Tuesday, September 10, 2024

“সময়ের দাবি অনুযায়ী ছবির ভাঙা-গড়া শিল্পকলায় নিত্য নতুনের সন্ধান এনে দেয়।”-- চিত্রশিল্পী অভিজিৎ ভট্টাচার্য

 

 





“সময়ের দাবি অনুযায়ী ছবির ভাঙা-গড়া শিল্পকলায় নিত্য নতুনের সন্ধান এনে দেয়।”

 

ত্রিপুরার চিত্রচর্চায় এই সময়ে অভিজিৎ ভট্টাচার্য অবশ্যই স্মরণীয় একটি নাম। অধ্যাপক হিসেবে ত্রিপুরা সরকারি আর্ট  কলেজের   সাথে জড়িয়ে রয়েছেন বহুদিন ধরেতার সাথে একান্ত আলোচনায় তমালশেখর দে ।    

 

 প্রশ্ন ঃ “ সমস্ত সত্তা দিয়ে দেখো, দেখো, দেখো। ... দেখতে পাওয়া মানে প্রকাশকে পাওয়া । বিশ্বের প্রকাশকে মন দিয়ে গ্রহণ করাই হচ্ছে আর্টিস্টের সাধনা।” – রবীন্দ্রনাথের এই কথাটাকে আপনি কীভাবে বিনির্মাণ করতে চাইবেন ?

 উত্তর ঃ প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ । মানুষ মাত্রেই স্রষ্টা । মানুষ তার নিজের সৃষ্টিকাল থেকে কোনো না কোনোভাবে সৃষ্টি করেই আসছে । চোখ মেলে যেদিন মানুষ প্রথম এই প্রকৃতিকে দেখেছে সেদিন থেকেই চর্মচক্ষু ক্রিয়াশীল হয়ে উঠেছে অজানা অনন্ত জিজ্ঞাসার তাড়নায় । এই অনন্ত জিজ্ঞাসা বা অনন্ত খোঁজ যেদিন বন্ধ হয়ে যায়, মানুষের মৃত্যু হয় সেদিনই ।

যে-কোনো সৃষ্টিশীল মানুষের মনশ্চক্ষু থাকে নিরন্তর ক্রিয়াশীল । সেই মনশ্চক্ষু সর্বসত্তা দিয়ে বিরামহীন সৃষ্টিতত্ত্বের সূত্রের খুঁজে ব্যাপৃত থাকে । সেই সুত্রেই সন্ধান চলতে থাকে একজন শিল্পীর, তার সৃষ্টিকে ভাঙা গড়ার মধ্য দিয়ে । এ এক অনন্ত অমৃত পথের বিরামহীন যাত্রা । যারা এই যাত্রা পথে ক্লান্ত হয়ে পড়েন তারা তখনই নিঃশেষিত হয়ে মহাকালের অন্তরালে বিলীন হয়ে যান। আর যারা ক্লান্তহীন খোঁজ চালিয়ে যেতে পারেন, তাদেরকেই পৃথিবী  জানে, গ্রহণ করে কালজয়ী রূপে ।

এখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সর্বসত্ত্বা দিয়ে যে দেখার কথাকে ইঙ্গিত করেছেন তা শুধুই চর্মচক্ষুর দেখা নয়, অন্তরচক্ষু দিয়ে প্রতিটি বিষয়কে বিশ্লেষণ করে তার অন্তঃসার নিংড়ে বের করে আনা । আর সেখানেই প্রকৃত দেখার সার্থকতা । যখন আমরা  সার্থকভাবে অন্তর্দৃষ্টিকে সচল করতে পারি তখন ক্রমে ক্রমে আমাদের রুদ্ধদ্বার চেতনার অনর্গল মুক্তি ঘটতে থাকে । নব প্রকাশের আলোয় আমরা উদ্ভাসিত হই । সৃষ্টিতত্ত্বের গূঢ় অর্থের সূত্র ক্রমশ আমাদের কাছে ধরা দেয় । শিল্পী যেহেতু নিরন্তর সৃষ্টিশীল তাই এই প্রকাশ আলোকবর্তিকা তাকে বুকে ধারণ করতেই হবে । নব আনন্দে... নব কিরনে জাগতেই হবে ।

 

প্রশ্ন  চিত্র হবার জন্য অবশ্যই রেখা এবং রঙের সাথে চাই মনন। এই মনন থেকে তৈরি হয় যে-কোন শিল্পীর নিজস্ব চিত্রভাষা। আপনি কিভাবে সেই ভাষা তৈরির চেষ্টা করছেন ? বা এই বিষয়টা নিয়ে কি ধরণের চিন্তাভাবনা করে থাকেন ?

