Friday, September 27, 2024

"শেকড়সুদ্ধ উপড়ে ফেলে দিতে চেয়েছি কবিতায়" - - কবি-আলোচক রামেশ্বর ভট্টাচার্য


 

সত্তর দশকের ভাঙাচোরা সময়ের মন্থন থেকে উঠে আসা তীব্র এক উচ্চারণের ভিতর দিয়ে প্রতিস্পর্ধী কবি-আলোচক রামেশ্বর ভট্টাচার্যের উত্থান ।  কবির জন্ম ১৯৫৩ সালে । গ্রুপ সেঞ্চুরি আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সারির কবি । প্রথম কাব্যগ্রন্থ – ‘উপদ্রুত বসন্ত’ প্রকাশ- ১৯৯৯ সালে ।পরবর্তী কাব্যগ্রন্থ – “এখন কথা বলার সময়”- প্রকাশ কাল – ২০০২ সালে । কবি রামেশ্বর ভট্টাচার্যের কবিতার প্রকাশভঙ্গি মূলত বক্তব্যধর্মী ।সমাজ- শাসনতন্ত্র- সামাজিক অধঃপতন ছিল তাঁর কবিতার মূল বিষয় । আত্মিক সংকট জড়িয়ে থাকে তাঁর কবিতার রন্ধ্রে রন্ধ্রে । যেমন – “ ক্রমশ, ক্রমশ আরো গভীরে, গভীরে গহ্বরে আমি/ অনুপ্রবেশে টের পাই আমার কোন দুঃখ নেই সুখ নেই/ ত্বক নেই কোন অনুভূতি নেই সাড়ে পাঁচফুট বিছানায় নির্জীব অসাড় যে সামাজিক পুরুষ / বোতাম খুললেই শারীরিক মীমাংসা অন্তর্বস্ত্রে / চাপা পড়ে যায়।”

কবি রামেশ্বর ভট্টাচার্য ত্রিপুরার রাজ্যের কবিতা আন্দোলনের পাশাপাশি নানা রকমের সামাজিক আন্দোলনের সাথে সদা সর্বদাই জড়িয়ে থাকেন । চিত্রকলা এবং সংস্কৃত সাহিত্যেও রাখেন অঘাত জ্ঞান। আমার  সৌভাগ্য হয়েছিল তাঁর একান্ত সাক্ষাৎকার নেওয়ার । সেই সাক্ষাৎকারটা আজ তোলে ধরলাম ।

 

 প্রশ্ন ঃ “মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাৎ ত্বমগমঃ সমাঃ / যৎ ত্রুৌঞ্চ মিথুনাদেবমবধীঃ কামমোহিতমঃ ...” আদি কবির মতো একটি বেদনা বোধই কি কবিতার মূল উৎস বলে আপনি মনে করেন ?

 

উত্তর ঃ “কখনো প্রতিষ্ঠা পাবে না তুমি, এই শ্বাশতকাল,/ হে নিষাদ / মিথুনমগ্ন ক্রৌঞ্চের একটিকে করেছো হত্যা/ মোহিত যে কামনায়।’ আদি কবির প্রথম উচ্চারিত শ্লোককে যদি এইভাবে অনুবাদ করে ফেলি, তাহলে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে,কবিতার উৎসে ছিল বেদনার কড়া নাড়া । প্রলুব্ধ শিকারির কাম-মোহ-হিংসা এক নিরপরাধ মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করেছিল । শোক এরপর সমাহিত হয়ে যায় শ্লোকে। এইভাবে কবিতার চরণে, আবহমান,বাল্মীকি থেকে অনঙ্গমোহিনী । বলো তমাল, কে নয় বেদনাতাড়িত কবি । একটি নিদারুণ বিচ্ছেদ, যেমন কাদম্বিরী, জোড়াসাঁকোর কবির আরও দুঃখরাশি, তাঁর অনেক সৃষ্টির সম্ভারকে মহত্তর করে তুলতে পেরেছিল বলেই আমার মনে হয় । বিশেষ করে তাঁর গানগুলি । অতুল বা কান্তকবির গানেও যে সুরের মধুরিমা, এর আড়ালে কি বিষণ্ণতার আর্তি খুঁজে পাওয়া যায় না ? মৃত্যুর যন্ত্রণা, পরাভবের গ্লানি, অপমানের দুঃখ বা বিচ্ছেদ-বিরহের বেদনা আছড়ে-পিছড়ে দেয়নি কখনও, এমন মানুষই বিরল । তবে, ব্যক্তিগত দুঃখের সংকীর্ণ লক্ষণরেখা ভেঙে দিয়ে কবির মনখারাপ যখন উঠে আসে সমষ্ঠির সামূহিক যন্ত্রণার অন্ধকূপ থেকে, কবি যখন দেখেন যুদ্ধ আর সন্ত্রাসের আস্ফালন, ক্ষুধা ও মহামারীর করাল ছায়া আফ্রিকা আর ল্যাটিন আমেরিকার মরুভূমে ও ঘন জঙ্গলে, যখন রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসে পুড়ে খাক হয়ে যায় যুবকের শত লাশ, যখন ঘনিয়ে আসে সভ্যতার সংকট, ঘৃণ্য উল্লাস যখন ঝাঁপিয়ে পড়ে অসহায় নারীর নগ্নতায় –- সে সবকিছু এক অনিবার্য বেদনা-বোধে জারিত করে একজন সৎ ও সচেতন কবিকে । আর ঠিক তখনই একজন জীবনানন্দ খুঁজে পান তিমির হননের গান, আরেকজন কবি হয়ে ওঠেন সমর সেন বা নবারুণ ভট্টাচার্য ।

