোক্ষ প্রেরণা ছিলো। গান বাজনার চল ছিল আমাদের
পরিবারে। যন্ত্রপাতিও ছিল। পূর্ব
বঙ্গে থাকাকালীন আমাদের বাড়ির নিজস্ব যাত্রাদল ছিল। বাড়িতে
দুর্গা পূজার সময় যাত্রাপালা হতো বাবার নির্দেশনায় । ইণ্ডিয়াতে আসার পর এসব বাদ হয়ে যায় ।
তবে আমার মা খুব ভালো গান (গীত) গাইতেন ।
যাক এসব। কবিতা লেখার মত আরও নানান বিষয় আছে । কেউ তো ছবিও আঁকতে পারে । যেকোন কিছু করতে হলে, ওটার সঙ্গে অন্তত প্রাথমিক একটা পরিচয় থাকা
দরকার । কবিতা যদি কেউ পড়েই না, বা অন্য কাউকে পড়তেও দেখে না, তবে কবিতার প্রতি আগ্রহ কী করে জন্মাবে ? পরিবেশ তো জরুরী ব্যাপার ! তবে সকল লোকের পক্ষেই কবিতা বা গান বা অন্য কিছু করা সম্ভব
নয়, যদি না তাগিদ থাকে ভেতরে । কবিতা লেখার তাগিদ পরিবর্তনশীল নয় । যে লেখে সে যদি সত্যি কবি
হয় তো লাভ লোকসানের কথা না-ভেবেই লিখবে । কবি না হলে এক সময় লেখা ছেড়ে দিতে পারে । তবে
কাব্যচেতনা পরিবর্তনশীল । সামাজিক অবস্থার কথা ভেবে
কেউ কবিতা লেখা শুরু করে বলে মনে হয় না আমার । যদি কেউ লেখে, তা স্লোগান । তার উদ্দেশ্য কবিতা লেখা নয় । আর সময়-- সময়কে চিরকালই সকলেই খারাপ ভাবে । এটা একটা কথার কথা । ভালো সময় এলে সেটা কেউ মনে রাখে না । প্রেম ভালবাসা ঘৃণা হতাশা- এগুলো জীবনের মূল বিষয়, এগুলো এড়ানো যায় না ।আবার এগুলো বাদ দিলে আর
থাকে কী জীবনের ?
২। পূর্ববঙ্গ- বাড়িতে
যাত্রাপালা, দুর্গাপুজা, বেশ এলাহী পরিবার ছিল বলা যায় তাহলে!তারপরও ভারতে আসা হল কি সেই চিরাচরিত নিপীড়নের অংশ হয়েই
? আপনার বড় হওয়া তো যতদূর জেনেছি দরিদ্রতার সঙ্গে মেলেমেশা করেই । মেসোমশাই তো হোমিওপ্যাতি
প্র্যাকটিস করতেন। সেই সব সংমিশ্রণের উত্থান-পতনের কথা কিছু কি
বলবেন ?
সেলিম মুস্তাফাঃ পূর্ববঙ্গে আমাদের অবস্থা খারাপ ছিল না । নিপীড়নের ব্যাপার ছিল না, তবে হয়ত ভবিষ্যতের নিরাপত্তার কথা ভেবেই একজন দু’জন করে আমরা ইণ্ডিয়ায় চলে আসি । সব শেষে আসেন বাবা আর আমার দিদিদের মধ্যে সবচেয়ে ছোটজন । ধর্মনগরেও আমাদের বিষয় কম ছিল না, তবে সেটা ছিল আমার বড় ভাইয়ের নামে । কারণ সে ছিল ইণ্ডিয়াতে আমাদের প্রথম সদস্য । তাই ১৬ কানি সম্পত্তির সবটাই তার নামে কেনা হয় । আর বিপদটা ঘটে এখানেই- আমরা কেউই এই
সম্পদের সুফল পাইনি, এমনকি আমার বাবাও না । বাবাকে প্রায় বিনা চিকিৎসায়ই এ পৃথিবী ত্যাগ করতে হয় । বাবার ডাক্তারীর পসার জমানোর আর বয়স ছিল না। ইণ্ডিয়াতে এসেই কিছুদিনের মধ্যে এক ছেলেকে হারাতে হল । চাকুরিজীবী ছেলে । আমার বড় ভাই (মেজো) । তখন সে কদমতলা স্কুলে চাকুরি করতো ১৯৭০-এর ২৬শে ডিসেম্বরে ‘মায়া সিনেমা’হলের সামনে তার পিঠে ছুরি মারে আততায়ী । সম্ভবত দেবী প্রসাদ পুরকায়স্থের চার আদর্শ-শিষ্য- দিলীপ নাগ, প্রমেশ মালাকার, রাখু সোম । যার কথায় এরা এই কাণ্ডটি ঘটায় সে লোকটা হল নির্মলেন্দু ধর ।
ব্যস, এরপরই আমাদের দুর্দশা শুরু হল। বাবাও ধীরে ধীরে অসুস্থ হতে লাগলেন । আমাদের অবস্থাও অবনতির দিকে গড়িয়ে গেলো । বিবাহিত দুই বোন সাহায্য করতে লাগল অল্প করে । সবার বড় ভাই টাকা পাঠাতেন অনিয়মিত ভাবে । বাবার রোজগার দু টাকা পাঁচ টাকা । আমরা চারজন । আমি বেকার । কলেজে পড়ি কিন্তু মন নেই । ডাক্তারী পড়ার কথা ছিল । বড় ভাই বললেন, তার ছেলেকে পড়াবেন, খরচ দিতে পারবেন না। জায়গা বিক্রি করার উপায় নেই । জায়গা বড় ভাইয়ের নামে।
৩। “ আমার ভাইকে ওরা এখানেই খুন করেছিল,
ওরাও ভাই, আমার না-হলেও
অন্য কারুর ,
ওরা বাড়ি ফিরে যাবার পর
ওদের ভাই জিজ্ঞেস করেছিল ঃ
দাদা ,এ কি করলি !
ওরা ওদের ভাইয়ের মুখের দিকে
তাকিয়েছিল,
ওরা ওদের ভাদের বলেছিলঃ
রুপু , সোনা , খোকন!
কাঁদিস না, আমি বুঝতে
পারিনি ...
আমিও বুঝিনি, আমি এখনো বুঝতে পারছি না
এই ঘটনায় আমি কোন চরিত্র কি
না,
বিব্রত নাট্যকার আমার মুখে
কোনও সংলাপ
দিতে পারছে না, একা-একা
নিজে নিজে খুন হয়ে যাচ্ছি।
(একা গ্রিনরুমে একা একা)”
কবিতাটা সাথে সাথে মনে পড়ে
গেল। ‘ছোরার বদলে একদিন’ কাব্যগ্রন্থ’এ প্রকাশিত হয়েছিল ফেব্রুয়ারী ১৯৮৪ সালে। এই কবিতায় আপনাকে এক নৈর্ব্যক্তিক আবেগময়
অবস্থানে দেখতে পাই। এবং খুব নাটকীয় মোড় আসে যখন আপনি নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করেন,
‘আমিও বুঝিনি, আমি এখনো বুঝতে পারছি না/ এই ঘটনায় আমি কোনও চরিত্র কি না!’ কবিতাটার
ভিতর দিয়ে ঘটনাকে আপনি সার্বিক ভয়ংকর এক মানবিক সংকটের দিকে নিয়ে গেলেন । আমার
প্রশ্ন ঘটনার এত বছর পর এখনো কি আপনি তেমনই বিব্রত ? সেই সংকট কি এখনও
সমানভাবে বিদ্যমান ? এখনও কি একা একা মননের অন্তরালে ভাবেন, বিচারের বাণী
নীরবে নিভৃতে কেন গ্রিনরুমে কাঁদে ? না, সমাজের একটা অংশ চিরদিনই এভাবেই কেঁদে যায়
? এটাই তাদের ভবিতব্য ?
সেলিম মুস্তাফাঃ হ্যাঁ, আমি এখনও ঐ রকমই ভাবি । ওটা শুধু আমার জীবনে নয়, আমাদের পুরো গোষ্ঠীর কাছে একটা বিশাল ঘটনা ছিল, আজও আছে । কারণ সে ছিল আমাদের বংশে সকলের কাছে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি, অত্যন্ত ভদ্র অত্যন্ত শান্ত এবং শিক্ষিত । যে বড় আওয়াজে কথাও বলে না । খুনীরা আমার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টাও করেছে । আমি উৎসাহ পাইনি । রাগও করিনি । সব তো আমার আশেপাশেরই লোক !
সম্ভবত তাই। ওরা সন্দেহের অবকাশে (Benifit of doubt) মুক্তি পেয়ে যায়। ৩ জনের মধ্যে কে ছুরি মেরেছে প্রমাণ হয়নি বা প্রমাণ করা হয়নি। আমার ভাইয়ের জবানবন্দি রেকর্ড করা ছিল। সেটা তখনকার এস ডি ও গায়েব করে দেন । এস.কে. নন্দী সম্ভবত নাম । মনে নেই। আমার সাইকেলটা থানাতে যে নিল আর দিল না । ২৬ ডিসেম্বর ছুরি মারে,২৭ ডিসেম্বর কৈলাসহরে মারা যায়। সঙ্গে আমার মা আর এক দিদি ছিলেন । দেবিপ্রসাদ লাশ আনতেও মানা করেছিল । বলে ,গাড়ি পাবেন না । মা বলেন- আমি ছেলেকে ঠেলা গাড়ি করে হলেও বাড়ি নিয়ে যাব । সে অনেক কাহিনি । এস.কে.নন্দী নামটা ভুলও হতে পারে । তবে নন্দী ছিল টাইটেল । শুনেছি ওর ছেলে বারবেল করতে গিয়ে পড়ে মারা যায় । আমার ভাই সবার নাম বলে গিয়েছিলো। বলেছিলো ওদের যেন শাস্তি না হয় । পরে ওরা আমার ভাইএর নামে অনেক কুৎসা রটনা করে ।
৪। থামলেন কেন?
সেলিম মুস্তাফাঃ থাক সে সব কথা। আজ
আর বলে কি লাভ?
৫। থাক, কেন সে সব কথা? একজন কবিকে বুঝতে গেলে তার জীবনের
নিষ্ঠুর দুঃখগুলোও জানা দরকার!
সেলিম মুস্তাফাঃ আমার ভাই স্কুলে ছাত্রদের কাছে খুব প্রিয় ছিল। তারা যখন খবর পায় কদমতলা থেকে সাইকেল চেপে দলে দলে চলে আসে ধর্মনগর, এখানে এসে খবর পায় তাকে কৈলাসহর নেয়া হয়েছে, তখন তারা সাইকেলেই কৈলাসহর চলে যায় । আমার কাছে এ ঘটনা অভূতপূর্ব । যাই হোক ভাইয়ের লাশ শেষ পর্যন্ত এলো বাড়িতে । বাড়ির সামনের বেড়া কারা যেন খুলে দিল । শহর থেকে মিছিল করে এলেন শিক্ষকরা । ছবি তোলা হলো । সেই ছবি আমরা স্টুডিও থেকে আনতে পারিনি টাকার জন্য । মাস্টারমশাইরা একে একে সরে গেলেন যার যার পথে । ভাইএর মহাধমনীতে ছুরির ফলা ঢুকে যাওয়াতে রক্ত দেয়া হলেও তা আটকাতো না। ধর্মনগরের ডাক্তার ওয়াদ্দেদার তখন ছুটিতে ছিলেন । ডাঃ সোম আমার ভাইকে দেখেন, কিন্তু কিছু বুঝতে না পেরে শুধু পিঠে সামান্য একটা চেরা কাটা দেখে ব্যাণ্ডেজ করে দেন, ভেতরে তখন রক্তক্ষরণ হচ্ছিলো । চোখ সাদা হয়ে যেতে দেখে প্রাইভেট ডাক্তার মাখন লাল দাস চৌধুরীকে নিয়ে আসা হয় । তিনি এসে চোখ দেখেই বললেন এখানে হবে না, কৈলাসহর নিতে হবে। রাত দুটোর সময় কৈলাসহর পাঠানো হয় এম্বুলেন্সে করে । যাবার সময় খুব যন্ত্রণা হয়, বার বার গাড়ি থামাতে বলে । এত রাত্রে রক্তের ব্যবস্থা করতে না পেরে ডাক্তাররা তারই শরীর চিরে চিরে রক্ত নিয়ে পুশ করেন । কিন্তু মেইন আর্টারী ছিদ্র থাকায় সেই রক্ত আবার বেরিয়ে যেত । সকাল ৮টার সময় মারা যায় । খুনিরা আজও বহাল তবিয়তে আছে ।
৬। যদি কিছু মনে না করেন, তাহলে আমার খুব জানতে ইচ্ছে
করছে, এই সব যন্ত্রণার কথা, বিশেষত্ব ‘বড় ভাই সম্পর্কিত’ যা অত্যন্ত ঘরোয়া অথচ
সাংঘাতিক মর্মান্তিক । আমি জানতে চাইছি,
আপনার কবিতায় সম্পর্কের এই নির্দয় টানাপোড়েন খুব একটা দেখতে পাওয়া যায় না কেন ? অথচ আপনি এই যন্ত্রণা
যাপনের ভিতর দিয়েই বড় হয়েছিলেন। এখনও হচ্ছেন ।
সেলিম মুস্তাফাঃ হ্যাঁ । ভাইয়ের এপিসোড ক্রমশ সচেতনতা দিয়ে এড়িয়ে গেছি । কারণ এর মূল্য আমার কাছে যতখানি, অন্যদের কাছে ক্রমশ তা ফিকে হয়ে আসে । এটার উল্লেখও আমি এত বেশি করেছি যে, আর করলে তা সহানুভূতি পাবার হাতিয়ার ভাববে অন্যরা । দুঃখের প্রকৃত জায়গা যার যার মনের ভেতর । সকলেরই দুঃখ আছে । নিজের কাছে রেখে এর থেকে সম্মানের সঙ্গে শিক্ষা নেয়াই সঠিক মনে হয় ।
৭।কেন ঘটনাটা ঘটেছিল, তাঁর কিছু আভাস
পেলেন ? আমি খবর নিয়ে কিছু কানাঘোষা শুনলাম, তাতে মনে হল প্রেম সম্পর্কিত কিছু ছিল যেন ? আবার আরেকটা
খবর পেলাম সেটা সাজানো হয়েছিল, ঘটনাটাকে অন্য দিকে মোড় দেবার জন্য । প্রকৃত ঘটনাটা ঠিক কি ? আপনি কিছু খবরাখবর নিয়েছিলেন ? প্রেম তো থাকতেই পারে ?
সেলিম মুস্তাফাঃ না,
প্রেম ছিল না । তার তো বিয়ে প্রায় ঠিক
হয়েই রয়েছিল । প্রেম বলতে এখনকার দিনে তোমার যা মনে হয়, সে-সময় এত সহজ বা
সম্মানজনক ছিল না । আমার ভাইয়ের পক্ষে তো অসম্ভবই ছিল । যেমন আমার জন্য মার্বেল
খেলা বা পথে আড্ডা দেয়া নিষেধ ছিল । পরিবারের পক্ষে তখনকার দিনে সামাজিক
মূল্যবোধটা খুব বেশি গুরুত্ব পেতো । তা ছাড়া সে একজন শিক্ষক হিসেবে অত্যন্ত
সম্মানজনক একটা অবস্থানে ছিলো । তার খুনের ঘটনার পর সাইকেলে চেপে দলে দলে
ছাত্রদের কৈলাসহর চলে যাওয়া থেকেই ব্যাপারটা অনুমান করে নিতে পার।
ঘটনাটা ছিলো অন্যরকম । ভাইয়ের এক সহকর্মী
ছিলেন নিখিল চক্রবর্তী । আমার ভাইয়ের ডাকনামও ছিল নিখিল । তাই ঘনিষ্টতা ছিল বেশি ।
এরা দুজনের সঙ্গে ব্যাডমিন্টন খেলছিলেন
আরো দুজন, যাদের একজন নির্মলেন্দু ধর । ফ্লাওয়ারটা (কর্ক) পুরোনো বলে একজন ছাত্রকে
পাঠানো হয়েছিল বাজারে নতুন কর্ক আনার জন্য ।
নির্মলেন্দু পুরোনোটাই বার বার নিখিল চক্রবর্তীকে সার্ভ করছিলেন, কিন্তু
নিখিলবাবু সেটা ফেরত মারছিলেন না । এই করে তর্কাতর্কি, এবং শেষ পর্যায়ে গালাগালি ।
তখন আমার ভাই মাঝখানে কথা বলেছিলো। নির্মলেন্দুকে বলেছিলো- ‘আ রে মশাই, ভদ্রভাবে
কথা কন না !’ তখন নির্মলেন্দু বলে- ‘ধর্মনগর যাও, ভদ্রতা শিখাইমু !’
এর পর সকলে মিলে আপসে এই ঘটনার আপস
মীমাংসা হয়, করমর্দন হয় । সবে মিটে যায় । কিন্তু এর একমাস পরে ঐ খুনের ঘটনা ঘটে । নির্মলেন্দু তার পিসতুতো ভাই রাখুকে
নিযুক্ত করে আমার ভাইকে অপমান করার জন্য । অপমান করতে গিয়ে ওরা খুনই করে ফেলে । ঘটনার রাতে, যখন ওরা মায়া সিনেমা হলে সিনেমা
দেখে রাত ন’টার সময় বেরিয়ে আসেন তখন আমার
ভাইয়ের সঙ্গী ছিলেন আরেক শিক্ষক, নয়াপাড়ার অধীর কর্মকার । সিনেমা হলের সামনের
চৌমুহনীতে ঘটনাটি ঘটে প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যে
। তখন কর্মকারমশাই সঙ্গে ছিলেন না । হঠাৎ গায়েব হয়ে যান । মনে হয় যোগসাজস ছিল
অপরাধীদের সংগে । তিনি কোর্টে বলেছেন, তখন তিনি প্রস্রাব করতে গিয়েছিলেন । ভাইয়ের
ডানহাতে সাইকেল ছিল । ওরা এসেই ভাইকে
ধাক্কা দিয়ে ড্রেনের পাশে ( এখন যেখানে আমরা স্কুটার সাইকেল পার্ক করি, এর আগে
এখানে চানাচুর বিক্রি হতো) কাঁটাতারের ওপর । পিঠে কাটাতার, বুকের ওপর সাইকেল । তারপরো সে উঠে দাঁড়ায় আর
সজোরে লাথি মারে সামনেরটাকে । সেটা ছিটকে গিয়ে পড়ে
দূরে । তারপর ভিড়ের মধ্যেই কেউ তার পিঠে ছোরা ঢুকিয়ে দেয়, যা প্রথম আধ ঘণ্টা টেরই
পাওয়া যায়নি । স্প্রীং দেয়া ছোরা । পিঠে লাগিয়ে লিভার টিপলেই সোজা ভেতরে ঢুকে যায়
। ছোরার ডগাটা ভেতরে ঢুকে গিয়ে মহাধমনীও স্পর্শ করে ফেলে, যেখানে রক্তপতন বন্ধ
করার কোন উপায় ছিলো না। এ ঘটনা ২৬শে ডিসেম্বর ১৯৭০, শনিবার রাত ৯টার
পর । পরদিন ২৭শে ডিসেম্বর সকাল ৮টায় আমার ভাই মারা যায় কৈলাসহর হাসপাতালে । ভাই
ধর্মনগর হাসপাতালে থাকতেই তার জবানবন্দি রেকর্ড (ক্যাসেট) করা হয় , যা বিচারের সময়
পাওয়া যায়নি । সে সকলের নাম বলে যায় । বলে
কারোর কোন শাস্তি যেন না-হয় । মানুষ মৃত্যুর কথা হয়তো টের পেয়ে যায় আর তখন কোন
প্রতিশোধস্পৃহা আর থাকে না মনে হয় ।
১৯৭১-এর মার্চে আমার হায়ার সেকেণ্ডারী
পরীক্ষা । দিতে চাইছিলাম না। কিন্তু সবাই চাপাচাপি করাতে দিলাম । রেজাল্ট ভালো হল
না। হাইয়ার সেকেন্ড ডিভিশন । আগরতলায় গেলাম । এক দূর সম্পর্কের কাকা এগ্রি বি এস.সি-তে সুযোগ করে
দেবেন বলেও দিলেন না । তারপর কৈলাসহর রামকৃষ্ণ
মহাবিদ্যালয়ে পিওর সায়েন্স নিয়ে ভর্তি হলাম । শেষ হলো না । পার্ট ওয়ান, পার্ট টু দুটোতেই থিয়োরীতে ফেল
প্র্যাক্টিক্যাল-এ পাশ । ৫ নং আ ৬ নং-এর জন্য ফেল । আর পড়িনি । কলেজ লাইব্রেরীতে পেয়ে
গেলাম জাগরণ পত্রিকার সাহিত্যের পাতা ,
সেই শুরু । আজো চলছে ।
৮। আপনার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ বাহান্ন তাসের পর’ যা মূলতএকটি দীর্ঘ কবিতা
। শুনেছি, আপনার বন্ধুবান্ধবরা চাঁদা তুলে
প্রকাশ করেছিল। ভাবতেই কেমন অবিশ্বাস্য
মনে হচ্ছে। কিভাবে সম্ভব হল ? তারা কি সেদিন কবিতাকে ভালবেসেছিল, না, আপনাকে ? পেছন
ফিরে সেই সময়’টাতে আমাদের একটু নিয়ে যাবেন ?
সেলিম মুস্তাফাঃ কবিতাকে
হয়তো ততটা নয়, যতটা আমাকে । তবে এই নির্দিষ্ট কবিতাটিকে সকলেই ভালবেসেছিল এ কথা বলতে পারি এবং কবিতার প্রতি সকলেরই ভালবাসা জেগে উঠছিলো তখন । তা ছাড়া এত বড় একটা কবিতা সকলের অভিজ্ঞতাতেই এই প্রথম
এলো-- সেটাও একটা বিষয় বটে । এর প্রধান কারিগর রবীন্দ্র দেবনাথ, সহযোগী বিকাশ পাল, সন্তু চক্রবর্তী, জগন্ময় দে, কল্যাণব্রত সোম, সুদীপ ভট্টাচার্য, শ্যামল ভট্টাচার্য (এখন প্রয়াত), রীতা ভট্টাচার্য এবং আরো অনেকে। প্রধান প্রেরণাদাতা অধ্যাপক সুব্রত দেব ( এখন বেহালা, কলকাতা , সম্প্রতি ইনি বেহালা থেকে যোগাযোগ করেছেন, আমার লেখা নিয়ে ছাপিয়েছেন ওখানের একটি কগজে, যার নাম 'শ্লোক'। যাক, ওটা বেরোনোর পর সকলে দল বেঁধে বিক্রি করেছিল । 'সোনিক অর্কেস্ট্রা' ছিল এই সকল কাণ্ডের পেছনে।এরপর সকলেই প্রায় লিখতে শুরু করে -- সন্তু, বিকাশ (বিকাশ এখনো লিখছে) জগন্ময়, সকলেই কম বেশি লিখেছে । রবিও লেখে মাঝে মাঝে । সে তো 'রোদবৃষ্টি' নামে কাগজও বের করে।
৯। 'সোনিক অর্কেস্ট্রা' এবং রবীন্দ্র দেবনাথ, প্রসঙ্গ আসতেই মনে পড়লো আপনারা কয়েকজন বোধহয় এর সাথে
ভীষণভাবে জড়িয়ে ছিলেন। বর্তমান ‘ভাবা মেডিকেল’ এর পাশে বা উপরে আপনাদের অফিস ছিল। সেই সময়ের কথা যদি কিছু
বলেন ? ধর্মনগরের সাংস্কৃতিক পরিবেশ তখন কি রকম ছিল ?
সেলিম
মুস্তাফাঃ হ্যাঁ, ভাবা মেডিকেল-এর ওপরে ছন বাঁশের ঘর বানিয়ে তা'তে শুরু হয়েছিল 'সোনিক মিউজিক ইন্সটিটিউশন' । প্রেসিডেন্ট নলিনী দা, ভাইস প্রেসিডেন্ট অরুণ দা, সেক্রেটারী আমি, রবি ক্যাশিয়ার, বাকিরা সদস্য । সেটা ১৯৭৭ সাল। সোনিক অর্কেস্ট্রা'কে শক্তিশালী করার জন্য এই কলেজের জন্ম ।ধর্মনগরে লখনৌ ইউনিভার্সিটির কোন গানের কলেজ এর আগে ছিল না । যা ছিল সেটা এলাহাবাদ ইউনিভার্সিটির । লখনৌ ইউনিভার্সিটির কলেজ ছিল করিমগঞ্জে , শিলচরে আর কৈলাসহরে । আমরা যোগাযোগ করলাম । তারা বিরক্ত হলেন। করিমগঞ্জের লোকটি তো মানা-ই করে দিলেন । আসলে ধর্মনগর থেকে সবাইকে মানা করে দেয়া হয়েছিলো আমাদের সাহায্য করতে । আমরা শেষ পর্যন্ত লখনৌ-এ যোগাযোগ করি। প্রচুর চিঠিপত্র লিখতে হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত (খুব সম্ভবত) নীলরতন বন্দ্যোপাধ্যায় তখনকার দিনে রেডিওতে খবর পাঠক প্রশান্ত বন্দ্যোপাধ্যায় ( আবার তবলার গ্রামার বইএর লেখক) -এর পিতা । একদম বুড়ো মানুষ, কিন্তু গলার আওয়াজ বাঁশির মত সুরেলা। তিনি কৈলাসহরে পরীক্ষা নিতে আসার পথে আমাদেরটা দেখে রিপোর্ট করে দেন । তারপর আমরা এফিলিয়েশন পাই । তিনি এসেই সব দেখে একেবারে মুগ্ধ হয়ে যান। বলেন -তোমাদের এটা তো একেবারে আশ্রমের মত সুন্দর । তখন আমার কবিতা চর্চার ৪ বছর হয়ে গেছে। গানের পরীক্ষার ব্যাপারে কৈলাসহরে যাই রবির সঙ্গে। সাথে 'বাহান্ন তাসের পর' নিয়ে যাই রবির পরামর্শে সুব্রত দেব স্যরকে দেখবার জন্য । তিনি শুনে বলেন- এটা কী হয়েছে জানি না, তবে একটা দারুণ স্পীড আছে, তুমি এটা ছাপিয়ে ফেলো । ব্যস, রবি এসেই সবার সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে ছাপিয়ে ফেলে। খরচ ২০০ টাকা। সব রবি দেয় । অবশ্য সকলে মিলে বিক্রি করে টাকা তুলে ফেলে প্রায় । ঐ কলেজে আমরা ক্লাশ শেষ হলে নিজেরা গান বাজনা করতাম। রবি ধর্মনগরের প্রথম গীটারিস্ট। বিকাশ পাল ড্রামসেট বা পিয়ানো একোর্ডিয়ান, বাবু (রবির ভাগ্নে সম্ভবত) কঙ্গো বঙ্গো, দেবাশিস ম্যাণ্ডোলিন, সুদীপ ভট্টাচার্য আর কল্যাণব্রত সোম বাজাতো তবলা । আমিও তবলা, ম্যারাকাস, বা গীটার বাজাতাম। আমাদের সঙ্গে বর্তমানে স্টুডিও রক্সি-র মালিক সনৎ, এবং আরো কয়েকজন ছিল। গায়িকা ছিল টুলটুল । আমাদের কলেজের ছাত্রছাত্রী একসময় ছিল প্রায় ৩০০ জন । এটা একটা গানের প্রতিষ্ঠানের জন্য মস্ত ব্যাপার । এটা ১৯৭৭ সাল এবং পরের কথা । এটা বলার কারণ, আমরা যখন গান বাজনা করতাম, তখন মাঝে মাঝে অর্কেস্ট্রার সঙ্গে মিলিয়ে কবিতাপাঠও হত। কবিতার সঙ্গে বিশেষ করে ড্রামসেট বাজানো হত। কখনো একটা ঈজিপ্সিয়ান মিউজিক এস পি রেকর্ড বাজানো হতো।
১৯৭৪ সালের শেষ বা ১৯৭৫-এর শুরু থেকে দীপক চক্রবর্তী, দীপক দেব, কিশোর রঞ্জন দে সহ আমরা পাবলিক লাইব্রেরীতে বিকেলে মিলিত হতাম ।বই নিয়ে নেবার পর আমরা রাস্তায় বেরিয়ে যেতাম । দীপক দেব কবিতা (যা হয়ত কিছুক্ষণ আগে দেশ'-এ পড়ে এসেছি) বলত আর ব্যাখ্যা করতো । বা নিজেদের লেখা নিয়ে নোয়াখলী স্টলে চলে যেতাম । সেখানে সবার পকেট ঝেড়ে পয়সা যোগাড় করে কিশোর সিঙাড়া-র অর্ডার দিতো। কখনো আমরা আমরা স্পেশাল বাটি চা' খেতাম। আমাদের সঙ্গে গৌরা পাল নামে একজন থাকতো সবসময় । সে কবিতা লিখতো না, বা ততটা রসও পেতো না । কিন্তু আমাদের সঙ্গ দিত নিয়ম করে । এখন তাকে আর পাই না ।
১৯৭৬ সালে পীযূষ দা আসার পর বি. বি. আই. তে প্রতি মঙ্গলবার সন্ধ্যায় টীচার্স কমন রুমে আমাদের আড্ডা বসতো। প্রত্যেকে ৩টে করে লেখা আনতেই হতো। বেশি আনলে সবার শেষে আবার বাকিগুলো পড়া হতো। কখন প্রায় ৩২ জন কবি সেখানে নিয়মিত/ অনিয়মিত ভাবে আসতেন। এই আড্ডার মুখপত্র হিসেবে ' যখন যেমন' নামে ৪ পৃষ্টার কাগজ বেরোয় মাসে মাসে । আমরা কবিতা বা সাহিত্য নিয়ে প্রচারও করতাম। রিক্সায় মাইক লাগিয়ে বিভিন্ন বক্তব্য রাখা হতো, স্লোগান দেয়া হতো। ছেলেমানুষী মনে হয় এখন, কিন্তু আমরা করেছি। 'বোঝার জন্য হাজার আছেন, যিনি লেখার তিনিই লেখেন' ইত্যাদি । এরপর আমি আর বিকাশ দেবরায় মিলে 'গাণ্ডীব' নামে কাগজ করি। এটা করতে গিয়ে আর্থিক অনটনেও পড়তে হয় । ১৯৭৭ সালে সোনিক-এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ি। সাহিত্য আর গান বাজনা চলতে থাকে।
১০। সে সময় বোধহয় প্রদীপ চৌধুরী’ও ছিলেন ধর্মনগর ?
