Monday, September 9, 2024

“জীবন বিকাশের একটি উত্তম মাধ্যম হল রঙ্গমঞ্চ” -- অভিনেত্রী রীতা চট্টোপাধ্যায়

 





“জীবন বিকাশের একটি উত্তম মাধ্যম হল রঙ্গমঞ্চ”

 ত্রিপুরার নাটকে রীতা চট্টোপাধ্যায় এক উল্লেখযোগ্য  নাম । বহুবছর অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে ছিলেন নাটক-যাত্রার উন্মাদনায়  তার সাথে একান্ত কথোপকথনে তমালশেখর দে ।

  প্রশ্নঃ দীর্ঘদিন নাটক করেছেন। আজ এতটা পথ এসে কি মনে হয়, জীবন কি সত্যিই একটা রঙ্গমঞ্চ ?

উত্তর ঃ খুব সরাসরি বলতে গেলে, হ্যাঁ জীবন সত্যিই আমার কাছে এক জীবন্ত রঙ্গমঞ্চ।জীবন আর নাটক একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। পরস্পর পরস্পরের উপর নির্ভরশীল। আমি আমার জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত নাটকের আনাচে-কানাচে ব্যবহারের চেষ্টা করেছি। একাত্ম হতে চেষ্টা করেছি চরিত্রের সাথে। জীবন বিকাশের একটি উত্তম মাধ্যম হল রঙ্গমঞ্চ। প্রতিটি পরিবারই এক অর্থে এর অন্তর্গত। পরিবার থেকেই আমরা অভিনয়ের উপাদানটুকু গ্রহণ করি।  নিজেকেও সাজাই। গড়ি-ভাঙি। নাটকের সাথে জীবনের এই যে, অভিনয়ের মাধ্যমে জড়িয়ে পড়া, এটাকে আমি মঞ্চে সত্যিই খুব উপভোগ করি।  

প্রশ্নঃ নাটকের সাথে জীবনের জড়িয়ে যাওয়া নিয়ে আমাদের কিছু গল্প বলুন। কখন, কীভাবে শুরু এই পথ-

উত্তর ঃ সবার জীবনেই একটা স্বপ্ন থাকে, সে বড় হয়ে কি করবে, না-করবে! আমরাও সেটা স্বাভাবিকভাবেই ছিল। পড়াশোনা ছাড়া ছোটবেলা থেকেই নাচ এবং নাটকের সাথে জড়িয়ে যাই। মূলত বাবার হাত ধরেই নাটকের মোহময় জগতে আমার প্রবেশ ঘটে।  বাবার পরিচালনায় প্রথম নাটক করি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মুক্তির উপায়’। আমি ফকিরের দ্বিতীয় স্ত্রী-র চরিত্রে অভিনয় করি। আমার দিদি করেছিল ফকিরের চরিত্রে। সেই প্রথম অভিনয়ে বেমালুম নিজের চরিত্রের নাম ভুলে আপন মনে আঙ্গুর খেয়ে যাচ্ছিলাম। যা মঞ্চের ঠাকুরের জন্য বরাদ্দ ছিল। শেষে দিদি মঞ্চেই বুদ্ধি করে ধমক দিয়ে বলল –‘বসে বসে কি আঙ্গুর খাওয়া হচ্ছে? এগুলো কি তোমার জন্য ছিল?’ তারপর ধমক দিয়ে বলল- ‘এখন যাও!’ মঞ্চের বাইরে এসে ভুল বুঝতে পারলাম। আজ সবই সুখস্মৃতি।এরকম অনেক অনেক গল্প জড়িয়ে আছে নাটক নিয়ে।   

প্রশ্নঃ নাটক তো অনেক করেছেন। এর মধ্যে আজও মনকে নাড়া দিয়ে যায়, এমন একটি নাটকের স্মৃতি রোমন্থন শুনতে চাই আপনার কাছ থেকে –

উত্তর ঃ  আসলে প্রতিটা নাটকই মনকে নাড়া দেয়। কোনটা বাদ দিয়ে কোনটা বলি! আমি পাল্টে পাল্টে বিভিন্ন চরিত্রে নাটক করতেই ভালবাসি। আবার একই নাটকে বিভিন্ন চরিত্রেও অভিনয় করেছি। কখনও গান্ধারীর চরিত্রে, আবার পরক্ষণেই  স্বাধীনতা সংগ্রামীর চরিত্রে। আবার এরপরই আবার চেঁঙ্গিস খাঁর চরিত্রে অভিনয় করছি। প্রতিটি চরিত্রেই অবলীলায় ঢুকে যেতে পারতাম। প্রতি তিরিশ/চল্লিশ সেকেন্ড পরপর পোশাক পরিবর্তন করা, আমার বেশ ভালই লাগত। একটা চ্যালেঞ্জও ছিল। ঘরে বসে বসে এইসব প্র্যাকটিস করতাম। রমেশ হাই স্কুলের প্রধানশিক্ষক কান্তিলাল চক্রবর্তী-র লেখা এবং পরিচালিত নাটক ‘যুদ্ধ নয় শান্তি চাই’এ এমন অভিনয় ছিল। তিনি আমাকে শিখিয়েছিলেন কথা বলতে বলতে হাঁটা, কীভাবে কাঁদতে কাঁদতে হাঁটা! ‘যদিও সন্ধ্যা’ ‘দেবী চৌধুরাণী’ ‘শুভ ফিরে এল’ ইত্যাদি নাটকগুলো আজও মনকে নাড়িয়ে দিয়ে যায়।  পেছন ফিরে তাকালে অনেক ঘটনা মনকে দোলা দেয় । কথায় বলে না, অভিজ্ঞতা কথা বলে। বাবার হাত ধরেই আমার এই পথের যাত্রা শুরু । আজ বাবা নেই । স্মৃতিতে জড়িয়ে আষ্টপৃষ্টে জড়িয়ে আছেন ।  

প্রশ্নঃ তখনও তো আপনি সম্ভবত কর্মজীবনে যোগ দেননি!

