“একমাত্র ক্যানভাসের সামনে আমি নির্ভয় থাকি। এখানে আমি এক স্বাধীন নির্ভয় সত্তা।”
ছিন্নমূল-আইডেন্টিক্যাল
ক্রাইসিসের মতো জটিল বিষয় নিয়ে ভাস্কর-চিত্রকর জয়ন্ত ভট্টাচার্য কাজ করতে ভালবাসেন। আজ
তার সাথে একান্ত আলোচনায় তমালশেখর দে ।
উত্তর ঃ ছোটোবেলায় যখন ছবি আঁকতাম সেই সময়টা অর্থাৎ ওই ছবি আঁকার সময়টা ছিল অতি আনন্দের।
তুই সিন্দ্রাই থাকতাম । কিন্তু এরপর সময় যত গড়িয়েছে, তত
ভাবনায়ও পরিবর্তন এসেছে । আপনার প্রশ্নের উত্তরে
আমি এমন ভাবে বলতে পারি, যে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে একজন সামাজিক মানুষ হিসাবে নিজেকে যখন অসহায় বোধ করি এবং আমার যখন কোনও সামাজিক গোষ্ঠীয় বা রাষ্ট্রীয় কোনও ধরনের পরিচয় খুঁজে পাইনা । আমি যখন বুঝতে পারি রাজ্য সরকার কিংবা পার্লামেন্টে কারা যাচ্ছে ? কীভাবে সব হচ্ছে! আমার একটি ভোটের দাম কী, তখন এসব নিয়ে চিন্তা-ভাবনার প্রেক্ষাপটে আমার ভেতরে ভেতরে তৈরি হয় এক আক্রোশ, অদ্ভুত এক অসহায় গোঙানি । সমস্ত দিনের শেষে আমি বুঝতে পারি, এই সমাজের চালিকাশক্তি শুধুমাত্র টাকা ।
এমনকী অধুনা সময়ে শিল্পের পৃষ্ঠপোষকতা শুধুমাত্র বুর্জোয়াদের কব্জায়। ছবি আঁকাটা আমার কাছে
শুধু তুলির আঁচড় দেয়া নয়, ধারালো ছেনি
দিয়ে একটা আস্ত পাহাড় কাটাও শিল্পকর্ম। মনে হয় কয়েক যুগ ধরে ধারালো অস্ত্রে কেটে ফেলি এক আস্ত পাহাড়। আর তখনই দেখি আমারই মতো আপাদমস্তক অসহায় ধবধবে সাদা ক্যানভাস। একমাত্র
ক্যানভাসের সামনে
আমি নির্ভয় থাকি। এখানে আমি এক
স্বাধীন, নির্ভয় সত্তা।
প্রশ্ন ঃ আপনার একের পর এক কাজ দেখলে লক্ষ্য করা যায়, প্রতিটি ক্যানভাসই একটা থেকে আরেকটা আলাদা। আপনি কি শিল্পীর নিজস্ব কোনওঁ ধারায় মানে স্টাইলাইজেশানে বিশ্বাস করেন না ? না-করলে, কেন জানতে চাইবো !
উত্তর
: প্রত্যেক শিল্পীর আঁকা আলাদা এবং একই ক্যানভাসগুলি দেখতে একই রকম না- হলেও বোঝা যায় যে, ওগুলো একই শিল্পীর আঁকা । তার জন্য দেখতে জানতে হবে বৈকি!
