Tuesday, September 10, 2024

“ প্রকৃতির আনন্দ-বেদনার সাথে আমি নারী-জীবনের অদ্ভুত এক সামঞ্জস্য খুঁজে পাই।”-- চিত্রশিল্পী এবং রবীন্দ্রসঙ্গীতশিল্পী সংঘমিত্রা নন্দী

 





“ প্রকৃতির আনন্দ-বেদনার সাথে আমি নারী-জীবনের অদ্ভুত এক সামঞ্জস্য  খুঁজে পাই।”

আমাদের রাজ্যে একাধারে চিত্রশিল্পী এবং  রবীন্দ্রসঙ্গীতশিল্পী হিসেবে প্রখ্যাত সংঘমিত্রা নন্দীসব অর্থেই স্বতন্ত্র তাঁর পদচারণা তাঁর সাথে একান্ত কথোপকথনে তমালশেখর দে ।

  

 প্রশ্ন ঃ আপনার শুরুর জীবন দিয়েই প্রথমে শুরু করতে চাইবো । আপনার বাবার সাথে স্বয়ং  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিঠিপত্রে যোগাযোগ ছিল । সেইসব ঈর্ষণীয় বিষয় এবং আপনার শান্তিনিকেতনে পড়তে যাওয়ার বিষয়টা নিয়ে প্রথমেই আপনার কাছ থেকে কিছু শুনতে চাইবো  

 উত্তর ঃ  আমার বাবা  দ্বিজেন্দ্রচন্দ্র দত্ত কে নিয়ে আমি গর্ব করি । তিনি শেষ মহারাজা বীর বিক্রম মাণিক্যের একান্ত সচিব ছিলেন । সেই সূত্রে মহারাজার সফরসঙ্গী ছিলেন তিনি । এবং সেই সুবাদে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথেও বাবার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল । ত্রিপুরার সব তথ্য ছিল বাবার নখদর্পণে । বাবার বিরাট লাইব্রেরী আজও আমার কাছে বিস্ময় । পৃথিবী বিখ্যাত দুর্লভ সব কালেকসন। আমার মা শৈল দত্তও খুব ভালো লিখতেন । মামার বাড়ির সবাই শান্তিনিকেতনেই থাকতেন।  ফলে আমি বাবা এবং মামার বাড়ি দুই দিক দিয়েই সাংস্কৃতিক পরিবেশ পেয়েছি । এসবের ভিতর দিয়েই আমার বেড়ে ওঠা । আমি ছোটোবেলা থেকেই শান্তিনিকেতনের অপূর্ব সব মায়াবী বাতাবরণ পেয়েছিমোহিত হয়েছি চারপাশের প্রকৃতি দেখে । গান এবং ছবি আঁকা নিজেই অজান্তেই যেন রপ্ত করেছিলাম ছোটোবেলা থেকেই। বাবা আমাকে ছবি আঁকার যাবতীয় উপকরণ এনে দিতেন । আমার বড়দি- দিদিরা গান করতেন। আমি স্বাভাবিকভাবেই গান শিখতে লাগলাম। সাথে ছবিও । বাবা প্রথমে আমাকে বিজ্ঞান বিভাবে ভর্তি করালেও ঠিক মন বসাতে পারলাম না ।  এরপর আমাকে বাবা ফাইস আর্টে ভর্তি করে দিলেন তুলসীবতী স্কুলেই।  সেখানে আমার সংগীতগুরু ছিলেন শিল্পী আরতি কর এবং ছবিতে গুরু ছিলেন শৈলেসচন্দ্র দেববর্মণ ।  শেষে আমি  শান্তিনিকেতনেই পড়তে চলে যাই ।  ছবিরও নেশা ছিল । আমি কলা ভবনের পাশাপাশি সঙ্গীতভবনেও ক্লাস করতে শুরু করলাম । দুটো বিষয়কেই পাশাপাশি চালু রাখলাম । তখন সেটা সম্ভব ছিল । বাবার বন্ধু ধীরেণকৃষ্ণ দেববর্মণ আমাকে এই বুদ্ধিটা দিয়েছিলেন। তখন তো শান্তিনিকেতনের সবাই রত্ন কার নাম বাদ দিয়ে কার নাম নেবো! রামকিঙ্কর বেইজ,ধীরেণকৃষ্ণ দেববর্মণ, সুখময় মিত্র  জি পেরুমল   থেকে শুরু করে  সঙ্গীতভবনের শান্তিদেব ঘোষ, কণিকা  বন্দ্যোপাধ্যায়, নীলিমা সেন থেকে  সুচিত্রা মিত্র সবাই। সে এক স্বপ্নময় ভুবন, স্বপ্নময় পরিবেশ ছিল !  