সেলিম মুস্তাফাঃ না, প্রদীপ চৌধুরী ১৯৭৮ সালে এখানে বদলি হয়ে আসেন । আমরা দেখলাম আমাদের চিন্তা ভাবনার সঙ্গে তাদের চিন্তা ভাবনা মিলে যায়। আমাদের চিন্তা ভাবনা স্বতোৎসারিত । কোন পূর্ব পাঠ ছিল না। প্রদীপও আগরতলা থেকে আমাদের নাম শুনে এসেছেন, পরিচয় হল । আমি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ও আলোচনায় নতুনের খোঁজ পেলাম । প্রদীপ সব সময় জীবন নিয়ে কথা বলেন, কবিতা বা কোন লেখা নিয়ে নয় । যা বলেন জীবনের সঙ্গে তুলনা করে, ভবিষ্যতের সঙ্গে সম্ভাব্য তুলনা করে কথা বলেন । কিছুই অস্বীকার করেন না । জীবন যে রকম, লেখাও সেরকম । তবে শব্দ সম্পর্কে অত্যন্ত স্বাভাবিকতা বজায় রাখতে বিশ্বাসী । আমরা আসলে আরোপিত শব্দ বসাই । কবিতা লিখতে গেলেই শব্দের স্বাভাবিকতা আমরা বর্জন করে ফেলি। স্থান কাল পাত্র ভেদে অত্যন্ত স্বাভাবিক শব্দটি চয়ন করা আসলেই খুব কঠিন । পরিষ্কার দৃষ্টিভঙ্গি না থাকলেই আরোপিত শব্দ এসে যায়, আমরা টের পাই না । প্রদীপের ভাষা তাই খুব সরল কিন্তু স্বাভাবিকতা নিয়ে অত্যন্ত ঝকঝকে । তিনি ২ বছর এখানে ছিলেন । আমার কবিতার একটি শব্দও পাল্টাতে বলেন নি কখনো । কিন্তু আমার নজরের কুয়াশা কাটিয়ে দিতেন একটি বা দুটি কথায়। আমার বিশ্বাস জীবন সম্পর্কে তাঁর নিজের ধারণা অত্যন্ত পরিষ্কার থাকাতে এটা সম্ভব হতো । জীবন সম্পর্কে সত্য উপলব্ধিটাই একান্ত নিজের ভাষায় লিখে ফেললে একটা লেখা হয়ে যায়, কোন মশলার প্রয়োজন পড়ে না । আমার লেখার কখন প্রশংসা করেননি, শুধু যেদিন ধর্মনগর ছেড়ে চলে যান, সেদিন বাসে ওঠার সময়, বাসের পা দানিতে এক পা রেখে মুখ ঘুরিয়ে বললেন-‘ লিখে যান, আপনার
হবে ।’
এবার একটু আগের কথা বলি । কৈলাসহর রামকৃষ্ণ মহাবিদ্যালয়ে আমাকে ভর্তি করে দিল আমার দিদি । দিদি তখন চাকুরি করতো । এই দিদি আমাদের বাড়ির মূল গায়িকা । পরে এক গায়ক ও সঙ্গীত শিক্ষকের সঙ্গেই তার বিয়ে হয় । ঐ দিদি সাকাইবাড়ি স্কুলে চাকুরি করার সময় আমার জন্য স্কুল থাকে গল্পের বই নিয়ে আসতো। বিশ্বসাহিত্যের কিশোর সিরিজ- পিরামিড সিরিজ। আমি সব পড়ে ফেলেছি । ঐ পিরামিড সিরিজ থেকেই আমার প্রথম ছদ্মনাম রেখেছিলাম- পিরামিড, যা পীযূষ রাউত পছন্দ না করায় আমার কোন লেখা তখন ছাপেননি । দীপক দেবরা-ও জানতো এই নাম । ফলে লেখাগুলো কেমন হচ্ছে বুঝতে পারতাম না। পরিচিত লোকের লেখার ওপর কেউ সঠিক মন্তব্য করে না । কলেজে ভর্তি হবার পর কলেজ লাইব্রেরীতে একদিন দেখলাম 'জাগরণ' কাগজে ছোটদের সাহিত্যের পাতা। পরে দেখলাম বড়দের জন্যও আছে, প্রতি বুধবারে। প্রথমে ছোটদের বিভাগে পাঠাতে শুরু করলাম । ছাপা হতো । ছড়া । যোগাযোগ হল । সেটা কিন্তু ১৯৭২-৭৩ সাল। বা ১৯৭৪-ও হতে পারে, সঠিক মনে নেই। তখন ধীরে ধীরে এত লেখা পাঠাতে শুরু করলাম যে ওরা (মানস পাল,নকুল রায়) আমার জন্য একটা আলাদা ফাইল তৈরি করেছিলো । আমার মিনি একটা গল্প বড়দের বিভাগে প্রথম ছাপা হয়। সেটার নাম ছিল ‘-ত্রাস’ । সেদিন আমাকে আর পায় কে । সেদিনের আনন্দ আজ আর নেই। এর পর আরো গল্প লিখেছি। একদিন নকুল রায়ের চিঠি পেলাম- ‘আপনি একটা ভ্রমণ কাহিনি লিখুন।’ আমার ভ্রমণ তো তখন মাত্র ধর্মনগর থেকে কৈলাসহর । প্রতি সপ্তাহে যাওয়া আসা করি । তাই লিখে পাঠিয়ে দিলাম। ছাপা হল। এরপর চিঠি এলো, ‘আপনার কবিতা হবে । কবিতা লিখুন ।’ সেই শুরু। ওরাই আমার প্রথম গুরু।
এর পর আমি আরো দুটো গল্প লিখি যা দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত হয়। আমার সব গল্পই ছিল মনোলগ । মিনি গল্প। পীযূষ দা ফেরত দিলেন ছদ্ম নামের কারণে । কৈলাসহর ফিরে গিয়ে নিজের নাম পাল্টালাম । সেলিম মুস্তাফা । দৈনিক সংবাদ একই দিনে ছাপলো দুটো গল্প । হেডিং ছিল- সেলিম মুস্তাফার দুটি গল্প। একটা গল্পের নাম মনে আছে- ‘বাবার মত লোকটা।’ওরা আমাকে তো চিনতোও না। এর পর মানস ' সৈকত' বের করতে শুরু করে । টেলিপ্রিন্টার নিউজ শীটের এক দিক সাদা থাকে, লম্বা রোল। ওটাকে কেটে কেটে এ-৪ সাইজ করে সাদা পৃষ্ঠায় ৬ পয়েন্ট টাইপে কবিতার কাগজ। সেটা জাগরণের হকার আমার কাছে পৌঁছে দিতো। সেখানে সেলিম মুস্তাফা নাম দেখতে দেখতে একদিন দীপক, কিশোররা আবিষ্কার করে ফেললো আমাকে । যাই হোক এরকম চলতে লাগলো । কিন্তু আমি তো বেকার । বাবা মারা যান ১৯৭৮ সালে । প্লুরিসি-তে। এটা ক্ষয় রোগের পূর্বাবস্থা । আমাকে বেকার অবস্থায় আমার বন্ধুরা খুব সাহায্য করেছে। রবি, সন্তু, বিকাশ, সুদীপ কল্যাণ শ্যামল, আরো কতজন। এমন কি রবি আমাকে লেখার জন্য কাগজও দিয়ে দিতো । বিড়ি খেতাম, তা-ও সন্তু কিনে দিতো । সন্তু আমার স্যান্ডেলে পিন-ও মারিয়ে দিতো তার বন্ধুর মত এক মুচির দোকানে । তার নাম অশোক ঋষিদাস (বা রবিদাস-ও হতে পারে) । সে এখনো আছে কংগ্রেস ভবনের সামনে। আমি এখনো যাই তার দোকানে মাঝে মাঝে, কাজ না থাকলেও যাই। সে আমারো বন্ধু এখনো। তখন পিন মারতে দশ পয়সা লাগতো। সেটাও বাকিতে । এসব আমি জীবনে কখনো ভুলতে পারবো না । বাবা মারা যাবার কারণ খাদ্যাভাব । অভ্যস্থ খাবার সহসা কমে গেলে ক্ষয় রোগ হয়। আমার বড় ভাই সেটা বুঝলেন না। আউট অব সাইট আউট অব মাইণ্ড, একটা কথা আছে । তাই হয়েছে । বড় ভাইকে আমি সারা জীবনে ৩/৪ বার দেখেছি মাত্র । আসামে নগাঁও-এর সালানা চা-বাগানে থাকতেন। দুবার আমি গিয়েছি মা-র সঙ্গে। একবার ১৯৬৪-এ। ওখানে গিয়েই রেডিওতে শুনলাম জহরলাল নেহেরু মারা গেছেন । এর পরের বছর সম্ভবত ধর্মনগরে রেল আসে। তখন রেলে ডাকাতি হত বাতি নিবিয়ে, আসাম এলাকায়। কদিন আগেও হয়েছে শুনেছি । তবে মনে হয় এই গ্যাং পুলিশ ধরে ফেলেছে।
আমার প্রকৃত বন্ধুরা সব আমার জুনিয়র । তাদের মধ্যে অশোক সাহাও আছে । বাজারে এদের বড় হোল্সেল্ দোকান আছে । সে খুব ভালো মাউথ অর্গ্যান বাজায় ।
আমার যে ভাই খুন হল , সে-ও বড় ভাই-এর খুব পছন্দের ছিল না । আমি আর আমার ছোটদিদি (আমার থেকে বছর পাঁচেকের বড়) দুজনে মিলে যুক্তি করে বহুবার বড় ভাইকে লিখেছি জায়গা কিছু বিক্রি করে দিয়ে বাবার চিকিৎসার জন্য টাকা যোগাড় করে দিতে । কোন লাভ হয়নি। বলেন- ‘ছোট মুখে বড় কথা ভাল ন।’
আমার মনে হয় ভারতে আসা সব পূর্ববঙ্গীয় পরিবারের এই একই অবস্থা । জমি জায়গা খুবই বাজে জিনিষ। কেউ কিছু নিয়ে যেতে পারে না, তবু এটা নিয়েই যত অশান্তি । ভাই গেল । বাবা গেলেন । দুই দিদির বিয়ে হয়ে গেল । সম্পত্তি ভূতে খেলো । আমি কিছুই নেব না তখনি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম।
আমার পড়াশোনা আর হলো না । যেদিন রিস্ক পরীক্ষা ছিল, সেদিন অনুপ ভট্টাচার্য আর দুলাল ঘোষের সঙ্গে সারাদিন ধর্মনগর ঘুরে বেরিয়েছি সাহিত্যের ব্যাপারে । রুটিন ভুল ছিল । সন্ধ্যার সময় জানলাম পরীক্ষা শেষ । খুব কষ্ট হয়েছিলো । একটা অনুশোচনা এখনো কাজ করে । যদি স্নাতক হতাম, আমার জীবন অন্যরকম হতো । তবে চাকুরী ভালোই করেছি । যারা আমার থেকে বেশি বিদ্যান, তারাও আমার সঙ্গেই প্রমোশন পেয়েছেন । বিধিলিপি । কারণ ২০ বছর প্রমোশন এবং চাকুরী বন্ধ ছিলো । কিন্তু কিছু কিছু মানুষ আমাকে অন্য নজরে দেখেছে পড়াশোনা কম থাকার কারণে। এটা ওদের রোগ । আমার নয় । ওরা বিদ্যান, কিন্তু বিদ্যার দান ওদের আত্মা হয়ত গ্রহণ করতে পারেনি । আমি সেই কলেজীয় বিদ্যাকে অবশ্য কখনোই পছন্দ করিনি। আমার প্রতিজ্ঞা ছিল পৈতৃক ধন নেব না, বাড়ি করব নিজের টাকায় । করেছি । আমার বড় ভাই বলেছিলেন আমার সাহিত্য করা হবে না। কোন এক গুরু-মা তাকে বলেছিলেন । কিন্তু একটা অবাক কাণ্ড, বড় ভাই আমাকে রাইটিং প্যাড ছাপিয়ে দিয়েছিলেন একবার । হয়ত সেটা আমাকে কোনো কারণে খুশি করার জন্য । আমার ৩টা নামে ৩টে প্যাড ছাপিয়ে দিয়েছিলেন ।
১১। আপনাদের
জীবনে ‘মেজো ভাই’ এর মৃত্যু বড় রকমের
একটা বিপর্যয় নিয়ে আসে । সে তুলনায় আপনার কবিতায় তার প্রসঙ্গ দু’একবার দেখা গেছে । আপনি কি সচেতনভাবে সেটা এড়িয়ে গেছেন ? সে
রকমভাবে তাঁর প্রসঙ্গ কবিতায় আসেনি ?
সেলিম মুস্তাফাঃ হ্যাঁ, বাহান্ন তাসে পর-এর ব্যাক পেজ-এ কিছু কথা আছে । ' আমার প্রিয়ার শরীরে ছিল পানিফল' কবিতার শেষ অংশেও কিছু আছে । এছাড়া আরো বিভিন্ন কবিতায় আছে । এই বিহবলতা কাটাতে আমার অনেক সময় গেছে । এই যন্ত্রণা আমার ব্যবহারিক জীবনেও মারাত্মকভাবে চলে এসেছিল । কাঞ্চনপুরে থাকতে নেশা করলেই ওগুলো চলে আসত, বা কেউ ঐ প্রসঙ্গে কিছু বললেই অসুবিধা হয়ে যেত । আমার কলিগরা এব্যাপারে আমাকে আগলে আগলে রাখতেন । এ ব্যাপারে নিষেধ করা সত্ত্বেও, আমার বা আমার ভাইয়ের সহমর্মী একজন এই প্রসঙ্গ তোলাতে আমার এক কলিগের সঙ্গে তার হাতাহাতি পর্যন্ত হয়ে যায় । আমি ক্রমশ এই বেদনা থেকে উত্তরণ চেয়ে চেয়ে আজ এই অবস্থায় এসেছি । এটা শুধু আমার ক্ষেত্রে ছিল না, আমার বোনদের মধ্যেও ভয়ংকরভাবে ছিল । তারাও অনেক কষ্টে এর থেকে মুক্তি নিয়েছেন । আমাদের গোটা বংশেই এটা একটা মস্ত ধাক্কা ছিল । ঐ খুনটা ছিল, বলা যায় ধর্মনগরের প্রথম খুন । সারা শহরই যেন মিছিল করে আমাদের বাড়িতে চলে যায় । বাড়ির সামনের পুরো বেড়া সবাই মিলে খুলে দিয়েছিলো । বরেন রায়, তারাবিনোদ চক্রবর্তীরা ( যাদের পরে আর দেখিনি) ছিলেন । সারা শহরে মিছিল হয় । ছবি তোলা হয় । কিছুই আনা হয় নি । পরে তো কাউকেই পাওয়া যায়নি । খুনের সময় তোমাদের গীটারিস্ট অভিজিৎ কর্মকারের কাকা ( খুব সম্ভবত) অধীর কর্মকারকে পাওয়া যায় নি । অথচ আগেও ছিল, পরেও ছিল । আমাদের তো তাকেও সন্দেহ হয় । তবে সে জানতো । পরে ভয় পেয়ে যায় । বীরবল্লভ সাহা তখন কদমতলা স্কুলের হেডমাস্টার ছিলেন । আমার ভাইকে তার ডান হাত বলা হতো । তারা ছিলেন ATTA-All Tripura
Teacher's Association ভুক্ত । পরে উনি বদলি হয়ে যান । আমি চাকুরীর জন্য তার কাছেও গিয়েছি । কোন লাভ হয়নি । নৃপেন চক্রবর্তীর কাছে গিয়েছি, কোন লাভ হয়নি । দশরথ দেবের কাছে গিয়েছি কোন লাভ হয়নি । ভাইয়ের মৃত্যুর প্রভাব আমার এক দিদির (বর্তমানে কৈলাসহর, এই দিদিই তখন চাকুরী করতো । ভাই বলেছিল তাকে- তুই সংসার দেখবি, আমি তপনকে পড়াব । আমার ডাক্তারী পড়ার কথা চলছিল হাইয়ার সেকেণ্ডারীর পরে।) ওপর এমন পড়েছিল যে ভাইয়ের সমস্ত ছবি সরিয়ে লুকিয়ে ফেলা হয় । নইলে দিদি সারাক্ষণ ঐ ছবির সামনে দাঁড়িয়ে থাকত । কিছুদিন পর এই দিদিরও বিয়ে দেয়া হল । এর ছোটজনের বিয়ে আগে হয় । ঐ দিদি আর বড় ভাইয়ের সাহায্যে বিয়ে হয়ে যায় কোনরকমে । এক বোন বাকি থাকে । আমি চাকুরী পাবার পর তারও বিয়ে দেয়া হয় ঋণ করে । দিদিদের বিয়ে হয়ে গেলেও আমরা সাহায্য পেতাম । কিন্তু তাতে ভাল করে চলতো না । আমি সব সময়ই ভাত পেয়েছি , খেয়েছি। কিন্তু মা বাবা আর দিদি হয়তো রুটি খেয়েছেন । অথচ বাবা তখনো ১৬ কানি জমির মালিক।এক কণাও বিক্রি করতে পারছেন না । জমি যে বড় ভাইয়ের নামে ! আমি রেশনের চাল খাইনি, তারা খেয়েছেন । আমার জন্য ১ কিলো হলেও ভাল চাল রাখা হত । বাবার স্নেহ । আমি লেখালেখি করি জেনে বাবা রোজ একটা মোমবাতি আমার টেবিলে রেখে দিতেন । আমি সোনিক মিউজিক ইন্সটিটিউট-এর কাজ সেরে হয়ত রাত এগারোটা বারোটায় বাড়ি আসতাম । সবাই মেনে নিয়েছেন সেটা । আগরতলার দিদি একটা টেবিল ল্যাম্প কিনে দিয়েছিল । বাবার শ্রাদ্ধের সময় বাড়িতে প্রথম কারেণ্ট আসে ।রাতে ভাত ঢাকা থাকত । সবাই ঘুমে, দরজা ভেতর থেকে একটা চেয়ার দিয়ে আটকানো থাকতো । আমার প্রিয় একটা কুকুর ছিল । কুকুরী । নাম টমি । শুধু সেটাই জেগে থাকতো । আমি রাত ১২টা ১টাপর্যন্ত লিখতাম।
টমি আমাকে বাড়ির প্রবেশ পথ থেকে এসে নিয়ে যেত। কি করে যেন টের পেয়ে যেত যে আমি এসে গেছি। একদিন দিদি ভুলে তাকে ভাত দেয়নি । সবাই ঘুমিয়ে গেছে। অনেক্ষণ চুপ থাকার পর যখন বুঝতে পারলো যে সবাই আসলে ঘুমিয়ে গেছে, তখন বাইরে থেকে দরজার চৌকাটের শেকল ধরে শব্দ করে আমাদের ডেকে তোলে। এরপর তাকে ভাত দেয়া হয় । ১০ বছর বেঁচে ছিল । সব সময় বারান্দায় ঘুমাতো একটা চেয়ারের ওপর । আমি কৈলাসহর থেকে এক দিন এসে শুনি টমি নেই। মারা গেছে । মরার আগে বারান্দায় যে চেয়ারে সে ঘুমাতো সেটা থেকে নেমে এসে উঠোনে একটা লিচু গাছে তলায় শুয়ে পড়ে এবং মারা যায় । খুব কষ্ট পেয়েছিলাম । একদম নিখুঁত কালো রঙের ছিল।
১২। আপনার পরবর্তী জীবন সম্পর্কে কিছু বলুন ?
