“ একজন শিল্পীর
কাছে ছবি হচ্ছে তার প্রতিবাদের হাতিয়ার।সৃষ্টির আনন্দ।”
ত্রিপুরার যে-কজন
চিত্রকরকে নিয়ে আমরা গর্ব করতে পারি, তার মধ্যে ধ্রুব ভট্টাচার্য একজন। লন্ডন প্যারিস সিঙ্গাপুর
থেকে শুরু করে ভারতের বিভিন্ন শহরে তার উজ্জ্বল উপস্থিতি আমাদেরকে গৌরবান্বিত করেছে।
শিল্পীর সাথে একান্ত আলোচনায় তমালশেখর দে।
প্রশ্ন ঃ আপনারা যখন ছবির জগতে এলেন, তখন ত্রিপুরায় সে রকম কোন পরিকাঠামো ছিল না। ছবির জগতে ছিল না কোন উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। তারপরও ছবি নিয়ে মেতে রইলেন! এটা কি নিছক উন্মাদনা ছিল আপনার ?
উত্তর ঃ এটা ঠিক যে আমি যখন ছবির জগতে আসি তখন
ত্রিপুরায় ছবি আঁকিয়েদের জন্য তেমন কোন সুযোগ ছিল না। আমি ত্রিপুরার ধর্মনগরে জন্ম
গ্রহণ করি এবং ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি যে কোন পূজা অনুষ্ঠানে মা-কে নানারকম আলপনা আঁকতে। ছোটবেলা থেকেই সে আঁকিবুঁকিআমাকে খুব আকৃষ্ট করতো। একটু বড় হবার সাথে সাথে আমিও নানারকম
আলপনা আঁকতে থাকি। এটা থেকেই আমার ছবি আঁকার হাতেখড়ি বলতে পারেন।এখনও মনে পড়ে, ছোটবেলা কাগজের অভাবে কেলেন্ডারের পেছনে ছবি আঁকতাম। তখন ধর্মনগরে ছবি আঁকার চলন বা পরিবেশ তেমন কিছুই ছিল না। কেবল রামবিহারী রায়
নামে একজন সাইনবোর্ড পেইনটার ছিলেন। তার কাজ দেখার জন্য ছুটে যেতাম তার দোকানের সামনে। এই দেখার আনন্দ, তার
সাথে রাসবিহারী’দার উৎসাহ পেয়ে শিল্প জগতে এগিয়ে গেলাম । আমি যখন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ি তখন দিদির সহায়তায় বিবিআই স্কুলে আমার আঁকা
১৫০টা ছবি নিয়ে একটা প্রদর্শনীর আয়োজন করি।এতে ত্রিপুরার বহু প্রতিষ্ঠিত শিল্পী, শিক্ষকসহ বহুজন এসে আমাকে উৎসাহিত এবং
প্রশংসিত করেছিলেন। তারপর সময়ের সাথে বড় হই এবং ছবি আঁকার প্রতিও আমার ভালোবাসা বাড়তে থাকে। এই ভালোবাসার
টানেই পড়াশোনা শেষ করে ‘ত্রিপুরা গভর্ম্যান্ট কলেজ অফ আর্ট এন্ড ক্র্যাফট’
আগরতলাতে ভর্তি হই। তখন আমার সামনে এক নতুন দিগন্ত খুলে যায়। ছবি এঁকে ভবিষ্যতে কি
হবে বা কী করবো, সেসব কিছু ভেবে আঁকতে আসিনি। শিল্পের প্রতি ভালোবাসার প্রেমই আমার
শিল্পী হবার প্রধান কারণ। এটাকে উন্মাদনাও বলতে পারেন।
প্রশ্ন
ঃ সবাই ছবি নিয়ে তার মতো করে, ভিন্ন ভিন্ন ভাবে ভেবে থাকেন।অনুভবে তার একান্ত ছবিকে পাওয়ার
চেষ্টা করেন। সেই
প্রক্ষিতে জানতে চাইছি, আপনি ছবি বলতে কী বোঝেন ? কীভাবে
তাকে
ক্যানভাসে পেতে চান
?