 



প্রশ্ন আপনি ত্রিপুরা আর্ট কলেজের সাথে শুরু থেকেই ওতপ্রথ ভাবে জড়িত শুরুর দিনগুলির যদি একটু স্মৃতিচারণ করেন, মুগ্ধ হই


উত্তর ঃ  শান্তিনিকেতন পর্ব শেষ করে এসেই আমি একটি শিক্ষকতার চাকরি পেয়ে যাই । কিন্তু সেই চাকরিতে মন বসাতে পারছিলাম না । তখন শুনছিলাম আর্ট কলেজ হবে হবে । সেই সময় বিখ্যাত চিত্রকর সুমঙ্গল সেন হাইয়ার এডুকেশনের ডিপারমেন্টের সচিব অধী চৌধুরী এবং  তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী  তাদের সবার আন্তরিক তৎপরতা এবং সহযোগিতায় আর্ট কলেজ শুরু হয় । আমাকে  ডেপুটেশনে আনা হল আর্ট কলেজ । দশ- বারো জন ছাত্র-ছাত্রী নিয়েই রবীন্দ্র ভবনের দ্বিতলায় প্রথম ব্র্যাচের ক্লাস শুরু হয়। অপরশ পাল, বরুণ চক্রবর্তী,  দীপিকা সাহা , এবার নাম এই মুহূর্তে মনে পড়ছে । এরপর আরও ছাত্র বাড়লে মিউজিক কলেজের হলে এইভাবে বার কয়েক স্থান পরিবর্তন করে আজকের জায়গায় শেষ অবধি  স্থানান্তরিত হয় । কত অল্প সরঞ্জাম দিয়ে আমরা ক্লাস করিয়েছি । সব জিনিস তখন কিনতেও পাওয়া যেত না । ভীষণ কষ্ট করে ছাত্র-ছাত্রীরা ক্লাস করেছে । হয়ত এই অভাবের ভিতর তারা তারা শিখেছে বলেই হয়ত ওরা আরও বেশি করে কাজ শিখেছে । অক্লান্ত কাজ করে গেছে তারা । আমরা আউট-ডোর করেছি। সত্যিই সে দিনগুলো খুব সুন্দর ছিল।

 




প্রশ্ন ঃ প্রকৃতি আপনার ছবির প্রাণ । আপনি সাধারণত আপনার ছবিতে টাইটেলও ব্যবহার করতে চান না  সেটা কী প্রকৃতির কথা মাথায় রেখেই? সেইসব বিষয় আপনার মূল্যবান অনুভূতি জানতে চাইছি   

উত্তর ঃ  কেন জানি না, ছোটোবেলা থেকেই আমার প্রকৃতি ভাল লাগে। জঙ্গল আমাকে পাগলের মতো টানে ।  আমাকে জঙ্গলে ছেড়ে দিয়ে এলে, আমি বোধ হয় কেবল ছবির পর ছবিই এঁকে যাবো । আমি বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে কাজ করতে ভালবাসি । প্রকৃতির রঙ, প্রকৃতির ফর্ম ...

 

প্রশ্ন ঃ ‘প্রকৃতির ফর্ম’ – বলতে আপনি ঠিক কী বোঝাতে চাইছেন ? একটু বুঝতে চাইছি ।

 উত্তর ঃ  যেমন ধরো, – একেক গাছের একেক ফর্ম,  একেক  ফুলের একেকটা ফর্ম । প্রতিটি গাছের কালার ভিন্ন রকম । কত বৈচিত্র্য। আমাদের মাটির রঙ কত ভিন্ন ভিন্ন, কত ভেরিয়েশন । আকাশের বৈচিত্র্যের কথা তো বলাই-বাহুল্য । এই সব মিলেমিশে আমি একাকার হয়ে থাকতে পছন্দ করি । আমি মনে হয়, আমি প্রকৃতিকে অনুভব করতে পারি । তাদের জীবনকে আমি পাঠ করার চেষ্টা করি । কোথাও একটা রিলেট করতে পারি আমি ।