 

প্রশ্ন ঃ সত্য- শিব- এবং সুন্দর ভারতীয় পরম্পরার এই তত্ত্বের সঙ্গে মার্কসবাদী সাহিত্য তত্ত্বকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন ? নাকি আজকের সময়ে এই প্রশ্নটা অপ্রাসঙ্গিক ?

 

উত্তর ঃ সত্য-শিব-সুন্দর ও মার্কসবাদী সাহিত্যতত্ত্ব –-- এ-দুটি আপাত-বিরোধী হলেও আমার কাছে প্রিয় ও জরুরি । কিন্তু যান্ত্রিকভাবে দু’টিকে মেলানো ঠিক হবে না । একটি ভাববাদী অপরটি বস্তুবাদী – এরকম সরলীকরণের অতিরেকেও  যাব না, প্রথমটির মধ্যে ধার্মিক অনুষঙ্গ মিশে আছে নিবিড়। দ্বিতীয়টি একটি রাজনৈতিক মতবাদের পরিপোষক । ‘সত্য’ ও ‘সুন্দর’ নিয়ে কোনও ঝামেলা নেই । সকলেরই অভীষ্ট বস্তু । মুশকিল হল ‘শিব’-কে নিয়ে । ‘শিব’ তো হিন্দু দেবতাতত্ত্বে ‘ত্রিমূর্তি’-র অন্যতম । জটাজুটধারী । আর্য-অনার্যের সেতুবন্ধন । ইতিমধ্যে  ‘শিব’র আভিধানিক ধর্মনিরপেক্ষ অর্থ আমরা প্রায় ভুলে গেছি । ‘শিব’ মানে মঙ্গল । ‘শিবেতর’ মানে যা মন্দ । অষ্টম শতাব্দীর ভারতীয় নন্দনতত্ত্ববিদ মম্মটাচার্য তার ‘কাব্যপ্রকাশ’ বইটিতে সাহিত্য রচনার উদ্দেশ্য ও বিধেয়তা নিয়ে আলোচনায় বলেছিলেন, ‘কাব্যং যশসে, অর্থকৃতে শিবেতর ক্ষয়তে’। অর্থাৎ কাব্য হল যশের, অর্থের এবং প্রধানত অমঙ্গল বিনাসের জন্য । আর ‘শিবেতর ক্ষয়তে’ এই শব্দবন্ধে আমি খুঁজে পাই জীবনানন্দের তিমিরবিনাশী চিত্রকল্পনা । একজন মার্কসবাদী সদাচারী সাহিত্যিক যেমন স্বপ্ন দেখেন, বিপ্লবী রূপান্তরের ভেতর দিয়ে দুঃখ- বেদনাহীন শোষণমুক্ত এক রাষ্ট্রহীন সমাজব্যবস্থার । ফুকো, দেরিদা বা বাখতিন পড়ব, তবে ধ্রুপদীকে সঙ্গে নিয়েই ।

 




প্রশ্ন ঃ “বাইরে পাহাড়ে, সমতলে বা অনতিদূরে/ পদ্মানদীর পারে যদি ওঠে/ যদি মৃত্যু হয় অনাহারে, তবে/ কী আসে যায় তাতে; আমি তো বেশ ভালই আছি।” – কবিতাটি তো লেখা হল, কাব্য আকারেও বের হল, কিন্তু তারপর ...

