সত্তর দশকের ভাঙাচোরা সময়ের
মন্থন থেকে উঠে আসা তীব্র এক উচ্চারণের ভিতর দিয়ে প্রতিস্পর্ধী কবি-আলোচক রামেশ্বর
ভট্টাচার্যের উত্থান । কবির জন্ম ১৯৫৩
সালে । গ্রুপ সেঞ্চুরি আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সারির কবি । প্রথম কাব্যগ্রন্থ – ‘উপদ্রুত
বসন্ত’ প্রকাশ- ১৯৯৯ সালে ।পরবর্তী কাব্যগ্রন্থ – “এখন কথা বলার সময়”- প্রকাশ কাল –
২০০২ সালে । কবি রামেশ্বর ভট্টাচার্যের কবিতার প্রকাশভঙ্গি মূলত বক্তব্যধর্মী
।সমাজ- শাসনতন্ত্র- সামাজিক অধঃপতন ছিল তাঁর কবিতার মূল বিষয় । আত্মিক সংকট জড়িয়ে
থাকে তাঁর কবিতার রন্ধ্রে রন্ধ্রে । যেমন – “ ক্রমশ, ক্রমশ আরো গভীরে, গভীরে
গহ্বরে আমি/ অনুপ্রবেশে টের পাই আমার কোন দুঃখ নেই সুখ নেই/ ত্বক নেই কোন অনুভূতি
নেই সাড়ে পাঁচফুট বিছানায় নির্জীব অসাড় যে সামাজিক পুরুষ / বোতাম খুললেই শারীরিক
মীমাংসা অন্তর্বস্ত্রে / চাপা পড়ে যায়।”
কবি রামেশ্বর ভট্টাচার্য ত্রিপুরার
রাজ্যের কবিতা আন্দোলনের পাশাপাশি নানা রকমের সামাজিক আন্দোলনের সাথে সদা সর্বদাই
জড়িয়ে থাকেন । চিত্রকলা এবং সংস্কৃত সাহিত্যেও রাখেন অঘাত জ্ঞান। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল তাঁর একান্ত সাক্ষাৎকার নেওয়ার
। সেই সাক্ষাৎকারটা আজ তোলে ধরলাম ।
উত্তর ঃ “কখনো প্রতিষ্ঠা পাবে না তুমি, এই
শ্বাশতকাল,/ হে নিষাদ / মিথুনমগ্ন ক্রৌঞ্চের একটিকে করেছো হত্যা/ মোহিত যে
কামনায়।’ আদি কবির প্রথম উচ্চারিত শ্লোককে যদি এইভাবে অনুবাদ করে ফেলি, তাহলে
বুঝতে অসুবিধা হয় না যে,কবিতার উৎসে ছিল বেদনার কড়া নাড়া । প্রলুব্ধ শিকারির
কাম-মোহ-হিংসা এক নিরপরাধ মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করেছিল । শোক এরপর সমাহিত হয়ে যায়
শ্লোকে। এইভাবে কবিতার চরণে, আবহমান,বাল্মীকি থেকে অনঙ্গমোহিনী । বলো তমাল, কে নয়
বেদনাতাড়িত কবি । একটি নিদারুণ বিচ্ছেদ, যেমন কাদম্বিরী, জোড়াসাঁকোর কবির আরও
দুঃখরাশি, তাঁর অনেক সৃষ্টির সম্ভারকে মহত্তর করে তুলতে পেরেছিল বলেই আমার মনে হয়
। বিশেষ করে তাঁর গানগুলি । অতুল বা কান্তকবির গানেও যে সুরের মধুরিমা, এর আড়ালে
কি বিষণ্ণতার আর্তি খুঁজে পাওয়া যায় না ? মৃত্যুর যন্ত্রণা, পরাভবের গ্লানি,
অপমানের দুঃখ বা বিচ্ছেদ-বিরহের বেদনা আছড়ে-পিছড়ে দেয়নি কখনও, এমন মানুষই বিরল ।
তবে, ব্যক্তিগত দুঃখের সংকীর্ণ লক্ষণরেখা ভেঙে দিয়ে কবির মনখারাপ যখন উঠে আসে
