Monday, September 9, 2024

নাটক করার জন্য চাই নেশা! -- বিভু ভট্টাচার্য

 

 

 




“খোয়াই থেকেই আমার নাট্যজীবনের শুরু”

  ত্রিপুরার উল্লেখযোগ্য নাট্যকর্মী নাট্যকার, অভিনেতাদের মধ্যে  বিভু ভট্টাচার্য অন্যতম একজন। ত্রিপুরা থিয়েটারই এখন তার স্বপ্ন, ধ্যান-জ্ঞান । তার সাথে একান্ত আলোচনায় তমালশেখর দে ।   

 প্রশ্ন ঃ  ‘ ত্রিপুরা থিয়েটার ’ এর নাট্যদলের  নাট্যকার এবং নির্দেশক আপনি। প্রথমেই যেটা জানতে চাইবো, নিজের দল থাকলে কি নাটক লেখার ক্ষেত্রে একটা বাড়তি সুবিধা পাওয়া যায়? সেটাকে আপনি কিভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করে থাকেন -   

 

উত্তর ঃ  হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন । নিজের দলের নিজের লেখা নাটকে নির্দেশনা দিলে বাড়তি কিছু সুবিধা তো পাওয়া যায়ই । প্রথমত – শিল্পীদের সম্পর্কে পূর্বাপর জানা থাকার কারণে বডি ফিটনেস অনুযায়ী শিল্পী-সামর্থকে  সহজেই মঞ্চের জন্য ফিট করে তোলা যায় । দ্বিতীয়ত – শিল্পীর ভাবাবেগ জানা থাকায় ঐরকম চরিত্রেই তাকে যুক্ত করে তাড়াতাড়ি কাঙ্খিত ফল লাভ করা সম্ভব হয়। তৃতীয়ত – যে-বিষয়ে যে-শিল্পী বেশি আগ্রহী, তাকে সেদিকে নিযুক্ত করে, দর্শকদের ভালো অভিনয় উপহার দেয়া সম্ভব হয় । এভাবেই গ্রুপের সবার সাথে থেকে তাদের থেকে বছরব্যাপী প্রশিক্ষণ দিয়ে, ভালো করে তৈরি করা যায় । ট্রায়েল এন্ড এরর বা গ্রহণ-বর্জনের পদ্ধতিতে তাদের সেরা পারফরমেন্স বের করে আনার অন্তত আমি চেষ্টা করে থাকি

 প্রশ্ন ঃ  একাঙ্ক নাটক নিয়ে অনেক ধরণের এক্সপেরিমেন্ট হয়েছে । যদি খুব সোজাসুজি জানতে চাই,  আপনি একজন নির্দেশক হিসেবে, দর্শকের সাথে কি ধরণের সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী ?  

 উত্তর ঃ প্রশ্নটা যতটা সহজ,  নির্দিষ্ট উত্তরটার ব্যাপ্তি ততই বেশি । তবু, সংক্ষেপে বললে, প্রথমেই বলি- ত্রিপুরায় নাটক করা আমাদের পেশা নয় বরং নেশা । এবং এই নেশার উৎপত্তি কিছু আদর্শ থেকে । কানাইলাল বা রতন থিয়াম যেমন বলতেন – “যেখানে অন্যায় সেখানেই নাটকের মাধ্যমে সম্মিলিত প্রতিবাদ ।” অথবা এবছর বিশ্বনাট্য দিবসে যে পাকিস্তানী নাট্যব্যক্তিত্ব শাহিদ নাদিম বলেছেন- “খারাপ সময় থিয়েটারের পক্ষে ভালো।”  যেমন মানবাধিকারের স্থলন, সামাজিক অন্যায়, কুসংস্কার, নারীর ক্ষমতার অবমূল্যায়ন ইত্যাদি । তবে অবশ্যই নান্দনিকতা বজায় রেখে কাজ করতে হবে উত্তর- পূর্বাঞ্চলে শুক্রাচার্য রাভা আফস্পা আইনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিবাদে “ ইকো অফ লাইফ ” নামে যে একাঙ্ক নাটক বা স্পেস থিয়েটার করেছেন তা সারা দেশে শ্রেষ্ঠই বলা যায় । নাটক ভাল হলে দর্শকও নাট্যানুসারী না হয়ে থাকতে পারবেন না ।তাই আমি যে উদ্দেশ্যে নাটকটা করবো,   দর্শককেও সেই মতের অনুসারি করতেই চাইবো । তার সমর্থন আদায় করার চেষ্টা অবশ্যই করবো । তাই সফল-নাট্য উত্তরণের জন্য তা সে একাঙ্ক বা পূর্ণাঙ্গ নাটক যাই হোক না কেন, চাই দর্শকের সমমনস্কতা বা সতীর্থভাবনা ।

  প্রশ্ন ঃ কানাইলাল বা রতন থিয়াম যেমন বলতেন – “যেখানে অন্যায় সেখানেই নাটকের মাধ্যমে সম্মিলিত প্রতিবাদ ।” এই কথাগুলো শুনে গণনাট্য আন্দোলন বা চেতনার কথা মনে যাচ্ছে একটি বিশেষ সময়ের সন্ধিক্ষণের দলিল। এই গণচেতনার দ্বারা আপনি কতটা প্রভাবিত ছিলেন ?    