সেলিম মুস্তাফাঃ এর পর 'বাসুদেব প্রেস'-এ আমি কাজ নিই । এই প্রেসটা এখন নেই। রয়েল লাইব্রেরী-র ছিল। রয়েল লাইব্রেরী -তে আমার ভাইয়ের নামে একাউণ্ট ছিল । সেটা আমার জন্যই । ভাই বলতে যে ভাই খুন হল। তাঁর নাম ছিল প্রত্যেশ চন্দ্র দাশ বিশ্বাস (ডাক নাম নিখিল) । আমার বই খাতা কলম কাগজ, যা প্রয়োজন হতো, সেখান থেকে নিয়ে আসতাম। দাদামণি পরে টাকা দিতো। যখন 'গাণ্ডীব' করি, সেখান থেকেই ছাপাতাম।মালিক, জগন্ময় দে-র বড় ভাই, চিন্ময় দে । তিনিও আমাকে খুব স্নেহ করতেন । দাদামণি মারা যাবার পর আমার জন্য তাঁরাও সমানভাবে চিন্তিত থাকতেন । দাদামণি কে সবাই ভাল বাসতেন এবং সমীহ করতেন। তাই সকলেই আমাকেও অন্য চোখে দেখতেন । তখন বাসুদেব প্রেসে সমস্ত পরীক্ষার প্রশ্ন জমা হত । সেখান থেকে আরো ১২টা প্রেসে বিতরণ করা হত ছাপার জন্য । ছাপা হয়ে এলে আমি ঐ সব প্রশ্নের প্রুফ দেখে দিতাম। কোন ভুল এলাউ
করা হত না । ভুল থাকলে
ওরা আবার
ছেপে দিতেন
। আমার চোখের
ওপর ভয়ংকর
চাপ পড়লো । এক সময় ডান
চোখ ফুলেও
গেলো। মনে
পড়ে আমার
অবস্থা দেখে
সুদীপ ভট্টাচার্য (এখন নগর
পঞ্চায়েতে কাজ
করে) আমাকে একটা সান
গ্লাস কিনে
দেয় ৭ টাকা দিয়ে।
সেটা ১৯৮০
সালের মাঝামাঝি হবে।৩ মাস
কাজ করেছিলাম । মাসে ৩০০ টাকা । এরপর চাকুরি
হয়ে গেল । কাঞ্চনপুর শুনেই মা কান্নাকাটি শুরু
করে দিলেন । অফার-এ প্রথমে
ধর্মনগর-ই ছিল, ওটা কেটে কাঞ্চনপুর করা ছিল।
ভালই হল । সে এক অভিজ্ঞতা । টি,আর,টি,সি, বাসে গিয়ে
পায়ে হেঁটে দেও নদী পেরিয়ে কাঞ্চনপুর। সামনে তাকালেই জম্পুই। কাঞ্চনপুর আর জম্পুই
আমাকে পালটে
দিল সারাজীবনের জন্য। এর পর দিদির
বিয়ে । কিছু ঋণ নিলাম । বড় দুই দিদি, যাদের বিয়ে
হয়ে গিয়েছে
আগেই, তারা সাহায্য করল। তাদের সাহায্যেই আমাদের
এতদিন চলছিল
। এবার শুধু
আমি আর মা । মা’কে আসাম
পাঠাতে হল বড় ভাইয়ের
কাছে । এখানে এই বয়সে একা
থাকা সম্ভব
নয় । কিন্তু মায়ের
কোন ভয় ছিল না । মা খুব-ই সাহসিনী ছিলেন।
আমার সকল
সাহস স্বাধীনতা উৎসাহ আর কর্মের মূল
আমার মা।
কাঞ্চনপুর যাবার
কিছুদিন পর আমার কলিগ দেবব্রত দেব (বর্তমান ‘মুখাবয়ব’এর সম্পাদক এবং খ্যাতনামা গল্পকার), সত্যেন্দ্র
দেব নাথ (কাঞ্চনপুরের হোমিও ডাক্তার), আমার অন্যান্য কলিগ
এবং সেখানকার স্থানীয় কিছু
ছেলেদের সাথে
যোগাযোগ গড়ে
ওঠে সাহিত্যের ব্যাপারে এবং
শেষ পর্যন্ত স্টেনসিল কেটে
সাহিত্য পত্রিকা করার উদ্যোগ
নিই আমরা
। নাম ' এই বনভূমি' । কয়েক সংখ্যা বেরোনোর পর প্রেসে
ছেপে বই আকারে কবিতার
কাগজ করি- 'মন্বন্তর' , সবই খুব সাড়া
ফেলে ওখানে । অনুপদা আর দুলালদা 'মন্বন্তর' নামে একটা কাগজ করার কথা ছিলো, কিন্তু করতে পারেনি, তাই ওটার তৈরি করা ব্লকটা আমি নিয়ে আসি ।
এর পর একবার পূজার ছুটিতে বাড়ি যাবার সময় দেবুদা আর আমি অফিস শেষ করে বিকেলেই মাছমারা চলে আসি গৌতম চাকমার বাড়িতে ।
বললাম দেয়াল পত্রিকা করবো, এক্ষুণি লেখা যোগাড় কর ।
গৌতম বেরিয়ে গেল আর এলো রাত ৯টার সময় সারা গ্রাম ঘুরেঘুরে লেখা নিয়ে এসেছে । আমরা কাগজ কলম সব নিয়েই এসেছিলাম ।
নাম ঠিক হলো-'মনোবীজ'।
সারা রাত লাগিয়ে পুরো আর্ট সীট ভর্তি করা হলো । লিখলাম আমি ।
গ্রাফিক্স করলো দেবুদা । ভোরবেলা সমীরণ বড়ুয়ার চা মিস্টির দোকান 'নীলাচল' (খুব সম্ভবত)-এ টাঙিয়ে দিয়ে আমরা চলে আসি ।
আমি ধর্মনগর, দেবুদা আগরতলা ।
পেচারথল থেকে দুই পথে দু’জন চলে গেলাম । এর আগে কাঞ্চনপুরেও আমরা দেয়াল পত্রিকা করেছি । বড়দের জন্য দুটো, ছোটোদের জন্য একটা । ছোটোদেরটা পরে সেখানকার মর্নিং স্কুলে নিয়ে যায় । কারণ ওটা খুবই সুন্দর হয়ে ছিলো । সেটা ১৯৮২ সাল । কাঞ্চনপুরে আমার প্রবেশ ২৩.১১.১৯৮০সন । আমি কাজে যোগ দিই ২৪.১১.১৯৮০, শনিবার, পরের দিন । বেরিয়ে আসি ডিসেম্বর ১৯৮৩ সালে । 'মন্বন্তর' প্রকাশের জন্য আমাদের সম্বর্ধনাও দেয়া হয় । কারণ সেখান থেকে সেই প্রথম ছাপার অক্ষরে কিছু প্রকাশ পেলো ।
এর পর বদলী সোজা কৈলাসহর টীলাবাজার । সেখানে হিমাদ্রিদা রয়েছে । পরিচয় হলো বিশ্বজিতের সঙ্গে। বেরোল 'ক' । নাম নিয়ে টস্ হল কবি ডাক্তার দেবাশিস তরফদারের ঘরে । কিন্তু সে কাগজটাকে ধরে রাখতে পারেনি । বিবেকানন্দের বাণী দিয়ে- 'আমার কিছু বলিবার আছে, উহা আমি নিজের
ভাবে বলিব'। এ টুকুই ছিল প্রথম
সম্পাদকীয় । এর পর সম্ভবত
জুলাই ১৯৮৪তে
পানিসাগর । তৈরি হল 'পানিসাগর সাহিত্য চক্র'। প্রতি সপ্তাহে পাঠচক্র । তৈরি হল ' পানিসাগর শিল্পী
সমাজ'-ও । অনার্য
শুরু হল । শুরু
হল 'কিরাত', বিনয় দেবনাথের(সম্প্রতি প্রয়াত)সম্পাদনায় । অনার্যের একটা
ক্রোড়পত্র-ও জেরক্স হয়ে
বেরোল কিছুদিন ‘বীজাণু’ নামে । নানান প্রিণ্টেড লেখা আঁঠা
দিয়ে পেস্ট
করে জেরক্স
এ-৪ কাগজে। পানিসাগর থেকে ১৯৮৮ ডিসেম্বর আবার বদলী
আগরতলায় । সেখানে
অরুণ বণিক । আবার
কাগজ । এবার
প্রেসের ছাট্ কাগজে। কভার ছাপতে গেলে
৪/৫ ইঞ্চি পাশ-এর লম্বা
সীট কেটে
অনেক সময়
ফেলে দিতে
হয় । সেগুলোই ছোট করে
কেটে কবিতার
কাগজ হত। রতু (শুভব্রত দেব, দেবুদার ছোটভাই –বর্তমান অক্ষর পাব্লিকেশনের কর্ণধার) যত্ন করে ছেপে
দিতো। অরুণকে সবাই খুব সম্মান
করতো । বিশ্বসাহিত্য তাঁর খুব দখলে
ছিল । অসাধারণ ইংরাজী
জ্ঞান । কাগজের
নাম ঠিক
করলাম 'গেরিলা' । ছোট ছোট
সম্পাদকীয় লিখতো
অরুণ । অত্যন্ত ঝরঝরে
সহজ গদ্য
। কয়েকটা আমরা
অনার্যে পুনর্মুদ্রিত করেছি। মনেপ্রাণে বামপন্থী । কংগ্রেসীরা ওকে মেরে
ফেলল গলা
টিপে । এরপর ‘গেরিলা’ আর বের হয়নি । অনার্য কিন্তু চলতেই থাকলো । আমি
আগরতলা থেকেও
ছেপে দিয়েছি
। এর পরের
খবর তো তুমি জানোই
।
১৩। ‘মেয়েমানুষের নাম অরুন্ধতি বলে ভালোবাসার নাম হল গোলাপ,
গোলাপ কাগুজে প্রতিভায় ফুটে উঠল তৎক্ষনাৎ অরুন্ধতির বুকে
এবং
শহর জুড়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা , পাটের গুদামে আগুণ – সমান
ম্যাজিক আমার অন্ত্র থেকে অন্তরময়, তবুও সংবাদ – শহরে
মা আনন্দময়ী এসেছেন, বিপ্লবীরা সকলেই তাঁর শরণাগত।
বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক! এরকম বিপ্লব আরো দীর্ঘজীবী হোক –
তা না হলে কোনও প্রতিবিপ্লব আর আসন্ন হবে না ! আমি
সম্পদহীন আদিবাসী – শরীরে আমার শরীর ছাড়া কিছু নেই
কেবলই খাদ্য চাই আমার !
আমি কাকে কি বলবো ? আদিম
বিপ্লব ছাড়া আর কি মুক্তি আছে কোনো ? তাকে
কী বলে ডাকব ? গোলাপ ?
আমি রাত্রির ভিতর ঘুরে বেড়াচ্ছি ! জানি রাত অন্ধকার, শুধু
রাতের ভিতর কোনো কোলাহল নেই—আমি ইদানিং টের পাই,
মানুষের কাছ থেকে মানুষ উঠে চলে গেছে আরো দূরের দিকে, পথে
মরা বাঁশপাতা,ভাইয়ের পাশ থেকে বোন উঠে চলে গেছে এ পথেই,
আমাকে যে খুঁজতে বেরোবে তাকেও এ পথেই আসতে হবে—চলে
যেতে হবে গভীর জঙ্গলে কোনো আদিবাসী গ্রামে, যেখানে
বিপুল সম্ভার যার নাই তাকে আমি স্পর্শ করতে চাই!
মেয়েমানুষকে ভালো না বাসলে সে আমাকে নাস্তিক বলে, ভালবাসলে
বলে কাম-ই আমার অভিপ্রেত ছিল,সে সফল কণ্ঠে ঘোষণা করে
মানুষ মরণশীল এবং মানবিকতাও ! ঠিক একইভাবে আজ একজন
তরুণ বিপ্লবী তাঁর পিতাকে বলে কামুক, মাকে বলে নষ্টফুল,
প্রতিবেশীকে বলে শ্রেণিশত্রু, শুধু নিজেকে
‘ধর্ষিত আত্মার করুণ সংগীত’ বলে
অরুন্ধতী পাশের বাড়িতে গোলাপের খবর নিতে যায় । আমি
কাকে কী বলব ? কে
এদিকের, কে ওদিকের ? আমি আমাকে
কী বলব ? তাকে কী বলে ডাকবো আমি ? অরুন্ধতী ?
কিন্তু তা কী করে সম্ভব ? আমি জানি
তাঁর কবরে আজও গোলাপ ফোটেনি, গোলাপ যে
এখনো জানে না তাকে কোথায় গিয়ে ফুটে থাকতে হবে।’(সম্পদহীন
আদিবাসী ও গোলাপ)
আমরা যারা আপনার কবিতার
নিবিষ্ট পাঠক তারা মোটামুটি সবাই জানি,
এই কবিতার জন্ম কাঞ্চনপুর’এর পটভূমিকে কেন্দ্র করে । আপনার নিজের কথাতেও আপনি বহুবার উল্লেখ করেছেন, ‘কাঞ্চনপুর’ আপনার
কাব্য-মননে আলাদা একটা মাত্রা যোগ করেছে । আপনার তৎকালীন কবিতা পড়লেও
তা অনুভূত হয়। যেমন এই কবিতার ছত্রে ছত্রে। ‘সম্পদহীন আদিবাসী ও গোলাপ’ এই কবিতার
প্রক্ষাপট জনিত ইতিহাস সম্পর্কে কিছু জানতে চাই, যাপন থেকে কবিতা অব্দি ...
সেলিম মুস্তাফাঃ কাঞ্চনপুর আমার জীবনের একটা বিশাল অধ্যায় । প্রথম বৃষ্টির জলের মত । সেখানে মূল চরিত্রগুলোর সঙ্গে মিশে ছিল বাইরের লোকজন। বহিরাগত কর্মচারীরা । সেখানে P W
D, Bridge বানানোর কোম্পানী, শিক্ষক শ্রেণী, ব্যাঙ্ক কর্মচারী ব্লক কর্মচারী এমনই প্রায় সব দপ্তর, সেই সঙ্গে সন্ধ্যার পর টের পেতাম মেয়েমানুষ চালাচালি হচ্ছে । খবর এমনি ভেসে বেড়াতো বাতাসে- কার ঘর থেকে কার ঘরে কে যাচ্ছে । কোন বিকার ছিল না কারো । অনেকটাই খুব স্বাভাবিক ঘটনা যেন । কারণ এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল মিজো কালচার । অবিবাহিত অবস্থায় মা হলেও দোষণীয় ছিল না, তবে ফাইন দিতে হতো । তবে জোর করে কিছু হতো না । জোর করার প্রয়োজন হতো না । পাহাড়ি হোক বাঙালি হোক, স্বল্প অপরাধ যেন সহনীয় ছিল সকলের কাছেই । পয়সার বিনিময়ে বিপদমুক্তি ঘটে যেতো । কিন্তু বনেদী সম্ভ্রান্ত পরিবারও ছিল অনেক । বয়স্ক নীতিবান কর্মচারীও ছিলেন অনেক । তারা দূরে দূরেই থাকতেন । আমরা যা দেখতে চাইতাম, তা আমরা সহজেই দেখতে পারতাম। সেটা ছিল ১৯৮০-র জুনের দাঙ্গার ঠিক পরবর্তী সময়। সেখানে কিন্তু এক কণাও দাঙ্গা হয়নি । খুবই অবাক করার মত ঘটনা । আদিবাসী- বাঙালি সম্প্রীতি ব্যাপারটা ছিল অতি স্বাভাবিক ব্যাপার। এটাই ছিল আমার কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ব্যাপার । সন্ধ্যার পরের ঘটনাগুলো ছাড়াও সুন্দর ও সাদা প্রাপ্তির অনেক মিথষ্ক্রিয়া ছিল যার কোন প্রতিদান কারোর পক্ষে দেয়া সম্ভব নয় । বিশেষ করে দেবুদা আর আমার কাছে ধরা দেয় এক অন্য জগত, যার দেখা পাওয়া শহরে একেবারেই সম্ভব নয় । আমরা দিই নি কিছুই, শুধু ধরাবাঁধা ডিউটি করে গেছি । মানুষের সঙ্গে মিশেছি । এই মেলামেশাও আমাদের ডিউটির মধ্যেই ছিল বলতে হয় । এর জন্য আমাদের ম্যানেজার তপনময় চন্দ -এর প্রভাব ছিল বলব। এই সব interaction থেকেই লেখাগুলো এসেছে । আমাদের নিজেদের জীবনের ভেতর বাহির সব দেখে ফেললাম ওখানে গিয়ে । একটু দিলে, পাওয়া যায় তার একশ গুণ। কিন্তু পাওয়াটা যখন দাবি হয়ে যায়, তখনই সেটা অত্যাচার হয়ে ওঠে ওখানে গিয়ে মনে হয়েছে মানুষের জীবন শুধু তার নিজের জন্য কখনো নয় ।
১৪।
“সম্পদহীন আদিবাসী – শরীরে আমার শরীর ছাড়া কিছু নেই
কেবলই খাদ্য চাই আমার” –
এখানে শরীর ও খাদ্য কি কোন সংকটের দিকে ইঙ্গিত করছে। এই লাইনের কি কোন
প্রেক্ষাপটগত ইতিহাস আছে ?
সেলিম মুস্তাফাঃ তখন কী ভেবে কোন অনুষঙ্গে কি লিখেছিলেম এখন বলা সঠিক নাও হতে পারে । শরীরের খাদ্য দুটোই মাত্র-- ভাত আর নারী । শরীর এখানে গোটা অস্তিত্বকেই সিম্বলাইজ করছে। কী চাই জানিনা, কিন্তু চাই । সৃষ্টির প্রথম আকুলতা বোধ হয় এটাই । প্রকৃত লেখার জন্য ক্রমশ গড়ে ওঠা Urge । নারী মূলত সমস্ত অদৃশ্য ক্ষুধারই
প্রতীক ।
আদিবাসী সমাজ-- বা বলতে পারো কাঞ্চনপুরকে দেখে, কাঞ্চনপুর যদি আমার জীবন দেখার প্রথম প্রতীক হয়ে থাকে, তবে সেটা আমার অকল্পনীয় দেখা, বিস্ময়ে দেখা, কৌতুহলে দেখা, আগ্রহে দেখা, এক রিয়ালিটিকে দেখা--জীবনের ভেতরে ভেতরে বয়ে চলা আরেক জীবন, বাইরের জীবনের ভেতরে চলা যে মেশিনঘর--যা বাইরের জীবনকে রসদ জোগাচ্ছে, জেনারেট করছে, তার মুখোমুখি হওয়া । বিনিময় ছাড়া যে সৎ বা অসৎ, মহান বা সাধারণ, সুখী বা অসুখী কোন জীবনই চলে না, তার সরাসরি মুখোমুখি হলাম সেখানে। আমার প্রথম, রিয়ালিটিকে ছোঁয়া ! আমার মনে হলো ভালবাসাও বিনিময়-মাধ্যম
। আমি অনেক পরে জেনেছি বলে অনেকে হয়তো হাসবেন । এই ইমোশনকে যথেষ্ট সম্মান জানিয়েই বলতে
চাই, যা যতটুকু দেয়া যায়, তা ততটুকু পাওয়া যায়। কোন কোন আদিবাসী যদি যৌনতা
দিয়ে কিছু আদায় করেও থাকেন, সেটা বিনিময়ের কড়ি হিসেবেই দিয়েছেন । আবার কারো কারো যৌনতা
লুণ্ঠিত হয়েছে, সেটা আলাদা ব্যাপার । ওখানে অনুপজাতিরা বুঝেছিল, শরীর খুবই সস্তা বিষয়, আর বিশেষ সম্প্রদায়ের উপজাতিরা বুঝেছিল-- আরে, এরা তো দেখি শরীর পেলেই সন্তুষ্ট ! তাই শরীর দিতে কারো আপত্তি হয়নি বিশেষ, যদিও কিছুটা হলেও সংকোচ তো ছিলোই । এতে দোষ ছিল অবশ্যই, তবে প্রায়শ্চিত্তের বিধান ছিল । প্রকাশ্যে হলে, বা অননুমোদিত হলে অর্থদণ্ড তো ছিলোই। যাক এসব । মূল কথা হল যা আমরা যত ইমোশনালি
মহান ভাবাদর্শ নিয়ে ভাবি, জীবনের কঠিন জ্যামিতিতে, তা ততটা মোটেই নয়। যে যেরকম ভাবে তাকে সেই পদ্ধতিতেই বশ করা হয়, ভোলানো হয় । কাঞ্চনপুরকেও সেভাবেই ব্যবহার করা হয়েছে, হচ্ছে, অন্যান্য এই রকম এলাকার মতই । ঠিক এভাবেই রাজনীতিও আমাদের ভুলিয়ে রাখে
। কেউ অংক কষে এগোয়, কেউ আবেগে এগোয় । জাতি বা উপজাতির ব্যাপার আসলে নয়, আসল ব্যাপার ব্যবহারকারী আর ব্যবহৃত । উপজাতিরা শুধু তিল কার্পাস ভুট্টা বা
যৌবন দিয়েছে তা নয়, তারা তাদের সংস্কার, সংস্কৃতি ইতিহাস আর মিথ কাহিনিগুলোও দিয়েছে
বিশ্বের বাজারে সামান্য বিনিময়ে । ইমোশনালি ব্ল্যাকমেইল্ড
হয়েছে লাগাতর । যারা নিয়েছে তারা পরজীবী । হয়ত সংসার এভাবেই চলে । লুন্ঠন করা হয়েছে । কাঞ্চনপুর এমনই এক বাজার, যেখানে বাজারের ভেতরে সব সময় চলছে আরেক বাজার । নৃপেন
চক্রবর্তীর সময়কালে চালু ফর্ম-১৬-র কন্ট্রাক্টরীর কাজ পেতে মিজো যুবতীদের অনেককেই হয়তো
রাত কাটাতে হয়েছে বিশেষ কোন অফিসারের
কোয়ার্টারে, এমনকি তার পিতার সম্মতিতেই
কখনো । এটা পারস্পরিক সম্মতিতেই হয়ত । তবু হয়েছে । কেউ প্রেমের নাটকে ভুলিয়ে ভোগ করেছে যৌবন । এগুলো এখনও আছে, সর্বত্র । কিন্তু আমার কাছে তখন ছিল একেবারেই নতুন । এখন হয়ত বিষয় নয়। তখন ছিল বিষয় ।
১৫
। “ রাতকে দু ভাগ করে ভালোবাসার দুই পা
দুদিকে নেমেছে, গভীর শিকড়ে
ফুটেছে একটি মাত্র রক্তজবা –
অদ্ভুত অচেনা প্রদাহে –
আমার পশু পুড়ে যায়
আমার প্রভু পুড়ে যায়
অপার আকাশ থেকে ঝরে পড়ে
গুচ্ছ অন্ধকার !” (মিলন)
আমার প্রিয় কবিতার মধ্যে
একটা । এখানে প্রেম, প্রেমের উঠা-নামা, তাঁর শরীরী আলাপ,
অশরীরী বিস্তার, তার শঙ্খলাগা মুহূর্তের অদ্ভুত অচেনা প্রদাহের প্রবাহমানতা, ঈশ্বরিক অন্ধকারের ভিতরে যেভাবে
গুলিয়ে গেল পশু ও প্রভু , এককথায় দারুণ । আমার প্রশ্ন হল, আপনি এই কবিতার ভিত্তিতে আমাকে আপনার যৌন-দর্শন, কবিতায়
তার মাত্রাবোধ বা রুচিবোধ, অর্থাৎ ‘পশু ও প্রভু’র একাকার হয়ে
যাওয়া নিয়ে কিছু বলুন।
সেলিম মুস্তাফাঃ যৌনতা ছাড়া জীবনের কোন মানে আমি এখনো বুঝিনি । যৌনতা হঠাৎ যদি উদয় হয়, সেটা হয়তো পাশবিক, প্রেমহীন । আমার যৌনতা কিছুটা শোকাশ্রয়ীও বটে, হয়তো । আমরা দার্শনিক নই, তাই সঠিক বলতে পারছি না । নারী আমার কাছে প্রকৃতি । কূল নেই কিনারা নেই । এখানে শুধুই নিবেদন । একজন নারীর চেয়ে একজন পুরুষ হাজার গুণ তুচ্ছ । পুরুষ আসলে নারী দ্বারা ব্যবহৃত হয় । কিন্তু, নারী ছদ্ম ব্যবহার করে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে , বা ব্যবহৃত হতেও চায় । পারস্পরিক নিবেদনই প্রকৃত যৌনতা যা প্রেমের কাছে নিয়ে যায় হয়ত । ঈশ্বরও নারীর কাছে আনত নয় কি ?
১৬। ‘কবিতায় তার মাত্রাবোধ, রুচিবোধ’ নিয়ে কিছু বললেন না ? ঐ মাত্রা নিয়েই তো যত-শত তর্ক, বিতর্ক ... আপনার উক্ত কবিতায় পশু ও প্রভু এই প্রশ্ন টাও আপনি আনেছেন। এই দুটো পরস্পর সম্পর্ক কিভাবে করলেন ?
সেলিম মুস্তাফাঃ মাত্রাবোধ তো থাকতেই হবে। তবে সিচুয়েশন অনুযায়ী। কবিতার আবেগই স্থির করে দেয় মাত্রাবোধ। রুচিবোধের কারণে সহসা মিতাচার ঘটালে রচনা সচেতনতার কারণে মিথ্যাচারে পরিণত হবে। রুচিবোধের বেড়াজালে পড়লে সঠিক রচনাটি লিখিত হবে না কখনোই। সেটা অসত্য প্রকাশ হবে। মনে এক জিনিষ আর লিখলাম আরেক জিনিষ, এমন হয়ে যাবে না ? কবিতাই স্থির করবে সব। আমার কবিতায় পশু যেমন থাকছে না, প্রভুও থাকছে না । অপার আকাশ থেকে ঝরে পড়া অন্ধকারই স্থান নিচ্ছে। আমি বিশ্বাস করি যৌনতায় একটি শোকের স্থান আছে, পরস্পরের প্রতি সহানুভূতির আরেক আবেগ, যা হয়তো পশু আর প্রভুর মিশ্রণও হতে পারে--আনডিফাইন্ড ! দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে কান্না বা, কান্নার চেয়ে বেশি কিছু। নিবেদন । পশু একা থাকে না । প্রভুও একা থাকে না। মানুষের মনন মানুষকে এখানে এনে দাঁড় করিয়েছে । একজন সাধু এই জায়গাটা চেনে না, একজন লম্পটও চেনে না, কারণ তারা পশু আর প্রভু নিয়ে আলাদাভাবে ভিন্ন পথের যাত্রী।
১৭। ‘রুচিবোধের
বেড়াজাল’ বলতে আপনি কি বুঝাতে চাইছেন ?
সেলিম মুস্তাফাঃ তবে
এটাও সত্য যে ‘মিতাচার’ আর ‘রুচিবোধ’ এই শব্দগুলো আসলে সামাজিক শব্দ । এগুলোর
প্রকৃত কোন মাত্রা নেই । একটি রচনা-ই ঠিক করবে এর পরিমাণ । সাধারণ পাঠকের কাছে
সেটা অস্বাভাবিক-ও মনে হতে পারে সহসা । ‘মিতাচার’ আর ‘রুচিবোধ’ আমাদের যেমন
সংস্কার, তেমনি কুসংস্কারও বটে । এর পরিপ্রেক্ষিত ‘সমাজ’ নামের অদৃশ্য অনুশাসন—স্থবির
মূল্যবোধ ।
রুচিবোধের ব্যাপারটা প্রত্যেকের ভিন্ন । সামাজিক ন্যায়
অন্যায়বোধ নিয়ে আমাদের প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু পূর্বধারণা রয়েছে, আমরা যে যে বন্ধুবান্ধবের পরিমণ্ডলে চলা ফেরা করি, তাদের রুচিবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমাদের রুচিবোধ গড়ে ওঠে। সামাজিক ও
বৌদ্ধিক শ্রেণির তারতম্যে রুচিবোধের ভিন্নতা গড়ে ওঠে । যৌনতার ব্যাপারটাও এই
রুচিবোধের সংঘাতে কোথাও অশ্লীল মনে হতে পারে । আমার মনে হয় কোন কিছুরই
কোন প্রামাণ্য মাত্রা নেই । আবার যৌনতার ব্যবহারে কবিতা নির্মিত হলে, একজনের কাছে তা ভিন্ন ভিন্নভাবে,অর্থাৎ দশজনের সামনে একরকম, আবার গোপনে একা একা আরেক রকম মনে হতে পারে । সামাজিক রুচিবোধ ব্যতিরেক, পারিবারিক রুচিবোধও আছে। আদপে, তাই, রুচিবোধেরও কোন নির্দিষ্ট মাত্রা নেই, বা হতে পারে না। জীবনানন্দের সময় যা অশ্লীল ছিল, আজ তা, বা তারও চেয়ে বেশি কিছু স্কুলপাঠ্য হতে চলেছে । যৌনতা জীবনের
প্রাথমিক এবং অক্ষয় ব্যাপার । কিন্তু বিভিন্ন উদ্দেশ্যে, বা যখন সাহিত্যে সাহিত্যের উদ্দেশ্য ছাড়া কেবলই জৈবিকতার জন্য এর ব্যবহার হয়, তখনও তাকে অশ্লীল না বলে 'যৌন সাহিত্য' বা পর্ণসাহিত্য বলা হয় । কবিতায় যৌনতার ব্যবহার যখন কাব্যের
উদ্দেশ্যকে পূর্ণ করে না, বা করতে পারে না, তখন তা যৌনতার (জৈবিকতার) দিকে ঝুঁকে যায় স্বয়ংক্রিয়ভাবেই। এই
সংঘাতটুকু একজন বোদ্ধা পাঠকের কাছে রুচিবোধের সংঘাত নয়, সাহিত্যবোধের সংঘাত, বা আমি বলব, সাহিত্য-সংকট । তখন তিনি এটাকে 'অশ্লীল' বলতে পারেন , বা 'কিছু হয়নি'-ও বলতে পারেন । কারণ বোদ্ধা-পাঠক হলে, কবির প্রয়াসটুকু তার চোখ এড়ানোর কথা নয় । শৈলেশ্বর ঘোষের কবিতায়
যৌনতার প্রচুর ব্যবহার আছে। তিনি বা
তারা (হাংরিরা) চেয়েছিলেন সমাজের
সকল অবদমিত বিষয়, যা পুরুষতান্ত্রিক অবদমন, বৌদ্ধিক সমাজের অবদমন, সামন্ততান্ত্রিক অবদমন ইত্যাদি নানা কারণে বহুযুগ ধরে স্তূপীকৃত
হয়ে আছে, সেখানে 'বৌদ্ধিক নৈরাজ্য' সৃষ্টি করে সত্যকে সামনে এনে ফেলা । তাই ষাটের দশক সত্তরের
দশকের কাছেও হয়ত নিন্দিত হয়েছে, কিন্তু আজ আর এসব কোন বিষয়ই না। তথাকথিত
বৌদ্ধিক সমাজের কূপমণ্ডুকতায়
জীবনানন্দকে নিন্দিত হতে হয়েছিল । আজ তাই ঐ সব মৌলবাদী বৌদ্ধিক সমাজের কোন মূল্য
কেউ দিতে চান না, বা তারা তাদের প্রাপ্য মূল্যবোধের আসন থেকে ছিটকে
পড়েছেন । শব্দ তো কোন ভাব বা ভাবসংগঠনের অংশের প্রতীকমাত্র ! একটি শব্দের
মধ্যে নিহিত থাকে রচয়িতার উদ্দেশ্য বা ইন্টেনশন বা অভিসন্ধান । দোষী যদি হয়, তো উদ্দেশ্য বা ইন্টেনশন হবে, শব্দ নয় । কিছু শব্দ আছে যা কেবলই হয়ত যৌনতাকে প্রকাশ
করার জন্য ব্যবহৃত হয়, সেগুলোকে আমরা ইংরাজীতে স্ল্যাং বলে থাকি । সেগুলো আবার সোস্যাল
ডায়ালেক্ট হিসেবে স্ল্যাং না-ও হতে পারে। শৈলেশ্বর ঘোষের রচনায় অজস্র তথাকথিত যৌন শব্দ ব্যবহৃত
হয়েছে, কিন্তু কোথাও তা কবিতার কাব্যময়তাকে
ডিঙিয়ে যায়নি । উদ্দেশ্য থেকে টলেনি । কিন্তু অনেক সমালোচকই নিজেদের
উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য অতিসরলীকরণের ব্যাখ্যায় টেনে নিয়ে গেছেন । এ ক্ষেত্রে তারা কাব্য না
খুঁজে যৌনতাই খুঁজেছেন, বলাই বাহুল্য । তাই আমার মনেহয়, স্থূল অর্থে যদি, রুচিবোধের একটা সাধারণ মান আছে বলে ধরেও নিই, সেখানেও এখন একটু চলমানতার প্রয়োজন এসে গিয়েছে। তা ছাড়া যৌনতা নিজেই কাব্যের একটি বিষয় হবে না
কেন ? এটাকে যারা অস্বীকার করেন, তারা কি মৃত নন ? শিব পার্বতী, রাধাকৃষ্ণ, এদের নিয়ে যে যে কাহিনি রয়েছে, সেগুলো বিশ্লেষণ করলে, তাদের আবরণে ধর্মের মোহর রয়েছে বলে নিন্দিত হয়নি এটা আমরা বুঝতে পারি । মঙ্গলকাব্যেও
তাই। আঞ্চলিক গীতিকাব্যেও তাই। ইউরোপীয়ান কাব্য অনুবাদ করলে যৌনতার ব্যবহারকে আমরা প্রশ্রয়
দিই। এখন কবি যদি রচনা করতে গিয়ে প্রচলিত
রুচিবোধকে মনে রেখে তার কবিতাকে ভিন্ন পথে চালিত করেন, তা হলে 'হায়' বলা ছাড়া আর কি-ইবা বলার
থাকে। অয়দিপাউসের রচনা কি আজকের ? খাজুরাহের শিল্প কি আজকের ?