 





প্রশ্ন ঃ আপনি কোথাও বলেছিলেন প্রকৃতিকে আপনি বৃহৎ অর্থে নারীর সাথে মিলিয়ে দেখতে ভালবাসেন। সেই অন্তর্নিহিত অর্থটা যদি আমাদের একটু খুলে বলতেন ।

 উত্তর ঃ হ্যাঁ, বৃহৎ প্রকৃতি মানে গাছপালার  আনন্দ-বেদনার সাথে আমি নারী-জীবনের অদ্ভুত এক সামঞ্জস্য  খুঁজে পাই। পরিবার বলো, সমাজ বলো, মেয়েরা কিন্তু এখনও খুব সংগ্রাম করে চলছে । মেয়েরা  তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে শত বাধা সত্ত্বেও । আমাদের মা- মাশিমা- কাকিমা তারা কিন্তু তাদের অনেক ইচ্ছেকে, আকাঙ্খাকে চেপে রেখেও প্রকৃতির মতো সংসারে অবিচল পরিসেবা দিয়ে যাচ্ছে নীরবে । আমি সেখানেই একটা গাছকে কোথাও-না-কোথাও একটা মেয়েদের সাথে তুলনায় টেনে আনছি । আমি মিল খুঁজে পাচ্ছি দু-জনার জীবনের মধ্যেকার । ফলে আমি প্রকৃতিকে ক্যাভাসে আঁকতে  আঁকতে কোথাও এসে মনে হয়, আমি বোধ হয় একজন নারীকেই আমার ছবিতে তুলে ধরলাম । শত কষ্টের মধ্যেও সে তার ছায়া দিয়ে যাচ্ছে । ফল দিয়ে যাচ্ছে । যা কাজ করার সবই করে যাচ্ছে ।বৃক্ষ যেমন আমাদের ফল দেয়, ফুল দেয় । বীজ থেকে আবার চারা দেয় । ছায়া দিয়ে যায় সারাজীবন । আমি মনে করি, একজন নারীও কিন্তু তেমনই তাঁর পরিবারকে ছায়া দেয়।   সারাজীবন নীরবে সংসারে পরিসেবা  দিয়ে যান । নিজেকে মেলে ধরেন সংসারের কল্যাণে । বিপরীতে নারী কী এমন পায় সংসার থেকে । শৈশব থেকে বৃদ্ধাবস্থা পর্যন্ত অনেকটা  বৃক্ষের মতো নিজেকে বিলিয়েই যান চুপ করে। সংসারের ঝড় ঝাঁপটা মেনে নেন । সেই দৃ্ষ্টিকোণ  থেকেই আমি প্রকৃতিকে আমার ক্যানভাসে  তুলে ধরতে চাই ।    



প্রশ্ন ঃ সেই হিসেবে কিন্তু আপনার প্রকৃতির ভিতর আমরা বেদনার খুব একটা ছোঁয়া পাই না । যতটা পাই উচ্ছ্বাস, প্রকৃতির মধ্যে রঙের বাহার ,  রঙের  আনন্দ –

 উত্তর ঃ না, সবই ঠিক আছে । কিন্তু কোথাও দেখবে  আমার প্রকৃতির মধ্যে একটা বেদনাও খুঁজে পাবে। কিছু কিছু রঙ আমি নির্বাচন করি আমার ছবিতে, সেটারও কিন্তু একটা প্রভাব পড়ে । আমার কম্পোজিশনে নেচারকে নেচারের মতোই রাখি । তাদের আমি বিরক্ত করি না । কিন্তু তাই বলে ফটোগ্রাফি কাজ আমি করি না । রিয়েলিস্টিক ঠিক আমি করি না । আবার এবস্ট্রাকও না। আমার ছবিতে প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের একটা মিশ্রণ পাবে লক্ষ্য করলে । কালারের একটা খেলা থাকে আমার ছবিতে। কথা বলার মতো আমি তাদের জীবন চেতনাকে ধরার চেষ্টা করে থাকি ।


 প্রশ্ন ঃ একসময় তো আপনি নারীদের নিয়ে প্রচুর ফিগারেটিভ প্রচুর কাজ করে ছিলেন। এটা হঠাৎ থামিয়ে দিলেন কেন ?