 

উত্তর ঃ নিশ্চয়ই, গণনাট্য আন্দোলনের কথা তো অবশ্যই মনে হচ্ছে । চোখে  তো দেখিনি, বই পড়ে যা জেনেছি সে সব আবারও বাস্তবে দেখি কিনা, ভয় হচ্ছে । সত্যি কথা বলতে কি কানাইলাল বা রতন থিয়ামের মুখে নিজের কানে কথাগুলো শুনেছি, কিন্তু বই পড়ে জেনেছি অনেক আগেই । যেমন নাট্যশিল্পের আন্দোলনের ধারা থেকে জানলাম – ‘ সমবেত শিল্প নিয়ে সমবেত প্রতিরোধ।’

গণনাট্য আন্দোলনের ইতিহাস, বিজন  ভট্টাচার্য বা শম্ভু মিত্রের লেখা থেকে জেনে কিছুটা হলেও ঋদ্ধ হয়েছি । বিজন ভট্টাচার্যের কাছে নাটক এসেছিল অন্যপথে । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর  চারদিকে তখন অভাব আর অভাব । রেশন দোকানের লাইনে হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খৃস্টান নির্বিশেষে জনসংহতির  একটা বীজের সম্ভাবনা দেখে তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন । পরে এলো “ ভাত দাও, মা ফ্যান দাও” পাশাপাশি “ মোটা কালো কুচকুচে দোকানির খবরদারি ”।সৃষ্টি হল  অনবদ্য নাটক  “নবান্ন ” । লেখক ও পরিকল্পক বিজন ভট্টাচার্য । নির্দেশক শম্ভু মিত্র । এই প্রথম ৫০/ ৬০ জন শিল্পী ঢুকে গেল একটি নাটকে । আর সেটা নাটক রইল না, হয়ে উঠল রূঢ় বাস্তবের নাট্য দলিল । গণনাট্য আন্দোলনের প্রাথমিক সব বাধা অপসারিত হল । বড় এবং তৎকালীন সময়ের বিশিষ্ট শিল্পীরা গণনাট্যের সঙ্গে যুক্ত হতে লাগলেন । হেমন্ত মুখোপাধ্যায় , বলরাজ সাহানী, ভূপেন  হাজারিকা, বিজন ভট্টাচার্য, শম্ভু মিত্র । কে নয় ? সকলে মিলে চাইলেন সমাজের গতিধারা পাল্টাতে । সবাই যে কমিউনিস্ট হয়ে গেলেন তা নয়, কিন্তু একটা স্পষ্ট ছাপ পড়ল তাদের সক্রিয়তায় । কারণ তাদের সৃষ্টির আহ্বানে ছুটে এল লক্ষ লক্ষ মানুষ । কিসের টানে? ঐ যে সমাজ গঠনে মূল কথার টানে, কি সেই মূল কথা ?             

 

প্রশ্ন ঃ  খোয়াই থেকেই আপনার নাট্যজীবনের শুরু। নাটকের নানা উত্থান-পতন দেখেছেন । এই মুহূর্তে ত্রিপুয়ায় নাটকের অবস্থান নিয়ে আপনার মূল্যায়নটা জানতে চাই ?

 উত্তর ঃ হ্যাঁ, খোয়াই থেকেই আমার নাট্যজীবনের শুরু। ‘সাদা পায়রার জন্য’ ‘ দেবো না তিতুন’ বা ‘অন্য পৃথিবী’ নাটক দেখে বা ঐসব নাটকে অংশগ্রহণ করে মাঝে মাঝে একটু হতাশই লাগে । বিশেষত নতুন শতাব্দীর প্রথম দশকে। কিন্তু দ্বিতীয় দশক থেকে আবার ধীরে ধীরে আমরা সে সমস্যা কাটিয়ে উঠছি । দল কমেছে বিশেষ করে মহকুমায় । রাজধানীতেও অফিস নাট্য প্রতিযোগিতার রমরমাও হয়তো আগের মতো নেই । কিন্তু তারপরও কয়েকটি নাটকের দলের নাট্যমান বেড়েছে । জাতীয় স্তরে বেশ সুনামের সাথে অংশগ্রহণ করছে । গতি ধীর হলেও খুবই দৃঢ়ভাবে কয়েকটি দল এগিয়ে যাচ্ছে । সম্প্রতি আরেকটি বিষয় জানাই যে, নাটকের মঞ্চায়ন বাড়াবার জন্য আগরতলার পনেরোটি নাট্যদল যৌথভাবে “ সম্মিলিত নাট্য প্রয়াস” নামে একটি উদ্যোগ গড়ে তুলেছে । প্রতি মাসের দ্বিতীয় শুক্রবার রবীন্দ্রভবনে একটি করে নাটক পরিবেশিত হবে । এর অতিরিক্ত কোন দল ইচ্ছা করলে মাসের যে কোন দিন নাটক করতে পারবে, সেক্ষেত্রে কোন বাধা নেই ।

 প্রশ্ন ঃ  ত্রিপুরায় ‘ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামা’ ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে আমরা নাটকের উপর অনেক ভালো ভালো উদ্যোগ দেখতে পাচ্ছি ।  এতে আমরা কতটা উপকৃত হয়েছি বলে আপনি মনে করেন ?