 উত্তর আসলে নিজস্ব চিত্রভাষাএই কথাটি নিয়ে আমার নিজের মধ্যেই অনেক দ্বন্দ্ব  আছে প্রথমত, আমি বিশ্বাস করি, সততা নিয়ে কোন শিল্পী বলতেই পারবেন না, যে তিনি তার সৃষ্ট শিল্পে নিজস্ব ভাষা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন সেটা বলতে পারে একমাত্র সময় ঠিক এমন একটি জায়গায় দাঁড়িয়ে একজন চিত্রকর হিসেবে আমার নিজস্ব কোন চিত্রভাষাতৈরি করার বিষয়ে আমি কখনও ভাবারই সাহস সঞ্চয় করতে পারিনি আমার ছবিতে ঘুরে ফিরে আসে প্রকৃতি, পুরুষ তাদের একাত্মাতা প্রকৃতি আর পুরুষ একাত্ম হয় প্রেমে আর প্রেমে সৃষ্টি হয় নতুন জীবন পৃথিবীর সকল সৃষ্টির গোড়ার কথা প্রেম তাই শুধু মানুষ নয় জীব মাত্রেই স্রষ্টা আর যেখানে সৃষ্টি সেখানে প্রেম অবধারিত প্রেম মানেই মিলন আর মিলনই বয়ে আনে নতুন জীবন সৃষ্টির বার্তা, সেখানে কাম অবশ্যম্ভাবী আমি আমার ছবিতে গাছ, ফুল, লতা, পাতা, পাখি,মানুষ ইত্যাদি সবার মধ্যেই স্বর্গীয় প্রেম আর কামনার এক শীৎকার তৈরি করার চেষ্টা করি এমনকি আমি আমার ছবিতে যে সময়টিকে ধরার চেষ্টা করি সেটাও সন্ধিকাল অর্থাৎ ক্ষণের সঙ্গে  ক্ষণের মিলনই কাল

সেই ক্ষণটি একটি স্বর্গীয় প্রেম মুহূর্ত এই সময় কালটিই আলোর সঙ্গে আঁধারের প্রেম। রাত্রির সঙ্গে দিনের প্রেম এবং আবেগ জড়ানো মোহময় আলো আঁধারিতে ভরা প্রকৃতির মিলনক্ষণ আমি প্রকৃতির এই ভাষাগুলোকেই আমার ছবিতে ধরার চেষ্টা করি আমার ‘নিজস্ব চিত্রভাষা’  এসবই। আমার মনের আবেগ অনুভূতিগুলোকে চিত্ররূপ দিতে যখন যে আকার, আকৃতি, আঙ্গিক, বুনোট ও রঙের সাহায্য আমার নিতে হয় তা নির্দ্ধিধায় গ্রহণ করি প্রকৃতি থেকে । কোনো  বিশেষ ভাষা তৈরির দায় কখনও মাথায় রাখি না । বরং বলা যায়, সে দায় আমি অস্বীকার করি । আমি বিশ্বাস করি, মুক্ত মনে, সততা নিয়ে কাজ করা আমার দায় । আর আমার নিজস্ব চিত্রভাষা তৈরি করার দায় সময়ের । হার উপর আমার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই ।  

 







প্রশ্ন  চিত্রশিল্পে আপনি স্থানিকতাকে  কতটা গুরুত্ব দিতে চান ?  কিংবা কেউ কেউ আবার  স্থানিকতাশব্দের  ভিতরে  সংকীর্ণতার গন্ধ পান ! গোটা বিষয়টাকে নিয়ে আপনার অবলোকন জানতে চাই ?

 

উত্তর ঃ   স্থান এবং কাল যেকোনো ধরণের সৃষ্টির উপরই একটা প্রভাব ফেলে যায় । আমি অবশ্যই চিত্রকলায় স্থানিকতাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকি । একজন চিত্রশিল্পী তার পারিপার্শ্বিকতা এবং সমকালীন অবস্থা সম্পর্কে যত  বেশি অবজারবেশন থাকবে, অন্যস্থান সম্পর্কে স্বাভাবিকভাবেই সেটা ততটা থাকবে না । সেই শিল্পী যদি তার স্থান এবং কালের মধ্যে থেকেও তার গভীর চিন্তা ও চেতনাকে জাগিয়ে তুলে শাশ্বতর সন্ধানে ব্যাপৃত হতে পারেন, তবে তার সৃষ্টি স্থান এবং কালের গণ্ডি পেরিয়ে কালজয়ী হয়ে উঠবে অধারিতভাবেই । এই রকম উদাহরণ আমরা বারে বারে দেখতে পাই পৃথিবী জোড়া অনেক শিল্পীর সৃষ্টির মধ্যে । শিল্পী রামকিঙ্কর বেইজ-এর সৃষ্টি । আমাদের রাজ্যের বরেণ্য চিত্রশিল্পী নলিনীকান্ত মজুমদারের সৃষ্টিও আমাদেরকে সেই শাশ্বতের সন্ধান দিতে সক্ষম। এর একমাত্র কারণ হচ্ছে এই শিল্পীরা তাদের অস্তিত্বের খোঁজে গভীর থেকে গভীরতর অভিমুখে নিরন্তর যাত্রা জারি রেখেছেন আজীবন ।

