“ভাস্কর্য আমার রক্তে, আর চলচ্চিত্র আমার মননে।”
তরুণ চলচ্চিত্রকার মনেট সাহা ত্রিপুরার ক্ষেত্রে এক
সম্ভাবনার
নাম
। তাঁর কিছু কাজ ইতিমধ্যেই মুগ্ধতা
কুড়িয়েছে
অনেকের
। তাঁর সাথে একান্ত আলোচনায় তমালশেখর
দে
প্রশ্ন ঃ ভাস্কর্যচর্চা বলতে গেলে আপনার রক্তে মজ্জাগত । তাই প্রথমেই জানতে চাইবো ভাস্কর্য থেকে চলচ্চিত্র জগতে চলে আসার পেছনের মূলগত তাগিদটা কী ছিল ?
উত্তরঃ ঠিকই বলেছেন, কোনো – না – কোনোভাবে শিল্পচর্চাটা আমার মজ্জাগত । আমার চোখ ফোটার পর থেকেই আমি এসব দেখতে দেখতেই বড় হয়েছি । আমার বাবা এবং মা দুজনেই ভাস্কর্যচর্চার সাথে নিবিড়ভাবে জড়িয়েছিলেন । তাই আমি অনেকটা এরকমই বলতে পছন্দ করি, ছোটোবেলা আমি যেন শিল্পচর্চার মধ্যেই বন্দি ছিলাম । কিছু একটা আঁকলেই বাবা মাকে ডেকে দেখাতেন । এভাবেই আমার বড় হওয়া, আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়া । আমার জীবনে ভাবনার মোড় ঘুরে রবীন্দ্রভারতীর ডিন এবং বিখ্যাত চিত্রশিল্পী পার্থপ্রতিম দেব-এর একটি কথায়,– “বাবার পরিচয়ে তো অনেকদিন কাটালে, এবার নিজের একটি আইডেন্টিটিটি গড়ে তোল!” সেটাই ছিল আমার জীবনের একটা টার্নিং পয়েন্ট । আর আর্ট থেকে চলচ্চিত্র জগতে আসার কথা বললে বলবো, আর্ট বা ভাস্কর্যচর্চা আমার চলচ্চিত্র জগতে আসার ভিত্তিভূমি বলতে পারেন। আর্ট বা ভাস্কর্যচর্চায় কাজ করার পরও আমি অন্য আরেকটা মাধ্যম খোঁজ করছিলাম । তখন আমি রবীন্দ্রভারতী থেকে দিল্লিতে যাই পোষ্ট গ্রেজুয়েসন করতে । তখন বন্ধুদের নিয়ে একটা ‘ ইনার আই’ নামে একটি তথ্যচিত্র দেখি । এরপর দিল্লির বন্ধুদের সাথে মেলামেশার সময়ই মূলত আমি চলচ্চিত্র জগতের সাথে জড়িয়ে পড়ি । সেখানে একটা নতুনত্বের স্বাদ পেয়ে যাই । তারপর থেকে একের পর বিভিন্ন এমব্যাসিতে নিয়মিত চলচ্চিত্র দেখা শুরু করি । মূলত তখন থেকে ভাস্কর্য থেকে চলচ্চিত্রের দিকে ঝুঁকে পড়ি । এবং সেই নিয়ে পড়াশোনা শুরু করি ।
প্রশ্ন ঃ ফিল্ম এবং ভাস্কর্য নিয়ে নিয়ে পুনে-মুম্বাই করছেন অনেক বছর । আমার জানার ইচ্ছে, গোটা আর্ট ফর্মের মধ্যে আপনি নিজেকে কোথায় স্বাধীন, স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন । কিংবা মুক্তির স্বাদ খুঁজে পান?
প্রশ্ন ঃ আপনি আগরতলায় “আবক্ষ পল্টুদা” নামে একটা ডকুমেন্টারি করেছিলেন । সে বিষয়ে অনেকেই জানেন না । সেই ডকুমেন্টারির আসয়-বিষয়, তার তাগিদ নিয়ে আমাদের কিছু বলুন ?