১৮ । আপনি না বললেও আপনাকে সবাই ‘হাংরি’ বলেই মনে করে। এই ধারণা যে একবারে ভিত্তিহীন তা আমারও মনে হয় না । অনেকে আপনাকে প্রদীপ চৌধুরী’র ভাবশিষ্যও মনে করে। আমিও তাঁর ব্যতিক্রম নই। এনিয়ে সরাসরি আপনার সাথে কোনদিন আলোচনা হয়নি । মনে হয়েছিল, এটা একান্তই আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপার । কিন্তু আজ যখন আপনাকে পরতে পরতে জানছি, তখন মনে হচ্ছে, এ’ব্যাপারেও সরাসরি জানা উচিত। শুধুমাত্র মেনে-নেওয়া একটা ধারনার কোন মূল্য থাকতে পারে না। আপনার কি মনে হয় ?
সেলিম মুস্তাফাঃ আমি প্রদীপের শিষ্য নই, কিন্তু প্রদীপ আমার গুরু । আমাকে হাংরি না বলে উত্তর-হাংরি বললেই সঠিক হবে যদি বলতেই হয় । আমার 'ছোরার বদলে একদিন'-এর পেছনে প্রদীপের যে লেখাটা ছিল, সেখানে তিনি আমার লেখাকে পরিণত হাংরি লেখার মত বলেছিলেন। প্রদীপের সঙ্গে থেকে লেখা নয় ওগুলো । তাঁর সঙ্গে পরিচয়ের আগেই কিছু লেখা । আবার তিনি চলে যাবার পর কিছু লেখা । তিনি লেখা এডিট করেন না, তাই তাঁর ছাপ চট করে পড়ার কথা নয় । তিনি শুধু জীবনকে দেখার চোখ খুলে দিয়েছেন । কারোই কবিতা নিয়ে কখনো কিছু বলার অভ্যেস তাঁর নেই, কিন্তু কবির জীবনদর্শনের ওপর কথা বলে সিদ্ধান্ত নিতে বলেন । তাঁর ভাষা লেখায় আনা অসম্ভব ব্যাপার । অরুণ বণিক, বা অরুণেশ ঘোষও হাংরি নন । উত্তর-হাংরি বলা যায়। তবে তাঁরা আরো কাছের । আমাকে হাংরি বললে আমার কোন আপত্তি নেই, কিন্তু সেটা ইতিহাসবিকৃতি হবে । এদিকে একমাত্র শঙ্খপল্লব আদিত্য হাংরি কবি । কল্যাণব্রতরা নিন্দার ভয়ে সরে এসেছেন, নইলে তাঁরাও হাংরি খ্যাতি পেতেন হয়ত । এছাড়া হাংরি প্রভাবিত কবি আছেন ত্রিপুরাতে অনেকেই, যারা তা স্বীকার করতে চান না। বরং তারা আরো উগ্র হবার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু সেই কন্সেপ্ট ভেতরে না থাকলে যা হয় । সত্যিকারের হাংরি কবি তখন ত্রিপুরাতে আরো ছিলেন নামে বেনামে, চাকুরিসূত্রে ছিলেন, চলে গেছেন । আমার গুরুর শেষ নেই । নকুল রায়, মানস পালও আমার গুরু । আর সত্যিকার অর্থে আমার পরিচিত সব পাঠক/পাঠিকাই(যারা সব সময় কমেন্ট করেন নিন্দা বা প্রশংসা, দুই অর্থেই) আমার গুরু।
১৯ । সময়ের প্রবাহে (বলা
ভালো দাবীতে) ‘হাংরি আন্দোলন’এর যে ঢেউ বিশ্ব জুড়ে এসেছিল। তা তো তার ছাপ রেখে আবার
চলেও গেছে । তাহলে নিজেকে উত্তর-হাংরি বলছেন কেন ? একটু যদি আলোচনা করেন, তাহলে আপনি ও আপনার কবিতার
মেজাজ বুঝতে সুবিধে হয়।
সেলিম মুস্তাফাঃ আন্দোলন কেউ আনে না, আসে। স্মৃতি রেখে যায়, ছাপ রেখে যায় । কিছু না রেখে যায় না । আসে সময়ের দাবিতেই । কাজ করে যায় পরবর্তীর জন্য । সেই সময় থেকে আমার এখনের অবস্থান সেই সময়েরই পরিণতি । যেকোন 'সময়'-ই তার পূর্ববর্তী সময়ের ফসল । এটা অস্বীকার করা তো ইতিহাস অস্বীকার করা । হাংরি-পরবর্তী হাংরি-অনুরাগীদের উত্তর-হাংরী-ই বলা হয়ে থাকে । এটা আমার কথা নয় । কেউ স্বীকার না করলেও, যদি লেখায় তার কখন প্রভাব এসে থাকে, সেটা কি এ-জীবনে মোছা সম্ভব ? আমি কোন কিছু-ই অস্বীকারের পক্ষপাতী নই । আজকের স্পষ্টবাদীতার যে ধারা বিশেষ করে ত্রিপুরা, উত্তরবঙ্গ এমন কি বাংলাদেশের কোথাও কোথাও ( বাংলাদেশে ছিলেন রবিউল হক--এক সময়ের ঢাকার চীফ্ আর্কিটেক্ট, 'ক্ষুধার্তে'-র নিয়মিত লেখক-- ইনি নাটকও লিখেছেন, মানিক চক্রবর্তী মঞ্চায়নও করেছেন) দেখা যায়, তা তো এমনি এমনি আসেনি ! কে কোন পন্থী সেটা কখনোই আলোচ্য নয় । কেউ একরকম থাকে না । রাজনীতিতেও এরকমই । শুধু পরিণত হয় । তবু নাম তো দিই আমরা । দিই বিভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে। কখনো ইতিহাস লিখতে গিয়ে, কখনো কোন সংকীর্ণ মানসিকতার প্ররোচনায় । আমাকে কেউ হাংরি বললে ঠিক হবে না । বললে উত্তর-হাংরি-ই বলা ঠিক হবে, এই কথাই বলেছি।
২০। প্রদীপ চৌধূরী’র সঙ্গে আপনার মেলামেশা দীর্ঘ দিনের। আপনি খুব কাছে থেকে তাকে জেনেছেন, অনুভব করেছেন । সে সব দিনের স্মৃতি নিশ্চয়ই আপনাকে এখনও তাড়া করে। বন্ধুত্ব হোক, কবিতা নিয়ে আলোচনা হোক, জীবনমুখী আলোচনা হোক। আপনি আজ পেছন ফিরে তাকালে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন সেই সব দিনগুলোকে ?
সেলিম মুস্তাফাঃ সে দিন গুলো অবশ্যই খুব উত্তেজনার ছিল । আমাদের কথাবার্তার সঙ্গে প্রদীপ চৌধুরীর কথাবার্তা বা চিন্তাধারা মিলে যায় বলেই আমরা কারো কারো বাধা সত্ত্বেও তার প্রতি আগ্রহী হয়ে পড়ি । পরে কেউ কেউ অন্য ধারাতে আগ্রহী হয়ে গেলে অন্যত্র সরে যান, কিন্তু লেখা পড়লেই বোঝা যাবে এই চক্ষুরুন্মিলন কিভাবে হয়েছে। আজকের দিনের লেখালেখি থেকে হাংরি আদর্শ আছে এমন লেখা খুঁজে বের করা আর সম্ভব নয় । বহিরঙ্গ থেকে তো নয়-ই । কারণ কিছু উদ্দেশ্যপূর্ণ লোক যেভাবে হাংরি চিহ্নিতকরণ শুরু করেছিলো সেটার পেছনে হীনম্মন্যতা ছিলো এটা পরিষ্কার, এবং সেই ধরণের চিহ্নায়ন আজ সকলের লেখাতে স্বাভাবিকভাবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে উপস্থিত, কেউ এজন্য দুঃখিত, বা লজ্জিত, বা সংকোচিত বা উৎফুল্লও নয়, কারণ, কারণটা তারা জানে না, এবং জানতেও চায় না । ( এই জানতে না-চাওয়াটাও একদিন বিপদ হয়ে দাঁড়াবে, কারণ, এই ভাষাটার অন্তরাত্মা, গতি, অনুসন্ধান তার অধিগত নয় ) । কোন আন্দোলনের ব্যর্থতা হয়ত এখানেই । যেমন এখনকার অনেক বামপন্থীরা জানেই না বামপন্থা কি জিনিষ । প্রদীপের সঙ্গের দিনগুলো এখন শ্রেষ্ঠ দিন বলে মনে হয় । কারণ এখনো তাঁর থেকে পাওয়ার আছে মনে হয়। ৭২/৭৩ বছর বয়সে লোকটা সমান জীবিত । মানিক চক্রবর্তী থাকলে, সুস্থ থাকলে, কিছুটা অভাব পুরণ করতে পারতেন আমাদের । আর একজন সত্যিকারের পাঠক ছিলেন, যিনি প্রকৃতপক্ষে লেখালেখির লোকও না, কিন্তু সব বোঝেন এবং জানতে চাইলেই বোঝাতে পারেন । আমার পানিসাগর থাকাকালীন ম্যানেজার। রবীন্দ্র নাথ সরকার , বলা বাহুল্য, এঁর পড়াশোনা সীমাহীন।
প্রদীপ
যৌনতাকে বহুমাত্রিক সিগনিফিকেন্সে ব্যবহার করেছেন । সব সময়-ই পাঠকের সামনে প্রেজেন্ট করেছেন যা, তার
মূল ব্যঞ্জনা আরো গভীরে । তিনি এখানে শৈলেশ্বর থেকে আলাদা । প্রদীপে যেখানে ভাষাগত প্রকরণগত তীক্ষ্ণতা পাই, শৈলেশ্বরে
পাই আপাদমস্তক প্রেমে ও যৌনতায় জড়িয়ে থাকা, কিন্তু
দুজনের ক্ষেত্রেই, পড়ার
পর, অনেক পর, তার
নিহিতার্থের ঠিকানা মেলে । হাংরি হয়েও সকলেই যে যৌনতাকে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় ব্যঞ্জনায় তীক্ষ্ণতায়
এবং কাব্যপরিসরের
অন্তর্গত থেকেই করেছেন এটা একটা মস্ত বিষয় । যৌনতা ছাড়া মুক্তি নেই, কিন্তু
যৌনতা জীবনের একটা স্তর মাত্র, একসময়
প্রকৃত জীবন দ্বারা এটা
অতিক্রমিত হয়ে যায়, যদি না এর
সঙ্গে লেপ্টে থাকার সুপ্ত বাসনা জীইয়ে
রাখা হয়, নিজের চরিতার্থতার জন্য, বা, কবি
সাহিত্যিক হিসেবে পাঠকদের প্রলোভিত
করার জন্যে, 'দেশ' পত্রিকায়
এমন বহু লেখা ইদানীং-ও আমরা দেখতে পাই দীর্ঘ
উপন্যাস হিসেবে মূলত পর্ণগ্রাফির সিরিয়েল । সুভাষ ঘোষের বা বাসুদেব দাশগুপ্তের গদ্যপদ্ধতি বাংলাসাহিত্যে দুটি অমিল ধারা । সমরেশ বসুর
যৌনতা থেকে এগুলো
সম্পূর্ণ ভিন্ন । সন্দীপন, সমরেশ কিন্তু ঐ সময়েরই। পাঠকের মনে যৌন আবেশ গড়ে ওঠার প্রাকমুহূর্তে কখনো, কখনো
রচনা শেষ করার পর যৌনতাকে তছনছ করে
দিয়েছেন হাংরিরা । রচনাকে সর্বত্রগামী করার জন্য যৌনতাকে জীইয়ে রাখেননি । কিন্তু প্রদীপ ব্যতীত, যৌনতার
চেহারা প্রায় সকলেরই কখনো কখনো সামান্য হলেও
বিদ্ঘুটে, দৃষ্টিকটু, শ্রুতিকটু
হয়েছে । কখনো
অতিরিক্ত হয়েছে বলে আমার ব্যক্তিগত
ধারণা ।
পাঠকের বোধেএটা ইচ্ছাকৃত আক্রমণ । প্রদীপের কথায় আসছি পরে । আন্দোলন আসে, কেউ তৈরি করে
না । বিপ্লবও আসে । সময় আনে। এটা আমার কথা
নয় । একজন মনীষীর
এরকম একটা কথা একসময় আমি আমার ঘরে (১৯৭৪/৭৫ সালে) লিখে বাঁধিয়ে রেখেছিলাম । আমাদের দেশে কখন কি হলো সেটা বড় কথা
নয়, বড় কথা কোন সময়ে পৃথিবীতে কী হলো । সুনামীর মত অবশ্যই কোথাও একটা কেন্দ্র
থাকে, এবং সেন্সেটিভ জায়গাগুলিতে ছড়িয়ে পড়ে ।
ষাটের মাঝামাঝি যেমন হাংরি ঢেউ এসেছিল, সঙ্গে এসেছিল নক্সাল আন্দোলন । কিন্তু কোনটারই সঠিক জায়গা হয়নি । নতুন জিনিষের অবস্থা এমনই হয় । আজ বহুদিন বাদে নক্সালীদের গ্রহণ করতেই হল বামপন্থীদের--সময়ের দাবি । মাওবাদীদেরও আগে পরে প্রহণ করতে হবে। নইলে সময়ের ফাঁকে পড়ে যেতে হবে কোন একটি ধারাকে । সময়ের অভ্যুত্থান এগুলো, আন্দোলনের নয় । কাউকে বাদ দেবার কোন প্রশ্নই ওঠে না । যারা সময়ের একটা সামান্য ইঙ্গিতও বাদ দিতে চাইবে, তারা নিজেরাই বাদ পড়ে যাবে তাদের দলেরই নতুনদের দ্বারা । কারণ একটার ভেতরে আরেকটার জন্ম । যাক, যা বলতে চাইছিলাম, সবচেয়ে বড় সত্যি কথা যেটা আমার মনে হয়েছে, সেটা হচ্ছে, হাংরিরা মূলত যৌনতাবিরোধী । কথাটা শুনলে ধাক্কা লাগবে । হাংরি কন্সেপ্ট অনেকেরই অধিগত হয়নি আদৌ । কারণ কোথাও কোথাও শুধু নালিশের কবিতাও দেখি । কিন্তু তাদের প্রচারে ছিল—‘নালিশের, ক্ষোভের, রাগের কবিতা হয় না ।’ তাদের লক্ষ্য শিল্প নয়, সত্য । তাদের পথ--বৌদ্ধিক অবস্থাকে নৈরাজ্যের মাধ্যমে তছনছ করে সত্যের কাছাকাছি যাওয়া, সমাজের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক, আর্থিক, ও মৌলবাদী অন্যান্য স্বার্থ দ্বারা লুক্কায়িত অবদমিত সমস্ত তথাকথিত অন্ধকারকে আলোয় টেনে নিয়ে আসা । এই কাজটি অত্যন্ত সুচারুরূপে হয়ে গেছে ইতিমধ্যে, এবং আরো হচ্ছে । এই প্রক্রিয়া আর কেউ বন্ধ করতে পারবে না। প্রদীপ কখনো ছন্দকে সেরকম ভাবে ব্যবহার করেননি । শৈলেশ্বর করেছেন খুব বেশি । শৈলেশ্বর জীবনানন্দের মত সমস্ত অস্বিত্ত্বের ভেতর দ্রবীভূত হয়ে যান, প্রদীপ ভাষার তীক্ষ্ণতায় সংক্ষিপ্ততায় তুলির টানে ধরেন উপলব্ধিকে। প্রদীপের কথা সরাসরি অত্যন্ত নির্বাচিত শব্দের মাধ্যমে । বার বার না পড়লে আসল কবিতাটি অনাবিষ্কৃত থেকে যায় । তার কালো গর্তের ব্যাখ্যা ভারতীয়রা অত্যন্ত স্থূলভাবে করেছে- ইচ্ছে করেই, কারণ তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীরা সকলেই তৎকালীন কাব্যজগতে অনেক শিরোপা আদায় করে নিয়েছেন--যাদের মূল্য একমাত্র আধুনিকতাবাদীদের ধারাতেই বিচার্য । আজ তারা কোথায় ? অলোকরঞ্জন থেকে শক্তি সুনীল এমনকি ত্রিপুরার কল্যাণব্রত পর্যন্ত। হাংরিদের চর্চা হয়, হচ্ছে---গোপনে । নাম বলতে পারি । কিন্তু বলব না । চোখ রাখলেই দেখতে পাবে। তার আগে হাংরিদের উদ্দেশ্যটুকু সম্পর্কে পরিষ্কার হতে হবে । হিন্দি সাহিত্যের খবর আমরা রাখিনা । হাংরি নিয়ে হিন্দিতেই মনে হয় সব চেয়ে বেশি গ্রন্থ রচিত হয়েছে। আমার কাছে নেই । কালোগর্ত যেমন নারীকে ব্যাখ্যা করে, তেমনি ব্ল্যাক হোল-কেও ব্যাখ্যা করে । প্রদীপের ' কবিতাধর্ম ' একটি অসাধারণ গদ্য, এটা পড়লে একজন কবি বার বার নিজেকে খুঁজে পেতে পারেন । কবিতার বিবর্তন নিয়ে বা কবিতার আলোচনার গাম্ভীর্য কতটুকু হাস্যকর হতে পারে একজন কবির দৃষ্টিতে, কেন হতে পারে, এসব নিয়েও তার নিজস্ব বক্তব্য রয়েছে তার ফরাসী সাহিত্য নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে, যা একজন কবির পক্ষে চট করে এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব । গঠনবাদী তত্ত্ব তার আগের সবকিছুকে নস্যাৎ করে, সত্যকেও । জীবনকে নাটক বলেছেন অনেক দার্শনিক । মানিক বলেছেন পুতুল নাচ । ভূপেন হাজারিকা গান গেয়ে স্বীকার করেন-- জীবন নাটকের নাট্যকার সে কি বিধাতাপুরুষ...। তার আফ্রিকান গুরু পল রোবসন বলেছেন--গীটারের একটি ভ্যাম্প (কর্ড) একটি সমাজ পালটে দিতে পারে । কবিরাজ জর্জ ডাউডেন বলেছেন- মেক ইয়োর লাইফ এ পোয়েম, বলেছেন-- মন্ত্রের একটি সিলাবেল-এর উচ্চারণ (হ্লীং ক্লীং ... ইত্যাদি) পালটে দিতে পারে গোটা বিশ্ব(ইউনিভার্স)। শৈলেশ্বর বলেছেন-- বস্তুর ষড়যন্ত্রময় অবস্থান...। এ গুলো সবই ভারতাত্মার কথা । আমাদের সব ধারণাই আসলে পূর্বধারণা । আঁতে ঘা লাগে যখন প্রদীপ বলেন--' তোমার আত্মার অবিশ্বাস্য স্ফু্লিঙ্গগুলি একের পর এক রূপান্তরিত হবে মুদ্রা ও সন্তানে।'...............
বস্তুর ষড়যন্ত্রময় অবস্থান প্রসঙ্গে আরেকটা কথা বলার ছিল, সেটা হল কেউ বলেছেন (মনে নেই) প্রত্যেকটা বস্তুই হচ্ছে শব্দের বা তরঙ্গের জমাটবাঁধা (কঠিনীভূত) রূপ । এই কথাটা যদি hypothesis (যা এখনো প্রমাণসাপেক্ষ ) হিসেবে ধরে নিই, তাহলে উপরের অনেক কথারই জট খুলে যাবে । বৌদ্ধিক স্তরে নৈরাজ্যের ব্যাপারটা খুব ভেবে দেখার । এটা বুঝে নিলে হাংরি কনসেপ্ট একদম পরিষ্কার হয়ে যায় । তাদের কাণ্ডকারখানার ব্যাখ্যা ( যদিও কোন ব্যাখ্যাতেই যেতে কবিতার শরীর বা কবি রাজী থাকা উচিত নয়) বা হদিশ পাওয়া যায় । অন্ধকারেই সব লুক্কায়িত। কিন্তু অন্ধকারের শেষ নেই । তবু সামাজিকভাবে ভেবে কিছু কিছু স্তর তো (অন্ধকারের) আমরা পেতেই পারি । সত্য (গঠনবাদের কথা আপাতভাবে এড়িয়ে গিয়ে) তা সে যতই অর্ধসত্য হোক, বা পূর্বধারণাপ্রসূত হোক, কিছু ব্যাপার তো আমরা আবিষ্কার করতেই পারি অন্ধকারকে তছনছ করে দিয়ে । কবরে গোলাপ বা যেকোন ফুলের কথা আমরা পাই যেমন শৈলেশ্বরে, তেমনি জাফর সাদেকে। আমরা বাল্মীকিকে পাই রত্নাকরের মধ্যে, যখন সে তার পরিবারের মায়াটিকে ভেঙে গিয়ে ছাড়খার হতে দেখে। স্থূল অর্থে 'ঘোলা জলে মাছ ধরা'র কথা বলা হয়। প্রকৃতপক্ষে জল ঘোলা না হলে মাছ বেরোয় না। নজরুল বলতেন 'দে গরুর গা ধুইয়ে' । পদ্মফুল যদি সৃষ্টির প্রতীক হয়, সে পাঁকেই ফোটে । কিন্তু এইসব কোন কথাই নতুন নয় বা হাংরিদের দ্বারাই প্রথম সামনে এল, এমন মনে হয় না আমার । এগুলো আগেও ছিল। এরা প্রকাশের নতুন রূপ বা মাত্রা নিয়েছে মাত্র । সময়ের স্ফূর্তিতে এসব সেন্সেটীভ জায়গাগুলোতে প্রকাশ পাবার প্রয়াস নিয়েছে মাত্র । আমরা কেবল আমাদের পছন্দমত ধারণা নিয়ে চলি । সত্য আমাদের ব্যক্তিগত, কখন সমাজগত নির্মাণ । রবীন্দ্রনাথ স্পষ্ট বলেছেন ' আমার চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ' । আমার বিশ্বাস ' মানুষ একটা ‘ধারণার’ নাম । আমি লিখেছিও । দেখে নাও --'অরক্ষণীয় শব্দাবলী' । তবু এসব সাধারণভাবে আমাদের আটপৌরে জীবনে ভাবার প্রয়োজন পড়ে না । তবে নিজের ভেতরের ধারণাগুলিকে আত্মসমালোচনা দ্বারা অচলগুলিকে পরিত্যাগ না করলে নতুনের জায়গা দিতে অসুবিধে হবারই তো কথা !
২১ প্রশ্ন ঃকি রকম গুলিয়ে ফেলছি সব। দু’একটা উদারণ
দিয়ে যদি বলা যায় ?
সেলিম মুস্তাফাঃ যৌনতা যদি কাব্যচেতনাকে ( এই পৃথিবীতে যা কখনোই মানবতাকে ডিঙিয়ে যায়নি) ছাড়িয়ে যায়, তার উদ্দেশ্য ভিন্ন । এই ভিন্ন উদ্দেশ্যকে প্রদীপরা নানাভাবে আঘাত করেছেন।
' একজন যুবতীর
কষানো উরুর বিস্তারই ছিল কবিদের পতন ও মৃত্যু' (গোলপার্ক) ।
বা
' মিথ্যা নিয়মের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত থাবা
কাউকে রেহাই দেয়না, তাইতো বালিকা
কেবল একবার হারিয়ে যাবার যাওয়ার অপরাধে
আর ফিরে যেতে পারেনি মনিহারি-
মেলা থেকে আলের ধারের ঘরে,
মই লাগিয়ে একদিন আব্রুহীন রাস্তা থেকে তাকে
উঠিয়ে দেয়া হয় গম্বুজনগরে;
সেখান থেকে রোজ সন্ধ্যায় চুঁইয়ে পড়ে
বীর্য ও আতরের গন্ধ--এসো।
নতমুখে কাঁপতে কাঁপতে আমরা
অপেক্ষা করি, কাঁদি ।
এই ধারাবাহিকতা একদিন খোলসের মতো । সকলের শরীর থেকে খসে পড়বে
......পূর্ব গোলার্ধের সবাইর সঙ্গে আমরাও
দেখব একদিন অস্তগামী সূর্য
গলিত সোনার মতো শরীর বিছিয়ে দিয়েছে
শহরের আর গ্রামের/ গ্রামের আর শহরের এ প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে
আর তখুনি পিঠভর্তি চুল এলিয়ে
গম্বুজ থেকে রাস্তায় নেমে এসেছে
আমাদের বোন;
তার মুখে গর্বিত আর অর্থপূর্ণ হাসি ।( নাগরিক উপকথা )
এটি একটি অসাধারণ কবিতা । এখানে সবচেয়ে মরমী জায়গাটা হচ্ছে, কবির আকাঙ্ক্ষা, সুদূর বিশ্বাসে রঞ্জিত শেষটুকু...পুর্ব গোলার্ধের ......।
'হঠাৎ অস্ফুট গোঙানীর শব্দে মনে হয়
খুব কাছেই কেউ একাকী প্রসব করছে
রোমকূপে সমুদ্রের অস্থির নিঃশ্বাস
চোখ খোলার আগেই টের পাই কার
এলোচুল আমার শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে---
ফুঁপিয়ে কেঁদে চলেছে সে...(পাহারা)
আরো দেখো---
' এই ক্ষতস্থান অনেকেই ব্যবহার করেছে,
সংকুচিত নালা
দ্বিখণ্ডিত সূর্যাস্ত
মানুষের প্রণালীতে এনে দিয়েছে
ব্যবহারের অস্পষ্টতা ;
সাময়িক, তবু বিভ্রান্তি---
আমি কখনো আমাকে সম্পূর্ণ দেখতে পাই না।‘ (ব্যক্তিগত-৩)
বা
' আমার বুকে একবারও চেপে ধরেনি
প্রসাধনহীন প্রেমিকা তার বুক...।‘(দুই অধ্যায়)।
বা
'...দাবী আদায়ের বহু পরেও একজন কর্মচারী
মিছিল থেকে বেরুতে পারছে না
আমার বান্ধবীটি কিছুতেই বলতে পারছে না
ক্ষুধা আগুনের মতো সর্বত্রগামী---জামা-পাজামার ও আকাশের মতো সহজ ও অফুরন্ত। (টুকরো লেখা -তিন) ।
২২।
প্রদীপ চৌধূরী’কে আর কোনভাবে
ব্যাখ্যা করতে চাইবেন ?