আমাদের অস্তিত্বের শেকড়ের সন্ধান যদি পেতে হয় তবে অবশ্যই নিজের পরিমণ্ডলকে গভীরভাবে চিনতে এবং জানতে হবে । একজন শিল্পীর সৃষ্টি তখনই সার্থক হতে পারে যখন তার অস্তিত্ব তার সৃষ্টির সাথে সম্পৃক্ত হয়ে যায় । একমাত্র স্থানিকতা বোধ ও তার বিষয়ে আবেগই একজন শিল্পীর অস্তিত্বের সাথে তার সৃষ্টিকে একাত্ম করে দিতে পারে । 

 

প্রশ্ন   সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে আঁকার প্রকৃতি, বিষয়, বিন্যাসের পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই আসে।  আপনার উপলব্ধিতে ছবিতে কেমন ধরা পড়ছে এই সময়ের পরিবর্তন ?

 

উত্তর ঃ  একজন শিল্পীর  ভাবনায় প্রতি মুহূর্তে একটি নতুন কিছু গড়ার তাগিদ থাকে । আর নতুন কিছু গড়তে গেলেই পুরনো ভাবনাগুলোকে ভাঙতে হয় । যে কোন শিল্পের অগ্রগতি নির্ভর করে তার নিরন্তর ভাঙা গড়ার  আবর্তনের উপর ।  সময়ের দাবি অনুযায়ী এই ভাঙা-গড়া শিল্পকলায় নিত্য নতুনের সন্ধান দেয় । এবং  সার্বিক পরিবর্তন নিয়ে আসে শিল্পীর চেতনায় ও তার সৃষ্টিতে ।

প্রথমত শিল্পী একজন মানুষ এবং মানুষ মাত্রেই সমাজবদ্ধ জীব । তাই যখন একজন শিল্পী সৃষ্টি করেন তিনি কোনো অবস্থাতেই তার পারিপার্শ্বিক অবস্থার প্রভাবকে এড়িয়ে যেতে পারেন না । কোনো –না –কোনোভাবে স্থান-কাল-, সমাজ, সংস্কৃতি, ধর্ম, রাজনীতি শিল্পীর মনে তার চেতনে অথবা অবচেতনে প্রভাব বিস্তার করেই থাকে । এই বিষয়গুলি যেমন সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তনশীল ঠিক তার প্রভাব শিল্পীর চেতনাকেও তার জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে  তীব্রভাবে প্রভাবিত করে ও নতুনের সৃষ্টি হয় ।

আমরা আজ সারা বিশ্ব শিল্পের অঙ্গনেই এক বিশাল পরিবর্তন লক্ষ্য করছি এবং তার ঢেউ আছড়ে পড়ছে আমাদের এই প্রান্তিক ছোট্ট রাজ্য ত্রিপুরাতেও । নিত্য নতুনের খোঁজে প্রতিনিয়ত ভাঙা গড়ার প্রভাব আমরা আমাদের রাজ্যের শিল্পাঙ্গনেও বিশেষভাবে লক্ষ করছি, যা অবশ্যই এই উজ্জ্বল ভবিষ্যতের বার্তা বয়ে আনে ।

এটাই পৃথিবীর নিয়ম যে, নতুন প্রজন্ম সব সময়ই নতুনের প্রতি আগ্রহী থাকে । আমাদের রাজ্যের নতুনদের কাছ থেকেও শিল্প নিয়ে প্রতিদিন নতুন নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা আমরা লক্ষ্য করছি । কিন্তু তার থেকেও বড় কথা যে, নতুনদের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের রাজ্যের প্রবীণরা যেভাবে নতুন নতুন আঙ্গিক ও ভাবনার শিল্পকর্ম উপহার দিচ্ছেন, তা এককথায় অভাবনীয়। 

 


প্রশ্ন   ত্রিপুরার চিত্রকলার ক্ষেত্রকে আপনি কেমন দেখছেন ? মানে একাল সেকালকে যদি তুলনামূলক আলোকপাত করেন !

 