সমষ্ঠির সামূহিক যন্ত্রণার অন্ধকূপ থেকে, কবি যখন দেখেন যুদ্ধ আর সন্ত্রাসের
আস্ফালন, ক্ষুধা ও মহামারীর করাল ছায়া আফ্রিকা আর ল্যাটিন আমেরিকার মরুভূমে ও ঘন
জঙ্গলে, যখন রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসে পুড়ে খাক হয়ে যায় যুবকের শত লাশ, যখন ঘনিয়ে আসে
সভ্যতার সংকট, ঘৃণ্য উল্লাস যখন ঝাঁপিয়ে পড়ে অসহায় নারীর নগ্নতায় –- সে সবকিছু এক
অনিবার্য বেদনা-বোধে জারিত করে একজন সৎ ও সচেতন কবিকে । আর ঠিক তখনই একজন
জীবনানন্দ খুঁজে পান তিমির হননের গান, আরেকজন কবি হয়ে ওঠেন সমর সেন বা নবারুণ
ভট্টাচার্য ।
প্রশ্ন ঃ সত্য- শিব- এবং
সুন্দর ভারতীয় পরম্পরার এই তত্ত্বের সঙ্গে মার্কসবাদী সাহিত্য তত্ত্বকে কীভাবে
মূল্যায়ন করেন ? নাকি আজকের সময়ে এই প্রশ্নটা অপ্রাসঙ্গিক ?
উত্তর ঃ সত্য-শিব-সুন্দর ও মার্কসবাদী
সাহিত্যতত্ত্ব –-- এ-দুটি আপাত-বিরোধী হলেও আমার কাছে প্রিয় ও জরুরি । কিন্তু
যান্ত্রিকভাবে দু’টিকে মেলানো ঠিক হবে না । একটি ভাববাদী অপরটি বস্তুবাদী – এরকম
সরলীকরণের অতিরেকেও যাব না, প্রথমটির
মধ্যে ধার্মিক অনুষঙ্গ মিশে আছে নিবিড়। দ্বিতীয়টি একটি রাজনৈতিক মতবাদের পরিপোষক ।
‘সত্য’ ও ‘সুন্দর’ নিয়ে কোনও ঝামেলা নেই । সকলেরই অভীষ্ট বস্তু । মুশকিল হল
‘শিব’-কে নিয়ে । ‘শিব’ তো হিন্দু দেবতাতত্ত্বে ‘ত্রিমূর্তি’-র অন্যতম । জটাজুটধারী
। আর্য-অনার্যের সেতুবন্ধন । ইতিমধ্যে ‘শিব’র
আভিধানিক ধর্মনিরপেক্ষ অর্থ আমরা প্রায় ভুলে গেছি । ‘শিব’ মানে মঙ্গল । ‘শিবেতর’
মানে যা মন্দ । অষ্টম শতাব্দীর ভারতীয় নন্দনতত্ত্ববিদ মম্মটাচার্য তার
‘কাব্যপ্রকাশ’ বইটিতে সাহিত্য রচনার উদ্দেশ্য ও বিধেয়তা নিয়ে আলোচনায় বলেছিলেন,
‘কাব্যং যশসে, অর্থকৃতে শিবেতর ক্ষয়তে’। অর্থাৎ কাব্য হল যশের, অর্থের এবং প্রধানত
অমঙ্গল বিনাসের জন্য । আর ‘শিবেতর ক্ষয়তে’ এই শব্দবন্ধে আমি খুঁজে পাই জীবনানন্দের
তিমিরবিনাশী চিত্রকল্পনা । একজন মার্কসবাদী সদাচারী সাহিত্যিক যেমন স্বপ্ন দেখেন,
বিপ্লবী রূপান্তরের ভেতর দিয়ে দুঃখ- বেদনাহীন শোষণমুক্ত এক রাষ্ট্রহীন
সমাজব্যবস্থার । ফুকো, দেরিদা বা বাখতিন পড়ব, তবে ধ্রুপদীকে সঙ্গে নিয়েই ।
প্রশ্ন ঃ “বাইরে পাহাড়ে,
সমতলে বা অনতিদূরে/ পদ্মানদীর পারে যদি ওঠে/ যদি মৃত্যু হয় অনাহারে, তবে/ কী আসে
যায় তাতে; আমি তো বেশ ভালই আছি।” – কবিতাটি তো লেখা হল, কাব্য আকারেও বের হল,
কিন্তু তারপর ...
