“মানুষকে জীবনে চলার পথে সঠিক পথ নির্দেশ দেখাতে পারে নাটক।”
ত্রিপুরার নাট্যচর্চায় কমল রায়চৌধুরী এক মাইলস্টোন । তাঁর নাট্যচেতনা,
নাট্যভাবনা ত্রিপুরার নাটককে সমৃদ্ধ করেছে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে । তাঁর সাথে একান্ত আলোচনায় তমালশেখর দে ।
প্রশ্ন ঃ প্রথমেই
আপনার কাছে জানতে চাইবো, নাটক বিষয়টা আপনার মননকে নাড়া দিল কখন ? ঠিক কখন মনে হল
আপনার, নাটক আমাকে করতেই হবে ?
উত্তর ঃ অন্য সকলের মতো আমিও ছোটবেলা থেকে নাটককে ভালবাসতাম । নাটক দেখা,
নাটক করা নাটকের বই পড়া এই সব কিছুতেই উৎসাহ ছিল । যখনই সুযোগ হয়েছে ছাত্রাবস্থায় থাকা কালিনই নাটক লেখার চেষ্টা
করতাম । শিক্ষকতার জীবনে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে নাটক মঞ্চস্থ করেছি । দু-একটি নাটক
লিখেছিলাম । কিন্তু সেগুলি মঞ্চস্থ হয়নি ।
এভাবে চলতে চলতেই আমার কর্মজীবন এবং সাংস্কৃতিক জীবন সম্মুখীন হল দেশের রাজনৈতিক
অস্থির পরিস্থিতির সামনে । আমি জড়িত হয়ে পড়লাম গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সাথে । আমার
কাছে সংস্কৃতির অন্যান্য শাখার মতো নাটকও রাজনীতির অঙ্গ হয়ে পড়ল । তখন থেকেই
নাটকের মাধ্যমে আমার রাজনৈতিক বক্তব্যকে প্রকাশ করার একটা প্রবণতা আমাকে পেয়ে বসল
।
প্রশ্ন ঃ নাটককে
আপনি কোন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে ভালোবাসেন ? নাটককে কি আপনি প্রকৃষ্ট প্রতিবাদের
একটা মাধ্যম মনে করেন ?
উত্তর ঃ অবশ্যই, নাটককে আমার প্রতিবাদের মাধ্যম বলে মনে করি । শুধু তাই নয়
আমার বোধ, আমার চেতনাকে সকলের কাছে পৌঁছে দেবার সবচেয়ে বলিষ্ঠ উপায় বলে মনে করি।
প্রশ্ন ঃ “ দেবো
না তিতুন ” – এই নাটকটি লেখার প্রয়োজনবোধ করলেন ঠিক কখন? কেনই বা এই প্লটটিকে বেছে
নিলেন ? এর পেছনে ঠিক কি ধরণের তাগিদ
অনুভব করেছিলেন, সেটা জানতে খুব ইচ্ছে করছে ?
উত্তর ঃ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের
সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত হবার পর ত্রিপুরার জনজাগরণের অতীত ইতিহাসকেও জানবার আগ্রহ
জন্মাল । সে সময়ে বয়স্ক লোকজনদের মুখে
অতীতের যেসকল ঘটনাবলি শুনেছিলাম, সেগুলোর মধ্যে খোয়াই-এর পদ্মবিল গ্রামের আদিবাসি
রমণীদের
শহিদ হওয়ার ঘটনাটি আমাকে ভীষণভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল । তখন থেকেই তাদের
আত্মদানের ঘটনাকে নিয়ে একটি নাটক লেখার কথা ভেবেছিলাম । এবং পরবর্তীতে যা লিখেও
ফেলি । এবং মঞ্চস্থও হয় ।
প্রশ্ন ঃ আপনার কাছ থেকে “দেবো না তিতুন”- মতো আরও অনেক
নাটক আমাদের পাওয়ার কথা ছিল । কিন্তু আপনি সে তুলনায় আপনি নাটক লিখেছেন তুলনামূলক
খুব কম । এর কারণ কি ? যথেষ্ট প্লট ছিল আমাদের সামনে । তারপরও আপনি লিখলেন না! বা
তুলনামূলক কম লিখলেন ?
উত্তর ঃ প্রত্যাশা অনুযায়ী নাটক লিখতে পারিনি, একথা ঠিক । এর প্রধান কারণ
বলতে পারি, সময় এবং সুযোগের অভাব । হয়ত বা কিছুটা আমার অক্ষমতাও দায়ি ।
প্রশ্ন ঃ আপনার
সমসাময়িক নাট্যচর্চায় কে আপনাকে খুব বেশি প্রভাবিত করেছিল ? কোন জিনিসটা প্রভাবিত
করেছিল ?
উত্তর ঃ নাটক চর্চায় আমি কোন একজন বিশেষ ব্যক্তির দ্বারা প্রভাবিত হয়েছি
বলে আমার মনে হয় না । তবে এক্ষেত্রে আমার পূর্বসূরি মহান নাট্যকারগণের সম্মিলিত
প্রভাবকে কিছুতেই আমি অস্বীকার করতে পারি না । স্বদেশের ও বিদেশের বিশেষ করে
পশ্চিমবঙ্গের খ্যাতিমান নাট্যকারদেরও প্রত্যক্ষ প্রভাব তো রয়েছেই ।
প্রশ্ন ঃ আপনি
তো নাটকের একাল-সেকাল সবই দেখেছেন । ঠিক কীভাবে মূল্যায়ন করতে চান, নাটকের
একাল-সেকাল’কে ? নিষ্ঠা কি দিন দিন কমে আসছে ?