উত্তর ঃ আমরা সবাই জানি, শিল্প সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চায় এই পাহাড়ঘেরা ছোট্ট রাজ্যের অতীত ঈর্ষণীয়।  যার টানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো বিশ্ববিখ্যাত ব্যক্তিত্ব সাতবার এই প্রত্যন্ত রাজ্যে আস্তে বাধ্য হয়েছিলেন । তৎকালীন রাজন্যশাসিত ত্রিপুরা ছিল শিল্প ও সংস্কৃতির উদার পৃষ্ঠপোষক । রাজ অন্দরমহলে ভিতরে ছিল নিরলস সাহিত্য- শিল্পের চর্চা। রাজসভা আলোকিত করে রাখতেন কত কত উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব যারা স্ব স্ব ক্ষেত্রে একেকজন উজ্জ্বল নক্ষত্র । যদিও সাধারণ্যে এই শিল্প ও সংস্কৃতি চর্চার বিশেষ কোনো প্রভাব তখন ছিল না । কালক্রমে রাজঅন্দর থেকে শিল্প ও সংস্কৃতি চর্চার  মুক্তি ঘটল এবং সাধারণ্যে তার উদ্দীপনা তৈরি করল । চূড়ান্ত উদ্দীপনা দেখা যায় ত্রিপুরার চিত্রচর্চায় । বিশিষ্ট চিত্রশিল্পীরাই তার প্রমাণ । মাঝে একটা পর্যায়ে  খুব দুঃখজনকভাবে ম্লান হয়ে গিয়েছিল এই ইতিহাস । কিন্তু বর্তমানে এই ত্রিপুরা আবার জেগে উঠেছে, বলতেই হয় । জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকস্তরে  এখন আমরা অনেক এগিয়ে । গ্যালারি সম্পর্কিত আরও কিছু সুযোগ- সুবিধা  থাকলে, আমরা আরও অনেকদূর এগিয়ে যেতে পারতাম  নিঃসন্দেহে । তাই বলাই যায়, একটা পর্যায়ের ম্রিয়মাণ ‘সেকাল’ কাটিয়ে আজকের ‘একাল’  অনেক ঝলমলে । অনেক উজ্জ্বল

 


প্রশ্ন ঃ তারপরও কি কোথাও কোনো অভিযোগ নেই ?

 উত্তর ঃ কিন্তু তারপরও যদি কিছু বলতে হয়, তবে বলতেই হয়,  আগরতলা শহরের উপর সর্ব সুবিধাযুক্ত আন্তর্জাতিক মানের একটি গ্যালারি তৈরি করে দেওয়া গেল না শিল্পীদের জন্য, যেখানে বিনে পয়সায় শিল্পীরা তাদের শিল্পকর্মের প্রদর্শন করতে পারেন । যদিও নজরুল কলাক্ষেত্রে একটি গ্যালারি আছে কিন্তু তার জন্মলগ্ন থেকেই বিভিন্ন আভ্যন্তরীণ সুবিধার চূড়ান্ত অপ্রতুলতা । অথচ বিশাল অঙ্কের বুকিং রেন্ট, যার ফলে অমুখো হবার সাহস কেউ দেখায় না ।

এছাড়া সিটি সেন্টারে আরও একটি গ্যালারী আছে সেখানেও বিভিন্ন রকমের অব্যবস্থা সেই সঙ্গে এটি আকারে অত্যন্ত ছোট । তাছাড়া আমাদের রাজ্যে শিল্প কেনা-বেচার কোনো বাজার নেই । কোথাও কোনোও উদ্যোগ নেই । এত এত অত্তালিকা তৈরি হয়েছে রাজ্যে, সেসব অট্টালিকা তৈরির মোট অর্থমূল্যের দুই বা তিন শতাংশ অর্থও শিল্পীদের কাছ থেকে শিল্পকর্ম ক্রয়ের মাধ্যমে Interior design করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া যেত, তবে রাজ্যের শিল্প ও শিল্পীর উন্নয়নে অত্যন্ত উপযুক্ত একটি পদক্ষেপ হতে পারতো ।

আমি আশা করবো, কাল বিলম্ব না-করে রাজ্যের চিত্র-ভাষ্কর্য শিল্পীদের সার্বিক উন্নয়নের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নীতি গ্রহণ করা হবে, যা রাজ্যের শিল্পকলার উৎকর্ষতা বিধানে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে । আমাদের রাজ্যে প্রতিভার কোনো অভাব নেই । প্রচুর শিল্পী শুধু মনের জোরে প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছেন । এটাই আশার দিক ।  

  প্রশ্ন ঃ আবার কোনো কোনো প্রখ্যাত আর্টিস্টকে এও তো বলে শুনি, আমাদের রাজ্যে ছবির বিক্রির গ্যালারী নেই, বিক্রির প্রতিযোগিতা নেই, কালেক্টর নেই, ফলে তারা কালেক্টরের শোষণ থেকে মুক্ত । এই গোটা বিষয়কে কীভাবে দেখছেন ?

 উত্তর ঃ আমি একমত নই । আমাদের রাজ্যে কোনো বাজার নেই, এটাকে আমি অভিশাপ হিসেবে দেখি। শখের কবি হয়, শখের লেখক হয়, গায়ক হয়, কিন্তু  Visual artist  হয় না । কারণ শখের  Visual artist   হলে তার জন্য যে মাসুল দিতে হয় তা উল্লেখিত অন্য শিল্পে দিতে হয় না । একজন চিত্রশিল্পী যদি শখ করে একটি সাধারণ আকারের ছবি সাধারণ মানের Materials  দিয়েও করে, তাতেও নূন্যতম তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা তার খরচ পড়বে । আর যদি একটু ভালো 

 

  

 


প্রশ্ন স্পেস এবং ব্যাল্যান্স ছবির গুরুত্বপূর্ণ  এই সংযোগ নিয়ে আপনার কাছে কিছু শুনতে চাই?     

