Monday, September 9, 2024

“গানের সেই রসিকরাও আজ আর নেই” / শিল্পী মিহির লাল পাল

 


 

 


গানের সেই রসিকরাও আজ আর নেই

 

প্রতিদিন বাড়ির সন্ধ্যা-কীর্তন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সরল-সজীব-অকৃতিম লোকসংস্কৃতির প্রেমে পড়ে  অধুনা বিলুপ্তপ্রায়ঠাট গানবা উচ্চকীর্তন’-এর   প্রতি ভালোবাসা জন্মায়।   শিল্পী মিহির লাল পালএর সাথে পুরনো  সংস্কৃতির খুঁজে তমালশেখর দে।      

 

 

প্রশ্ন ঃ আপনার ছোটোবেলা এবং সংগীতবোধের উন্মোচন নিয়ে আমাদের কিছু বলুন ?

উত্তর ঃ আসলে আমরা কিভাবে, কখন গান শিখেছি বা  সংগীতবোধের উন্মোচন হয়েছে বলা মুস্কিল।আমি নিজেকে উঠোন-সংস্কৃতির ফসল বলে মনে করি। কেননা, আমি আমার বোঝবুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই দেখেছি, আমার বাবার একটা আসর ছিল। সন্ধ্যার পর গ্রামেই কয়েকজন সেখানে বসে কীর্তনগান করতেন।প্রায়ই খিচুড়ি প্রসাদ থাকতো। আমাদের সময়ে তখন এটাই পরিবেশ ছিল। তখন গ্রাম-বাংলার পরিবেশটাই এমন ছিল। সারাদিন কৃষিজনিত কাজকর্ম শেষে সন্ধ্যাবেলা খোল-করতাল নিয়ে আধ্যাত্মিক একটা গানের আসর বসতো। আমি এটাকেই আজ আমাদের  উঠোন-সংস্কৃতি বলতে চাইছি। এর ভিতর দিয়েই আমি গান গাওয়া, খোল-করতাল-হারমোনিয়াম বাজানো, সবই শিখেছি।আমাদের নিয়মমাস  কার্তিক-মাসের ভোরের কীর্তন- পরিক্রমার আনন্দ -- হায়, হায়, আজ-যে কি-করে সে আনন্দের কথা বুঝিয়ে বলি! ৩০-৪০জন  হয়ে যেত সে-সব পরিক্রমায়বাড়ি-আশ্রম মিলিয়ে রং খেলা হত ১৫দিন পর্যন্ত, সাথে গান। গরু-ছাগলের গায়ে রং লেগে থাকতো সারামাস। আজ সেসব দিন অতীত।আমাদের গ্রামের প্রধান অসিত পাল উনার কাছে আমার পরবর্তী গান শিক্ষার হাতেখড়ি। ‘লক্ষ্মীনারায়ণ শ্রীনাম সঙ্ঘ’ ছিল। আমরা নাম-কীর্তন, নিমাই সন্ন্যাস, নৌকাবিলাস,মান-ভঞ্জন পালাগান তখন আমরা গাইতাম।  

প্রশ্ন ঃ ‘ঠাট গান’ আজ প্রায় হারিয়ে যাওয়ার পথে। আপনি সেই হারিয়ে যাওয়া   গানের সাথে এখনো জড়িয়ে রয়েছেন।‘ঠাট গান’ নিয়ে প্রথমে আমাদের কিছু বলুন ?

উত্তর ঃ আমি ‘ঠাট গান’কে গানের রাজা বলে থাকি। যদিও উচ্চাঙ্গসংগীত বা ক্ল্যাসিক্যাল গান সম্পর্কে আমার কোনধরণের প্রথাগত ধারণা নেই।আমি যা বলবো, ঠাট গান বা আমাদের এ’দিকে ‘উচ্চকীর্তন’ নামেও পরিচিত , এই গান শিখতে গিয়ে যা জানি, তাই বলবো। সেই জানাকে আপনি গ্রামীণ পর্যায়ের জানাই বলতে পারেন, যেহেতু এ’বিষয়ে তত্ত্বগতভাবে কিছু জানাবার মত জ্ঞান-অধ্যয়ন আমার নাই।যতদূর জানি, এই ধরণের গান, সপ্তকের ‘সা’ ও ‘পা’ সহ বাকি রে, গা, মা, ধা, নি -- এই পাঁচটি স্বরের শুদ্ধ ও বিকৃত রূপ মিলে কোনো সপ্তক রচিত হলে তাকেই ‘ঠাট’ বলে। বিলাবল ঠাট – স র গ ম প ধ ন, কল্যাণ ঠাট – স র গ ক্ষ প ধ ন , খাম্বাজ ঠাট – স র গ ম প ধ ণ,  এই ধরণের ঠাটের উপর সুর বাঁধা আছে। ঠিক মত একটি  ঠাট গান গাইতে গেলে, এক গানেই পুরো রাত লেগে যায়। আমরা তো সে তুলনায় ঠাট  গানের কিছুই জানি না। ঠাট গানের আসরে ‘লোয়া’ মানে  আসর শুরুর আগে যে কনসার্ট বাজায়, সেটা প্রস্তুত করতেই আড়াই থেকে তিনঘণ্টা সময় লেগে যায়।এই ‘লোয়া’র প্রস্তুতি দেখার মত।  

প্রশ্ন ঃ ‘লোয়া’-র প্রস্তুতি এবং সময় লাগার কারণ নিয়ে আমাদের কিছু বলুন?   