উত্তর ঃ হ্যাঁ, একসময় আমি নারীদের নানারকম সমস্যা নিয়ে আমি প্রচুর  ফিগারেটিভ ফর্মে, কোলাজ ফর্মে, কিউবিক ফর্মে, রিয়েলিস্টিক ফর্মেও একের পর এক সিরিজ করেছি । কিন্তু তখন রাজস্থানের খুবই শিক্ষিত পরিবারের ঘটনা, রুপকানোয়ার  সিং নামে একজন মেয়েকে সতীদাহ প্রথা মেনে চিতায় উঠতে হল । সারাদেশে খুবই সাড়া ফেলেছিল সেই ঘটনা । তখন আমি পাগলের মতো একের পর এক ছবি আঁকি । এত কষ্ট পেয়েছিলাম আমি । তার কিছুদিন পর আমি আবার আমার প্রকৃতির মধ্যেই ফিরে আসি। এবং বিভিন্ন ফর্ম ভেঙে ভেঙে এখন কাজ করার চেষ্টা করছি ।  

 



প্রশ্ন ঃ আর ছবিতে টাইটেল ব্যবহার না- করার বিষয়টা নিয়ে কিছু বললেন না ?

 উত্তর ঃ আসলে, তখন ভাবলাম, মানুষ কিছু ভাবুক । দেখি কিছুদিন । কে কীভাবে ভাবতে চাইছে আমার ছবি নিয়ে । তখন আশ্চর্যজনকভাবে দেখি, আমি মনে মনে যা ভারছি, দর্শকও তাই রিলেট করতে পারছে। এখন অবশ্য আবার টাইটেল ব্যবহার করছি । 

 প্রশ্ন ঃ আপনি আমাদের রাজ্যের প্রখ্যাত চিত্রশিল্পীর পাশাপাশি একজন প্রখ্যাত রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পীও রবীন্দ্রনাথের গানের সাথে তাঁর আঁকা চিত্রের কী কোথাও সংযোগ খুঁজে পেয়েছেন ?

 উত্তর ঃ আমি কিন্তু কোথায় যেন কবির গানের সাথে তাঁর ছবির আশ্চর্যজনক মিল খুঁজে পাই । কবির গানের সুর, গানের কথা থেকে একটু বেরিয়ে এসে, একটু আলাদাভাবেই ভাব প্রকাশ করেছেন তাঁর ছবিতে । সে ক্ষেত্রে তাঁর কিছু কিছু ছবির সাথে আমি  ভীষণভাবে রিলেট করতে পারি । তাঁর  চণ্ডালিকা, গাছের আড়াল থেকে একটি মেয়ের বেরিয়ে আসা, তাঁর অদ্ভুত অদ্ভুত স্টাইলে  পোর্ট্রেট করেছেন, আমার মনে হয় সব লিরিক্যাল। কোনো মতেই আমি আলাদা করতে পারি না ।

 

 



প্রশ্ন ঃ যে ছোট্ট আর্ট কলেজ থেকে আজ আর্ট কলেজ মহীরুহ। অগণিত ছাত্র-ছাত্রী আপনার দেশে- বিদেশে অনেকেই চিত্রশিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত আগামীতে আর কী কী পরিকল্পনা নেয়া যেতে পারে বলে আপনি মনে করেন ।

 উত্তর ঃ  ঠিকই বলেছ । আর্ট কলেজ আজ প্রতিষ্ঠিত । সবই আছে আজ । তবু কোথাও কোনো কোনো সময় মনে হয়, ছবি নিয়ে আমাদের মধ্যে আলোচনা কম হয় । আর আরেকটা জিনিস, কোথায় যেন তরুণ প্রজন্ম বড় বেশি ডিজিটাল নির্ভর হয়ে পড়ছে আর্টের ক্ষেত্রে । আমার মতে ডিজিটালের সুযোগ তারা অবশ্যই নেবে, কিন্তু তার আগে তাকে বেসিকটাকে ভাল করে শিখে নিতে হবে । না-হলে গোঁড়ায় কিন্তু একটা দুর্বলতা থেকে যাবে ।  

 

 

No comments:

Post a Comment

অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎

  'অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎ ‎সত্তর দশকের উন্মাদনায় এক ভিন্ন উচ্চারণ-ভঙ্গ...