সেলিম মুস্তাফাঃ না। প্রদীপকে ব্যাখ্যা করা এতটা
সহজ নয় আমার পক্ষে । প্রতিটি পংক্তিতে ভিন্ন ধরণের চমক আর অভিজ্ঞতা এক অন্য উদাসীনতায় নিয়ে যায়, যৌনতা
থাকে, কিন্তু তা এক অন্য মাত্রার
।
'সুরভিত উরুতে
হাত রেখে দেখি তেমনই
প্রদাহ আছে, কিন্তু
সেই পাখিগুলি
ভুল ব্যবহারের ফলে
উড়ে গেছে, চোখে পড়ে,
কালো
কালো ক্ষত ; তাদের ঝলসানো
পালকগুলি সারামুখে
লেগে আছে ।
অভ্যস্ত আঙুল জানে
এ কার অধিগ্রহণ ।
...চণ্ডাল গঙ্গার
কাছে এসে যায়, বলে, যাবে
নাকি !'......(অধিগ্রহণ)
জীবনের পজিটিভ দিকগুলি বা তার স্বপ্ন, যার
জন্য একজন কবির
লেখালেখিতে যুক্ত হওয়া, লিপ্ত হতে
বাধ্য হয়ে যাওয়া, এই আর্জগুলি তাঁর রচনার
আষ্টেপৃষ্ঠে লেগে থাকে। মনে হয় এক কঠিন
বর্মের ভেতর এক অন্য হৃদয় –
'ওদের কোমর
থেকে খসে পড়েছে লাইফ-বেল্ট
এক শতাব্দীর ভুল যুদ্ধের শেষে ওদের
রাইফেলের ভেতর থেকে
বেরিয়ে আসে
বুনো পাখির ঝাঁক
......এখন ইউকেলিপটাসের
গন্ধে পুনরায়
জেগে ওঠে
মহামারীগ্রস্ত এলাকা' (যুদ্ধ)
প্রদীপ ১৯৮০-র
দাঙ্গার পর ত্রিপুরা ছেড়ে চলে যান মাত্র ১৭ বছর চাকুরি করে । কোলকাতায়
গিয়ে একটা প্রাইভেট স্কুলে জয়েন করেন । তাঁর স্ত্রী ত্রিপুরাতেই থেকে যান PWDতে চাকুরীসূত্রে।
১৯৯২ সালে উনিও চলে যান চাকুরী শেষ করে । তাদের এক
ছেলে দিমিত্রি । ওঁর স্ত্রী শান্তিনিকেতনের ছাত্রী, বাড়ি
কৈলাশহর । ওঁর বাবা
প্রমোদ চৌধুরী ত্রিপুরাতে শিক্ষকতা করতেন । হয়ত সেই সূত্রেই প্রদীপেরও চাকুরী পরবর্তী সময়ে ত্রিপুরাতে হয় । এর আগেই তিনি
ত্রিপুরা থেকে এরেস্ট হন
হাংরি আন্দোলনের ব্যাপারে । ভালবাসার বিয়ে হলেও জীবনের দীর্ঘ সময় তাদের ব্যবধানেই কাটে। ওঁর স্ত্রী অত্যন্ত রুচিশীলা
ডিগনিফায়েড মহিলা ছিলেন। ৭/৮ বছর হল উনি গত হয়েছেন ।
প্রদীপ বিশ্বাস করেন শেষ পর্যন্ত একটা কবিজীবন নিঃসঙ্গই !! এর জন্য মানসিক প্রস্তুতি তাঁর ছিল, এখনো
আছে।
' যাবতীয়
জন্মের সংস্কার
আমাকে
সাপটে আছে চারদিক
থেকে ; সন্তানের
জনক
আমি, আমি
পিতা অথবা সন্তান ! ...।
আমি অপেক্ষা করে আছি
কখন উদ্যত ছোরা নিয়ে
আমার
ছেলে আমার দিকে
এগিয়ে আসবে অপরিচিত
পিতার মতো ।' (ব্যক্তিগত-১) ।
একটি কবিতার
শেষ সামান্য নোট রেখেছেন যা তাঁর বিশ্বাসের অংশ--(আর্তুর
র্যাঁবো) কেবল ফরাসী সাহিত্য না , বিশ্বসাহিত্যে
র্যাঁবোর চিরস্থায়ী
তাৎপর্য না বোঝা অব্দি এক লাইনও লেখার অর্থ হচ্ছে, হয়
শব্দ নিয়ে অজ্ঞতার
কানামাছি খেলা, না হয় পুরোনোকে
আরো বেশি পুরোনো বোতলে ঢেলে গেলার চেষ্টা
। আত্মাকে সম্পূর্ণ অরাজক না
করা অব্দি, এবং সেই
অরাজক মানসিক স্তরকে পরিণত
শিশুর হাসি-কান্নার মতো 'সম্পূর্ণ' ভালবাসার
কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া অব্দি
র্যাঁবো কিংবা প্রকৃত কবিতাটির ( নরকে এক ঋতু-র কথা বলছেন প্রদীপ) একটি চুলের নাগালও পাওয়া সম্ভব নয় । আলো এবং
অন্ধকার দুটোকেই তিনি আবৃত
করেছিলেন । তিনি পৃথিবীকে এতটা সম্ভাবনাযুক্ত মনে করতেন হাজার হাজার জীবনেও যার স্বরূপ পূর্ণ প্রত্যক্ষ করা সম্ভব নয় । সব
বৈপরীত্যের মর্মে দাঁড়িয়ে
তার নির্ভুল ঘোষণা " এগিয়ে যাও, এগিয়ে
সারাক্ষণ !" অপরিমেয় তাঁর উদ্যোগ, তাঁর
ইচ্ছা দমে থাকার মতো নয় । নিবৃত্তিহীন তাঁর ক্ষুধা । " না-শোনা এবং নামহীনের(নাম না-জানার) পেছনে ছুটতে ছুটতে ফেটে পড়ুক কবিরা ।"
২৩ । এবার একটু অন্য
প্রসঙ্গ টেনে আনতে চাইছি।
যে-কবির যে স্বভাব এবং
যে-মেজাজ সেই অনুযায়ীই তিনি লেখেন । কেউ লেখেন দার্শনিক ভাষণের
মনোভাব নিয়ে, কেউ লেখেন নিছক শিল্প সৃষ্টির অভিলাষে, কেউ লেখেন মস্তিষ্ককে প্রবল
রেখে, আবার কেউ লেখেন হৃদয় ও অনুভবকে থেকে । আপনার এব্যাপারে ব্যক্তিগত মতামত কি ?
সেলিম মুস্তাফাঃ শৈলেশ্বরও আমার গুরু, এই অর্থে যে, তাঁর কিছু কথা আমি সব সময় মনে রাখি।
'*১। কবিতায় দার্শনিকতার মোড়কে কোন কথাই বা দার্শনিক কোন কথাই থাকবে না।
*২' দার্শনিকতা আবিষ্কৃত হবে কবির সারাজীবনের সমস্ত রচনা বিশ্লেষণ করে, তা করবেন একজন সমালোচক বা পাঠক। আমি জীবনবাদী রচনায় বিশ্বাসী, শুধু শিল্প সৃষ্টি তো প্রাণহীন ব্যাপার । এই জঞ্জাল বয়ে বেড়ানোর কোন মানে আমার কাছে নেই।
একদিন কবিতা যদি শুধু জ্যামিতি হয়ে যায়, তখন হয়ত মস্তিষ্কের কবিতা হবে । কবি যদি কেউ হয়েই থাকে, আবেগ ব্যতিরেক কী করে তার কবিজন্ম সম্ভব ? আবেগ সংকোচন করে স্মার্ট হতে গিয়ে যদি সে শুধু মাথা চালায়, সে তো আমার বিচারে ফাঁকিবাজ, অ-সৎ কবি।
প্রদীপের বিশ্বাস- যার ভিশন (Vision) নেই সে কবি হতে পারবে না । আমিও বিশ্বাস করি যার দূরদৃষ্টি নেই, আনলিমিটেড কল্পনাশক্তি নেই, সে কী লিখবে ? যা লিখবে তা তো তার আগের কারোর লেখার পুনরাবৃত্তিই হবে ! যারা যন্ত্র বানান, তারাও তো আবেগহীন নন । শুধু মাথা দিয়ে মনে হয় না আমার জন্য কেউ একটি ভাল কবিতা লিখতে পারবে, বা জীবনে এর কোন ভূমিকা থাকবে । আবার শুধু আবেগ দিয়েও লেখা হবে না, আবেগের পরিমিতি না থাকলে তা এফেক্টীভ হতে পারবে না । কবির নির্মাণটুকু এখানেই।
এ ছাড়া নালিশের, ক্ষোভের, রাগের বশে কবিতা হবে না , তা যতই প্রতিবাদের হোক । এ সবের জন্য আলাদা আলাদা জায়গা রয়েছে । যারা বিষয়হীন কিছু লিখতে চান, তাদের ক্ষেত্রেই এই সমস্যা আসে।
কবিতায় আমার মতে সত্যের সন্ধান থাকবে প্রচলিত পথগুলি ছেড়ে, কবিতার পথে একটা মাধ্যম (কবিতা) কেন আরেকটা মাধ্যমকে (দার্শনিকতা, শিল্প) নকল করবে, বা সাহায্য নেবে ? কবিতা সবকিছুর মিশ্রণ হয়েও আলাদা কিছু হবে, যেমন সব কিছু নিয়েও সিনেমা সম্পূর্ণ একটি আলাদা মাধ্যম ।
২৪। আপনি তো
ত্রিপুরার ৮০’এর
দশকের কবিদের নিয়ে একটা প্রবন্ধ লিখতে গিয়ে অনেক কাজ করেছেন। আপনাদের সময়ের
ক্রাইসিসের সাথে তুলনামূলক বিচার করলে কিভাবে দেখলেন ‘ত্রিপুরার ৮০’এর দশকের ক্রাইসিসকে ? যদি আপনি আদৌ বিষয়টাকে এভাবে
ব্যাখ্যা করতে চান ?
সেলিম মুস্তাফাঃ দশকের
হিসেব আমার খুব পছন্দ নয় । কেউ তো দশক হিসেব করে লিখতে শুরু করে না। আর যে দশকে শুরু সেই দশকে হয়তো তার
নিজস্ব ভাষাই খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয় । অন্তত ৫/৬ বছর না-লিখলে তার একান্ত নিজস্ব
ধারায় নিজেকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলা কঠিন । অবশ্য ব্যতিক্রম তো থাকেই । যেমন জাফর সাদেক । তবে জাফরের কবিতা তাঁর
কাব্যজীবনের চূড়ান্ত একটা পর্যায়ে লেখা, এটা
তাঁর কবিতা পড়লেই অনুভূত হয় । তাঁর সাহিত্যপাঠের পরিচয় ফুটে উঠেছে তাঁর লেখার
গুরুত্বে, গাম্ভীর্যে, আত্মবিশ্বাসী বয়ানে আর অভ্রান্ত নির্মাণে । তাঁর শব্দপ্রয়োগ
দেখলে, তাঁর পরবর্তী ও দীর্ঘপথ অতিক্রমকারী অনেককেই এখনো দুর্বল আর শব্দের প্রতি
অমনোযোগী মনে হয় । শব্দ তো সাহিত্যের ইঁটস্বরূপ । একে অবহেলা মানে তো ষোলো আনাই
মিছে ! ভাবও গেল, বিষয়ও গেল ! সাতের দশকে শুরু হলেও তীব্র শ্লেষ, তির্যক
বাক্যযোজনা, প্রাপ্তজীবনকে অস্বীকার, যেকোন প্রাপ্তিকে স্বীকার না-করা, নিজের
জীবনের চেয়ে ওজনদার বাক্যযোজনা, অন্য সময়ের অন্য পরিবেশের অন্য জীবনের অন্যের
দর্শনের আলোকে বা অন্ধকারে নিজেকে স্থাপিত করে, নিজেকে জরুরী ও প্রচারিত করার
বায়বীয় প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় । খাওয়া নাওয়া ঘুম আড্ডা নেশা পেশা ভ্রমণ এমনকি সখী-বিচরণ
করেও নকল অশান্তির কষ্টকল্পিত বিলাসিতা কারো কারো রচনায় কখনো কখনো লক্ষ্যণীয় । এটা
সময়েরই অভিব্যক্তি, বাঁশ-কড়ুলের মত সময়েরই উদ্ভেদ । বেশির ভাগ সংকটই কখনো
সমাজরহিত, কখনো ভূমিহীন । দোষণীয় নয়, সময় যা ভাবায়, মানুষ তাই ভাবে । প্রত্যেকের
সময় তার নিজের রচনা—তাঁর অভিজ্ঞতা, তাঁর যাপন, তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক বোধ, তাঁর
দূরদর্শিতা থেকে উৎসারিত বলে মনে হয় আমার । রচনাকাররা নিজেকে সৃষ্টিকর্তা ভাবেন,
কিন্তু সময়ই প্রকৃত লেখক । আটের দশক আমার মতে, পরিবর্তনের একটা অস্থায়ী ক্যাম্প, অতীতের
সঙ্গে আগামীর হাওয়ার রসায়ন । যাঁরা এখানে অসুবিধে বোধ করেছেন তাদের কারো কারো কিছু
কিছু রচনা দার্শনিকতায় ভারী হয়ে উঠেছে, যা তাঁর অস্তিত্বের চেয়েও কখনো ভারী বলে
মনে হয় আমার । প্রতিবাদ মাত্রা ছাড়াতে ছাড়াতে কখনো ফ্যাশনের
পর্যায়ে চলে যাচ্ছে । এই প্রবণতা জলীয় । তবে আস্তে আস্তে কেউ কেউ তার মাটি খুঁজে পাচ্ছেন, কেউ কেউ এখনো
কল্পলোকের শূন্যতায় । আত্মস্থ না-হলে কি ফেরা সম্ভব ? কবিতা সৃজনাত্মক
পরিবেশনা বা উপস্থাপনা । তাই বিষয়ে কোন
মন্তব্যই সঠিক না-ও হতে পারে । আমি আমার সময়
থেকে কথা বলছি, এটা কখনোই প্রামাণিক ধরে নেয়া ঠিক নয় । তুমি জানতে চাইলে তাই বললাম
। আমাদের শুরুর সময়ের সঙ্গে ৮-এর দশকের সংকটের বাহ্যিক দিকটাই শুধু দেখা গেলো ।
কিন্তু সংকটের প্রকৃত বসতি তো রচনাকারের অন্তরে । তাই কেউ কোথা থেকে লিখছেন, অন্তর থেকে,
নাকি নিউজপেপার থেকে, সেটা চট করে ধরা যায় না । আমার মতে ব্যক্তিগত পরিচয়
না-থাকলে, বা একজনে সমস্ত রচনার পাঠ না-থাকলে কোন মন্তব্য করা ধৃষ্টতা । সংকট ধরা
যায় না । আর ধরা যায় না বলেই সংকট আরো ঘনীভূত হয়, আর এই সংকট লেখকের চেয়ে পাঠকের
বেশি !
২৫। ত্রিপুরায়
কার কবিতা ভালো লাগে না-লাগে এরকম বিব্রতকর প্রশ্ন করবো না । তার বদলে জানতে চাইবো, এই সময়ের কবিতাকে আপনি কিভাবে দেখছেন ? কোথাও
কি কোন অপূরণ
সেলিম
মুস্তাফাঃ জীবনে যার যার পাওনাটুকুর স্বীকৃতি যেন নেই কোথাও ।
থাকলেও খুব কম । তার চেয়ে বেশি তাদের
জেহাদ, দুঃখ, অযথা প্রতিবাদ আর বিভ্রম, বিভিন্ন ‘বাদ’-এর স্থূল চিহ্নায়ন, সম্পর্কহীন
জল মাটি আর মানুষের অনুষঙ্গের আমদানী, নিজের অবস্থান স্বীকার না-করে অন্য ভুবন
থেকে লিখে যাওয়া । কবিতা যেন শুধুই নালিশের জন্য । মুষ্টিমেয় কয়েকজন বাদে, টের পাওয়া যায়, সাহিত্যপাঠ সকলেরই অত্যন্ত নগন্য । লেখা
অত্যন্ত তাৎক্ষণিক । ফেসবুকের কল্যাণে লেখা হবার সঙ্গে সঙ্গেই পাঠকের দরবারে চলে
আসছে অজস্র ভুল বানান আর নির্মাণের অপটুতা নিয়ে। লেখা ছড়িয়ে যাচ্ছে বিশ্বজুড়ে অসংবৃত অবস্থায় ।
সময় নেই নিজেকে দেখার, নিজের সৃষ্টিকে দেখার । এতে অনুমান হয়, দ্রুত আরেকটি
পরিবর্তন হয়ত আসছে । আমার এই বলাটা হয়ত গোঁড়ামী মনে হচ্ছে, পুরাতনী মনে হচ্ছে ।
তবে এটা ঠিক, আগামীর দিনগুলো আরও পাতলা, আরও স্বচ্ছ, এবং অবশ্যই আরও নির্দয় ।
কবিতে কবিতে দলাদলি, প্রতিযোগিতা, অবিশ্বাস আরও প্রকট হবে, আবার সমন্বয়ের জন্যও
কেউ কেউ মাথা ঘামাবে । হাস্যকর । যারা থাকবে, লেখার জোরেই থাকবে । সৃজন সব সময়ই
নিরিবিলির চর্চা ।
তবু
কারো কারো লেখায় আশ্চর্য কল্পনাশক্তি আর জীবনকে পর্যবেক্ষণ করার মোক্ষম উপস্থাপনা
দেখি । তখন বিস্ময়ের সঙ্গে ভাবি যে আমি কেন তার মতো নজর পেলাম না ! তখন কবি আর কবিতার প্রতি আবার বিশ্বাস ফিরে আসে, আর
মনে হয় কবিতা একজন পাঠককে যা দিতে পারে তা চিরস্থায়ী দেয়া, এবং সৃজনের আর কোন
মাধ্যম তা দিতে পারে না । একটা সার্থক
কবিতা একজন পাঠককে চিরজীবনের জন্য পালটে দিতে পারে ।
২৬ । ‘শব্দের অতিরিক্ত মিতাচার । কাজেই চাতুর্য বেশি’ – কথাটার মধ্যে কি ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে না ? এভাবে আপনি বলতে পারেন কি ? যে জায়গায় আপনার ছোট ছোট মিতাচারী কবিতার সংখ্যা নেহাত কম নয়।
সেলিম মুস্তাফাঃ আমার ছোট কবিতায় যা বলা আছে তাই এর অর্থ । অভিজ্ঞতা ছাড়া নয় । তবু কিছু তো আছেই । তুমি
হয়ত লক্ষ্য করনি,
আমি বলেছি, যখন অভিজ্ঞতা থাকবে না, তখনই দর্শনের আশ্রয় নেবার প্রয়োজন দাঁড়াচ্ছে । তাছাড়া ঝুঁকির কোন ব্যাপার নেই । আজ যা সত্য মনে হয় , আজ তা সত্য।
২৭। এর একটা কারণ কি এটা হতে পারে, আপনারা যে সংগ্রাম করে ‘কবি’ উপাধি লাভ করেছিলেন, আজ সে
রকম কিছু করতে হয় না। বই ছাপাটাও চলে এসেছে হাতের মুঠোয়। না, সহজ কথায় বলা যায়, সমসাময়িক নতুন কবিদের কাজ নিয়ে কোন যুগেরই পূর্বজ কবিরা খুশি হতে পারেন নি, তারই একটা ধারা আপনিও বহন করছেন ? এই অভিযোগের প্রেক্ষাপটে আপনি কি আরেকবার ভেবে দেখতে চাইবেন যেখানে আপনি নতুন কবি সম্পর্কে বলছেন
-- ‘ কোথাও না কোথাও জীবন নিয়ে, সংকট নিয়ে, শব্দ নিয়ে, তাৎক্ষণিক ফল লাভের আশায় জাগলারি চলছে ।’
সেলিম মুস্তাফাঃ জীবনকে যাপন করছি । এটা যদি সংগ্রাম
হয় তো সংগ্রাম । কবি হবার জন্য আলাদা কিছু করিনি । তা ছাড়া কবি হলাম কি হলাম না,
তা বলবে কে ? আর তবু, যদি কবি হয়েই থাকি,
তাহলে তো আমৃত্যুই কবি ! এখানে সময়ের কোন বাউণ্ডারী নেই । সকলেই এই সময়ের কবি ।
আবার প্রত্যেকের সময়ও ভিন্ন ভিন্ন । ‘এই সময়’ কথাটা হয়তো বলা যায়, কিন্তু কারোর
সঙ্গে কারোর সময়ের তুলনা চলে না । যারা আগে জন্মেছেন তারা অগ্রজ, বয়সে প্রাচীন,
সময়কে দেখার আর লালন করার তথা ব্যবহার করার পদ্ধতি আলাদা । যেকোন জিনিষকেই দেখার
আঙ্গিক কারোর সঙ্গে কারোর মেলার কথা নয় । যদি হতো তাহলে সৃজনশীল কাজ এই বিশ্বে হতো না।
বিভিন্ন ইজ্ম্-এর জন্ম হতো না, যেমন কিউবিজ্ম্,
শুধু তো দেখার ভঙ্গী আলাদা, তাই তাৎপর্যও আলাদা । কবিতাকে কে কিভাবে দেখেন সেটাও
একটা ব্যাপার ।
৬০-এর দশকের কেউ কেউ এখনো এখানে আছেন, যারা নিজের লেখা নিজেই বিশ্বাস করেন না । জায়গার গুণে বা কাছাকাছি থাকার গুণে হয়ত এরাই এই প্লাস্টিক কবিতার চকচকে ধারাটির জন্ম দিয়েছেন । আমার মনে হয়েছে এখানে জীবন কোন বিষয় নয়, শুধুই চতুর শব্দযোজনা ? কিংবা বলতে পারি , আমি এগুলো ঠিক বুঝিনা । আর এভাবে বোঝাটাও ঠিক হবে না, কারণ পৃথিবীর তাবৎ মৌলিক রচনাই ভিন্ন ভিন্ন । তুলনার কোন ব্যাপারই নেই । যে যা লিখছেন, সময় যদি তাকে বয়ে নিয়ে যেতে পারে, তবে তো কোন কথাই নেই ! বিচারক যদি কেউ থাকে, তা সময় । লেখা অবশ্যই ব্যক্তির কবিসত্ত্বাটিকে কোয়ালিফাই করবে। এখানে কোন কালেই কোন সন্দেহের অবকাশ ছিল না । আজো নেই । জীবনের আঁশ কবিতায় যদি না থাকে তবে তা তো Art for art sake হয়ে যাচ্ছে । তবু মন্দ নয় যদি কবির ইচ্ছা পূরণ হয়, যার জন্য এত হাঙ্গামা । শেষকথা অবশ্যই সময় । মানে ভবিষ্যত । শেষকথা মানে ফলাফল, যদি কেউ ফলাফল জানতে চায় । কবিরা সম্ভবত ফলাফলের জন্য বসে থাকেন না । কারণ
লেখার সঙ্গে সঙ্গেই যে ফলাফল উঠে আসে, এর পরে আর কিছু পাবার থাকে না ।
ত্রিপুরায় একটা সম্ভাবনা ছিল সত্যিকারের জীবনবাদী লেখার । ত্রিপুরার বাইরের যে সব লেখা দেখি (যেমন ফেসবুক’কে ধর) বাংলাদেশের কিছু লেখা ছাড়া বেশিরভাগ লেখাই জলো, পঙ্গু,বা অতিস্মার্ট । তাহলে কেমন হবে কবিতা ? আমি জানি না । কেউ জানে না । শুধু মাঝে মাঝে বলা যেতে পারে (অবশ্যই পাঠক হিসেবে)--না, এরকম নয় । আগের একটা কথাই আবার বলছি--বর্তমান কবিতাবলি সামূহিক যে-জীবনের ইঙ্গিত বহন করে গণজীবন এখনো সেই ধারায় এসে পৌঁছোয়নি ।' যদি পৌঁছায়ও, দেখা যাবে গ্যাপ্ রয়ে গেছে কোথাও । সুধীন্দ্রনাথ , বুদ্ধদেব বসুরা এরকমই হয়ত আত্মবিশ্বাসহীনতার যাঁতাকলে পড়ে মিউজিয়াম হয়ে গেলেন, তবে এখানেও , যদি কেউ চায় তার বিশ্বাসকে খুঁজে পেতে পারে । কারণ ঘটনা দুর্ঘটনা সবই অভিজ্ঞতা মাত্র। আমরা তাই খুব সরল ভাবে , সাধারণ মানুষ হিসেবে চট করে রবীন্দ্রনাথ থেকে জীবনানন্দে চলে আসি । মানুষ, হয় বাঁচার জন্য, আনন্দের জন্য, তৃপ্তির জন্য, তার সুবিধার জন্য সব সময়ই, গ্রহণের চেয়ে বর্জন করে বেশি ।
২৮। আপনার কাব্য জীবনের শুরু “বাহান্ন তাসের পর” এর
মত দীর্ঘ কবিতা দিয়ে। ত্রিপুরার দীর্ঘ কবিতার ইতিহাসে নিঃসন্দেহে আপনি প্রথম সারির অনিবার্য একজন
। দীর্ঘ কবিতার সুখ,অসুখ, প্রাপ্তি , ব্যাপ্তি নিয়ে কিছু সহজ সরল অনুভব জানতে চাই আপনার কাছ থেকে । আপনি কিভাবে নিজের সাথে একে অঙ্গীভূত করেন ? স্বস্তি’টা কোথায় পান ? নির্দিষ্ট কোন লক্ষ্য নিয়ে এগুতে হয়, না-কি চেতন-অবচেতনের ডলাডলিতে শেষ
অবধি যা দাঁড়ায় , তাই দীর্ঘকবিতা ?