 উত্তর ঃ খুব সংক্ষেপে বলতে গেলে বলছি,  স্পেস এবং ব্যাল্যান্স – এই শব্দ দুটি একটি মানবিক জীবন চিত্রণে যেমন প্রাণসঞ্চার করতে পারে, ঠিক তেমনি চার কোণাবিশিষ্ট চিত্রপটেও একজন শিল্পী প্রাণসঞ্চার করতে পারেন, এই দুটি শব্দের সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে । আমাদের জীবনটি অবশ্যই একটি চিত্রপট । তাতেও নানা রঙ, আকার, আকৃতি, চরিত্ররা পাশাপাশি অবস্থান করে।  নিজেদের মধ্যে  প্রয়োজনীয় দূরত্ব ও ভারসাম্য রাখাটা যেমন খুব জরুরী একটা বিষয় । তেমনি চিত্রকর্মেও । দুটো ক্ষেত্রেই সংরচনা একটা মৌলিক শর্ত ।  নাহলে ছবির ভারসাম্য নষ্ট হয় । আর ভারসাম্য নষ্ট হলে,  স্বাভাবিকভাবেই  ছবিও তার সঠিক মূল্য হারায় । তাই ছবি আঁকতে গেলে প্রাথমিক শর্তই হচ্ছে নিরন্তর চর্চা ।

 

 



প্রশ্ন আপনার ছবিতে আপনি বিষয় হিসেবে প্রায়ই লোক আঙ্গিককে বেছে নেন। এই নিয়ে আমাদের একটু আলোকপাত করুন? আপনি দর্শকদের সাথে কিভাবে কমিউনিকেট করতে আগ্রহী!   

উত্তর ঃ না, সেরকম পূর্ব প্রস্ততি নিয়ে আমি কখনও আমার ছবিতে লোকআঙ্গিকের ব্যবহার করি না। তবে আমার ছবিতে ঘুরে ফিরে প্রকৃতি আসে । প্রেম আসে । এবং এই প্রেম ও প্রকৃতিকে জাগতিক পরিমণ্ডলের স্তর পেরিয়ে আরেক কল্পজাগতিক বা স্বপ্নীল স্তরে উন্নীত করার প্রয়াস নিরন্তর চলতে থাকে আমার ভিতরে । এছাড়াও আমি পৌরাণিক  কাহিনির বিষয় ও চরিত্রগুলোকে বর্তমানের সামাজিক প্রেক্ষাপটে বিনির্মাণ করার চেষ্টা করি এবং তার সঙ্গে সঙ্গতি রাখতে গিয়ে যে আকার, অবয়ব, আঙ্গিক, পরিমণ্ডল রচনা করি, তাতেও এক মায়াবী স্বপ্নময় জগৎ তৈরি করার প্রয়াস থাকে । বিষয়ের চাহিদা অনুযায়ী আমার ছবিতে এক স্বপ্নময় জগৎ তৈরি করার প্রয়াস থাকে । বিষয়ের চাহিদা অনুযায়ী আমার ছবিতে যে form, treatment, texture, colour  আসে তার মধ্যে  হয়ত দর্শক লোক আঙ্গিকের আভাস পান...!

আমি সবসময়ই আমার ছবিতে এক স্বপ্নময় জগৎ তৈরি করার চেষ্টা করি যা আমার দর্শককে বাস্তব আর অবাস্তবের সীমারেখায় নিয়ে দাঁড় করিয়ে দেয় । আমার ছবির পরিসরে দর্শক নির্দ্বিধায় বাস্তব জগৎ থেকে স্বপ্ন বা কল্পনার জগতে স্বচ্ছন্দ ও স্বতঃস্ফূর্ত বিচরণ করতে পারেন । আমি আমার ছবিতে কখনও আমাদের মানবিক জীবনের দুঃখ, দুর্দশা, সমস্যা, টানাপড়েন কিছুই দেখাতে চাই না । কারণ, মানুষ আজ প্রতিটি মুহূর্তে এইসব বিষয়ের সাথে লড়াই করছেন এবং বেঁচে থাকার জন্য এই যুদ্ধ করতে করতে মানুষ প্রাণান্তকর । মানুষের জীবন এখন এতটাই পরিবেষ্টিত যে তার থেকে পরিত্রাণের রাস্তা ক্রমেই সঙ্কুচিত হতে হতে এক সময় শ্বাসরুদ্ধকর একটা অসহনীয় অবস্থায় পরিণত হয় । মানুষ তখন এক মুহূর্তের শান্তি, এক মুহূর্তের স্বস্তি, এক টুকরো খোলা আকাশ, এক মুঠো খোলা বাতাস, এক চিমটে স্বপ্নের জন্য আকুল হয়ে ওঠে... ! আর ঠিক এই পরিস্থিতিতেই আমি দর্শককে তার আবদ্ধ জীবনে এক টুকরো খোলা আকাশ, এক মুঠো বাতাস, এক চিমটে স্বপ্ন দিয়ে মুহূর্তের জন্য সব সমস্যা ভুলিয়ে দিতে চাই ।

 

প্রশ্ন ঃ আপনার ছবিতে তাহলে আপনি ঠিক দর্শকদের তুলে দিতে চান ?