উত্তর ঃ এ-কথা আমি স্বীকার করি না যে, নিষ্ঠা দিনদিন কমে আসছে । প্রতি
যুগেই দেখা গেছে যুগের প্রয়োজনে নাটক যুগোপযোগী কথা বলেছে । সমকালীন পরিস্থিতিতে
যা অন্যায় বলে মনে হয়েছে, সমাজের পক্ষে ক্ষতিকারক বলে মনে হয়েছে, জীবনের গতিকে যা
রুদ্ধ করেছে বলে মনে হয়েছে, তার বিরুদ্ধে নাটক সোচ্চার হয়েছে। এবং শুভ লক্ষ্যের
দিকে জনমানসকে ধাবিত করার চেষ্টা করেছে । নাটকে সেই ধর্ম আজও বজায় আছে । নাট্যকার,
কলাকুশলি এবং নাট্যকর্মীরা সারা পৃথিবী জুড়ে নাটকের এই অভিমুখকে বেগবান রাখতে
সক্রিয় রয়েছেন।
প্রশ্ন ঃ নাটক নিয়ে চিরকাল এক্সপেরিমেন্ট হয়েই
চলেছেন । নাটকের এই পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্রে কোন বিষয়টাকে আপনি প্রাথমিকতা বা বেশি
গুরুত্ব দিতে চান ? কেন চান ?
উত্তর ঃ নাটক নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট
হয়েছে যুগের প্রয়োজনেই । প্রতিকূল পরিস্থিতিতে চিরাচরিত আঙ্গিককে বদলে ফেলে নতুন
আঙ্গিককে উদ্ভাবন করে নিয়েছেন নাট্যশিল্পীরা । এক্ষেত্রে নাট্যকাররাই তাদের
প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন সবচেয়ে বেশি । এই প্রশ্নে প্রাথমিকভাবে যে বিষয়টি
সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়ার যোগ্য তা হল, মানুষের কাছে নাটকের বক্তব্যকে সুস্পষ্ট
তুলে ধরা ।
প্রশ্ন ঃ আজকের তরুণ প্রজন্মকে নাটক করতে দেখছেন। আপনি
কতটা আশাবাদি তাদের নিয়ে -
উত্তর ঃ আমি খুবই আশাবাদি । আমি মনে করি, আজকের তরুণ প্রজন্মই পারবে এই
যুগের ভয়ানক জটিল পরিস্থিতিতে সমাজের বাধা বিঘ্ন সমস্যা সঙ্কূল পারিপার্শ্বিকতা আবদ্ধ জলাভূমি থেকে সমাজকে
মুক্ত করার বাণীকে জয়যুক্ত করতে ।
প্রশ্ন ঃ নাটক
নিয়ে আপনার এমন কোন স্বপ্ন যা, আপনার পূরণ হয়নি -
উত্তর ঃ আমি
চেয়েছিলাম এমন নাটক লিখতে যা সারা বিশ্বকে নাড়া দেবে এবং মানবজাতিকে উদ্বুদ্ধ করবে
সাম্য ও শান্তির পক্ষে পা বাড়াবে ।
প্রশ্ন ঃ ‘দেবো না তিতুন’ সহ আপনার উল্লেখযোগ্য নাটকের
মধ্যে রয়েছে ত্রিপুর রাজার উপাখ্যান,
ধর্মগোলা, যেখানে ইতিহাসই আপনার যাপিত সময়ের ঘাত-প্রতিঘাত নিয়ে তেমনভাবে আপনি
লেখেননি কেন ?
উত্তর ঃ আমার যাপিত সময়ের ঘাত-প্রতিঘাত নিয়ে একদম লিখিনি তা ঠিক নয় । জাতি-উপজাতির ঐক্যকে কেন্দ্র করে আমার
লেখা পথ-নাটিকা ‘ বাঁচতে হলে’, জাতীয়
স্বাধীনতার ৫০ বছরপূর্তিতে দেশপ্রেমি
বৃদ্ধ দম্পতির স্বপ্নকে নিয়ে লেখা শ্রুতি নাটক ‘ সূর্যোদ্বয়’, স্বাক্ষরতার পক্ষে
প্রচারমূলক পথনাটিকা ‘ সত্যদাতের বাল্যশিক্ষা ’।
জনৈক অভিনেত্রীর জীবন সংগ্রামের কাহিনি নিয়ে রচিত ‘ অতিক্রমণের ক্রন্দন ’
ইত্যাদি রয়েছে । তবে স্বীকার করি এগুলো যথেষ্ট নয় ।
প্রশ্ন ঃ উৎপল দত্ত বলেছিলেন- ‘যে নাটকের রাজনীতি ভুল,
তার সব ভুল।’ আপনি কি এটা বিশ্বাস করেন? কেন করেন ?
উত্তর ঃ উৎপল দত্ত ঠিকই বলেছিলেন - ‘যে নাটকে রাজনীতি ভুল তার সব ভুল’।
কারণ এমন নাটক মানুষকে বিভ্রান্ত করে। মানুষকে জীবনে চলার পথে সঠিক পথ নির্দেশ
দেখাতে পারে না, এমন নাটক। আমি বিশ্বাস করি, নাটকই পারে মানুষকে সঠিক
দিশা দেখাতে । নাট্য মাধ্যমের পক্ষেই তা করা সম্ভব ।

No comments:
Post a Comment