উত্তর ঃ
হ্যাঁ, এ-কয়েকটি পংক্তি আমার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘এখন কথা বলার সময়’ থেকে নেওয়া, ‘কূর্মাবতারের
জীবনযাপন’ কবিতার অংশ । রাজনীতির ধারায়, বিশেষত বামপন্থায় যখন মূল্যবোধের অবক্ষয়,
চূড়ান্ত আদর্শহীনতা আর অর্থনীতিবাদ গেড়ে বসে যায়, সেসময় নিজেকে বিমুক্ত ও বিশুদ্ধ রাখা
যে কত কঠিন তা অনুভব করেই লিখেছিলাম । নিরাপদ আয়াসে থেকে বিপ্লবী বুলি আওড়ানো সহজ
। নারীমুক্তি নিয়ে প্রবন্ধ লিখব, অথচ শহরে প্রকাশ্যে নাটমন্দিরের খুঁটিতে বেঁধে
নারীকে পেটানো হবে তখন সরকারের বন্ধুরা খেপে যাবে বলে নীরব থাকাটাই কূর্মাবতারের
জীবনযাপন । ধর্মের নামে তীর-ধনুক আর রাইফেল হাতে তুলে নেওয়াকে দেশপ্রেম বলব,
কিন্তু কৃষক ও আদিবাসীদের অধিকার রক্ষার লড়াইকে দেশদ্রোহিতা বলতে হবে, এ-ফতোয়া
কতদিন মেনে নেব ?
প্রশ্ন ঃ ‘পূর্বমেঘ’ লিটল
ম্যাগাজিন আপনার ও মণীশ চক্রবর্তী-র
সম্পাদনায় বের হচ্ছে বহুদিন থেকে। প্রত্যেকটি সংখ্যাতেই দেখেছি আপনারা
প্রবন্ধ বিভাগে বিশেষ জোর দিয়ে থাকেন, তার পেছনে কি কোনও মৌলিক ভাবনা রয়েছে ?
উত্তর ঃ ‘পূর্বমেঘ’ পত্রিকার সঙ্গে মণীশ
চক্রবর্তী ছাড়াও আরও অনেকে যুক্ত আছেন । কিছুদিন, মানে আশির দশকে, কবি নকুল রায়ও
কয়েকটি সংখ্যা সম্পাদনা করেছিলেন । সত্তর দশকের গোড়ায় প্রকাশিত ‘পূর্বমেঘ’- এর
প্রথম সংখ্যা থেকেই প্রবন্ধের উপর জোরটা রয়ে গেছে । কবিতা মূলত আবেগ ও
রোম্যান্টিকতাকে আশ্রয় করে পাঠক মনকে জড়িয়ে রাখে । সেখানে, প্রবন্ধের উপাদান হল যুক্তি ও মনন, সে
সাহিত্যের ভুবন হোক বা সমাজবিজ্ঞান । তাছাড়া সংস্কৃতির ও ঐতিহ্যের, যথার্থ ইতিহাস
চর্চাও জরুরি। সেসব নানা কারণে ‘পূর্বমেঘ’ সাহিত্যপত্রের প্রতিটি সংখ্যার
বিষয়-বৈচিত্র্যের বিন্যাসে আমরা সিরিয়াস
থাকার চেষ্টা করি ।
প্রশ্ন ঃ ‘আজকাল লিটল
ম্যাগাজিন অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক- প্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন কারণে তার স্পর্ধা হারিয়ে ফেলছে’
– এই অভিযোগটিকে আপনি কোন দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করতে চাইবেন ?