উত্তর ঃ ঠাট গানে এই পর্যায় খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই আড়াই থেকে তিনঘণ্টায় বিভিন্ন তালে , বিভিন্ন বাহাদুরি এখানে দেখতে পাওয়া যায়। কত-তালে যে ঐ-সময় তাল  সেট করতে হত !এই সেট করার উপরই সারারাতের গানের ভালো-মন্দ অনেকটাই নির্ভর করে।  সে এক অপূর্ব মাধুর্য। এই তালের  সাথে সাথে শুরু হয় ‘পাড়া’এই পাড়ায় ভুল করা পাপ মনে করা হয়। আমরা ঘুরে ঘুরে পাড়া দিয়ে দিয়ে বাজনার সাথে নিজেদের একাত্ম করি। বাজনা বলতে – ঝাঁঝ,মৃদঙ্গ, রাম-করতাল, এই সব যন্ত্র থাকে। সে এক অপ্রকাশ্য মাধুর্য। যাই হোক, বাজনার সাথে ‘পাড়া’- দেওয়াটা সবচেয়ে সমস্যার।সবই দিতে পারে না। এই পাড়ার

নির্দিষ্ট একটা ভঙ্গি আছে।এখানে পাড়া ও তালের সমন্বয় না-হলে, গানের সুর কেটে যাবে। আপনি তিন-চার ঘণ্টায় একটা গানের সুর বাঁধলেন, সেটা চট করে কেটে যাবে। আর না-হলে, দেখা যাবে, আসর জমছে না। আগে আমাদের অভিজ্ঞ দর্শক বা অভিবাবকদের ছোটবেলায় বলতে শুনেছি, ‘গানে এখনও ঘর করছে না বা, এখনও ঘর করছে না!’ তখন তো ‘গানে ঘর করছে না ’ এই বিষয়টা বুঝতে পারতাম নাবহুপরে বুঝেছি, গানে-ঘর-করা কথাটা কতটুকু মূল্যবান একটা কথা। ‘ঘর’- শব্দ’টাকে গানের সাথে তুলনা করে, কি অপূর্ব  ব্যঞ্জনা আমাদের পূর্ব-পুরুষরা তৈরি করেছিলেন

 

প্রশ্ন ঃ  ‘ঘর-করা’ মুহূর্ত’টা যদি আর একটু বুঝিয়ে বলতেন?   

 

উত্তর ঃ আসলে গানের চূড়ান্ত মুহূর্ত।সুরের মাধুর্য যেখানে পাগলের মত শিল্পীর সাথে সাথে দর্শক-শ্রোতাদের শ্বাসরুদ্ধকর এক পরিস্থিতিতে নিয়ে যায়। এইসময় গাইয়েরা ঝাঁঝ,মৃদঙ্গ বা রাম-করতাল নিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে কিভাবে যে শূন্যে উঠে যায়, তারাই জানে না। আবার কখনও গাইয়েরা ঝাঁঝ,মৃদঙ্গ,রাম-করতাল রেখে শুধু হাততালি দিয়ে ধামাইলের মত ঘুরে ঘুরে, কখনো আগে পিছে হয়ে, সাপের মত এঁকে-বেঁকে , ঊর্দ্ধ-বাহু হয়ে নাচতে নাচতে অন্তিমে যায়। কখনো দেখা যায় তারা সারিবদ্ধ হয়ে বৃত্তাকারে ঘুরতে ঘুরতে নাচতে থাকে। একটা ঘুরের ভিতর চলে যায় গোটা আসর, বাইন থেকে গাইন। কয়েকজন মূল গানটি গাইলে অন্যরা দোহা দিয়ে এটিকে ব্যঞ্জনাময় করে তোলে। আসলে এই মুহূর্তের সুর-স্বর-ভাব-বাজনা এমনই এক মোহ তৈরি হয়, এখন যেন কেউ তাল কাটলে মনে হয়, যেন মেরে ফেলি। এত কষ্ট করে সাজিয়ে আনার পর যদি সুরের ঘর-বানতে না-পারি! কার-না রাগ উঠবে ?  