 

উত্তর ঃ এই যে বললাম, আমার ছবির মধ্যে দিয়ে  আমি আমার দর্শকদের কাছে মুহূর্তের আনন্দের ও শান্তির জন্যই তুলে ধরতে চাই । দর্শকদের মুখ থেকে এক মুহূর্তের জন্য যদি ‘আহ্’ বেরিয়ে আসে, তবেই আমি আমার কাজ সফল বলে মনে করি । আমার ছবি নিয়ে শিল্প বিশ্লেষক বা বোদ্ধারা কি বললেন, তা নিয়ে কখনও আমার মাথা ব্যথা নেই । কখনও ছিলও না । আমি ছবি আঁকি সাধারণ দর্শকদের জন্য এবং এমনভাবেই কাজটা করার চেষ্টা করি যাতে সাধারণ দর্শক আমার ছবির সামনে দাঁড়িয়ে মনে কোনো চাপ না-নিয়ে ভালোবেসে যেন ছবির চত্বরটা বেরিয়ে আসতে পারেন এবং চাপ মুক্ত হতে পারেন ! আমার ছবি বোঝার জন্য যাতে তাদের নিজেদের মাথার চুল ছিঁড়তে না-হয় । বরং ছবি দেখার, ছবিকে ভালোবেসে আঁকড়ে ধরার একটা ইচ্ছে মনে জাগে । আমি বিশ্বাস করি, ছবির প্রতি সাধারণ মানুষের ভালোবাসা জাগানোর দায় শিল্পীকেই কাঁধে নিতে হবে । শিল্পীর হয়ে এই কাজটি অন্য কেউ করে দেবে না । মানুষের চোখ এবং মনকে ধীরে ধীরে ছবি দেখার, ছবির ভাষা বোঝার, ছবিকে ভালোবাসার মত সমৃদ্ধ ও উপযোগী করে তুললে তবেই শিল্পীরাও তাদের মনের ঝাঁপি খুলে তাদের মনের চূড়ান্ত বিমূর্ত ধারণাকেও নির্দ্বিধায় দর্শকের সামনে তুলে ধরতে পারবেন । তখন দর্শকও শিল্পরস আহরণ ক্ষিধে নিয়ে সাগ্রহে, মুক্ত মনে নিয়ে, ভালোবেসে এগিয়ে আসবে শিল্পের কাছে । 

 


প্রশ্ন   বহুকাল ধরে ভারতীয় চিত্রকলা ছিল বর্ণনাত্নকবহুদিন পর ইদানিং আবার অনেক গ্যালারীতে বর্ণনাত্নক ছবির  লক্ষ্য করা যাচ্ছে এই বিষয় নিয়ে আপনার ব্যক্তিগত ভাবনা-চিন্তা বিশ্লেষণটা একটু জানতে চাই ?  

উত্তর ঃ লক্ষ্য করলে দেখা যায়, যেকোনো শিল্পমাধ্যমের জন্মই হয়েছে বিশেষ কোন মাধ্যমকে নির্ভর করে কিছু বলার তাগিদ নিয়ে । যেহেতু কিছু বলার তাগিদ নিয়ে সৃষ্টি তাই সেই শিল্পে কিছুটা বর্ণনাধর্মীতার উপস্থিতি থাকা অত্যন্ত স্বাভাবিক । প্রাচীনকাল থেকেই ভারতীয় চিত্রকলা বর্ণনাত্নকএই ধারা কখনও সংগঠিতভাবে, আবার কখনও বিচ্ছিন্নভাবে, বা বিক্ষিপ্তভাবে আজও বিদ্যমান । আমি আমার সৃষ্টি  চিত্রকর্মে অবশ্যই সেই ধারার ধারক এবং বাহক। আমার চিত্রচর্চার ভিতই হচ্ছে বর্ণনাধর্মী।