উত্তর ঃ লিটল ম্যাগাজিনগুলো নানা কারণে
আগেকার স্পর্ধা ও মেজাজ হারিয়ে ফেলেছে ইদানিং, এমন অভিযোগ শুনি । তা কিছুটা সত্য ।
কেন পত্রিকা করা, তার লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য কী, সে সম্পর্কে কোনও স্পষ্ট ধারণা ছাড়াই
সম্পাদনায় নেমে পড়েছেন অনেকে । অধিকাংশ ক্ষেত্রে, প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতাবস্থা বজায়
রাখার পক্ষেই লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদকরা সাফাই গাইছেন । সাহিত্যতত্ত্ব বা
সমাজদর্শনের ওপর বিতর্কসঞ্চারী লেখা খুব কমই চোখে পড়ে । তবে ব্যতিক্রমী কিছু ছোট
পত্রিকাগুলিই আমাদের ভরসা ।
প্রশ্ন
ঃ আপনারা দেশভাগ দেখেছেন, তাদের অসহায় মুখ দেখেছেন,জমিদারকে দেখেছেন ভিখারি হতে,
দেখেছেন আশি সালের দাঙ্গা – এককথায় সাহিত্য ভাবনার মতো একটা যুগযন্ত্রণা দেখেছেন ।
আজ সে তুলনায় তরুণরা লি অনেকটাই দৃশ্যত ঘটনাবিহীন ? আপনি কীভাবে দেখছেন বিষয়টাকে ?
উত্তর ঃ দেশভাগ
দেখিনি । তবে দেশভাগের ফলশ্রুতি আর যন্ত্রণা দেখেছি । সাতপুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে
ছিন্নমূল উদ্বাস্তুদের বেঁচে থাকার জন্য রক্ত ঝরানো দিনগুলি দেখেছি । আবার
একাত্তরের উদ্বাস্তু-স্রোত ত্রিপুরার জনপরিসরকে একেবারে টালমাটল করে দেয়, নিজভুমে
পরবাসী হয় আদিবাসীরা । আর নয়া বসতের আদিবাসীরা হয়ে যায় ‘ওয়াংছো’। জরুরি অবস্থা,
নকশাল আন্দোলন, আশির দাঙ্গা – এত সব সামাজিক ঘটনায় জারিত আমাদের জীবন-যাপন ।
কবিতায়, গদ্যে, নাটকে ও চিত্রকলায় নানাভাবে উঠে এসেছে যুগযন্ত্রণার ধারাভাষ্য ।
সমকালও তেমনি । আপাত ঘটনাবিহীন, প্রমোদতরণীতে গা-ভাসানো মুক্তজীবন ও অন্তর্জালের
কামনাবাসনার অবাধ মৃগয়াভূমি এসবের আড়ালে ধর্মান্ধতা ও কর্পোরেট কালচারের আগ্রাসন ।
প্রতিক্রিয়া তো থাকবেই । তরুণ কবিরাই রি-অ্যাক্ট করবেন সবচেয়ে বেশি । এ বিশ্বাস
আমার অটুট ।
প্রশ্ন
ঃ ‘তিনটি বিতর্ক ও স্বস্তিবাচক’ কবিতা তিনটি কবিতাতেই চিরচেনা মেজাজের বাইরে বেশ উত্তেজিত,আক্রমণাত্মক প্রকাশভঙ্গিতে
দেখা গেল আপনাকে । এর বিশেষ কোনও কারণ ? না, কবিতায় পরীক্ষা ?
উত্তর ঃ ‘তিনটি
বিতর্ক ও স্বস্তিবাচক’ লেখাটি নিঃসন্দেহে আক্রমণাত্মক ও নিরীক্ষাধর্মী, রীতি ও
আঙ্গিককে একটু উলটে-পালটে দেখলাম, শানিত যুক্তিমালা ও রোম্যান্টিকতা দুটোই দরকার আমূল পরিবর্তনের জন্য । শেকড়সুদ্ধ
উপড়ে ফেলে দিতে চেয়েছি কবিতায় । দারিদ্রতার
দর্শন নিয়ে মার্কস থেকে অমর্ত্য সেন – সবার কাছেই ছুটে যাচ্ছি বারবার ।
পাশাপাশি দর্শনের দারিদ্রও যে প্রকট হয়ে উঠেছে মগজে ও মেধায়, সেদিকেও চোখ ফেরাতে
হবে ভাবীকালের ক্রান্তদর্শীকে । যার মধ্যে নিঃসন্দেহে একজন কবিও থাকবেন, ভালোবাসা
বিলিয়ে নিঃস্ব হলেও তিনি পূর্ণ, চিরকাল ।




No comments:
Post a Comment