সেলিম মুস্তাফাঃ না, কোন টার্গেট নিয়ে নয় । মানুষের সামনে
শুরুতেই একটা অদৃশ্য টার্গেট স্থির হয়ে থাকে, সেটা তার জীবন । এই টার্গেট অবহেলা
করলেই বিপদ । মিথ্যাচারের বিপদ সামনে এসে দাঁড়ায় । এজন্য অনেকেই নিজের জীবনকেই
বিদ্রূপ করে লেখালেখি শুরু করে ফেলেন, এমনকি লেখালেখির শুরুতেই, জীবনকে
বিন্দুমাত্র স্বীকার করার আগেই ! বিরূপ মনোভাব নিয়ে শুরু করলে, মূল জীবনে ফেরার আর
পথ থাকে না । ‘সুভা কা ভোলা সাম্ কো ‘ আর
ঘরে ফেরার পথ পায় না , পেতে পারে না, তার ‘নকল প্রতিবাদী ইমেজ’ তাকে ঘরে ফিরতে আর
এলাউ করে না ।
আমার লেখা, সে বড়
হোক আর ছোটই হোক, লিখতে লিখতেই আসে । তবে বড় লেখা একটা ঘোরের মত চেপে ধরে থাকে শেষ না হওয়া পর্যন্ত । আসলে এর প্রস্তুতি হয়ত শুরু হয় লেখার অনেক আগে থেকেই । পুরো স্নানের মতই, ওটাতে লিপ্ত থেকে যেতে ভাল লাগে । বা লেখাটাই টেনে ধরে রাখে । দীর্ঘ কবিতা অন্যের কাছে কেমন জানিনা, আমার কাছে উপন্যাসের জীবনতৃষ্ণা নিয়ে আসে । কোথাও পৌঁছানোর লক্ষ্য যে একেবারে থাকে না, সেটাও নয়। ডলাডলির কোন ব্যাপার নেই, কুস্তি করে কি আর কোন রচনা হয় ? ক্রমশ গভীরের দিকে যাত্রা চলে । সুর কেটে গেলে আর ফেরানো যায় না । কোন একটা বিষয় কাজ করে না, বরং একটা সময়, একটা গণজীবন, বা একটা জনপদ, বা একটা শ্রেণি বা একটা নদী, একটা পাহাড়, বা একটা বিশেষ চরিত্র বা একটা আদর্শ মূল সূত্র হিসেবে কাজ করে থাকে। এসব ব্যাখ্যা দেয়া যায় না । বরং বলা যায় আমি যা জানিনা সেটাই চরিত্র হয়ে দাঁড়ায় । অন্বেষাই টেনে নিয়ে যায় । দীর্ঘকবিতা-র অর্থ জীবনকবিতা- life poem !
২৯ । ‘তীব্র বিষক্রিয়া ছড়িয়ে পড়েছে
বাতাস কখনো উত্তরে , কখনো দক্ষিণে
অনাবশ্যক চাঁদ
আবার উঠে এসেছে আকাশে ,কেউ
জাগেনি কোথাও, সর্বত্র
স্পষ্ট হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে
মানুষের প্রয়োজনহীনতা’
কিংবা
‘কারা যেন সরছে
কারা যেন সরে যাচ্ছে লোটা কম্বল ঘটি বাটি
কোলের সন্তান নিয়ে –
মেরুদণ্ড হাতে নিয়ে কারা যেন সরে যায়
পুবে ও পশ্চিমে ’
উপরের মারাত্মক লাইনগুলি ‘ইতি জঙ্গল কাহিনি’ থেকে নেওয়া। যতদূর
জানি, এই
দীর্ঘ কবিতাটি আপনি কাঞ্চনপুর থেকে ফিরে আসার পর লিখেছিলেন। আমার জানতে
ইচ্ছে করছে, জঙ্গল-ইতিপূর্বে আপনার এমন মনে হওয়ার পেছনে কি কোন প্রেক্ষাপট ছিল ? পুরো কবিতাটাতেই যেন ক্ষোভের আগুণ জ্বলছে।
‘পায়ের দাগ ধরে এসে কে যেন মরে পড়ে থাকে
--
একা --
উপুড় করা শরীর।
তার উপরে ?
তার উপরে কী চাঁদ, নাকি চন্দ্রালোক ?
হায়! স্তব্ধ অরণ্যে এ কোন বিস্মিত ভোর !’
এইসব রোমহর্ষক লাইনগুলো পড়তে
পড়তে মনে হল, এটা যেন একটা স্বপ্ন ভঙ্গের আত্ম-ক্রন্দন। সত্যিই কি ‘ইতি
জঙ্গল কাহিনি’ তাই ?
সেলিম
মুস্তাফাঃ জানি না । কিন্তু এখনো পড়লে আমি জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়ি । মনে হয় স্তব্ধ অরণ্যে এ কোন বিস্মিত ভোর !’ যেন আদিম পৃথিবীর কোন এক দৃশ্য যা কোন দীর্ঘ এক টানেলের পর এসে হঠাৎ এসে উন্মুক্ত হয়েছে । প্রশ্ন করো না, প্রশ্নের কোন জবাব কখনো হয় না ।
তবে লেখাটা ওখানেও লেখা হয়ে থাকতে পারে, সঠিক মনে পড়ছে না । কারণ আমি ১৯৮৩ শেষে বেরিয়ে এসেছি । ১৯৮৪/৮৫ খুব অস্থির ছিলাম বদলি ইত্যাদি নিয়ে । ১৯৮৫-র শেষে বিয়ে । এর পর ৫ বছর লিখিনি । ১৯৮৯-র শেষ বা ১৯৯০ থেকে আবার শুরু ।
‘ইতি জঙ্গল কাহিনি’-র নাম প্রথম ভেবেছিলাম 'অথ জঙ্গল কাহিনি' । আসলে আমি বেরোতে চাইনি হয়ত ।
৩০। আপনার ‘ভাষাশহিদ স্টেশনের দিকে একটি আহত ট্রেন’ কাব্যগ্রন্থে রাজনীতি
,প্রতিবাদ, মিলেমিশে একাকার ।বিশেষত ভাষা-রাজনীতি । আপনাকে
এভাবে সরাসরি স্থানিক ব্যাপারে মাথা
ঘামাতে দেখা যায় না। হঠাৎ মনের এই পরিবর্তন ?
সেলিম মুস্তাফাঃ হঠাৎ নয়। প্রতিবাদ তো চিরকালই ছিল। বুকে লুকিয়ে ছিল । ভাষার রাজনীতিটা আগে ততটা বুঝতাম না । রাজনীতিতে এখন তো আর নীতি নেই, কৌঁশল আছে । আগেও ছিল অবশ্য । গোটা উত্তরপূর্বাঞ্চলের প্রতি নেহেরুর অবজ্ঞা ছিল । গান্ধীকেও আমার কুচক্রী মনে হয় । এসবই দানা বাঁধতে বাঁধতে প্রকাশিত হচ্ছে । এই সব প্রতিবাদই চিরকালীন বলা যেতে পারে এই অর্থে যে, এগুলো মূলত সকলেরই প্রতিবাদের বিষয় হবার কথা কোন না কোনভাবে, যদি না হয়, সেটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলব। কোন স্থানিক ব্যাপারে খুব একটা প্রতিবাদ আমার নেই । (প্রকাশ্য) প্রতিবাদই কবিতা নয়, যদিও অনেকে বলেন, কবিতা একটা ইচ্ছা মাত্র ! তবে যারা কবি, তাদের জন্মই একটা প্রতিবাদ । নতুন করে লোকদেখানো কিছু করা বা বলা একটু দুর্বলতাও বটে। কিন্তু প্রতিপক্ষও তো 'বহেরা' বা 'কালা' হয়ে থাকে ! মানুষের বোধশক্তি যদি অবুঝ হবার ভান করে, তখন তো জোরে কথা বলতেই হয়! এটাই প্রকাশ্য প্রতিবাদ, শিল্পের বিচারে স্থূল আর নিম্নশ্রেণির তৎপরতা, আত্মবিশ্বাসহীন কবির উচাটন !! চাঁদের যে পিঠে আলো নেই, তার জন্য হাহাকার বুঝতে পারি, যে পিঠে আলো আছে তা আমরা উপভোগ করি কিন্তু তার জন্য স্বীকারোক্তি কোথায় ?
৩১।. 'স্বীকারোক্তি' বলতে ঠিক কি বুঝাতে চাইছেন , বুঝতে পারলাম না । আর একটু যদি খুলে বলেন ?
সেলিম মুস্তাফাঃ এটা বয়স না হলে, নিজের কাছে নিজে না দাঁড়ালে, একা না থাকলে , হয়ত বোঝা যায় না । কনফেশন । নিজের-ই কাছে । আত্মসমালোচনার অভ্যেস না হলে, সাহস না হলে, এটা অর্থহীন ।
৩২। কবিতায় ‘দার্শনিকতা’র প্রভাবকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করেন ? জানি, আপনার স্বভাবসুলভ উত্তর হবে –‘ কিছুই ভাবি না!’ কিন্তু আমি চাইছি না আপনি এ’ভাবে বিষয়টা দেখেন। আমাদের লেখার মধ্যে ‘দেখা’র দর্শন তো স্বাভাবিকভাবেই থেকে যায়। প্রশ্ন তার মাত্রা নিয়ে। অনেকের কবিতায় লালনের মত একটা দার্শনিকতা লক্ষ্য করা যায়, এটাকে আপনি কিভাবে দেখেন ?
সেলিম
মুস্তাফাঃ দার্শনিকতা শিখে
কেউ কবিতা
লিখতে বা সাহিত্য করতে
আসেনা । বহু
নিরক্ষর গ্রাম্য কবি, নৌকার মাঝি, বাউল, ভিকিরি আছেন
যারা এটা
জানেন না, বোঝেন না, কখনো শোনেননি । কিন্তু তাদের
গানে, কথায় দার্শনিকতা ফুটে ওঠে
স্বাভাবিকভাবে । কোন
অসুবিধা তারা
অনুভব করেন
না।
কিন্তু শিক্ষিত মানুষদের (কবি সাহিত্যিকদের) রচনায় দার্শনিকতার ব্যাপারটা খুব
স্থূলভাবে আলগা
হয়ে যেন
বসে । এর কারণ এরা
কাজটা খুব
সচেতনভাবে করেন
রচনাটির গুরুত্ব বাড়বে ভেবে
। আমরা কি দার্শনিকতা জানার
জন্য কোন
রচনা পড়ি ? মনে হয় না । তবে
দার্শনিকতারও পাঠক
আছেন । তারা
হলেন গবেষকরা । সেটা তারা
করে থাকেন
নির্দিষ্ট রচনাকারের জীবনাদর্শ জানা
বা বোঝার
জন্য যা তার গবেষণাপত্রের জন্য দরকার । কিন্তু
সার্থক গবেষক
তার আলোচ্য
ব্যক্তির দ্বারা
যুক্ত বা উদ্ধৃত দার্শনিক বাক্যটিকে গ্রহণ
না করে, তার রচনার
অভিমুখ থেকে
উদ্ধার (স্থির) করেন তার
জীবনাদর্শ, বা ভঙ্গিমা, বা বিশ্বাস বা অবিশ্বাস, বা ঘৃণা বা ক্রোধ বা ভালবাসা বা যে কোন
আচরণ এবং
অন্য রচনায়ও
তার সমর্থন
খোঁজেন । লেখকের
দার্শনিকতা তার
আয়ত্তে থাকে
না, থাকতে পারেনা , কারণ এ-ব্যাপারে তার মনযোগ
না থাকার-ই কথা।
কারোর জীবনের
আজকের দার্শনিকতা আগামী কাল
পালটে যেতেও
পারে । জীবন
সব স্থির
করে দেয়
। এর জন্য
কোন মাথাব্যথা থাকার কথা
নয় । এছাড়া
লেখক দ্বারা
স্পষ্টিকৃত দার্শনিকতা তার রচনার
সবচেয়ে দুর্বল
অংশ। কারণ
যে দার্শনিকতার তিনি উল্লেখ
করেন সেটা
কোনভাবেই তার
নিজের নয়।
যেকোন দার্শনিকতা যিনি সুচারুভাবে ভাষার অন্তরে
আড়াল করতে
পারেন , তিনিই দক্ষ লেখক ! অন্যের বাণী
বা ধারণা
গ্রহণ করলেই
তো সেটা
আর মৌলিক
থাকেনা । দার্শনিকতা কেউ সৃষ্টি
করতে পারেনা
। স্থান কাল
পাত্র যে প্রভাব ফেলে
জীবনে তার
অন্তিম অনুভব
থেকেই হয়ত
এমন কোন
সিদ্ধান্ত বা সত্যের (অবশ্যই খণ্ডিত) ধারণা মনে গড়ে
ওঠে, যার চ্যানেল থেকে
সহজে পার
পাওয়া যায়
না। এছাড়া আছে পূর্বধারণা, যার হাত থেকে
কারো নিস্তার নেই। কবিতা
বা এককথায়
সাহিত্য আমার
মতে দার্শনিকতা করার জায়গা
নয়। আমরা
তো কবি
হতে চাই, দার্শনিক নয়।
৩৩ । ‘হৃদয় থেকে জাম্পুই অব্দি ’ আপনার একটা গদ্য প্রকাশিত হয়েছিল সম্ভবত ১৯৮২ সালে। ‘ত্রিপুরা দর্পণ’ সংবাদপত্র’এ। ঔ রচনার প্রেক্ষাপট ও অনুভব নিয়ে কিছু জানতে চাই ? কবি সমর চক্রবর্তী’র কাছে এনিয়ে একটু কথা শুনেছিলাম। এবার সুযোগ যখন হল সরাসরি আপনার কাছ থেকে জানতে চাইছি।
সেলিম মুস্তাফাঃ 'হৃদয় থেকে জম্পুই অব্দি ' একটি রম্য-ভ্রমণ গদ্য। 'ত্রিপুরা দর্পণ ' সংবাদপত্রটির ১৯৮২ সালের পূজা সংখ্যায় প্রকাশিত হয় । সদর্থে ত্রিপুরার প্রথম ঔপন্যাসিক দুলাল ঘোষ কাগজটির পক্ষে আমাকে উৎসাহিত করেন লাখাটির জন্য। আমি তখন ত্রিপুরা গ্রামীণ ব্যাঙ্কে সদ্য চাকুরি পেয়ে কাঞ্চনপুরে পোস্টিং পেয়ে জয়েন (২৪.১১.১৯৮০) করেছি, হ্যাঁ এক বছরের ওপর হয়ে গেছে । তখন (এখনো) বড় ম্যাগাজিন বা বই ইত্যাদি কোলকাতা থেকে ছাপানো হতো । কাজেই প্রুফ দেখার একটা জটিলতা থেকেই যেতো, ফলে আমার রচনাটির ভাগ্যেও কিছু ক্ষতচিহ্ন থেকে গেল । আমার তৎকালীন ব্যাঙ্ক ম্যানেজার তপনময় চন্দ সব জানার পর আমাকে খুব উৎসাহিত করেন, এমনকি আমাকে কাজের ফাঁকেও লেখাটির জন্য সুযোগ করে দিতেন, কখনো কাজ কম থাকলে টিফিনেরপর না এলেও চলতো । আমি ওখানকার মেস-এ বসে তখন লেখটিকে এগিয়ে নিয়ে যেতাম । তিনি ব্যাংকের তরফে জম্পুই-এ তোলা কিছু ছবি দিয়েছিলেন যা আমার রচনাটির জন্য খুব উপযোগী হয়েছিল । 'ত্রিপুরা দর্পণ ' -এর কাছে শ্ররত ছিল তারা ছবিগুলো ফেরত দেবেন । দেন নি । কথা ছিল জম্পুই-এ আমার যাতায়াত খরচ বাবদ কিছু দক্ষিণা (রাহা খরচ) দেবেন । দেন নি। তারা আমাকে পত্রিকাটির একটা কপিও দিতে চান নি। আমি কাঞ্চনপুরের এজেণ্ট-র কাছ থেকে প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে যাই একটি কপি আর 'ত্রিপুরা দর্পণ ' -এর সম্পাদককে বাজে ভাষায় একটা চিথি লিখে তা জানিয়ে দিই। পত্রিকাট প্রকাশের আগেই আমার কাছে খবর আসে যে আমার ঐ রচনাটি-ই নাকি ঐ সংখ্যার উল্লেখযোগ্য রচনা । কিছু ছবি আমি নিজেও তুলেছিলাম, কিন্তু জম্পুই বেশিরভাগ সময়ই মেঘলা থাকে বলে আমার দীন ক্যামেরায় ছবি ভাল আসেনি। কিছু জিনিষের ছবি তোলার পর, ঐসবের মালিকরা শর্ত রাখেন যাতে তা প্রকাশ করা না হয়, সেটা অবশ্য চুরি ডাকাতির ভয়ে। আজ আমার কাছে কোন ছবি-ই নেই ।
পরবর্তী সময়ে এই লেখটি দেবব্রত দেব সম্পাদিত মাসিক সাহিত্যপত্র 'একুশ শতক '-এ প্রকাশিত হয়। কিন্তু আমার কাছে এর কোন কপি নেই । পাণ্ডুলিপিটাও নেই । আর আগের সেই জাম্পুই পাহাড়-ও নেই । নেই সেই আদিম কৌমার্যের সৌন্দর্য বা রহস্য ! আমার লেখাটাই সম্ভবত জাম্পুই নিয়ে কোন প্রথম রচনা । এখন তো দলবাবুরা যান, মন্ত্রীরা যান, । আগে শুধু সৌন্দর্যপিয়াসীরা যেত, আর কমলার দালালরা যেত, এখন শুধু দালালরাই যায় । কারণ সকলেই এখন কোন না কোন কিছুর দালাল ! আমার মনে হয় এই লেখাটা যদি তুমি পড়ে নিতে তবে সেটাই ভাল হত। কত বলব ? বলতে হলে পুরোটাই বলতে হয়, সেটা সম্ভব না । সেখানে যা লেখা আছে তা সবই সত্যি আর বাস্তব। বানানো কোন কথা নেই । আর খুব সাধারণ হলেও কিছু ইতিহাস পাবে ।
দেবুদার কাছে খোঁজ নিলে পাবে । তাহলে আমিও পেয়ে যাবো ।
৩৪। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আপনার মননে কি কোন মৌলিক প্রভাব রাখেন ? তাকে কি অনুভবের কোন এক জায়গায় আপনার চিন্তার ‘দিগ- দ্রষ্টা’ মনে
হয় ?
সেলিম মুস্তাফাঃ রবীন্দ্রসঙ্গীত আমার প্রিয় । সাহিত্যে তথাকথিত আধুনিকতার অনুষংগ ,উপকরণ তথা ব্যাধিগুলি জানতেন বা অনুমান তাঁর ছিল বলে, পূর্বাহ্নেই জীবনের প্রতি ভালবাসার পুনরুত্থানের কথার ইঙ্গিত দিয়েই রেখেছিলেন। জীবনকে স্বীকার না করে তো তার কাটা ছেঁড়া করা যায় না । কিন্তু জীবনচক্র স্বীকার করার
মধ্যে যে
আনন্দ, তার স্বীকৃতি আজো তেমনভাবে দেখা যায় না । কিন্তু তা আসবে, কারণ এক তরফা কিছু হয় না । সম্প্রতি অনুপম মুখোপাধ্যায়ের একটি গদ্য রচনায় সেরকম একটি ইঙ্গিত পেলাম । তিনি বলছেন পু্নরাধুনিক ( neo-modern, re-modern নয় )। এটা রবীন্দ্রনাথ কথিত সেই আশ্বাসের কথাই। নিশ্চয় তিনি আমার মননে আছেন । সব তো পড়িনি, পড়লে আরো কত জানবো কে জানে ! তিনি সম্পূর্ণ একটি জীবনের অভিজ্ঞতার কথাই বলেছেন । আধুনিক (৩০-এর দশকের পর থেকেই) সাহিত্য আমার মনে হয় পূর্ণতায় বিশ্বাসী নয় , বা আদৌ কোন 'বিশ্বাস'-ই আধুনিকতা বহন করে না ! সেই অর্থে রবীন্দ্রনাথ আজো বেশি প্রাসঙ্গিক ।
৩৫।এই
যে বললেন-জীবনচক্র
স্বীকার করার মধ্যে যে আনন্দ, তার স্বীকৃতি আজো তেমনভাবে দেখা যায় না। কিন্তু তা আসবে, কারণ এক তরফা কিছু হয় না ।” --এই কথাটা যদি আর একটু গুচিয়ে বলেন ?
সেলিম
মুস্তাফাঃ জীবনের সব কিছু স্বীকার করে নেয়া । একটা কথা আছে ' গিভেন পজিশন বা গিভেন সিচ্যুয়েশন’। অর্থাৎ, যখন যেখানে যা দেয়া আছে, তাতে কোন প্রশ্ন না করে কাজ করে যেতে হবে।আরেকটা কথা আছে -'এজ ইজ হোয়ার ইজ' । একই ব্যাপার, যেখানে যা আছে, সেই অবস্থায় দায়িত্ব নিতে হবে, সমাধান করতে হবে , মেনে নিতে হবে । জীবন তো যুদ্ধ-ই ! যুদ্ধ কি কেউ সাজিয়ে দেয় ? আমার কথার অর্থ হল--জীবনচক্র এমনই ।
ভাল সময় খারাপ সময় বলে যদি কিছু থাকে তা একটার পর আরেকটা আসে । খুব বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ।
একটার ক্লাইম্যাক্স চূড়ান্ত হলেই শেষ হয়, এবং মনে হয় আরেকটা এলো। দিনের পর রাতের মত ।
জীবনচক্র এরকমই ।
৩দিন উপবাস থাকার পর যদি কেউ ভাত খেতে পায় , ভাবে -- আমার সুদিন এলো ।
একটা মেনে না নলে আরেকটা র উপলব্ধি হবে না ।
কবিরা, তাদের জীবনে যা নেই, শুধু তার কথাই বলছেন যা আছে তার কোন স্বীকৃতি নেই ।
প্রশ্ন উঠবে --কার কাছে স্বীকৃতি ? উত্তর -- যার কাছে নালিশ, ক্ষোভ, তার কাছে ।
ঈশ্বরও হতে পারেন , পাঠকও হতে পারেন কবি স্বয়ং-ও হতে পারেন । যে চক্রের কথা বললাম, তা কাল্পনিক নয় ।
'সম্ভাবনার অংক' করলে দেখা যাবে যে, একটা কয়েন ১০০বার টস করলে, হেড আর টেলের সংখ্যা মোটামুটি আধা আধা হয়ে যায় ।
৫০/৫০ না হলেও ৪৫/৫৫ হতে পারে ।
এর বেশি তফাৎ হয় না ।
জীবন ও এমনই না হবে কেন ।
সুদিন-এর প্রথম প্রমাণ- সে বেঁচে আছে, খাচ্ছে ,
ঘুমুচ্ছে ।
দুর্দিনটা প্রথমেই মাথা থেকে আসে ।
এবং সে তার পুরো বাঁচাটাই অস্বীকার করে বসে ।
এজন্য-ই বলেছি এক তরফা কিছু হয় না ।
এক হাতে তালি বাজে না ।
রাত ছাড়া দিনের কোন অস্তিত্ব নেই।মেরু প্রদেশে ৬ মাস দিন ৬ মাস রাত ।
সেখানে জীবনচক্রের ঢেউগুলো বড় বড় আর কি । এটা অনেকটা ভারতীয় অস্তিত্ববাদের ইশারা দেয় ।
৩৫ঃ প্রশ্ন ঃ আপনার "ছোরার বদলে একদিন"
কাব্যগ্রন্থটি নিয়ে মানিক চক্রবর্তী, অরুণ বণিক সহ কয়েকজন
আগরতলা একটা আড্ডায় দীর্ঘ আলোচনা হয়েছিল । আপনি তার একটা রেকর্ডও রেখেছিলেন । আমি নিজেও শুনেছি সেসব আলোচনা । সেই আলোচনার প্রেক্ষাপট নিয়ে আমাদের কিছু বলুন ! সেই আড্ডা, সেই উন্মাদনা, এবং চরম কবিতাপ্রেমী রসিকজনদের নিয়ে ! সেদিনের সে অভিজ্ঞতা আজও কি
শিহরণ তুলে আপনার মনে ?