আমাদের দেশীয় সমাজ ব্যবস্থায় এখনও শিল্পকলা সম্পর্কিত বোধ, সচেতনতা, উৎসাহ, আকর্ষণ যা-ই বলি না কেন, এই সব কিছুকেই একটি বিশেষ গোষ্ঠী বিলাসিতা, উন্মাদনা বা আদিখ্যেতা বলে কটাক্ষ করে ।আমজনতার সাথে শিল্পের দূর দূর কোন সম্পর্ক থাক্, এটা অনেকেই পছন্দ করেন না । এবং এটা সত্যিই যে, আমরা, শিল্পীরা বিশেষত আজকের আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায় ক্রমশ ক্ষুদ্র গোষ্ঠীবদ্ধ ও নিঃসঙ্গ হয়ে যাচ্ছি ।  বিশ্বায়নের বাজারে যেখানে পৃথিবীর প্রতিটি কোণায় আধুনিকতার ঢেউ গিয়ে ধাক্কা দিচ্ছে, মিডিয়ার দৌলতে তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয়ের প্রচার, প্রসার, প্রভাব মুহুর্মূহু আলোড়ন তুলছে জনজীবনে সেখানে শিল্পকলা কিন্তু তুলনায় জনবিচ্ছিন্নতার ধারা বজায় রেখেই চলেছে । শিল্পকলাকে আধুনিক থেকে আধুনিকতর করার ও তার মধ্যে একটি Uniqueness আনার তাগিদে শিল্পে Abstracation, Distortion-এর পাশাপাশি Simplification-কে শিল্পীরা অত্যধিক গুরুত্ব দিয়েছেন আর এই Simplification এর ভিতর শিল্পের যে লুক্কায়িত গূঢ়তাত্ত্বিক ভাষা তার সঙ্গে সাধারণ মানুষের বা দর্শকের মানসিক যোগাযোগ স্থাপন করতে না পারার কারণে মানুষকে অহেতুকভাবে বিভ্রান্ত ও বিরাগী করে তুলেছে শিল্পকলার প্রতি । অধিকাংশ শিল্পী মনের মাধুরী মিশিয়ে শুধু সৃষ্টি করে গেছেন কিন্তু তার সৃষ্টির উপযুক্ত বোদ্ধা দর্শক তৈরি করার কোন দায় তার ছিল না। ফলে ক্রমশ শিল্প আর শিল্পী দুইই জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এই সমাজে । শিল্পের যে ভাষা, এই ভাষা বোঝার জন্য এই ভাষা শিখতে হয়, জানতে হয়, নতুবা তার রস আস্বাদন করা অসম্ভব, ঠিক যেমন অজানা কোনো ভাষার সাহিত্য-রস পেতে গেলে সেই ভাষার হরফ জ্ঞান থাকতে হয় । পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি যোগাযোগের ক্ষমতা যে ভাষার সেটা হচ্ছে Visual Language । এই ভাষার জন্মই পৃথিবীতে প্রথম এবং এই ভাষাই সারা পৃথিবীকে একসূত্রে বেঁধে ফেলার ক্ষমতা রাখে অথচ এই শাশ্বত ভাষাকে স্থান কাল নির্বিশেষে আরও সার্বজনীন করার পরিবর্তে কিছু শিল্পী একে চূড়ান্ত দুর্বোধ্য করে তোলার প্রয়াসে মেতে থাকেন । তাতেও অসুবিধা নেই, কিন্তু এই বিশেষ ভাষাটি সম্পর্কে তো মানুষকে আগে সচেতন করতে হবে সমাজ, স্থান, কাল, পাত্রের নিরিখে এবং ক্রমে ক্রমে এই ভাষায় শিক্ষিত করতে হবে, তবেই আমরা একটি বোদ্ধা শিল্পরসিক সমাজ পাবার আশা করতে পারি কিন্তু এর দায় কে নেবে ? শিল্পীদেরকেই তো নিতে হবে এবং সেটা ধাপে ধাপেই নিতে হবে । এই ক্রমপ্রক্রিয়াতেই আমাদের সবচেয়ে দুর্বলতা, তার ফলেই আমাদের দেশে শিল্পকলা কখনও সার্বজনীনতার মর্যাদা পায়নি । মুষ্টিমেয় একটি গোষ্ঠী ছাড়া এই সমাজের নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত অথবা স্বল্পশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত, উচ্চশিক্ষিত সবাই শিল্পকলা সম্পর্কে উদাসীন থেকেছেন ! তারপরও আমরা দেখেছি যে অতীতের বর্ণনাধর্মী শিল্পের প্রতি  সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে যে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, আকর্ষণ, সচেতনতা সর্বোপরি যে গ্রহণযোগ্যতা ছিল তা একসময় অনেকটাই হারিয়ে গিয়েছিল, মানুষ শিল্পবিমুখ ও উদাসীন হয়ে পড়েছিল চূড়ান্তভাবে। মজার ব্যাপার হল, এই উদাসীনতাকে অনেকেই আজ আবার ফলাও করে অন্যের কাছে প্রতিষ্ঠিতও করতে চান । এমনও দেখেছি যে উচ্চশিক্ষিত  এবং সমাজের অগ্রগণ্য প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিত্ব একটি শিল্প প্রদর্শনীর উদ্বোধন করে উদ্বোধনের বক্তব্য রাখতে গিয়ে নির্দ্বিধায় ঘোষণা  দিচ্ছেন - “এসব আর্ট-ফার্ট একেবারেই বুঝি না।”  আর এই বক্তব্য যখন সমাজের সাধারণ মানুষের সামনে রাখা হয় তখন একটি সূক্ষ্ম তাচ্ছিল্যে ভরা  মেকি বিনয় ফুটে ওঠে এবং মানুষভাবে যে -“এত বিদ্বায় মানুষটিও যখন শিল্প বুঝতে পারেন না তখন আমাদের যত মানুষের এসব নিয়ে চিন্তা করে কাজ নেই...। ”