উত্তর ঃ তখন আসলে আমি অন্য আরেকটা প্রজেক্ট নিয়ে আগরতলা এসেছিলাম । কিন্তু এসে জানলাম, প্রজেক্ট সাবমিট করার সময় চলে গেছে । তখন বিচ্ছিন্নভাবে এদিক-ওদিক ঘুরছি । ত্রিপুরার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নতুন করে পড়াশোনা শুরু করি । তখন হঠাৎ আমার মাথায় এলো পল্টুদা মানে রমাপ্রসাদ দত্ত-কে নিয়ে একটা কাজ করলে কেমন হয় ? গান্ধি লাইব্রেরীর পেছনে তাঁর কোয়াটার ছিল তখন ।আর্ট কলেজ থেকে বের হবার পর আমি সব কিছুকে দেখতাম ফর্মের আকারে । আবার ফিল্ম জগতে আসার পর থেকে সব কিছুকে ক্যারেক্টার বা গল্প আকারে দেখতে থাকি । দুই শিল্প মাধ্যমে দুই রকম দেখা হয়ে গেল । সেই চরিত্র দিয়ে তখন আমি পল্টুদাকে দেখা শুরু করলাম । পুনরায় যেতে শুরু করলাম আবার । তিনি বলছেন, আমরা শুট করছি । আমরা একটা সিনেমা খুঁজে পাচ্ছিলাম তাঁর ভেতর । তারপর ক্রমেই একটা নেশায় যেন জড়িয়ে পড়তে লাগলাম । পল্টুদার জীবন, তাঁর প্রাণের লাইব্রেরি, একের পর দুষ্প্রাপ্য সব বই, ডকুমেন্ট, সেই লাইব্রেরি নিয়ে তাঁর দুশ্চিন্তা, এইসব বিষয়কেই প্রাধান্য দিয়েছিলাম আমরা। এটাকে বাঁচানোর খুব তাদিগ অনুভব করছিলাম । আমাদের সামনেই বৃষ্টিতে ভিজছিল মূল্যবান কিছু বই । এটাকে বাঁচানোর তাগিদ থেকেই “আবক্ষ পল্টুদা”ডকুমেন্টারিটা করে আগরতলা ‘ তথ্য-সংস্কৃতি দপ্তর’ –এ জমা দিয়েছিলাম ।
প্রশ্ন ঃ সম্প্রতি “প্রকৃতি” চলচ্চিত্রটি নানা জায়গায় প্রদর্শিত হচ্ছে । বেশ সাড়াও ফেলেছে । এই চলচ্চিত্রটির পরিকল্পনা, তাগিদ নিয়ে আমাদের কিছু বলুন ?
উত্তর ঃ হ্যাঁ, ‘প্রকৃতি’ চলচ্চিত্রটির সাফল্য আমাকে
অনেকটা অনুপ্রাণিত করেছে । লক-ডাউনের সময় লক্ষ করলাম হঠাৎ পারিবারিক
হিংসা-বিদ্বেষের গ্রাফ অনেকটাই বেড়ে গেছে । তখন আমাদের সমাজ, সেই সমাজে নারীর
অবস্থান, আমাদের মিথোলজিতে তাদের কীভাবে ধরা হয়েছে, এসব নানা বিষয় নিয়ে
চিন্তা-ভাবনা করার সময় নতুনভাবে নারী- সত্তাকে খুঁজে পাচ্ছিলাম । আর তখনই আমার
বন্ধু এবং লেখক অভিষেক ভট্টাচার্য আমাকে ‘প্রকৃতি’ চলচ্চিত্রটির চিত্রনাট্য শোনায়
। যেখানে আমরা দেখি, দেবী দুর্গাকে আমরা একদিকে আবাহন করছি, তাঁকে শ্রদ্ধাভরে পূজা
করছি, আবাহ্বন করছি । অথচ আমার বাস্তবের নারী রয়ে গেছে সেই অবহেলায় । গার্হস্থ
ঘটনায় সে দিনের পর দিন সে নির্যাতিত হচ্ছে । উপেক্ষিত হচ্ছে। তখন সেই দেবী দুর্গার
পাশাপাশি আমাদের সামাজিক নারীর অবস্থান খোঁজার চেষ্টা করলাম চলচ্চিত্রটির ভিতর দিয়ে। কোথাও- না- কোথাও আমাদের সামাজিক জীবনকে আমারই
কী প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছি না ? সেই ভাবনারই প্রতিচ্ছিবি ছিল আমার ‘প্রকৃতি’
চলচ্চিত্রটি ।
প্রশ্ন ঃ ত্রিপুরা নিয়ে আগামীতে
কাজ
করার
কোনো
পরিকল্পনা
আছে
?
উত্তর ঃ ত্রিপুরা নিয়ে আগামীতে কাজ করার ইচ্ছে আছে । ইদানিং ‘কবি
অনঙ্গমোহিনী
দেবী’কে নিয়ে একটা কাজ শেষ করেছি । আরও কিছু কাজ করার ইচ্ছে আছে । আমার কাছে ত্রিপুরা খুব সম্ভাবনাময়
একটা
জায়গা।

No comments:
Post a Comment