সেলিম : হ্যাঁ ঠিকই বলেছো । সেদিনের সেই উন্মাদনা এখনো শিহরণ তোলে ।
১৯৮৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আমার দ্বিতীয়
কাব্যগ্রন্থ “ছোরার বদলে
একদিন” কলকাতা থেকে বের করেন প্রদীপ চৌধুরী তাঁর “ক্ষুধার্ত-স্বকাল” প্রকাশনা
থেকে । তার আগেই আমি চাকুরি পেয়ে গেছি এবং কাঞ্চনপুরেই আছি, যেখানে আমার প্রথম পোস্টিং হয়েছিল । লেখা যা হচ্ছিল, সব পাঠিয়ে দিচ্ছি প্রদীপের কাছে । ১৯৮০ সাল থেকে পাঠিয়ে যাচ্ছি, কোলকাতায় । কারণ ত্রিপুরায় আশির দাঙ্গার পর তিনি ত্রিপুরায় শিক্ষকতার চাকুরি ছেড়ে ততদিনে কোলকাতা চলে গেছেন । বছর দুয়েক পর হঠাৎ একদিন তাঁর চিঠি পেলাম—‘আপনি কি মনে করেন, আজ থেকে দশ বছর পরও কেউ আপনার কবিতা পড়বে ?’ আমি বুঝলাম যা বোঝার । এর পর দিন যায়, যেতেই থাকে ।
তারপর আবার একদিন হঠাৎ একটা পোস্টকার্ড পেলাম, Beg, borrow or steal, ৫০০ টাকা কালই পাঠান । পড়লাম বিপদে । আমার বেতন মাত্র ৪০০ টাকার মতো তখন । ৫০০ টাকা কোত্থেকে পাঠাই ! দেবুদার (গল্পকার দেবব্রত দেব, আমার কলিগ, দুজনে এক ঘরেই থাকি) সঙ্গে কথা হল । দুজনে মিলে আমাদের বস্ (ত্রিপুরা গ্রামীণ ব্যাঙ্কের কাঞ্চনপুর শাখার ম্যানেজার তপনময় চন্দ)-এর কাছে গেলাম । তিনি ধর্মনগরের লোক, আমার বাল্যবন্ধুর ভগ্নীপতি, সে সূত্রে আমারও । বললেন তিনি ধার দিয়ে দেবেন ৫০০ টাকা । আমি রাজী হলাম না । বললাম, ধার না-দিয়ে বরং একটা পারসোনাল লোন দিয়ে দিন । মাসে মাসে বেতন থেকে কেটে নিয়ে যাবেন । দিলেন । পরদিন মনি-অর্ডার করে টাকা পাঠালাম । তবে এর আগেই কিছু টাকা প্রদীপের কাছেই জমা করতে শুরু করেছিলাম । সে টাকা হল আমার বইয়ের অগ্রিম বিক্রির টাকা । অনেকেই ৬ টাকা করে আমাকে বইয়ের দাম বাবদ অগ্রিম দিয়েছিলেন । সে সাহায্যের কথা জীবনে কখনো ভুলব না । মোট খরচ হয়েছিল ১৪০০ টাকা । ১২০০ টাকাতেই হতো, কিন্তু শেষ মুহূর্তে দেখা গেল বইয়ের একটা ফর্মা হারিয়ে গেছে রহস্যজনকভাবে । তাই ওটা আবার ছাপাতে হয় । যাক শেষ পর্যন্ত বই এলো । বইয়ের দাম পরে দেখা গেল ৫ টাকা হয়েছে ।
কবে ঠিক মনে পড়ছে না, তবে সম্ভবত বই বেরোবার কিছুদিন পরেই আমি
আগরতলায় যাই কিছু বই নিয়ে । সেখানে আমার ঘনিষ্ট বন্ধুরা হলেন নাট্যকার তথা
অভিনেতা মানিক চক্রবর্তী, কবি
অরুণ বণিক, কবি দীপঙ্কর সাহা, কবি
অরূপ দত্ত । তাঁরা তো বই দেখে মহাখুশি । সবাই বলল, চল একদিন বসি, সেলিমের বইটা আমরা সেলিব্রেট
করা যাক ।
সেই মতো একদিন সত্যি
সত্যি বসা হল মানিকের মূল ঘরের বড় কামরাটায়, মাটিতে মাদুর পেতে, গোল হয়ে । উপরে যাদের নাম বললাম তাঁরা ছাড়া আরেকজন ছিলেন, তিনি শ্যামলতরু মুখোপাধ্যায় । ঠিক মনে পড়ছে না, স্পভবত তিনি দীপঙ্কর সাহার পরিচিত এবং তার সঙ্গেই এসেছিলেন কোলকাতা থেকে । গদ্য লিখিয়ে । অরূপ দত্তের কাছ থেকে জানলাম তাঁর একটা চটি বইও আছে যার নাম “ভারত ব্লেড” ।
যাক, আসর শুরু হল মানিকের কণ্ঠে আমার কবিতা পাঠ দিয়ে । সে কী গভীর কন্ঠ ! এর পর অন্যরাও একে একে যার যার পছন্দমতো পাঠ করে গেলেন একের পর এক কবিতা । অরুণ, দীপঙ্কর, অরূপ সকলেই ।
ঐ পুরো অনুষ্ঠানটা
আমি টেপ-রেকর্ডারে রেকর্ড করি । সেটা এখনো আছে আমার কাছে । কথাবার্তা তত পরিষ্কার নয়, তবু কান পেতে শুনলে বেশ বোঝা যায় । আলোচনার চেয়ে পাঠই হয়েছিল বেশি । আর আলোচনার কী-ইবা, থাকে তখন বলো । নতুন বই পাঠ করা, তা-ও দূর মফস্সল
থেকে আসা এক কবির কবিতা । সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার সেটাও
ছিল যে, বইটা প্রকাশ করেছেন প্রদীপ চৌধুরী, যিনি কিছুদিন আগেও আগরতলা তথা ত্রিপুরায় ছিলেন, এবং এখানে উপস্থিত সকলেরই অত্যন্ত প্রিয় মানুষ ।
পাঠের মাঝে
মাঝে হাসিঠাট্টা, চা,
চানাচুর, মুড়ি আর সিগারেট তো ছিলই । হতে পারে ঠিক সন্ধ্যের সময় মানিকের পাশের বাড়ি কালুয়ার ঘরেও
আমরা গিয়েছি । বিভিন্নজনের ভিন্ন ভিন্ন নেশার কারণ ছাড়াও কালুয়ার ঘরটা ছিল
এমন অসাধারণ এক আড্ডার ঘর, যার
কাছে কলকাতার কফি হাউসের আড্ডাও ম্লান মনে হতে পারে । কারণ সেখানে কেবলই শিল্প-সাহিত্য-নাটক-সিনেমা
আর বিভিন্নজনের সদ্যপঠিত কোনো বিখ্যাত গ্রন্থ নিয়েও খোলাখুলি আলোচনা হত । সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার যে,
কালুয়া, যে নাকি আগরতলা পৌর সভার
স্যানিটেশন কর্মচারী, যার চোখ সবসময় গাঁজার নেশায় লাল হয়ে
থাকত সে-ও নির্দ্বিধায় নিঃসংকোচে সেই আলোচনায় যোগ দিত । এটা আমার কাছে তখনই খুব বিস্ময় কর মনে হত । কিন্তু বিস্মিত হবার কারণ আসলে তেমন ছিল না । কারণ মানিক চক্রবর্তীর প্রধান এবং এক নম্বর শ্রোতাই তো ছিল সে ! আর মানিকের শ্রোতা মানেই তো সাংঘাতিক
ব্যাপার । কারণ মানিকের আলোচনাই হত সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, কাম্যু,
কাফ্কা, জয়েস
এমনতর বিরল সব সাবজেক্ট নিয়ে । পৃথিবীর মহত্তম জিনিশগুলোই তো মানিকের বিষয়-আশয় ! এমন লোকের দেখা এ জীবনে আমি অন্তত পাব না, অন্য কেউ পাবে কিনা, তা-ও সন্দেহ আছে । ত্রিপুরার সৌভাগ্য এবং একই সঙ্গে দুর্ভাগ্যও যে মানিকের মতো প্রতিভা এখানে জন্মেছিল । কেউ চিনলোই না তাকে, এখনও না । কিছু নিতেই পারলো না তাঁর কাছ থেকে ! হয়ত কেবল কালুয়াই চিনেছিল তাঁকে ! নইলে কী করে সে মানিককে সহ্য করতে পারত !! এই কালুয়াকে নিয়ে পরবর্তীতে আমার একটি কবিতা হয়, যা আমার পরবর্তী কাব্যগ্রন্থ “ইতি জঙ্গল কাহিনি”-র একেবারে শেষ পৃষ্ঠায় আছে । একটু শোনো—
“যে-খোলস চাপানো ছিল তা কি খুলে পড়েছে ?
পান করা হয়েছে কি অভয়নগরীর মদ ?
তবে যাওয়া হোক কালুয়ার ঘরে—
তার গাঁজা-লাল চোখে আজ আমাদের ছুটির নিমন্ত্রণ !... …
… …পৃথিবীর পুরুষেরা আজ
কালুয়ার ঘোরে যাবে,
দগ্ধ গাছের মতো কালুয়ার উচ্ছন্ন শরীর
কালো পতাকার মতো কালুয়ার নাম
জ্বলন্ত উনুনের মতো কালুয়ার দুই চোখ—
আজ ঐ দুই চোখে আমাদের সকলের
ছুটির নিমন্ত্রণ ।
কথায় কথায় অনেক দূর চলে এলাম । আজ মানিক নেই, অরুণ নেই, দীপঙ্কর নেই, কিন্তু আমার সৌভাগ্য যে, তাঁদের কণ্ঠ রয়ে গেছে আমার কাছে । অরুণের সেই বিখ্যাত হাসি- হা হা হা… ঘর ফেটে যায়… আকাশ ফেটে যায়… আজ আমার বুকটাও ফেটে যাচ্ছে…
৩৬ । আপনার কবিতায় 'আমি' শব্দের ব্যবহার কি একান্ত আপনার ব্যক্তিগত চরিত্র ? এক ধরণের আত্ম-জৈবনিক ক্রমবিকাশ আপনার কবিতা ? আপনি কি বলেন ?
সেলিম মুস্তাফাঃ হ্যাঁ। তবে কয়েক রকম আমি আছে মনে হয় । কিছু তুমিও আছে যেগুলো আসলে আমি । পড়তে পড়তে পেয়ে যাবে ।
৩৭। “সময়ের নিরিখে যে কবিতা এখন আমাদের চোখে পড়া উচিত,তা যেন হচ্ছে না । মনে হচ্ছে বর্তমান সময়ের কবিদের চারদিকে এমন এক পরিখা,যেখানে ছিন্ন হয়ে গেছে উদ্বর্তনের তাবৎ ধারাবাহিকতা ।” আপনার এই মন্তব্যের পেছনে নিশ্চয়ই এক গভীর নিরীক্ষা রয়েছে। কোন কবির নাম না-করে শুধু সময়ের এই সংকট নিয়ে আপনার ব্যক্তিগত আত্ম-বিশ্লেষণ যদি আর একটু বিস্তারিত করে বলতে বলি,কি বলবেন ?
উত্তর ঃ কবিতার গোটা ধারাবাহিকতায় যে কবি ইতিমধ্যে অবগাহন সেরে ফেলেছেন, তাবৎ কাব্যসাহিত্য যার ইতিমধ্যে অধীত, তাঁর মনন, তাঁর দার্শনিকতা, জীবনকে আর একমুখী বা একপেশে করে দেখার অবস্থায় থাকার কথা নয়। আজও কারো কারো বা বলা যায় ৮এর দশক থেকেই এখন পর্যন্ত কমবেশি সকল নবীন কবিদের লেখায় জীবনের নঞর্থক দিকটাই জোর পড়ছে বেশি । যে জীবন পেয়েছেন, যা ভোগ করে যাচ্ছেন যদৃচ্ছভাবে, তার কথা কোথাও দেখি না । এই অস্বীকার, এই ভুখা-নাঙ্গা পরিচিতি যেন নিজেকেই লুকোবার মুখোশ । যা সত্য ছিল বিগত দশকগুলোতে, তা, আমরা জানি আর সত্য নয় এই সব এলিট কবিকুলে । দেখি উচ্চমার্গের দার্শনিকতা, যা কোন নির্দিষ্ট কবির ক্ষেত্রে, বা তার এপর্যন্ত রচনার নিরিখে হয়ত সত্য নয় । উপরন্তু দার্শনিকতা, আমার মতে কবির কাজই নয় । দার্শনিকতাকে ওভারল্যাপ্ করেই কবিতার প্রকাশ । একাধারে থাকে, কিন্তু দুটো এক জিনিষ নয় । দুটো আলাদা মাধ্যম, যেখানে একে অপরকে প্রচ্ছন্ন রেখে নিজেকে প্রকাশ করে । এ তো গেল একটা দিক ।
আরেকটা আরেকটা দিক নেহাৎই টেকনিক্যাল বলা যায় । সেটা ভাষাগত । অতি বিশেষণে ভারাক্রান্ত । অনুপলব্ধ জটিল ভাব ও ইমেজারী । এমন এমন বিচ্ছিন্নতা, যা থেকে টের পাওয়া যায়, কবির সাহিত্যপাঠ খুবই দুর্বল বা একেবারেই শূন্য ।
৩৮ । “কিছু দেরী হল। ফেসবুকের ফুটপাথে হারিয়ে যাওয়া কবিরা সাদা কাগজের পৃষ্ঠায় কিছুতেই ফিরে আসতে পারছেন না। এর ভালমন্দ দোষগুণ বিচার করার ক্ষমতা কারো নেই। যা করার সময় করবে। অন্যদিকে, হাংরি-ফেরত,কৃত্তিবাস-ফেরত,দেশ-ফেরত কিছু কিছু কবি মরীয়া হয়ে মাথা তুলতে চাইছেন শরীরের স্পান্ডেলাইটিস ও মনের গেঁটেবাত সরিয়ে। দায় যদি কোনদিনই না-ছিল, আজ কোন দায় তবে তাড়া করে এইসব বানীকুমারদের! ফুটপাত থাকুক না পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন !” ‘পাখি সব করে রব, মার্চ -২০১৪ )
আবার , “ কবিদের হয়ত সাবধান হবার সময় এসে গেছে।ফেসবুক সমস্ত সৃজনমূলক কাজকে ভোঁতা করে দিচ্ছে(সমীক্ষা)। কিছু ভাসমান কবি(?) শিল্পী(?) ‘ফলস লেবার-পেইন’-এ গোঙাচ্ছেন। এবং ইতিমধ্যে অন্যের বিরক্তির কারণও হয়ে উঠেছেন কেউ কেউ। আমার প্রিয় কবিদেরও কেউ কেউ এই ইঁদুর-কলে পড়েছেন দেখে কষ্ট হয়। এত মুখোশের ভিড়, কে কোথায় বোঝা দায় ! এক ক্লিকে যদি হারিয়েই যাওয়া,কেন তবে আসা !” ( ‘পাখি সব করে রব, জুন-২০১৪ )
এখানে আড়ালে আবডালে অনেক কথাই আপনি বলে ফেলেছেন। আমি সে-সব
ব্যাপারে না-গিয়ে, আপনার কাছে মোদ্দা যে বিষয়টা জানতে চাইছি তাহল, আপনি কি মনে
করেন না, এভাবেও একটা কবিতার আড্ডা সম্ভব, যা আপনারা প্রযুক্তির কারণে আগে হয়ত
কল্পনা করতে পারেন নি ? না, এখানে একটা দায়-সারা অবাধ ‘Like’এর প্রশ্রয় আছে , যা কোনো–না-কোনোভাবে তরুণ মননশীল কবি হয়ে উঠার
ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে উঠছে ? আপনার একান্ত ব্যক্তিগত মূল্যায়ন কি বলে ?
সেলিম মুস্তাফা
ঃ না । সাহিত্যের
আড্ডা বলতে
যা বোঝায়, তা
অনলাইনে হবার কথা
নয় । আড্ডা
আর সেমিনার
এক জিনিষ
নয় । এখানে যা সম্ভব, তা
সেমিনার জাতীয় কিছু
।
যেখানে সাজিয়ে গুছিয়ে
লিখে বা
মুখস্থ করে, বেফাঁস কিছু
না-বলে, নিজের
পোশাকি পরিচয় অক্ষুণ্ন
রেখে, পঠিত বিদ্যা
জাহির করে, অজস্র কোটেশন
দিয়ে বক্তব্য
রাখা হয়ে
থাকে । এখানে
বক্তার আসল চেহারার
দেখা পাওয়া
সম্ভব হয়
না । আর
আড্ডা হলো
এর সম্পূর্ণ
বিপরীত ব্যাপার । এখানে
বাস্তবিকভাবে মুখোমুখি হতে
হয় । বক্তার
অভিব্যক্তি নজরে আসে
। অন্যের প্রখর দৃষ্টির
সামনে বক্তব্য
রাখতে হয়
অগোছালো ভাষায় স্বতস্ফূর্তভাবে
।
কিছু গোপন
করলে তা
ধরা পড়ে
যায় । কাজেই
ফেসবুকের আড্ডা নকল
আড্ডা । তবে
ভবিষ্যতে, ভিডিও কনফারেন্সের
মাধ্যমে তা কিছুটা
সম্ভব
হতে পারে, যদিও
সেখানে সময়ের আর
খরচের একটা
চাপ থেকেই
যাবে । কবিতা কখন
কোন রূপ
নেয় তা
বলা মুস্কিল
।
এখন ফেসবুকে যে
যে কবিতা
আমরা পড়ি, সেগুলোর
প্রকৃত পরিচয় জানা
সম্ভব হয়
না, কবিকে না-জানার কারণে, তার
সাহিত্যপাঠের ইতিহাস না-জানার কারণে
।
তবু এটাই
হয়তো বর্তমানের
কবিতার প্রকৃত পরিচয়
।
সময়টাই এমন । তাই
কবিতাই এমন । সে-কবিতা কালজয়ী
হবে কি
হবে না, সেটার
উত্তরদাতা একমাত্র সময়
।
অনেকেই তৎক্ষণাৎ কবিতা
লেখেন মোবাইলে
ফেসবুক খোলার পর
।
আগে লিখিত
নয় । বানান
সম্পর্কে অত্যন্ত উদাসীন, যা
থেকে তার
ভাষাজ্ঞান, শব্দজ্ঞান, কবিতার প্রতি
বা সাহিত্যের
প্রতি শূন্য-কমিটমেন্ট ইত্যাদি
বহু ব্যাপার
এক ঝলকে
ধরা পড়ে
যায় । এছাড়া
এটা
আদৌ তার
লিখিত লেখা
কি না
সে-সন্দেহও
জাগে কখনো
কখনো । একজনের
কবিতা দেখা
যাচ্ছে ৪/৫
জন চুরি
করে ফেলছে
।
অধিকাংশ কবিতা এবং
অনুগল্পই অত্যন্ত জলো, এবং
ইস্যুভিত্তিক রচনা । ধর্ষণ
খুন ধর্ম
রাজনীতি নিয়ে ওয়ান-টাইম স্লোগানধর্মী, এবং বিভিন্ন
‘দিবস’, যেমন মা
দিবস, বাবা দিবস, নারী
দিবস, রাখী দিবস, বন্ধু
দিবস, ভ্যালেন্টাইন দিবস, শিশু
দিবস, ইত্যাদি ইত্যাদি
উদযাপনের কোরিওগ্রাফী মনে
হয় । সাহিত্যে, হয়ে ওঠার
যে একটা
ব্যাপার আছে, সেটা ফেসবুক
এখনো বোঝেনি
।
তবে অনেকেই
কিছু প্রবন্ধ
জাতীয় রচনা
পোস্ট করেন, বা
পুনর্মুদ্রিত করেন, সেটা আমাদের
কাছে ফেসবুকের
সুফল ।
তবে এটাও ঠিক
যে, আমি যখন
এই কথাগুলো
লিখেছিলাম, তার থেকে
অবস্থা এখন অনেক
পালটে গেছে
। ত্রিপুরারই কয়েকজন
তরুণ কবি
, মাঝে মাঝে একটু বিভ্রান্ত
মনে হলেও, ভালো
লিখছেন। তেমনি বাংলাদেশের
কয়েকজন
নবীন কবি
খুবই ভালো
লিখছেন । আশা করি এই কবিতা
রচনায় তারা
আরও কমিটেড
হয়ে যাবেন
খুব দ্রুত
।
অনেক সময়
অনেকেই
মন্তব্য করতে গিয়েও
নানা কারণে
সঠিক কথাটি
গোপন রেখে
দেন, বিতর্কে জড়িয়ে
যাবার
ভয়ে, এমন আমি
লক্ষ্য করেছি । অনেক ব্যাপারই
তাৎক্ষণিক বলে বিস্তৃত
মন্তব্য অনেকেই এড়িয়ে
যান । সঠিক
মন্তব্যের জন্য আবার অনেক
সময়
ব্যাখ্যা আর কৈফিয়ৎ
দিতে হয়
।
তাই সঠিক
মন্তব্য সবসময় আসে
না । উপরন্তু
কিছু অসাহিত্যিক
আছেন যারা
মন্তব্যে যোগ দিয়ে
বন্ধুকৃত্য সারেন, ফলে আলোচনা
সঠিক লক্ষ্যে
কখনোই যায়
না ।
৩৯।“ ২১শে ফেব্রুয়ারী। মাতৃভাষায় কথা বলারয় দাবিতে আত্মবলিদানের এক রক্তঝরা দিন।২১শে ফেব্রুয়ারী দেশ কালের সীমানা ডিঙিয়ে আজ সারা বিশ্বের মাতৃভাষাদিবস।কিন্তু যুদ্ধ শেষ নয়। সাম্রাজ্যবাদের যত অস্ত্র রয়েছে তার মধ্যে ভাষাও একটি। বলা যায় ভাষাই আজ সাম্রাজ্যবাদের সুনিশ্চিত এবং অমোঘ হাতিয়ার, যা কর্কটরোগের মত অলক্ষ্যে ছিনিয়ে নিয়ে চলেছে আত্ম-সর্বস্ব লভোভী পরশ্রীকাতর মানুষের ঠোঁট ও জিহ্বা।এই রোগ চিহ্নিন্ত না করলে ভাষিক পরাধীনতা আর বেশি দূর ন্য।(২১-২-২০১৪ ইং)”
“ ফেব্রুয়ারী। বাঙালি মাত্রেই অত্যন্ত আবেগের একটি মাস। ২১শে ফেব্রুয়ারী আজ বিশ্ববন্দিত মাতৃভাষা দিবস। ঘটনা আমরা জানি । কিন্তু এই দিনটির প্রকৃত তাৎপর্য ধারণের ক্ষমতা আমাদের হৃদয় থেকে ক্রমশই যেন লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে । বত্তৃতার সময় আমাদের মুখ থেকে যা যা উচ্চারিত হয়, তা প্রতিবছর প্রায় একই। সন তারিখ নাম ও অশ্রু একইভাবে নির্গত হয়ে বয়ে যায়, উবে যায় শূন্যে, মহাশূন্যে, এগারো শহিদের ঠিকানাহীন সাকিনের দিকে।এই তারিখের পর বাংলা আর মন টানে না। জিহ্বা তালব্য করে ন্যাকা আর ন্যাকীদের খুকি-বাংলা শুনে যাই সারাটা বছর ।(২১-২-১৬” –
দুই মাতৃভাষা দিবসে দুই রকম সংকটের দিকে আপনি অঙ্গুলি নির্দেশ করছেন।
আমি আপনাকে এই ভাবনার পরিপ্রক্ষিতে সরাসরি যে প্রশ্নে আসতে চাইছি তা হল, আপনার কি মনে হয় আগামীতে এর ফলে বাংলা সাহিত্য ভাণ্ডার দুর্বল হতে চলেছে ? একটা প্রজন্মের বাংলাশিক্ষা কাঠামোগত ভঙ্গুরতা থাকলে, এর উপর সাহিত্য ভাবনার শক্ত ভিত কি করে গড়ে উঠবে ? আপনি কি মনে করেন ?
সেলিম
মুস্তাফা ঃ বাংলা ভাষা
শুধু দুর্বল
নয়, এমন চললে এই ভাষা লুপ্ত
হতে মনে
হয় না বেশি সময়
নেবে । হিন্দি
আর বাংলা
দুটোই বেশি
আক্রান্ত হচ্ছে
ইংরাজী দ্বারা, এবং তা হচ্ছে আমাদের
হীনম্মন্য উচ্চাশার মাধ্যমেই, হচ্ছে নিজের ভাষাকে
নিজেই দুর্বল
ভাবার কারণে, হচ্ছে ভারতীয়
যেকোন ভাষায়
উচ্চশিক্ষার উপযুক্ত বইয়ের অভাবে
। ‘‘আমার ছেলে
বাংলা জানে
না, বা বলতে পারে
না’’, এটা আজ স্ট্যাটাস সিম্বল । এসব
নতুন কথা
নয়। বহুদিন
ধরে বলা
হচ্ছে, বহুদিন ধরে শোনা
যাচ্ছে । যারা
বাইরে এসব
বলেন, তারাই ঘরে শিশুদের বাংলা পড়াতে
উৎসাহী নন । অনুকরণ আর মিমিক্রি বাঙালির প্রিয় নেশা
। অভিভাবকদের চাপে(?) ত্রিপুরাতেই কত সরকারী স্কুল
বাংলা মিডিয়াম থেকে ইংলিশ
মিডিয়ামে বদলে
দেয়া হয়েছে, আরও হচ্ছে
। কোলকাতায় বর্তমান প্রজন্ম যা-ও বাংলা
বলছে তা ইংরাজীর ভঙ্গিতে বলছে,”র”-এর বদলে “ড়” উচ্চারণ করছে । টিভি
খুললেই এই জিহ্বা উল্টিয়ে কথা বলার
ধরণ টের
পাবে । মাতৃভাষায় কবিতা না-লিখে, মাতৃভাষায় সাহিত্য না-করে অনেকেই
ইংরাজীতে লিখতে
চাইছে, বা লিখছে । এর পেছনেও হীনম্মন্যতা কাজ করছে
। যারা প্রতিষ্ঠিত লেখক তারা
ইংরাজীতে লিখে
পরে তা তাদের মাতৃভাষায় অনুবাদ করে
বা অন্য
কাউকে দিয়ে
করিয়ে বাজারের ফায়দা তুলছে, যেমন চেতন
ভগত, ঝুম্পা লাহিড়ী, বিক্রম শেঠ,এবং আরও অনেকে
। বাংলা যাদের
মাতৃভাষা, তারাও এমন শুরু
করেছেন ইদানীং
। ইংরাজী জানার
অহংকারের (?) আড়ালে এখানে
সেই ঔপনিবেশিক মানসিকতার ইনফেরিওরিটি কমপ্লেক্স-ই মূলত কাজ
করছে । সুতরাং
বাংলা যে মিউজিয়ামে যাবে
না, তার গ্যারান্টি কোথায় ? অবশ্য গেলেই
বা কী ক্ষতি ? বাঙালির বাঙালিত্ব তো কোথাও দেখা
আর যায়
না । না পোষাকে, না ঐতিহ্যে । অথচ
অন্যান্য রাজ্যের দিকে তাকিয়ে
দেখো, গুজরাট, বিহার,পাঞ্জাব, রাজস্থান, আসাম, সকলেরই মাতৃভাষা ও জাতিগত
ঐতিহ্যের প্রতি
কেমন টান
। এমনকি বাঙালিরাও বিহুর নাচ
নাচতে পারলে
খুব খুশি
হয় এবং
একদিন এই বিহুও যদি
নষ্ট হয় বাঙালির দ্বারাই হবে । কারণ
তারা বিহুর
সঙ্গে ব্রেক
ডান্স মেলাবার চেষ্টা করবে
। অসমীয়ারা এটা
জানে, তাই তারা বাঙালি
অপছন্দ করে
। এটা একটা
উদাহরণ দিলাম
। কিছু করার
নেই । বাংলা
যেখানে গিয়ে
থামবে, যেখানে নিয়ে গিয়ে
থামানো হবে, তাতেই হয়তো
সাহিত্য হবে
। কারণ বাঙালি
আবার সেই
জাতি, যে খুব আবেগপ্রবণ, রাধাভাব তার
অস্তিত্বে জড়ানো, তাই ঘুরে
ফিরে গোয়ালে
ফিরে আসতেই
হবে, সাহিত্য তাকে করতেই
হবে, কবিতা তাকে লিখতেই
হবে, তা ভাষা যা-ই হোক
না কেন
। আর সবকিছুর পেছনে রাজনীতি তো আছেই
। রাজনীতির জন্য
কে কোথায়
কী বলি
দেবে তার
কোন ঠিকানা
নেই । দিল্লির ভাষা ভেবে
দেখো । হিন্দি
আর অন্যান্য বহু ভারতীয়
ভাষার সঙ্গে
ইংরাজী মিশে
আছে প্রায়
৬০ শতাংশের মতো । গোয়ার
ভাষাও তাই
। এখন “কেন না” এই বাক্যবন্ধের জায়গা
নিচ্ছে “কেন কি” । হিন্দির “কিঁউ কি” অনুকরণে । সেদিন
টেলিফোনে একজন
অধ্যাপককে “কেন কি” বলতে শুনলাম । ভগীরথ
মিশ্র(খুব সম্ভবত) একটা গল্পের মধ্যে
দুবার এই শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছেন । এবং
পংক্তিটাই লিখেছেন এমনভেবে যাতে
এটা তিনি
ব্যবহার করতে
পারেন । তার
এই শব্দ-লোলুপতা, এই অনুকরণপ্রিয়তা, বলাবাহুল্য
আমার ভালো
লাগেনি ।
৪০। প্রশ্ন ঃ
“ ভোরের বাতাসে ভেসে আসে রেলের বাঁশি – ধর্মনগর স্টেশন থেকে ভাষাশহিদ স্টেশনের দিকে যাত্রা করেছে একটি আহত ট্রেন।’ -- ২০১৪ সালে ‘অক্ষর পাবলিকেশন’ থেকে আপনার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘ভাষাশহিদ স্টেশনের দিকে একটি আহত ট্রেন’- কবিতাটি শেষ হচ্ছে এ’রকম। আসলে আমি এই আজব ‘স্টেশন’ এবং তার ‘আহত’
হওয়ার কারণ জানতে চাইছি ? ‘বাংলা আমার কী?’-
কবিতার এই লাইনটিতে একটা ব্যঙ্গ ব্যঞ্জনারও ইঙ্গিত পাচ্ছি। সব মিলিয়ে আসলে আপনার এই কবিতার ভাবনার প্রেক্ষাপট জানতে চাইছি ?
