"শিল্প ব্যাপারটাই হল ব্যক্তি মনে প্রতিবিম্বিত সমাজচিত্র "
পার্থপ্রতীম আচার্য বহুদিন থেকে নাটকের সাথে
জড়িয়ে আছে। নিজে নাটক লেখেন, নির্দেশনা করেন। আলোচনা করেন। তার সাথে আলাপচারিতায় তমালশেখর দে ।
প্রশ্ন ঃ আপনি
মূলত নাট্যকার এবং নির্দেশক। ঠিক কখন, কোন পরিস্থিতিতে আপনার চিন্তা-চেতনায় নতুন
একটি নাটকের প্লট দানা বাঁধতে শুরু করে দেয় সহজাতভাবেই ? এমন একটি নাটকের নামও
জানতে চাইব -
যেহেতু নাটক আমার
মাধ্যম, তাই ঐ-মাধ্যমেই তার স্ফুরন ।
হ্যাঁ, যখন সেটাকে নাট্যরূপ দিতে বসি তখন নন্দনতত্ত্বের বিষয়টা চলে আসে ।
মূল অনুভূতির নির্যাসকে অক্ষুন্ন রেখে প্লট বা নাটকের বুনোট নান্দনিকভাবে অনুভবটা
দর্শকের কাছে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা । এই প্রচেষ্টা-টা সহজাত নয় । ‘সহজাত’ হল দেহ যাকে ধরে রাখতে পারে না, সেই
অনুভূতিগুলোই ।এ-পর্যন্ত লেখা আমার কুড়িটি নাটকের প্রায় বেশির ভাগেরই এভাবেই জন্ম
। দু-একটা আছে যা তাগিদে লেখা । সেগুলো আমার সন্ততি নয় ।
‘এমন একটি নাটকের
নামও জানতে চাইব’ –এর উত্তরে অবশ্যই আমি আমার ‘অনুপমা’ নাটকের কথা উল্লেখ করতে
চাইবো । এমন অনেক নাটক আছে, যাদের সাথে আমার প্রত্যক্ষ এবং
আত্মিক যোগাযোগ, অনুভব অত্যন্ত নিবিড় ।
প্রশ্ন
ঃ আপনার ‘হাঁড়ি বৃত্তান্ত’ ‘ওয়াকসা’
নাটকগুলো মঞ্চ সফল নাটকের মধ্যে অন্যতম উদাহরণ। এই ‘সফলতা’ শব্দের সাথে
‘দর্শক’ শব্দটাও নিবিড়ভাবে জড়িত। এই দুই সম্পর্ককে আপনি
কোন দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করতে চাইবেন?
উত্তর ঃ ভাবনাকে নাটকে রূপান্তরের ক্ষেত্রে সবচেয়ে
গুরুত্বপূর্ণ হল, নাটকটিকে পরিবেশন করার পদ্ধতির মধ্যে । যে নাটকগুলোর কথা উল্লেখ
করলে, তার মধ্যে ‘হাঁড়ি বৃত্তান্ত’ নাটকটা আমার জীবনের প্রথম দিকের লেখা । দুরন্ত
যৌবন তখন । এ-রাজ্যে সত্তর দশকের পর আমার জানা মতো সবচেয়ে বেশি বার পথে পথে,
ছোট বড় সবধরণের মঞ্চে সবচেয়ে বেশি হওয়া একটি সফল
নাটক।ভারতের বড় বড় নাট্য উৎসবে এই নাটকগুলো
প্রদর্শিত এবং প্রশংসিত হয়েছে ।
এই নাটকগুলো সফল
হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ মনে হয়েছে, প্রথমত- এই নাটকগুলির বিষয়বস্তু । সমসাময়িক বাস্তবতার যে অভিঘাতে
এইগুলির সৃষ্টি তার সাথে দর্শকদের জীবনের
কোথাও-না-কোথাও একটা মিল ছিল। দ্বিতীয় যে কারণ মনে হয়েছে, তাহল এর আঙ্গিক । দুটো
নাটকই লোক-আঙ্গিকে তৈরি । দ্বিতীয়টা এই
রাজ্যের জনজাতি গোষ্ঠীর আঙ্গিকে। লোকআঙ্গিক জেনেটিকভাবেই দর্শকরা তার মননে বহন করে চলে । এটা হল তার সাংস্কৃতিক অতীতের
সুর-তাল-লয় ছন্দ । দর্শকদের যা খুব চেনা । অপরিচিত যা, তা হল
বিষয়বস্তু । এখন এই পরিচিত আর অপরিচিতের বিপরীতাত্মক বিন্যাস নাটকটিকে ভালো লাগার
দিকে নিয়ে যায় বলেই আমার বিশ্বাস ।
প্রশ্ন ঃ ‘সরলবার্তা’
‘অনুপমা’ কিংবা ‘চরৈবেতি’ ‘অটোড্রাইভার’ এই নাটকগুলো নিয়ে কি বলবেন ? দর্শকরা তো এই নাটকগুলোও খুব নিয়েছিল !