একদিকে শিল্পীদের ক্রমশ বিমূর্ততাও দুর্বোধ্য ইঙ্গিত নির্ভর অতি সংক্ষিপ্ত শিল্প সৃষ্টির তাগিদ আর অন্যদিকে শিক্ষিত সমাজের শিল্পকলার প্রতি ঔদাসীন ও শিল্পবিমুখতা আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের কাছে শিল্পকলাকে পৌঁছোনোর ক্ষেত্রে বড় অন্তরায় হয় দাঁড়িয়েছে । কিন্তু বর্ণনাত্মক শিল্পকলা মানুষের এই শিল্পবিমুখতা দূর করতে পারে বলে আমার বিশ্বাস । আর আমার মত অনেকেই আজ এটা বিশ্বাস করেছেন বলেই হয়ত শিল্পকলা এখন পুনরায় বর্ণানাত্মক রূপ নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হচ্ছে এবং শিল্পীরা বর্ণানাত্মক সৃষ্টির দিকে ঝুঁকছেন । 

 




প্রশ্ন ঃ আমাদের ত্রিপুরার চিত্রজগৎ রাজ আমল থেকেই ঐতিহ্যশালী । আমরা বিশেষ বিশেষ চিত্রব্যক্তিত্বেরও আমরা পেয়েছি । তাদের কার কার কাজ আপনাকে প্রভাবিত করেছে ? আপনি ব্যক্তিগতভাবে কাকে বেশি ফলো করার চেষ্টা করতেন ?

উত্তর ঃ আমি আর্ট  কলেজে পড়াশোনা করেছি মূলত Applied / Graphic Design বিষয় নিয়ে । ফলে বিজ্ঞাপনের প্রয়োজনে যতটা ছবি আঁকা, তার বাইরে ছবি আঁকা নিয়ে আমার কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না। আমি মনের আনন্দেই ছবি আঁকতাম । কোনো বাঁধাধরা রুটিন, কোর্স, শিক্ষকদের নীতি নির্দেশিকা, পরীক্ষার চাপ এসব কিছুরই দায় আমার ছিল না । স্বাধীনভাবে, দায়ভার না-নিয়ে খোলা মনে যখন যেভাবে মন চাইতো সেভাবেই ছবি আঁকতাম । কারও  সাথে কোনো প্রতিযোগিতাও ছিল না । (আজও আমি তীব্রভাবে প্রতিযোগিতা বিরোধী ।) কিছু ভুলভ্রান্তি হলেও কেউ বিশেষ গুরুত্ব দিতেন না, ভেবে নিতেন ‘এ’ তো ছবি আঁকার main stream – এর ছাত্র নয় তাই যা ততটুকুই করতে পারে, করুক না ! একটা ক্ষমা, ঘেন্না মিশ্রিত প্রশ্রয় ছিল সবারই। এতে অবশ্য আমার ক্ষতি কিছু হয়নি, যা হয়েছে পুরোটাই আমার লাভ । শুধু একজন শিক্ষক, যিনি আমাকে খুব উৎসাহিত করতেন, প্রয়োজনীয় সহায়তা ও দিকনির্দেশ করতেন। তিনি আমার বিভাগেরই শিক্ষক শ্রী সত্যেন চক্রবর্তী । যা-ই কাজ করতাম শুধু তাকেই দেখাতাম, তার কাছ থেকেই পরামর্শ চাইতাম। তিনি যেভাবে বলতেন, সেই কথাগুলো মাথায় রেখে কাজ করার চেষ্টা করতাম । তাকে না-দেখান অবধি শান্তি পেতাম না।

কিন্তু আমি কোনো শিক্ষক বা কোনো শিল্পীকে অনুকরণ করিনি । সে ইচ্ছেও আমার কখনও ছিল না । যদিও রাজ্যের অনেকের কাজেই আমি উদ্বুদ্ধ হয়েছি । তারপরও কারও শিল্পের প্রভাব আমার ছবিতে পড়েনি বলেই আমি মনে করি । তবে হ্যাঁ, ছবি আঁকার ক্ষেত্রে নিজেকে যার একলব্য শিষ্য বলে মনে করি, যার ছবি, ছবির ভাবনা- চিন্তা আমাকে দারুণভাবে প্রভাবিত, অনুপ্রাণিত করত, তিনি হলেন আমার প্রাণের শিল্পী গণেশ পাইন । যিনি আমার ঈশ্বর । তারপরও দেশে- বিদেশের অনেক অনেক শিল্পীর কাজ তাদের চিন্তা- ভাবনা আমাকে ভীষণভাবে আন্দোলিত করে। প্রতিনিয়ত সবার সৃষ্টি থেকে কিছু না কিছু শিখতে জানতে চেষ্টা করি । এভাবেই গুটি গুটি পায়ে গিয়ে চলেছি ।

 

 

 

No comments:

Post a Comment

অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎

  'অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎ ‎সত্তর দশকের উন্মাদনায় এক ভিন্ন উচ্চারণ-ভঙ্গ...