উত্তর ঃ অবশ্যই
প্রত্যেক শিল্পী তার নিজের মতো করে ভাবে এবং সেটাই স্বাভাবিক। প্রত্যেকের আলাদা আলাদা চিন্তা
থাকে। সেই চিন্তা ভাবনাকে সে নিজের মতো
করে ক্যানভাসে রূপ দেয়। বা দেয়ার চেষ্টা করেন।আমি ছবি বলতে সাধারণত বুঝি, আমার মনের ভাব বা চিন্তা ভাবনাকে
রঙ তুলির মাধ্যমে মানুষের কাছে তুলে ধরা। আমার মনে হয়, একজন শিল্পীর কাছে ছবি
হচ্ছে তার প্রতিবাদের হাতিয়ার। সৃষ্টির আনন্দ। লেখকরা যেমন কবিতা বা গল্প-উপন্যাস
লিখে তার মনের ভাব প্রকাশ করেন! সাধারণ মানুষ যেমন মুখে বলে তার ভাব প্রকাশ করেন।
আমি তেমনভাবে ছবির মাধ্যমে আমার ভাবনা প্রকাশ করি। আমার প্রতিটা ছবি কিছু-না-কিছু
বলতে চায়, যা আমি নতুন প্রজন্ম এবং সমস্ত স্তরের মানুষকে বলতে চাই। তাদের বলতে চাই, এই মুহূর্তে আমি কি ভাবছি ! কি বলতে চাইছি! একটা সত্যি কথা হল,
প্রত্যেক মানুষের ভিতর শিল্পসত্তা আছে।প্রত্যেকে সে তার নিজের মতো করে ভাবতে শেখে
এবং নানাভাবে সে তা প্রকাশও করে। আমার কাছে আমার ছবিই হল সৃষ্টি সুখের আনন্দ।যত উল্লাস!
প্রশ্ন
ঃ ছবির কোন ধারায় কাজ করতে আপনি বেশি স্বচ্ছন্দবোধ করেন? এবং কেন?
উত্তর ঃ কলেজ থেকে বেরিয়ে নানা ধরণের প্রচুর কাজ করেছি। যেমন – ওয়েল কালার, ওয়াটার কালার, চারকোল, পেস্টাল, অ্যাক্রালিক ইত্যাদি ইত্যাদি নানা মাধ্যমে প্রচুর কাজ করেছি। কলকাতা থাকা অবস্থায় দেখলাম ফুটপাতে থাকা দরিদ্ররা কীভাবে সংগ্রাম করছে, নিজের সন্তানকে দু’মুটো খাওয়ার দেবার জন্য! সেই স্মৃতিকে আমি ক্যানভাসে তুলে ধরার চেষ্টা করি।পরবর্তীতে তার প্রদর্শনীও করেছি। এরপর কর্মসূত্রে কলকাতা ছেড়ে চলে আসি অরুনাচল প্রদেশে। সেই সময় এখানে কোন ধরণের আর্ট মেটারিয়াল পাওয়া যেত না। আমি তখন এর বিকল্প হিসেবে পাহাড়ি নদীর স্রোতে ভেসে আসা খুব সুন্দর সুন্দর ছোটছোট পাথর দিয়ে অরুনাচলের আদিবাসিদের প্রোর্টেট করতে শুরু করলাম। পরবর্তীতে কলকাতায় এবং দিল্লিতে এসবের প্রদর্শনীও করলাম। এরপর ধারা পরিবর্তন করলাম। আমি আবার একই ধারায় বেশিদিন কাজ করি না। একটা ধারায় কাজ করে নানারকম এক্সপেরিমেন্ট করার পর একটা পরিতৃপ্তি এসে গেলে, তখন অন্য সিরিজ শুরু করে দিই। যেমন- কাগজের খণ্ড দিয়ে আদিবাসিদের উপর ভাস্কর্য করা। বেশ কয়েক বছর অ্যাবস্ট্র্যাক্ট ফর্মের উপরেও কাজ করেছি। সিরিজও করেছি। আবার পরিবর্তন।আমি মনে করি,একজন শিল্পী নির্দিষ্ট কোন ধারায় আটকে থাকতে পারে না। নতুন কিছু করার জন্য তাকে নানারকম মাধ্যমের সাহায্যের ভিতর দিয়েই যেতে হয়। তাই শিল্পীর নির্দিষ্ট কোনকিছু ভাবনায় না-থাকাটাই শ্রেয়।
প্রশ্ন
ঃ আপনি একক প্রদর্শনী করেছেন কয়েকবার। এই ধরণের আয়োজনের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি নিয়ে
আমাদের কিছু বলুন। আপনি বিষয়টাকে কীভাবে বিশ্লেষণ করতে চাইবেন ?