সেলিম মুস্তাফাঃ ভাষাশহিদ স্টেশন বলতে শিলচর স্টেশনের কথাই বলেছি । বাংলা ভাষা নিয়ে ওখানেই প্রাণ দিলেন কতজন । ১৯৬১ সালের ১৯শে মে । দাবি উঠেছিল এই স্টেশনের নাম পরিবর্তন করে নাম হোক ভাষাশহিদ স্টেশন । হলো না । অথচ কেন্দ্রিয় সরকারে তখন ছিলেন বেশ ক-জন বাঙালি । এই আশাভঙ্গ নিয়েই আক্ষেপটি রূপায়িত । বাঙালিরা মুখে যা বলে তা খুব কমই রূপায়িত করতে পারে । অথবা যা রূপায়িত করে, বলে তার চেয়ে বেশি । অন্যদিকে বাংলা ভাষার বিকৃতিও এই বাঙালিদেরই অবদান । পশ্চিমবঙ্গীয়রা কিছুদিন আগেও ১৯শে মে-র খবরই জানতো না । ইংরাজী শিক্ষার প্রাদুর্ভাবে ওরা জিহবা উল্টিয়ে ‘র’-কে ‘ড়’ বা ‘ঢ়’-র মতো করে উচ্চারণ করে । এটা ব্যাকরণসিদ্ধ ‘বর্ণবিপর্যয়’-ও বলা যায় না । নেহাতই ন্যাকামি । যেমন ওদের উচ্চারণে ‘ভারতীয় নারী’ হয়ে যায় ‘ভাড়তীয় নাড়ী’ । এমন শোনার চেয়ে সাপের ছোবল খাওয়া ভাল । বাংলা যেসব চ্যানেল আছে, সেগুলো বেশিরভাগই অবাঙালির । সবগুলোতেই ভাষাগত ন্যাকামির রমরমা । আর শিলচরে তো শুনেছি এই ১৯শে মে নিয়ে দলাদলি । সকলেই এটাকে পুঁজি করে নিজেদের স্বার্থ আদায়ে ব্যস্ত । কাছাড়ের অধিকাংশ কবি সাহিত্যিকরাই প্রচারের লোভে স্বভূমি ত্যাগ করে কোলকাতাবাসী হয়েছেন । অনিল সরকারের দৌলতে ত্রিপুরায় ১৯শে মে-কে ‘মাতৃভাষা প্রণাম দিবস’ হিসেবে মান্যতা দিয়ে পালন করা হয় । এটা ওদের মাথায়ই আসেনি । তবে নিমন্ত্রণ পেলে ওরা আসেন ত্রিপুরায় । আমাদের শিলচর যেতে হয় । স্টেশন দেখলে বুকের ভেতর হাহাকার ওঠে । পলাশীর পরাজয়ের কথা মনে হয় । বুকের ওপর পাথর চাপা নিয়ে কত শহিদ এখানে শুয়ে আছে !
৪১। প্রশ্ন ঃ
‘হে সন্ধ্যা,/ হে দিন অবসান/ কথা দাও!/ তমসায় যাকে দেখি/ ঊষার আলোয় যেন তাকে ফিরে পাই।’ – এইরকম একটা দৃশ্যভাবনার প্রেক্ষাপট হয়তো ৮০-র দশকে ছিল। আপনি কি আজও সেই সংকট বহমান দেখতে পাচ্ছেন? কোন্ দৃষ্টিকোণ থেকেই বা দেখতে পাচ্ছেন ?
সেলিম মুস্তাফাঃ এটা ৮-এর দশকের একমাত্র হবে কেন ? সারা বিশ্বের সব জায়গায় সময় আর পরিবেশ যেমন একই রূপ নিয়ে আসে না, একটা দেশে বা একটা রাজ্যে বা একটা গ্রামেও সমসত্ত্ব (Homogeneous) হয়ে অর্থাৎ সমানভাবে সময় ও পরিবেশের প্রভাব দেখা যায় না । রাজধানীর ঔজ্জ্বল্যের সমকক্ষ কখনোই একটা মফস্সল হতে পারে না । তাই তুমি ৮-এর দশকের একটা দৃশ্য ৩০৮০ সালেও পেয়ে যেতে পারো । মূল ব্যাপারটা বৈপরীত্যের ফারাকটা । এই ফারাক কখনো কমে না, কমবে না । মানুষ চাঁদে গেলেও এই ফারাক বজায় থাকবে । একটা শ্রেণিহীন সমাজ কখনোই হবে না, হতে পারে না । এই ইউটোপিয়া চিরকালই ইউটোপিয়া থেকে যাবে । আমার লেখাটারও দিশা হয়তো সেদিকেই । যে মলিন একটি বালিকার (অস্পষ্ট বালিকা) বিষণ্ন একটি ছবি বিষণ্ন আলোকে (ভাঙা মোম) এখানে দৃশ্যগত হয়, আমি চাই ভোরের আলোয়ও তাকে যেন পাই । সুদিন আসবে, অথচ সে থাকবে না, এমন যেন না-হয় । কিন্তু ট্র্যাজেডি এটাই যে, সন্ধ্যা আর ভোরের এই বৈপরীত্য কখনোই ঘোচে না । হয়তো একটা জীবনের, এমনকি একটা সমাজেরও বয়ে চলার অন্তর্নিহিত শক্তিটাই (Force) এখানে লুক্কায়িত । ব্যাপারটা নিষ্ঠুর, কিন্তু সত্য । ভাঙা মোম জ্বলে জ্বলে নিঃশেষ হয়ে যায় ভোরের আশায় । ভোরের সঙ্গে তার দেখা হয় না কোনদিন । ভোর আসে, রাতের কথা তার মনেও পড়ে না । ভাঙা মোমের মতো বালিকাটিও কোন না কোন জীবনের দিকে অদৃশ্য হয়ে যায়, হয়তো অন্ধকারেই মিলিয়ে যায় । বিস্মৃতি তাকেও আবিষ্ট রাখে । সে নিজেও ভুলে যায় তার অতীতের কথা । আরও অনেক রকম ব্যাখ্যা হতে পারে । আমি আমার কথা বললাম ।
৪২। প্রশ্ন ঃ
‘কথা দিয়ে যারা পথে নামিয়েছিল / তাদের কথা মনে পড়ে,/
অনেক দূর থেকে তাদের পরোক্ষ স্বর/ ভেসে আসে-’ কিংবা ‘পার্টি অফিস থেকে দুর্গাপূজার মিটিং-এ
/ কল্ দিয়েছে, যার অসুবিধা / তার বাড়িতে যাবে সকলে মিলে- / পঞ্চাশ কাপ চা একশো ব্রিটানিয়া -/ মামামিয়া!/ এই গ্রাম আমাদের গ্রাম।’ (আমাদের গ্রাম/ভাষাশহিদ ষ্টেশনের দিকে একটি আহত ট্রেন’ -- এককথায় রক্ষকই ভক্ষক! সব কবিরই মনে একটা কাল্পনিক সমাজব্যবস্থা থাকে । কম তো রাজনৈতিক পালাবদল বা পরিবর্তন হল না ! তারপরও আপনি স্বপ্ন দেখেন ? ঠিক কি রকমের পরিবর্তন আপনি দেখতে চাইছেন ?
সেলিম মুস্তাফাঃ মানুষের পরিবর্তন না হলে সমাজের পরিবর্তন কী করে হবে ? সমাজ তো মানুষেরই সমষ্টি ! মানুষই তো পাল্টাচ্ছে না । রাজনীতির কথা যদি ধরি, দেখতে পাই, নীতিকথা কোনটাই খারাপ নয় । সমাজ নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখার কিছু নেই । স্বপ্নের কোন কমতি নেই । কিন্তু সেগুলো কেউ তো সফল করছে না । সবগুলো রাজনৈতিক দল, বা সব শাসকই এক রকম । একই লোক দল পালটে পালটে সরকারে ঢুকে যাচ্ছে । তার চরিত্র তো পাল্টাচ্ছে না । আমরা একই লোককে ভোট দিচ্ছি বার বার তার কথায় মুগ্ধ হয়ে । এছাড়া আর বিকল্পও নেই । সে অশিক্ষিত, সে লোভী, সে ভ্রষ্টাচারী, সে নিম্নরুচির জেনেও তাকেই আমরা সরকারে পাঠাচ্ছি । সে যাচ্ছে টাকার জোরে, গায়ের জোরে, দলের জোরে । বারবারই ‘লাঠি যার মাটি তার’ হয়ে যাচ্ছে । এই কথাটা, অনুরূপ কথা Survival of the Fittest এর চেয়েও শক্তিশালী । শুধু আমি নই, সকলেই প্রথমত চায় ভ্রষ্টাচারবিহীন একটা ব্যবস্থা । এটা হলে বাকি সব আপনাআপনি বহুদূর এগিয়ে যাবে ।
৪৩। প্রশ্ন ঃ
‘ আমি সারাদিন ভাবি তোমার মতো হব,/ তোমার মতো দীর্ঘ, বড়ো.../ তারপর সারারাত ভাবি/ যেন তোমার মতো
/ কিছুতেই না-হই।’ (হওয়া না-হওয়া’ -- আপনার সমালোচকরা আড়ালে-আবডালে প্রায়ই বলে-
‘সেলিম বেশির ভাগ কবিতায় পলায়ন করে । শেষ অবধি সাতেও থাকে না । পাঁচেও থাকে না । সব সময় নিরাপদ একটা দূরত্ব বজায় রেখে চলে।’ আপনি কি বলবেন ?
সেলিম মুস্তাফাঃ এটা পালিয়ে যাওয়া বটে এক অর্থে । অতিসরলীকরণ আর কি । মোটা দাগের না-হলে অনেকেই অনেকেরই অনেক কিছু চোখে পড়ে না । আমি এ নিয়ে ভাবিত নই । কবি কি কোথাও থাকে ? পদ্মপাতায় জল পড়ে আর তাকে নাড়িয়ে দিয়ে মিশে যায় জলসমুদ্রে— জনসমুদ্রে মিশে যায় কবি । কবিতায় একটা দোলাচলের আভাস রয়েছে । এটাই উপজীব্য । কখনো সূর্যের মতো হতে চাই, সূর্য মেঘের আড়ালে চলে গেলে, আর তার মতো হতে চাই না । এই দোলাচলই জীবন, এর থেকে মুক্তি নেই । কারণ জীবন টের পায় সবই আপেক্ষিক । যে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, সে গৃহবাসী আর থাকে না, থাকতে পারে না । যখন যা সত্য মনে হয়, আমি তা-ই বলতে চাই । আমি দার্শনিক হলে যাচাই করতে যেতাম । আমাদের এ লোক-জীবনে সত্য যাচাই করার ধৈর্য বা প্রয়োজনীয়তা বা যথার্থতা আছে বলে আমি মনে করি না । জীবন যখন যেমন, তখন তেমন । নৃপেন চক্রবর্তী বলেছিলেন—‘আগে যা বলেছি সেটাও ঠিক, এখন যা বলছি এটাও ঠিক’ । যা দেখছি সেটাই দেখছি । এটা অস্বীকার করবো কোন জ্ঞানের বলে ? আর সেই জ্ঞানের যথার্থতাই-বা কী ? লোকে বলবে –তোমার চোখ নেই ? দেখতে পাচ্ছো না ?
৪৪। প্রশ্ন ঃ আপনার ষষ্ঠ কবিতা সংকলন ‘১৮টি দীর্ঘকবিতা’ ২০১৭ সালে সৈকত থেকে প্রকাশিত হয় আপনার নির্বাচিত এবং অপ্রকাশিত ১৮টি দীর্ঘকবিতা এই বইয়ের সম্পদ । ত্রিপুরার কবিতা জগতে সম্ভবত আপনিই বেশি দীর্ঘকবিতা লিখেছেন । আপনার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘বাহান্ন তাসের পর’ মূলত একটি দীর্ঘকবিতা । এই প্রসঙ্গে খুব জানতে ইচ্ছে করছে, দীর্ঘকবিতাকে আপনি ঠিক কীভাবে বিশ্লেষণ করে থাকেন ? এর তৃপ্তি, আনন্দ উপলব্ধি নিয়ে আমাদের কিছু বলুন ?
সেলিম মুস্তাফাঃ দীর্ঘকবিতা সম্পর্কে আমার চেয়ে তোমার ধারণা অনেক বেশি । আমি বেশি লিখেছি, হয়তো এটা ঠিক, কিন্তু বিশ্লেষণ করে সব বলা আমার কর্ম নয় । শুধু দীর্ঘকবিতা লিখেই আমি বেশি তৃপ্তি বা আনন্দ পাই, এটাও সম্পূর্ণ ঠিক নয় । যেকোন কবিতা, সার্থক হলে এক ধরনের মুক্তি পাই, এটা সত্য । এটা সকল লিখিয়ের জন্যই সত্য । মিতায়তন রচনার চেয়ে দীর্ঘায়তন রচনায় লেখকের সুযোগ একটু বেশি থাকে । অনু গল্প বা ছোট গল্পের সঙ্গে একটা উপন্যাসের যে ফারাক, এখানেও কমবেশি তাই । তবে দীর্ঘকবিতা হয়তো উপন্যাসকেও ছাড়িয়েও যায় এই অর্থে যে, উপন্যাসের সকল সুবিধা এতে থাকার পরও কবিতার এক উদ্দাম স্বাধীনতা এতে থেকে যায়, যা কোন ইতিহাস বা সময়বন্ধনী বা বিশেষ কোন সমাজসভ্যতার নির্দিষ্ট কোন আবেগ বা আচরণ একে বাঁধতে পারে না, বা বাঁধতে চাইলেও তা পাত্র থেকে উপচিয়ে পড়ে যায় । আর যেহেতু এটাও কবিতা, এর নীরবতাগুলি(একটা বিশেষ কিছু বলার প্রস্তুতি তৈরি করেও না-বলে পাশ দিয়ে চলে যাওয়া) আর অবকাশগুলি আর সরবতাগুলিও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অর্থ প্রকাশ করে যেতেই থাকে ।
৪৫।প্রশ্ন ঃ দীর্ঘ ২৫ বছর পর বামফ্রন্ট বা যুক্ত কমিউনিস্ট পার্টির ধরাশাই হল ৩ মার্চ,
২০১৮। এই দীর্ঘ সময় না-হলেও, আপনার ভিত্তিগত একটা রাগ বা অভিমান রয়েছে।পরান প্রিয় ভাই’র খুন,
বিচার না-পাওয়া সহ বিভিন্ন অনেককিছুই। এখন কেমন লাগছে? আপনি ঠিক কীভাবে এই পরিবর্তনকে দেখছেন? এককথায় জীবন-ট্রেনের যাত্রী হিসেবে এইক্ষণে আপনার প্রতিক্রিয়া জানতে চাইছি
?
সেলিম
মুস্তাফাঃ যা হবার ছিল তা-ই হয়েছে । আমার ভাইয়ের ব্যাপারে তেমন বলার আর
কিছু নেই । অনেকেরই বিচার হয়নি । আমার ভাইয়ের খুনীকে তো এরাই আশ্রয় দিয়েছিল ! যাক
। শুধু নালিশ করে করে,
মানুষকে উত্তেজনা
জিইয়ে রেখে কতদিন শাসন কায়েম রাখা যায় ? মানুষ কাজ চায় । ত্রিপুরার রোজগার স্বয়ংক্রিয়ভাবে যা হতো, তাই ছিল গোটা
বাম-আমলেও । আমার এমনই মনে হয় । এরা এক টাকাও বাড়তি রোজগারের ব্যবস্থা করতে পারেনি
। উপরন্তু দিনের পর দিন দুষ্কৃতীদের আশ্রয় ও প্রশ্রয় দিয়ে গেছে । আসলে সবই একসময়
তাদের আয়ত্তের বাইরে চলে গেছে । একসময় ছিল শুধু ‘মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ’ এটা একঘেয়ে হয়ে
যাবার পর,
কেন্দ্রীয় সরকারের
বিরুদ্ধে নালিশ । নালিশ কি সব সত্যি ছিল ? এ তো শিশুরাও বোঝে । কিন্তু ব্যবস্থা কী ? নালিশে কি পেট চলে
?
নালিশ নিন্দে করে
ভোটে
হয়তো জেতা যায়, কিন্তু রাজ্যশাসন
চলে না । বামপন্থাকে ভালোবাসে বলে মানুষ অপেক্ষা করেছে, সময় দিয়েছে অনেক ।
এখন হয়তো আরও বড় বিপদ ঘটবে । তাতে কী ? মানুষ তো সবই বোঝে । এ হল আমার সাধারণ উপলব্ধি এর বাইরে আর
বোঝার কোন প্রয়োজন নেই । এতে যদি ভুল থাকে থাকুক । পতনের কারণ কী এরা
নিজে যে জানে না,
এমন নয় । পরিবর্তন
তো ভালোই লাগে । কিন্তু এটা যদি আত্মঘাতীও হয়ে থাকে কিছু করার নেই । যা করার
মানুষই তো করছে ।
৪৬ প্রশ্ন ঃ
ফেইসবুকে আপনি ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন জায়গার কবি-লেখকদের লেখালেখি নিয়ে আলোচনা করে
থাকেন। ত্রিপুরার সাহিত্য জগতে বরাবরই একটা আক্ষেপ গুনগুণ করে
শোনা যায় যে, এখানে সাহিত্যের সব বিভাগই ক্রমেই
বলিষ্ঠ হয়ে উঠছে। উপন্যাসেও পিছিয়ে নেই এখন আমরা। কিন্তু সমালোচনার প্রসঙ্গ
উঠলেই যেন একটু থামতে হয়! ঠিক এই জায়গায় মনে হয় আমরা এখনও কিছুটা পিছিয়ে। আপনি কীভাবে দেখছেন বিষয়টাকে? কেন ত্রিপুরাতে
ভাল সমালোচনা সাহিত্য গড়ে উঠছে না ?
সেলিম
মুস্তাফাঃ উঠবে । কিন্তু সবার আগে প্রচুর পড়াশোনা দরকার । কিছু কথা
বললেই আলোচনা হয় না । আমার যতটুকু জ্ঞান, ততটুকুই বলার চেষ্টা করি । আলোচনা যারা করতে পারেন, তারাও করেন না
অন্যের বিরিক্তিভাজন হবার ভয়ে । বিখ্যাত আলোচকদের অনেক আলোচনা গ্রন্থ আছে
সাহিত্যের ওপর । সেগুলোও পড়া প্রয়োজন । মূল সাহিত্যই অনেকে পড়েন না, আলোচনা পড়বেন কখন ? অভারতীয় সাহিত্য, বিশেষ করে ইংরাজী
এবং ইংরাজীতে অনুবাদ করা অন্য বিদেশি ভাষার সাহিত্য অনেকেরই পড়া আছে। কিন্তু
বাংলাসাহিত্যের পাঠ ততটা নেই । এর কারণ উন্নাসিকতা । ফলে বিদেশি সাহিত্যের গতিবিধি
জানা থাকলেও বাংলাসাহিত্যের মোচড়গুলো অজানাই রয়ে গেছে । উপরন্তু, আলোচনা করাকে
এখানের অনেকেই মনে করেন খুঁত ধরা । আমার ধারণা, আলোচনা হল লেখক বা কবিকে তার সময়ের প্রেক্ষিতে উন্মোচিত করা ।
এর জন্য খোলা মন,
প্রশংসা করার
সক্ষমতাও জরুরী । আমাদের তো শুধু লবি । গড়া জিনিশ ভাঙার গ্রাম্য রাজনীতি । আমরা
কমবেশি সকলেই ডাইনী বটে । আলোচনা না-হলে সাহিত্য এগোবে কী করে ? বিরূপ আলোচনাও পথ
দেখায় । তাছাড়া,
কবি লেখকরা
নিজেরাও তো নিজের লেখাটিকে ফিরে দেখেন না । তাই আত্মসমালোচনাও নেই । ফেসবুকে সবারই
নিজস্ব সার্কেল আছে । ওখানে পাস হয়ে গেলেই হল । অতিআঁতেলও কম নয় ।
আলোচনা যে করবে,
সেটা কিসের আলোচনা, তা-ই তো জানা নেই
অনেকের । এটা তো আর জন্মগত করিশ্মা নয় !
৪৭। প্রশ্ন ঃ “ ২৫ বছর আগের একটি খবরঃ “ ফটিকসাগর থেকে শিক্ষকের মৃতদেহ উদ্ধারঃ সংবাদ প্রতিনিধি, অমরপুর, ২রা সেপ্টেম্বর (১৯৯২ইং)ঃ আজ ভোরে স্থানীয় ফটিকসাগরের জলে অমরপুর দ্বাদশশ্রেণী বিদ্যালয়ের জনৈক শিক্ষকের মৃতদেহ ভাসমান অবস্থায় পাওয়া সাহিত্যিকও ছিলেন। অরুণ বণিক ‘গেরিলা’ নামে একটি ম্যাগাজিনের সম্পাদকও ছিলেন।” রাজনীতিতে বামপন্থার প্রতি অকুণ্ঠ ভালবাসার পুরস্কার এই মৃত্যু। এই রহস্য আজও অন্ধকারেই আছে। কোন রাজাই তার মৃত সৈনিকের দিকে আর ফিরে তাকায় না।” – আপনার সম্পাদিত কাগজ ‘পাখি সব করে রব’ এর ৪র্থ
বর্ষ, ১১তম সংখ্যায় আপনার সম্পাদকীয় লেখা। আপনার কাছে আমার জানতে ইচ্ছে করছে, আপনি ছাড়া প্রয়াত কবি অরুণ বণিক নিয়ে প্রায় সবাই নীরব।‘বামপন্থা’র কবি হয়েও প্রায় ২৫
বছর বামপন্থীরা শাসন করে গেল। এখন তারা আবার বিরোধী দলের ভূমিকায়। নিহত কবি নিয়ে সবাই চুপ। আপনি ফটিকসাগরের
নাম পরিবর্তন করে ‘ অরুণসাগর’ রাখার আবেদন করেছেন। কিন্তু সেটা তো তখনই সম্ভব, যখন
আমরা কবি অরুণ বণিককে প্রথমে মেনে নেব। কবির
প্রতি এই দীর্ঘ নীরবতার রহস্য কী হতে পারে বলে আপনার মনে হয়? না, সে-ই চিরপ্রবাদই আমাদের সান্ত্বনা –‘বাঙালী আত্মভোলা জাতি!’
সেলিম
মুস্তাফাঃ শুধু অরুণ বণিক কেন, ত্রিপুরার অনেক প্রতিভাবান ব্যক্তিত্ব মৃত্যুর পর বিস্মৃতির
অতলে তলিয়ে গেছেন । এখানে কেউ কাউকে আসলেই পছন্দ করে না । গ্রাম্যপভাবে বলা যায়, হিংসে করে ।
শক্তিধর কেউ মরে গেলে আসলে আনন্দ পায়, ভাবে,
যাক একজন তো গেলো প্রতিদ্বন্দ্বী
! সবাই সবাইকে প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবে । কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের কেউ বিদায় নিলে এদের
কুম্ভীরাশ্রু আর থামে না । সলিলকৃষ্ণ দেববর্মণ, বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী, সত্যেন বন্দ্যোপাধ্যায়, অরুণ বণিক, মানিক চক্রবর্তী, জাফর সাদেক, তপন দেবনাথ এমনি আরও অনেকেই প্রতিভার সাক্ষর রেখে গেছেন ।
ত্রিপুরা এদের ভুলে গিয়ে আত্মতৃপ্তিতে বেঁচে আছে । আর লবির ব্যাপার তো আছেই ।
ব্যক্তিগতভাবে ভালোবাসা থাকলেই সামান্য আলোচনাসভা করা দায়মুক্তি ঘটে, আর ব্যক্তিগতভাবে
ভালোবাসা না-থাকলে তো ভুলেও নাম নেয় না। দোষত্রুটি
সকলেরই থাকে,
কিন্তু কোনো গুণ না-থাকলে
কি আমরা জানতাম তাঁদের ?
কিন্তু
এইটুকুরও স্বীকৃতি
দিতে না-পারাটা আমাদের রিফিউজি মানসিকতার, হীনম্মন্যতারই লক্ষণ ছাড়া আর কী ?
৪৮। প্রশ্নঃ “... সাহিত্যে প্রতিবাদ না-থাকলে কীসের
সাহিত্য, এমন যাদের শিরোবাণী ছিল একদা, আজ তাদের দেখি অশুভ-আঁতাতে লিপ্ত হয়ে নিজের
নাসিকা কর্তনেও পিছ-পা নন।” -- দীর্ঘ বাম
রাজনীতির অন্ত হওয়ার পর আপনার লেখনি থেকে এই সম্পাদকীয় লেখা বের হল আপনার হাত ধরে। ত্রিপুরার সাহিত্য জগৎ আপনার চোখের সামনে প্রায়
গড়ে উঠেছে বলা যায়। সময়ের স্রোতে অনেকের অনেক পরিবর্তন দেখেছেন। সেই সব মূল্যায়নে
আপনার সার্বিক একটা ধারণা নিশ্চয়ই তৈরি
হয়েছে। অনেক প্রবীণকবি-গল্পকারের তারুণ্য,
উন্মাদনা দেখেছেন। এখন তাদের বার্ধক্য দেখছেন। মতের পরিবর্তন দেখছেন। অবশেষে আজ আপনার মূল্যায়নের
উপলব্ধিটা জানতে চাইছি! বুঝতে চাইছি- মুখ ও মুখের আড়ালের কথোপকথন ...
সেলিম
মুস্তাফাঃ এটা তো তুমি দেখতেই পাচ্ছো । এটার দুটো দিক, একটা হলো সরাসরি
রাজনৈতিক,
আর অন্যটা হলো
পরিবর্তিত অবস্থায় নিজের শৈল্পিক দৃষ্টিকোণটাই পাল্টে ফেলা । হয় আগে ভণ্ড ছিল অথবা
পরে ভণ্ড হয়েছে,
অথবা উভয়
অবস্থাতেই সে মূলত ভণ্ড । সাংসারিক জীবনে অনেক সময়ই
কম্প্রোমাইজ করে থাকতে হয়,
এটা বাঁচার নীতি, যুদ্ধের নীতি, কিছু করার নেই, কিন্তু তাই বলে
সৃষ্টিকর্মেও ?
অবশ্য কেউ কেউ
কোনো অবস্থাতেই কম্প্রোমাইজ করেন না । এমন লোক আমাদের এখানে আমার জানামত অবশ্য
একজনও নেই । ভালো । আরেকটা কথা আছে । কোন্ অবস্থাটা সঠিক কোন্ অবস্থাটা বেঠিক, এটা জানারও কোন
ফর্মূলা নেই । কাজেই কে ভণ্ড আর কে ভণ্ড নয়, এটাও নির্ধারণযোগ্য নয় । কিন্তু মানুষগুলোকে তো আমরা চিনি, জানি । তাদের সহসা
পরিবর্তন বিস্ময় সৃষ্টি করে । তখন বলতে ইচ্ছে হয় — এতোদিন কোথায় ছিলেন ?
এতোদিন কী করলেন
তবে ?
তমালশেখরঃ প্রায় চার বছরের ব্যবধানে আপনার কাছ থেকে
টুকরো টুকরো করে দেখা, অদেখায় প্রশ্নে প্রশ্নে অনেক উত্তর নিয়েছি। বেলা-অবেলায়
আপনাকে বিব্রত করেছি অনেকবার। আপনিও অসাধারণ ধৈর্য ধরে, ভালোবেসে আমাকে
প্রশ্রয়, আশ্রয় দিয়েছেন, তারজন্য অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই আপনাকে! আপনার সাথে দীর্ঘ
এই সম্পর্ক আমার হৃদয়ে আজীবন এক অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকবে। আবারও আপনাকে দীর্ঘ এই
সাক্ষাৎকার দেয়ার জন্য ধন্যবাদ জানাই।


No comments:
Post a Comment