তবে অবশ্যই শিল্পীকে নিজস্ব মৌলিক অনুভূতি থেকে চিত্র রচনা করতে হবে । একটা বিশেষ ঘটনা, বা ঘটনা প্রবাহ আমাদের যখন মানসিকভাবে ভীষণরকম ভাবে আন্দোলিত করে এবং আমরা যখন তার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া বা ব্যঞ্জনা বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশ করি, তখন শুধুমাত্র প্রকাশ ব্যঞ্জনার স্টাইলটা বা শৈলী গুরুত্বপূর্ণ হতে হবে, এটা আমি বিশ্বাস করি না । বরং মনে হয় আমার মধ্যে যা প্রতিক্রিয়া হলো সেই সুনির্দিষ্ট ভাব ,আমি কতদূর সফল ভাবে প্রকাশ করতে পারছি। আর তার চাইতেও বড় কথা নিজস্ব শৈলী খুব সাবলীলভাবে অবলীলাক্রমে যদি সে আসে, তবেই ভাল। জোর করে আনতে গেলে তাতে আর কিছুই থাকে না। এবং এটাই স্বাভাবিক ।
প্রশ্ন ঃ আপনার প্রায় প্রতিটি কাজ কোনও- না- কোনও ঘটনা বা পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া থেকে উঠে আসে ক্যানভাসে । বিশেষ করে ছিন্নমূল সমস্যা, বিশেষ করে আইডেন্টিক্যাল ক্রাইসিস নিয়ে আপনি ছবিতে বেশ সোচ্চার । জীবনের নির্মল কিছু দিকও তো থাকে। সেটাও তো বিষয় হতে পারে! এনিয়ে আপনার ভাবনা জানতে চাইছি ।
উত্তর ঃ আমার মনে হয় যে কোনও শিল্প সে সুনির্দিষ্ট কোনো লেখা, কবিতা, সিনেমা, নাটক চিত্রকলা ও অন্যান্য যেকোনও শিল্পকর্ম সমসাময়িক সময়ের সমাজজীবনের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক সমস্ত অবস্থার এক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সাক্ষ্য বহন করে। কোনও ধরনের ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ চেতনা এগুলো যখন সামগ্রিক বর্গ গোষ্ঠী ও সময়ের হয়ে যায় তখনই তা কাল থেকে কালোত্তীর্ণ অবস্থায় যায়। দীর্ঘদিন ত্রিপুরার বাইরে আছি বলে বুঝতে পারি, আমাদের অর্থাৎ পূর্ববঙ্গীয় বাংলা ভাষাভাষী মানুষদের অবস্থানটা সত্যিই খুব মর্মান্তিক। গোটা ভারতবর্ষের কথা বাদই দিলাম! নর্থইস্টসহ অন্যান্য রাজ্যগুলিতে একটু ঘুরলেই দেখা যায়, তাদের সাহিত্য কাব্য শিল্পের এক পরম্পরা আছে তাদের সমাজের এক স্বীকৃতি আছে তাদের নিজস্ব ভাষা যে ভাষায় ওরা রান্নাঘরে মায়ের সাথে কথা বলে সেই ভাষায় এফএম রেডিও শোনে সেই ভাষাতেই। ওরা সাহিত্য করে কাব্য করে নাগরিক মঞ্চে কথা বলে একই ভাষায়। পক্ষান্তরে আমি দেখেছি আমার ভাষাটার কোনও স্বীকৃতি নেই। এটা তো আমরা সবাই জানি, ইংলেণ্ড এত ছোটো একটা দেশ হওয়া সত্ত্বেও সমগ্র পৃথিবীতে একদিন তারা তাদের দাপট কায়েম করতে পেরেছিল । নানা দিক দিয়ে। এবং তার মধ্যে ভাষা একটা অন্যতম দিক ছিল ।
ভাষা দিয়ে কর্তৃত্ব করার ব্যাপারটা অনস্বীকার্য। আজকে স্বাধীনোত্তর ভারতবর্ষে খুব ভালো ইংরেজি জানলে, ইংরেজি লিখতে পারলে, তার যোগ্যতার মাপকাঠি সর্বোচ্চ। দেশভাগ অতীত কিন্তু মাইগ্রেশন নিয়ত। এক জায়গা হতে আরেক জায়গায় খাদ্য বস্ত্রের অর্থাৎ জীবনের একেবারে ন্যূনতম জিনিসগুলোর জন্য মানুষের পরিযান কিন্তু অনবরত সংঘটিত হচ্ছে সারা পৃথিবীতে। ছোটোবেলা থেকে দেখে এসেছি পশ্চিমবাংলার সংস্কৃতির উপনিবেশিক চর্চা আমাদের আগরতলা ভিত্তিক ত্রিপুরাতে হয়ে আসছে। এর ফলে দীর্ঘ বৎসরে ত্রিপুরার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে আমাদের নিজস্ব কোনও বক্তব্য আমরা পরিষ্কার করে তুলে ধরতে পারিনি।