উত্তর ঃ আমার
যতটুকু মনে আছে একক এবং যৌথ মিলিয়ে দেশে-বিদেশে প্রায় ৬৫টি প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ
করে ফেলেছি। জীবনে জাতীয় স্তরেও বহুবার সম্মানিত ও পুরস্কৃত হয়েছি। আর প্রদর্শনীর ব্যাপারে
যদি বলেন, তবে বলবো – অবশ্যই গুরুত্ব রয়েছে।
প্রদর্শনী না-হলে একে- অপরের কাজ, কাজের ধারা, কাজের মাধ্যম, শিল্পীর ভাষা, এই বিষয়গুলো সাধারণ
মানুষ তথা আমাদের কাছে পৌঁছতো না। ওয়ার্কশোপের
প্রয়োজনীয়তাও একই ভাবনায়। একই ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই যেমন ধরুন — বিদেশের অনেক
বিখ্যাত শিল্পীর ছবি প্রদর্শনী হয়েছে। আর সেজন্যই আমরা সেইসব ছবি
দেখার সুযোগ পেয়েছি। তার থেকে শেখেছি। ফলে প্রদর্শনীর বিকল্প নেই।আর ব্যক্তিগত প্রদর্শনীর ক্ষেত্রে
বলবো, সম্ভব হলে আর্টিস্টের এটা করা দরকার। এতে সে অভিজ্ঞ মহল থেকে বিভিন্ন ধরণের
মতামত জানতে পারবে। যা পরবর্তীতে তার সিগন্যাচার স্ট্যাইল ডেভেলাপ্ট করতে গুরুত্বপূর্ণ
ভূমিকা নিতে সহায়তা করবে। আমার মতে নিজের আর্টকে
বোঝার জন্য এটা খুবই প্রয়োজনীয়একটা দিক। একক প্রদর্শনী শিল্পীকে আগামীর পথ
অনুসন্ধানে সহায়তা করে।
প্রশ্ন
ঃ ত্রিপুরার কোন্
কোন্ আর্টিস্ট দ্বারা আপনি প্রভাবিত হয়েছিলেন? কিংবা তাদের চেতনাকে আপনাকে
প্রভাবিত করেছিল!
উত্তর ঃ এভাবে বলতে গেলে আমি অনেকের দ্বারাই প্রভাবিত। তার মধ্যে শিল্পী শক্তি হালদারের কথা অবশ্যই বলবো। তার কাজ আমাকে খুব
প্রভাবিত করেছিল। তিনি ভারতীয় শৈলীতে ত্রিপুরার আদিবাসিদের নিয়ে কাজ করেছিলেন দীর্ঘদিন।প্রথাগতভাবে না-হলেও আমার গুরু বলতে পারেন শিল্পী চিন্ময় রায়-কে। আমার অ্যাবসার্ড আর্টের শুরু তার হাত ধরেই।তিনি
আমাকে খুব উৎসাহের সাথে আমাকে গাইড করেছিলেন।এটা আমার এক পরম সৌভাগ্য। আমার মতো কেউ তার
সান্নিধ্য পেয়েছিল কিনা আমার সন্দেহ আছে! এখনও আমি আমার কাজে তার প্রভাব টের পাই। আধুনিক আর্টের ক্ষেত্রে শিল্পী অপরেশ পালের কথা এই মুহূর্তে খুব মনে পড়ছে। তার চিন্তাধারা আমাকে খুবই প্রভাবিত
করেছিল। তিনি তার সময়ের থেকেও এগিয়ে চিন্তাধারা করতেন। সংসার- জীবনের বা সময়ের নানা সংকটে হয়ত তিনি অনেক কিছুই করে উঠতে পারেননি। যা করার ক্ষমতা তার ছিল। আর মনে পড়ছে শিল্পী বরুণ চক্রবর্তীর কথা। তিনি আমাকে জলরঙের উপর
খুব গাইড করেছিলেন। এভাবেই আমি সবার ভালোবাসা পেয়েছি এবং নিয়েছিও অকাতরে । সবার কাছেই আজ আমি বিনীতভাবে ঋণী এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

.jpg)







No comments:
Post a Comment