এইজন্যই আমরা প্রথম পর্যায়ে আড়াই থেকে তিনঘণ্টায় নিজেদের তৈরি করি।  আমার গলার-রগ ছিঁড়ে তিনবার রক্ত এসেছে। তিন-চার জোড়া রাম-করতাল,ঝাঁঝ,মৃদঙ্গ ছাপিয়ে আপনার গলাকে তুলে ধরা কি চারটি-খানি কথা!

 

প্রশ্ন ঃ ঠাট গানের পদ ও পর্যায় নিয়ে আমাদের কিছু বলুন? এখানে বিশ্রামের কি কোন সুযোগ থাকে ?

উত্তর ঃ ঠাট গানে পদ খুব কম থাকে। পাঁচ কি ছয় লাইন থাকে।  এরপর সুরের বিস্তারেই সব গান এগিয়ে যায় সারারাত। একরাতে দুটো- তিনটের বেশি গাওয়া যায় না। আবার এক গানেই রাত শেষ হয়ে যায়, এমন গানও আছে।তবে বর্তমানে আর এমন নেই। কে শুনবে এত ধৈর্য ধরে ? কে-ই বা শুনাবে ? সেই বাজনা বাজাবার লোক কোথায় ?গাওয়া তো আরও কঠিন! এটা একটা সমন্বয়ের ব্যাপার। তবু আমি গাই, অনেক ছোটো ছোটো ভাবে ভাগ করে নিয়েছি।পনেরো-কুড়ি বছর আগেও দুর্গা পূজা, বাসন্তী পূজা, নারায়ণ পূজা উপলক্ষ্যে গাওয়া হত ।

পর্যায় বলতে, প্রথমের ‘লোয়া’ বাজানো হয়। তার পরের গানের প্রথম পর্যায়কে বলে ‘রূপক’।  রূপক-পর্যায়ের পর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়া হয়। এরপর ‘পাতনি’তে গানকে ফেলা হয়।বিশ্রামের সময় মাঝখানে ‘কারিকা বা বুলি ’ গাওয়া হয়। ঠাট গানের কোনও গায়কের মান পাওয়া যায় না। কিন্তু কারিকায় নাম পাওয়া যায়। কারিকা না-গাইলে ঠাট গান বা কীর্তন পূর্ণতা পায় না। কারণ তারা পদের শেষে গান ও নাচের তাল ধরিয়ে দেয়।  এভাবেই গানে গানে সকাল থেকে রাত, রাত থেকে ভোর হয়।

 

প্রশ্ন ঃ ঠাট গান হারিয়ে যাওয়ার কারণ কি বলে আপনার মনে হয়?

উত্তর ঃ এর সঠিক উত্তর আমি কি করে দিই বলুন তো ? খুব সহজ কথায় বলতে গেলে তো নিষ্ঠুরের মত বলতেই হয়, আমরা কেউ একে বাঁচিয়ে রাখতে চাইনি বলেই তা আজ বেঁচে নেই যে-কোন কিছুরই পৃষ্ঠপোষকতা দরকার। আগে বড় বড় জমিদাররা করাতো, তারপর বড় বড় বাড়িতে হত। এক পর্যায়ে তারাও হারিয়ে গেছে। গানের সে-ই সৌখিন বা রসিক লোকজনেরাও নেই। কার,  কিসের দায়-- একটা সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখাতে টাকা খরচ করার।ফলত যা হবার তাই হচ্ছে। আমি চলে গেলে, আপনাকে এই কথাগুলো বলার লোক আরও একজন কমবে

 এই প্রসঙ্গে  একটা কথাবলার  আছে, দাবি আছে – আপনারা পারলে গানগুলোকে বাঁচান। ধরে রাখুন।আমি এখনও মনে করি, গানের রাজা ঠাট গান।এটা আমাদের সিলেটের নিজস্ব ঐতিহ্যও বটে।এর পৃষ্ঠপোষকতা এতদিন আমাদের পূর্ব-পুরুষরা করে

এসেছেন। তখন তাদের সে অর্থনৈতিক-সামাজিক ক্ষমতা ছিল। আজ কেউ নেই। আমি রাজ্য-কেন্দ্র সব সরকারের প্রতি আহ্বান করছি, আপনারা একে উদ্ধারের জন্য কোন প্রকল্প নিন। অন্তত পক্ষে গানগুলোকে সংক্ষরণ  করুন। একটা সংস্কৃতির সুর হারিয়ে গেলে তাকে আর উদ্ধার করতে পারবেন না!যেহেতু এগুলো পাথর নয়, যে খনন করে কেউ আবিষ্কার করতে পারবে ...                   

No comments:

Post a Comment

অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎

  'অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎ ‎সত্তর দশকের উন্মাদনায় এক ভিন্ন উচ্চারণ-ভঙ্গ...