আর্ট কলেজের দিনগুলিতে একটু স্বতন্ত্র একটু এক্সপেরিমেন্টাল নাটক মানেই পশ্চিমবাংলার, অথচ তখন জানতেই পারি নি প্রতিবেশী রাজ্যের ওঝা কানাইলাল, রতন থিয়ামের মত আন্তর্জাতিক নাট্য ব্যক্তিত্ব কাজ করে চলছেন । জীবনের নির্মল দিনগুলি বজায় রাখার ক্ষেত্রে অবক্ষয়গুলি সঠিকভাবে চিহ্নিত করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
প্রশ্ন ঃ আপনার ছবিতে আবার এক ধরণের নস্টালজিক ব্যাপার থাকে। এই নিয়ে আপনার অনুভব জানতে চাইছি। আবেগের এই জায়গাটা নিয়ে আমাদের কিছু বলুন।
উত্তর ঃ হ্যাঁ আমার শিল্পকর্মের নস্টালজিয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমার মনে হয় আমার স্মৃতি ও আকাঙ্ক্ষা এই দুইয়ের মধ্যে অনবরত এক সংঘাত এবং তার মধ্য থেকেই বেরিয়ে আসে আমার অধিকাংশ চিত্রকল্প। আমার স্মৃতির দিনগুলো, সেই স্কুলের মাঠ, ছোট্ট ঝির ঝিরে ছড়া, ছোট নদী, দূরে শীতের বনের কুজি, দাদুর ডিস্পেন্সারি সবকিছুই চলে আসে।ওই যে আপনি বললেন জীবনের এক নির্মল দিক থাকে, আমাদের ছোটবেলা অনেক শর্তহীন ছিল। অ্যানড্রয়েড মোবাইল ছিল না। ইন্টারনেট ছিল না। এন্টারটেইনমেন্ট বলতে তাই বিকালবেলা মাঠের কবাডি খেলা, জমির নাড়া চেছে ক্রিকেট খেলা, শংকরমামার মূর্তি বানানোতে সাহায্য করা, আরো কত কী ! এ যেন এক রূপকথার সময় ছিল । তাকে অস্বীকার করি কী করে !
প্রশ্ন ঃ শুধুমাত্র ছবি আঁকবেন বলে, লোভনীয় একটা চাকরি ছেড়ে দিলেন । এটা কেন করতে গেলেন ? ছবির জগতে বহু বিখ্যাত আর্টিস্টকেই দেখলাম, দুটোই একই সাথে চালিয়ে গেছেন । আপনি তার ব্যতিক্রম কেন ?
রাজ্যের নতুন প্রজন্মের প্রতিভা মেনে
নিতে যাদের
বাধে, তাদের ক্রিয়াকলাপ মেনে
নিতে আমি
কখনওই পারিনি।
প্রশ্ন ঃ ত্রিপুরার চিত্র জগতের ইতিহাস অনেক পুরনো প্রবীণ- নবীন মিলিয়ে । সাম্প্রতিক সময় মানে সত্তর দশকের পর থেকে ধরলে, ত্রিপুরার চিত্র জগতের চর্চা নিয়ে আপনার ভাল-মন্দ জানতে চাইলে, ঠিক কী বলতে চাইবেন ?
কিন্তু দুঃখজনক ঘটনাটা হল, প্রবীনদের মধ্যে নবীনদের প্রতি যে স্বাভাবিক উদারতার কথা ছিল, তা নেই। নিজের জায়গাটা ছাড়তেই নারাজ। এদের মধ্যে অনেকেই দেশভাগের প্রত্যক্ষদর্শী, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ দেখেছে, বাংলাদেশ এবং ইন্ডিয়ার দুটো দেশেই ওদের ছেলেবেলা ও যৌবন কেটেছে, কিন্তু তাদের শিল্পকর্মে এত বড় একটা সিভিল ওয়ার বা দুর্ভিক্ষ দেশভাগ বা তৎসম্বন্ধীয় কোনও চিন্তা-ভাবনার ছিটেফোঁটাও নেই। থাকতেই হবে তা বলছি না। কিন্তু থাকাটাই খুব স্বাভাবিক ছিল।ছবি আঁকা কি শুধুমাত্র একটা কায়দা ? না শুধুমাত্র ক্যানভাসে বিভিন্ন রং দেওয়া ?পাঞ্জাবি পরে লম্বা চুল রেখে শিল্পী শিল্পী ভাব নিয়ে সমস্ত নিরাপত্তা সমস্ত রাজনৈতিক অনুকূল পরিস্থিতির মধ্যে ছবি আঁকা করা ?খুব দুঃখজনক হলেও আমার কাছে এটা সত্য যে, আমরা এত বছরেও ত্রিপুরায় আমাদের কোনও ইতিহাস তৈরি করতে পারিনি । আমরা কী তবে আসলেই বুঝতে পারছি না, ‘আমরা কেন একটি ছবি আঁকবো বা আঁকছি ?’





No comments:
Post a Comment