 

উত্তর ঃ  হ্যাঁ, এ-কয়েকটি পংক্তি আমার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ  ‘এখন কথা বলার সময়’ থেকে নেওয়া, ‘কূর্মাবতারের জীবনযাপন’ কবিতার অংশ । রাজনীতির ধারায়, বিশেষত বামপন্থায় যখন মূল্যবোধের অবক্ষয়, চূড়ান্ত আদর্শহীনতা আর অর্থনীতিবাদ গেড়ে বসে যায়, সেসময় নিজেকে বিমুক্ত ও বিশুদ্ধ রাখা যে কত কঠিন তা অনুভব করেই লিখেছিলাম । নিরাপদ আয়াসে থেকে বিপ্লবী বুলি আওড়ানো সহজ । নারীমুক্তি নিয়ে প্রবন্ধ লিখব, অথচ শহরে প্রকাশ্যে নাটমন্দিরের খুঁটিতে বেঁধে নারীকে পেটানো হবে তখন সরকারের বন্ধুরা খেপে যাবে বলে নীরব থাকাটাই কূর্মাবতারের জীবনযাপন । ধর্মের নামে তীর-ধনুক আর রাইফেল হাতে তুলে নেওয়াকে দেশপ্রেম বলব, কিন্তু কৃষক ও আদিবাসীদের অধিকার রক্ষার লড়াইকে দেশদ্রোহিতা বলতে হবে, এ-ফতোয়া কতদিন মেনে নেব ?

 





প্রশ্ন ঃ ‘পূর্বমেঘ’ লিটল ম্যাগাজিন আপনার ও মণীশ চক্রবর্তী-র  সম্পাদনায় বের হচ্ছে বহুদিন থেকে। প্রত্যেকটি সংখ্যাতেই দেখেছি আপনারা প্রবন্ধ বিভাগে বিশেষ জোর দিয়ে থাকেন, তার পেছনে কি কোনও মৌলিক ভাবনা রয়েছে ?

 

উত্তর ঃ ‘পূর্বমেঘ’ পত্রিকার সঙ্গে মণীশ চক্রবর্তী ছাড়াও আরও অনেকে যুক্ত আছেন । কিছুদিন, মানে আশির দশকে, কবি নকুল রায়ও কয়েকটি সংখ্যা সম্পাদনা করেছিলেন । সত্তর দশকের গোড়ায় প্রকাশিত ‘পূর্বমেঘ’- এর প্রথম সংখ্যা থেকেই প্রবন্ধের উপর জোরটা রয়ে গেছে । কবিতা মূলত আবেগ ও রোম্যান্টিকতাকে আশ্রয় করে পাঠক মনকে জড়িয়ে রাখে ।  সেখানে, প্রবন্ধের উপাদান হল যুক্তি ও মনন, সে সাহিত্যের ভুবন হোক বা সমাজবিজ্ঞান । তাছাড়া সংস্কৃতির ও ঐতিহ্যের, যথার্থ ইতিহাস চর্চাও জরুরি। সেসব নানা কারণে ‘পূর্বমেঘ’ সাহিত্যপত্রের প্রতিটি সংখ্যার বিষয়-বৈচিত্র্যের বিন্যাসে  আমরা সিরিয়াস থাকার চেষ্টা করি ।

 

প্রশ্ন ঃ ‘আজকাল লিটল ম্যাগাজিন অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক- প্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন কারণে তার স্পর্ধা হারিয়ে ফেলছে’ – এই অভিযোগটিকে আপনি কোন দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করতে চাইবেন ?