 উত্তর ঃ   ‘ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামা’ আসায় ত্রিপুরাবাসি নাট্যক্ষেত্রে অবশ্যই উপকৃত হয়েছে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ভালো ভালো নাটক বিনা টিকিটে দেখার সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে । নাটকের উপর নিয়মিত ওয়ার্কশপ হচ্ছে। তাতে শিল্পীরা নাটকের বিষয়ে বিভিন্ন বিষয় বিশদে জানতে এবং শিখতে পারছে । রাজ্যের ছেলেমেয়েরা দিল্লিতে তিন বছরের গ্র্যাজুয়েশন কোর্স করার সুযোগ পাচ্ছে । এখানে প্রতি বছর টি আই উইঙ কোর্সেও পড়াশোনা করার সুযোগ পাচ্ছে । পাশ করে তারাই আবার উত্তর- পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন জায়গায়  ওয়ার্কশপ করাচ্ছে । এই দিকগুলো খুব আশাপ্রদ আগামি দিনের জন্য । নাটকের জন্য ।

 প্রশ্ন ঃ নাটকের উপর আপনারা একটি ম্যাগাজিন প্রকাশ করে থাকেন । মূলত কোন কোন পরিকল্পনাকে সামনে রেখে আপনারা এই পরিকল্পনা নিয়েছেন ? কতটা সফল হতে পেরেছেন !

 উত্তর ঃ  হ্যাঁ, আমাদের সংস্থার নাম ত্রিপুরা  থিয়েটার ম্যাগাজিনের নামও ‘ত্রিপুরা থিয়েটার’। আমাদের কাছে  দুটোই একে অপরের পরিপূরক । ঐ-যে আগে বলেছিলাম, নাটক করার জন্য আমাদের  চাই  নেশা! সম্মিলিত সেই নেশাই আমাদের নাটক করতে বার বার প্রলুব্ধ করে ।  দর্শকের প্রশংসা সেটাকে আরও তীব্র করে । আর নাটক সম্পর্কে কিছু জানতে বা জানাতে প্রয়োজন বই বা সাহিত্য কর্ম। যা শিখলাম বা শেখাতে চাই সেগুলো লিপিবদ্ধ করা প্রয়োজন । না-হলে হয়ত এসব অমূল্য সম্পদ হারিয়ে যাবে একদিন। পনেরো বছর ধরে আমরা বিরামহীন ভাবে চালিয়ে যাচ্ছি ত্রিপুরা থিয়েটার প্রকাশ কর্ম । সাথে রয়েছে নিয়মিত প্রতি বছর ন্যূনতম একটি পূর্ণাঙ্গ এবং একটি একাঙ্ক নাটক প্রযোজনা উপস্থাপিত করা  আমাদের ম্যাগাজিনের জন্যও রয়েছে আগামিতে বড় ধরণের পরিকল্পনা । আশা এবং সফলতা দুই দিন দিন বাড়ছে আমাদের ।        

 

প্রশ্ন ঃ  ত্রিপুরার কয়েকটি নাটকের নাম জানতে চাই, যেগুলো  আপনাকে মুগ্ধ করেছে ! নতুন করে কিছু করার প্রেরণা যুগিয়েছে ! 

 

উত্তর ঃ ত্রিপুরার নাট্য জগতের অতীত ভীষণ উজ্জ্বল । মারীচ সংবাদ, সাদা পায়রার জন্য। দেবো না তিতুন, অন্য পৃথিবী, নক্সী কাঁথার মাঠ, নরক গুলজার, কাক চরিত্র ছাড়াও অসংখ্য ভালো লাগা নাটক আছে  যা আমাকে মুগ্ধ করেছে। একটা থেকে আরেকটা ভালো । ত্রিপুরায় নিজেদের পূর্বসূরীরদের সাথে বর্তমানে নিজেরাই পাল্লা দেবার চেষ্টা করছি । অতীতকে ছাপিয়ে সত্যিই কঠিন কিন্তু একটা ভারসাম্য তো রক্ষা করতে হবে । এই দায় অস্বীকারও করি না ।     

 

 

No comments:

Post a Comment

অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎

  'অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎ ‎সত্তর দশকের উন্মাদনায় এক ভিন্ন উচ্চারণ-ভঙ্গ...