উত্তর ঃ হ্যাঁ,
এই নাটকগুলোও দর্শকরা গ্রহণ করেছে । এই নাটকগুলোতে ভিন্ন ভিন্ন ধারায় নিরীক্ষা করার চেষ্টা করেছিলাম । দর্শকদেরও ভালো
লেগেছে । আবার ধরো, “ আজো টেবাটেক” যা শিক্ষা দপ্তরে মধুমিতা নাথের নির্দেশনায়
অভিনীত হয়ে অফিস ড্রামায় প্রথম হয় । এই নাটক মাথায় এসেছিল ক্রোধ থেকে । দর্শকদের
যখন ভালো লাগল, তখন মনে হয়েছে, কোথাও দর্শক এবং নাট্যকার ভাবনাসূত্রে আমরাএকই
অবস্থানে অবস্থান করছি । আমার মনে হয়েছে, আমি কিছু বলতে পেরেছি । এইটুকুই পাওনা
।
তবে আমি বিশ্বাস
করি, নাটক হচ্ছে, একটি সমষ্টিগত কাজ । এর পেছনে আলো, আবহ, সাজসজ্জা, রূপসজ্জা সবার
সার্থকতা জড়িয়ে থাকে । আমাদের নাট্য সংস্থা ‘নাট্যভূমি গ্রুপ থিয়েটার’-র অনেক টানাপড়েনের মধ্যেও সমষ্টিগত কাজের ভিতর দিয়েই
টিকে আছি ।
প্রশ্ন
ঃ আপনি বিভিন্ন সময় নাটক নিয়ে আলোচনামূলক
আর্টিকেল লিখে থাকেন পত্র-পত্রিকায়।
একটি নাটক যখন আপনি দেখেন, তখন কোন্ কোন্ বিষয়ের দিকে, বিশেষ করে দৃষ্টিপাত করে
থাকেন ? এবং কেন ?
উত্তর ঃ
সমালোচনাও একটি সাহিত্যকর্ম। ভিন্ন ভিন্ন দিক থেকে একটা শিল্পকে দেখতে সাহায্য
করতে পারেন একজন সমালোচক । কিন্তু আমাদের রাজ্যে নাট্য সমালোচনা লেখার ক্ষেত্রে
কিছু প্রতিবন্ধকতা আছে - ...... ।
আমি নাটক দেখতে
গেলে শুরু করি দর্শকদের থেকে, কারা দেখছে । তাদের বর্গ ইত্যাদি । ছিদ্রান্বেষণে
আমার অসম্ভব রকম অরুচি । আমি প্রধানত দেখি, বিষয়বস্তু। তারপর দেখি আঙ্গিক কতটা
জীবন্ত করেছে নাটকটাকে । এরপর অভিনয় থেকে উপকরণ, যে উপাদানগুলো নাটককে তৈরি করতে
সহযোগিতা করেছে, সেসব দেখি । ছোট্ট ছোট্ট অংশের ভালো-মন্দ না-দেখে আমি সামগ্রিক
ভাবেই নাটককে বিচার করতে আগ্রহী। যদি কোথাও মনে হয়, এই জায়গাটা আরও ভালো ভাবে মনকে
ছুঁয়ে যেতে পারতো, তখন সেটা লিখি ।
আলোচনা লিখি একটা
কারণেই, যাতে এই রাজ্যে নাটককে আরও জনপ্রিয় করা যায়।
প্রশ্ন ঃ ‘পাঞ্চজন্য’ ‘পঞ্চায়ুধ’ আপনার প্রকাশিত দুটি
নাটকের বই।পাঠকের প্রতিক্রিয়া কী রকম দেখলেন ? নাটকের পাঠক কি এখনও আছে ?
উত্তর ঃ পাঠকের
প্রতিক্রিয়া বললে, বলবো ‘পঞ্চজন্য’ এর প্রথম সংস্করণ দ্বিতীয় মুদ্রণ হয়েছে। গল্প,
কবিতার মতো নাটকের বি নয়। নাটক একটি পারফমিং আর্ট । স্বাভাবিকভাবেই এর চাহিদা খুব
ব্যাপক হবার কথা নয় । তবু নিবিড় পাঠের জন্য, অভিনয়ের জন্য, গবেষণার জন্য কেনার লোক
এখনও আছে । নাট্যসাথী ড. সায়ন চৌধুরী নাটকগুলোর
ইংরেজি অনুবাদ করেছেন । দেখা যাক, শেষ অবধি কি দাঁড়ায়!
প্রশ্ন
ঃ তরুণ প্রজন্মের কাজকে কীভাবে মূল্যায়ন
করছেন? তাদের কাজে কতটা খুশি আপনি !
উত্তর ঃ আমি মনে
করি, তরুণরা দুর্দান্তভাবে এগিয়ে যাচ্ছে । আমার দলের ছেলেমেয়েরাও খুব ভালো কাজ
করছে ।

No comments:
Post a Comment