উত্তর ঃ  না, আসলে এরপরই কর্মজীবনে প্রবেশ করে, অফিস নাটকের সাথে জড়িয়ে যাই। সেটা আমার নাটকের দ্বিতীয় পর্ব বলতে পারি।  অফিস নাটকের পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্থার সাথে নাটক করতে থাকি। টানা বাইশ বছর বিভিন্ন চড়াই-উৎরাইয়ের ভিতর দিয়ে নাটক করে যাই।  তখন আমার জীবনে নাটকে আসেন ত্রিপুরার বিখ্যাত পরিচালক নাট্যগুরু ননী দেব। তিনি আমার যাবতীয় নাটকের অপরিপূর্ণতাকে ভরিয়ে তুলেন।                

প্রশ্ন ঃ কিছুদিন  যাত্রার সাথেও তো আপনার সম্পর্ক ছিল । সেই সব অভিজ্ঞতা নিয়ে কিছু বলুন ?

উত্তর ঃ  হ্যাঁ ছিল । যাত্রা সম্রাট হারাধন দত্তের হাত ধরে যাত্রাতে আমার অভিনয় জীবনের শুরু । সে এক অনবদ্য অভিজ্ঞতা । চতুরদিকে জনসমাগম । পাশে কনসার্ট বাজছে । স্কেল ধরিয়ে দিল । এবার সেই স্কেলে অভিনয় করে যেতে হবে । হারাধনদা-র পরিচালনায় বেশ কয়েকটি যাত্রাপালা করেছি । যেমন – নটীবিনোদিনী, ধুলোর স্বর্গ, টপু সুলতান, পাগল ঠাকুর, আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণ প্রমুখ যাত্রা খুবই উল্লেখযোগ্য ছিল ।

প্রশ্নঃ ত্রিপুরার নাটককে আপনি খুব কাছে থেকে দেখেছেন। সামগ্রিক মূল্যায়নে নারীর অবস্থান নিয়ে আমাদের কিছু বলুন ?

উত্তর ঃ  সময়ের সাথে সাথে সামগ্রিকভাবে নারীরা এখন অনেক দূর এগিয়ে ।সময়ের সাথে সাথে মেয়েরাও আমাদের থেকে এখন অনেক এগিয়ে । আমাদের সময়ের থেকে এখন মেয়ে অনেক বেশি সাহসী এবং সচেতন । নাটক নিয়ে দিব্যি পড়াশোনা করছে । ফিরে এসে নাটক নিয়ে কাজ করছে । নিজস্ব নাটকের দল আছে।  আলো দিচ্ছে।  পরিচালনা করছে ।  সেই দিক দিয়ে তারা অনেকটা এগিয়ে। অন্তত আমাদের সময়ের তুলনায় ।    

প্রশ্ন ঃ আপনি তো সিনেমায়ও কাজ করেছিলেন। সে নিয়ে আমাদের কিছু বলুন?

উত্তর ঃ আমার সৌভাগ্য হয়েছিল সিনেমাতে কাজ করার । মঙ্গল শাঁখ এবং নোঙ্গর দুটোই ত্রিপুরার প্রেক্ষাপটে লেখা । ‘নোঙ্গর’ সিনেমার শুটিং রুদ্রসাগর আর নীরমহল-এর জীবনজীবিকাকে কেন্দ্র করে লেখা ছিল । প্রাধান্য পেয়েছিল জেলেদের জীবনকথা এবং চড়কমেলার আত্মকথা । ত্রিপুরার বহু শিল্পী এতে কাজ করেছেন । সারাদিন কাজ শেষে সবাই মিলেমিশে গান করতাম । কেউ বা নৌকা নিয়ে জলবিহারে যেত । খুব মজা হয়েছে । ‘মঙ্গল শাঁখ’-এর পরিচালক ছিলেন কলকাতার ।আউটডোর শুটিং হয়েছে ত্রিপুরায়। আর ইনডোর শুটিং হয়েছে কলকাতায় । নায়ক ছিলেন অভিষেক এবং পল্লবী চট্টোপাধ্যায় । আমি অভিষেকের বৌদির ভূমিকায় অভিনয় করেছিলাম । জমজমাট কাহিনি ছিল । খুব চিন্তায় ছিলাম । যাই হোক, শেষ অবধি সবই খুব ভালো হয়েছে ।    

প্রশ্নঃ নাটক নিয়ে তরুণ প্রজন্মদের দেখছেন। কেমন লাগছে? সম্ভাবনা কি দেখতে পান?   

উত্তর ঃ আমি মনে করি, আজকের তরুণপ্রজন্ম আমাদের থেকে অনেক বেশি সম্ভাবনা নিয়ে এগিয়ে আছে স্কুল কলেজের চাপ সামলে, প্রত্যেকেই  অভিনয় চালিয়ে যাচ্ছে । সব দিকেই তারা এগিয়ে । ছোটবেলা থেকে তারা নিজেদের তৈরি করে নিচ্ছে । এক্ষেত্রে আমাদের অনেক অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল । তাদের ক্ষেত্রে সেটা হবে না। আমি তাদের বলতে চাই –‘তোমার হল শুরু । আমার হল সারা / তোমায় আমায় মিলে এমনই বহে ধারা ।’    

No comments:

Post a Comment

অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎

  'অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎ ‎সত্তর দশকের উন্মাদনায় এক ভিন্ন উচ্চারণ-ভঙ্গ...