 

উত্তর ঃ লিটল ম্যাগাজিনগুলো নানা কারণে আগেকার স্পর্ধা ও মেজাজ হারিয়ে ফেলেছে ইদানিং, এমন অভিযোগ শুনি । তা কিছুটা সত্য । কেন পত্রিকা করা, তার লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য কী, সে সম্পর্কে কোনও স্পষ্ট ধারণা ছাড়াই সম্পাদনায় নেমে পড়েছেন অনেকে । অধিকাংশ ক্ষেত্রে, প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতাবস্থা বজায় রাখার পক্ষেই লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদকরা সাফাই গাইছেন । সাহিত্যতত্ত্ব বা সমাজদর্শনের ওপর বিতর্কসঞ্চারী লেখা খুব কমই চোখে পড়ে । তবে ব্যতিক্রমী কিছু ছোট পত্রিকাগুলিই আমাদের ভরসা ।

  

প্রশ্ন ঃ আপনারা দেশভাগ দেখেছেন, তাদের অসহায় মুখ দেখেছেন,জমিদারকে দেখেছেন ভিখারি হতে, দেখেছেন আশি সালের দাঙ্গা – এককথায় সাহিত্য ভাবনার মতো একটা যুগযন্ত্রণা দেখেছেন । আজ সে তুলনায় তরুণরা লি অনেকটাই দৃশ্যত ঘটনাবিহীন ? আপনি কীভাবে দেখছেন বিষয়টাকে ?

 

উত্তর ঃ দেশভাগ দেখিনি । তবে দেশভাগের ফলশ্রুতি আর যন্ত্রণা দেখেছি । সাতপুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে ছিন্নমূল উদ্বাস্তুদের বেঁচে থাকার জন্য রক্ত ঝরানো দিনগুলি দেখেছি । আবার একাত্তরের উদ্বাস্তু-স্রোত ত্রিপুরার জনপরিসরকে একেবারে টালমাটল করে দেয়, নিজভুমে পরবাসী হয় আদিবাসীরা । আর নয়া বসতের আদিবাসীরা হয়ে যায় ‘ওয়াংছো’। জরুরি অবস্থা, নকশাল আন্দোলন, আশির দাঙ্গা – এত সব সামাজিক ঘটনায় জারিত আমাদের জীবন-যাপন । কবিতায়, গদ্যে, নাটকে ও চিত্রকলায় নানাভাবে উঠে এসেছে যুগযন্ত্রণার ধারাভাষ্য । সমকালও তেমনি । আপাত ঘটনাবিহীন, প্রমোদতরণীতে গা-ভাসানো মুক্তজীবন ও অন্তর্জালের কামনাবাসনার অবাধ মৃগয়াভূমি এসবের আড়ালে ধর্মান্ধতা ও কর্পোরেট কালচারের আগ্রাসন । প্রতিক্রিয়া তো থাকবেই । তরুণ কবিরাই রি-অ্যাক্ট করবেন সবচেয়ে বেশি । এ বিশ্বাস আমার অটুট ।

 



প্রশ্ন ঃ ‘তিনটি বিতর্ক ও স্বস্তিবাচক’ কবিতা তিনটি কবিতাতেই চিরচেনা মেজাজের  বাইরে বেশ উত্তেজিত,আক্রমণাত্মক প্রকাশভঙ্গিতে দেখা গেল আপনাকে । এর বিশেষ কোনও কারণ ? না, কবিতায় পরীক্ষা ?

 

উত্তর ঃ ‘তিনটি বিতর্ক ও স্বস্তিবাচক’ লেখাটি নিঃসন্দেহে আক্রমণাত্মক ও নিরীক্ষাধর্মী, রীতি ও আঙ্গিককে একটু উলটে-পালটে দেখলাম, শানিত যুক্তিমালা ও রোম্যান্টিকতা  দুটোই দরকার আমূল পরিবর্তনের জন্য । শেকড়সুদ্ধ উপড়ে ফেলে দিতে চেয়েছি কবিতায় । দারিদ্রতার  দর্শন নিয়ে মার্কস থেকে অমর্ত্য সেন – সবার কাছেই ছুটে যাচ্ছি বারবার । পাশাপাশি দর্শনের দারিদ্রও যে প্রকট হয়ে উঠেছে মগজে ও মেধায়, সেদিকেও চোখ ফেরাতে হবে ভাবীকালের ক্রান্তদর্শীকে । যার মধ্যে নিঃসন্দেহে একজন কবিও থাকবেন, ভালোবাসা বিলিয়ে নিঃস্ব হলেও তিনি পূর্ণ, চিরকাল ।

 

 

 

               

 

No comments:

Post a Comment

অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎

  'অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎ ‎সত্তর দশকের উন্মাদনায় এক ভিন্ন উচ্চারণ-ভঙ্গ...